The Daily Ittefaq
ঢাকা, বুধবার, ০৩ জুলাই ২০১৩, ১৯ আষাঢ় ১৪২০ এবং ২৩ শাবান ১৪৩৪

স্মরণীয়-বরণীয়

আমাদের দীনেশচন্দ্র

খন্দকার মাহমুদুল হাসান

গ্রামের নাম বগজুড়ী। একেবারে গণ্ডগ্রাম। এই গ্রামেই প্রায় দেড়শো বছর আগে ১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দের ৩ নভেম্বর তারিখে জন্ম হয়েছিল একটি ছেলের। নাম তার দীনেশচন্দ্র সেন। তোমরা কি জানো কে ছিলেন এই দীনেশচন্দ্র সেন? তিনি ছিলেন বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের একজন।

গ্রামটা এখন পড়েছে মানিকগঞ্জ জেলায়। ওখানে ছিল ছেলেটার মামাবাড়ি। তার মামারা ছিলেন খুব নামকরা বংশের মানুষ। এই বংশকে এলাকার লোক মুনশি বংশ বলে চিনত। 'মুনশি' ছিল মুঘল আমলের একটি সম্মানজনক পদ। তার মামাদের পূর্বপুরুষ ছিলেন বাঞ্ছারাম সেন। তিনি মুনশি পদে চাকরি করতেন। এই বাঞ্ছারাম সেনের ছিল দুই ছেলে। এক ছেলের নাম শ্রীকণ্ঠ সেন, অন্যজনের নাম উগ্রকণ্ঠ সেন। শ্রীকণ্ঠের ছেলে ছিলেন ঢাকা শহরের নামকরা উকিল গোকুল কৃষ্ণ সেন মুনশি। আইন ব্যবসায় তাঁর ছিল রমরমা অবস্থা। সেই ওকালতির টাকায় ঢাকার জিন্দাবাহারে বাড়ি করেছিলেন তিনি। ভদ্রলোকের ছিল তিন ছেলে। তাদের নাম ছিল— হীরালাল সেন, মতিলাল সেন ও দেবকী লাল সেন। এই হীরালাল সেন তো ছিলেন খুব নামকরা মানুষ। তিনি বাঙালি জাতিতে তো বটেই গোটা ভারতীয় উপমহাদেশেরই চলচ্চিত্র শিল্পের জনক হিসেবে স্বীকৃত। বাঙালি জাতিতে তাঁর আগে আর কেউই চলচ্চিত্র অর্থাত্ সিনেমা বানাননি। হীরালাল সেনের বাবা চন্দ্রমোহন সেন পরে ঢাকা থেকে কলকাতায় গিয়ে বাস করতে শুরু করেন এবং ওই শহরের ৮৫/২ মসজিদবাড়ি স্ট্রিটে ছিল তার বসবাস। এই বাড়িতে থেকেই হীরালাল বাংলা তথা ভারতে চলচ্চিত্র শিল্পের জন্ম দেন। হীরালালের তৃতীয়া কন্যা প্রতিভা সেনের স্বামী নরনাথ সেনের বড়ভাই আদিনাথ সেন ছিলেন পরবর্তীকালের বিখ্যাত অভিনেত্রী সুচিত্রা সেনের শ্বশুর। তো এই হীরালাল সেনের ফুপাতো ভাই ছিলেন দীনেশচন্দ্র সেন। অর্থাত্ দীনেশচন্দ্র সেনের মামাত ভাই ছিলেন হীরালাল। আর তার মামা চন্দ্রমোহন সেন ছিলেন হীরালালের মায়ের ভাই, অর্থাত্ মামা। দীনেশচন্দ্রের মায়ের নাম ছিল রূপলতা। এই রূপলতা ছিলেন গোকুলকৃষ্ণের দ্বিতীয়া কন্যা।

দীনেশচন্দ্র সেনের বাবা-ঠাকুর্দার গ্রাম ছিল সুয়াপুর। তাঁর বাবার নাম ছিল ঈশ্বরচন্দ্র সেন। মানিকগঞ্জ শহরে থেকেই ওকালতি করতেন তিনি। তবে দীনেশচন্দ্রের লেখাপড়ার শুরুটা হয়েছিল সুয়াপুর গ্রামেই। গ্রামের পাঠশালার পড়ালেখা শেষ করে মানিকগঞ্জ মাইনর স্কুলে ভর্তি হলেন ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দে। ১৮৭৯ খ্রিষ্টাব্দে ক্লাস সেভেনে ভর্তি হলেন কুমিল্লা গভর্নমেন্ট স্কুলে। এর ঢাকা শহরে গিয়ে প্রথমে কলেজিয়েট স্কুলে, তারপর ভর্তি হলেন জগন্নাথ স্কুলে। ওই জগন্নাথ স্কুলই এখন হয়েছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। আর এই কলেজিয়েট স্কুল বাংলাদেশের মধ্যে তো বটেই। গোটা উপমহাদেশের মধ্যে এটিই প্রথম সরকারি ইংরেজি বিদ্যালয়। ১৮৩৫ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ জুলাই ঢাকা গভর্নমেন্ট স্কুল নামে এই স্কুলটি প্রথম যাত্রা করেছিল। তো যাই হোক জগন্নাথ স্কুল থেকে ১৮৮২ খ্রিস্টাব্দে এনট্রান্স (এখন যাকে বলা হয় এসএসসি) ও ১৮৮৫ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকা কলেজ থেকে এফএ পাস করেন। তবে মা-বাবার মৃত্যুর কারণে পড়ালেখা মূলতবি করে ১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দে হবিগঞ্জে গিয়ে বিদ্যালয়ের তৃতীয় শিক্ষক হিসেবে যোগ দিলেন। পেটের দায়ে চাকরি নিলেও মনের দায় মেটানোর জন্যে চাকরি অবসরে পড়াশোনা এবং অন্যান্য কাজে মেতে রইলেন। পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে লেখাপড়া করে ১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি ইংরেজিতে অনার্সসহ বিএ পাস করলেন। এবারে তিনি হবিগঞ্জ থেকে আবারও এলেন কুমিল্লায়। প্রথমে শম্ভুনাথ ইন্সটিটিউশনে, পরে ভিক্টোরিয়া স্কুলে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ দিলেন।

ছোটবেলা থেকেই তাঁর ছিল শিল্পীমন। মামা বাড়ি বগজুড়ি এলাকায় গাঁয়ের আনাচে-কানাচে মামাত ভাই 'হীরালালকে নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন আর গাছের ছায়ায় বসে গাঁয়ের ছবি আঁকতেন। বাস্তব আর কল্পনার মিশেল দিয়ে আঁকতেন ফুল-পাখি,প্রজাপতি,গাছপালা,খাল-নদীর ছবি। রাতের আঁধার ঘনিয়ে এলে লণ্ঠনের আলোয় ছায়াবাজির খেলা দেখাতেন। দু'টি ভাই তো নয় যেন দুই বন্ধু। দিনে দিনে এই দুই ভাইই হয়ে উঠলেন বাংলার আকাশে দুটো উজ্জ্বল তারা।

কুমিল্লায় থাকার সময়ই দীনেশচন্দ্রের এক মহাকীর্তির কথা জানতে পারল সবাই। সেটি হলো বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের উপকরণ সংগ্রহ। তিনি গ্রামে গ্রামে ঘুরে লোকচক্ষুর আড়ালে লুকিয়ে থাকা প্রাচীন সব পুঁথি সংগ্রহ করলেন। সেসব ঘাঁটাঘাঁটি করলেন। তন্নতন্ন করে খুঁজে সেসবের ভেতর থেকে সংগ্রহ করলেন বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন ও মধ্যযুগের ইতিহাসের উপাদান। তারপর রচনা করলেন 'বঙ্গভাষা ও সাহিত্য'। গ্রন্থটি প্রকাশিত হলো ১৮৯৬ খ্রিষ্টাব্দে। এই অনন্য সাধারণ কাজ চমকে দিল সবাইকে। এর আগে বাংলা সাহিত্যের এমন ইতিহাস গ্রন্থ আর লেখেনি কেউ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাকে অভিনন্দন জানিয়ে চিঠি দিলেন। পরের বছর কঠিন অসুখে পড়ে কলকাতায় গিয়ে উঠলেন। সেখানে চিকিত্সা চলল অনেকদিন। তারপর সুস্থ হলেন ধীরে ধীরে। এবারে এলো তাঁর সম্মানও। স্বীকৃতির পালা। এগুলোর বেশির ভাগই পেয়েছিলেন গোটা ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়— কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। তেমন কিছু সম্মাননা স্বীকৃতির মধ্যে হলো: ১৯০৫ খ্রি. বি.এ পরীক্ষায় বাংলার পরীক্ষক, ১৯০১ খ্রি. কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের রিডার নিযুক্তি, ১৯১০ খ্রি. সিনেট সদস্য হিসেবে মনোনীত, ১৯১৩ খ্রি. রামতনু লাহিড়ী গবেষণা ফেলোশিপ লাভ, ১৯২০ খ্রি. 'বাংলা ভাষা ও সাহিত্য' নামে খোলা নতুন বিভাগের প্রথম প্রধান, ১৯২১ খ্রি. ডিলিট উপাধি লাভ ও ১৯৩১ খ্রি. জগত্তারিণী স্বর্ণপদক লাভ। তাঁর জীবনের অনেকগুলো অমর কীর্তি আছে, যেগুলোর যে কোনো একটিই একজন মানুষকে অমর করে রাখার জন্য যথেষ্ট। ১৯১১ খ্রিষ্টাব্দে তিনি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস বিষয়ক ইংরেজি গ্রন্থ 'হিস্ট্রি অব বেঙ্গলি ল্যাংগুয়েজ অ্যান্ড লিটারেচার' লেখেন। এটি বের হওয়ার পর তার পাণ্ডিত্যের কথা সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। ইউরোপের জ্ঞানী-গুণীরা বুঝতে পারেন যে, বাংলাদেশে এক মস্তবড় গুণী মানুষ আছেন। তবে এতেই তিনি থেমে রইলেন না। অনেকদিন ধরে গবেষণা করে তিনি লিখলেন বঙ্গসাহিত্য পরিচয়। বইটি বের হলো ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দে। আর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে 'রামতনু লাহিড়ী গবেষণা ফেলোশিপ' পাওয়ার পর তিনি বৃহত্তর ময়মনসিংহ তথা পূর্ববঙ্গের অর্থাত্ আজকের বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে লোকমুখে ছড়িয়ে থাকা লোককাহিনী সংগ্রহে নিয়োজিত হন। এগুলোর ওপর দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে তিনি সম্পাদনা করেন মৈমনসিংহ গীতিকা। ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে বের হয় গ্রন্থটি। পূর্ববঙ্গ গীতিকা। বের হয় ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে। এ দুটিও তাঁর অমরকীর্তি। বাংলার সংস্কৃতির রূপ তিনি আবিষ্কার করে তা তুলে ধরেছিলেন সবার সামনে। মধ্যযুগে বাংলার স্বাধীন সুলতানরা যে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের চর্চার প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন সেই তথ্যও তিনি স্পষ্ট করে তুলে ধরেন। তবে এসব ছাড়াও তাঁর মহামূল্যবান একটি কীর্তি আছে। তার নাম বৃহত্বঙ্গ। এটি একটি অসাধারণ ও বিশাল ইতিহাস গ্রন্থ। হাজার পৃষ্ঠার চেয়েও অনেক বেশি পৃষ্ঠাসংখ্যা নিয়ে দুই খণ্ডে এটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত এই গ্রন্থটির বিষয়বস্তু ছিল সুপ্রাচীনকাল থেকে পলাশীর যুদ্ধ পর্যন্ত বাংলার ইতিহাস। এই দীর্ঘকারের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয়ের চুলচেরা বিশ্লেষণ ও বিশদ বর্ণনাও পাওয়া যায় তার গ্রন্থটিতে। শুধু মূল গ্রন্থটি নয়, এর বিশাল ভূমিকা ও দুর্লভ আলোকচিত্রগুলোও বাঙালি জাতির চিরকালের সম্পদ। একটি মানুষের পক্ষে এক জীবনে এতগুলো মহাকীর্তি স্থাপন বিস্ময়কর এবং প্রায় অবিশ্বাস্য। এই বিস্ময়কর অবিশ্বাস্য কীর্তির স্রষ্টা ও ধারক ছিলেন দীনেশচন্দ্র সেন। বৃহত্বঙ্গ প্রথম প্রকাশের কয়েক বছরের মধ্যেই মৃত্যুবরণ করেন তিনি। ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দের ২০ নভেম্বর তারিখে কলকাতার বেহালায় রূপেশ্বর ভবনে ৭৩ বছর বয়সে মৃত্যু হয়েছিল এই মহান পণ্ডিতের। তিনি বাঙালির চিরকালের গৌরব।

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
গভর্নর ড. আতিউর রহমান বলেছেন, 'গ্রামীণ ব্যাংকের কাঠামোগত পরিবর্তনের দরকার নেই।' আপনিও কি তাই মনে করেন?
7 + 8 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
জুলাই - ২১
ফজর৩:৫৮
যোহর১২:০৫
আসর৪:৪৪
মাগরিব৬:৪৯
এশা৮:১১
সূর্যোদয় - ৫:২৩সূর্যাস্ত - ০৬:৪৪
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :