The Daily Ittefaq
ঢাকা, বুধবার, ২২ মে ২০১৩, ৮ জৈষ্ঠ্য ১৪২০, ১১ রজব ১৪৩৪
সর্বশেষ সংবাদ অবশেষে আটক ১২ বাম নেতা-কর্মীকে ছেড়ে দিল পুলিশ | জয়পুরহাটে বিজিবির গুলিতে দুইজন নিহত | রাজশাহীতে যুবলীগ নেতাকে গুলি করে হত্যা | আশুলিয়ার ৫ পোশাক কারখানা বন্ধ ঘোষণা | কিশোরগঞ্জ উপনির্বাচন ৩ জুলাই, গাজীপুর সিটি নির্বচন ৬ জুলাই | মানবতাবিরোধী অপরাধ: কায়সারের জামিন আবেদন নাকচ | সরকারি করা হলো ৮ কলেজ | মাহমুদুরের মা ও সংগ্রাম সম্পাদকের মামলার কার্যক্রম স্থগিত করেছে হাইকোর্ট | আটকে গেল দুই ডিসিসির নির্বাচন | রাজধানীতে 'বন্দুকযুদ্ধে' নিহত ২ | সাভার ভবন ধস: ১২১ পরিবারকে প্রধানমন্ত্রীর আর্থিক সহায়তা প্রধান | ৫ পোশাক মালিক ও রানাকে যাবজ্জীবন সাজার সুপারিশ তদন্ত কমিটির

পোশাকখাত :অমানবিক কর্মপরিবেশ ও শ্রম-শোষণ

আবু তাহের খান

এখন আর এটি তথ্য প্রমাণ দিয়ে বলার অপেক্ষা রাখে না যে, তৈরি পোশাক কারখানায় অহরহ আগুন লাগা বা যখন-তখন তা ধসে পড়াটা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটি খুবই মামুলি ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে । আর এ ধরনের ঘটনা ঘটলে পরক্ষণেই সেটিকে মহলবিশেষের ষড়যন্ত্র বা বিদেশি ইন্ধনে এ দেশের পোশাকশিল্পকে ধ্বংসের পাঁয়তারা বলে চালিয়ে দেয়াটাও এখন খুবই প্রচলিত রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। আর এসব প্রতারণামূলক বক্তব্যের মাধ্যমে এ খাতে বিরাজমান মূল সমস্যাকেই শুধু আড়াল করার চেষ্টা হচ্ছে না, একই সঙ্গে এ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্দেশ্যমূলক বিভ্রান্তিও সৃষ্টি করা হচ্ছে, যাতে করে সে বিভ্রান্তির ছায়ায় পোশাক-শ্রমিকদের ভেতরকার ক্ষোভ ও অসন্তোষসমূহ সংগঠিত প্রতিবাদের রূপ ধারণ করতে না পারে। তদুপরি এসব ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত (আসলে যা হত্যা বা আঘাত) শ্রমিকদেরকে উপহাসমূলকভাবে এক-দু'লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণদানের বিষয়টিকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যেন, ঐসব জীবনের পুরো মূল্যটাই তারা পরিশোধ করে দিয়েছেন এবং সে জন্যে ঐ শ্রমিক পরিবারগুলো যেন বাদবাকি জীবনজুড়ে পোশাক কারখানার ঐ মালিকদের কাছে কৃতজ্ঞ থাকে ! এ ধরনের তথাকথিত ক্ষতিপূরণের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট শ্রমিক বা তাদের পরিবারগুলো নিজেদেরকে যে খুবই অপমানিত বোধ করেন, তা মোটেও বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু পেটের দায়ে ঐ অপমান তারা সয়ে যেতে বাধ্য হন বৈকি !

পূর্বের ঘটনার কথা বাদ দিই। ২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর তাজরিন ফ্যাশনে আগুন লেগে ১১২ জন (মতান্তরে ১১৫ জন) শ্রমিক মারা যাওয়ার পর গত ২৪ এপ্রিল রানা প্লাজা ধসের মাঝখানে সময়ের ব্যবধান মাত্র ৫ মাস। আর রানা প্লাজার ধ্বংসস্তূপ থেকে মরদেহ উদ্ধারের কাজ শেষ হওয়ার আগেই এর ১৫তম দিবসে গত ৮মে আবার আগুন লাগলো তুং হাই সোয়েটার কারখানায়। সর্বশেষ ঘটনায় কারখানার মালিক ও সহযোগীরা মারা গেলেও আগের প্রতিটি ঘটনাতেই হত্যার শিকার হয়েছেন অসহায় দরিদ্র শ্রমিকেরা, যার সিংহভাগই হচ্ছেন নারী, এই বৈষম্যপীড়িত সমাজে যারা অবহেলিত ও অসহায়দের মধ্যেও আবার অধিক অবহেলা ও অসহায়ত্বের শিকার। এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্য ও তাদের আত্মীয়-স্বজনরাই শুধু নন, দেশের সাধারণ মানুষও এতে ব্যাপকভাবে ব্যথিত ও ক্ষুব্ধ হয়েছেন। সাধারণ মানুষের এ হূদয় নিঙরানো ব্যথা ও ক্ষোভের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখে বলি, কেন যেন মনে হয় নিহত এই শ্রমিকদের সিংহভাগ যদি নারী না হতেন, তাহলে ব্যথার কথা জানিনা, তবে ক্ষোভের মাত্রাটা বোধকরি আরো অনেক অনেক বেশি হতো। এতো সব নির্মম হত্যাকাণ্ডের পরও মানুষের ধূমায়িত ক্ষোভ যে শেষতক শোষক মালিকের লালসাকে পরাভূত করবার মতো প্রতিবাদের রূপ পরিগ্রহ করতে পারেনি বা করেনি, সে আসলে নিহতরা নারী বলেই। এ সমাজে নারী এখনো সেবার আধার ও ত্যাগের উপকরণ মাত্র।

পোশাক কারখানায় আগুন লাগলে বা তা ধসে পড়লে এবং শ্রমিকরা এর প্রতিবাদ করলে মালিকরা বলার চেষ্টা করেন যে, এতে করে বিদেশিদের কাছে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় এবং এর ফলে বৈদেশিক বিনিয়োগ ও পোশাক রফতানি দুই-ই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এই প্রেক্ষিতে পোশাকশিল্পের মালিকদেরকে জিজ্ঞেস করি, আপনাদের কর্মের 'প্রশংসায়' দারুণভাবে 'মুগ্ধ' হয়ে ক্যাথলিক ধর্মগুরু পোপ ফ্রান্সিস যখন বাংলাদেশের তৈরি পোশাকখাতে নিয়োজিত শ্রমিকদের জীবনকে ক্রীতদাসের সঙ্গে তুলনা করে অতি স্বাভাবিক মানবিক ক্ষোভটুকু প্রকাশ করেন, তখন বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি কোথায় যেয়ে ঠেকে ?

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকখাতে শ্রমিকদের ক্রীতদাসসম জীবনের জন্য মালিকদের পাশাপাশি এর পশ্চিমা আমদানিকারকরাও কিন্তু এর দায় এড়াতে পারেন না। পোশাকখাতের অস্বাস্থ্যকর ও অমানবিক পরিবেশের কারণে বাংলাদেশকে জিএসপি সুবিধাদানের ব্যাপারে নৈতিক অবস্থান থেকে যুক্তরাষ্ট্র সরকারিভাবে যতো কড়াকড়ি আরোপের চেষ্টাই করুক না কেন, সে দেশের বৃহত্ ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে পোশাক আমদানি এতোটুকুও কমাবে বলে মনে হয় না (আমরা তা চাইও না)। কারণ পুঁজির ধর্মই হচ্ছে নিরন্তর মুনাফা। ফলে বাংলাদেশের পোশাক-শ্রমিককে ক্রীতাদাস বানিয়ে হলেও তাদের যদি মুনাফা বাড়ে তাহলে নীতি-নৈতিকতা ও রাষ্ট্রীয় বিধিবিধানের কারণে মুখে যদি ভালো কথা বলতে হয়তো সেটি তারা বলবে বৈকি !

পোশাক কারখানায় আগুন লাগলে বা তা ধসে পড়লে কিংবা সেখানে কোন দুর্ঘটনা ঘটলে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য তাত্ক্ষণিকভাবে কারখানার মালিকরা যেসব অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন সে সবের মধ্যে রয়েছে : ১) সংশ্লিষ্ট মালিক কর্তৃক এককালীন কিছু অর্থ সাহায্য প্রদান ; ২) বিজিএমইএ কর্তৃক আরো কিছু অর্থ সাহায্য ঘোষণা ; ৩) বিজিএমইএ কর্তৃক সংশ্লিষ্ট কারখানার সদস্যপদ স্থগিতকরণ ; ৪) ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের জন্য পোশাক কারখানায় চাকরির ব্যবস্থাকরণ ; ৫) ভবিষ্যতে শ্রমিকদের বেতনভাতা ও ওভারটাইম ভাতা সময়মতো পরিশোধ করা ইত্যাদি। তাদের এসব প্রতিশ্রুতির অধিকাংশই হচ্ছে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য সাময়িক কৌশল মাত্র, যেগুলোর বেশির ভাগই শেষ পর্যন্ত আর বাস্তবায়িত হয় না। প্রকৃতপক্ষে এসব প্রতিশ্রুতি তারা বাস্তবায়নের সত্ উদ্দেশ্য নিয়ে যেমনি দেন না, তেমনি শ্রমিক বা সাধারণ মানুষও তাদের এসব প্রতিশ্রুতিকে বিশ্বাস করেন না ; এবং এটাই হচ্ছে বাংলাদেশের পোশাকখাতের চলমান নির্মম বাস্তবতা।

রানা প্লাজার ঘটনার পর ইতিমধ্যে শিল্পাঞ্চল পুলিশ ও কারখানা পরিদপ্তর কর্তৃক ঝুঁকিপূর্ণ পোশাক কারখানা চিহ্নিতকরণের একটি সাময়িক ও সীমিত উদ্যোগ নেয়া হলেও এ ব্যাপারে বিজিএমইএ তার সদস্যগণ কর্তৃক কী উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বা আদৌ নেয়া হয়েছে কিনা, সে বিষয়ে জনসমক্ষে কোন তথ্য নেই। তবে অভিজ্ঞতা থেকে ধারণা করা চলে যে, অধিকাংশ পোশাক কারখানার মালিকই শেষ পর্যন্ত এ ব্যাপারে তেমন কিছুই করবে না। সাময়িকভাবে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার লক্ষ্যে নিছক প্রচারণার জন্য কিছু কিছু মৌখিক আশ্বাস হয়তো বিজিএমইএ দেবে ; কিন্তু একান্ত বাধ্য না হওয়া পর্যন্ত সেগুলো কোনদিনই তারা বাস্তবায়ন করবে না। অতএব এ ক্ষেত্রে অগ্রগতি যদি কিছু অর্জন করতেই হয় তাহলে সরকারকেই উদ্যোগ নিতে হবে এ ব্যাপারে কিছু করতে তাদেরকে বাধ্য করার জন্য। তবে বলার অপেক্ষা রাখে না যে, কার্যক্ষেত্রে সে বাধ্যবাধকতা আরোপের প্রথম পূর্বশর্ত হচ্ছে যূথবদ্ধতাসম্পন্ন দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার।

সাধারণভাবে আমরা বলছি যে, এই মুহূর্তে আমাদের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম সম্ভাবনাময় চালিকাশক্তি হচ্ছে আমাদের তরুণ প্রজন্ম। তো, এটা মনে করার কোনই কারণ নেই যে, এই তরুণ প্রজন্ম বলতে আমরা শুধু তথ্য প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন তরুণদেরকেই বুঝবো বা আমাদের পোশাক শ্রমিকদেরকে এর বাইরে রাখবো। বস্তুত, আমাদের এই তরুণ পোশাক শ্রমিকরাও অন্যান্য সব খাত ও শ্রেণির তরুণদের মতোই অসীম সম্ভাবনাময়। ফলে দেশ ও অর্থনীতির বৃহত্তর স্বার্থেই এদেরকেও ক্রীতদাসের মতো নয়- মানুষের মতোই বাঁচতে দিতে হবে। কিন্তু পোশাক কারখানার মালিকরা কি তা করবেন ? বিশ্বাস করা কঠিন। মানুষের ওপর বিশ্বাস হারানোকে রবীন্দ্রনাথ পাপ হিসাবে দেখেছেন। আমরাও সে পাপ থেকে যতোটা সম্ভব মুক্ত থাকতে চাই বৈকি ! কিন্তু বাংলাদেশের পোশাক কারখানার ওই রক্তচোষা মালিকরা কি আমাদেরকে তা থাকতে দেবেন ?

 লেখক : পরিচালক, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন

[email protected]

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
ড. আকবর আলি খান বলেছেন, সংসদ নির্বাচন পদ্ধতি নির্ধারণে গণভোট হতে পারে। তার এই বক্তব্য আপনি কি সমর্থন করেন?
2 + 7 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
আগষ্ট - ২৫
ফজর৪:১৯
যোহর১২:০১
আসর৪:৩৪
মাগরিব৬:২৭
এশা৭:৪২
সূর্যোদয় - ৫:৩৮সূর্যাস্ত - ০৬:২২
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :