The Daily Ittefaq
ঢাকা, বৃহস্পতিবার ১২ জুন ২০১৪, ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২১, ১৩ শাবান ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ দেশে সংকট নেই, বিএনপিই মহাসংকটে : নাসিম | রাঙ্গামাটির নানিয়ারচরে পাহাড়ি দুই গ্রুপের 'বন্দুকযুদ্ধে' নিহত ২ | হাইকোর্ট বিভাগে স্থায়ী হিসেবে ৫ বিচারপতির শপথ গ্রহণ | দেশে ফিরলেন সোমালিয়ায় অপহৃত ৭ বাংলাদেশি নাবিক

[ আন্তর্জাতিক ]

প্রণবের স্বপ্নময় ভাষণে মোদীরভারত নির্মাণের ছবি

বাহারউদ্দিন

গুমোট আকাশ। মেঘ জমেছে দূরে কোথাও। কখনো হালকা বাতাস বইছে। কোথাও আবার চোখ রাঙিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে অসহ্য, বিদ্রোহী রোদ। দাবদাহ পিছু ছাড়ছে না। গরমে সবার হাঁস-ফাঁস অবস্থা। আবহাওয়া দপ্তরের খবর, এ রকম আরো কয়েকদিন চলবে। আমাদের অনুমান, অচিরেই শেষ জ্যৈষ্ঠের বৃষ্টি নামবে। নামতে বাধ্য। প্রকৃতির নিঃশব্দ স্বর আর মানুষের প্রত্যাশা নিরন্তর এ আভাস দিচ্ছে। আসন্ন অনিবার্য বৃষ্টির সঙ্গে কী অদ্ভুতভাবে, ভারতীয় রাজনীতির ইঙ্গিতও মিলে যাচ্ছে। গতকাল যাঁরা একে অন্যকে প্রবল শত্রু ভাবত, কটাক্ষে, বিদ্রূপে কাঁপিয়ে দিত, তাতিয়ে দিত স্বআয়োজিত জনসভাকে, আজ তাঁরা সৌহার্দ্য আর আপ্যায়নের পরিসর গড়ে তুলছে। একই আসরে বসে নিঃশব্দে ভাষণ শুনছে। একে-অন্যের সঙ্গে করমর্দন করে বিলিয়ে দিচ্ছে ব্যতিক্রমের হাসি। এসবের নিকটতম উদাহরণ-একই দিনে, কয়েক ঘণ্টা ব্যবধানে কলকাতা আর দিল্লিতে ঘটে গেল এ রকম অভিনব, প্রত্যাশিত অন্তত চার ঘটনা। এক, কলকাতার নবনির্মিত সচিবালয় নবান্ন-এ ঘোষিত প্রতিপক্ষ, প্রথম সারির বামপন্থি নেতাদের ফিস ফ্রাই, ক্রিমরোল আর দার্জিলিং টি দিয়ে আপ্যায়ন করলেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সৌজন্যের অভিনব ঘটনা। কেউ কেউ বলছেন, এটি একটি চমক অথবা কৌশল। আমরা মনে করি, প্রত্যাশিত সৌজন্যে। এরকমই হওয়া উচিত। সমাজে, রাজনীতিতে মতভেদ থাকবে কিন্তু মতান্তর নয়। মতান্তর বজায় রেখেও স্বাস্থ্যময় পরিসর গড়ে তোলা দরকার। এতে মানুষের মঙ্গল। রাজনীতিও সুস্থতার পথে হাঁটবে। তীব্র খরা, দহনের পর যেমন বৃষ্টি নামে, এটাও এক ধরনের বর্ষণ।

দুই. দিল্লির সংসদের সেন্ট্রাল হলে, লোকসভা ও রাজ্যসভার ৮০০ সদস্যের সামনে রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের স্বপ্নময় ভাষণে নবগঠিত মোদী সরকারের ভারত নির্মাণের ছবি ফুটে উঠল। প্রণব বাবু কংগ্রেস পরিবারের সন্তান। যৌবনে বাংলা কংগ্রেসে যোগ দিয়ে রাজ্যসভার সদস্য। '৬০-এর দশকের শেষের দিকে শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী যখন ব্যাংক জাতীয়করণের ঝুঁকি নিলেন, মোরারজি দেশাইয়ের নেতৃত্বে রক্ষণশীল কংগ্রেসদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালেন। বিলের সমর্থনে চমত্কার যুক্তি পেশ করলেন তরুণ বিরোধী সাংসদ। প্রণবের তথ্য, পরিসংখ্যান আর রচনাভঙ্গিতে মুগ্ধ ইন্দিরা পরে তাঁকে ডেকে নিয়ে কথা বললেন। পরে তিনি কংগ্রেসে যোগ দিয়ে এক সময় বাণিজ্য দপ্তরের মন্ত্রী হয়ে সাফল্যে বিস্মিত করে দিলেন প্রধানমন্ত্রীকে। পরে আমৃত্যু ইন্দিরার সঙ্গী এবং তাঁর মন্ত্রিসভার দ্বিতীয় ব্যক্তি। মাঝখানে রাজীব তাঁকে ভুল বুঝেছেন। কংগ্রেসের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়েছে। কিন্তু আদর্শচ্যুত হননি। রাজীব পরে ফিরিয়ে দিলেন ভারতীয় রাজনীতির স্থিতধী প্রজ্ঞাকে। রাজীবের মৃত্যুর পর সামনে সোনিয়া, নেপথ্যে প্রণব বাবুই কংগ্রেসের সর্বভারতীয় অভিভাবক। কখনো বিদেশ মন্ত্রী, প্রতিরক্ষা মন্ত্রী, সক্রিয় রাজনীতির শেষ পর্যায়ে সফল অর্থমন্ত্রী। কংগ্রেস অনেক ভেবে-চিন্তে, পরিকল্পিত স্বপ্নকে সামনে রেখে তাঁকে রাষ্ট্রপতির পদপ্রার্থী যখন করল, তখন গোড়ার দিকে বিরোধীদের কারো কারো কিন্তু কিন্তু ছিল। পরে তা কেটে যায় এবং নিরঙ্কুশ ভোট পেয়ে তিনি জয়ী হলেন। রাষ্ট্রপতির আসনে বসে তিনি তাঁর প্রথম ভাষণেই বুঝিয়ে দিলেন—দেশের সাংবিধানিক প্রধানের নিরপেক্ষতা রক্ষাই তাঁর ধর্ম। ভোটের বহু আগে, বেশ কয়েকটি অভিভাষণে দেশবাসীকে স্মরণ করিয়ে দিতে ভোলেননি, কেন্দ্রে স্থায়ী সরকার গড়তে হবে। অস্থিরতা গণতন্ত্রের ভিতকে নড়বড়ে করে দেয়। ডেকে আনে অনৈক্য। অর্থনীতিকেও দুর্বল করে তোলে। তাঁর কাঙ্ক্ষিত স্বপ্নের সঙ্গে মোদী সরকারের ভারত নির্মাণের প্রতিশ্রুতি অনেকটাই মিলে গেছে। স্বভাবত এজন্যই সোমবার লোকসভা ও রাজ্যসভার যৌথ অধিবেশনে, লিখিত ভাষণে অকপটে জানিয়ে দিলেন সদ্যসমাপ্ত নির্বাচনে আকাঙ্ক্ষা পূরণের স্বপ্ন দেখেছেন দেশের মানুষ। প্রায় তিনশ' বছর পর ৬৬.০৪ ভোট পেয়ে একটি রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় এসেছে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এটি এক বিশেষ অভিমুখ তৈরি করছে। এদেশে প্রতিটি সম্প্রদায়ের, প্রতিটি জাতির, প্রতিটি অঞ্চলের।'

কেউ কেউ বলছেন, মাননীয় রাষ্ট্রপতি তাঁর ভাষণে মোদী স্বপ্ন ছড়িয়ে দিয়েছেন। এতে কেউ কেউ সম্ভবত ক্ষুব্ধ। মুখ তাঁদের ভারী হয়ে উঠেছে। হতে পারে। এরকম হওয়ার কারণ ভোটের আগে মোদীর শ্ল্লোগান ছিল 'এক ভারত, শ্রেষ্ঠ ভারত। সব কা সাথ সব কা সাথ সবকা বিকাশ। আমি চাই ন্যূনতম সরকার আর সর্বোচ্চ প্রশাসন।' ভোটে জেতার পরও নরেন্দ্র মোদী বলেছেন, আমি সর্বভারতীয় জনতা প্রতিনিধি।—এসব উচ্চকিত বিজ্ঞাপিত শ্লোগানই নাকি রাষ্ট্রপতির ভাষণে প্রকারান্তরে ফিরে এসেছে। যাঁরা এসব প্রশ্ন তুলছেন, তারা বাস্তবকে অস্বীকার করছেন। উড়িয়ে দিচ্ছেন সত্যতার বিশ্লেষণকে। প্রণব বাবু বিচক্ষণ, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তি। তাঁর পক্ষে বাস্তবের মুখকে অস্বীকার করা অসম্ভব। এজন্যই বলতে পারলেন, গরিবের কোনো ধর্ম নেই, ক্ষুধার কোনো জাত নেই। হতাশার কোনো ভূগোল নেই। গরিবিই আমাদের সামনে সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ। এই অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে হবে। কল্যাণপ্রসূ অর্থনীতির প্রবক্তা অমর্ত্য সেনের দর্শনের সঙ্গে প্রণব বাবুর চিন্তার অদ্ভুত মিল খুঁজে পাচ্ছি আমরা। অমর্ত্য সেন বৈষম্যহীন, দারিদ্র্যমুক্ত সমাজ দেখতে চান। প্রণব বাবুও এই স্বপ্ন দেখেছেন। দায়িত্বশীল প্রধানমন্ত্রী হয়ে ওঠার পথে গরিবির অভিশাপ থেকে মুক্ত সমাজের ছবি আঁকছেন নরেন্দ্র মোদী। গরিবি হটাও শ্লোগান কণ্ঠে নিয়ে এক সময় ভারত জুড়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী। অমৃত্যু ইন্দিরার স্বপ্নকে যদি স্বাগত জানাতে পারি, তাহলে মোদীর কর্মসূচিকে তাঁর কর্মসূচির রূপরেখাকে রাষ্ট্রপতির ভাষণে দেখতে পেয়ে বাঁকা চোখে কেন তাকাব।

রাষ্ট্রপতি ভাষণ দিচ্ছেন, তাঁর সামনেই একই সারিতে বসে আছেন শ্রীমতী সোনিয়া গান্ধী, মনমোহন সিং, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি। ভাষণ শুনতে সবাই মগ্ন। দাঁড়িয়ে বলছেন প্রণব। ভাষণের আসন ছেড়ে বেরিয়ে যেতেই শুরু হয়ে গেল গুঞ্জন। কিছুক্ষণের মধ্যেই টি আর পি কাঙাল বৈদ্যুতিন মাধ্যমে শুরু হয়ে গেল তরজা-প্রণবের মুখ দিয়ে বেরিয়ে এসেছে মোদীর বার্তা, মোদীর ভারতদর্শনের স্বপ্ন। সাংবিধানিক প্রধানকে নিয়ে এই ধরনের আচরণ সুরুচির পরিচায়ক নয়। ভালো কাজে, ভালো উদ্যোগে রাষ্ট্রনেতার সঙ্গে দেশের সাংবিধানিক প্রধানের সমন্বয় থাকে, থাকা উচিত। আবার মতভেদও হতে পারে। তাই বলে পছন্দের হলে বাহবা করব। আর অপছন্দের দিকে ঝুঁকলেই মুখ বাঁকাব, গণতন্ত্রে, সমাজে এহেন রুচিহীনতা চলতে পারে না। প্রণব বাবু, রাজনৈতিক খরার বদলে সম্ভাবনাময়, ফলদায়ী বৃষ্টির আভাস পেয়ে তাঁর স্বপ্নের কথা বলেছেন, বলতে পেরেছেন—এটাই তো কাঙ্ক্ষিত। ভালো কাজের তোয়াজহীন প্রশংসা করার সাহস, রুচি সবার হয় না। যাঁরা করতে পারেন, তাঁরা ব্যতিক্রম, তাঁরা দূরদ্রষ্টা।

তিন. সেন্ট্রাল হলে ঢোকার সময় নরেন্দ্র মোদী আর রাহুল গান্ধী প্রায় মুখোমুখি। প্রধানমন্ত্রীকে দেখেই ভিড়ের ভেতর থেকে রাহুলের হাত বলল, নমস্তে। দেখতে পাননি মোদী। এগিয়ে গেলেন। সভাশেষ যখন প্রায় একসঙ্গে বেরিয়ে আসছেন, তখনই প্রত্যাশিত চমক। বিশেষ কারো নজরে পড়ল না, দ্রুত এগিয়ে পা চালিয়ে বাঁহাত দিয়ে মোদী চেপে ধরলেন রাহুলের হাত। এক সেকেন্ডের করমর্দনে মুছে গেল ভোটের আগের সমস্ত তিক্ততা। এ এক বিরল ছবি। দিন কয়েক আগে যাকে শাহজাদা বলে বার বার তীব্র আক্রমণ করেছেন, আজ তাঁকেই সাদর অভ্যর্থনা। এ কিসের লক্ষণ? নিছক সৌজন্যের? না দায়িত্বশীল রাষ্ট্রনেতার মনোহর অভিব্যক্তি। এখানেও বৃষ্টির আগাম আওয়াজ বেজে উঠল, উঁচু হলো বিরোধের প্রতি গণতান্ত্রিকতার, উপমহাদেশীয় শুভচেতনার মহিমা।

চার. কমিউনিস্টরা সহজে ভুল স্বীকার করেন না। করলেও গোপনে। নিজেদের অভ্যন্তরে মাকর্সবাদী রাষ্ট্রতন্ত্রের অনুশাসন থেকে বেরিয়ে আসার, প্রশ্ন তোলার অধিকারকে মান্যতা দিতে তাদের এত ভয় কেন জানি না। সম্প্রতি কলকাতায় সিপিএম-এর রাজ্য কমিটির বৈঠকে নেতৃত্ব বদলের দাবি ওঠে। দাবিটি উড়িয়ে দেয় উচ্চাসীন নেতৃত্ব। অপেক্ষাকৃত তরুণদের বক্তব্য, যাঁদের বয়স হয়েছে, তাঁরা নেতৃত্ব দিতে ব্যর্থ। তারুণ্যের ভাবাবেগ নস্যাত্ করে দিয়ে সিপিএমের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক প্রকাশ কারাত জানিয়ে দেন, এই মুহূর্তে নেতৃত্ব বদলের প্রশ্নই ওঠে না। ব্যস চুপসে গেল সব মুখ। কিন্তু তলে তলে ধিকিধিকি আগুন জ্বলতে লাগল। গ্রামে-গঞ্জে হিংসার শিকার হচ্ছে নিচুস্তরের কর্মী, নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন, আর বড়ো বড়ো নেতারা বিবৃতি ঝেড়েই দায়িত্ব থেকে খালাস। পরাজয়ের নৈতিক দায় নিতেও গররাজি। এরপর বিলম্বিত বোধোদয় ঘটল। দিল্লিতে সাংবাদিক সম্মেলনে প্রকাশ কারাত স্বীকার করলেন, আর্থিক উদারনীতির বিরোধিতা করেই তাদের আজকের এই অবক্ষয়। বাংলায় তাঁর দলের অভাবনীয় বিপর্যয়ের দায়ও তিনি রাজ্য কমিটির ঘাড়ে চাপাননি। বলেছেন, মোদী হাওয়া বুঝতে পারিনি। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তাঁর শক্তি ও প্রভাব বাড়াতে পারেনি। জনভিত্তি কমেছে। ভোটেও সেই প্রতিফলন দেখা গেছে। এটাও এক ধরনের বৃষ্টির লক্ষণ। বামপন্থিদের আত্মতৃপ্তি, ঔদ্ধত্য, যান্ত্রিকতা নিয়ে আত্মসমালোচনা শুরু হলে তাদের মননে ভরা বর্ষা নামতে পারে। কিন্তু এ এক কঠিন কাজ। আদ্যোপান্ত শ্লোগান পারবেন তাঁরা বদলাতে, পারবেন বলতে শুধু শ্রমিক-কৃষকের ঐক্য নয়, চাই সব মানুষের ঐক্য এবং বৈষম্যহীন সমাজ ব্যবস্থা? যদি না পারেন, বামপন্থিদের ব্যবহারিক রাজনীতি নিয়ে সংশয় বাড়বে, নিরন্তর প্রশ্ন উঠতে থাকবে। আর এসব প্রশ্ন ও সংশয়ের ফাঁক দিয়ে রাজনৈতিক আসরে নামবে বিপজ্জনক শক্তি। বড্ড দুঃসময় যাচ্ছে। ২০০৯ থেকে ১১, তারপর ২০১৪- ভোট কমতে কমতে ২৯ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে। আশঙ্কা আরো কমবে। পুরোপুরি দেয়ালেই ঠেকে যাবে পিঠ।

বামপন্থিদের কেন এই 'কৌশলী' আপ্যায়ন?

এখানকার একটি কাগজে, বড়ো বড়ো হরফে শিরোনাম দেখলাম, বিজেপির বাড়বাড়ন্ত দেখে সিপিএমের দ্বারস্থ হয়েছেন মমতা। খবরটির ভেতরে কী আছে, না পড়েই কটাক্ষের চেহারা ভেসে উঠল। একপেশে খবর, পক্ষপাতদুষ্ট বিশ্লেষণকে গুরুত্ব দিতে রুচিতে বাধে। খবরকে যাঁরা কবর চাপা দেন, বা অংশত বলেন-তারা কোন্ জগতের মানুষ গো। এটা পেশাগত অন্যায়, তা বলবে কে? বলার লোক নেই, তা নয়, আছেন। তাঁদের সংখ্যা বাড়ছে। একদিন তাঁরা অবশ্যই প্রতিবাদের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে দেবেন। যাকেগ প্রসঙ্গে ফিরে আসছি। মমতার সঙ্গে সিপিএমের বিরোধ, সবার জানা। লোকসভা ভোটের প্রচারে একা তিন শক্তির বিরুদ্ধে শাণিত আক্রমণ করেছেন তৃণমূল নেত্রী। বলেছেন, গেটআপ গেম খেলছে সিপিএম, বিজেপি এবং কংগ্রেস তিন দলেরই লক্ষ্য, তৃণমূল। সিপিএমও মমতাকে রেহাই দেয়নি। প্রচারকে ঘিরে রুচিহীনতা, সংঘর্ষ, হুমকিতে উত্তাল হয়ে ওঠে বঙ্গজমিন। '৭৭ সাল থেকেই মমতা সিপিএমের সাথে লড়াই করেছেন। বার বার আক্রান্ত হয়েছেন। প্রতিটি আক্রমণ তাঁর জেদ ও দুঃসাহসকে বাড়িয়ে দিয়েছে। সিপিএমও বসে থাকেনি। সবদিক থেকে কোণঠাসা করে রাখার অঙ্ক কষেছে। মমতামুখী আক্রমণ যত বেড়েছে, ততই সিপিএমের ঔদ্ধত্য মুখ খুলেছে, ততই বামপন্থিদের প্রতি সাধারণ মানুষের বিতৃষ্ণা উঁচু হয়েছে। বিতৃষ্ণার চূড়ান্ত পরিণতি ২০১১ সালের বিধানসভা ভোটে মুখ থুবড়ে পড়ে গেলেন বামপন্থিদের বড় বড় বৃক্ষ। সর্বশেষ পঞ্চায়েত ভোটেও পতন এড়াতে পারল না। আর চূড়ান্ত বিপর্যয় দেখা দিল এই লোকসভা ভোটে। ৪২টি আসনের মধ্যে পেল মাত্র দুটি। একটি ইসলামপুরে আরেকটি মুর্শিদাবাদে। কিন্তু তাঁদের হিসেব ছিল, ২০০৯ সালে কংগ্রেস আর তৃণমূল জোটবেঁধে লড়ে অনেকটাই সফল হয়েছে। এবার জোট নেই। বিজেপি ঝাঁপিয়ে পড়েছে। প্রধানত চারমুখী লড়াই। ভোট কাটাকুটিতে কেল্লা পুনরুদ্ধার হয়ে যাবে। সাম্প্রদায়িকতা ইস্যু করল না। করলেন মমতা। ফল দাঁড়াল, লড়াই মোদী বনাম মমতার। ভোটের রেজাল্ট দেখে অবাক হইনি, ভস্ম হয়নি মমতার প্রত্যাশা। তাঁর দখলে ৩৪ আসন। বিজেপি ২, কংগ্রেসের ৩ । কিন্তু বিজেপি ২ আসন পেলেও তাঁদের ভোট বেড়ে দাঁড়াল ১৭ শতাংশের উপরে। এই আশাতীত বৃদ্ধি মমতার আশঙ্কার কারণ, উদ্বিগ্ন সিপিএমও। দুইপক্ষই ভয় পাচ্ছে, পুরভোটে, ২০১৬ বিধানসভার নির্বাচনে মোদীর টানে ভোট আরো বাড়বে। সিপিএমের পায়ের তলার জমি ক্রমশ সরছে। ২০১১ সালে ভোটের পর বামপন্থিদের তৃণস্তরের কর্মীদের একাংশ তৃণমূলমুখী হয়ে ওঠেন। বহিরাগমনের স্রোত থামেনি। লোকসভা ভোটের পর থেকে শোনা যাচ্ছে, মধ্যবিত্ত ভোটার, সীমান্ত এলাকার বামপন্থি নির্বাচকরা দলে দলে বিজেপির দিকে ঝুঁকে পড়ছেন। মাসখানেক আগে, হালে কোথাও কোথাও তৃণমূল কংগ্রেস আর সিপিএম সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। এই সংঘর্ষের রাজনৈতিক পরিভাষা সন্ত্রাস। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে স্মারকলিপি পেশ করতেই মৃত, আহত আর ঘরছাড়াদের তালিকা নিয়ে বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিমান বসুর নেতৃত্বে মমতার সঙ্গে দেখা করতে গেলেন বামপন্থি নেতারা। আগে অনেকবার তাঁরা সাক্ষাত্ করতে চেয়েছেন। মমতা পাত্তা দেননি। এবার একসঙ্গে বসে প্রায় কথা বললেন। আন্তরিক আপ্যায়নেও কমতি নেই। মমতা বললেন, ঘর সামলান, আপনাদের এত লোক দলে দলে বিজেপিতে যাচ্ছেন কেন? বামপন্থিরা কী বললেন, জানা যায়নি। কিন্তু দুইপক্ষের আলাপে তিক্ততা নেই, বিতর্ক নেই। সৌজন্য আর সৌহার্দ্য ছায়া ছড়াচ্ছে। দিনকয়েক আগেও একে অন্যের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করে নিজ নিজ সমর্থনের ভিতকে উসকে দিয়ে যাঁরা বাড়িয়ে তুলেছেন সামাজিক অশান্তি, তাঁরাই আজ একই বৈঠকে পরস্পরের মুখোমুখি। নিন্দুকের ভাষায় লাগাম থাকে না। তারা বলছে বিজেপির বৃদ্ধিই এক আসরে খানা খেতে দুইপক্ষকে বাধ্য করলো। এটা রটনা, না ঘটনা তা আমরা জানি না। শুধু এটুকুুই বলতে পারি, বেঁচে থাক এই সৌজন্য। জ্যৈষ্ঠের উত্তাপকে কাবু করতে নেমে আসুক অবিরল বৃষ্টি। দ্বিতীয়ত, নানা এলাকা থেকে তৃণমূল বিজেপির সংঘর্ষের খবর আসছে। বাংলায় মমতার জনপ্রিয়তা এই মুহূর্তে মোদীর অনেক ঊর্ধ্বে। চাইলেই বিজেপিমুখী 'সন্ত্রাস' রুখতে পারেন তিনি। রুখবেন না? রুখলেই নেমে আসবে প্রবল বর্ষা। না রুখলে সাম্প্রদায়িক বিপদ আরো বাড়বে। ফিরে আসবে ভেদাভেদের রাজনীতি।

লেখক : ভারতীয় সাংবাদিক, সম্পাদক আরম্ভ পত্রিকা

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে আইন করে কঠোর শাস্তি করার পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তি বাড়ানোর আশ্বাস দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ। এই আশ্বাস দ্রুত বাস্তবায়িত হবে কি?
1 + 1 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
আগষ্ট - ২০
ফজর৪:১৬
যোহর১২:০২
আসর৪:৩৬
মাগরিব৬:৩১
এশা৭:৪৭
সূর্যোদয় - ৫:৩৬সূর্যাস্ত - ০৬:২৬
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :