The Daily Ittefaq
ঢাকা, মঙ্গলবার ৪ জুন ২০১৩, ২১ জৈষ্ঠ্য ১৪২০, ২৪ রজব ১৪৩৪
সর্বশেষ সংবাদ ভারতীয় অভিনেত্রী জিয়া খানের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার | তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত খেলতে পারবেন না আশরাফুল | ম্যাচ ফিক্সিংয়ের ঘটনায় দোষ স্বীকার করে ক্ষমা চাইলেন আশরাফুল | আইসিএলের এমডিকে দুদকে জিজ্ঞাসাবাদ | রূপসায় ৮ কোটি টাকার ভারতীয় বস্ত্রপণ্যসহ আটক ৩ | ১৭ হাজার প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ হচ্ছে | অভ্যুত্থান চেষ্টা: ইশরাক ও মেজর জিয়াউলকে গ্রেফতারে ইন্টারপোলের সাহায্য কামনা | বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন ও আলালকে হয়রানি না করতে হাইকোর্টের নির্দেশ | পদ্মা সেতু দুর্নীতি: মোশাররফের সাময়িক বরখাস্তাদেশ প্রত্যাহার | সন্ত্রাস সৃষ্টিকারীদের জন্য সমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে: স্বরাষ্ট্রপ্রতিমন্ত্রী | বিশ্বের অন্য গণতান্ত্রিক দেশগুলোর অনুসরণে আগামী নির্বাচন: প্রধানমন্ত্রী

ছারছিনা দরবার শরীফের ইতিকথা

হাওলাদার ওমর ফারুক

বাংলাদেশসহ মুসলিম বিশ্বে ছারছিনা দরবার শরীফ ও ইসলামী শিক্ষা কেন্দ্র ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক এক আধ্যাত্মিক প্রাণকেন্দ্র হিসেবে আজ সুপরিচিত। পিরোজপুর জেলার নেছারাবাদ(স্বরূপকাঠি)উপজেলা সদরের উত্তর পাশে ইতিহাসখ্যাত পুন্যভূমি ছারছিনা গ্রামটি অবস্থিত। এ গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম আকন্দ পরিবারে ১৮৭৩ খৃীষ্টাব্দে দ্বীনের আলোকবর্তিকা নিয়ে এক পূণ্যবান ধর্মীয় সংস্কারক হযরত মাওলানা শাহ সুফি নেছারুদ্দিন আহমেদ(রহঃ) জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম হযরত সুফি সদরুদ্দিন এবং মাতার নাম ছিল জোহরা খাতুন। ১৮২১ খ্রীঃ ফারায়েজি আন্দোলনের নেতা ফরিদপুর জেলার বাহাদুরপুরের হাজী শরীয়ত উল্ল¬াহ ইসলাম ধর্ম প্রচার করতে এ অঞ্চলে আসলে দাদা মুন্সি জহির উদ্দিন এবং একই এলাকার মরহুম হাজী সইজুদ্দিন মিয়ার কাছে ছদরুদ্দিন আহমেদ(রহঃ) শিষ্যত্ব গ্রহণ করে ইসলাম ধর্ম প্রচার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। সমাজে ইসলাম প্রচার, মুসলমানগণ ধর্মীয় শিক্ষাসহ শরীয়ত অনুযায়ী চলার শিক্ষায় সদরুদ্দিন আহমেদ(রহঃ) আমল থেকেই ঐ বাড়িতে মুসাফিরখানা তৈরি করা হয়েছিল। হযরত মাওলানা শাহ সুফি নেছারুদ্দিন আহমেদ(রহঃ) বয়স যখন ১৪/১৫ বছর তখন তার পিতা ছদরুদ্দিন আহমেদ তাঁকে উপজেলার মাগুরা গ্রামের মো. দলিল উদ্দিন সিকদারের কন্যা ছাহেরা খাতুনের সাথে বিবাহ দিয়ে পবিত্র হজ্জ পালনে যান এবং সেখানে তাঁর মৃত্যু হয়। দাদা মুন্সি জহির উদ্দিন এবং বিধবা মাতা জোহরা বেগমের সান্নিধ্যে বড় হতে লাগলেন নেছারুদ্দিন আহমেদ। কিছুদিন পর দাদা জহিরুদ্দিন ইন্তেকাল করেন। দাদা ও পিতার ধর্মীয় অনুপ্রেরণায় উজ্জীবিত নেছারউদ্দিন মাদারীপুরের একটি প্রাথমিক মাদ্রাসায় পড়াশুনা শুরু করেন। তারপর তিনি ঢাকার হাম্মাদিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হন। সেখানে কিছুদিন অধ্যয়নের পর কলিকাতা আলিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হন। পরে তিনি হুগলি মোহসেনিয়া

মাদ্রাসায় পড়াশুনা করেন এবং বৃত্তি সহকারে জামায়াতে-উলা পাস করেন। ঐ মাদ্রাসায় অধ্যয়নকালে ১৮৯৫ খৃষ্টাব্দে ফুরফুরা শরীফের পীর হযরত আবুবকর সিদ্দিকী আল কোরাইশী(রহঃ) এর হাতে বায়াত হন। তিনি তখন সনদপ্রাপ্ত পীর সমাজের হাদী। দ্বীন ইসলাম প্রচারসহ হেদায়েতের কাজে আত্মনিয়োগ করলেন। শৈশব থেকে দাদা মুন্সি জহিরুদ্দিন আকন নাতি নেছারুদ্দিনকে নিয়ে ইসলাম ধর্ম প্রচারে বিভিন্ন এলাকা সফর করতেন। মাদারীপুরে পড়াশুনা অবস্থায় নেছারুদ্দিন আহমদ(রহঃ) দ্বিতীয় বিয়ে করেন। স্ত্রীর নাম ছিল ছাহেরা খাতুন। ছাহেরা খাতুনের গর্ভে জন্ম নেয় দু'ছেলে। ছেলেরা ও দ্বিতীয় স্ত্রী ইন্তেকাল করায় ১৯০৫ সনে ৩২/৩৩ বছর বয়সে গোপালগঞ্জের কোটালিপাড়া উপজেলার কুশলা গ্রামের চৌধুরী আব্দুল ওয়াফী সাহেবের কনিষ্ঠ কন্যা মোসাম্মাত্ আফছারুন্নেছাকে বিবাহ করেন। এ স্ত্রীর গর্ভে ৮ ছেলে ও ৬ কন্যা জন্মগ্রহণ করেন। তাদের মধ্যে শাহ আবু জাফর মো. সালেহ ও শাহ মো. সিদ্দিক পরবর্তীতে বড় ও মেঝ পীর নামে খ্যাত। শাহ নেছারউদ্দিন (রহঃ) ঝালকাঠি জেলার কাচাবালিয়া গ্রামের মো. রমজান উল্লাহ গাজী সাহেবের কন্যা ছমেদুন্নেছাকে বিয়ে করেন। সেখানে ৪ কন্যা সন্তান জন্ম নেয় । ১৯০৫ সনে শাহ সুফী নেছারুদ্দিন আহমদ(রহঃ) একখানা গোলপাতার দোচালা ঘর নির্মাণ করেন। ঐ ঘরের একপাশে খানকাহ বা কুতুবখানা এবং অন্যপাশে মুসাফিরখানা হিসেবে ব্যবহূত হত। তখন থেকে পীর সাহেব কেবলা শাহ সুফি নেছারুদ্দিন আহম্দ (রহঃ) ব্যাপকভাবে দ্বীন ইসলাম প্রচারে মঠবাড়িয়া উপজেলায় গুদিঘাটায় খানকাহ স্থাপনসহ বরিশাল অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে দ্বীন ইসলাম প্রচারের কাজ করতেন। ছোট বজরা বা পানশী নৌকায় পীর কেবলা ছফর করতেন। তাঁর হেদায়াতী ছফর শুধু ওয়াজ-নসীহতের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, ছফরে গিয়ে তিনি সমাজের বিভিন্ন সমস্যাদিরও সমাধান দিতেন। পীর কেবলা দ্বীন ইসলাম প্রচারের পাশাপাশি শরীয়ত বিরোধী কর্মকান্ড থেকে বিরত থাকতে এবং ইসলামী হুকুম আহকাম মেনে চলতেও সকলকে পরামর্শ দিতেন। তাঁর দাওয়াতে সাড়া দিয়ে তত্কালীন কৃষকসমাজ ধূমপান (হুকো) ও লক্ষ্মীপূজা ত্যাগ করে। পীর সাহেব কেবলা তার প্রতিষ্ঠিত খানকায় মুসলমানদের তরীকায় ছবকাদি শিক্ষাদান ও তালীম তরবীয়াত প্রদান করতেন। ঈমান আকিদা, ইসলামের রীতিনীতি, আমল আখলাক ইত্যাদি বিষয়ে শিক্ষাদানে ১৯১২ গোলপাতার এক কুটিরে প্রতিষ্ঠা করেন কেরাতিয়া মাদ্রাসা। ঐ মাদ্রাসার প্রথম শিক্ষক ছিলেন পীর কেবলার ভগ্নিপতি হাফেজ আলহাজ্ব আব্দুর রশিদ। ঐ কেরাতিয়া মাদ্রাসা উদ্বোধন করেন ফুরফুরা শরীফের পীর কেবল হযরত আবু বকর সিদ্দিকী আল কোরাইশী(রহঃ)। ১৯১৫ সনে পীর সাহেব কেবলা একটি মক্তব প্রতিষ্ঠা করেন। ঐ মক্তবে ভাণ্ডারিয়ার এমদাদ আলী সাহেব বাংলা ও ইংরেজি শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হন। ঐ সময় থেকে ক্লাসওয়ারী জামাত চালু হয়। ১৯১৮ সনে ঐ মাদ্রাসায় কোলকাতা আলিয়া মাদ্রাসার সিলেবাস অনুযায়ী জামাত নিয়মে তালিম শুরু হয়। এবং মাদ্রাসার নামকরণ করা হয় ছারছিনা দারুসুন্নাত আলিয়া মাদ্রাসা। ১৯১৯ সনে গোলপাতার ছাউনি ও কাঠের ঘরের কুতুবখানা পাকাকরণ করা হয়। মাদ্রাসা ও মক্তবের ছাত্রের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় ছাত্রদের থাকা ও খাওয়ার জন্য ১৯২০ সনে প্রতিষ্ঠিত হয় ফতেহিয়া লিল¬াহ বোর্ডিং।১৯২৭ সনে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সভাপতি এবং শাহ সুফি নেছারুদ্দিন আহমদ(রহঃ) সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯২৮ সনে উলা জামাত খোলা হয়। ১৯২৭ সনে ২৯ জানুয়ারি মাদ্রাসার প্রথম মঞ্জুরি এবং ১৯৩৭ সনে জামাতে উলার স্থায়ী মঞ্জুরি পায়। ১৯৩১ সনে ছারছিনা দারুসুন্নাত আলিয়া মাদ্রাসার পাকা ভবন নির্মিত হয়। মাদ্রাসায় ছাত্রের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় ১৯৩৫ সনে দ্বিতল আবু বকর সিদ্দিক হল, একতলা সুফি ফতেহ আলী হল নির্মিত হয়। জামায়াতে উলার পাশাপাশি ১৯৩৮ সনে সরকারি মঞ্জুরি সাপেক্ষে টাইটেল ১ম বর্ষের পাঠ শুরু হয়। ১৯৪০ সনে অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক এবং বৃটিশের ছোট লাট গর্ভনর মিঃ জন হারবার্ট আর্থার মাদ্রাসা পরিদর্শনে আসেন। ১৯৪২ সনে শেরে বাংলা একে ফজলুল হক সর্বপ্রথম ঐ মাদ্রাসায় টাইটেল খোলার অনুমতি দেন। ১৯৫০ সনে তত্কালীন শিক্ষামন্ত্রী মোয়াজ্জেম হোসাইন এ মাদ্রাসা পরিদর্শন করেন এবং ঐ মাদ্রাসায় পরীক্ষাকেন্দ্র মঞ্জুর করেন। ঘরে ঘরে ইসলামী দাওয়াত পৌঁছে দিতে শাহ সুফি নেছারুদ্দিন আহমদ(রহঃ) ১৯৪৯ সনে পাক্ষিক তাবলীগ নামে একটি পত্রিকা বের করতেন, যা আজো নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে। ১৯৪১ সনে নেছারুদ্দিন আহমদ(রহঃ)বাঙালি হাজিদের জন্য পবিত্র মক্কায় একটি রিলিফ ফান্ড গঠন করেন এবং রিলিফ ফান্ড থেকে একটি মুসাফিরখানা প্রতিষ্ঠা করেন। যার নাম নেছারিয়া মুসাফিরখানা। ১৯৪৩ সনে পীর সাহেব কেবলা জমাইয়েতে হিযবুল¬াহ নামে একটি ইসলামী সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৪৫ সনে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের সুন্নাত তরীকা মোতাবেক আমলের নিমিত্তে পীর সাহেব কেবলা এহইয়ায়ে ছুন্নাহ বোর্ড গঠন করেন। ১৯৫০ সনে পীর সাহেব কেবলা ছারছিনা দরবার শরীফে হজ্জ অফিস খুলে দেশের বিভিন্ন স্থানের ১৪০১ জন ভক্ত মুরিদান হজ্জযাত্রী নিয়ে রিজার্ভ স্টিমার মোজাফফরী জাহাজ যোগে হজ্জে গমন করেন এবং হজ্জ পালন শেষে দেশে ফিরে আসেন। এটাই ছিল তার জীবনের শেষ হজ্জ পালন। ১৯৫১ সনে পীর সাহেব কেবলা ছাত্র হিযবুল¬াহ নামে একটি ছাত্র সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। মাদ্রাসা ছাত্রদের আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষে পীর সাহেব কেবলা গড়ে তুলেছিলেন তাত শিল্প। ঐ শিল্পে লুংগি, চাদর, মশারির কাপড় তৈরি হতো। পরে তা বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৫২ সনের ১লা ফেব্রুয়ারি মাওলানা শাহসুফি নেছারুদ্দিন আহমদ(রহঃ) নিজ বাসভবনে ৮০ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। পরদিন আসর বাদ জানাজা শেষে তাকে তাঁর প্রতিষ্ঠিত জামে মসজিদের উত্তর পাশে দাফন করা হয়। তার জ্যেষ্ঠপুত্র পীর শাহ আবু জাফর মোঃ সালেহ (রহঃ) গদিনশীন হন এবং দরবার শরীফসহ মাদ্রাসার যাবতীয় প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। তত্কালীন গদিনশীন পীর কেবলা শাহ আবু জাফর মোহাম্মদ ছালেহ (রহঃ)আমলে ছারছিনা দরবার শরীফের ব্যাপক উন্নতি সাধিত হয়। তাঁর মৃত্যুর পর পুত্র শাহ মোহাম্মদ মোহেবু্ল্লাহ বর্তমানে গদিনশীন পীর এবং পূর্বসূরিদের যোগ্য উত্তরসূরি হয়ে সাফল্যের সাথে দায়িত্ব পালন করছেন।

এই পাতার আরো খবর -
font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধের প্রতিবাদে সংসদ ওয়াকআউট করেছে বিএনপি। আপনি কি এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেন?
7 + 1 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
মে - ১৬
ফজর৩:৫২
যোহর১১:৫৫
আসর৪:৩৩
মাগরিব৬:৩৭
এশা৭:৫৬
সূর্যোদয় - ৫:১৫সূর্যাস্ত - ০৬:৩২
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :