The Daily Ittefaq
ঢাকা, সোমবার ০৫ আগস্ট ২০১৩, ২১ শ্রাবণ ১৪২০ এবং ২৬ রামাযান ১৪৩৪
সর্বশেষ সংবাদ হাইকোর্টের রায় বহাল; নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না জামায়াত | আপিল করেছেন গোলাম আযম | অষ্টম মজুরি বোর্ডের সুপারিশে মন্ত্রিসভার একমত

মুক্ত গদ্য

কাগজ-কলম সম্বল

বেলাল চৌধুরী

চমকপ্রদ সব অভিযানে ভরপুর বিগত শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়টা ছিল ব্যক্তিগতভাবে আমার জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ এবং ঘটনাবহুল। শরতের ভাসমান মেঘের মতো নিরুদ্দেশ হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে কলকাতায় গিয়ে নোঙর ফেললাম।

তার পেছনে অবশ্য আরও অনেকানেক ইতিহাস। সত্য-মিথ্যের মিশেল দেওয়া। মিথ্যে না থাকলে মিথ তৈরি হয় কী করে? নিজের বলতে আত্মপরিচয় দেওয়ার মতো ট্যাগ লাগানো সামান্য লাগেজ-পত্তর অব্দি ছিল না। যার ফলে একসঙ্গে সবটাই ভাসমান এবং ভ্রাম্যমাণ না বলে ভ্রামণিক বলাটাই কি অধিকতর যুক্তিসঙ্গত নয়? কে জানে? এই অনিশ্চয়তা, দোদুল্যমানতা নিয়েই বিগত ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে বেশ বিপাকেই পড়ে গিয়েছিলাম বলা যায়।

সেটাও আবার ঘরের পাশে আরশিনগর কলকাতায়। একটা শহরকে চিনতে হলে জানতে হলে যে সব জায়গা চেনা-জানার দরকার, অল্পদিনের মধ্যে তা আমার নখদপর্ণে। আড্ডার জায়গা কফি হাউস, শুঁড়িখানা খালাসি টোলা, বারদুয়ারি, মাইফেলের জায়গা সোনাগাছি, রূপোগাছি, রামবাগান, হাঁড়কাটা গলি, আদিগঙ্গার ধারের কালীঘাট কোনোটাই আর অগম্য নয়।

দিনে দিনে কলকাতার মতো শহরও ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে। ঠিক এই সময় তখনকার ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে একটা যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলা হয়ে যাওয়ার আগে নিজের একটা অভেদত্বের প্রয়োজনে অবচেতনে হাতে তুলে নিলাম নিরীহ একটা কলম আর কিছু সাদা কাগজ। এতকাল ধরে তো আর শুধু শুধুই ঘাস কাটিনি। লেখাপড়া বলতে টিপসই থেকে অক্ষরজ্ঞান আর হাতের কাছে যা পাওয়া গেছে পাঠ্য-অপাঠ্য শ্লীল-অশ্লীল বিবেচনায় না এনে গোগ্রাসে কম গেলা হলো না তো। তাই ঝড়ের বেগে খানিকটা প্রাণের দায়ে যখন যতটুকু সম্ভব পারা যায়, যা হোক কিছু একটা লিখে বারেন্দ্র বামুনকে শান্তি লাহিড়ীর হাতে তুলে দিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলব কি ফেলব না করছি—এমন সময় উত্পল কুমার বসু সদ্য প্রকাশিত সুমুদ্রিত বাংলা কবিতায় প্রকাশিত লেখা দুটি পড়ে এমনই উচ্ছ্বসিত হলেন যে, নগদ পাঁচ টাকা বের করে পুরো এক বোতল ১ নম্বরের অর্ডার করলেন।

মুখে বললেন, করেছেন কী?

যাক বাবা। বাঁচা গেল।

তখন উত্পল কুমার বসুর 'চৈত্রে রচিত কবিতা', মোহিত চট্টোপাধ্যায়ের 'গোলাপের বিরুদ্ধে যুদ্ধ' শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'হে প্রেম হে নৈঃশব্দ' আর দখনে ভাষায় লেখা উপন্যাস 'কুয়োতলা' পড়ার ঘোর কাটেনি। 'কৃত্তিবাস' সম্পাদক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তখন আমেরিকায়। বিনয় মজুমদার-এর কবিতা নিয়ে আলোচনা লিখতে গিয়ে 'হাংরি জেনারেশন'-এর জন্ম দিয়ে ফেললেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়।

কফি হাউসসহ কলকাতার আরও অনেক অজায়গা-কুজায়গাসহ খালাসিটোলায় একছত্র আধিপত্য তখন শক্তির। সকালবেলা কুয়াশা কাটা ভোর মানে বেলা দশটা কি এগারোটার দিকে পকেটে মাত্র দশ নয়া পয়সা কি পঁচিশ নয়া পয়সা সম্বল করে বেরিয়ে পড়তেন উল্টো ডাঙার ৪ নম্বর অধর দাস লেনের বাড়ি থেকে। তারপর আমিই রাজা আমিই প্রজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে-কে কার করতে করতে রাত গভীরে যখন ফুটপাত বদল হয়ে যায় পা জোড়া হয়ে যায় উল্টো তখন ফিরতেন। শুধুই কি ফিরতেন? চারদিকে কাড়ানাকাড়া বাজিয়ে জগঝম্প রব তুলে রাজা ফিরছেন—এরকম একটা ব্যাপার ছিল নিত্যনৈমিত্তিক।

পরের দিনগুলি কফি হাউস, শক্তিদা, খালাসিটোলা, উত্পলদার পদ্মপুকুর রোডের পৈতৃক বাড়ি বেচে দিয়ে হাজরা বাজারের দ্বিতলের একটি ফ্ল্যাটে পৈতৃক সুবাদে প্রাপ্ত চল্লিশ দশকের সংস্করণ এনসাইক্লোপিডিয়া অফ ব্রিটানিকার ঘরে বসবাস করতে হলেও কখনো হাতে হাত দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা বোধ করিনি। বরং ওই ফ্ল্যাটে বহুদিন বহু হৈ চৈ আর আড্ডা হয়েছে সবাই মিলে। কেমাত্র শক্তি চট্টোপাধ্যায়েরই আসা যাওয়ার কোনো সঠিক সময় বা দিন-ক্ষণের ঠিকঠিকানা ছিল না।

কাছেই মহিম হালদার স্ট্রিটে থাকতেন টাঙ্গাইলের কবি তারাপদ রায়। শোনা যায়, যার প্রথম আবির্ভাব হয়েছিল মাল্টিকালার পাজামা-পাঞ্জাবি পরা অবস্থায়। প্রথম কবিতা ছাপিয়েছিলেন চাঁদা দিয়ে। তখনো মিনতি বৌদি ঘরে আসেননি মানে তারাপদ রায়ের গৃহিণী হিসেবে। ধারে কাছেই ছিল একটি উড়ে হোটেল। সেখানে পরম তৃপ্তি সহকারে রুই মাছের আস্ত মুড়ো খেতে দেখেছি শক্তিদাকে। অবশ্যই 'সোবার' অবস্থায়। হাজার হলেও বামুন সন্তান তো। পরে বহু পরে একবার সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কেও। একই রকমে রোহিত মেস্যর আস্ত মুণ্ড ভক্ষণে নিখুঁত তত্পর হতে দেখেছি। সে আবার অন্য এক পরিস্থিতিতে। তা ওই হাজরা মার্কেটের ফ্ল্যাটে আর যারা আসতেন, তাদের মধ্যে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, দীপক মজুমদার, উত্পলদার তত্কালীন বান্ধবী পরবর্তীকালে স্ত্রী সান্ত্বনা বৌদি। অবশ্য তিনি আসতেন দিনের বেলায়। উত্পলদা কাছেই যোগমায়া কলেজে পড়াতেন। সেখানে অনেক পরে পরিচিত হওয়া 'এক্ষণ' সম্পাদক নির্মাল্য আচার্যও অধ্যাপনা করতেন। তবে সেটা ছিল আশুতোষ কলেজ।

মাঝে মাঝে দীপক মজুমদার এলে জমে উঠত গানের আসর। কত যে বিচিত্র রকমের গানের ভাণ্ডারি ছিলেন দীপকদা। যেসব তুখোড় বলিয়ে কইয়ে লিখিয়ে ছিলেন তা আর এই স্বল্প পরিসরে বলার নয়। একেক দিন এমনও দেখেছি, একক দ্বৈত ইঙ্গবঙ্গ, কোরাস গাইতে গাইতে অন্যরা ঘুমে ঢলে পড়েলেও দীপকদা অক্লান্তভাবে গেয়ে চলেছেন তো চলেছেনই স্বরচিত ও সুর আরোপিত—'বেদানা আর চুল বেঁধো না।

কাছেই ছিল হাজরা পার্ক। শর্টকাট করা ছাড়া সত্যিকার পার্ক বিলাসী হয়তো ছিলেন কেউ কেউ। সেখানে পার্কের সমতলে একটা বিজ্ঞপ্তি আমাকে খুব আকর্ষণ করত। 'অযথা ফুল তুলিয়া বাগানের সৌন্দর্য নষ্ট করিবেন না।'

তা সেই পার্কেই একবার একরাতে একটা লোককে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেল। কে বা কারা খুন করেছিল আর কখনই বা খুনটা হয়েছিল, কেউ স্থির নিশ্চিত হতে পারছিল না। সকালের খবরের কাগজ খুলে খবরটা জানা গেল। আরও জানা গেল ঘটনার তদন্ত কাজে অকুস্থলে সদ্য আমদানীকৃত দুটি বিদেশি শিক্ষাপ্রাপ্ত পুলিশ কুকুরকে নিয়ে আসা হবে। পার্কে একটি চশমা পাওয়া গেছে। কুকুর দুটি তার গন্ধ শুঁকে তদন্ত কাজে নামবে বলে আশা করা যাচ্ছে। আগের রাতে মূর্তিমান শক্তি চট্টোপাধ্যায় গভীর রাতের দিকে বেসামাল হয়ে টর্পেডোর মানে তারাপদ-এর খোঁজে গোটা এলাকাব্যাপী ঝামেলা ঝঞ্ঝাট পাকাতে দেখে টহল পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে যায় একটি পুলিশ ফাঁড়িতে।

সেখানকার সেকেন্ড অফিসার পাকড়াশি বাবুর আবার দুটি মাত্র আসক্তি ছিল। যার একটি ছিল একজন বাঁধা রাঢ়ের প্রতিপালন আর অন্যটি ছিল নিয়মিত মদ্যপান। সে কাহিনি যথা সময়ে বলা যাবে। এখন যেটুকু প্রয়োজন সেটুকু বলে সেরে নিই।

ঘটনার দিন যখন শক্তিবাবুকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তখন পাকড়াশিবাবু ছিলেন বেহেড মাতাল। এছাড়া একটি মুসলমান বস্তিতে সেদিন নিজেদের মধ্যে এমন এক প্রাণঘাতী হাঙ্গামা বেঁধেছিল যে, তাতে মহিলাসহ বস্তির প্রায় অর্ধেক লোক রক্তাক্ত অবস্থায় ওই পুলিশ ফাঁড়িতে জমায়েত হয়েছিল। অকথ্য গালমন্দ আর প্রচণ্ড কলকোলাহলের মধ্যে একদিকে ঘোর মাতাল কবি, অন্যদিকে বেহেড মাতাল দারোগা, চড়া মেজাজের মুসলমান দাঙ্গাবাজরা, সে এক মহা হুলস্থূলু কাণ্ডকারখানা।

হঠাত্ এরই ফাঁকে বড় বাবুকে নিচে নেমে আসতে দেখে, সেপাইরা বেধড়ক পেটাতে শুরু করল নির্বিচারভাবে হাঙ্গামাকারীদের। হঠাত্ই কবির দিকে চোখ যেতেই বড় বাবু বলে উঠলেন, এই পেঁচোটাকে আবার কে নিয়ে এসেছে? একদিন না বারণ করে দিয়েছি—এটাকে যেন কক্ষনো থানায় নিয়ে আসা না হয়। যত্তসব উটকো ঝামেলা। আনন্দবাজারের লোক ব্যাটা, বেহেড মাতাল, সব বড় সাহেবদের পেয়ারের লোক, এক্ষুনি টেলিফোন এল বলে, বাবুকে ঠিকঠাকমতো ঠিকানায় পৌঁছে দিয়ে এসো। এই তো দু-পায়ের ওপর লাফানো শুরু করেছে। একটু লাই পেয়েছে কি মাথায় চড়ে বসবে। বাবুর আবার হাজার বায়নাক্কা। সিগারেট দাও, মাল দাও। আর রাতের মতো ঘুম হারাম। এদিকে আবার বাবু তার চশমা খুঁজে পাচ্ছেন না। যত রাজ্যের মড়া তার ঘাড়ে। নাও এখন চশমা খোঁজো।

সেন্ট্রি রামখেলাওন বলল—'চশমা পাবে কোথায়? সে তো ছোট বাবু লিয়ে চলে গিয়া। ইতনাহি দারু পিয়া থা কে কেয়া বোলে আর।'

ব্যস হয়ে গেল। মোদো মাতালদের নিয়ে আর পারা যায় না। পাকড়াশি এখন আবার কোন মড়ায় গিয়েছে কে জানে। বাড়িতে তার বৌ তারাসুন্দরী আবার হূদরোগী। বেশি রাত হলে দরজায় তালা ঝুলিয়ে শুয়ে পড়ে। মরে গেলেও সকালের আগে সেটা খোলার কোনোই সম্ভাবনা নেই।

কাল আবার দুপুরে তার ডিউটি। কী ফ্যাসাদেই না পড়া গেল। শক্তিবাবুকে জোরাজুরি করে ফের পাকড়াও করে চেপে ধরে হাজরা পার্কে এনে ছেড়ে দিয়ে পালিয়ে বাঁচল যেন।

কাছাকাছি মহিম হালদার স্ট্রিটে থাকেন তারাপদ বাবু। তার মেসোমশাই জাঁদরেল দেবী রায় আবার লালবাজারের বড় সাহেব। কথিত আছে, যার নামে বাঘে-গরুতে এক ঘাটে জল খায়।

শুধু তাই কী? আচমকা সে সময়ই মার্কিনি বিট সম্প্রদায়ের অক্ষম অনুকরণ করে হঠাত্ গজে ওঠা ভূঁইফোড় হাংরি জেনারেশন নামে এক দঙ্গল যুবা যা ইচ্ছে তা-ই নয় বলে পরীক্ষা-নিরীক্ষার নামে কালাপাহাড়ি সাহিত্যের অবতারণা করে। তাদের সম্পর্কে বিস্তারিত বলার জায়গা হয়তো এটা নয়। তবে হাংরিরা যে ফান্টুসের অধিক কিছু নয় তার প্রমাণ তো এই অর্ধ শতাব্দের মধ্যেই দেখা যাচ্ছে।

এখানে একটি চুটকি নয়; শুধু বাস্তব ঘটনার উল্লেখের লোভ সংবরণ করা কঠিন। আমাদেরই এক তরুণ বন্ধু হাংরির দলে ভিড়ে লেখালেখি করতে শুরু করে দিল। ওর বাবা-মায়ের দেওয়া নাম হারাধন ধাড়াই পরবর্তীকালে হাংরিদের যশস্বী কবি দেবী রায় নামে সমধিক পরিচিত। হাংরিদের ওপর নানাবিধ কারণে সাধারণ সাহিত্যপ্রেমী পাঠকরাও তিতি-বিরক্ত ঠিক তখন লাল বাজারের দুর্ধর্ষ দুঁদে অফিসার দেবী রায়ের নেতৃত্বে হাংরিদের নির্বিচারে ধর-পাকড় করা হচ্ছিল তখন প্রতিবাদস্বরূপ হারাধন ধাড়া হয়ে গেল দেবী রায়। ঠিক যেন সুকুমার রায়ের সেই ছড়া কাব্যের অমর পঙিক্তর মতো—ছিল রুমাল হয়ে গেল বিড়াল।

ঝঞ্ঝাট বলে ঝঞ্ঝাট। শক্তিবাবু ছাড়া পেয়েই আবার ট্যাক্সি চেপে প্রায় এক ফার্লং দূরে মহিম হালদার স্ট্রিটে তারাপদ-এর বাড়ির সামনে। মধ্যরাতে টর্পেডো বলে সে কী চিল্লাচিল্লি। পাড়া-প্রতিবেশীরা এসব হাঙ্গামা-হুজ্জত দেখতে দেখতে রপ্ত হয়ে গেছেন। কেউ কোল বালিশ টেনে কেউ বা বউকে জড়িয়ে পাশ ফেরে শোয়।

ওদিকে ট্যাক্সিঅলারা তারস্বরে চেঁচিয়ে বলছে, 'হামকো ছোড় দিজিয়ে বাবু'। শক্তি বাবু সমানে অনর্গল নেচে এবং বকে যাচ্ছেন। একসময় গেট খুলে তারাপদ বাবু শক্তিবাবুকে ভেতরে ঢুকিয়ে আবার ওপরে গেলেন ট্যাক্সিঅলাকে বিদায় করার জন্য টাকা আনতে। এর আগে একদিন তো একসঙ্গে চার-চারজন ট্যাক্সিঅলাকে বিদায় করতে হয়েছিল। বাবু ধরমতল্লা থেকে নানা পথ ঘুম করকে আয়া। একসঙ্গে চার ট্যাক্সি কী করে হয়?

জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেল, মাতোয়ালা বাবু এক ট্যাক্সি ছেড়ে আর এক ট্যাক্সিতে চেপেছেন এবং পথটুকু আসতে সব কটাতেই কোনো না কোনো সময় তিনি চেপেছেন নেমেছেন আবার উঠেছেন। অগত্যা সবাইকে দিয়ে থুয়ে বিদায় করতে করতে দেখা গেল ঘটাং ঘটাং করে দিনের প্রথম ট্রাম বেরিয়ে পড়েছে।

শক্তিবাবু তখনো যথেষ্ট পরিমাণ শান্ত হননি। কখনো লাফাচ্ছেন কখনো টর্পেডোকে লালা ঝরানো মুখে জড়িয়ে ধরে চুমু খেতে চাইছেন। টর্পেডো মানে তারাপদ। অ্যালেন গিনসবার্গ তারপদকে এই নামে ডাকতেন বলে পরবর্তীকালে শক্তিবাবুও টর্পেডোতে স্থির হতেন মাতোয়ালা মত্ত অবস্থায় অবশ্যই। অন্য সময় তো শক্তি চট্টপাধ্যায়ের মতো সজ্জন, মধুর ভাষী, নম্র ভদ্র কজন হতে পারেন।

এদিকে অদূরে অবস্থিত হাহরা মার্কেটের ফ্ল্যাটে উত্পল কুমার বসু সকালের কাগজে গতরাতে হাজরা পার্কের খুনের ঘটনা এবং সেই সূত্রে পুলিশী কুকুরের অভিযানের কথা দেখে তড়িঘড়ি বিরাট এক প্যাডলক ঝুলিয়ে বহরমপুর রওয়ানা হয়ে গেলেন। মহিম হালদার স্ট্রিটে তখন শক্তি বাবু অঝোরে ঘুমালেও মাঝে মাঝে আড়মোড়া ভেঙে জেগে উঠেই খুঁজছেন চশমা। চশমা ছাড়া তিনি যে রীতিমতো কানা।

তার চশমা যে বদলা বদলি হয়ে গেছে বা হাজরা পার্কে একটা জলজ্যান্ত খুন এবং একটা বেওয়ারিশ চশমা পাওয়া গেছে যেটার গন্ধ শুঁকে বিদেশ থেকে আনা গোয়েন্দা কুকুর আততায়ীর খোঁজে খানা তল্লাশিতে বেরুবে যে, সে সম্পর্কে তিনি মোটেই অবহিত নন। আর জানবেনও বা কী করে? তিনি তো গতকাল দুপুর থেকেই গাঞ্জা পার্কে ট্যাক্সি ড্রাইভারদের সঙ্গে চুল্লু পরে তরুণ কবিদের সঙ্গে বাংলু তারপর সবই ঝাপসা। সব ঘটনা কিন্তু ঘটছে ভবানীপুর আর হাজরা রোড এলাকায়।

গল্প সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্রেও কলকাতার স্থান বরাবরই শীর্ষে। তা কলকাতাকে হেয় করার জন্যে যতদূর স্বপ্নের নগরী বা মিছিল নগরী বলা হোক না কেন। কবি ঈশ্বর গুপ্তের কথায় কলকাতা আছে কলকাতাতেই। সাধারণ মানুষকে ছবিমনস্ক করে তোলার জন্য বা অন্য কথায় আধুনিক চিত্রকলার সঙ্গে পরিচিত করে তোলার জন্য জনাকীর্ণ রাস্তার ফুটপাত সংলগ্ন রেলিং-এর সাথে শিল্পকর্মের প্রদর্শনী বা ব্যান্ডপার্টিসহ মিছিল করে শিল্পপ্রদর্শনী কিন্তু একমাত্র কলকাতাতেই সম্ভব। এ দুয়েরই পথপ্রদর্শক ছিল কিন্তু বাংলা বর্ণমালার খোদাইকার হিসেবে খ্যাত পঞ্চানন কর্মকারের বংশধর, আমাদের বন্ধু, বর্তমানে বিশ্বখ্যাত শিল্পী প্রকাশ কর্মকার। আর কবিতা নিয়ে গর্ব করার মতো একসময়কার সাহিত্য-সংস্কৃতির রাজধানী শহর কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের জন্মভূমি এবং জন্মভিটে কলকাতা আর জোড়াসাঁকো ছাড়া আর কোথায় হতে পারে? আমিও খানিকটা থিতু হয়ে ভিড়ে গেলাম কবিদের দঙ্গলে। সেখানে কে কোথাকার কার কী পরিচয়, বংশপরিচয়ই বা কী—এসব বেশি বিচার-বিবেচনা বা খোঁজাখুঁজির অবকাশ কোথায়।

১৯৬৫ সালে সংখ্যালঘু হিসেবে সরাসরি দাঙ্গার কবলে পড়ার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা আমার জীবনে সেই প্রথম ও শেষ। দাঙ্গা জিনিসটা যে কী, বুঝতে পারলেও সেটা তখন পর্যন্ত ছিল আবছা একটা ব্যাপার। এর আগে দাঙ্গার গল্প পড়েছি। ১৯৪৬ সালে কলকাতার মুসলিম লীগের সেই ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে বা দ্য গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং কবলিত আত্মীয়-স্বজনের গল্প শুনেছি।

সম্পর্কিত এক আত্মীয়া কীভাবে প্রাণ হারিয়েছিলেন তার বীভত্স বিশদ বিবরণ শুনে মনে প্রশ্ন জেগেছিল, মানুষ কী করে অত নৃশংস হতে পারে! মানুষ হয়ে একজন আরেকজনের প্রাণহানি ঘটাতে পারে! আমার কুয়াশাবৃত মনে পারিপার্শ্বিকের প্রভাবে বহু অতিরঞ্জিত বীরত্বগাথাতেও উজ্জীবিত বোধ করতে শুরু করেছিলাম। ধর্ম সম্পর্কে তখনো কোনো স্পষ্ট বোধ বা স্বচ্ছ ধারণা না জন্মালেও একটা ক্রোধসঞ্জাত প্রতিহিংসাপরায়ণতা কেন জানি না কীভাবে কাজ করছিল অবচেতনে। অবশ্য সেটা ছিল খুবই ক্ষণস্থায়ী এবং এক ধরনের অজ্ঞানতার কারণে। তাছাড়া আমার বাল্যকাল কেটেছিল মফস্বল শহর কুমিল্লায়। যেখানে আমরা লেশমাত্র সাম্প্রদায়িকতার নাম-গন্ধ দেখিনি বা টের পাইনি।

বিভাগপূর্বকালে কুমিল্লা ছিল বৃহত্তর ত্রিপুরা জেলার অধীন, যার এক পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে গোমতী নদী। শান্ত প্রকৃতির একটি নিরিবিলি মহকুমা ও জেলাসদর। খ্যাতি ছিল ব্যাংক আর ট্যাংকের শহর হিসেবে। ট্যাংক মানে দিঘিগুলো এখন পর্যন্ত সগৌরবে বর্তমান থাকলেও ব্যাংকের গৌরব কিন্তু বহু আগেই অস্তমিত। আর ব্যাংক মানে রাস্তার এপারে যদি হয় সানরাইজ ব্যাংক তো ওই পারে সানসেট ব্যাংক।

শহর হিসেবে কুমিল্লা খুব বড় একটা কিছু নয়। কিন্তু অন্য নানাবিধ কারণে কুমিল্লার গৌরবের অন্ত নেই। আর ট্যাংকের মধ্যে বিশাল ধর্মসাগর, রাণীর দিঘি যার দুপারের মধ্যে এক পারে নজরুলের দীপ্ত পদচারণা আর প্রণয় উপাখ্যানে মুখরিত। আমি দিককানা বলে উপপদ-এর নিশানায় ভুলভাল করলেও এক পার যে লেখাপড়ার পাড়া অর্থাত্ বিখ্যাত ভিক্টোরিয়া কলেজ, পাশেই আচার্য দীনেশ চন্দ্র সেন খ্যাত স্কুলটির কথা কোনো অবস্থাতেই বিস্মৃত হওয়ার নয়। নীরব-নিভৃতে পড়ে থাকা উজির দিঘি আর শহরের মধ্যবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত নানুয়ার দিঘি তো আমারই শৈশবোত্তর জীবনের প্রণয় মাধুরি আর মাধুর্য মিশানো রঙ্গলীলায় টইটম্বুর হয়ে উপচে পড়ার দশা। সম্ভবত পূর্ববঙ্গে কুমিল্লাই এমন এক শহর যেখানে কিছু পাড়ার নামকরণ দেখলে মনে হবে পেশার নামেই হয়তো এ ধরনের নামের আধিক্য। যেমন মুনসেফ বাড়িতে কোনোও মুনসেফ আদৌ কখনো ছিলেন কি না সে ব্যাপারে সন্দেহ আছে। মৌলবিপাড়াতে কজন মৌলবি আছেন বা ছিলেন তাও সন্দেহের ঊর্ধ্বে নয়। উত্তর চর্থায় অবস্থিত দারোগা বাড়ি নিয়ে অবশ্য সামান্য খটকা থাকলেও অর্থাত্ দারোগা বলতে সচরাচর আমরা বুঝি—সে রকম কোনো পুলিশের দারোগার অস্তিত্ব খুঁজে না পাওয়া গেলেও যে মুনশি রিয়াজউদ্দিনের নামে দারোগা বাড়ির নামকরণ। তিনি ছিলেন একদা ত্রিপুরা মহারাজার আমলে প্রবল ক্ষমতাধর শুল্ক আদায়কারী আবগারির দারোগা। এছাড়া বৈপরীত্যের কথা ধরলেও বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। যেমন ঝাউতলায় কবে কখন কত ঝাউ ছিল কে বলবে। সুপারিতলা, বাদুরতলা সম্পর্কেও ওই একই কথা খাটে।

ছাল-চামড়া তেমনভাবে না থাকলেও ডালপালা আর সিঁদুরবর্ণ লিচুসহ গোটাগাছগুলোকেই জাল দিয়ে ঘিরে রাখা হতো। নওয়াব বাড়ি তো নওয়াব বাড়িই বটে। সৈয়দ বাড়িরও একই দশা। মোগলটুলি, চকবাজার, সম্ভবত একই সময়ের ফসল। কাজির পাড়া, মনোহরপুর, বজ পুর, ঠাকুরপাড়া, শাসনগাছা, রাণীর বাজার, রাজগঞ্জ বাজার, চৌধুরীপাড়া, গাঙচর, কালিয়াজুরি, ছোটরা, দিগম্বরীতলায় দিগম্বরীদের দেখা না গেলেও আহা, কত বড় যে এক বৈশাখী মেলা বসত। রাস্তার মাথায় ছিল কিংবদন্তিপ্রতিম উষা ডাক্তারের চেম্বার। সেকালের এমবিবিএস। কথিত আছে, দূরদূরান্ত থেকে রোগীরা তার কাছে এসে ভিড় জমাতেন তার হাতের নিদান পত্রের জন্য। আর তার তাকানো মানে অতল সমুদ্র নিরীক্ষণ। তার চশমার কাচ দুটি ছিল এতই অতলান্ত, হাতযশ, সাক্ষাত্ ধন্বন্তরিকেও হার মানিয়ে গিয়েছিল।

রাজগঞ্জ থেকে চকবাজারমুখী যাওয়ার পথে ডান হাতে পড়ত সুপারিবাগান, এখানেও সেই একই ব্যাপার। কিছু সুপারিগাছের সমাবেশ দেখা গেলেও নামকরণের মতো সুপারিগাছ সম্মিলনী কোনোকালেই ছিল না। এখন সেখানে অজিত গুহ কলেজ। এখানেই থাকতেন সুদর্শন অরুণবাবু স্যার। অজিত গুহর অগ্রজ। কুমিল্লা ইউসুফ স্কুলে আমার স্যার ছিলেন। আর নানুয়ার দিঘির চার পাড় বরাবরই ছিল অন্তত আমার চোখে চিরন্তন মফস্বল শহরের অন্তরঙ্গ এক রঙিন ছবি। রাণীর দিঘি, উজিরের দিঘি, ধর্মসাগর স্থান মাহাত্ম্যে নিশ্চিতভাবেই স্বকীয়তার দাবিদার। তবে নানুয়ার দিঘির মতো কোনোটাই তেমন উচ্ছল প্রাণচঞ্চল, গৌরবোজ্জ্বল বা রৌদ্রকরোজ্জ্বল ছিল না।

আসলে কুমিল্লা শহরের পাকে পাকে ছড়িয়ে আছে আমার শৈশব, বাল্যকাল।

আর একটি ব্যাপার কুমিল্লা শহরের বেশ জোর গলায় বলার অধিকার আছে—এই একটি মাত্র শহর যেখানে কখনো কোনো সাম্প্রদায়িক উন্মত্ততার প্রকাশ ঘটেনি। সম্ভবত এর দুটি কারণ নির্দেশ করা যেতে পারে। প্রথমত সাংস্কৃতিক শহর হিসেবে কুমিল্লার কৃতকীর্তি। আর দ্বিতীয়ত ব্রিটিশ জামানায় কুমিল্লার বৈপ্লবিক ভূমিকা। সর্বোপরি কুমিল্লার সাংগীতিক উত্তরাধিকার। যেমন রাজগঞ্জ বাজারের অদূরে দারুণ আড্ডাবাজ উচ্চাঙ্গ সংগীতপাগল দরজি কালু সেনকে এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে ধরা যায়। একদিকে সেলাইয়ের মেশিন চালাচ্ছেন দুই হাতে-পায়ে, অন্য দিকে কথার তুবড়ি ফুটছে মুখে। তাও কি আবার উচ্চাঙ্গ সংগীতের যত সব খুঁটিনাটি নিয়ে।

দেশ ভাগের পর পর কুমিল্লা থেকে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনরা সপরিবারে দেশত্যাগ করতে শুরু করে, হয়তো হাতের কাছে আগরতলা ছিল বলেই। আগরতলা আর কুমিল্লার মধ্যে কতটাই বা ফারাক। আমাদের দেবতুল্য স্যারদের মধ্যে হেড মাস্টার প্রখর ব্যক্তিত্বসম্পন্ন সুবর্ণ চৌধুরী—ষাটের দশকের শেষ ভাগে যার দেখা পেয়েছিলাম কলকাতার রাস্তায়, উত্তর কলকাতার শ্যামপুকুর রোডে। আমাকে দেখে স্যারের সে কী বিস্ময় আর আবেগাপ্লুত দশা। অ্যাসিস্ট্যান্ট হেড মাস্টার সুদর্শন রবি বসু, বেশ লম্বা নবযুগ বাবু, অঙ্কের স্যার দেখতে গাট্টা গোট্টা পেটানো শরীরের সুধাংশু বাবু স্যার, বাংলার পরিশীলিত শ্রীকান্ত বাবু স্যার, একান্তভাবে কুমিল্লার মার্কামারা গোবিন্দ বাবু স্যার, যাঁর প্রিয় বুলি ছিল বনটোলা (এক ধরনের বিড়াল) আর দু-আঙুলের পেটের চামড়া ধরে রাম চিমটি। বজ পুরে স্যারের দ্বিতল বাড়িটি এখনো যখন দেখি, বুকটা ছাঁত্ করে ওঠে। যার দ্বিতল বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যেত স্যারের দুই মোটাসোটা কন্যাদের। তবে যখন প্রবলতর রাজনৈতিক-সচেতন কুমিল্লা শহরে অতীন রায়ের মতো যুগপুরুষের জায়গায় বগা মিআ ছগা মিআরা আসতে লাগল, তখনই মনে হয়েছিল কুমিল্লার শেষ ঘণ্টা অর্থাত্ বারোটা বুঝি এইবার বাজতে চলল।

এই পাতার আরো খবর -
font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেছেন, 'রাজনৈতিক দল হিসাবে কর্মকাণ্ড করার কোনো অধিকার জামায়াত রাখে না।' আপনিও কি তাই মনে করেন?
8 + 3 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
অক্টোবর - ১৯
ফজর৪:৪২
যোহর১১:৪৪
আসর৩:৫২
মাগরিব৫:৩৩
এশা৬:৪৪
সূর্যোদয় - ৫:৫৭সূর্যাস্ত - ০৫:২৮
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :