The Daily Ittefaq
ঢাকা, শনিবার ১ জুন ২০১৩, ১৮ জৈষ্ঠ্য ১৪২০, ২১ রজব ১৪৩৪
সর্বশেষ সংবাদ ওকলাহোমায় টর্নেডোর আঘাতে নিহত ৫ | নওয়াজ তৃতীয়বারের মতো পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী | রবিবার নোয়াখালী, ফেনী ও লক্ষ্মীপুরে শিবিরের অর্ধবেলা, সোমবার রংপুরে বিএনপির হরতাল | রবিবার ৩ পার্বত্য জেলায় বাঙ্গালী ছাত্র পরিষদের সকাল-সন্ধ্যা হরতাল | মাগুরায় চলন্ত বাসে গৃহবধূর সন্তান প্রসব | আশুলিয়ায় ৩ কারখানায় বিক্ষোভ | হাজারীবাগে ছাদ থেকে পড়ে ঢাবি ছাত্রীর মৃত্যু | নেতাদের মুক্তির বিষয়টি আদালত বিবেচনা করবে: স্পিকার ড. শিরীন | শান্তিরক্ষা মিশনে শহিদ চার বাংলাদেশি জাতিসংঘ পদক পেলেন | আশা করি বিরোধী দল সংসদ নির্বাচনে অংশ নেবে: প্রধানমন্ত্রী

আমাদের মানিক ভাই

শেখ মুজিবুর রহমান

গভীর রাত। পিন্ডি থেকে টেলিফোনে খবর পেলাম, মানিক ভাই আর আমাদের মাঝে নেই। মনে হলো চারদিক যেন ভয়ানক ফাঁকা, শূন্য, একেবারেই অন্ধকার। দাউ দাউ করে জ্বলছিল যেন এক মশাল, প্রজ্বলিত অগ্নিশিখার চারপাশ ঝলমল, নাট্য শাখার মহা সমারোহ, সব থেমে গেল। এ যেন মুহূর্তের অনুভূতি। একটি সংবাদ, একটি বার্তা, মাত্র একটি ঘটনা যে কত বড় হূদয়-বিদারক হতে পারে, বেশি মর্মান্তিক হতে পারে, তাহারই প্রমাণ। পর মুহূর্তে আমার মানসে ফুটে উঠল দূর অতীত। ১৯৪৪ সন। মরহুম হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর বাস ভবনে কলকাতায় তাঁহার সাথে আমার পরিচয়। একই নেতার দুই শিষ্য, যেন একই পিতার দুই সন্তান। বিগত ২৫ বছরের মধ্যে কোনোদিনই আমরা বিচ্ছিন্ন হইনি। কোনো ঘটনা আমাদের মধ্যে বিভেদ টানতে পারেনি। নেতা মারা যাবার পরেও আমরা এক ও অভিন্ন ছিলাম। বর্ষার মেঘরাজির ন্যায় তাঁর অপার স্নেহ সর্বক্ষণ আমাকে ঘিরে রাখতো। বিশাল বাড়িটির ন্যায় তার প্রশস্ত বিপুল বক্ষে আমার ঠাঁই হয়েছিল। কোনো ষড়যন্ত্র, কোনো কথা, নিন্দা বাক্য সেখান থেকে আমাকে দূরে ঠেলে দিতে পারেনি। হূদয়ের গভীরতম অনুভূতির রসে সিক্ত মানিক ভাইয়ের ভালোবাসার কথা আমি কোনোদিনই ভুলতে পারব না। আজ মানিক ভাই সম্পর্কে লিখতে বসে আমার কলম বারবার থেমে যাচ্ছে, আমার ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে হয়তো, ভাববার ক্ষমতাও।

তবুও মানিক ভাইয়ের সম্পর্কে আমার যেটা ব্যক্তিগত অনুভূতি, তা আমি প্রকাশ করব। মানিক ভাইয়ের কর্মময় জীবনের পরিধি খুবই ব্যাপক ও বিস্তৃত। তাঁর সাথে ২৫ বছরের ইতিহাস এদেশের সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ভাবধারার ঘাত-প্রতিঘাত, উত্থান-পতন, আলোড়ন-আন্দোলন অগ্রগতির সাথে প্রত্যক্ষভাবে সর্ম্পকযুক্ত। বাংলা ও পরবর্তীকালে পাকিস্তানের রাজনীতিতে মানিক ভাইর আসন দর্শকের গ্যালারীতে ছিল না। দূরত্ব বজায় রেখে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পৃষ্ঠপোষক বলে তিনি আরাম আয়েশ ভোগ করেননি। বিপদসঙ্কুল দুর্গম পথে পা বাড়িয়েছেন। নিজ জীবনের ঝুঁকি এবং অত্যাচার ও নিপীড়নের মারগুলো মাথায় পেতে নিয়ে তিনি গণতান্ত্রিক সংগ্রাম এগিয়ে নেবার কাজে আত্মনিয়োগ করেছিলেন। ত্যাগবতী শহীদ সোহরাওয়ার্দীর বিমূর্ত দেশপ্রেমিকতা, স্বদেশীকতা তাঁকে প্রভাবিত করেছিল। গণতন্ত্রের উপর ছিল তাঁর প্রগাঢ় আস্থা। নিয়মতান্ত্রিক গণঅভ্যুত্থানকে তিনি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার পক্ষপাতী ছিলেন ও রুশোর প্রকৃতিদত্ত মানব স্বাধীনতা ও প্রজাতন্ত্রের জাগ্রত চিন্তাবাহী, লিংকনের Government of the people, by the people, and for the people-এর পূজারি, প্রকৃতির প্রদত্ত বৈচিত্র্য মেনে নিয়ে 'সব মানুষ সমান' এই তত্ত্ববাদে বিশ্বাসী। নীতির প্রশ্নে তিনি ছিলেন আপসহীন। একান্ত কঠিন ও নিতান্ত অনমনীয়। পাষাণ-প্রাচীরের ন্যায় অটল। কায়েমী স্বার্থের নিক্ষিপ্ত শহরগুলো তার বক্ষে এসে ভেঙে ভেঙে পড়েছে। 'ইত্তেফাক' বারবার বন্ধ হয়ে গেছে। মানিক ভাই টলেননি। রোগাক্রান্ত হয়ে কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে দিন কাটিয়েছেন তবু আপস করেননি। মানিক ভাই ছিলেন কর্মবাদী পুরুষ। তিনি বিশ্বাস করতেন কাজের মাঝেই মানুষ বেঁচে থাকে। পদের মাঝে নয়। স্বাধীনতা সংগ্রাম, ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সনের নির্বাচন, '৬২-র গণজাগরণ, '৬৫ সনের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম, '৬৬ সন ও তার পরবর্তীকালের স্বায়ত্তশাসন কায়েমের গণঅভ্যুত্থানে মানিক ভাই নেতৃত্ব দিয়েছেন। কর্মী ও নেতাদের দিকনির্দেশ করেছেন। লেখনীর দ্বারা আমাদের দাবি-দাওয়াকে জনগণের দরজায় পৌঁছিয়ে দিয়েছেন, বিরুদ্ধ শক্তিগুলোর আক্রমণ প্রতিহত করেছেন। নিজের জন্য কোনো দিন তিনি কিছু চাননি। একটু ইঙ্গিত করলে, সামান্য আভাস দিলে, একটু পট পরিবর্তন করলে প্রভূত ঐশ্বর্য, মানিক ভাইয়ের পায়ের কাছে এসে জমা হতো। সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পর একবার আমি নিজে তাঁকে আওয়ামী লীগের সভাপতি হবার জন্য অনুরোধ জানিয়েছিলাম। মানিক ভাই হেসে বলেছিলেন, সংগঠন আপনাদের, কলম আমার। প্রত্যাখ্যানের কি অপূর্ব সুন্দর পদ্ধতি। ১৯৫৫ সনে তাঁকে গণপরিষদের সদস্য পদ গ্রহণের জন্য কথা হয়েছিল। তিনি সেদিনও তা গ্রহণ করেননি। আমার জানা আছে, আইয়ুব শাসনামলে তাঁকে বহুবার উচ্চ পদমর্যাদার প্রলোভন দেখানো হয়েছে। তিনি ঘৃণাভরে তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। কিছু না চেয়ে দেবার যে প্রেরণা মানুষকে অসাধারণ ব্যক্তিত্ব দান করে। মানিক ভাইয়ের মধ্যে সেই তাগিদ ছিল একান্ত আন্তরিক। অক্লান্ত পরিশ্রম করে তিনি 'ইত্তেফাক' দাঁড় করিয়েছেন। বাংলার সবচাইতে জনপ্রিয় সাংবাদিক ছিলেন মানিক ভাই। কলামিস্ট হিসেবে খোদাপ্রদত্ত গুণের অধিকারী ছিলেন তিনি। শক্ত বিষয়বস্তুকে সহজবোধ্য করে পরিবেশন করবার ভাষাচাতুর্য তিনি রপ্ত করতে পেরেছিলেন। ব্যক্তিগত জীবনের নির্ভীকতা ও সততা তার রচনাগুলোকে প্রভাবিত করছে। জীবনের ন্যায় লেখার মধ্যেও তিনি কোনোদিন মিথ্যায় প্রশ্রয় দেননি। তার দৃষ্টিভঙ্গী ছিল গণমুখী। জনগণের কথা বলার জন্যই তিনি লেখনী হাতে নিয়েছিলেন। জনগণের ভাষায় তিনি কথা বলতেন। অলংকারের বাহুল্য চমক তাঁর বিষয়বস্তুকে কোনোদিন আবৃত করতে পারেনি। তিনি নিজে সৃষ্টি করেছিলেন এক নতুন সাংবাদিক-ভাষা। তার ব্যবহূত শব্দগুলো অনেক সময় নিজস্ব আভিধানিক অর্থ ছাড়িয়ে নতুন অর্থ ব্যক্ত করতো। তিনি ছিলেন উঁচু দরের গাল্পিক। গল্প বলার ব্যাপারে তার সমকক্ষ আমি আর কাউকে দেখিনি। তাকে ভুল বুঝবার অবকাশ ছিল প্রচুর। যেন ক্ষ্যাপা দুর্বাশী। সব সময় যেন বিক্ষুব্ধ ভাব। আসলে তিনি ছিলেন ঘোর বিপ্লবী; অন্যায়, অত্যাচার, জালেম, জুলুমের বিরুদ্ধে সর্বদা খড়্গহস্ত। উত্পীড়ন, নির্যাতনকারীদের প্রতি মারমুখী। অন্তরে তিনি ছিলেন কোমল। মানিক ভাই ভালোবাসতে জানতেন। প্রাণ দিয়ে তিনি ভালোবেসেছিলেন বাংলাদেশকে। এদেশের মাটিকে, মানুষকে। তিনি ছিলেন ভয়ানক আবেগপ্রবণ। তাঁর হূদয়ের সৃজনশীল তন্ত্রগুলো সামান্য আলোড়নে ঝংকার তুলতো। অনুভূতিপ্রবণ মন তাঁর ক্ষুদ্র কারণে বিস্ফোরিত হতো। আগ্নেয়গিরির ন্যায় দাউ দাউ করে জ্বলে উঠতো। এরই মধ্যে ছিল একটা যুক্তিনির্ভর মনন। যাকে তিনি আক্রমণ করতেন, আঘাত করবার জন্য উদ্যত হতেন, যুক্তি দিয়ে, শুভবুদ্ধি নিয়ে, সত্ বাসনা নিয়ে, মানুষের কল্যাণের ইচ্ছে নিয়ে উপস্থিত হলে তার কথাই শুনতেন। ফলে তার জীবনে দেখেছি এক অপূর্ব ভারসাম্য। মানিক ভাই ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন সাদাসিধে, বিলাস ও বাহুল্যকে তিনি কোনোদিন কাছে ঘেঁষতে দেননি। সামান্য আসবাবে সজ্জিত ছিল 'ইত্তেফাক' অফিসে তার ব্যক্তিগত বসবার ঘরখানি। একখানা মাত্র ডেক চেয়ার; সহযোগীদের জন্য অতি সাধারণ টেবিল, ক'খানা চেয়ার, একটা বইয়ের আলমারি। সেদিন পর্যন্ত পুরাতন একখানা ভাঙ্গা হিলম্যান গাড়ি ব্যবহার করেছেন মানিক ভাই। ভাঙ্গা নড়বড়ে। মাঝপথে সেটা বন্ধ হয়ে যেত। তবুও মানিক ভাই পাল্টাতে চাননি। বুড়ো ড্রাইভার ও পুরাতন গাড়ি তাকে পেয়ে বসেছিল। শুনেছি, ছেলেমেয়েরা অনেক কষ্টে শেষতক সেটাকে বিদায় করতে সক্ষম হয়েছিল। মানিক ভাই ঘোর সংসারী। নিজে তিনি বাজার করতেন। মাছ কিনবার দিকে তাঁর ছিল ঝোঁক। ভাবীকেও তার সাথে যেতে হতো হাটে-বাজারে। ছেলেমেয়েদেরকে তিনি প্রাণ দিয়ে ভালোবাসতেন। অমন স্নেহপ্রবণ পিতৃহূদয়ের পরিচয় আমি আর পাইনি। মানিক ভাই জানতেন, কী করে ক্ষমা করতে হয়। এই গুণটি তিনি নেতা শহীদ সোহরাওয়ার্দীর কাছ থেকে অর্জন করেছিলেন। ব্যক্তিগতভাবে মারাত্মক লোকসান ঘটিয়ে তাঁর কাছে এসে দাঁড়ালেও তিনি ক্ষমা করে দিনে। সর্বোপরি মানিক ভাইকে আমরা পেয়েছি এক ঐতিহাসিক ব্যক্তি হিসেবে। এ দেশের সত্যিকার ইতিহাস যদি কোনোদিন লেখা হয়, তাহলে সেখানে মরহুম তফাজ্জল হোসেন (মানিক মিয়া) তার সত্য আসনটি পাবেন ও অমর অক্ষয় এক প্রজ্বলিত জ্যোতিষ্কের ন্যায় সেখানে বিরাজ করবেন।

ধন্য বাংলার সাংবাদিক পরিমণ্ডল, যে তাঁকে নিজেদের জগতে পেয়েছিল। ধন্য আমরা সকলে যে, ব্যক্তিগত পর্যায়ে তার ঘনিষ্ঠ সাহচর্য পেয়েছিলাম। অকালে পরপারে পাড়ি জমিয়েও মানিক ভাই আমাদের সকলের মাঝে বেঁচে রইলেন। মানিক ভাই আজ নেই। এ ক্রান্তিকালে মানিক ভাইয়ের তিরোধান শুধু আমার বা আমাদের জন্য নয়, সাড়ে ছয় কোটি মানুষের জন্য এক বিরাট বিপর্যয়। আমরা পথ প্রদর্শককে হারিয়েছি। কিন্তু সেই পথের রেখা আমরা কিছুতেই মুছে যেতে দেবো না। বরং তার নির্দিষ্ট লক্ষ্যে তারই পতাকা হাতে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। পথ কণ্টকাকীর্ণ এতদিন যিনি ছিলেন পাশে সাহস ও ভরসার মতো, তিনিও নেই। তবু আমার একটা প্রার্থনা, সে পতাকা বহনের দায়িত্ব আমরা পেয়েছি, তাকে সার্থক লক্ষ্যে পৌঁছে দেবার শক্তিও যেন অর্জন করতে পারি।

চিরবিশ্রামে শায়িত মানিক ভাই'র স্মৃতির প্রতি এটাই হবে আমাদের শ্রেষ্ঠ শ্রদ্ধার্ঘ্য।



[মানিক মিয়ার মৃত্যুর পরে ১৯৬৯ সালের ৯ জুন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের

এ লেখাটি দৈনিক ইত্তেফাক-এ প্রকাশিত হয়]

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, 'নির্দলীয় অথবা দল নিরপেক্ষ সরকারের অধীনেই আগামী নির্বাচন হতে হবে। আপনি কি তার এই বক্তব্যের সাথে একমত?
3 + 4 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
অক্টোবর - ১৪
ফজর৪:৩৯
যোহর১১:৪৫
আসর৩:৫৫
মাগরিব৫:৩৭
এশা৬:৪৮
সূর্যোদয় - ৫:৫৫সূর্যাস্ত - ০৫:৩২
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :