The Daily Ittefaq
ঢাকা, শুক্রবার, ২৪ মে ২০১৩, ১০ জৈষ্ঠ্য ১৪২০, ১৩ রজব ১৪৩৪
সর্বশেষ সংবাদ অচিরেই দেশে আন্দোলন-সংগ্রামের নেতৃত্ব দেবেন তারেক : শামসুজ্জামান দুদু | ঢাকা-চট্টগ্রাম ও বরিশাল বিভাগে অতিভারী বর্ষণের আশঙ্কা | আগামী রবিবার ১৮ দলের সকাল-সন্ধ্যা হরতাল

নজরুলের পল্টন-জীবন

হোসেন মাহমুদ

বাংলা সাহিত্যের একমাত্র 'সৈনিক কবি' কাজী নজরুল ইসলাম। মেধা ও প্রতিভার দীপ্তিতে উজ্জ্বল নজরুল ১৯১৭ সালে সেকালের ম্যাট্রিক পরীক্ষার প্রায় পূর্বমুহূর্তে ৪৯ নং বাঙালি পল্টনে যোগ দিয়েছিলেন। তখন তাঁর বয়স ছিল ১৮ বছর। নজরুল ঠিক কোন তারিখে ব্রিটিশ ভারতীয় সেনা বাহিনীতে যোগ দেন, তা জানা যায়নি। তবে সবার ধারণা যে, এটা ১৯১৭ সালের মাঝামাঝি কোনো সময়ে হবে। সে সময় অর্থাত্ প্রথম মহাযুদ্ধকালে (১৯১৪-১৮) বাঙালি তরুণদের ব্রিটিশ ভারতীয় সেনা বাহিনীতে যোগদান করাতে প্রায় সারা বাংলাদেশ জুড়েই ব্যাপক প্রচারণা চলছিল, আর তাতে মোটামুটি সাড়াও মিলছিল। নজরুল যে সৈনিক হলেন, তা তাঁর জীবনের বাস্তব পরিস্থিতির চাপে নাকি তা অভিভাবকের নিয়ন্ত্রণহীন দামাল কিশোরের সাময়িক খেয়ালে, সে ব্যাপারে বিশেষ কিছু জানা যায় না। এ বিষয়ে 'হেনা' গল্পের নায়কের জবানিতে নজরুলের পরোক্ষ ভাষ্যটির কথা এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে :'তবু আমি সরল মনে বলছি, ইংরেজ আমার শত্রু নয়। এ আমার শ্রেষ্ঠ বন্ধু। যদি বলি আমার এ যুদ্ধে আসার কারণ, একটা দুর্বলকে রক্ষা করবার জন্য প্রাণ আহূতি দেওয়া তাহলে ঠিক উত্তর দেয়া হয় না। আমার অনেক খামখেয়ালীর অর্থ আমি নিজেই বুঝি না।' কবির সহপাঠী, অন্তরঙ্গ বন্ধু ও প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় বলেছেন—'নজরুল জীবনের নিগূঢ়তম বেদনার কাহিনীও আমি জানি। সে বেদনার সঙ্গে মিশেছিল কৈশোরের দুর্দমনীয় অ্যাডভেঞ্চার প্রীতি। তাই সবকিছু হাসি মুখে পরিত্যাগ করে সেও ঝাঁপ দিয়েছিল এই মরণযজ্ঞে।' নজরুলের বিশিষ্ট সুহূদ কমরেড মুজফ্ফর আহমদ লিখেছেন—'প্রথম মহাযুদ্ধের সময় জোর লেখালেখি হতে থাকল যে বাঙ্গালীদেরও সৈন্যদলে ভর্ত্তি করা হোক। শেষ পর্যন্ত ১৯১৭ সালে ভারতের বৃটিশ গবর্ণমেন্ট একটি বেঙ্গলী ডবল কোম্পানী গঠন করতে রাজী হলেন। তখন সেই সময়ের দেশ নেতারা সৈন্যদলে ভর্ত্তি হওয়ার জন্য বাঙ্গালী যুবকদের আহবান জানালেন। অন্য অনেক যুবকের মতো রাণীগঞ্জের শিয়ারশোল রাজ হাই স্কুলের দশম শ্রেণীর প্রথম ছাত্র কাজী নজরুল ইসলামও এই আহ্বানে সাড়া দিল। বেঙ্গলী ডবল কোম্পানীতে, পরে বেঙ্গলী রেজিমেন্টে যে বাঙ্গালী যুবকরা যোগ দিয়েছিলেন তাঁদের সকলের মনে কি ছিল তা জানিনে, তবে বহু সংখ্যক লোক ভেবেছিলেন যে এটা একটা দেশপ্রেমের কাজ। নজরুল ইসলামও এই বহু সংখ্যকের একজন ছিল।' তিনি আরও বলেছেন, '...স্কুলের ভালো ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও মেট্রিকুলেশন পরীক্ষা পাশ করার চেয়ে সে দেশপ্রেমকেই উচ্চাসন দিয়েছিল। বেঙ্গলী ডবল কোম্পানীতে যোগ দেওয়ার যে ডাক তার কানে পৌঁছেছিল সে ডাককে দেশপ্রেমের ডাক ধরে নিয়েই সে তাতে সাড়া দিয়েছিল।' দেখা যায়— চির-চঞ্চল, বাঁধন হারা নজরুল সৈন্য বাহিনীতে শুধু যোগই দেননি, সামরিক বাহিনীর কঠিন-কঠোর জীবনের সাথে দিব্যি খাপ খাইয়েও নিয়েছেন। উল্লেখ্য, যে সেই কিশোর বয়স থেকেই তাঁর মধ্যে ব্রিটিশ বিরোধী মনোভাব বিরাজ করছিল। কিন্তু তাঁর সামরিক জীবনের সাথে তা সাংঘর্ষিক হয়নি। সৈন্য বাহিনীতে ভর্তি হওয়ার পর অন্য সবার সাথে নজরুলকে প্রথমে কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম, তারপর ট্রেনে করে লাহোর হয়ে নওশেরাতে নিয়ে যাওয়া হয়। নওশেরা (নৌশহরা) ছিল তত্কালীন উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের (বর্তমানে পাকিস্তানের পাখতুনখোয়া প্রদেশ) পেশোয়ার জেলার একটি মহকুমা শহর। ব্রিটিশরা সেখানে সেনানিবাস প্রতিষ্ঠা করেছিল। নতুন রিক্রুটদের সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো সেখানে। নৌশেরাতে তারা প্রায় মাস তিনেক সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। তারপর নিজ কোম্পানির সাথে নজরুল যান করাচিতে। সৈনিক জীবনের বাকি সময় তাঁর করাচিতেই কাটে। তবে, কার্যোপলক্ষে দু'একবার তিনি বেলুচিস্তানে গিয়েছিলেন বলে জানা যায়। তাঁর সৈনিক বন্ধু জমাদার শম্ভু রায় (তিনি যুদ্ধশেষে প্রথমে সাব ডেপুটি কালেক্টর, পরে ট্রেজারি অফিসার হয়েছিলেন) জানিয়েছেন, 'কাজীর অন্তর ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে; অতএব বিদ্রোহী, তথাপিও শিক্ষানবিশিতে কাজী কখনও আইন বা নিয়ম বিরুদ্ধ কাজ করেননি। তাঁর শিক্ষানবিশি কৃতিত্বপূর্ণই ছিল। ....কাজী পল্টনে অত্যন্ত নিয়মানুবর্তী ও সভ্য জীবন যাপন করেছেন।' শুধু তাই নয়, সাধারণ সৈনিক থেকে ঈর্ষণীয় ভাবে খুব কম সময়ের মধ্যে তিনি ল্যান্স নায়েক ও নায়েক পদ পেরিয়ে হাবিলদার হন। এ বিষয়ে ৪৯ নং বাঙালি পল্টনের সাবেক সৈনিক প্রখ্যাত সাহিত্যিক-গবেষক মাহবুব-উল-আলম তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'পল্টন জীবনের স্মৃতি'তে লিখেছেন—'সেপাই থেকে ল্যান্স নায়েক, ল্যান্স নায়েক থেকে নায়েক। নায়েক থেকে হাবিলদার। তাঁর অসাধারণ চরিত্রই এটা সম্ভব করে তুলেছিল।' হাবিলদার পদে উন্নীত হওয়ার পর তাঁকে দেওয়া হয় ব্যাটালিয়ন কোয়ার্টার মাস্টারের দায়িত্ব অর্থাত্ তিনি হলেন ব্যাটালিয়ন কোয়ার্টার মাস্টার হাবিলদার। এই কোয়ার্টার মাস্টার হাবিলদার কী? এ বিষয়ে বিশদ ব্যাখ্যা সামরিক বাহিনীর লোকেরাই ভালো দিতে পারবেন। আমরা সাধারণ মানুষ এ ব্যাপারে জনাব মাহবুব-উল-আলমের স্মরণাপন্ন হতে পারি—'কোয়ার্টার মাস্টার হাবিলদার। সুতরাং প্যারেডের বা অন্য ডিউটির বালাই নেই। কাঁচা রসদ সাপ্লাই থেকে নিয়ে এসে বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটে যোগান দেওয়া এটাই কোয়ার্টার মাস্টারের হাল ঠাট কাজ।'

জানা যায়, নজরুলের পল্টন জীবন ছিল তাঁর জন্য সত্যিই আনন্দময়। সেনাবাহিনীর জীবনে যা সম্ভব নয় সেটাই নজরুলের জীবনে ঘটেছিল। বলা দরকার, নজরুল ছিলেন একজন সাধারণ সৈনিক। কোন যুদ্ধে তাঁর যোগদানের সুযোগ হয়নি, অসাধারণ কোন কৃতিত্ব প্রদর্শনের ঘটনাও তাঁর বেলায় ঘটেনি। সুতরাং ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীর কাগজপত্রে তাঁর সৈনিক জীবনের কোন বিবরণ নেই, থাকার কথাও নয়। তারপর আবার তিনি যে বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন, যুদ্ধের পর অপ্রয়োজনীয় বোধে তা ভেঙে দেওয়া হয়। সে যা-ই হোক, গোটা নজরুল জীবনের পটভূমিতে বিচার করলে দেখা যায়—এই পল্টন জীবনই ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে শান্তি ও সুখের সময়। বয়সের দিক থেকে খুব বেশি না এগোলেও সাহিত্য ও সঙ্গীত চর্চার পথে তিনি অনেকখানি এগিয়ে যান। অন্যদিকে সৈনিক জীবন বলতে যে নিয়ন্ত্রিত, রস-কষহীন, নিরানন্দ পরিবেশ বোঝায়—নজরুলের ক্ষেত্রে সে রকম অবস্থা ছিলনা। মাহবুব-উল-আলম লিখেছেন—'তবে হাবিলদার কাজী সাহেবের ব্যাপার অন্য। তিনি বসেছেন হারমোনিয়াম সামনে নিয়ে। কাপের পর কাপ চা খাচ্ছেন, খিলির পর খিলি পান মুখে দিচ্ছেন—আর তার কণ্ঠ থেকে নিঃসৃত হচ্ছে গানের পর গান।' কিন্তু সৈনিক জীবনের কঠিন-কঠোর নিয়ম-শৃঙ্খলার মধ্যে এটা কি করে সম্ভব? মাহবুব-উল-আলম বলেছেন- 'কেউ তাঁকে না ভালোবেসে পার্ত না। তাঁর প্রতিভার ছোঁয়া লেগে প্রত্যেককেই অভিভূত হতে হতো। ... করাচি কর্তৃপক্ষ তাঁর উপর আদেশ চালাবার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছেন। তিনি নিজেই নিজের নিয়ন্তা হয়ে আপন জগত্ রচনা করে চলেছেন। ...করাচিতে নজরুল প্রতিভা এক দিগ্বিজয়ের আকার নিয়েছিল। তাঁকে খাটাবে কি, শাসন কর্বে কি—সেসব কথা কারো মনে হয়নি। তাঁকে কোয়ার্টার মাস্টারের বিভাগে আসীন করে দিয়ে তাঁরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেল্লেন।' ড. রফিকুল ইসলাম বলেছেন—'করাচি সেনানিবাসে নজরুলের সাহিত্য চর্চার সঙ্গে সঙ্গে সঙ্গীত চর্চাও অব্যাহত গতিতে চলেছে। সেনাবাহিনীতে মিলিটারি ব্যান্ডের বদৌলতে ভাল বাদ্য যন্ত্রের অভাব ছিল না, নজরুল সেগুলো ব্যবহারের সুযোগ পেয়েছিলেন এবং এই সুযোগে যন্ত্র সঙ্গীতে হাত পাকিয়ে নেন। সেনানিবাসে যন্ত্র সঙ্গীতের শিক্ষকও তিনি পেয়ে গিয়েছিলেন, হুগলীর পূর্বোল্লিখিত হাবিলদার নিত্যানন্দ নজরুলের ব্যাটালিয়নেই ছিলেন, তিনি ভাল অরগ্যান বাজাতে পারতেন। নজরুল অরগ্যান শেখেন তার কাছেই।'

শুধু গান, উল্লাস বা হৈ-হুল্লোড় নয়, নজরুলের সৈনিক জীবন ছিল তাঁর সাহিত্যিক আত্মপ্রকাশের প্রস্তুতি কালও বটে। কবি, প্রাবন্ধিক ও গল্পকার নজরুলের পরবর্তী কালের মহীরুহের অঙ্কুর ডালপালা মেলতে শুরু করেছিল এই সামরিক পরিবেশেই। জানা যায়, বাংলাদেশ থেকে বহুদূরে সেই করাচিতেও নজরুল বাংলাদেশের সাহিত্য জগতের সাথে যোগাযোগ অক্ষুণ্ন রাখেন। কলকাতার উল্লেখযোগ্য সাহিত্য পত্রিকাগুলোর গ্রাহক ছিলেন তিনি। এই-ই সব নয়। শম্ভু রায় বলেন, 'কাজীর পড়াশোনার প্রতি বেশ প্রীতি ছিল। রবীন্দ্রনাথের প্রায় সমস্ত পুস্তকই ও শরত্চন্দ্রের সব লেখাই কাজীর কাছে ছিল। তাছাড়া মাসিক পত্রাদি 'প্রবাসী ', 'ভারতবর্ষ ', 'ভারতী', 'মানসী ও মর্মবাণী', 'সবুজপত্র' প্রভৃতি সবই কাজী রাখত।" ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর একজন সামান্য ও দরিদ্র সৈনিকের পক্ষে এই সাহিত্য প্রীতিকে অসাধারণ বললেও কম বলা হয়। আরো কথা, নজরুল করাচি থেকেই বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় লেখা পাঠাতে থাকেন। এসব লেখায় লেখকের নাম থাকত 'হাবিলদার কাজী নজরুল ইসলাম।' পাঠানো লেখাগুলোর সবই যে প্রকাশিত হয়েছিল, তা নয়। ড. রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, করাচিতে বসে লেখা ও সেখান থেকে পাঠানো নজরুলের যেসব রচনা কলকাতার পত্র-পত্রিকায় ছাপা হয় সেগুলো হলো: ১.' বাউন্ডেলের আত্মকাহিনী', (গল্প), সওগাত, জ্যৈষ্ঠ-১৩২৬; ২. 'মুক্তি' (কবিতা), বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা, শ্রাবণ-১৩২৬; ৩. 'স্বামীহারা', (গল্প), সওগাত, ভাদ্র-১৩২৬; ৪. 'কবিতা-সমাধি' (হাসির কবিতা), সওগাত, আশ্বিন-১৩২৬; ৫. 'তুর্ক মহিলার ঘোমটা খোলা' (প্রবন্ধ), সওগাত, কার্তিক-১৩২৬; ৬. 'হেনা' (গল্প), বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা, কার্তিক-১৩২৬; ৭. 'আশায়' (হাফিজের গজলের বাংলা ভাবানুবাদ), প্রবাসী, পৌষ-১৩২৬; ৮. 'ব্যথার দান' (গল্প), বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা, মাঘ, ১৩২৬; ৯. 'মেহেরনেগার' (গল্প), নূর, মাঘ - ১৩২৬; ১০. 'ঘুমের ঘোরে' (গল্প), নূর, ফাল্গুন-১৩২৬। উল্লেখ করা যেতে পারে যে 'বাউন্ডেলের আত্মকাহিনী' হল নজরুলের প্রথম প্রকাশিত গল্প, 'মুক্তি' হল তার প্রথম প্রকাশিত কবিতা ও 'তুর্ক মহিলার ঘোমটা খোলা' হল তাঁর প্রথম প্রকাশিত প্রবন্ধ।

নজরুল করাচি থাকাকালে তিনি ফারসি ভাষাটি বেশ ভালোভাবে আয়ত্ত করেন। 'রুবাইয়াত্-ই-ওমর খৈয়াম'-এর মুখবন্ধে তিনি বলেছেন—'আমি তখন স্কুল পালিয়ে যুদ্ধে গেছি, সে আজ ১৯১৭ সালের কথা। সেইখানে আমার হাফিজের সাথে পরিচয় হয়। আমাদের বাঙ্গালী পল্টনে একজন পাঞ্জাবী মৌলবী থাকতেন। একদিন তিনি দীওয়ান-ই-হাফিজ থেকে কতকগুলি কবিতা আবৃত্তি করে শোনান। শুনে আমি এমন মুগ্ধ হয়ে যাই যে সেইদিন থেকে তাঁর কাছে ফারসী শিখতে আরম্ভ করি। তাঁরই কাছে ক্রমে ফারসী কবিদের প্রায় সমস্ত কাব্যই পড়ে ফেলি।' এর প্রত্যক্ষ প্রভাবে আমরা তাঁর কাছ থেকে 'রুবাইয়াত্-ই ওমর খৈয়াম' ও 'দীওয়ান-ই-হাফিজ' নামে দু'টি অত্যুত্কৃষ্ট অনুবাদ কাব্য পেয়েছি।

সেনা বাহিনীর কঠোর নিয়ন্ত্রণের মধ্যেও বাইরের পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ-চাঞ্চল্যকর খবরগুলো নজরুলের কাছে চলে আসত অর্থাত্ তিনি সেসব খবর জানতে পারতেন। যেমন রুশ বিপ্লবের কথা কিংবা ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সংবাদ। শম্ভু রায় জানিয়েছেন—'আমাদের ব্যারাকের কর্তৃপক্ষের শ্যেনদৃষ্টি ছিল যাতে আমরা বাইরে থেকে কোনরকম রাজনৈতিক খবর না পাই। সেজন্য পত্র-পত্রিকা যা আসত তা পরীক্ষা করে আমাদের দেয়া হত। তা সত্বেও 'বজ্র আাঁাটুনি ফসকা গেরো'র মতো হওয়ার দরুন ওসব খবরাখবর কী করে যোগাড় করত সেই জানে।

নজরুলের আড্ডা থেকেই বাছাই করা কয়েকজনকে সে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সংবাদ দিত, যেমন আইরিশ বিদ্রোহ ও রুশদের কথা। ....

একদিন সন্ধ্যায়, ১৯১৭ সালের শেষের দিকেই হবে... অন্যান্য দিনের চেয়ে নজরুলের চোখেমুখে একটা অন্যরকম জ্যোতি খেলে বেড়াচ্ছিল।...নজরুল সেদিন যেসব গান গাইলেন ও প্রবন্ধ পড়লেন তা থেকেই আমরা জানতে পারলাম যে রাশিয়ার জনগণ জারের কবল থেকে মুক্তি পেয়েছে।"

করাচি অবস্থানকালে রচিত নজরুলের কোন কোন লেখা থেকে সে সময় অনেকেরই ধারণা হয় যে তিনি সৈনিক হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে ও ইউরোপেও গিয়েছিলেন। ড. রফিকুল ইসলামের মতে, " 'রিক্তের বেদন' (প্রকাশকাল ডিসেম্বর ১৯২৪) গ্রন্থে প্রকাশকদের পক্ষে লিখিত কবি মোহাম্মদ মোজাম্মেল হকের নিবেদনে এ ভ্রান্ত ধারণার উদ্বোধন হয়। তিনি লিখেছেন : রণ কোলাহলের মত্ততার মাঝে জন্মেছিল তরুণ কবির ভাব রাজ্যের দ্যোতনা ভরা এই উচ্ছ্বাস! মেসোপটেমিয়ার ধূলি ঝেড়ে আমার ন্যায় অযোগ্য ব্যক্তিকেই একে কোল দিতে হয়েছিল।

একই ধারণা পোষণ করতে দেখা যায় সেকালে বাঙালি মুসলমানের প্রধান সাহিত্য মুখপত্র 'সওগাত'-এর সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনকেও। ১৩৫৪ সালের আষাঢ় সংখ্যা 'সওগাত' পত্রিকায় "নজরুলের প্রথম কবিতা" শীর্ষক সম্পাদকের লেখা ভূমিকা লিপিতে তিনি বলেন—" নজরুল ইসলাম তখন মেসোপটেমিয়ায় ভারতীয় সেনাদলে হাবিলদারের কাজ করিতেছিলেন। তিনি সওগাতে প্রকাশের জন্য অজস্র কবিতাও পাঠাইতেন।"

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস রচয়িতা ড. সুকুমার সেনের মত বিজ্ঞজনও এ ভুল করেছেন বলে দেখা যায়। তিনি লিখেছেন: মেসোপটেমিয়ায় বাঙ্গালী পল্টনের মুসলমান সিপাহীদের তদারকের জন্য একজন পাঞ্জাবী মৌলবী নিযুক্ত ছিলেন। ...মেসোপটেমিয়ায় গিয়া নজরুল স্বাধীনতাকামী নবজাগ্রত মুসলিম রাষ্ট্র তুর্কীর উদ্যম খানিকটা প্রত্যক্ষ করিয়াছিলেন। ইহাই তাঁহার কবিতায় বিদ্রোহ উল্লাসের সুর আনিয়াছিল।

অথচ বাস্তব হল, তিনি করাচি বা ভারতের বাইরে কোথাও কখনোই যাননি। নজরুল মধ্যপ্রাচ্যে গিয়েছিলেন কিনা সে ব্যাপারে তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু প্রাণতোষ চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন—'এই সৈন্যদলের অনেকে এখনো বাঁচিয়া আছেন। তাঁহাদের কাছ হইতে এবং স্বয়ং কবির মুখ হইতে শুনিয়াছি যে, তাহারা করাচি ছিলেন, তৈরী ছিলেন ডাক পড়িলে যাওয়ার জন্য। কিন্তু ডাক পড়ে নাই যাওয়াও হয় নাই।'

ড. রফিকুল ইসলাম করাচি নজরুল একাডেমীর সাবেক সম্পাদক মিজানুর রহমানের করাচিতে অনুসন্ধানের বরাতে জানিয়েছেন—'এখন অনুসন্ধানে জানা গেছে যে নজরুল করাচির বাইরে যান নাই।'

নজরুল চরিত্রের এ সময়কার আরেকটি বৈশিষ্ট্যের কথা জানিয়েছেন শম্ভু রায়। তিনি বলেছেন—'কাজী যে কাজ আরম্ভ করত তা শেষ না করে কখনও ছাড়ত না। তাই যে লেখা সে পল্টনে যাওয়ার আগেই আরম্ভ করেছিল সে অভ্যাস সে সমস্ত পল্টনের জীবনেই চর্চা করে গেছে।' তাঁর এ কথার সত্যতা মেলে সৈনিক জীবনে নজরুলের অবিরাম লেখালেখি থেকে।

নজরুল স্বভাবে ছিলেন বিদ্রোহী, ব্রিটিশ বিরোধী, স্বাধীনতাকামী। যে কোন কারণেই হোক, তিনি ব্রিটিশ-ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। পুরো পল্টন জীবনে তিনি ব্রিটিশ বিরোধী কোন তত্পরতায় জড়িত না হলেও কখনোই তিনি ইংরেজ ভক্ত ছিলেন না। তাঁর তত্কালীন মনোভাবের পরিচয় দিয়েছেন শম্ভু রায়। তিনি বলেছেন—'...কাজী সৈনিকের কাজ বেশ দক্ষতার সঙ্গে শিখে নিয়ে যখন বুঝল যে শুধু সৈনিকের কাজ করা মানে কুকুরবৃত্তি করা , এতে দেশের বা জাতির কল্যাণ কিছুই হবে না, এবং রায় সাহেব, রায়বাহাদুর, খানসাহেব, খানবাহাদুর প্রমুখের মনোভাবই সৃষ্টি হবে, তখন সে কায়মনে নিজের লেখনীর শক্তিতে চারণ-কবি সেজে জাতির চরিত্র ও মনোবল সৃষ্টি করতে চাইল।' এ কথার বাস্তব প্রমাণ মেলে সৈনিক জীবনোত্তর নজরুলের সাহিত্যিক ও সাংবাদিক জীবনের লেখালেখি থেকে। স্বাধীনতার অভিযাত্রায় জাতিকে অগ্রসর করতে তিনি আত্মনিয়োগ করেন।

নজরুলের পল্টন জীবনের মেয়াদকাল দীর্ঘ ছিল না—সাকল্যে পুরো তিন বছরও নয় (জুন-জুলাই ১৯১৭ থেকে মার্চ-এপ্রিল ১৯২০)। কার্যত এটি ছিল তাঁর বেড়ে ওঠার ও ঋদ্ধ হওয়ার সময়। তবে সে ব্যাপারটি আর দশজন কৈশোর কাল অতিক্রমরত মুক্ত পরিবেশে বিচরণকারী সদ্য তারুণ্যে পা দেয়া ছেলেদের মত ছিল না। সৈনিকের সংযত, নিয়ন্ত্রিত, শৃঙ্খলাপূর্ণ জীবনে অনেক কিছুর স্বাদই গ্রহণ করা সম্ভব হত না। কিন্তু নজরুল বিশুষ্ক মাটির মধ্য থেকেই অপরিসীম প্রাণ-প্রাচুর্যে আহরণ করতেন জীবনের অমিয় রস। অসম্ভব ও অসাধ্যকে সম্ভব ও সাধ্য করার দুর্লভ ক্ষমতা ছিল তাঁর, আর এজন্যই তিনি অসাধারণ, অনন্য হয়ে উঠেছিলেন।

সহায়ক গ্রন্থ ও প্রবন্ধ: ১.নজরুল জীবনী—রফিকুল ইসলাম, ১৯৭২; ২. কাজী নজরুল ইসলাম : স্মৃতিকথা—মুজফ্ফর আহমদ, মুক্তধারা, ১৯৭৩; ৩. সহযোদ্ধাদের চোখে সৈনিক নজরুল— মুহাম্মদ লুত্ফুল হক, প্রথম আলো, ২৪ আগস্ট২০১২।

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
স্থায়ী কমিটির বিবৃতিতে বিএনপি সরকারকে অনতিবিলম্বে সংলাপ আয়োজনের আহ্বান জানিয়েছে। আপনি কি মনে করেন সংলাপ দ্রুত সময়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত হবে?
2 + 3 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
জুলাই - ১৩
ফজর৩:৫৩
যোহর১২:০৪
আসর৪:৪৪
মাগরিব৬:৫২
এশা৮:১৫
সূর্যোদয় - ৫:১৯সূর্যাস্ত - ০৬:৪৭
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :