The Daily Ittefaq
ঢাকা, শনিবার, ৪ মে ২০১৩, ২১ বৈশাখ ১৪২০, ২২ জমাদিউস সানি ১৪৩৪
সর্বশেষ সংবাদ ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে নির্দলীয় সরকার ঘোষণা দেয়ার আল্টিমেটাম : মতিঝিলে ১৮ দলের সমাবেশে খালেদা জিয়া | প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য অন্তসারশূন্য, অবরোধ হবেই: হেফাজত | দয়া করে আর মানুষ হত্যা করবেন না: খালেদা জিয়ার উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী

জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জীবন বাঁচাল যারা

আবুল খায়ের

++জীবিত এত মানুষ উদ্ধারের ঘটনা বিরল

++উদ্ধার কর্মীদের সাহস ও মানুষের প্রতি ভালোবাসা ছিল মূলমন্ত্র

++জীবিতরা বললেন, যেন কবর থেকে ফিরলাম

++খাবার পানি না পেয়ে অনেকেই দেয়াল চেটেছেন

কোনো দুর্ঘটনায় কিংবা ভবন ধসে বাংলাদেশে আগে কখনো এতো মানুষের মৃত্যু হয়নি। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরাও এতো বড় দুর্ঘটনা দেখেনি। সাভারে ধসে পড়া রানা প্লাজার ধ্বংসস্তূপ থেকে জীবিতদের উদ্ধারে অভিযানটি তাই উদ্ধারকর্মীদের জন্য ছিল একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ। এই ধরনের অভিযান পরিচালনায় যে ধরনের আধুনিক যন্ত্রপাতি, দক্ষ ও অভিজ্ঞ লোকবল, সমন্বয় ও সুব্যবস্থাপনার দরকার তার কোনটাই ছিল না। পুরো উদ্ধার অভিযানে এই বিষয়গুলো প্রকট আকারে বারবার ওঠে এসেছে। এতো সীমাবদ্ধতার মধ্যেও ধ্বংসস্তূপ থেকে প্রায় তিন হাজার পোশাক শ্রমিককে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। এদের কেউ সামান্য, কেউ মারাত্মক আহত। কেউ চিকিত্সা নিচ্ছেন হাসপাতালে, কেউ ফিরে গেছেন পরিবার-পরিজনের কাছে। এই মানুষগুলোকে নতুন জীবন দেয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে একদল অসম সাহসী যোদ্ধা। এ যোদ্ধাদের কেউ সামরিক বাহিনীর সদস্য, কেউ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সদস্য, কেউ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য। আবার কোন কোন যোদ্ধা কোন বাহিনীরই সদস্য নয়, একেবারে সাধারণ মানুষ। আসলে সাধারণের ভেতর অসাধারণ কিছু মানুষ। এদের কেউ ছাত্র, কেউ চিকিত্সক, কেউ রিকশাচালক, কেউ ফেরি করে বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করেন।

নিজের জীবন তুচ্ছ করে, মৃত্যুর কথা একবারও না ভেবে মানুষগুলো বারবার ছুটে গেছে ধ্বংসস্তূপের ভেতরে, ইট সিমেন্টের টুকরোর মধ্যে ব্যথায়-কষ্টে অক্সিজেন ছাড়া কবরের অন্ধকারের মধ্যে পড়ে থাকা মানুষগুলোর কাছে। আটকেপড়া মানুষের আর্তনাদ ও বেঁচে থাকার আকুতিই বারবার তাদের নিয়ে গেছে ধ্বংসস্তূপের মধ্যে। এ প্রসঙ্গে ফায়ার সার্ভিসের এক সদস্য বলেছেন, ধ্বংসস্তূপ থেকে জীবিত অবস্থায় যখন একজন গার্মেন্টস কর্মীকে উদ্ধার করি তখন কী যে আনন্দ হয়েছে তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না।

তবে ১৫ ঘণ্টা অভিযান চালিয়েও লড়াকু নারী শাহিনাকে জীবিত উদ্ধার করতে না পারাটাকে ব্যর্থতা হিসেবে নিচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা। ক্যাপ্টেন হাসানের নেতৃত্বে উদ্ধারকারী দলটি শাহীনার কাছে পৌঁছতে সমর্থ হয়েছিলেন। সঙ্গে ছিলেন ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার আব্দুল জলিল, তানহার, ডুবুরি আবুল খায়ের। শাহিনা উদ্ধারকর্মীদের বলেছিলেন, ভাই আমাকে বাঁচান, আমার দেড় বছরের একটি ছেলে আছে। ২৮ এপ্রিল রাত ৯টার পর ইলেকট্রিক লাইন সংযোগ করে দেয়াল কাটার সময় হঠাত্ গার্মেন্টসের কাপড়ে আগুন ধরে যায়। কোনো রকমে বেঁচে আসেন উদ্ধার কর্মীরা। তবে অগ্নিদগ্ধ হন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার আবদুল আজিজ। বর্তমানে তিনি সিংগাপুরে চিকিত্সা নিচ্ছেন। এরপরেও বাঁচানো যায়নি শাহিনাকে। ফিরিয়ে দেয়া হলো না শাহিনার সন্তানের কাছে তার মাকে।

সেনাবাহিনীর মেজর আতিক চৌধুরী, মেজর আরিফ, মেজর শাদাত, ক্যাপ্টেন হাসান ও লেফট্যানেন্ট আশরাফের নেতৃত্বে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত একটি দল ধ্বংসস্তূপের মধ্যে উদ্ধার কাজে অংশগ্রহণ করেন। শুরুতে ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন) মেজর মোহাম্মদ মাহবুব ও প্রকল্প পরিচালক মেজর এ কে এম শাকিল নেওয়াজের নেতৃত্বে পাঁচ শতাধিক ফায়ার সার্ভিস কর্মী উদ্ধার কাজে অংশ নেন। ২২টি সুড়ঙ্গ পথে সেনাবাহিনী ও ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকর্মীরা বিরামহীন হতাহতের উদ্ধারে অংশ নেন। সেনাবাহিনীর মেজর আতিক, ক্যাপ্টেন হাসান ও লেফট্যানেন্ট আশরাফ টানা একশ' ঘণ্টা পর্যন্ত অভিযান চালিয়েছেন। এ সময় তাদের খাওয়া, ঘুম ও বিশ্রামের কথা মনে পড়েনি। একটা কথাই ভেবেছেন কিভাবে আরো বেশি জীবিত লোককে উদ্ধার করা যায়। বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হবে সাভারের এনাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও আশেপাশের হাসপাতাল, ক্লিনিকের চিকিত্সকসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা চিকিত্সকদের। এই চিকিত্সকরাই একেক জনকে উদ্ধার করে নিয়ে আসার পর দিয়েছেন প্রয়োজনীয় চিকিত্সা। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ভূমিকম্পসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘটনায় বা ভবন ধসে ধ্বংসস্তূপ থেকে এতো মানুষকে জীবিত উদ্ধার করার ঘটনা বিরল। উদ্ধারকর্মীদের সাহসিকতায় গার্মেন্টস কর্মীরা পেয়েছেন নতুন জীবন।

গার্মেন্টস কর্মী সজীব (৩১) কাজ করতেন রানা প্লাজার ষষ্ঠ তলায়। তার পিঠের ওপর ছাদ ধসে পড়ে। দেখতে পান চারদিকে ধুলাবালু আর নিকষ অন্ধকার। তার সঙ্গে আরো চারজন একই স্থানে চাপা পড়ে। পরে তারা বাঁচাও বাঁচাও বলে চিত্কার শুরু করে। ২৪ ঘণ্টা পর উদ্ধারকর্মীরা সজীবসহ ৫ জনকে উদ্ধার করে। সজীব কোমরে মারাত্মক আঘাত পেয়েছেন। সজীব বলেন, কবরের ও কিয়ামতের কথা শুনেছি। পুরো সময়টি মনে হয়েছে কবরের মধ্যে আছি। সজীবের স্ত্রীও তার সঙ্গে গার্মেন্টসে চাকরি করতেন। ছুটি থাকায় ওই দিন কাজে যাননি তার স্ত্রী। বেঁচে যান তিনি।

নূরুজ্জামানকে (৩২) ধ্বংসস্তূপ থেকে সেনাবাহিনীর সদস্যরা ১৫ ঘণ্টা চেষ্টার পর উদ্ধার করেন। অন্ধকারে থাকা অবস্থায় পুরো সময়টা নূরুজ্জামান দুই শিশু সন্তানের জন্য আল্লাহর কাছে বাঁচার ফরিয়াদ করেন। উদ্ধার হওয়ার পর নূরুজ্জামান জানান, আল্লাহ তার ফরিয়াদ কবুল করেছেন।

উদ্ধারকর্মী মাহরুফ আলম উদ্ধারকর্ম চালানোর সময় সুড়ঙ্গে চাপা পড়েন। দেখতে পান লাশ আর লাশ। কিছুক্ষণ পর পর দেয়াল ভেঙ্গে পড়ছে। তার ডান হাতে রড ঢুকে পড়ে। তিনি নিশ্চিত হয়ে যান আর জীবিত ফিরতে পারবেন না। তিনি বলেন, দোয়া দরুদ পড়া শুরু করি। নিজেকে আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেই। আড়াই ঘণ্টা পর সেনাবাহিনীর সদস্যরা আমাকে উদ্ধার করে। মৃত্যু কী তা বুঝেছি। রানা প্লাজার দোতলায় একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সেলসম্যান নূরুল ইসলাম (২৫) ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়েন। ঘটনার দিন বিকালে তিন মহিলা কর্মীর সঙ্গে তাকেও উদ্ধার করা হয়। সাত তলার গার্মেন্টস কর্মী নাসরিন (১৯) ধ্বংসস্তূপে ১২ ঘণ্টা আটকে থাকেন। তার চোখের সামনে তিনজন গার্মেন্টস কর্মী মারা যায়। ডান হাত কেটে উদ্ধার করা হয় নাসরিনকে।

আট তলার গার্মেন্টস কর্মী পিয়ারী (১৯) ও তার ছোট বোন সোহাগী (১৮) হাত ও পায়ে আঘাত পেলেও প্রাণ বেঁচে যান। কোহিনূর বেগমকে ২৪ ঘণ্টা পর ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। তার কোমরের হাড় ভেঙ্গে গেছে। কোহিনূর ভেবেছিলেন তার মৃত্যু নিশ্চিত। সাত তলার গার্মেন্টস কর্মী সীমা আখতারকে ৩৬ ঘণ্টা পর ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা হয়। একটি মেয়ের লাশ তার উপরে ছিল। মেয়েটি ছাদ ধসে মারা যায়। ওই মেয়ের লাশটির কারণে সীমা আখতার বেঁচে যান।

ঝরনা আকতারের উপর তার দুই সহকর্মীর লাশ পড়ে। লাশের উপর পড়ে দেয়াল। ২৪ ঘণ্টা চেষ্টার পর তাকে সেনাবাহিনীর সদস্যরা উদ্ধার করেন। ওই দুই লাশের কারণে দেয়াল চাপা থেকে ঝরনা রক্ষা পান বলে জানান। সাত তলায় ঝরনা আকতারের মেয়ে তানজিনা (১৫) ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়ে। ১২ ঘণ্টা পর সেনাবাহিনীর সদস্যরা বুকের হাড় ভাঙ্গা অবস্থায় তানজিনাকে উদ্ধার করে। আট তলার গার্মেন্টস কর্মী সফুরা বেগমকে ২৮ ঘণ্টা পর ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা হয়। সাত তলার গার্মেন্টস কর্মী লাভলীকে ১২ ঘণ্টা পর উদ্ধার করা হয়। মাথায় ভীষণ ব্যথা পান তিনি। ছয় তলার গার্মেন্টস কর্মী সাহার বানু (২৬) ধ্বংসস্তূপে ২৪ ঘণ্টা আটকে ছিলেন। ক্ষুধায় তিনি দেয়াল জিহ্বা দিয়ে চেটে ছিলেন। তাকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। গার্মেন্টস কর্মী রুলি বেগম (২৮) ও তার পুত্র চঞ্চল ধ্বংসস্তূপে আটকা পড়েন। রুলি বেগম আল্লাহর কাছে ওই সময় ফরিয়াদ করেছিলেন, তার জীবনের বিনিময়ে যেন ছেলে জীবিত থাকে। তবে ৩৬ ঘণ্টা পর মা ও ছেলেকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার হয়।

এই পাতার আরো খবর -
font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
বিএনপি বলেছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মেনে নিলে প্রধানমন্ত্রীর আলোচনায় বসার আহ্বানে সাড়া দেবে। দলটির এই সিদ্ধান্ত যৌক্তিক বলে মনে করেন?
5 + 5 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
নভেম্বর - ১
ফজর৫:০৪
যোহর১১:৪৮
আসর৩:৩৫
মাগরিব৫:১৪
এশা৬:৩১
সূর্যোদয় - ৬:২৪সূর্যাস্ত - ০৫:০৯
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :