The Daily Ittefaq
ঢাকা, সোমবার ০৫ আগস্ট ২০১৩, ২১ শ্রাবণ ১৪২০ এবং ২৬ রামাযান ১৪৩৪
সর্বশেষ সংবাদ হাইকোর্টের রায় বহাল; নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না জামায়াত | আপিল করেছেন গোলাম আযম | অষ্টম মজুরি বোর্ডের সুপারিশে মন্ত্রিসভার একমত

উপন্যাস

কান্দুপট্টি

তুষার কণা খোন্দকার

'কী ব্যাপার বাবা, তুমি দুলারিকে এখনো বিদায় করনি? বদমাশ দুলারি বুয়াকে দেখলাম নিচতলায় দারোয়ান, ড্রাইভারদের সঙ্গে নেচে-কুঁদে বর্বর নষ্টামি করে বেড়াচ্ছে। ইতরটাকে কোনো শেলটার হোমে পাঠিয়ে দেওয়ার জন্য সেদিন এত করে বলে গেলাম তুমি শুনতে পাওনি?'

কথার ঝোঁকে মিতুর কপালে ভেসে ওঠা চিকন ভাঁজ বিরক্তিতে গভীর হচ্ছে। তার গলায় বিরক্তির সঙ্গে রাগের মিশেল। বুয়া শব্দের গায়ে সে ইচ্ছা করে কড়া ঝাঁঝ মিশিয়ে নিচ্ছে।

'দুলারিকে বিদায় করতে তুমি এমন গড়িমসি করছ কেন? ওকে বাড়ি থেকে বিদায় করে আর একটা কাজের মানুষ রাখতে তোমার সমস্যা কী? রান্নাবান্নার কাজ জানে—এমন একজন পুরুষ মানুষ বাসায় রাখতে পারো। কাজের মানুষ পুরুষ হলে তোমাকে খুন করে ফেলবে—এমন ভাবনা ভাবার দিন ফুরিয়ে গেছে। খুন-খারাবির কাজে বাংলাদেশের মহিলারা আগের মতো পিছিয়ে নেই। খুনে মহিলাদের অনেকে একলাই জোয়ান মদ্দ ব্যাটাছেলেকে কুপিয়ে টুকরা করে বস্তায় ভরে ডাস্টবিনে ফেলে দিচ্ছে। দুলারি চাইলে তোমার মতো বুড়া মানুষকে মাছ কাটা বটি দিয়ে কেটে টুকরা করে কমোডে ফেলে ফ্লাস করে দিলে তুমি বাধা দিয়ে কুলাতে পারবে? কাজের মানুষ তোমার গলায় কোপ দেবে কি দেবে না, সেটা ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দেওয়াই ভালো।'

মিতুর গলার স্বর শেষের দিকে একটু ঝিমিয়ে আসে। তার মুখের কথায় বিশ্বাসের জোর কম। তার মনের দ্বিধা গলার স্বরে চাপা থাকে না। মেয়ের উঁচু স্বর নিচের দিকে নামতে দেখে আতিকুজ্জামানের চেহারায় আমোদ পাওয়ার ভাব। মুখে হাসি নিয়ে সে তার মেয়েকে কথা শেষ করার সুযোগ দিচ্ছে। মিতু কথা শেষ করার পরে তার বাবা আতিকুজ্জামান একটু সময় অপেক্ষা করে। মেয়ের কথা শেষ হয়ে গেছে নিশ্চিত হয়ে সে কথা শুরু করে। হাসি মেশানো তরল গলায় বলে,

'কী আশ্চর্য! তুই রাগের ঝোঁকে দুলারি সম্পর্কে একটার পর একটা ভুল শব্দ বলে যাচ্ছিস। তোর এক নম্বর ভুল—দুলারিকে কাজের বুয়া বলা। তুই জানিস ও আমার কাজের বুয়া না। ওর সঙ্গে আমার সম্পর্কের ভিন্ন ব্যাখ্যা আছে। তোর দুই নম্বর ভুল—দুলারির আচার-ব্যবহারকে বর্বর নষ্টামি বলা। তোর ভাষায় যেটা বর্বর নষ্টামি সেটা দুলারির জন্য কষ্ট করে রপ্ত করা অতিশয় ভদ্র ব্যবহার। তোর কাছে আমি ওর পরিচয় ভাঁড়িয়ে ভণ্ডামি করিনি। ওর ব্যাপারে তোর বারবার ভুল হওয়ার কোনো যুক্তি আছে, বল?'

'বাবা, তুমি আরেকদিন পরান খুলে আমাকে জ্ঞান দিও, আমি খুব মন দিয়ে শুনব। আমার ভাষা শুধরানোর চেষ্টা বাদ দিয়ে তুমি সমস্যা সমাধানের পথ বাতলাও। আজ দুলারি-সমস্যার সমাধান না করে এখান থেকে এক পা নড়ছি না—এটা শুরুতেই জানিয়ে রাখছি।'

'শোন, এটা ভাষার সমস্যা না। মুখের ভাষা তোর মনের বাহন। আমি পষ্ট ভাষায় তোর চিন্তার ভুল শুধরে দিচ্ছি। 'দুলারি এবং তার ভবিষ্যত্' তোর পছন্দের সাবজেক্ট । তোকে কিছু টিপস দিচ্ছি যাতে তোর পছন্দের সাবজেক্ট নিয়ে আরও যৌক্তিক ভাষায় কথা বলতে পারিস। তুই দেখ, দুলারিকে তাচ্ছিল্য¬ করতে গিয়ে তুই ওর সম্পর্কে ইচ্ছেমাফিক অপছন্দের শব্দ বেছে নিচ্ছিস, যে শব্দগুলো লজিকের ধোপে টেকে না। ওকে অপছন্দ করা তোর জন্য কোনো দোষের ব্যাপার না। একজন মানুষ আরেকজন মানুষকে অপছন্দ করতেই পারে। কিন্তু মানুষকে তাচ্ছিল্য¬ করা একটা যাচ্ছেতাই মন্দ কাজ। ঠিক কিনা মিতু বল?'

জামান মেয়ের দিকে সরু চোখে চেয়ে গলায় উপহাসের ছোঁয়া মিশিয়ে টেনে টেনে বলে,

'মানুষকে তাচ্ছিল্য¬ করা ইতরজনের কাজ। ভদ্র মহিলারা ইতর আচরণ করলে তাদের ব্যক্তিত্বের হানি ঘটে, বুঝলি। তোর মতো একজন রীতিমতো ভদ্রমহিলার ব্যক্তিত্বের জন্য ইতর আচরণ খুব ক্ষতিকর। আজকের জমানায় সুচারু, সুললিত ব্যক্তিত্ব নারীর শরীরে বাড়তি অলংকার। ব্যক্তিত্বের সুষমা নারীর সৌন্দর্য বহুগুণ বাড়িয়ে তোলে। দেখিস না, মিস ওয়ার্ল্ড নির্বাচনের সময় সুন্দরী নারীদের ব্যক্তিত্বের পরীক্ষা নেওয়া হয়। সুন্দরীরা যথেষ্ট ব্যক্তিত্বশালিনী হলে তবে ব্যাটাছেলে বিচারকরা ওদের মাথায় বিশ্বসুন্দরীর মুকুট পরিয়ে দেয়।'

বাপের গলায় উপহাসের সূক্ষ্ম সুর শুনে মিতুর স্বর আবার উঁচু গ্রামে উঠতে থাকে। তার গলায় অসহায় ক্ষ্যাপামো। মিতুর মনে হচ্ছে তার বাপ দুলারিকে এই বাড়ি থেকে সরাবে না। আত্মীয়-স্বজনের কথা সে এক কান দিয়ে ঢুকিয়ে আরেক কান দিয়ে দিব্যি বের করে দিচ্ছে। বাপের মনের ধাঁচ বুঝে মিতু একবার ভাবে, দুলারিকে নিয়ে আর কথা বলবে না। কিন্তু মনের মধ্যে মরিয়া জিদ ঘনিয়ে আসায় সে কথা থামাতে পারে না।

'বাবা শোন, ইনাফ ইজ ইনাফ। আমার সঙ্গে অমন বাঁকা গলায় ছেঁদো কথা বলবে না। সোজা কথা সোজা করে বোঝার চেষ্টা করো। আমার মনে হয়, তুমি যথেষ্ট বয়সি মানুষ। এই বয়সে একজন পুরুষ মানুষের সংযমী হওয়ার জন্য বাড়তি কষ্ট স্বীকার করার প্রয়োজন নেই। বরং সেক্স অ্যাপিল নিয়ে একজন মহিলা চারপাশে সারাক্ষণ ঘুরঘুর করলে সেটা তোমার জন্য একটা বাড়তি বিড়ম্বনা। এই বয়সে কি তোমার জৈবিক প্রয়োজন আছে? এই বয়সে একটা মহিলার সার্বক্ষণিক সঙ্গ তোমার শরীর ডিম্যান্ড করে? নিশ্চয়ই নয়। আসলে এখন, এই বাড়িতে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছাড়া অনাত্মীয় একটা মহিলা তোমার আশপাশে হাঁটাহাঁটি করলে সেটাই তোমার খারাপ লাগার কথা।'

মেয়ের কথা শুনে রাগের বদলে জামানের মুখে মজা পাওয়ার ভাব। মেয়ের রাগী সুরের চ্যাটাং কথার ধার দিয়ে না গিয়ে সে বলে,

'কিরে মিতু, তুই তো এতদিন একটা নির্বোধ কিসিমের মেয়ে ছিলি। আচমকা এমন জ্ঞানী হয়ে উঠলি কেমন করে? তোর কথার মধ্যে জিদের চেয়ে লজিকের ভাগ যে বেশ পোক্ত হতে শুরু করেছে, এটা কি খেয়াল করেছিস? শোন, দুনিয়ায় সব রকম মতলব হাসিলের জন্য জিদের চেয়ে লজিক অনেক বেশি কার্যকর। লজিক হচ্ছে জিদ হাসিলের অস্ত্র। মতলব হাসিলের কৌশল হিসেবে প্রথমে তুই মনের মধ্যে জিদ তৈরি করবি। তারপর সেই জিদ ঘিরে লজিক ফেনিয়ে তুলতে শুরু করবি। শোন, মনের জিদ মনের মধ্যে লুকিয়ে রেখে জিদ হাসিলের যুক্তিগুলো মানুষের সামনে সুন্দর করে মেলে ধরবি। আসলে লজিকের বাজারমূল্য জিদের চেয়ে অনেক বেশি। আমার মনে হচ্ছে, তোর মাথার মধ্যে লজিক শেপ নিতে শুরু করেছে মানে তোর ভবিষ্যত খুব সম্ভাবনাময়।'

'বাবা, তুমি কথা প্যাঁচাবে না। আগডুম-বাগডুম কেচ্ছা বলে তুমি আসল সমস্যা থেকে সটকে পড়ার ফন্দি আঁটছ। শোন বাবা, সোজা কথা সোজা করে বোঝার চেষ্টা করো। চারপাশের আত্মীয়-বন্ধুর অত্যাচারে আমার পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। তোমার কাছে দরকারি কথা পাড়লে তুমি আজিরা কথার প্যাঁচ তুলে আসল কথা চাপা দিয়ে দাও। অথচ আত্মীয়-স্বজন সবাই তোমার কথা তুলে আমাকে কাচিয়ে মোরব্বা বানিয়ে ছাড়ছে। এতগুলো বছর ধরে এই এক প্যাঁচাল কাঁহাতক সহ্য হয় বাবা, তুমিই বলো।'

'বেশ, আমি কিছু বলব না। তুই তোর মতো করে কথা শেষ কর। আমি মন দিয়ে শুনছি। তবে, একটা কথা তোকে আগেই বলে রাখি, তুই বলছিস আমাকে নিয়ে সমস্যায় পড়ে তোর পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া কোনো সমস্যা না। পিঠের পেছনে যে দেয়ালে তোর পিঠ ঠেকে গেছে সেই দেয়াল তোর নিজের হাতে গড়া। তুই চাইলে আজই ওটা ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে পারিস। দেয়ালটা একবার ভেঙে দিয়ে দেখ, আত্মীয়-স্বজনের ঠেলা খেয়ে তুই মনের আনন্দে সমতল মাটিতে পেছন পায়ে হাঁটতে পারছিস। পিঠের পেছনে দেয়ালের বাধা না থাকার সুখ দুলারিকে দেখে টের পাসনে?'

মেয়েকে খোঁচা মারার সুখে জামানের মুখে হাসি প্রশস্ত হয়ে ওঠে। বাবার আমুদে মুখের দিকে চেয়ে মিতু প্রশ্ন করে,

'মা মারা যাওয়ার পরে তুমি একটা বিয়ে করলে না কেন বাবা? একটা কেপ্ট এনে ঘরে তুললে কেন? ছোটবেলায় সত্ মা আমাকে জ্বালাতন করলে সেটাও আমার এখনকার বিড়ম্বনার চেয়ে ভালো ছিল।'

'সত্মা তোকে সোহাগ করবে না মারবে, সেটা নিয়ে কোনোদিন মাথা ঘামাইনিরে। আসলে তোর মা মারা যাওয়ার পরে আমি প্রিজন ভ্যানে চড়ে দ্বিতীয়বার প্লেজার ট্রিপে যেতে চাইনি।'

'তোমার কাছে বিয়ের অর্থ এত খারাপ বাবা?'

মিতু কপাল কুঁচকে বাবার মুখের দিকে চেয়ে আছে। বাবা-মায়ের দাম্পত্য সম্পর্ক কেমন ছিল মিতু সেটা জানে না। এ বিষয়ে জানার জন্য তার কখনো কৌতূহল হয়েছে বলে মনে পড়ে না। কিন্তু আজ মিতুর আচমকা মনে হয়, তার বাবা-মা ভীষণ অসুখী ছিল। কেন? কে জানে! এই ব্যাপার নিয়ে মিতুর আর ভাবতে ভালো লাগে না। বাবা-মায়ের প্রসঙ্গ থেকে সরে পড়ার তাগিদে মিতু বলে,

'শোন বাবা, তুমি কী কারণে দুলারিকে বিদায় দিতে পারছ না সেটা বোঝার মতো বুদ্ধি আমার আছে। তুমি বিবেকবান মানুষ। কাজেই নিজের বিবেকের শাসন মানতে গিয়ে তুমি একটা বিদঘুটে গেঁড়াকলে আটকে গেছ। তোমার মনে হচ্ছে, তুমি ছাড়া এই দুনিয়ায় দুলারির আর কোনো আশ্রয় নাই। ওকে তাড়িয়ে দিলে ও যাবে কোথায়? আসলে দেখ, নিরাশ্রয় দুলারিকে আশ্রয় দিতে গিয়ে তুমি নিজে সমাজে নিরাশ্রয় হয়ে বসে আছ। দুলারিকে আশ্রয় দিতে গিয়ে তুমি একা ভোগান্তি পোহাচ্ছ এমন না, তোমার দুলারি বিলাস আমার জন্য এক মূর্তিমান আতঙ্ক। আত্মীয়-স্বজনের বাজে প্রশ্নের মিথ্যা জবাব বানিয়ে বলা এখন আমার নিত্যদিনের রুটিন ওয়ার্ক। প্রতিদিন খালু-খালা-ফুফু-চাচি মিলিয়ে অন্তত দশজনের কাছ থেকে আমি দশটা ফোন পাই। সব ক-টা ফোনের বিষয়বস্তু ঘুরিয়ে ফিরিয়ে 'দুলারি'। নিত্য দিনে ফোন করা বাহিনীর লাইনে চাচা গতকাল এসে নতুন সামিল হয়েছে। এতকাল দুলারির প্রশ্নে সে নিশ্চুপ ছিল, গতকাল হঠাত্ সে বেশ অ্যাকটিভ হয়ে উঠেছে। কাল সাত সকালে আমাকে ফোন করে চাচাও ঘুরে ফিরে দুলারির কথা জানতে চাইল। তুমি ঠান্ডা মাথায় ভেবে বলো, সবার অবান্তর প্রশ্নের জবাব আমাকে কেন দিতে হবে? তোমাকে নিয়ে এত প্রশ্নের জন্ম হওয়ার জন্য কি আমি দায়ী?'

জামানের মধ্যে মাথা গরম করার কোনো লক্ষণ নেই। বরং মেয়ের কথা শুনে তার চোখে মুখে হাসির ভাব আরও তাজা হচ্ছে। চোখের কোণ ছাপিয়ে হাসি মুখজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। গলার স্বরে মজা পাওয়ার ভাব মিশিয়ে জামান বলে,

'দুলারিকে নিয়ে লোকে তোকে প্রশ্ন করে কারণ আমি তোর বাপ। লোকে প্রশ্ন করলেই তুই ঘরের কথা বার করার মতো আহাম্মকি করতে যাবি কেন? জানিস না আহাম্মক নম্বর চার, ঘরের কথা যে করে বার। আত্মীয়-স্বজনের ফোনের জবাবে বিনয়ে গদগদ হয়ে বলবি 'সরি, আমি এ বিষয়ে তেমন কিছু জানি না। আপনারা বাবাকে ফোন করুন। দুলারির ব্যাপারে সংক্ষিপ্ত টেলি-জবাব সবার জন্য প্রযোজ্য হলেও তোর চাচাকে ভিন্ন কথা গুছিয়ে বলতে হবে। তুই তোর চাচার কথাগুলো মনে করে দেখ। সে দুলারি সম্পর্কে বিশদে কিছু জানতে চায় নাই। জানতে চেয়েছে, আমার এই মহামূল্য বসত বাড়ির আংশিক কিংবা সম্পূর্ণ দুলারির নামে আমি লিখে দিয়েছি কি না। কাজটা এখনো না করে থাকলে ভবিষ্যতে আমি করব কি না, সে সেটা নিশ্চিত হতে চেয়েছে। ঠিক কি না বল?'

মিতু তার বাবার অনুমান করার ক্ষমতা দেখে মনে মনে অবাক হয়ে যায়। তার চেহারায় অপ্রস্তুত ভাব। চাচা আলিমুজ্জামান শুধুমাত্র মিতুর বাবার বাড়ির ব্যাপারে দুই-একটা প্রশ্ন করেছে। দুলারিকে নিয়ে সে আজেবাজে বাড়তি প্রশ্ন তোলেনি। মিতু মনে মনে তার চাচার পরিমিতিবোধের প্রশংসা করেছে। কিন্তু বাবার কথার ধরন দেখে মিতুর মনে অন্য সন্দেহ প্যাঁচ খাচ্ছে। চাচা যে শুধু বাড়ির মালিকানা নিয়ে কয়েকটা প্রশ্ন করেছে, বাড়তি কোনো কথা বলেনি বাবা সে কথা জানল কী করে? বাবা কি দিন দিন গণক হয়ে উঠছে নাকি? টেলিফোনে চাচা-ভাতিজির মধ্যে কী কথা হয়েছে, সেটা সে এমন ঠিকঠাক অনুমান করে কী বোঝাতে চাচ্ছে? মনের মধ্যে বিষয়টা নাড়াচাড়া করলেও মিতু তার মনের ভাবনা মুখে ফুটতে দেয় না। সে ভাবে, বাবা তার মতো করে সব কথা অনুমান করতে থাক। বাবার ওসব ধুনপুন শুনে ঘাবড়ে গিয়ে আমাকে হাল ছাড়লে চলবে না। মিতু ভেবেচিন্তে গলায় আরও তেজ গুছিয়ে তুলে বলে,

'চাচা বাড়ির দলিল নিয়ে প্রশ্ন করলে করেছে। এতে দোষের কী হয়েছে? বাবা হয়ে তুমি আমার ভালোমন্দ নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছ না। চাচা হয়েও সে আমার ব্যাপারে তোমার চেয়ে বেশি দায়িত্বশীল। দুলারিকে তুমি তোমার বাড়ি লিখে দিচ্ছ কি না—এটা সে আমার স্বার্থে জানতে চেয়েছে। আমাকে ভালোবাসে বলে আমার সুখ-দুঃখ নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে। চাচার নির্দোষ প্রশ্নের মধ্যে আতিপাতি হাতড়ে তুমি কী দোষ বার করবে, বলো।'

'আহা-হা। কী যে বলিস? আমি তোর চাচার দোষ খুঁজব কেন মা? সে আমার মা-র পেটের ভাই। তার দোষ ধরে আমার লাভ আছে? বড় কথা, সে তার নিজের আইনগত অধিকার সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে, এতে আমার ক্ষেপে যাওয়ার সুযোগ কোথায়? নিজের স্বার্থে আগ বাড়িয়ে তার ভাইয়ের সম্পত্তির দেখ-ভাল করলে আমার বেজার হওয়া অন্যায়।'

মিতুর কপালে ফের বিরক্তির রেখা। সেই সাথে তার চোখে মুখে বাড়তি কৌতূহল। বাবার কথার মধ্যে একটু জটিল ঝোঁক তার কান এড়ায় না। বাড়তি কৌতূহল মনের মধ্যে লুকিয়ে রেখে কথা শেষ করার অনুমতি দেওয়ার ঢংয়ে মিতু কপাল কুঁচকে বাপের মুখের দিকে চেয়ে থাকে।

'শোন মিতু, আমি খুব একটা কর্তব্য-সচেতন মানুষ নই। তোর ব্যাপারে আমার কর্তব্য পালনে হাজার গন্ডা গাফিলতি থাকতেই পারে। তোর চাচা হয়তো আমার চেয়ে শতগুণ বেশি দায়িত্বশীল। তারপরও বাপ হিসেবে একটা সত্যি কথা তোকে আগাম বলে রাখা খুব দরকার মনে করছি। যে কথাটা এখন তোকে জানাব, সেটা আমি মরার পরদিন তুই স্বাভাবিক নিয়মে জানতে পারবি। সম্পত্তির লোভ শব্দটা শুনেছিস কিন্তু এটার দাঁতমুখ খিঁচানো রাক্ষুসে চেহারা কেমন, সেটা আমি মরার পরে তুই হাড়ে-হাড্ডিতে টের পাবি। সে-সময় যাতে মনে কষ্ট কম পাস সেজন্য তোকে আগাম বার্তা দিয়ে রাখছি। আপন ভাইকে নিয়ে মেয়ের কাছে বাজে কথা বলার আগে আমি ভেবেচিন্তে নিশ্চিত হয়ে নিয়েছি। তারপরও বলছি তুই আমার কথা পরীক্ষা করে দেখতে পারিস। তোর সুবিধার জন্য পরীক্ষার পদ্ধতিও আমি শিখিয়ে দিচ্ছি।'

মিতু তার বাবার কথা খানিক বিশ্বাস করছে। আবার তার চাউনির মধ্যে খানিক অবিশ্বাস পষ্ট ভেসে আছে। চাচাকে পরীক্ষা করার জন্য বাবা তাকে কী মতলব বাতলাবে সেটা ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। তার চাচা সরল মনে তার ভালো চায়—এই বিশ্বাস সে কিছুতেই নষ্ট করতে চায় না। জামান তার চোখ থেকে তামাশার ভাব মুছে ফেলে সিরিয়াস গলায় বলে,

'আমার ছোট ভাই হাড়ে-হাড্ডিতে একজন বিষয়ী মানুষ—এটা তুই জানিস কি না আমি জানি না। বিষয়ী মানুষেরা সারাজীবন সম্পত্তি গোছানোর কাজে মজে থেকে মরার সময় ভাবে, এইতো, আজ শরীরটা বেশি খারাপ লাগছে। একটু পরে সব ঠিক হয়ে যাবে। আমার ছোট ভাই বয়সে আমার চেয়ে মাত্র দুই বছরের ছোট। সে একবারও ভাবছে না আমি মরার পরে আমার সম্পত্তি থেকে সে যা ভাগ পাবে, সেই সম্পত্তি সাকুল্যে দুই বছর ভোগ করার সুযোগ পাবে। দিন-তারিখের হিসাব মিলিয়ে ঠিক দুই বছর পরেই সে মারা যাবে তা বলছি না তবে সময়টা কাছাকাছি ধরে নেওয়াই ভালো। অথচ আমি মরার পরে আমার ওয়ারিশ হিসেবে সম্পত্তির অংশ বুঝে নেওয়ার জন্য আমাকে জ্যান্ত রেখে সে মাঠ তৈরি করতে নেমে পড়েছে।'

'বাবা, তোমার কি মাথা ঠিক আছে? তুমি চাচা সম্পর্কে এসব কী উদ্ভট কথা বলছ? চাচার কি গাড়ি-বাড়ি ব্যাংক ব্যালান্সের অভাব আছে যে সে তোমার সম্পত্তি হাতিয়ে নেওয়ার জন্য লোভ করবে? ঠিক আছে, তর্কের খাতিরে মেনে নিলাম, চাচা সত্যি তোমার সম্পত্তি হাতিয়ে নেওয়ার লোভে আমাকে ফোন করেছে। আমার প্রশ্ন, চাচার লোভের সঙ্গে দুলারির নামে বাড়ি লিখে দেওয়ার কী সম্পর্ক? তোমার সম্পত্তি তুমি দুলারির নামে লিখে দিচ্ছ কি না চাচা সে কথা জানতে চেয়েছে। তার মানে কি এই যে চাচা তোমার সম্পত্তি তার নামে লিখে নিতে চাচ্ছে। চাচা চাচ্ছে, তোমার সম্পত্তি তোমার নিজের নামে বহাল থাক। খামখেয়ালি করে তুমি দুলারির নামে লিখে দিলে আমি ফাঁকিতে পড়ে যাব ভেবে সে একটা ফোন করতেই পারে। আমাকে ফাঁকিতে পড়তে দিতে চায় না বলে সে তোমার সম্পত্তি নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে—এটা বুঝতে কি উকিল মুহুরি হওয়ার দরকার পড়ে?'

জামানের মুখের হাসি ঠোঁট ছাড়িয়ে সারা মুখে ছড়িয়ে পড়ছে। তার মুখ দেখে মনে হচ্ছে, সে ভারি মজাদার কোনো বিষয় রসিয়ে উপভোগ করার মওকা পেয়েছে। জামানের গলার ভেতর থেকে মৃদু স্বরে হেঁ হেঁ আওয়াজ উঠছে। তার হাসির আওয়াজে হাসির চেয়ে উপহাসের ভাগ বেশি।

'বল দেখি, আমি মরার পরে আমার স্থাবর-অস্থাবর তাবত্ সম্পত্তির মালিক কে?'

'কেন, আমি। তোমার একমাত্র সন্তান।' মিতুর দ্বিধাহীন ঝটিতি জবাব।

'তুই আমার একমাত্র সন্তান—এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে একমাত্র সন্তানের সঙ্গে তুই কন্যা শব্দ যোগ করতে ভুলে গেছিস। মুসলমানের ঘরের কন্যা সন্তান হিসাবে তুই তোর বাবার সম্পত্তির ষোল আনার মালিক হতে পারিস না। আমি মরার পরে আমার শত কোটি টাকা দামের হাবিলি বালাখানার বারো আনার মালিকানা তোর কাছে থাকবে, আর চার আনার মালিকানা তোর চাচার কাছে চলে যাবে। আমার প্রাণবায়ু বের হওয়ামাত্র দেশের আইন অনুযায়ী আমার ভাই, মানে তোর শুভাকাঙ্ক্ষী চাচা এই বাড়ির একজন ভাগীদার। আমার কোনো ছেলে নেই বলে তোর চাচা এই বাড়ির একটি অংশের আইনসঙ্গত মালিক।'

মেয়ের মুখের দিকে চেয়ে জামান হেসে ফেলে। তার মৃত্যুর পরে বাড়ি ভাগ-বাটোয়ারার ঝামেলার মুখে পড়ে এই সরল-সোজা মেয়ের চেহারা কী দাঁড়াবে—এটা ভেবে তার খুব হাসি পাচ্ছে। হাসির পাশাপাশি মনের মধ্যে দুঃখের কাঁটা কুটকুট করে ফুটতে থাকে। বাপ মারা যাওয়ার পরে আত্মীয়-স্বজনের লোভী চেহারা দেখে মিতু কেমন অসহায় বোধ করবে, সেটা ভেবে মেয়ের জন্য তার মায়া লাগে। একবার ভাবে, মরার পরে আমার সম্পত্তি নিয়ে আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে কুকুর কামড়াকামড়ি শুরু হলে হবে। আমি আহাম্মক সে ভাবনা আগাম ভাবতে যাই কেন? ভবিষ্যতে মিতু তার সমস্যা কিভাবে মোকাবিলা করবে সেটি তার নিজস্ব ব্যাপার। জামান বিষয়টা মন থেকে ঝেড়ে ফেলতে চায়। কিন্তু জোর খাটিয়ে মাথা থেকে ভাবনাটা দূরে সরাতে পারে না। কথাটা মিতুকে বলার জন্য সে মরিয়া বোধ করে। তবে মুখ গোমড়া করে বিষয়টাকে সিরিয়াস করে তুলতে তার ভালো লাগে না। ইচ্ছা করে গলায় চটুল রসিকতার ভাব ফুটিয়ে সে বলে,

'আইনের কচকচি একপাশে সরিয়ে রাখ। আয় মিতু, আইনের ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ার আগে আমরা তোর চাচার মন মতলবের হদিশ করে দেখি। আইন মেনে সম্পত্তি ভাগাভাগি একটা সোজা কাজ। ওটা যে কেউ হেলায় ফেলায় সেরে ফেলতে পারে। ভাগাভাগির যুদ্ধে কে কত পেল সেটা বড় কথা নয়। ভাগ পাওয়ার জন্য মানুষের ছলচাতুরির হাঁসফাঁস দেখার মধ্যে আসল মজা । তোর চাচা কি তোকে কখনো বলেছে, 'মিতু, এত দামের বাড়িটা তুই তোর বাপের কাছ থেকে নিজের নামে লিখে নে। তোর বাপের বুড়াকালে যেমন ভীমরতি দেখছি, তাতে তাকে আর বিশ্বাস করা ঠিক হবে না। আমার ভয় হচ্ছে সে বাড়িটা দুলারির নামে লিখে দিয়ে গোরে যাবে।'

বাবার কথা শুনে মিতু ফিক করে হেসে ফেলে। তার মনে হয়, সারল্যের কারণে বাবার মন প্রকৃতির মতো স্বচ্ছন্দ। জীবনের কঠিন সত্য সে গল্প বলার ভঙ্গিতে অবলীলায় বলে ফেলতে পারে। সরলতার কারণে মিতু বাবাকে খুব পছন্দ করে। বাপের সারল্য নিয়ে মিতুর মনে গর্ব থাকলেও এখন সে কথা বাবাকে টের পেতে দেবে না। বাবা পাঁজি, এটা টের পেলেই দুলারি সমস্যা থেকে ছিটকে বের হয়ে যাওয়ার মওকা পেয়ে যাবে। সব দিক ভেবে মিতু মুখে গাম্ভীর্যের ভাব ফুটাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কপালে জটিল কয়েকটা ভাঁজ গভীর করে তুলে বলে,

'না বাবা, চাচা আমাকে কখনো ওসব বলে নাই। আমার ধারণা, বাড়ির ব্যাপারে চাচা তোমার মতো এমন পেঁচুক লাইনে চিন্তাই করে না। সে সরল মনে তোমার বাড়ির মালিকানার অবস্থা জানতে চেয়েছে।'

'তোর চাচা ভারি সরল বলেই সম্পত্তি ভাগের সরল অঙ্ক সহজে কষে ফেলতে পারে। এই বাড়িটা আমি তোর নামে লিখে দিলে আমার ভাইয়ের যা ক্ষতি দুলারির নামে লিখে দিলে তার একই ক্ষতি। এই বাড়িটা আমি আমার নিজের নামে না রেখে পৃথিবীর যেকোনো মানুষের নামে লিখে দিলে আমার শোকাতুর ভাই সেটা নিয়ে বিলাপ করতে বাধ্য। শোন, তোর সরলমতি চাচা বাড়ির ব্যাপারে আবার তথ্য-তালাশ করলে তুই গলায় মোলায়েম আহ্লাদ মেখে বলবি, 'শোন চাচা, এতদিনে আমার বাবার সুমতি হয়েছে। বাবা তার বাড়িটা আমার নামে লিখে দেবে বলেছে। বাবা পুরান ঢাকার কাছারি পাড়ার একজন ঝুনা মুহুরিকে খবর পাঠিয়েছে। এই সপ্তাহে সে তার বাড়ি আমার নামে হেবায়ে লেহেওয়াজ করে দেবে বলে মুহুরি এখন দলিলের মুসাবিদা করছে। এ পর্যন্ত বলে কিন্তু থেমে যাবি না। এরপর সময় নিয়ে মিহি গলায় নাকি সুরে হাসবি আর বলবি, এটা খুব ভালো হয়েছে না চাচা? বাড়ির দলিল আমার নামে রেজিস্ট্রি হয়ে গেলে দুলারিকে গলাধাক্কা দিয়ে রাস্তায় নামিয়ে দেব। দুলারি বদমাশটার এবার উচিত শিক্ষা হবে, তাই না চাচা?'

জামান জানে, মিতু নিজেকে চালাক বলে মনে করে। জামান তার মেয়েকে ভালো করে চেনে। মেয়েটা এই ছ্যাঁচ্চড় দুনিয়ার আসল সত্য কিছুই জানে না। তার মনের কোঠাগুলো এখনো হরেক পদের আবেগের খোলস দিয়ে মোড়া। আমোদের ছলে জামান তার মেয়ের মনের গা থেকে মিথ্যা আবেগের পরতগুলো আলগোছে তুলে আনতে চাচ্ছে। খেয়াল রাখছে, মেয়ের মনের আলগা পরত তুলতে গিয়ে চামড়া ছিঁড়ে যেন রক্ত না ঝরে। সে জানে, তার ছোট ভাই আলিমুজ্জামান ভয়ংকর কসাই। বড় ভাইয়ের সম্পত্তির ভাগ পাওয়ার সম্ভাবনা শেষ হয়ে যাওয়ার সাথে সাথে সে তার আসল চেহারার উপর আর রাখঢাক রাখবে না। বাপ মরার শোকে কাতর ভাস্তির সামনে তার মনের ঘরে লুকিয়ে থাকা লোভের রাক্ষস উদাম করে মেলে ধরবে। চাচার লোভী আচরণের সম্ভাবনার কথা আগাম জানা থাকলে মিতুর দুঃখের ভার কম হবে আশায় জামান কথা চালিয়ে যেতে থাকে।

'আমি তোকে একটা গল্প শিখিয়ে দিলাম। গল্পটা তুই যদি বিশ্বাসযোগ্য করে ফুটিয়ে তুলতে পারিস, তাহলে তোর কাজ হাসিল হয়ে যাবে। দেখবি, এটুকু একটা গল্পের গা থেকে বোম্বাই মরিচের মতো ঝাল বেরোতে শুরু করবে। গল্পটা শুনিবা মাত্র তোর চাচার মুখ থেকে নীতিকথার মুখোশ টুক করে খসে গিয়ে তার কুিসত চেহারা দাঁত-মুখ খিঁচে ভেসে উঠবে। আমি বেঁচে থাকতে তোর চাচার আসল রূপ দেখতে পেলে তুই একবেলা প্রাণ খুলে হাসতে পারবি। আমার জান কবচ করে আজরাইল ফিরতি পথে উড়াল দেওয়ার আগেই তোর চাচা আমার সম্পত্তির একটা অংশের মালিকানা পেয়ে যাবে। আইনসঙ্গত মালিকানা পাওয়ার পরদিন তোর চাচা এই বাড়িতে তার প্রাপ্য অংশ বিক্রির জন্য খদ্দের খুঁজতে বের হবে, আমার কুলখানির জন্য অপেক্ষা করে সময় নষ্ট করবে না। আমার লাশ গোরে নামিয়ে চোখ মুছতে মুছতে গলায় পুরু পরতে দুঃখ মেখে বলবে, 'আমার বড় হাত টানাটানি যাচ্ছেরে মিতু, কী করব বল। চারপাশের মানুষজন আমার অঢেল সম্পত্তির খবর রাখে। তারা ভাবে আমি কত ধনী। আসলে তারা কেউ আমার ঘাড়ে চেপে থাকা দায়-দেনার বোঝা দেখতে পায় নারে। বাইরের মানুষজনের কথা কী বলব, আমার নিজের ছেলে কোনোদিন আমার কষ্ট গায়ে মেখে দেখল না।' ছেলের কথা তুলে তোর চাচা তোকে বোঝাতে চাইবে, তুই তার কাছে তার ছেলের চেয়ে বেশি আপন। কাজেই তুই তোর চাচার দুঃখ-কষ্টের ভাগীদার হতে দ্বিধা করবি না। তোর চাচার দুঃখী সংলাপের সঙ্গে মোটা দাগের তিন চারটে দীর্ঘশ্বাস থাকবে। এই দৃশ্য আমার কাছে এত বাস্তব যে, তোর চাচার দীর্ঘশ্বাসের তাপ এখনই আমার গায়ে এসে লাগছে।'

বাপের সারল্য নিয়ে মিতুর মনে কোনো সন্দেহ নেই। তবুও বাবার হিসাবে কোথাও ভুল হচ্ছে ভেবে মিতুর মনে সন্দেহের দোলা। সে মনে মনে ভাবে, চাচা তার আপন ভাই। ভাইয়ের স্বভাব-খাসলত সম্পর্কে ভাইয়ের ধারণা ভাস্তির চেয়ে বেশি হওয়াই স্বাভাবিক। বড় কথা, বাবার ধারণার সঙ্গে চাচার প্রশ্ন করার ধাঁচ বেশ মিলে যাচ্ছে। চাচা সব সময় মুখে এত ভাব-ভালোবাসার কথা বলে কিন্তু একবারও বাড়িটা বাবার কাছ থেকে আমার নামে লিখে নেওয়ার বুদ্ধি দেয় না কেন?

মিতু ধাঁ করে একপেশে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে দোনামোনা করে। চাচা কি সত্যি এত লোভী? হতে পারে আবার না-ও হতে পারে। বাড়তি সময় নিয়ে মিতু বাবার চিন্তার সঙ্গে চাচার কথাবার্তার ধরন মনে মনে মিলিয়ে দেখতে চায়। বাবার দেওয়া বুদ্ধিটা খারাপ না। বাবা একটু আগে কী সব আরবি-ফারসি দলিলের কথা বলছিল। দলিলের বিটকেলে নাম মনে রাখতে পারলে সুবিধা হতো। চাচার সামনে এমন কঠিন দলিলের কথা নামসহ বললে সে আমার কথা সহজেই বিশ্বাস করবে। ভাববে, উকিল মুহুরির সাথে কথা না বললে বোকা-সোকা মিতু দলিল-দস্তাবেজের এত কঠিন নাম জানল কীভাবে। আচ্ছা, আর একটা কাজ করলে কেমন হয়। চিন্তাটা মাথার মধ্যে চিলিক দিয়ে জেগে উঠতে মিতুর চোখ-মুখের কঠিন ভাব কমে আসে। গলার স্বর যত দূর সম্ভব স্বাভাবিক রেখে সে বলে,

'বাবা, তোমার ভাইয়ের ওপর তোমার যদি এত অবিশ্বাস তাহলে তুমি বাড়িটা আমার নামে দলিল করে দিচ্ছ না কেন? হেবা না কি একটা দলিলের নাম বললে—তেমন একটা দলিল করে বাড়ির মালিকানা আমাকে দিয়ে দাও। তাহলেই সব ঝক্কি মিটে যাবে।'

জামান মন দিয়ে তার মেয়ের মনের কথা খুঁটিয়ে পড়ছে। মেয়ের মনে জেগে ওঠা দোনামোনা ভাব তার চোখ এড়ায়নি। জামান জানে তার মেয়েটা এখনো সরল। চারপাশে আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে স্বার্থ নিয়ে কুকুর কামড়াকামড়ি দেখেও মেয়েটা চোখ ফিরিয়ে ভালো কিছু খোঁজার সাহস বজায় রেখেছে। আজকের দিনে মনের সারল্য টিকিয়ে রেখে সোজা-সাপ্টা পথ চলা সোজা কথা নয়। মিতুর মনের মধ্যে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচল দেখে মেয়ের সঙ্গে জামানের মজার কোনো ছেলেমানুষি খেলা খেলতে ইচ্ছে করে। সব চিন্তা বাদ দিয়ে মেয়ের সাথে খুনসুটি করার লোভে সে বলে,

'তোর নামে বাড়িটা হেবা মূলে দলিল করে দিতে আমার কোনো আপত্তি নাই। এই বাড়ি তোর নামে হেবা করে দিতে পারলে আমি সবচেয়ে বেশি খুশি হব। বাড়িটা তোর নামে লিখে দিয়ে আমি মারা গেলে আমার লাশের পাশে দাঁড়িয়ে তোর চাচার মুখভঙ্গি কী হবে সেটা ভেবে আমার এখনই এক চোট হেসে নিতে ইচ্ছে করছে। বেচারার চেহারায় শোকের ছায়া ছাপিয়ে বঞ্চনার ভাব প্রবল হয়ে উঠবে। চাচার চেহারা দেখে সেদিন তুই শোক ভুলে নিজেও হাসতে শুরু করবি। কিন্তু হেবা দলিল করতে গিয়ে ঝামেলা বাঁধছে তোকে নিয়ে । দলিলে আমি যেসব শর্ত দিব, সেগুলো তুই কিছুতেই মানতে চাইবি না। শর্তগুলো খুব সোজা। কিন্তু ওগুলো মেনে নিতে তুই কঠিনভাবে বেঁকে বসবি।'

'বাবা হয়ে তুমি কঠিন শর্তের প্যাঁচ কষে মেয়েকে সম্পত্তি দেবে কেন? দলিলের মধ্যে তুমি এমন শর্ত জুড়বে কেন যা মানতে আমার আপত্তি থাকতে পারে? ঠিক আছে, তুমি আমাকে দলিল দেবে কি দেবে না সে কথা পরে শুনলেও চলবে। আগে বলো, তুমি কী কঠিন শর্তে আমাকে দলিল দিতে রাজি আছ? তোমার প্যাঁচ কষা শর্তগুলো আগে শুনে নিই। তারপর তোমাকে সাইজ করব।'

'দলিলের মধ্যে পষ্ট ভাষায় লেখা থাকবে, 'দুলারি বেগম, মাতা রোশনা বেগম, পিতা অজ্ঞাতকে এই বাড়িতে আমৃত্যু অবস্থান করিতে দিতে হইবে। দুলারি বেগমের জীবন যাপনের নিজস্ব স্টাইল অক্ষুণ্ন রাখিবার অধিকার এই দলিলে সংরক্ষিত বলিয়া বিবেচিত হইবে। দলিল গ্রহিতা দ্বিতীয় পক্ষ দলিলে উল্লিখিত কোনো একটি শর্ত ক্ষুণ্ন করিলে এই দলিল বাতিল বলিয়া গণ্য হইবে।'

জামানের চোখ-মুখ হাসিতে জ্বলজ্বল করছে। দারুণ মজা পাওয়ার ভাব নিয়ে সে বলতে থাকে,

'দলিলের শর্ত ঠিকঠাক পালন হচ্ছে কি না সেটা দেখার জন্য কম বয়সি একজন উকিল ঠিক করে রেখে যাব। উকিলের বয়স নিয়ে আমাকে মাথা ঘামাতে হচ্ছে কারণ, উকিল ব্যাটাকে দুলারির চেয়ে বেশি দিন বাঁচতে হবে। দুলারি বেঁচে থাকতে যদি তার উকিল মরে যায় তাহলে দুলারির অধিকার মানতে তুই বেগর বাই করতে পারিস। এই কারণে দুলারি মারা যাওয়ার আগে উকিলকে মরতে দেওয়া যাবে না। অবশ্য, বাংলাদেশে অ্যাক্সিডেন্টে যেমন গণহারে মানুষ মরা শুরু হয়েছে তাতে একটা মাত্র জানের ওপর ভরসা রাখা বোধ হয় ঠিক হবে না, কী বলিস মিতু। একটা কম বয়সি উকিলের পাশে আরেকটা আরও কম বয়সি উকিল ঠ্যাকনা দিয়ে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ।'

মিতু তার বাবার কথায় রেগে যাবে না নিয়ত করে আজ কথা শুরু করেছিল। কিন্তু দলিলের শর্তের ছিরি শুনে রাজ্যের রাগ একযোগে তার মাথার দিকে চড়াও হচ্ছে। তার ধৈর্যের সূতা এখন ছিঁড়ে যাওয়ার মতো টান টান। তবুও মাথা ঠান্ডা রেখে বলে,

'শোন বাবা, আগের দিনের বিলাসী ফুল বাবু জমিদারদের মাথায় তোমার চেয়ে বেশি ঘিলু ছিল। তারা তাদের রং-বিলাসের খায়েশ মিটানোর জন্য একটা নয় অনেক সময় দুই, তিন, চারটা রক্ষিতা পুষত। কিন্তু রক্ষিতাদের তারা তাদের মূল বসত বাড়িতে এনে আশ্রয় দিত না। বুদ্ধিমান জমিদাররা রেড লাইট এরিয়ায় বাড়ি বানিয়ে রক্ষিতাদের দান করে দিত। তুমি দুলারির জন্য তেমন ব্যবস্থা করলেই পারো। ওকে যেকোনো রেড লাইট এরিয়ায় একটা আলিশান বাড়ি তুলে দাও। সেখানে ওর নিজের বসবাসের ব্যবস্থা হবে। আবার অন্য পতিতাদের বাড়ি ভাড়া দিয়ে দুলারি ভালো টাকা রোজগার করতে পারবে। রেড লাইট এরিয়ায় দুলারির বাড়ি ইন্ডিয়ার আম্বানিদের বাড়ির মতো বিলাসবহুল হলে আমার তাতে কী আসে যায়? আর শোন বাবা, আমি হিংসায় পাগল হয়ে দুলারিকে এ বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিতে চাচ্ছি—তোমার এই ধারণা ঠিক না। আসলে, আমাদের পরিবারের সবার মান-মর্যাদার স্বার্থে আমি তাকে এই বাড়িতে থাকতে দিতে চাচ্ছি না। আমার কাছে আমার যুক্তি খুব পরিষ্কার। কিন্তু বাবা, তোমার কাছে তোমার যুক্তি কি পরিষ্কার, বলো? আমার সব আপত্তি ঠেলে ফেলে দলিল-দস্তাবেজ পাকা করে তুমি দুলারিকে এই বাড়িতে রাখতে চাচ্ছ কেন, তার কারণ কি তুমি ব্যাখ্যা করতে পারবে?'

'শোন বোকা, দুলারিকে আলাদা একটা বাড়ি বানিয়ে ওর নামে পাকা দলিল করে দিলে দুলারি সেটা তার দখলে রাখতে পারবে না। তুই বলছিস, কোনো একটা ব্রোথেলের মধ্যে দুলারিকে একটা বাড়ি তুলে দিয়ে তাতে ওর থাকার ব্যবস্থা করতে। সেটা জমিদারদের আমলে সম্ভব ছিল। ব্রিটিশ আমলে রেড লাইট এরিয়ায় কোনো পতিতা একটা বাড়ির মালিক হলে সে বাড়ি সেই পতিতার দখলেই থাকত। গুন্ডারা সেটা কেড়ে নেয়ার সাহস দেখাত না। স্বাধীন দেশে এটা সম্ভব না। তাছাড়া কান্দুপট্টির পতিতালয় উচ্ছেদ হওয়ার পরে ঢাকা শহরের মধ্যে গেটে সিল-ছাপ্পর মারা কোনো রেড লাইট এরিয়া নাই। এখন পতিতারা পাড়া-মহল্লায় যার যেখানে খুশি স্বাধীনভাবে বাস করে। তাই বলে তারা পতিতার পেশা ছেড়ে সতী নারীর খাতায় নাম লিখিয়েছে—এটা ভাবিস না। পাড়া মহল্লার ভেতরে সেজে গুজে পতিতারা দরজার সামনে রাস্তায় সারবেঁধে দাঁড়াতে পারে না। বসবাসের নতুন পরিবেশের সাথে মিল রেখে ওরা শরীর বেচাকেনার নতুন কৌশল বের করে নিয়েছে। অভিজাত এলাকার বাসিন্দা, মাঝবয়সি সোসাইটি, লিডার থেকে শুরু করে উঠতি চ্যাংড়া মাস্তান সবাইকেই ওরা সমঝাতে জানে। কিন্তু দুলারি দুনিয়াদারির এসব আওবাও কিছুই বুঝবে না। দুলারিকে নিয়ে আমার সমস্যা হচ্ছে ওর জন্ম পতিতালয়ে কিন্তু আদতে সে...'

জামান মাঝপথে কথা থামিয়ে দেয়। কোনো একটা কথা বলতে গিয়ে আচমকা থেমে কিছুটা সময় চিন্তা করে। একটা অজানা আবেগের আলোড়ন জামানের মনকে নাড়া দিতে গিয়ে থমকে গেছে। সজাগ হয়ে সে তার মনকে বর্তমান বাস্তবতায় ফিরিয়ে নিয়ে আসে। জামানের মুখে বিষাদের ছায়া গোপন থাকে না। একটু থেমে সে লম্বা শ্বাস ফেলে বলে,

'দুলারি ওর মায়ের মতো আবেগী ধরনের সাদামাটা মেয়ে। গুলশান বনানী দূরের কথা, কড়াইল বস্তিতে একটা ঘর দুলারি একলা ওর দখলে রাখতে পারবে না। ওকে কেউ ঘর ছেড়ে চলে যেতে বললে ও প্রতিবাদ না করে পথে নেমে যাবে। সম্পত্তি দখলে নেওয়ার কুকুর কামড়া-কামড়ি সভ্য সমাজের ধারণা। সম্পত্তির দখল-বেদখল বিষয়ে দুলারির কোনো ধারণা নাই। সম্পত্তির মালিকানা বেহাত হলে পাল্টা জবরদস্তি করে মেয়েটা সেখানে টিকে থাকার চেষ্টা করবে না।'

প্রথম দিকে জামান নিরাসক্ত গলায় দুলারির স্বভাব মেজাজের বর্ণনা দিয়ে যাচ্ছিল। তার কথা শুনে মনে হচ্ছিল, সে খুব দূরের কোনো মানুষের সমস্যা নিয়ে কথা বলছে। বাবার নিরাসক্তির বহর দেখে এতক্ষণ মিতুর মেজাজ ঠিক রাখতে বেগ পেতে হচ্ছিল। কিন্তু শেষের দিকে দুলারির স্বভাবের বর্ণনা দিতে গিয়ে জামানের গলায় আবেগের ছোঁয়া গোপন থাকে না। দুলারির আবেগী মন ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তার বাবা গলায় আদিখ্যেতার কাঁপন তোলায় মিতুর মনে বিদ্বেষ ছুঁয়ে যায়। বাবার মনের মধ্যে মিতু তার নিজের অবাধ দখলের জায়গায় আরেক জনের উপস্থিতি টের পেতে থাকে। বিদ্বেষ প্রকাশের নিচুতায় না গিয়ে বাপের ওপর তার মনে রাগ জমা হতে থাকে। রাগে ফেটে পড়ার ইচ্ছা দমন করতে নিজের মনের ওপর মিতুকে জোর খাটাতে হয়। ধীরে সুস্থে মেজাজের মুখে লাগাম পরিয়ে সে ফের কথা শুরু করে। মিতুর সচেতন মন তাকে সাবধানে পা ফেলতে বলছে। তার মনে হচ্ছে, দুলারির সমস্যা এতদিন যত হালকা বলে মনে হয়েছে আসলে সেটা তার চেয়ে জটিল। বিষয়টা খুব সাদামাটা মনে হচ্ছে না। দুলারিকে ঘিরে তার বাবার জীবনে এমন কোনো সত্য লুকানো আছে যার শিকড় অনেক গভীরে। দুলারি সমস্যা এমন হালকাভাবে নাড়াচাড়া করা উচিত হবে না। তাতে পুরো ব্যাপারটা লেজে গোবরে হওয়ার ভয় মিতুর মনে জানান দিতে থাকে। সজাগ মনের সতর্কবাণী মাথায় রেখে মিতু বাবাকে ডাক দিলে তার গলায় বাড়তি সাবধানতা জামানের কানে লুকানো থাকে না।

'শোন বাবা, তোমার সংকট আমি ভালো মতো বুঝতে পারছি। তুমি এখন নিজের জালে নিজে আটকা পড়ে গেছ। দুলারিকে এতদিন তুমি কী দরকারে ব্যবহার করেছ সেটা আমি জানি না। তবে, দুলারির সঙ্গে তোমার সম্পর্ক তুমি যেমন সোজা সিধে শারীরিক বলে আত্মীয়-স্বজনকে বুঝ দিয়ে তোমার দায়িত্ব শেষ করে ফেল সেটি আমি বিশ্বাস করি না। ঠিক আছে। তর্কের খাতিরে তোমার কথাকে সত্য বলে মেনে নিয়ে বলছি, দুলারিকে তোমার আর প্রয়োজন নেই। কারণ তোমার বয়স হয়েছে। আমার মতের সঙ্গে একমত হয়ে তুমি এই সত্য মেনে নেবে। তাহলে প্রশ্ন, দুলারি বিড়ম্বনা বাসা থেকে দূর করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে তোমার বাধা কোথায়? এটা নিয়ে আমার নিজস্ব ব্যাখ্যা আছে। আমার ধারণা, স্রেফ মানবিক কারণে দুলারিকে তুমি ঘর থেকে বিদায় করতে পারছ না। ভাবছ, দুলারি একলা অসহায় মেয়েমানুষ। পথে বের করে দিলে ও কোথায় যাবে? আমার বিশ্বাস, দুলারির একটা আশ্রয় থাকলে তুমি এমন উত্কট ঝামেলা লটকে রাখতে রাজি হতে না।'

জামান নিজেকে পুরোপুরি সামলে নিয়েছে। তার চোখে বিতর্ক প্রতিযোগিতার বিচারকের চাউনি। মেয়ের কথা বলার ভঙ্গি, একটা একটা শব্দ সাবধানে খুঁটে তোলার চেষ্টা, হিসাব করে যুক্তির জাল বিছানো সবই সে খুব মনোযোগ দিয়ে বিচার করছে। মিতু বুঝতে পারে, তার বাবা চোখে মুখে হাসির ঝলক ফুটিয়ে তাকে পরখ করছে। সব টের পেয়েও মিতু তার টের পাওয়ার বিষয়টা সাবধানে লুকিয়ে রাখতে চাচ্ছে। মনের মধ্যে লুকিয়ে রাখা অতি সাবধানি চিন্তাগুলো বাবা চট করে পড়ে ফেলুক এটা সে চাচ্ছে না। মনের ভেতর লুকিয়ে রাখা কথাগুলো আড়াল করে রাখার জন্য সে তার বাবার সঙ্গে চোখাচোখি এড়িয়ে যাচ্ছে।

অন্য দিকে চেয়ে প্রতিটি শব্দের ওপর জোর দিয়ে মিতু বলে,

'দুলারির বয়স, তোমার নিজের বয়স এবং সামাজিক সংকটের কথা মাথায় রেখে তুমি ওর জন্য একটা আশ্রয়ের ব্যবস্থা চিন্তা করো। দুলারিকে আমি ধাক্কা মেরে পথে নামিয়ে দিতে বলছি না। হাজার হোক আমি তোমারই মেয়ে। আমি চাইলেও কোনো মানুষের সঙ্গে খুব বেশি নিষ্ঠুর ব্যবহার করতে পারব না।'

মিতু হঠাত্ কথা থামিয়ে বাবার চোখে চোখ রেখে হাসে। জামানের চোখে মেয়ের হাসি নিখাদ, নির্মল মনে হয়। সেই মূহূর্তে জামান অন্তর থেকে বিশ্বাস করে, মিতু চাইলেও দুলারিকে গলাধাক্কা দিয়ে পথে বের করে দেওয়ার মতো নিষ্ঠুর কাজ কোনোদিন করতে পারবে না। মিতু ভুলে-চুকে একটু আধটু নিষ্ঠুর হয়ে উঠলেও খুব তাড়াতাড়ি ফের অনুতপ্ত হতে জানে। বাবার চাউনির গায়ে নরম ছোঁয়া দেখে মিতু চোখ নামিয়ে বলে,

'শোন বাবা, দুলারির বিয়ের বয়স হয়েছে। মেয়েটার নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করতে হলে ওকে এখন বিয়ে দিতে হবে। আমার ধারণা, তুমি হাজার চেষ্টা করে দুলারিকে একটা ভালো ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিতে পারবে না। দুলারি কান্দুপট্টি পতিতালয়ে জন্ম নেওয়া পিতৃপরিচয়হীন একটা মেয়ে। দুলারির জন্ম-পরিচয় জানার পরে ওকে কেউ বিয়ে করবে, তুমি এটা আশা করতে পার? আবার দেখ, ওর জন্ম-পরিচয় গোপন করে কারও সাথে ওর বিয়ে দিলে তারা একসময় সেটা ঠিকই জানতে পারবে। আমাদের দেশের মানুষের খাসলত তুমি ভালো করেই জান। রাস্তায় চলতে গিয়ে যে পুরুষ মানুষগুলো একটা মেয়ের গায়ে ধাক্কা দেওয়ার জন্য মুখিয়ে থাকে তারা দুলারির মতো একটা মেয়েকে শান্তিতে সংসার করতে দেবে—এটা তুমি বিশ্বাস কর? আমি নির্বোধের মতো শুধু পুরুষ মানুষগুলোর কথা বলছি কেন? দুলারির সুখের আশায় ছাই দেওয়ার কাজে মহিলারা কি পিছিয়ে থাকবে? তুমিই বলো। চুপ করে আছ কেন?

'শ্বশুরবাড়ির লোকের কাছে দুলারির পরিচয় ফাঁস করার জন্য রাস্তা থেকে লোক ডেকে আনতে হবে কেন? বিয়ের নিশি ভোর হওয়ার আগে দুলারি নিজেই সাফল্যের সঙ্গে শশুরবাড়িতে তার পরিচিতি পর্ব সেরে ফেলবে। দুলারি বাঁদরটা কি আমাদের সমাজের ভণ্ডামি-ভরা মানুষের ছলাকলার খবর রাখে? ছলাকলা করে মিছে কথার ডালি সাজানোর ভণ্ডামো বিদ্যা ও কোথায় পাবে?'

বাবার কথার মধ্যে কি দুলারির সারল্যের প্রশংসা? একটু গর্ব একটু প্রশ্রয় বাবার মুখে ছায়া ফেলে গেল কি? মিতুর মনে বিদ্বেষের কাঁটা ফের কুট কুট করে খোঁচাতে থাকে। তার অহংকারী মন দুলারিকে ঈর্ষা করার মতো নিচু কাজের স্বীকৃতি দিতে চায় না। সে যে মনের মধ্যে দুলারিকে হিংসা করছে সেটা তার বাবাকে কিছুতেই বুঝতে দেবে না।

মনের ভাব চাপা দেওয়ার জন্য সে পুরোনো কথার রেশ টেনে বলে,

'তাহলে বুঝে দেখ ওর বাস্তবতা। সত্য জানার পরে শ্বশুরবাড়ির লোকেরা দুলারিকে পুরা একটা দিন তো দূরের কথা, এক মিনিটের জন্য তাদের ঘরে ওকে জায়গা দেবে না। মেয়েটাকে সঙ্গে সঙ্গে পথে বের করে দেবে। স্রেফ জন্ম-পরিচয়ের কারণে সমাজে মেয়েটার অবস্থান কত নাজুক। অথচ, জন্ম-পরিচয়ের দায় মেয়েটার ঘাড়ে চাপানো কেমন নাহক কাজ—এই বুঝ আমার, সমাজের মানুষের কাছে তুমি আশা করতে পার না। যাকগে, দুলারি বেচারার সামাজিক সংকট মাথায় রেখে সাবধানে ওকে গুছিয়ে দিতে হবে—এটা তুমি না বুঝলেও আমি খুব ভালো করে বুঝি। না, মানে, তুমি যে কিছুই বোঝ না আমি তা বলছি না। আমার মনে হয় আসলে তুমি সংকট সমাধানের পথ খুঁজে পাচ্ছ না। এ ব্যাপারে আমি তোমাকে সাহায্য করতে পারি। বলতে পার, মেয়েটার সংকট সমাধানের জন্য আমি তোমার সাথে হাত লাগাতে পারি।'

জামানের চোখে মুখে প্রশ্রয়ের হাসি। মিতু জানে তার বাবা বিষয়টাকে গুরুত্বের সাথে নিচ্ছে না। কিন্তু ওর বিশ্বাস তার পরিকল্পনা শুনলে বাবা তার কথা ফেলে দিতে পারবে না। সে ঠিকই মনে মনে মেয়ের বুদ্ধির তারিফ করবে। এই বিশ্বাস মনে রেখে মিতু বাপের চোখে ভেসে থাকা বাঁকা হাসি না দেখার ভান করে বলে,

'দেশে এখন অনেক প্রতিষ্ঠান আছে যারা দুলারির মতো মেয়েদের দেখ-ভালের দায়িত্ব নিয়ে থাকে। দুলারির পুনর্বাসনের ব্যাপারে তুমি মন ঠিক করলে এ ধরনের কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমি কথা বলতে পারি। দরকার হলে সেই প্রতিষ্ঠানকে আমরা ভালো অঙ্কের ডোনেশন দিব। বিনিময়ে আমরা তাদের কাছ থেকে দুলারির আজীবন দেখ-ভালের লিখিত গ্যারান্টি নিব। সমাজে দুলারি তো আর একা না। ওর মতো আরও অনেক ভাসমান মেয়ে আছে। ভাসমান মেয়েদের জীবনের জটিল প্যাঁচ সামলানোর দক্ষতা নিশ্চয়ই ওসব প্রতিষ্ঠানের আছে। দাতব্য প্রতিষ্ঠানের লোকজন আমাদের মতো অ্যামেচার নয়। পয়সার বিনিময়ে ওরা ওদের পেশাগত দক্ষতা দিয়ে মেয়েটার জীবন গুছিয়ে দিলে আমাদের ক্ষতি কী?'

মিতুর কথা শুনে জামানের মুখে মজা পাওয়ার ভাব আরও ঘনিয়ে আসে। চোখের কোনা ছেড়ে চটুল হাসি তার মুখজুড়ে বিছিয়ে পড়ে। গলার স্বরে হাসির ছোঁয়া নিয়ে সে বলে,

'মিতু, তুই নির্বোধ ছিলি এবং এখনো যথারীতি নির্বোধ রয়ে গেছিস। তোর ভাব দেখে মনে হচ্ছে, ভবিষ্যতে তোর মাথায় বুদ্ধি গজানোর সম্ভাবনা একবারে নাই। বাংলাদেশে কোনো চ্যারিটি হোম দুলারিকে আটকে রাখতে পারবে—এটা তুই বিশ্বাস করিস? চ্যারিটি হোম অনেক দূরের কথা, তুই ওকে সেন্ট্রাল জেলের সেফ কাস্টডিতে রেখে আয়। দেখবি, সাত দিনের মাথায় দুলারি জেল থেকে বেরিয়ে নাজিমুদ্দিন রোডে মাক্কু শাহের মাজারের পাশে লোক জমিয়ে তাদের সাথে রঙ্গ-রসের আসর বসিয়েছে। আসলে তুই দুলারিকে চিনিস না। দুলারির মতো মেয়ের জন্য কোনটি আশ্রয় আর কোনটি ওর নিরাশ্রয় হওয়ার পথ, সেটা তোর পক্ষে অনুমান করা সম্ভব না। কাজেই ওকে নিয়ে তুই মনগড়া যুক্তি তৈরি করার আজিরা খাটনি আর খাটবি না। তোর নিজের জীবনের বাস্তবতার ছকে ফেলে দুলারির জীবনের সুখ-দুঃখ মাপতে গিয়ে তোর ভাবনা-চিন্তা গুলিয়ে গেছে।'

কথা বলতে বলতে মিতুর কথায় সরল আন্তরিকতার সুর ঘনিয়ে এসেছিল। কিন্তু জামানের চাঁছাছোলা মন্তব্য মিতুকে ধাক্কা মেরে ফের তার নিজের ভেতর গুটিয়ে ফেলে। মিতুর গলা থেকে আন্তরিকতার ছাপ মুছে গিয়ে খড়খড়ে ঝগড়ার সুর বেজে ওঠে।

'বাবা, দুনিয়ার সব সমস্যা তুমি তোমার মনগড়া অবাস্তব থিওরি দিয়ে বিচার করতে ভালোবাস। ঘরে বসে দিনভর থিওরি কপচে কক্ষনো দুলারি সমস্যার সমাধান খুঁজে পাবে না। মাঝখান থেকে সমস্যার জটে প্যাঁচিয়ে তুমি কড়া গোছের একটা আছার খাবে। দুলারির জটিল সমস্যার সমাধান করতে চাইলে তুমি নিজে স্বাভাবিক লাইনে চিন্তা করতে শেখো। তুমি আসলে ফ্যান্টাসি দুনিয়ার বাসিন্দা। কল্পনার দুনিয়া ছেড়ে বাস্তব দুনিয়ায় এসে বাস করো। দেখবে অনেক সমস্যার সহজ সমাধান তুমি খুঁজে পাচ্ছ। স্বীকার করি, দুলারি আমার অচেনা অন্য দুনিয়ার বাসিন্দা ছিল। কিন্তু এখন ও বেচারা আমাদের সমাজের একজন। বড় কথা, তুমি ভুলে যাচ্ছ, ওর সমস্যা ওর অসুবিধা একান্ত মেয়েলি ধাঁচের। মেয়েটার সামাজিক ব্যাকগ্রাউন্ড যা-ই হোক, কিছু সমস্যা সব মেয়ের জন্য এক রকম। তুমি পুরুষ মানুষ হিসেবে ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারবে না। মেয়ে হিসেবে আমি ওর বাস্তবতা তোমার চেয়ে ভালো বুঝব—এটা তোমাকে মানতে হবে।'

জামানের মুখে বিরক্তির ছায়া। গলায় রাগের সাথে বিরক্তির মিশেল। মেয়ের দিকে খড়খড়ে চোখে চেয়ে গলা থেকে হাসির ছোঁয়া মুছে ফেলে সে বলে,

'তুই আস্ত একটা নির্বোধ। শোন মিতু, তুই তোর নিজের বৃত্তে বাঁধা পড়ে আছিস। তুই আসলে নিজে কিছু দেখতে পাসনে। তুই মেয়ে হিসেবে সমাজের কোন জিনিসটা চোখ মেলে দেখবি আর কোনটা দেখলে চোখ বুজে থাকবি সেটা তোর সমাজ তোর জন্য ছক কেটে ঠিক করে রেখেছে। সমাজ যে তোর চারপাশে একটা বৃত্ত এঁকে রেখেছে সেটার দাগও তুই দেখতে পাসনে। একটা বৃত্তের মধ্যে বাস করে তার দাগ দেখতে না পেলে মানুষ কি সেই বৃত্ত ভাঙার চেষ্টা করতে পারে? চোখে দেখা যায়—এমন বেড়া মানুষ ভাঙতে পারে। অদৃশ্য বেড়া তুই ভাঙবি কীভাবে? অদৃশ্য বেড়ার ঘেরে বন্দি জীবনে মানুষের চিন্তা-ক্ষমতা শূন্যের কোঠায় নেমে যায়। কতখানি নির্বোধ হলে তুই বলছিস, তুই একজন নারী এবং দুলারি তোর মতোই একজন নারী। দুলারি সেকেন্ড জেনারেশন পতিতা। তার বাবার পয়-পরিচয় ছাড়া সে দুনিয়ায় জন্মেছে। বাবার পরিচয় বিনে সে তার সমাজে তার মতো করে বেড়ে উঠেছে। এটা নিয়ে ওর মনে বিশেষ হায় আফসোস আছে—এটা তোর কষ্ট কল্পনা। ও যেখানে বেড়ে উঠেছে সেই ব্রোথেলে বাবার পরিচয় না থাকা স্বাভাবিক। ওখানে কেউ বাবার পরিচয় নিয়ে জন্মালে সেটা একটা অস্বাভাবিক ঘটনা। দুলারির মনে তার বাপ-ভাইয়ের লুতুপুতু স্মৃতি নাই। ওর চোখে পুরুষ মানে কাস্টমার আর মেয়েমানুষ মানে শরীর বিক্রি করা পতিতা। সতীত্ব শব্দের সাথে জন্ম থেকে যার পরিচয় নাই সেই মানুষকে তুই আমার চেয়ে ভালো বুঝবি বলে দাবি করছিস? দুলারির কাছে ফুটপাতে রাত কাটানো আর ঘরে বাস করার মধ্যে ফারাক শুধু আরাম-আয়েশের। ফুটপাতে যদি বাড়ি ঘরের মতো আরাম-আয়েশের সুবিধা থাকত তাহলে দুলারি কখনো ঘরের ভেতর চার দেয়ালে আটকা পড়তে রাজি হতো না। পতিতারা তোদের সমাজের ললিত লবঙ্গ লতা ভদ্রমহিলা না। সমাজের কাছে দুলারিদের হাত পেতে নেওয়ার কিছু নেই। আবার দুলারিদের ঘৃণা ছাড়া আর কিছু দেওয়ার সম্বল সমাজের হাতে নেই। দুলারিকে ঘর থেকে বের করে দিলে ও ঠিকই ওর নিজের মতো করে বাঁচার পথ খুঁজে নেবে। বুকে বল নিয়ে জীবনের মুখোমুখি দাঁড়ানোর ব্যাপারে পতিতারা তোদের চেয়ে শতগুণ বেশি স্মার্ট। যেকোনো বাধার বিরুদ্ধে লড়াই করার প্রশ্নে পতিতারা ভদ্রমহিলাদের চেয়ে হাজার ধাপ এগিয়ে আছে।'

বিষয়ের গুরুত্ব বোঝাতে জামান ঘটা করে সামনে ঝুঁকে আরও কথা বলতে গিয়ে ফিক করে হেসে ফেলে। তার মুখ দেখে মনে হয় হঠাত্ যেন সে তার কথার গুরুত্ব হারিয়ে ফেলেছে। সে আচমকা ব্রেক কষে দরকারি কথা থামিয়ে দিয়ে খানিক সময় ঝিম মেরে বসে থেকে বলে,

'থাক বাদ দে মিতু। মেলা সময় ধরে আমরা খুব কঠিন একটা সাবজেক্টে বন্দি হয়ে আছি। নে আয়, আমরা রেড লাইট এরিয়া থেকে সরে এসে অন্য কোনো বিষয় নিয়ে কথা বলি। আচ্ছা মিতু, তুই রোজ সকালে খবরের কাগজ পড়িস?

'বাবা, তোমার ধারণা আমি একটা মূর্খ মেয়েমানুষ। তাই বলে কি এত মূর্খ যে খবরের কাগজও পড়ব না?'

'আরে ধুর, আমি কি তা-ই বলছি নাকি? আজকের দিনে যাদের মাথায় ঘিলু আছে তারা খবরের কাগজের ধারে কাছে যায় না। তোর কথাবার্তায় বুদ্ধির ছাপ পেয়ে ভেবেছিলাম তুই নিশ্চয়ই খবরের কাগজ পড়া বন্ধ করে দিয়েছিস।'

'না বাবা, আমি খবরের কাগজ নিয়মিত পড়ি এবং আগামীতেও পড়তে থাকব। আমার নির্জন গুহাবাসী জ্ঞানী হওয়ার সাধ নেই।'

জামানের চাউনিতে স্বাভাবিক চটুল ভাব ফিরে এসেছে। হঠাত্ তার মনে হচ্ছে মেয়ে মিতুর সঙ্গে কথা বলে সে আনন্দ পাচ্ছে। ধীরে সুস্থে গল্প চালিয়ে যাওয়ার মুড নিয়ে জামান সোফার ওপর আয়েশ করে বসে মেয়েকে বলে,

'খবরের কাগজ পড়ার জন্য আমি তোকে কিছু টিপস দিচ্ছি। শোন, পত্রিকার প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় হেডলাইনগুলোর দিকে ভুলেও তাকাবি না। ওগুলো পত্রিকার মালিক, সম্পাদকের স্বার্থ বাঁচানোর বদমতলবি খবর। ওসব খবর নিয়ে পলিটিশিয়ান কিংবা ব্যবসায়ীরা কষে দর কষাকষি করতে থাক। তুই পত্রিকার পৃষ্ঠা উল্টে বুদ্ধি করে একেবারে সাধারণ একটা খবর বেছে নিয়ে মন দিয়ে পড়বি। খবরটা এমন হতে হবে, যেটা নিয়ে তুই নিজে মাথা ঘামিয়ে সত্য খুঁজে পাওয়ার আনন্দে মেতে উঠতে পারবি। ভেতরের পৃষ্ঠার চিকন দাগে ছাপা খুব সাধারণ খবরগুলো খুঁটিয়ে পড়লে তুই ঠকবি না। দেখবি, এত্তটুক একটা খবরের ভেতর কত পদের সামাজিক বেমিলের ছবি। সাকুল্যে দশ-বিশ লাইনের একটা খবরের সঙ্গে তোর চারপাশে ঘটতে থাকা নিত্য দিনের ঘটনা আর বাঁধা ধরা নিয়ম-রীতির কত বেমিল। তুই তোর চারপাশে কতশত ভণ্ড মানুষ নিয়ে মহাসুখে দিন কাটাচ্ছিস এটা দেখতে পাওয়া একটা মজার অভিজ্ঞতা। চারপাশের মানুষগুলোর ভেতর ঘাপটি মেরে থাকা ভণ্ডামির খবর একটা খবরের ভেতরে পষ্ট দেখতে পাবি। খবর পড়ে একবেলা মন খুলে হাসার মতো এক গাদা উপকরণ হাতে পেয়ে যাবি। জুতসই একটা খবরের মিল-বেমিলের দুই দিক ভেঙেচুরে ব্যাখ্যা করে যদি গুছিয়ে লিখে কোনো খবরের কাগজে ছাপিয়ে ফেলতে পারিস তাহলেই কেল্লা ফতে। একজন সেল্ফ মেড সমাজবিজ্ঞানী হওয়ার পথে তোর আর কোনো বাধা থাকবে না।'

কথাটা বেশ গুছিয়ে বলতে পারার আনন্দে জামান খানিক হেসে নেয়। তার হাসির সাথে মিল দিয়ে মেয়ে হাসছে কি হাসছে না সেদিকে তার খেয়াল নেই। হাসি শেষ করে সামনে নিচু টেবিলের ওপর গাদাগাদি জড়ো করা পত্রিকার দিকে তার চোখ পড়ে। পত্রিকার গাদার দিকে আঙুল তুলে ইশারা করে জামান খুব আগ্রহ নিয়ে মিতুকে বলে,

'ওই যে, ওই কোনায় আলাদা করে রাখা বাংলা পত্রিকার শেষের পাতা খুঁজে দেখ। ওই কাগজে শেষ পাতার শেষ কলামে দারুণ একটা খবর আছে। খবরটা পড়ে পয়লা ভাববি এটা একটা সাধারণ খবর। এই খবর নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করার কথা তোর মাথায়ই আসবে না। আসলে খবরটা কোনো দুর্লভ ঘটনা নয় কিন্তু খবরটার আগু পিছু তত্ত্বতালাশ করলে দেখবি এটি তোর চোখের সামনে দুর্লভ একটি ছবি তুলে ধরবে। ছাপানো খবরের সঙ্গে মিল পড়ে—এমন সামাজিক বিষয়গুলো একটু সময় নিয়ে চিন্তা করলে তোর চোখে সমাজের সমষ্টিগত ভণ্ডামির চেহারা জ্বলজ্বলে পষ্ট হয়ে যাবে। তখন তোর কাছে খুব সাধারণ একটা খবর অসাধারণ হয়ে উঠবে।'

মিতু পত্রিকা হাতে নিয়ে মন দিয়ে খবরটা পড়ে করে শেষ করে চোখে প্রশ্ন নিয়ে বাবার দিকে চেয়ে থাকে। তার চাউনির মধ্যে কৌতূহলের চেয়ে বিরক্তির ভাগ বেশি। জামান মেয়ের চাউনির প্রতি উদাসীন। পত্রিকার পাতায় ছাপা হওয়া খবরটি মেয়ে পড়ল কি পড়ল না সেটা নিয়ে সে আর মাথা ঘামাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না। সে এখন নিজের মনে নিজের ভাবনার জাল বুনতে ব্যস্ত। মিতু ডাক দিয়ে বাবার মনোযোগ ভাঙে। বলে,

'তুমি এত ঘটা করে এমন সাধারণ একটা খবর আমাকে পড়তে বাধ্য করলে কেন আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না। জেনা করার অপরাধে আমাদের দেশে মেয়েমানুষকে মাঝে মাঝে দোররা মারা হয়। ঢাকা কিংবা চিটাগাং-এর মতো বড় শহরে দোররা মারার চল নেই কিন্তু দূরের গ্রামে-গঞ্জে দোররা মারার ঘটনা বছরে দুই-একবার পত্রিকায় ছাপা হয়। জেনা করার দায়ে মেয়েমানুষকে দোররা মারা বাংলাদেশে কোনো আজগুবি ঘটনা নয়। তাই বলে এটা এমন নয় যে, দেশজুড়ে সব ক-টা পুরুষ মানুষ দোররা হাতে মহিলাদের পেছনে হা-রে-রে বলে ছুটছে। দোররা মারার বিরুদ্ধে আমাদের দেশে সামাজিক প্রতিবাদের রীতি চালু থাকায় আমি বিষয়টাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে দেখি। দেশের আনাচে কানাচে টুকুর টাকুর এমন বাজে ঘটনা ঘটলে সেটা নিয়ে বিশেষভাবে মাথা ঘামাতে হবে কেন? ইন্ডিয়ার আনাচে কানাচে কালেভদ্রে নরবলির মতো নারকীয় ঘটনা ঘটে, তুমি সেটা জান না?'

জামান চোখ তুলে মেয়ের মুখের দিকে অপলকে চেয়ে থাকে। এক সময় চোখ দুটো সরু করে জিজ্ঞেস করে,

'এই খবরের মধ্যে বিশেষভাবে বাজিয়ে দেখার মতো কোনো সামাজিক অসঙ্গতি তোর চোখে পড়ল না?'

'না বাবা, আমি পাইনি। আমি আবার জোর দিয়ে বলছি আমাদের সমাজে দোররা মারা একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা। বিবেকবান মানুষ হিসেবে বলতে পারি, সমাজে এমন ঘটনা একটিও ঘটা উচিত নয়। তবে আমার চাওয়ার সাথে তাল মিলিয়ে রাতারাতি সমাজ বদলে যাবে না। আমি কোনো কামেল পির-ফকির না যে সমাজ থেকে সব অনাচার ছু মন্তর দিয়ে এক লহমায় মুছে দেব। শুধু দোররা মারা কেন, দোররা মারার চেয়েও জঘন্য ঘটনা সমাজে অহরহ ঘটছে যার একটিও ঘটুক সেটা আমি চাই না। কিন্তু আমি না চাইলেও ঘটনা ঘটছে এবং ভবিষ্যতেও ঘটতে থাকবে।'

মিতু মনের আনন্দে লম্বা একটা বক্তৃতা শেষ করে এবার দম নিতে বসে। তার মনে হয়, আজ কত বছর ধরে সে বাবার সাথে শুধু দুলারিকে নিয়ে ভ্যানর ভ্যানর করে আসছে। বাবার সঙ্গে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু থেকে দুলারিকে সরাতে পেরে তার আরাম বোধ হতে থাকে। আয়েশ করে লম্বা দম নিয়ে সে তার বাবার দিকে স্বাভাবিক চোখে চেয়ে বলে,

'ও আচ্ছা, ভালো কথা। এই দেখ। গুরুগম্ভীর বাণী দিতে গিয়ে তোমার আসল কথা ভুলে বসে আছি। দোররা মারার খবরের কোন গুমোড়ের ওপর তুমি জোর দিতে চাচ্ছ সেটা বলে ফেল।'

'আমাদের সমাজে মেয়েদের পতিতা বানালে দোষের কিছু নেই। দেশজুড়ে পতিতারা বুক ফুলিয়ে দিব্যি চলে ফিরে খাচ্ছে। পতিতাদের দেহ ভোগ করাকে কেউ জেনা করা বলে গাল দেয় না। জেনা করার দায়ে ওদের কেউ দোররা মারতেও যায় না। অথচ ঘরের মেয়ে-বৌ বেচাল চললে তাকে জেনাকারি বলে দোররা মারে। আমার মনে হয় কী জানিস, মেয়েটাকে শাসন করার জন্য ওরা দোররা মারার ফিকির করে না। আসলে মেয়েটাকে ঘরছাড়া করে বারোয়ারি ভোগ্য মানে পতিতা বানানোর লোভে পুরুষেরা দোররার নাটক সাজায়।'

জামান হঠাত্ ক্লান্ত বোধ করে। তার আর কথা বলতে ইচ্ছে করে না।

জামানের কথা ফুরানোর সাথে সাথে দরজায় বেল বেজে ওঠে। সে হেসে বলে,

'বিকেলের রুটিন ঢলাঢলি শেষে দুলারি বিবি এবার ঘরে ফিরলেন। দে মিতু, দরজাটা খুলে দে। ঘরের মধ্যে এবার দুলারি তাণ্ডব শুরু হবে।'

মিতুর চোখে ঝাপসা চোরা চাউনি। মনে হয়, মিতু জানে, দুলারি নয়, দরজায় অন্য কেউ বেল বাজিয়েছে।

প্রয়োজনের চেয়ে জোরে পা চালিয়ে সে দরজার কাছে ছুটে গিয়ে ঝটিতি দরজা খুলে মাটির দিকে চেয়ে আগন্তুককে খুব নরম গলায় বলে, 'এস'।

মিতুর বন্ধু রায়হান ঘরে ঢোকে। রায়হান কি জামানের চোখের দিকে সরাসরি তাকাতে দ্বিধা করছে? ছেলেটার সমস্যা কী? ও কী ভাবছে, তাকে এ বাড়িতে আসতে দেখে আমার মনের মধ্যে সন্দেহ চাগা দিয়ে উঠছে? আমি ধরে নেব ও আমার বিবাহিত মেয়ের সাথে চোরা পথে প্রেম করার মতলবে এখানে এসেছে?

জামান কপাল কুঁচকে রায়হানের মুখের দিকে চেয়ে ভাবে, ছেলেটার গায়ে এখন ভরা যৌবন। ভরা যৌবন গায়ে নিয়ে যুদ্ধে নামতে বেল্লিকটার লেজ দুই পায়ের চিপায় ঢুকে গেছে কেন? রাবিশ! এমন আস্ত একটা কাপুরুষ ঘরে কাজের মেয়ের সাথে লুচ্চামি করতে পারবে। জীবনে কোনোদিন কোনো ভদ্রমহিলার সাথে প্রেম করতে পারবে না। রায়হানের মুখের দিকে চেয়ে থেকে জামান মনে মনে ভাবে, এখানে প্রেম-ভালোবাসার কোনো ব্যাপার নেই। দুলারি সংকটে হিমশিম মিতু সংকট আসানের কাজে হাত লাগানোর জন্য তার বন্ধুকে ভাড়া করে এনেছে। আমার কাছে ধরা খাওয়ার ভয়ে দুটো এমন চোরের মতো করছে।

মিতু এবং রায়হানের একযোগে এ বাসায় আসার কারণ পষ্ট হয়ে যেতে জামানের পয়লা খুব হাসি পায়। হাসিটা মনের মধ্যে পুরোপুরি জমে ওঠার আগে তার ক্লান্তি লাগতে থাকে। তার মনে হয়, এখন রায়হান আর মিতু দুইজন একযোগে টানা-হ্যাঁচড়া করে তাকে ফের বাজে প্যাঁচালে সামিল করবে। জামান মনের মধ্যে ঝাড়া দিয়ে নড়েচড়ে বসে। সে ওদের পাতা ফাঁদে পা দেবে না বলে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। জামান বার দুয়েক হাই তুলে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। রায়হানকে বসতে বলে চুপচাপ ভেতরের ঘরে চলে যায়।

জামান ভেতরের ঘরে চলে যেতেই মিতু ওর মুখ থেকে হাসির চিহ্ন মুছে ফেলে বলে,

'আজকের দিনটাও আমার বৃথা গেল, রায়হান। বিকেল থেকে প্যাঁচাল পারতে গিয়ে আমার মুখ পচে গেছে। কিন্তু আমার বাপকে তার সিদ্ধান্ত থেকে এক চুলও নড়াতে পারিনি। তুমি কষ্ট করে দেখ তাকে নড়াতে পার কি না। আমার বাসায় ফেরার তাড়া। মেয়েটাকে বুয়ার কাছে একা ফেলে এসেছি। আর দেরি করব না। এখন মনে হচ্ছে, তোমাকে ডেকে এনে শুধু শুধু কষ্ট দিচ্ছি। আমি চলে গেলে তুমি বাবাকে ডেকে এনে শেষবারের মতো একবার বুঝিয়ে বলে দেখ। কীভাবে বললে আলোচনা বেশ প্রাসঙ্গিক মনে হয় সেটা তোমাকেই গুছিয়ে নিতে হবে। তবে মনে রাখবে, দুলারিকে নিয়ে কথা বলতে যে এখানে এসেছ—এ কথা আমার বাবা যেন ঘুণাক্ষরে আঁচ করতে না পারে। দুলারিকে আশ্রয়কেন্দ্রে পাঠানোর কথা আজ বাবাকে বলার দরকার নেই। আজই কথাটা শুনলে আমার বাপ পাজি ঠিক তোমার মতলব ধরে ফেলবে। তার চেয়ে ভালো, বাবাকে বুঝতে দাও তোমার সঙ্গে আমি এখানে পরকিয়া প্রেম করতে এসেছিলাম। বোঝ না, চারপাশের মানুষগুলো নষ্টামিতে মজে গেলে আমার বাপ সহজে নিজের নষ্টামি জাস্টিফাই করতে পারে। দুঃখের কথা কী বলব, আমার স্বামী হয়েছে আমার বাবার চেয়ে আর এক কাঠি সরেস।'

'কেন, কেন? সে কি একযোগে দুইটা রক্ষিতা ঘরে তুলেছে নাকি?'

রায়হানের চোখে মুখে কৃত্রিম উদ্বেগ। মিতু হেসে ফেলে। বলে,

'আরে ধুর। ফারুক যদি বাবার নষ্টামি নিয়ে আমাকে খোটা দিত তাহলে তোমাকে ডেকে এনে নিত্য দিন এমন কষ্টে ফেলতে হতো না। ফারুক তার শ্বশুরের নষ্টামি নিয়ে দুই-চারটা কটু কথা বললে বাবা তার মেয়ের সংসারের সুখ চেয়ে দুলারি সমস্যার সুরাহা করার কথা সিরিয়াসলি ভাবত। এখন তো বাবার সেই দায় নেই। সে ভাবে তার জামাই চমত্কার উদার মানুষ। কারণ, ফারুক আমার বাপকে গালাগালি না দিয়ে উল্টা যেসব আদিখ্যেতার কথা বলে সেগুলো শুনলে আমার মাথায় রক্ত চড়ে যায়।'

রাগে গজ গজ করে মুখ ভেংচে মিতু বলে,

'ফারুক বলে, দুই দিন পরপর তুমি বাবার পেছনে লাগ কেন? সে একলা একটা বুড়া মানুষ, আহা! থাক না। একজন মানুষ সর্বসাকুল্যে বাঁচে কয় বছর! মানুষ যে কয়দিন বাঁচে সে কয়দিন তাকে তার মতো করে বাঁচতে দেওয়া উচিত। মেয়েটাকে সঙ্গী পেয়ে তোমার বাবা ভালো বোধ করলে তোমার তাতে অসুবিধা কী? আমি তো ওনার মধ্যে খারাপ কিছু দেখি না। তুমি যা-ই বলো মিতু, তোমার বাবার মানবিক বিবেচনাবোধকে আমি সম্মান করি। এইবার বুঝে দেখ, আমি কী ভয়ানক ঝক্কির মধ্যে আছি।'

কথা শেষ করে মিতু কোনো দিকে না চেয়ে সোজা ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যায়। রায়হান মিতুর চলে যাওয়ার দিকে চেয়ে থাকে।

দুই

মিতু চলে যেতে একলা ঘরে রায়হান সোফার গা এলিয়ে আরাম করে বসে পত্রিকা পড়তে শুরু করে। ঠিক তক্ষুনি ভেজানো দরজা ঝটকা মেরে খুলে দুলারি ঘরে ঢোকে। ঘরের ভেতর পা রেখে রায়হানকে বসা দেখে দুলারি লম্বা দম টেনে বুক টান করে দাঁড়িয়ে অনেক দিনের চেনা আপন মানুষের মতো একগাল হাসে। চোখে মুখে আনন্দের ঝলক তুলে চোখ নাচিয়ে জিজ্ঞেস করে,

'ভাইজান, আপনে কেমন মানুষ! নিচে স্বচোক্ষে আমারে দেখেও না দেখার ভান করলেন। বিষয় কী? আপনে আমারে ভালো-মন্দ কিছুই না জিগায়া চোরের মতো পাও টিইপা উপরে আইসা পড়লেন। আপনার এই রকম চোর চোর ব্যবহার দেইখ আমার মনের মধ্যে একটুক অন্যরকম 'কিন্তু' ঠেকছে। আপনে পৌঁছানোর কিছুক্ষণ আগে আমাগো আপা নিচে আমারে দেইখাও না দেখার ভান কইরা উপরে আইসা পড়ল। সেই বেলা আমি চোখ কান খোলা রাইখা নিচে খাড়াইয়া আছি। আপার পাছে পাছে এই বাড়িতে কে আসে নিচে খাড়াইয়া এতক্ষণ আমি সেইটার উপর কড়া নজর রাখছি।'

দুলারির কথা শুনে রায়হান হেসে ফেলে। বলে,

'বাপরে! স্রেফ দুই পায়ের ওপর খাড়াইয়া এত সময় ধরে নজরদারি করা কি সোজা কাজ! তুমি খুব পরিশ্রমী মানুষ দুলারি। দায়িত্ব পালনে তোমার এতটুকু গাফলতি নেই!'

দুলারি কোমড়ে হালকা দোল তুলে দুই হাত শূন্যে নাড়া দিয়ে বলে,

'দুই ঠ্যাঙ্গে দাঁড়াইয়া থাইকা দায়িত্ব পালন কইরা আমার লাভ কী হইল? আপনে আইলেন আর আমার আপা ঝড় তুইলা বাড়ি থাইকা বাহির হইয়া গেল। বিষয় কিছু বুঝলাম না। আমার আপার মুখ বানানির বাহারের মধ্যে আজ অন্য রকম প্যাখনা দেইখা আমি ভাবছিলাম, আজ আমাগো ঘরে একখান সিনেমা হইব। একটুক হিন্দি ঢংয়ের। ওমা! কিসের নাটক, কিসের সিনেমা! সিনেমার শুরুতেই নায়িকা উধাও। কে জানে, এইটা বুঝি আপনাগো সিনেমার নতুন কিসিম।'

আঁচল তুলে মুখ মুছে দুলারি নিজের মনে তার গল্প টেনে লম্বা করতে থাকে। ঠোঁট উল্টে দিয়ে মুখে বিরাগের ছাপ ফুটিয়ে বলে,

'আজ সন্ধ্যায় আমাগো বাসায় যে সিনেমা হইল, সেইটার সিন-সিনারি আমার চিন্তার সাথে একটুও মিল পড়ল না। আজকের সিনেমার মধ্যে অতি কঠিন কোনো গুমর আছে। আচ্ছা, আপনে বসেন। আমি আপনার জন্য চা বানাইয়া আনি। সময় সুযোগ মতো এই সিনেমার গুমর আমি ঠিকই ভাইঙ্গা ফেলব।'

'গুমর আগে ভাঙবে নাকি আগে চা বানাবে, দুলারি? অবশ্য চাইলে দুইটা কাজ তুমি এক সাথে করতে পার। তুমি হাত নেড়ে চা বানাবে আর মাথার মধ্যে চিন্তার ঝড় তুলে সিনেমার গুমর ভাঙবে। আজ তুমি এক ঢিলে দুই পাখি মারার মওকা পেয়ে গেছ। ও ভালো কথা দুলারি, এই দু-টা কাজ শুরু করার আগে তুমি চাচাকে ডাক দিয়ে বলো আমি এখানে একা বসে আছি।'

'একা বইসা আছেন মানে? আপনে এই ঘরে একলা আছেন নাকি? আমি সশরীলে এইখানে মজুদ আছি না। আমার এতখানি শেয়ান শরীল আপনার চোক্ষে ভাসে না? শোনেন, চা খাইয়া শ্যাষ করনের আগে বুড়ারে ডাইকা কোনো লাভ নাই। উনি সকালে এক কাপ ব্লাক কফি খাওয়ার পরে সারাদিন আর চা-কফি কিচ্ছু খায় না। অবশ্য তাইতে কোনো অসুবিধা নাই। আপনে একটুক সময় একলা বসেন। আপা চইলা গেছে এইটা খুব ভালো হইছে। আমি এখন আরাম কইরা আপনার সামনে দুই পাও মেইলা বইসা সুড়ুত সুড়ুত চা খামু। আপা থাকলে আমারে দুর ছাই কইরা আপনার সামনে থাইকা খেদাইয়া দিত। আপনার বুড়া চাচাও কম শয়তান না। সেও আমারে আপনার লগে বইয়া চা খাইতে দিবে না। ওরা বাপ-বেটি দোনোজনে যে আমারে আপনার সামনে থেকে খেদাইয়া দেয় এইটার মধ্যেও একটা কিন্তু আছে। আজ আরাম কইরা চা খাইতে খাইতে আপনারে সেই কিন্তুটা ভাইঙ্গা কমু। আপনে বসেন।'

'বাপরে বাপ! এ তো জটিল পরিস্থিতি। তোমার মনের মধ্যে দেখি অনেক সব্বনাশা 'কিন্তু' সারাক্ষণ নড়াচড়া করে। এত কিন্তু মাথায় নিয়ে তুমি ঘুমাও কী করে?'

রায়হানের কথার জবাব না দিয়ে দুলারি আর একবার চোখ মটকে হাসে।

ট্রের ওপর চা-বিস্কুট সাজিয়ে নিয়ে দুলারি বেশ তাড়াতাড়ি বসার ঘরে ফিরে আসে। নিচু টেবিলে ট্রে নামিয়ে রেখে সে টেবিলের আরেক পাশে মেঝের ওপর আরাম করে বসে। রায়হানের হাতে চায়ের কাপ তুলে দিয়ে নিঃসঙ্কোচে আরেক কাপ চা নিজের হাতে তুলে সে সুড়ুত্ সুড়ুত্ শব্দ তুলে চায়ে চুমুক দিতে থাকে। পিরিচ থেকে বিস্কুট তুলে নিয়ে চায়ে ডুবিয়ে খেতে খেতে বলে,

'আপা চইলা গেছে বইলা কি আপনের মন খারাপ?'

'কেন দুলারি, আমাকে কি খুব মনমরা দেখাচ্ছে?'

দুলারি রায়হানের মুখের দিকে চোখ তুলে সরাসরি চেয়ে থাকে। রায়হানের প্রশ্নের সঠিক জবাব দেওয়ার জন্য সে তার মুখ খুঁটিয়ে পরখ করছে। দুলারির দৃষ্টি নিঃসঙ্কোচ। রায়হানের মনে হয় মেয়েটার চোখের ভাষা কী সুন্দর সরল। দেশজুড়ে মানুষের মন থেকে সারল্য অনেক আগেই উধাও হয়ে গেছে। শহুরে মানুষগুলোর চোখে মুখে এখন শুধুই সন্দেহ। ঢাকা শহরের শিশুদের তাকানোর মধ্যে সারল্যের মায়া হারিয়ে গিয়ে তাতে সন্দেহের কালো দাগ। কতকাল পরে রায়হান একজন মানুষের চোখে আদিম সারল্য খুঁজে পেল। মনের মধ্যে স্বস্তি নিয়ে রায়হান দুলারির চোখের দিকে অপলক চেয়ে থাকে। দুলারি রায়হানকে ভালো মতো পরখ করে দেখে বলে,

'আপনারে দেইখা মনে হয় না আপনার মনে তেমন কোনো দুঃখু আছে। অবশ্য দুঃখু পাওয়ার কোনো কারণ আমিও খুঁইজা পাইতাছি না। আপনে দুঃখু পাইবেন কোন হাউশে? আমার আপার এইভাবে চইলা যাওয়া কি একটা নতুন বিষয়? উনি আমাকে দেখতে পারে না বইলা মাঝে মাঝে এই বাসা থাইকা এমন খাড়ার উপর দৌড়াইয়া চইলা যায়। তার যাওনের সাথে আপনার আসার কোনো যোগ নাই। আপনে শুধু শুধুু মনে কষ্ট নিবেন না। সে দৌড়াইয়া চইলা গেছে আমার কারণে। আমি উপরে আইসা পড়ুম বইলা সে আগেই দৌড়াইয়া বাহির হইয়া গেছে।'

'তুমি ঘরে আসবে বলে তোমার আপা ঘর ছেড়ে চলে গেল। তার মানে তোমার আপা তোমাকে পছন্দ করে না। তোমার আপার তোমাকে যে পছন্দ না এজন্য তোমার মন খারাপ হয় না?'

'নাহ! মন খারাপ হইব ক্যান? আমি এই বাসায় আইছি পর্যন্ত অতি ফাস্ট থাইকা আপা আমারে দুর ছাই করে। পয়লা দিন থাইকা সে আমারে বিষ চোক্ষে দেখে। তয় সে মুখ ফুটে কিছু বলে না। মুখ ফুটে কিছু না কওন আপনাগো সমাজের রীত। আমাগো কান্দুপট্টিতে কোনো কথা পেটের মধ্যে ভুরভুরি কাটার আগেই সেটা ডাক চিত্কার দিয়া বইলা ফেলতে হয়। আপনাদের সমাজের রীত ভিন্ন। এইখানে আসল কথা পেটে রাইখা মুখে হাসি ফুটাইতে হয়। শোনেন, আপনাকে আসল কথা কই। আপা যে আমারে বিষ চোক্ষে দেখে, এইটা কি তার দোষ নাকি? তার বাপ আমারে কী আশায়, কী মতলবে খানকি পাড়া থাইকা উঠাইয়া আইনা নিজের এত দামের ঘর দুয়ারে স্বর্ণের পালঙ্কে শুইতে দিছে সেই বুঝ তেনার মনে এখনো খোলাশা না। একটা বিষয় খোলাশা কইরা না বুঝলে মানুষের মনে গোস্বা ওঠে—এইটা তো জানা কথা। আমার এইখানে বাস করনের বিষয়-আশয় খোলাশা কইরা না বুঝলে উনার মনে গোস্বা উঠবে—এইটা তো দোষের কিছু না।'

'তুমি ঠিকই বলছ দুলারি। তোমার আপার অবশ্যই গোস্বা হওয়ার কথা। গোস্বা না হলে আমি বরং অবাক হতাম। আচ্ছা দুলারি, তার বাপ কী আশায় কী মতলবে তোমাকে এই বাড়িতে এনে তুলেছে সেটা তুমি নিশ্চয়ই জান। তুমি যদি সব জান তাহলে বিষয়টা তোমার আপাকে বুঝিয়ে বলে তার মনের গোস্বা ভেঙে দাও না কেন?'

রায়হানের কথার সরাসরি জবাব না দিয়ে দুলারি তার আগের কথার সূতা ধরে। বলে,

'আমাগো এই বাড়িতে মূল গুড়ির শয়তান কে জানেন? এই বাড়ির গুড়ির শয়তান হইতাছে আপনার চাচা বুড়া। বুড়া তার মেয়েটারে খেপাইয়া তার মেজাজ চান্দিতে তুইলা দেওয়ার জন্য দিনরাত ফিকিরে থাকে। বুড়া হরেক কথার ধন্ধে ফেইলা তার মেয়ের শরীলে রাগ তুইলা দেয়।'

'ঠিক বলেছ। তোমার কথার সাথে আমার চিন্তার মিল পড়ে যাচ্ছে। তোমার কি মনে হয়, এই চাচা পাজিটার উচিত ছিল তার মেয়েকে সত্যি কথা বুঝিয়ে বলা, কী বলে?'

'আমি একবার আপনারে বুঝাইয়া বললাম না। এইটা নিয়া আমি নতুন কথা কী বলব? আমি যা বলছি সেইটা এক-শ বার সত্যি বইলাই বলছি। এই বুড়া খান্নাছ মেয়ের সাথে বগিছগি আলাপ কইরা বাড়ির মধ্যে একটা ধাঁধার আসর বসাইয়া নিছে। এই বুড়া এই রকমই। জীবনভর তার চারধারে ধাঁধা তৈয়ার কইরা ফেরে। সময় সময় আমার মন চায় বুড়ার মাথার উপর দেই একটা ঠুসা।'

দুলারি চায়ের কাপ টেবিলে নামিয়ে রেখে ডান হাত মুঠা করে একটা ঠুসা দেওয়ার সাধ বাতাসের গায়ে মিটিয়ে নেয়। সেই সাথে তার মুখ অবিরাম চলতে থাকে।

'ঠুসা মারার সাধ হইলে কী হবে? বুড়া তার শরীলটারে কী যে পয়পবিত্র একটা জিনিস ভাবে—এ আর বললে সারে না। বুড়া তার গায়ের ধারেকাছে আমাকে ভিড়তে দেয় না। আমি ঠিক করছি, একদিন বুড়া যখন ঘুমাইয়া থাকব সেই বেলা তার ঘরে ঢুইকা তার চান্দির উপর একটা ঠুসা মাইরা আসুম। কিন্তু আমি তার ঘরে ঢুকুম ক্যামনে? বুড়া ছাগল তো তার রুম লক কইরা ঘুমায়। এইটা আর একটা মুশকিল।'

দুলারি হঠাত্ কথা বলা বন্ধ করে নিজের পা দুটোর দিকে একমনে চেয়ে থাকে। দুলারি আনমনা হয়ে কী ভাবছে? সরল মনের মেয়ে দুলারি কি এমন কোনো কথা ভাবছে যা সে কোনোদিন কাউকে বলতে পারে না? কিংবা মেয়েটার মনে এমন কোনো প্রশ্ন আছে যার জবাব সে নিজেও জানে না? মিতু বলছে দুলারি তার বাপের রক্ষিতা। অথচ দুলারি সহজ সরল বর্ণনায় বলে যাচ্ছে, সে বুড়ার ধারে কাছে কোনোদিন ভিড়তে পারে না। ভদ্রলোক নিজের ঘরে রাতে তালা বন্ধ করে ঘুমিয়ে থাকে। দুলারির বর্ণনা সম্পূর্ণ সত্যি—এ ব্যাপারে রায়হান শত ভাগ নিশ্চিত। দুলারি বলছে, বুড়া খান্নাছ বাড়ির মধ্যে ধাঁধার আসর বসিয়েছে। বুড়া আতিকুজ্জামান এবং এই দুলারি মেয়েটার সম্পর্কের মধ্যে ভারি একটা গোলমেলে ধাঁধা রয়ে গেছে। রায়হানের মনে হয়, মিতু খুব বড় একটা ভুল ধারণা বয়ে বেড়াচ্ছে। এই ভুল ধারণা মিতুর মনে নিজে থেকে জন্মায় নাই। তার বাপ ইচ্ছা করে মিতুকে কিছু একটা ভুল ধারণা পুষতে দিচ্ছে।

মিতু চলে যাওয়ার পরে রায়হান ভেবেছিল, মিতুর বাবাকে ডেকে একটা সালাম ভেজে দিয়ে সে বাসায় চলে যাবে। এখন তার মন থেকে যাই যাই ভাব উবে গেছে। জামান এবং দুলারি এই অসম বয়সি মানুষ দুটোর মধ্যে লুকিয়ে থাকা সম্পর্ক নিয়ে তার মনে এক ধরনের ব্যাকুল জিজ্ঞাসা। রায়হানের মনে হচ্ছে, দুলারি মেয়েটাকে মন খুলে অবাধে কথা বলতে দিলে প্রকৃত সত্য জানা যাবে। আতিকুজ্জামান এবং দুলারির মধ্যে সত্যিকার সম্পর্কের জট খুলে গেলে বোধ হয় দুলারিকে আশ্রয় দেয়া নিয়ে এমন টানাপেড়েনের একটা কিনারা হবে। তবে সত্যি কথা বলতে কি, আতিকুজ্জামান বুড়াটা আগা-পাছ-তলা হেঁয়ালিতে ভরা একটা মানুষ। নিজের মেয়ের সঙ্গে এত লম্বা সময় ধরে বিটকেলে হেঁয়ালি করার কোনো মানে আছে?

ঝিম মারা ভাব থেকে জেগে উঠে দুলারি হড়বড় করে ফের কথায় মেতে ওঠে। রায়হানের মনে হয়, পুকুরের পাড়ে ডানায় মুখ গুঁজে দাঁড়িয়ে থাকা হাঁস ডানা ঝাপটে পানিতে নেমে গেল। দুলারির বিরামহীন কথার সাঁতার দেখতে রায়হানের বেশ মজা লাগে। তার চোখের সামনে সাদা ডানার প্রাণবন্ত একটি হাঁস পানিতে ছল ছল করে সাঁতরে বেড়াচ্ছে।

'শোনেন ভাইজান, মোটা মোটা বইয়ের পোক বুড়া বইয়ের গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে একদিন ফুট্টুস করে মরে যাবে।'

সোফার গদির ওপর হাতের থাবা মেরে বলে,

'এই সোফাখানের ওপরেও সে মরতে পারে আবার ভিতরের বারান্দার ইজি চেয়ারেও সে ঢইলা পড়তে পারে।'

মানুষটার মরে ঢলে পড়ার ছবি ফুটিয়ে তোলার তাগিদে দুলারি নিচু টেবিলের ওপর চোখ উল্টে কাত হয়ে গড়িয়ে পড়ে। একটু সময় ওভাবে শুয়ে থেকে ফের সোজা হয়ে বসে সে খ্যাক খ্যাক শব্দ তুলে দুলে দুলে হাসতে থাকে। দুলারির হাসির সাথে তাল মিলিয়ে রায়হান হাসে কিন্তু তার মাথার ভেতর তখন আর একটি চিন্তার ঝড়। তার মনে প্রশ্ন জাগে, আতিকুজ্জামান মানুষটা মা-মরা কিশোরী মেয়েটাকে পতিতালয় থেকে তুলে এনে নিজের কাছে জায়গা দিল। অসহায় মেয়েটাকে আশ্রয় দেওয়ার অপরাধে এত বছর ধরে নিজের মেয়ে, আত্মীয়-স্বজনের নিন্দা কটুকাটব্যের ঝড় বুক পেতে সয়ে গেল। অথচ মেয়েটার মনে সে নিজের জন্য একটু মায়ার জায়গা তৈরি করতে পারেনি? মেয়েটার মন থেকে এতটুকু ভালোবাসা আতিকুজ্জামান কাড়তে পারেনি? মেয়েটি তার আশ্রয়দাতার মৃত্যুর কথা কি নির্বিকার মুখে বর্ণনা করে যাচ্ছে। রায়হান দুলারির দিকে তীক্ষ চোখে চেয়ে খড়খড়ে শুকনা গলায় জিজ্ঞেস করে,

'দুলারি, এই বুড়া মানুষটাকে তুমি ভালোবাস না? তুমি চাও না সে আরও অনেক দিন বেঁচে থাকুক?'

'ওমা! ভালোবাসব না ক্যান? আমি তারে খু-ব ভালোবাসি। তার বাঁইচা থাকার জন্য অনেক দোয়াও করি। কিন্তু তাতে লাভ কী? ছোটকালে আমি আমার মাকে খুব ভালোবাসতাম। তার যখন অসুখ হইল আমি তার বাঁইচা থাকার জন্য কত দোয়া করলাম। লাভ কী হইল? সেই তো মা মরে গেল। এইসব দেইখা শুইনা আমি এখন মানুষকে মরতে দেখলে একটুও ডরাই না। মানুষ যেই বেলা মরে সেই বেলা এমনিই মইরা যায়। কেউ তারে ফিরাইতে পারে না। যেই বেলা মানুষের মরণ ঘনাইয়া আসে সেই বেলা কারও দোয়ায় কিচ্ছু কাম হয় না। শোনেন, দোয়ায় কোনোদিন মরণ ফেরে না। আবার কারও মরার বদদোয়া দিতে দিতে মুখ পচাইয়া কোনো লাভ নাই। বদদোয়ার জোরে মানুষ মরে না। আচ্ছা বাদ দেন ওই সব বাঁচা মরার কেচ্ছা। মরা বাঁচার কেচ্ছা গাওয়া এক্কেবারে বেফায়দা। মানুষের বাঁচা মরার ওপর মানুষের হাত নাই। এইটাই ফাইনাল।'

রায়হান তার আটকে রাখা দম ধীরে ছেড়ে দিয়ে আবার আরাম করে বসে। তার মনে হয়, দুলারি তার আদরের বুড়াকে যথেষ্ট ভালোবাসে। দুলারির মন ঘটা করে তার ভালোবাসা মেলে ধরতে জানে না। দুলারির ভালোবাসা প্রকৃতির নিজস্ব নিয়মের মতো। ওর ভালোবাসা স্বাধীন, বহতা। ওটি অবাধে আপন ছন্দে বয়ে চলে। এই ভালোবাসা মৃত্যুর চরে আটকে গিয়ে গতি হারাতে জানে না। দুলারির ভালোবাসার স্বচ্ছন্দ চেহারা রায়হানকে মুগ্ধ করে। রায়হানের মনের মধ্যে বাড়তি শান্ত ভাব জেগে ওঠায় দুলারির সঙ্গে সে ফের গল্পে মজে যায়। দুই চোখে হাসির ঝলক তুলে রায়হান বলে,

'তারপর দুলারি, চুপ করলে কেন? বলো কী বলছিলে। তোমার কথা শুনতে ভালো লাগছে।'

'আপনের লগে গল্প করুম কী! মরনের কথা শুইনা আপনে দেখি টাস্কি মাইরা গেলেন। শোনেন ভাইজান, আমার মায় মরণ দেইখা খুব ডর খাইত। সে ভাবত, আজরাইল বুঝি খুব ঘটা কইরা তার জান কবচ করতে আসবে। আজরাইল যখন তার সামনে আইসা খাড়া হবে, সেই বেলা সে ডাক চিত্কার দিয়া কাইন্দা কাইন্দা আজরাইলের পায়ে ধইরা ক্ষ্যামা চাইবে। আজরাইল তার ডাক চিত্কার না শুইনা তার জানডারে কচলাইয়া চিইপা টাইনা বাইরে বাইর কইরা আনবে। অথচ মরণ যখন ঘনাইয়া আইল সেই বেলা আমার মায় ডর-ভয় টের পাওনের আগে ঘুমের কোলে ঢইলা পড়ল। তার যে মরণ হইল সেইটাই তো আমার মা জানতে পারল না। তাহলে আপনেই কন, মরণ দেইখা ভয় পাওনের কোনো মানে আছে? আচ্ছা ভাইজান, আপনে যে মরণ দেখে এত ভয় পান...।'

'আরে ধুর। কী যে বলো। আমি কি বাঁচা-মরা নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছি নাকি? অনেকক্ষণ কথা বলে হাঁফ ধরে গিয়েছিল। তাই একটু দম নিলাম।'

'আচ্ছা, ঠিক আছে। দম জিরান নিয়া ভালো করছেন। এইবার আসেন চট জলদি আমরা আমাগো নিজেরার ভালো-মন্দ লইয়া আলাপ সাইরা ফালাই। আমরা কিন্তু নিরালে আলাপ করনের জন্য বেশি সময় হাতে পাব না। বুড়া ফট কইরা দরজা খুইলা আইসা সোফার উপর মজুদ হইয়া আমাগো কথায় পানি ঢাইলা দিব। আমাগো দোনোজনরে থামাইয়া দিয়া বুড়া তার মানে ছাড়া বেহুদা আলাপ জুড়াইয়া বইব। আপনার চাচা মানে বুড়া ছাগলরে আপনারা তেমন ভালো চেনেন না। আমি তারে চিনি হাড়ে হাড্ডিতে। সব্ব বিষয়ে সে আস্ত একটা ত্যান্দর। তার সামনে কিচ্ছু গল্প করা যায় না। হ্যায় নিজেই খালি গল্প করনের ধান্ধায় ফেরে। এই বুড়ার জ্বালায় অস্থির হইয়া দেখেন না আমি নিচে গিয়া দারোয়ান ড্রাইভারগো লগে মন খুইলা আলাপ সালাপ কইরা আসি। এই বুড়ার পায়ের কাছে বইয়া বারো মাস তার ওয়াজ শুনলে আমি এতদিনে পাগল হইয়া যাইতাম।'

'ভাগ্যিস তুমি উনার কথা বেশি শোন না। সেজন্যই তোমার মাথা খুব পরিষ্কার। তোমার ভাষাও ভারি সুন্দর। তোমার ভাষা খানিক গ্রামের আবার খানিক শহরের। তুমি কি কখনো গ্রামে ছিলে দুলারি?'

'আমি গ্রাম পামু কোনখানে। আপনে দেখি আজব প্রশ্ন জিজ্ঞাস করেন। খানকি পাড়ায় যার জন্ম সে কোনোদিন গ্রাম দেখতে পায়? আমার মায় কইত, তার বাপের বাড়ি কিশোরগঞ্জ। কান্দুপট্টিতে মজুদ হওনের আগে আমার মা কিশোরগঞ্জে তার বাপ-মার সাথে ছিল। আমার মা গায় গতরে ডাঙ্গর হয়ে উঠতে তার বাপ নিজে সাথে কইরা নিয়া আইসা কান্দুপট্টিতে মুন্সি দালালের কাছে বেইচা দিয়া গেছিল। এই গল্প মায়ের মুখে মেলাবার শুনছি। তয় শোনেন, খানকি পাড়ার কোন গল্প সত্যি আর কোন গল্প মাগিরা নিজেরা পয়দা কইরা নেয়—এইটা কোনোদিন আপনে জানতে পারবেন না। আমার মাও একটা খানকি ছিল। তার কথা ষোল আনা বিশ্বাস করনের কিছু নাই। সে নিজে কোনো ব্যাটার হাত ধইরা কান্দুপট্টিতে আইসা উঠতে পারে আবার তার বাপেও তারে বেইচা দিতে পারে। কান্দুপট্টির গল্প কেচ্ছা বাদ দেন। এইখানে বইয়া আমি কি আপনারে খানকি পাড়ার গল্প কমু না কি? সেইটা শুনতেও অতি খারাপ শোনায়। আপনাগো সমাজ জামাতের অতি সুন্দর গল্প আপনে কন আমি কান ফালাইয়া শুনি।'

রায়হানকে গল্প বলার জন্য অনুরোধ করে দুলারি পা ছড়িয়ে আরাম করে বসে নিজেই গল্প বলতে শুরু করে দেয়। কারও গল্প শোনার জন্য অপেক্ষা করার ধৈর্য দুলারির নেই।

'শোনেন ভাইজান, কান্দুপট্টি থেকে বুড়া পাগলে আমারে যখন নিয়া আইসা এই বাড়িতে উঠাইল সেইবেলা আমি ঠাইট আতারে পড়লাম। আপনাগো দুনিয়ার আওবাও কিছুই বুঝতাম না। এই জানালা ওই জানালা দিয়া বাইরের দিকে চাইয়া ভাবতাম, এইটা কোন পদের খানকি পাড়া? দিনভর চারদিক গাড়ি-ঘোড়া লোকজনের আনাগোনা। রাত নামলে কেমন সব সুনসান। আমাগো খানকি পাড়ায় দিনভর মাগিরা ঘুমায়। রাতভর সেইখানে গানবাজনা, ডাকহাঁক মানুষজন—এইটাই চিরকাল দেইখা আইছি। আমি জন্ম থেকে চারপাশে যা দেখছি দুনিয়াটারে তো তা-ই ভাবুম, ঠিক কি না ভাইজান, আপনেই কন। কান্দুপট্টির বাইরে একটা দুনিয়া আছে এই খবর আমার জানা ছিল না। কান্দুপট্টির বাইরে জীবনে আমি একদিনের জন্য পাও রাখি নাই। কান্দুপট্টির সীমানার বাইরে দুনিয়ার সীমানা ফুরাইয়া গেছে নাকি আরেক দুনিয়া শুরু হইছে—এইটা আমি জানুম ক্যামনে! আমরা মা মইরা যাওনের পরে বুড়া আমারে কান্দুপট্টিতে মায়া মাসির কাছে দিন সাতেক রাখছিল। তয় বুড়ির লায় লক্ষণ সুবিধার ছিল না। সে তলে তলে আমারে দিয়া ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু করার ধান্ধায় ছিল। মাসির ভাবসাব দেইখা বুড়া পাগল কইল, 'চলরে দুলারি, বাসায় চল।' আমি তার হাত ধইরা চইলা আইলাম। তারপর থেইকা এই তো আছি। আমি এই বাসায় চইলা আসার সাত দিনের মধ্যে কান্দুপট্টি ভাইঙ্গা নাশ। সেই খবর টেলিভিশনে দেখলাম। টেলিভিশনে খবর দেইখা চিন্তা করলাম, কান্দুপট্টি শেষ মানে আমার ঠিকানা শেষ। আমার আর এই জীবনে নিজের ঠিকানায় ফিইরা যাওয়া হইল না।'

'তোমার কি এখনও সেখানে ফিরতে ইচ্ছা করে দুলারি? তোমার কি মনে হয় না...'

দুলারি রায়হানের কথা শুনতে পাচ্ছে না। সে তার নিজের কথায় মজে আছে। আপন মনে কথা বলতে গিয়ে সে একটা ঘোরের মধ্যে ডুবে গেছে। লম্বা দম টেনে সে বলে,

'এই বাড়িতে আসার কিছুদিন পরে এই বাড়ির ঠিকা বুয়া ফজরের মার লগে কথা কইয়া আমার মনে ধন্ধ দেখা দিল। এই প্রথম আমার মনে হইল খানকি পাড়ার বাইরে আর একটা দুনিয়া আছে যেইখানের নিয়ম-কানুন এক্কেবারে আলাদা। আমি বুড়া পাগলকে কইলাম, আপনাগো সমাজের বিষয় আশয় আমারে ভাইঙ্গা বলেন। আমি তো কিছুই বুঝতাছি না। আপনে কি আমারে আপনার সাথে রাখবেন নাকি আমারে কারও কাছে বেইচা দিবেন, সেইটাও কিছু বুঝতাছি না। আপনে যদি আমারে আপনার কাছে রাখেন তাইলে এই দুনিয়ার নিয়ম রীতি শিখে পড়েই এইখানে আমারে থাকতে হবে।'

রায়হান সামনে ঝুঁকে প্রবল আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করে,

'সে কী জবাব দিল? সে কি তোমাকে তার কাছে রাখবে বলল? না কি পরে অন্য কোনো ব্যবস্থা করবে বলল?'

'হায়রে ভাইজান, আপনে আর মানুষ পাইলেন না?। সে একটা বদ্ধ পাগল এইটা আপনে বোঝেন না। সে আমার কথার সিধা জবাব কী দিবে? সে নিজে কিছু জানলে না আমাকে কইবে।'

রায়হান হতাশ গলায় বলে,

'ও! তাহলে তোমার ব্যাপারটা দেখি একেবারে ঝুলে আছে।'

'ঝুলে আছে মানে, এক্কেবারে বাতাসের গায় লটকাইয়া আছে। বুড়ারে কইলাম, আপনাগো সমাজে যখন থাকতে হইব, আপনে আমারে আপনাগো সমাজের মতো কইরা শিখাইয়া পড়াইয়া নেন। হায়রে আমার কপাল! সে আমারে কী শিখাইব? সে কি নিজে কিছু জানে? চিন্তা করলাম, পাগলের উপর ভরসা কইরা কোনো লাভ নাই। বুড়ার ভরসায় বইসা না থাইকা আপনাগো দুনিয়ার নিয়ম-কানুন শিখনের জন্য আমি গাও ঝাড়া দিয়া খাড়াইলাম। ভাবলাম, আমার বিষয় আমাকেই বুঝতে হবে। বুড়ার পায়ের তলে বইসা থাইকা কোনো লাভ নাই।'

রায়হান ঘড়ির দিকে তাকায়। রাত অনেক হয়ে গেছে। আর দেরি না করে সে কথা শেষ করতে চায়। বলে,

'দুলারি, চাচাকে বোলো আমি কাল আবার আসব। কাল তোমার সাথে আরও অনেক গল্প করব। আজ রাত হয়ে গেছে। আজ উঠি।'

তিন

পরদিন রায়হান তার কথা রাখে। নিজের মনের কাছে জবাবদিহি করার জন্য 'কথা রাখা' শব্দটা সে বেছে নিয়েছে। কিন্তু রায়হান জানে, এখানে সাদামাটা কথা দেওয়া কিংবা কথা রাখা বিষয় না। বড় কথা সে দুলারির মুখে অচেনা দুনিয়ার গল্প শোনার নেশায় পড়েছে। দুলারির নিজের জীবনের স্মৃতি, তার মায়ের কথা তার জন্মস্থান কান্দুপট্টির দিন যাপনের নিখাদ বর্ণনার মধ্যে রায়হান অচেনা দুনিয়ার ঝলক দেখতে পাচ্ছে। রায়হান তার চেনা দুনিয়ায় ছকে বাঁধা মানুষ দেখে অভ্যস্ত। এই প্রথম সে একটি মানুষ দেখছে, যে তার মেয়েমানুষ অস্তিত্বের তোয়াক্কা না করেই বেঁচে আছে এবং তার মতো করে বেড়ে উঠছে। তার চারপাশে কে কী বলছে কিংবা ভাবছে, তার খবর সে জানে না কিংবা বিশেষভাবে সেটা জানার কোনো আগ্রহ আছে বলে মনে হয় না। সে নিজের মনে নিজের কথা বলে যায়। সমাজের মুখ চেয়ে সত্য-মিথ্যা সাজিয়ে নিতে চায় না। ওর প্রতিটি কথা রায়হানের কাছে নির্জলা সত্য। রায়হানের মনে হয়, নির্জলা সত্যের নিজস্ব একটা শক্তি আছে।

রায়হান বেল বাজাতে দুলারি দরজা খুলে চোখে মুখে হাসির ছটা বিছিয়ে বলে,

'আমি সিওর আছিলাম আপনে আজকে অতি অবশ্যই এই বাসায় আইবেন।'

কথাটা শেষ করে কপালে গেরো তুলে বলে,

'আপারে সাথে নিয়া আসেন নাই তো? সে আইলে কিন্তু খবর আছে।'

'কেন দুলারি, তোমার আপা আসলে তোমার কি কোনো অসুবিধা আছে?'

'অসুবিধা মানে? বিরাট বড় অসুবিধা। সে আইলে কি আমারে এইখানে আপনার পাশে বইতে দিবে। আপনারে কইছি না, আমারে দেখলে আপার শরীরের সব রক্ত চিলিক দিয়া মাথায় উঠে যায়। এইটা তার একটা কঠিন অসুখ। এক পাতা প্যারাসিটামল এক ঢোকে খাইলেও তার এই অসুখ কমবে না। হি হি হি...'

ভেতরের ঘর থেকে আতিকুজ্জামান হাঁক দিয়ে জিজ্ঞেস করে, 'কে দুলারি? কার সাথে কথা বলছিস?'

দুলারি চোখ মটকে হাসে। তারপর গলা তুলে বলে,

'কেউ না। দারোয়ান হারামজাদারে ঝাড়ু মাইরা বিদায় করতাছি। ওই যা, যা এইখান থেইকা। নইলে দিমু একটা ঝাড়ুর বাড়ি।'

গলা নামিয়ে বলে,

'বুড়ারে বুঝ দিলাম কিন্তু সে বিশ্বাস করবে না। এই এক্ষুনি আইসা এইখানে মজুদ হইব। কইলাম দেইখেন আপনে।'

আতিকুজ্জামান ধীর পায়ে ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে রায়হানকে দরজায় অপ্রস্তুত মুখে দাঁড়ানো দেখে। রায়হানের দিকে চেয়ে গলা তুলে একচোট হেসে বলে,

'এই এখন যে রূপে ওকে দেখলে ওটি আদি অকৃত্রিম দুলারি। ওর কায়কারবার দেখে তুমি বিব্রত হয়ো না। যদি বিব্রত হও তাহলে এ বাসায় আর আসতে পারবে না। দুলারি এমন কীর্তি করতেই থাকবে এটা মেনে নিয়েই তোমাকে আমার বাসায় আসতে হবে।'

এ পর্যন্ত বলে জামান আর এক চোট হাসে। তারপর চশমার কাচ মুছে রায়হানের মুখের দিকে চেয়ে বলে,

'এ বাসায় না আসলে দুলারির দেখাও পাবে না আর তার মুখ থেকে এমন আদিম গল্প তুমি শুনতেও পাবে না। আমার অনুমান সত্য হলে তুমি দুলারির গল্পের টানে আজ এখানে এসেছ। অবশ্য আমার কন্যারত্নের প্ররোচনায়ও আসতে পার, তবে তার সম্ভাবনা প্রায় শূন্য। তুমিই বলো, দুলারির গল্পের টানে এসেছ নাকি আজও মিতু তোমাকে পাঠিয়েছে?'

রায়হানের মন থেকে হঠাত্ সব সংকোচ উবে যায়। আতিকুজ্জামানকে তার সমবয়সি বন্ধুর মতো মনে হতে থাকে। কথা ঘুরানোর কোনো তাগিদ রায়হানের মাথায় আসে না। সে সরল গলায় বলে,

'আমি দুলারির গল্পের টানে এসেছি।'

'ব্যস! আমি জানি এটা হতেই হবে। গল্প হচ্ছে সাহিত্যের আসল কথা। শোন,...

দুলারি শব্দ তুলে হাসে। চোখ নাচিয়ে বলে,

'কী, কইছিলাম না এইখানে আইসা আমাগো গল্পের মধ্যে বাগড়া দিয়া বইব।'

দুলারির কথা শুনে জামান হাসতে হাসতে ভেতরের ঘরে চলে যায়।

'এইবার ঠিক আছে। আরাম কইরা বসেন। মন খুইলা আলাপ সালাপ করি।'

রায়হানের মনে হয় দুলারি তার মনের কথা কাউকে খুলে বলতে চায়। কান্দুপট্টির চেনা দুনিয়া ছেড়ে চলে আসার পরে চারপাশের সবাই তার অচেনা। চেনা এবং অচেনা দুই দুনিয়ার বিপরীত অভিজ্ঞতা মেয়েটার মনে নিশ্চয়ই অনেক তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। সব কথা মন খুলে বলার তাগিদে সে রায়হানকে একা পেতে চাচ্ছে।

রায়হানের জন্য চা-নাস্তা হাতে রান্নাঘর থেকে ফিরে এসে দুলারি আরাম করে মেঝেতে বসে সরাসরি গল্প শুরু করে। দুলারির গল্প শুরু করা দেখে মনে হচ্ছিল সে দিনভর গল্প বলার মহড়া দিয়ে রেখেছে।

'আমি কোনো দিকে কূল-কিনারা না পাইয়া রোজ বিকালে নিচে গ্যারেজে গিয়া নানান জনের লগে মন খুইলা আলাপ করা শুরু করলাম। ব্যস কেল্লা ফতে। নিচ তলায় নাইমা গিয়াই তো আমি আপনাগো দুনিয়ার আওবাও বেবাক কিছু বুইঝা ফালাইলাম।'

'তুমি কি এখন আমাদের সমাজের আওবাও সব বুঝতে পার, দুলারি?'

'পারি না মানে? আমি এখন সব বুঝি। আপনাগো সমাজের পুরুষ মানুষ কন আর মাইয়া মানুষ কন সবার মনের শুলুক-সন্ধি সব আমার কাছে পরিষ্কার। এই যে আমাগো আপা। আপনে পয়লা তার কথাডা বিচার করেন। আপনে মনে করেন সে একটা চালাক মানুষ? উঁহু! আপনে আপারে চালাক মানুষ বইলা ধইরা নিছেন কি ঠাইট মারা পড়ছেন। আমাগো এই আপা মানুষটা ঠিক তার বাপের মতো অতি অবশ্যই বোকা ছাঁদের এইটা আমি খুব ভালো বুঝি।'

'তুমি বলো কী দুলারি। আমি তো তোমার আপাকে ভাবতাম চালাক মানুষ আর আপার বাপকে ভাবতাম মহাচালাক মানুষ। তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে তারা দুটাই ঠাইট বোকা।'

রায়হানের কথায় দুলারি হাসে। মুখে কাপড় দিয়ে দুলে দুলে হাসতে থাকে। বলে,

'এই দুইটাই সমান তালের বোকা। এই দুইটারে যদি আপনে চালাক মানুষ ভাইবা থাকেন, তাইলে আপনার মাথায় দোষ আছে ভাইজান। আপা তার স্বামীরে আড়াল কইরা আপনার লগে একটু ঢলাঢলি করে, এইটা দেইখা আপনে ভাবছেন সে খুব চালাক? শোনেন, এইটার মধ্যে কি কোনো চালাকি আছে? একটা জোয়ান মাইয়ামানুষ একটা জোয়ান ব্যাটা মানুষের সাথে প্যাখনা মাইরা দুইটা কথা কইব না। মাইয়ামানুষ হইছে বইলা কি তারে জীবনভর একটা ব্যাটার লগে লটকাইয়া থাকতে হইব? একটা ব্যাটারে হাতে রাইখা অন্য ব্যাটাগো লগে কায়কারবার আমাগো কান্দুপট্টির খানকি পাড়ায় হামেশাই ঘটত। এইটা লইয়া বহুত কাইজা-ফ্যাসাদ আমি নিজ চোক্ষে দেখছি। কান্দুপট্টির কাছে পাঁচ ভাই ঘাট লেনের হাশেম বেপারিরে চেনেন না? সে তো অতিশয় ধনী লোক। তারে তো আপনার চেনার কথা। বাংলাদেশের বেবাক মানুষ হাশেম বেপারিরে চেনে।'

পাঁচ ভাই ঘাট লেনের নামী মানুষ হাশেম বেপারিকে বাংলাদেশের সব মানুষ চেনে। দুলারির এমন বিশ্বাস রায়হান ভাঙতে চায় না। তার মনে হয়, সে যদি এখন হাশেম বেপারিকে না চেনে তাহলে দুলারি মনের মধ্যে ধাক্কা খাবে। ধাক্কার তোড়ে বেচারার গল্পের সূতা ছিঁড়ে যাবে। গল্পের মজা ঠিক রাখার জন্য রায়হান এপাশে ওপাশে মাথা দুলিয়ে বলে,

'কী আশ্চর্য! পাঁচ ভাই ঘাট লেনের হাশেম বেপারির ঘটনাটা তুমি খুলে বলো। উনি কি কান্দুপট্টিতে কাউকে বিয়ে করে সংসার পেতে বসেছিল নাকি? সেই বউকে নিয়ে কি কোনো হ্যাঙ্গাম হয়েছিল?'

'আরে এইটা আবার কী ঢংয়ের আলাপ করেন? হাশেম বেপারির কি বউয়ের অভাব ছিল নাকি? খাজে দেওয়ানের বউটারে তালাক দেওনের পরেও তার ঘরে আরও চার-পাঁচটা বউ মজুদ ছিল। তয় দুধের স্বাদ কি আর ঘোলে মেটে। বান্ধা মাইয়ামানুষের সুখ কি আর বউ দিয়া সারা যায়, আপনেই কন ভাই। খানকি পাড়ায় বান্ধা মাইয়া মানুষ রাখনের মধ্যে অন্যরকম একটা মর্ম-মর্যাদা আছে না। পুরুষ মানুষের লাইগা এইটা মনে করেন একটা ইজ্জতের সওয়াল। খানকি পাড়ায় একটা বান্ধা মাইয়ামানুষ রাখনের খরচ দিয়া আপনাগো সমাজে পাঁচটা বউ পালন যায়। একটা ব্যাটা মানুষ যখন খানকি পাড়ায় বান্ধা মাইয়া মানুষ রাখে, তখন আশপাশের দশজনে তার দিকে চোখ তুইলা চাইয়া দেখে। কারণ, সে যে কত টাকার মানুষ এই কথা সবাই জাইনা যায়। আচ্ছা বাদ দেন সেসব কথা। শোনেন, আপনাগো সমাজে যেমন বিয়া, আমাগো কান্দুপট্টিতে সেইটা হইতাছে বান্ধা চুক্তিতে মাইয়ামানুষ রাখা। হাশেম বেপারি গোলাপি সুন্দরীরে বান্ধা চুক্তিতে মিটাইয়া নিয়া ঠাকুরবাড়িতে একলা একটা ঘর ভাড়া কইরা দিল। ঠাকুরবাড়ির ঘর ভাড়া মানে বোঝেন কিছু? মাসের পয়লা মন্তা হাজির হাতে ঘর ভাড়া বাবদ বেপারিরে পাক্কা ষাট হাজার টাকার বান্ডিল তুইলা দেওন লাগত। এইটা তো গেল ঘর ভাড়ার ষাট হাজার। গোলাপি সুন্দরীরে বান্ধা রাখার জন্য তার আরও লাখ টাকা বাড়তি খরচ আছে না।'

খরচের বর্ণনা শুনে রায়হান কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ ফুটিয়ে বলে,

'অবশ্যই আছে। গোলাপির মতো সুন্দরীর খরচ কি আর অল্প হতে পারে। অবশ্যই অনেক খরচের মামলা। দুলারি, ঠাকুরবাড়ির ব্যাপারটা আমাকে ভেঙে বলো তো। কান্দুপট্টির ভেতর কোনো মন্দির ছিল নাকি?'

'ভাইজান, আপনে তো বড় ভোলা মনের মানুষ। মোটে কয় বছর হইল কান্দুপট্টি ভাইঙ্গা দিছে। আপনে তার মধ্যে কান্দুপট্টির বেবাক নিশানা ভুইলা খাইয়া বইসা আছেন? আপনে ঠাকুরবাড়ি চেনেন না? আরে ইংলিশ রোডের পানির পাম্পের পাশের গেট দিয়া ভিতরে ঢুইকা শান বাঁধানি পাকুড় গাছের গোড়ায় খাড়াইলে হাতের ডাইনে চাইয়া পুরান যে লাল ইটের দালান বাড়ি দেখছেন সেইটাই তো ঠাকুর বাড়ি। কান্দুপট্টির শাইঠাল সুন্দরী যুবতী বেশ্যারা ঠাকুরবাড়িতে মাসে পঞ্চাশ-ষাট হাজার টাকা ভাড়া দিয়া একলা এক রুম নিয়া থাকত। ঠাকুরবাড়িতে একলা একটা ঘর নিয়া থাকা কোনো যাই তাই ব্যাপার না। সেইখানে যেই রকম শান শওকতের কারবার তা দেখলে আপনার মাথায় ফিট উইঠা যাইব।

দুলারি হঠাত্ কথা থামিয়ে একটু সময় চিন্তা করে। তারপর হেসে বলে,

'বুজছি ভাইজান, আপনে মনে লয় তেমন দামের কাস্টমার ছিলেন না। আসলে ঠাকুরবাড়ির মাইয়ামানুষের কাস্টমার হইতে হইলে পকেটে অনেক টাকা থাকন লাগে। আচ্ছা বাদ দেন। দুনিয়ায় সবাই তো আর জামান সাব কি হাশেম বেপারির মতো ধনী মানুষ না। হাশেম বোপারি গল্পডা আগে শোনেন।'

দুলারি পা দুটো সামনে ছড়িয়ে দিয়ে আরাম করে বসে। তারপর লম্বা হাই তুলে আড়মোড়া ভেঙে বলে,

'হাশেম বেপারি রোজ পাড়ায় আইত না। আসলে আসত রাত দশটার পরে। গোলাপি সুন্দরীর ঘরে বেপারি কোনো মতে রাত কাটাইয়া মসজিদে ফজরের আজান পড়নের লগে লগে টুপি মাথায় দিয়া বাইর হইয়া যাইত। তারপর গোলাপির ঘর দিনভর ফাঁকা। বেপারির বান্ধা মাইয়ামানুষ হইছে তো কী হইছে। একলা একা একটা মানুষ খালি ঘরে এত্ত বড় লম্বা দিন কেমনে পার করে, আপনেই কন।'

'না তা তো ঠিকই। সে বেচারার নিশ্চয়ই অনেক কষ্ট হতো। তাছাড়া গোলাপি জোয়ান সুন্দরী নারী। সে বেপারির পথ চেয়ে হাত-পা কোলে নিয়ে বসে থাকবে না কি?'

'এই তো আপনে সঠিক কথাটা বুঝতে পারছেন। গোলাপিও এই লাইনে চিন্তা কইরা দিনের বেলা কাস্টমার ধইরা সাইড কারবার শুরু কইরা দিল। গোলাপির মতো জোয়ান মাইয়ামানুষের ঘরে তখন কাস্টমারের লাইন। শোনেন, একদিন হইছে কী...'

'হ্যাঁ বুঝতে পারছি দুলারি, সে বড় খতরনাক ঘটনা।'

'ও আচ্ছা আপনেও জানেন দেখি। ওই সময় খানকি পাড়ার যত কাস্টমার ছিল তারা বেবাকেই এই ঘটনার সাক্ষী।

ঘটনার কথা মনে পড়ে দুলারি মুখে আঁচল চাপা দিয়ে এক চোট হেসে নেয়। রায়হান জীবনে কোনোদিন কান্দুপট্টি বেশ্যাপাড়ার দরজায় পা রাখেনি—এ কথা দুলারিকে তার বলতে ইচ্ছা করে না। রায়হানের মনে হয়, দুলারিকে এমন কথা বললে রায়হান মানুষটা ওর চোখে অচেনা হয়ে যাবে। তার সাথে মন খুলে গল্প করতে পারবে না। রায়হান কৌশলে কথা ঘুরিয়ে বলে,

'সে-সব অনেক পুরান কথা দুলারি। এখন ওগুলো বলে আর লাভ কী? কান্দুপট্টি জায়গাটা তছনছ হয়ে উল্টে গেছে। সেখানকার মানুষগুলো কে কোথায় ছত্রখান হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে। ওদের কথা বাদ দিয়ে তুমি তোমার আপার কথা বলো।'

'ও হ্যাঁ। আপা যে আপনার লগে দেখা-সাক্ষাত্ করে এই কাম তার আরও বুদ্ধি খরচ কইরা করা উচিত না?'

'কেন বুদ্ধি খরচ করেই তো সে এখানে আসে। এইটা তার বাপের বাড়ি। সে তো আর আমাকে তার স্বামীর বাড়িতে নিয়ে তুলতে পারে না, কী বলো? আমাকে সে যদি তার স্বামীর বাড়িতে নিয়ে গিয়ে সিনেমা করার চেষ্টা করে তাহলে তার স্বামী আমাকে কলার ধরে টেনে ঘর থেকে বের করে দেবে না। আপার স্বামী আমাকে চড়-ঘুষিও মারতে পারে। তাই না?'

'কথাটা ঠিক বলেন নাই ভাইজান। আপার স্বামী ফারুক ভাইজান মানুষটা অতিশয় ভালো। আপারে না জানাইয়া সে এই বাসায় আসে। আমার লগে সে সব সময় হাইসা কথা বলে।'

'সব্বনাশ। বল কী দুলারি। এ তো ভয়ংকর কথা!

'আরে না। ফারুক ভাইজান মানুষ ভালো। কিন্তু সে ভালো হইলে কী হইব। আমাগো বুড়া খান্নাছ তো মানুষ ভালো না। ফারুক ভাইজানরে ডাইকা নিয়া বুড়া তার লগে গুজগুজ করে। ফারুক ভাইজানের মতো ভালো মানুষের মনের মধ্যে বুড়া তার চৌদ্দ রঙ্গের ধাঁধা ঢুকাইয়া দেয়ার ধান্ধায় আছে। ফারুক ভাইজানের মতো ভালো মানুষের মাথায় ধাঁধার পোকা ঢুকে গেলে উনি একটা ব্যারাছ্যাড়া অবস্থায় পইড়া যাবে না। আচ্ছা বাদ দেন ফারুক ভাইজানের কথা। বুড়া বেশি বাইড়া শাবাশ পাইব না। আমি আছি না? ফারুক ভাইজানরে একদিন আবডালে ডাক দিয়া কানে কিছু কানমন্তর দিয়া দিমু, তাইলেই সব ঠিক হইয়া যাইব।'

'ফারুক ভাইকে তুমি কি কঠিন কানমন্তর দেবে সেটা আমাকে বলা যাবে না?'

'দুর ওইটা কি এখনই চিন্তা করছি নাকি? পরের কথা পরে ভাইবা ঠিক কইরা নিমু। এখন হাসির কথা শোনেন, এই বাড়িতে আসার পরে চারপাশের বাসা বাড়ির সব মাইয়া মানুষরে ভাবতাম খানকি, বেশ্যা। ব্যাটা মানুষগুলারে ভাবতাম তাগো কাস্টমার। কোনো মাইয়া মানুষ মুখ বানাইয়া সাইজা গুইজা...।'

দুলারিকে কথার মাঝখানে থামিয়ে দিয়ে রায়হান বলে,

'দুলারি, তুমি আমাকে মুখ বানানির ব্যাপারটা ভেঙে বলো। তুমি বারবার মুখ বানানি শব্দ বলছ বলে কথাটার মানে জানার আমার খুব ইচ্ছা হচ্ছে।'

রায়হানের কথা শুনে দুলারি মজা পাওয়ার আহ্লাদে মুখজুড়ে হাসি ছড়িয়ে দিয়ে বলে,

'মুখ বানানি কথার মর্ম বোঝেন না, আপনে কেমন ব্যাটা মানুষরে ভাই? মুখ বানানি হইতাছে আমাগো খানকি পাড়ার পয়লা ছবক। পড়া-লেখা শিখতে বইলে যেমন অ, আ শেখা লাগে তেমনি খানকির খাতায় নাম লেখানোর পরে মাইয়াগো মুখ বানানি শিখন লাগে। এইটা এমন কিছু ব্যাপার না। মুখে চোখে চড়া কইরা রঙের পোচ মাইরা কানে গলায় পুরু পাউডার মাইখা খানকিরা কাস্টমারের তালাশে গিয়া ইংলিশ রোডের গেটে খাড়ায়। আবার পিছনের গেট দিয়া বাইর হইয়া গিয়া বংশালের চিপচাপা থাইকাও কাস্টমার ধইরা আনে। মুখের রঙ-বাহারি সাজগোজরে আমরা নিজেগো ভাষায় মুখ বানানি কই। আপনাগো সমাজে মেয়েছেলেরা মাঝে মাঝে বেশ ঝলক তুইলা মুখ বানায়। আমি পয়লা ভাবতাম, তারাও বুঝি আমাগো মেয়েদের মতো কায়দা কসুর কইরা কাস্টমার ধরে। আমি খালি চিন্তা করতাম, কাস্টমার ধরনের জন্য এই পাড়ার খানকিগুলা খাড়ায় কই আর কাস্টমার পাইলে তাগো লইয়া যায় কই? অনেক দিন যাবত্ এইটা আমার মনে এক বিশাল ধন্ধ ছিল। নিচতলায় একটা বেল্লিক বুড়া ড্রাইভার মতিইন্যা আছে না। তারে কথাটা জিজ্ঞেস করতে ব্যাটা হাইসা কুটিপাটি। বাদে ওই বুড়া কুত্তা আমারে ব্যাপারটা বিশদে ভাইঙ্গা বলতে আমি নিজে হাইসা কুটিপাটি।'

'কেন, কেন? তুমি হেসে কুটিপাটি হলে কেন? ওই যে মতিইন্যা বুড়া কুত্তার কথা বললে, ও কি তোমাকে ভুলভাল কিছু বুঝিয়ে দিয়েছিল?'

'আরে না। বুড়া খাটাশ আমারে ভুলভাল কী কইব। আপনাগো ঘর সংসারের মাগিগুলার মানে ছাড়া বগিছগির কায়-কারবারের কথা শুইনা আমার হাসি উঠছে। হাসব না ক্যান, আপনেই কন। এত দামের স্নো-পাউডার খরচ কইরা মুখ বানাইয়া কেউ যদি কাস্টমার না ধইরা বিনি লাভে হাঁটাহাঁটি কইরা সব নষ্ট করে তাইলে তার স্নো-পাউডারের দাম পানিতে গেল না?'

'ও আচ্ছা। মুখ বানানি মানে মুখে মেক-আপ নেওয়া। তাই বলো। তুমি বারবার এমন করে বলছিলে, আমি ভাবলাম না জানি কী ব্যাপার। আচ্ছা, ভালো কথা, দুলারি, বলো তো মেয়ে, তুমি...'

রায়হানের কথা শেষ হয় না। রায়হানের মুখে মেয়ে শব্দ শুনে দুলারি চমকে মুখ তুলে তাকায়। রায়হানের চোখে একটু অপ্রস্তুত ভাব। মেয়ে শব্দ শুনে মেয়েটা এমন চমকালো কেন? ওর বয়স এমন কিছু বেশি হয়ে যায়নি যে তাকে মেয়ে বললে সে চমকাবে। মেয়ে শব্দ তার জন্য বেমানান হওয়ার কথা নয়। রায়হানের নরম গলার মেয়ে ডাক দুলারিকে বিষণ্ন করে তুলেছে। দুলারির নুইয়ে পড়া মুখের দিকে চেয়ে রায়হানের খুব ক্লান্ত লাগে।

চার

গত মাসে পুরো একটা সপ্তাহ রায়হানের মাথা দুলারির দখলে ছিল। তারপর হঠাত্ তার মাথা থেকে মেয়েটা উধাও হয়ে গেছে। মাথার মধ্যে দুলারির চিন্তা কেন এতখানি জায়গা দখল করে নিয়েছিল আবার কেনই বা সেটা ঝটিতি উধাও হয়ে গেল, রায়হান নিজেও সেটা খেয়াল করল না। একমাস মিতুর কাছ থেকে কোনো ফোন না পেয়ে রায়হান সেদিন ভাবে, আতিকুজ্জামানের বাড়িতে দুলারি সংকট নিশ্চয়ই মিটে গেছে নইলে মিতু তাকে ফোন করত। এমন ভাবনা ভাবার দুই দিনের মাথায় মিতুর বাবা আতিকুজ্জামানের কাছ থেকে রায়হান ফোন পেল।

'রায়হান, কাল সন্ধ্যায় কি তুমি ফ্রি আছ? তেমন জরুরি কোনো কাজ না থাকলে সন্ধ্যায় আমার এখানে চলে এসো। আসার সময় দুইজনের হিসাবে কাবাব-পরটা নিয়ে এসো।'

রায়হান অফিস থেকে বেরিয়ে কাবাব-পরোটার প্যাকেট হাতে জামান সাহেবের বাড়ির দরজায় বেল বাজাতে ভদ্রলোক নিজেই দরজা খুলে দিল। ভদ্রলোককে দেখে রায়হান চমকে ওঠে। এই একমাসে মানুষটা অর্ধেক ওজন হারিয়েছে। মাত্র এক মাসে মানুষটা হঠাত্ কী অসম্ভব বুড়িয়ে গেছে।

'আপনার কি শরীর খারাপ? ডায়াবেটিস, প্রেসার কিংবা আরও বড় কিছু?'

'আরে না। জোয়ান কালে অসুখ না হলে বুড়া কালে কোনো অসুখ শরীরের নাগাল পায় না। সুখ আর অসুখের আদি ধর্ম এক। দুটোই জোয়ানকালে শরীর-মনে বাসা বাঁধে। জোয়ান কালে শরীরে সুখ-অসুখ দানা না বাঁধলে বুড়া কালে সুখ-অসুখের সুলুক সন্ধান করলে গাড্ডায় পড়তে হয়। আমার ওজন হারানো নিয়ে মিতু তোমার মতো চমকে উঠে দৌড়াদৌড়ি শুরু করেছিল। ও আমাকে জবরদস্তি করে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়েছিল। ডাক্তার ব্যাটা বলে, আমার ফুসফুসের পঁচিশ ভাগ নাকি ক্যান্সারের দখলে। পাঁচটা কেমোথেরাপি দিয়ে আমার ফুসফুস ক্যান্সারের দখলমুক্ত করতে হবে। ডাক্তারের ত্যাঁদড়ামো টের পেয়ে আমি সুরুত করে কেটে পড়েছি। মিতু ঘ্যানর ঘ্যানর করছে কিন্তু আমাকে ঠিক বাগে আনতে পারছে না।'

'আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে ক্যান্সার কোনো অসুখ না? কিংবা ক্যান্সার চিকিত্সার অযোগ্য কোনো রোগ? কেমো না নিয়ে আপনি কি আত্মহত্যা করতে চাচ্ছেন? কেমো না নেয়ার পরিণাম আপনি নিশ্চয়ই জানেন।'

আতিকুজ্জামান হাসতে চায়। রায়হানের চোখে তার হাসি মৃত্যুর চেয়ে করুণ মনে হতে থাকে। রায়হানকে তার মুখের দিকে চেয়ে থাকতে দেখে জামান বলে,

'শোন রায়হান, ক্যান্সার রোগটার ব্যাপারে আমার বুঝ পরিষ্কার। এইডস-এর মতো ক্যান্সার মানুষের শরীরে বহিরাগত মেহমান রোগ না। একটা কথা শোননি, তোমারে বধিবে যে, গোকূলে বাড়িছে সে। শরীর গোকূলে ক্যান্সার কি নতুন করে জন্ম নেয়? জন্মের পর থেকে মানুষের শরীরে প্রতিদিন ক্যান্সার সেল জন্মে। যতদিন আয়ু থাকে ততদিন সেলগুলো শরীর থেকে সুরসুর করে বেরিয়ে চলে যায়। আয়ু ফুরিয়ে গেলে ওরা শরীরের মধ্যে মনের সুখে ঘর-সংসার পেতে বংশবৃদ্ধি শুরু করে। শরীর যন্ত্রের এই প্রক্রিয়াকে সহজে মেনে নিতে হয়। ও আচ্ছা, তোমাকে আজ এসব তত্ত্বকথা শোনানোর জন্য ডেকে আনিনি। আসলে একটা মজার খবর তোমাকে না জানিয়ে চুপচাপ চলে যেতে আমার খারাপ লাগবে। এজন্য ঘটা করে তোমাকে ডেকে আনলাম। মজার খবর হলো আমাদের ফারুক, মিতুর চোখে ভারি বোকা মানুষ, দুলারির জন্য একটা যোগ্য পাত্র জোগাড় করে তাকে বিয়েও দিয়ে ফেলেছে। এই একটা যুগান্তকারি ঘটকালির সাফল্যে ফারুক তোমাদের কাছে একটা ন্যায্যভাবেই একটা স্বর্ণপদক দাবি করতে পারে। দুলারির স্বামী জাউরা মন্তা বংশালে পুরান টায়ারের মহাজন। আরে, জামাইয়ের নাম শুনে তুমি অমন কপাল কুঁচকে চেয়ে আছ কেন? বুঝেছি, নাম শুনে তাকে গুণ্ডা-পাণ্ডা বলে ধরে নিয়েছ। তোমার চিন্তা ঠিক না। মন্তা মহাজন সত্ এবং নিপাট ভদ্র ব্যবসায়ি। মন্তা কান্দুপট্টির এক পতিতার ছেলে। কান্দুপট্টিতে জন্ম বলে লোকে তার নামের সঙ্গে জাউরা শব্দ যোগ করে ডাকে। ছেলেটাকে শুধু মন্তা নামে ডাক দিলে সে ঘাড় ঘুরিয়ে হেসে বলে, জ্বি ভাইজান বলেন। আমিই জাউরা মন্তা। লোকটার সততার ব্যাপারে তুমি শতভাগ নিশ্চিত থাকতে পার। মন্তা বিয়ের কাবিনে পিতার নামের ঘর পূরণ করতে রাজি হয় নাই। বিয়ের কাজিকে মোলায়েম করে বলেছে, আপনাদের পিতার নামের ঘর আপনারা ভুলভাল পূরণ করেন সেটা আপনাদের ব্যাপার। আমার আর দুলারির পিতার নামের দরকার হবে না। মিথ্যা কথা বলা খুব শক্ত গুনার কাজ। মিথ্যা কথা লেখার গুনা নিশ্চয়ই আরও শক্ত।'

রায়হানের কপালে চিন্তার ভাঁজ। সে শীতল গলায় বলে,

'মন্তার কথা বাদ দিলাম। বিয়ের কাবিনে দুলারির পিতার নামের ঘর ফাঁকা থাকার কোনো কারণ নাই। আপনি সাহস করে নিজের নাম লিখে দিতে পারতেন। আমার বিশ্বাস, এতে ভুল হওয়ার ভয় ছিল না।'

'আমিও তোমার মতো করে ভেবে রেখেছিলাম। আমি ভেবেছিলাম, আমি দুলারির বাবা। দুলারির মা নিশ্চয়ই তাকে এ ব্যাপারে ধারণা দিয়ে গেছে। কাবিন লেখার সময় আমি আগ বাড়িয়ে সেই কথাই বলেছিলাম। কিন্তু দুলারি তাতে বাগড়া দিয়ে বসল। বলল, কান্দুপট্টিতে আমার আড়ালে ওর মায়ের আরও কাস্টমার ছিল। তাছাড়া দুলারির বাপের পরিচয় নিয়ে তার মা তাকে পষ্ট করে কিছু বলে যায়নি। কাজেই আমি ওর জন্মদাতা বাবা হতেও পারি আবার না-ও হতে পারি।'

রায়হান এই প্রসঙ্গে কথা বাড়াতে অস্বস্তি বোধ করে। বলে,

'মন্তাকে স্বামী হিসেবে পেয়ে দুলারি কি খুশি হয়েছে?'

'দুলারির কাছে বিয়ে কোনো বিশেষ ঘটনা না। সে আসলে তার কান্দুপট্টির চেনা জীবনে ফিরে যাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে ছিল।'

এ পর্যন্ত বলে জামান ক্লান্ত হয়ে পড়ে। চুপচাপ বসে দম নিয়ে ফের কথা শুরু করে।

'বিয়ের দিন মিতু দুলারিকে মন খুলে নিজের হাতে সাজিয়ে দিয়েছিল। বিয়ের সাজে সুসজ্জিত দুলারিকে দেখে বর জাউরা মন্তা দিল খোলা হাসি দিয়ে বলল, জব্বর মুখ বানাইছিস তো দুলারি। তোর মুখের ঝলক তোলা বাহার দেইখা আমার নিজেরে আজ খুব দামি কাস্টমার মনে হইতাছে। মনে হইতাছে ঠাকুরবাড়ির দামি ঘরে তোর সাথে আমার সাক্ষাত্।'

কথা শেষ করে জামান শব্দ তুলে হাসে। হাসির দমে দমে আতিকুজ্জামানের মুখে রক্তের মৃদু আভাস ফিরে আসতে থাকে।

এই পাতার আরো খবর -
font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেছেন, 'রাজনৈতিক দল হিসাবে কর্মকাণ্ড করার কোনো অধিকার জামায়াত রাখে না।' আপনিও কি তাই মনে করেন?
8 + 1 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
অক্টোবর - ১৯
ফজর৪:৪২
যোহর১১:৪৪
আসর৩:৫২
মাগরিব৫:৩৩
এশা৬:৪৪
সূর্যোদয় - ৫:৫৭সূর্যাস্ত - ০৫:২৮
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :