The Daily Ittefaq
ঢাকা, রবিবার, ১৪ এপ্রিল ২০১৩, ১ বৈশাখ ১৪২০, ২ জমাদিউস সানি ১৪৩৪
সর্বশেষ সংবাদ ভেনেজুয়ালার নতুন প্রেসিডেন্ট মাদুরো | পদ্মায় নৌকাডুবি: তিন লাশ উদ্ধার | রাজশাহীর তিন জেলায় হরতাল পালন: ছাত্রলীগ কর্মীকে হত্যা, বিএনপি কার্যালয়ে ভাংচুর | সাংবাদিকদের অনশনে বিএনপির সংহতি | ঢাবিতে ছাত্রলীগের চাঁদাবাজি: ১১ কর্মী বহিষ্কার | ক্ষমা চাইল প্রথম আলো ও হাসনাত আবদুল হাই | সাংবিধানিক ধারা অব্যাহত রাখবে সশস্ত্র বাহিনী: তিন বাহিনীর প্রধান | যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মাননা পাচ্ছেন ড. ইউনূস | বিদেশে কর্মী পাঠাতে প্রতারণা করলে সাত বছরের কারাদণ্ড

শুভ নববর্ষ

শামসুজ্জামান খান

বাংলা সনের প্রথম মাসের নাম বৈশাখ। পয়লা বৈশাখে বাঙালির নববর্ষ উত্সব। নববর্ষ সকল দেশের, সকল জাতিরই আনন্দ উত্সবের দিন! শুধু আনন্দ-উচ্ছ্বাসই নয়, সকল মানুষের জন্য কল্যাণ কামনারও দিন। আমরা সুখ-শান্তি-সমৃদ্ধি ও কল্যাণের প্রত্যাশা নিয়েই মহা-ধুমধামের সঙ্গে আমাদের নববর্ষ উত্সব উদযাপনব করি। একে অন্যকে বলি :শুভ নববর্ষ।

বাংলা নবনবর্ষ এখন আমাদের প্রধান জাতীয় উত্সব। প্রতি বছর এ-উত্সব বিপুল মানুষের অংশগ্রহণে বিশাল থেকে বিশালতর হয়ে উঠছে। বাংলাদেশে যে এতটা প্রাণের আবেগে এবং গভীর ভালোবাসায় এ উত্সব উদ্যাপিত হয় তার কারণ পাকিস্তান আমলে পূর্ব-বাংলার বাঙালিকে এ-উত্সব পালন করতে দেওয়া হয়নি। বলা হয়েছে, এটা পাকিস্তানি আদর্শের পরিপন্থি। সে বক্তব্য ছিল বাঙালির সংস্কৃতির ওপর এক চরম আঘাত। বাঙালি তার সংস্কৃতির ওপর এ আঘাত সহ্য করেনি। তারা এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে। ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে সকল বাঙালির এ-উত্সবকে জাতীয় ছুটির দিন ঘোষণার দাবি জানিয়েছে। কিন্তু সে-দাবি অগ্রাহ্য হয়েছে। ফলে পূর্ব-বাংলার বাঙালি ফুঁসে উঠেছে। সোচ্চার হয়ে উঠেছে প্রতিবাদে। এভাবেই পূর্ব-বাংলায় বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং বাঙালি জাতিসত্তা গঠনের প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায় বাংলা নববর্ষ এবং তার উদযাপনবের আয়োজন।

১৯৫৪ সালের পূর্ব বাংলার সাধারণ নির্বাচনে মুসলিম লীগ সরকারকে বিপুলভাবে পরাজিত করে যুক্তফ্রন্টের সরকার গঠিত হলে মুখ্যমন্ত্রী ও বাঙালিদের জনপ্রিয় নেতা শেরে বাংলা এ.কে. ফজলুল হকের সরকার বাংলা নববর্ষে ছুটি ঘোষণা করেন এবং দেশবাসীকে নববর্ষের শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান। সেটা ছিল বাঙালির এক তাত্পর্যপূর্ণ বিজয়ের দিন। কিন্তু সে-বিজয় স্থায়ী হয়নি। যুক্তফ্রন্ট ভেঙ্গে দিয়ে এবং সামরিক শাসন জারি করে তা সাময়িকভাবে রুখে দিয়েছে স্বৈরাচারি পাকিস্তান সরকার। তবু পূর্ব-বাংলার বাঙালি পিছু ওঠেনি। সরকারিভাবে আর নববর্ষ উদ্যাপিত হয়নি পাকিস্তান আমলে; কিন্তু বেসরকারিভাবে উদ্যাপিত হয়েছে প্রবল আগ্রহ ও গভীরতার উত্সাহ-উদ্দীপনায়। এর মধ্যে সবচেয়ে সুসংগঠিত এবং সুপরিকল্পিত বিপুল আগ্রহ-উদ্দীপনাময় অংশগ্রহণে দেশের সর্ববৃহত্ জাতীয় অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। রাজধানী ঢাকার নববর্ষ উত্সবের দ্বিতীয় প্রধান আকর্ষণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ছাত্র-ছাত্রীদের বর্ণাঢ্য মঙ্গল শোভাযাত্রা। এই শোভাযাত্রায় মুখোশ, কার্টুনসহ যেসব সাস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতীকধর্মী চিত্র বহন করা হয় তাতে আবহমান বাঙালিত্বের পরিচয় এবং সমকালীন সমাজ-রাজনীতির সমালোচনাও থাকে।

এবার আমরা বাংলা সন ও নববর্ষ উদযাপনবের কথা বলি। বাংলা সনের ইতিহাস এখনো সুস্পষ্টভাবে জানা যায়নি। তবে অধিকাংশ ঐতিহাসিক ও পণ্ডিতই মনে করেন মুগল সম্রাট আকবর চান্দ্র হিজরী সনের সঙ্গে ভারতবর্ষের সৌর সনের সমন্বয় সাধন করে ১৫৫৬ সাল বা ৯৯২ হিজরিতে বাংলা সন চালু করেন। আধুনিক গবেষকদের মধ্যে কেউ কেউ মনে করেন মহামতি আকবার সর্বভারতীয় যে এলাহী সন প্রবর্তন করেছিলেন তার ভিত্তিতেই বাংলায় আকবরের কোনো প্রতিনিধি বা মুসলমান সুলতান বা নবাব বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। সেজন্যই একে 'সন' বা 'সাল' বলে উল্লেখ করা হয়। 'সন' কথাটি আরবি, আর 'সাল' হল ফারসি। এখনো সন বা সালই ব্যাপকভাবে প্রচলিত। তবে বঙ্গাব্দও বলেন কেউ কেউ।

বাংলা সন চালু হবার পর নববর্ষ উদযাপনবে নানা আনুষ্ঠানিকতা যুক্ত হয়। নবাব এবং জমিদারেরা চালু করেন 'পুণ্যাহ' অনুষ্ঠান। পয়লা বৈশাখে প্রজারা নবাব বা জমিদার বাড়িতে আমন্ত্রিত হতেন, তাদের মিষ্টিমুখও করানো হতো। পান-সুপারিরও আয়োজন থাকতে। তবে তার মূল উদ্দেশ্য ছিল খাজনা আদায়। মুরশিদাবাদের নবাবেরা এ অনুষ্ঠান করতেন। বাংলার জমিদারেরও করতেন এ অনুষ্ঠান। জমিদারী উঠে যাওয়ায় এ অনুষ্ঠান এখন লুপ্ত হয়েছে।

পয়লা বৈশাখের দ্বিতীয় বৃহত্ অনুষ্ঠান ছিল 'হালখাতা'। এ অনুষ্ঠানটি করতেন ব্যবসায়ীরা। বাংলাদেশ কৃষি প্রধান। তাই ফসলের মৌসুম ফসল বিক্রির টাকা হাতে না এলে কৃষকসহ কেউই নগদ টাকার মুখ খুব একটা দেখতে পেত না। ফলে সচারাচর বাকিতে প্রয়োজনীয় জিনিস না কিনে তাদের উপায় ছিল না। পয়লা বৈশাখের হালখাতা অনুষ্ঠানে তারা দোকানীদের বাকি টাকা মিটিয়ে দিতেন। অন্তত আংশিক পরিশোধ করেও নতুন বছরে খাতা খুলতেন। হালখাতা উপলক্ষে দোকানীরা ঝালর কাটা লাল নীল সবুজ বেগুনি কাগজ দিয়ে দোকান সাজাতেন। ধূপধুনো জ্বালানো হতো। মিষ্টিমুখ করানো হতো গ্রাহক-খরিদ্দারদের। হাসি-ঠাট্টা, গল্পের মধ্যে বকেয়া আদায় এবং উত্সবের আনন্দ উপভোগ দুই-ই সম্পন্ন হতো। হালখাতাও এখন আর তেমন সাড়ম্বরে উদ্যাপিত হয় না। এখন মানুষের হাতে নগদ পয়সা আছে। বাকিতে বিকিকিনি এখন আর আগের মতো ব্যাপক আকারে হয় না।

বাংলা নববর্ষের আর একটি অনুষ্ঠান হলো বৈশাখী মেলা। দেশের বিভিন্ন স্থানে বৈশাখের প্রথম দিনে বার্ষিক মেলা বসে। এইসব মেলার অনেকগুলোই বেশ পুরোনো। এই মেলাগুলোর মধ্যে খুব প্রাচীন ঠাকুরগাঁ জেলার রাণীশৈংকেল উপজেলার নেকমরদের মেলা এবং মহামুণির বৌদ্ধপূর্ণিমা মেলা। এক সময়ে এইসব মেলা খুব ধুমধামের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হতো। সে মেলা এখনো বসে তবে আগের সে জৌলুস এখন আর নেই। আগে গ্রাম-বাংলার এই বার্ষিক মেলাগুলোর গুরুত্ব ছিল অসাধারণ। কারণ তখনো সারাদেশে বিস্তৃত যোগাযোগ ও যাতায়াত ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ফলে মানুষের জীবনযাত্রা ছিল স্থবির। এখন যেমন দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে একদিনের বেশি লাগে না। তা সম্ভব ছিল না। নৌকা, ঘোড়ার গাড়ি, গরুর, মোষের গাড়িতে মানুষ বা পণ্য পরিবহনে বহুসময় বা কয়েকদিন লেগে যেত। এখন নতুন নতুন পাকা রাস্তা ও দ্রুতগতির যানবাহন চালু হওয়ায় সে সমস্যা আর নেই। আগে এসব আঞ্চলিক মেলা থেকেই মানুষ সারা বছরের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে রাখতো। তাছাড়া এসব মেলা অঞ্চল বিশেষের মানুষের মিলন মেলাও পরিণত হতো। নানা সংবাদ আদান-প্রদান, নানা বিষয়ে মত বিনিময়েরও আদর্শ স্থান ছিল এসব মেলা। আবার বাত্সরিক বিনোদনের জায়গাও ছিল মেলা। মেলায় থাকতো কবিগান, কীর্তন, যাত্রা, গম্ভীরা গান, পুতুন নাচ, নাগর দোলাসহ নানা আনন্দ-আয়োজন।

নববর্ষের ওই তিনটি প্রধান সর্বজনীন উত্সব ছাড়াও বহু আঞ্চলিক উত্সব আছে। এদের মধ্যে চট্টগ্রামের লালদিঘি ময়দানে অনুষ্ঠিত বলী খেলা বিশেষ উল্লেখযোগ্য। ১৯০৭ সাল থেকে কক্সবাজারসহ বৃহত্তর চট্টগ্রামের নানাস্থানে এই খেলার প্রচলন আছে। এই বিখ্যাত কুস্তি খেলাকেই বলা হয় বলী খেলা। আবদুল আজিজ নামের এক ব্যক্তি এ খেলার প্রবর্তন করেন বলে একে 'আবদুল আজিজের বলী খেলা'ও বলা হয়।

আমানিও নববর্ষের একটি প্রাচীন আঞ্চলিক মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান। এটি প্রধানত কৃষকের পারিবারিক অনুষ্ঠান। চৈত্র মাসের শেষ দিনের সন্ধ্যারাতে গৃহকত্রী এক হাঁড়ি পানিতে স্বল্প পরিমাণ অপক্ব চাল ছেড়ে দিয়ে সারারাত ভিজতে দেন এবং তার মধ্যে একটি কচি আমের পাতাযুক্ত ডাল বসিয়ে রাখেন। পয়লা বৈশাখের সূর্য ওঠার আগে ঘর ঝাড়ু দিয়ে সেই হাঁড়ির পানি সারা ঘরে ছিঁটিয়ে দেন। পরে সেই ভেজা চাল সকলকে খেতে দিয়ে আমের ডালের কচি পাতা হাঁড়ির পানিতে ভিজিয়ে বাড়ির সকলের গায়ে ছিঁটিয়ে দেন। তাদের বিশ্বাস এতে বাড়ির সকলের কল্যাণ হবে। নতুন বছর হবে সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধির। এ অনুষ্ঠান এখন খুব একটা দেখা যায় না।

নববর্ষের এ ধরনের আরও নানা অনুষ্ঠান আছে নিজ নিজ এলাকায় খোঁজ নিলে তার সন্ধান পাওয়া যাবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকায়ও নববর্ষের উত্সব হয় নানা আনন্দময় ক্রীড়া-কৌতুকের মধ্য দিয়ে এরা বৈসুব, সাংগ্রাই ও বিজু তিনটিকে একত্রে করে 'বৈসাবী' নামে উত্সব করে। গ্রাম-বাংলায় নববর্ষে নানা খোলাধুলারও আয়োজন করা হতো। মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জে হতো গরুর দৌড়, হাডুডু খেলা, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মোরগের লড়াই, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, নড়াইলে ষাঁড়ের লড়াই প্রভৃতি।

আধুনিককালের নব আঙ্গিকের বর্ষবরণ উত্সবের সূচনা হয় কোলকাতার ঠাকুর পরিবারে এবং শান্তি নিকেতনে রবীন্দ্রনাথের উদোগে। সেই ধারা ধীরে ধীরে সারা বাংলায় ছড়িয়ে পড়ে। আমাদের নববর্ষ উত্সব '৫২ সনের ভাষা আন্দোলনের পর নতুন গুরুত্ব ও তাত্পর্য লাভ করে। আগে সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট-এর আয়োজনের কথা বলেছি। এ ছাড়া বাংলা একাডেমতে বৈশাখী ও কারুপর্ণ মেলা এবং গোটা বিশ্ববিদ্যালয় ও রমনা এলাকায় পয়লা বৈশাখের দিনে লক্ষ্য মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে। নতুন পায়জামা-পাঞ্জাবি পরে চেলো এবং নানা রংয়ের শাড়ি পরে মহিলা ও বালিকারা এই অনুষ্ঠানকে বর্ণিল করে তোলে। রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলের গান লোকসংগীত এবং বাঁশির সুরে মতোয়ারা হয়ে ওঠে সমবেত আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা। আনন্দময় ও সৌহার্দ্যপূর্ণ এই পরিবেশ আধুনিক বাঙালি জীবনের এক গৌরবময় বিষয়।

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করবে সংসদীয় ঐকমত্য কমিটি। টিআইবির এ প্রস্তাবের সঙ্গে আপনি একমত?
9 + 8 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
সেপ্টেম্বর - ১৭
ফজর৪:৩০
যোহর১১:৫৪
আসর৪:১৮
মাগরিব৬:০৪
এশা৭:১৭
সূর্যোদয় - ৫:৪৫সূর্যাস্ত - ০৫:৫৯
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :