The Daily Ittefaq
ঢাকা, সোমবার ০৫ আগস্ট ২০১৩, ২১ শ্রাবণ ১৪২০ এবং ২৬ রামাযান ১৪৩৪
সর্বশেষ সংবাদ হাইকোর্টের রায় বহাল; নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না জামায়াত | আপিল করেছেন গোলাম আযম | অষ্টম মজুরি বোর্ডের সুপারিশে মন্ত্রিসভার একমত

গল্প

স্বপ্নের ছায়ামন

মুজতবা আহমেদ মুরশেদ

চিলেকোঠায় বসবাসকারী লোকটার বুকের ওপর চড়ুইটা উড়ে এসেই দিল দুটো লাফ । খুব সন্তর্পণে চোখ মেলে লোকটা। পাখিটা ফুড়ুত্ করে জানালার গ্রিলে। বুকের ওপর পাখি বসার অসীম আনন্দটাকে অনুভব করে লোকটা। সেই উপলব্ধিটা ধরে রাখতে থাকে। মনে হয় এটাই তো জীবন। এই যে পাখিটা বুকের ওপর এসে নির্ভার দু-লাফ দিল, সেটাই তো ওর সুখ। আর সেই সাথে এটা ওর আপন সুখের সংযোগ।

বিছানা ছেড়ে উঠে বসে লোকটা। বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থাকে জানালায়। আরও তিনটে চড়ুই এখন জানালায়। নাগরিক জীবনে অনেক না পাওয়ার মাঝে এ এক পূর্ণতা।

চড়ুইগুলো লাফাচ্ছে। লোকটার দিকে বিশ্বাস এবং অবিশ্বাসের চঞ্চল চোখে তাকায়। শব্দ না করেই ওদের সাথে কথা বলে হানিফ। আমি তোমাদের কোনো ক্ষতি করব না। তোমরা আমার বুকে ইচ্ছেমতো লাফাও। এস। কেন আজ আর আকাশে উড়ে চলে যাবে? আমি তোমাদের এখানে বাসা বানিয়ে দেব।

হানিফ মজুমদার ঘরের ভেতর তাকায়। কোথাও একটা ঘুলঘুলি নাই। কী যে করি! ছাদের সাথে তো কোনো বিম নাই যে সেখানের ফাঁকে বাসার জন্যে জায়গা দেব। বইয়ের র্যাকের একটা কোণ ছেড়ে দেওয়া অবশ্য যায়। কিন্তু ওরা কি সেখানে বাসা বানাবে? মনে হয় না।

চড়ুইগুলো গ্রিল ছেড়ে দিল ফুড়ুত্ করে ।

হানিফ মজুমদারের মনে হতে থাকে, তাই তো জীবন একটি সংযোগসূত্রের মাত্রিকতা। আপন আত্মার সাথে হাওয়ার, আলোর এবং পানির। এই ত্রিধারার সাথে সংযোগ প্রতিস্থাপিত হলে মানুষের সাথে মানুষের, আত্মার সাথে আত্মার তখন সংযোগ চলাচল মানুষকে প্রাণ দেয়। মানুষকে সুখী করে।

হানিফ মজুমদার, তুমি কি সুখী ?

হ্যাঁ। না...

হ্যাঁ এবং না এর খেলা খেলো না

না, আমি বলছিলাম এই যে একটু আগের সময়টা এটা আমার সুখ। কিন্তু পুরোটার নয়। অর্থাত্ পুরো সময়টাতো আমি সুখী থাকি না।

কেউ কি থাকে!

পুরোটা বলতে এই ধরো সারাদিনের সময়টাতে বেশিরভাগটা জুড়েই আমি যন্ত্রণায়।

তাহলে তুমি কী করতে চাও?

ভাবনার গভীরে হানিফ মজুমদার। যে সংযোগটার কথা ভাবছিলাম, আসলে সেই সংযোগের ভেতর যদি কখনো কোনো তাল কেটে যায়, তো অন্তরে অস্থিরতা গোখরো হয়ে ওঠে।

আমার ভেতর তবে কি একটা গোখরো! হানিফ মজুমদার পুনরায় নিজের ভেতরের হানিফটার সাথে বাতচিতে লিপ্ত ।

লোকটার এমন আচরণে আমার মনে হচ্ছে একটা কথা। ঠিক এভাবে বলা যায়, তা হলো, নিজের ভেতর বাস করা গোখরোর ফণা সামলাতে কেউ কেউ পথ খোঁজে। আর কেউ কেউ বুঝতেই পারে না, আজীবন কেন তার ভেতর এই সংঘাত। স্থিরতা আনবার পথ পেতে সে আরও সংঘাতমুখী হয়।

সবার সাথে যথার্থ সংযোগ স্থাপনের যারা পথ খোঁজে, তারা সমাজের সকল উপাদানের ওপর নজর রাখে। বুঝতে চায় আত্মার ছন্দটা। হানিফ মজুমদার ঠিক তেমনি একজন মাঝ বয়সী লোক, যে প্রতিদিন নিজেকে সুখী দেখতে চায় এবং সেজন্যে প্রতিদিন নিজের চারপাশটায় প্রতিদিন চোখ চালিয়ে দেখে।

বাহ বেশ তো আজকের সকালটা!

হুম, একটা খোশবু আছে বাতাসে।

ওই যে দেখ একটা দাঁড় কাক।

তাই তো, আজকাল দাঁড় কাক দেখাই যায় না।

কিন্তু একটা কাক দেখে খুশি হবার কোনো কারণ তো নাই।

তো! খুশি হবার জন্যে এখন আমি এমন কী জোগার করব বা দেখতে পাব!

চড়ুইটা ওর বুকের ওপর এসে বসায় আজ সকালে হানিফ একটু সুখের অনুভব পেয়েছে। একটা ম্যাচের কাঠির ডগায় যতটুকু সময়ের আলো দেবার ক্ষমতা থাকে, অন্তত ততখানি সময় সে সুখের অনুভব লাভ করেছে। এভাবে মজুমদারের সাথে মজুমদারের কথা শুরু হয়। কথার মাঝেই বাসে ওঠে। তবুও ওর মাঝে একটা কিসের জানি কথা। একটা কিসের জানি ছোবল!

আজিমপুর থেকে বাসে উঠে সাইন্সল্যাবরেটরি হয়ে মতিঝিল তার রুট। এই পথেই গিয়ে সে অফিস করে। অফিসের টাকায় আজকাল আর মাসের চাহিদা পূরণ হয় না। ফলে লোকটা কাতর। কিন্তু সে এমন পথ জানে না, চেনে না যেখান হয়ে সে নিজেকে উদ্ধার করবে। সকল চাহিদা মিটিয়ে নিজেকে সুখী করবে।

এখানে একটা কথা বলে রাখি পাঠকদের, আমি জানি এ কথাগুলোর ভেতর তেমন কোনো ভিন্ন লেবাসের গল্প নাই। এই সকল চিত্র এখনকার দিনে এবং আমাদের রাষ্ট্রে একেবারেই একঘেয়েমি। এভাবে আমি বিষয়টা সাজালে অন্তত পাঠকদের কিন্তু তা-ই মনে হবে ।

কিন্তু সত্যি বলতে বিষয়টা এমন নয় যে, এটা একঘেয়েমি বিষয় বলে ফালতু, বা একঘেয়েমি নয় বলেই অনবদ্য ! গল্পটার বা এই একটা মানুষের জীবনের ঘটনাপ্রবাহ এমন যে, এটাকেই গুরুত্ব দিয়ে অন্তত সে দেখতে বাধ্য হচ্ছে এবং সে সেভাবেই দেখতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। তার অভ্যস্ততায় এমন কোনো আঁচড় পড়ছে না যে, সে এ চিন্তার প্রেক্ষিত বদলে দেবে।

এই প্রেক্ষিতটা তার কাছে গুরুত্ব পাবেই, কেননা তার কাছে এটাই তার আপন ভাবনার গুরুত্ববহ! প্রতিদিন এই একটা লোক নিজেকে রাষ্ট্রের অংশ হিসেব করে সকল আইন মেনে চলে, কিন্তু রাষ্ট্র তাকে তার বাঁচার কোনো হিসেবকেই পাত্তা দিচ্ছে না। বাঁচার বলতে কথাটা দর্শনের ভাষায় না প্রকাশ করে, অর্থনীতির ভাষায় বিবৃত করলে সঠিক। সেটা হলো এই বাঁচাটা মানে সঠিকভাবে জীবনযাপন। হ্যাঁ, এই কথাটাই জুতসই।

ধরা যাক। না, ধরা যাক বা বলছি কেন! প্রতিটা ঘটনাপ্রবাহের প্রতিদিনের নিয়মটা এতটা প্রকট যে, তার কাছে সেটা জীবন্ত। বলা যায়, তার কাছে সেটার একটা অর্থ অবয়ব নিয়ে উপস্থিত হয়। অবয়বগুলো রক্তাক্ত। অবয়বগুলোতে মারপিট, খুন-জখম, লুটপাট। সেখানে রাজনীতির কোলাহল। হানিফ মোহম্মদ হাঁফিয়ে উঠেছে এইসবে।

কোন পত্রিকায় হত্যাকাণ্ডের বিবরণ নাই? কোন পত্রিকায় ধর্ষণের কৌশলী চিত্র নাই? কোন টেলিভিশন নিজের গুণগানে মত্ত নয়? অথবা কোনো রাজনৈতিক দলের চাটুকারিতায় লিপ্ত নয়! তবুও এইসবের ভেতর দিয়ে সকলে যাচ্ছে। হানিফ মজুমদারও এর থেকে আলাদা কোনো অস্তিত্ব ধারণ করে কি! না, করে না। এর ভেতরই একটি বিলুপ্ত সত্তা। যখন পুরোটা ক্যানভাস জুড়ে এমন একটা তালগোল পাকানো সারাংশ, তখন তার মানে হচ্ছে, ক্রমান্বয়ে নিজের বাস করা সমাজের ওপর থেকে আপন এখতিয়ার সে হারিয়ে ফেলছে।

তার এখতিয়ার বদলে যাচ্ছে এই সমাজে। যখন কি না তার নিজের সাথে অন্যের একটা ইতিবাচক সংযোগ দরকার, তখন সেখানে কোনো সংযোগ থাকছে না।

হানিফ মজুমদার ভাড়া করা অ্যাপার্টমেন্টের বিল্ডিংটার একদম ওপরে বিজনেস কার্ডের মতো যে এক চিলতে চিলেকোঠায় থাকে, সেখান থেকে উঁকি দিয়ে আকাশ দেখতে চেষ্টা করে। প্রশান্ত আকাশে অস্থিরতা নাই। প্রতিটা গ্রহ এবং তারার ভেতর একটা পরিমিত এবং যথার্থ বিনিময়।

লোকটার ভেতর একটা ভাবনা গেড়ে বসে। সে সিদ্ধান্ত নেয় প্রতিরাতে একটা করে সুখী স্বপ্ন দেখার। সারা স্বপ্ন জুড়ে ভালো ভালো ব্যাপার স্যাপার থাকবে। অন্তত খুন-জখম এবং অন্যকে ঠকানোর হালচাল থাকবে না।

এখন তো প্রতিদিনই রাস্তায় হরতাল। হরতাল মানেই বোমা। ক্ষমতায় থাকা লোকগুলো প্রশান্তিতে ভোগছে। নিজের বিপত্তি দেখতে পায় না।

না না পাঠক, একটা কথা এখানে পরিষ্কার করেই বলি, এই সব চিন্তা করবার জন্যে হানিফ মজুমদারকে রাজনৈতিক দলের কর্মী বলাই যাবে না। বেচারা নেহাত ভোটার। একেবারেই জনগণ। তার মুশকিল হলো, সে ভাবতে বাধ্য হয়। কেননা, তার মগজের কোষে ভাবনার বিস্তার। সাদামাটাভাবে বললে বলা উচিত, এভাবে ভাবার জন্যে সে একটা আজগুবি মগজ লাভ করেছে। যেমন সে নিজের ধর্ম নিয়ে ভাবে। অন্যের ধর্ম নিয়েও ভাবে।

সে দুম করে নিজের ধর্মে শত বছর ধরে মেনে চলা বিষয়গুলোকে নিজের কাছে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে ফেলে। কিন্তু চ্যালেঞ্জ করলেই তো হবে না। সেটার উত্তর পেতে হবে। উত্তর কই! আবার ভাবে, আচ্ছা এমন যদি হতো যে উত্তর পেয়ে গেল, তখন কি তাকে অতি ধর্ম মানা লোকগুলো কিচ্ছুই করবে না! তাকে হত্যা না করলেও নিদেনপক্ষে আহত কি করবে না! তারা কি নিজেদের 'গডস সোলজার' বলে দাবি করবে না এবং সকল যুক্তি উপেক্ষা করে, অগ্রাহ্য করে ছুটে আসবে না তাকে কতল করতে! তার ভাবনার সূত্রগুলোকে কি এ সমাজ প্রকাশ্যে বলতে দেবে!

স্মিত হাসে সে। সত্যিই আজব। নিজে নিজের মতো করে ভাববে তারও উপায় নাই। হাল ছেড়ে দেয় হানিফ মজুমদার। নাহ, এভাবে নয়। এভাবে সে নিজের কাছে কোনো সুখ আনতে পারবে না। অন্তত একটা পথ তার কাছে আছে। সে সেই যে আনন্দময় স্বপ্ন দেখতে চেয়েছিল, সেই স্বপ্নগুলো তো অন্তত দেখতে পারে।

হানিফ মজুমদার স্বপ্ন সাজায়। মনে মনে একেকটা স্বপ্নের ভিত গড়ে। পাজল কম্বিনেশনের মতো করে স্বপ্নের শরীর নির্মাণ করে। এবং তখন আকাঙ্ক্ষা করে, সে এই স্বপ্নটা গভীর রাতে দেখবে।

প্রথম যে স্বপ্নটা সাজালো সেটা তার পছন্দ হলো না। সে আবার নতুন একটা স্বপ্ন বুনতে সচেষ্ট হয়। এখানে কারও মনে হতেই পারে, যে স্বপ্নটা হানিফ মজুমদারের পছন্দ হলো না সেটা কী রকম? এই উত্সুক্যটা মেটানোর জন্যে স্বপ্নটা এখানে বলা যায়। তবে এতে সময় ক্ষয়। বরং দেখি তো সে এমন কী স্বপ্ন নির্মাণ করতে পারবে যেটাকে তার কাছে উপাদেয় লাগবে।

লোকটা ঘরে ফিরে আসে। টিভি চালু করে। কোনো চ্যানেল ঠিকমতো আসছে না। সবকটা ঝিরঝির করছে। অনেক কষ্টে একটা চ্যানেলে একটু ছবি দেখা যাচ্ছে। হানিফ মজুমদার কিছুটা হলেও স্বস্তি পায়। ভাবতে শুরু করে। এটাকে জীবনের সূত্র বলে ধরে নেয়া যায়। কখনো এমন সময় আসে যে অল্পতেই মনটা ভরে ওঠে। টেলিভিশনে ছবি এলেও সেটার বিষয়বস্তু তাকে আনন্দ দেয় না।

সংসদের বিবরণ। বিরোধীদলীয় নারী সাংসদরা অকথ্য ভাষায় আক্রমণ করছে। আবিশ্বাস্য! এত নোংরা গালিগালাজ, নোংরা ইঙ্গিত মানুষ করতে পারে! অনেকেই করে। কিন্তু সে তো হীনজীবন যাপনের মানুষেরা করে। কিন্তু সংসদ? সেখানে কীভাবে এইসব বমি আসা ভাষার ব্যাবহার হতে পারে! টিভি অফ করে দেয় সে।

ওর অস্থির লাগে। এ কেমন রাষ্ট্র! এ কেমন সমাজ, যেখানে লোকেরা তাদের দায়িত্ব ভুলে যায়! এই যে পদ্মা সেতু হলোই না। এই যে প্রতিদিন ব্যাংকের ভাঁড়ারে পাইপ লাগিয়ে বাদুড়গুলো লক্ষকোটি টাকা পান করছে আবার সেই পানপাত্র ওপরতলার সাথেও ভাগাভাগিতে লিপ্ত—এর কোনো সুরাহা হলো না! এই যে নদীগুলো একের পর এক গিলছে, কিন্তু কেউ নদীখোরদের গ্রেফতার করে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দিচ্ছে না!

বিকট হাসি পায় আমাদের গল্পের লোকটার। ফাঁসি কে কাকে দেবে? এখানে কে কার বিচার করে? ঘরে পায়চারি করে। হানিফ মজুমদারের মাথাটা ঝিমঝিম করে। মাথার দু-পাশের রগ ফুলে উঠেছে। এমন মাথাব্যথার যে কী কষ্ট। কিশোর বয়সে হঠাত্ খুব মাথা ব্যথা হতো হানিফের। প্যারাসিটামল খেয়ে উপশম পেলে ও কাঞ্চন নদীর পাড়ে গিয়ে বসে থাকত।

নদীর স্রোত ছুঁইতে সে ধীরে নদীতে নামে। গ্রীষ্মকালে শীর্ণ নদীতে চর মিলিয়ে সমস্ত ধু-ধু জমিনটাকে পৌরাণিক কাহিনির প্রেক্ষিত মনে হয়। নদী পার হয়ে হেঁটে চলে যায় ছোট্ট গ্রাম্য হাটবাজারে। ওখান থেকে আরও দূরে একটা আম বাগান। বিশাল বিশাল বৃক্ষ। পাখির কলকাকলি।

সকল কিছু এখন অপসৃত। গ্রামের জীবন ছেড়ে যে শহরের ভেতর তার অভিযাত্রা, সেখানে শেষতক কই আর তার নোঙরের বন্দর! হানিফের মনে হয়, কেমনে সে এসব আশা করে! সে তো এই রাষ্ট্র কাঠামোর বাইরে কোথাও যায়নি। এখানেই আছে। আর এখানে যারা এর নিয়ন্ত্রণ করে, তারা তো কেউ বদল হয়নি। সবই তো একই ধারার লোকজন। পরিবর্তন মানে তো শুধু কিছু বছর কাবারি পালা বদল। আর মাঝে মাঝে তাদের কাছ হতে বাণী পেয়ে সাধারণেরা কিছু আশ্বাসের ফুল বাগান সাজায়।

আর ভাবতে ভালো লাগে না হানিফ মজুমদারের। যতই এদিক থেকে সেদিক ভাবছে, ততই মাথার ভেতর গুঞ্জন। একটা যন্ত্রণার ছাপমেশিন ঘটর ঘট করে চলছে। আবার একটা স্বপ্নের বিনুনি দরকার। এবং সেটাকে ঠিক করে নিজের মাথায় সেঁধিয়ে দিতে হবে যেন সে ঘুমের ঘোরে সেই স্বপ্নটা দেখতে পায়।

কেউ বলে রঙিন স্বপ্ন দেখা যায় না। স্বপ্নে কোনো রং থাকে না। সকল স্বপ্নই সাদাকালো। হানিফ সেটা বিশ্বাস করে না। একটি চমত্কার স্বপ্ন দেখার আকাঙ্ক্ষায় আজ সে গ্রিক পৌরাণিক দেবতাদের আরাধনা করে।

হানিফ মজুমদার ঢাকা শহরের অ্যাপার্টমেন্টের একদম ওপরে একটি ক্ষুদ্র্র ঘরে বসে আহ্বান করে স্বপ্নের দেবতাকে। ঘনকণ্ঠে উচ্চারণ করে, মরফিয়াস এস। পার্সিফোন তুমিও এস। তোমরা দুজনেই এস আমার সুউচ্চ অনুভবে এবং প্রবেশ করো আমার মস্তিষ্কের যে আকাঙ্ক্ষার ভুবন, সেখানে। হে মরফিয়াস, আমার চেতনা এবং তার অলিন্দে তুমি স্বপ্নের অবয়ব এঁকে দাও। হে পার্সিফোন, তুমি আমাকে বর্ণিল উজ্জল চিত্র দাও।

হানিফ মজুমদার মনকে আরও স্থির করতে সচেষ্ট হয়। গভীর আরাধনার মাঝেই জুতসই স্বপ্ন খোঁজে। যে স্বপ্নটা চারপাশের সকল নেতিবাচক পরিস্থিতি থেকে ওকে বের করে আনবে। হানিফ মজুমদার শুনতে পায় হিপনোস এবং মরফিয়াসের কথা।

হে আমার পুত্র মরফিয়াস, আমি তোমার পিতা হিপনোস ঘুমের দেবতা হিসেবে তোমাকে দায়িত্ব প্রদান করছি মানুষের চোখে ঘুম বিতরণের ।

হে পিতা আমার, হে ঘুমের দেবতা মহামান্য হিপনোস, আপনি আমাকে আজ্ঞা করুন। আমি সেই মোতাবেক আপনার বানানো ঘুমের জন্যে অন্ধকার এবং গাঢ় বিষাদ মেশানো রং মানুষের চোখে বিলিয়ে দেব।

মনে রেখো পুত্র মরফিয়াস, মানুষেরা মৃত্যুর পর হেইডিসের মৃত্যুপুরীতে সময় কাটাবে। তাই আমি চাই মৃত্যুর পূর্বে তারা মৃত্যু সম্পর্কে জ্ঞাত হউক। কিন্তু চাই না সেই নিরানন্দ মৃত্যুপুরীতে তারা শুধুই অচেনা মৃত্যুর জন্যে কষ্টে থাকুক।

হে মহামান্য ঘুমের দেবতা এবং আমার পরম শ্রদ্ধার পিতা, আমি আপনার আদেশ যথার্থ নিষ্ঠার সাথে পালন করব।

হানিফ মজুমদার উসখুস করে। কিন্তু আমি তো কেবলি অন্ধকার এবং বিষাদের কোনো স্বপ্ন বা ঘুম চাই না। আমি চাই প্রাণচঞ্চল স্বপ্ন। চাই রংয়ের ছটায় আর বিভায় অসাধারণ স্বপ্ন। এই চলমান জীবনের বিক্ষিপ্ততা থেকে আমার মুক্তি আমি আকাঙ্ক্ষা করি।

ওর মনের এই কথার খেলায় আবারও ডেলফির পথে হানিফ মজুমদার শুনতে পায় মরফিয়াস এবং তার ফুপু পার্সিফোনের কথা। পার্সিফোন মরফিয়াসকে বলছে, হে আমার ভ্রাতুষ্পুত্র, ঘুম বিলানোর দায়িত্বের দেবতা, আমি মনে করি তুমি মানুষকে ঘুমের ভেতর ঔজ্জ্বল্য প্রদান করো। মৃত্যুর একঘেয়েমির অন্ধকারে তাদের তুমি রেখোনা।

তবে আমার কী করণীয় মহামান্যা দেবী পার্সিফোন, আমার শ্রদ্ধাভাজন ফুপু?

এই নাও মরফিয়াস, এই নাও তোমার গুপ্ত পকেটে রেখে দেবার জন্যে উজ্জ্বল রং এবং ঝলমলে জিনিস। এসব তুমি মানুষের ঘুমে ছড়িয়ে দিও।

এর কী প্রতিক্রিয়া হবে দেবী?

এর ফলে মানুষ ঘুমের মাঝে সাময়িক বিশ্রামে মনোমুগ্ধকর স্বপ্নের সুখ পাবে। তাদের স্বপ্নেরা হবে রং-বৈচিত্র্যে অসাধারণ।

কিচিরমিচির করে চড়ুইগুলো আবার ফিরে এসেছে। ধ্যানস্থ অবস্থার অবসান ঘটে হানিফ মজুমদারের। ওরা কি ডাকছে? প্রশান্ত চোখ মেলে তাকায় চড়ুইগুলোর দিকে। একটা মুহূর্তেই সব কটাই আবার ফুড়ুত্ করে আকাশে।

হানিফ মজুমদার এ বেলা আর কোনো স্বপ্নই ধরতে পারে না। পাখিগুলোও এখন এখানে নাই। ঘরের ভেতর মন অস্থির। পথে বেড়িয়ে আসে। রিকশা নেয়। গন্তব্য? মিরপুর। আজিমপুর থেকে মিরপুর! কী করবে ওখানে? কিছুই না। এমনি পথ পার করবে। মাঝ পথে আসতেই রিকশা থামায়।

এই নাও ষাট টাকা ।

এইটা কী দিলেন! আপনি তো একশ কুড়ি টাকা দিবেন।

আমি তো মিরপুর যাই নাই।

তাতে কী হইলো। আপনি তো মিরপুরের ভাড়া ঠিক করসেন।

তো! আমি তো এই... এটা কোন জায়গা? তালতলা। তালতলায় কি একশ কুড়ি টাকা ভাড়া?

রিকশাওয়ালা গজগজ করে।

ঠিক আছে আর কুড়ি টাকা নাও ।

হানিফ মজুমদার মানিব্যাগ বের করে। ব্রাউন কালার মানিব্যাগটা কুড়িয়ে পাওয়া। ফেরত দিতে চেয়েছিল এর মালিককে। কিন্তু ওখানে কোনো ঠিকানা নাই। আর টাকাও ছিল না তাতে। কেবল একটা ছোট্ট চিরকুটে ঠিকানা ছিল। কিন্তু নামটা ছাড়া ঠিকানাটা ঠিকমতো পড়া যায় নাই। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মানিব্যাগটা সেই থেকে তার পকেটে।

কার মানিব্যাগ এটা?

কী করে লোকটা? না, হতে পারে নারীর। ধ্যাত্ মেয়েরা তো এমন ধরনের মানিব্যাগ ব্যাবহার করে না।

এটা পুরুষের।

মানিব্যাগটা চোখের সামনে মেলে ধরতেই ম্যারিওনের কথা মনে আসে। মানিব্যাগের চিরকুটে ম্যারিওন নামটা লেখা ছিল।

ম্যারিওন। কে হয় মেয়েটা মানিব্যাগের মালিকের?

নামটা বিদেশি। কোন দেশের। নাকি বাংলাদেশের মেয়ে? আজকাল অনেক পরিবারই তো এই সব পাক্কা বিদেশি ঘরানার নাম রাখছে।

অনেক আকাশ-পাতাল ভাবে সে চিরকুটে লেখা নামাটা নিয়ে। অসংখ্যবার ঠিকানাটা পড়ার চেষ্টা করে। কিন্তু কোনো কিছুই উদ্ধার হয় না।

নিজেকে ধমকায়। আরে এটার ভেতর তো কোনো টাকা ছিল না। তাহলে ফেরত দেবার জন্যে এত অস্থিরতা কেন! মানিব্যাগটাও কাউকে দিয়ে দিত। কিন্তু ম্যারিওন নামটা লেখা থাকার জন্যে দেয়নি । মনে হয়েছে মেয়েটা তার কাছে নিরাপদে আছে।

ম্যারিওনকে খোঁজার জন্যে ফেসবুকে বসেছে। ম্যারিওন লিখে সার্চ। প্রায় এক ডজন ম্যারিওন ভেসে উঠল। এত জন! এদের মধ্যে কি কেউ? কী করে এবার, কিছু বুঝে ওঠাই মুশকিল। আবার প্রত্যেকের চেহারা খুঁটিয়ে দেখে। পাঁচ জন দেখতে দারুণ সুন্দরী। সকলের প্রোফাইলেই ঢু মারে। কারও কারও দারুণ ফিগারের ছবি। মুগ্ধতা বাড়ে ওর মাঝে। একজন দেখতে অবিকল কাতিয়ার মতো দেখতে। কাতিয়া কুইনের সাথে ওর পরিচয় ঢাকায় একটা এনজিওতে কাজ করার সময়। ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে ওঠে। কাতিয়ার সাথে নিবির হয়ে ওঠার দিনগুলো মনে পড়ে। এখনো ওর দু-ঠোঁটে গভীর উষ্ণতা লেগে আছে।

চিলেকোঠার বাসায় দুজনে একটা বিছানায় খুব ভালোভাবেই এঁটে যেত। অনেক অনেকগুলো দিন এবং রাতের উপাখ্যান এভাবে নির্মিত। একদিন হানিফ মজুমদার খুবই ক্লান্ত। কাতিয়ার জ্বলছে। হঠাত্ করেই কাতিয়া রেগে গিয়ে চটকে বিছানা ছেড়ে চিত্কার করে উঠল, ইউ ডোন্ট নো হাউ টু হোল্ড! হাউ টু মেক মি লাভিং। সরি, সরি...

কাতিয়ার চিত্কার না মিলাতেই গভীর রাতে বৃষ্টি উপেক্ষা করেই উষ্ণ পাথরের মতো মেয়েটি স্মৃতির ছায়াটুকুন রেখে অপসৃত। বিমূঢ় হয়ে পড়া হানিফের মাঝে বিধ্বস্ত দ্বীপ। একটা শুকনো হাসি বিস্তৃত হয় হানিফের ঠোঁটে। কতগুলো বছর পেরিয়ে গেল কাতিয়া কোনোদিনও ফোন করেনি ।

ফেসবুকের এই মেয়েটা কাতিয়ার মতো দেখতে। হানিফের এদের সবাইকে খুব আপন লাগে। প্রত্যেককেই ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে দেয়। যে মেয়েটি ওর ফ্রেন্ড হবে তাকে সে খুলে বলবে মানিব্যাগের ভেতর চিরকুটে থাকা নামের রহস্য।

তার ভেতর এ এক অদ্ভুত খেলা। প্রতিদিন সময় পেলেই দিনে দশবার সে ফেসবুকে বসে চেক করে কোনো ম্যারিওন কি ওর রিকোয়েস্ট গ্রহণ করেছে? নাহ, কেউ করেনি। প্রবল হতাশা খাবলে খায় ওকে। খুব রাগ হয়। কী আস্পর্ধা মেয়েগুলোর। ও কি এতই ফেলনা যে কেউ ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট গ্রহণই করল না!

মাথা ঝাঁকিয়ে আপাতত ম্যারিওনকে দূরে সরিয়ে দেয়। চারদিকে তাকায়। আরে এটা তো তালতলা না। তাহলে! কিন্তু আমি তো রিকশা থেকে রোকেয়া সরণির তালতলায় থামলাম। সেখানেই নামলাম। ওখানেই রিকশা ভাড়া মিটালাম। তাহলে! এটা কোন জায়গা! নিজের ভেতর একটা প্রবল বিস্ময় ঝাঁপিয়ে পড়ে।

যখন চিনতে পারে তখন সে বিস্ময়ে বোকা বোধ করে। আরে এটা তো আজিমপুর। কিন্তু আমি আজিমপুর এলাম কখন? পিলে চমকানো প্রশ্নের ধাক্কা। তালতলা থেকে আজিমপুর পর্যন্ত কী কী ধরনের সর্বনাশের হাত থেকে বেঁচে গেছে—এই ভেবে ভাগ্যকে ধন্যবাদ দেয়।

পা টন টন করছে। ক্লান্তি এসে জাপটে ধরেছে। তবুও আজ লিফটে হানিফ উঠবে না। সিঁড়ি ভাঙছে। ধীরে উঠছে আকাশের দিকে। কত তলা আর? নাহ গুনবার দরকার নাই। উঠতে থাকি। পায়ের নলি বেয়ে বেদনা সিঁড়িতে গিয়ে লুকিয়ে পড়ছে। হানিফ তোয়াক্কা না করেই আকাশ ছুঁইতে উঠছে ।

হানিফ মজুমদার মাথার ওপর আর কোনো সিঁড়ি দেখতে পায় না। ধপ করে সিঁড়ির শেষ মাথায় বসে পড়ে। বুকের ধুকপুক টের পায়। শব্দটা বেশ জোড়ে। নিজের কানেই শুনতে পাচ্ছে হার্টবিট। শরীর টেনে তুলে দরজার কাছে নিজেকে দাঁড় করায়। অবসন্ন হাত দিয়ে চাবি ঘুরিয়ে তালা খুলতে চেষ্টা নেয়।

হঠাত্ খেয়াল করে, দরজার ওপর কী জানি লেখা। কাঠের দরজার ওপর পূর্ণ চোখের দৃষ্টি ফেলে। গাঢ় মেরুন রং লিপস্টিকে বড় করে লেখা—'মিস ইউ।' তার পাশেই খুব ছোট করে নামটা লেখা । —ম্যারিওন।

এই পাতার আরো খবর -
font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেছেন, 'রাজনৈতিক দল হিসাবে কর্মকাণ্ড করার কোনো অধিকার জামায়াত রাখে না।' আপনিও কি তাই মনে করেন?
9 + 6 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
অক্টোবর - ১৯
ফজর৪:৪২
যোহর১১:৪৪
আসর৩:৫২
মাগরিব৫:৩৩
এশা৬:৪৪
সূর্যোদয় - ৫:৫৭সূর্যাস্ত - ০৫:২৮
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :