The Daily Ittefaq
ঢাকা, শুক্রবার, ০৫ এপ্রিল ২০১৩, ২২ চৈত্র ১৪১৯, ২৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৪
সর্বশেষ সংবাদ ঢাকার সঙ্গে সারা দেশের দূরপাল্লার বাস চলাচল বন্ধ | কাওড়াকান্দি-মাওয়া নৌ চলাচল বন্ধ | চট্টগ্রামকে বিচ্ছিন্ন করার হুমকি হেফাজতের | সারা দেশ থেকে হেঁটে লংমার্চে যোগ দেয়ার আহবান হেফাজতে ইমলামের | লংমার্চে বাধা দিলে লাগাতার হরতাল:হেফাজতে ইসলাম | লংমার্চে পানি ও গাড়ি দিয়ে সহায়তা করছেন ফেনীর মেয়র | ঢাকার প্রবেশমুখে অবস্থান নেবে গণজাগরণ মঞ্চ | বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে অগ্নিকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে | সীতাকুণ্ডে বাস খাদে, নিহত ৩ | উত্তরের ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবেলায় দক্ষিণ কোরিয়ার যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন | ইন্দোনেশিয়ার কারাগারে বৌদ্ধ-মুসলিম দাঙ্গায় নিহত ৮ | টেস্ট দলে ফিরলেন সাকিব নাফীস | মুম্বাইয়ে ভবন ধসে নিহত ৪১

সান্ধ্যকালীন ট্রেনে গোপন যাতায়াত

ময়ূখ রিশাদ

শেষ হয়ে যাওয়া বিকেলের রোদ আর শুরু হতে যাওয়া রাতের আকাশ আমাকে প্রায় দ্বিধায় ফেলে দেয়। আঙুলের ফাঁকে হাহাকার মেশানো বিষণ্নতা নিয়ে তো এখন দিব্যি ভালো আছি। সবচেয়ে ঝামেলা হয় যখন দ্বিধাটি কী নিয়ে—সেটাই বুঝে পাই না। সেদিন হয়তো আড্ডায় যাওয়া হয় না, কোনো মেয়েকে শিস দেওয়া হয় না, কাউকে নিয়ে টিপ্পনী কাটা হয় না। ফোনের পর ফোন আসে, ফোন বেজেই চলে আর আমি চুপচাপ বসে থাকি জানালার ভাঙা কাচের সামনে। অবশ্য ভালো থাকাই বা কাকে বলে? দিন-রাত টইটই করে ঘুরে, রাতে বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে, আরামসে সিগারেটে টান দিতে দিতে ঘুমিয়ে পড়ার নাম ভালো থাকা? দ্বিধাটাই বা কিসের? এই অনিশ্চিত শান্তিপূর্ণ জীবন ছেড়ে নিশ্চিত অশান্তিময় কোনো কিছুর দিকে পা বাড়ানো? নাকি এই দ্বিধাটা বুঝতে না পারার নাম-ই দ্বিধা? বিকেলের রোদ শেষ হয়ে যখন রাতের অন্ধকারে নিজেকে খুঁজে পায়, তখন আমি মাঝে মাঝে আধো আধো আলোর সন্ধানে কেমন যেন বিষণ্ন হয়ে যাই। কেবল মনে হয়, আমার জীবন বুঝি কোনো এক সন্ধ্যাতেই থেমে গেছে; না পারছি পেছনে গিয়ে রোদ লাগাতে, না পারছি সামনে এগিয়ে চাঁদ মাখাতে। আমি এখন সন্ধ্যাবন্দী এক মানুষ।

এলাকার লোকজন প্রায় আমাকে সভাপতি বলে ডাকে। যদিও শ্লেষ মেশানো, তবু এই ডাক শুনলে নিজেকে বেশ কেউকেটা গোছের মনে হয়। আমার বন্ধুরা, আমাদের বেকার সৈনিকদলের এতে কোনো আপত্তি দেখিনি। বরং তারাও এখন মাঝে মাঝে আমাকে সভাপতি বলে ডাকে। আমি এই বেকার সৈনিকদলের সভাপতি। এই ডাকটা ওদের থেকে আমাকে একটু হলেও আলাদা করে দেয়। আমার নিরুত্তাপ জীবনে খুব সম্ভব একমাত্র আনন্দের উপলক্ষ এই আলাদা হয়ে যাওয়া। আমি যে কী ভীষণ সাধারণ একজন, তা আমি মুহূর্তের জন্য হলেও ভুলে যাই।

আজ সকাল থেকে মেঘ করে আছে, বৃষ্টি হয়নি। সারা দিন মেঘবন্দী হয়ে শুয়ে থেকে বিছানায় এপাশ-ওপাশ করছি। খানিকটা পড়াশোনা করার কারণে আমার শ্রেণী-উত্তরণ ঘটার পর বাড়ির লোকজনের সাথে বেশ দূরত্ব সৃষ্টি হয়ে গেছে।

আমি কখন আসি, কখন যাই, কীভাবে থাকি, কীভাবে বাঁচি—এ নিয়ে তাদের ভেতরে বিশেষ কোনো আগ্রহ দেখা যায় না। হুটহাট বাবা এসে করুণ চোখে তাকিয়ে বলেন, আমার তো বয়স হয়ে এল। এবার কিছু একটাতে যোগ দে। কিছু না পারলে মাস্টারি কর। আমি কিছু না বলে, চোখ গরম করে তাকালে বাবা বিনা প্রতিবাদে চলে যান।

পরিবারের সঙ্গে আমার সংযোগ তাই সীমাবদ্ধ থাকে মাঝে মাঝে বড় আপার বাসায় যাওয়াতে। অনেক দিন হয়ে গেল, সেই বড় আপার বাসায় যাওয়া হয় না। নির্দিষ্ট কোনো কারণ নেই, স্রেফ যাওয়া হয় না। শেষবার গিয়েছিলাম প্রায় এক মাস আগে। এর আগে নিয়মিত বিরতিতে যেতাম, সপ্তাহে একবার না হলেও দশ দিনে একবার। বাড়ি থেকে খুব বেশি দূরে না। বিশ টাকা রিকশা ভাড়া। আপা, দুলাভাই দুজনেই চাকরিজীবী। বাসায় থাকে আমার ভাগনে আর তাকে দেখাশোনার জন্য দুলাভাইয়ের কোনো এক লতাপাতায় আত্মীয়। দেখতে দেখতে ভাগনের সাত বছর হয়ে গেল। ওর যখন জন্ম হয়, তখন আমার অনার্স শেষ হয়েছে। তার মানে এই বেকারজীবনের সাত বছর পার হয়ে গেছে। ভার্সিটির বন্ধুরা কেউ কেউ বিয়ে পর্যন্ত করে ফেলেছে, অনেকেই চাকরি করছে, দেখা-সাক্ষাত্ নেই বলতে গেলে। আমার সময় কাটানোর ভরসা তাই ওই এলাকার বন্ধুরা, যারা আমার মতো করেই হতাশা পান করে চলছে।

আমার ভাগনে অনি সেদিন হুট করেই আমাকে বলেছিল, মামা তুমি আমাকে জাদু শেখাবে?

আমি নরম ফোমের সোফায় গা ডুবিয়ে দিয়ে আয়েশ করে টিভির বিভিন্ন চ্যানেলে ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম। তার কথায় বেশ অবাক হয়ে তাকালাম। জিজ্ঞেস করেছিলাম, কিসের জাদু?

অনি এই বয়সে ভারী চশমা পরে, কোঁকড়া চুলে তাকে বয়সের তুলায় বেশ বড় লাগে। অবশ্য বড় লাগার আরেকটি কারণ হতে পারে, সে হাসে না, খেলে না, তার বয়সী কোনো বন্ধু আমার চোখে পড়েনি।

তাই অনি যখন কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলেছিল, পাখি হয়ে উড়ে যাওয়ার জাদু, আমি অবাক হইনি। ছেলেটি হয়তো জন্ম হয়ে শৈশবে যাবার পরিবর্তে একেবারে কৈশোরে চলে গিয়েছে, তাই তার কাছ থেকে এমন ভারিক্কি উত্তরে অবাক হবার কিছু থাকে না। অবশ্য ব্যাপারটা এভাবেও দেখা যায়, শৈশবে আছে বলেই এমন ছেলেমানুষী ইচ্ছে হয় তার কিংবা পরিচিত কাউকে সে দেখেছে পাখি হতে চাইছে। আমরা বড় মানুষেরাও তো কখনো কখনো চাই পাখি হয়ে উড়ে চলে যেতে। আবার আমাদের ভয় আঁকড়ে ধরে, পাখি হতে গিয়ে যদি কোনো খাঁচায় বন্দী হয়ে যাই? আমরা কেউ তো আসলে চাই না, এক খাঁচা থেকে মুক্ত হয়ে অন্য খাঁচায় চলে যেতে। তাই পুরোনো চেনা খাঁচাতেই আমরা চুপচাপ মরে যেতে যেতে দিন কাটাতে থাকি।

আমি তত্ক্ষণাত্ উত্তর দিয়েছিলাম, কেন নয়? অবশ্যই শেখাব।

সে মুচকি হেসে চুপ হয়ে গিয়েছিল। এই মুচকি হেসে চুপ হয়ে যাবার ব্যাপারটি কেবল বড়দের ক্ষেত্রে দেখা গেলেও অনির এমন হাসিতেও আমি বিন্দুমাত্র অবাক হই না, বরং সে যদি উচ্ছ্বসিত হয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরত অথবা চকোলেট খেতে চাইত, আমি অবাক হতাম।

আমি তাকে মিথ্যে আশ্বাস দিয়েছিলাম। ভাগনে জানে না, যত ভয় থাকুক না কেন, উড়ে যেতে পারলে আমি কবেই উড়ে চলে যেতাম।

বাইরে বিজলি চমকানোর শব্দ শোনা যায়। ভাগনে খুব সম্ভব জানালা দিয়ে এখন গম্ভীর মুখে তাকিয়ে বৃষ্টি দেখবে। আমি একদিন তাকে বলেছিলাম, বৃষ্টিতে ভিজতে ইচ্ছে হয় না? সে বলেছিল, ভিজতে ইচ্ছে হবে কেন?

বেচারা বাসায় এখন একা বসে আছে নিশ্চয়। ইচ্ছে করছে, চলে যাই ওর বাসায়। বাসার ছাদের উঠে ওকে নিয়ে বৃষ্টিতে ভিজে আসি। তার পাখি হবার সাধ কিছু হলেও পূরণ হয়ে যাবে। আমার মামা আমাকে পুকুরে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে সাঁতার কাটা শিখিয়েছিলেন, বাড়ির সবার চোখ লুকিয়ে সাইকেল কিনে দিয়েছিলেন, সাইকেল চালিয়ে কীভাবে টইটই করে ঘুরে সকালকে সন্ধ্যা বানাতে হয়—তা শিখিয়েছিলেন। আমি হয়তো আমার ভাগনেকে কীভাবে ঘরবন্দী হয়ে থাকতে হয়, তা নিজের অজান্তেই শেখাচ্ছি।

রেডি হবার জন্য বিছানা থেকে উঠতেই ওকে দেওয়া প্রতিশ্রুতির কথা মনে পড়ে যায়; জাদু শেখানোর প্রতিশ্রুতি, যে-সে জাদু নয়, পাখি হবার জাদু! মনে মনে ঠিক করে ফেলি, আমি আজ তাকে সন্ধ্যার ট্রেন থেকে ঘুরিয়ে নিয়ে আসব, যে ট্রেনের যাত্রী এত দিন ছিলাম কেবল আমি।

২.

এবার একটু পেছনে ঘুরে আসা যেতে পারে। যখন আমার জীবনে আচমকা একজন রাজকন্যা এসেছিল আর এসেছিল নিজেকে সাধু অথবা তান্ত্রিক বলে পরিচয় দেওয়া এক রহস্যময় ব্যক্তি। অবশ্য এই যে রাজকন্যা আজ আর নেই, এর পেছনে ওই বিশেষ ব্যক্তির সামান্য হলেও ভূমিকা ছিল সে কথা আমি আদৌ অস্বীকার করতে পারি না কিংবা অস্বীকার করতে চাই না।

বেশ কিছুদিন আগের কথা। তখনো আমার বয়স বেশ কম। আচমকা এক রাজকন্যার সঙ্গে পরিচয় হয়, পরিচয় থেকে বন্ধুত্ব। এমন ক্ষেত্রে রূপকথার মতো করে রাজকন্যা আমাকে ভালোবেসে ফেলে। রাজকন্যাকে ফেরায়, সেই সাধ্য কার? আমিও ফেরাতে পারিনি।

তারপর দিন কাটতে লাগল, কাটতে লাগল রাত। আর সেই দেশে ছিল এক তান্ত্রিক; ঘটনাচক্রে একদিন তার সঙ্গে আমার দেখা হয়ে যায়। রাত করে বাড়ি ফেরা আমার অভ্যাস। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে গিয়ে কোনো কোনো দিন বাড়িতেই ফিরি না। তো এমন এক রাতে সাদা পাঞ্জাবি পরা, মুখভর্তি রবীন্দ্রনাথের মতো দাঁড়িওয়ালা একজন ভদ্রলোক আমাকে থামিয়ে বলল, সিগারেট হবে?

সিগারেট শেয়ার করতে গিয়ে টুকটাক কথা বলতে বলতে তান্ত্রিক আমার পকেটে ছুরি ঢুকিয়ে দিতে দিতে বলেছিল, সাবধান, এই ছুরি দেখা যায় না, ছোঁয়া যায় না, এই ছুরি দিয়ে কেবল কুয়াশা কাটা যায়, কুয়াশার ফুল বানানো যায়, তোমার কাজে লাগবে। হেঁয়ালি ভেবে ভুলে গিয়েছিলাম। আর ভুলব না কেন? মাতাল কোনো এক রাতে কেউ যদি এসে বলে, এই নে ছুরি। এটা দিয়ে কুয়াশা কাটা যায়, তবে পরদিন সুস্থমস্তিষ্কে সেটা ভুলে যাওয়ার-ই কথা।

এরপর আরেকটি মাতালরাত্রি শেষে বাড়ি ফিরতে গিয়ে দেখি, কুয়াশায় পথে হাঁটা দায়। তান্ত্রিকের দেওয়া ছুরির কথা মনে পড়ে যায়। ভাবি, কুয়াশা কেটে বোধহয় বাড়ি ফিরতে হবে।

পকেটে হাত দিয়ে কিছু পাই না। কিছুটা হতাশ হয়ে হাত বের করে ফেলি। ও মা, দেখি, এক টুকরো কুয়াশা আমার হাতের ভেতরে চলে এল, তারপর আরও। একটু একটু করে পথ পরিষ্কার করে করে আমি হাতভর্তি কুয়াশা নিয়ে বাড়ি ফিরে এসে ফুল বানাতে বসি। কাগজের ফুলই বানাইনি কখনো, তাই কুয়াশার ফুল বানাতে বানাতে রাত পার হয়ে সকাল হয়ে যায়। বানিয়ে তোমার কাছে নিয়ে যেতেই, তুমি ফুল হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলে। তারপর যে যার পথের দিকে নিঃশব্দে চলে গেলাম।

আমি একফোঁটা অবাক হইনি। বস্তুত, আমরা দুজনই বুঝতে পেরেছিলাম একটা কুয়াশার মতো সুন্দর কিন্তু ঝাপসা আবহে এক পথে হাঁটার চেয়ে আলাদা পথ খুঁজে নেওয়া ভালো। আমার গল্পটা এখানেই শেষ হয়ে যেতে পারত, যদি সান্ধ্যকালীন নিজস্ব ট্রেনে আমার গোপন যাতায়াত না থাকত।

৩.

পড়াশোনা শেষ হয়েছে, চাকরি নেই। প্রেম এসেছিল জীবনে, প্রেম আছে এখনো তবে প্রেমিকা নেই। আকণ্ঠ হতাশায় ডুবে থাকার জন্য নিঃসন্দেহে এটি একটি আকর্ষণীয় প্ল্যাটফর্ম। প্ল্যাটফর্ম আছে যেহেতু ট্রেন তো থাকতেই হয়। সেজন্য কিনা স্বপ্নে কিংবা বাস্তবে আমি একটি ট্রেনপ্রাপ্ত হলাম। ধোঁয়াটে রঙের ট্রেন। একটাই বগি, পুরো বগিজুড়ে ঘাসের কার্পেট। ইনসমনিয়াকে আমি বিছানা ভেবে গা পেতে দিই। চোখের ভেতরে ঢুকে যায় ঘাসফুল, বেগুনি রঙের প্রজাপতি এসে বসে পায়ের পাতায়, ট্রেন ঝিকঝিক শব্দ তুলে কোথায় জানি এগিয়ে যায়।

কখনো সময়কে পেছনে ফেলে শৈশবে যায়। আমার নিজস্ব টাইম-মেশিনে তখন আমি ছোট্ট শিশু হয়ে এলাকার ছেলেদের কোলে কোলে ঘুরে লজেন্স খেতে থাকি। আহা, সেই কোকাকোলা লজেন্স!

আমি সুন্দরী বোনের ছোট ভাই ছিলাম। এলাকায় ছিল বাড়তি খাতির। তখন বুঝতাম না। আমার ট্রেন আমাকে দেখিয়ে দেয়, কীভাবে আমাকে লজেন্স খাওয়ানো নিয়ে ঝগড়া হতো। নিরীহ লজেন্সের কত শক্তি।

আবার কোনোদিন চলে যাই ব্রিজে, ব্রিজের নিচে নদী। আমি ট্রেনে বসেই শুনতে পারি ছলাত্ ছলাত্ শব্দ। আমি তখন একটা ছোট্ট মাছ হয়ে যাই। লাফ দিই জলে আর কোথা থেকে এসে জুড়ে বসে জেলেদের জাল। আমি ফাঁক-ফোঁকর খুঁজে পালানোর চেষ্টা করি। কোনোদিন পালিয়ে চলে যাই। ডুব দিই আরও গভীর জলে। গিয়ে দেখি, সেখানে আমার মতো শত শত ছোট মাছ। মাছ হয়ে গেলে কথা বলা যায় না, তাই তাদের জিজ্ঞাসা করা হয় না, তাদের ও কী গোপন ট্রেন আছে কি না।

আবার কোনো কোনো দিন ধরা পড়ে যাই। জেলের চেহারার দিকে তাকিয়ে চমকে উঠি। অবিকল আমার মতো চেহারা। হিংস্র চোখে তাকিয়ে থাকে আমার দিকে। আমি আমার মতো চোখ দেখে আবার অবাক হয়ে যাই। নিজের চোখ বুঝি মানুষের কাছে এত অচেনা থাকে?

ট্রেনে উঠে গেলে আমি ডাইনোসর হতে পারি। ডাইনোসর হয়ে দাবড়ে বেড়াই শহর। সবুজ রঙের ডাইনোসর। মাঝে মাঝে ঘাসের মধ্যে কাদা লেগে থাকার মতো করে ধূসর রঙের ছোপ। রূপকথার গল্পের মতো বিশাল বড় দাঁত। ডাইনোসর হয়ে চারপেয়ে আমি থপথপ করে হেঁটে বেড়াই। মুখ দিয়ে আগুনের পরিবর্তে বের হয় বরফ। প্রথমেই জমিয়ে শীতল করে দিই পাড়ার দোকানদারদের, যারা আমার কাছে টাকা পায়। আর ভাবি, এই ট্রেনও আমাকে আগুন নিক্ষেপ করতে শেখাল না? বাস্তবজীবনে তাই বুঝি আমি কেবল শীতল থেকে শীতলতর হতে থাকি।

আমার ট্রেন আমাকে যা ইচ্ছে, তা হতে দেয়। অন্যের ইচ্ছেয় পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে ক্লান্ত আমি ট্রেন ভ্রমণে হয়ে উঠি রাজা। ট্রেনের কোনো যাত্রায় এটা পর্যন্ত দেখতে পাই, বাবা আমাকে নিয়ে গর্ব করছেন।

ছোটবেলায় বাবা আমাকে কাঁধে নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন আর কারও সঙ্গে দেখা হলে বলতেন, এইটা আমার ছেলে। ছেলে বেকার সৈনিকদলের সভাপতি। এসব বিষয় নিয়ে বাবারা গর্ব করতে জানে না, একদমই না।

আজ এই প্রথম আমার ভাগনের সঙ্গে যাব ভাবতে বেশ ভালো লাগছে। আমি দ্রুত রেডি হয়ে নিই। ওর বাবা-মা ফিরে এলে কোথাও যাওয়া হবে না। ভাগনের বাড়ি থেকে বের হওয়া নিষেধ।

৪.

ওদের বাসার বেল বাজাতে কাজের মেয়ে দরজা খুলে দিল। এই অসময়ে কারও বাসায় থাকার কথা না থাকলেও আমাকে দেখে দুলাভাই বের হয়ে এলেন। মুখে রাজ্যের আঁধার।

আমাকে দেখে বললেন, এবার আর হচ্ছে না রে। আর পারছি না।

আমাদের কাউকে বলনি কেন?

বলে কী হবে? এখন মাসে দুবার দেওয়া লাগে। একেবারে সব শেষ হলেই না হয় খবর দিব।

দুলাভাইয়ের হতাশা আমি বুঝতে না পারলেও বোঝার ভান করি। ভাগনের রুমে ঢুকতেই দেখি, মলিন মুখে সে শুয়ে আছে। শরীরে ব্লাড যাচ্ছে। আগে হাসপাতালে গিয়ে দিত। এখন ঘন ঘন দিতে হয় বলেই বাসায় দেওয়া হয়। এমনিতে ও-নেগেটিভ ব্লাড। পাওয়া মুশকিল হয়ে যায়। আপার মুখ শুকিয়ে আছে। আমাকে দেখেও দেখে না।

থ্যালাসেমিয়া রোগ যখন ধরা পড়ল তখন ডাক্তার বলেছিল, রক্ত দিয়ে দিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে ওকে। কিন্তু এত তাড়াতাড়ি যে অবস্থা খারাপ হয়ে যাবে, এটা আমরা কেউ ভাবতে পারিনি।

আপা বলতে থাকেন, ওর পেটের বাঁ পাশ ফুলে অনেক বড় হয়ে গেছে। অপারেশন করাতে হবে। কী করব বল?

করাতে হলে করাবে। এরপর নিস্তব্ধতা নেমে আসে ঘরে। আমার দমবন্ধ হতে শুরু করে। এদিক-সেদিক ঘুরে সন্ধ্যা হবে হবে করছে এমন সময়ে বাসায় ফিরে আসি।

ট্রেনের জন্য অপেক্ষা শুরু হয়। কিন্তু ট্রেনের দেখা পাওয়া যায় না। বিচ্ছিরি ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে ফ্যান ঘুরতে থাকে। সন্ধ্যা কেবল নীরবতা নিয়ে জেগে থাকে। একসময় সে বিদায় নেয়। রাত আসে। মা খাবারের জন্য ডাক দেয়। খাবার একসময় ঠান্ডা হয়ে যায়। আমার প্ল্যাটফর্মে আমি একাকী বসে থাকি। কেবল একটি জিনিসই মাথায় ঘুরতে থাকে, পাখি হবার আসল জাদু জেনেও ভাগনে আমার কাছে জাদু শিখতে চেয়েছিল, পাখি হয়ে উড়ে যেতে চেয়েছিল। সে হয়তো একদিন উড়ে চলে যাবে, আমরা তার পালকগুলো নিয়ে সাজিয়ে রাখব, তাতে ধুলো জমতে দেব না, হারিয়ে যেতে দেব না।

ট্রেন মানুষকে মাছ হওয়া শেখাতে পারে, ডাইনোসর বানাতে পারে, টাইম মেশিনের মতো করে শৈশবে নিয়ে যেতে পারে কিন্তু পাখি হবার জাদু শেখাতে পারে না। আর আমার মতো কেউ কেউ তবুও সান্ধ্যকালীন ট্রেনের অপেক্ষায় দু-এক প্যাকেট সিগারেট বেশি খেয়ে ফেলবে।

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
রাশেদ খান মেনন বলেছেন, সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করছে আবার হেফাজতের সঙ্গে আলোচনা করছে। এর ফলে সরকারের আমও যাবে ছালাও যাবে। তার বক্তব্যের সঙ্গে আপনি একমত?
6 + 6 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
নভেম্বর - ৮
ফজর৫:০৭
যোহর১১:৫১
আসর৩:৩৬
মাগরিব৫:১৫
এশা৬:৩৩
সূর্যোদয় - ৬:২৭সূর্যাস্ত - ০৫:১০
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :