The Daily Ittefaq
ঢাকা, শুক্রবার, ২৪ মে ২০১৩, ১০ জৈষ্ঠ্য ১৪২০, ১৩ রজব ১৪৩৪
সর্বশেষ সংবাদ অচিরেই দেশে আন্দোলন-সংগ্রামের নেতৃত্ব দেবেন তারেক : শামসুজ্জামান দুদু | ঢাকা-চট্টগ্রাম ও বরিশাল বিভাগে অতিভারী বর্ষণের আশঙ্কা | আগামী রবিবার ১৮ দলের সকাল-সন্ধ্যা হরতাল

মানিকগঞ্জে নজরুল

মিয়াজান কবীর

১৯২১ সালের এপ্রিলে কবি নজরুল কলকাতা থেকে আলী আকবর খানের সঙ্গে বেড়াতে আসেন কুমিল্লায়। কুমিল্লায় এসে আলী আকবর খান নজরুলকে নিয়ে ওঠেন ইন্দ্রকুমার সেনের শহরের কান্দিরপাড়ের বাসায়। ইন্দ্রকুমার সেনের ছেলে ধীরেন্দ্রকুমার সেন ছিলেন আলী আকবর খানের ছাত্রজীবনের বন্ধু। সেই সূত্র ধরে আলী আকবর খান নজরুলসহ চার-পাঁচ দিন অবস্থান করেন ইন্দ্রকুমার সেনের বাসায়। এই সময় সেন পরিবারের সঙ্গে নজরুলের প্রথম পরিচয় হয়।

ইন্দ্রকুমার সেনের প্রকৃত বাড়ি ছিল মানিকগঞ্জ জেলার শিবালয় থানার 'তেওতা' গ্রামে। তিনি কোর্ট অব ওয়ার্ডসের ইনসপেক্টর হিসেবে কুমিল্লায় নিয়োজিত ছিলেন। তাঁর বড় ভাই বসন্তকুমার সেন ছিলেন ত্রিপুরা রাজ্যের নায়েব। বসন্তকুমার সেনের মৃত্যুর পর সংসারে নেমে আসে চরম দুঃখ-দুর্দশা। ফলে নিরুপায় হয়ে গিরিবালা দেবী স্বামীর ভিটেমাটি 'তেওতা' ছেড়ে আশ্রয় নেন ইন্দ্রকুমার সেনের কুমিল্লার বাসায়। নজরুল ছিলেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে ফেরা এক সৈনিক কবি। তখনও 'লেফট-রাইট' কুচকাওয়াজের ঝংকার সুরে সঞ্চারিত ছিল তাঁর মনে-প্রাণে। সেন পরিবারের ছেলে ধীরেন্দ্রকুমার সেন ছিলেন স্বদেশি আন্দোলনের নেতৃস্থানীয় নেতা। করমচাঁদ গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনে সাড়া দিয়ে ঈশ্বর বিদ্যালয়ের চাকরি থেকে দিয়েছেন ইস্তফা। আর নজরুল ছিলেন কমরেড মুজফ্ফর আহমদের বন্ধু। দেশের স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত এক সংগ্রামী পুরুষ। প্রথম আলাপচারিতায় দুজনের মাঝে গড়ে ওঠে হূদ্যতা। সেইসাথে ধীরেন্দ্রকুমার সেনের মা বিরজাসুন্দরী দেবী ও কাকিমা গিরিবালা দেবীর উদার মুক্তমনা মাতৃস্নেহে মুগ্ধ হন কবি। উদার আবহাওয়ায় বেড়ে ওঠা বীরেন্দ্রকুমার সেনের কাকাতো বোন আশালতা সেন ওরফে দোলন দেবী দুলি, আর তাঁর নিজের ছোট বোন কমলা দেবী বাচ্চি ও অঞ্জলি দেবী জটুর সংগীত শুনে কবি বিমোহিত হয়ে পড়েন।

আলী আকবর খান 'মা' বলে সম্বোধন করতেন বিরজাসুন্দরী দেবীকে। কবি নজরুলও অনুরূপ 'মা' বলে ডাকতে থাকেন। নজরুলের সুন্দর মুখাবয়ব, লাজুক-নম্র স্বভাব, মিষ্টি হাসি, ডাগর ডাগর মায়াবি চোখের চাউনিতে সেন পরিবারের সবাই আকৃষ্ট হন। আর রাতে কবির সুমধুর কণ্ঠে গান শুনে তো সবাই হতবাক। কুমিল্লা শহরে মানিকগঞ্জের সেন পরিবারের সঙ্গে নজরুলের গড়ে ওঠে এক অন্তরঙ্গ মধুর সম্পর্ক।

প্রথম যেদিন কবির সঙ্গে দুলির দেখা হয়েছিল, সেই প্রথম দেখাতেই কবির ভালো লেগেছিল তাকে। চৈত্রের শেষে বসন্তলগনে চোখে চোখে ঘটেছিল যে মিলন, হিয়ায় হিয়ায় জেগেছিল যে শিহরণ, আষাঢ়ের নবঘন বরষায় সে প্রেমের অঙ্কুর ভরে ওঠে পত্রমঞ্জরীতে।

সেই ফুল বসন্ত-সুখ বসন্তে মধুর লগনে চৈত্রের উতল হাওয়ায় কবির মনে জেগেছিল দোলা। কবি সংগোপনে মানসপটে এঁকেছিলেন গোপন প্রিয়া দুলির প্রতিচ্ছবি। কবির গোপন অভিসারের কথা প্রকাশ করেন তাঁর 'পূজারিণী' কবিতায়:

'মনে পড়ে বসন্তের শেষে আসা ম্লান মৌন মোর আগমনী সেই নিশি,

সেদিন আমার আঁখি ধন্য হল তব আঁখি চাওয়াসনে মিশি।'

কালের খেয়ায় চড়ে ১৯২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে নজরুল আবার কুমিল্লায় আসেন প্রিয়ার টানে। এই সময় 'দোল উত্সবে' কবি বেড়াতে আসেন ধীরেন্দ্রকুমার সেনের সঙ্গে পদ্মার পারে যমুনার তীরে মানিকগঞ্জের 'তেওতা' গ্রামে। কবি-প্রিয়া দুলিও সহযাত্রী হয়ে এসেছিলেন তাঁর জন্মভূমি 'তেওতা'য়। যমুনার তীরে আম-জাম-কাঁঠাল-লিচু-বেল আর সারি সারি নারকেল গাছে ঘেরা ছায়াপল্লি পরিবেশ দেখে মুগ্ধ হন নজরুল। এই রূপময় সবুজ-শ্যামল সুন্দর প্রকৃতির হাতছানিতে ব্যাকুল হয়ে টইটই করে ঘুরে ফিরেন সারা গ্রাম। দুপুরের নির্জনতা ভেঙে তেওতার জমিদার হরশঙ্কর রায় চৌধুরীর শান বাঁধানো পুকুরঘাটে বসে মনের হিল্লোলে সুর তোলেন বাঁশিতে। সে সুরের মাদকতায় বিমোহিত হয়ে পড়েন প্রান্থসখাজন। তেওতায় এসে বাঁধনহারা নজরুল হয়ে পড়লেন হ্যামিলনের এক বংশীওয়ালা। আবার কখনো জমিদার বাড়ির পুকুরে সাঁতার কেটে এ-পাড় থেকে ও-পাড় গিয়ে মনের আনন্দে হো হো করে হেসে ওঠেন কবি। নজরুলের দুরন্তপনায় আর প্রতিভাবলে তেওতা গ্রামের ছোট-বড় সকলের হয়ে ওঠেন প্রিয়জন।

'তেওতা' গ্রামের 'দোল উত্সবে' নর-নারীর মিলনমেলা ছোট-বড়, ধনী-গরিবের মহাসম্মিলন দেখে কবি আকুলিত হন আর ঢাকঢোল, শঙ্খ-করতালে কবির মনে জাগে হিন্দোল। 'তেওতা'য় কবির এত হাসি-গান, এত উল্লাস-উচ্ছ্বাস সব কিছুকে ছাপিয়ে একসময় বেজে ওঠে বিদায়ের সকরুণ সুর।

নজরুল অশ্রুসিক্ত ব্যথাভরা মন নিয়ে বিদায় নেন প্রেয়সীর কাছ থেকে। পেছনে পড়ে থাকে যমুনার সলিলকন্যা 'তেওতা' আর কবি-প্রিয়া 'দোলনচাঁপা'। কবি-প্রিয়া বিরহ-ব্যথায় গাঁথেন অশ্রুমালা। দুলির ডাগর চোখের কালো কাজল যমুনার জলে মিশে একাকার হয়ে প্রতিবিম্বিত হয় কবির সুন্দর মুখচ্ছবি।

দুলি, সে তো নারী অবলা। সমাজের শাসন-বাঁধন শত বিপত্তি আরও রয়েছে জাতিভেদের প্রতিবন্ধকতা। দুলির না বলা মনের কথা যেন 'চিরদিন থাকিব তোমার।'

১৯২২ সালের সেপ্টেম্বরে নজরুলের লেখা 'আনন্দময়ীর আগমনে' শীর্ষক কবিতাটি প্রকাশিত হয় 'ধূমকেতু' পত্রিকায়। এতে ব্রিটিশ সরকারের রাজতখত কেঁপে ওঠে। ব্রিটিশ সরকার কবি নজরুলের নামে করে হুলিয়া জারি। ফলে নজরুল গিরিবালা ও দুলির সঙ্গে এসে আত্মগোপন করেন নিভৃতপল্লি 'তেওতা'য়। কবি ছিলেন চিরচঞ্চল, চিরকিশোর; রাজরোষে পড়ে আত্মগোপন করতে এসেও চির উদ্দাম যৌবনদীপ্ত কবি ঘরে বসে না থেকে দুলিকে নিয়ে ঘুরে বেড়ান ছায়াবীথিঘেরা 'তেওতা'র পথপ্রান্তরে। কবির চপল চঞ্চলতায় আবার জেগে ওঠে 'তেওতা' গ্রামখানি। মুখরিত হয়ে ওঠে 'তেওতা'র জনপদ।

'তেওতা' বর্ধিষ্ণু হিন্দু অধ্যুষিত একটি গ্রাম। এই গ্রামের অভিজাত এক হিন্দু পরিবারের মেয়ে দুলি। নজরুলকে হিন্দু পরিবারের মেয়ের সঙ্গে অবাধে মেলামেশা করতে দেখে তেওতার জমিদার হরশঙ্কর রায় চৌধুরী ক্ষুব্ধ হয়ে তাঁর সঙ্গে রূঢ় আচরণ করেন। এতে দুলির পরিবার মনক্ষুণ্ন হয়ে নজরুলকে নিয়ে কুমিল্লায় চলে যান।

তখনকার সময় 'তেওতা'র সমাজব্যবস্থা ছিল খুবই রক্ষণশীল। গিরিবালা দেবী দুলিসহ নজরুলকে নিয়ে কুমিল্লায় চলে গেলেও দুলির বড় মা আঙুরি দেবীকে 'একঘরে' করে রাখা হয়। 'তেওতা' গ্রামের কমলা দাশগুপ্তা (১৯১৫) বলেন:'দুলি তার মা গিরিবালা দেবীর সঙ্গে কুমিল্লায় কাকা ইন্দ্রকুমার সেনের বাসায় থাকতেন। তাঁর বড় মা আঙুরি দেবী থাকতেন তাঁর স্বামীর ভিটায় তেওতা গ্রামে। নজরুল আর দুলির প্রেমঘটিত বিষয় জানাজানি হয়ে গেলে আঙুরি দেবীকে একঘরে করে রাখা হয়। তাঁর সঙ্গে কেউ মিশত না, এমনকি কেউ কথাও বলত না। আমি আর প্রবোধচন্দ্র দাশগুপ্তের স্ত্রী প্রীতিকণা দাশগুপ্তা গোপনে গোপনে আঙুরি দেবীর সঙ্গে মিশতাম।'

বাঁধনহারা কবি নজরুলের তারুণ্যে ভরা উচ্ছল-উচ্ছ্বাস-উদ্দামতাকে তেওতার জমিদার হরশঙ্কর রায় চৌধুরী উচ্ছৃঙ্খল মনে করলেও তেওতাবাসী ভালবেসেছিলেন নজরুলকে। কবির পদচারণায় জাগরণ ঘটেছিল তেওতা জনপদে। তেওতাবাসীর কাছে আজও রূপকথার গল্পগাথায় চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম।

কবি ভালোবেসেছিলেন তাঁর প্রেয়সী দুলিকে। তেমনি ভালবেসেছিলেন দুলির জন্মভূমি তেওতা গ্রামকে। নজরুল তাঁর প্রিয়ার জন্মস্মৃতি তেওতা গ্রামকে নিয়ে লিখেছেন 'ছোট হিটলার' শীর্ষক এক অনবদ্য কবিতা। কবির আদরের পুত্র সানি ও নিনির মুখ জবানিতে লিখেছেন:

'মাগো! আমি যুদ্ধে যাবো নিষেধ কি মা আর মানি?

রাত্তিরে রোজ ঘুমের মাঝে ডাকে পোলান্ড-জার্মানি।

ভয় করি না পোলিশদেরে জার্মানির ঐ ভাঁওতাকে,

কাঁপিয়ে দিতে পারি আমার মামা বাড়ি "তেওতা"কে।

কোল ন্যাওটা তোমার "নিনি" তোমার নামে আধখানা,

তোমার "সানি" যুদ্ধে যাবে মুখটি করে চাঁদপনা।'

মানিকগঞ্জবাসীর সঙ্গে নজরুলের গড়ে উঠেছিল এক অকৃত্রিম হূদ্যতা। বলতে গেলে নজরুল জীবনে মানিকগঞ্জ ছিল এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়। তাই শত ব্যস্ততার মাঝেও কবি মানিকগঞ্জবাসীর ডাকে সাড়া দিয়ে বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে রাজনৈতিক সভা-সমাবেশে, সাহিত্যসম্মেলনে মানিকগঞ্জে এসে সভাকে করেছেন অলঙ্কৃত, করেছেন গৌরবোজ্জ্বল।

১৯২৪ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে রজনী মোহন বসাকের উদ্যোগে মানিকগঞ্জ শহরে ঢাকা জেলার কংগ্রেস কমিটির এক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। কবি নজরুল ও চিত্তরঞ্জন দাশ এককালের 'গেট অব ইন্ডিয়া'খ্যাত আরিচাঘাটে এসে পৌঁছালে এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে তাঁদের জানানো হয় প্রাণঢালা অভিনন্দন। তারপর আরিচাঘাট থেকে ঘোড়ার গাড়িতে চড়িয়ে নিয়ে আসা হয় বেউথাঘাটে। এখানে থেকে ভিক্টোরিয়া ও মডেল স্কুলের শিক্ষক, ছাত্র-ছাত্রী ও জনগণ তাদের বরণ করেন ফুলের মালা দিয়ে। নজরুল ও চিত্তরঞ্জন দাশকে রজনী মোহন বসাকের শহরের নান্দনিক শিল্পমণ্ডিত বাড়িতে (বর্তমান মহিলা কলেজ হোস্টেল) নিয়ে আসা হয়। সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল কালীবাড়ির উন্মুক্ত মাঠপ্রাঙ্গণে।

নজরুল সভামঞ্চে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করেন, 'আমি জেলে বসে যেসব গান রচনা করেছি, সেই গান আপনাদের শোনাব।' এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে উচ্চ স্বরে গাইতে লাগলেন:

'এই শিকল পরা ছল মোদের এ শিকল পরা ছল,

এই শিকল পরেই শিকল তোদের করবরে বিকল।'

কবি দরাজকণ্ঠে আরও গাইলেন:

'জাতের নামে বজ্জাতি সব জাত-জালিয়াত্ খেলছ জুয়া,

ছুঁলেই তোর জাত যাবে? জাত ছেলের হাতে নয় ত মোয়া'

গানের সুরে যেন অগ্নি-বারুদ জ্বলে ওঠে। উপস্থিত দর্শক-শ্রোতাদের ঘনঘন হর্ষধ্বনিতে কবি উত্ফুল্ল হয়ে একের পর এক গান গাইতে থাকেন। কবির গানে যখন সত্যি সত্যি জনমনে দাবানলের সৃষ্টি হয়, ঠিক সেই মুহূর্তে মানিকগঞ্জ মহকুমা প্রশাসনের দুজন কর্মকর্তা ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট আবদুল হালিম চৌধুরী (শহীদ মুনীর চৌধুরীর বাবা) ও সাব-ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট আবদুল খালেক (কবি কায়কোবাদের ছোট ভাই) সভাস্থল ত্যাগ করেন। যদিও দুজনই ছিলেন সাহিত্যানুরাগী। তবুও ব্রিটিশ-ভারতীয় রাজ কর্মকর্তা হিসেবে তাঁদের ওপর চাপ সৃষ্টি হতে পারে, এসব কথা ভেবে সভায় উপস্থিত থাকা সমুচিত নয় মনে করে তাঁরা সভা ছেড়ে চলে যান।

মানিকগঞ্জের কংগ্রেস শাখা আয়োজিত সম্মেলনে কবি নজরুল ও চিত্তরঞ্জন দাশের উপস্থিতি সভাকে করেছিল শোভামণ্ডিত। এই সম্মেলনে অতিথিদের খাবার ব্যবস্থা করা হয়েছিল প্রখ্যাত মত্ত গ্রামের জমিদার হেমেন্দ্রকুমার সেনের বাড়িতে। এই অনুষ্ঠানের সম্মানিত অতিথিদের মানিকগঞ্জের বিখ্যাত চন্দনচূড় দই, কই মাছ ছাড়াও প্রচুর পরিমাণে খাইয়েছিলেন মজাদার খাবার। সংবাদপত্রে শিরোনাম বের হয়েছিল, 'দধি হস্তে রজনী বাবু'। এ মুখরোচক সংবাদ শিরোনামটি সারা দেশের মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল।

এরপর সাহিত্যরসপিয়াসী মানুষের উদ্যোগে ১৯২৬ সালে মানিকগঞ্জ শহরে এক সাহিত্য সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। কাজী নজরুল ইসলাম এই সাহিত্য সম্মেলন অলঙ্কৃত করেন একজন সম্মানিত অতিথি হিসেবে। কবি মঞ্চে দাঁড়িয়ে উদাত্ত কণ্ঠে আবৃত্তি করেন স্বরচিত কবিতা। কবিতা তো নয়, যেন কবিতার মালা উপহার দেন উপস্থিত দর্শক-শ্রোতাদের। মানিকগঞ্জবাসী কবির উচ্চকিত কণ্ঠে কবিতা আবৃত্তি শুনে আকুলিত হয়ে পড়েন। যৌবনের কবির উদ্দামতায় মুগ্ধ হয়ে মানিকগঞ্জের এক কৃতী সন্তান ত্রিপুরা শঙ্কর সেন লিখেছেন, 'মনে পড়ে, প্রায় পঁয়তাল্লিশ বছর পূর্বে পূর্ববঙ্গের একটি মফস্বল শহরে (ঢাকা জেলার অন্তর্গত মানিকগঞ্জে) একটি সাহিত্য সম্মেলনে কাজী সাহেবকে প্রথম দর্শনের সৌভাগ্যলাভ করেছিলাম। দেখেছিলাম সে 'বৃষস্কন্ধ' পুরুষটিকে, যার সম্পর্কে মহাকবি কালিদাসের ভাষায় সত্যিই বলা চলে—'আত্মকর্মক্ষমং দেহং ক্ষাত্রোধর্ম ইবাশ্রিতঃ' ক্ষাত্রধর্ম যেন এর মধ্যে আত্মকর্মক্ষম দেহকে আশ্রয় করেছে। মুখমণ্ডলে দুর্জয় সঙ্কল্প ও বলিষ্ঠ পৌরুষের ছাপ। কথাবার্তায়, আবৃত্তি ও গানে উচ্ছল প্রাণপ্রাচুর্য যেন উপচে পড়েছে। সাহিত্য সম্মেলনে বা সাহিত্যিক মজলিশে এবং সম্মেলনের বাইরেও দেখেছি, কবিকে স্বরচিত একটি কবিতা আবৃত্তির অনুরোধ জানালে তিনি দশটি কবিতা আবৃত্তি করেছেন, একটি গান গাইতে অনুরোধ করলে গানের মালা গেঁথে চলেছেন। কোনো তরুণ যুবককে বিষাদগ্রস্ত বা চিন্তান্বিত দেখলে বলেছেন—'তুমি কি মা মরার টেলিগ্রাম পেয়েছো?'

মানিকগঞ্জে এই সাহিত্য সম্মেলনে কবি নজরুলের সহযাত্রী হিসেবে এসেছিলেন প্রখ্যাত সাংবাদিক রমানন্দ চট্টোপাধ্যায়, সাহিত্যিক জলধর সেন, ডক্টর সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ।

১৯৩৯ সালে অ্যাডভোকেট অরুণচন্দ্র রায়ের উদ্যোগে মানিকগঞ্জ শহরে 'ফরওয়ার্ড ব্লক'-এর কর্মী সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। মানিকগঞ্জের শ্রী আনন্দময়ী কালীবাড়ির প্রাঙ্গণে ছিল একটি লম্বা হলঘর। এই হলঘরটির নাম ছিল 'সারস্বত ভবন'। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের বহু ঘটনার সাক্ষী এই ভবনটি। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম নেতা নেতাজী সুভাষ বসু এই সারস্বত ভবনে করেছিলেন বক্তৃতা আর কবি কাজী নজরুল ইসলাম পরিবেশন করেছিলেন সংগ্রামী গান। সভাশেষে নেতাজী সুভাষ বসু মত্তের জমিদার বাড়িতে অবস্থান করেন আর নজরুল শহরের তেজেন্দ্র মিত্র মাস্টার মহাশয়ের বাড়িতে আতিথেয়তা গ্রহণ করেন। মিত্রবাড়ির বধূ চারুবালা মিত্রকে অপরূপা সাজে সজ্জিত দেখে কবি গেয়েছিলেন, 'রুমুঝুমু রুমুঝুমু কে এল নূপুর পায়'। কবিকণ্ঠে গান শুনে মিত্রবাড়ির সবাই আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়েছিলেন।

কবি নজরুল মানিকগঞ্জে এসেছেন একাধিকবার। কখনো তেওতায় আবার কখনো মানিকগঞ্জ শহরে। মানিকগঞ্জে এসেছেন দুলির ভালবাসার টানে আবার রাজনীতি সম্মেলনে ও সাহিত্য মজলিশে।

কবি নজরুল এসেছিলেন সবুজ সীমানা রেখায় আঁকা মানিকগঞ্জের বুকে। সে সুনীল রেখায় কবির মা বিরজা সুন্দরীর ঘর ছিল, ছিল বসতবাড়ি। কবি মানিকগঞ্জে এসেছেন হয়তোবা চিতার বুকে তাঁর হারানো বোন বেলীর স্মৃতির স্মরণে। হয়তোবা কীর্তিনাশার বুকে সর্বগ্রাসী শ্মশান-মশানের সন্ধানে। শত জর্জরিত মায়ের পোড়ো ঘরখানি খুঁজতে। কিংবা মা-মাসিমার পরশ-পুত্র হারা গৃহগুলির সন্ধানে।

নজরুল-প্রমীলা স্মৃতিবিজড়িত যমুনা নদীর পারে মানিকগঞ্জের তেওতা গ্রামখানি পরিগণিত হতে পারে একটি দর্শনীয় স্থান হিসেবে। সেইসাথে ভারতীয় কংগ্রেস নেতা কিরণ শঙ্কর রায় চৌধুরীর অরক্ষিত স্থাপত্যনন্দিত নজরুল-প্রমীলা স্মৃতিধন্য সুন্দর বাড়িটি সংরক্ষণ করে গড়ে উঠতে পারে 'নজরুল-প্রমীলা একাডেমী', 'নজরুল-প্রমীলা পাঠাগার', 'নজরুল-প্রমীলা স্মৃতি জাদুঘর' কিংবা 'নজরুল-প্রমীলা বিশ্ববিদ্যালয়'। যেমনিভাবে অ্যাভন নদীর তীরে শেক্সপিয়ারের জন্মস্থান 'স্ট্যাট ফোর্ড' গ্রামটিতে 'শেক্সপিয়ার মেমোরিয়াল থিয়েটার', জর্জ বার্নাড শর বাড়ি 'অয়োটসেন্ট লরেন্স' গ্রামখানি এখন পরিগণিত হয়েছে জাতীয় পর্যটন হিসেবে কিংবা দক্ষিণ ডিহি গ্রামে গড়ে উঠেছে রবীন্দ্র কমপ্লেক্স।

নজরুল আমাদের জাতীয় কবি। তাঁর লেখা গান-কবিতা আমাদের জীবনে প্রতিফলন ঘটেছে। উনিশ-শ একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে প্রেরণা দিয়েছে, সাহস জুগিয়েছে নজরুলের সংগ্রামী গান। নজরুলের স্মৃতি আমাদের হূদয়ে অম্লান; অব্যয়-অক্ষয়।

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
স্থায়ী কমিটির বিবৃতিতে বিএনপি সরকারকে অনতিবিলম্বে সংলাপ আয়োজনের আহ্বান জানিয়েছে। আপনি কি মনে করেন সংলাপ দ্রুত সময়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত হবে?
2 + 2 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
ফেব্রুয়ারী - ২৯
ফজর৫:০৫
যোহর১২:১২
আসর৪:২৩
মাগরিব৬:০৪
এশা৭:১৭
সূর্যোদয় - ৬:২১সূর্যাস্ত - ০৫:৫৯
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :