The Daily Ittefaq
ঢাকা, রবিবার, ১৪ এপ্রিল ২০১৩, ১ বৈশাখ ১৪২০, ২ জমাদিউস সানি ১৪৩৪
সর্বশেষ সংবাদ ভেনেজুয়ালার নতুন প্রেসিডেন্ট মাদুরো | পদ্মায় নৌকাডুবি: তিন লাশ উদ্ধার | রাজশাহীর তিন জেলায় হরতাল পালন: ছাত্রলীগ কর্মীকে হত্যা, বিএনপি কার্যালয়ে ভাংচুর | সাংবাদিকদের অনশনে বিএনপির সংহতি | ঢাবিতে ছাত্রলীগের চাঁদাবাজি: ১১ কর্মী বহিষ্কার | ক্ষমা চাইল প্রথম আলো ও হাসনাত আবদুল হাই | সাংবিধানিক ধারা অব্যাহত রাখবে সশস্ত্র বাহিনী: তিন বাহিনীর প্রধান | যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মাননা পাচ্ছেন ড. ইউনূস | বিদেশে কর্মী পাঠাতে প্রতারণা করলে সাত বছরের কারাদণ্ড

[ রা জ নী তি ]

রাজনীতির অতি-গতি বনাম সমাজের দুর্গতি

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন

সমাজ ও রাজনীতি পরস্পরের অনুষঙ্গ। ফলে, সমাজ যেমন রাজনীতির বাইরের কিছু নয়, রাজনীতিও সামাজিক রীতি-নীতি ও বিধি-ব্যবস্থার বিযুক্ত কিছু নয়। তাই রাজনীতি যেমন সমাজের গুণগত পরিবর্তনে অনুঘটকের কাজ করে, তেমনি সমাজও রাজনীতির চরিত্র এবং প্রক্রিয়া নির্ধারণে ভূমিকা রাখে। এভাবেই রাজনীতির ভেতর দিয়ে সমাজ এগিয়ে যায় কিংবা পিছিয়ে যায় আবার সমাজের ইতিবাচক বিকাশের ভেতর দিয়ে রাজনীতির উত্কর্ষায়ণ ঘটে। এই পারস্পরিক মিথষ্ক্রিয়ায় দু'টো দু'টোর চলক এবং চালকের ভূমিকা নিয়ে চালিত হয়। কিন্তু অবস্থা, এজেন্ডা এবং কার্যকারণ ভেদে, একটা অতি গতি অন্যটার দুর্গতিরও কারণ হতে পারে। সম্প্রতি বাংলাদেশে সংঘটিত কিংবা চলমান রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহের ভেতর দিয়ে এদেশের সমাজ-জীবনে একটি বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি হয়েছে এবং সেটা অদ্যাবধি জারি আছে। এবার ভূমিকার সদর থেকে আলোচনার অন্দরমহলে যাওয়া যাক।

সাম্প্রতিক সময়ের রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহের পরিপ্রেক্ষিতে একথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, বাংলাদেশের মতো রাজনৈতিক গতিশীলতার দেশ পৃথিবীতে বিরল। রাজনীতির ময়দানে এতো খেলোয়াড় এবং দর্শকের চরিত্র, চিন্তা, ভূমিকা ও সমর্থনের র্যাডিক্যাল পরিবর্তনের এতো বৈচিত্র্য নিকট অতীতের সীমানায় দেখা যায় না। ফলে, যেহেতু রাজনীতির আবহাওয়ায় সকাল-বিকাল ঋতু পরিবর্তিত হয়, সেহেতু সাধারণ মানুষের পক্ষে রীতিমত মুশকিল হয়ে উঠে নিজের রাজনৈতিক দর্শন, রাজনৈতিক নিশানা এবং রাজনৈতিক কেবলা ঠিক করা। সকল রাজনৈতিক পক্ষ নিজের সপক্ষে জনসমর্থনের দাবি করলেও জনগণ আদৌ কোন পক্ষকে সমর্থন করে কিনা সেটা মাপ-ঝোঁক করার সর্বজন গ্রাহ্য কোন ব্যারোমিটার বাংলাদেশে অদ্যাবধি ব্যবহূত হয়নি। মাঝে মাঝে বিভিন্ন সংবাদপত্রের মাধ্যমে জনমত জরিপের একটা হিড়িক পড়ে তাও নির্বাচন-কেন্দ্রীক। যদিও তাতে নানান হিসাব-নিকাশের হেরফের থাকে কিন্তু এসকল জরিপের ভেতর দিয়ে জনমতের একটা আলামত পাওয়া যায়। তাই রাজনীতির ময়দানের সাম্প্রতিক সময়ের এতো দ্রুত পরিবর্তনের সাথে মানুষ নিজেকে কতোটা খাপ খাওয়াতে পারছে এবং রাজনীতির গতি প্রকৃতি উপলব্দির জায়গা থেকে নিজের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও সমর্থন কতোটা চিন্তা-জাত হয়ে নিতে পারছে, সেটা একটি বিরাট জিজ্ঞাসা।

যদিও রাজনীতির সকল পক্ষই জনসমর্থনের দাবিদার কিন্তু বাস্তবতা প্রকৃতার্থে ভিন্ন। যারা সরাসরি দলীয় রাজনীতি করেন, তাদের কথা আলাদা কেননা তাদের সমর্থনের মোহনা এবং রাজনৈতিক অবস্থানের কেবলা "প্রি-ডিফাইনড" বা পূর্ব নির্ধারিত। তাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত সবধরনের ভালোমন্দ বিবেচনাবোধের ঊর্ধ্বে। নিঃশর্ত দলীয় আনুগত্যই তাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মাপকাঠি। কিন্তু যারা কোন দলীয় রাজনীতি করেন না কিংবা রাজনৈতিক সমর্থন এবং কোন রাজনৈতিক ইস্যুতে যাদের অবস্থান পূর্বনির্ধারিত নয় কিন্তু দেশের চলমান রাজনীতির গতিপ্রবাহের ওপর সচেতন মনোযোগ রেখে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান ঠিক করেন, তাদের জন্য দেশের রাজনীতির ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে সকাল-বিকাল লেফ্ট-রাইট করা কিছুটা কষ্টকর। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধে জামায়াতের উন্মত্ততা, কাদের মোল্লার অসন্তুষজনক রায়, এদেশের তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশের উদ্যোগে ও নেতৃত্বে গণজাগরণ মঞ্চের জন্ম, গোটা দেশব্যাপি সমাজের বিপুল একটা অংশের মানুষের মধ্যে ব্যাপক জাগরণ, গণজাগরণ মঞ্চকে মোকাবিলা করার তরিকা হিসাবে আস্তিক-নাস্তিকের বেহুদা বিতর্ক, হেফাজতে ইসলামের ঝড়ো আগমন এবং নির্গমন, তের দফার নামে কিছু "প্রিমিটিভ ডিমান্ড" এবং এ তের-দফাকে কেন্দ্র করে সমাজের মধ্যে জেগে উঠা ব্যাপক প্রতিক্রিয়া ও প্রতিরোধ, বিএনপির অর্থহীন গণ-হরতাল, সর্বশেষ মাহমুদুর রহমানের গ্রেফতার প্রভৃতি হচ্ছে অতি সাম্প্রতিক কালে এদেশে সংগঠিত রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহের পরম্পরা। সব মিলিয়ে ঝড়ের গতিতে প্রাইভেট টিভি চ্যানেলগুলো কিংবা সংবাদপত্রের লিড-আইটেম পরিবর্তনের প্রতিযোগিতায় দেশের রাজনীতিতে তুমুল গতিশীলতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কিন্তু রাজনীতির এ অতি-গতিশীলতা যে দেশের সামগ্রিক কর্মকাণ্ডে চরম দুর্গতি বয়ে নিয় আসছে, সেটা আমাদের সবকিছুকে অতি রাজনীতিকীকরণের বহুল চর্চিত প্রবণতার কারণে লোকচক্ষুর আড়ালে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে শিক্ষা, চিকিত্সা, অর্থনীতি, উত্পাদন, আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য, কৃষি, শিল্প-কারখানা, সাধারণ শ্রমজীবী গণমানুষের নিত্যদিনের আয়-রোজগার ও স্বাভাবিক জীবন ব্যবস্থার যে নিয়মিত-গতিশীলতা সাম্প্রতিক সময়ের রাজনৈতিক অতি-গতিশীলতা তাকে ক্রমান্বয়ে মন্থর করে দিচ্ছে। কিন্তু সেদিকে কি কারো নজর আছে? কী সরকারি দল, কী বিরোধী দল! আমাদের কি এখন সেদিকে একটু নজর দেয়া উচিত নয়?

অনেকেই বলে থাকেন, বিগত কয়েক মাসে দেশে যে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, সেটা মূলত গণজাগরণ মঞ্চকে কেন্দ্র করেই। একথার মধ্যে সত্যতা থাকলেও, গণজাগরণ মঞ্চের কারণে রাজনৈতিক নৈরাজ্য ও অস্তিরতা তৈরি হয়েছে, একথা সত্য নয়। কোন কিছুকে "কেন্দ্র" করে হওয়া আর "কারণে" হওয়া এক কথা নয়। এটা উদোর পিণ্ডি বুঁদোর ঘাড়ে চাপানো চেষ্টা। একথা সত্য যে, একাত্তরের একটি অমীমাংসিত বিষয়ের ফয়সালার অংশ হিসাবে এদেশের এক বিপুল জনগোষ্ঠীর সমর্থন নিয়ে গণজাগরণ মঞ্চের পক্ষ থেকে যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি করা হয়েছে, ইতিহাসের দায়মুক্তির প্রশ্নে সেটার যথেষ্ট ন্যায্যতা রয়েছে। কিন্তু অবশ্যই সেটা স্বাভাবিক বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই হতে হবে এবং সে প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। কিন্তু গণজাগরণ মঞ্চকে মোকাবিলা করার নানান রাজনৈতিক কৌশল হিসাবে বিগত কিছুদিন ধরে দেশে যে একটি অস্বাভাবিক অবস্থা তৈরি করা হয়েছে, সেটা অত্যন্ত অনাকাঙ্ক্ষিত। কেননা, সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচির মধ্যে দেশ ও দশের নিরাপদ জীবন-যাপনের যে স্বাভাবিক গতিশীলতা সেটাকে অটুট রাখার চিন্তা সংযুক্ত থাকা বাঞ্ছনীয়। কিন্তু সেটা ঘটেনি। সারাদেশে একটা রাজনীতি রাজনীতি খেলা শুরু হয়ে গেছে। এদেশের সাধারণ মানুষের জীবন-যাপন ব্যবস্থার নিশ্চয়তা ও নিরাপত্তা নিয়ে কারো কোন ধরনের উদ্বেগ নাই। তাই, রাজনীতির মাঠের সকল খেলোয়াড়রা এবার রাজনীতি রাজনীতি খেলা বন্ধ করেন। গণজাগরণ মঞ্চ শুরু থেকেই নানা সৃজনশীল কর্মসূচির মাধ্যমে তাদের আন্দোলনের প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখছিল এবং একটা পর্যায়ে সেটা অনিয়মিত করে নিয়মতান্ত্রিকভাবে চালিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল। কিন্তু নানান রাজনৈতিক কর্মসূচির মাধ্যমে গণজাগরণ মঞ্চকে মোকাবিলা করার চেষ্টার প্রতিক্রিয়া হিসাবে গণজাগরণ মঞ্চও নতুন কর্মসূচিতে সম্পৃক্ত হয়। সেটাও অনেকের কাছে অনাকাঙ্ক্ষিতই ছিল। তাই গণজাগরণ মঞ্চকে দলীয় রাজনীতির ফ্রেইমওয়ার্কে ভোটের রাজনীতির সাথে মিশিয়ে পক্ষে কিংবা বিপক্ষে, আর খিঁচুড়ি না-পাকানোতেই সবার মঙ্গল। গণজাগরণ মঞ্চের রাজনীতি মহান মুক্তিযুদ্ধের রাজনীতি। একাত্তরের চেতনার পুনরুদ্ধারের রাজনীতি। এটাকে আওয়ামী লীগ বনাম বিএনপির কিংবা চৌদ্দ বনাম আঠার দলের ভোটের রাজনীতির মারপ্যাঁচে ফেলে আর টানাটানি না-করার মধ্যেই রাজনীতি এবং সমাজ উভয়ের জন্যই কল্যাণকর। গণজাগরণ মঞ্চকে তার স্বতন্ত্র চরিত্র নিয়ে নিজের মতো চলতে দেন। গণজাগরণ মঞ্চ যদি নিজের মতো করে চলতে পারে, সমাজের স্বাভাবিক গতিশীলতার কোন ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ার কথা না। রাজনীতিবিদরা বরঞ্চ সমাজের সাধারণ মানুষের জীবনে নতুন করে কীভাবে গতিশীলতা আনা যায় তা নিয়ে নতুন কোন রাজনীতি শুরু করেন। কেননা, অতি রাজনীতির অতি গতিশীলতা সমাজের সাধারণ মানুষের জীবনে দুর্গতির পরিবৃদ্ধি ঘটায়। কারণ বাংলাদেশের মতো দেশে রাজনীতির অতি-গতি আর সমাজের দুর্গতি "চলে যুগলে, বগলে বগলে"।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, বর্তমানে হুমবোল্ট ভিজিটিং ফেলো হিসাবে জার্মানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করবে সংসদীয় ঐকমত্য কমিটি। টিআইবির এ প্রস্তাবের সঙ্গে আপনি একমত?
9 + 2 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
জুন - ১৬
ফজর৩:৪৩
যোহর১১:৫৯
আসর৪:৩৯
মাগরিব৬:৫০
এশা৮:১৫
সূর্যোদয় - ৫:১০সূর্যাস্ত - ০৬:৪৫
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :