The Daily Ittefaq
ঢাকা, বুধবার, ২২ মে ২০১৩, ৮ জৈষ্ঠ্য ১৪২০, ১১ রজব ১৪৩৪
সর্বশেষ সংবাদ অবশেষে আটক ১২ বাম নেতা-কর্মীকে ছেড়ে দিল পুলিশ | জয়পুরহাটে বিজিবির গুলিতে দুইজন নিহত | রাজশাহীতে যুবলীগ নেতাকে গুলি করে হত্যা | আশুলিয়ার ৫ পোশাক কারখানা বন্ধ ঘোষণা | কিশোরগঞ্জ উপনির্বাচন ৩ জুলাই, গাজীপুর সিটি নির্বচন ৬ জুলাই | মানবতাবিরোধী অপরাধ: কায়সারের জামিন আবেদন নাকচ | সরকারি করা হলো ৮ কলেজ | মাহমুদুরের মা ও সংগ্রাম সম্পাদকের মামলার কার্যক্রম স্থগিত করেছে হাইকোর্ট | আটকে গেল দুই ডিসিসির নির্বাচন | রাজধানীতে 'বন্দুকযুদ্ধে' নিহত ২ | সাভার ভবন ধস: ১২১ পরিবারকে প্রধানমন্ত্রীর আর্থিক সহায়তা প্রধান | ৫ পোশাক মালিক ও রানাকে যাবজ্জীবন সাজার সুপারিশ তদন্ত কমিটির

জয়বাংলার কবি কাজী নজরুল ইসলাম

মিয়াজান কবীর

ক্লাস ওয়ান/ একের সমান/ ধাক্কা দিলে যায় বর্ধমান/ টিক্কি ধইরা টাইনা আন'— লোকছড়ায় শৈশবে শোনা 'বর্ধমান' পশ্চিমবঙ্গের একটি জেলার নাম। এই বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার 'চুরুলিয়া' গ্রামে ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দের ২৪ মে জন্মগ্রহণ করেন আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর বাবার নাম কাজী ফকির আহমদ ও মায়ের নাম জাহেদা খাতুন। ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে ২০ মার্চ বাবার মৃত্যুতে পরিবারে নেমে আসে চরম দুঃখ-দুর্দশা। ফলে ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে গ্রামের মক্তব থেকে নিম্ন প্রাথমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার পর আর্থিক অনটনের দরুন নজরুলের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। তাই নিরুপায় হয়ে সাংসারিক ব্যয়ভার বহনের জন্যে অর্থ উপার্জনের পথ খুঁজতে থাকেন নজরুল। যে স্কুলের তিনি ছাত্র ছিলেন সেই স্কুলে ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে যোগদান করেন একজন বালক শিক্ষকরূপে। এছাড়াও বালক নজরুল মসজিদের ইমামতি, মাজারে খাদেমগিরি করে নির্বাহ করেন জীবন-জীবিকা। আর কাজের ফাঁকে ফাঁকে বাংলা, আরবী, ফারসী তালিম নেন চাচা কাজী বজলে করীমের কাছে। আবার মাঝে মাঝে দু'-একটি কবিতা লিখে চাচাকে দেখাতেন নজরুল। কাজী বজলে করীম ছিলেন একজন কবি। নজরুলের লেখা কবিতা পড়ে বজলে করীম মনে মনে খুশি হন। তিনি নজরুলকে কবিতা লিখতে উত্সাহ দিতে থাকেন। নজরুল চাচার উত্সাহ পেয়ে কবিতা লেখায় আগ্রহী হয়ে ওঠেন।

নজরুল ছিলেন শিক্ষানুরাগী। লেখাপড়ার জন্য তাঁর মন ব্যাকুল হয়ে ওঠে। তিনি ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে সিয়ারসোল রাজ হাই স্কুলে ভর্তি হয়ে লেখাপড়া করতে থাকেন। কিন্তু সাংসারিক অভাব-অনটনের জন্য লেখাপড়া ছেড়ে যোগদান করেন নিমসা গ্রামের লেটোদলে। নিজে ছড়াগান লিখে সুর দিয়ে গাইতে লাগলেন আসরে আসরে। গাইতে লাগলেন 'চাষীর সঙ' 'রাজপুত্র', 'শকুনী বধ' কাব্য পালা। আসরের উপস্থিত দর্শক-শ্রোতা মুগ্ধ হন নজরুলের দরাজ কণ্ঠে গান শুনে। নজরুল তাঁর প্রতিভাবলে লেটোদলে 'ক্ষুদে ওস্তাদজী' হিসেবে সুপরিচিতি লাভ করেন। জনৈক এক রেলওয়ের গার্ড নজরুলের গান শুনে বিমোহিত হন। ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে ঐ গার্ড নিজ বাড়িতে নজরুলকে খানসামার চাকরি দেন। কিছুদিন সেখানে কাজ করার পর নজরুল আসানসোলের এম. বকশের রুটির দোকানে এক টাকার বেতনে 'বয়গিরি' কাজে নিয়োজিত হন। এই সময় বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশাল থানার কাজীর শিমলা গ্রামের পুলিশ সাব-ইন্সপেক্টর কাজী রফিজউল্লাহর সঙ্গে নজরুলের পরিচয় হয়। সুন্দর আচার-আচরণে নজরুল তাঁর স্নেহধন্য লাভ করতে সক্ষম হন। ১৯১৪ সালে কাজী রফিজউল্লাহ নিজ বাড়িতে নিয়ে এসে সপ্তম শ্রেণীতে ভর্তি করে দেন দরিরামপুর হাই স্কুলে। দরিরামপুর থেকে চলে এসে ভর্তি হন বর্ধমানের সিয়ারসোল রাজ হাই স্কুলে। নজরুল মেধাবী ছাত্র হিসেবে সাত টাকা বৃত্তি লাভ করেন। এই স্কুলে দশম শ্রেণীতে টেস্ট পরীক্ষা দেবার পরেই সেনাবাহিনীর ৪৯নং বাঙালি পল্টনে যোগদান করে তিনি করাচি চলে যান। সেনাবাহিনীতে কর্মরত অবস্থায় ১৯২৯ সালে মে সংখ্যায় 'সওগাত' পত্রিকায় 'বাউন্ডেলের আত্মকাহিনী' প্রকাশের মাধ্যমে লেখকরূপে নজরুলের আত্মপ্রকাশ ঘটে। নজরুলের লেখা 'মুক্তি' নামে প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয় ১৩২৬ সালের শ্রাবণ সংখ্যায় 'বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য' পত্রিকায়।

১৯২০ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে বাঙালি পল্টন বিলুপ্ত হয়ে যায়। ফলে নজরুল করাচি থেকে কলকাতায় ফিরে আসেন। কলকাতায় এসে 'বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি'র অফিসে কমরেড মুজফফর আহমদ-এর সঙ্গে বসবাস করতে থাকেন। এই সময় দু'বন্ধু মিলে সম্পাদনা করেন সান্ধ্য দৈনিক 'নবযুগ' পত্রিকা।

১৯২২ সালে ৬ জানুয়ারি সংখ্যায় 'বিজলি' পত্রিকায় নজরুলের 'বিদ্রোহী' কবিতা প্রকাশিত হলে সারা ভারতবর্ষে তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর স্বাধীন মতামত প্রকাশের জন্যে এই বছরের ১২ আগস্ট তিনি সম্পাদনা করেন 'ধূমকেতু' নামে একটি অর্ধ সাপ্তাহিক পত্রিকা। ২৬ সেপ্টেম্বর 'ধূমকেতু' পত্রিকায় নজরুলের লেখা 'আনন্দময়ীর আগমনে' শীর্ষক কবিতাটি প্রকাশিত হয়। ফলে ব্রিটিশ সরকার রাজদ্রোহের দায়ে নজরুলকে গ্রেফতার করে। ১৯২৩ সালে রাজদ্রোহীর মামলার আত্মপক্ষ সমর্থন করে নজরুলের কালজয়ী এক অনবদ্য বক্তব্য 'রাজবন্দীর জবানবন্দী' শিরোনামে প্রকাশিত হয় 'ধূমকেতু' পত্রিকায়। চীফ ম্যাজিস্ট্রেট কবি সুহান-হো-র কোর্টে এক বছর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন নজরুল। কবি জেলের অভ্যন্তরে বসে লিখলেন অনবদ্য এক কাব্যগ্রন্থ 'দোলনচাঁপা'। ১৫ ডিসেম্বর নজরুল কারামুক্তি লাভ করেন। কারামুক্তির পর তিনি ১৯২৪ সালের ২৪ এপ্রিল মানিকগঞ্জের 'তেওতা' গ্রামের চাঁপাকান্তি ষোড়শী কন্যা আশালতা সেনগুপ্তা ওরফে দোলন দেবী দুলির সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। নজরুল ভালবেসে আশালতা সেনগুপ্তার নাম রেখেছিলেন 'প্রমীলা'। নজরুল দাম্পত্য জীবনে ছিলেন আজাদ কামাল (কৃষ্ণ মুহাম্মদ), বুলবুল সব্যসাচী, সানি ও অনিরুদ্ধ নিনি এই চার পুত্র সন্তানের জনক।

নজরুল সাহিত্যে, রাজনীতিতে, মননশীলতায়, সংগ্রামী চেতনায় জাতির জীবনে বয়ে এনেছেন মুক্তির দিশা। জাতিসত্তা বিকাশে নজরুলের অবদান অনন্য। তাই জাতির পক্ষ থেকে ১৯২৯ সালের ১৫ ডিসেম্বর অ্যালবার্ট হলে নজরুলকে এক সংবর্ধনা দেয়া হয়। এই অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, প্রধান অতিথির আসন অলংকৃত করেন নেতাজী সুভাস চন্দ্র বসু, অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতি ছিলেন এস. ওয়াজেদ আলী।

১৯৪২ সালের ৯ জুলাই কলকাতা বেতারে ছোটদের আসরে গল্প বলতে বলতে কবির জিহ্বা আড়ষ্ট হয়ে পড়ে। তারপর ধীরে-ধীরে বাকশক্তি লোপ পায়। সত্যি একদিন চিরতরে কবির বাঁশী স্তব্ধ হয়ে যায়। কবি চির নির্বাক হয়ে পড়েন।

১৯৭২ সালের ২৪ মে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে কবি নজরুলকে কলকাতা থেকে ঢাকায় আনা হয়। পরদিন বিপুল উত্সাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে পালন করা হয় কবির ৭৪তম জন্ম-জয়ন্তী। সেই সঙ্গে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক কবিকে প্রদান করা হয় বাংলাদেশের নাগরিকত্ব। সেদিন জাতির পক্ষ থেকে কবি নজরুলের সামগ্রিক অবদানকে স্বীকৃতি প্রদান করে বঙ্গবন্ধু দ্ব্যর্থ কণ্ঠে বলেছিলেন: 'নজরুল বাংলার বিদ্রোহী আত্মা ও বাঙালির স্বাধীন ঐতিহাসিক সত্তার রূপকার।' ১৯৭৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতি স্বরূপ নজরুলকে একুশের পদকে ভূষিত করা হয়।

বঙ্গবন্ধু ছাত্রজীবন থেকে রাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। তিনি এই সোনার বাংলায় বেড়ে উঠেছেন একজন খাঁটি বাঙালির জীবনধারায়। দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়িত করার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু কবি নজরুলের 'জয়বাংলা' শব্দমালা ধারণ করেন মনের মণিকোঠায়। পরবর্তী সময় বিভিন্ন সভা-সমাবেশে 'জয়বাংলা' শ্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে বাংলার আকাশ-বাতাস। থর থর করে কেঁপে ওঠে পাকিস্তানি স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠীর ভিত!

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে 'জয় ধ্বনি' হিসেবে 'জয়বাংলা সমস্বরে উচ্চারিত হয় রণাঙ্গনে। 'জয়বাংলা' শব্দমালা প্রতিটি মুিক্তকামী মানুষের যুগিয়েছে শক্তি সাহস-উদ্দীপনা। 'জয়বাংলা' শব্দটি প্রথম প্রয়োগ আমরা দেখতে পাই 'কাজী নজরুল ইসলামের 'ভাঙ্গার গান কাব্যগ্রন্থের পূর্ণ অভিনন্দন' শীর্ষক একটি কবিতায়। এই কবিতাটি কাজী নজরুল ইসলাম মাদারীপুরের ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামী নেতা পূর্ণচন্দ্রের জেলখানা থেকে মুক্তি উপলক্ষে তাঁকে অভিনন্দন জানিয়ে রচনা করেন। কবিতাটির একটি অংশে কবি লেখেন:

'জয় বাঙলার পূর্ণচন্দ্র, জয় জয় আদি অন্তরীণ,

জয় যুগে যুগে আসা সেনাপতি, জয় প্রাণ অন্তহীন'।

কবি নজরুল ছিলেন বিদ্রোহী কবি,সাম্যের কবি, মানবতার কবি, দোলনচাঁপার কবি, ঝিঙ্গে ফুলের কবি, মুক্তিযুদ্ধের কবি। আবার অনেকে নজরুলকে 'জয় বাংলা'র কবি বলেও অভিহিত করে থাকেন। আগামী ১১ জ্যৈষ্ঠ কবি নজরুলের জন্ম-জয়ন্তী। কবির এই শুভ জন্ম-জয়ন্তী উপলক্ষে 'জয় বাংলা'র জয়ধ্বনি জাগ্রত হোক সমগ্র বাঙালির মনে-প্রাণে সংগ্রামী চেতনায়।

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
ড. আকবর আলি খান বলেছেন, সংসদ নির্বাচন পদ্ধতি নির্ধারণে গণভোট হতে পারে। তার এই বক্তব্য আপনি কি সমর্থন করেন?
6 + 2 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
জুলাই - ১৯
ফজর৩:৫৭
যোহর১২:০৫
আসর৪:৪৪
মাগরিব৬:৫০
এশা৮:১২
সূর্যোদয় - ৫:২২সূর্যাস্ত - ০৬:৪৫
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :