The Daily Ittefaq
ঢাকা, রবিবার, ১৪ এপ্রিল ২০১৩, ১ বৈশাখ ১৪২০, ২ জমাদিউস সানি ১৪৩৪
সর্বশেষ সংবাদ ভেনেজুয়ালার নতুন প্রেসিডেন্ট মাদুরো | পদ্মায় নৌকাডুবি: তিন লাশ উদ্ধার | রাজশাহীর তিন জেলায় হরতাল পালন: ছাত্রলীগ কর্মীকে হত্যা, বিএনপি কার্যালয়ে ভাংচুর | সাংবাদিকদের অনশনে বিএনপির সংহতি | ঢাবিতে ছাত্রলীগের চাঁদাবাজি: ১১ কর্মী বহিষ্কার | ক্ষমা চাইল প্রথম আলো ও হাসনাত আবদুল হাই | সাংবিধানিক ধারা অব্যাহত রাখবে সশস্ত্র বাহিনী: তিন বাহিনীর প্রধান | যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মাননা পাচ্ছেন ড. ইউনূস | বিদেশে কর্মী পাঠাতে প্রতারণা করলে সাত বছরের কারাদণ্ড

সোমেশ্বরী মেলার অতীত-বর্তমান

 সুমনকুমার দাশ

সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার দাড়াইন নদীর ধারে সবুজ-শ্যামল ছোট্ট গ্রাম বাহাড়া। সেই গ্রামের দু-চারজনকে 'বাহাড়া' নামের উত্পত্তি হলো কীভাবে সে প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করলাম। কিন্তু কেউ বলতে পারলেন না। তবে সেই গ্রামের পাশে যে প্রায় সাড়ে তিন শ বছর ধরে 'সোমেশ্বরী মেলা'র প্রচলন, সেটা বেশ বলতে পারলেন। তার মানে এই গ্রামের উত্পত্তি সাড়ে তিন শ বছরেরও অধিক সময় পূর্বের। আর তখন থেকেই পুণ্যার্জনের স্থান হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে সোমেশ্বরী মন্দির প্রাঙ্গণ।

সোমেশ্বরী মেলার উত্পত্তি বিষয়ে জানা যায়, ভাটি এলাকার কৃষকেরা বছরে একবারই ফসল ফলাতেন। সেটা হচ্ছে বোরো ধান। সেই খেতের ফসলের উপর নির্ভর করেই সারা বছর খাদ্যসহ খরচ জুটত। কিন্তু আগাম বন্যা, খরা, শিলাবৃষ্টি ও ঝড়ে প্রায় বছরই সেই ফসল হয় পানিতে তলিয়ে যেত নতুবা বিনষ্ট হতো। এমনই একসময় বাহাড়া গ্রামের এক ব্যক্তি পার্শ্ববর্তী পাহাড়ের পাদদেশের নলখাগড়ার বনে নল কাটতে গিয়ে একটি শিলা (পাথর) দেখতে পান। ওই ব্যক্তিটি নল কাটার সুবিধার্থে পাথরটি বাড়িতে নিয়ে আসেন। পরদিন পাথরের উপরে রেখে নলকাটার সময়ে দায়ের আঘাতে পাথরটি ভেঙে দুই টুকরো হয়ে যায়। ভেঙে যাওয়া পাথরের অংশ দিয়ে তাত্ক্ষণিক রক্ত বেরোতে থাকলে লোকটি ভয় পেয়ে যান। ওই রাতেই ব্যক্তিটি স্বপ্নে দেখেন—ভাঙা পাথরটি হচ্ছেন সোমেশ্বরী দেবী। সেই দেবীকে গ্রামের পাশে স্থাপন করে পূজা-অর্চনা করতে হবে। এ স্বপ্নের কথা তিনি গ্রামবাসীকে জানালে সবাই মিলে গ্রামের পাশের একটি উঁচু স্থানে পাথরটি স্থাপন করেন।

সেই থেকেই পাথরখণ্ডটি 'সোমেশ্বরী দেবী' রূপে হিন্দু ধর্মলম্বীদের কাছে পূজিত হয়ে আসছে। পাথরখণ্ডটিকে গ্রামের লোকেরা 'সোমেশ্বরী দেবীর শিলা' আখ্যা দিয়ে পূজা-অর্চনা শুরু করেন। মানুষজন অকাল বন্যা ও শিলাবৃষ্টি থেকে রক্ষা পেতে সোমেশ্বরী দেবীর দারস্থ হয়ে মানত করতে থাকেন। ধীরে ধীরে সে খবর ভাটি অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর পুণ্যার্থীদের বিস্তৃতি ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে। এভাবেই শুরু। এখন সেই সোমেশ্বরী প্রাঙ্গণ তীর্থ হিসেবে রূপ পেয়েছে।

সোমেশ্বরী মেলা যে দেবীর স্মরণে পালিত হয়ে আসছে, সেই দেবীর বিগ্রহ হচ্ছে বেশকিছু পাথরখণ্ড। শাল্লার আদি গ্রাম বাহাড়ার পাশে ছোট্ট ছোট্ট গোটা চল্লিশেক পাথরখণ্ড তার শরীরে সিঁদুর ধারণ করে গ্রামীণ সহজ-সরল মানুষের লৌকিক ইতিহাস ও বিশ্বাসের সাক্ষী হয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে রয়েছে। ভাটি অঞ্চলের মানুষেরা বিশ্বাস ও শ্রদ্ধায় প্রতি শুক্র ও সোমবার পাথরখণ্ডে দুধ ঢেলে স্নান করিয়ে সিঁদুর মাখিয়ে দেন। কত শত মানুষ সেই পাথরখণ্ডের কাছে হাতজোড় করে মানত করছেন। এখানে দাঁড়িয়ে কায়মনোবাক্যে মনের দুঃখ জানাচ্ছেন লৌকিক দেবী সোমেশ্বরীর কাছে। জীবনযুদ্ধে না-পাওয়ার বেদনা ও হতাশায় আকীর্ণ শত শত মানুষের দীর্ঘশ্বাস এখানে প্রতিনিয়ত জমা হচ্ছে। তারা উদ্ধারের আশায় পরম ভক্তিভরে সোমেশ্বরীর কাছে পরিত্রাণ চান।

সেটা তো লৌকিক দেবী সোমেশ্বরীর এক রূপ। অন্য আরেক রূপ রয়েছে। সেটা প্রত্যক্ষ করা যায় প্রতি চৈত্র মাসের রবি ও সোমবার। এ দুইদিন এখানে মেলা বসে। স্থানীয় অনেকে আবার মেলাকে 'বানিন' বলে থাকেন। দুই দিনব্যাপী মেলার প্রথম দিন বসে 'বেল-কুইশ্যালের মেলা'। এই মেলায় কেবল বেল ও ইক্ষু বিক্রি হয়। সেই মেলাস্থলটি হচ্ছে সোমেশ্বরী মন্দির প্রাঙ্গণে যাওয়ার সামান্য আগে। দাড়াইন নদীর পাড়ে এই মেলা বসে। শত শত পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতা বেল ও ইক্ষু নিয়ে বসে থাকেন। প্রতি আঁটি (এক আঁটিতে অন্তত ১২-১৫টি ইক্ষু থাকে) ইক্ষু বিক্রি হয় ৫০ থেকে ১৪০ টাকায় এবং প্রতি হালি বেল বিক্রি হয় ৪০ থেকে ১৫০ টাকায়। পরের দিন সোমবার সোমেশ্বরী প্রাঙ্গণে বসে বারোয়ারি মেলা। খাদ্যদ্রব্য থেকে শুরু করে ব্যবহার্য জিনিস—হরেক রকমের জিনিস মেলে সেই মেলায়। উপমহাদেশের অন্যতম এই বৃহত্ মেলায় ভাটি অঞ্চলের হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে প্রায় কয়েক লক্ষাধিক মানুষের সমাগম ঘটত একসময়। তবে মেলা ধীরে ধীরে বৈচিত্র্য হারাচ্ছে, মানুষের সমাগমও কমছে। কমতে কমতে এমন অবস্থা দাঁড়িয়েছে—এখন মানুষ হাজার পঞ্চাশেক হয় কিনা সন্দেহ! আমাদের শৈশবে এই মেলাই ছিল উচ্ছ্বাস প্রকাশের অন্যতম ক্ষেত্র। মেলার দুদিন সকাল থেকেই বাবার আশপাশে ঘোরাফেরা, কখন বিকেল আসবে আর বাবা মেলায় নিয়ে যাবেন।

মেলার প্রস্তুতিটা শুরু হয়ে যেত কয়েকদিন আগে থেকেই। আগের বছর মেলা থেকে কিনে আনা একটি মাটির ব্যাংকের ফুটো দিয়ে পাঁচ পয়সা থেকে শুরু করে এক টাকা পর্যন্ত জমাতাম। চৈত্র মাসের প্রথম রবিবার ঘটা করে সেই মাটির ব্যাংকটি ভাঙতাম। এরপর শুরু হতো টাকা গোনার পালা। সর্বসাকুল্যে ৩০ থেকে ৩৫ টাকা হতো। শৈশবে এ ছিল আমাদের কাছে অনেক টাকা! একটা পিস্তল বড়জোর পাঁচ টাকা, চরকি দুই টাকা, হাওয়াই মিঠাই এক টাকা, প্লাস্টিকের বল ১০ টাকা। খেলনা কেনার হিসাব কষতে-কষতে পুরো দিনটাই যেত। আর বাবার কাছ থেকে বাড়তি খেলনা উপহার প্রাপ্তি তো রয়েছেই। এ ছাড়া মেলার আসার আগ-মুহূর্তে মা ও বড় ভাই-বোনদের কাছ থেকে আরও কিছু টাকা পাওয়ার নিশ্চয়তা তো ছিলই।

সেই সকাল থেকে মেলার যাওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকতাম। দুপুরের পর বাবার ভাতঘুম শেষে বিকেল হলে মেলায় যাওয়ার প্রস্তুতি শুরু হতো। সে মুহূর্তটুকুর আনন্দ ছিল অন্যরকম। বাবার পাঞ্জাবির কোনা খামচে খেত-লাগোয়া মেঠোপথ দিয়ে হাঁটতাম। বাবা স্কুলশিক্ষক, সবাই তাকে চেনে। তাই সবাই হাত তুলে তাকে নমস্কার করত। এভাবেই আমাদের বাসস্থান ঘুঙ্গিয়ারগাঁও বাজার থেকে আধা কিলোমিটার হেঁটে মেলা-প্রাঙ্গণে পৌঁছতাম। কী নেই মেলায়? খেলনা থেকে শুরু করে মুড়ি-মুড়কি-জিলেপি-রসগোল্লা কত কী!

এখনও মনে পড়ে বায়োস্কোপওয়ালার কণ্ঠ—'হায়রে জানি, কী কী আছে? দেখবার মতো জিনিস আছে।' সেই 'দেখবার মতো জিনিস' দেখবার জন্য মন আকুলিপাকুলি করত। আট আনা খরচ করে অতি-আগ্রহের সেই বায়োস্কোপে চোখ রাখতাম। ডান চোখ বন্ধ করে বাম চোখে 'দেখবার মতো জিনিস' দেখতাম। সে সময় কী কী দেখতাম—সেসব আর তেমন মনে নেই। যতদূর মনে পড়ে তখনকার বাংলা সিনেমার নায়ক-নায়িকা, বন-জঙ্গলের ছবি আর 'বাপের বেটা' হিসেব তত্কালীন সময়ে পরিচিতি পাওয়া ইরাকের সাদ্দাম হোসেনের ছবি ছিল বায়োস্কোপের বাক্সে। তবে বায়োস্কোপের ভেতরে চোখ রাখার চেয়েও আকর্ষণীয় ছিল বায়োস্কোপওয়ালার হাস্যরসাত্বক মধুর বর্ণনা।

পরিষ্কার মনে আছে—বায়োস্কোপের ওপরে একটি ছোট্ট দণ্ডে দুইটি পুতুল থাকত। একটি পুরুষ পতুল, অপরটি নারী পুতুল। দুই পুতুলকে নিয়ে ছিল বায়োস্কোপওয়ালার গানের ঢঙে মজাদার বিবৃতি। সেই লম্বাচুলওয়ালা বায়োস্কোপওয়ালা ডান হাতে খঞ্জনি বাজাতেন আর মজাদার কথাগুলো আওড়াতেন। অন্য হাতে বায়োস্কোপের হাতল ঘুরিয়ে বাক্সের ভেতরের ছবিগুলো একের পর এক নিয়ে আসতেন। বায়োস্কোপওয়ালা চমত্কার ঢঙে নানাসব কথা বলেই নারী পুতুলটির গালে হাতে দিয়ে একটি ঠোকর মতো দিয়ে বলতেন, 'নাতিন লো নাতিন, মরলে! তোর রূপের ঠেলায় পাগল দুনিয়ার মানুষ রে।'

বায়োস্কোপওয়ালা যখন পুতুলটিকে ঠোকর দিতেন, আমাদেরও ইচ্ছে হতো ওই পুতুলটিকে ঠোকর দিই। বায়োস্কোপওয়ালার চোখ ফাঁকি দিয়ে যে, এক-আধবার ঠোকর দিইনি, তাও কিন্তু নয়। এতদিন পরে সেই সোমেশ্বরী মেলায় গিয়ে ছোটবেলার দেখা বায়োস্কোপওয়ালা কিংবা অন্য কোনো বায়োস্কোপওয়ালাকে আর দেখিনি। তবে কি বায়োস্কোপের দিন শেষ হয়ে গেল?

শৈশবের মেলার কত কত স্মৃতি। কিছু যে একেবারেই ফিকে হয়ে যায়নি তা নয়। তবে যে-পর্যন্ত স্মৃতিতে আছে, সেটি এ রকম :মেলায় যাওয়ার পথে দাড়াইন নদীর দুটি অংশে দুটি বাঁশের সেতু পারাপার হতে হতো। মেলার দিন মানুষের ভিড় বেশি থাকায় সেতুর নিচে খেয়া নৌকাও থাকত। যারা বাঁশের সেতু চড়তে ভয় পেতেন কিংবা যাদের হাত জিনিসপত্র বোঝাই থাকত, কেবলমাত্র তারাই সেতু ব্যবহার না করে বিকল্প খেয়ানৌকা দিয়ে নদী পাড়ি দিতেন। প্রতি বছরই দেখেছি—হুড়মুড়িয়ে নৌকোয় উঠার কারণে নৌকাডুবি ঘটত। মুহূর্তেই শুরু হতো নারী-পুরুষ-শিশুদের চিত্কার-চেঁচামেছি। সবারই যেন 'চাচা আপন প্রাণ বাঁচা'। উত্কণ্ঠা-ভরা দৃষ্টিতে কেউ কেউ নদীর দিকে তাকাত, কেউবা উদ্ধার করতে লাফিয়ে পড়ত জলে। তবে খননের অভাবে যৌবন-হারানো দাড়াইন নদীতে আর জল কতটুকুই বা? হাঁটু বা বুক সমান জল হবে! সামান্য স্রোত যে নেই তাও কিন্তু নয়। উতরোল ঢেউ পার হয়ে ভিজে কাপড়ে ডুবে-যাওয়া মানুষগুলো তীরে উঠামাত্র যেন প্রাণ ফিরে পেত!

মেলার এত এত মানুষের হাঁটাহাঁটির কারণে প্রচুর ধুলো উড়ত। মেলার যেসব বিক্রেতারা বসতেন (বিশেষ করে 'মূর্তিছিলা'লাগোয়া পুকুরটির পাশে) তাদের কালো চুল ধুলায় সাদা হয়ে যেত। বিক্রেতাদের মেলানো পসরাও সাদা হয়ে যেত। এখনও সমানতালে ধুলো ওড়ে, সেই ধুলো-ওড়া বিকেল মেলার অন্যতম সুখস্মৃতি। মেলাকেন্দ্রিক আরও আরও স্মৃতি রয়েছে। শৈশবে বড়দের আলাপ করতে শুনতাম, 'মেলায় জুয়াখেলা বাইড়া যাইতাছে।' এটি যে নিষিদ্ধ কোনো খেলা সেটা ঢের বুঝতে পারতাম, তবে খেলাটি কী ধরনের সেটা জানতাম না। দিনের বেলা মেলা শেষে রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বসত জুয়াখেলা—এ রকম তথ্য আমাদের জানা ছিল। যখন কৈশোরে পা দিই, তখন কয়েক বন্ধু মিলে জুয়াখেলা জিনিসটা কী—সেটি দেখতে নির্দিষ্ট স্থানে হাজির হই।

জুয়াখেলার স্থানটিতে হাজির হয়ে দেখি নানা বয়সী মানুষ গোল হয়ে বসে রয়েছে। মধ্যখানে একটি আলো ঝলমলে হ্যাজাক লাইট জ্বলছে। কিশোর, যুবক, বৃদ্ধ—অনেক চেনা মানুষকে দেখতে পেলাম। যেহেতু এটি ছিল নিষিদ্ধ অঞ্চল, তাই সামান্য সময় পরেই আমরা বন্ধুরা স্থান ত্যাগ করার উদ্দেশে পা বাড়াই। ঠিক এমন সময়ই দেখা হয়ে যায় আমাদের এক স্যারের সঙ্গে। স্যারকে দেখে কোনোক্রমে আমরা সটেক পড়ি। আমাদের সে কী চিন্তা। কেনই বা উঁকি দিতে গেলাম সেই দিকটায়? সেখানে যাওয়ার কারণেই তো স্যার দেখতে পেলেন!

এখন কী যে হবে! তবে স্যার কেন সেই নিষিদ্ধ দিকটায় গেলেন—সেটা কৈশোর বয়সে বুঝতে পারিনি! ভাবতাম—স্যার আমাদেরই মতো বোধহয় জুয়ার আসরটি ঘুরে দেখতে গিয়েছিলেন! সেদিন চেনা মানুষগুলোর কে জুয়া খেলতে গেল আর কে জুয়াখেলা দেখতে গেল—সেই বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচালে দীর্ঘদিন ভুগেছিলাম প্রথম জুয়াখেলা দেখার সন্ধ্যাটির কথা ভেবে ভেবে। সে সময় জুয়াখেলা আড়ালে-আবডালে হতো। চট, ত্রিপল কিংবা পাটির মাধ্যমে খেলার স্থানটি আড়াল করে দেওয়া হতো। আর এখন জুয়া খেলাটাই যেন মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে সোমেশ্বরী মেলায়। আগে অনেকটা লোকচক্ষুর আড়ালে জুয়াখেলা চললেও এখন অনেকটা প্রকাশ্যেই এ খেলা হয়। উপঢৌকন পেয়ে পুলিশ যেন সেই খেলার পাহারাদারের ভূমিকা পালন করে! সামাজিক সম্মান প্রদানের রীতিনীতি তোয়াক্কা করে প্রবীণদের সামনেই চলছে জুয়াখেলা। কোনো বাধ্যবাধকতা কিংবা সম্মান-হারানোর কোনো ভয়ই যেন নেই জুয়া-খেলোয়াড়দের ভেতর।

আমার দেখা শৈশবের সেই মেলা ক্রমশ ফিকে হয়ে আসছে। মেলার সেই রং ও বৈচিত্র্য ধূসর রূপ নিয়েছে। বাবা বলতেন, তাদের ছোটবয়সে এই সোমেশ্বরী মেলায় নাকি ব্যবসায়ীরা হাতির পিঠে চড়ে মালামাল নিয়ে আসতেন। কিন্তু শৈশবে আমরা সেই দৃশ্য কখনও দেখিনি। আর যে দৃশ্য আমরা দেখেছি, সেটা এখনকার শিশু-কিশোররা দেখতে পাচ্ছে না। ধীরে ধীরে যেমন লোকসমাগম কমছে, তেমনি বর্ণিলতা পাংশুটে রং ধারণ করছে। ছোটবেলায় যখন নতুন বছরের বর্ষ-পঞ্জিকা দেখতাম, তখন চৈত্র মাসের নির্দিষ্ট ওই দিনটির সূচিতে দেখতাম—'সোমেশ্বরী মেলা হচ্ছে উপমহাদেশের অন্যতম বৃহত্ মেলা'। 'অন্যতম সেই বৃহত্ মেলা'টি নীরবে-নিভৃতে কেমন যেন নিস্তেজ হয়ে পড়ছে। মেলা উপলক্ষে বসা অস্থায়ী সার্কাস, ষাঁড়ের লড়াই, টিয়ে পাখির ভাগ্যগণনা, পুতুলনাচ—এসব এখন আর চোখেই পড়ে না। দেখা মেলে না সেইসব কুটির শিল্প কারিগর, কুমার ও কামারদের—যাদের হাতের কারুকার্যে তৈরি হতো পলো, কুলো, লাঠি, দা, চুপড়ি, কড়া, জাল, বড়শি, ছিপ, খুন্তিসহ নানা ব্যবহার্য দ্রব্য ও খেলনাসামগ্রী।

কী সুন্দর করে পুঁথিপাঠ করতেন ভরতচন্দ্র সরকার। দৃষ্টিহীন হওয়ায় তিনি 'অন্ধ ভরত' নামে পরিচিত। প্রতি বছরই মেলার দিনটি ওই লোকটির পাঠ করা পুঁথির সুর পুরো মেলা প্রাঙ্গণে ভিন্ন দ্যোতনা সৃষ্টি করত। অন্ধ ভরত চেঁচিয়ে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতেন, 'অন্ধ ভরতের পুঁথি, পড়লে হবে গতি'। সেই অন্ধ ভরতের বয়স যখন বাড়তে শুরু করে তখন তিনি একটি চাটি পেতে সোমেশ্বরী মন্দিরের ঠিক পাশেই মেলায় বিভিন্ন ধর্মীয় পুস্তক এবং স্থানীয়ভাবে জেলা শহরে নিউজপ্রিন্ট কাগজে মুদ্রিত পুঁথি, ধামাইল গান, সূর্যব্রতের গান, কীর্তন, পাঁচালী, মালসীসহ বিভিন্ন লোকসংগীতের বই বিক্রি শুরু করেন। সেসব বইপুস্তকের লেখকেরা ছিলেন গ্রামীণ নিরক্ষর গীতিকারেরা। প্রকৃতি হতে প্রাপ্ত জ্ঞানই ছিল এসব গীতিকারদের দিকদর্শন।

সেই অন্ধ ভরতের বয়স এখন কমসে কম পঁচাত্তর। সঙ্গত কারণেই গত কয়েক বছর ধরে মেলায় আসছেন না। এখন অন্ধ ভরতের সুমধুর কণ্ঠের পুঁথি আওড়ানো আর কারও কানে বাজে না। মেলা প্রাঙ্গণে অন্ধ ভরতের বসার স্থানটিতে এখন অন্য কয়েকজন পঞ্চাশোর্ধ্ব ব্যক্তিকে বই-পুস্তক নিয়ে বসে থাকতে দেখি। তবে সেসব বই-পুস্তকের অধিকাংশই বাংলা ছায়াছবির গান আর বিভিন্ন ধরনের ভিউকার্ড। কিছু কিছু দোকানে ধর্মীয় বইপত্র ও পাঁচালী এবং ধর্মীয় পোস্টার থাকলেও গানের চটি বইগুলো তেমন চোখে পড়ে না। চোখে তো পড়ে না আরও কতকিছুই। তখনকার সময়ে ছানা দিয়ে তৈরি রসগোল্লা এখন ভেজালে বিপর্যস্ত। ময়দা ও পাউডার দুধের তৈরি রসগোল্লা আগের স্বাদ হারিয়েছে কবেই! নেই জিলাপি, জাম (মিষ্টিজাতীয়), কাটাগজা, দই-চিড়া, মিষ্টি উখড়ার রমরমা অবস্থা।

মেলায় কাছিম-কাটুয়া এবং হাওরের বড় বড় মাছের হাট বসত। টাকার অভাবে সবাই সেই কাছিম-কাটুয়া কিনতে পারতেন না। এলাকার দু-চারজন বড় গৃহস্থের বাড়িতে সেই কাছিম-কাটুয়া যেত। প্রতিবছরই বাবা বড় দেখে একটি কাছিম অথবা কটুয়া কিনে আনতেন। এ নিয়ে আমার আনন্দের সীমা ছিল না। কাছিম-কাটুয়া সচরাচর বাজারে কিনতে পাওয়া যায় না, তাই মেলার দিনটিতে এই প্রাণীটি কিনে নেওয়ার গৌরবে আমার শৈশবের উচ্ছ্বাসে অন্যরকম রং লাগত! পরের দিন ঘটা করে আমাদের গ্রামের বাড়ি সুখলাইনের আত্মীয়স্বজনদের নিমন্ত্রণ করা হতো। তারা নিমন্ত্রণ পেয়ে আমাদের ঘুঙ্গিয়ারগাঁও বাজারের বাসায় আসতেন। সকলের উপস্থিতিতে সেই কাছিম/কাটুয়া কাটা হতো। রান্না শেষে একসঙ্গে সবাই বসে উত্সবের মতো সেই মাংস খাওয়ার আয়োজন ছিল এক অন্যতম সুখস্মৃতি। কিন্তু এখন মেলায় কাছিম-কাটুয়া তো দূরের কথা, হাওরের তাজা-বড় মাছেরও সন্ধান পাওয়া যায় না।

মেলা উপলক্ষে ভাটি অঞ্চলের প্রতিটি বাড়িতে অতিথিদের সমাগম ঘটে। যে মেয়েটির বিয়ে হয়ে গেছে দূর কোনো গাঁয়ে, সেও জামাই-সন্তানসহ ওই দিনটিতে 'নাইওর' আসে বাবার বাড়িতে। আত্মীয়-স্বজনদের উপস্থিতিতে মুখরিত হয়ে ওঠে ভাটির গ্রামগুলো। এখানে নাগরিক কৃত্রিমতা নেই, মেলার বদৌলতে পারিবারিক সম্প্রীতি ও বন্ধনই যেন মূর্ত হয়ে ধরা দেয়। একে-অপরের সঙ্গে সাক্ষাত্লাভের এক অন্যতম উপলক্ষ সোমেশ্বরী মেলা তাই ভাটির মানুষের কাছে মহামিলনের এক কাঙ্ক্ষিত লগ্ন হিসেবেই পরিচিত। নগরবাসী হওয়া সত্ত্বেও এই মেলার টানে কতবার যে ফিরে-ফিরে গিয়েছি জন্ম-এলাকায়। কিন্তু শৈশবের সেই মেলার সঙ্গে এখনকার মেলার কোনো সাদৃশ্যই যেন খুঁজে পাই না।

আমাদের শৈশবে সোমেশ্বরী মন্দির প্রাঙ্গণটি ছিল জীর্ণ-শীর্ণ আর মেঝের পাকা যে অংশে শিলাখণ্ড রাখা হতো সেটি ছিল ভাঙাচোরা। এখন সেই সোমেশ্বরী মন্দির প্রাঙ্গণে সুদৃশ্য পাকা দোতলা ভবন উঠেছে, শিলাখণ্ড রাখার স্থানটি অনেক নান্দনিক ও দৃষ্টিনন্দন জায়গায় পরিণত হয়েছে। তবুও ছোটবেলার সেই আকর্ষণ কেমন যেন ফিকে মনে হয় এখন। এই মেলা এখন আমাকে আর ছুঁতে পারছে না। ছোটবেলার সেই চৈত্রের বিকেলের আনন্দটুকু কোথায় যেন হারিয়ে গেছে! সেটা কী বয়সের কারণে, নাকি মেলার বৈচিত্র্যতা হারানোর কারণে? বিষয়টি কখনও খুঁজে দেখিনি, খুঁজতে চাইও না। তবে মেলার সাদৃশ্য-বৈশাদৃশ্য মেলাতে গিয়ে ভাবি—রং হারাতে হারাতে আজ থেকে অন্তত ৪০-৫০ বছর পর সোমেশ্বরী মেলার অবস্থা কোথায় গিয়ে ঠেকবে?

শুধু সোমেশ্বরী মেলা কেন, ভাটি অঞ্চলের গ্রামীণ মেলার প্রায় সবগুলোরই একই অবস্থা। মেলার গতি-প্রকৃতি পরিবর্তিত হয়ে এখন শুধু পণ্য বিক্রির একটা নিরেট গত্বাঁধা মেলায় রূপান্তরিত হয়েছে। শিল্পায়নের দ্রুত প্রভাব পড়েছে গ্রামগুলোতেও। এ কারণে হাতে তৈরি কারুপণ্য এখন মেলায় খুব একটা চোখে পড়ে না। ঘরে ঘরে ডিশ-সংযোগের কারণে সিনেমা এখন সহজলভ্য, তাই বায়োস্কোপ আর শিশুদের প্রাণিত করে না। মফস্বল শহরেও শিশু পার্ক প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুবাদে হাতে-চালানো চড়কি আর দোলনার আবেদন থাকার কথাও নয়। বাধ্য হয়ে এসব পেশার লোকেরা পেশা পরিবর্তন করে অন্য রাস্তা ধরেছেন। একের পর এক এভাবেই বিলুপ্ত হতে চলছে গ্রামীণ মেলার উত্সবের রং ছড়ানো নানা অধ্যায়। মেলার সেই প্রাণ পুনরায় ফিরে পাওয়ার কোনো সম্ভাবনাও আর নেই।

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করবে সংসদীয় ঐকমত্য কমিটি। টিআইবির এ প্রস্তাবের সঙ্গে আপনি একমত?
3 + 4 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
নভেম্বর - ১৮
ফজর৪:৫৬
যোহর১১:৪৪
আসর৩:৩৭
মাগরিব৫:১৫
এশা৬:৩১
সূর্যোদয় - ৬:১৫সূর্যাস্ত - ০৫:১০
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :