The Daily Ittefaq
ঢাকা, শুক্রবার, ২৪ মে ২০১৩, ১০ জৈষ্ঠ্য ১৪২০, ১৩ রজব ১৪৩৪
সর্বশেষ সংবাদ অচিরেই দেশে আন্দোলন-সংগ্রামের নেতৃত্ব দেবেন তারেক : শামসুজ্জামান দুদু | ঢাকা-চট্টগ্রাম ও বরিশাল বিভাগে অতিভারী বর্ষণের আশঙ্কা | আগামী রবিবার ১৮ দলের সকাল-সন্ধ্যা হরতাল

একুশ শতকে নজরুলের প্রাসঙ্গিকতা

রফিকুল ইসলাম

একুশ শতকের সূচনাকালে বিশ্বায়ন, মুক্তবাজার অর্থনীতি এবং তথ্যপ্রযুক্তি বিপ্লব মূল্যবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন ঘটিয়েছে। একুশ শতকে এসে বিশ্ব নতুন শতক ছাড়াও নতুন সহস্রাব্দে প্রবেশ করেছে। ফলে বিপুলা এ পৃথিবীর নিরবধি কালের প্রবাহে যুক্ত হয়েছে নতুন মাত্রা। একটি শতক থেকে আর একটি শতক সময়ের অগ্রগতির কারণে ভিন্ন হতে বাধ্য কিন্তু মানুষের সভ্যতার ইতিহাসকে সময়ের মাপকাঠি দিয়ে সম্পূর্ণ পৃথক করা চলে না। ঐতিহ্যের একটা নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ থাকে যা সময়ের গণ্ডীকে অতিক্রম করে চলে। ইতিহাস হচ্ছে অতীতের ঘটনাক্রম আর ঐতিহ্য হচ্ছে অতীতের বর্তমানতা। ইতিহাস অতীত কালানুক্রমিক গণ্ডীতে আবদ্ধ কিন্তু ঐতিহ্য কালের গণ্ডীকে অতিক্রম করে প্রবাহিত। সে কারণেই উনিশ শতকের মূল্যবোধ ও আবেগের প্রকাশ সত্ত্বেও রবীন্দ্রনাথের 'গীতাঞ্জলি" বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে প্রথম মহাযুদ্ধের প্রাক্কালে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিল। সভ্যতার ইতিহাসে কিছু মূল্যবোধ রয়েছে শাশ্বত বা চিরকালীন যেমন, স্নেহ, প্রেম, ভালোবাসা; আবার কিছু প্রবৃত্তি রয়েছে অদমিত যেমন হিংসা, বিদ্বেষ, লোভ, জিঘাংসা প্রভৃতি। ওই সব মনোবৃত্তি মানুষের মধ্যে চিরন্তন। যাঁরা মহত্ কবি ও শিল্পী তাঁরা যুগে যুগে মানুষের ওই চিরন্তন প্রবৃত্তিগুলি পরিচর্যা করেন তাঁদের সৃষ্টিকর্মের মধ্যে।

নজরুল বিশ শতকের প্রথমার্ধের কবি ও শিল্পী। প্রশ্ন উঠতে পারে, বিশ শতকের প্রথমার্ধের এক সৃজনশীল প্রতিভার সৃষ্টিকর্ম একুশ শতকে কতটা প্রাসঙ্গিক? বস্তুত একুশ শতকে এসে বিশ শতকের শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি একটা গ্রহণ-বর্জন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। বিশ শতকের চিন্তা-চেতনা মন-মানসিকতার পরিবর্তনে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে তথ্যপ্রযুক্তির অপরিসীম বিকাশ যা বিশ শতকের পরাশক্তিদ্বয়ের স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর থেকে সম্প্রসারিত হতে শুরু করেছে। যার রূপান্তর এক অপরিসীম সম্ভাবনাকে বাস্তবায়িত করে চলেছে। বাতিল বা বর্জিত হয়ে চলেছে সভ্যতার অনেক উপাদান, সংযোজিত হচ্ছে নব নব প্রক্রিয়া। এমন এক ক্রান্তিলগ্নে অতীতের সব কিছুই আমরা হারিয়ে ফেলব কি না, সে প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ায় পৃথিবীর ছোট ছোট দেশ ও জাতিগুলি তাদের স্বাতন্ত্র্য ও বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ফেলতে বসেছে। বিশ্বের বিভিন্ন জাতিসত্তা ও অসংখ্য ভাষা-সংস্কৃতি অস্তিত্বের হুমকির মুখে পড়েছে; মুক্তবাজার অর্থনীতি আজ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিকে দেউলিয়া ও পরনির্ভর করে তুলেছে, অবাধ তথ্যপ্রবাহ একদিকে যেমন সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছে, অপরদিকে তেমনি বহু প্রাচীন সভ্যতাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। এই পরিবর্তন-প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এক নতুন পৃথিবীর উন্মেষ ঘটছে।

বিশ শতকের প্রথমার্ধ ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত, দুই দুইটি মহাযুদ্ধে বিশ্বকে দুই পরাশক্তি পদানত করে ফেলেছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর এশিয়া আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বহু দেশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তির উপনিবেশে পরিণত হয়। দ্বিতীয় মহাযুদ্দের পর পৃথিবীর পাশ্চাত্য উপনিবেশগুলিতে শুরু হয় স্বাধীনতা ও মুক্তির সংগ্রাম। বিশ শতকে প্রথম মহাযুদ্ধে জার্মানি ও তার মিত্র তুরস্কের পরাজয়ের ফলে মধ্যপ্রাচ্যে বিশাল তুরস্ক-সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ে, ওই অঞ্চলের বিভিন্ন দেশ ব্রিটেন, ফ্রান্স, ইতালি ও বেলজিয়ামের উপনিবেশে পরিণত হয়। একদিকে রাশিয়া সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব এবং তুরস্কে তুর্কি সাম্রাজ্যের ধ্বংসস্তূপের ওপর মোস্তফা কামাল আতাতুর্কের নেতৃত্বে ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্রের অভ্যুত্থান অপরদিকে জার্মানি, স্পেন ও ইতালিতে নািস ও ফ্যাসিস্ট শক্তির উত্থান দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের প্রেক্ষাপট নির্মাণ করে। ভারত ও অন্যান্য দেশে জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম জোরদার হয়ে ওঠে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শেষ হয় জার্মানি, ইতালি ও জাপানের পরাজয়, পারমাণবিক অমানিশা আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের পরাশক্তিতে পরিণত হওয়ার মাধ্যমে। তৃতীয় বিশ্বের পরাধীন দেশগুলি একে একে স্বাধীন হয়ে উঠতে থাকে। শুরু হয় দুই পরাশক্তির মধ্যে প্রভুত্বের লড়াই যা ঠান্ডা যুদ্ধ নামে অভিহিত। বিশ শতকের প্রথমার্ধে দুটি বিশ্বযুদ্ধের ফলে পৃথিবীর মানচিত্রে অনেক পরিবর্তন এলেও বিশ শতকের অপরার্ধ যুদ্ধমুক্ত করতে পারেনি; কোরিয়া, ভিয়েতনাম, বাংলাদেশ এবং আফ্রিকা ও বলকানের গৃহযুদ্ধে যে প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞ তার পরিণাম দুটি মহাযুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির চেয়ে কম নয়। ইতোমধ্যে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে দুনিয়ার একমাত্র পরাশক্তি থেকে মহাপরাশক্তিতে পরিণত করে দুনিয়াকে শক্তির ভারসাম্যহীন করে তোলে। ওই আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বিশ শতকের প্রথম চার দশকে অবিভক্ত বাংলা তথা ভারত ও মধ্যপ্রাচ্যের অবস্থা বিশ্লেষণের মাধ্যমে নজরুলের সৃষ্টিকর্মের পটভূমিকা আর একুশ শতকে তাঁর প্রাসঙ্গিকতা বিবেচনা করা যেতে পারে। বিশ শতকের প্রথম দুই দশকে যখন নজরুলের শৈশব, কৈশোর অতিক্রান্ত হচ্ছিল, তখন বাংলা ছিল বঙ্গভঙ্গ (১৯০৫-১১), বঙ্গভঙ্গরদ, স্বদেশি আন্দোলন, সশস্ত্র বিপ্লববাদের অভ্যুত্থান এবং হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িক সংঘাতে ক্ষত-বিক্ষত। নজরুল যখন যৌবনে পদার্পণ করেন, তখন প্রথম মহাযুদ্ধের রণদামামা বেজে উঠেছে, ওই রণাঙ্গন ইউরোপ এবং আফ্রিকা মহাদেশে সীমাবদ্ধ থাকলেও তার প্রভাব পড়ে ভারতসহ সমগ্র ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে। ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীকে ইউরোপ ও আফ্রিকার বিশেষত মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন রণাঙ্গনে ব্রিটেনের পক্ষে লড়াইয়ে নিয়োগ করা হয়। নজরুল সেনাবাহিনীতে যোগদান করে প্রথম মহাযুদ্ধ এবং তার প্রতিক্রিয়া সম্যকভাবে অনুধাবন করার সুযোগ পান। শুধু তা-ই নয়, সেনাবাহিনীতে কর্মরত অবস্থায় রুশ সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব নজরুলকে উদ্দীপিত করে তোলে, যার পরিচয় করাচি সেনানিবাসে অবস্থানকালে রচিত তাঁর সাহিত্যকর্মে পাওয়া যায়। প্রথম মহাযুদ্ধ শেষে কলকাতায় সাংবাদিক- সাহিত্যিক জীবনে তিনি ভারতে ইংরেজ বিরোধী অসহযোগ আর খেলাফত আন্দোলনের প্রত্যক্ষ সংস্পর্শে আসেন। নজরুল অসহযোগ আর খেলাফত আন্দোলনে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী চরিত্রের সমর্থক হলেও অহিংস অসহযোগ আন্দোলনে স্বাধীনতা আসবে—এ কথা বিম্বাস করতেন না। তিনি স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র বিপ্লবী সংগ্রামের সমর্থক ছিলেন। প্রথম মহাযুদ্ধে পরাজিত তুরস্কের সুলতানের ক্ষমতা অক্ষুণ্ন রাখার জন্য খেলাফত আন্দোলনেও তিনি বিশ্বাসী ছিলেন না, তাঁর সমর্থন ছিল নব্যতুর্কি আন্দোলনের নেতা মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত নতুন ধর্মনিরপেক্ষ তুরস্ক প্রজাতন্ত্রের প্রতি। সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের সাম্যের আদর্শ তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। প্রথম মহাযুদ্ধোত্তর এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন পাশ্চাত্য উপনিবেশের জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের প্রতি ছিল নজরুলের অকুণ্ঠ সমর্থন। ফলে নজরুল তাঁর সমকালীন ইতিহাসের প্রগতিশীল আন্তর্জাতিক চেতনায় অভিষিক্ত হয়ে তাঁর সৃষ্টিকর্মকে ওই আদর্শে নিয়োজিত করেন।

স্বদেশে নজরুলকে সবচেয়ে বিচলিত করেছিল ভারত তথা বাংলার সাম্প্রদায়িক সংঘাত। একটা সত্য, তিনি চরমভাবে উপলব্ধি করেছিলেন যে, সাম্প্রদায়িকতা হচ্ছে ভারত তথা বাংলার সবচেয়ে বড় সমস্যা। তিনি বুঝতে সক্ষম হয়েছিলেন, সাম্প্রদায়িক সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে তাঁকে পাশ কাটিয়ে গেলে স্বরাজ বা স্বাধীনতা আন্দোলন কখনো প্রকৃত স্বাধীনতা বা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক তথা জাতীয় মুক্তি আনয়ন করতে সক্ষম হবে না। ওই বোধ থেকে তিনি সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে তাঁর জীবন ও সৃষ্টিকর্মের মাধ্যমে জেহাদ ঘোষণা করেন। সেদিন নজরুলের সতর্কবাণী উপেক্ষিত হয়েছিল। রাজনীতিকদের একপক্ষ ধরে নিয়েছিল, ইংরেজের কাছ থেকে রাজনৈতিক স্বাধীনতা পেলেই সব সমস্যার সমাধান হবে আর একপক্ষের ধারণা ছিল, সাম্প্রদায়িকতার মধ্য দিয়েই মোক্ষ লাভ হবে। সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্পে যখন দেশের সমস্ত মানুষ আচ্ছন্ন তখন সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে নজরুলের সংগ্রামকে তদানীন্তন রাজনৈতিক পক্ষগুলি গুরুত্ব দেয়নি, ফলে স্বাধীনতা এসেছে সাম্প্রদায়িক সংঘাতের মধ্য দিয়ে, দেশ বিভক্ত হয়েছে, কিন্তু সাম্প্রদায়িক অভিশাপ থেকে মুক্তি পায়নি। স্বাধীন ভারত আজও ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার অভিশাপমুক্ত নয়। জাতিগত সাম্প্রদায়িকতার কারণে পাকিস্তান ভেঙে গেছে কিন্তু পাকিস্তানে শিয়া-সুন্নি সংঘাতে রক্তপাত বেড়েই চলেছে। উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িকতা উগ্র থেকে উগ্রতর হয়েছে। তা রূপ নিয়েছে উগ্রজঙ্গি মৌলবাদে। বিশ শতকের বিশ ও ত্রিশের দশকে সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মান্ধতা, কূপমণ্ডুকতা, রক্ষণশীলতা, কুসংস্কার এবং ধর্মীয় আচার-আচরণ সর্বস্বতার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর ছিলেন নজরুল। নজরুল একদিকে নিজের অপরদিকে প্রতিবেশী সম্প্রদায়ের সামাজিক ভেদবুদ্ধির সবচেয়ে কঠিন সমালোচক ছিলেন আর সে কারণেই তিনি কেবল বিদেশি সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে নয়, সঙ্গে সঙ্গে অবিভক্ত বাংলা তথা ভারতের প্রধান দুটি সম্প্রদায়ের সামাজিক অনুশাসনগুলির বিষক্রিয়া চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছিলেন। কিন্তু জেগেও যারা ঘুমিয়ে থাকে, মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টিই যাদের স্বভাব, নজরুলের সমালোচনা তাদের সচেতন করে তুলতে পারেনি। ফলে দেশ বিভাগের ষাট বছর পরেও উপমহাদেশের মানুষকে তার জন্য চরম মূল্য দিতে হচ্ছে।

বিশ শতকের প্রথমার্থে দুই দুইটি মহাযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে অবিভক্ত ভারত তথা বাংলায় সাম্রাজ্যবাদী বিভাজন এবং দেশীয় সামন্ততান্ত্রিক শাসন ও শোষণের ফলে মানুষ বিভক্ত হয়েছে জাতি,ধর্ম, বর্ণ, সম্প্রদায়, শ্রেণী এবং লিঙ্গবৈষম্য। দেশ বিভাগ ও স্বাধীনতার পর আরও যুক্ত হয়েছে রাষ্ট্র তথা সরকারের আমলাতান্ত্রিক দুঃশাসনের প্রক্রিয়া। ফলে উপমহাদেশের মানুষ পাশ্চাত্যমুখী ধ্যান-ধারণা ও দৃষ্টিভঙ্গিতে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে ক্রমাগত। নজরুলের ভাষায়, 'বিশ্ব যখন এগিয়ে চলেছে সমুখপানে আমরা তখন বিবি তালাকের ফতোয়া খুঁজেছি ফেকা ও হাদিস ঘেঁটে।' নজরুলের বিশ্বাসের গভীরে ছিল 'মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই নহে কিছু মহীয়ান' আর সে কারণেই তিনি মানুষের বিভেদ সৃষ্টিকারী দেয়ালগুলি ভাঙতে চেয়েছিলেন। সে দেয়ালগুলি হচ্ছে জাতি, ধর্ম, সম্প্রদায়, বর্ণ, শ্রেণী ও লিঙ্গ। মনুষ্য জাতির অবিভাজ্যতায় বিশ্বাসী নজরুল বিভেদের প্রাচীর ভাঙতে চেয়ে শাসক, শোষক ও সমাজপতিদের চক্ষুঃশূলে পরিণত হয়েছিলেন কিন্তু তিনি নিজের বিবেকের সঙ্গে কখনো সন্ধি করেননি। তিনি তাঁর সুস্থ জীবনের শেষপর্যায়ে একটি ভাষণে বলেছিলেন, 'বিংশ শতাব্দীর অসম্ভবের যুগে আমি জন্মগ্রহণ করেছি, এর অভিযান সেনাদলের তূর্যবাদকের একজন, এই হোক আমার সবচেয়ে বড় পরিচয়।' বিশ শতকের অভিযান সেনাদলের আদর্শ ও লক্ষ্য ছিল মানুষের মধ্যকার জাতি-ধর্ম, জাত-পাত, ধনী-দরিদ্র, সাদা-কালো ও নারী-পুরুষের বৈষম্য দূর করা।

যুগ যুগ সঞ্চিত মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টিকারী ওই উপাদানগুলি বিশ শতকে দূর করার চেষ্টা হয়েছিল সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব, ধর্ম ও সমাজ সংস্কারের মাধ্যমে। কিন্তু মানুষ সংস্কারের দাস, তাই তা থেকে মুক্ত হওয়া কঠিন, তবুও বিশ শতকের অসম্ভবের সম্ভাবনার যুগে সে অসাধ্য সাধনে নজরুল অভিযান চালিয়েছিলেন। নজরুল হয়তো তাঁর অভিযানে সফল হননি কারণ পরাধীন দেশে যুগপত্ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব নয় কিন্তু তবুও নজরুলের সংগ্রাম তো মিথ্যা ছিল না। বিশ শতক পেরিয়ে আমরা একুশ শতকে প্রবেশ করেছি, সাম্রাজ্যবাদের বদলে এসেছে বিশ্বায়ন, ঔপনিবেশিক শোষণের স্থান নিয়েছে মুক্তবাজার অর্থনীতি, জাতীয় সংস্কৃতিকে গ্রাস করে ফেলেছে আকাশসংস্কৃতির বিকিরণে অপসংস্কৃতির বাতাবরণ। আজ তৃতীয় বিশ্বের সবচেয়ে জটিল সমস্যা ওই প্রভুত্ব থেকে স্বকীয়তা অক্ষুণ্ন রাখা আর সে জন্য প্রয়োজন একই সঙ্গে স্বদেশি ও আন্তর্জাতিক হওয়া। নিজের জাতিসত্তা ও সংস্কৃতির প্রতি অবিচল থেকে আন্তর্জাতিক হওয়া। আজকের পৃথিবীতে কোনো দেশ-জাতি নির্জন দ্বীপের মতো বিচ্ছিন্ন থাকতে পারে না, আজ তাকে নিজের মাটিতে আপন ঐতিহ্যের শেকড় গভীর থেকে গভীরে প্রোথিত করে অসীম আকাশের আলো-হাওয়ার দিকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হবে। নজরুলের মতো বলতে হবে, 'বল বীর—/ বল উন্নত মম শির,/ শির নেহারি আমারি নতশির ওই শিখর হিমাদ্রির।' এই আত্মবিশ্বাস ও আত্মপ্রত্যয় যদি মানুষের মধ্যে সঞ্চারিত হয়, তা হলেই মানুষের স্বাধীন চিত্ততার জাগরণ ঘটতে পারে। পরাধীন যুগের স্বাধীন কবি নজরুল বারবার স্বদেশের মানুষের মধ্যে স্বধীন চিত্ততার জাগরণের আহ্বান জানিয়েছেন, তিনি প্রথমে মনের শিকল ভেঙে পরে হাতের শিকল ভাঙার কথা বলেছিলেন, নজরুলের ভাষায়, 'মনের শিকল ভেঙেছি এবার হাতের শিকলে পড়েছে টান।' এ কথা নজরুলের কিন্তু আমরা হাতের শিকল ভাঙলেও মনের শিকল ভাঙতে পারিনি। বিশ শতকের পরাধীন দেশে আমরা মনের শিকল যতটা ভাঙতে পেরেছিলাম, একুশ শতকে এসে আমরা সে বাঁধনকে আবার শক্ত করে তুলছি; এই হলো আমাদরে ট্র্যাজেডি। একুশ শতকে বিশ্বায়ন মুক্তবাজার অর্থনীতি এবং আকাশসংস্কৃতির সর্বগ্রাসী আগ্রাসনে আমরা ক্রমশ শামুকের মতো গুটিয়ে যাচ্ছি, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে আমরা যাচ্ছি। কিন্তু আরও বেশি কূপমণ্ডুক হয়ে পড়ছি, ধর্মের মর্ম অপেক্ষা আচার সর্বস্বতায় অধিক থেকে অধিকতর আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছি। নজরুলের কথায় বলতে হয়, 'আজাদ আত্মা, আজাদ আত্মা, সাড়া দাও দাও সাড়া, এই গোলামীর জিঞ্জির ধরি ভীম বেগে দাও নাড়া।' কিন্তু মানসিক গোলামি আমাদের মজ্জাগত।

একুশ শতকে পাশ্চাত্য শক্তিগুলি বিশ্বায়ন মুক্তবাজার অর্থনীতি ও আকাশসংস্কৃতির বাতাবরণে দুনিয়াকে পদানত এবং তৃতীয় বিশ্বের সম্পদ লুণ্ঠনের জন্য জঙ্গি ধর্মীয়মৌলবাদকে প্রতিপক্ষরূপে দাঁড় করিয়েছ। সে মৌলবাদের উত্থানের পেছনে রয়েছে পরাশক্তির কূটকৌশল। প্রথম মহাযুদ্ধ-পরবর্তীকালে নজরুল যে সাম্প্রদায়িকতাকে মানবতার প্রধান শত্রুরূপে চিহ্নিত করেছিলেন, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর ঠান্ডা লড়াইকালে সমাজতান্ত্রিক প্রভাব ঠেকানোর জন্য পুঁজিবাদি পরাশক্তি তৃতীয় বিশ্বের নব্যস্বাধীন দেশগুলিতে সেই সাম্প্রদায়িক শক্তিকেই ইন্ধন জুগিয়েছে ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক জাতীয়বাদী শক্তির উত্থান রোধে। আফগানিস্তানকে সোভিয়েত দখলমুক্ত করার জন্য পাশ্চাত্য পরাশক্তি সৃষ্টি করেছিল তালেবান শক্তিকে। আফগানিস্তানে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপর্যয়ের পর সেই মৌলবাদী শক্তিই ফ্রাঙ্কেনস্টাইন হয়ে ওঠে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ার পর পাশ্চাত্যপরাশক্তি সৃষ্ট ধর্মীয় জঙ্গি মৌলবাদী শক্তিকেই তারা প্রতিপক্ষরূপে দাঁড় করায় তাদের সমরশিল্পকে চালু এবং তেলসমৃদ্ধ দেশগুলিকে পদানত করার জন্য। নজরুল বিশ শতকে সাম্প্রদায়িকতাকে মানবতার সবচেয়ে বড় শত্রুরূপে শনাক্ত করেছিলেন, একুশ শতকে সে সাম্প্রদায়িক শক্তি উগ্র ও জঙ্গিরূপ ধারণ করে জঙ্গি মৌলবাদরূপে আত্মপ্রকাশ করেছে। কিন্তু জঙ্গি মৌলবাদের অভ্যুত্থান কেবল আফগানিস্তান বা মুসলমানদের মধ্যেই ঘটেনি। আফগানিস্তানের অনেক আগে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ-পরবর্তীকালে পাশ্চাত্য শক্তি প্যালেস্টাইন বিভক্তির মাধ্যমে জঙ্গি গোঁড়া ইহুদি মৌলবাদী রাষ্ট্র ইসরাইলের সৃষ্টি করেছিল, তুলনায় নিজদেশে পরবাসী ফিলিস্তিনিরা ছিল অসাম্প্রদায়িক এবং ধর্মনিরপেক্ষ। ধর্মনিরপেক্ষ তুরস্ক এবং আলজিরিয়ায় পাশ্চাত্য মদদে জঙ্গি মৌলবাদী শক্তির উত্থান ঘটেছে। ইরানে পাশ্চাত্য সমর্থনপুষ্ট শাহের স্বেচ্চারিতায় শিয়া মৌলবাদ শক্তিশালী হয়ে ক্ষমতা দখল করেছে। ধর্মনিরপেক্ষ ইরাককে ইরানের বিরুদ্ধে লেলিয়ে শিয়া ও কুর্দিদের উস্কানি দিয়ে সাদ্দামকে অপসারণ আর ইরাককে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে। কার্যত ইরাককে শিয়া-সুন্নি-কুর্দি—তিনভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। পরিণতিতে ইরানের শিয়া মৌলবাদ সম্প্রসারিত হয়েছে ইরাকে। ইউরোপে জুগোশ্লোভিয়াতে খ্রিষ্টান মৌলবাদ মুসলমান প্রধান বসনিয়া ও কসভোতে যে 'জেনেসাইড' এবং 'এথনিক ক্লিনজিং' চালিয়েছে তা সম্ভবপর হয়েছে মার্শাল টিটোর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত সমাজতান্ত্রিক জুগোস্লাভ রাষ্ট্রকে ভাঙার পাশ্চাত্য কূটকৌশলের ফলেই। উপমহাদেশের তিনটি দেশে মৌলবাদী শক্তির উত্থানের জন্য যেসব সাম্প্রদায়িক শক্তি দায়ী, তাদের উন্মেষের পেছনে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ পরবর্তীকালে ঠান্ডাযুদ্ধের আমলে পাশ্চাত্য শক্তির বিভিন্ন সামরিক চুক্তির প্রত্যক্ষ ভূমিকা রয়েছে। ভারতে হিন্দু মৌলবাদী শক্তির উত্থান ঘটানো হয়েছিল ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক শক্তির বিকাশ রুদ্ধ এবং জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনকে পর্যুদস্ত করার জন্য। জোটনিরপেক্ষ নেতা ইন্দোনেশিয়ার ড. শোকরানা, মিশরের জামাল আবদুল নাসের এবং ঘানার ড. একক্রুমার বিরোধিতার পাশ্চাত্য শক্তিগুলি মৌলবাদী এবং সামরিক শক্তিতে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে, পাকিস্তানে সামরিক স্বৈরাচারকে শক্তিশালী ও স্থায়ী করেছে, একাত্তরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানকে সমর্থন করেছে।

ওই আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটেই একুশ শতকে জঙ্গি মৌলবাদকে মানবতার সবচেয় বড় শত্রুরূপে অভিহিত করা হচ্ছে। উপমহাদেশে এই ধর্মীয় জঙ্গি মৌলবাদের বীজ রোপিত হয়েছিল বিশ শতকের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের প্রতিক্রিয়ার সৃষ্ট সশস্ত্র বিপ্লববাদ এবং সাম্প্রদায়িক সংঘাতের মাধ্যমে। বিশ শতকের বিশের দশকে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী অসহযোগ-খেলাফত আন্দোলন ব্যর্থ হয়ে গিয়েছিল; দেশে হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িক সংঘাতের কারণেই। অবিভক্ত বাংলায় ১৯২৬ সালে 'বেঙ্গল প্যাক্ট' বা 'হিন্দু-মুসলিম চুক্তি' বাতিল হয়ে গিয়েছিল; সাম্প্রদায়িক সংঘাতে রক্তাক্ত হয়েছিল একটানা ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগ যার অনিবার্য পরিণতি। নজরুল ১৯২৬ সালে 'দুর্গম গিরি কান্তার মরু' বা 'কাণ্ডারী হুঁশিয়ার' গানে প্রশ্ন তুলেছিলেন, 'হিন্দু না ওরা মুসলিম ওই জিজ্ঞাসে কোন জন? কাণ্ডারী বল ডুবিছে মানুষ সন্তান মোর মার।' কিন্তু সেদিন ভারত তথা বাংলার কাণ্ডারিরা হুঁশিয়ার হননি। বিশ শতকে সাম্প্রদায়িকতা একুশ শতকে জঙ্গি ধর্মীয় মৌলবাদের বিষবৃক্ষে পরিণত। একুশ শতকে এই বিষবৃক্ষের উত্পাটনে নজরুলের মানবতার বাণী আমাদের শক্তির উত্স এবং ভবিষ্যতের পথ নির্দেশক আর এ সংগ্রামে নজরুলের আদর্শ আমাদের পাথেয়। একুশ শতকে এখানেই নজরুলের প্রাসঙ্গিকতা।

একুশ শতকের পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক এবং পরিবর্তনশীল বাংলাদেশের পরিস্থিতিতে আজ নজরুলের মতো দুঃসাহসী দেশপ্রেমিক মানবদরদি সাহিত্যিকের প্রয়োজন বড় বেশি। বাংলাদেশের মানুষ দেশ বিভাগের পূর্ব সময় থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত ছয় দশক যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, সাম্প্রদায়িক সংঘাতে যে দুঃসহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করেছে সে যন্ত্রণা হূদয়ে ধারণ করে লেখকেরা এ দেশের কোটি কোটি মানুষের দুঃখ-বেদনা ত্যাগ-তিতিক্ষাকে তাদের লেখনীর মাধ্যমে কবে তুলে ধরতে পারবেন? একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে এ দেশের মানুষের শৌর্য-বীর্য এবং অপরিমেয় রক্তের বিনিময়ে যে স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে সে কাহিনি এখনো আমাদের সাহিত্যে পূর্ণাঙ্গভাবে ফুটে ওঠেনি। বাংলার মানুষের বীরোচিত সংগ্রাম আর বিজয়গাথা আজও রচিত হয়নি বরং বারবার বিকৃত হয়েছে। আজ আমাদের প্রয়োজন নজরুলের মতো অকুতোভয় দূরদৃষ্টিসম্পন্ন কবি সাহিত্যিকের, যিনি বাংলার সাহসী সন্তানদের সংগ্রামকে সাহিত্যে তুলে আনবেন, এ দেশের দুঃখী মানুষকে সাহস ও প্রেরণা জোগাবেন মানবতার জয়ের অনুপ্রেরণা দিয়ে, যাতে মানুষ আশাহত না হয়ে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে জয়যাত্রার পথে এগিয়ে যেতে পারে। নজরুল যেমন তাঁর সৃষ্টিকর্মের মধ্য দিয়ে বিশ শতকের প্রথম চার দশকের পরাধীন দেশের মানুষের মর্মজ্বালাকে ছন্দে-গানে তুলে ধরে ভীতি তুচ্ছ করে, উপনিবেশবাদ, সামন্তবাদ এবং মৌলবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে মানুষকে উদ্দীপিত করেছিলেন, আজকের বাংলাদেশে তেমন কবি ও শিল্পীর প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি। মানুষ আজ হতাশ এবং বিভ্রান্ত, এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণের পথ প্রদর্শন করতে পারেন নজরুলের মতো মানবতাবাদী ও সংগ্রামী শিল্পী-সাহিত্যিক যিনি আন্তর্জাতিক স্বার্থের রক্ষক দেশীয় তাঁবেদারের মুখোশ উন্মোচন করতে পারেন নির্ভয়ে, নিঃসংকোচে। নজরুল পরাধীন দেশের মানুষকে মুক্তির পথ দেখিয়েছেন। আজ স্বাধীন দেশের মানুষকে অগ্রযাত্রার পথ প্রদর্শনের জন্য নজরুলের মতো নির্ভয় মানুষের প্রয়োজন, যিনি সত্য কথা বলতে ব্যক্তিগত লাভ-ক্ষতিকে বিবেচনায় আনবেন না। নজরুলের একটি কবিতা আছে, 'সত্যকে হায় হত্যা করে অত্যাচারীর খাঁড়ায়/ নেই কি রে কেউ সত্য সাধক বুক খুলে আজ দাঁড়ায়?' আজ নজরুলের মতো তেমনি দৃপ্ত উচ্চারণ প্রয়োজন। নজরুল পরাধীন দেশের দুঃশাসন সম্পর্কে লিখেছিলেন, 'বলরে বন্য হিংস বীর/ দুঃশাসনের চাই রুধির।' সে জন্যেও নজরুলের মতো সাহসী উচ্চারণ প্রয়োজন। নজরুলের মতো সত্য সাধকের প্রয়োজন আজ খুব বেশি। নজরুল 'বিদ্রোহী বাণী' কবিতায় বলেছিলেন, 'দোহাই তোদের এবার তোরা সত্যি করে সত্য বল/ ঢের দেখালি ঢাক ঢাক গুড় গুড় ঢের মিথ্যা ছল।' নজরুল এ কথাগুলি বলেছিলেন তত্কালীন বুদ্ধিজীবীদের উদ্দেশে। ওই নির্মম কথাগুলি সমকালীন বুদ্ধিজীবীদের প্রতিও প্রযোজ্য হতে পারে। নজরুল 'আমার কৈফিয়ত্' কবিতা শেষ করেছিলেন যে দুটি চরণ দিয়ে, তার মধ্যে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে বর্ণনা করে গিয়েছেন, বিদেশি শক্তিপদানত দেশের এক কবি অমন অমোঘ উচ্চারণ করতে পেরেছিলেন অথচ স্বাধীন দেশের কবিকণ্ঠে তেমন কথা উচ্চারিত হয় না কেন? নজরুল 'ফরিয়াদ' কবিতার শেষ স্তবকে লিখেছিলেন, 'চির অবনত তুলিয়াছে আজ গগনে উচ্চ শির।/ বান্দা আজিকে বন্ধ ছেদি ভেঙেছে কারা-প্রাচীর।/ এতদিনে তার লাগিয়াছে ভালো—/ আকাশ বাতাস বাহিরিতে আলো,/ এবার বন্দী বুঝেছে, মধুর প্রাণের চাইতে ত্রাণ/ মুক্ত-কণ্ঠে স্বাধীন বিশ্বে উঠিতেছে একতান—/ জয় নিপীড়িত প্রাণ।/ জয় নব অভিযান।/ জয় নব উত্থান।'

নজরুলের মতো সংগ্রামের, বিজয়ের, মুক্তির গান আজ আমাদের কে শোনাবে একুশ শতকের বাংলাদেশে? আজ নজরুলের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি যাতে মানুষ নিজের ওপর বিশ্বাস না হারায়, নিজের ওপর আস্থা ফিরে পায়, সব বাধা-বিপত্তি এবং প্রতিকূলতাকে জয় করে। মানবতার জয় যে অর্জিজ হবেই, এক কথাটা বলার মানুষ আজ নেই; সে জন্যেই আমাদের বারবার নজরুলের কাছে ফিরে যেতে হয়। একুশ শতকে যখন বিশ শতকের মানবের শত্রু দানবরূপে আবির্ভূত, তখন নজরুলের মতো বলতে হবে, 'নাই দানব, অসুর—চাই না চাই না চাই মানব।' একুশ শতকের বাংলাদেশে সুর-অসুর, মানব-দানবের সংঘাতে আমরা মানবের, মানবতার, মনুষ্যত্বের জয় দেখতে চাই আর সে জন্যই নজরুল আজও প্রাসঙ্গিক। নজরুলের বাণী, 'মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই নহে কিছু মহীয়ান' আজও অম্লান।

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
স্থায়ী কমিটির বিবৃতিতে বিএনপি সরকারকে অনতিবিলম্বে সংলাপ আয়োজনের আহ্বান জানিয়েছে। আপনি কি মনে করেন সংলাপ দ্রুত সময়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত হবে?
4 + 1 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
জুলাই - ১৩
ফজর৩:৫৩
যোহর১২:০৪
আসর৪:৪৪
মাগরিব৬:৫২
এশা৮:১৫
সূর্যোদয় - ৫:১৯সূর্যাস্ত - ০৬:৪৭
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :