The Daily Ittefaq
ঢাকা, মঙ্গলবার ৮ জুলাই ২০১৪, ২৪ আষাঢ় ১৪২১, ৯ রমজান ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ ফতুল্লায় শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধসহ আহত ১৫ | খুলনায় চিকিৎসকদের কর্মবিরতি ১৫ জুলাই পর্যন্ত স্থগিত | বুধবার থেকে রাজশাহীতে অনির্দিষ্ট কালের পরিবহণ ধর্মঘটের ডাক | সমুদ্রসীমার রায়: সাড়ে ১৯ হাজার বর্গকিলোমিটার পেল বাংলাদেশ | সবকিছুর ঊর্ধ্বে দেশ: সাকিব

[ রা জ নী তি ]

রাজনৈতিক দলে গণতন্ত্র চর্চা

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম

এদেশে গণতন্ত্রের জন্য কতো না সংগ্রাম হয়েছে! বুকের রক্ত দিয়ে গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করেছে কতো না মানুষ! গণতন্ত্রের জন্য এসব সংগ্রামের ফসল হিসেবে আমাদের হাতে বিজয় এসেছে বার বার। কিন্তু প্রতিবারই তা কেন ও কিভাবে যেন হাতছাড়া হয়ে গেছে। গণতন্ত্র অনেকটাই যেন 'সোনার হরিণ' হয়ে থাকছে। কেন এমনটা হচ্ছে? এ নিয়ে গভীর আলোচনা ও উপলব্ধি প্রয়োজন। এই প্রশ্নের জবাবের বহুবিধ মাত্রিকতা রয়েছে। সে সবের মাঝে একটি হলো—রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্র চর্চার বিষয়।

একটি দেশকে গণতান্ত্রিক পথে পরিচালনার অর্থ হলো তার অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ব্যবস্থাতে গণতন্ত্রের মর্মবাণীর প্রতিফলন নিশ্চিত করা। কিন্তু 'গণতান্ত্রিক' বলে দাবিদার বেশিরভাগ রাষ্ট্রে, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে তো বটেই, রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও গণতন্ত্রের অনেক উপাদান অনুপস্থিত থাকে। অধিকন্তু সে সব দেশে নানা কারণে গণতন্ত্রের মর্মবাণীও দুর্বল অথবা বিকৃতভাবে কার্যকর থাকে। আমাদের দেশে গণতন্ত্রের হাল-হকিকত তেমনই। এই আছে তো এই নেই; থাকলেও নেই তার অন্তঃসার। বলা হয়ে থাকে যে, এর কারণ হলো দেশে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির দুর্বলতা বা অভাব। কথাটি সত্য বটে। তবে সবটা সত্য এই একটিমাত্র কথায় প্রতিফলিত হয় না। গণতন্ত্রের সমস্যা শুধু গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অভাবের কারণেই সৃষ্টি হয় না। এর কারণ আরো গভীরে। তার উত্সস্থল হলো প্রচলিত অর্থনৈতিক-সামাজিক ব্যবস্থার মধ্যে নিহিত।

দেশের রাজনীতিতে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অভাবের জন্য অন্যান্য কারণের সাথে সবচেয়ে বেশি যেটাকে অনেকে দায়ী করে থাকেন তা হলো, রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্রের অভাব। দলের ভেতরে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অস্তিত্ব না থাকার কারণেই দেশের রাজনীতিতে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির প্রচলনে অন্তরায় সৃষ্টি হচ্ছে, তাদের বক্তব্য অনেকটা এরকমই। কিছু সত্যতা থাকলেও, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির সম্পর্কিত সমস্যার মূল কারণ এই সহজ কথাটি দ্বারা পূর্ণভাবে উদ্ঘাটিত হয় না। আগেই একথা বলা হয়েছে যে, গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে মৌলিক সমস্যা আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার স্বরূপের মধ্যে নিহিত। সে বিষয় নিয়ে পৃথকভাবে আলোচনা প্রয়োজন। এখানে শুধু রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্র চর্চার বিষয়ে এবং তারও একটি প্রধান দিক নিয়ে কিছু বিষয়ের অবতারণা করা হয়েছে।

যে কোনো দল বা সংগঠন গঠিত হয় তার সদস্যদের নিয়ে। সেই সদস্যরা দলকে কতোটা নিয়ন্ত্রিত করার ক্ষমতা রাখে, সেটাই দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের মর্মবস্তু। যে কোনো নীতির ক্ষেত্রে তার দুটি উপাদান থাকে। একটি উপাদান হলো সেই নীতিটি যারা প্রণয়ন করে (অর্থাত্ বিষয়গত বা subject), আর অপরটি হলো যার উপর নীতিটি প্রয়োগ করা হয় (অর্থাত্ বিষয়ীগত বা object)। দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্র কতোটা আছে তা পরিমাপ করার চূড়ান্ত মাপকাঠি হলো, সেই দলের সদস্যরা দল পরিচালনায় ও তার কাজকর্মে শুধু object হয়ে না থেকে কতোটা পরিমাণে subject-এর ভূমিকা পালনের সুযোগ পাচ্ছে। দলে গণতন্ত্র নিশ্চিত হওয়াটা নির্ভর করে দলের সব সদস্য দল পরিচালনায় ভূমিকা রাখার সুযোগ পাচ্ছে কিনা এবং পেলেও তা কতোটা পাচ্ছে তার উপরে।

একটি দলের ওপর নিয়ন্ত্রণ মূলত নির্ভর করে দলের নিম্নোক্ত তিনটি উপাদানের ক্ষেত্রে কে বা কারা কর্তৃত্ববান রয়েছে, তার উপর : (ক) দলের নীতি, আদর্শ ও কর্মকৌশল (খ) দলের সংগঠন-কাঠামো (গ) দলের অর্থ-সম্পদ।

দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্র চর্চা নিশ্চিত করতে হলে দলের নীতি, আদর্শ ও কর্মকৌশল নির্ধারণের দায়িত্বের সাথে যুক্ত করতে হবে দলের প্রতিটি সদস্যের ভূমিকা ও অবদান রাখার সুযোগ। তাহলেই দলে গণতন্ত্র চর্চা প্রকৃত অর্থে অর্থপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তাছাড়া একই সাথে সংগঠন কাঠামোতে ব্যক্তি নেতৃত্বের বদলে যৌথ নেতৃত্ব নিশ্চিত করা, নির্বাচনের মাধ্যমে সব স্তরের কমিটি গঠনের ব্যবস্থা করা, সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিধান কার্যকর করা, ব্যক্তি-পূজার প্রবণতা রোধ করা, পরিবারতন্ত্রের ধারা বন্ধ করা ইত্যাদি কাজ সাংগঠনিক কাঠামোকে গণতান্ত্রিক ধারায় পরিচালনার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে দলের অর্থ-সম্পদ পরিচালনার ক্ষেত্রে ফান্ড সম্পর্কে স্বচ্ছতা, আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছ হিসাব রক্ষা, ফান্ড সংগ্রহে সকলের অংশগ্রহণ, খরচে অগ্রাধিকার নির্ধারণে যৌথভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, নিয়মিতভাবে হিসাবপত্র চেক-আপ করার ব্যবস্থা ইত্যাদি কাজ দলীয় তহবিল পরিচালনায় গণতান্ত্রিক চর্চা নিশ্চিত করার জন্য একান্ত অপরিহার্য।

এ প্রসঙ্গে অবশ্য রাজনৈতিক দলের মৌলিক চরিত্রের বিষয়টিকে প্রথমে বিবেচনায় রাখতে হবে। যে কোনো রাজনৈতিক দলের ৩টি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো— (ক) তার শ্রেণি ভিত্তি (খ) তার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য-কর্মসূচি (গ) তার মতাদর্শ। একটি দলের মৌলিক চরিত্র এই তিনটি বৈশিষ্ট্যের স্বরূপ দ্বারাই নির্ধারিত হয়। দলের সাংগঠনিক নীতি তার সেই মৌলিক চরিত্রকে উপেক্ষা বা অতিক্রম করে ভিন্ন কোনো বৈশিষ্ট্য বা তাত্পর্য গ্রহণ করতে পারে না। কোনো দলের নীতি-আদর্শই যদি হয় লুটপাটতন্ত্র, তাহলে সেই নীতি বজায় রেখে নেতৃত্বে একনায়কত্বের বদলে যদি যৌথ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা হয়, কিংবা এমনকি তার সব সদস্যকে নীতি নির্ধারণে ভূমিকা পালনের সুযোগও যদি দেয়া হয়, তাহলেও চূড়ান্ত বিচারে, যা ছিল ব্যক্তিগত কর্তৃত্বে লুটপাট, তা তখন হয়ে উঠবে যৌথ লুটপাট। এক্ষেত্রে কর্তৃত্বের বিকেন্দ্রীকরণ পরিণত হবে লুটপাটের বিকেন্দ্রীকরণে।

অন্যান্য অনেককিছুর মতো, গণতন্ত্রেরও যেমন একটা সারসত্তা (content) থাকে, আবার তার থাকে একটি সুনির্দিষ্ট রূপও (form)। বুর্জোয়া মতাদর্শের তাত্ত্বিকরা গণতন্ত্রের content-কে মোটেই বিবেচনায় নিতে চায় না। তারা তার form-কেই একচ্ছত্র প্রাধান্য দিয়ে থাকে। অন্যদিকে যান্ত্রিক মার্কসবাদীরা মার্কসবাদের বিকৃত ব্যাখ্যা দিয়ে অনেক সময়ই গণতন্ত্রের content-কে প্রধান বিবেচ্য বিষয় হিসাবে গণ্য করতে গিয়ে তার form-কে একটি অপ্রয়োজনীয় ও তাচ্ছিল্যের বিষয় হিসাবে দেখে। ভাবটা যেন এই যে, গণতন্ত্রের উদ্ভাবিত formগুলো (যা সাধারণ মানুষের দীর্ঘ লড়াই-এর মধ্য দিয়ে উদ্ভাবিত ও অর্জিত হয়েছে এবং যা আজ সভ্যতার সাধারণ সঞ্চয় হয়ে উঠেছে) নিছকই বুর্জোয়াদের ব্যাপার, আর তাই সেগুলো ঢালাওভাবে পরিত্যাজ্য। আসলে মার্কসবাদীদের কর্তব্য হলো ইতিহাসে গণসংগ্রামের প্রক্রিয়ায় উদ্ভাবিত গণতন্ত্রের সার্বজনীন formগুলোকে সমাজতান্ত্রিক content সম্পন্ন করে তোলার দিকে নজর দেয়া ও সেজন্য সংগ্রাম করা। যে form সেই নতুন content ধারণে বাধা হয়ে দাঁড়াবে তাকে ভেঙ্গে নতুন form-এ উত্তরণ ঘটানো। মনে রাখা দরকার যে, content এবং form, একটি আরেকটির সাথে দ্বান্দ্বিকভাবে সম্পর্কিত এবং একটি অপরটিকে যেমন প্রভাবিত করে তেমনি একে-অপরের দ্বারা প্রভাবিত হয়। তবে সার্বিক বিবেচনায় content-ই হয় চূড়ান্ত নিয়ামক।

এসব কথা গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে সাধারণভাবে যেমন সত্য, রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্র চর্চার ক্ষেত্রেও তা সমভাবে সত্য। তাই, রাজনৈতিক দলের মৌলিক চরিত্র (অর্থাত্ তার শ্রেণি ভিত্তি, লক্ষ্য ও আদর্শ) নিয়ে মূল্যায়ন ও বিশ্লেষণের প্রয়োজনীয়তার পাশাপাশি রাজনৈতিক দলের কার্যকলাপের নিয়ম-কানুন, বিধি-বিধান ও সেসবের বাস্তব প্রয়োগ—ধারা ইত্যাদি সম্পর্কে আলোচনাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। এই বিবেচনায় বিভিন্ন দলে, সেই দলের সদস্যরা দলীয় নীতি ও কর্মকৌশল নির্ধারণে কতোটা সুযোগ পায়, সেদিকে এবার একটু দৃষ্টি দেয়া যেতে পারে।

দেখা যাবে যে, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি প্রভৃতি বুর্জোয়া ধারার দলগুলোতে দলের প্রাথমিক সদস্যদের দলীয় নীতি নির্ধারণে প্রত্যক্ষ ভূমিকা গ্রহণের কোনো ব্যবস্থা তো নেই-ই, এমনকি সে বিষয়ে ন্যূনতম বিবেচনা ও ধারণাও এসব দলে প্রায় সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। নেতাদের পেছনে জমায়েত হয়ে 'জিন্দাবাদ' দেয়াটাই যেন সাধারণ সদস্যদের একমাত্র দায়িত্ব। নীতি ও কর্মকৌশল নির্ধারণের কাজটি যেন একচ্ছত্রভাবে 'নেতাদের' জন্য সংরক্ষিত বিষয়। দল পরিচালনার কাজে দলের প্রাথমিক সদস্যদেরকে প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত করার প্রসঙ্গটি এসব দলে এখনো অপ্রাসঙ্গিক হয়ে আছে। অথচ এই বিষয়টিই দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্র চর্চার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

জামায়াতে ইসলামী বা এ ধরনের সাম্প্রদায়িক দলগুলো গণতন্ত্র চর্চার ক্ষেত্রে আরো এক কদম পিছিয়ে আছে। এসব সংগঠনে বুর্জোয়া দলে বিরাজমান 'পরিবারতন্ত্রের' চেয়ে আরো পশ্চাত্মুখী 'আমিরতন্ত্রের' ব্যবস্থা চালু রয়েছে। একক ব্যক্তির 'আমিরত্বের' হাতে এসব দলের সাংগঠনিক নেতৃত্বই শুধু কেন্দ্রীভূত নয়, তার হাতে আধ্যাত্মিক নেতৃত্বও ন্যস্ত থাকে। এসব দলের সার্বিক কর্মকাণ্ডের মতো তাদের সাংগঠনিক নীতিতেও মধ্যযুগীয় সাম্প্রদায়িক-মৌলবাদী চিন্তাধারার পূর্ণ প্রতিফলন স্পষ্ট প্রকাশিত।

কমিউনিস্ট পার্টিসহ মার্কসবাদী দলগুলোতে পরিস্থিতি বহুলাংশেই ভিন্ন রকম। এসব দল সম্পর্কে এ রকম একটা ভ্রান্তি ছড়ানো হয় যে, এগুলো 'ক্যাডার ভিত্তিক' ও 'রেজিমেন্টেড' দল। তাই এসব দলে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের কোনো সুযোগ নেই। প্রকৃত সত্য হলো এই যে, কমিউনিস্ট পার্টির মতো দলের সাংগঠনিক নীতি গণতান্ত্রিক-কেন্দ্রিকতার ভিত্তিতে পরিচালিত হয়ে থাকে। এসব দল সুশৃংখলভাবে তাদের কাজ পরিচালনা করে ঠিকই এবং এসব দলের সদস্যপদ পেতে হলে উচ্চ আদর্শনিষ্ঠা, নীতিবোধ ও প্রগতিবাদী বিপ্লবী চেতনা ও কর্মকাণ্ড একটি আবশ্যিক শর্ত। কিন্তু এই শৃংখলাবোধের সাথে হাতে হাত মিলিয়ে দলের অভ্যন্তরে চলে সর্বোচ্চ গণতান্ত্রিক বিধি-বিধানের চর্চা। এটা 'রেজিমেন্টেশনের' সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী। একটি মার্কসবাদী দলে শৃংখলা আসে আত্মসচেতন নিয়মানুবর্তিতা থেকে। সেই নিয়মানুবর্তিতা গণতান্ত্রিক বিধানের ভিত্তিতে বাস্তবে চর্চা করা হয়। কোনোক্রমেই তা 'রেজিমেন্টেশনের' 'হুকুমের দাস'-এর প্রক্রিয়ায় করা হয় না।

একটি মার্কসবাদী দল পরিচালিত হয় গণতান্ত্রিকভাবে রচিত নীতি-নির্ধারণী দলিল অনুসারে। দলের সদস্যদেরকে পার্টির অনুসরণীয় দলিল রচনায়, পার্টির নীতি-কর্মকৌশল নির্ধারণ ও তদারকিতে, ব্যক্তি নেতৃত্বের বদলে গোপন ব্যালটে নির্বাচিত যৌথ নেতৃত্ব গঠনে, নেতৃত্বের কাজকে তৃণমূলের সব সদস্যের প্রত্যক্ষ তদারকির আওতায় রাখার ব্যবস্থায়, সমালোচনা-আত্মসমালোচনার ব্যবস্থায়, সর্বোচ্চ নেতৃত্বের কাছে যেকোন সময় যেকোন প্রস্তাব পাঠানোর সুযোগের ক্ষেত্রে—প্রভৃতি বিষয়ে ভূমিকা পালনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়। এসব বিষয় কমিউনিস্ট পার্টিতে বাধ্যতামূলক চর্চার বিষয়। এসবকে পার্টির সাধারণ সদস্যদের প্রতি দলের নেতা-নেত্রীদের বদান্যতা বলে গণ্য করা হয় না। সদস্যদেরকে এসব অধিকার দেয়ার বিষয়টি তাদেরকে সন্তুষ্ট রাখার জন্য পদক্ষেপ নয়, বরং তাদেরকে এই সুযোগ ও অধিকার দেয়াটা দলের জন্য একটি মূল্যবান সম্পদ ও শক্তির উত্স বলে গণ্য করা হয়। সামষ্টিক প্রজ্ঞা (collective wisdom) সবসময়ই ব্যক্তিগত প্রজ্ঞা (personal wisdom)-এর চেয়ে অধিকতর অভ্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা (probability) বেশি। সকলের মতামত ও পরামর্শ গ্রহণ করে সিদ্ধান্ত নেয়ার ব্যাপারটাকে 'অহেতুক ঝামেলা' বলে মনে করাটা খুবই ভুল, বরং তাকে সঠিক নীতি-কৌশল নির্ধারণের কাজে একটা মূল্যবান সম্পদ বলে বিবেচনা করাটাই সঠিক।

বুর্জোয়া দলগুলো এভাবে ভাবতে ও চলতে অপারগ। তাদের ভাবনাটা ঘুরপাক খায় এক ধরনের সামন্ততান্ত্রিক চিন্তার ধারায়। নেতা-নেত্রী ও সদস্যদের মধ্যে সম্পর্কটি হয়ে থাকে 'রাজা' ও 'প্রজার' মধ্যকার সম্পর্কের মতো। তা থেকেই আসে ব্যক্তি-পূজা, নেতা-নেত্রীর বন্দনা, হিরো ওয়ারশিপ ইত্যাদির ক্ষেত্রে পরস্পরের মধ্যে প্রতিযোগিতার কালচার। মধ্যযুগীয় এই সামন্তবাদী মনোভাবের সাথে তাদের মধ্যে ঘুরপাক খায় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার আধুনিক পদ্ধতির চিন্তা ও ধারা। যেটাকে corporated culture বলে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে। সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়নের বর্তমান যুগে এই প্রবণতা আরো প্রবল হয়ে উঠেছে। বড় বড় কর্পোরেশন যেভাবে প্রধান প্রশাসকের তথা CEO-এর একক হুকুমে, 'হায়ার এণ্ড ফায়ার'-এর কমাণ্ড সিস্টেমে, প্রমোটার নিয়োগ করে, 'লোভ অথবা ভয়'-এর দ্বারা সৃষ্ট প্রণোদনাকে ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানের আপাত চোখ ধাঁধানো সফলতা এনে দেয়, রাজনৈতিক দলকেও তারা সেই 'সফল কর্পোরেশনের' ধারায় চালাতে চায়। বহুজাতিক কর্পোরেট বুর্জোয়াদের পদলেহী লুটেরাদের কাছে দল সম্পর্কে ভাবনায় 'দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্রের' ব্যাপারটি শুধু বেমানানই নয়, তা দলের সফল অগ্রগতির জন্য প্রতিবন্ধক বলেও তারা মনে করে থাকে।

পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী বাজার অর্থনীতির দর্শন-চিন্তা বজায় রেখে এ ধরনের corporated culture-এর চর্চা দ্বারা বুর্জোয়া ধারার দলগুলো কখনোই তাদের দলের অভ্যন্তরে প্রকৃত 'গণতন্ত্র' চালু করতে পারবে না। আর, এর সাথে যদি সমানতালে জড়াজড়ি করে যুক্ত থাকে এখনো পরিত্যাগ করে না আসতে পারা সামন্তবাদী ভাবনা ও কাজের প্রবণতা, তাহলে অবস্থা যে ভয়ঙ্কর রূপ নিবে, সেটাই স্বাভাবিক। বর্তমানে তেমন অবস্থাই সৃষ্টি হয়েছে। এসব দলের ভেতরে ও বাইরে সবাই একথা ভালোভাবে টের পেলেও, তা থেকে উদ্ধার পাওয়ার সক্ষমতা এসব বুর্জোয়া দল হারিয়ে ফেলেছে বলেই মনে হচ্ছে। কমিউনিস্ট ও বাম দলগুলো দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে মূল স্রোত হয়ে উঠতে পারলে, একমাত্র তার প্রভাবে বুর্জোয়া দলে গণতন্ত্রায়নের প্রক্রিয়া এগিয়ে গেলেও যেতে পারে।

লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)

ইমেইল : [email protected]

এই পাতার আরো খবর -
font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
সাকিব আল হাসানকে সব ধরনের ক্রিকেট থেকে ছয় মাসের জন্য নিষিদ্ধ করেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড। এই সিদ্ধান্ত সমর্থন করেন কি?
2 + 7 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
সেপ্টেম্বর - ১৯
ফজর৪:৩০
যোহর১১:৫৩
আসর৪:১৭
মাগরিব৬:০২
এশা৭:১৫
সূর্যোদয় - ৫:৪৬সূর্যাস্ত - ০৫:৫৭
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :