The Daily Ittefaq
ঢাকা, বুধবার ১৪ মে ২০১৪, ৩১ বৈশাখ ১৪২১, ১৪ রজব ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ নূর হোসেনের অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোকের নির্দেশ | হুমকি মোকাবেলায় প্রস্তুত থাকতে হবে : প্রধানমন্ত্রী | দিনাজপুরে খোলাহাটি সেনানিবাসে প্রশিক্ষণে বিস্ফোরণ, ৮ সেনা আহত

তক্ষশীলার গল্প

খন্দকার মাহমুদুল হাসান

আজ থেকে কমপক্ষে দু'হাজার ছ'শো বছর আগের কথা। ভারতীয় উপমহাদেশে তখন ছিল ষোলটি নামকরা রাজ্য। এই স্বাধীন রাজ্যগুলোকে এক সাথে বোঝার সুবিধের জন্যে বলা হয় ষোড়শ মহাজনপদ। এই জনপদগুলোতে যেসব প্রাচীন নগরী গড়ে উঠেছিল সেগুলোর মধ্যে একটির নাম ছিল তক্ষশীলা। তবে শুধু উপমহাদেশে কেন, সারা দুনিয়ারই সবচেয়ে নামকরা প্রাচীন নগরীগুলোর তালিকা করলেও তাতে তক্ষশীলার নামও উঠবে। প্রাচীন পৃথিবীর সেই বিখ্যাত শহরের গল্পই শোনাব এখন। তবে তার আগে চুপিচুপি একটা কথা বলে রাখি, ষোড়শ মহাজনপদ গড়ে ওঠার আগে থেকেই তক্ষশীলার নামডাক ছড়িয়ে পড়েছিল বলেও মনে করা হয়। জায়গাটার অবস্থান ছিল উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিম দিকে। বর্তমান পাকিস্তানের রাওয়াল পিন্ডির ১৬ কিলোমিটার দূরে এই জায়গাটা।

প্রাচীন পৃথিবীর খুব নামকরা সাম্রাজ্যগুলোর একটি ছিল পারস্য সাম্রাজ্য। সারা দুনিয়া তখন কাঁপতো ওই সাম্রাজ্যের নাম শুনে। সেই সাম্রাজ্যের খুব নামকরা এক সম্রাটের নাম ছিল সাইরাস। তিনি ছিলেন বিখ্যাত আকিমেনীয় বংশের প্রথম সম্রাট। খ্রিস্টপূর্ব ৫৫৮ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ৫৩০ অব্দের মধ্যবর্তীকালে রাজ্য চারদিকে অনেক বাড়িয়েছিলেন তিনি। তখন প্রাচীন ভারতের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে আক্রমণ চালান তিনি। সিন্ধু নদের অনেক কাছাকাছি পর্যন্ত তাঁর সাম্রাজ্য প্রসারিত হয়েছিল। পরে সম্রাট দারিউস (রাজত্বকাল: খ্রিস্টপূর্ব ৫২২ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ৪৮৬ অব্দ) গান্ধার ও তক্ষশীলা পর্যন্ত তার রাজ্য প্রসারিত করেছিলেন। এই সম্রাটের সাম্রাজ্যে ২০টি ছিল প্রদেশ। এর মধ্যে একটি ছিল ভারতীয় উপমহাদেশে। সেই ভারতীয় প্রদেশটির রাজধানী ছিল তক্ষশীলায়। তার মানে আড়াই হাজার বছর আগেই তক্ষশীলা ছিল একটি রাজধানী শহর। আর এই ভারতীয় প্রদেশটি থেকেই আসত সবচেয়ে বেশি রাজস্ব। সেই রাজস্বের পরিমাণ ছিল পুরো সাম্রাজ্যের আদায় করা রাজস্বের তিন ভাগের এক ভাগ। কাজেই তক্ষশীলা আর এই শহর কেন্দ্রিক রাজ্যটি যে কত সম্পদশালী ছিল তা তো বুঝতেই পারছ।

মহাবীর আলেকজান্ডার খ্রিস্টপূর্ব ৩২৭ অব্দে পারস্যের পূর্বভাগ জয়ের পর ভারতের পশ্চিমভাগের দিকে রওনা দেন। তিনি তার পরের বছর অর্থাত্ খ্রিস্টপূর্ব ৩২৬ অব্দের জুলাই মাসের শেষ দিকে বিপাশা নদীর তীর পর্যন্ত পৌঁছে যান। আলেকজান্ডারের এই অভিযানে কেউ কেউ তাঁর সাথে যুদ্ধ করে পরাজিত হয়েছিল আবার কেউ কেউ বিনাযুদ্ধেই বশ্যতা স্বীকার করেছিল। তক্ষশীলায় তখন রাজত্ব করছিলেন রাজা অম্ভি। তিনি আলেকজান্ডারের শক্তি-ক্ষমতার কথা ভালোভাবেই জেনেছিলেন। তাই তাঁর সাথে যুদ্ধের ঝুঁকি তিনি নেননি। তিনি বিনাযুদ্ধেই বশ্যতা স্বীকার করে নিয়েছিলেন। শুধু তাই নয় আলেকজান্ডারকে তিনি সন্তুষ্ট করার চেষ্টাও করেছিলেন উপহার দিয়ে। সেই উপহারের মধ্যে ছিল পঁয়ষট্টিটি হাতি, তিন হাজার ষাঁড় ও বিপুলসংখ্যক উন্নত জাতের ভেড়া। এই আনুগত্য ও আন্তরিকতার মূল্য দিয়েছিলেন আলেকজান্ডার। পুষ্কলাবতী রাজ্য জয়ের পর রাজা অম্ভির প্রিয়জন সঞ্জয়কে রাজ্যটি উপহার হিসেবে দিয়ে দেন তিনি।

শিক্ষা-দীক্ষা ও ব্যবসা-বাণিজ্যের দিক দিয়ে তক্ষশীলা ছিল খুবই বিখ্যাত শহর। এখানে ছিল একটি খুবই নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়। যদিও শহরটা গড়ে উঠেছিল বৌদ্ধযুগের আগেই, কিন্তু বৌদ্ধযুগের শুরুতেও এই শহরের বিশ্ববিদ্যালয়ের নামডাক ছিল। শত শত বছর ধরে পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষ এখানে আসত লেখাপড়া শিখে পন্ডিত হয়ে উঠতে। বহু দূর দেশের বণিকরাও এখানে আসত ব্যবসা-বাণিজ্য করতে। যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে সম্ভব হয়েছিল এসব। এখান থেকে কাশ্মীর বেশ কাছেই। আর কাশ্মীর হয়ে যাওয়া যেতো মধ্য এশিয়ায়। তাই নিকটবর্তী আফগানিস্তান বা দূরবর্তী মধ্য এশিয়া থেকেও ছাত্ররা এসে তক্ষশীলার বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মশাস্ত্র ছাড়াও চিকিত্সা বিজ্ঞান, দর্শন শাস্ত্র ও যুদ্ধ বিদ্যার মতো জ্ঞানের নানান শাখায় পান্ডিত্য অর্জন করতো। কোশল রাজ্যের অধিপতি প্রসেনজিতও পড়াশোনা করেছিলেন এই বিশ্ববিদ্যালয়েই। আর মধ্য এশিয়ার দেশগুলো, কিংবা আফগানিস্তান বা চীন থেকে যারা বাণিজ্যের কাজে আসত তাদের অনেকেই সিন্ধু নদ ধরে নৌপথে চলে যেত আরব সাগর বা পারস্য সাগরে। এসব কারণেই জাতকের কাহিনীসহ বহু প্রাচীন বিবরণেই তক্ষশীলার কথা ঘুরে-ফিরে এসেছে। তাই প্রত্নতত্ত্ববীদ পন্ডিতরা গত একশো বছর ধরে বার বার এখানে চালিয়েছেন খনন কাজ, মানে মাটি খুঁড়ে দেখার চেষ্টা করেছেন কী কী প্রাচীন নিদর্শন খুঁজে পাওয়া যায়। পাওয়াও গেছে অনেক কিছু। আর যাবে না'ই বা কেন, এই উপমহাদেশের প্রাচীন শহরগুলোর মধ্যে তক্ষশীলার মতো এত ব্যাপকভাবে খোঁড়াখুঁড়ির কাজ আর কোথাও তো হয়নি। এখানে ১৯১৩ ও ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দে মার্শাল, ১৯৪৪-১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে হুইলার ও ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে এসএম শরিফের মতো নামকরা পন্ডিতরা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন খনন কাজের। এখানে পাওয়া গেছে দালান- কোঠার ধ্বংসাবশেষ, প্রাচীন মূর্তি, মুদ্রা, সিলমোহর, অলঙ্কার, অস্ত্রপাতি, বাসন-কোসন প্রভৃতি। দালান-কোঠার মধ্যে ছিল একাধিক বৌদ্ধবিহার, স্তূপ, প্রাসাদ, মন্দির প্রভৃতি।

পাওয়া গেছে বোধিসত্ত্বের মূর্তি খোদিত পাথর, সোনা, রূপা, পাথরের ভস্মাধার, পোড়ামাটি ও চুনবালির তৈরি মস্তক মূর্তি, চিত্র খোদাই করা পাথরের ফলক, পোড়ামাটির বুদ্ধমূর্তি, পাথরে তৈরি গুপ্তযুগের সিলমোহর, মাটির তৈরি সিলমোহর। প্রাচীন মুদ্রার মধ্যে পাওয়া গেছে সাসানীয় বংশের রাজা দ্বিতীয় সাপুরের (৩০৯ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ৩৭৯ খ্রিস্টাব্দ) ১৫টি তাম্রমুদ্রা ও শেষ কুষাণযুগের ৫টি স্বর্ণমুদ্রা। এখান থেকে প্রাপ্ত কুষাণ আমলের রাজা হুবিস্ক ও বাসুদেবের মুদ্রাগুলো বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো। এসব নিদর্শন থেকে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, হাজার হাজার বছর আগে থেকেই তক্ষশীলা খুব গুরুত্বপূর্ণ জায়গা ছিল। আজও তক্ষশীলা জায়গাটা আছে। আজও জায়গাটা টানে দেশ-বিদেশের মানুষকে। কারণ ওখানটায় গেলে মানুষ পায় প্রাচীন পৃথিবীর ঘ্রাণ। ইতিহাসের সৌরভ।

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
নারায়ণগঞ্জে ৭ খুনের ঘটনা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, 'জড়িতদের অবশ্যই খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।' আপনি কি মনে করেন প্রধানমন্ত্রীর এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হবে?
8 + 8 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
জুন - ১৯
ফজর৩:৪৪
যোহর১২:০০
আসর৪:৪০
মাগরিব৬:৫১
এশা৮:১৬
সূর্যোদয় - ৫:১২সূর্যাস্ত - ০৬:৪৬
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :