The Daily Ittefaq
ঢাকা, বুধবার ৭ মে ২০১৪, ২৪ বৈশাখ ১৪২১, ৭ রজব ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ নারায়ণগঞ্জের ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন: সাত দিনের মধ্যে অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ | বিএসএমএমইউ পরিচালকের কক্ষের সামনে ককটেল বিস্ফোরণ, গ্রেফতার ১

গাজীপুরের মানুষ ভোলেনি তাঁকে

আশিস সৈকত

টঙ্গীর স্টেশন রোড থেকে ডানে এগুলে্ই ফ্লাইওভার দিয়ে যানজট এড়িয়ে সিলেট কিংবা বাইপাসের যেকোন রাস্তায় উঠা যায়। ফ্লাইওভারে উঠার পাশেই টঙ্গী নোয়াগাঁও উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠ। এখানে পত পত করে উড়ছে একটি কালো পতাকা। মাঠের একাংশের চারপাশ বাঁশ-বেড়া দিয়ে আটকে রাখা হয়েছে।

এখানেই দশ বছর আগে ২০০৪ সালের ৭ মে সন্ত্রাসীদের গুলিতে লুটিয়ে পড়েছিলেন এ বিদ্যালয়েরই প্রধান শিক্ষক এবং গাজীপুর-২ আসনের জনপ্রিয় সংসদ সদস্য আহসানউল্লাহ মাস্টার। আজো ওই মাঠে শোকের কালো পতাকা উড়ে উড়ে যেন শ্রদ্ধা জানাচ্ছে তাঁর প্রতি। আর পাশ দিয়ে যাওয়া শহীদ আহসানউল্লাহ মাস্টার ফ্লাইওভারটি যানজট থেকে মানুষকে স্বস্তি দিয়ে যেন তাঁর কথাই মানুষকে বার বার মনে করিয়ে দিচ্ছে।

খুবই অল্প সময়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন দল-মতের ঊর্ধ্বে গণমানুষের নেতা। আওয়ামী লীগের রাজনীতি করলেও সব সময় তিনি দাঁড়াতেন সব মানুষের পাশে। সাহস দিতেন অসহায় কিংবা বিপদগ্রস্তদের। তার দরাজ গলায় শোনা যেত সম্ভাবনার কথা। দলীয় রাজনীতির সংকীর্ণতা স্পর্শ করতে পারেনি তাঁকে। ভয় বলে কিছু ছিল না তাঁর জীবনে। সম্ভবত এ কারণেই ঘাতক যখন তাঁদের লক্ষ্য করে মঞ্চের দিকে গুলি ছুঁড়ছিল তখনও তিনি ধমকের সুরে বলছিলেন, 'কাকে গুলি করছিস তোরা'?

তাঁর সঙ্গে শেষ দেখা গাজীপুর পৌরসভা নির্বাচনে। মৃত্যুর কয়েকদিন আগে। মতিঝিলে আওয়ামী লীগের হরতাল কর্মসূচিতে শ্রমিক লীগের মিছিলে নেতৃত্ব দেওয়ার সময় পুলিশের লাঠির আঘাতে হাড়ে ব্যাপক ব্যথা পাওয়ায় তার বিদেশে চেকআপ করতে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু গাজীপুর পৌরসভা নির্বাচন থাকায় তিনি তাঁর যাত্রার তারিখ পিছিয়ে দেন। এর কদিন পরেই আসে ৭ মে। আমি তখন কাজ করি দৈনিক প্রথম আলোতে। সকালে অফিসে আসার পরই খবর পাই আহসানউল্লাহ মাস্টার গুলিবিদ্ধ। মুমূর্ষু অবস্থায় তাঁকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ঢাকার বক্ষব্যাধি হাসপাতালে। ছুটে যাই সেখানে। ডাক্তাররা একনজর দেখেই পাঠিয়ে দেন সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে। গাড়িতে উঠানোর সময় এক নজর দেখলাম, নির্লিপ্ত নয়নে তাকিয়ে রয়েছেন। দেখেই মনে হচ্ছিল আর বোধ হয় ফিরবেন না তিনি। সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে গিয়ে সব শেষ হয়ে যায়।

সন্ত্রাসীদের বুলেটে দশ বছর আগে নিহত হলেও এখনও গাজীপুরের রাজনীতিতে তাঁর প্রভাব ব্যাপক। নিহত আহসানউল্লাহ মাস্টারের জনপ্রিয়তার হিসেব ধরেই এখনও পুরো গাজীপুরের ভোটের হিসেব নিকেশ করা হয়। তাঁর বড় ছেলে জাহিদ আহসান রাসেল এখন বাবার প্রতিনিধিত্ব করছেন গাজীপুরের ভেঙ্গে যাওয়া আসনটিতে। বাবার কারণেই মূলত রাসেল এখনও এলাকার প্রিয় মানুষ। তবে রাসেলের জন্য এখন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে তার বাবাই। মৃত বাবাই এখন যেন তার প্রতিদ্বন্দ্বী। কারণ মানুষ চট করেই তুলনা করে বাবার সঙ্গে পুত্রের। এ এক কঠিন চ্যালেঞ্জ রাসেলের ভবিষ্যত্ রাজনীতির জন্য।

কারণ একটাই। প্রয়াত আহসানউল্লাহ মাস্টার এখনও গাজীপুরের রাজনীতিতে অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। গাজীপুরের সব দলের নেতারাই মনে করেন, গাজীপুরের রাজনীতিতে আহসানউল্লাহ মাস্টারের প্রভাব অনেকদিন থাকবে। বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদের পর এ অঞ্চলে আর বড় মাপের নেতা দেখা যায়নি।

ঘাতকের হাতে নিহত আহসানউল্লাহ মাস্টারের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা ছিল প্রায় আট বছরের। এর আগে তাঁকে চিনলেও সংসদ সদস্য হওয়ার পর পেশাগত কারণেই তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। একই জেলায় বাড়ি হওয়ায় ঘনিষ্ঠতার আরেকটি কারণ ছিল। পর পর সপ্তম এবং অষ্টম সংসদের সদস্য ছিলেন তিনি। মানুষকে আপন করে নেয়ার এক অসাধারণ গুণ ছিল তাঁর। নির্লোভ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মুক্তিযোদ্ধা আহসানউল্লাহ মাস্টার যে স্কুলের মাঠে নিহত হন সে স্কুলেই তিনি কর্মজীবন শুরু করেন। আর মৃত্যুর আগপর্যন্ত তিনি ছিলেন এ স্কুলের প্রধান শিক্ষক। অত্যন্ত সদালাপী আহসানউল্ল¬াহ মাস্টার গাজীপুরের মানুষের কাছে যে কেমন জনপ্রিয় ছিলেন তা তাঁর মৃত্যুর পর গাজীপুরের দৃশ্য দেখেই বোঝা গেছে। তাঁর মৃত্যুতে গোটা গাজীপুরের দৃশ্যপটই যেন পাল্টে গেছে। মুক্তিযুদ্ধের পর গাজীপুরে আর কখনও এ অবস্থা দেখা যায়নি।

আহসানউল্লাহ মাস্টার জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গেছেন, সত্ ত্যাগী রাজনীতিবিদদের মানুষ এখনও হূদয় দিয়ে ভালোবাসে, সম্মান করে। অনেক সংসদ সদস্যের নানা খারাপ কাহিনী শুনতে শুনতে মানুষ যখন অভ্যস্ত, তখন তিনি ছিলেন ব্যতিক্রম। ঢাকাতো দূরের কথা টঙ্গীতেও একটি বাড়ি রেখে যেতে পারেননি তিনি। মৃত্যুর আগপর্যন্ত স্কুলের পাশে একটি ভাড়া বাড়িতে থাকতেন তিনি।

আজ গাজীপুরের প্রিয়জন আহসানউল্লাহ মাস্টারের দশম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানাই। ঘাতকের বুলেট বুকে নিয়ে তিনি চলে গেছেন সমস্ত আলোচনা আর ধরাছোঁয়ার বাইরে। কিন্তু গত দশ বছরেও গাজীপুরের মানুষের কাছে তাঁর স্মৃতি এতোটুক ধূসর হয়নি। আজো তাঁর প্রয়াণের দিনে গোটা গাজীপুরের মানুষ নানা অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানাবে। সন্ত্রাসীদের গুলিতে জীবন দিয়েও তিনি প্রমাণ করে গেছেন, মানুষকে ভালোবাসলে বৃথা যায় না।

লেখক :সাংবাদিক

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
নারায়ণগঞ্জে ৭ খুনের ঘটনায় র্যাবের মহাপরিচালক মোখলেছুর রহমান বলেছেন, 'র্যাবের কেউ জড়িত থাকলে তাকে রক্ষার চেষ্টা করব না, বিভাগীয় সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেয়া হবে।' তিনি কি এ প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারবেন?
8 + 9 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
নভেম্বর - ৬
ফজর৫:০৭
যোহর১১:৫০
আসর৩:৩৬
মাগরিব৫:১৫
এশা৬:৩২
সূর্যোদয় - ৬:২৭সূর্যাস্ত - ০৫:১০
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :