The Daily Ittefaq
ঢাকা, বুধবার, ০৩ জুলাই ২০১৩, ১৯ আষাঢ় ১৪২০ এবং ২৩ শাবান ১৪৩৪

মুক্তিযুদ্ধে পটুয়াখালীর গৌরবময় ইতিহাস

পটুয়াখালী প্রতিনিধি

মিত্রবাহিনীর সহায়তা ছাড়াই প্রতিরোধ আর সম্মুখ যুদ্ধে শত্রুদের পরাজিত করে জেলা সদর ব্যতীত সকল এলাকা মুক্তিযোদ্ধারা দখল করে নেয়। তারা অবস্থান নেয় শহরের চারিদিকে। এ অবস্থা আঁচ করতে পেরে ৬ ডিসেম্বর রাতে নিষ্প্রদীপ কারফিউ জারি করে লঞ্চযোগে পালিয়ে যায় পাক সেনারা। পরদিন ৭ ডিসেম্বর সকালে মুক্তিযোদ্ধারা শহরে প্রবেশ করতে শুরু করলে রাজাকার ও আলবদররা অস্ত্রশস্ত্র ফেলে পালাতে থাকে। বিনা বাধায় মুক্তিযোদ্ধারা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। দীর্ঘ ৮ মাস অবরুদ্ধ থাকার পর একাত্তরের ৮ ডিসেম্বর পটুয়াখালীতে আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তোলন করা হয় স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। মির্জাগঞ্জ থানার দায়িত্বে আলতাফ হায়দারের নেতৃত্বাধীন মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপ প্রথম প্রবেশ করে পটুয়াখালী শহরে। প্রশাসনের কর্মকর্তারা আনুগত্য প্রকাশ করে। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে এইদিনে আনুষ্ঠানিকভাবে কমান্ডার আলতাফ হায়দার উত্তোলন করেন স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা।

সংগ্রাম পরিষদ গঠন ও সশস্ত্র প্রশিক্ষণ

পটুয়াখালী জেলায় মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করতে সংগ্রাম পষিদের নেতৃত্বে ছিলেন সভাপতি- এডভোকেট কাজী আবুল কাসেম (জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি), সাধারণ সম্পাদক- আশরাফ আলী খান (জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক), হাফিজুর রহমান ফোকান মিয়া (আওয়ামী লীগের নেতা), এডভোকেট মোঃ আবদুল বারী (আওয়ামী লীগের নেতা), আবদুল করিম মিয়া (ভাষানী ন্যাপের কেন্দ্রীয় নেতা), সৈয়দ আশরাফ হোসেন (জেলা ন্যাপের সভাপতি) ও কমরেড মোকসেদুর রহমান (কমিউনিস্ট পার্টির নেতা)। এদের মধ্যে কমরেড মোকছেদুর রহমান ছাড়া সকলেই আজ প্রয়াত। ২৬ এপ্রিলের আগ পর্যন্ত একমাস পটুয়াখালী জেলা ছিল মুক্তাঞ্চল। এসময় সংগ্রাম পরিষদ বর্তমান মহিলা কলেজে জেলা নিয়ন্ত্রণ কক্ষ স্থাপন করে ৩শ মুক্তিযোদ্ধাকে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ দেয়ার ব্যবস্থা করে। তত্কালীন জেলা প্রশাসক এম.এ আউয়াল এক্ষেত্রে অনন্য সাধারণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি পুলিশ লাইন থেকে রাইফেল ও গুলি এনে তুলে দেন মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে। পরে এজন্য পাকহানাদাররা তাকে গুলিবিদ্ধ করে। তবে তিনি প্রাণে বেঁচে যান।

গণহত্যা চালায় যেভাবে

২৬ এপ্রিল'৭১, সোমবার সকাল সাড়ে ১০টা। পাক-হানাদারদের জঙ্গী বিমান ছুটে আসে পটুয়াখালীর আকাশে। শুরু হয় বিমান হামলা। চলে শেলিং আর বেপরোয়া গোলাবর্ষণ। একনাগাড়ে কয়েকঘন্টা বোমা হামলা চালিয়ে সামরিক হেলিকপ্টারে কালিকাপুর এলাকায় অবতরণ করে পাকিস্তানি ছত্রীসেনা। উন্মত্ত আক্রোশে হানাদাররা ঝাঁপিয়ে পড়ে নিরস্ত্র জনতার উপর, চালায় নির্বিচারে গণহত্যা। মারণাস্ত্রের ভয়ঙ্কর শব্দ, আক্রান্ত মানুষের আর্তনাদ, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ, সবমিলিয়ে সৃষ্টি হয় এক নারকীয় পরিস্থিতির। অগ্নিসংযোগে ভস্মীভূত করা হয় শহরের বাণিজ্যিক সমগ্র পুরান বাজার এলাকা। যত্রতত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে থাকে মক্তিকামী জনতার লাশ। ঐদিনের গণহত্যায় তিন শতাধিক লোক শহীদ হয়। পাকসেনারা গুলিবিদ্ধ করে তত্কালীন জেলা প্রশাসক মোঃ আবদুল আউয়ালকে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে রাইফেল তুলে দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে সহায়তার।

ছত্রীসেনা অবতরণকালে কালিকাপুর মাদবার বাড়ির শহীদ হয় ১৭ জন, প্রতিরোধ করতে গিয়ে জেলা প্রশাসকের বাসভবনের সামনে শহীদ হন ৬ জন আনসারসহ ৭ জন। এছাড়া, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে জেলার বিভিন্ন স্থানে গণহত্যা চালিয়ে ও জেলখানার অভ্যন্তরে হত্যা করা হয় দেড় সহস্রাধিক লোককে। এদের অধিকাংশকেই দাফন করা হয় বিনা জানাজায় গণকবরে। মাদবার বাড়ির গণকবর, জেলা প্রশাসকের বাসভবনের অদূরে আনসারদের গণকবর ও পুরাতন জেলখানার অভ্যন্তরের বধ্যভূমি মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যার নির্মম সাক্ষ্য বহন করে আছে আজো।

বেঁচে আছেন ৮ বীরাঙ্গনা

মুক্তিযুদ্ধকালে পাক-হানাদাররা যাদের সম্ভ্রম কেড়ে নিয়েছে সেইসকল বীরাঙ্গনা ইটবাড়িয়া এলাকার ১৪ জনের মধ্যে ৮জন আজো বেঁচে আছেন সেই নরক যন্ত্রণার স্মৃতি নিয়ে। এয়ার ভাইসমার্শাল(অবঃ) এ.কে খন্দকারসহ সেক্টর কমান্ডরস ফোরামের নেতৃবৃন্দ ঐ এলাকায় গেলে এরা সকলে গণসাক্ষ্য দেন। ঘটনার দিনটি ছিল ৮ মে, দুপুর আনুমানিক সাড়ে ১২টার দিকে পাক-সেনারা গানবোটে আসে পায়রা নদী পাড়ের ইউটবাড়িয়া গ্রামে। তারা নেমেই নির্বিচারে গুলি চালাতে চালতে গ্রামের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে। হত্যা করে ২৪ জনকে। অগ্নিসংযোগে পুাড়িয়ে ৪৩টি বাড়ি। তারা ধরে সার্কিট হাউজের ক্যাম্পে নিয়ে আসে ৩৫ জন গৃহবধূ ও যুবতীকে। এদের উপর চালানো হয় পাশবিক নির্যাতন। আত্মস্বীকৃত ১৪ জন বীরাঙ্গনা হলেন-রুশিয়া বেগম, হাসন বানু, ভানু বিবি, হাচেন ভানু, মোনয়ারা বেগম, ময়ুর নেছা, ফুলবানু, রিজিয়া বেগম, ফুলভানু, জয়ফুল বিবি, সকিনা বেগম, জামিনা বেগম, আনোয়ারা বেগম ও ছয়তুননেছা। এদের মধ্যে সেই দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকারা বীরাঙ্গনা নামের খেতাব ছাড়া এদের ভাগ্যে জোটেনি আর কিছুই। তবে, সমপ্রতি জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে বেঁচে থাকাদের প্রত্যেককে নগদ ৫হাজার টাকা ও কিছু কাপড়-চোপড় সহায়তা দেয়া হয়েছে।

রণাঙ্গনে শহীদ হয় ৩৩জন মুক্তিযোদ্ধা

মুক্তিযুদ্ধকালে বিভিন্ন রণাঙ্গনে শহীন পটুয়াখালী জেলার ৩৩জন মুক্তিযোদ্ধা। তারা হলেন-আমজাদ হোসেন সিকদার, তোজম্বর আলী গাজী, সিপাহী নুরুল হক, হাবিলদার হাফিজ উদ্দিন সিকদার, আঃ হক তালুকদার, আঃ ছালাম, আঃ রহমান হাওলাদার, আঃ মান্নান, আঃ কাদের জমাদ্দার, ইউছুফ আলী মৃধা, সিপাহী আবদুল করিম, ল্যান্স নায়েক মুজাফফর হাওলাদার, মোঃ আবদুল খালেক, মোয়াজ্জেম হোসেন খান, আলী আহমেদ খাঁ, শাহজাহান হাওলাদার, আবদুল মজিদ খান, আঃ রশীদ হাওলাদার, পিসি আনোয়ার হোসেন, আঃ খালেক, সিপাহী আবদুল মোতালেব, সিপাহী আবদুল কুদ্দুস, সুলতান আহমেদ, সিপাহী আবদুল খালেক, সোরাব আমীর হোসেন, নায়েক জয়নাল আবেদীন হাওলাদার, হাবিলদার নাসির উদ্দিন, নায়েক আবদুল মালেক, সিপাহী ইউছুফ আকন্দ, সিপাহী চান মিয়া, মোঃ হাফিজুর রহমান, মোঃ আবদুর রাজ্জাক ও সিপাহী মকবুল হোসেন।

প্রথম প্রতিরোধ মাদারবুনিয়ায়

পটুয়াখালী শহর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে তখনকার সময়ে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন মাদারবুনিয়া গ্রামে ১১আগস্ট দুপুরে সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বাধীন শাহজাহান ফারুকীর ৩৪ সদস্যের একটি মুক্তিযোদ্ধা দলের উপর অতর্কিত আক্রমণ চালায় পাক সেনারা। গ্রুপ কমান্ডার হাবিলদার মতিয়ার রহমানের নেতৃত্ব মুক্তিযোদ্ধারা তা প্রতিরোধ করে। এসময় শত্রুপক্ষের ৩ জন গুলিবিদ্ধ হলে তারা পিছু হটে প্রায় একঘন্টার গোলাগুলিতে মুক্তিযোদ্ধাদের গুলিস্বল্পতার কারণে এবং জেলা সদর নিকটবর্তী হওয়ায় তারাও এসময় ঐ এলাকা ত্যাগ করতে বাধ্য হয়।

পানপট্টির যুদ্ধ ও মুক্তাঞ্চলে

স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন

গলাচিপা থানা থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার পূর্ব-দক্ষিণে প্রমত্তা আগুনমুখা নদী পাড়ের একটি নিভৃত পল্লী পানপট্টি গ্রাম। ভারতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত একটি মুক্তিযোদ্ধা দল কে.এম নুরুল হুদা ও হাবিবুর রহমান শওকতের নেতৃত্বে এসে নিরাপদ এলাকা চিহ্নিত করে ক্যাম্প স্থাপন করেন পানপট্টি সাইক্লোন সেল্টারে। ১৮ নভেম্বর সকাল ৬টার দিকে মেজর ইয়ামিনের নেতৃত্বে পাক-হানাদারদের একটি সুসজ্জিত বাহিনী আক্রমণ করে সেখানে। মুক্তিযোদ্ধারা যে যার মত করে অবস্থান নিয়ে পাল্টা আক্রমণ চালায়। শুরু হয় সম্মুখ যুদ্ধ। দু'পক্ষের গোলাগুলিতে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে সমগ্র এলাকা। মুক্তিযোদ্ধাদের তিনদিক থেকে আক্রমণে পাকবাহিনী কোনঠাসা হয়ে পড়ে ও তাদের কয়েকজন হতাহত হয়। বিকাল ৪টার দিকে পিছু হটতে শুরু করে ইয়ামিন বাহিনী। এদিকে, ঐ এলাকার জনতা মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তায় এগিয়ে আসে।

তারা জয়বাংলা ধ্বনিতে প্রকম্পিত করে তোলে এলাকা। (সংক্ষেপিত)

এই পাতার আরো খবর -
font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
গভর্নর ড. আতিউর রহমান বলেছেন, 'গ্রামীণ ব্যাংকের কাঠামোগত পরিবর্তনের দরকার নেই।' আপনিও কি তাই মনে করেন?
7 + 4 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
মে - ২৪
ফজর৩:৪৭
যোহর১১:৫৬
আসর৪:৩৫
মাগরিব৬:৪১
এশা৮:০৩
সূর্যোদয় - ৫:১২সূর্যাস্ত - ০৬:৩৬
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :