The Daily Ittefaq
ঢাকা, সোমবার ০৫ আগস্ট ২০১৩, ২১ শ্রাবণ ১৪২০ এবং ২৬ রামাযান ১৪৩৪
সর্বশেষ সংবাদ হাইকোর্টের রায় বহাল; নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না জামায়াত | আপিল করেছেন গোলাম আযম | অষ্টম মজুরি বোর্ডের সুপারিশে মন্ত্রিসভার একমত

উপন্যাস

মৃত্যু ও শান্তি

সেলিনা হোসেন

অনেক রাত পর্যন্ত জেগে থাকলেন আকমল হোসেন।

টেবিলের ওপর ডায়রি খোলা। কখনো লিখছেন, কখনো চুপচাপ বসে থাকছেন। বুঝতে পারছেন নিজের চিন্তাশক্তি বারবার এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। নিজেকে বারবার বোঝালেন যে, যুদ্ধ কোনো সুখের সময় নয়। বিশেষ করে স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ।

স্বাধীনতা যুদ্ধের কঠিন সময়ে দিনরাতের কোনো আলাদা প্রহর হয় না। এর রং দুটি—হয় কালো, না হয় সাদা। হয় আনন্দ, না হয় কষ্ট। হয় জীবন, না হয় মৃত্যু। এমন ভেবে ডায়রির পাতা ভরালেন তিনি। সময়ের স্মৃতিচারণ করলেন। গতকাল মেলাঘর থেকে তিনজন গেরিলা যোদ্ধা ঢাকায় ঢুকেছে। তাদের কথা লিখলেন। ওরা চলেছে, একটি সিটি টেরোরাইজিং অপারেশন করতে হবে। প্রতি মুহূর্তে শত্রুপক্ষকে নিজেদের অবস্থান জানান দেওয়া গেরিলা যুদ্ধের কৌশল।

ওদের দীপ্ত চেহারায় যুদ্ধ ও শান্তির ছবি প্রতিফলিত হচ্ছিল। ওদের স্নিগ্ধতার সঙ্গে বারুদের গন্ধের মাখামাখি ছিল। তিনি আঁকিবুঁকি রেখায় ওদের নাম লিখলেন। ডিজাইন করলেন নামের রেখার সঙ্গে ফুলপাতা এঁকে। মনে হলো, এইটুকুতে তাঁর খানিকটুকু স্বস্তি ফিরে এসেছে। সঙ্গে সঙ্গে নামের সঙ্গে পতাকার ছবি আঁকলেন। ডায়রির বেশ কয়েকটি পৃষ্ঠা এভাবে ভরালেন। মনে করলেন, এটিও যুদ্ধের স্মৃতি।

রাত বাড়ছে।

তিনি ঘড়ি দেখলেন। কিন্তু ঘুমুবার কথা তাঁর মনে এল না। চেয়ারে মাথা হেলিয়ে রাখলেন। আয়শা ঘুমুচ্ছে। ভাবলেন, ও ঘুমোক। এই মুহূর্তে ঘুমই ওর যুদ্ধ।

এই রাতে ঢাকা শহরের গেরিলাদের আশ্রয়-বাড়ি আক্রমণ করেছে পাকিস্তানি সৈন্যরা। আক্রমণের সময় ছিল সন্ধ্যা থেকে সকাল পর্যন্ত। বেশ অনেকজন গেরিলা ধরা পড়েছে। এই খবরে মর্মাহত আকমল হোসেন ও আয়শা খাতুন।

সারাদিন গাড়ি চালিয়ে প্রতিটি আক্রান্ত বাড়িতে গেরিলাদের খবরাখবর নিয়ে বিকেলের দিকে বাড়ি ফিরলেন দুজনে।

মেরিনার খোঁজ করলেন। বাড়িতে নেই ও। কোথায় গিয়েছে তা কাউকে বলে যায়নি। আয়শা খাতুন সোবার ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়েন। আকমল হোসেন নিজের পড়ার টেবিলের ওপর কনুই রেখে মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকেন।

গতকাল রাব্বী, বাকের আর শরীফ অস্ত্রসহ ঢাকায় ঢুকেছিল। অপারেশনের নতুন পরিকল্পনা ছিল ওদের। দুই ট্রাঙ্ক অস্ত্র নিজের বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিল মাহমুদ। সেই ট্রাঙ্ক বাড়ির পেছন দিকে মাটি খুঁড়ে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল।

ওই বাড়ির কারও কাছ থেকে এসব কথা শুনেছিলেন তিনি। তিনি বলেছিলেন, বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করেছিল পাকিস্তানি কয়েকজন সেনা—পেছন দিকের গেটের দরজা ভেঙে। তিনি কাঁদতে কাঁদতে আরও বলেছিলেন, আমাদের যোদ্ধা মানুষটি সৈনিকদের জিজ্ঞাসার সামনে নির্ভীক ছিলেন। নিজে একাই কথা বলেছিলেন। কাউকে কোনো কথা বলতে দেননি। মৃত্যু নিশ্চিত জেনে নিয়েই তিনি বন্দি হয়েছিলেন।

আকমল হোসেন চারদিকে তাকিয়ে বাড়িটি দেখছিলেন। আয়শা ছিলেন তাঁর পাশে। দেখেছিলেন খোঁড়া মাটির স্তূপ। জানতেন ঘরের কোথাও তাঁর প্রিয় হারমোনিয়াম আছে। এই হারমোনিয়ামে তিনি অসাধারণ সুর তুলেছিলেন বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের পরে। এই বছরেও সেই গান গেয়ে শহীদ মিনারে গিয়েছিল শহরের মানুষ।

সুরের মানুষের দাঁত ভেঙে যায় রাইফেলের বাঁটের প্রচণ্ড আঘাতে।

বেয়োনেটের খোঁচায় কপালের চামড়া উঠে যায়। চামড়ার একাংশ ঝুলতে থাকে কানের পাশে।

সেই অবস্থায় সুরের মানুষ মাটি খুঁড়তে থাকেন। মাটি খুঁড়তে থাকেন। টেনে তোলেন লুকিয়ে রাখা অস্ত্র। তুলে দেন শত্রুর হাতে। যাদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার জন্য লড়াই তাদের হাতে। তিনি তখন জানতেন না স্বাধীনতা দোর গোড়ায়। মাত্র সাড়ে তিন মাস বাকি।

একজন বললেন, তিনি সুর আর অস্ত্রের সঙ্গে জীবন বাজি রেখেছিলেন।

আকমল হোসেন শুনতে পেলেন কান্নার শব্দ।

শুনতে পেলেন শিশুর চিত্কার।

তিনি জানতেন তাঁর মেয়েটির নাম শাওন। বয়স চার বছর মাত্র।

তাঁর সঙ্গে আরও কয়েকজনকে যখন বন্দি করে গাড়িতে তোলা হলো, তিনি বুঝলেন অতি যত্নে সংরক্ষিত অস্ত্র আর গেরিলা যুদ্ধে ব্যবহূত হবে না। এই ভাবনায় তাঁর ভেতরে যন্ত্রণা দগ্ধীভূত হলো।

আকমল হোসেন দেখলেন, বাড়ির ছাদে রোদ লুটোচ্ছে। উঠোনের কাঁঠাল গাছে কাকেদের কা-কা শব্দ নিস্তব্ধতার বুক চিরে দিচ্ছে।

বাড়িটির খুব কাছে রাজারবাগ পুলিশ লাইন। পঁচিশের রাতে পুলিশ লাইনে ভয়াবহ তাণ্ডব সংঘটিত হয়েছে। এখন পুলিশ লাইনের ব্যারাকে বন্দি আছে মেয়েরা। নির্যাতনে জর্জরিত মেয়েদের কণ্ঠে প্রতিশোধের শপথ আছে। তিনি দূরের দিকে তাকিয়ে রাবেয়ার কথা ভাবলেন। সুইপার রাবেয়া। সুইপার পরদেশির কথাও ভাবলেন। তাঁর মনে হলো যুদ্ধক্ষেত্রটা পুরোই এখন তাঁর সামনে।

তিনি আয়শা খাতুনকে নিয়ে মগবাজারে এলেন। এই প্রথম তিনি গাড়ি চালাতে ক্লান্তি বোধ করলেন। তাঁর মনে হচ্ছে পথ ফুরোচ্ছে না। সামনে আরও দীর্ঘ পথ। যেতে হবে, যেতেই হতে থাকবে।

মগবাজারের তিরিশ নম্বর দুর্গাবাড়ির সামনে গাড়ি থেকে নামতে নামতে মনে হয়, এই বাড়ি থেকে যদি মারুফ গ্রেফতার হয়ে থাকে তাহলে কোথায় খুঁজবেন ওকে? না, তিনি ওকে খুঁজতে নামেননি। ক্র্যাক প্লাটুনের সব সদস্যের খোঁজখবর নিচ্ছেন, যারা তাঁর বাড়িতে সব সময় যোগাযোগ রেখেছে। কখনো থেকেছে, কখনো থাকেনি। কখনো তাঁর বাড়ি থেকে অস্ত্র নিয়ে অপারেশনে বেরিয়ে গেছে।

হঠাত্ করে আয়শা খাতুন তাঁর দিকে তাকিয়ে বলেন, মারুফ!

আমাদের একটি মাত্র ছেলেই গেরিলা যোদ্ধা নয় আয়শা।

তা নয়।

আয়শা আঁচল দিয়ে কপালের ঘাম মুছলেন। তাঁর মনে হচ্ছে, আজ তিনি একটু বেশি ঘামছেন। বারবার মুছেও ঘাম কমাতে পারছেন না। কেমন করে যাবেন মুক্তিযোদ্ধা রাশেদের মায়ের সামনে? কেমন করে জিজ্ঞেস করবেন, যারা ধরা পড়েছে তাদের নাম কী? জিজ্ঞেস না করেও রাজারবাগ আউটার সার্কুলার রোডের বাড়ি থেকে জানতে পেরেছিলেন সুরের মানুষটির সঙ্গে আর কারা ধরা পড়েছিল। এখন কী করবেন? বুকের ভেতরে প্রবল আতঙ্ক!

গাড়ি লক করে আকমল হোসেন বললেন, এসো। নিস্তব্ধ এলাকা। তিন মাস আগে রেললাইনের কাছাকাছি জায়গায় নামিয়েছিলেন মাহমুদাকে। এখন যাবেন রেললাইন থেকে শিল্প এলাকার দিকে খানিকটুকু এগিয়ে হাতের ডানদিকের একটি গলিতে। একতলা বাড়ি। দেখলেন আশপাশের বাড়ির দরজা-জানালা বন্ধ। এই একতলা বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে দেখলেন সামনের দরজা খোলা। দু-চারজন মানুষ চুপচাপ বসে আছেন। বাড়িতে পরিচিত কেউ আছে কি না বোঝা যাচ্ছে না।

একজন বললেন, আসুন। বসুন। আপনাকে আমি চিনি। ভাগ্নের মুখে আপনার কথা শুনেছি। আপনার ছেলে কোথায়?

আয়শা বুঝলেন তাঁর ছেলে রাতে এই হাউজে ছিল না। আকমল হোসেনও উত্তর পেয়ে গেছেন। তারপর ঘাড় নেড়ে বললেন, মারুফ যে কোথায় তা তো আমি জানি না।

না জানারই কথা। এ কয়দিনে ঢাকায় না থাকলে হয়তো রূপগঞ্জে আছে, নয়তো মেলাঘরে।

হ্যাঁ, সেরকমই হবে।

কাল এ বাড়িতে গোলাগুলি হয়েছে। কাজী গুলি করেছিল পাকিস্তানি সৈন্যকে। তারপর পালিয়ে যেতে পেরেছে। ধরা পড়েছে বাকি ছয়জন। সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন রেকি করতে গিয়ে জুয়েলের আঙুলে গুলি লেগেছিল। ও দিলু রোডের বাড়িতে ছিল।

আকমল হোসেন ভুরু কুঁচকে বলেন, আমি শুনেছিলাম ও অসুস্থ মাকে দেখতে যাওয়ার কথা বলে ওই বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল।

কিন্তু মাকে ওর দেখতে যাওয়া হয়নি। মানে, ও যায়নি। ও এসেছিল এই বাড়িতে। ওদের পরিকল্পনা ছিল অপারেশনের। আজাদের সঙ্গে ও ধরা পড়েছে।

আকমল হোসেন বিবর্ণ মুখে কথাগুলো শোনেন। মনে মনে উচ্চারণ করেন, সেই ছেলেটি—। আয়শা খাতুন ভেজা চোখ নিয়ে অন্যদিকে তাকান। একদিন ও বলেছিল, আমি গাজরের হালুয়া পছন্দ করি। আমি আরও এক বাটি হালুয়া খাব।

আয়শা বিব্রতবোধ করে চুপ করেছিলেন। সেদিন বাটিতে আর হালুয়া ছিল না।

মৃদু হেসে বলেছিল, জয়বাংলা মামণি, যেভাবে বসে আছেন, আমার মায়ের হাতেও খাবার না থাকলে এমন গোমড়া মুখে বসে থাকতেন। দিতে না পারার কষ্ট আমি মায়েদের মুখ দেখে বুঝতে শিখেছি।

আয়শা খুঁজে দেখার দৃষ্টিতে বাড়িটি দেখেন। গলির রাস্তাটির এমাথা-ওমাথায় তাকান। রিকশাগুলো খোঁজেন। ভাবেন, যদি কোনো পরিচিত মুখ দেখতে পাওয়া যায়। যদি কেউ কাছে দাঁড়িয়ে বলে, জয়বাংলা মামণি, ঠান্ডা পানি চাই। ফ্রিজে কি পুডিং আছে? আজ কি মুগের ডাল রান্না হয়েছে? পুঁইশাক চিংড়ি মাছের তরকারি? আমি বিরিয়ানি খাব। কাচ্চি বিরিয়ানি।

আয়শা নিজের ভেতর আচ্ছন্ন হয়ে যান। তাঁর চোখের সামনে থেকে একতলা বাড়িটি উধাও হয়ে যায়। জেগে থাকে অপার প্রান্তর। যেখানে শত শত ছেলেমেয়ে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একদিন একজন একবস্তা গুলি এনে বলছে, এগুলো রাখেন। দরকার মতো নিতে থাকব। তিনি তো রেখেছেন। গ্যারেজের মেঝে খুঁড়ে। সেদিন সব ব্যবস্থা শেষ করতে রাত ফুরিয়ে গিয়েছিল। একবারও মনে হয়নি, আজ না কাল করব। এখন না তখন। ছেলেদের যা হুকুম সেটা তো নিমেষে করতেই হয়।

আকমল হোসেন বলেন, চলো যাই।

আয়শা খাতুন বিড়বিড় করে বলেন, বিদায় যোদ্ধারা। তোমরা ধরা পড়েছ। যদি ছাড়া পাও, আবার দেখা হবে।

আকমল হোসেন আবার বলেন, চলো যাই। যুদ্ধক্ষেত্র দেখার শেষ থাকে না আয়শা। এইসব যুদ্ধক্ষেত্র যতদিন বাঁচব, দেখতে হবে। স্মরণের দীপশিখায় আমাদের জ্ঞানের আলোয়। ইতিহাসের পাতায় গেঁথে রাখতে হবে পরবর্তী মানুষদের জন্য।

গাড়ি আবার ছুটছে।

আমরা কোথায় যাচ্ছি?

এলিফ্যান্ট রোডে।

'কণিকা' বাড়িতে?

হ্যাঁ।

মাত্র কিছুদিন আগে ঘুরে এলাম ওখান থেকে।

যুদ্ধের সময় মুহূর্তে মুহূর্তে অন্যরকম হয়ে যায় সবকিছু। আনন্দ-কষ্ট পাশাপাশি থাকে।

জানি। বুঝতে পারি। আমরা প্রতি মুহূর্তে এর ভেতরে দিন কাটাচ্ছি।

গাড়ি যাচ্ছে। দুজন চুপ। তাঁরা বুঝতে পারেন, আজ তাঁদের কথা বুকের ভেতরে বেশি। যেটুকু বলছেন সেটুকু জোর করে। অনেক বেশি কথা ভেতরে স্তব্ধ হয়ে আছে।

গাড়ি গেটের কাছে থামলে তাঁরা দেখলেন, দু-তিনজন লোক দাঁড়িয়ে আছে। একজন বলল, খালাআম্মা বাড়িতে নাই।

একজন বলল, পাঁচ জনকে ধরে নিয়ে গেছে। রুমীর বাবাকেও।

আয়শা স্খলিত কণ্ঠে বললেন, ইমাম ভাইকেও?

কেউ কোনো উত্তর দিল না। আকমল হোসেনের মনে হলো, তিনি একজন অসহায় মানুষ। যুদ্ধের সময় মানুষ কখনো কখনো এমন পরস্থিতির শিকার হয়। মানুষের আসহায়ত্ব নির্ণয় করা কঠিন।

কেউ একজন বললেন, সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত মোট ছয়টি বাড়ি আক্রমণ করেছে সৈন্যরা। প্রথম আক্রমণ হয়েছে মগবাজারের চারশ পনেরো নম্বর বাড়ি। ধরে নিয়ে গেছে আবদুস সামাদকে।

আমরা তো ওইদিক থেকেই এলাম। জানতাম না বলে ঢোকা হয়নি। এমন সর্বনাশ কী করে হলো? ওরা কেমন করে জানল?

কেউ কোনো কথা বলে না। কোন অন্তরালে কোথায় কী ঘটেছে তা তো কেউ জানে না। দাঁড়িয়ে থাকা লোকেরা কাঁদতে শুরু করে।

আর একজন বলে, ওই বাড়ির পেছন থেকে ধরা পড়েছেন সরকার আবদুল হাফিজ। নির্যাতনে তাঁর একটি চোখ বের হয়ে গিয়েছিল। একটি রগের সঙ্গে তাঁর চোখটি আটকেছিল।

উহ মা! আয়শা খাতুন অস্ফুট শব্দ করেন। তিনি একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। দেখছিলেন অন্য বাড়িগুলো। মেইন রোড থেকে যে গলিতে বাড়িটা, সেটি একটি ব্লাইন্ড গলি। 'কণিকা' বাড়ির পরে আর একটি মাত্র বাড়ি আছে। পায়ে হেঁটে বেরিয়ে যাওয়ারও রাস্তা নেই। সব বাড়িতে অজস্র গাছ। বৃষ্টিস্নাত গাছের পাতা চকচক করছে। ফুল আছে অনেক গাছে। গেরিলা যোদ্ধাদের তত্পরতা এবং গোলাবারুদের আনা-নেয়ার মধ্যে আশ্চর্য স্নিগ্ধ প্রকৃতি। আয়শা খাতুনের মনে হয় সংগীতের মতো এই প্রকৃতি। যা মানুষের চিত্তকে মোহিত করে। শান্তির মগ্নতায় মানুষ স্থির হয়। আজকের প্রকৃতি ধরা-পড়া গেরিলাদের জন্য প্রার্থনা করছে। আয়শা খাতুন এতক্ষণে বুকের ভেতর স্বস্তি অনুভব করেন।

আকমল হোসেন তাঁর দিকে তাকালে তিনি বলেন, ধানমন্ডি আটাশে চলো যাই।

আকমল হোসেন পা বাড়াতেই একজন বলল, ওই বাড়ি থেকে কেউ ধরা পড়েনি। গেরিলারা কেউ ছিল না। আর্মি বাড়িতে ঢুকেছিল। এই ঘটনার দুদিন আগে দুজন যোদ্ধা মেলাঘরে চলে গিয়েছিল। ওরা একজন দারোয়ানকে ধরে। অন্যজন পালিয়ে যায়।

চলো আমরা দিলু রোডে যাই।

হ্যাঁ, চলো।

গলি ছেড়ে বের হয়ে গাড়ি মেইন রোডে ওঠে।

ছুটতে শুরু করে গাড়ি। পৌঁছে যান দিলু রোডে। মেইন রোড থেকে বেশ অনেকখানি ভেতরে ছিল বাড়িটা। আকমল হোসেন যখনই এসেছেন, মাঠে এক চক্কর ঘুরেছেন। বাড়ির পাশের বড় মাঠটি তিনি খুব পছন্দ করেন। আলমকে বলেন, মাঠটি হলো শান্তির জায়গা। আলো-বাতাসের মুক্তি। পতাকা ওড়ানোর মুক্তি।

হা-হা করে হাসত আলম। বলত, তোমার ভাবনাই অন্যরকম। কোথাকার জিনিস কোথায় যে নিতে পার। ভাবতেও পার বাপু।

আলমের হাসি বুকে নিলে যুদ্ধের ছবি অন্যরকম হয়ে যায়। যুদ্ধ আর প্রতিদিন এক হয়ে থাকে।

গাড়ি থেকে নেমে বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকলেন।

একজন বলল, বিশ-পঁচিশ জন সেনা এসেছিল। প্রবল মারমুখী হয়ে। সে রাতে বাড়িতে এসেছিলেন কাজী। আমাদের বাড়িতে আর্মি ঢুকলে কাজী ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ক্যাপ্টেনের ওপর। বেশ ধস্তাধস্তি হয়েছিল। সেপাইরা এলোপাতাড়ি গুলি করে। গুলিবিদ্ধ হয় দুজন যোদ্ধা। আহতদের ফেলে রেখে অন্যদের ধরে নিয়ে যায় সৈন্যরা। রাতের অন্ধকারে পালিয়ে যাওয়া কাজী এই বাড়িতে এসেছিল।

আকমল হোসেন দাঁড়িয়ে রইলেন।

আয়শা ভেতরে ঢুকেছেন। যোদ্ধারা কেউ নেই বাড়িতে। বাড়ির মেয়েরাও সবাই নেই। শুধু একজন আছেন। মাত্র কয়েকদিন আগে তিনি করাচি থেকে এসেছেন। এই বাড়ির বড় মেয়ে তিনি।

তিনি বললেন, বাবা আর্মির উপস্থিতি টের পেয়ে পেছনের দেয়াল টপকে পাশের বাসায় চলে গিয়েছিলেন।

আয়শা জানেন, এ বাড়ির ছেলে একদম প্রথম দিককার গেরিলা যোদ্ধা। নিজের বিছানায় কোল বালিশ চাদর দিয়ে ঢেকে রেখে কাউকে কিছু না বলে চলে গিয়েছিল যুদ্ধে। তবে বাবার কাছে একটা চিঠি লিখে রেখে গিয়েছিল।

আয়শা তার বোনের দিকে তাকালে সে বলে, আমি খুব ভালো উর্দু জানি। ওদেরকে করাচি থেকে এসেছি সে কথা বললাম। বিমানের টিকিট দেখালাম। কিছুটা দমল ওরা। কিন্তু ওদের আক্রমণটা এল অন্যদিক থেকে। মনে হলো ওরা যেন জেনেশুনেই এসেছে যে, বাড়ির কোথায় কী আছে। ততক্ষণে ওদের রান্নাঘর বের করা হয়েছে। দেড়তলা বাড়িটা ওদের নখদর্পণে। ধুমধাম করে রান্নাঘরে গেল। শাবল দিয়ে রান্নাঘরের মেঝে খুঁড়ে অস্ত্র-গোলাবারুদ বের করল। হা-হা করে হাসল। হাসতে হাসতে বলল, বহুত আচ্ছা। বহুত আচ্ছা—

আরও কী কী সব বলেছিল তা আমি মনে করতে পারছি না। আমার মধ্যে তখন একটাই চিন্তা ছিল যে, ওরা রান্নাঘরের খোঁজ পেল কোথা থেকে! আমার আব্বা মেঝে খুঁড়ে অস্ত্র-গোলাবারুদ রাখলেন। তার ওপরে স্ল্যাব দিলেন। স্ল্যাবের ওপরে রাখা হলো কেরোসিনের চুলো। পাশে শুকনো লাকড়ি। বোঝার কোনো উপায় ছিল না। অথচ ওরা ঠিকই শাবল দিয়ে মেঝে খুঁড়ে ফেলল।

যোদ্ধার বোন দুহাতে মুখ ঢাকলে আয়শা তার মাথায় হাত রাখেন। গুনগুনিয়ে বলেন, আমার সকল দুঃখের প্রদীপ—মেয়েটি তাঁর দুহাত জড়িয়ে ধরে। আয়শার সামনে দেড়তলা বাড়িটি যুদ্ধক্ষেত্র হয়ে যায়। যে বাড়িতে অস্ত্র রাখা হয়, যোদ্ধারা থাকে, শত্রুপক্ষ আক্রমণ করতে আসা সে বাড়ি তো একটি যুদ্ধক্ষেত্রই হবে। এমন দুর্গবাড়িগুলো এখন এই শহরের প্রাণ।

ওদের গাড়ি আবার ছুটছে। যাচ্ছে নাসিরাবাদ। এখানকার বাড়িটিও মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্রের ও অস্ত্র রাখার জায়গা। দূর থেকেই দেখলেন বাড়িটি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ছাই ও কয়লার স্তূপের পাশে পড়ে আছে একটি রক্তাক্ত লাশ। চিত্ হয়ে পড়ে থাকা লাশে অজস্র বুলেটের চিহ্ন।

তাঁরা গাড়ি থেকে নামলেন না। গেলেন এলিফ্যান্ট রোডে। একটি সরকারি বাড়ি এটি। বড় ভাই সরকারি চাকুরে। ছোট ভাই মুক্তিযোদ্ধা। এ বড়িতে যুক্তিযোদ্ধাদের অবাধ যাতায়াত ছিল। যখন-তখন যেকোনো প্রয়োজনে চলে আসত ওরা। এমন অনায়াস যাতায়াতের জন্য ভীত ছিলেন গৃহকর্তা। তিনি সরকারি বাড়িতে বসবাস করতেন চাকরিসূত্রে। অন্যদিকে বাড়িতে অস্ত্র-গোলাবারুদ ছিল। আলমারিতে সুটের আড়ালে রাইফেল লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। গ্রেনেড ছিল অনেকগুলো। চুল্লু বুঝতে পেরেছিলেন যে একটা কিছু ঘটবে। প্ল্যান ছিল সকালের আগেই এসব অস্ত্রসহ সরে পড়বে। কিন্তু হয়নি। ভোর হওয়ার আগেই আর্মির গাড়ি এসে বাড়ির সামনে থামে। দরজায় বুটের লাথি পড়লে ঘুম ভেঙে যায় সাদেকের।

বাড়িতে অতিথি আসলে এভাবে দরজায় ধাক্কা দেয় না। এতরাতে কারও আসার কথাও নয়। তাহলে কি মুক্তিযোদ্ধাদের আসা-যাওয়া আর্মির নজরদারিতে পড়েছে? শুনতে পান দরজা খুলতে দেরি হচ্ছে বলে গালাগালি করছে সেপাইরা।

সাদেকের মুখের দিকে তাকিয়ে আকমল হোসেন বলতে চান, এখন মধ্যরাতে সেপাইরা নিয়ন্ত্রণ করছে মানুষের জীবন। লাথি দিয়ে, গুঁতো দিয়ে, বুলেটের আঘাতে, বেয়োনেটের খোঁচায় তারা যা খুশি তা করতে পারে।

সাদেক বিষণ্ন কণ্ঠে বলে, এই বাড়িতে আমি ওকে প্রশয় না দিলে ওকে হয়তো আর্মির হাতে ধরা পড়তে হতো না।

আপনি তা বলতে পারেন না। যিনি যোদ্ধা তিনি বিপদের মাঝ দিয়েই হেঁটে যান। মৃত্যু ভয় নিয়ে কেউ যুদ্ধে যায় না।

ঠিকই বলেছেন। ওর জন্য কষ্ট হচ্ছে বলেই নিজের ওপর এমন দায় টেনেছি।

আকমল হোসেন মাথা ঝাঁকিয়ে বলেন, আমাদের সকলের বুকবোঝাই কষ্ট আছে।

পাশাপাশি স্বপ্নও আছে।

হ্যাঁ, তা আছে।

আবার সবাই চুপ হয়ে যান। এই মুহূর্তে এসব কথার কোনো অর্থ আছে বলে মনে হয় না আয়শা খাতুনের। ইসমাত তাঁকে হাত ধরে ভেতরের ঘরে নিয়ে যায়।

মুখোমুখি চেয়ারে বসলে ভিজে ওঠে দুজনের চোখ।

ভাবি, কী হলো আমাদের?

যাত্রাপথে এমন অঘটন ঘটেই থাকে। আমাদের আরও সতর্ক হতে হবে।

ওরা কি ফিরে আসবে?

আয়শা খাতুন চুপ করে থেকে বলেন, জানি নাতো। ওদের জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।

আমরা কি ওদের খোঁজটুকুও পাব না।

এসব প্রশ্নের উত্তর কে দেবে?

আয়শা খাতুন জানেন, এসব প্রশ্নের উত্তর হয় না। উত্তর দেওয়ার সাধ্য তাঁর নিজের নেই। শুরুর সময়ে ওরা একদিন বলেছিল, আপনার কাছ থেকে সেই গুনগুন ধ্বনি শুনতে চাই—

লাজুক হেসে থেমেছিল চুল্লু।

বল কোনটা?

চল চল চল উর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল—

সেদিন গুনগুন ধ্বনি শোনার পরে ওরা পাঁচজন মার্চ-পাস্টের ভঙ্গিতে ঘরের ভেতর ঘুরেছিল। বলেছিল, আমরা পারব। যিনি এই গানের কবি, তিনি একজন সৈনিক ছিলেন। আমরাও জীবন-জয়ের সৈনিক হব।

আয়শা খাতুন ইসমাতের দিকে তাকিয়ে বলেন, ওরা জীবন-জয়ের সৈনিক। ওদের হাতে লাল-সূর্যের পতাকা। তাদের মাথায় তুলে রাখার সাধ্য আমাদের নাই। ভারী তো, এক কাপ চা আর দুই মুঠো ভাত খাইয়েছি—

আয়শা চোখে আঁচল চাপা দেন। ইসমাত বিষণ্ন হয়ে বসে থাকে। মধ্যরাতে হিংস্র সেনাদের হাতে ধরা-পড়া কতিপয় যোদ্ধার সঙ্গে পরিচয় ওদের বাকি জীবনের সঞ্চয়। এই সঞ্চয় ইতিহাসের। স্বাধীনতার গৌরবের। যদি বেঁচে থাকেন তাঁরা এই সঞ্চয়ের সাক্ষী হবেন। আয়শা ইসমাতকে জড়িয়ে ধরলে দুজনের নিশ্বাস দুজনের শরীরে বয়ে যায়। পরস্পর পরস্পরের স্পর্শ অনুভব করে। এবং দুজনেই বলে, আমরা রাত জেগে ওদের জন্য অপেক্ষা করব। পাকিস্তানি সৈন্যদের শত নির্যাতন আমাদের পিছিয়ে রাখতে পারবে না। বাড়ি আক্রান্ত হলেও আমরা ভীত নই।

আয়শা ঘরের মেঝেতে দাঁড়িয়ে বলেন, আমরা ওদের জন্য জেগে থাকব। আমাদের কেউ মেরে শেষ করতে পারবে না।

ওরা যতই খুঁজে খুঁজে আমাদের দুর্গগুলো ভেঙে চুরমার করুক, আমরা নতুন দুর্গ গড়ব।

আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা আবার শহরকে কাঁপাবে।

কথা বলতে বলতে নেমে যান আয়শা। গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন আকমল হোসেন। দাঁড়িয়ে ছিলেন আরও কেউ কেউ। আয়শা বাড়িটা দেখেন। একতলা বাড়িটার সামনে যোদ্ধারা বাচ্চাদের সঙ্গে খেলত। দুর্গবাড়িটির একটি স্বাভাবিক ইমেজ রাখার জন্য। আয়শা দৃষ্টি ঘুরিয়ে আকমল হোসেনের দিকে তাকান।

চলো।

আপনারাও সাবধানে থাকবেন।

সাবধান! আকমল হোসেন সবার দিকে তাকান।

আমরা একটা ধাক্কা খেলাম না।

আমরা যা করছি তার থেকে তো পিছিয়ে যেতে পারব না।

আপনারা না থাকলে ওরা সাপোর্ট পাবে কোথায়? অপারেশন চালানোর জন্য ওদের আশ্রয় দরকার। খোলা মাঠ থেকে গেরিলা যুদ্ধ পরিচালিত হয় না।

আমরা আপনার কথা বুঝেছি। আপনি ঠিক কথা বলেছেন। আমরা যাই।

গাড়ি ছুটছে।

ছুটছে ঘরবাড়ি। মানুষ। গাছপালা।

ছুটছে চিন্তা এবং পরিকল্পনা।

আয়শা বলেন, আমরা বাড়ি যাচ্ছি।

আমরা তো বাড়িতেই ছিলাম। এতক্ষণ আমরা যা দেখেছি তার খতিয়ান করেছি।

আমরা কি বাড়িতে আছি?

এখনো আছি।

এবং থাকব।

ওরা যদি এই বাড়ি আক্রমণ করতে আসে?

আসবে।

ওরা যদি উঠিয়ে নিয়ে যেতে চায়?

যেতে হলে যাব।

আমি খুশি মনে যাব।

যদি বন্দিশালায় ওদের দেখা পাই, মনে করব ঠিক জায়গায় এসেছি। যদি ওদের সঙ্গে কথা হয়, বুঝব ভুল ঠিকানায় যাইনি। যদি ওদের সঙ্গে মৃত্যু হয়, মনে করব স্বাধীনতা পেয়েছি।

দুজনে মৃদু পায়ে বারান্দায় আসেন। দেখতে পান আলতাফ গেট খুলে দিচ্ছে। মেরিনা রিকশা থেকে নামছে। ও বারান্দায় বাবা-মাকে দেখে বলে, আপনারা কখন ফিরলেন?

বেশ কিছুক্ষণ হলো।

আপনাদের সঙ্গে কথা আছে। আমি আসছি।

কোথায় গিয়েছিলি মা?

আমি আসছি আব্বা।

আকমল হোসেনের মনে হয় ওকে উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছে।

পাশাপাশি জেদি এবং একরোখা ভঙ্গি ওর ভেতরে কাজ করছে। আকমল হোসেন আয়শা খাতুন ড্রইংরুমে এসে বসেন। টেলিভিশন ছাড়েন।

খবরে দেখতে পান, নতুন গভর্নর হিসেবে শপথ নিচ্ছেন ডা. মালিক। তত্কালীন প্রধান বিচারপতি বি.এ সিদ্দিকী তাঁকে শপথ পাঠ করালো। দুদিন আগে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ডা. মালিককে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর নিযুক্ত করেন। লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খান পূর্ব পাকিস্তান থেকে চলে গেছেন গতকাল।

আকমল হোসেন খবরের এতটুকু দেখে নিজের পড়ার টেবিলে আসেন। সকালে খবরের কাগজ পড়া হয়নি। কয়েকটি সংখ্যা টেবিলের ওপর জমা করে রেখেছেন।

পত্রিকার পাতা ওল্টাতেই দেখতে পেলেন নতুন গভর্নর ডা. মালিকের ছবি ছাপা হয়েছে। নতুন সামরিক আইন প্রশাসক হয়েছেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল এ. এ. কে নিয়াজী। তিনি পত্রিকা মুড়ে পাশে রাখলেন। খুললেন দৈনিক পাকিস্তান। একটি খবরের জন্য কয়েকদিন ধরে অপেক্ষা করছিলেন কিন্তু পত্রিকায় তেমন করে আসেনি। আজ সেই খবরের ওপরে চোখ আটকে গেল। লেখা হয়েছে—'মরতে যখন হবেই, তখন দেশের জন্যই মরি। বিশ বছর বয়স্ক পাইলট রশীদ মিনহাজ গত ২০ আগস্ট পাকিস্তান বিমান বাহিনীর একটি বিমানকে জোর করে ভারতে নিয়ে যাওয়ার প্রয়াস ব্যর্থ করতে গিয়ে নিজের জীবন দিয়েছেন।'

তিনি মুখে মুখে শোনা খবরটির আরও বিস্তারিত জানার জন্য যে কাগজগুলো পড়া হয়নি তার পাতা উল্টাতে লাগলেন। দেখলেন কয়েকদিন ধরে কেবল রশীদ মিনহাজের বীরত্বের খবর ফলাও করে প্রচার করা হয়েছে। তাকে সামরিক মর্যাদায় দাফন করার কথা আছে। কিন্তু কে বিমান হাইজ্যাক করলেন তার নাম নেই।

শেষ পর্যন্ত নাম পাওয়া গেল। তিনি ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট এ.কে. এম মতিউর রহমান। তিনি বিমান হাইজ্যাক করে ভারতে পালিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু রশীদ মিনহাজের সাহসিকতার কারণে তিনি সে কাজটি করতে পারেননি। ভারতের সীমানায় পৌঁছানোর কয়েক মাইল আগে বিমানটি বিধ্বস্ত হয়। সরকার রশীদকে দিয়েছে সর্বোচ্চ বীরের খেতাব। আর মতিউরকে বলা হয়েছে বিশ্বাসঘাতক। তিনি পত্রিকা ভাঁজ করে পাশে রাখলেন। খুললেন দৈনিক পূর্বদেশ। পত্রিকায় বড় করে ছাপা হয়েছে 'বিশ্বাসঘাতকের নাম মতিউর রহমান।'

আকমল হোসেন পত্রিকার পৃষ্ঠায় বস্ফািরিত চোখে তাকিয়ে রইলেন। একজন বীর বাঙালিকে একটি বাংলা ভাষার দৈনিক পত্রিকা এভাবে লিখতে পারে? পরমুহূর্তে তিনি নিজের ভাবনার সংশোধন করলেন। বাংলা ভাষার অসংখ্য মানুষইতো যুদ্ধের বিপরীতে অবস্থান নিয়েছে। স্বাধীনতার বিপক্ষের শক্তি হয়েছে। তাহলে শুধু একটি পত্রিকার ক্ষতের মতো শিরোনাম তাঁকে এমন পীড়িত করছে কেন? তিনি নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করেন। সবগুলো পত্রিকা ভাঁজ করে ফাইলে রাখেন ইতিহাস লেখার জন্য। ইতিহাসের উপকরণ রাখতে হবে ভবিষ্যতের জন্য। তিনি জানেন না যে, ইতিহাস তিনি লিখতে পারবেন কি না, কিন্তু উপকরণ সংরক্ষণ করে যেতে তো পারবেন। যুদ্ধের পাশাপাশি এই পারাটাও নৈতিক কাজ। তিনি মতিউরকে সর্বোচ্চ বীরের খেতাব দিয়ে, বীরশ্রেষ্ঠ উপাধিতে ভূষিত করে ডায়রির পাতায় বড় করে লিখে রাখেন।

আয়শা এসে পাশে দাঁড়ালেন।

খাবে চলো।

আকমল হোসেন ডায়রি বন্ধ করলেন। কলমের মুখ আটকালেন।

ডায়রিতে কী লিখেছ?

মতিউরের কথা। লিখেছি, বল বীর চির উন্নত মম শির। তোমার একটি গুনগুন ধ্বনি না হলে আমি আজ রাতে খেতেও পারব না, ঘুমুতেও পারব না।

চলো একসঙ্গে গাইব।

আকমল হোসেন আয়শার ঘাড়ে হাত রাখে। আয়শা টেবিলে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে শুরু করে গুনগুন ধ্বনি— আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে/ এ জীবন পুণ্য করো দহন-দানে/ আমার এই দেহখানি তুলে ধরো,/ তোমার ওই দেবালয়ের প্রদীপ করো/ নিশিদিন আলোক-শিখা জ্বলুক গানে

মেরিনা কান খাড়া করে গুনগুন ধ্বনি শোনে। তারপর ঘর থেকে বের হয়ে বাবা-মায়ের ঘরের দরজায় এসে দাঁড়ায়। ছড়াতে থাকে সুর। আজ ওর মন ভালো নেই। প্রবল দুশ্চিন্তায় ওর প্রতিটি মুহূর্ত আক্রান্ত। তারপরও গানের শক্তিতে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করে।

আয়শার কণ্ঠ একা নয়, আজ যুক্ত হয়েছে আকমল হোসেনের কণ্ঠও—আঁধারের গায়ে গায়ে পরশ তব/ সারা রাত ফোটাক তারা নব নব/ নয়নের দৃষ্টি হতে ঘুচবে কালো,/ যেখানে পড়বে সেথায় দেখবে আলো-/ ব্যথা মোর উঠবে জ্বলে ঊর্ধ্বপানে

মেরিনা মায়ের সুরের ধ্বনি শেষ হওয়ার আগে একটি মোমবাতি জ্বালিয়ে নিয়ে আসে। কোথাও না রেখে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের হাতে ধরে রাখে।

আকমল হোসেন কাছে এসে মোমবাতি ওর হাত থেকে নিজে নিয়ে বলে, আয় মা। তোর কথা শুনব এখন।

দুই

ডাইনিং টেবিলে বসে মেরিনা প্রথমেই বলল, আমাদের পরিবারে যুদ্ধের আর একটি ফ্রন্ট ওপেন হয়েছে আব্বা।

ফ্রন্ট!

শব্দটি দুজনে একসঙ্গে উচ্চারণ করেন।

হ্যাঁ, আমি বলব যুদ্ধের নতুন ফ্রন্ট।

দুজনে আবারও একসঙ্গে বলেন, ফ্রন্ট!

মেরিনা এক গ্রাস ভাত মুখে পুরে বলে, আপনারা ভাত খান। তারপরে শোবার ঘরে গিয়ে বলব। আমার খুব খিদে পেয়েছে। আমি দুপুরের পর থেকে আর কোনোকিছু খাইনি।

আমরাও খাইনি। চা-ও না।

তাহলে তো পেটপুরে খেতে হবে এখন। আর একটি নতুন ফ্রন্টে যুদ্ধ করার জন্য তৈরি হতে হবে না।

মেরিনা, ফিক করে হেসে বাবা-মায়ের দিকে তাকায়। দুজনেই চমকে ওঠেন। ওর বিষণ্ন মুখের হাসি দেখে দুজনেই ভাবলেন যেন মর্গের ভেতরে শায়িত কেউ। দুজনের ভাত খাওয়া মাথায় উঠল।

তারা ভাত নাড়াচাড়া করলেন। মাছের টুকরো বোন প্লেটে উঠিয়ে রাখলেন।

মেরিনা তাদের দিকে তাকিয়ে বলে, এভাবে খেলে আজ রাতে আমার না ঘুমিয়ে কাটাতে হবে। আমার গলা দিয়ে ভাত নামবে না।

আকমল হোসেন প্লেটের ওপর মাথা নামিয়ে গবগবিয়ে কয়েক গ্রাস মুখে পোরেন। আয়শা ভাতে ডাল মাখালেন। ডাল দিয়ে প্লেটের ভাত শেষ করেন।

মেরিনা যখন বাবা-মায়ের মুখোমুখি বসে তখন বেশ রাত হয়েছে। ঘড়ির কাঁটা বারোটার প্রান্ত ছাড়িয়েছে। ও সরাসরি বলে, আজ আমাকে নওশীন ফোন করেছে।

নওশীন?

দুজন ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করেন।

নুসরাতের ভাই। সে রাজাকার বাহিনীতে যোগ দিয়েছে। মনে হলো এখন প্রবল দাপটে আছে।

কিছু বলেছে তোকে?

হ্যাঁ।

ওতো একটা দুষ্টু ছেলে। চান্স পেলেই নিজের বোনকে বলত, আর্মির ক্যাম্পে দিয়ে আসব।

ওর বাড়াবাড়ির কারণে ওরা বাবা-মা অন্যদের নিয়ে গ্রামে চলে গেছে। ও আমাকে দুটো কথা বলেছে। প্রথমে বলেছে মাজিয়ার কথা।

তোমাদের বান্ধবী মাজিয়া?

হ্যাঁ, আম্মা। আমরা একসঙ্গে বাংলাদেশের পতাকা বানিয়ে আকাশে উড়িয়েছিলাম।

কী হয়েছে ওর?

নিউমার্কেটের সামনে ওকে রিকশায় উঠতে দেখে নওশীন গিয়ে ওকে আটকায়। তারপর জোর করে টহলদার আর্মির গাড়িতে তুলে দেয়।

ওহ গড!

আকমল হাসেন দুহাত চুলের মধ্যে ঢোকান। আয়শা খাতুন বোকার মতো তাকিয়ে থাকেন। যেন নিজের মেয়ের চেহারা মনে পড়ছে না। ওকে চেনা যাচ্ছে না।

নওশীন বিকট হাসিতে ভরে দিয়েছিল টেলিফোন। বলেছিল, পতাকা বানানোর মজা বুঝিয়ে দিলাম ওকে। বুঝুক ঠেলা। পাকিস্তানের গায়ে হাত দেওয়া সহজ কথা না।

তুই এতকথা শুনলি মা?

অনেক ধৈর্য ধরে, কষ্ট করে শুনেছি আম্মা। আমার পুরো বিষয়টা বোঝার দরকার ছিল। ও কতদূর এগোতে চায় তা দেখতে চাই।

রাগারাগি করিসনি তো?

প্রথমে করিনি। কৌশল হিসেবে রাগব না বলে ঠিক করেছিলাম। কিন্তু পরে আর ধৈর্য রাখতে পারিনি।

কী বলেছে?

একটা গুন্ডার মতো কণ্ঠস্বর বানিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বলেছে, এইবার তুমি তৈরি হও মেরিনা জাহান। তোমাকেও স্বাধীনতার স্বপ্ন বুঝিয়ে ছাড়ব। টের পাবে কত ধানে কত চাল।

কী বললি? আয়শা ছিটকে ওঠে।

এতবড় কথা বলেছে?

নওশীন নুসরাতের ছোটভাই। ওদের বাড়িতে গেলে, দেখা হলে ও আমাকে আপাই ডাকত। আজকে তুমি করে বলেছে, নাম ধরে বলেছে।

তুই কিছু বলেছিস?

আমিও চিত্কার করে বলেছি, তোকেও আমি দেখে নেব শুয়োরের বাচ্চা। তারপর আমি ফোন রেখে দিয়েছি। ফোনটা পরে আবার বেজেছিল। আমি ধরিনি।

ওর কথা শুনে নিশ্চুপ হয়ে থাকে আয়শা। আকমল হোসেন উঠে পায়চারি করেন।

আমি ভয় পাইনি আম্মা। ও আমার সঙ্গে বদমাইশি করতে এলে আমিও ছাড়ব না।

আয়শা খাতুন কথা না বলে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে থাকেন। মেয়ের দৃষ্টি পড়তে থাকেন। মেরিনা মাকে শান্ত করার জন্য বলে, আমি বিকালবেলা নিউমার্কেটে গিয়েছিলাম। তিনটে ছোটবড় ছুরি কিনে এনেছি। সব সময় আমার সঙ্গে রাখব। প্রয়োজনে সুযোগ বুঝে ব্যবহার করব। হয় পেট ফুটো হবে। নয়তো বুক।

ওরা কথা শুনে আকমল হোসেন ফিরে দাঁড়ালেন।

কী বললি মা?

আমি তো নওশীনকে ছাড়ব না আব্বা। ওর পাকিস্তানের অখণ্ডতার স্বপ্ন আমার হাতে দু-টুকরো হবে।

আমি ভাবছি এ বাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও যাব।

না, সবাই ছাড়ব না। আমি একা থাকব আলতাফকে নিয়ে। তুমি আর মেরিনা যাবে।

তুমি থাকলে আমিও থাকব। আমিও বাড়ি ছাড়তে চাই না। এখনো এই বাড়িতে গোলা-বারুদ অস্ত্র আছে। এখনো এই বাড়িতে যখন-তখন ছেলেরা আসবে। খাবেদাবে, ঘুমাবে, অস্ত্র নিয়ে সরে পড়বে। মারুফ এসে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ফিসফিসিয়ে বলবে, মা আমি এসেছি। তুমি দেখো গেরিলারা কেউ যদি মেলাঘরে যায় তার সঙ্গে মেরিনাকে পাঠিয়ে দাও। ওরা ওকে বিশ্রামগঞ্জ ফিল্ড হাসপাতালে নার্সিংয়ের কাজে লাগিয়ে দেবে।

এটাও খারাপ না আব্বা। আমি যেতে চাই। আহতদের শুশ্রূষার সঙ্গে থাকতে পারলে আমিও শান্তি পাব। আপনাদের এই বাড়ি ছাড়া ঠিক হবে না।

সবাই মিলে এই সিদ্ধান্তই নেয়।

রাতে ঘুমুলেও যুদ্ধের নতুন ফ্রন্ট সকাল থেকে আকমল হোসেনকে ভাবিত করে। মেরিনাকে তাঁর বোনের বাড়িতে দিয়ে আসবেন নাকি ওর নানার বাড়িতে পাঠাবেন। বাবার প্রস্তাব শুনে মেরিনা কোথাও যেতে রাজি হয় না। ওর এক কথা, হয় মেলাঘরে যাব, নয়তো এই বাড়িতে থাকব। আমাকে ধরতে এলে একটাকে মেরে মরব।

আকমল হোসেনের মনে হয় মেয়ের জেদের সঙ্গে তিনি পারবেন না। দুদিন পরে চেনা আস্তানা খোঁজ করেন। কোথাও কেউ নাই। যারা পেরেছে নদী পার হয়ে চলে গেছে। যারা ঢাকায় আছে তারা সবাই আস্তানা বদল করেছে। কেউ কারও খবর বলতে পারছে না। আশরাফ বলে, এতবড় একটা বিপর্যয়ের পরে শহর নীরব হয়েছে ঠিকই, কিন্তু আমার বিশ্বাস এ নীরবতা কয়েকদিনের জন্য মাত্র। আবার ফুটবে বোমা, পুড়বে পেট্রোল পাম্প-পাওয়ার স্টেশন, গুলিবিদ্ধ হবে শত্রুসেনারা কিংবা ওদের দোসররা।

আকমল হোসেনও তা-ই মনে করেন।

খবরের কাগজ খুলে বসলে দেখতে পান, পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা দিবস পালনের তোড়জোড় চলছে।

'শির দেগা, নাহি দেগা আমামা' এই শ্লোগান দিয়ে দিবস উদযাপন করা হবে। প্রতিরক্ষা দিবসকে কেন্দ্র করে শুরু হবে সভা-সমাবেশ। মিছিল। আকমল হোসেন কাগজ ভাঁজ করে রেখে উঠে পড়েন। ফার্মগেটের বাড়ির ভাড়া দিতে হবে। ছেলেদের খোঁজ নিতে যাবেন। ড্রইংরুমে আসতেই ফোন বাজে।

অপর প্রান্তে নওশীন।

হ্যালো, আমাকে মেরিনাকে দেবেন।

তুমি কে বাবা?

আমি নওশীন। মেরিনাকে দিন।

মেরিনাকে কেন চাইছ?

আমি ওকে চাই। আপনি ফোন দেন।

ও বাড়িতে নেই। ও ওর খালার বাসায় আছে।

মিথ্যা কথা বলবেন না। আমি জানি ও বাড়িতে আছে। আজ বের হয়নি। আমাদের লোক আপনার বাড়ির ওপর নজরদারি রাখে।

ওহ, মাই গড।

ঘাবড়াচ্ছেন কেন? আপনি না সাহসী বীরযোদ্ধা। দেশকে স্বাধীন করছেন বলে জানপ্রাণ দিয়ে খাটছেন। আপনার পরিবারকে ধরে...

আকমল হোসেন ফোন রেখে দেন। আয়শা এসে ওটা ক্রেডলে না রেখে পাশে রাখেন। মেরিনাও বাবা-মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। আকমল হোসেন বলেন, তোমাকে অন্য জায়গায় যেতেই হবে মা। বুঝতে পারছি ও মরিয়া হয়ে উঠেছে। আর্মির কাছে নিজের বাহাদুরি দেখাবে।

আয়শা বলেন, যাও মা ছোট একটা ব্যাগ রেডি করে নাও।

মেরিনা কথা না বলে বের হয়ে যায়। থম ধরে দাঁড়িয়ে থাকে জানালার পাশে। এক সঙ্গে এত মুক্তিযোদ্ধা দেখার পরে এমন একজন রাজাকার দেখতে হবে—এটা ও ভাবতেই পারে না। ক্রোধ ওকে উত্তেজিত করে। যে ছুরিটা কিনেছে সেটা ওর বুকে বেঁধানো উচিত। হোক ও বান্ধবীর ভাই তাতে কিছু আসে যায় না।

সেদিন বিকেলে কেঁদেকেটে বাড়ি তোলপাড় করে আলতাফ। ওর সঙ্গে কাঁদে মন্টুর মা। খবরটা প্রথমে মন্টুর মা দেয়।

আলতাফের বাড়ি থেকে টেলিগ্রাম এসেছে।

কী খবর এসেছে? ওর বাবা ভালো আছে তো? বাড়ির অন্যসব খবর ভালো?

অতকিছু জানি না। শুনেছি ওর ভাই মারা গেছে।

ওর তো পাঁচ ভাই। কোন ভাই মারা গেল?

যে ভাইটা রাজাকার হয়েছিল।

মন্টুর মা চোখ মুছতে মুছতে চলে যায়।

আয়শা বলে, বোধ হয় মুক্তিবাহিনীর হাতে মারা গেছে। পাকিস্তান আর্মিতো আর ওকে মারবে না।

হতে পারে। ঠিকই বলেছ। অথবা কোনো অসুখেও মারা যেতে পারে।

জোয়ান ছেলের আবার অসুখ কী!

আয়শা বিরক্তির সঙ্গেই বলে। আকমল হোসেন নিজের মনে হাসেন। ভাবেন, সময়টাই এমন। এখন কোনো লোক অসুখে মরবে না। সবাই মরবে গুলিবিদ্ধ হয়ে কিংবা বিস্ফোরণে। হয় শত্রুপক্ষের হাতে গুলিবিদ্ধ, নয়তো মুক্তিবাহিনীর হাতে গুলিবিদ্ধ হয়ে। মৃত্যুর উত্তর বড় সহজ হয়ে গেছে।

সন্ধ্যায় পুরো খবরটা আলতাফ জানাল।

মুক্তিবাহিনী পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্প আক্রমণ করেছিল। আমার ভাই পাকিস্তানিদের সঙ্গে যুদ্ধে ছিল। মুক্তিসেনার গুলি খেয়েছে। ছয় জন পাকিস্তানি সেনা মরেছে। মুক্তিযোদ্ধা মারা গেছে দুই জন।

তোমার বাবার খবর কী?

বাবা ভালোই আছেন।

আলতাফ একটুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে, একদিন দেশ স্বাধীন হবে। গায়ের লোকে ওর নামে ধিক্কার দেবে। কেউ বলবে না যে, ও শহীদ হয়েছে। দেশের জন্য শহীদ হওয়ার ভাগ্য ওর ছিল না।

এক সময় হাউমাউ করে চিত্কার করে কেঁদে উঠে বলে, এই মরণ ওকে মরতে বলেছে কে? ওহ, আল্লারে এর চেয়ে ও যদি নদীতে ডুবে মরত তাও সান্ত্বনা পেতাম। আল্লায় আমারে এমন কষ্ট দিল ক্যান? ও আল্লারে।

মেরিনা এসে সামনে দাঁড়ায়।

থামেন তো। ও একটা মানুষ, তার জন্য আবার কান্নাকাটি।

আলতাফ চোখ মুছতে মুছতে বলে, ছোটবেলায় একসঙ্গে বড় হয়েছি না। ও আমার পাঁচ বছরের ছোট ছিল। কত কোলে নিয়েছি। এক থালায় ভাত ভাগ করে খেয়েছি। নিজের কথা নিজে ভুলব কেমন করে?

থামেন, বললাম। থামেন। এমন ছোটবেলা সব্বার আছে। এই ছোটবেলা নিয়ে কথা বলার কিছু নাই।

আলতাফ হাঁ করে তাকায়। তারপর উঠে চলে যায়। বুঝতে পারে মেরিনার মেজাজ খারাপ। মেরিনা ওর সঙ্গে এমন করে কথা বলে না।

ওর সঙ্গে মেজাজ করছিস কেন মা?

কারণ আমাকে ছোট একটি ব্যাগ গোছাতে হয়েছে।

আকমল হোসেন আয়শা খাতুন ওকে দ্বিতীয় প্রশ্ন করতে পারেন না।

ও নিজেই আবার গলা উঁচিয়ে বলে, একজন রাজাকারের হুমকি-ধামকিতে আমার ব্যাগ গোছাতে হয়েছে। আমি এই দুর্গবাড়ি ছেড়ে সাধারণ বাড়িতে যেতে চাই না। তাহলে আমি যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে থাকব।

মা কিছুদিন থাক। তারপর আবার আসবে।

না, আমি একদিনও অন্য কোথাও থাকতে চাই না। ঠিক আছে, আমি আপনাদের কথামতো ব্যাগ গুছিয়েছি। তবে ছুরি দুটো ব্যাগে দিইনি।

কোথায় রেখেছ?

এই যে, দেখো।

ও কোমরে গুঁজে রাখা ছুরি দুটো দেখায়। চমকে ওঠে আকমল হোসেন ও আয়শা খাতুন।

এখনই কোমরে গুঁজেছ কেন? বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে গুঁজলেই হতো।

প্র্যাকটিস করছি। হঠাত্ করে গুঁজলে অসুবিধা ফিল করতে পারি। কোমরে গুঁজে হাঁটছি, বসছি এবং শুয়েও দেখেছি। তেমন অসুবিধা দেখছি না। তবে বেকায়দা হলে আমার পেটেও ঢুকে যেতে পারে।

খিলখিল করে হাসে মেরিনা। ওকে হাসতে দেখে আবার চমকে ওঠেন দুজনে। হাসতে হাসতে মেরিনা বারান্দায় যায়। সেখান থেকে সামনে নামে। গাছ থেকে একটি জবা ফুল ছিঁড়ে চুলের ক্লিপে গেঁথে রাখে। দু-এক লাইন গান গাইবার চেষ্টা করে। মন ভালো থাকলে ও গান গায়। আয়শা খাতুনের আফসোস যে, মেয়েটা ঠিকমতো গান শিখল না। শিখলে, ভালো গাইতে পারত। ওর গানের গলা দারুণ।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে দু-একবার গেয়েছিল। দর্শকের প্রশংসা পেয়েছিল। তারপরও ঠিকমতো শেখা হলো না ওর। আজও নিজের বাড়ির প্রাঙ্গণে ঘুরতে ঘুরতে গাইল—হূদয় আমার প্রকাশ হলো অনন্ত আকাশে/ বেদন বাঁশি উঠল বেজে বাতাসে বাতাসে—

কিছুক্ষণ গাইলে আলতাফের কান্না বন্ধ হয়ে যায়। ও ঘরের বাইরে এসে চৌকাঠের ওপর বসে থাকে। একমনে গানটি শোনে।

ঘরে আয়শা খাতুন সোয়েটার বুনছিলেন। হাত থেমে যায়। উল আর কাঁটা এক হয় না। আকমল হোসেন নিজের টেবিলে বসে পত্রিকার পাতা ওল্টান। বিভিন্ন নিউজে চোখ আটকে যায়। তারপরও নিউজের ভেতরে ঢুকতে পারেন না। হেড লাইন পড়ে ছেড়ে দেন।

সবশেষে চোখ পড়ে একটি খবরে—কোম্পানিগঞ্জের বামনিবাজারে আর্মি ও রাজাকাররা মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পে আক্রমণ করে। চৌদ্দজন মুক্তিযোদ্ধা নিহত হয়। আহত হয় বেশ কয়েকজন। কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাকে আটক করে আর্মি ও রাজাকাররা।

তিনি কাগজ রেখে বাইরে আসেন। দেখলেন মেরিনা নেই। ও ঘরে চলে গেছে। ওর ঘরের দরজার সামনে ছোট ব্যাগটি রাখা আছে। তিনি ভাবলেন, কাল সূর্য ওঠার আগেই তিনি মেরিনাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়বেন। ওর নানার বাড়িতে রেখে আসবেন। এখান থেকে কারও সঙ্গে মেলাঘরে চলে যাবে।

রাত দশটার দিকে তিনটি মিলিটারির গাড়ি আসে বাড়ির সামনে। দূর থেকে আর্মির গাড়ি গেটের সামনে থামতে দেখে আলতাফ হামাগুড়ি দিয়ে ঘরে ঢোকে।

বয়ে আতঙ্কে কাঁপতে কাঁপতে বলে, স্যার গাড়ি। গাড়ি।

কার গাড়ি?

আর্মির।

ততক্ষণে গেটে বুটের পদাঘাতে থরথর করে কাঁপে লোহার গেট।

আকমল হোসেন আলতাফের হাত ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে বলেন, যাও, গেট খুলে দাও।

আলতাফ চলে যায়। ওকে পাশ কাটিয়ে বাবা-মায়ের ঘরে ঢোকে মেরিনা।

তাহলে ওরা এসে গেছে? নওশীনও এসেছে কি?

আকমল হোসেন বারান্দার দিকে এগিয়ে যান। ক্যাপ্টেনসহ সেপাইরা ততক্ষণে বারান্দায় এসে উঠেছে। পেছনে নওশীন।

আলতাফ গেটের তালা খোলার সঙ্গে সঙ্গে ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে দুজন। কিল-ঘুঁষি-লাত্থি দিয়ে ফেলে দেয় ওকে। ও পড়ে থাকে গেটের পাশে।

ওরা আকমল হোসেনকে প্রথমে রাইফেলের বাঁট দিয়ে পিঠে আঘাত করে। তারপর জিজ্ঞেস করে, মুকুত কিধার? আর্মস-অ্যামুনিশন কিধার?

আকমল হোসেন চুপ করে থাকেন।

ওরা এক মুহূর্ত অপেক্ষা না করে আবার বলে, বাত কিউ নেই করতা?

আবার রাইফেলের বাঁটের বাড়ি পড়ে।

একজন ক্যাপ্টেন সেপাইদের দিকে তাকিয়ে বলে, গো, সার্চ।

দুপদাপ করে এগিয়ে যায় ওরা।

ততক্ষণে মেরিনাকে রেডি করে ফেলেছেন আয়শা খাতুন। আলমারির ভেতর থেকে একটি হ্যান্ড গ্রেনেড বের করে মেরিনার ব্লাউজের ভেতর ঢুকিয়ে দেন।

ওরা যতজন এসেছে শুধু ছুরি দিয়ে হবে না। বড় অস্ত্র লাগবে।

বুঝেছি। মেরিনা শক্তই থাকে। নওশীনের ফোন পাওয়ার পর থেকে অনেক বোঝাপাড়া হয়েছে নিজের সঙ্গে। এখন ও আর ভীত নয়। শক্তভাবেই মনে করে, ওরা শরীরে হাত দেওয়ার আগেই সুইসাইড স্কোয়াড হওয়া জরুরি। গাড়িতে যতগুলো থাকবে তার সবগুলো মরবে। হাঃ, প্রিয় স্বাধীনতার জন্য নিজেকে তৈরি করো মেয়ে। ও বুকের ওপর সুতির শাড়ি ভাঁজ করে গ্রেনেডটা খানিকটুকু আড়াল করার চেষ্টা করে।

আয়শা খাতুন মেয়ের দিকে তাকিয়ে যুদ্ধ কণ্ঠে বলেন, পারবি না মা?

পারব। আমি পারবই। আমার জন্য ভেবো না।

আমি জানি তুই পারবি।

গ্রেনেডের ওপর হাত রাখেন আয়শা খাতুন। বিদায় মা।

বিদায়?

আয়শা খাতুন চমকে মেয়ের দিকে তাকান।

বিদায়ইতো মা। আর দেখা হবে না।

ঘরে এসে দাঁড়ায় সেপাইরা। পেছনে নওশীন। ঘরে দাঁড়িয়ে থাকা মা-মেয়ে একসঙ্গে বলেন, স্টপ। থাম।

পেছন থেকে নওশীন এগিয়ে এসে বলে, খুব সাহস দেখাচ্ছ। ছ্যাঁচা খেয়ে ঠিক হয়ে যাবে।

তুমি বেশি কথা বলবে না নওশীন।

তবে রে।

নওশীন সিপাইদের ইঙ্গিত করলে ওরা এগিয়ে আসার আগেই আয়শা খাতুন মেয়ের সামনে দাঁড়িয়ে দুহাত ছড়িয়ে দিয়ে বলেন, ভদ্র ব্যবহার কর নওশীন। কী করতে হবে বল।

ওকে যেতে হবে আমাদের সঙ্গে।

ঠিক আছে, যাবে। যাও মা।

সেপাইদের দিকে আঙুল তুলে বলেন, ডোন্ট টাস হার।

মেরিনা দরজার দিকে এগিয়ে যায়।

এতক্ষণ ধরে বাড়িঘর তছনছ করেছে সেপাইরা। জিনিসপত্র চারদিকে ছুঁড়ে মেরেছে। তোশক-বালিশ-সোফার কভার, কুশন ছিন্নভিন্ন করে বাড়িতে তুলো উড়িয়েছে। আসবাবপত্র উল্টে ফেলেছে। সবই দেখে মেরিনা। দাঁত কিড়মিড়িয়ে বলে, যুদ্ধের নতুন ফ্রন্ট। নিজের অজান্তেই নিজের হাত গ্রেনেডের ওপর চলে যায়। মারুফ ওকে যুদ্ধের শুরুতেই গ্রেনেডের পিন খোলা শিখিয়েছে। আজ ওর সেই চরম পরীক্ষা।

ও ড্রইংরুমে আসতেই ক্যাপ্টেন দন্ত বিকশিত করে বলে, আইয়ে। বহুত খুব সুরত।

সেপাইগুলো দাঁড়িয়ে থাকে। পা দাপায় না বা রাইফেল তাক করে না। ক্যাপ্টেন মেরিনার পাশাপাশি হাঁটে। যেন এই মুহূর্তে মেরিনা সম্রাজ্ঞী। ওরা তার আজ্ঞাবহ দাস। এমন এক ভঙ্গি ওদের আচরণে। ঘর পেরিয়ে বারান্দায় এলে মেরিনা দেখতে পায় আকমল হোসেনকে। বারান্দার ওপর উপুড় হয়ে পড়ে আছেন। তাঁর শরীরে রক্ত। মারের চোটে নাক-ঠোঁট ঘাড়সহ বিভিন্ন জায়গা ফেটে রক্ত বের হচ্ছে। ও ছুটে বাবার কাছে যাওয়ার চেষ্টা করতেই ক্যাপ্টেন হাত দিয়ে বলে, নো। ইধার নেহি, উথার।

ক্যাপ্টেন সিঁড়ি দেখিয়ে দেয়।

মেরিনা যেখানে ছিল সেখানে দাঁড়িয়েই আর্ত-চিত্কার করে, আব্বা। আকমল হোসেন সাড়া দেন না।

আপ চলিয়ে।

আব্বা, আব্বা—। বাবার সাড়া নেই। বোধ হয় জ্ঞান হারিয়েছে।

আবার পা বাড়াতে গেলে ক্যাপ্টেন বাধা দেয়।

নেহি। ইধার।

ক্যাপ্টেন মেরিনার হাত ধরে টেনে আনে। ওকে আর কোনো সুযোগ দেয় না। একজন পিঠের ওপর রাইফেলের নল লাগিয়ে রাখে। পেছন ফিরে তাকানোরও সুযোগ নেই। ওর মনে হয় এখন সোজা হেঁটে গাড়িতে ওঠাই উচিত। টানা-হ্যাঁচড়া করলে গ্রেনেডটা পড়ে যেতে পারে। ও মুহূর্তে সতর্ক হয়।

গাড়ি সরে যায় গেটের সামনে থেকে। আড়ালে লুকিয়ে থাকা মন্টুর মা ছুটে এসে গেট আটকায়। নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন আয়শা খাতুন। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বিভিন্ন জিনিসের পাশ কাটিয়ে আকমল হোসেনের কাছে আসেন। মাথা তুলে ধরতেই বুঝতে পারেন জ্ঞান হারিয়েছেন।

চিত্কার করে ডাকেন আলতাফ, মন্টুর মা।

আলতাফ ততক্ষণে নিজে নিজে উঠেছে। মার খেয়ে জ্ঞান হারায়নি ও। ঘাপটি মেরে পড়েছিল। তারপরও যাবার সময় একজন পিঠে লাথি দিয়েছিল।

বলেছিল, শালা গাদ্দার।

আয়শা খাতুনের চিত্কার শুনে আলতাফ বারান্দায় উঠে আসে। আকমল হোসেনকে পড়ে থাকতে দেখে নিজের শরীরের অসহ্য যন্ত্রণার কথা ভুলে যায়। মন্টুর মা গ্লাসে করে পানি নিয়ে আসে।

আয়শা খাতুন পানি দিয়ে মুখ মুছিয়ে দেন। ঠোঁটে পানি দিলে সে পানি গড়িয়ে পড়ে যায়। তিনি বলেন, ঘরে নিয়ে চলো।

তাঁকে ধরে ওঠানোর চেষ্টা করার সময় তিনি নড়ে ওঠেন। চোখ খোলেন। বলেন, পানি খাব।

পানি খেয়ে তিনি চারদিকে তাকান। তারপর উঠে বসার চেষ্টা করেন। সবাই মিলে তাঁকে সাহায্য করে। তিনি উঠে বসেন। বলেন, ওরা আমার ঘাড়ে মেরেছিল। আরও অনেক জায়গায়। আমার কিছু মনে নেই।

চলো, তোমাকে ঘরে নিয়ে যাই।

তোমাকে ওরা মারেনি তো আশা?

আমার মা কোথায়? আমার মেরিনা?

যুদ্ধের নতুন ফ্রন্টে গেছে।

ফ্রন্টে? ও বাড়িতে নেই তাহলে?

তখন প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দ ভেসে আসে।

সবাই চমকে পরস্পরের দিকে তাকায়। রাস্তায় মানুষের হৈ-চৈ শোনা যায়। আকমল হোসেনের মনে হয় তাঁর গায়ে পুরো শক্তি ফিরে এসেছে। তিনি আয়শা খাতুনের দিকে তাকান।

মেয়েটাকে গ্রেনেড দিয়েছিলে?

দিয়েছিলাম।

তাহলে যুদ্ধের নতুন ফ্রন্টে ও জয়ী হয়েছে।

মুহূর্ত সময় মাত্র। তারপর চিত্কার করে কাঁদতে থাকে পুরো পরিবার।

রাতের মধ্যপ্রহর শেষ হয়েছে।

শেষ রাতে আকমল হোসেন বিছানায় উঠে বসেন। দেখতে পান ঘরে আয়শা খাতুন নেই। বিছানা থেকে নামলেন। দেখলেন বাথরুমে নেই। বিছানায় শোয়ানোর সময় আয়শা তাঁকে পেইন কিলার দিয়েছিলেন। শরীরের ব্যথা খানিকটুকু কমেছে। মাথা টলছে। তারপরও পা বাড়ালেন। আয়শা কোথায় দেখতে হবে। মেরিনার ঘরে কি? ঠিকই ধরেছেন। একটি মোমবাতি জ্বালিয়ে বসে আছে আয়শা। পুরো ঘর তছনছ করা। কাপড়-চোপড় বইপত্র মেঝেতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে। তিনি পাশ কাটিয়ে আয়শা খাতুনের পাশে গিয়ে বসলেন।

উঠলে কেন? শরীর ঠিক আছে?

তোমার কাছে এসেছি আশা।

বসো। এসো। আমার হাত ধরো।

আকমল হোসেন স্ত্রীর পাশে বসেন। বুঝতে পারেন বুক ভেঙে যাচ্ছে। বুঝতে পারেন মাথা সোজা করে রাখা কঠিন হচ্ছে। চোখের জল সামলানো দুঃসাধ্য ব্যাপার।

আয়শা মৃদু স্বরে বলেন, শহীদের জন্য আমরা শোক করব না।

ওর জন্য গৌরব বোধ করব।

আকমল হোসেন দুহাতে বুক চাপড়ান।

আয়শা হাত টেনে ধরেন।

এখন মাতমের সময় নয়।

আমি জানি শোককে শক্তি করার সময়। সামনে আমাদের অনেক কাজ।

ওর জন্য আমরা কুলখানি করব। মিলাদ হবে। ফকির খাওয়াব। কোরান খতম হবে।

হ্যাঁ, সবই হবে।

শহীদের স্মরণে তোমার একটি গুনগুন ধ্বনি হবে না আশা?

আমি এতক্ষণ সেই শক্তি পাচ্ছিলাম না। তোমাকে পেয়ে আমার মধ্যে শক্তি ফিরে এসেছে।

আকমল হোসেন দুহাতে আয়শাকে বুকে টানেন। তাঁর মাথার ওপর নিজের থুতনি রেখে বলেন, আয়শা তুমি আমার মধ্যে শক্তি ভরে দাও। আমি যেন শহীদ মেয়েটির স্মৃতি বুকে কিছুকাল বেঁচে থাকি।

আয়শা খাতুন সুর করেন—আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে।/ তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে/ তবু প্রাণ নিত্যধারা, / হাসে সূর্য চন্দ্র তারা, বসন্ত নিকুঞ্জে আসে বিচিত্র রাগে/ তরঙ্গ মিলায়ে যায় তরঙ্গ ওঠে,/ কুসুম ঝরিয়া পড়ে কুসুম ফোটে।/ নাহি ক্ষয়, নাহি শেষ, / নাহি নাহি দৈন্যলেশ— সেই পূর্ণতার পায়ে মন স্থান মাগে/

শেষের লাইনটি আকমল হোসেন নিজেও গুনগুন স্বরে গাইতে থাকেন। আবার প্রথম লাইন গান দুজনে— আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে—

আকমল হোসেন নিজেকে সামলাতে পারেন না। আয়শা খাতুন তাঁকে শান্ত করার জন্য দ্বিতীয় পংক্তিতে যান—তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে কিন্তু দ্বিতীয় পংক্তি গাওয়ার পরে আয়শা খাতুন নিজেও কাঁদতে শুরু করেন।

এই প্রথম তাঁর গুনগুন ধ্বনি কান্নার শব্দে মিশে যায়। দুজনের কণ্ঠ থেকে ধ্বনিত হয়—নাহি ক্ষয়, নাহি শেষ/ নহি নাহি দৈন্যলেশ—।

স্বাধীনতা যুদ্ধে ক্ষয় নেই শেষ নেই। স্বাধীনতার অনন্ত বাণী ছড়াতে থাকে আকাশে। দুজন মানুষ দেয়ালে পিঠ ঠেকায়, মাথা ঠেকায়। রাত শেষ হয়। দিনের প্রথম আলো ছড়ায় চারদিকে।

ঘরের দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে আলোর দিকে তকিয়ে থাকে আলতাফ। পেইন কিলার খাওয়ার পরও শরীরের ব্যথা কমেনি। তারপরও উঠে কোথাও যেতে পারে না। গতরাতে বাড়িটা যুদ্ধক্ষেত্র হয়েছে। নতুন এই যুদ্ধক্ষেত্র তার জন্য চ্যালেঞ্জ।

রান্নাঘরে বসে থাকে মন্টুর মা। পুরো রান্নাঘর তছনছ হয়ে আছে। কেরোসিনের চুলো ভেঙে দিয়েছে। রান্না করতে হলে নতুন চুলো আনতে হবে। কাচের প্লেট-গ্লাস টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে আছে। গতরাতে এই বাড়িতে যুদ্ধ হয়েছে।

একটি মেয়ে শহীদ হয়েছে।

ও মাগো —ও আল্লাহরে—

হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে মন্টুর মা। মাঝে মাঝে সুর করে বিলাপ করে। কপাল আছড়ায়। ওর বিলাপের নানা কথা ছড়াতে থাকে বাড়িতে। আকমল হোসেন আয়শা খাতুন সোজা হয়ে বসেন। বিলাপের নানা কথা তাঁদের কাছে পৌঁছে যায়। দুজন আবার স্তব্ধ হয়ে পড়েন। স্মৃতিভরা এমন অজস্র কথা তো তাঁদেরও আছে। আমৃত্যু তাঁরা এইসব কথা স্মরণ করবেন। এখন যুদ্ধ।

দুজনে উঠে মন্টুর মায়ের কাছে আসেন। আয়শা খাতুন তার পাশে বসে বলেন, থামো মন্টুর মা। আমাদের এখন অনেক কাজ আছে।

বাড়ি তো যুদ্ধের ময়দান হয়েছে।

হবেই। আমাদের চারদিকে যুদ্ধের সময়। যুদ্ধের ময়লা এখন আবার সরাব।

অ, তাই তো। রান্নাঘরের ময়লা আমি একাই সরাতে পারব। এইটা কি আমার যুদ্ধ?

হ্যাঁ, তোমার যুদ্ধ।

ততক্ষণে আলতাফও বাড়ি পরিষ্কারের কাজে লেগেছে। মাঝে মাঝে বসে দম নিচ্ছে। চারদিকে তাকাচ্ছে। মাথা চাপড়াচ্ছে। আকমল হোসেন কাছে এলে আলতাফ বলে, আপনি কোথাও যাবেন স্যার?

কোথায়?

সেই রাস্তার ধারে।

যেখানে জিপটা উল্টে গেছে।

না, শুধু উল্টে যায়নি। পুড়েছে। টুকরো টুকরো হয়েছে।

আলতাফ গভীর আগ্রহ নিয়ে বলে, সেখানে যাবেন স্যার?

হ্যাঁ, যাব। শুধু তুমি আর আমি।

আকমল হোসেন পেছন ফিরে দেখলেন আয়শা রান্নাঘরে। তিনি আলতাফকে ইশারা করলেন। দুজনে গেট খুলে দ্রুত বের হলেন।

মাথার ওপর সূর্য। চারদিকে ঝকমকে রোদ।

তাঁরা ঘটনার জায়গায় পৌঁছাতে পারলেন না। অনেক দূর জুড়ে রাস্তা ঘিরে রেখেছে মিলিটারি পুলিশ।

দুজনে শিরীষ গাছের নিচে দাঁড়ালেন। আকমল হোসেন পরক্ষণে আলতাফের দিকে তাকিয়ে বললেন, চল ফিরে যাই। আমাদের যুদ্ধ তো শেষ হয়নি।

দুজনে দ্রুতপায়ে বড়িতে ফিরে আসে।

গেটের কাছে দাঁড়িয়ে আলতাফ বলে, স্যার আপনি তো বললেন আমাদের যুদ্ধ শেষ হয়নি।

বলেছি। ঠিকইতো বলেছি।

ওরা এই বাড়িতে আবার আসতে পারে। তাহলে আপনি এই বাড়ি থেকে চলে যান।

না। এটা দুর্গবাড়ি। এখানে এখনো অস্ত্র আছে। এখানে মুক্তিযোদ্ধারা আসবে।

ওরা যদি এসে ধরে নিয়ে যায়?

যাবে। আমি বাড়ি ছাড়ব না।

দুজনে গেটের ভেতরে ঢুকলে দেখতে পায় আয়শা খাতুন বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছেন। সিঁড়িতে নামতে নামতে জিজ্ঞেস করেন, কোথায় গিয়েছিলে?

সেই জায়গায়।

বুঝেছি। চলো, ঘরে চলো।

আকমল হোসেনের হাত ধরে আয়শা বলেন, তোমার গায়ে জ্বর দেখছি।

কখন জ্বর এল, টের পাইনিতো।

পেয়েছ ঠিকই। আমায় লুকাচ্ছ। ডাইনিং টেবিলে এসো। তোমাকে একটা নোভালজিন দিচ্ছি।

না, নোভালজিন লাগবে না। আমি ঘরে যাচ্ছি। আমি ঠিক আছি আশা।

আকমল হোসেন দ্রুত পায়ে শোবার ঘরে যান। আয়শা পিছু পিছু যেতে পারেন না। তাঁর মনে হয় মানুষটি নিজেকে সালানোর সময় চাচ্ছে। তাকে ডিসটার্ব না করাই উচিত।

আয়শা খাতুন চুপচাপ বারান্দায় বসে থাকেন। জানেন যেকেনো সময় আর্মির গাড়ি এ বাড়িতে আবার আসবে। আসুক, তিনি নিজেকে বলেন—আছে মৃত্যু, আছে দুঃখ।—

তিন

দুদিন পরে এক সন্ধ্যায় স্কুটার নিয়ে এ বাড়ির গেটে এসে দাঁড়ায় নাজমুল। ওকে দেখে গেট খুলে দেয় আলতাফ। ও উদ্বিগ্ন স্বরে বলে, আঙ্কল কই?

ড্রইংরুমে।

জয় বাংলা মামণি কেমন আছে?

আলতাফ উত্তর দেয় না। নাজমুল দুই লাফে সিঁড়ি পার হয়ে ড্রইংরুমে ঢোকে। আকমল হোসেন ও আয়শা খাতুন টেলিভিশন দেখছিলেন? ওকে দেখে সুইস অফ করেন।

এসো বাবা।

আমি বসব না। স্কুটার দাঁড় করেই রেখেছি। মারুফ ভাই পাঠিয়েছে আমাকে।

মারুফ? মারুফ কোথায়?

ঢাকায় নেই। মেলাঘরে। আমাকে বলেছে মেরিনা আপাকে নিয়ে মেলাঘরে যেতে।

তুমি বসবে?

না, সময় নেই। সবাই অপেক্ষা করছে। মেরিনা আপাই কেবল বাকি। আমরা গেলেই—

দুজনকে মুখ ঢাকতে দেখে চারদিকে তাকায় নাজমুল। ঘরের লন্ডভন্ড অবস্থা দেখে কিছু আঁচ করে। বাইরে এসে আলতাফের ঘাড়ে হাত রেখে ঝাঁকুনি দেয়।

কী হয়েছে? খুব তাড়াতাড়ি বলেন। আমার সময় নেই। দাঁড়িয়ে থাকতে পারব না।

আলতাফ দ্রুতকণ্ঠে সব কথা বলে দেয়। উজ্জ্বল হয়ে ওঠে নাজমুলের চোখ। অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে চারদিকে তাকিয়ে বলে, সাবাস! মেরিনা আপা এতবড় যুদ্ধ করেছে। সাবাস। খবরটা সবাইকে পৌঁছাতে হবে। গেলাম।

স্কুটার ছাড়ার মুহূর্তে দাঁড়িয়ে থাকে আলতাফ। তারপর গেট বন্ধ করে। গেটে পিঠ ঠেকিয়ে দম নেয়। আগামীকাল এ বাড়িতে মিলাদ। ফকির খাওয়ানো হবে।

পরদিন সন্ধ্যায় বাড়িতে আসে মারুফ।

ছেলেকে দেখে দুজনেই চমকে ওঠেন।

মারুফ তুই? আয়শা খাতুন আতঙ্কিত কণ্ঠে বলেন। মারুফ মাকে ব্যাকুল শোকে জড়িয়ে ধরে। তারপর বাবার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে। আকমল হোসেন ছেলের ঘাড়ে মুখ রেখে নিজের চোখের জল সামলান। মারুফ বাবার ঘাড়ে মাথা ঘষে, আবার মায়ের বুকে আশ্রয় নেয়।

এই মুহূর্তে এই বাড়িতে সময় স্তব্ধ হয়ে থাকে। এক একটি মুহূর্ত অনন্তকাল হয়ে যায়।

বাবা-মা দুজনে ছেলেকে নিয়ে মেরিনার ঘরে আসেন। মারুফ বলেছে, এই বাড়িটা এখন একটা বিপজ্জনক জায়গা জেনেও আমি এসেছি আব্বা-আম্মা। ওর ঘরে একটি মোমবাতি জ্বালাতে এসেছি।

তুই মেলাঘরে যাবি না?

কালকে যাব। খবরটা শোনার পরে অনেকে আমাকে এই বাড়িতে আসতে না করেছে। আমি অনেকক্ষণ এই বাড়িকে নজরে রেখে তারপরে ঢুকেছি। সতর্কতার সঙ্গে এসেছি আব্বা।

মেরিনার ঘরে আলো জ্বলছিল। সারারাত এই ঘরে আলো জ্বালিয়ে রাখে আয়শা খাতুন। রান্নাঘর থেকে একটি মোম জ্বালিয়ে নিয়ে আসেন তিনি। মারুফের হাতে দেন। মারুফ খাটের ওপর মেরিনার মাথার কাছে কতগুলো বই রেখে তার ওপর মোম রাখে। নিচে বসে কাঠের ওপর মাথা ঠেকিয়ে রাখে ও।

আয়শা খাতুন নিস্তব্ধ দাঁড়িয়ে থাকেন। ঘরের ভেতরে গুনগুন ধ্বনি ছড়ায়—আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু বিরহদহন লাগে। তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে—।

আকমল হোসেন নিচু হয়ে ছেলেকে টেনে তোলেন। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে ও। আয়শা খাতুন আঁচল দিয়ে নিজের চোখ মোছেন, ছেলের চোখ মোছেন। পুরো পরিবার একটি মোমের শিখার দিকে তাকিয়ে থাকে। ভাবেন, তাঁদের মেয়েটি মরে যায়নি। ও এখন একটি প্রজ্বলিত শিখা

সময় ফুরোয়।

মারুফ বাবা-মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে, আমি এখন যাই।

আয়শা খাতুন ওর হাত ধরে বলেন, আমাদের সঙ্গে খেয়ে যা। তোকে বেশিক্ষণ আটকাব না।

ডাইনিং টেবিলে আবার নিস্তব্ধতা।

ঠিকমতো খেতে পারে না কেউ। খাবার মুখে ওঠানো কত যে কঠিন কাজ, এ কাকে বলে বোঝাবে কে। তবুও মারুফ প্লেটের ভাত শেষ করে। ডাল ঢেড়স ভাজি আর ডিমের তরকারি দিয়ে। মায়ের রান্নার আগের টেস্টও নেই। ডাইনিং টেবিলের আয়োজনও নেই।

মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে, আমার পেট ভরে গেছে আম্মা। আপনাদের খাওয়া শেষ হলে আমি হাত ধোব।

আমাদের খাওয়া!

শেষ করবেন না?

করব তো। অনেক সময় লাগবে।

আমার তো বেশি রাত করা উচিত না। পথেঘাটে কত বিপদ।

ও, তাইতো।

দুজনে দ্রুত খেয়ে শেষ করেন। ডাল আর ভাজি ঠিকমতো খাওয়া হয় না। ডিমের তরকারি তো প্লেটেই ওঠে না।

মন্টুর মা টেবিলের কাছে এসে বলে, এরকম করে খেলে তাঁদের শরীর কি ঠিক থাকবে।

আব্বা-আম্মাকে আপনারা দেখবেন বুয়া।

আমরা তো চেষ্টা করি। সব সময় পেরে উঠি না।

দুজনে উঠে বেসিনে গিয়ে হাত ধোন। মারুফও উঠে এসে বাবা-মায়ের কাছে দাঁড়ায়।

তুই এখন কোথায় যাবি বাবা?

ফার্মগেটের দুর্গবাড়িতে। সকালে উঠে চলে যাব।

কয়দিন থাকবি মেলাঘরে?

বেশিদিন না। কমান্ডার আমাদের ডেকে পাঠিয়েছেন। নতুন তেজে গেরিলাদের আবার ঢুকতে হবে ঢাকায়। গোলাবারুদ অস্ত্র নিয়ে। ঢাকা শহরে গেরিলা তত্পরতা যে কমেছে, এই অবস্থা বেশিদিন থাকবে না।

মারুফ তোয়ালেতে হাতমুখ মুছে বলে, যাই আম্মা।

যাই আব্বা।

কবে আসবি?

সাত দিনের মধ্যে ঢাকায় ঢুকব।

বাড়িতে আসবি তো?

এবার আমার হাইড হবে ফার্মগেটের বাড়িতে। ওখানে থেকেই অপারেশনে যাব। দোয়া করবেন আমার জন্য।

মারুফ দুজনকে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে।

আলতাফকে বলে, সাবধানে থাকবেন। আসি।

বেরিয়ে যাওয়ার সময় পেছন দিকে তাকায় না। দ্রুত রিকশায় ওঠে।

সাত দিনের মাথায় বৃষ্টি মাথায় করে দুজন যোদ্ধা আসে আকমল হোসেনের বাড়িতে। আয়শা খাতুন ওদের তোয়ালে দেন ভেজা শরীর মোছার জন্য। ওরা শিহাব আর কামরুল। বয়স কম। মাত্র স্কুলের গণ্ডি পার হয়েছে। উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে, আমরা আবার ঢাকা শহরে ঢুকেছি। আগামীকাল থেকে এই শহর চাঙ্গা করে তুলব।

আকমল হোসেন মৃদু হেসে বলেন, আমরা আবার জয়ী হব বাবারা।

আয়শা ওদের দুহাত নিজের কপালে ঠেকিয়ে বলেন, তোমরা আমার প্রাণ।

ছেলেরা তাঁর দিকে তাকিয়ে বলে, আমরা এই বাড়িটা গুছিয়ে দেব?

না। এভাবেই থাকুক কিছুদিন।

কতদিন এভাবে থাকবে?

আমি জানি না।

স্বাধীনতা লাভ পর্যন্ত কি?

হতে পারে। তোমাদের জন্য চা নিয়ে আসি।

আয়শা খাতুন উঠে যান। যোদ্ধাদের দিকে তাকিয়ে আকমল হোসেন বলেন, তোমরা ঢাকায় কতদিন থাকবে?

আপাতত যাচ্ছি না। পরশুদিন আমাদের অপারেশন আছে। সিরিজ অপারেশনের চিন্তা আছে।

কোন পথে ঢুকেছ তোমরা?

আমরা গোপীবাগের পেছন দিয়ে ঢাকায় ঢুকেছি। ওখানে একটা গ্রামে ক্যাম্প করা হয়েছে। আস্তে আস্তে গোলাবারুদ-অস্ত্র ঢাকায় আনা হবে। সাভারের দিক থেকেও গেরিলারা ঢাকায় ঢুকছে। দলে দলে গেরিলারা ঢাকায় ঢুকবে। সিদ্ধান্ত হয়েছে পাকিস্তান আর্মিকে ব্যতিব্যস্ত করে রাখা হবে। যেন ওরা দম ফেলার সময় না পায়। আকমল হোসেনের মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। বিষণ্নতার মাঝে এ এক অলৌকিক আনন্দ। ছেলেরা তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে স্বস্তি পায়। আয়শা খাতুন ওদের জন্য পুডিং আর চা নিয়ে আসেন। ছোট প্লেটে খিচুড়ি আর ইলিশ মাছ ভাজা দেন।

চটপট খেয়ে নাও।

এত খাবার?

তোমাদের জন্য মোটেই বেশি না। খিচুড়িটা আগে খাও। তারপর পুডিং। পরে চা।

ছেলেরা বেসিন থেকে হাত ধুয়ে আসে। দ্রুত খেয়ে শেষ করে। যাবার সময় বলে, প্রতিদিন কোথাও না কোথাও কিছু ঘটবে। বিস্ফোরণের শব্দ শুনলে ভাববেন, আমরা আপনাদের কাছে আছি। আমরা যাচ্ছি, জয় বাংলা মামণি।

দুজনে চুপ করে বসে থাকেন। তাঁরা বুঝতে পারেন, তাঁদের জীবন থেকে সময় কমে যাচ্ছে। আয়শা খাতুনের মনে হয়, কতদিন ধরে তিনি যেন সোয়েটার বুনছেন না। উল-কাঁটা হাত দিয়ে ধরলে পুড়ে যায় হাত—প্রবল যন্ত্রণা তাঁকে উথাল-পাতাল করে। আগুনবিহীন পুড়ে যাওয়ার স্মৃতি তাঁর শরীর অবশ করে দেয়। তিনি সোফার ওপর পা উঠিয়ে বসেন। পেছনে মাথা হেলিয়ে দেন। দৃষ্টি ছড়িয়ে থাকে উল্টেপাল্টে থাকা ঘরের ভেতর। কিন্তু তিনি কিছুই দেখতে পাচ্ছেন না। এই বোধ তাঁকে ভীষণ ক্লান্ত করে। ভাবেন, শরীরের সবটুকু শক্তি নিঃশেষ । এমন কাউকে যদি পেতেন যে, তাঁর পুরো সময়টুকু গানে গানে ভরিয়ে রাখত!

আকমল হোসেন সোফা ছেড়ে উঠতে চান। পারেন না। শরীর ভারী লাগছে। পিঠের ব্যথা চড়চড়িয়ে উঠছে। পা ফেলতেও কষ্ট। মনে হয় কতকাল ধরে যেন নিজের টেবিলে বসা হচ্ছে না। ডায়রির পৃষ্ঠা খোলা হচ্ছে না। পাত্রিকার খবর পড়া হচ্ছে না। ইতিহাসের উপাদান সংগ্রহে ভাটা পড়েছে। স্মৃতির পৃষ্ঠা ভরে থাকছে শুধু। তাঁর পাশে যদি কেউ থাকত, যদি লিখে রাখত প্রতিদিনের ঘটনা—বলত, দেখুন কত কিছু লিখে রেখেছি আপনার জন্য। ভয় নেই, ইতিহাসের একটি তথ্যও হারাবে না। এই শহরের সবটুকু আপনার জন্য রক্ষিত আছে। আকমল হোসেন সোফায় মাথা হেলালেন। দেখলেন, তছনছ ঘরে দুজন মানুষ মুমূর্ষু অবস্থায় বসে আছেন। কারণ এই বাড়ির একটি মেয়ে শহীদ হয়েছে। বাড়িটিকে যুদ্ধক্ষেত্র ভেবে তাঁরা এই বসবাসকে নিজেদের ভেতরের সবটুকুর সঙ্গে আটকে রেখেছেন। তাঁরা স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসের বাইরের মানুষ নন। সোফায় মাথা হেলালে দু-চোখ বেয়ে অঝোর ধারায় পানি পড়তে থাকে। আর কতদিন পারবেন নিজেকে সামলাতে! সময় নিয়ে কিছু একটা ভাবতে চাইলেন। পরে মনে হলো, না ভাবাটি ভালো।

দুদিন পরই মর্নিং নিউজ পত্রিকা অফিসের সামনে গ্রেনেড ছোঁড়া হলো। ফোন পেলেন নাহিদের কাছ থেকে।

আমরা এভাবে শহর জুড়ে থাকব।

কেটে যায় লাইন। তিনি বসে পড়েন। বুকের ভেতর ধস। ব্যথায় কষ্ট লাগছে।

দুইদিন পরে আবার খবর পেলেন খান এ সবুর খানের ধানমণ্ডির বাড়িতে বোমা বিস্ফোরণ ঘটেছে।

আবার খবর পেলেন প্রাদেশিক নির্বাচন কমিশন অফিসে বোমা বিস্ফোরণ করা হয়েছে। একজন মারা গেছেন, দুইজন আহত হয়েছেন, ঘর বিধ্বস্ত হয়েছে, বোমার আগুনে কাগজপত্র পুড়েছে। ঘরের চাদ ধসে পড়েছে।

খবর জানতে পারেন তুহিনের কাছ থেকে। ওর হাসিতে ঝড় ওঠে। হাসতে হাসতে বলে, আমরা 'গেরিলা' পত্রিকা সাইক্লোস্টাইল করে ছেপেছি। দু-একদিনের মধ্যে বিলি করতে হবে। আমি আর সমশের পত্রিকার কপি নিয়ে আসব।

ফোন রেখে দেয় ওরা। মেরিনা 'গেরিলা' পত্রিকা বিতরণ করত। বাড়ি বাড়ি দিয়ে আসত। এখন এই বাড়িতে তাঁকে কপি দেবে ওরা। কে বিতরণ করবে? চোখ ভিজে যায় আকমল হোসেনের। এত চোখ ভিজে গেলে তো অন্ধ হয়ে যাবেন, এই যুদ্ধের সময় কি কারও নিজে নিজে অন্ধ হয়ে যাওয়া সাজে? একদম না। নিজেকে ধমক দিয়ে নিজেকেই উত্তর দেন তিনি। আয়শা কাছে এসে বলেন, চা খাবে?

হ্যাঁ। কড়া করে চা দিতে বলো।

ডাইনিং টেবিলে এসো। নাকি বারান্দায়?

বারান্দায়। আকমল হোসেন জোরের সঙ্গে বলেন।

আয়শা খাতুন ভুরু কুঁচকে বলেন, বারান্দার ছোট টেবিলটা ওরা ভেঙে ফেলেছে।

ড্রইংরুমের একটা টিপয় নিয়ে আসছি। তুমি যাও।

আয়শা খাতুন যেতে যেতে স্বস্তি পান। অনেকদিন পরে ভালোবাসার মানুষটির স্বাভাবিক কণ্ঠস্বর টের পেলেন আজ। যেন নিজের জায়গায় ফিরে এসেছেন, যেখানে দাঁড়িয়ে নিজেকে যুদ্ধ সময়ের মানুষ ভাবতেন। বলতেন, আমার বয়স হয়নি। তারুণ্যের শক্তি ভরপুর আছে। প্রতিদিনের যুদ্ধক্ষেত্রে হেঁটে যেতে পারি।

চা খেতে খেতে আয়শাকে বললেন, দু-একদিনের মধ্যে ছেলেরা 'গেরিলা' পত্রিকা বিলি করার জন্য নিয়ে আসবে। ফোনে তা-ই বলল।

আসুক।

কে বিলি করবে?

কেন আমি।

আয়শা খাতুন চায়ের কাপে চুমুক দেন। আকমল হোসেনের দিকে তাকান না। আয়শা খাতুনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে বলে মনে করলেন আকমল হোসেন। তিনি নিজেও শেষ করে কাপটা ঠেলে দিলেন। দেখলেন, আয়শা খাতুন চামচ দিয়ে পিরিচে টুংটুং শব্দ করছে। এক পর্যায়ে বলেন, বল কী বলবি?

আমার গানটি আপনার কাছ থেকে শুনব আম্মা।

তোর প্রিয় গানটি?

তুমি কি কিছু ভাবছ আশা?

ভাবছি।

কী ভাবছ, বলবে?

মেরিনার প্রিয় গানের কথা। ও আমাকে এই গানটি গাইতে বলছে।

আকমল হোসেন গান শোনার অপেক্ষা করেন। একটু আগেই তিনি বুঝে গেছেন যে, আয়শার নিজের ভেতরে ফিরে আসার প্রস্তুতি শেষ। এখন তিনি মেরিনার সঙ্গে কথা বলছেন। নিজের সঙ্গে কথাও। আকমল হোসেন প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে দূরে তাকালেন। ভেসে ওঠে গুনগুন ধ্বনি—

আমার যাবার বেলাতে সবাই জয়ধ্বনি কর। ভোরের আকাশ রাঙা হলো রে,/ আমার পথ হলো সুন্দর

তুমি কি গাইবে আমার সঙ্গে?

আকমল হোসেন চমকে আয়শার দিকে তাকান। বলেন, হ্যাঁ গাইব। মেরিনার প্রিয় গানটি আমিও গাইতে চাই আশা।

তুমিও ওর কথা শুনতে পাও?

আকমল হাসেন চুপ করে থাকেন।

আমি শুনতে পাই।

তিনি আবার শুরু করেন গানের ধ্বনি—কী নিয়ে বা যাব সেথা ওগো তোরা ভাবিস নে তা,/ শূন্য হাতেই চলব বাহিরে/ আমার ব্যাকুল অন্তর/ মালা পরে যাব মিলনবেশে, আমার পথিকসজ্জা নয়। বাধা বিপদ আছে সাঁঝের দেশে, / মনে রাখি নে সেই ভয়।/ যাত্রা যখন হবে সারা/ উঠবে জ্বলে সন্ধ্যাতারা, পূরবীতে করুণ বাঁশরি/দ্বারে বাজবে মধুর স্বর।

আকমল হোসেনের মনে হয়, আয়শার গুনগুন ধ্বনি আজ বাড়ি ছাড়িয়ে রাস্তা পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।

আয়শা গুনগুন ধ্বনি থামিয়ে বলেন, মেয়েটির যাত্রা তো শেষ হয়েছে। সন্ধ্যাতারা কি জ্বলে উঠেছে? তুমি কি দেখেছ? খুঁজেছ নাকি সন্ধ্যাতারা?

আকমল হোসেন দুহাতে মুখ ঢাকেন।

আয়শা খাতুন প্রাঙ্গণে দৃষ্টি ফেলে বলেন, মানুষের দ্বারে কি মধুর স্বর কাঁদছে? শহীদের জন্য ঘরে ঘরে প্রার্থনার মতো বলা হচ্ছে কি, তোমরা আমাদের স্বাধীনতা দিয়েছ, আমরা তোমাদের জয়গান গাইছি। আহ, ওরা তো নির্ভীক পায়ে যাত্রা শেষ করেছে। ওদের শেষ যাত্রায় জয়ধ্বনি করতে বলেছে।

তুমি কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছ না?

না, না। আমি কিছুই শুনতে পাচ্ছি না।

আকমল হোসেন দেখলেন আয়শা জ্ঞান হারিয়েছেন। সবাই মিলে তাঁকে শোবার ঘরে নিয়ে যায়।

দিন সাতেক পরে আবার বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে শহর। দুদিন আগে এসেছিল ছেলে দুটো। স্কুলের ছাত্র, ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেবে। পাঁচ পাউন্ড পিকে নিয়ে গেছে তাঁর কাছ থেকে।

এই দুজনের লক্ষ্য ছিল ডিআইটি টাওয়ারের ওপরে টেলিভিশনের যে এন্টেনা টাওয়ারিং আছে, সেটিকে কাটিং চার্জ করে ফেলে দেওয়া। নানা বাধায় সুযোগ করতে পারেনি। এবার তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডিআইটির একজন কর্মচারী মাহবুব। তিনি নাটক করেন। জন আর ফেরদৌসকে সহযোগিতা দিচ্ছে। ভেতরে ঢোকার পাস জোগাড় করে দিয়েছেন।

টেলিভিশন স্টুডিও থাকার কারণে ডিআইটি ভবনের সিকিউরিটিতে খুবই কড়াকড়ি। চেকিংয়ের শেষ নেই। প্রধান দুটো গেটের একটি খোলা থাকে ভেতরে ঢোকার জন্য। তাও আবার প্রত্যেক ফ্লোরে আছে চেকিংয়ের ব্যবস্থা। মূল ভবনে ঢোকার মুখে আছে চেকপোস্ট। প্রত্যেক তলার সিঁড়ির মুখে আছে চেকপোস্ট। প্রত্যেক তলার চেকপোস্ট পার হয়ে সাততলায় উঠতে হয়।

কথাগুলো বলে মিষ্টি করে হাসে জন। আকমল হোসেন সেই হাসি দেখে জেগে ওঠেন। ওরা আছে বলে শক্তি ফুরোয় না। এক রাতে কতজন যোদ্ধাকে ধরে নিয়ে গেল, ওর ভয় পায়নি। ওদের জায়গা পূরণ করে রুখে দাঁড়িয়েছে। এখানেই মৃত্যুর শান্তি।

আগামীকাল আমরা রেকি করতে সাততলায় যাব। ভয় পাচ্ছি এত চেকিং কাটাতে পারব কি না ভেবে।

সব অপারেশনেই রিস্ক থাকে, ছেলেরা। ভয় পেলে চলবে না, রিস্ক কাটাতেও হবে।

আমরা সেই সাহস নিয়েই তো এগোই আঙ্কল।

জানি। তোমাদের পিকে নেয়ার কাজ শেষ হয়েছে?

মাহবুব ভাই বারো পাউন্ড পিকে নিতে পেরেছেন। আমাদের ষোল পাউন্ড লাগবে।

মাহবুব দারুণ কাজ করেছে।

প্রথম দিন মাহবুব ভাই অফিসে যাওয়ার আগে আমি তার পায়ের কাছে ফাস্ট এইড ব্যান্ডেজ বেঁধে আট আউন্স পিকে বেঁধে দিই। জুতোর ভেতরে পায়ের পাতার নিচে আরও আট আউন্স পিকে দেওয়া হয়। মাহবুব ভাই বারো দিনে বারো পাউন্ড পিকে বিল্ডিংয়ের ভেতরে নিয়ে গেছেন। সাত তলার একটি ঘরের পুরোনো ফাইলপত্রের আড়ালে লুকিয়ে রাখা হয়েছে।

জন আবার মিষ্টি করে হাসে। এক মুখ হাসি নিয়ে ফেরদৌসও আকমল হোসেনের দিকে তাকায়। তাঁর মনে হয়, এই হাসিই এখন সম্বল।

তোমাদের কি আরও পিকে দেব?

না লাগবে না। ষোল পাউন্ড পিকে আমাদের হাতে আছে। রেকির কাজ শেষ হলে দু-একদিনের মধ্যে অপারেশনের সময় ঠিক করব।

এসো।

আকমল হোসেন দুহাত বাড়িয়ে ওদের ডাকেন।

ওরা কাছে এলে বুকে জড়িয়ে ধরেন। বেশ কিছুক্ষণ ধরে রাখেন। পরস্পরের বুকের উষ্ণতায় নির্ভরতা বাড়ে। আকমল হোসেন ওদের মাথার ওপর মুখ রেখে চোখ বন্ধ করেন।

ষোল পাউন্ড পিকে বহন করার আগেই সমস্যা দেখা দেয়। মাহবুব ওদের খবর দেয় যে, সাততলার যে ঘরে পিকে রাখা হয়েছে, সে ঘরের ফাইলপত্র গোছানোর তোড়জোড় চলছে। দুই কিশোর যোদ্ধা দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়। ষোল পাউন্ড পিকে বহন করার আগেই কাজটি করে ফেলতে হবে।

মাহবুবের পায়ের নকল ব্যান্ডেজের নিচে বেঁধে দেওয়া হয় ছয় গজ ফিউজওয়্যার। একটি কলমের ভেতরের অংশ ফেলে দিয়ে খোলের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় একটি ডেটোনেটর। মাহবুব সেগুলো পায়ে বেঁধে ঢুকে যায় অফিসে।

জন আর ফেরদৌসের জন্য দুটো পাস জোগাড় করা হয়েছিল। অডিশন দেওয়ার অজুহাত ছিল। ওরা নির্দিষ্ট সময়ে ডিআইটি ভবনে ঢুকে যায়। ছয়তলার চেকপোস্ট পর্যন্ত নির্বিঘ্নে ওঠে। সাততলার গেইটে পুলিশ ওদের আটকায়। কীজন্য যাবে জিজ্ঞেস করতেই ওরা বলে, ওরা সরকারের অন্য ডিপার্টমেন্ট থেকে এসেছে বুড়িগঙ্গায় কতটা পানি বেড়েছে তা দেখার জন্য। এবারে বর্ষা খুব বেশি। বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কথা বলার মাঝে অন্য লোকজন এসে পড়ায় পুলিশ ওদের ছেড়ে দেয়।

ওরা দ্রুত উঠে যায় নির্দিষ্ট ঘরে। পিকে বের করে একত্র করে। জন চার্জ সেট করে। ফিউজওয়্যারে ইগনিশন পয়েন্ট ও ডেটোনেটর ফিট করে ফেরদৌস।

ওদের সামনে সময় অনন্তকাল। অথচ মুহূর্ত মাত্র সময়। বেলা একটা বারো মিনিটে ফিউজওয়্যারে আগুন দেয় ওরা।

হাতে মাত্র তিন মিনিট সময়। তিন মিনিট পরে বিস্ফোরণ ঘটবে। সরে যেতে হবে এই ভবনের এলাকা থেকে। ওরা যখন ভবন ছেড়ে রাস্তায় নামে তখন বিস্ফোরণ ঘটে।

গাড়ি নিয়ে স্টেডিয়াম এলাকায় অপেক্ষা করছিলেন আকমল হোসেন। বিভিন্ন দোকানে ঘুরে নানা জিনিস দেখছিলেন। টুকটাক কেনাকাটিও করেছেন। বিস্ফোরণের শব্দ শুনে গাড়ির কাছে আসেন। ওদের দূর থেকে দেখে গড়িতে স্টার্ট দেন। ওরা এসে গাড়িতে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি চলতে শুরু করে।

কনগ্র্যাচুলেশন্স ফ্রিডম ফাইটার্স।

আকমল হোসেন রাস্তার দিকে তাকিয়ে কথা বলেন।

আমার বুক এবং পিঠ দুটোই তোমাদের জন্য আছে। আমার পিঠ দেখে ভেবো না যে, আমি পৃষ্ঠ প্রদর্শন করছি।

হা-হা করে হাসে দুই ছেলে।

আমরা তো সবাই জানি, আপনি আমাদের অভিভাবক আঙ্কল।

তোমাদের কোথায় নামাব?

মগবাজারের কোথাও।

ঠিক আছে। এই সময় আমি বাইরে থাকতে চাই না। বাড়িতে খোঁজ নিতে আসতে পারে বিস্ফোরণের ঘটনায়। ওরা দেখুক যে, আমি বাড়িতেই আছি। ওদের কোনো প্রশ্নের সুযোগ দেব না। যা করবে আমার ওপর দিয়ে করবে। গাড়ি থামে মগবাজারের মোড়ে। দুজনে নেমে যায়।

বাড়ি পৌঁছে আমাকে একটা ফোন দিও তোমরা।

জি, আঙ্কল।

ওরা দ্রুতপায়ে গলির ভেতর ঢুকে পড়ে।

আকমল হোসেন বাড়ি ফিরলে দেখতে পান আয়শা খাতুন বারান্দায় বসে আছেন। এক পলক তাঁর দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলেন খুব বিষণ্ন দেখাচ্ছে। হঠাত্ করে বয়স বেড়ে গেছে মনে হয়। মাথার সামনের দিকের অনেক চুল সাদা হয়েছে। আকমল হোসেন গ্যারেজে গাড়ি ঢোকাতে গেলে পেছনের বারান্দায় আসেন আয়শা খাতুন। তিনি বারান্দায় উঠলে বলেন, সাকসেসফুল অপারেশন?

হ্যাঁ।

ওদের বাড়িতে দিয়ে এসেছ?

না। মগবাজারের মোড়ে ছেড়ে এসেছি। ভাবলাম, আমার বাড়িতে থাকা দরকার। যদি আর্মি খুঁজতে আসে।

যদিও সেদিনের পরে আর্মি এ বাড়িতে আসেনি। তারপর বলা তো যায় না।

ঠিক বলেছ আশা।

তোমার জন্য লেবুর শরবত বানিয়ে রেখেছি।

লেবুর শরবত! চমকে ওঠেন আকমল হোসেন। হঠাত্ করে মনে হয় কথাটি তাঁকে মেরিনা বলল। ঠিক যেমন করে মেরিনা বলত ঠিক তেমনই ভঙ্গিতে আয়শা বলেছে। তিনি আয়শার পাশ কাটিয়ে ঘরে ঢুকতে গিয়েও ফিরে দাঁড়ান। ঘাড়ে হাত রেখে বলেন, এসো। লেবুর শরবত খাবে। যা গরম পড়েছে। ভীষণ ভ্যাপসা গরম।

আয়শা ফ্রিজ থেকে লেবুর সরবত বের করেন। নিজের জন্যও এক গ্লাস। দুহাতে দু-গ্লাস নিয়ে ড্রইংরুমে আসেন। গ্লাস নিতে নিতে আকমল হোসেন জিজ্ঞেস করেন, কী রান্না হয়েছে?

পাবদা মাছের ঝোল। করল্লা ভাজি আর ডাল। আর কিছু চাও?

না, না এতেই হবে।

ভাত তো খেতেই পার না। ভাতের থালা সামনে নিয়ে বসে থাক। মনে হয় ভাত খেতে তোমার বুঝি ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। এভাবে কেউ ভাত খায় না।

ঠিকই বলেছ। তবে ঠিক বলনি যে, এভাবে কেউ ভাত খায় না।

ঠিক বলিনি? আমি ঠিকই বলেছি।

আমি তো জানি আরও একজন এভাবেই ভাত খায়। আমারই সামনে বসে খায়।

আয়শা খাতুন লেবুর গ্লাস হাতে নিয়ে উঠে পড়েন।

বসো আশা। তুমি শরবত না খেলে আমিও খেতে পারব না।

আয়শা খাতুন সোফায় এসে বসেন। দুজনে একসঙ্গে একটু একটু করে শরবত খান। যেন এক একটি চুমুকে শেষ হয়ে যেতে পারে জীবনের বাকি সময়টুকু।

মন্টুর মা দরজায় দাঁড়িয়ে বলে, টেবিলে খাবার দিয়েছি।

দুজনে ভুরু কুঁচকে তার দিকে তাকান। যেন বলতে চান, তুমি আমাদের নীরবতা কেন ভাঙতে এসেছ। কিন্তু বলা হয় না।

ঘুমুতে যাবার আগে ফোন আসে জনের কাছ থেকে।

আঙ্কল, মাহবুব ভাই জানিয়েছেন, বিস্ফোরণে টাওয়ারের একটি অংশে ফোকর হয়েছে। সাততলার মেঝেতে গর্ত হয়েছে। আগুন সাততলা থেকে ছয়তলায় ছড়িয়ে পড়েছে। অফিসের অনেক কাগজপত্র পুড়ে গেছে।

আবারও তোমাদের কনগ্র্যাচুলেশনস। ওরা বুঝেছে যে আমাদের দমাতে পারেনি।

আঙ্কল দোয়া করবেন।

সেদিন তিনি নিজের টেবিলে এসে বসলেন। ডায়রির পাতা খুললেন। আয়শা উল-কাঁটা নিয়ে সোয়েটার বুননের বাকি কাজ নিয়ে বসেন। পেছনের বারান্দার দিক থেকে ঝিঁঝিটের ডাক ভেসে আসে। দুজনেরই মারুফের কথা মনে হয়। শব্দের ভেতরে স্মৃতির বিকাশ ঘটে। শব্দ স্মৃতিকে পথে ডাকে। দুজনেই ভাবলেন, পথের ডাকে স্মৃতির রেশ বড় নিষ্ঠুর। দুজনে ঘুমুতে গেলে পরস্পরের দিকে পিঠ ফিরিয়ে শুয়ে থাকলেন। বুঝলেন, জীবনের জলরংয়ে স্মৃতির ক্যানভাস ভরে না। কোথায় পালাবেন তাঁরা? তাঁদের সামনে কোনো ঠিকানা নাই। যন্ত্রণার দাবদাহে পুড়বেন। আবার ফিনিক্স হয়ে জাগবেন। জাগতেই তো হয় মানুষকে। তাঁরা পরস্পরের দিকে মুখ ফেরালেন। হাত ধরলেন। আয়শা খাতুন বিড়বিড় করলেন, মারুক যে এখন কোথায় আছে? শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ে? নাকি সীমান্তের ওপারে? আকমল হোসেন বিড়বিড় করলেন, আমরা কেন ওর কথা ভাবছি। ওকে তো ওর মতো থাকতে দিতে হবে। আয়শা বললেন, তাহলে কি অপেক্ষা করব? হ্যাঁ, অপেক্ষাই করতে হবে আমাদের। ওর বিজয়ী হয়ে ফিরে আসার অপেক্ষা।

দুজনেরই মনে হয় চারদিক তোলপাড় হচ্ছে। ঝিঁঝিটের ডাক নেই। পোকাগুলোকে বুটের নিচে পিষে মারছে সৈনিকেরা। ওরাও এখন ওদের শত্রু। ওই শব্দ যেন কারও স্বাধীনতার স্বপ্ন বাড়িয়ে না দেয়, সেজন্য ওদের এমন নিধন। দুজনে বিছানার ওপর উঠে বসেন।

তুমি কি কোনো স্বপ্ন দেখেছ আশা?

আমার মনে হচ্ছিল মারুফ বুঝি ডাকছে। ও পাগলের মতো আমাদের খুঁজছে। আমরা সামনে দাঁড়িয়ে আছি, ও আমাদের দেখতে পাচ্ছে না। তুমি কিছু স্বপ্ন দেখেছ?

আমার মনে হলো মারুফ আমাদের দেখে হেঁটে আসছে। কিন্তু ভীষণ কুয়াশা ওর চারদিকে। কুয়াশা কখনো নীল, কখনো সাদা। কখনো গোলাপি, কখনো সবুজ। আমি মুগ্ধ হয়ে ওর দিকে তাকিয়েছিলাম। আমার মনে হচ্ছিল, আমি ওকে এভাবেই দেখব অনন্তকাল।

আমাদের মাথা কি খারাপ হয়ে যাচ্ছে?

নাকি আমরা ওকে দেখার জন্য ব্যাকুলতা বোধ করছি?

দুজনের প্রবল নিঃশ্বাস বাতাসে উড়ে যায়। দুজনে পেছনের বারান্দায় এসে বসে। সুনসান রাত। কুকুরও কোথাও ডাকছে না। পাখিও না। জোনাকি নেই। অন্ধকার সামনে রেখে বসে থাকার যন্ত্রণা দুজনকে কুঁকড়ে রাখে।

পরদিন মারুফের ফোন আসে। ফোন ধরেন আয়শা।

আম্মা, আমি ঢাকায় এসেছি।

কোথায় আছিস বাবা?

ফার্মগেটের দুর্গবাড়িতে।

বাড়িতে আসবি একবার?

অপারেশনের পরে আসব। আব্বা কই?

তিনি তো বাইরে গেছেন। ডা. আশরাফের সঙ্গে একজন আহত গেরিলাকে দেখতে যাবেন।

কে আহত হয়েছে আম্মা?

নাম তো আমার মনে নাইরে।

আব্বার সঙ্গে আর কথা হবে না। আব্বাকে আমার সালাম দেবেন।

ছেলের সঙ্গে কথা বলে আয়শার মন খুশিতে ভরে যায়। ভাবেন, আলতাফকে বাজারে পাঠাবেন। মারুফের পছন্দের খাবার ফ্রিজে রাখতে হবে। তিনি রান্না ঘরে আসেন।

মন্টুর মা, মারুফ ঢাকায় এসেছে।

মেলা অস্ত্রশস্ত্র এনেছে?

এনেছে বোধহয়।

কোথায় যুদ্ধ করবে?

এটাতো আমাকে বলেনি। এসব কথা ফোনে বলা ঠিক নয়।

হ্যাঁ, তাইতো। কী রাঁধব আজ?

ওর পছন্দের সবকিছু। আলতাফ যা আনবে সব দেখেশুনে রান্না করবে। ফ্রিজে রাখা হবে। ও কখন আসে বলা তো যায় না।

মন্টুর মা ঘাড় নেড়ে রান্নাঘর পরিষ্কারের কাজে লেগে যায়। আয়শা খাতুন মারুফের তছনছ করে যাওয়া ঘরটা গোছাতে শুরু করেন। জোরে জোরে সেনাসদস্যদের গাল দেন, বকা দেন। মানুষের ঘরদুয়োর নষ্ট করার জন্য অভিশাপ দেন। আয়শা খাতুনের মনে হয় তিনি জীবনের বাকি সময়ে এই ঘর আর ঠিক করতে পারবেন না। এ বড় কঠিন কাজ।

আকমল হোসেন বাড়ি ফিরে দেখতে পান, আয়শা খাতুন ঘর পরিষ্কার করতে করতে ক্লান্ত হয়ে খাটের পাশে মাথা ঠেকিয়ে ঘুমিয়ে আছেন। তিনি জেনেছেন মারুফের টেলিফোনের কথা। তাঁর সঙ্গে ছেলের কথা হলো না! এই বিষাদে তিনি খানিকটুকু মনমরা হয়ে গেলেও ছেলের ঘর দেখে স্বস্তি পেলেন। এতদিন কোনো ঘরই গোছানো হয়নি, আজ মারুফের ঘর গোছানো হচ্ছে। বুকের ভেতরে খানিকটুকু স্বস্তি ফিরিয়ে এনে ভাবলেন, আয়শা ঘুমাক। ওর ঘুম খুব দরকার। ও নিজের সঙ্গে লড়াই করে কুলিয়ে উঠতে পারছে না। তাঁর আর নিজের ঘরে যাওয়া হলো না। মারুফের ঘরে ঢুকে একটি খালি চেয়ারে বসে পড়েন।

পরদিন সকালে ফার্মগেটের দুর্গবাড়ি আক্রমণ করে আর্মি। বেশ কিছুদিন ধরে এলাকার চারদিকে নজর রাখছিল ওরা। নতুন লোকজনের আসা-যাওয়া খেয়াল করছিল। কে কোনদিক থেকে আসছে, কোনদিকে ঢুকছে এইসব। নতুন লোক দেখলে মাঝে মাঝে আইল্যান্ডের মিলিটারি পুলিশ জিজ্ঞেস করত, তুমহারা নাম কেয়া? কিধার যায়েগা? উত্তর না দিলে বেতের লাঠির খোঁচা দিয়ে বলত, বাতাইয়ে।

এই উত্পাতের কারণে এলাকায় পায়ে হাঁটা লোকজনের চলাচল কমে গিয়েছিল। তারপর গোয়েন্দারা গেরিলাদের আশ্রয় কেন্দ্রটি খুঁজে পায়। তখন সকাল আটটা বাজে। ওরা পাঁচজন ছিল বাড়িতে। কেউ ঘুম থেকে জেগেছে, কেউ বিছানা ছাড়েনি। এমন সময় যমদূতের মতো এসে দাঁড়ায় ওরা। ওদের আগমনের খবর প্রথমে টের পায় মারুফ। ঘরে ঢুকে অন্যদের খবর দেয়, আমাদের দুর্গ আক্রান্ত হয়েছে। ওরা বাড়ির উঠোনে এসেছে। ওরা ছয়জন। রাইফেল, স্টেনগান আছে হাতে। গাছপালা ঘেরা বাড়ি তো, তাই এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। সতর্কতার সঙ্গে আসছে।

তুই বাইরে গিয়ে দাঁড়া। দেখ কী বলে।

বাকিরা চৌকি ছেড়ে উঠে পড়ে।

মারুফ বাইরে আসার সঙ্গে সঙ্গে ওর চুলের মুঠি ধরে হেঁচকা টান দেয়।

আর্মস-অ্যামুনিশন কিধার?

নেহি জানতা।

নেহি জানতা! গাদ্দার।

বাকিরা ঘরে ঢুকেছে। বিভিন্ন ঘর থেকে বের করে আনে সবাইকে। ওদের গেঞ্জি ও শার্ট খুলে হাত এবং চোখ বাঁধে। পাঁচ-ছয়বার বাড়ির চারদিকে ঘোরায়। ওরা কেউ কোনো কথা বলে না। রাইফেলের বাঁট দিয়ে বাড়ি দিলে ওরা পাঁচজন শুধু বলে, নেহি জানতা। প্রশ্ন ছাড়া উত্তরটা অনবরত আউড়াতে থাকে গেরিলা যোদ্ধারা।

ওদের কাছ থেকে অস্ত্রের খবর বের করা কি সহজ। ওরা তো মৃত্যুকে হাতের মুঠোয় নিয়ে যুদ্ধ নেমেছে। ওদের হারানোর কিছু নেই।

যমদূতের মতো ছয়জন পাকসেনা ওদেরকে বাড়ির পেছনে নিয়ে যায়। গাছ, বুনো ঝোপ এবং ঘাস ও শুকনো পাতার মর্মরধ্বনি চারদিকে কম্পন তোলে।

বাতায়ে মুকুত কিধার? বাতায়ে আর্মস কিধার?

ওরা বুক টান করে দাঁড়ালে গুলিবিদ্ধ হয় ওদের শরীরে।

মারুফের গুলি লাগে বুকে।

ময়েজের চোখে।

স্বপনের পেটে।

মিজারুল আর ওমর আহত হয় সামান্য। একজনের কানের পাশ দিয়ে গুলি চলে যায়। অন্যজনের পায়ে লাগে।

লুটিয়ে পড়ে সবাই।

দুদিন পরে ফার্মগেটের বাড়ির খবর নিতে আসেন আকমল হোসেন। সঙ্গে আলতাফ। দূর থেকে বাড়ির দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারেন আবস্থা খারাপ। আলতাফ পাশে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বলে, স্যার, আপনি যাবেন না। আমি গিয়ে আগে দেখে আসি।

আকমল হোসেন মাথা নেড়ে সায় দেন।

বিধ্বস্ত বাড়িটির কাছে এসে আলতাফের বুক মুচড়ে ওঠে। বুঝতে পারে এই বাড়িতে যুদ্ধ হয়েছে। বাড়ির ভেতরে ঢোকে না ও। একরকম ছুটে গিয়ে খবর দেয় আকমল হোসেনকে।

স্যার যুদ্ধ। হাঁপাতে থাকে, যেন দম আটকে আসছে ওর। স্যার চলেন।

তুমি কি ছেলেদের দেখেছ?

কাউকে দেখিনি স্যার। আমি তো বাড়িতে ঢুকতে পারিনি। সব তছনছ হয়ে আছে। স্যার অনেক বড় যুদ্ধ।

তুমি শান্ত হও আলতাফ। তোমাকে উত্তেজিত দেখলে মিলিটারি পুলিশ সন্দেহ করবে। তুমি গাড়িতে ওঠ। গাড়িটা অন্যদিকে কোথাও রেখে আসি।

আকমল হোসেন বিপন্ন বোধ করেন। আলতাফকে তা বুঝতে দেন না। গাড়ি গ্রীন রোড ধরে অনেকখানি চালিয়ে ফিরে আসতে থাকেন। নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করেন। দেখতে পান, আলতাফ দুহাতে চোখ মুচছে। নিজেরও একটু খটকা আছে। যুদ্ধের পরে মারুফ বাড়িতে ফোন করেনি। তাহলে কি ও রূপগঞ্জে চলে গেছে। না মেলাঘরে? বুক চেপে আসে। তারপরও মাথা ঠিক রেখে বাড়ির কাছাকাছি এক জায়গায় গাড়ি পার্ক করেন।

তুমি গাড়িতে থাকো আলতাফ।

না, স্যার আমিও আপনার সঙ্গে যাব। গাড়ি এখানে থাকুক। যা হয় হবে।

তিনি এক পলক দীর্ঘদিনের পারিবারিকভাবে যুক্ত লোকটির দিকে তাকান। শুকনো, ছোটখাটো মানুষটি। বছর দশেক ধরে তাঁর কাছে আছে। পরিবারের সুখ-দুঃখের সঙ্গে এক হয়ে আছে। আজও তার ভূমিকা পরিবারের একজনের মতোই। তিনি আলতাফের হাত ধরে বলেন, আমার পা টলছে। ঠিকমতো হাঁটতে পারছি না।

সেজন্যই আমি আপনার সঙ্গে যাচ্ছি। আমি তো জানি এই দুর্গবাড়িটি আপনি খুব যত্ন করতেন। এখানে এলে আপনি যুদ্ধ আর শান্তি দেখতেন। আপনি আমাকে একথা বলেছেন।

দুজনে বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ায়। আকমল হোসেন আলতাফের হাত চেপে ধরে বলেন, একি! আশ্চর্য! এতটা ঘটেছে। কেউ আমাকে কোনো খবর দিল না। হায় আল্লাহ, ওরা কোথায়?

বাড়ির সামনের প্রাঙ্গণ, প্রতিটি ঘর তছনছ, লন্ডভন্ড। আক্রোশ মেটানো যে হয়েছে তার প্রমাণ ছড়িয়ে আছে চারদিকে। কোথায় গেল ছেলেরা? সরে পড়তে পেরেছিল কি?

আর কোথায় খুঁজব? তারচেয়ে বাড়িতে গিয়ে ফোনে যোগাযোগ করে দেখি কোনো খবর পাওয়া যায় কি না।

স্যার বাড়ির পেছন দিকটা দেখে আসি।

পেছনে তো সব বুনো ঝোপঝাড়। ওই ব্যাটারা এসব জায়গায় যেতে ভয় পায়।

স্যার, আমাদের এখানে আসা আর না-ও হতে পারে। দেখে আসি।

ঠিক আছে, চলো আমিও যাই।

দূর থেকেই দেখলেন পাঁচটি রক্তাক্ত লাশ পড়ে আছে। ছুটে কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই চক্ষু স্থির হয়ে যায় আকমল হোসেনের। ওদের চোখ এবং হাত বাঁধা। মারুফ চিত্ হয়ে পড়ে আছে। বুক জুড়ে ফোকর তৈরি হয়েছে। ছিন্নভিন্ন হয়ে আছে চারদিক। আকমল হোসেন হাঁটু গেড়ে বসলেন। বুকের ফুটোর দিকে তাকিয়ে থাকলেন। দুহাত বাড়িয়ে মিজারুলের বাম পায়ের পাতা পেলেন। আর স্বপনের ডান হাত। মাথা ঝুঁকে গেল তাঁর বুকের ওপর।

কতক্ষণ সময় গেল দুজনের কেউই বুঝতে পারেন না। আকমল হোসেন অনুভব করেন যে, তাঁর মাথা ক্রমাগত শহীদের শরীরের ওপর ঝুঁকে পড়ছে। তিনি মাথা কাত করে বলেন, বাসায় যাও।

আলতাফ আঁতকে উঠে বলে, বাসায়!

হ্যাঁ বাসায়। তোমার খালাআম্মা আর মন্টুর মাকে নিয়ে এসো।

আলতাফ দুহাত দিয়ে বুক চেপে ধরে।

আর শোন, তোমার খালাম্মাকে বলবে, পাঁচটা সাদা বিছানার চাদর আনতে।

আমি কেমন করে বলব? ও আল্লাহরে—

শোন, দুটো কোদাল এনো। তোমার জন্য একটা আমার জন্য একটা। আমি জানি দুটো কোদাল বাসায় নেই। তুমি কোদাল কিনে বাসায় যাবে। আমার পকেট থেকে মানিব্যাগটা বের করে নাও। তাড়াতাড়ি যাও। তাড়াতাড়ি আসবে।

আপনি কী করবেন স্যার?

আমি এখানে থাকব।

না, স্যার, আপনাকে একা রেখে আমি যাব না।

তোমাকে তো যেতেই হবে আলতাফ।

আলতাফ কাঁদতে শুরু করে। দশ বছর ধরে মানুষটিকে দেখছে, কিন্তু এমন কণ্ঠস্বরে কোনোদিন কথা বলতে শোনেনি।

আলতাফ তুমি যাও। আর কেঁদো না।

আপনি স্যার?

আমি ওদের সঙ্গে শুয়ে থাকব। তুমি যাও। সময় নষ্ট করছ কেন?

আলতাফ কথা না বাড়িয়ে এগোয়। বিল্ডিংয়ের কোণায় গিয়ে পেছন ফিরে তাকায়।

দেখতে পায় আকমল হোসেন শহীদদের পাশে শুয়ে পড়েছেন। গেটের কাছে যাওয়ার আগেই ভেসে আসে তাঁর কণ্ঠস্বর—ও আমার দেশের মাটি তোমার পরে ঠেকাই মাথা...।

এই পাতার আরো খবর -
font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেছেন, 'রাজনৈতিক দল হিসাবে কর্মকাণ্ড করার কোনো অধিকার জামায়াত রাখে না।' আপনিও কি তাই মনে করেন?
7 + 2 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
সেপ্টেম্বর - ১৮
ফজর৪:২৯
যোহর১১:৫৩
আসর৪:১৭
মাগরিব৬:০৩
এশা৭:১৬
সূর্যোদয় - ৫:৪৫সূর্যাস্ত - ০৫:৫৮
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :