The Daily Ittefaq
ঢাকা, রবিবার, ১৪ এপ্রিল ২০১৩, ১ বৈশাখ ১৪২০, ২ জমাদিউস সানি ১৪৩৪
সর্বশেষ সংবাদ ভেনেজুয়ালার নতুন প্রেসিডেন্ট মাদুরো | পদ্মায় নৌকাডুবি: তিন লাশ উদ্ধার | রাজশাহীর তিন জেলায় হরতাল পালন: ছাত্রলীগ কর্মীকে হত্যা, বিএনপি কার্যালয়ে ভাংচুর | সাংবাদিকদের অনশনে বিএনপির সংহতি | ঢাবিতে ছাত্রলীগের চাঁদাবাজি: ১১ কর্মী বহিষ্কার | ক্ষমা চাইল প্রথম আলো ও হাসনাত আবদুল হাই | সাংবিধানিক ধারা অব্যাহত রাখবে সশস্ত্র বাহিনী: তিন বাহিনীর প্রধান | যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মাননা পাচ্ছেন ড. ইউনূস | বিদেশে কর্মী পাঠাতে প্রতারণা করলে সাত বছরের কারাদণ্ড

হালখাতার ইতিবৃত্ত

'হালখাতা' শব্দটির সঙ্গে ব্যবসায়ী ও ক্রেতা-বিক্রেতারা কমবেশি পরিচিত। এটি এ দেশের ব্যবসায়ী শ্রেণীর চিরায়ত ঐতিহ্য। বাংলা বছরের শুরুতে ব্যবসায়ীরা পুরোনো বছরের দেনা-পাওনার হিসাব-নিকাশের সমাপ্তি টেনে নতুন বছরে এই হালখাতার আয়োজন করতেন। দেনা চুকিয়ে মিষ্টিমুখ করতেন ক্রেতারা। কিন্তু সময়ের পালাবদলে পুরোনো সেই হালখাতার ধরনও বদলে গেছে। তবুও হালখাতা সবার কাছেই এক ঐতিহ্যমণ্ডিত উত্সব।

প্রাঞ্জল সেলিম

হালখাতা বঙ্গাব্দ বা বাংলা সনের প্রথম দিনে দোকানপাটের হিসাব আনুষ্ঠানিকভাবে হালনাগাদ করার এক প্রক্রিয়া। বছরের প্রথম দিনে ব্যবসায়ীরা তাদের দেনা-পাওনার হিসাব সমন্বয় করে এদিন হিসাবের নতুন খাতা খুলেন। এ জন্য খদ্দেরদের বিনীতভাবে পাওনা শোধ করার কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়। এ উপলক্ষে নববর্ষের দিন ব্যবসায়ীরা তাদের খদ্দেরদের মিষ্টিমুখ করান। খদ্দেররাও তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী পুরোনো দেনা শোধ করে দেন। আগেকার দিনে ব্যবসায়ীরা একটি মাত্র মোটা খাতায় তাদের যাবতীয় হিসাব লিখে রাখতেন। এই খাতাটি বৈশাখের প্রথম দিনে নতুন করে হালনাগাদ করা হতো। হিসাবের খাতা হাল নাগাদ করা থেকে 'হালখাতা'র উদ্ভব। শুধু বাংলাদেশই নয়, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় ছোট বড় মাঝারি যেকোনো দোকানেই এটি পালন করা হয়ে থাকে। এই দিন ক্রেতাদের আনন্দদানের জন্য মিষ্টান্ন, ঠাণ্ডা পানীয় প্রভৃতির ব্যবস্থা করে থাকেন ব্যবসায়ীরা। অনেক ব্যবসায়ী অক্ষয় তৃতীয়ার দিনেও হালখাতা বা শুভ মহর অনুষ্ঠান করে থাকেন। রাজধানীর পুরান ঢাকার ব্যবসায়ীরা নববর্ষের প্রথম দিনে নতুন হিসাব খাতা খোলেন। নতুন এই হিসাব খাতাই হলো হালখাতা। এতে তারা গ্রাহকদের দায়-দেনার যাবতীয় তথ্য লিপিবদ্ধ করেন। পুরোনো বছরের খাতার হিসাব বন্ধ করে দেন। হালখাতা খোলার রীতি শুধু পুরান ঢাকায়ই নয়, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও এর প্রচলন আছে।

সেকালে কাগুজে কিংবা ধাতব মুদ্রার প্রচলন না থাকায় প্রাচীনকালে ব্যবসা-বাণিজ্যে কৃষিপণ্য বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত ছিল। এই ব্যবস্থায় কৃষকরা যেসব পণ্য উত্পাদন করত তা অন্যের উত্পাদিত পণ্যের সঙ্গে বিনিময় করত এবং রশিতে গেরো দিয়ে হিসাব রাখত। কেউ কেউ মাচানের খুঁটিতে দাগ কেটেও হিসাব রাখার ব্যবস্থা করত। আরও পরে তালপাতায় বা তুলট কাগজের চিরকুট এই হিসাব ব্যবস্থায় যুক্ত হয়। 'হালখাতা' সেই পুরাতন ব্যবস্থার পরিবর্তিত রূপ।

কৃষি অর্থনীতিতে হালখাতা ছিল বাকিতে ভোক্তার প্রয়োজন মেটানোর একটি মাধ্যম। কৃষি অর্থনীতিতে নগদ অর্থের প্রবাহ না থাকায় বাকিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি কেনাবেচা ছিল অপরিহার্য। ফলে 'হালখাতা'র গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। তখন বাংলার কৃষকদের হাতে নগদ টাকা থাকত না। পাট বিক্রির নগদ অর্থ কেবলমাত্র পরিবারের সদস্যের পোশাক ক্রয়, দেনা শোধ এবং বিয়ের খরচ মেটানোর কাজে ব্যবহার করত। নববর্ষে দু'একটি শখের ইলিশ মাছ কেনার জন্যও তারা এই টাকা খরচ করত। পাটের মৌসুম পার হলেই পুনরায় বাকিতে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে বাধ্য হতো। বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন হালখাতা অনুষ্ঠানে এই দেনার আংশিক বা পুরোটাই পরিশোধের রীতি প্রচলিত ছিল। ফলে হালখাতা ছিল পুরাতন বছরের হিসাব মিটিয়ে নতুন বছরে নতুন জীবন শুরুর সংস্কৃতি।

স্বাধীনতার আগেও পূর্ব বাংলায় ব্যাপকভাবে 'হালখাতা' উদযাপিত হতো। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এই অবস্থার আরও উন্নতি ঘটে। বাংলাদেশ বিশ্ব অর্থনৈতিক পরিমণ্ডলে যুক্ত হার কারণে আধুনিক লেনদেনের দোলাচালে হালখাতার গুরুত্ব অনেকাংশে কমে যায়। প্রবাসীদের পাঠানো অর্থেই মূলত বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের কিছুটা অর্থনৈতিক আধিপত্য অর্জিত হয়। গ্রামীণ অর্থনীতিতে উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থ এবং প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের প্রবাহ বিদ্যমান থাকায় অনেকের ক্রয় ক্ষামতা পূর্বরূপের পরিবর্তন ঘটে।

সার্বজনীন উত্সব হিসেবে 'হালখাতা' ছিল বাংলা নববর্ষের প্রাণ। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে 'হালখাতা'র সামাজিক গুরুত্বও ছিল ব্যাপক। ভোক্তারা 'হালখাতা'র জন্য বছরব্যাপী অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করত। দোকানি বা ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান থেকে মিষ্টিমুখ করে আত্মতৃপ্তির বিষয়টি ছিল তাদের কাছে অনেকটা স্বর্গীয় সুখের মতো। তার সঙ্গে সুগন্ধি পানে আপ্যায়িত হতে তারা সম্মান বোধ করত। বিষয়টি এত প্রাণবন্ত ছিল যে, যারা বকেয়া শোধ করে হালখাতায় অংশগ্রহণ করতে পারত না নিজেদেরকে হতভাগ্য মনে করত। সময়ের বিবর্তনে হালখাতার গুরুত্ব কমে আসলেও পহেলা বৈশাখে শহরকেন্দ্রিক ইলিশ-পান্তার উত্সব আজ বাঙালি প্রাণের অবিচ্ছেদ্য আনন্দ হয়ে উঠেছে। তবে সুগন্ধি পানের গুরুত্ব কমেনি। পহেলা বৈশাখে ইলিশ-পান্তা খাওয়া শেষে হাজারও নারী-পুরুষ একখিলি পান মুখে দিতে ভুল করে না।

হালখাতা খোলার জন্য বাজারে বহু ধরনের খাতা বা টালি পাওয়া যায়। ব্যবসার ধরন, পরিধি ও গ্রাহকের ওপর নির্ভর করে তারা হালখাতা কিনে থাকেন। অনেকে আবার পরিবারের নানা হিসাব-নিকাশও লিখে রাখতে ব্যক্তিগতভাবে এই খাতা সংগ্রহ করেন। ছোট, মাঝারি ও বড় আকারের এই খাতাগুলো তিন-চার রকমের হয়। এগুলো তিন থেকে পাঁচ নম্বর হালখাতা হিসেবেও পরিচিত। তবে অধিকাংশ ব্যবসায়ী লাল রঙের খাতা ব্যবহার করেন। দাম খাতার ধরন অনুযায়ী হয়ে থাকে। বাজার ঘুরে দেখা যায়, এসব খাতার দাম ন্যূনতম ১২০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। তবে ১৫০, ২০০ কিংবা ২৫০ টাকার মধ্যে আপনি সুন্দর হালখাতা কিনে নিতে পারেন। এসব হালখাতা আপনি পাবেন বাংলাবাজার, চকবাজার ও নিউমার্কেট এলাকার কয়েকটি দোকানে। নতুন বছর, নতুন খাতায় হিসাব শুরু করবেন অনেকেই। এ যেন আমাদের দেশীয় রীতি।

আসছে বাংলা নতুন বছর ১৪২০। পুরোনো দিনের দুঃখ-স্মৃতি মুছে ফেলে প্রতিটি বাঙালি যেন নতুন স্বপ্ন ও আশা নিয়ে নববর্ষের সঙ্গে যাত্রা শুরু করে। নববর্ষ এলেই তাকে স্বাগত জানাতে আমরা প্রথম দিনটিতে পান্তা-ইলিশ খাই। মেতে উঠি দেশীয় আরও নানা খাবার এবং বাদ্যবাজনায়। তেমনি প্রিয়জনকে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানাতে দিই নানা উপহার, কার্ড। ব্যবসায়ীরাও তাদের পুরোনো হিসাব-নিকাশ বন্ধ করে আবার নতুন হিসাবের খাতা খোলেন। যারা দিনের শুরুতে জানতে চান, আজ দিনটি আপনার জন্য শুভ কি না, তারাও নববর্ষে কিনে নেবেন নতুন পঞ্জিকা।

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করবে সংসদীয় ঐকমত্য কমিটি। টিআইবির এ প্রস্তাবের সঙ্গে আপনি একমত?
4 + 5 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
নভেম্বর - ১৪
ফজর৪:৫৩
যোহর১১:৪৩
আসর৩:৩৮
মাগরিব৫:১৭
এশা৬:৩২
সূর্যোদয় - ৬:১১সূর্যাস্ত - ০৫:১২
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :