The Daily Ittefaq
ঢাকা, শনিবার, ৪ মে ২০১৩, ২১ বৈশাখ ১৪২০, ২২ জমাদিউস সানি ১৪৩৪
সর্বশেষ সংবাদ ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে নির্দলীয় সরকার ঘোষণা দেয়ার আল্টিমেটাম : মতিঝিলে ১৮ দলের সমাবেশে খালেদা জিয়া | প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য অন্তসারশূন্য, অবরোধ হবেই: হেফাজত | দয়া করে আর মানুষ হত্যা করবেন না: খালেদা জিয়ার উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী

বাঁচার সিঁড়িতেই লাশের স্তূপ

জীবিত উদ্ধারের আর কোন সম্ভাবনা নেই, আরো ৬১ লাশ উদ্ধার, মোট ৫১৩ লাশ

আমীর মুহাম্মদ

সাভারে রানা প্লাজার ধ্বংসস্তূপের যত গভীরে যাওয়া হচ্ছে ততই মিলছে বীভত্স লাশের স্তূপ। 'রানা প্লাজা' ধসের দশম দিন গতকাল শুক্রবারও সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে লাশের সংখ্যা। বিশেষ করে ভবনের 'জরুরি বহির্গমন সিড়িতে' রয়েছে লাশের স্তূপ। ভবন ধসের পরপরই বেঁচে যাওয়া গার্মেন্টস কর্মীরা বলেছিলেন, ভবনের পিছনের জরুরি বহির্গমন সিঁড়িতে অনেকে চাপা পড়ে আছেন। গতকাল উদ্ধার অভিযানের দশম দিনে শ্রমিকদের সেই শঙ্কা সত্য প্রমাণ হল। জীবন বাঁচানোর ওই সিঁড়িতেই কংক্রিটের ভাঁজে ভাঁজে মিলছে অনেক নারী-পুরুষের দলাপাকানো লাশ। এছাড়া মূল ভবনের পিছনের দিকের বাথরুমগুলোতেও অনেক লাশ চাপা পড়ে থাকার কথা জানিয়েছেন উদ্ধার কর্মীরা। সেসব মৃতদেহ এখন এতটাই বিকৃত ও বীভত্স যা নজীরবিহীন। উদ্ধার কাজে নিয়োজিত এক সেনা কর্মকর্তা বলেন, ধসে পড়া ভবনের সবকিছু দেখে বোঝা যাচ্ছে, ঘটনার দিন গার্মেন্টসের কলাপসিপল গেটটি বন্ধ করে রাখা ছিল। যেন কেউ বেরুতে না পারে। ভবনের পিছন গেট যা জরুরি বহির্গমনের জন্য তৈরি সেটিও ছিল তালা মারা। বেশির ভাগ শ্রমিক ওই গেট দিয়ে বেরুতে গিয়েই আটকে পড়ে। এদিকে ছুটে এসেই মরতে হয়েছে তাদের। তিনি বলেন, মরার ফাঁদ তৈরি করতেই গেটটি বন্ধ করে রাখা হয়েছিল। পিছনের গেটে তালা না থাকলে এতো লোক মরতো না।

এদিকে উদ্ধার হওয়া বিকৃত লাশগুলো নিয়ে নানামুখী সংকট তৈরি হচ্ছে। হাড় থেকে মাংস খসেপড়া গলিত বা দলা পাকানো লাশগুলো উদ্ধারের পর সেগুলো দেখে শনাক্ত করার কোন উপায় থাকছে না। এত বীভত্স লাশগুলো স্বজনহারাদের শনাক্তের জন্যও বেশিক্ষণ ফেলে রাখা যাচ্ছে না। পাশাপাশি ছিন্নভিন্ন গলিত মৃতদেহগুলো ধংসস্তূপের মধ্য থেকে উদ্ধার করে আনতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন উদ্ধার কর্মীরা। খণ্ডিত লাশের অংশগুলো কুড়িয়ে কুড়িয়ে একস্থানে জড়ো করার পর সেগুলো বাইরে নিয়ে আসা হচ্ছে। এতে বার বার থামিয়ে রাখতে হচ্ছে কংক্রিট অপসারণের কাজ।

উদ্ধার অভিযানের দশম দিনে ক্রেন, ডোজার ও লোডার ব্যবহার করে উদ্ধার কর্মীরা ভবনের চারপাশ থেকে কংক্রিটের স্তূপ সরিয়ে নিচ্ছেন। ছাদের অংশও টুকরো টুকরো করে সরিয়ে নেয়ার কাজ চলছে। ট্রাকে করে এসব কংক্রিটের স্তূপ সরিয়ে নেয়া হচ্ছে বংশী নদীর তীরে। দ্বিতীয় ধাপের উদ্ধার অভিযানের শুরুতে লাশ উদ্ধারের হার কমে গেলেও ধসের নবম ও দশম দিনে লাশের সংখ্যা বেড়েছে। বিশেষ করে গতকাল শুক্রবার ৬১টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। দুর্ঘটনার পর স্থাপন করা পুলিশ কন্ট্রোল রুম থেকে জানানো হয়, দুর্ঘটনার দশম দিন শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ৫১৩ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪২৬ জনের মরদেহ হস্তান্তর করা সম্ভব হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১২টা থেকে শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে আরো ৬১টি লাশ উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিস ও রেডক্রিসেন্ট কর্মীরা। এদের মধ্যে প্রমীলা, মামুন, জাহাঙ্গীর, তাহসান আহমেদের ও সর্বশেষ রাশিদার নাম জানা গেছে। এছাড়া ধ্বংসস্তূপ থেকে জীবিত দুই হাজার ৪৩৭ জনকে উদ্ধার করা হয়। তবে আর কোন জীবিত মানুষ ধসে পড়া ভবনের নিচে নেই বলে ধারণা করছে উদ্ধারকর্মীরা। উদ্ধারকর্মীরা জানান, দুপুর দেড়টায় উদ্ধার করা চার জনের মধ্যে একজন তাহসান আহমেদ। এসময় সেনাবাহিনী তার পকেট থেকে একটি কাগজ ও সেলফোন উদ্ধার করে। এ থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়, তার বাড়ি রাজশাহী জেলায়। দুপুর পৌনে দুইটায় উদ্ধার করা ৩ মৃতের মধ্যে একজনের নাম রাশিদা। তার কাছে থাকা একটি সাদা কাগজ থেকে নাম ও আইডি (আইডি নং ১৪১৫২) নম্বর জানা যায়। এছাড়া, সকাল ৬টার পর প্রমীলার মৃতদেহ উদ্ধার করার সময় তার সঙ্গে আইডি কার্ড পায় উদ্ধারকর্মীরা। আইডি কার্ডের তথ্য মতে, প্রমীলা রানা প্লাজার একটি পোশাক কারখানায় সুইং এ সেকশনে কর্মরত ছিলেন। এর বাইরে জাহাঙ্গীরের বাড়ি গাজীপুরের জয়দেবপুরে। জাহাঙ্গীর ও মামুনের পকেটে সেলফোন পাওয়া গেছে। ওই সেল ফোন থেকে তাদের পরিচয় নিশ্চত করা হয়েছে। গতকাল শুক্রবার সকালে উদ্ধার করা পুরুষ লাশের মধ্যে বেশিরভাগের কাছে সেলফোন পাওয়া গেছে। তবে উদ্ধারকৃত নারী লাশগুলোর সঙ্গে সেলফোন পাওয়া যায়নি।

এদিকে বিশেষজ্ঞদের ধারণা অনুযায়ী নির্ধারিত সাড়ে ৬ হাজার টন ধ্বংসস্তূপের মধ্যে প্রায় ৮শ টন এরইমধ্যে অপসারণ করা হয়েছে। এখনো অনেক মৃতদেহ অপসারণের অপেক্ষায় থাকা কংক্রিটের নিচে চাপা পড়ে আছে। তাই ধ্বংসস্তূপ পুরোপুরি অপসারণ না হওয়া পর্যন্ত করো পক্ষেই লাশের সঠিক পরিসংখ্যান বলা সম্ভব হচ্ছে না। একইভাবে উদ্ধারকাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত করা যাচ্ছে না নিখোঁজ নারী-পুরুষের সঠিক তালিকা।

গতকাল শুক্রবার সরেজমিন দেখা যায়, ধ্বংসস্তূপ থেকে লাশ উদ্ধারের হার বেড়ে যাওয়ায় আবারো ঘটনাস্থলের চারপাশে স্বজনহারাদের উপস্থিতি বেড়েছে। এখান থেকেই লাশবাহী গাড়ির সঙ্গে অধরচন্দ্র উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে ছুটে যাচ্ছেন দিকভ্রান্ত হাজারো স্বজনহারা। লাশের খোঁজে নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনেরা এখনো ধসে পড়া ভবনের আশপাশ, হাসপাতাল ও অধরচন্দ্র উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে ভিড় করছেন। অধর চন্দ্র বিদ্যালয় মাঠে শুয়ে বসে আছেন প্রিয় মানুষটির লাশের জন্য স্বজনরা। রানা প্লাজা এলাকার আশপাশে অপেক্ষারত লোকজন আর অধর চন্দ্র বিদ্যালয় মাঠে যারা রয়েছেন তাদের একই অপেক্ষা, কখন স্বজনের লাশটি বুঝে পাবো। তাদের চোখে কান্নার দাগ। নতুন করে আর চোখে যেন জল নেই বের হওয়ার মতো। সবারই চোখ মুখ শুকিয়ে গেছে।

উদ্ধার অভিযানের নেতৃত্বে থাকা সেনাবাহিনীর নবম পদাতিক ডিভিশনের অধিনায়ক মেজর জেনারেল চৌধুরী হাসান সারওয়ার্দী জানিয়েছেন, শুক্রবার প্রথম প্রহর থেকে অর্ধশতাধিক মৃতদেহ উদ্ধার করেছেন তারা। সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে ফায়ার সার্ভিস ও রেড ক্রিসেন্টের উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপ থেকে কংক্রিট সরানোর পাশাপাশি লাশের সন্ধান চালিয়ে যাচ্ছেন। উদ্ধার করা লাশগুলো স্বজনদের শনাক্ত করার জন্য নেয়া হচ্ছে সাভারের অধর চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে। সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষিত এক উদ্ধারকর্মী জানান, পেছনের দিকে ধ্বংসস্তূপের ভেতর চাপা পড়া অবস্থায় অনেক লাশ দেখা গেলেও তা অনেক সাবধানে তুলে আনা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে দুমড়ে মুচড়ে যাওয়া মৃতদেহগুলো বিভিন্ন স্থান থেকে কুড়িয়ে আনতে হচ্ছে। তখন উদ্ধারকাজে পরিচালিত ভারী যন্ত্রগুলো বন্ধ করে যথাযথ মর্যাদায় লাশগুলো বের করে আনতে হয়। এ কারণে মূল ভবনের ধ্বংসস্তূপে অনেক সাবধানে কাজ করা হচ্ছে।

সাভার রানা প্লাজায় উদ্ধার কাজের দশম দিনে গতকাল শুক্রবার ধ্বংসস্তূপ থেকে যে মৃতদেহ উদ্ধার করা হচ্ছে এর অধিকাংশই দ্বিখণ্ডিত। উদ্ধারকারীরা জানান, ভবনের যে অংশে উদ্ধার কাজ চলছে সেখানে মানুষের হাড়ের ছড়াছড়ি। হাটতে গিয়ে পায়ে বাধছে শুধু মানুষের চোয়াল। শুধু চোয়ালই নয়- হাটতে গেলে পায়ের নীচে বাধছে মানুষের হাড়।

রেডক্রিসেন্ট উদ্ধারকারী দলের দলনেতা খায়রুল আলম দুলাল জানান, ধ্বংসস্তূপ থেকে লাশ উদ্ধার করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। অনেক স্থানে মানুষের হাড়গোড় ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। তাতে কীট-পতঙ্গ ও মাছিদের ছড়াছড়ি। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে লাশ উদ্ধারের জন্য জায়গা করে নিতে হচ্ছে। এছাড়া এরই মধ্যে কঙ্কালে পরিণত হয়ে গেছে বেশকিছু মৃতদেহ। তিনি আরো বলেন, গত তিন দিনে আমরা কাউকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করতে পারিনি। লাশগুলোতে পোকা ধরে গেছে। সকাল থেকে ওপরে ওঠা-নামার সময় পায়ের নীচে কতো যে হাড় পাওয়া গেছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই। ধসে পড়া ভবনের চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে শুধু মানুষের হাড়। অপর এক উদ্ধারকর্মী জানান, এখনো অসংখ্য হাড়গোড় পাওয়া যাচ্ছে। লাশ পচে যাচ্ছে। কঙ্কাল হয়ে যাচ্ছে বেশিরভাগ লাশ। ভাবা যায় না যে, মানুষের হাড়ের ওপর দিয়ে হাঁটছি। কিন্তু কিছুতো করার নেই। কাজতো করতে হবে। শুধু তাই নয় পাওয়া গেছে মাথার খুলিও। একটা খুলি পাওয়া গেছে ধ্বংসস্তূপের মাঝে। খুলিটি পরে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে আঞ্জুমান মুফিদুলে।

এই পাতার আরো খবর -
font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
বিএনপি বলেছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মেনে নিলে প্রধানমন্ত্রীর আলোচনায় বসার আহ্বানে সাড়া দেবে। দলটির এই সিদ্ধান্ত যৌক্তিক বলে মনে করেন?
8 + 3 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
নভেম্বর - ১
ফজর৫:০৪
যোহর১১:৪৮
আসর৩:৩৫
মাগরিব৫:১৪
এশা৬:৩১
সূর্যোদয় - ৬:২৪সূর্যাস্ত - ০৫:০৯
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :