The Daily Ittefaq
ঢাকা, সোমবার, ১৪ এপ্রিল ২০১৪, ১ বৈশাখ ১৪২১, ১৩ জমাদিউস সানী ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ মিল্কি হত্যা মামলায় ১২ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট | বারডেমে চিকিৎসকদের অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি | কালিয়াকৈরে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৪ | তারেকের বক্তব্যে ভুল থাকলে প্রমাণ করুন : ফখরুল

বৈসাবির আনন্দে মেতেছে পাহাড়

এ কে এম মকছুদ আহমেদ, রাঙ্গামাটি প্রতিনিধি

পাহাড়ের জনগোষ্ঠী মেতেছে বৈসাবি উত্সবে। পার্বত্য জনপদের পাড়া-মহল্লায় এখন সাজ সাজ রব। পুরাতন বছরকে বিদায় ও নতুন বছরকে বরণ করতে তিন পার্বত্য জেলার আদিবাসীরা উদযাপন করেন তিন দিনের এই উত্সব। আজ শনিবার থেকে শুরু হচ্ছে বৈসাবির মূল আনুষ্ঠানিকতা। পাহাড়ি জনগোষ্ঠী ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে নদীর জলে গঙ্গাদেবীর উদ্দেশে ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে শুরু করবে উত্সব। এ উপলক্ষে পাহাড়ে সরকারি-বেসরকারি ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন নানা অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করেছে।

মূলত চৈত্র সংক্রান্তি উত্সবই হলো বৈসুক-সাংগ্রাই-বিজু; যার সমন্বিত নাম বৈসাবি। তিন পার্বত্য জেলার পাহাড়িদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় ও সামাজিক উত্সব এটি। বাংলা বর্ষ বিদায় আর বরণকে চাকমা ও তঞ্চংগ্যা সম্প্রদায় বিজু, মারমারা সাংগ্রাই, ত্রিপুরা ও উসুইরা বৈসুক বা বৈসু নামে পালন করে থাকে।

পার্বত্য এলাকায় বসবাসরত বিভিন্ন সম্প্রদায়ের লোকজন তাদের মতো করে জাঁকজমকভাবে বৈসাবি উদযাপনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন। বাজারে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি থাকলেও পার্বত্য এলাকার আদিবাসীরা থেমে নেই উত্সব উপলক্ষে নতুন জামা-কাপড় কেনাকাটায়।

চাকমা ও তঞ্চংগ্যা সম্প্রদায়ের বিজু উত্সব

চৈত্রের শেষ দু'দিন আর পহেলা বৈশাখ এই তিন দিন চাকমারা মহাসমারোহে 'বিজু' উত্সব পালন করে। প্রতি বছরই চাকমা জনপদে পাখির 'বি-জু-বি-জু' ডাক সবাইকে 'বিজু' উত্সবের আগমনী বার্তা জানিয়ে দেয়। এর পর পর সবাই উত্সবের প্রস্তুতি গ্রহণ করে। এই তিন দিন তারা কোনো প্রাণী হত্যা করেন না। বিজু উত্সবের প্রথম দিন 'ফুল বিজু', ১৩ এপ্রিল দ্বিতীয় দিন 'মূল বিজু' এবং ১৪ এপ্রিল তৃতীয় ও শেষ দিন 'গোজ্যাই পোজ্যা' নামে পালন করা হয়।

ফুল বিজু:উত্সবের প্রথম দিনে চাকমারা ফুল দিয়ে ঘর সাজায়। বয়স্কদের স্নান করিয়ে তাদের বস্ত্র দান করে আশীর্বাদ কামনা করে। এছাড়া চলে নাচ-গানের ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা। উত্সবের জন্য প্রত্যেকের ঘরে ঘরে প্রচুর পরিমাণে বিশেষ পানীয় তৈরি করা হয়। সে সঙ্গে মুখরোচক খাবার রান্নার জন্যে নানা রকমের শাক-সবজি, তরিতরকারি বাজার এবং জঙ্গল থেকে সংগ্রহ করে ঘরে রাখা হয়।

এদিন সবাই খুব ভোরে উঠে নদী কিংবা ঝরনাতে গিয়ে স্নান করে। বাড়ির ছেলেমেয়েরা পাহাড় ও নার্সারী থেকে ফুল পাতা সংগ্রহ করে ঘর সাজায়। নদীর ঘাটে গিয়ে গঙ্গা বা জলদেবীর উদ্দেশে ফুল দিয়ে পূজা করে, সকলে মিলে বুদ্ধ মূর্তিকে স্নান করায় এবং নদী থেকে পানি এনে মুরুব্বিদের গোসল করিয়ে আশীর্বাদ গ্রহণ করে। রাতে প্রদীপ পূজা, ঘরের আঙ্গিনায়, গোয়াল, ঢেঁকিঘরে, নদী বা কুয়ার পাড়ে সারি সারি প্রদীপ জ্বালিয়ে সমস্ত গ্রামকে উত্সবের আলোতে উদ্ভাসিত করে রাখে।

মূল বিজু:চৈত্রের শেষ দিনকে 'মূল বিজু' হিসেবে পালন করা হয়। এটাই হচ্ছে বৈসাবির মূল উত্সব। এ দিনে ঘরে ঘরে রান্না হয় ঐতিহ্যবাহী 'পাচন' এবং অতিথিদের নানা উপাদেয় খাবার দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়। অন্তত পাঁচ পদের তরিতরকারী মিলিয়ে রান্না করা হয় বিশেষ ধরনের 'পাচন'। এছাড়া বিভিন্ন ধরনের পিঠা, তিলের নাড়ু, বিন্নি ধানের খৈ ও মিষ্টি তৈরি করা হয়। চাকমা মেয়েরা তাদের কোমর তাঁতে বোনা রাঙ্গা খাদি বুকে জড়িয়ে পাড়ায় পাড়ায় বেড়ায়। অপরাহ্নে তরুণ-তরুণীরা এক সঙ্গে ঘিলা, পোত্তি (বউচি) প্রভৃতি খেলায় মেতে উঠে।

গোজ্যাই পোজ্যা: বৈসাবি উত্সবের শেষ দিনে চাকমারা 'গোজ্যাই পোজ্যা' (গড়াগড়ি খাওয়া) উত্সব পালন করে। তিন দিনব্যাপী বিজু উত্সবের এটিই শেষ দিন। নতুন বছরের প্রথম দিন অর্থাত্ পহেলা বৈশাখে চাকমারা 'গোজ্যাই পোজ্যা' উত্সব পালন করে থাকে। অতীতে এদিনে চাকমারা পেট ভরে ভোজন করত, প্রচুর মদও পান করত। তাই ভোজন শেষে সবাই বিশ্রাম নিতো কিংবা গড়াগড়ি যেতো। বছরের এই প্রথম দিনটি ভাল খাওয়া-দাওয়া করে হাসি-গল্পে কাটাতে পারলে বছরের বাকি দিনগুলো ভালো যাবে-এই হলো তাদের বিশ্বাস।

ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের বৈসুক উত্সব

ত্রিপুরা সম্প্রদায় 'বৈসুক' উত্সবের মাধ্যমে পুরানো বছরকে বিদায় এবং নতুন বছরকে স্বাগতম জানায়। এ উত্সবে হাসি আনন্দ এবং নৃত্যগীতের পাশাপাশি শিবের আশীর্বাদ কামনা করা হয়। ত্রিপুরারা তিন পর্বে এ উত্সব পালন করে। এর একটি 'হারি বৈসুক'। এ দিনটি তারা চৈত্র সংক্রান্তির আগের দিন পালন করে থাকে। এদিন প্রতিটি ত্রিপুরা গৃহস্থ পরিবারেই গবাদিপশুর গোসলের আয়োজন করা হয় এবং বিভিন্ন ফুলের মালা দিয়ে তাদের সাজিয়ে রাখা হয়। খুব সকালে নদীর ঘাটে গিয়ে দেবতার উদ্দেশে ফুল দিয়ে আসা ত্রিপুরা সমাজের প্রচলিত রেওয়াজ।

চৈত্র সংক্রান্তির দিনকেই ত্রিপুরারা 'বিসুমা দিবস' হিসেবে পালন করে থাকে। এই দিন বিশেষ ধরনের 'কচুই' বা বিশুদ্ধ পানি দিয়ে ঘর-দুয়ার ধুয়ে পবিত্র করা হয়। প্রত্যেকের বাড়িতে বিভিন্ন ধরনের পিঠা তৈরি হয়। পাশাপাশি এদিন মুখরোচক খাদ্য হিসেবে বিশেষ ধরনের তরকারি 'পাচন' রান্না করা হয়। অতিথিদের এসব পিঠা, পাচন ও মদ দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়। বছরের এ শেষ দিনটিতে সবাই রাগ, অভিমান, হিংসা, ক্ষোভ বিসর্জন দিয় পরস্পরের প্রতি আন্তরিকতা ও সৌহার্দ্যতা প্রদর্শন করে।

নববর্ষের প্রথম দিনকে ত্রিপুরারা 'বিসিকাতাল' নামে পালন করে থাকে। এদিন ত্রিপুরা নবদম্পতি ও তরুণ-তরুণীরা নদী থেকে কলসী ভর্তি পানি তুলে গুরুজনদের গোসল করিয়ে আশীর্বাদ গ্রহণ করে। নতুন বছরটি যাতে সবার জীবনে মঙ্গল বয়ে আনে সে জন্য বিভিন্ন দেবতার আরাধনা করা হয়। এ উত্সব চলাকালে এক সপ্তাহ পর্যন্ত পাড়ায় পাড়ায় ত্রিপুরা শিল্পীরা ঐতিহ্যবাহী 'গরায়' নৃত্য পরিবেশন করেন।

মারমা সম্প্রদায়ের সাংগ্রাই উত্সব

মারমা সম্প্রদায়ের মানুষ নতুন বছরকে বরণ করতে 'সাংগ্রাই' উত্সব পালন করেন। এ উপলক্ষে তাদের ঐতিহ্যবাহী পানি খেলা হয় খাগড়াছড়ি জেলা শহরের পারনখাইয়াপাড়া মহিলা কলেজ এলাকায়। এই পানি উত্সবে প্রতিবছর কয়েক হাজার নারী-পুরুষের সমাগম হয়।

মারমা সম্প্রদায় চারদিন ধরে 'সাংগ্রাই' উত্সব পালন করে থাকে। পুরনো বছরের শেষ তিন দিন এবং নতুন বছরের প্রথম দিনই 'সাংগ্রাই' উত্সবের দিন হিসেবে গুরুত্ব পেয়ে থাকে। পুরানো বছরের শেষে তিনদিনের প্রথম দিন নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই মিছিল করে বৌদ্ধ মূর্তিগুলোকে নদীর ঘাটে নিয়ে যায়। ভেলা তৈরি করে মূর্তিগুলোকে সেখানে বসিয়ে চন্দন বা দুধ পানিতে গোছল করানো হয়। এরপর সেগুলোকে মন্দির অথবা বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। পরের দু'দিন মারমা জনপদে নেমে আসে আনন্দের বন্যা। এ দু'দিন পাড়ায় পাড়ায় চলে পানি খেলা। আনন্দের আতিশয্যে একে অপরকে পানি ছিটিয়ে পুরানো বছরের ব্যর্থতা, গ্লানি ও দুঃখকে ধুয়ে-মুছে দেয়।

এছাড়া 'সাংগ্রাই' উপলক্ষে খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও কক্সবাজারের রাখাইন সম্প্রদায়ের তরুণ-তরুণীরা বড় বড় প্যান্ডেল তৈরি করে তার নিচে নৌকা ভর্তি রঙ্গিন পানি নিয়ে ঐতিহ্যবাহী পানি খেলায় মেতে উঠে। সবাই নৌকা থেকে পানি নিয়ে একে অপরের গায়ে ছিটিয়ে আনন্দ প্রকাশ করে এবং পুরানো বছরকে বিদায় জানায়। এ সময় তারা বয়স্ক আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশিদের আনুষ্ঠানিকভাবে স্নান করায়। এছাড়া বৌদ্ধ মন্দিরে গিয়ে পুরানো বছরের সকল ব্যর্থতা দূর করে নতুন বছর নতুন উত্সাহ-উদ্দীপনা নিয়ে জীবন সংগ্রামে সাফল্য অর্জনের উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করে।

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বলেছেন, 'দেশ আজ বন্ধুহীন হয়ে পড়েছে। এদেশে বিদেশিরা বিনিয়োগ করছে না'। আপনিও কি তাই মনে করেন?
4 + 9 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
সেপ্টেম্বর - ২২
ফজর৪:৩২
যোহর১১:৫২
আসর৪:১৪
মাগরিব৫:৫৮
এশা৭:১১
সূর্যোদয় - ৫:৪৭সূর্যাস্ত - ০৫:৫৩
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :