The Daily Ittefaq
ঢাকা, বুধবার, ২২ মে ২০১৩, ৮ জৈষ্ঠ্য ১৪২০, ১১ রজব ১৪৩৪
সর্বশেষ সংবাদ অবশেষে আটক ১২ বাম নেতা-কর্মীকে ছেড়ে দিল পুলিশ | জয়পুরহাটে বিজিবির গুলিতে দুইজন নিহত | রাজশাহীতে যুবলীগ নেতাকে গুলি করে হত্যা | আশুলিয়ার ৫ পোশাক কারখানা বন্ধ ঘোষণা | কিশোরগঞ্জ উপনির্বাচন ৩ জুলাই, গাজীপুর সিটি নির্বচন ৬ জুলাই | মানবতাবিরোধী অপরাধ: কায়সারের জামিন আবেদন নাকচ | সরকারি করা হলো ৮ কলেজ | মাহমুদুরের মা ও সংগ্রাম সম্পাদকের মামলার কার্যক্রম স্থগিত করেছে হাইকোর্ট | আটকে গেল দুই ডিসিসির নির্বাচন | রাজধানীতে 'বন্দুকযুদ্ধে' নিহত ২ | সাভার ভবন ধস: ১২১ পরিবারকে প্রধানমন্ত্রীর আর্থিক সহায়তা প্রধান | ৫ পোশাক মালিক ও রানাকে যাবজ্জীবন সাজার সুপারিশ তদন্ত কমিটির

চুরুলিয়ার ডাকাবুকো ছেলেটি

ফারুক নওয়াজ

বয়স ১০ বছর হতেই মক্তবের পাঠ শেষে, সেই মক্তবেরই শিক্ষক হলেন। সেই সঙ্গে মাজারশরীফের খাদেমগিরি আর মসজিদের ইমামতি করতে থাকেন। কোরানে হাফেজ শিশু দুখু মিয়ার সংসারে দুখিনী মা আর ছোট ভাই-বোন। বাবা নেই। সংসারের দায় তাই তাঁর কাঁধেই। মক্তবে পড়নো আর মসজিদে ইমামতি করে যা আয় হয় তাই দিয়েই দিন চলে যায় কোনোরকমে।

এমন অবস্থাতেই চাচা বজলে করিমের কাছে ফারসি ভাষা শিখতে থাকেন। পরবর্তী সময়ে নিজেও ফারসি সাহিত্যে সুপণ্ডিত হয়ে ওঠেন।

গ্রামের ছোট্ট হুজুর দুখু মিয়া যতোটা ধার্মিক তার চেয়ে বেশি ছিলেন মানবিক। মানুষ হিসেবে ছোটবেলা থেকেই ছিলেন অসামপ্রদায়িক। এজন্যই ছোটবেলাতেই সুফি, সাধক, দরবেশদের যেমন শ্রদ্ধা করতেন সাধুসন্যাসীদের সঙ্গেও ছিল তাঁর সখ্য। যেমন হামদ-নাতে দক্ষ ছিলেন, তেমনি কীর্তন, লেটোগানেও তার জুড়ি ছিলো না।

মক্তবে পড়িয়ে যা আয় হতো তাতে সংসার চলতো না বলে পেশা পাল্টে লেটোগানের দলে যোগ দিলেন। দাপিয়ে বেড়ান গ্রামের পর গ্রাম। গানের সঙ্গে ঘুঙুর পায়ে নাচ। নিজে নিজে গান বানান। মঞ্চ কাঁপে, সেই সঙ্গে দর্শক স্রোতারাও নাচতে থাকে। আসর মাতানো ছোট্ট এক লেটোকারের নাম ছড়িয়ে পড়ে দশ গ্রামে। দলের মালিক আদর করে ডাকেন ব্যাঙাচি বলে।

ঘরভরা অভাব আর বুকভরা কষ্ট তাঁর। পরপর চার ভাই-বোন জন্ম নিয়ে মারা যায়, এরপর দুখুর জন্ম। এজন্য বাবা-মা ছেলের নাম রাখেন দুখু মিয়া। নামে দুখু মিয়া হলেও দুষ্টুমিতে ষোলআনা। গ্রামের দুরন্তদের নেতা। সারা পাড়া মাতিয়ে রাখেন। এর গাছের আম, ওর গাছের লিচু পাড়াতে তার জোড়া মেলা ভার। ঘন্টার পর ঘন্টা বাড়ির পাশের পুকুরে ডুবোডুবি খেলে চোখ লাল করে ঘরে ফেরা। মায়ের বকুনিতে হাসেন। সাংঘাতিক খেয়ালী। হঠাত্ লেটোগান ছেড়ে স্কুলে ভর্তি হলেন। নামকরা স্কুল— মাথরুন ইংরেজি স্কুল। প্রধান শিক্ষক নামকরা কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিক। ক্লাস সিক্সের ছাত্র। স্কুলটা পুরনো আমলের দালান। ছাদের কড়িবর্গায় চড়ুইপাখির বাসা। এক ঝড়ের দিন সেই বাসা গেল উড়ে। মেঝেতে পড়ে গেল ছোট্ট চড়ুইছানাটি। পড়েই চিঁচিঁ করে ডাকতে লাগল মাকে। দুখুমিয়ার মনটা কেঁদে উঠলো কষ্টে। লিখে ফেললেন একটা কুড়ি লাইনের কবিতা। নাম— 'চড়ুইপাখির ছানা'। কবিতার প্রথম দুটি লাইন ছিলো—

'মস্ত বড় দালান বাড়ির উইলাগা ওই কড়ির ফাঁকে।

ছোট্ট একটি চড়াইছানা কেঁদে েঁকদে ডাকছে মাকে।'

সবাই জেনে গেলো দুখুমিয়া কবি। ছাত্র হিসেবেও সবার সেরা। কিন্তু মন যার চঞ্চল, সে কি বাঁধাধরা নিয়মে থাকতে পারে? সেভেনে উঠতেই স্কুল ছেড়ে ছুটলেন আসানসোলে। কাজ নিলেন রুটির দোকানে। সারাদির পরিশ্রম শেষে রাতে সুর করে পুঁথিপাঠ। তারপর জীবন গড়িয়েছে নানাভাবে। এক দারোগার সঙ্গে পরিচয় হয়ে তাঁর সঙ্গে তাঁর বাড়ি ময়মনসিংহের কাজির সিমলায় আসা। ভর্তি হলেন দরিরামপুর হাইস্কুলে। এক বছর যেতেই পালালেন বর্ধমান রানীগঞ্জে। সেখানে শিয়ারসোল রাজস্কুলে ভর্তি হলেন। তখন ১৯১৫ সাল। সামনে এন্ট্রান্স, মানে এসএসসি পরীক্ষা। পরীক্ষা না দিয়েই ১৯১৭ সালে সৈনিকে যোগদান করেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলছে তখন। বাঙালি পল্টনের হাবিলদার মেজর পদে পদোন্নতি পান। দুখু মিয়া ১৯১৯ সালে চলে আসেন কলকাতায়। লিখলেন 'বাউণ্ডলের আত্মকাহিনী' নামের গল্প। ছাপা হলো সওগাত পত্রিকায়। জীবনের প্রথম ছাপা লেখাটি। এরপর 'মুক্তি' নামের একটি কবিতা ছাপা হলো বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য পত্রিকায়। প্রথম মুদ্রিত কবিতা। এবার নিশ্চয় আমরা তাকে চিনে ফেলেছি। তার ডাকনাম দুখু মিয়া হলেও কবি হিসেবে তিনি পরিচিতি লাভ করেন আসল নামে। কাজী নজরুল ইসলাম।

আমাদের জাতীয় কবি। বাংলা সাহিত্যের বিদ্রোহী কবিখ্যাত এই কালজয়ী প্রতিভার জীবন বিচিত্র ঘটনায় সমৃদ্ধ।

কেউ কেউ তাকে বলেন, 'পরাধীন জাতির স্বাধীনতা আনয়ণের কবি'। আসলেও তাই। তাঁর জন্ম হয়েছিলো ১৮৯৯ খ্রিস্টব্দের ২৪ মে। বাংলা ১১ জ্যৈষ্ঠ। বর্ধমানের চুরুলিয়া নামের এক ধুলোওড়া গ্রামে। বাবা কাজী রফিকউদ্দীন আহমদ। মা জাহেদা খাতুন।

সে সময় গোটা ভারতবর্ষে— অর্থাত্ আজকের ভারত-বাংলাদেশ-পাকিস্তান নিয়ে একটাই দেশ ছিল। আর দেশটার শাসক ছিল ইংরেজরা। পরাধীন সেই দেশটাকে স্বাধীন করতে তখন অনেক আন্দোলন হয়েছে। নজরুল তাঁর লেখনীর মাধ্যমে স্বাধীনতার চেতনা ছড়িয়ে দেন মানুষের মাঝে। কবিতা, গান, প্রবন্ধ, গল্প-উপন্যাস সবকিছুতেই বিদ্রোহের আগুন। এজন্য তাঁকে জেলে যেতে হয়। তাঁর বিখ্যাত কবিতা 'বিদ্রোহী'। বাঁধনহারা, সর্বহারা, ভাঙার গান, বিষের বাঁশি, অগ্নিবীণা তাঁর বিখ্যাত কবিতার বই। কুহেলিকা, রিক্তের বেদন তাঁর উপন্যাস। আর অসংখ্য গান, নাটক, গল্প লিখেছেন। অনেক বই তাঁর। তিনি সাংবাদিকতা করেছেন। চলচ্চিত্র নির্মাণ ও তাতে অভিনয়ও করেছেন। বহুমুখী প্রতিভায় অধিকারী ছিলেন তিনি।

প্রথমত স্বাধীনতার জন্য যেমন তিনি যেমন জ্বালাময়ী লেখা লিখেছেন, তেমনি সাধারণ খেটেখাওয়া মানুষ আর মানবতার জয়গান গেয়েছেন সমগ্র সৃষ্টিতে। তাঁর ছোটদের জন্য লেখাও কম নয়। অসংখ্য হাসির কবিতা, মজার ছড়াপদ্য, মিষ্টি মিষ্টি নাটক আর কত যে গান তিনি লিখেছেন তার ইয়ত্তা নেই। ঝিঙেফুল, পুতুলের বিয়ে, ঘুমজাগানো পাখি, জাগো সুন্দর চিরকিশোর ইত্যাদি তাঁর ছোটদের বই। তাঁর লিচুচোর, খুকি ও কাঠবেড়ালি, খাঁদুদাদু, প্রভাতি, শিশু জাদুকর— এসব কবিতা আমাদের শিশুদের মুখে মুখে শুনি। আমাদের প্রিয় এই কবির বিখ্যাত গান— 'চল চল চল' বাংলাদেশের রণসংগীত।

আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর গান, কবিতা স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র থেকে প্রচারিত হয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরণা যুগিয়েছিল। দেশ স্বাধীন হলে ১৯৭২ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু কলকাতা থেকে কবিকে ঢাকায় নিয়ে আসেন। তাঁকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান এবং জাতীয় কবি খেতাবে ভূষিত করা হয়। ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট জাতীয় কবি ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদের পাশে তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়।

৭৭ বছর জীবনে মাত্র ২৩ বছর তিনি লেখালেখি করতে পেরেছেন। ১৯১৯ সালে পত্রিকায় প্রথম লেখা প্রকাশ পায়। ১৯৪২ সালে দুরারোগ্যে আক্রান্ত হয়ে বাক ও লেখনী শক্তি চিরতরে স্তব্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ ৩৪ বছর এভাবেই বেঁচে ছিলেন। মাত্র ২৩ বছরেই তিনি জাতিকে যে বিশাল সৃষ্টিভাণ্ডার দিয়ে গেছেন তা প্রতিনিয়ত আমাদের অনুপ্রাণিত করে চলেছে।

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
ড. আকবর আলি খান বলেছেন, সংসদ নির্বাচন পদ্ধতি নির্ধারণে গণভোট হতে পারে। তার এই বক্তব্য আপনি কি সমর্থন করেন?
2 + 7 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
মে - ২২
ফজর৩:৪৮
যোহর১১:৫৫
আসর৪:৩৪
মাগরিব৬:৪০
এশা৮:০১
সূর্যোদয় - ৫:১২সূর্যাস্ত - ০৬:৩৫
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :