The Daily Ittefaq
ঢাকা, রবিবার ২৭ জুলাই ২০১৪, ১২ শ্রাবণ ১৪২১, ২৮ রমজান ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ দুই মামলায় খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণ ৩ সেপ্টেম্বর | বিএনপির সাথে কোন সংলাপ হবে না : নাসিম | খালেদা জিয়াকে প্রধানমন্ত্রীর ঈদ শুভেচ্ছা | হামাস ২৪ ঘণ্টার যুদ্ধবিরতিতে রাজি | কুমিল্লার চান্দিনায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৩

[রা জ নী তি]

অন্ধকার ও আলোর দোলাচলে প্রিয় স্বদেশ...

শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন

সংযমের মাস। সবাই রোজা, নামাজ, জাকাত ও ধর্ম-কর্ম নিয়ে ব্যস্ত। কিন্তু সংযমের মাসেও রাজনীতিবিদরা থেমে নেই, রাজনৈতিক বাহাস চলছেই। বিরোধী পক্ষ বলছে, ঈদের পরই শুরু হবে সরকার পতনের আন্দোলন। লন্ডন থেকে রূপরেখা তৈরি করছেন নির্বাসিত যুবরাজ! দেশে তাদের কর্মীবাহিনী ওই রূপরেখা বাস্তবায়ন করবেন। তাহলে কি আবার শুরু হবে জ্বালাও পোড়াও? ওই সাংগঠনিক ক্ষমতা কি তাদের আছে? বিরোধী দলের কর্মী, সমর্থক এবং তাদের প্রতি সহমর্মী বুদ্ধিজীবীরাও বিরোধী দলের শক্তি-সামর্থ্য নিয়ে সন্দিহান ও বিরক্ত। (প্রিয় পাঠক, এখানে বিরোধী দল বলতে বিএনপিকে বোঝানো হচ্ছে, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সামঞ্জস্যহীন জ্বালাময়ী বক্তৃতা সত্ত্বেও 'গৃহপালিত' জাতীয় পার্টিকে বিরোধী দল বলা হচ্ছে না।) বিরোধী দলের জনসমর্থন আছে, কিন্তু আন্দোলন করার মত শক্তি-সামর্থ্য নেই। আর শক্তি-সামর্থ্য কি করে থাকবে? সেনাবাহিনীর গর্ভ থেকে জন্ম নেয়া একটি দল। অধিকাংশ সময় হয় দলটি ক্ষমতায় ছিল, নয়তো ছিল ক্ষমতার কুশীলবদের স্নেহধন্য। সুবিধাবাদী রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও সামরিক-বেসামরিক আমলারাই দলটির নেতৃত্ব দিয়েছেন। ফলে দলটির সাংগঠনিক সামর্থ্য যেমন প্রশ্নবিদ্ধ, তেমনি আন্দোলন সংগ্রামে দলের শক্তির ঘাটতিও স্পষ্ট। দিনের পর দিন হরতাল দিয়ে নেতৃবৃন্দ মাঠে থাকেন না। দলের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী সভার তথ্য ফাঁস হয়ে যায় বলে দলীয় প্রধান জ্যেষ্ঠ নেতাদের মুঠোফোন 'সিজ' করে নেন। এমনই এক ফাঁপা, আদর্শিকভাবে দেউলিয়া ও সাংগঠনিকভাবে জরাগ্রস্ত বিরোধী দলকে ভয় পাওয়ার কোন কারণ আছে কি? ফলে সরকারি দলের তরফে বিরোধী দলের হুমকি-ধামকিকে আমলে নেওয়ার খুব একটা কারণ অনেকেই দেখছেন না এবং সরকারি দলও বিরোধী দলকে খুব একটা পাত্তা দিচ্ছে না। কিন্তু তার মানে কি এই যে, সরকারি দল আওয়ামী লীগ খুব ভাল আছে? নিরাপদ ও শংকামুক্ত আছে?

আওয়ামী লীগের মত ঐতিহ্যবাহী ও গণসংশ্লিষ্ট দলও আজ বিএনপি অনুসৃত পথে হাঁটা শুরু করেছে। গ্রামে-গঞ্জে দলের সাংগঠনিক তত্পরতা হতাশাব্যঞ্জক। কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ সাংগঠনিক তত্পরতার চেয়ে চটকদার বক্তব্য দিতে এবং সংবাদ সম্মেলন করে ক্যামেরা বন্দী হতেই বেশি আগ্রহী। কিছুদিন আগে বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরনো এই দলটির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে জনশূন্যতা দেখে অনেকে শংকিত হয়েছেন। সাংগঠনিক তত্পরতার অভাব ছাড়াও আরও কিছু কারণে আওয়ামী লীগের ভেতর থেকে ক্ষয় শুরু হয়েছে। রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও আদর্শিক প্রতিশ্রুতি না থাকা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগের মনোনয়নে অনেক ব্যবসায়ী ও সামরিক-বেসামরিক আমলা এমপি হয়েছেন, তাদের মধ্যে কেউ কেউ হয়েছেন মন্ত্রী। ওই এমপি ও মন্ত্রীদের দল হিসেবে আওয়ামী লীগের কাছে যেমন কোন দায়বদ্ধতা নেই, তেমনি তারা এলাকার জনগণ বা আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের সাথেও যোগাযোগ রাখেন না। বিএনপি যেমন ব্যবসায়ী ও সুবিধাবাদী আমলা ও রাজনীতিবিদদের দলে ভিড়িয়ে দল পরিচালনা করেছিল, আওয়ামী লীগও আজ একই পথ ধরেছে। বঙ্গবন্ধু, শেরে-ই-বাংলা, ভাসানী যেভাবে আদর্শিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে মানুষের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনীতি করতেন, তা আজ ইতিহাসের পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত! রাজনীতি এখন চলে গেছে ব্যবসায়ী, চাঁদাবাজ আর টেন্ডারবাজদের হাতে। রাজনৈতিক দলে নাম লিখিয়ে ওই সাইনবোর্ড ব্যবহার করে এখনকার রাজনীতিবিদরা তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থ উদ্ধার, টেন্ডারবাজি আর চাঁদাবাজিতেই ব্যস্ত থাকেন। দলীয় আদর্শ বাস্তবায়নে যেমন তাদের কোন তত্পরতা দেখা যায় না, তেমনি গণমানুষের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠারও তাদের থাকে না কোন ভূমিকা। রাজনীতির অবস্থা, রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন আস্তে আস্তে গ্রাস করছে পুরো রাষ্ট্র এবং সমাজকে। অথবা ৭০ দশকের দ্বিতীয়ার্ধে ক্ষমতার পালাবদলে রাষ্ট্রীয় ভাবাদর্শের যে 'ইউটার্ন', গ্রামকেন্দ্রিক সমাজ ব্যবস্থার নগরমুখী রূপান্তর এবং পরিণতি স্বরূপ উদ্ভূত 'সোস্যাল ট্রানজিসান', মূল্যবোধের অবক্ষয়, দুর্নীতির ব্যাপক বিস্তার, প্রথাগত সামাজিক মূল্যবোধ, দৃষ্টিভঙ্গি ও জীবন যাপনের ধরনকে পাল্টে দিয়েছে এবং দিচ্ছে। ফলে বেড়ে যাচ্ছে অপরাধ, সামাজিক অস্থিরতা ও দুর্নীতি। মূল্যবোধের অবক্ষয়, পরিবার ও ধর্মের ক্রমঃহরাসমান নিয়ন্ত্রণ, সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতা অনেককেই অস্থির করে তুলেছে, কাউকে নির্মোহ করেছে, কাউকে করেছে মাদকাসক্ত ও দুর্নীতিগ্রস্ত।

মানুষ টাকার জন্য, বাড়ি-গাড়ি, এ্যাপার্টমেন্টের জন্য, পার্থিব ভোগের জন্য কেন এমনভাবে উন্মাদ হয়ে উঠেছে? আমরা কি এজন্য মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম? সংবিধানের মুখবন্ধে যে বৈষম্যহীন সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠার কথা লেখা আছে তা কি শুধুই ফাঁকা বুলি? আওয়ামী লীগ যে অসাম্প্রদায়িক ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বৈষম্যহীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়, বাস্তবে তার প্রতিফলন কোথায়? বিএনপি যে বাংলাদেশে একটি উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নির্মাণ করতে চায়, তার কি প্রমাণ তারা এ পর্যন্ত রেখেছেন?

র্যাবের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ৬ কোটি টাকার জন্য সাত সাত জন মানুষকে শ্বাস রোধ করে হত্যা করলেন, তারপর তাদের লাশ পানিতে ডুবিয়ে দিলেন। র্যাবে নিয়োজিত সামরিক কর্মকর্তাদের কিসের এত লোভ? সেই লোভের জন্য কি এমন নৃশংস হন্তারক হতে হবে? মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য বিভিন্ন দেশের অতিথিদের যে সোনার ক্রেস্ট দেওয়া হল, ওই ক্রেস্টে সোনা দেওয়া হল পরিমাণের চেয়ে কম, আর তদন্ত কমিটি বললেন যে, ওই সোনা চুরির সঙ্গে নাকি মন্ত্রী ও সচিব জড়িত। হায় সেলুকাস কী আজব এ দেশ! শিক্ষিত লোকের দুর্নীতিতে দেশটা হল শেষ।

আগে শুধু পুলিশের দুর্নীতির কথা শুনতাম। পেট মোটা লোক দেখলে 'ঘুষখোর' বলে তার বদনাম রটে যেত। সমাজের লোকজন তাকে এড়িয়ে চলতেন। এখন পুলিশের সঙ্গে দুর্নীতির প্রতিযোগিতায় নেমেছে শিক্ষা বিভাগ। রাজনীতিবিদ, সামরিক-বেসামরিক আমলা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক— দুর্নীতির সুযোগ পেলে কেউ কারো চেয়ে কম যান না। 'টকশো'তে যারা এত বড় বড় কথা বলেন, তাদের অনেকেরই হাঁড়ির খবর সুবিধার নয়। দেশটা এখনও চলছে এ কারণে যে, লাখ লাখ নারী শ্রমিক পোশাক কারখানা ও গ্রামে-গঞ্জে কাজ করেন, কৃষকরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ফসল ফলান, কয়েক লাখ শ্রমিক বিদেশ থেকে হাড় ভাঙ্গা পরিশ্রম করে প্রতি বছর ১৫ বিলিয়ন ডলার করে রেমিট্যান্স পাঠান, কিছু নিষ্ঠাবান উদ্যোক্তা পুঁজি নিয়ে ব্যক্তিখাতে শিল্প কারখানা গড়ে তুলেছেন।

আমি বাংলাদেশের ভবিষ্যত্ নিয়ে মোটেই শংকিত নই। অর্থনীতি, খেলাধুলা, সামাজিক উন্নয়নের নানান ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাপক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ নানা ক্ষেত্রে যেমন ইতিবাচক অর্জন করেছে, তেমনি উন্নয়নশীল রাষ্ট্র হিসেবে এর পদযাত্রা সম্মুখগামী। কিন্তু সরকারে যেই আসছে, তার আচরণ হয়ে যাচ্ছে একনায়কতান্ত্রিক, গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কেউ গড়ে তুলছেন না, মানুষের লোভ বেড়ে যাচ্ছে, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য নিঃস্বার্থভাবে কিছু করার লোকের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। এসব কারণে আমাদের যতটা এগুবার কথা, ততটা আমরা এগুতে পারছি না।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরী বলেছেন, 'ভোটারবিহীন নির্বাচনে ক্ষমতায় এসে সরকার এখন অস্থিরতায় ভুগছে।' আপনিও কি তাই

মনে করেন?
3 + 5 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
সেপ্টেম্বর - ২০
ফজর৪:৩২
যোহর১১:৫৩
আসর৪:১৬
মাগরিব৬:০১
এশা৭:১৩
সূর্যোদয় - ৫:৪৬সূর্যাস্ত - ০৫:৫৬
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :