The Daily Ittefaq
ঢাকা, সোমবার ০৫ আগস্ট ২০১৩, ২১ শ্রাবণ ১৪২০ এবং ২৬ রামাযান ১৪৩৪
সর্বশেষ সংবাদ হাইকোর্টের রায় বহাল; নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না জামায়াত | আপিল করেছেন গোলাম আযম | অষ্টম মজুরি বোর্ডের সুপারিশে মন্ত্রিসভার একমত

বড় গল্প

সরকারবাড়ি

ময়ুখ চৌধুরী

পড়তে পড়তে খানিক বাদে টের পেলেন, এটা পুরোনো পত্রিকা। ফ্যান চলছিল। কোনো রকমে সেটা গুটিয়ে বালিশের পাশে রেখে দিলেন। তখনও কোনাগুলো পতপত করছে। যেন সদ্য উড়তে শেখা কবুতরছানা।

কড়িকাঠে তারপিনমাজা বেড়ার সিলিং। সেখানে কবুতর বাসা বেঁধেছিল। এখনও দুই-একজোড়া থাকতে পারে। চড়ুইপাখির কিচিরমিচিরও শোনা যায়। নকুলেশ্বর তাড়িয়ে দিতে চেয়েছিল। কত্তাবাবুর অসুবিধে হতে পারে ভেবে ফাঁকফোঁকররগুলোও বন্ধ করে দিতে চেয়েছে। কিন্তু কালীপদ সরকার বলেছিলেন, 'না, থাক ওগুলো।'

দোতলার বিশাল খাসকামরায় শুয়ে শুয়ে সময় কাটান কালীপদ। একা। তাই প্রাণের শব্দ পেলে ভালোই লাগে। অনেক ওপর থেকে ঝুলে থাকা ফ্যানের কিচির কিচির শব্দও মন্দ লাগে না। মনে হয়, ডিমফোটা চড়ুইয়ের বাচ্চা।

এ তল্লাটের প্রথম বিজলিপাখা এটাই। অন্যবাড়ির লোক বেড়ানোর ছলে দেখেও গেছে। এ বাতাসের আরামই আলাদা।

কয়েক পুরুষ আগে নাকি ঘোড়ার গাড়িও ছিল, আস্তাবল ছিল। এখন আছে গোয়ালঘর; গোবরের গন্ধ। তা হোক, তবুও এ মহল্লার নাম তাঁদের নামেই।

মুর্শিদকুলি খাঁর 'মালজামিনী' আমল থেকেই নাকি তাঁদের এই ইজারা। হিন্দুদের কাছ থেকে খাজনা উসুল করা সহজ—এই ভেবে হিন্দুরদেরকেই বেশি জমিদারি দেওয়া হতো তখন। সেই সুবাদে আজকের এই স্থায়ী বন্দোবস্ত।

কালীপদের ঠাকুরদা তারিণীমোহন সরকার। তাঁর আমলে ছিল সরকারবাড়ির রমরমা অবস্থা। দ্বিতীয়পক্ষের পরিবারও ছিল বিশাল—পেছনের পুকুরের উত্তরদিকে নতুন ভিটে। সবমিলিয়ে অনেক লোকজন। অনেক আসা-যাওয়া, খানাপিনা, আনন্দ উত্সব—সবই ছিল। এমনকি, বাড়ির চাকরবাকরদের বিয়ে করিয়ে ঠাঁই দেওয়া, তাও ছিল।

কিন্তু কালীপদ, তাঁর চোখের সামনেই সরকার-বংশের জমিদারি বেলুনের মতো চুপসে যেতে দেখেছেন। সেই ভাঙন ঠেকানোর প্রাণপণ চেষ্টা করেছিলেন ভবানীচরণ সরকার—কালীপদের স্বর্গত পিতা।

এখন তিনি দাঁড়িয়ে আছেন খড়খড়িওয়ালা বিশাল দরজার ওপরে। ধুতির ওপর গাঢ় ছাই-রঙের আচকান। হাতে রুপালি হাতলের লাঠি। ওপরের দিকে পাকানো অনমনীয় গোঁফ, সেই সঙ্গে আভিজাত্যের হাসি, তীক্ষ দৃষ্টি। যেন তাঁর চোখের সামনে থরথর করছে গোটা সরকারবাড়ি, আর তার বাসিন্দারা। প্রতিদিন সেই ছবিতে মালা চড়ানো হয়। প্রতিদিন কালীপদ হাতজোড় করে মাথা নোয়ায়।

দুই

একসময়, ব্রিটিশদের হাতের মুঠো আস্তে আস্তে শিথিল হয়ে পড়ছিল। যদিও যুদ্ধবিজয়ী, তার চেয়েও বেশি রণক্লান্ত । এ দেশ ছেড়ে যাবে ওরা, নানা রকম প্রস্তুতি চলছে।

অন্যদিকে, স্বাধীনতাকামী দুই সম্প্রদায় হৈ-হল্লায় মেতে উঠেছে। হানাহানির খবরও পাওয়া যাচ্ছে। হিন্দু-মহাসভার সভাপতি শ্যামাপ্রসাদের বক্তব্য কারও কারও কানে পৌঁছে গেছে। তাদের ধারণা—মুসলমানের দেশে হিন্দুরা থাকতে পারবে না।

কয়েকদিন বাদে বাদে কোনো না কোনো বাড়ির লোকজন পাড়ি জমাচ্ছে। দাঙ্গাপীড়িত মুসলমানরাও চলে আসছে এদিকে। রংপুরে, সৈয়দপুরে, বা অন্য কোথাও। বেশিরভাগ বিহারের মজফফরপুর-রাণীগঞ্জ থেকে। মুর্শিদাবাদ, বর্ধমান, চব্বিশ পরগনা থেকেও লোক আসছে।

নানা রকম গুজব পেট্রলের আগুনের মতো ছড়াচ্ছে। কান থেকে কানে—মনে। ঘটনার চেয়ে রটনার শক্তি বেশি। এর ফলে, লুকিয়ে লুকিয়ে জমিজমা বিক্রিবাট্টা শুরু হয়ে গেল। কোনো শলাপরামর্শ ছাড়াই, জ্যাঠতুত-খুড়তুতরা চলে গেল। এমনকি ভবানীচরণের আপন ভাই—সেও!

একদিন সকালবেলা। কাউকে কিছু না জানিয়ে ভবানীচরণ বেরিয়ে পড়লেন। কাঁধে ঝোলানো চটের থলে। ডানহাতে রুপালি হাতলের লাঠি। কাউকে কিছু বললেন না। যারা দেখেছে, তারা দেখেছে কেবল, কিছু জিজ্ঞেস করবার সাহস দেখাতে পারেনি।

তখন খাসনফর ছিল সত্যব্রত। সেও কিছু জানে না। একমাত্র ভরসা শ্যাম, মানে শ্যামাপদ, এ বাড়ির বড় নাতি। বয়স পাঁচের দিকে। পুত্রবধূ সরমা তার দু-বাহু ধরে বলল, 'হ্যাঁ রে শ্যাম, গুড়ের সন্দেশ খাবি?'

শ্যাম সন্দেহভরা বড় বড় চোখে বলল, 'দাও।'

'আগে বল তো, তোর ঠাকুরদা কোথায় গেছেন?'

'আগে সন্দেশ দাও।'

'দেব, দেব; দুটি দেব। এখন বল তো, কোথায় গেছেন?'

'আমার জন্যে খেলনা আনতে গেছে।'

'কোথায় গেছেন ?'

'হাত ছাড়ো।'

'বলবি না ?'

'জানি না।' সন্দেশের আশা ছেড়ে দিয়ে ফড়িঙের খোঁজে পুকুরের দিকে চলে গেল শ্যাম।

সকাল গড়িয়ে দুপুর। দুপুর গড়িয়ে বিকেল। বেলা যত গড়াচ্ছে, ততই বাড়ছে নানা রকম দুশ্চিন্তা, অশুভ আশঙ্কা। সকলের চোখেমুখে নীরব অস্থিরতা, যোগাযোগহীন অস্বস্তি। আর কিছুক্ষণ বাদে সন্ধ্যা নামবে। কিন্তু সন্ধ্যার আগেই, ঘোড়ার গাড়ি থেকে নামলেন ভবানীচরণ।

ঘোড়ার খুরের ফিরতি শব্দ আস্তে আস্তে মিলিয়ে যাচ্ছে। সত্যব্রত দৌড়ে গিয়ে চটের থলেটা সামলে নিতে গেল। ভবানীচরণ লাঠির ইশারায় তফাত যেতে বললেন। ঘরে না ঢুকে, বিশাল বাড়িটার চারপাশে চক্কর কাটতে শুরু করেছেন। চোখে-মুখে দুর্বোধ্য উত্ফুল্লতা। কাছে ঘেঁষবার সাহস নেই কারও। কেবল শ্যাম অল্প একটু দূরত্ব বজায় রেখে পেছনে পেছনে ঘুরছে। বড় বড় চোখ মেলে ঠাকুরদার থলের দিকে তাকিয়ে।

বাড়ির নিচের অংশটা পাকা। ওপরে টিনের ছাউনি। সামনের দিকে একটা অংশ দোতলা। খড়খড়ি দেওয়া বিশাল পাল্লার খিড়কি। দেয়ালের বেশ কয়েক জায়গায় শ্যাওলা। কার্নিশে অশ্বত্থের পাতাও দেখা যাচ্ছে। ওদিকেই তাকিয়ে থাকলেন কিছুক্ষণ। মুখের ভেতর থেকে আঙুল বের করে শ্যাম বলল, 'ঠাকুদ্দা, ওখানে ইয়া বড় একটা সাপ দেখেছি একদিন।'

'তাই নাকি! কে তাড়াল? তুমি?'

'কেউ না। অমনি অমনি চলে গেল। সত্যিদা বলেছে।'

'হুম। ...গাছটার নাম কী, বলো তো?

'অশত্ত।'

তিন

নিচের তলায় কেউ কেউ হঠাত্ চমকে উঠল। দোতলার খাসকামরা থেকে অপরিচিত শব্দ ভেসে আসছে। ওই ঘরে ভবানীচরণ একাই থাকেন। পাশের কামরাটা খালি, তালা মারা। সেই বন্ধ কামরার দরজার ওপর দেয়ালে পেরেক ঠুকছেন তিনি।

'কত্তাবাবু আমাকে দিন।' সত্যব্রতের কণ্ঠ।

'না।' একটু থেমে ভবানীচরণ বললেন, 'তুই যা তো, সবাইকে আসতে বল।'

সত্যব্রত নিঃশব্দে নেমে গেল।

একটু বাদে চা-সন্দেশ নিয়ে উঠে এল সরমা—বড় ছেলের বউ।

'বাবা।'

'টেবিলে রাখো।'

ছবি-টাঙানোর কাজ শেষ। উদ্বৃত্ত পেরেক, হাতুড়ি, সুতলি বালতিতে রাখলেন ভবানীচরণ। তারপর পা দিয়ে ঠেলা মারলেন খাটের তলায়। হাততালি দেওয়ার মতো করে হাত ঝাড়লেন। চোখে-মুখে অন্য রকম তৃপ্তি, এরপর ছবিটার দিকে মুখ করে বসলেন তিনি। দোলনাচেয়ারে দুলতে দুলতে সন্দেশ খেতে লাগলেন।

'শ্যামকে দিয়েছ?'

'ও তো বাবা, সারাদিনই খায়।'

ততক্ষণে দোতলার ঘরটা ভরে গেছে। যারা ওপরে আসতে পারে না, খরগোশের মতো উত্কর্ণ হয়ে আছে—দোতলায় কী হচ্ছে না হচ্ছে।

চায়ের কাপটা পিরিচের ওপর নামিয়ে রাখলেন। ওটা প্রথম শব্দ। এর পর ভবানীচরণের কণ্ঠ 'সত্য।'

'আজ্ঞে কত্তাবাবু।'

'শহরে গিয়েছিলাম।' একটু বিরতি নিয়ে আবার বলতে লাগলেন, 'আমি ভাবতাম, আমরাই বুঝি মুখ্যসুখ্য মানুষ। ...আমাকে কী জিজ্ঞেস করল জানিস—তা মশাই, আপনাদের ওখানে কজন হিন্দু মরল? আমিও বললাম, অনেক। গত বছরের আগের বছর ওলাওঠায় মরল জনাবিশেক। গত বছর সাপে কাটল দুজনকে। কালাজ্বরে মরল আমাদের সত্যব্রতের বউ।' এটকুু বলেই অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন ভবানীচরণ। সে হাসিতে তীক্ষ শ্লেষ।

'নে, নে, একটু তামাক সাজিয়ে দে; মিঠেকড়া তামাক, বকশির হাট থেকে এনেছি।'

'ঠাকুদ্দা, আমার খেলনা?' —শ্যাম ঠিকই মনে রেখেছে।

'ওহেহা, তাই তো !'

মায়ের হাত ছাড়িয়ে শ্যাম কাছে গেল। ভবানীচরণ থলে হাতড়ে বের করলেন টিনের একটা রেলগাড়ি—সঙ্গে তার দিয়ে বেঁধে রাখা একটা বগিও। শ্যাম মেঝেতে উপুড় হয়ে রেলগাড়িটা হাত দিয়ে চালাতে লাগল। টাঙানো ছবিটার দিকে তাকিয়ে ভবানীচরণ মৃদু মৃদু দুলছেন। এই মুহূর্তে শ্যামের ঝিকঝিক শব্দ ছাড়া আর কোনা শব্দ নেই। বাড়ির সীমানার সুপারিগাছগুলোর মতো দাঁড়িয়ে আছে এক-একজন।

তামাক সাজানো শেষ। দস্তার পাত্রের তামাকজল আগেই পালেক্ষ রাখা হয়েছে। খানিক তফাত থেকে তামাকের নলটা টেনে অতিযত্নে কর্তাবাবুর হাতে ধরিয়ে দিল সত্যব্রত। তারপর দূরে বসে ছিলিমের টিকায় ফুঁ দিতে লাগল সে।

ঠোঁটে নল চেপে প্রথমে ছোট ছোট দু-তিনটে টান, তারপর লম্বা একটা। প্রতিটি টানই যেন নীরব শ্রোতাদের হূিপণ্ডের প্রতিধ্বনি।

'সত্যব্রত!' গুরুগম্ভীর আওয়াজ।

'আজ্ঞে, কত্তাবাবু।' কাছে এসে দাঁড়াল সত্যব্রত। ভবানীচরণ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন ছবিটার দিকে। প্রশস্ত ফ্রেমের মধ্যে বেমানান রকম ছোট ছবি। ছবিতে তিনি এবং তাঁর স্বর্গীয় পত্নী স্নেহলতা। সত্যব্রতের দিকে না তাকিয়েই সবাইকে শোনানোর মতো করে বললেন, 'হাজারী গলি থেকে বাঁধিয়ে এনেছি।' হঠাত্, সরমার দিকে তাকিয়ে বললেন, 'কেমন লাগছে, বউমা?'

আকস্মিক প্রশ্নে সরমা অপ্রস্তুত কণ্ঠে বলে ফেলল, 'সুন্দর'। একটা ঢোক গিলে তারপর বলল, 'বাবা, বাঁ-দিকে একটু কাত হয়ে আছে না?'

'তাই নাকি ! এতক্ষণ তো আমি খেয়ালই করিনি !' ভবানীচরণের কণ্ঠ যেন নরম হয়ে আসছে।

বড় ছেলে রমাপদ এতক্ষণ কথা বলার সুযোগ খুঁজছিলেন। ব্যস্তভাব দেখিয়ে বললেন, 'বাবা, আমি ঠিক করে দিচ্ছি।'

' না, তুমি না।' এরপরই কণ্ঠস্বর আবার নরম, 'বউমা, তুমি যাও তো, পেছনের পুকুরপাড়ে অনেক বকুল ঝরে আছে; রাত অব্দি ঝরবে। তুমি চট করে একটা মালা গেঁথে আনো। তারপর ছবিটা সোজা করে দিয়ো।'

সরমা ব্যস্ততার সঙ্গে বেরিয়ে গেল। ভবানীচরণ দুলছেন। ইশারায় নাতিকে কাছে ডাকলেন, কোলে চড়িয়ে আস্তে আস্তে দুলতে লাগলেন।

'বল তো শ্যাম, ছবিটাতে কে কে আছে?'

'তুমি।'

'আর?'

'তোমার বউমা।' ফিক করে হেসে দিল শ্যাম। অন্যদের মুখেও হাসির আভাস। কিন্তু, ভবানীচরণের মুখ কালো। গম্ভীর কণ্ঠে তিনি বললেন, 'ঠাকুরমা বলে কিছু আছে, তোমাকে শেখায়নি কেউ!' কথাটা সরাসরি বিদ্ধ করল রমাপদকে। অন্যেরাও মাথা নিচু করে থাকল।

মালার সঙ্গে পুজোর থালাও নিয়ে এসেছে সরমা। একটা জলচৌকি আর একটা উঁচু চৌকি দিয়ে গেল কাজের ছেলে। শ্যাম ঠাকুরদার কোল থেকে নেমে গিয়ে দেখছে—মা কী করছে। ছবির কাচে একটা তুলসীপাতা লেপ্টে দিয়ে মালা পরানো হলো। তারপরে থালাটা কপালে ঠেকিয়ে নেমে পড়ল সরমা। রাঁধুনি মাসি গলা টান করে কী যেন বলতে এসেছিল। সরমার চোখের ইশারা বুঝে অদৃশ্য হয়ে গেল। ধোঁয়ায় ঘরটা আচ্ছন্ন। দুই-একটা কাশি দিয়ে গলাটা পরিষ্কার করে নিলেন ভবানীচরণ।

'শহরে গিয়েছিলাম, এটা তো জানলে। ছবি বাঁধাই করে এনেছি। তামাক কিনেছি; আরও কিছু টুকিটাকি। জমিজমার দলিলপত্র হালনাগাদ করিয়েছি। দাখিলা হিসাবপত্রও খতিয়ে এনেছি। আশপাশের জমির কবালা ঠিকঠাক কি না, তাও দেখে এসেছি। ...ভালো কথা, আমার ভাই মানে তোদের প্রিয় কাকামণির কোনো খবর জানিস?'

এ জাতীয় প্রশ্নে ভবানীচরণের সামনে চুপ থাকাটই নিয়ম। দোলনা-চেয়ারটার গতি বেড়ে যাচ্ছে।

'বলেছিল, বউবাচ্চা নিয়ে কলকাতায় বেড়াতে যাচ্ছে। ...বেড়ানো! চার বছরেও তার বেড়ানো শেষ হলো না! কীসের কি কলকাতা! কলকাতা থেকে পঁচিশ মাইল দূরে বজবজে পড়ে আছে... বজবজ। নামের কী ছিরি! সেখানে, মামা-শ্বশুরের মুদির দোকানে ক্যাশ-বাকশো পাহারা দেয়। বাহ !... মুসলমানের দেশের জমিদারের ছেলে—হিন্দুস্থানে গিয়ে কেরানি। এই না হলে তারিণীমোহনের সুপুত্র ! ছিঃ!'

আবার লম্বা একটা টান। আরও ধোঁয়া। দোলনা থামল। ভবানীচরণ বলে যাচ্ছেন, 'আমাকে একটা পোস্টকার্ড পাঠিয়েছিল। সামনে—পুজোর বিসর্জনে আসবে।' দাঁতে দাঁত ঘষে স্বগতোক্তির মতো উচ্চারণ করলেন, 'বিসর্জন! ...আমি সাফ না করে দিয়েছি। টেলিগ্রাম পাঠিয়ে দিয়েছি—মায়ের পুজোতে যে নেই, বিসর্জনেও তার কোনো অধিকার নেই। ...সত্য!'

'আজ্ঞে, কত্তাবাবু।'

'আরেক কাপ চা দিতে বলো।'

শ্যাম হামাগুড়ি দিতে দিতে ট্রেন চালাচ্ছে, 'ঝিকঝিক বনগাঁ, ঝিকঝিক বনগাঁ।' ভুরু কুঁচকে ওদিকে তাকালেন ভবানীচরণ তারপর গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, 'ওকে বনগাঁ নামটা কে শিখিয়েছে?' ভবানীচরণের কপাল কোঁচকানো। কারও মুখ দিয়ে কথা সরছে না। আবার নরমকণ্ঠে তিনি বলতে শুরু করলেন, 'সামনের দিঘির পুবপাড়ে বটগাছটা দেখেছ? কেমন ঝাঁকড়া হয়ে উঠেছে! অন্য জাতের পাখিও দেখলাম। বাসুকীর ভাইকেও দেখলাম—তক্ষক। গাছটা লাগিয়েছিলেন আমার স্বর্গত পিতা শ্রী তারিণীমোহন সরকার। বলেছিলেন, এই গাছ একদিন ভরে উঠবে, অনেক ডালপালা ছড়াবে। এই বটগাছটা ভিটেমাটির সাক্ষী হয়ে থাকবে।' ততক্ষণে চা এসে গেছে। একটা চুমুক দিয়ে সরমার দিকে তাকিয়ে বললেন, 'বুঝলে? আরেকটু বড় হলে তোমার ছেলেমেয়েরা বটের ঝুরির দোলনা সাজাবে, দুলবে—আমি বারান্দায় বসে বসে দেখব। ভালো কথা, তার আগে ওখানে একবার পুজো দিয়ো।'

রমাপদ এবার মিনমিন করে কী যেন বলতে চাইল। হঠাত্ প্রচণ্ড শব্দে লাঠি ঠুকে উঠে দাঁড়ালেন ভবানীচরণ। আবার আস্তে আস্তে বসে পড়লেন। শ্যামের রেলগাড়ি থেমে গেছে। পরপর লম্বা কয়েকটা শ্বাস নিলেন ভবানীচরণ, ভুরু কুঁচকে বলেলেন, 'তার মানে, নিজেকে বাঁচাবার জন্যে তুই পালাবি! ...আমাদের ফেলে? তোর মা, তোর পূর্বপুরুষদের ফেলে? এ জন্য তোকে লেখাপড়া শিখিয়েছিলাম, ওকালতি পাস করিয়েছিলাম? আরে, যাদের বদৌলতে সরকার-পদবিটা লেজে বেঁধে জাতে উঠলি, তাদের ভয়ে সরকারবাড়ি ছেড়ে যেতে চাস! কী?'

ভবানীচরণের চোখ দুটো আহত চিতার মতো জ্বল জ্বল করছে। যে-কারওরই ভয় লাগার কথা। কিন্তু, মেজ ছেলে কালীপদ দেখল, স্বয়ং ভবানীচরণের চোখেই যেন দুর্বোধ্য এক ভয়।

হুকোতে টান চলছে। সারা ঘর ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। কালীপদের মনে হলো, ক্রমশ সকলের মুখ অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

চার

বেঁচে থাকতেই ভবানীচরণ মেয়ে দুটোর বিয়ে দিয়ে গেছেন। বড়টি আগরতলায়। বছরে-দুই বছরে একবার আসত। ছোট মেয়ে জামসেদপুর। বাবার মৃত্যুর পরেও আসতে পারেনি।

শ্রাদ্ধের মাসখানেকের মধ্যেই, একদিন ঘোড়ার গাড়ি এল। সপরিবারে চলে গেল রমাপদ উকিল। সঙ্গে ছোট ভাই উমাপদকেও ভিড়িয়ে নিল। কলকাতায় লেখাপড়া করানোর জন্যেই নাকি তাকে নেওয়া। এও বলা হলো, সে ফিরে আসবে। কিন্তু আর আসেনি।

আর কালীপদ, পূর্বপুরুষদের ভিটেমাটি আঁকড়ে এখনও পড়ে আছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় একমাত্র ছেলেকে বড় পিসির কাছে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। নিজে যাননি, মালি সেজে পড়ে থাকলেন।

স্বাধীনতার পরে, বটতলায় ঘটা করে পুজো দিলেন, অষ্টপ্রহর কীর্তন করালেন। প্রচুর লোকজন খাওয়ালেন। মুসলিমপাড়ার লোকজনও এসেছিল, আনন্দ করেছিল। কিন্তু সেই আনন্দ অর্থহীন হয়ে গেল একমাত্র পুত্রের অনুপস্থিতিতে। ভবানীচরণের মতো কালীপদও বুঝতে পারলেন—একা হওয়া কী জিনিস!

পাঁচ

প্রয়োজন নেই, তবু কালীপদ এখন সেই লাঠিটা সারাক্ষণ নিজের সঙ্গে রাখেন। রুপালি হাতলের সেই লাঠিটা। অকারণে ঠকঠক করে বাড়ির শব্দহীনতাকে শাসন করেন। সকালে-বিকালে সারা বাড়ি চক্কর দেন। এটা-ওটা পরখ করেন।

ছাউনির তলায় অনেক ঝুলকালি। সেখানে লেগে আছে উড়ে যাওয়া পায়রার কয়েকটা হালকা পালক। একটু বাতাসেই ঘুরতে থাকে, উড়তে থাকে।

হঠাত্ চোখ গেল সামনের দিঘির পুবপাড়ে, বটগাছের দিকে। দুটি অসমান ঝুরিকে একত্র করে দোল খেতে চাইছে একটি মেয়ে। বয়স পাঁচ কি ছয়। অল্প নেমে আসা ঝুরিটাকে নাগালে আনবার জন্যে লাফাচ্ছে। নাগাল না পেয়ে লম্বা ঝুরিটা ধরে এলোমেলো দোল খাচ্ছে, ঘুরপাক খাচ্ছে।

মুহূর্তের জন্যে ভবানীচরণের চাওয়াটুকু মনে পড়ল। বিরান বাড়িতে এই সজীব মেয়েটি কে? নকুলেশ্বর বলতে পারবে। নকুলকে ডাকতে হলো না। তার আগেই সে এসে গেছে, 'কত্তাবাবু, চা-কচুরি তৈরি। এখানে নিয়ে আসব?'

'না। দোতলার বারান্দায় নিয়ে যা। আমি আসছি।' মনিবের দৃষ্টি অনুসরণ করে নকুল বলল, 'ও আমার মেয়ে, লক্ষ্মীরাণী। বিয়ের অনেককাল বাদে জন্মেছিল। কিন্তু জন্মের পর মাকে ভালো করে দেখতেও পায়নি, অন্নপিসি মানুষ করল বলে।'

'ও সাঁতার জানে?'

'তা জানে বৈকি।'

'কালই রশি জোগাড় করে একটা দোলনা বানিয়ে দে।'

লক্ষ্মীকে আগেও হয়তো দেখে থাকবেন তিনি। কিন্তু তারিণীমোহনের বটগাছে দুলতে দেখেই বিশেষভাবে চোখে পড়ল। দোতলায় উঠতে উঠতে আবার ভবানীচরণের কথা মনে পড়ছে। নকুলেশ্বরকে বিয়ে করিয়েছিলেন তিনি। নকুল যে এই বাড়ির চাকরবাকরদেরই একজন, সেটা বুঝতে অনেকের অনেকদিন লেগেছিল। কালীপদ ছাড়া, একমাত্র নকুল—যে কিনা এ বাড়ি ছেড়ে যায়নি, এখনও আছে।

একটা সময়, কালীপদকে সে 'মেঝ কত্তা' বলে ডাকত। এখন শুধু 'কত্তাবাবু' বলে। এটাকে দোষ বলা যায় না। দীর্ঘকাল ধরে সে দেখে আসছে। বড় কত্তা নেই, ছোট কত্তা নেই—আছেন কেবল কালীপদ সরকার। হয়তো প্রাপ্য মর্যাদাটুকুই সে দিতে চেয়েছে। কিন্তু বারবারই বেশি করে বেজে উঠেছে কালীপদের একাকিত্ব।

একা থাকলে, উল্টাপাল্টা চিন্তা মাথায় ভর করে। সরকারবাড়িকে মনে হয়, বাড়ি নয়, বিশাল এক হাহাকার। এ জন্যেই এ বাড়ির মেয়েমানুষগুলো বেশি দিন বাঁচে না, পুরুষগুলো বেশি দিন থাকে না। ভবানীচরণের অনেক আগে মারা গেলেন স্নেহলতা। কালীপদের বউ কুন্তিরাণী—বিবাহিত জীবনের মাত্র বারো বছরের মাথায় সেও চলে গেল। গিয়েছিল বাপের বাড়ি বেড়াতে—মুরাদনগর থানার রামচন্দ্রপুর গ্রামে। কিন্তু এপ্রিলের ঘূর্ণিঝড়ে সব শেষ। হাহাকার ভাগাভাগি করার বদলে হাহাকার বাড়িয়ে দিয়ে গেছে।

একমাত্র ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে কালীপদ আর বিয়ে করেননি। অথচ আজ, কথা বলার জন্যে পাশে কেউ নেই।

স্কুলজীবনের বন্ধু অনিলকান্তি শীল। মাঝেমধ্যে আসেন, খোঁজখবর নেন। ছেলেমেয়েদের কথা জানতে চাইলেই কালীপদ দাবার ছক পেতে বসেন। প্রায়াই হেরে যান। অনিলকান্তি বলেন, 'এ তো ডেসপারেট হলে কি চলে?'

'কিন্তু শেষ পর্যন্ত তো লড়ে যাই। না কি?'

'তাই তো দেখি।'

মাঝেমধ্যে কালীপদও বন্ধুর বাড়িতে যান। অবস্থাসম্পন্ন না হলেও বাড়িটা বেশ জমজমাট। কালীপদের ভালো লাগে। ভেতরে ভেতরে খারাপও লাগে।

ফেরার সময় ফটকের গোড়ায় দেখলেন লক্ষ্মীকে। পাতার ওপর বসে থাকা একটা ফড়িং ধরবার জন্যে একাগ্রভাবে এগোচ্ছে। হঠাত্ ফড়িংটা উড়ে গেল।

'এই যাহ।' লক্ষ্মী উঠে দাঁড়াল। টানাটানা কালো চোখ, একই সঙ্গে করুণ এবং করুণায় ভরা।

কালীপদ মিষ্টি হেসে বললেন, 'তোমার নাম লক্ষ্মী?'

'না। আমার নাম লক্ষ্মীরাণী।'

তেড়ে এল নকুলেশ্বর, 'ছিঃ লক্ষ্মী! এভাবে বলে না।'

'থাক নকুল।' আবার মিষ্টিস্বরে কালীপদ বললেন, 'কালকে দোলনায় চড়লে না যে? ভালো লাগে না ?'

'লাগে। কালকে যে লক্ষ্মীবার ছিল; অন্নপিসি মন্ত্র শেখাচ্ছিল, তাই...।'

কালীপদের ভালোই লাগছিল। তিনি বললেন, 'দেখি একটা মন্ত্র শোনাও তো।'

'ভবসাগরতারণ কারণ হে, গুরুদেব দয়া করো দীনজনে।' বলেই সে দৌড় দিল দোলনার দিকে।

ছয়

একটু আগেই দোতলার ঘরে তাঁকে দেখা গেছে। কিন্তু, চা নিয়ে এসে নকুলেশ্বর দেখল, তিনি নেই। বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াতেই সে হতভম্ব হয়ে গেল, নিজের চোখ দুটোকে বিশ্বাস করতে পারছে না। দোলনায় দুলতে দুলতে খিলখিল করে হাসছে লক্ষ্মী। আর অনুগতের মতো কালীপদ সরকার দোলনায় ধাক্কা দিয়ে যাচ্ছেন। আনন্দে, কৃতজ্ঞতায় নকুলেশ্বরের চোখ ঝাপসা হয়ে এলো।

এরপর আরেক দিন, নকুলেশ্বর তো রীতিমতো ভয় পেয়ে গিয়েছিল। চায়ের রেকাবটা বাপের হাত থেকে নিয়ে লক্ষ্মী সিঁড়ি বেয়ে তরতর করে উঠে গেল। পেছনে পেছনে সেও। দোলনা-চেয়ারে বসে দুলছিলেন কালীপদ সরকার। পাশের মর্মর-টেবিলে ঝন করে থালাটা নামিয়ে রেখে লক্ষ্মী হুমুকদারি কণ্ঠে বলল, 'নাও তোমার চা, তাড়াতড়ি শেষ করো, দোল খেতে যাবো।'

'ঠিক আছে, ঠিক আছে।' নকুলেশ্বরের দিকে একটু তাকিয়ে, মুচকি হেসে লক্ষ্মীকে বললেন, 'আচ্ছা লক্ষ্মী...।'

'লক্ষ্মী না, লক্ষ্মীরাণী।'

'আচ্ছা, লক্ষ্মীরাণী, আমাকে তোমার ভয় করে না ?'

'না।'

'কেন ?' বেশ কৌতুক বোধ করছেন কালীপদ।

'আমার বাবা আছে। তোমার বাবা নেই।'

মুহূর্তের জন্যে কালীপদ চুপ করে গেলেন। চায়ের কাপে পরপর কয়েকটা চুমুক। তারপর আবার হাসি, আবার অনাবিল কণ্ঠ, 'আচ্ছা, আরেকটা কথা—।'

'আহ্। চলো তো, দেরি হয়ে যাচ্ছে।'

'যাচ্ছি, যাচ্ছি। কথাটা হলো, সবাই আমাকে আপনি করে কথা বলে, তুমি কেন তুমি করে বলো ?'

'আমি সব্বাইকে তুমি করে বলি, অন্নপিসিকেও। ওর সবগুলো চুল সাদা।'

'না লক্ষ্মী, এটা ঠিক না। উনি কত্তাবাবু।' ভয়ে ভয়ে মেয়েকে শাসন করল নকুলেশ্বর।

কালীপদ নকুলকে হাত-ইশারা করলেন, 'থাক নকুল, থাক। আমাকে তুমি করে বলার কেউ নেই। একজন থাকা দরকার।'

এরপর থেকে নকুলেশ্বর ভয় পায় না। শুধু অবিশ্বাস্য আনন্দে স্থির হয়ে থাকে। কালীপদও এত দিন যেন জীবিত ছিলেন মাত্র, লক্ষ্মীর নিত্যনতুন উত্পাতে ক্রমশ জীবন্ত হয়ে উঠছেন। যেদিন লক্ষ্মী সামান্য জ্বরে বিছানায় পড়ে থাকল, সেদিন যদি কেউ তাঁকে দেখত! সারাবাড়ি মাথায় তুলে ডাক্তার-কবিরাজ এক করলেন। যেন বিছানায় যে শুয়ে আছে, সে লক্ষ্মী নয়—পার্বতী।

সাত

চায়ের খালি কাপটা নিয়ে নেমে যাচ্ছিল নকুলেশ্বর। ভেবেছিলেন লক্ষ্মীর খবরটুকু নেবেন। তার আগেই দুপদাপ করে উঠে এল লক্ষ্মী। কালীপদকে কোনো কথা বলারই সুযোগ দিল না। তাঁর হাত ধরে টানছে আর বলছে, 'চলো, চলো; তোমাকে একটা জিনিস দেখাই।'

দেখার আগেই আনন্দে উঠে দাঁড়ালেন কালীপদ। সঙ্গে রুপালি হাতলের লাঠি। লাঠির আরেক প্রান্ত ধরে টানতে টানতে লক্ষ্মী এগিয়ে যাচ্ছে। তার অস্থিরতার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছিলেন না কালীপদ। লক্ষ্মীর মুখেরও বিরাম নেই।

'তোমার জানলার নিচে পাকুড় আছে না—পাকুড়?'

'অশ্বত্থ।'

'তুমি কিচ্ছু জানো না, অন্নপিসি বলেছে পাকুড়।'

'হ্যাঁ, হ্যাঁ, পাকুড়। কী হয়েছে ?'

'চলোই না আগে, দেখাচ্ছি।'

টানতে টানতে বটতলা। মাটিতে বসে লক্ষ্মী বলল, 'দেখেছ?'

সত্যি বলতে কী, এর আগে কালীপদের চোখেই পড়েনি! বটের গোড়া বেয়ে লতিয়ে উঠছে অশ্বত্থগাছ। লক্ষ্মী আবার বলতে শুরু করল, 'জানো, পাকুড়টা ওপর থেকে নেমে এসে বিয়ে করেছে! অন্নপিসি বলেছে—এটা সংসারবৃক্ষ। পুজো দিতে হবে।'

কালীপদের মনে হতে লাগল—স্বর্গীয় ভবানীচরণই বুিঝ লক্ষ্মীকে এ বাড়িতে পাঠিয়েছেন !

আট

এখন প্রতিদিন বিকেলে বারান্দায় বসে চা খান কালীপদ। উদাস চোখে তাকিয়ে থাকেন দোলনার দিকে। অনেক বছর হলো দোলনাটা স্থির হয়ে আছে। মাঝেমধ্যে নিচে নামেন তিনি। বটতলায় গিয়ে বসে থাকেন, একা। অশ্বত্থের সবুজে ঢেকে যাচ্ছে বটের শরীর।

একদিন কালীপদ নকুলেশ্বরকে ডাকছিলেন। বেশ কয়েকবার। এক সময় দোতলার দরজায় এসে দাঁড়াল লক্ষ্মী, 'বাবা বাজারে গেছে। কিছু লাগবে?'

কালীপদ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন। চোখ নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে লক্ষ্মী, আশ্চর্য রকমের শান্ত। সত্যিই লক্ষ্মী!

'না থাক। তুমি যাও।'

লক্ষ্মী ধীরপায়ে নেমে গেল। কালীপদ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন বাবার ছবির দিকে। একটা সময় ছিল, ওই ছবি থেকে ছড়িয়ে পড়ত দীপ্ত অহংকার; এখন, কেবল করুণা। বুকে ব্যথা হয়। ঘুমের ঘোরে আঁতকে ওঠেন। আজবাজে স্বপ্ন দেখেন। কয়েকদিন আগে দেখেছেন—ভবানীচরণ দোলনায় দুলছেন, হঠাত্ দোলনা ছিঁড়ে পড়ে গেলেন। দাউ দাউ করে চিতা জ্বলে উঠল বটতলায়।

খুট করে শব্দ হতেই আলো জ্বলে উঠল।

'অন্ধকারে বসে আছেন কত্তাবাবু!' নকুলেশ্বর নীরবতা ভেঙে দিল ।

'কোথায় গিয়েছিলি?'

'আজ্ঞে, আপনাকে বলা হয়নি। লক্ষ্মীর জন্য একটা সম্বন্ধ এসেছিল; কালকে আবার শিবচতুর্দশী কি না।

নয়

খুব ভোরে কালীপদের চিত্কার শুনে ছুটে গেল নকুলেশ্বর। কত্তাবাবু বিছানা থেকে নামতে পারছেন না। বাঁ পা-টা নাড়াতে পারছেন না—অবশ। কাছেই কবিরাজ বাড়ি। অত সকাল সকাল তাঁকেই পাওয়া গেল। প্রথমে গরম জলের পট্টি, কয়েকবারই দেওয়া হলো। কালীপদ আঁচ পেলেন বলে মনে হলো না। সাব্যস্ত হলো—তিনি মলম বানিয়ে দেবেন, সেই মলম লাগিয়ে আস্তে আস্তে মাজতে হবে, টেনে শুকিয়ে এলে আরেকটা মলম, তারপর পানপাতা দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে। পানপাতাটা শুকিয়ে গেলে গরম জল দিয়ে মুছে আবার আগের মতো শুরু করতে হবে। এইভাবে চলতে থাকবে।

ভোর হওয়ার আগেই ঘুম ভেঙে গেল; কালীপদ বিস্মিত হয়ে দেখলেন—পায়ের কাছে খাটে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে লক্ষ্মী।

বিশেষ কোনো উন্নতি না হওয়ায়, এলোপ্যাথি ডাক্তার আনা হলো। তিনি ওষুধ লিখে দিলেন, এই ডাক্তারকে না জানিয়ে ওগুলোর পাশাপাশি মলমটাও চালাাচ্ছিল ওরা। তাতেও অবশতা কাটেনি।

শেষমেশ ডাক্তার ক্র্যাচ ধরিয়ে দিলেন। শুয়ে না থেকে, যতক্ষণ পারেন—তিনি যেন হাঁটবার চেষ্টা করেন। নকুলেশ্বরের উপস্থিতিতে, খাসকামরাতেই খটখট করে কালীপদ তা-ই করতে লাগলেন। কখনো ভয় পেয়ে বসে পড়েন দোলনা-চেয়ারে। তাকিয়ে থাকেন বাঁ-পায়ের দিকে। ভবানীচরণের দাঁড়িয়ে থাকার সঙ্গে নিজের তুলনা করেন। তখন নিজের প্রতি করুণা হয়।

নকুলেশ্বর পায়ের কাছে এসে বলল, 'কত্তাবাবু, একটা কথা ছিল। বলব?'

'কেন বলবি না? বল।'

'বলছিলাম কি, সম্বন্ধটা প্রায় পাকাই। পঞ্জিকামতে সামনের মাসে বেশ কটা শুভদিনও পাওয়া গেছে। কিন্তু...।'

'কিন্তু কী?'

'ওরা আপনার সঙ্গে একটু দেখা করতে চায়।'

'বুঝেছি। ওদের বল, দিনক্ষণ ঠিক করে যেন আসে। বাকি সব আমি দেখব।'

তারপর নিজেকেই যেন শুনিয়ে বললেন, 'আমি আজ সুস্থ থাকলে পার্বতীর মতো করেই ওকে বিয়ে দিতাম।'

আবেগে আর কৃতজ্ঞতায় নকুলেশ্বরের চোখ ভরে এল।

যথালগ্নে, মাথা উঁচু করেই লক্ষ্মীকে সম্প্রদান করা হলো। বিদায়কালে পাত্রপক্ষকে কালীপদ সরকার বললেন, 'এটা কেবল আমার বাড়ি নয়, নকুলেশ্বরেরও। আসা-যাওয়া যেন থাকে।'

ক্র্যাচে ভর করে কালীপদ এখন বারান্দা পর্যন্ত আসতে পারেন। দোলনা-চেয়ারটা টেনে আনে নকুলেশ্বর। ওখানে বসেই চলে বিকেলের চা-নাস্তা। চোখের সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে বটগাছ, তার নিচে শান্ত দোলনা।

ভবানীচরণের মৃত্যুর পর মহামারীর মতো উজাড় হয়ে গিয়েছিল সরকারবাড়ি—সেটা এক রকম। কিন্তু লক্ষ্মী যাওয়ার পরে যে শূন্যতা, সেটা অন্য রকম।

দশ

দু-মাসেরও বেশি, প্যারালিসিসের খবর জানিয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছিল। কলকাতায় ছোটমেয়ের কাছে, আগরতলায় বড়মেয়ের কাছে। পার্বতীর জবাব পাওয়া যায়নি। আর বড় মেয়ের চিঠিটা? সেটা না পেলেই ভালো ছিল। সে লিখেছে, জ্যোতির্ময়কে জানানো সম্ভব নয়। সে এখন লন্ডনে থাকে—মেম বিয়ে করেছে।

কালীপদের মনে হলো, তাঁর বাকি পা-টাও অবশ হয়ে যাচ্ছে। রাগে সমস্ত শরীর থরথর করছে। ছটফট করে এদিকে-ওদিকে তাকাচ্ছেন কালীপদ। ভবানীচরণের দিকে চোখ পড়তেই কুটি কুটি করে ছিঁড়ে ফেললেন চিঠিটা। যেন ভবানীচরণ সেটা পড়ে ফেলবেন!

মাঝরাতে হঠাত্ ঘুম ভেঙে গেল কালীপদের। ঘোরের মধ্যেও তিনি স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছেন—বাড়িতে কেউ যেন হাঁটছে। তাড়াতাড়ি ক্র্যাচে ভর করে দরজা খুললেন। সিঁড়ির সামনে অসহায়ভাবে দাঁড়িয়ে থেকে দেখতে পেলেন—ভবানীচরণ সরকার রুপালি হাতলের লাঠিটা নিয়ে, সদর দরজা খুলে বেরিয়ে যাচ্ছেন। বারান্দায় খানিকক্ষণ থেকে ডাকছেন, 'কই রে, বাড়ির লোকজন কই?'

'বাবা, এই যে, আমি!' কালীপদের গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোচ্ছে না।

'বাকিরা কোথায়?' বলতে বলতে বাড়ির ফটকের দিকে ক্রমশ মিলিয়ে যাচ্ছেন ভবানীচরণ।

'বাবা দাঁড়াও, দাঁড়াও, আমি আসছি...।'

ততক্ষণে নকুলেশ্বর ছুটে এসেছে। সিঁড়ির শেষ ধাপে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছেন কালীপদ। কপাল থেকে রক্ত ঝরছে। অন্নপিসিকে দেখে নকুল কেঁদে ফেলল, 'তাড়াতাড়ি পট্টি জোগাড় করো, জল নিয়ে এসো।'

ঘণ্টাখানেক জল ঢালবার পর আস্তে আস্তে জ্ঞান ফিরতে লাগল। ধরাধরি করে বিছানায় শুইয়ে দিতেই ছটফট করে উঠলেন, 'আমার লাঠি, বাবা, আমার লাঠি।'

নকুলেশ্বর কিছুক্ষণের জন্যে হতবুদ্ধি হয়ে গিয়েছিল, সত্যিই বিছানায় লাঠিটা নেই। আবার কালীপদ আর্তনাদ করে উঠলেন, 'আমার পা, আমার পা, আমি মরে যাচ্ছি...!'

ভোরে ভোরে সেই এলোপ্যাথি ডাক্তারকে নিয়ে এল নকুলেশ্বর। কপালে ব্যান্ডেজ লাগানো হলো। জোর করে ডিম-দুধ-কলা খাওয়ানো হলো, তারপর পেইন-কিলার।

'ডাক্তারবাবু, আমার লাঠি?'

ডাক্তারবাবু বোকা হয়ে গেলেন। অন্নপিসি লাঠিটা তাঁর হাতে ছুঁইয়ে দিল। মশারি তোলার সময় নিচে পাওয়া গেছে।

'ডাক্তারবাবু, আমার পা, আমার পা, আমি মরে যাব।'

'এটা তো সেই পা, যেটা অবশ হয়ে গিয়েছিল !'

বাঁ-পায়ের কবজিতে একটু চাপ দিতেই গলা ফাটিয়ে চিত্কার করে উঠলেন কালীপদ।

ডাক্তারবাবুর মুখে হাসি ফুটে উঠল, 'গুড। গুড সিমট্যাম। আপনার পায়ে সেনসেশন আছে।'

'সেনটেশান কী, ডাক্তারবাবু?' নকুলেশ্বরের উদ্বিগ্ন জিজ্ঞাসা।

ডাক্তারবাবু বললেন, 'সরকার মশাই, আপনি পুণ্যবান, ভাগ্যবান। যে পা-টাকে অবশ, আই মিন, প্যারালাইজড মনে করেছিলাম—ওটা প্যারালাইজড হয়নি। শুধু একটা এক্স-রে করিয়ে আনতে হবে। রিপোর্ট না পাওয়া পর্যন্ত বেডরেস্ট। ওষুধ লিখে দিলাম, সব ভরা পেটে খাবেন'।

সন্ধ্যার দিকে প্রচণ্ড জ্বর এল, প্রলাপ বকতে লাগলেন কালীপদ। মাথার ব্যান্ডেজটা বাঁচিয়ে অবিরাম জল ঢালা শুরু হলো।

কালীপদ বিড়বিড় করছেন, 'বাবা, আমি হেরে যাচ্ছি। বাবা, লাঠি, লাঠি, বাবা... আমি...।'

নকুলেশ্বর আবার ছুটে গেল ডাক্তারের কাছে। ডাক্তার এলেন। তখনও জল ঢালা চলছে। ডাক্তারবাবু দেখলেন, জ্বর পড়ে এসেছে। এখন দুধ-কলা দিয়ে অল্প হলেও ভাত খাওয়ানো দরকার, তারপর এক সঙ্গে দুটো ট্যাবলেট।

পেছনে বালিশ উঁচু করে কোনোমতে কালীপদকে বসানো হলো। খেতে চাইছেন না।

'কত্তাবাবু, হাঁ করো দেখি, আমি লক্ষ্মী বলছি।'

কালীপদ যেন সম্বিত্ ফিরে পেলেন, 'লক্ষ্মীরাণী, তুমি!'

'হ্যাঁ আমি। এখন খাও।'

সুবোধ বালকের মতো খেতে থাকলেন কালীপদ, আর নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেন লক্ষ্মীর দিকে।

পরদিন কালীপদকে শহরে নিয়ে যাওয়া হলো। সঙ্গে সহপাঠী অনিলকান্তি মাস্টার আর নকুলেশ্বর। বাঁ-পায়ে সামান্য ফ্র্যাকচার ধরা পড়েছে। ওখানে প্লাস্টার করা হলো। দিন দশেক হাঁটাচলা বন্ধ।

বিছানায় শুয়ে শুয়ে কয়েক দিনেই অস্থির হয়ে গেলেন কালীপদ। নিজে নিজে নেমে গেলেন। ক্র্যাচে ভর করে জানালার কাছে দাঁড়ালেন। বুক ভরে শ্বাস নিলেন। কিন্তু একটা সময় আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছেন না। অমনি চিত্কার শুরু করে দিলেন। 'নকুল, ও নকুল !'

আঁচলে হাত মুছে তরতর করে উঠে এল লক্ষ্মীরাণী, 'এ কী! তোমাকে নামতে কে বলেছে?'

'আর নামব না, নামব না।' বিছানার দিকে এগোতে চেষ্টা করছেন কালীপদ; ভয়ও পাচ্ছেন, 'আমি পড়ে যাব।'

লক্ষ্মী কাছে গিয়েও থমকে গেল, আলতোভাবে ছুঁয়ে থাকল তাঁকে। কোথায়, কীভাবে ধরবে, বুঝে উঠতে পারছে না।

এগারো

'বাবা, এখন কেমন আছ, বাবা? কিছু মনে করো না বাবা, আসব আসব করেও দেরি হয়ে গেল। বান্টি আগে থেকেই বায়না দিয়ে রেখেছিল, পরীক্ষা শেষে দীঘায় বেড়াতে যাবে—তাই। এখন কেমন আছ, বাবা?'

টুকটুক করে প্রণাম সেরে গড় গড় করে এতগুলো কথা বলে ফেলল পার্বতী। দেরি মানে তিন মাস দেরি! মনের কথা মনে রেখে, পিতা কালীপদ মেয়ের দিকে তাকিয়ে একটু হাসলেন, 'তোর ছেলেমেয়েরা কই? দেখছি না যে!'

'ওদের হাওড়ায় রেখে এসেছি। ...তোমার জামাইবাবু এসেছে।'

এবার শুরু হলো জামাইবাবুর কথা; কথা তো নয়, রীতিমতো জেরা। কবে-কখন-কোথায়-কীভাবে, ডাক্তার কী বলল না বলল, কী ওষুধ দিল, কী হলো না হলো—এন্তার প্রশ্ন। কিছুক্ষণ পরপর চোখ পিট পিট করেন, আর নাকের ডগা থেকে চশমাটা ওপরের দিকে ঠেলেন। হঠাত্ জামাইবাবুর চোখ পালাবদল করে একবার ক্র্যাচের দিকে, আরেকবার লাঠির দিকে পিংপং বলের মতো ছুটছে।

'আপনি লাঠিতেও চলাফেরা করেন নাকি!'

বিরক্তপ্রায় কালীপদের হয়ে নকুলেশ্বরই জবাব দিল, 'না।'

'তাহলে!'

নকুল বলল, 'জামাইবাবু, আপনাদের চা-নাস্তা কি এখানেই নিয়ে আসব?'

'বুঝলে?' এবার স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে উকিলজামাই বলতে লাগলেন, 'এটা নিউরো-প্রবলেম।' আবার শ্বশুরের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, 'আপনরার কি স্ট্রোক করেছিল? মাইল্ড স্ট্রোক?'

'নকুল, বালিশটা উঁচু করে দে তো, একটু বসি।' নকুল বুঝে গেল, কত্তাবাবু ভেতরে ভেতরে চটে যাচ্ছেন। হয়তো রমাপদ উকিলের কথাও তাঁর মনে পড়ছে। কালীপদ কিন্তু মনে মনে গজগজ করছেন, 'ব্যাটা, বিয়ের সময় করত বিমা কোম্পানির দালালি, তখন কি জানতেন ফাঁকেফুঁকে ওকালিত পাশ করে ডাক্তারি ফলাবে!'

'নিশ্চয় স্ট্রোক করেছিল, ঘুমের মধ্যেও হতে পারে। আচ্ছা, আপনার কি বুকে ব্যথা করত?'

'এখনও করে।' খুবই সংযত উত্তর।

কিন্তু ব্যথার মর্মার্থ না বুঝেই স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে জামাইবাবু বিজ্ঞের মতো বললেন, 'দেখলে তো, আমি ঠিকই ধরেছি! ফিজিওথেরাপিস্ট দেখালেই ঠিক হয়ে যাবে। চলো, বাবাকে কলকাতায় নিয়ে যাই। যদ্দিন লাগে লাগুক।'

'না না, কলকাতায় না। এখন ওষুধপত্র খাচ্ছি, দেখা যাক।'

' না না বাবা, তুমি না করো না। আমরা তোমাকে নিয়ে যেতেই এসেছি।' মেয়ের কণ্ঠে আহ্লাদ ঝরে পড়ল।

'কী যে বলিস, বাড়ি-ঘর ফেলে আমি কী করে যাই!'

'এসব কী বলছেন! এখানে আপনার আছে কে?'

জামাইবাবুর এই কথায় কালীপদের মুখ গম্ভীর হয়ে গেল। ক্ষতের ওপর চেপে রাখা তুলোতে টান পড়েছে। চা-নাস্তা এল, ফলমূলে টেবিল ভরা। তারপরও জামাইয়ের মুখ বন্ধ হচ্ছে না।

'এখানকার কত কত লোক জমিজমা সব বিক্রি করে সল্টলেকে বাড়ি বানাচ্ছে, জানেন? অবশ্য, আপনি বললে আমি ব্যবস্থা করে দিতে পারি।'

এতক্ষণে জামাইবাবুর মতলব খোসা ছাড়াতে আরম্ভ করেছে। কালীপদের মাথার শিরা দপদপ করে উঠল। উঁচু বালিশটা ঠেলা মেরে আবার শুয়ে পড়লেন, 'না। আমি কলকাতায় যাব না।'

'চিকিত্সা করাতেও না?'

'না।'

অবস্থা আঁচ করতে পেরে নকুলেশ্বর বলল, 'জামাইবাবু, আপনার স্নানের জল কি গরম করতে হবে ?'

যে ক-দিন ছিল, উকিলের পরামর্শ মোতাবেক প্রতিরাতেই পার্বতী চিড়ে ভেজাবার চেষ্টা করেছে, যাতে সব বিক্রিবাট্টা করে কালীপদ ওদের সেবাযত্ন গ্রহণ করেন।

বারো

যৌতুকের জাদুতে লক্ষ্মীরাণীর দিনকাল ভালোই কাটছিল। কিন্তু যে মেয়ে জন্মের পরেই মাকে হারিয়েছে, তার কপালে অত সুখ সইবে কেন? কয়েক মাসের মাথায়, ট্রাক-দুর্ঘটনায় হুট করে মারা পড়ল স্বামীটা। শ্বশুরবাড়ির লোকজন দূর দূর করে তাড়িয়ে দিল লক্ষ্মীকে। এমনকি, ঝিয়ের টিটকিরিও শুনতে হলো। 'রাক্ষুসী মেয়ে! মাকে খেয়েছে, স্বামীকেও খেল, বাড়িসুদ্ধু লোককে খাবে!' শাশুড়িকে সান্ত্বনা দিতে আসা এক প্রতিবেশীও ফোঁড়ন কেটে গেল। 'নামের কী ছিরি! কোন আহাম্মক জানি রেখেছিল লক্ষ্নী-রা-ণী! আস্ত অপয়া।'

কালীপদের পায়ে আছড়ে পড়ল নকুলেশ্বর। সিঁড়ির নিচে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল লক্ষ্মীরাণী। নকুল কাঁদতে কাঁদতে মেয়েকে টেনে আনল। চেয়ারে বসে থাকা কালীপদ সরকারের পায়ের দিকে প্রায় ধাক্কা দিয়ে ঠেলে দিল লক্ষ্মীকে। বাপ-মেয়ের কান্নায় তাঁর চোখও ঝাপসা হয়ে আসছে। এ রকম মর্মান্তিক পরিস্থিতিতেও কালীপদ অনুভব করছেন—এই বিরান বাড়িতে একজন মানুষ বাড়ল। লক্ষ্মীর ব্যথিত উপস্থিতি অনুকম্পার বিষয় হলেও কালীপদ যেন আবার প্রাণ ফিরে পেতে লাগলেন।

কিন্তু উদ্বিগ্ন নকুলেশ্বর ছুটে গেল লক্ষ্মীর শ্বশুরবাড়িতে। শাশুড়ির পায়ে পড়ে অনেক কান্নাকাটি করল। শাশুড়ি খেঁকিয়ে তাড়িয়ে দিল। যা মুখে আসে তা-ই বলল, বাকি রাখেনি কিছু। 'কোনো কথা শুনতে চাই না। কার না কার বাচ্চা পেটে নিয়েছে, এখন বলছে আমাদের। এত যৌতুক, এত ঘটা করার পেছনে মতলবটা কী! আমরা কিচ্ছু বুঝি না, না? সব বুঝি। ওই পোড়ামুখী যেন না আসে, কেরোসিন ধরিয়ে দেব। যেখানকার মরা, সেখানে গিয়ে মরুক।'

তের

সিঁড়িতে ক্র্যাচের আওয়াজ! দৌড়ে এল নকুশ্বের। এ কী! কত্তাবাবু নিজে নিজেই নেমে এলেন! লক্ষ্মীও দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে।

'কত্তাবাবু, আমাকে ডাকতেন !'

সদর দরজার পরে উন্মুক্ত বারান্দা। দু-দিকে রেলিং, তার কোল ঘেঁষে সারিবদ্ধ টব। প্রায় সবকটাতেই কুশ। একটাতে সাদা নয়নতারা সকালের আলোতে উজ্জ্বল।

'আহ্! এইখানে কতদিন পরে দাঁড়ালাম। কত আলো, কত বাতাস। যে রাতে সিঁড়ি থেকে পড়ে গেলাম, বাবা ঠিক এখানটায় দাঁড়িয়ে সবার খোঁজ করছিলেন। ...এই তো, আমি এসে গেছি, তাই না?'

'আজ্ঞে তা-ই।'

'তবে? কাউকে ডেকে পাঠালে কি এ জায়গাটুকু ওপরে উঠে যেত? কোনো কোনো ক্ষেত্রে নেমে আসতে হয়।'

দরজার কাছে দাঁড়িয়ে লক্ষ্মী। হাতে চায়ের রেকাব। নকুলেশ্বর এক দৌড়ে ভেতর থেকে একটা চেয়ার নিয়ে এল, 'কত্তাবাবু, বসুন।'

'না। একটু দাঁড়াতে দে; দাঁড়ানো দরকার। এ ক-দিন দোতলার বারান্দায় ক্র্যাচে ভর করে দাঁড়িয়েছি। কী মনে হয়েছে, জানিস?'

নকুলেশ্বর ছোট ছেলের মতো দু-দিকে মাথা নাড়ল।

'মনে হয়েছে, বাবা জেনেশুনেই আমার নামটা রেখেছিলেন কালীপদ। ক্র্যাচ নয়, মনে হয়েছে মা কালীর শক্তিতে ভর করেই আমি দাঁড়াতে পারছি। ক্র্যাচের ভেতরকার এই শক্তি আমি নিয়ে নেব। আর, আমার ওপর ভর করে দাঁড়িয়ে থাকবে এই সরকারবাড়ি।'

বাপ-মেয়ে দুজনেই হাঁ করে শুনছে কেবল। কোনো কথা না পেয়ে নকুলেশ্বর বলল, 'কত্তাবাবু, আপনার চা জুড়িয়ে যাচ্ছে।'

'ও তাই? তা হলে তো একটু বসতে হয়।' বসতে গিয়ে খানিকটা কসরত করতে হলো। তারপর চায়ে চুমুক দিয়ে কালীপদ বলে উঠলেন, 'ওহো, আসল কথাই তো বলা হয়নি। ভালো কথা, দোলনাটা মজবুত আছে তো?

' তা তো জানি না! না থাকারই কথা।'

'তা হলে এই বেলাই কাজটা যেন সারে।'

নকুলেশ্বর হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়াল। বলল, 'কিন্তু আসল কথা কী যেন বলছিলেন?'

'ও, অনেকদিন বাদে বাবাকে হাসতে দেখলাম। স্বপ্নে। বটতলায় বসে বাড়িটার দিকে তাকিয়ে আছেন। এক সময় উঠে দাঁড়িয়ে খালি দোলনাটায় দোল দিচ্ছেন। দোলনায় কিন্তু কেউ ছিল না।' এরপর আর কোনো কথা বললেন না। চুপচাপ উঠে দাঁড়ালেন। ক্র্যাচে ভর করে দোতলার দিকে চলে যাচ্ছেন। কয়েক সিঁড়ি বাকি থাকতে পেছন ফিরলেন। লক্ষ্মীরাণীকে দেখে বললেন, 'তোমার অন্নপিসিকে বলো, বটমূলে পিণ্ডদান করতে হবে।'

চৌদ্দ

গত দুই দিন কত্তাবাবু একবারও নিচে নামেননি। বারান্দাতেও দেখা যায়নি। সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার, ক্র্যাচের শব্দও শোনা যায়নি। ওপর থেকেও কোনো ডাক আসেনি।

অন্নপািসি কথা বলে কম। রান্নাবান্না পূজা-অর্চনা এসব নিয়েই ব্যস্ত। সেও রীতিমতো উদ্বিগ্ন।

'নকুল, নকুলরে, আমার তো কেমন জানি লাগছে। বাবুর কোনো কিছু হয়ে যায়নি তো ! একটু খোঁজ-খবর নে না। ঠাকুরপুরুত ডাক।'

দরজা প্রায়ই ভেজানো থাকে। নকুলেশ্বর ভয়ে ভয়ে সে ঘরে ঢুকেছে। খাবার দিয়ে এসেছে, নিয়ে এসেছে। বেশির ভাগই এঁটো পড়ে থাকে। একটা কথাও বলেননি তিনি। কিছু লাগবে কি না, জানতে গেলে হাতের ইশারায় সরে যেতে বলেছেন। শরীর যে খারাপ নয়, চেয়ারে বসে থাকতে দেখেই নকুল তা আঁচ করে নিয়েছে। কিন্তু কত্তাবাবুর মুখের ভাবসাব একেবারে অন্যরকম, অপরিচিত।

কালীপদ দোলনা চেয়ারে হেলান দিয়ে আছেন, কিন্তু দুলছেন না। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন ভবানীচরণের দিকে। যেন কোনো দৈববাণীর অপেক্ষায় আছেন। অথচ একই সঙ্গে অন্যকিছুও হচ্ছে। একটা বিষাক্ত পোকা কালীপদের মেরুদণ্ড বেয়ে উঠে যাচ্ছে, মগজের কোষে কোষে বিষ ছড়িয়ে আবার নেমে পড়ছে। এইভাবে ক্রমাগত উঠছে, নামছে।

অনেক রাত। সরকারবাড়ি ঘুমোচ্ছে। কারও নিশ্বাসের শব্দও পাওয়া যাচ্ছে না। টিনভর্তি কেরোসিন নিয়ে বাড়ির চারপাশে ঢেলে দিলেন কালীপদ। আবার আরেক টিন। শেষ টিনটার কেরোসিন খাসকামরার প্রতিটি দাহ্য বস্তুতে ঢাললেন। নিজের শরীরেও। এরপর কম্পিতহাতে ঠাস করে জ্বলে উঠল দেশলাই। ছুড়ে দিলেন। মুহূর্তেই লাল চিত্কারে দাউদাউ করে উঠল সরকারবাড়ি। কালীপদের গায়ে আগুন লাগতেই বিদীর্ণ আর্তনাদ, 'আগুন আগুন! বাঁচাও, বাবা আমাকে বাঁচাও। আমি মরতে চাই না বাবা। বাঁচাও!'

দুমদাম করে উঠে এল আতঙ্কিত নকুলেশ্বর। শায়িত কালীপদের গায়ে ঝাঁকুনি দিতে দিতে বলল 'কত্তাবাবু, কী হয়েছে? কী?'

তড়াক করে উঠে বসলেন কালীপদ, 'আমি বাঁচতে চাই নকুলেশ্বর, বাঁচতে চাই।' ঝরঝর করে কেঁদে ফেললেন তিনি। অনেক বছরের জমানো কান্না।

পনেরো

পেছনের পুকুরে স্নান সেরে কাপড় পাল্টাচ্ছিল লক্ষ্মী। হঠাত্ ভূত দেখার মতো চমকে উঠল। ক্র্যাচে ভর দিয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন কালীপদ সরকার। অবশিষ্ট বস্ত্রাংশ বুকের কাছে জড়ো করে লক্ষ্মী বলল, 'বাবা তো বাজারে গেছে।'

'জানি।' কালীপদ মাটির দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। চোখ না তুলেই বললেন, 'আমি সব শুনেছি। ওরা কী বলেছে না বলেছে, তাও জানি।'

লক্ষ্মীর আপাদমস্তক ঝিমঝিম করছে। চোখ দুটো আরও কালো, আরও করুণ। কালীপদ সেই চোখে চোখ রেখে এবার বললেন, 'তোমার কাছে ভিক্ষা চাইছি, ওই সন্তান আমার দরকার। ওরা মিথ্যা বলেছে, সেটাই সত্য হোক। তুমিও বলবে, ওই সন্তান আমার। মাথা উঁচু করেই বলবে। এটুকু করুণা কি করতে পারো না!' তারপর নিচের দিকে চোখ নামিয়ে বিড়বিড় করতে লাগলেন, 'প্রয়োজন হলে শাস্ত্র মেনে...। আমার সন্তান দরকার, সরকারবাড়িকে বাঁচানো দরকার।' আবার চোখ তুলে বললেন, 'আমি জানি, আমি তোমার বাবার মতো। ...কিন্তু বাবা নই। কাপুরুষও নই। যেকোনো মূল্যে সরকারবাড়িকে আমি বাঁচাতে চাই।'

এই পাতার আরো খবর -
font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেছেন, 'রাজনৈতিক দল হিসাবে কর্মকাণ্ড করার কোনো অধিকার জামায়াত রাখে না।' আপনিও কি তাই মনে করেন?
3 + 9 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
নভেম্বর - ২৯
ফজর৫:০২
যোহর১১:৪৭
আসর৩:৩৫
মাগরিব৫:১৪
এশা৬:৩১
সূর্যোদয় - ৬:২২সূর্যাস্ত - ০৫:০৯
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :