The Daily Ittefaq
ঢাকা, শনিবার ১ জুন ২০১৩, ১৮ জৈষ্ঠ্য ১৪২০, ২১ রজব ১৪৩৪
সর্বশেষ সংবাদ ওকলাহোমায় টর্নেডোর আঘাতে নিহত ৫ | নওয়াজ তৃতীয়বারের মতো পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী | রবিবার নোয়াখালী, ফেনী ও লক্ষ্মীপুরে শিবিরের অর্ধবেলা, সোমবার রংপুরে বিএনপির হরতাল | রবিবার ৩ পার্বত্য জেলায় বাঙ্গালী ছাত্র পরিষদের সকাল-সন্ধ্যা হরতাল | মাগুরায় চলন্ত বাসে গৃহবধূর সন্তান প্রসব | আশুলিয়ায় ৩ কারখানায় বিক্ষোভ | হাজারীবাগে ছাদ থেকে পড়ে ঢাবি ছাত্রীর মৃত্যু | নেতাদের মুক্তির বিষয়টি আদালত বিবেচনা করবে: স্পিকার ড. শিরীন | শান্তিরক্ষা মিশনে শহিদ চার বাংলাদেশি জাতিসংঘ পদক পেলেন | আশা করি বিরোধী দল সংসদ নির্বাচনে অংশ নেবে: প্রধানমন্ত্রী

তিনি কি আমাদের স্বাধীন ও সাহসী সম্পাদকদের শেষ প্রতিভূ

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

অবিভক্ত বাংলায় সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার একজন দাপুটে সাংবাদিক, সাহিত্যিক এবং রাজনীতিক ছিলেন। তার এক মৃত্যুবার্ষিকীর সভায় বক্তৃতা করতে এসে আরেক দাপুটে সাংবাদিক গৌর কিশোর ঘোষ বলেছিলেন, 'সত্যেন মজুমদারকে আমরা শুধু একজন সম্পাদক হিসেবে চিনি। কিন্তু তার যে বহুমুখী প্রতিভা এবং বিশাল চরিত্র, তার কোন দিকটি নিয়ে আমি আলোচনা করব? তার প্রতিটি মৃত্যুবার্ষিকীতে হাজির হয়ে আলোচনা করলেও তা শেষ হবে না।'

এই কথাটি বাংলাদেশের আরেকজন সম্পাদক সম্পর্কে আরও বেশি সত্য। তিনি 'ইত্তেফাক'-এর প্রতিষ্ঠাতা—সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া। তিনি একাধারে সম্পাদক, রাজনীতিক এবং অসাধারণ উঁচু মাপের মানুষ ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর তেতাল্লিশ বছর কেটে গেছে। এই তেতাল্লিশ বছরে তার স্মৃতি তর্পন করে লেখাজোকা কম হয়নি। দু ডজনের মতো আমিও লিখেছি। কিন্তু তার চরিত্রের সবদিকটা তুলে ধরতে পেরেছি অথবা অন্য কেউ পেরেছেন তা আমি বলব না। যতদিন বেঁচে আছি, ততোদিন প্রতি মৃত্যুবার্ষিকীতে লিখলেও তার সম্পর্কে লেখা শেষ করতে পারব না।

১৯৬৯ সালের ১লা জুন পাকিস্তানের তত্কালীন রাজধানী রাওয়ালপিন্ডিতে মানিক মিয়ার আকস্মিক মৃত্যু হয়। তারপর চার দশকের বেশি কেটে গেছে। কিন্তু এই একটি মানুষের মৃত্যুতে আমাদের সাংবাদিকতায় যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে, তা আজ পর্যন্ত কেউ পূর্ণ করতে পেরেছেন বলে মনে হয় না। পঞ্চাশের ও ষাটের দশকে সম্পাদক নামে আমাদের যে সাহসী ও নীতিনিষ্ঠ সম্পাদক প্রজাতি ছিল, সেই প্রজাতি ক্রমশ বিলুপ্ত হচ্ছে বলে আশঙ্কা হয়। মানিক মিয়াই সেই প্রজাতির শেষ এবং অতুলনীয় প্রতিভূ ছিলেন বলে আমার মাঝে মাঝে মনে হয়।

আমার সাংবাদিক জীবনের, বিশেষ করে কলামিস্ট জীবনের সবচাইতে বড় গৌরব এই যে, আমি শুধু তার কাগজে সাংবাদিকতার চাকুরি করিনি, তিনি ছিলেন আমার সাংবাদিকতায় (কলাম লেখারও) শিক্ষক। ইত্তেফাক তো তখন শুধু সংবাদপত্র নয়, ছিল প্রগতিশীল ও মুক্তচিন্তার সাংবাদিকতার একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। আমরা ডান ও বাম মতের শিক্ষার্থীও সংখ্যায় কম ছিলাম না। আহমেদুর রহমান (প্রয়াত ভীমরুল), মইদুল হাসান ('মূলধারা, ৭১' বইয়ের লেখক), আনোয়ার জাহিদ (বামপন্থী নেতা, পরে এরশাদের মন্ত্রী), আলী আকসাদ (বিশ্বশান্তি আন্দোলনের বাংলাদেশ শাখার প্রয়াত নেতা), বজলুর রহমান (সংবাদের প্রয়াত সম্পাদক) আরও কতজনের নাম লিখব? এদের সঙ্গে আমি তো ছিলামই। প্রায় প্রতিদিন দুপুরের দিকে পুরোনো ইত্তেফাক অফিসে তিনি আমাদের নিয়ে যে ব্রিফিং বৈঠকটি করতেন, সেই বৈঠকটি থেকেই আমাদের তখনকার একদিন তরুণ সাংবাদিকের, বিশেষ করে আমার যে সাংবাদিক জীবনের ভিত্তি তৈরি হয়েছে, সে কথা কবুল করতে কোনো দ্বিধা নেই।

মানিক মিয়ার মতো এমন মুক্ত মনের সম্পাদক, রাজনৈতিক কলামিস্ট আমি খুব কম দেখেছি। তিনি শহীদ সোহরাওয়ার্দীর রাজনীতি এবং আওয়ামী লীগের সমর্থক ছিলেন। কখনও নিজের মত আমাদের উপর চাপিয়ে দেননি। তার ব্রিফিং বৈঠকে বামপন্থীদের সংখ্যাই ছিল বেশি। আমি ছিলাম মধ্যবামপন্থী। কিন্তু বৈঠকে তার সঙ্গে আমাদের মতের মিল না হলে, আমাদের কথা ধৈর্যের সঙ্গে শুনতেন, এমন কি তা ছাপাতেও বাধা দিতেন না।

একবার মনে আছে, ভিয়েতনাম যুদ্ধ সম্পর্কে মানিক ভাই এডিটোরিয়াল বৈঠকে যে ব্রিফিং দিয়েছেন, তা আমরা মানিনি। আহমেদুর রহমান (ভীমরুল) তার মিঠাকড়া কলামে ভিন্নমত প্রকাশ করলেন। আমাদের ধারণা ছিল, লেখাটি মানিক মিয়া ছাপাতে দেবেন না, কিন্তু তিনি সেটি ছাপাতে দিয়েছেন। কেবল পরদিন নিজের রাজনৈতিক মঞ্চ কলামে মিঠাকড়ায় বক্তব্য খণ্ডন করে নিজের মতটি যুক্তিসহ উত্থাপন করেছেন। এই পরমত সহিষ্ণুতা এবং ভিন্নমত প্রকাশের স্বাধীনতাদানের উদারতা আমি খুব কম সম্পাদকের মধ্যে দেখেছি।

অন্যের মত প্রকাশের স্বাধীনতা দানে মানিক মিয়া যতটা উদার ছিলেন, ততোটাই নিষ্ঠ ছিলেন নিজের মত ধরে রাখার সাহস ও দৃঢ়তা দেখাতে। আজ আমি নিঃসঙ্কোচে লিখতে পারি, পাকিস্তান আমলে অবাঙালি শাসকেরা বাংলাভাষাকে 'হিন্দুয়ানি' ভাষা আখ্যা দিয়ে তত্কালীন পূর্বপাকিস্তান থেকে উত্খাত করতে না পেরে যখন এন্তার উর্দু-ফারসি শব্দ বাংলায় যোগ করে তাকে ইসলামিকরণের নামে খিচুরি ভাষায় পরিণত করার চক্রান্ত শুরু করেছিলেন, তখন মানিক মিয়া তার ইত্তেফাক নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে, এমন কি তার নিজ দল আওয়ামী লীগেরও একদল প্রবীণ নেতার মতের বিরুদ্ধে না দাঁড়ালে আজ বাংলা ভাষার অবস্থা ভাষা আন্দোলন সত্ত্বেও কী দাঁড়াতো তা ভেবে শঙ্কিত হই।

বিখ্যাত সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও রাজনীতিক আবুল মনসুর আহমদ ছিলেন আওয়ামী লীগের একজন প্রবীণ নেতা। মানিক মিয়া তাকে খুবই শ্রদ্ধা করতেন, 'মনসুর ভাই' ডাকতেন। কলকাতায় আবুল মনসুর আহমদ কর্তৃক সম্পাদিত 'দৈনিক ইত্তেফাক' কাগজে কাজও করেছেন। সেখানেই তার লেখাজোকায় হাতেখড়ি। এই আবুল মনসুর আহমদ ছিলেন রাজনৈতিক মতবাদে উদার ও অসাম্প্রদায়িক। কিন্তু ভাষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে 'পূর্ববাংলার আলাদা ঐতিহ্যের' নামে উর্দু-ফারসি ও আঞ্চলিক শব্দের প্রাধান্যমূলক আলাদা ভাষা অনুসরণের পক্ষপাতী। ফলে ভাষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে মুসলিম লীগ ও তমদ্দুনপন্থীদের মতের সঙ্গে তার মতের একটা মিল ছিল।

সে সময় আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রবীণ নেতা এবং প্রাদেশিক আওয়ামী সরকারের মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খানও আবুল মনসুর আহমদের আলাদা ভাষা সংস্কৃতি সম্পর্কিত মতের অনুসারী হলো। দু'জনই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলরকে উপাচার্য্য বলা, গ্রাজুয়েশনকে স্নাতকোত্তর বলা ইত্যাদির তীব্র বিরোধিতা শুরু করেন। মন্ত্রীর বদলে উজির, আকাশের বদলে আসমান ইত্যাদি লেখার জন্য দু'জনই জোরালো অভিমত ব্যক্ত করেন। দৈনিক আজাদের মতো এসব শব্দ ইত্তেফাকেও ব্যবহারের জন্য তারা মানিক মিয়াকে অনুরোধ জানান। এ সময় তাদের এক বৈঠকে আমিও উপস্থিত ছিলাম। ভাষা ভাগ করার ব্যাপারে মানিক মিয়া দৃঢ় কণ্ঠে বলেছিলেন, 'মনসুর ভাই, রেডক্লিফ সাহেব তার ছুরি দিয়ে বাংলাদেশটাকে কেটে দু'ভাগ করে গেছেন। আমরা যেন নিজেরা ছুরি দিয়ে ভাষাটাকেও কেটে দু'ভাগ না করি। করলে বাঙালির অস্তিত্ব থাকবে না।'

১৯৫৬ সালে যখন পাকিস্তানের প্রথম সংবিধান গৃহীত হয় এবং দু'অঞ্চলের মধ্যে সংখ্যাসাম্যের নীতি অনুসরণের সিদ্ধান্ত হয়, সেই সঙ্গে এক ইউনিট ব্যবস্থা; তখন পূর্ববঙ্গ, বাঙালি ইত্যাদি শব্দ বর্জন করে বাংলাদেশকে শুধুমাত্র পূর্বপাকিস্তান এবং বাঙালিদের শুধুমাত্র পূর্বপাকিস্তানি নামে উল্লেখ করার ব্যবস্থা হয়। স্বভাবতই পূর্বপাকিস্তানে এর তীব্র প্রতিবাদ ওঠে। এ সময় আবুল মনসুর আহমদ ও আতাউর রহমান খান মিলে একটা প্রস্তাব তোলেন, বাংলাদেশ বা পূর্বপাকিস্তানের নাম করা হোক পাকবাংলা।

এই নামের ব্যাপারে মানিক মিয়ার সমর্থন সংগ্রহ এবং তিনি যাতে এই প্রস্তাবের পক্ষে জনমত গঠনের জন্য রাজনৈতিক মঞ্চে কলম ধরেন, সেই অনুরোধ জানানোর জন্য আতাউর রহমান খান ও আবুল মনসুর আহমদ দু'জনেই পুরোনো ইত্তেফাক অফিসে এসেছিলেন। মানিক মিয়া তখন তার রাজনৈতিক মঞ্চের ডিকটেশন দিচ্ছিলেন। আমি ডিকটেশন নিচ্ছি। দু নেতা আসাতে তিনি সাময়িকভাবে লেখায় ক্ষান্তি দিয়েছিলেন।

এ সময় ঝড়ের বেগে শেখ মুুজিবুর রহমানও (তখন তিনি বঙ্গবন্ধু হননি) এসে হাজির। তিনি আতাউর রহমান খানের দিকে চেয়ে বললেন, 'আপনারা মানিক ভাইয়ের কাছে কেন এসেছেন তা জানি। বাংলাদেশের নাম আপনারা পাকবাংলা রাখতে চান! আমি, আমার আওয়ামী লীগ এর ঘোর বিরোধী। হাজার বছরের বাংলাদেশ নাম, বাঙালি পরিচয় আমরা মুছে ফেলার অপচেষ্টা সফল হতে দিতে পারি না। পূর্ববঙ্গের নাম রাখা হবে পাকবাংলা, তাহলে পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি হিন্দু বলে কি তার নাম হবে নাপাকবাংলা?'

তারপরে মানিক মিয়ার দিকে চেয়ে বললেন, 'মানিক ভাই, আমি যদি কোনোদিন সুযোগ পাই এদেশের নাম হবে বাংলাদেশ। আমার পরিচয় হবে বাঙালি।' মানিক ভাই এ কথার কোনো জবাব দিলেন না। আতাউর রহমানের খানের দিকে চেয়ে বলেছেন, 'আপনারা আমাকে এ ব্যাপারে কোনো চাপ দেবেন না। পাকবাংলা নামটি আমারও পছন্দ নয়। এদেশের একটা নাম আছে, সেটা বদলাতে হবে কেন? আরব, পারস্য দেশগুলো ইসলাম গ্রহণের পরেও তো তাদের দেশের নাম বদলায়নি।' মানিক মিয়ার দৃঢ়তার ফলে পাকবাংলা নামের প্রস্তাবের সেইদিনই চূড়ান্ত ইতি। শেখ মুজিব পরে তার অঙ্গীকার রক্ষা করেছিলেন। ঢাকার বিশাল জনসভায় তিনি পূর্বপাকিস্তানের নাম আবার বাংলাদেশ বলে ঘোষণা দেন। মানিক মিয়া তখন বেঁচে ছিলেন না।

শুধু একজন সম্পাদক হিসেবে নয়, ব্যক্তি মানুষ হিসেবেও তার সাহস ও নির্ভীকতার কোনো তুলনা ছিল না। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব-ইসকান্দার মীর্জার সামরিক শাসন প্রবর্তনের সময় মানিক মিয়াকে সামরিক আইনে গ্রেফতার করে চৌদ্দ বছর সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়ার ভয় দেখানো হয়। তিনি নতি স্বীকার করেননি। শেখ মুজিবের ছয়দফা আন্দোলন সমর্থন করার জন্য তাকে গ্রেফতার করা হয়। ইত্তেফাক বন্ধ করে দেওয়া হয়। প্রেসও তখন বাজেয়াপ্ত করা হয়। মানিক মিয়ার অদম্য মনোবল তাতে ভাঙতে পারা যায়নি।

বলা হয়, ফরাসি বিপ্লবের রূপকার ছিলেন ভল্টেয়ার এবং রুশো। আমি মানিক মিয়াকে ভল্টেয়ার অথবা রুশোর সঙ্গে অবশ্যই তুলনা করি না। কিন্তু স্বাধীন বাংলার শ্রেষ্ঠ রূপকার যে মানিক মিয়া ছিলেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই। '৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি বেঁচে ছিলেন না। কিন্তু তার নাম এবং সাংবাদিকতার ঐতিহ্য ছিল এই যুদ্ধের সবচাইতে বড় সহায়ক শক্তি। এর জন্যই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ঢাকায় গণহত্যার শুরু করার সূচনাতেই কামান দেগে এবং অগ্নি সংযোগ করে ইত্তেফাক অফিস (পুরোনো) ধ্বংস করার চেষ্টা চালায়। ব্যক্তিগত জীবনে মানিক মিয়া কতটা অসম সাহসী ছিলেন, সে সম্পর্কে নিজের একটি অভিজ্ঞতার কথা বলি। ১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে ১৭ দিনের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি ঘটে। তাসখন্দ চুক্তি হয়। যুদ্ধ শেষে পশ্চিমপাকিস্তানের রণাঙ্গণ পরিদর্শনের জন্য ঢাকার সম্পাদকদের (সাহিত্যিকদেরও আলাদাভাবে) আইয়ুব সরকার আমন্ত্রণ জানান। মানিক মিয়া, জহুর হোসেন চৌধুরী এবং আবদুস সালামও ছিলেন আমন্ত্রিত সম্পাদকদের দলে। আমিও 'আওয়াজ' নামে একটি সান্ধ্যপত্রিকার সম্পাদক হিসেবে এ দলে ছিলাম।

'ইত্তেফাকের' বর্তমান সম্পাদক আনোয়ার হোসেন মঞ্জুরও ইচ্ছা (তখন তিনি ছাত্র) আমাদের সঙ্গে রণাঙ্গনে যাবেন। তখন ঢাকা-করাচি বা ঢাকা-লাহোর সরাসরি বিমান চলাচল বন্ধ। ভারতের নিষেধাজ্ঞার ফলে কলম্বো হয়ে প্রথম করাচিতে এবং তার পর সেখান থেকে লাহোর বা রাওয়ালপিন্ডিতে যেতে হয়। রাওয়ালপিন্ডি তখন পাকিস্তানের অস্থায়ী রাজধানী। আমরা শ্রীলঙ্কা হয়ে প্রথমে গেলাম করাচি। সেখানে তাজ হোটেলে আমাদের থাকার ব্যবস্থা। মানিক মিয়া, জহুর হোসেন চৌধুরী, সালাম সাহেব আলাদা রুমে রইলেন। মঞ্জু আর আমি একই রুমে। সারারাত গল্প-গুজব করে কাটলো।

পরদিন এক ভাইকিং প্লেনে রাওয়ালপিন্ডি পৌঁছে দেখি, মানিক মিয়া ও অন্য দুই সম্পাদককে যে হোটেলে রাখা হয়েছে আমাকে সেখানে রাখা হয়নি। আমাকে অন্য হোটেলে রুম দেওয়া হয়েছে। মনটা বিষণ্ন হয়ে গেল। মানিক মিয়া বললেন, 'আপাতত ওই হোটেলেই উঠুন। রাত্রে আমাদের হোটেলে চলে আসবেন। মঞ্জুর সঙ্গে থাকবেন। সকালে একসঙ্গেই রণাঙ্গনে যাওয়া যাবে।

দুপুরটা কোনোরকমে অন্য হোটেলে কাটালাম। বিকেলে মানিক মিয়াদের হোটেলে এসে মঞ্জুর সঙ্গে কিছুক্ষণ শহরে ঘুরে ওই হোটেলেই রাত কাটাবো স্থির করলাম। সন্ধ্যার কিছু পর মানিক মিয়া আমাদের তিনজনের জন্য খাবার অর্ডার দিলেন। রুমেই খাবার দেওয়া হবে। ঠিক এই সময় বিমান আক্রমণের সাইরেন বেজে উঠল। হোটেলের এবং শহরের রাস্তাঘাত, দোকান পাটের আলো নিভিয়ে ফেলা হলো। আমি বললাম, 'যুদ্ধবিরতি হয়েছে। তারপর হঠাত্ ভারতের এই বোমা হামলা। এটা কেমন কথা।'

মানিক মিয়া কোনো কথা বললেন না। আমরা তিনজনই অন্ধকারে বসে আছি। হঠাত্ আমার মনে হলো, ভারতীয় বিমান যখন রাওয়ালপিন্ডি শহরে বোমা হামলা চালাতে এসেছে, তখন নিশ্চয়ই ঢাকা শহরেও চালাবে। আমি তখন থাকি পুরোনো শহরের নারিন্দার ৩২, শরত্গুপ্ত রোডে, একটা জরাজীর্ণ দোতলা বাড়িতে। আমি এখন এত দূরে। স্ত্রীর সঙ্গে ছোট ছেলে-মেয়েরা সেখানে আছে। এই বাড়িতে বোমা পড়ার দরকার নেই। বোমার শব্দেই জীর্ণ বাড়ি ধসে পড়বে।

আমি উদ্বেগ ও উত্কণ্ঠায় এতোটাই ভেঙে পড়েছিলাম যে, মানিক মিয়াকে নিজের উদ্বেগের কথা না জানিয়ে পারলাম না। মানিক মিয়া বললেন, 'আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করি, এখন যদি আপনি ঢাকায় শরত্গুপ্ত রোডের বাসায় থাকতেন আর শহরে বিমান হামলা চলত, তাহলে কি করতে পারতেন? বললাম, 'মানিক ভাই, কিছুই করতে পারতাম না।' মানিক মিয়া বললেন, 'তাহলে মনে করুন আপনি এখন ঢাকায় শরত্গুপ্ত রোডের বাসাতেই আছেন। মনের উদ্বেগ চলে যাবে। আমি তো তাই ভেবেই চুপ করে আছি। আমার উদ্বেগ নেই। এখন আমাদের যুদ্ধের মধ্যে বাস করার সাহস অর্জন করতে হবে।'

তার সাহস দেখে শুধু বিস্মিত হইনি, নিজে সাহস ফিরে পেয়েছি। উদ্বেগমুক্ত হয়েছি। কিছুক্ষণের মধ্যে অলক্লিয়ার সাইরেন বেজে উঠেছে। আমাদের খাবার এসেছে। পরে হোটেলে ঘোষণা করা হলো, ভারতীয় বোমারু বিমান হামলা চালাতে রাওয়ালপিন্ডিতে আসেনি। ওটা ছিল রঙ সিগন্যাল। ভুলে সাইরেন বাজানো হয়েছে।

এরপর রণাঙ্গন পরিদর্শন। কয়েকটিতে গেছি সম্পাদকদের সঙ্গে, কয়েকটিতে গেছি মুনীর চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত সাহিত্যিক গোষ্ঠীর সঙ্গে। মানিক ভাই ও অন্য দু'জন সম্পাদক আমার আগে ঢাকায় ফিরেছেন। তাকে বিদায় জানাতে তার হোটেলে আসতেই জিজ্ঞাসা করলেন, 'রণাঙ্গনগুলো ঘুরে আপনার কী মনে হচ্ছে?' বলেছি, 'লাহোর শহর ভারতীয় সৈন্যরা ইচ্ছা করলেই দখল করতে পারত। সম্ভবত রক্তপাত এড়ানোর জন্য করেনি। একমাত্র খেমকারণ সেক্টর (অমৃতসরের কাছে) ছাড়া পাকিস্তানিরা কোথাও সুবিধা করতে পারেনি। যুদ্ধবিরতি হওয়ায় তারা বেঁচে গেছে।'

মানিক মিয়া বললেন, 'এই যুদ্ধে আইয়ুব যদি সাফল্য দেখাতে পারতেন, তাহলে তিনি আরও কিছুকাল ক্ষমতায় থাকতেন। এখন ক্ষমতায় থাকা তার জন্য দুরূহ হবে।'

বিস্মিত হয়ে বলেছি, 'আপনার কি মনে হয় আইয়ুব ক্ষমতা হারাবেন?' তিনি বললেন, 'এখনই নয়, তবে তিনি সেনাবাহিনীর সমর্থন হারিয়েছেন। তার বিরুদ্ধে আন্দোলন হবে। খুব বেশিদিন তিনি ক্ষমতায় থাকতে পারবেন না। নতুন কোনো জেনারেল ক্ষমতায় আসবে।'

মানিক মিয়ার পর্যবেক্ষণ যে কতটা সঠিক ছিল তার প্রমাণ এই যুদ্ধের পর পরই পশ্চিম পাকিস্তানে তাসখন্দ চুক্তিবিরোধী আন্দোলন, পূর্বপাকিস্তানে ছয় দফার আন্দোলন, '৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং জেনারেল ইয়াহিয়ার ক্ষমতা দখল।

তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, আমাদের মানিক ভাইয়ের মৃত্যুর ৪৩ বছর পরেও মনে হচ্ছে, বাংলাদেশের এই চরম সংকট সন্ধিক্ষণে তার বড় প্রয়োজন ছিল। তার শূন্যস্থান পূর্ণ করার কেউ নেই।

[লন্ডন ২৮ মে, মঙ্গলবার, ২০১৩]

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, 'নির্দলীয় অথবা দল নিরপেক্ষ সরকারের অধীনেই আগামী নির্বাচন হতে হবে। আপনি কি তার এই বক্তব্যের সাথে একমত?
3 + 4 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
আগষ্ট - ২২
ফজর৪:১৮
যোহর১২:০২
আসর৪:৩৫
মাগরিব৬:৩০
এশা৭:৪৫
সূর্যোদয় - ৫:৩৬সূর্যাস্ত - ০৬:২৫
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :