The Daily Ittefaq
ঢাকা, সোমবার ০৫ আগস্ট ২০১৩, ২১ শ্রাবণ ১৪২০ এবং ২৬ রামাযান ১৪৩৪
সর্বশেষ সংবাদ হাইকোর্টের রায় বহাল; নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না জামায়াত | আপিল করেছেন গোলাম আযম | অষ্টম মজুরি বোর্ডের সুপারিশে মন্ত্রিসভার একমত

আত্মস্মৃতি

আমার লেখালেখি কিছু এলোমেলো নামতাপাঠ

অসীম সাহা

আমি জন্মেছিলাম এক জমিদার পরিবারে। পিতৃসূত্রে নয়; মাতৃসূত্রে। বাবার পরিবার মানে আমার ঠাকুরদা মধুসূদন সাহা ছিলেন ব্যবসায়ী। বাবা ব্যবসার পথে না গিয়ে শিক্ষার পথে গিয়েছিলেন। নিজে খুব মেধাবী ছাত্র ছিলেন। বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে সংগ্রামের বহু পথ পাড়ি দিয়ে কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যখন দর্শন নিয়ে এম এ পাস করেন, তখনকার দিনে সেটি গ্রামের মানুষদের মধ্যে তুখোড় আলোড়ন সৃষ্টি করে। এরপর তিনি চাকরির সন্ধানে যখন নিজে যে বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছিলেন, মানিকগঞ্জের ঝিটকা উচ্চ বিদ্যালয়ে, সেখানে প্রধান শিক্ষকের কাছে যান, তখন তিনি সুযোগ না থাকার কথা বললে বাবা ব্যর্থমনোরথ হয়ে ফিরে আসেন। এরপর তিনি সুদূর সন্দ্বীপের কার্গিল উচ্চবিদ্যালয়ে শিক্ষকের চাকরি পেয়ে সেখানে চলে যান। সে-সময়ে সন্দ্বীপ যাওয়া ছিল রীতিমতো ভয়ংকর ব্যাপার। আজকের মতো বিশাল বিশাল জাহাজে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে সেখানে যাওয়া সম্ভব ছিল না বলে আমার ঠাকুরদারও তাতে সম্মতি ছিল না। তা সত্ত্বেও বাবা চাকরির এই সুযোগ হাতছাড়া করতে চাননি বলে একরকমের ঝুঁকি নিয়েই সেখানে যান।

আমার বাবার বাড়ি ছিল আজকের মানিকগঞ্জ জেলার শিবালয় উপজেলার তেওতা গ্রামে, যে গ্রামে কাজী নজরুল ইসলাম-পত্নী প্রমীলা নজরুলেরও জন্ম। কিন্তু আমার জন্ম মাতুলালয়, নেত্রকোনা শহরের জমিদার বাড়ির নিচতলার একটি কক্ষে, যেটি কালের সাক্ষী হয়ে আজও ভগ্নদশা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এটি আমার দাদুর বাবা ভুবনমোহন রায় নির্মাণ করেছিলেন। তাঁরও পদবি ছিল সাহা। কিন্তু জমিদারি পত্তনের পর ব্রিটিশ সরকার তাঁকে রায় উপাধিতে ভূষিত করলে প্রথমে তিনি সাহারায় পদবি ব্যবহার করতেন। কালক্রমে সেটি তুলে দিয়ে পুরোপুরি রায় পদবি গ্রহণ করে বলতে গেলে সাহেব বনে যান। 'সাহাবাবু' তখন 'রায়বাবু' হয়ে ওঠেন। তো সেই রায়বাবুর বাড়িতেই আমার জন্ম ২০ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৯ সালে।

আমি বাবা-মার দ্বিতীয় সন্তান। আমার আগে আমার এক বোন। প্রথম দিকের সন্তানরা নাকি পিতার গৃহেই জন্ম নেয়। তাই আমার মা আমাকে জন্ম দেওয়ার জন্যে পিতৃগৃহেই চলে গিয়েছিলেন। সেখানে জন্মাবার পর মা এবং আমাকে নিয়ে বাবা গ্রামের বাড়ি ফিরে আসেন। ফলে আমার শৈশব তেওতার নিস্তরঙ্গ ও নিরিবিলি গ্রামের বাড়িতেই কাটতে থাকে। বাড়ির কাছে উত্তাল যমুনা নদী। সারাদিনে বেশ কয়েকবার ভেঁপু বাজিয়ে জলের ভেতর কাঠের চাকার ঘূর্ণন তুলে সিরাজগঞ্জ থেকে আরিচাঘাটে যাবার সময় আমাদের বাড়ির কাছে এসেই স্টিমারগুলো খুব জোরে ভেঁপু বাজাত। আর আমি সেই শব্দে দৌড়ে নদীর তীরে চলে যেতাম। ছোট্ট দুটি চোখে রাজ্যের বিস্ময় নিয়ে যতদূর পর্যন্ত স্টিমার দেখা যায়, নির্বাক তাকিয়ে থাকতাম। বাড়ির সামনে ছিল দিগন্তবিস্তৃত ধানক্ষেত। যখন ধান কাটা হয়ে যেত, তখন ফাঁকা মাঠে বন্ধুদের সঙ্গে ঘুড়ি ওড়ানো, তরমুজ, ফুটি চুরি করে খাওয়া, নদীর পাড়ে গোল্লাছুট খেলাসহ আরও কত দুষ্টুমি যে চলত, তার ইয়ত্তা নেই। কিন্তু সেই সুখের দিনগুলো ওখানে আমার স্থায়ী হয়নি। আমি মাত্র পাঁচ বছর পর্যন্ত তেওতা গ্রামে থাকতে পেরেছিলাম। কিন্তু এরপর বাবা সম্ভবত ১৯৪৮ সালের দিকে তত্কালীন ফরিদপুর জেলার মাদারীপুর মহকুমার নাজিমুদ্দিন মহাবিদ্যালয়ে চাকরি নিয়ে চলে যান। আমরা থেকে যাই গ্রামে। কয়েক বছর পর একটি বাড়ি ভাড়া করে বাবা আমাদের মাদারীপুর নিয়ে যান। শিক্ষকতা করতে করতে তিনি ওখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস করার জন্যে মনস্থির করেন এবং সেই অনুযায়ী কেনার জন্যে একটি বাড়ির খোঁজ করতে থাকেন। তখন সবেমাত্র ভারতবর্ষ বিভক্ত হয়ে দুটি রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। ভারত ও পাকিস্তান। দলে দলে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন ভারতে চলে যাচ্ছেন। এ সময়ে বিনোদবিহারী চট্টোপাধ্যায় বলে এক ভদ্রলোকের একটি বাড়ির সন্ধান পাওয়া যায়। দু-বিঘা জায়গার ওপর দোচালা টালি ও টিনের দুটি ঘর, তার পাশেই রান্না করার জন্যে আলাদা আরও একটি ঘর। পুজোর জন্যে মণ্ডপঘর। গাছগাছালির ঘন আবেশে জড়ানো মধুর পরিবেশে মন স্নিগ্ধ হয়ে যায়। আর ওই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে আরও মোহময় করে তোলে লাগোয়া একটি পুকুর। প্রকৃতি যেন গভীর প্রেমে সারা বাড়িটাকে জড়িয়ে ধরে চুম্বনে চুম্বনে সিক্ত করে ফেলছে।

বাড়িটা দেখেই বাবার পছন্দ হয়ে যায় এবং সেটি কেনার জন্যে তিনি মনস্থ করে ফেলেন। কিন্তু নিজের বাড়ি হলেও বিনোদবিহারী বাবু বাবাকে বাড়ি কেনার ব্যাপারে নিরুত্সাহিত করেন। তিনি বলেন, 'মাস্টার মশায়, পাকিস্তান হয়ে গেছে। আমরা দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছি। আপনি কী মনে করেন, এখানে আপনি থাকতে পারবেন? আপনি আজ রাতটা ভাবুন, আপনার স্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করুন। তারপর সিদ্ধান্ত নিন।' বাবা রাতে মা-র মতামত নিয়েই বাড়ি কেনার এবং এদেশে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পরের দিন সকালে গিয়ে বিনোদবিহারী বাবুকে বাড়ি কেনার কথা জানালে তিনি হতাশা ব্যক্ত করে বললেন, 'মাস্টার মশায়, ভুল করছেন, বড় ভুল।' কিন্তু বাবা তারপরও তাঁর সিদ্ধান্তে অনড় থাকায় সাড়ে পাঁচ হাজার টাকায় বাড়িটি বিক্রি হয়ে যায়। বাবা মাদারীপুর শহরের প্রাণকেন্দ্র মিউনিসিপ্যালিটি বাজারের উত্তর দিকে একটি চমত্কার বাড়ির মালিক হয়ে যান। সেই থেকে আমাদেরও নতুন বাড়িতে বসবাস শুরু হয়।

বাড়ি কেনার পর আমাকে ভর্তি করে দেওয়া হয় মধুবাবুর পাঠশালায়। কালীবাড়ির জায়গায় বিশাল টিনের চারচালা ঘর। তাতে টেবিল ও বেঞ্চি পাতা। আলাদা কোনো রুম নেই। সবই খোলামেলা। সেখানেই বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন শিক্ষক ক্লাস নিচ্ছেন। কালীবাড়িটি আমাদের বাড়ির পেছনে হওয়াতে আমার যাতায়াতের জন্য খুবই সুবিধা হয়েছিল। নতুন পৌরসভার একটি স্কুল তৈরি হলে পাঠশালাটি সেখানেই চলে যায়। আমি পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত সেখানেই লেখাপড়া করে শহরের একটি বিখ্যাত উচ্চবিদ্যালয় ইউনাইটেড উচ্চবিদ্যালয়ে ভর্তি হই। তখন থেকেই আমার মধ্যে লেখালেখির এক ধরনের আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত হতে থাকে। এর পেছনে আরও একটি বড় কারণ কাজ করে, সেটা আমাদের বাড়ির সাংস্কৃতিক আবহ। বাবা সারাক্ষণই বই নিয়ে থাকতেন, মা দুপুরের খাবার পর বই পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়তেন, তিনি গানও জানতেন, বড়দিও তুখোড় গান গাইতেন। আমিও মঞ্চে মঞ্চে গান গেয়ে বেড়াতাম। তখন কোলকাতা থেকে আমাদের বাড়িতে দি স্টেটসম্যান, আনন্দবাজার পত্রিকা, সাপ্তাহিক দেশ এবং ছোটদের পত্রিকা নবকল্লোল, সন্দেশ এবং আরও কিছু পত্রিকা আসত। আমার মনোযোগ ছিল ছোটদের পত্রিকাগুলোর দিকে। ওইসব পত্রিকার লেখাগুলো আমার মনের মধ্যে এক ধরনের ঘন উতরোল সৃষ্টি করতে থাকে।

এইটুকু ভূমিকা দেওয়ার কারণ, আমি যে পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছি, সেখান থেকে একজন কবি হয়ে বেরিয়ে আসতে পারে, সেটা কেউ কখনো কল্পনাই করেননি। 'সাহা'রা প্রধানত বৈশ্য। সে-কারণে অধিকাংশ সাহা পরিবারকে দেখা যায় ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকতে। আমার বাবার বাবা অর্থাত্ ঠাকুরদা অনাথ বন্ধু সাহাও ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। সেই পরিবার থেকে আমার বাবাই প্রথম ব্যবসা-বাণিজ্যের খোলস থেকে বেরিয়ে এসে শিক্ষাঙ্গনে পা রাখেন। ব্যবসার ব্যাপারটাই বাবা বুঝতেন না। অথচ ব্যবসায়ীর ছেলে ব্যবসায়ী হবেন, সকলের প্রত্যাশাই ছিল সেটা। বাবা তাঁদের আশার গুড়ে বালি দিয়ে শিক্ষাক্ষেত্রে নিজের নামটি এমনভাবে জড়িয়ে ফেলেন যে, তিনি আর কোনোদিনই সেদিকে পা বাড়াননি। আমাদের ছয় ভাইবোনের মধ্যে কেউই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত হননি। আমি চেষ্টা করেছিলাম, সেখানেও পুরোপুরি ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে নিজের জীবনকে চিরকালই সংকটাকুল করে রেখেছি। বাবা আমাকেও শিক্ষকতাপেশা বেছে নিতে বলেছিলেন। কিন্তু কবি হব বলে সে-পথেও আমি পা বাড়াইনি। আমার জীবনের অধিকাংশ সময়ই কাটে মূলত সাংবাদিকতা করে। তার মানে বাবা যেদিন থেকে শিক্ষাকেই জীবনের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে বেছে নিয়েছেন, সেদিন থেকেই সাহাপরিবারে এক ধরনের মৌলিক পরিবর্তন ঘটে। গোটা পরিবারটাই শিক্ষা-সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে যায়। এমন একটি পরিবারেই আমার বড় হয়ে ওঠা। নিজের মধ্যে লেখার অনুপ্রেরণার প্রধান কারণও একটি অনুকূল পরিবেশ পাওয়া। তো, পড়াশোনা করতে করতেই আকস্মিকভাবে ১৯৬৪ সালের দিকে মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে যখন আমি নবম শ্রেণীর ছাত্র, তখন প্রথম রবীন্দ্রনাথের অনুকরণে 'বসন্ত' নামে একটি কবিতা রচনা করে ফেলি। কিন্তু সেটি রবীন্দ্রনাথের এতটাই অনুকরণ ছিল যে, তা অনেকের কাছেই হাসির খোরাক হয়ে উঠেছিল। আমি বিব্রত বোধ করেছিলাম এবং সম্ভবত নিজের মধ্যে এক ধরনের জেদও কাজ করেছিল। ফলে আমি আর কোনও কবিতার অনুকরণ বা অনুসরণ না করে নিজের মতো লিখতে শুরু করি। ছোটদের কবিতা, ছড়া ও গল্প। ১৯৬৫ সালে ঢাকার 'দৈনিক পয়গাম' পত্রিকার ছোটদের পাতা 'নওনেহালের আসর'-এর ঈদসংখ্যায় 'ভুলিতে পারিনি আজও' নামে একটি গল্প ছাপা হলে আমার ভেতরে এক দ্যুতিময় শিহরণ খেলা করে যায় এবং আমি আমার নিজের একটি পথ চিনে নেবার সুযোগ পাই। এ ব্যাপারে দেশের বিশিষ্ট ছড়াকার রফিকুল হক (তখন তিনি মিতাভাই নামে পরিচিত ছিলেন) আমার লেখা নিয়মিত ছেপে আমাকে এতটাই প্রশ্রয় দিতে থাকেন যে, আমি আবেগে আপ্লুত হয়ে যাই।

তাই এসএসসি পাশ করার পর আমি ঢাকায় এসে তাঁর সঙ্গে দেখা করি। তিনি আমাকে গভীর স্নেহে ও ভালোবাসায় তাঁর পাটুয়াটুলির বাসায় নিয়ে যান, দুপুরে খাওয়ান এবং সদরঘাটের স্টার সিনেমাহলে একটি ছবি দেখিয়ে তারপর আমাকে বিদায় দেন। সেই আমার প্রথম একা ঢাকায় আসা।

ছোটদের পাতায় নিয়মিত লিখি বলে শহরে যারা সংবাদপত্র পড়েন এবং মোটামুটি শিক্ষিত শ্রেণীর, তারা অনেকেই আমার খোঁজ-খবর রাখতেন। ছোটখাটো লেখক হিসেবে সকলেই কিছুটা সমীহও করতেন। আমার শিক্ষকরাও আমাকে স্নেহদৃষ্টির আড়ালে ছায়া দিতেন। সেই বয়সে আমি লেখক হবার প্রয়াসে মাঝেমাঝে বেশকিছু কৌতুকপূর্ণ কাজও করে বসি। শুনেছিলাম, কবিরা নাকি একটু আলাভোলা হয়, চাঁদের আলো বা বর্ষার সময় বৃষ্টিফোঁটার রিমঝিম নূপুরের শব্দে আবেগে আপ্লুত হয়ে কবিতা লিখতে বসে পড়েন। আমিও রাস্তার পাশে বসে ধবধবে জ্যোত্স্নায় উদাসীন হয়ে যাবার ভাব করি এবং খাতার পাতায় আঁচড় কাটার চেষ্টা করি কিংবা বৃষ্টির সময় জানালার ধারে বসে এমন ভাব করি, যেন কবিতাদেবী আমার ওপর ভর করেছেন। সেটা অনেকটাই লোকদেখানো। আসলে ওভাবে কবিতাটবিতা কিচ্ছু হয় না। হয়তো লোকজনও মনে মনে হাসেন। কিন্তু তাতে আমার মনে কোনো ধরনের গ্লানি না থাকলেও আমি লাজুক স্বভাবের ছিলাম বলে ওই ধরনের আদিখ্যেতা অবিলম্বে বন্ধ করে দিই। শুরু হয় প্রকৃত লেখার পথে আমার নতুন অভিযাত্রা।

ঢাকা থেকে ফিরে আসার পরই আমার লেখার সংখ্যা আরও বেড়ে যায়। আমি নিয়মিতভাবে খেলাঘর, মুকুলের মাহফিল ও অন্যান্য পত্রিকার ছোটদের পাতায় লিখতে শুরু করি। সে-সময়ে আমার সঙ্গে ওখানে আরও যারা লিখতেন, তাদের মধ্যে ছিলেন সুকুমার বড়ুয়া, আখতার হুসেন, রশীদ সিনহা, মাহমুদউল্লাহ, শান্তিময় বিশ্বাস, বেবী মওদুদ, গোবিন্দলাল দাস, মুক্তিহরণ সরকার, ফারুক ইরাদ, আলী ইমাম, রোকেয়া খাতুন রুবীসহ আরও অনেকে। এদের কারও সঙ্গে কারও দেখা না হলেও প্রায় সকলেই সকলের এক ধরনের বন্ধু হয়ে উঠি। পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে লেখাপড়া চলতে থাকে অবিরাম। বিশেষত এসএসসি পাস করার পর মাদারীপুর পাবলিক লাইব্রেরির কত যে বই আমি পড়ে ফেলি তা হিসাব করে বলা কঠিন। আমার দিনরাত্রি কেটে যায় শুধু বই আর বই নিয়ে। কখন সকাল, কখন দুপুর হয়ে বেলা গড়িয়ে যায়, খাবার জন্যে মার বকুনিও আমাকে আমার পাঠ থেকে নিবৃত্ত করতে পারে না। আমি পাগলের মতো পড়তে থাকি। সে-সময়ে পাঠ্যবই যতটা না পড়েছি, তারচেয়ে অনেকবেশি পড়েছি গল্প, উপন্যাস ও কবিতা-ছড়ার বই। পাশাপাশি লেখা আর ঢাকার পত্রিকায় পাঠানো।

এর মধ্যে মাধ্যমিক পাস করে শহরের একমাত্র মহাবিদ্যালয়, যেখানে আমার বাবাও চাকরি করেন, নাজিমুদ্দিন মহাবিদ্যালয়ে ভর্তি হই। ওই সময়ে হঠাত্ করেই আমার হাতে আসে 'জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ কবিতা'র বইটি। কোলকাতার ভারবী প্রকাশনী থেকে পূর্ণেন্দু পত্রীর প্রচ্ছদে সজ্জিত বইটি আমার বাল্যবন্ধু ও ক্লাসমেট ফয়েজ সিরাজ আমাকে পড়তে দেয়। এই বইটি পড়তে পড়তে এক ঘোর লাগা বিস্ময় আমাকে আবিষ্ট করে রাখে। যদিও তখন তাঁর কবিতার অনেকগুলোই আমার কাছে রহস্যময় আবরণে ঢাকা বলে মনে হয়। কিন্তু 'বনলতা সেন' কবিতার ভালোলাগার রেশ দীর্ঘদিন আমাকে আপ্লুত করে রাখে। আমার চিন্তার ক্ষেত্রেও এক ধরনের বাকবদল হতে শুরু করে। আমি আধুনিক কবিতা লেখার চেষ্টা করতে থাকি। মাদারীপুরের কোনো বইয়ের দোকানেই তখন প্রাচীন লেখকরা ছাড়া আর কারও বই পাওয়া যেত না। খ্যাতিমান লেখকদের মধ্যে একমাত্র জসীম উদ্দীনের 'নকশী কাঁথার মাঠ' এবং 'সোজন বাদিয়ার ঘাট' বই দুটিই পাওয়া গিয়েছিল। আমার বড় মামা কোলকাতায় থাকতেন। তাঁকে আমি দেশ পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেখে বুদ্ধদেব বসুর নাটকের বই 'তপস্বী ও তরঙ্গিনী' এবং জীবনানন্দ দাশের কবিতার বই 'বনলতা সেন' পাঠাতে বলি। তিনি ও-দুটি বই পাঠাবার পর আমি গোগ্রাসে তা গেলার চেষ্টা করি। কিন্তু সেটা অতটা সহজ হয় না। বারবার পড়ি, বোঝার চেষ্টা করি। কিন্তু কিছুটা বুঝি, আর কিছু রয়ে যায় অজানা। বুদ্ধদেব বসুর 'তপস্বী ও তরঙ্গিনী' নাটকটি আমি প্রথমে 'আকাশবাণী' কোলকাতা থেকে প্রচারিত হওয়ার সময় শুনি।

সে-সময়ে আমার মাথায় একটি পত্রিকা বের করার ঝোঁক চেপে বসে। বেশ কয়েকদিন ঘোরাফেরা করে তত্কালীন মহকুমা প্রশাসক মোহাম্মদ আলীর কাছ থেকে পত্রিকা বের করার অনুমতি গ্রহণ করি। পত্রিকার নাম দিই 'কথাকলি'। লেখা জোগাড় করে পত্রিকাটি একটি প্রেসে ছাপতে দিই। সেখানে অনেকের লেখার সঙ্গে আমারও একটি কবিতা থাকে। কিন্তু সেটা আমার দুজন বন্ধুর নেতিবাচক ভূমিকার ফলে কোনোদিন আর আলোর মুখ দেখতে পায়নি। ফলে আমার মন খুব খারাপ হয়ে যায়। আমি পত্রিকা বের করা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হই। এরই মধ্যে নরেন বিশ্বাস মাদারীপুর নাজিমুদ্দিন মহাবিদ্যালয়ে শিক্ষক হয়ে আসেন। তিনি ছিলেন একেবারেই আলাদা ধরনের শিক্ষক। সাহিত্যের প্রতি প্রচণ্ড অনুরক্ত একজন মানুষ। যেহেতু আমার বাবা তখন ওই মহাবিদ্যালয়ের উপাধ্যক্ষ এবং আমি লেখালেখি করি, তাই আমার সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা হতে বেশি সময় লাগেনি। মাদারীপুরে কখনো কোনোদিন কোনো সাহিত্যসভা অনুষ্ঠিত হয়নি। নরেন বিশ্বাস আমাকে ওই ধরনের একটি সাহিত্যসভার আয়োজন করতে বলেন। আমি ও চিত্ত মণ্ডল নামে আর একজন লিখিয়ে ছাত্র আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একটি কক্ষে একটি সাহিত্যসভার আয়োজন করি। সেখানে আমি বড়দের জন্য লেখা একটি গল্প পাঠ করি, যে গল্পটির ভূয়সী প্রশংসা করেন নরেন বিশ্বাস ও অন্যরা। আমি বড়দের গল্প লিখতেও অনুপ্রাণিত হই।

মাদারীপুরের পড়ালেখার পাঠ চুকিয়ে এসে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে ভর্তি হই। ঢাকায় আসার আগেই লেখকমহলে আমার একটা পরিচিতি হয়ে যায়। আর ঢাকায় আসার পর তা আরও বিস্তৃত হতে থাকে। মহাবিদ্যালয়ে দু-বছর আমার শিক্ষক ছিলেন অধ্যাপক নরেন বিশ্বাস (যিনি পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হয়েছিলেন)। আমাকে ঢাকায় তিনিই প্রথম লেখক আহমদ ছফার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন।

প্রথম পরিচয়ে আহমদ ছফাকে দেখে আমি একটু বিস্মিত হয়েছিলাম। তাঁর কথা বলার ধরন, তাঁর হাসি, তাঁর মুখভঙ্গি—সবই অদ্ভুত ধরনের লেগেছিল। প্রথম প্রথম আমার খুবই হাসি পেত। কারণ এ ধরনের কোনো মানুষের সঙ্গে আগে আমার পরিচয় হয়নি। কিন্তু পাছে তিনি কিছু মনে করেন, তাই জোর করে হাসি চেপে রাখতে হতো। আমার সঙ্গে পরিচয় হবার পর তিনিই বলতে গেলে ঢাকা শহরে আমার অভিভাবক হয়ে উঠেছিলেন। বয়সে তিনি আমার চেয়ে খুব একটা বড় ছিলেন না। এক ধরনের ডিগনিটি প্রায় সবসময় তিনি বাজায় রাখতেন। কিন্তু যখন হাসিঠাট্টা করতেন, তখন বড়-ছোটর ব্যবধান খুব একটা মানতেন না। মুখ দিয়ে এমন সব অশ্রাব্য ভাষাও বের হয়ে যেত, যাতে আমি খুব লজ্জিত ও বিব্রত বোধ করতাম। কিন্তু সবচেয়ে সিরিয়াস ছিলেন তিনি পড়াশোনার সময়। পড়াশোনাটা ছিল তাঁর মজ্জাগত। আমি যখনই তাঁর ওখানে যেতাম, কোনোদিন হাতে বই ছাড়া দেখেছি বলে মনে পড়ছে না। আর পড়াশোনার সময় যেই যাক না, তাকে পরে আসার জন্য বলে দিতে তাঁর একটুও বাঁধত না। এমনকি আমাকেও না। অথচ তখন আমি ছিলাম তাঁর নিত্যসঙ্গী। ঘরে থাকলেও পড়তেন, বাইরে থাকলেও। এমনকি আমরা যখন নারায়ণগঞ্জে করুণাময় গোস্বামীর বাসায় যেতাম, তখনো দেখেছি তিনি বাসে বসেও বই পড়ছেন। অসাধারণ স্মৃতিশক্তি ছিল। আর ছিল অফুরন্ত প্রাণসম্পদে ভরা একটি আন্তরিক মন। অন্যের উপকার যেন তাঁর স্বভাবের অংশ ছিল। বাংলাবাজারের প্রকাশকদের ওপর তাঁর একটা অসাধারণ প্রভাব ছিল। তাই তাঁর কথায় অনেক প্রকাশক এমন সব লেখক-কবির কবিতার বইও প্রকাশ করতে বাধ্য হয়েছেন, যার বেশিরভাগই লাভের মুখ দেখেনি। তবু তাঁর সঙ্গে প্রকাশকদের কখনো মনোমালিন্য হতে দেখিনি। তবে তিনি এমন সব লেখককেও আবিষ্কার করেছিলেন যারা বাংলাদেশের সাহিত্যে পরবর্তীকালে আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন, যা ছিল হিংসা করার মতো। যেমন—হুমায়ূন আহমদের মতো লেখককে তিনিই আবিষ্কার করেছিলেন। তাঁর 'নন্দিত নরকে' উপন্যাসটিও তিনি ছাপার ব্যবস্থা করেছিলেন খান ব্রাদার্স থেকে। তার পরের ইতিহাস তো সবার জানা। এরকম আরও অনেককেই তিনি বাংলাবাজারের বহু প্রকাশকের মাধ্যমে পাঠকদের কাছে তুলে ধরেছিলেন। তবে তাঁর মধ্যে একটা বৈপরীত্যমূলক চরিত্রও আমি লক্ষ করেছি। তিনি যাদের জন্য কাজ করতেন, যাদের লেখক হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিতেন এবং যাদের স্নেহ করতেন, তারা পরবর্তীকালে খ্যাতি পেলে বা তাদের নিজস্ব কোনো আইডেনটিটি গড়ে উঠলে তা তিনি খুব একটা মেনে নিতে পারতেন না। সে কারণে ছোট-বড় অনেকের সঙ্গেই তাঁর সম্পর্ক একরকম থাকেনি। তিনি নিজেকে আহমদ শরীফের শিষ্য বলে পরিচয় দিতেন, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর সঙ্গে তাঁর নিবিড় সখ্য ছিল, কিন্তু তাও অটুট থাকেনি। বরং তাঁকে দেখেছি, এঁদের মতো লোকদের খুব বাজে ভাষায় গালিগালাজ করতে। এটা আমার কাছে খুব বিস্ময়কর মনে হতো। কিন্তু তখন তাঁর একনিষ্ঠ ভক্ত বলে কিছুই বলতে পারতাম না। এভাবে তিনি একে একে তাঁর অনেক শুভাকাঙ্ক্ষীকে হারিয়ে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত অনেকটা নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছিলেন। বিশেষত একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি যখন কোলকাতায় যান, ফিরে আসবার পরই তাঁর রাজনৈতিক ও ব্যক্তিক দৃষ্টিভঙ্গিতে এক ধরনের বাঁকবদল ঘটে। এটি তীব্র হয় লিবিয়ার গাদ্দাফির 'গ্রীন বুক' অনুবাদ করার পরে। তাঁর ঝোঁক লক্ষ করা যায় অনেকটাই মুসলিম মৌলবাদের দিকে। তিনি একসময় জাসদ রাজনীতির সঙ্গেও সম্পর্কিত হয়ে পড়েন। আবার বিভিন্ন এনজিওর কাছ থেকে আনুকূল্যও গ্রহণ করেন। এর ফলে আমার সঙ্গেও তাঁর দূরত্ব বেড়ে যেতে থাকে। সেই দূরত্ব অনেকটা তিক্ততায়ও পর্যবসিত হয়। তিনি যখন খুব অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন, তখন আমি আর আমার স্ত্রী তাঁকে দেখতে গেলে তিনি খুব করুণকণ্ঠে যখন বলেন, 'আমাকে মাফ করে দিও', আমার ভেতরে তখন এক অপরাধবোধ কাজ করতে থাকে। ছফা ভাইকে নিয়ে আমি কোনো ভুল করিনি তো? কিন্তু সুস্থ হবার পর তিনি যখন একই কার্যক্রম শুরু করেন, তখন আমাদের দূরত্বটা স্থায়ী হয়ে যায়। এটা ছিল আমার জীবনের অন্যতম বড় একটা কষ্টের ঘটনা। কিন্তু আমার তখন কিছুই করার ছিল না। তিনি আমাকে আর মেনে নিতে পারেননি, আমিও না। অথচ এই ঢাকা শহরে তিনি না থাকলে আমি আজ এখানে আসতে পারতাম কি না, সন্দেহ। মানুষের সম্পর্ক কখন কোথায়, কীভাবে পরিবর্তিত হয়ে যায়, সেটা কেউ বলতে পারে না। কিন্তু এখনো যখন আমি একান্তে বসে ভাবি, তখন দেখতে পাই একজন অন্যরকম আহমদ ছফাকে, যাঁর ছিল এক আশ্চর্য সম্মোহনী শক্তি। যেখানেই যেতেন, যার কাছেই যেতেন তাদের প্রভাবিত করতে এবং আপন করে নিতে একটুও দেরি হতো না তাঁর। কত বড় বড় মানুষের সঙ্গে যে তাঁর আত্মীয়সুলভ সম্পর্ক ছিল, তা দেখে আমি বিস্মিত হয়ে যেতাম। মন্ত্রী থেকে শুরু করে ঘরের পাশের দোকানিটির সঙ্গেও তাঁর নিবিড় সম্পর্ক ছিল। এই গুণটি আমি খুব বেশি লেখকের মধ্যে দেখিনি। আমাকে তিনি এতটাই স্নেহ করতেন যে, যেখানেই যেতেন, সেখানেই আমি ছিলাম তাঁর সহসঙ্গী। তিনি রাজনীতিতে সত্যেন সেন ও রণেশ দাশগুপ্তর অনুসারী ছিলেন অর্থাত্ সাম্যবাদী রাজনীতির প্রতি তাঁর গভীর আস্থা ছিল। সেজন্যে কমিউনিস্ট নেতাদের সঙ্গেও তাঁর সম্পর্ক ছিল বন্ধুর মতো। সত্যেনদা, রণেশদা তো ছিলেনই; সেই সঙ্গে কমরেড মণি সিংহ, কৃষক নেতা জীতেন ঘোষ, খোকা রায়সহ অনেক নামকরা নেতার সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব ছিল। তিনিই তাঁদের অনেকের সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন, সেই মানুষটার পরিবর্তন আজও আমার কাছে অবিশ্বাস্য মনে হয়!

ছফা ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয় হবার আগেই পুরান ঢাকার ২৬৩ বংশাল রোডের দৈনিক সংবাদ অফিসের দোতলায় কেন্দ্রীয় খেলাঘরের যে অফিসঘরটি ছিল, সেখানে আমার নিত্য যাতায়াত ছিল। প্রতিদিনই দুপুরের পর অথবা বিকেলে সেখানে যেতাম। অফিসকক্ষে যাবার পথে প্রায়শই আমি মাঝখানের একটি ঘরে শহীদ ঔপন্যাসিক শহীদুল্লাহ কায়সার এবং রাজনীতিবিদ ও লেখক রণেশ দাশগুপ্তকে দেখতাম। তাঁরা দুজনেই খুব রাশভারী মানুষ ছিলেন। তাই খেলাঘরে যাবার সময় অত্যন্ত সন্তর্পণে পা টিপে টিপে যেতাম, যাতে তাঁদের মনোযোগে কোনো ব্যাঘাত না ঘটে।

এই খেলাঘরেই সমসাময়িক অনেক বন্ধু-লেখকের সঙ্গেই আমার জানাশোনা হয়। তাদের মধ্যে বিখ্যাত ছড়াকার আখতার হুসেন, কবি বেলাল চৌধুরীর আপন ছোট ভাই জিয়াউদ্দিন আহমেদ, ছড়াকার রশীদ সিনহাসহ আরও অনেকেই ছিল। আমি খেলাঘরের সাংগঠনিক কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ি। তখন দৈনিক সংবাদের ছোটদের পাতা খেলাঘরের সম্পাদক ছিলেন প্রয়াত সাংবাদিক ও দৈনিক সংবাদের পরবর্তীকালের সম্পাদক বজলুর রহমান। তিনি তখন ভাইয়া নামে পরিচিত ছিলেন। আমরাও তাকে ভাইয়া বলেই ডাকতাম। খেলাঘরের সাংগঠনিক প্রধান হিসেবে আমরা তাঁকে বেশ সমীহ করতাম। তাঁরই নেতৃত্বে আমরা সংগঠন হিসেবে খেলাঘরকে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম।

আহমদ ছফার সঙ্গে পরিচিত হবার পর আমি ব্যাপকভাবে বড়দের লেখা লিখতে শুরু করি। বিশেষভাবে কবিতা ও প্রবন্ধ। সেই সময়ে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার 'পূর্বপাকিস্তান লেখক সংঘ' নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। এখানকার অধিকাংশ লেখকই এই সংগঠনটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সংগঠনটি থেকে 'পরিক্রম' নামে একটি সাহিত্যপত্রিকাও প্রকাশিত হতো। কিছুদিন এর অফিসটি ছিল বাংলা একাডেমীর গেইটের সামনে, আগে যে একটি টিনের ঘর ছিল, তার মধ্যে। তখন পত্রিকাটি সম্পাদনা করতেন অধ্যাপক ও প্রবন্ধকার সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। আমি একটি আধুনিক কবিতা লিখে একদিন অফিসে যাই তাঁর সঙ্গে দেখা করতে। কিন্তু তাঁকে না পেয়ে আমি তাঁর লেখার বাক্সের মধ্যে কবিতাটি রেখে আসি। পরের মাসে পত্রিকাটি বেরুলে সেখানে দেখি, আমার কবিতাটি ছাপা হয়েছে। আমি বিস্মিত হই। সেই আমার প্রথম আধুনিক কবিতা লেখা। কবিতাটি পরিক্রমে ছাপা হবার ফলে আমার উত্সাহ বেড়ে যায়। আমি নিয়মিতভাবে কবিতা ও বিভিন্ন বিষয়ে প্রবন্ধ লিখতে শুরু করি এবং একমাত্র দৈনিক বাংলা ছাড়া আর প্রায় সব পত্রিকাতেই ছাপা হতে থাকে। তখন দৈনিক বাংলার সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন চল্লিশ দশকের বরেণ্য কবি আহসান হাবীব। শুনেছিলাম, তিনি ভীষণ গম্ভীর মানুষ, অসম্ভব ব্যক্তিত্বসম্পন্ন এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাগীও। তাই স্বাধীনতার আগে তাঁর কাছে যেতে কখনো সাহস করিনি। অথচ ততদিনে আমি কবি ও প্রবন্ধকার হিসেবে বেশ পরিচিতি পেয়ে গেছি।

আহমদ ছফার সঙ্গে পরিচয়ের সূত্রে আমি নিয়মিত বাংলাবাজারে যেতাম। তিনিই প্রথম আমাকে বিখ্যাত বিউটি বোর্ডিংয়ে নিয়ে যান। সেখানেই আমার সঙ্গে প্রথম পরিচয় হয় আল মাহমুদ, শহীদ কাদরী, নির্মলেন্দু গুণ, আবুল হাসান, হুমায়ুন কবির প্রমুখ কবির সঙ্গে। আমি জগন্নাথ হলের আবাসিক ছাত্র। আহমদ ছফা আন্তর্জাতিক ছাত্রাবাসের। সাশ্রয় হবে বলে আমি নিয়মিতই আহমদ ছফার সঙ্গে রিকশায় করে বাংলাবাজারে যেতাম। তিনিই আমাকে বহু লেখকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। সেই সময়কার বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক ও কমিউনিস্ট নেতা সত্যেন সেনের নারিন্দার বাড়িতে নিয়ে যাবার পর আমি সত্যেনদাকে দেখে অভিভূত হই। এই খুব কাছে থেকে আমি একজন কমিউনিস্ট নেতাকে দেখি। তাঁর সঙ্গে অল্পদিনেই আমার সখ্য গড়ে ওঠে। আমি আহমদ ছফাকে ছাড়াই মাঝেমধ্যে তাঁর বাসায় যাই, তাঁর সঙ্গে গল্প করি। সত্যেনদা অকৃতদার ছিলেন। তিনি থাকতেন সংবাদপত্র শ্রমিক নেতা আবদুল করিমের বাসায়। করিমের স্ত্রী হেলেনের কন্যাসুলভ সেবাশুশ্রূষায় সত্যেনদার সময় ভালো কাটলেও হেলেন যখন তার ছোট বাচ্চাটিকে স্কুলে দিতে যায়, তখন সত্যেনদা খুব নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন। সেই সময় আমি গেলে তিনি খুব খুশি হন। তাঁর একাকিত্ব ঘোচানোর জন্যে আমি অনেকটা তাঁর বন্ধুর মতো হয়ে উঠি। আমি নিজেও তাঁকে একান্তে কাছে পেয়ে খুব গৌরব বোধ করি। বাংলাবাজারে তখন সত্যেন সেন বিখ্যাত লেখকের চাহিদা নিয়ে ঘুরে বেড়ান। তাঁর পেছনে প্রকাশকদের দীর্ঘ লাইন। তাঁর অভিশপ্ত নগরী, পাপের সন্তান, মেহনতী মানুষ প্রভৃতি বইগুলো হট কেকের মতো বিক্রি হতে থাকে। সত্যেনদার মুখেই শুনতে পাই, এগুলো তাঁর জেলে বসে লেখা। এখনকার মতো তখন প্রকাশকদের ভিড় ছিল না। স্টুডেন্ট ওয়েজ, মাওলা ব্রাদার্স, প্রকাশ ভবন, নওরোজ কিতাবিস্তান ও খান ব্রাদার্স সৃষ্টিশীল প্রকাশনার জন্য বিশেষভাবে পরিচিত ছিল। বাকিরা প্রধানত পাঠ্যপুস্তক প্রকাশ করত। সত্যেনদা বাংলাবাজারে গেলেই প্রকাশকদের মধ্যে হৈহুল্লোড় পড়ে যেত। কে আগে তাঁকে নিজেদের দোকানে ডেকে নেবেন, তা নিয়ে রীতিমতো প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যেত। একটি পাজামা, ফুল শার্ট ও স্পঞ্জের স্যান্ডেল তাঁর পরিধেয় ছিল।

সত্যেনদার সৌজন্যে আমরা কালিকলম প্রকাশনীর কর্ণধার আব্দুল আলীম নামে তাঁর এক শিষ্যের সঙ্গে পরিচিত হই। সেখানে আমাদের একটি নিয়মিত আড্ডা বসে। সকাল, দুপুর কিংবা রাত্রি—যেকোনো সময় আলীম ভাইকে বিরক্ত করা বলতে গেলে আমার এবং আহমদ ছফার অভ্যেসে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তিনি বিরক্ত হওয়া তো দূরের কথা, যতদিন বেঁচে ছিলেন, আমাদের নিরঙ্কুশ অত্যাচার সহ্য করেও ক্রমশ প্রশ্রয় দিয়ে গেছেন এবং সেটি সত্যেনদার কারণেই। এরকম বড় হূদয়ের মানুষ আমি বাংলাবাজারে খুব কমই দেখেছি। বাংলাবাজার পোস্টাপিসের পাশে আলীম ভাইয়ের একটি হোটেল ছিল। কতদিন যে সেখানে আমি আর আহমদ ছফা দুপুরের খাবার খেয়েছি। কিন্তু আলীম ভাইয়ের কারণে কোনোদিনই আমরা খাবারের টাকা দিতে পারিনি।

ইতোমধ্যে সত্যেনদা কালিকলম প্রকাশনী থেকে কিছু বিষয়ভিত্তিক ছোট আকারের বই প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেন। সেই গ্রন্থমালাসমূহের নাম দেওয়া হয় 'বোধনা গ্রন্থমালা'। এই প্রকাশনার সঙ্গে সত্যেনদা আমাকে ও আহমদ ছফাকে যুক্ত করেন। এর মধ্যে সেখান থেকে 'স্বদেশ' নামে একটি মাসিক সাহিত্যপত্রিকা প্রকাশেরও সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। আহমদ ছফা সম্পাদক। আমি এবং মুনতাসীর মামুন সহ-সম্পাদক। সম্পাদকমণ্ডলীতে ছিলেন সত্যেন সেন, আহমদ শরীফ, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর প্রমুখ। পত্রিকাটি নিয়ে আহমদ ছফা ও আমি নিয়মিতভাবে ৩৪ বাংলাবাজারের দোকানে বসি। বিজ্ঞাপন সংগ্রহের জন্য আহমদ ছফার সঙ্গে বিভিন্ন অফিসে যাই। ছফা ভাইয়ের কথা বলার ভঙ্গির মধ্যে এমন এক ধরনের কৌশল ছিল, যাতে প্রায় প্রত্যেক বিজ্ঞাপনদাতাই মোহিত হতেন এবং বিজ্ঞাপন দিতেনও। ফলে বেশ ভালো অঙ্কের টাকার বিজ্ঞাপন পাওয়া যেত। 'স্বদেশ'-এর মাত্র তিনটি সংখ্যাই বেরিয়েছিল এবং তা ছিল খুবই সমৃদ্ধ এবং দৃষ্টিনন্দনও। পত্রিকার প্রচ্ছদটি এঁকেছিলেন হারাধন বর্মন নামে বাংলাবাজারেরই একজন শিল্পী, যাকে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকবাহিনীর হাতে জীবন দিতে হয়। প্রধানত পাঠ্যপুস্তকের প্রচ্ছদ আঁকিয়ে বলে অনেকেরই সন্দেহ ছিল তিনি ভালো প্রচ্ছদ আঁকতে পারবেন কিনা। কিন্তু আঁকার পর দেখা গেল, একটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও উঁচু মানের প্রচ্ছদ এঁকে দিয়েছেন তিনি। রং বদল করে তিনটি সংখ্যাতেই একই প্রচ্ছদ ব্যবহার করা হয়েছিল। লিখেছিলেন তখনকার দেশসেরা লেখকেরা।

এই পত্রিকার সূত্রেই প্রথম আমার রণেশ দাশগুপ্তের সঙ্গে পরিচয় হয়। পত্রিকা বের হবার আগে আহমদ ছফা আমাকে তাঁর আবাসস্থল শাঁখারি বাজারের একটি ঘিঞ্জি গলির অন্ধকার ঘরে নিয়ে যান, পরিচয় করিয়ে দেন রণেশ দাশগুপ্তের সাথে। বার্ট্রান্ড রাসেলের ওপর রণেশদাকে একটি লেখা দিতে বললে তিনি তাতে রাজি হন এবং তাঁকে প্রাসঙ্গিক কিছু বইপত্র জোগাড় করে দেবার জন্যে বলেন। বইপত্র জোগাড় হলে সেগুলো দেওয়ার জন্যে আমি ফের রণেশদার বাসায় যাই। আমার সঙ্গে নতুন করে পরিচয় হয় এবং তা ক্রমশ গাঢ় হতে থাকে। আমার সঙ্গে সেই সম্পর্ক তাঁর ভারত চলে যাবার পূর্ব পর্যন্ত অটুট ছিল। কিন্তু আহমদ ছফার সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের একটি দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, যার কারণ আমি কখনো জানতে পারিনি। কিন্তু একদিনের ঘটনা মনে আছে। সেদিন দুপুরবেলা আমি আর ছফা ভাই নিয়মমাফিক বাংলাবাজার যাই। বিউটি বোর্ডিং-এ যাবার পথেই খান ব্রাদার্স প্রকাশনীর বইয়ের দোকান। সেখানে একটা টুলে রণেশদা বসে আছেন। দেখে, ছফা ভাই তড়িঘড়ি ঢুকে রণেশদা সম্পর্কে একটি কটু মন্তব্য করেন। তিনি আকস্মিক মন্তব্যে বেশ বিব্রত বোধ করতে থাকেন। কিন্তু নীরবে কথাগুলো মনোযোগের সঙ্গে শুনে পাশে রাখা ছাতাটা হাতে নিয়ে একটাই মন্তব্য করে উঠে চলে যান, 'দেখো ছফা, আমরা অতো কাঁচা কাজ করি না।' ছফা ভাই কী বোঝেন জানি না। কিছুটা বিকৃত মুখে চুপ করে থেকে আমাকে নিয়ে বিউটি বোর্ডিংয়ে গিয়ে ঢোকেন।

'স্বদেশ' পত্রিকার ব্যাপক চাহিদা হওয়াতে সত্যেনদা ও আলীম ভাই খুব খুশি হন। কিন্তু তিন সংখ্যায় প্রচুর বিজ্ঞাপন পাওয়া সত্ত্বেও প্রকাশকের ভাণ্ডারে তার অর্থ পুরোপুরি জমা না হওয়াতে স্বদেশ লাভের মুখ দেখতে না পাওয়ায় সত্যেনদার পরামর্শে আলীম ভাই পত্রিকাটি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন। এতে আহমদ ছফার সঙ্গে সত্যেন সেনেরও সম্পর্কের অবনতি ঘটে। এই সম্পর্ক সত্যেনদা ভারতে চলে যাওয়ার আগ পর্যন্ত আর কখনো স্বাভাবিক হয়নি।

স্বদেশ পত্রিকার সূত্রেই কবি শামসুর রাহমানের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় হয় পুরান ঢাকার আশেক লেনের বাসায়। আহমদ ছফাই আমাকে সেখানে নিয়ে যান এবং শামসুর রাহমানের সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দেন। এরপর থেকে তাঁর সঙ্গে মৃত্যুর আগ পর্যন্তও আমার গভীর সম্পর্ক ছিল। তিনি আমাকে স্নেহ করতেন। আমি বাংলাদেশে যত কবি দেখেছি কিংবা আমার সঙ্গে পরিচয় হয়েছে, শামসুর রাহমানের মতো নম্র, ভদ্র ও অন্যের প্রতি আন্তরিকতাসম্পন্ন মানুষ আমি আর একজনকেও দেখিনি। বাংলাদেশের এত বড় মাপের জনপ্রিয় কবির মধ্যে কোনো অহংকার তো দূরের কথা, ছোট-বড় সকলকে সম্মান দেখানোতে তাঁর মধ্যে কোনো কৃপণতা কিংবা হীনম্মন্যতা কখনো কাজ করেনি। তাই তিনি সকলকেই আপনি বলে সম্বোধন করতেন। আমাকেও। আমি বিব্রত বোধ করতাম। তাঁকে বহুবার বলেছি, কিন্তু তাঁকে দিয়ে কিছুতেই 'তুমি' সম্বোধন করাতে পারিনি। তবে মৃত্যুর কয়েক বছর আগে, যখন তিনি মাঝেমধ্যেই অসুস্থ হয়ে পড়তেন, তখন তাঁকে নিয়ে আহমদ ছফা পত্রিকায় খুব আক্রমণাত্মক একটি লেখা লিখেছিলেন, অসুস্থ থাকায় তিনি একটি প্রতিবাদপত্র পাঠানোর ব্যাপারে আমার সহযোগিতা চান। মূল বিষয়টি বলে দিয়ে আমাকে লেখাটি তৈরি করে দিতে বলেন। আমি রাতে লিখে পরের দিন সকালে টেলিফোনে তাঁকে শোনাই। তিনি অনুমোদন দেন এবং আমি বাসায় নিয়ে গেলে তাতে স্বাক্ষর করে দেন। আমি সেটা পত্রিকায় পাঠিয়ে দিই। আমার লেখাটিতে তিনি এতটাই খুশি হয়েছিলেন যে, তিনি নিজে থেকেই আমাকে এরপর তুমি বলতে শুরু করেন। আমি অত্যন্ত পুলক বোধ করি। ততদিনে লেখালেখির জগতে আমার একটি অবস্থান তৈরি হয়েছে। ফলে ছফা ভাইয়ের সঙ্গে আমার কিছুটা দূরত্বও বেড়েছে। কিন্তু সেই দূরত্ব আমাদের সম্পর্কে তখনো ফাটল ধরাতে পারেনি। সেটা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের আগের কথা।

১৯৭১-এ আমাদের এমএ ফাইনাল ইয়ারের পরীক্ষা হবার কথা ছিল। কিন্তু আমার হাতে তখন কোনো টাকা-পয়সা নেই যা দিয়ে আমি পরীক্ষার ফি দিতে পারি। কথাটা ছফা ভাইয়ের কাছে গিয়ে বলি। তিনি তত্ক্ষণাত্ ডিরোজিওর ওপর আমাকে একটি বই লিখে ফেলতে বলেন। সত্যি কথা বলতে কি, আমি এর আগে কোনোদিন ডিরোজিওর নামই শুনিনি। কিন্তু সেটা আমি তাঁকে বুঝতে না দিয়ে ডিরোজিওর ওপর দু-একটা রেফারেন্স বই জোগাড় করে দিতে বললে তিনি আমাকে বিনয় ঘোষের 'বিদ্রোহী ডিরোজিও' বইটি জোগাড় করে দেন। আমি গোগ্রাসে তা পড়ে ফেলি এবং বিস্ময়ের সঙ্গে ভারতের নবজাগরণের অগ্রদূত এক কম বয়সী মহামানবের জীবনের কথা জেনে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যাই। এরপর থেকে চলে আমার অনুসন্ধানের পালা। তখন বাংলাদেশে ওই বিদ্রোহী ডিরোজিও ছাড়া আর কোনো বই পাওয়া যেত না। ফলে একটি পূর্ণাঙ্গ বই লেখার জন্যে যে সহায়ক গ্রন্থ দরকার, তা না পেয়ে আমাকে ঊনবিংশ শতাব্দীর ওপর যত ধরনের বই আছে, তা খুঁজে বের করতে হয়। আমি ডিরোজিও সম্পর্কে যেখানে যতটুকু তথ্য পাই, তা-ই সংগ্রহ করি। ফলে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরি, পাবলিক লাইব্রেরি, ব্রাহ্মসমাজ লাইব্রেরি, লালকুঠি লাইব্রেরিতে তন্নতন্ন করে খুঁজে বেশকিছু তথ্য সংগ্রহ করি। প্রায় একটানা ছ-মাস পরিশ্রম করে তথ্য সংগ্রহের পর আমি মাত্র দু-মাসেই বইটি লেখা সম্পূর্ণ করি। লেখাটি শেষ হবার পর ছফা ভাই আমাকে নিয়ে যান বাংলাবাজারের বিখ্যাত প্রকাশক নওরোজ কিতাবিস্তানের মালিক শিশুসাহিত্যিক মোহম্মদ নাসির আলীর কাছে। পাণ্ডুলিপিটি তাঁকে দিয়ে ছফা ভাই সেটি ছাপতে তাঁকে অনুরোধ জানান। তিনি পাণ্ডুলিপিটি রেখে পরের দিন আমাকে যেতে বলেন। পরের দিন সকালের দিকে নাসির আলী সাহেবের কাছে দুরু দুরু বক্ষে উপস্থিত হলে তিনি বইটি ছাপার প্রতিশ্রুতি দেন এবং অগ্রিম হিসেবে আমাকে দু-শা টাকা দেন। আমি উল্লসিত আনন্দে টাকা হাতে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসি। দু-শ টাকা! ১৯৭১ সালে সেটা অনেক টাকা! এত টাকা দিয়ে আমি কী করব? ওই টাকা থেকে আমি আমার পরীক্ষার ফি বাবদ ষাট টাকার মতো খরচ করি। আর বাকি টাকা খরচ করার জায়গা কোথায়? আমি পান-বিড়ি, সিগ্রেট খাই না। অন্য কবিদের মতো গাঁজা, মদও পান করি না! ফলে আমি বেশ কিছুদিন নিশ্চিন্ত মনে চলি।

ওই সময়ে নির্মলেন্দু গুণ প্রবল জনপ্রিয় কবি। খান ব্রাদার্স থেকে তার 'প্রেমাংশুর রক্ত চাই' কাব্যগ্রন্থটি বেরিয়ে গেছে। ওই গ্রন্থের প্রথম কবিতা 'হুলিয়া' তখন তরুণ কবি ও রাজনৈতিক কর্মীদের মুখে মুখে। তার বিচিত্র বোহেমিয়ান জীবনও কিংবদন্তির মতো তরুণদের ভীষণভাবে প্ররোচিত করে। তখন হাইকোর্টের মাজারে নিয়মিত গাঁজার আসর বসত। নির্মলেন্দু গুণের নেতৃত্বে হাইকোর্টের মাজার তখন তরুণ কবিদের তীর্থক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল। আমি বরাবরই এসব থেকে সযত্নে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতাম। তাই ওদের সঙ্গে কখনো-সখনো হাইকোর্টের মাজারে গেলেও ওসব খেতে আমাকে কেউ প্ররোচিত করতে পারেনি। আমি কখনো মনে করিনি, কবিতা লেখার জন্যে ওসব খাওয়া বা পান করার প্রয়োজন আছে। আমার ৪৮ বছরের কবিজীবনে আমি সেটা অব্যাহত রাখতে পেরেছি। কবি মহাদেব সাহাও অনেকটাই সাত্ত্বিক ধরনের মানুষ। তার সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটে 'পূর্বদেশ' পত্রিকার সূত্রে। তিনি রাজশাহীতে পড়াশোনা করেছেন বলে তার সঙ্গে পরিচয় হয়েছে পরে। 'দৈনিক পূর্বদেশ'-এ চাকরির প্রস্তাব পেয়ে তিনি রাজশাহী থেকে ঢাকায় আসেন। আমি মাঝেমধ্যেই তার সঙ্গে দেখা করতে পূর্বদেশ অফিসে যেতাম। আমার বন্ধু হেলাল হাফিজ কিছুদিন ওই পত্রিকার সাহিত্যপাতার সম্পাদক, আমিও তাই পূর্বদেশের নিয়মিত লেখক। হেলাল থাকাতে সেখানে আমার বেশকিছু লেখা ছাপা হয়েছে। হেলালের সঙ্গে আমার পরিচয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালে। সেই থেকে আজও আমাদের বন্ধুত্ব অব্যাহত আছে।

বিউটি বোর্ডিংয়ের ব্যাপারে আবার একটু ফিরে আসি। প্রতিদিন সন্ধ্যায় লেখক-সাহিত্যিকদের মিলনস্থল ছিল ওই বোর্ডিং। এর মালিক ছিলেন প্রহ্লাদ সাহা। তিনি নিজেই কাউন্টারে বসতেন। এটি ছিল হোটেল কাম রেস্টুরেন্ট। রেস্টুরেন্টটিতে খুব বেশি লোকের স্থান হতো না। ফলে বাইরের প্রাকৃতিক পরিবেশে অনেকেই চেয়ার নিয়ে বসতেন। অনেক রাত অব্দি আড্ডা চলত। ওখানেই আমার সঙ্গে কবি আল মাহমুদের প্রথম সাক্ষাত্ হয়। তখন তাঁর 'লোকলোকান্তর' কাব্যগ্রন্থটি বেরিয়ে গেছে। ফলে কবিতার জগতে তিনি নিজের অবস্থানটিও পাকাপোক্ত করে নিয়েছেন। আল মাহমুদ খুব ব্যক্তিকেন্দ্রিক ছিলেন। অন্যের কথা তিনি খুব একটা ভাবতেন না। নিজের ব্যাপারে তিনি ছিলেন খুবই সতর্ক। ইত্তেফাক পত্রিকায় তখন তিনি প্রুফ রিডারের চাকরি করতেন। ক্লাস টেন পর্যন্ত পড়ার পর তাঁর আর লেখাপড়া করা হয়নি। সেজন্যে এক ধরনের হীনম্মন্যতাবোধেও ভুগতেন বলে আমার মনে হয়েছে। অন্যকে ছোট করে দেখবার প্রবণতা তাঁর মধ্যে প্রবল ছিল। কিন্তু কবিতা ভালো লিখতেন বলে অনেকেই তাঁকে সমীহ করত। আমিও। সেই সময় চট্টগ্রামের বইঘর থেকে সৈয়দ আলী আহসানের 'সহসা সচকিত', শামসুর রাহমানের 'বিধ্বস্ত নীলিমা', আল মাহমুদের 'কালের কলস' এবং শহীদ কাদরীর 'উত্তরাধিকার' নামে খুব আকর্ষণীয় সুসজ্জিত চারটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। এর নেপথ্যে ছিলেন বিখ্যাত শিশুসাহিত্যিক এখলাসউদ্দিন আহমদ। বই চারটি প্রকাশিত হবার পর লেখকমহলে ব্যাপক সাড়া পড়ে যায়। বাকি তিন জনের সঙ্গে আল মাহমুদের বইটি বের হওয়াতে কবি হিসেবে তাঁর গুরুত্বও বেড়ে যায়। আমার সঙ্গে পরিচয়ের পর তাঁর সঙ্গে আমারও একটা আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বিভিন্ন সময় তাঁর সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে যাই। কিন্তু তিনি কখনো আমাকে কারও সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন না। আমি নির্বোধের মতো বসে থাকি। এভাবে অনেকদিন গেলে তাঁর কাছ থেকে কোনো সাহিত্যিক সহযোগিতা না পাওয়াতে আমি দূরে সরে আসি। ১৯৭৩ সালের দিকে তাঁর সঙ্গে আবার আমার যোগাযোগ হয়। তিনি তখন 'দৈনিক গণকণ্ঠ' পত্রিকার সম্পাদক। ওই পত্রিকার ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ছিলেন আফতাবউদ্দিন আহমদ (পরে যিনি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য হয়েছিলেন এবং নিজ বাড়িতে আততায়ীর হাতে খুন হয়েছিলেন)। তিনি জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের রাজনীতির সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। আফতাব আমার ছোট বোন লীলা সাহার সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একসঙ্গে পড়তেন। তিনি একদিন জগন্নাথ হলের ক্যাফেটারিয়ায় বিকেলে খেতে আসেন। তখন আমার সঙ্গে তার দলেরই জগন্নাথ হল ছাত্রশাখার এক নেতা লক্ষীকান্ত সাহা আফতাবের সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দেন। আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন সবে শেষ হয়েছে। পরিচয়পর্ব শেষ হবার পর তিনি গণকণ্ঠে আমাকে কাজ করার প্রস্তাব দিলে আমি অগ্রপশ্চাত্ বিবেচনা না করে তাতে রাজি হয়ে যাই। পরের দিনই আমি সেখানে ফিচার রাইটার হিসেবে যোগ দিয়ে আসি। আল মাহমুদ আমাকে সেখানে দেখে বিস্মিত হন। তবে আমাকে স্বাগতও জানান। এরপর প্রায় দু-বছর আমি তার সঙ্গে কাজ করি। আমার খুব দ্রুত প্রমোশন হয় এবং আমি সহকারী সম্পাদক হিসেবে পদোন্নতি পাই। সেখানে তখন কাজ করতেন কবি আবু কায়সার। তার আগে এখানে কাজ করে গেছেন কবি নির্মলেন্দু গুণ। আল মাহমুদসহ তিন তিনজন কবি এখানে কাজ করার পর আমি চতুর্থ কবি হিসেবে এখানে যোগদান করি। পরে অবশ্য আর একজন কবিও এসে এই পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত হন। তিনি আবু করিম। আবু কায়সারের সঙ্গে আগে পরিচয় থাকলেও তেমন নিবিড় সম্পর্ক ছিল না। এখানে আসার পর সেই সম্পর্কটা তৈরি হয়। পত্রিকাটি ছিল ঘোরতর আওয়ামী লীগ ও তত্কালীন সরকারবিরোধী পত্রিকা। ফলে ওখানে এমন সব লেখা লিখতে হয়, যা ছিল আমার জন্যে বিব্রতকর। কিন্তু বিকল্প চাকরির জোগাড় করতে পারছিলাম না বলে ওখানেই আরও বেশ কিছুদিন থেকে যেতে হয় এবং প্রতিনিয়ত আমাকে বিষ হজম করতে হয়। এই অবস্থায় বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে এবং রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে ক্রমাগত এই পত্রিকাটির বিরূপ অপপ্রচারের ফলে এবং ছোটদের পাতায় বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে একটি তীব্র আপত্তিকর লেখা ছাপা হওয়ায় সরকার এটিকে বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন। ফলে অন্যদের সঙ্গে আমিও বেকার হয়ে পড়ি। আল মাহমুদকে জেলে যেতে হয়। কিন্তু আমি আর আল মাহমুদ শাহজাহানপুরে কাছাকাছি থাকতাম বলে বঙ্গবন্ধুর বদান্যতায় আল মাহমুদ জেল থেকে ছাড়া পেলে প্রায় প্রতিদিনই বিকেলে তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হয়। তিনি রোজ বিকেলে আমার বাসায় চা পান করতে আসেন। আমি যতদিন শাহজাহানপুরে ছিলাম, এটা ছিল প্রায় একটা রুটিনমাফিক ঘটনা। এই সূত্রে আল মাহমুদের সঙ্গে আমার খুব নিকট-সম্পর্ক গড়ে ওঠে। শাহজাহানপুর থেকে চলে আসার পর আল মাহমুদের চিন্তার ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন হবার ফলে তাঁর সঙ্গে আমার প্রায় দেখাই হয়নি বললেই চলে।

বিউটি বোর্ডিংয়েই আমি প্রথম নির্মলেন্দু গুণকে দেখতে পাই। আবুল হাসানকেও। আড্ডা দিতে দিতেই এদের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়ে যায়। পরিচয় থেকে ঘনিষ্ঠতা। সেখানে আর দুজন মানুষের সঙ্গেও আমার পরিচয় হয়, যারা কবি নন, কথাসাহিত্যিক। একজন কায়েস আহমেদ, অন্যজন বুলবুল চৌধুরী। দুজনেরই বেশ নামডাক ছিল। তখন বাংলাবাজার থেকে 'জোনাকি' নামে একটি মাসিক পত্রিকা বের হতো। বুলবুল চৌধুরী ওখানে নিয়মিত লিখতেন এবং যেতেনও। তিনিই আমাকে সেখানে নিয়ে যান। তখন ওখানে ইমদাদুল হক মিলনও যেতেন। কিন্তু লেখক হিসেবে তার তেমন গুরুত্ব ছিল না। তিনি এসে চুপচাপ বসে থাকতেন। বুলবুলই তখন মধ্যমণি। তার গুরুত্বই ছিল সর্বাধিক।

কায়েস আহমদ ভালো গল্প লিখতেন। তিনি পশ্চিমবঙ্গ থেকে আসা উদ্বাস্তু। ফলে তার লেখার মধ্যে উদ্বাস্তুদের জীবনের ছবি আন্তরিকতার ছোঁয়ায় উদ্ভাসিত ছিল। ব্যবহারে অমায়িক, নিচুস্বরে কথা বলতেন। আমার সঙ্গে কায়েস আহমদ ও বুলবুল চৌধুরীর একটা গভীর বন্ধুত্ব হয়ে যায়। বিশেষত বুলবুল চৌধুরীর বাসায় আমার মোটামুটি নিয়মিতই যাতায়াত ছিল। তবে কায়েসের ওখানে কখনো যাওয়া হয়নি। হয় বিউটি বোর্ডিং অথবা বাংলাবাজারের রাস্তায় তার সঙ্গে আমার প্রায়ই দেখা হতো। আমরা খুব নিবিড় বন্ধু হয়ে উঠেছিলাম। সংসারে অশান্তির কারণে আমাদের এই বন্ধু আশির দশকে আত্মহত্যা করেছিলেন। সেটা ছিল আমাদের সকলের জন্যই একটি মর্মান্তিক দুঃসংবাদ।

শহীদ কাদরী তখন নামকরা কবি। তাঁকে আমি ওখানে মাঝে মধ্যে দেখেছি। তবে তাঁর সঙ্গে তখন আমার অতি সাধারণ পরিচয় ছিল, ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠেনি। আমাদের খ্যাতিমান সাহিত্যিকদের অনেকেই তখন গুলিস্তানের 'রেক্স' রেস্তোরাঁয় আড্ডা দিতেন। তাদের মধ্যে একটা বনেদি ভাব ছিল। কিন্তু স্বাধীনতার আগে আমি কখনো রেক্স রেস্তোরাঁয় যাইনি। ফলে তখনো সৈয়দ শামসুল হক, সিকদার আমিনুল হক, আসাদ চৌধুরী কিংবা রফিক আজাদ প্রমুখের সঙ্গে পরিচয় হয়নি।

আমি সৈয়দ শামসুল হককে প্রথম দেখি সদরঘাটের শঙ্কর বোর্ডিংয়ের দোতলার ছাদে চলচ্চিত্রজগতের বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে। বিকেলে তিনি সেখানে নিয়মিত আড্ডা দিতেন। আমি ১৯৬৭ সালের দিকে ঢাকায় এসে সেই হোটেলে উঠি। এর আগে সৈয়দ শামসুল হকের লেখা আমি চলচ্চিত্র পত্রিকা সাপ্তাহিক 'চিত্রালী'তে প্রথম পড়ি। তাঁর ছবিও দেখি ওখানেই। ফলে তাঁকে প্রথম দর্শনেই চিনতে আমার কষ্ট হয়নি। তখন আমি মাত্র উচ্চমাধ্যমিকে পড়ি এবং বছর তিনেক হলো ঢাকার পত্রিকায় লিখি। ফলে সাহস করে হক ভাইয়ের সঙ্গে গিয়ে পরিচয় করতে পারিনি। সেই হক ভাইয়ের সঙ্গে আমার নিবিড় সখ্য গড়ে ওঠে দেশ স্বাধীন হবার অনেক পরে, জাতীয় কবিতা পরিষদের জন্মের সময়। আমি বরাবরই একটু সাহসী ছিলাম। সত্য কথা অকপটে বলে দিতে আমি কাউকেই পরোয়া করতাম না। আমার এই সাহসকে হক ভাই সব সময় প্রশংসা করতেন, এখনো করেন। এমনকি ভাবি কথাসাহিত্যিক আনোয়ারা সৈয়দ হকও আমাকে খুবই পছন্দ করেন। হক ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয় হবার আগে তাঁর একটি গল্পের বই 'রক্তগোলাপ' পড়ে আমি এতটাই অভিভূত হয়েছিলাম যে, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ তাঁর 'কণ্ঠস্বর' পত্রিকায় বাংলাদেশের ছোটগল্প সম্পর্কে আমাকে একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখতে বললে আমি প্রায় ছয় মাস ব্যাপকভাবে দুই বাংলার গল্পকারদের গল্প পাঠ করে 'এদেশের গল্প : পূর্ণতা-অপূর্ণতা' নাম দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের গল্পের সঙ্গে তুলনামূলক একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখি। ওই সময়েই 'রক্তগোলাপ' বইয়ের রক্তগোলাপ নামগল্পটি পড়ে আমি বিস্মিত হই। বাংলাদেশে এ ধরনের গল্প কেউ লিখতে পারেন, এই গল্প পড়ার আগে তা আমার ধারণার বাইরে ছিল। আমি আমার গল্পের আলোচনায় সৈয়দ শামসুল হক সম্পর্কে একটি বিস্তৃত আলোচনা করি এবং তখন থেকে তাঁর গল্পের আমি ভক্ত হয়ে উঠি। কিন্তু আমার ওই প্রবন্ধটি সম্ভবত হক ভাইয়ের নজরে পড়েনি। পরবর্তীকালে যখন তাঁর সঙ্গে আমার একটা নিবিড় সম্পর্ক গড়ে ওঠে, তখনো তাঁর কণ্ঠে ওই প্রবন্ধ সম্পর্কে কোনো কথা না শোনাতে আমার এ ধারণা হয়েছে। এর পরে তাঁর কবিতা এবং সার্বিকভাবে সব্যসাচী লেখক সম্পর্কে আমি দুটি আলোচনা লিখি। তিনি আমাকে আরও নিবিড় নৈকট্যে কাছে টেনে নেন।

পাকিস্তান আমলে ঢাকাসহ সারা বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর একুশে ফেব্রুয়ারিতে অসংখ্য সাহিত্য সংকলন বের হতো। তাতে তখন আমি কত যে কবিতা লিখেছি, তা হিসাব করে বলা মুশকিল। কবিতা কতটা ভালো হচ্ছে, তারচেয়েও নিজের উপস্থিতির জানান দিতেই অনেক ফরমায়েশি লেখা লিখেছি। এখন মনে হয়, সেগুলোর শিল্পমূল্য কিছুই ছিল না। তবে সেসব কবিতার অধিকাংশই আমার হাতে নেই বলে তা বিচার করার সুযোগও আমার নেই। স্বাধীনতার পরেও এই ধারাটা অব্যাহত ছিল। কিন্তু ১৯৭৫ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর এক্ষেত্রে বন্ধ্যাত্ব নেমে আসে। ফলে সংকলন প্রকাশের প্রবাহ বলতে গেলে সম্পূর্ণত বন্ধই হয়ে যায়। আমাদের লেখার ক্ষেত্রটাও সংকুচিত হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশের বেশিরভাগ লেখকের সঙ্গে আমার পরিচয় হয় দেশ স্বাধীন হবার পর। কবীর চৌধুরী, আহমদ রফিক, সৈয়দ শামসুল হক, আসাদ চৌধুরী, রফিক আজাদ, সিকদার আমিনুল হক, সুব্রত বড়ুয়া, তপন চক্রবর্তী প্রমুখের সঙ্গে পরিচয় বাহাত্তর সালে। আরও যে সব লেখক আছেন, প্রায় প্রত্যেক লেখকের সঙ্গেই আমার নিবিড় পরিচয় আছে। তারা প্রত্যেকেই আমাকে স্নেহ করেন, ভালোবাসেন, শ্রদ্ধা করেন। এ আমার পরম প্রাপ্তি। ১৯৬৯ সাল থেকে বাংলা একাডেমীতে আমার নিয়মিত যাতায়াত। সেখানেই তাঁদের সঙ্গে আমার পরিচয় ও নিবিড় সখ্য। অবশ্য স্বাধীনতার আগেই বাংলা একাডেমীতে সরদার ফজলুল করিমের সঙ্গে আমার দেখা হয়। তিনি তখন বাংলা একাডেমীর কালচারাল অফিসার ছিলেন। বর্ধমান হাউসের একতলায় বসতেন। আমি সরদার ভাইয়েরও নিবিড় ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছি। বাংলা একাডেমীতে গেলেই তিনি হাসিমুখে আমাকে বরণ করে নিতেন। সেই সম্পর্ক সুদীর্ঘদিন অটুট ছিল। এখন তিনি বয়সের ভারে ন্যুব্জ। তাই বাড়ি থেকে বের হন না। আমার সঙ্গে আর তেমন দেখাও হয় না। কিন্তু স্মৃতির জানালা খুলে বসলে এক ঝলক দমকা হাওয়ার মতো তাঁদের সঙ্গে সান্নিধ্যের স্মৃতি আমাকে আবিষ্ট করে রাখে।

১৯৭২ সালে কবি রফিক নওশাদ 'কালপুরুষ' নামে একটি মাসিক পত্রিকা এবং 'সূচিপত্র' নামে একটি গল্পপত্রিকা বের করেন। আমি ওই পত্রিকার প্রায় প্রতিটি সংখ্যাতেই হয় কবিতা, না হয় প্রবন্ধ লিখেছি। পত্রিকাটি ছিল অত্যন্ত সুদৃশ্য। তাই সকল কবিই ওই পত্রিকায় লেখার জন্য ব্যগ্র হয়ে থাকত। ওই পত্রিকাকে কেন্দ্র করেই রফিক নওশাদের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। শাহযাদ ফেরদাউস নামে আমার এক বন্ধু, যার সঙ্গে একাত্তরের সময় কোলকাতায় আমার পরিচয় হয়েছিল এবং গভীর বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল, রফিক নওশাদের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় করিয়ে দেয়।

ওই সময়ে, বর্তমানে আইন প্রতিমন্ত্রী এডভোকেট কামরুল ইসলাম 'কালস্রোত' নামে একটি মাসিক সাহিত্য পত্রিকা বের করেন। পত্রিকাটি দীর্ঘদিন তার অস্তিত্ব বজায় রাখতে পেরেছিল। কামরুলের একটি ছাপাখানা ছিল লালবাগের হরনাথ ঘোষ রোডে। সেখানে আমাদের অনেকেরই নিয়মিত যাতায়াত ছিল। ওখানেও আমার প্রচুর কবিতা ও প্রবন্ধ ছাপা হয়েছিল। বলতে গেলে আমি ছিলাম তার নিয়মিত লেখক। এ সময়েই আরও একটি পত্রিকা সকলের দৃষ্টি আকৃষ্ট করেছিল। সেটি সালাউদ্দিন জাকীর 'সপক্ষে'। ট্যাবলয়েড সাইজের ওই পত্রিকাটি সব দিক দিয়েই ছিল সৌকর্যমণ্ডিত। ওখানেও আমার কয়েকটি লেখা ছাপা হয়। কিন্তু অনিবার্য কারণে পত্রিকাটি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।

আসলে সে-সময়ে স্বাধীনতাপ্রাপ্তির উচ্ছল আবেগে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সঙ্গে লেখক-কবিদের মধ্যেও এক ঘন আবেগের জোয়ার সৃষ্টি হয়। ফলে তখন ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে থেকে কত অসংখ্য লিটল ম্যাগাজিন যে বেরুত, তা গণনা করে বলা মুশকিল। আর সেখানে লেখার চাহিদা বেড়ে যাওয়াতে প্রচুর লিখতে হয়েছে। আমি যখন প্রথম প্রথম প্রবন্ধ লিখি, তা ছিল অত্যন্ত দুরূহ শব্দ-ভারাক্রান্ত। পাণ্ডিত্য দেখাবার সৌখিন বাহাদুরি তাতে দৃষ্টির অগোচর থাকেনি। যেন অভিধানের সবচেয়ে পাথরভারী শব্দগুলোকে জোর করে বসিয়ে দিয়ে নিজের পাণ্ডিত্য জাহির করাই সেখানে মুখ্য ছিল। তাই এখন সেসব প্রবন্ধ পড়তে গেলে যেমন কৌতুক বোধ করি, একই সঙ্গে লজ্জা এসেও ঘিরে ধরে। এই অপপ্রয়াসের হাত থেকে আমাকে বাঁচিয়ে দেন কবি আহসান হাবীব।

১৯৭৪ সালের প্রথম দিকে আমি আহসান হাবীবের কাছে যাই। কিন্তু একা যাবার সাহস ছিল না। তাই কবি মাশুক চৌধুরীকে সঙ্গে করে নিয়ে যাই। মাশুকের সঙ্গে হাবীব ভাইয়ের ভালো সম্পর্ক ছিল। তিনি বসতেন দৈনিক পাকিস্তান অফিসের চার তলার একটি ভীষণ অপ্রশস্ত কক্ষে। আগে পাঠ্যপুস্তকে তাঁর কবিতা পড়েছি, বিচ্ছিন্নভাবে আধুনিক কবিতাও পড়েছি। কিন্তু রাশভারী ব্যক্তিত্বশীল মানুষটির কাছে প্রথম যেতে গিয়ে আমার বুক দুরু দুরু করে কাঁপতে লাগল। মাশুক আমাকে নিয়ে হাবীব ভাইয়ের ঘরে ঢুকল। আমার মনে হলো, আমি কোনো স্বপ্নপুরুষের ঘরে ঢুকেছি। আমাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হলো। তিনি আমাকে চিনলেন। এবং মৃদু কণ্ঠস্বরে বসতে বললেন। একটি টেবিলের ওপাশে আহসান হাবীব। আর সামনে তার টেবিলের ডান পাশে রাখা দুটো চেয়ার। মাশুকের কুশল জানতে চাইলেন। আমার সঙ্গে দু-একটা ছোটখাটো কথা বলে জানতে চাইলেন, কী জন্যে এসেছি। আমি কম্পিত হাতে তাঁর দিকে একটি প্রবন্ধ বাড়িয়ে দিলাম। তিনি ওটা হাতে নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখে বললেন, 'এটা তো ভাই আমি ছাপতে পারব না। এটা দৈনিক পত্রিকার সাহিত্যপাতার উপযোগী লেখা হয়নি। এত জটিল জটিল শব্দ ব্যবহার করে প্রবন্ধ লিখেছ কেন?'

হাবীব ভাইয়ের কথায় স্পষ্টত আমি বিব্রত বোধ করলাম। আমার শরীরের ভেতর দিয়ে এক ধরনের শীতল প্রবাহ বয়ে যেতে লাগল। আমি ভেতরে ভেতরে কাঁপতে লাগলাম। আমি একজন পরিচিত প্রবন্ধকার। সকলেই দ্বিধাহীনভাবে আমার প্রবন্ধ ছাপেন। আমি যখন এরকম ভাবছি, তখনই হাবীব ভাই একটি মোক্ষম কথা বললেন, 'কিছু মনে কোরো না। এই লেখাটিই তুমি সহজ ভাষায় লিখে নিয়ে এস। আমি ছাপব।'

হাবীব ভাইয়ের কথায় কিছুটা স্বস্তি ফিরে এলাম। কিন্তু প্রবন্ধটি হাতে নিয়ে দ্রুত বাইরে বেরিয়ে এসে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।

একদিন আমি সত্যি সত্যি খুব সহজ ভাষায় লিখে নিয়ে একাই তাঁর কাছে গিয়ে প্রবন্ধটি দিয়ে এলাম। হাবীব ভাই ছাপলেন। আমি আনন্দে উত্ফুল্ল হয়ে উঠলাম। এরপরে গেলাম কবিতা নিয়ে। তিনি কোনো কথা না বলে সেটাও নির্দ্বিধায় ছাপলেন। আমার দৈনিক বাংলার সাহিত্যপাতায় প্রাথমিক অভিযান শেষ হলো। এরপর হাবীব ভাই সাধারণ ও বিশেষ সংখ্যায় আমার কত যে কবিতা ও প্রবন্ধ ছেপেছেন, তা গণনা করে বলা মুশকিল। লেখা ছাপতে ছাপতে এবং ঘন ঘন যেতে যেতে হাবীব ভাই আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে গেলেন। যতদিন তাঁর কাছে গিয়েছি, মধুর আপ্যায়নে আমার সঙ্গে কত যে গল্প করেছেন, আজ ভাবলে আমার খুবই অবাক লাগে। আপাতরাশভারী একজন মানুষের মধ্যে এতটা যে সহানুভূতির উচ্ছল উষ্ণধারা প্রবাহিত হতে পারে, তা তাঁকে কাছে থেকে না দেখলে বোঝা মুশকিল। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত হাবীব ভাইয়ের সঙ্গে আমার এই সম্পর্ক অটুট ছিল।

মাশুক চৌধুরী চিরকালই লাজুক এবং অত্যন্ত সত্ চরিত্রের একজন মানুষ ছিলেন। আমার বেকারত্বের দিনে লক্ষ্মণ যেমন রামের ছায়াসহচর ছিলেন, তেমনি মাশুকও যেন ছিলেন তা-ই। বন্ধুর জন্যে এরকম সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার মতো আর একজন কবিকেও আমার জীবনে পাইনি। আমার স্ত্রী কবি অঞ্জনা সাহা তাই সব সময় মাশুককে বলতেন রামের ভাই লক্ষ্মণ। বেকারত্বের ঘুণ যখন আমাকে তিলে তিলে নিঃশেষ করে দিচ্ছিল, সেই সময়ে আমাকে সাহস দিয়ে, আর্থিক সহযোগিতা দিয়ে এবং প্রায় সার্বক্ষণিক আমার পাশে থেকে যে সহযোগিতা তিনি করেছেন তার তুলনা মেলা ভার। তাই মাশুকের কাছে আমার ঋণ অপরিসীম, যা কোনোদিন শোধ হবার নয়। কবি হিসেবেও তার হাত ছিল ভারি মিষ্টি। প্রেমের কবিতায় তার অনায়াস দক্ষতা তখন কবি হিসেবে তাকে যে স্বীকৃতি দিয়েছিল, জীবন ও জীবিকার তাগিদে তা তিনি তেমনভাবে ধরে রাখতে না পারলেও তার 'বকুল বাগানে একা' কাব্যগ্রন্থটি আজও আমার হূদয় ছুঁয়ে যায়।

আমার জীবনে লেখক ও কবি আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের ভূমিকার কথা উল্লেখ করতে গেলে বিনম্র শ্রদ্ধায় মাথা নুয়ে আসে। তিনি আমার জীবনের দুঃসময়ের সবচেয়ে বড় কাণ্ডারি। লেখালেখির সূত্রেই তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয়। তিনি তখন ঢাকা কলেজের বাংলার অধ্যাপক এবং থাকেন গ্রিন রোডের সরকারি কোয়ার্টারে। ১৯৭৫ সালে আমি বেকার অবস্থায় দুঃসহ জীবন নিয়ে ঢাকার রাস্তায় রাস্তায় ঘুরি। সেই দুঃসময়ে সায়ীদ ভাই ও ভাবির যে আন্তরিক সান্নিধ্য পেয়েছি, তা ভাবলে আজও আমার চোখে জল আসে। আমি তখন শাহজাহানপুরে কম ভাড়ার একটি বাসায় থাকি। কিন্তু বেকার হওয়াতে সেই ঘরভাড়া দিতেও আমাকে হিমশিম খেতে হয়। একটি চাকরির সন্ধানে আমি বিভিন্ন স্থানে যেতে থাকি। কিন্তু কারোরই তেমন সহযোগিতা পাই না। দিনে দিনে আমার শরীর কৃশকায় হতে থাকে। এমনকি সামান্য বাসভাড়া জোগাড় করতে না পারায় আমি শাহজাহানপুর থেকে বাংলা একাডেমীতে হেঁটে আসি, সেখান থেকে হেঁটে বাংলা বাজার যাই। বিভিন্ন বইয়ের দোকানে গিয়ে বসি, যদি কোনো কাজ পাওয়া যায়! কিন্তু কাজ জোটে না। প্রায় প্রতিদিনই ব্যর্থমনোরথ হয়ে ফিরে আসি। একবুক হতাশা আর ক্লান্তির ভারে দেহ অবশ হয়ে আসতে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় থাকলে দুপুর হলেই হাঁটতে হাঁটতে সায়ীদ ভাইয়ের বাসায় যাই। মধ্যাহ্নভোজের সুযোগ গ্রহণ করি। এই যে আকস্মিকভাবে দুপুরে কারও বাসায় যাওয়া, তাতে সকলেরই বিরক্ত হবার কথা। কিন্তু সায়ীদ ভাই কিংবা ভাবিকে কোনোদিন তা হতে দেখিনি। বরং তারা গভীর মমতায় আমাকে প্রশ্রয় দিয়ে আমাকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করেন। সায়ীদ ভাইয়ের মা, ভাই ও বোনরা, আমরা শাহজাহানপুরে যে বাসায় ভাড়া থাকতাম, তার পাশেই নিজস্ব বাড়িতে থাকতেন। তাদের সঙ্গেও আমার খুব নিবিড় সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সায়ীদ ভাই তখন আমার জন্যে একটা চাকরির জোর চেষ্টা করতে থাকেন।

সে সময়ে বগুড়ার ডিসি পদ থেকে বদলি হয়ে কবি মনজুরে মওলা ঢাকায় আসেন। বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন সংস্থার পরিচালক (প্রশাসন) হিসেবে যোগদান করেন। সায়ীদ ভাইয়ের বাসায় তাঁর সঙ্গে আমার দেখা। সায়ীদ ভাই আমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে আমার জন্যে একটি চাকরির ব্যবস্থা করার কথা বললে তিনি রাজি হন। কিছুদিন পরে পত্রিকার পাতায় বিজ্ঞাপন প্রদান করা হয়। ওই প্রতিষ্ঠানের সহকারী পরিচালক পদসহ আরও অনেকগুলো পদের জন্যে। মওলা ভাই আমাকে সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ) পদের জন্যে আবেদন করতে বলেন। আমি যথারীতি আবেদন করি। আবেদন করার অল্প কিছুদিন পর জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক সরদার জয়েনউদ্দিনের আমন্ত্রণে খুলনার বইমেলায় যাই। সেখান থেকে ফেরার পথে মাদারীপুরের বাড়িতে গিয়ে দুদিন থেকে ফের ঢাকায় চলে আসি। ফিরে তার পরের দিন মুক্তধারার ফরাসগঞ্জ অফিসে গেলে সেখানে মওলা ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হয়। তিনি আমাকে বলেন, 'আরে অসীম, আপনি কোথায় ছিলেন? আপনাকে খুঁজে হয়রান। আপনার চাকরিটার ব্যাপারে ভেবেছিলাম, সকলের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেব। কিন্তু সেটা তো হলো না। আমি তো কাল সকালে আমেরিকা চলে যাচ্ছি।' আমি হতাশ হয়ে পড়লাম। মওলা ভাই না থাকলে তো এ চাকরি হওয়া অসম্ভব। সে কথা চিন্তা করে ইন্টারভিউয়ের দিন আমি আর উপস্থিত হইনি। ফলে আমার বেকারত্বের দিন কাটে না। আবার পথে পথে ঘুরি। কোনোদিন খাই, কোনোদিন খাই না। বিভিন্ন পত্রিকায় লিখি, নানা ধরনের ফরমায়েশি লেখা। তাতে মাঝেমধ্যে কিছু কিছু টাকা পাই। তখন খাওয়া হয়। আবার অনাহারের দিন বিস্তৃত হতে থাকে। এভাবে চলতে চলতে 'ইমপ্রেশন' বলে একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থায় আমাকে একটা চাকরি জোগাড় করে দেন প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক এবং হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশনের জনসংযোগ অফিসার সিদ্দিকুর রহমান। তিনি আমাকে ভালোবাসতেন। তাঁর কথাতে প্রতিষ্ঠানটির মালিক আমাকে কপি রাইটারের একটি পার্টটাইম চাকরি দেন। মাসে ৫০০ টাকা বেতন। এটা ১৯৭৫ সালের শেষের দিকের কথা। এই চাকরি আমাকে এক দুঃসহ জীবনের অভিশাপ থেকে কিছুদিনের জন্য মুক্তি দেয়। জামিল ভাই আমার কপি রাইটিং-এ খুব খুশি হন। তিনি কখনো আমার সঙ্গে মালিক-কর্মচারির মতো ব্যবহার করেননি। কবি হিসেবে যতটুকু মর্যাদা দেওয়া দরকার, তারচেয়েও বেশি আমাকে দিয়েছেন। এ এক দুর্লভ অভিজ্ঞতা!

ইমপ্রেশনে আমাকে খুব বেশিদিন চাকরি করতে হয়নি। তখন মাঝেমধ্যে আমি প্রেসক্লাবে যেতাম। সেখানেই একদিন কথাসাহিত্যিক রাহাত খানের সঙ্গে দেখা। তিনিই আমাকে ডেকে বলেন, 'ইত্তেফাক ভবন থেকে আমরা একটা সাপ্তাহিক পত্রিকা বের করছি। আপনি আমাদের সঙ্গে কাজ করেন।' ১৯৬৫ সাল থেকেই আমার সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা। ফলে আমি এই

প্রস্তাব লুফে নিই এবং পরের দিনই ইত্তেফাক অফিসে গিয়ে রাহাত ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করি। তিনি আমাকে রোববারে একটা চাকরি দেন। ১৯৭৬-এ আমি রোববার-এ সহকারী সম্পাদক হিসেবে যোগদান করি। সম্পাদক হিসেবে কবি রফিক আজাদ নিয়োগপ্রাপ্ত হন। ওখানে আমিই ছিলাম পেশাগতভাবে একমাত্র সাংবাদিক। আর বাকি সকলে কবি-লেখক। ইমদাদুল হক মিলন, আতাহার খান, সেলিম নজরুল হক ও শিল্পী হিসেবে কাজী হাসান হাবিব। বর্তমানে কানাডা-প্রবাসী ইকবাল হাসান ইত্তেফাক ভবন থেকে প্রকাশিত চলচ্চিত্র পত্রিকা সাপ্তাহিক 'পূর্বাণীর' সাংবাদিক ছিলেন। তিনিও পার্টটাইম কাজ করতেন। কিন্তু একমাত্র আমারই ছিল সার্বিকভাবে সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা। ফলে আমার ওপর কাজের প্রচণ্ড চাপ পড়ে। রফিক আজাদ সম্পাদক হলেও তিনি তখনো বাংলা একাডেমীতে উপপরিচালক পদে চাকরি করতেন। তাই তিনি আসতেন বিকেলের দিকে। প্রায় একটানা দশ মাস বেতন ছাড়া কাজ করার পর 'রোববার' আলোর মুখ দেখে এবং পাঠকহূদয় জয় করে নেয়। ওখানে দিনরাত পরিশ্রম করার ফলে পেস্টিংরুমেই আমি একদিন মাথা ঘুরে পড়ে যাই। আমাকে ধরাধরি করে অফিসরুমে নিয়ে ফ্যানের নিচে শুইয়ে দেওয়া হয়, মাথায় জল দেওয়া হয় এবং একটু সুস্থ হলে আমার শিববাড়ির ভাড়া বাসায় পৌঁছে দেওয়া হয়। 'রোববার'-এ কাজের অভিজ্ঞতাটা আমার জন্যে সুখকর হয়নি। কিছুদিনের মধ্যেই পত্রিকাটির নির্বাহী প্রধান রাহাত খানের সঙ্গে আমার মতান্তর ঘটে এবং আমাকে পদত্যাগ করে চলে আসতে হয়। আমার বিরুদ্ধে নানা ধরনের অভিযোগ করে রাহাত ভাইয়ের কান ভারী করে আমার অন্যান্য সহযোগী। কিন্তু আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে চাকরি কেন, বেঁচে থাকার মধ্যেও কোনো গৌরব আছে বলে আমি কোনোদিন মনে করিনি, আজও করি না বলে মাত্র পাঁচ মিনিটের সিদ্ধান্তে আমি ওই চাকরি ছেড়ে দিয়ে বেকারজীবনকে পুনরায় আলিঙ্গন করতে বাধ্য হই।

চাকরি ছেড়ে দিয়ে আমি পূর্ণোদ্যমে লেখায় মনোনিবেশ করি। গদ্য-পদ্য নির্বিশেষে। প্রায় সকল পত্রপত্রিকায় প্রচুর লেখা প্রকাশিত হতে থাকে। তার মধ্যে আহসান হাবীবের হাত দিয়ে দৈনিক বাংলার সাহিত্য পাতাতেই বেশি। ও থেকে মাঝেমধ্যে কিছু সম্মানী পাই। কিন্তু তা দিয়ে তো সংসার চলে না। তাই আবার বিপর্যয় নেমে আসে। ওই সময়ই 'মুক্তধারা' থেকে 'প্রগতিশীল সাহিত্যের ধারা' নামে আমার একটি প্রবন্ধের বই প্রকাশিত হয় এবং তা থেকে কিছু সম্মানীও জোটে। ফলে কিছুদিন স্বস্তির জীবন কাটে। আমি বিভিন্ন পত্রিকা অফিসে যাই। মাঝে মাঝে দৈনিক বাংলার সহকারী সম্পাদক কবি শামসুর রাহমানের কাছে, 'বিচিত্রা' অফিসে সম্পাদক শাহাদাত চৌধুরী কিংবা শাহরিয়ার কবিরের কাছে। বিচিত্রাতেও আমার প্রচুর কবিতা ছাপা হয়, সঙ্গে গদ্যও। শাহাদাত ভাই আমাকে খুবই স্নেহ করতেন। 'বিচিত্রা'তে আমার 'অগ্নিপুরুষ ডিরোজিও'র সম্পূর্ণ পাণ্ডুলিপিটিই তিনি লোক দিয়ে আমার বাসা থেকে আনিয়ে একটি সংখ্যায় সম্পূর্ণটা ছেপে দিয়েছিলেন। তাছাড়াও তাঁর স্নেহ-ছায়ায় একটি সংখ্যায় কবিদের নিয়ে 'কবিতাসংখ্যা' করার পুরো দায়িত্বও তিনি আমাকে দিয়েছিলেন। তাই প্রতিদিন একবার অন্তত বিচিত্রা অফিসে না গেলে চলত না। শাহাদাত ভাইয়ের সঙ্গে আড্ডাটা ছিল বাড়তি পাওনা।

বেশি সময় কাটে কবি রফিক আজাদের সঙ্গে। তিনি স্বাধীনতার পর টাঙ্গাইলের অধ্যাপনা পেশা ছেড়ে এসে বাংলা একাডেমীতে অফিসার পদে যোগদান করেন। ঢাকায় আসার পরপরই তাঁর সঙ্গে লেখালেখির সূত্রে আমার পরিচয় হয় এবং একটা নিবিড় সখ্য গড়ে ওঠে। কবি আসাদ চৌধুরীর সঙ্গেও তা-ই। আসলে দেশ স্বাধীন হবার পর মহাপরিচালক হিসেবে ড. মাযহারুল ইসলাম তখন বাংলা একাডেমীতে বাংলাদেশের অনেক স্বনামধন্য লেখককে চাকরি দিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে সমৃদ্ধ করেছিলেন। ফলে সেখানে গেলে একস্থানে অনেক লেখকের সঙ্গে যোগাযোগ হয়ে যেত। স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় যেহেতু বিউটি বোর্ডিংয়ের মালিককে

পাকিস্তানি ঘাতকরা খুন করেছিল, তাই দেশ স্বাধীন হবার পর ওখানকার রেস্টুরেন্টটি উঠে গেলে অনেক লেখক-কবিরই কেন্দ্রস্থল হয়ে ওঠে বাংলা একাডেমী। ওখানকার মাসিক সাহিত্য পত্রিকা 'উত্তরাধিকার'-এর সম্পাদক ছিলেন কথাসাহিত্যিক রশীদ হায়দার, রফিক আজাদ হন বাংলা একাডেমী গবেষণা পত্রিকার সম্পাদক। রশীদ হায়দার থাকতে উত্তরাধিকার-এ আমার কোনো লেখা ছাপা হয়নি। কিন্তু পরবর্তী সময়ে রফিক আজাদ 'উত্তরাধিকার'-এর সম্পাদক হলে গদ্য-পদ্য মিলে আমার প্রচুর লেখা ছাপা হয়। রফিক ভাইয়ের রুমে লেখকদের একটা নিয়মিত জমজমাট আড্ডাও বসে।

দিনে রফিক ভাইয়ের অফিসরুম, রাতে নিউ মার্কেটের 'মনিকো' রেস্টুরেন্ট। সিনিয়র ও জুনিয়র সকলেরই আড্ডাস্থল ছিল রেস্টুরেন্টটি। এর আর একটি কারণ ছিল। ওখানে রফিক নামে একটি ছেলে কাজ করত, সে তখন বেশ চমত্কার আধুনিক কবিতা লিখত এবং প্রায় ঢাকার সকল কবির সঙ্গেই তার একটা সখ্য গড়ে উঠেছিল। সে প্রত্যেক কবিকেই সম্মান করত এবং তার সাধ্যমতো আপ্যায়ন করবার চেষ্টা করত। সেই সময় আমাদের চেয়ে আরও কত তরুণের সঙ্গে যে ওখানে সাক্ষাত্ হয়েছিল, এখন সকলের নাম আর মনেও করতে পারি না। সিনিয়র কবিদের সঙ্গে সঙ্গে ওখানে মোস্তফা মীর, জাহাঙ্গীরুল ইসলাম, সৈকত রহমান, মাসুদ আহমেদ মাসুদসহ আরও কত তরুণতর কবিকে দেখেছি, যারা অসাধারণ ভালো লিখতেন। কথাসাহিত্যিক ও কবি হিসেবে সুকান্ত চট্টোপাধ্যায়ও তখন সকলেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছিল।

হুমায়ুন কবির, রাজীব আহসান চৌধুরী, ফরহাদ মজহার—একসময় যারা নতুন ধারার কবিতা লিখতে শুরু করেছিলেন, তাদের মধ্যে রাজীব তো বলতে গেলে স্বেচ্ছানির্বাসন গ্রহণ করেন। ফরহাদ কবিতা লেখার চেয়ে রাজনীতির দিকেই মনোযোগ দিয়েছেন বেশি। আর হুমায়ুনকে নির্মমভাবে সর্বহারা পার্টির অন্তর্দ্বন্দ্বের কারণে ১৯৭২ সালে খুন হতে হয়।

১৯৭১-এর আগে কবি আবুল কাসেম আমাদের সকলেরই ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল। সে আমার জগন্নাথ হলের পশ্চিমের টিনশেডের ঘরে নিয়মিতই আসত। চলনে-বলনে পুরোদস্তুর কবি ছিল। জাত বোহেমিয়ান। হঠাত্ হঠাত্ কোথায় কোথায় যে উধাও হয়ে যেত, কেউ জানতেও পারতাম না। আবার হুট করেই একদিন এসে হাজির। কবিতা ছাড়া অন্য কিছু নিয়ে ভাবত না। একাত্তরের বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের পরের উত্তাল দিনগুলোতে আমি যখন আন্দোলন-মিছিলে অংশগ্রহণ নিয়ে ব্যস্ত, তখন সে ব্যস্ত তার কবিতা লেখা নিয়েই। বেশ কিছুদিন তার খোঁজ ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে গেছে। আমি বাড়িতে যাব। সে-সময়ে হঠাত্ একদিন সে এসে হাজির। আমি বাড়ি যাব শুনে বলল, 'আমাকে ঘরের চাবিটা দিয়ে যান, আমি এখানে কটা দিন থাকি।' তাকে আমি চাবিটা দিয়ে চলে যাই। ২৩ মার্চ ফিরে এসে যেখানে তাকে চাবি রেখে যেতে বলে গিয়েছিলাম, সেখানে তা না পেয়ে কক্ষের তালা ভেঙে ঢুকি। ঘরে ঢুকে মন খারাপ লাগাতে এরপর সেদিনই আবার হল থেকে বেরিয়ে মানিকগঞ্জে চলে যাই। ২৫ মার্চ কালো রাতে আবুল কাসেম আমার কক্ষেই ছিল বলে শুনেছি। কিন্তু স্বাধীনতার পর তার আর খোঁজ পাওয়া যায়নি।

আবুল কাসেম ভালো কবিতা লিখত। তবে তরুণতরদের মধ্যে আমার কাছে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় মনে হয়েছিল জাহাঙ্গীরুল ইসলামকে। তখন একটা সময় তরুণ কবিদের অধিকাংশই শঙ্খ ঘোষ এবং শক্তি চট্টোপাধ্যায়ে মজে আছে। আমরাও তা থেকে খুব একটা দূরে ছিলাম না। বিশেষত শঙ্খ ঘোষের 'পাথর' কবিতাটা প্রায় সকলকে আক্রান্ত করেছিল। আবিদ আজাদ, জাহাঙ্গীর ও সৈকত ওতে বেশি মজে ছিল। তেমনি শক্তিদার নতুন ধারার ছন্দোবদ্ধ কবিতা এবং 'জরাসন্ধ' কবিতাটি মাতাল কবিদের বেশি অনুপ্রাণিত করেছিল। আমি অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম আধুনিক কবিতায় শক্তিদার ছন্দ ব্যবহারের নতুন নতুন কৌশল দেখে। মাত্রাবৃত্ত, স্বরবৃত্ত এবং মধ্যখণ্ডনের এমন চমত্কার ও নিখুঁত ব্যবহার দুই বাংলার কারও কবিতাতেই আমি লক্ষ করিনি। শক্তিদার এই শক্তিমত্ততা আমাকে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল বলে আমি আমার কবিতায় বাংলা কবিতার নানা ধরনের ছন্দ ব্যবহারের ব্যাপারটা নিয়ে বেশ পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাই এবং আমার 'পুনরুদ্ধার' কাব্যগ্রন্থে তা ব্যবহার করি। পয়ার, মাত্রাবৃত্ত, স্বরবৃত্ত, মন্দাক্রান্তা, দ্বিপদী, ত্রিপদী, চৌপদী, মধ্যখণ্ডন প্রভৃতি নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে বাংলা আধুনিক কবিতায় এটি ছিল একটি নতুন প্রয়াস। সে-কারণে বইটি 'আলাওল সাহিত্য পুরস্কার' লাভ করে।

আমি কোনোদিনই পুরস্কার প্রাপ্তির জন্যে লালায়িত ছিলাম না। জানি, একজন কবি কিংবা লেখকের জীবনে পুরস্কার হয়তো অনেকটা গুরুত্ব বহন করে। কিন্তু আমি প্রথম থেকেই এ ব্যাপারে সতর্ক ছিলাম। তাই পুরস্কারের ব্যাপারে অন্য অনেকেই যখন ব্যস্ত, আমি তখন নির্বিকারভাবে আমার লেখার কাজটি করে গেছি। বিশেষত বাংলা একাডেমী পুরস্কার পাবার জন্যে যখন ফেব্রুয়ারি মাস আসার অনেক আগে থেকেই নানা ধরনের তদবির চলতে থাকে, তখন আমি নিজেকে সংযত রাখার চেষ্টা করি। কারণ আমি প্রথম থেকেই মনে মনে একটা প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, আর যা-ই হোক তদবির করে কোনোদিন পুরস্কার নেবার চেষ্টা করব না। তাই আমি আমার প্রবীণ বয়সে এসে কবিতায় সামগ্রিক অবদানের জন্য বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার লাভ করি ২০১১ সালে। পুরস্কার প্রদানের দিন আমি কবি হিসেবে বাংলা একাডেমী পুরস্কার প্রাপ্তির প্রতিক্রিয়ায় মঞ্চে দাঁড়িয়ে সকলের উপস্থিতিতে বলেছিলাম, 'বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার প্রাপ্তিতে আমি একটুও আনন্দিত, উল্লসিত কিংবা উচ্চ্ছ্বসিত নই। আজ আনন্দিত এই কারণে যে, আমি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, তদবির করে কোনোদিন পুরস্কার পাওয়ার চেষ্টা করব না। সেখানটাতে আমি জয়ী হয়েছি, তাতে আমি আনন্দিত।' আজও আমি আমার জীবনে সেই প্রতিজ্ঞা বহন করে চলেছি। এরপর আমি বাংলাদেশের প্রায় সব উল্লেখযোগ্য পুরস্কার পেয়েছি। কিন্তু আমার নির্বিকারত্ব ঘোচেনি।

যা-ই হোক, 'পুনরুদ্ধার' ছিল আমার তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ। তার আগে ১৯৮২ সালে আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। ১৯৬৪ থেকে ১৯৮২। অনেকটা বছর পেরিয়ে যাবার পরও আমি বই প্রকাশের ক্ষেত্রে কোনো তাড়াহুড়া করিনি। বিশেষত ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত আমার যত কবিতা বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকা ও সংকলনে ছাপা হয়েছে, তাতে বাহাত্তরেই আমার অন্তত পাঁচটি/সাতটি কবিতার বই প্রকাশিত হতে পারত। কিন্তু সকলে বলা সত্ত্বেও আমি নিজেকে সংযত রাখার চেষ্টা করেছি। তাই আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'পূর্ব-পৃথিবীর অস্থির জ্যোত্স্নায়' কবি ও পাঠক সমাজে তখন ব্যাপক সাড়া ফেলতে সক্ষম হয়েছিল। ৪৮ বছরে এ পর্যন্ত আমার মোট কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা ১০টি। অনেকেই তাতে আমার কাছে বিস্ময় প্রকাশ করেন। কিন্তু আমি সংখ্যা বিচার দিয়ে একজন কবিকে মূল্যায়নের পক্ষপাতি নই বলে এখনো তাড়াহুড়ায় বিশ্বাস করি না।

জীবনের অপরাহবেলায় এসে শুধু মনে হয় কিছু কি লিখতে পারলাম? অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী না হলে এই সংশয় সম্ভবত সকল কবির মধ্যেই থাকে। হয়তো সে-কারণেই এখনো নতুন কিছু লেখার তাগিদ অনুভব করি, নিজেকে প্রতিদিন, প্রতিপলে উতরে যাবার চেষ্টা করি। কিছু হয় কি হয় না, তা বিচার করবে মহাকাল। আমার কাজ শুধু লিখে যাওয়া। এই মন্ত্র আমার জীবন-সাধনার একমাত্র অবলম্বন। এই এতগুলো বছরে কত মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে, কত কবির সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়েছে। কিন্তু তবু 'আমার নিজেরি মুদ্রাদোষে আমি একা হতেছি আলাদা'। এটা আমার অহংকার নয়। আমার এখনকার উপলব্ধি। জীবনের যে কটা দিন বাকি আছে, আমি শুধু লিখে যেতে চাই। তারুণ্যের উদ্দীপনা নিয়ে, সত্যের প্রতি দায়বদ্ধ থেকে, কোনো ধরনের লোভের কাছে পরাজিত না হয়ে আমি যদি কয়েকটি পংক্তিও লিখে যেতে পারি, তবে মনে করব, এ জীবন সার্থক হয়েছে।

এই পাতার আরো খবর -
font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেছেন, 'রাজনৈতিক দল হিসাবে কর্মকাণ্ড করার কোনো অধিকার জামায়াত রাখে না।' আপনিও কি তাই মনে করেন?
7 + 8 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
অক্টোবর - ১৯
ফজর৪:৪২
যোহর১১:৪৪
আসর৩:৫২
মাগরিব৫:৩৩
এশা৬:৪৪
সূর্যোদয় - ৫:৫৭সূর্যাস্ত - ০৫:২৮
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :