The Daily Ittefaq
ঢাকা, সোমবার ০৫ আগস্ট ২০১৩, ২১ শ্রাবণ ১৪২০ এবং ২৬ রামাযান ১৪৩৪
সর্বশেষ সংবাদ হাইকোর্টের রায় বহাল; নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না জামায়াত | আপিল করেছেন গোলাম আযম | অষ্টম মজুরি বোর্ডের সুপারিশে মন্ত্রিসভার একমত

গল্প

দ্বিপদ ও চতুষ্পদ

শুভাশিস সিনহা

নিজে যে সে কাঁদতে পারে, নিতাই কখনোই তা বিশ্বাস করে উঠতে পারেনি, তার মনে হয়েছিল কাঁদার অধিকার অনেক আগেই তার কাছ থেকে হরণ করা হয়েছে, হাসার অধিকার তারও আগে। যেসব অধিকার মানুষের মৌলিকতার দায়ে পড়ে, সেসব থেকে নিজেকে বঞ্চিত কেউ বলে মনে করার অভিনবত্ব তাকে অবশ্যই খানিকটা গর্বিতও করেছে, একটা না একটা দিক দিয়ে মানুষের একটা বিশেষত্ব লাগে। সেই বিশেষত্ব তার গাত্রবর্ণে, তার স্বভাবে, চলনে-বলনে, বংশে অনেককিছুতে থাকতে হয়। নিতাই ধরেই নিয়েছিল সে রকম কোনো বিশেষত্ব তার নেই। ফলে মনুষ্যকুলে নিজেকে নিয়ে তার সংকোচের অন্ত ছিল না। যখন নিজের কাছে আজন্মের জানা বিষয়টাই অন্যের মধ্য দিয়ে ফের জেনে নিতে হয়, তখন সেটা যে মর্মে কতটা পীড়া দেয়, তা নিতাই বুঝতে পারল, যখন চোখে কিছু একটা পড়েছে বলে আঙুল চোখের কোণে বোলাতে গিয়ে টের পেল তা আলতো করে ভিজে গেছে এবং অবশেষে অশ্রু তাকে এ আনন্দ অন্তত দিতে পারল যে, সে কাঁদতে পারে।

তখন গ্রামের সব গাছের মাথায় সূর্য তার বেত্তমিজ আলো ঠিকরে ফেলে দিচ্ছিল, গাছের পত্রপুঞ্জের ফাঁক গলে সে আলো গড়িয়ে পড়ছিল, সেই দৃশ্য দেখতে দেখতেই কিনা গাছগুলোর মুখে রা ছিল না। পাখিগুলো ঘাপটি মেরে নিজেদেরই বোনা কোনো নীড়ের ভেতর বসে বসে ঝিমোচ্ছিল হয়তোবা, নদীর পেট জলে ভরেনি বলে সেখানেও বদহজমের মতো আলগা ঢেকুর উঠছিল থেকে থেকে, কয়েকটা কুকুর লেজ নাড়িয়ে নাড়িয়ে পথের ধুলায় বেহুদা লালা ঝরিয়ে গেলেও তা দেখে কারও মনে হবে না, সে লালার মধ্যে বাসনার কোনো রস লেগে আছে বলে। কিছুদিন থেকে নৌকো ব্যবহারের মৌসুম শুরু হয়েছে তবু অভ্যাসবশত কমবয়সী মাঝিটা ঘাটে না বসে দূরে কোথাও বন্ধুদের সাথে আড্ডা মারতে গিয়েছিল, তার বাপ তাকে গালিগালাজ করে যাচ্ছে এখনও।

নিতাই শুনতে পাচ্ছিল সবই। গ্রামটি দুটো অংশে ভাগ হয়ে আছে আগে থেকে। সেই দুটো ভাগের সংযোগপথটি খানিকটা অন্যরকম। একটা পথের সাথে লম্বালম্বি আরেকটা পথ এসে মিশেছে। ইংরেজি এল সাইজ। সেই এল সাইজের লম্বা রেখাটির গায়ে ঠেস দিয়ে যেন বসেছিল নিতাই। কেউ যখন থাকে না তখন সবাই কথা বলতে শুরু করে। বাতাসও কিছু একটা বলে। রাস্তার ঘাসগুলোও যেন মিনমিন করে ডেকে ওঠে—ও নিতাই! কী করিস, ব্যাটা আহাম্মক! আর সবচেয়ে ভয় লাগে তার মেঘগুলোকে। কত যে আকার-বিকার। একদিন রীতিমতো আশ্চর্য হয়েছিল।

হাল চাষ করার পর গরু দুটোকে একটু ক্ষেতের মধ্যে বসে জিরোতে দিয়ে সে নিজেও এসে জিরোচ্ছিল পথের ধারে। কী মনে করে কে জানে চোখ এমনিই চলে গেল আকাশের দিকে, সে আঁতকে উঠেছিল, একেবারে সেই নাক সেই কান, খরগোশের মতো খাড়া খাড়া, না না, তার কোনো পূর্বপুরুষ নয়, এ যে গোপালদার মুখ! হায় হায় গোপালদা আকাশে গিয়ে কী করছে!

সে আর তাকাতে পারেনি। গোপালদার সঙ্গে তার একটা হিসাব ছিল, তা চুকানোর আগেই গোপালদা বজ্রপাতে ছাই হয়ে গিয়েছিল। সেই গোপালদা গিয়ে আকাশে, তার দিকে তাকিয়ে যেন কিছু একটা বলছে—কই, আমার পাঁচশ টাকাটা দিলে না? আমি, কিন্তু দেবরাজ ইন্দ্রের কাছে আর্জি জানাব। আর ইন্দ্রের ক্ষমতা সম্পর্কে তুমি তো জানোই। হেসে উঠেছিল নিতাই।

আজও সে মেঘচিত্রমালা আকাশে আকাশে। মেঘ ঢেকুর তোলেনি। একটা মহিষ তার পিঠে চিরকালের মনিবের ভার নিয়ে অভিমানে পথ চলছিল হয়তোবা। আজ যে নিতাইয়ের খুব বেশি খারাপ লাগবে, এমনটা তার নিজের মনে হয়নি। সব ঠিকই ছিল, মালতী আজ বেরোবার আগে নিজে ডেকে তার পরনের শার্টটা খুলে নিয়ে সেখানে ছিঁড়ে যাওয়া একটা বোতাম নতুন করে সেলাই করে দিয়েছে।

নিতাই অবাক হয়ে দেখেছে মালতী এমন ঘনিষ্ঠতার ভান করে তার বুকের কাছে দাঁড়িয়েছিল, অনেক কাল পরে নিতাইয়ের শরীর গরম হয়ে উঠছিল, মালতীর গরম শ্বাস এসে আছড়ে পড়ছিল বুকের ওপর। মালতীর গলায় একটা বাজারি চেইন। সেটাও খুবই চমত্কার লাগছিল। নিতাই ছিঁড়ে যাওয়া বোতামকে নতুন করে পাওয়ার আনন্দে ফুরফুরে মেজাজে কাজে বেরিয়েছিল। আজ কেন তার চোখে পানি আসবে, সে মোটেই প্রস্তুত ছিল না।

কিন্তু সামান্য একটা ঘটনার জন্য, সামান্য একটা প্রাণীর জন্য আজ কেন যেন তার বড় যন্ত্রণা হচ্ছে। মোটেই অসামান্য কিছু নয়। এতই সাধারণ যে, পশুকুলে তাকে নিজের জায়গা করে নিতে হলে অন্তত সবার সঙ্গে লড়াই করতে হবে। বিড়াল। একটা বিড়াল বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে ছিল শুকনো খালের এক কোণে। কাঁটা-ঝাড় ছিল। লম্বা লম্বা ঘাস। ধুলো-বালি লাগা। পথের পাশে বেড়া দেওয়া। সেই বেড়া ঘেষে বিড়ালটা পড়ে ছিল নিথর। একটা চোখ গর্ত হয়ে যাওয়া। লেজের অর্ধেকটাই নেই। লোমও খসে পড়েছে দাঁতের আঁচড়ে, বোঝা যায়। নিতাই পাশ কেটে যাচ্ছিল, হঠাত্ প্রস্রাব করার জন্য সেই খালের ধারে বসে পড়েছিল। সাবধানী প্রস্রাব খালে ঢেলে দিতে যাবে এমন সময় দলামোচা বিড়ালটা তার চোখে পড়ে।

প্রথমে তার মনে হয়েছিল তার মতোই অদ্ভুত কোনো প্রাণী বুঝি। অন্য কোনো গ্রহ থেকে ধপাস করে পড়ে গেছে। কিন্তু না, চেনা চেনা লাগছে। এ যে বিড়াল। হায় হায়। কী গন্ধ! কে এই দশা করল। মনে হচ্ছে কোনো বড় পশুর খপ্পরে পড়েছে। বিড়ালটার একটা চোখ খোলা ছিল। মার্বেলের মতো। নিতাইয়ের বমি আসছিল। আজ এমনিতেও তার পেটের অবস্থা ভালো না। বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় মালতী ওরকম মধুর আচরণ না করলে আজ হাঁটার বল হারিয়ে মাঝপথেই তাকে বসে পড়তে হতো। কিন্তু মালতীর বোতাম লাগানোর দৃশ্য চোখের সামনে ভাসছিল বলে অনেক কিছু এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছিল। কিন্তু এক্ষণে বিড়ালটা তার বমি করিয়ে ছাড়বে মনে হচ্ছে।

বমি এল না। তার বিপরীতে চোখ ভিজে উঠল। এ যে উলটো রসায়ন।

মৃত অর্থহীন বড় বড় চোখে বিড়ালটা একটা আজব অর্থ পৌঁছিয়ে দিতে চাচ্ছিল নিতাইয়ের কাছে। নিতাই চিনতে পারল। এ যে তাদের বাড়ির বিড়ালটা। ভগবান!

দুই

বিড়ালটা স্বস্তি পেল। মরার পর মহা অস্বস্তি নিয়ে ছিল বুঝি। এখন তাকে খুবই শান্ত মনে হয়। অন্তত বেওয়ারিশ লাশ হওয়ার লজ্জা থেকে তার বাঁচা হলো। এখন যে যা পারে করুক। পরিচয় তো মিলেছে।

এই বিড়ালকেই ঘরের দুধ খেয়ে ফেলার অপরাধে মালতী জ্যান্ত পুড়িয়ে মারতে চেয়েছিল। নিতাই তাকে লাঠি দিয়ে এমনভাবে মেরেছিল, কীভাবে বেঁচেছে সে চিন্তাই করতে পারে না।

একবার মরে বেঁচে আবার মারা যাওয়া বিড়ালটা নিতাইয়ের দিকে এমন করুণ চোখে তাকিয়েছে, নিতাইয়ের চোখ না ভিজে পারেনি। কিন্তু নিতাই নিজের চোখের জল টের পায় তার অনেক পরে। কারণ বিড়ালটাকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে তার ঘুমই চলে এসেছিল।

সূর্য হেলে পড়েছে।

কেবল দুটো ক্লান্ত পাখি পাখা মেলে দিয়ে ঘরের দিকে ফিরছে। বিড়ালটা ঘাসে ধুলোয় ল্যাপ্টালেপ্টি। একটু হলে নিতাই মরা প্রাণীটার অভিশাপই খেত নিশ্চিত। তার বমি বিড়ালটার গায়ে লাগতে লাগতেও না লেগে একেবারে কাছে গিয়ে পড়ল।

নিতাই এই অসহায় মুহূর্তে আর কিছু করতে না পারলেও চোখে পানি আনতে পারল। তা সে টের পেল অনেক পরে। তখন বিড়াল চলে গেছে পৃথিবীর অনেক নিচে।

নিতাই তাকে পুঁতে ফেলেছে মাটির ভেতর। হায় রে বিড়াল!

তিন

বিড়ালটার মৃত্যু নিতাইকে এতটা ব্যথিত করবে, সে নিজেও ভাবেনি। পশুপাখির প্রতি তার যে এত দরদ এটাও তার জানা ছিল না। তবে তার মা প্রায়ই বলত, পশুপাখি কীট-পতঙ্গের ওপর তার নাকি ছোটবেলায় খুব দয়ামায়া ছিল। পিঁপড়া পায়ের ওপর দিয়ে হেঁটে গেলেও সে মারতে পারত না। পিঁপড়ারা সারি বেঁধে পথ চলে। সে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকত। তার বন্ধুরা—সেই নিমাই, বলাই, শ্যাম, কাশেম ওরা বলত পিঁপড়াদের ছত্রভঙ্গ করার মধ্যেই আসল মজা। নিতাই বাধা দিত। কী দরকার ওদের যন্ত্রণা দেওয়ার। সে বরং চেয়ে থাকত। আজ নিমাই বিশাল একটা বিল্ডিংয়ে থাকে। তার ছেলে গেছে মালয়েশিয়ায়। কে একজন ব্যবস্থা করে দিয়েছে। সেখানে গিয়ে নাকি ড্রাইভারি করে। টাকা পাঠায়। বাপ নিমাই ছেলের টাকায় ভালোই আছে। আর শ্যামের অবস্থাও খারাপ না। শ্যামের ছেলে বিডিআরে চাকরি করে। বিডিআর বিদ্রোহের সময় ছেলেটা বাড়িতে ছুটিতে এসেছিল। ফলে এযাত্রা সে বেঁচে যায়। আর বলাইও ভালোই আছে। মেয়েটা শ্বশুরবাড়ি থেকেই তার দেখভাল করে। বাপের প্রতি মেয়ের প্রবল মায়া। মা-মরা মেয়ে। ছোটবেলা থেকে বলাই তাকে মা-বাপের যৌথ ভালোবাসায় বড় করেছে।

কিন্তু পশুপাখি থেকে শুরু করে কীটপতঙ্গ পর্যন্ত জগতের যাবতীয় প্রাণযুক্ত জিনিসের ওপর ভালোবাসার ভাণ্ড ঢেলে নিঃশেষ করে দিয়েও নিতাই কারও কৃপাদৃষ্টি পায়নি। বরং অভিশাপ পেয়েছে। এবং একটা মিল সে পেয়েছে তার জীবনে, তা হলো জীবনটা তার মনুষ্যতুল্য হয়নি, হয়েছে পশুপক্ষীদের মতো। মানুষের হাসি-মস্করা, অবহেলা, লাত্থি খেতে খেতে ভয়ে তার শরীরের গড়নটাই না পাল্টে যায়।

মালতী তাকে ঘরের দাওয়ায় ওভাবে বসে থাকতে দেখে একটু অবাক হলো বটে কিন্তু সে জন্য খুব একটা সময় নষ্ট করার ইচ্ছে তার নেই।

ইদানীং মালতী মালা জপ করতে শুরু করেছে। বিড়বিড় করে। নিতাই অবাক হয়ে দ্যাখে। মালতী যে কখন কী মাথায় ঢোকায়, ঠিক নেই। নিশ্চয়ই কোনো সন্ন্যাসীর দেখা পেয়েছে? হতে পারে। নিতাইয়ের অগম্য নানান জায়গায় মালতীর যাওয়া-আসা আছে।

নিতাইয়ের দিন কাটে বেশির ভাগই ক্ষেতে, মাঠে অথবা পরের বাড়িতে কাজ করে। মালতীর বাতের ব্যথা, সে কোনো বাড়তি কাজ করতে পারে না। তাই শুয়ে-বসে দিন কাটে। নিতাইয়ের ওপর পড়ে সব দায়িত্ব। এখন মালতীর অলস মস্তিষ্কে নানান ধরনের ভূতের আনাগোনা। নিতাই এসব ভূতকে ভয় পায়।

ঘাঁটাতে চায় না। বিড়ালের মরা মুখখানি যেন কেউ নিতাইয়ের চোখের সামনে পেরেক ঠুকে সেঁটে দিয়েছে। সরাতে পারে না। সেই মুখ কত কথা বলে চলেছে! কত প্রশ্ন! নিতাই তার কোনো উত্তর দিতে পারে না। শুধু ভাবে, কে এমন দশা করল! কে! মালতী তার মনের ভেতরকার সব ভাবনা, অস্থিরতা ধরে ফেলে কোত্থেকে এসে পাশ কেটে যেতে যেতে বলে—একটা বিলাইয়ের মরণ নিয়া ভাইবা কি সারা দিন পার করবা নাকি?' ও কুকুর-শিয়ালের কাণ্ড। বোঝাই তো যায়। ও নিয়ে ভাবার কী আছে।' 'এত দিনের পোষা বিড়াল। মালতী, কুকুরটার সঙ্গে তো ওরে খেলতেও দেখছি। গাঁয়ে দশ-বারো বছরে কোনো শিয়ালের ডাকও তো শুনি নাই।' 'তাইলে আর কী! অ্যাম্নে অ্যাম্নে মরণ আইসা বিড়ালের ভিতর ঢুইকা গেছে। আসো, খাইতে আসো। নাকি তাও আজকে বাদ? জ্বালা !'

বলেই মালতী মালা জপতে জপতে ভেতরে চলে যায়। নিতাই বাড়ির দাওয়ায় মাটিতেই বসে থাকে। আজ আর কিছু খাবে না সে। একবার যদি একটু মনের মতো কেঁদে ফেলতে পারত! তাও পারছে না। মানুষ তাকে পাগল বলবে। মানুষ বড়ো আজব জিনিস।

নিতাই অনেক কিছু মনে করার চেষ্টা করে। বিড়ালের মৃত্যু বা হত্যা তার কাছে নানারকম ইশারা নিয়ে হাজির হয়। ওই যে পরশুদিন রাতের বেলা ঘন হয়ে আসা মালতীকে জড়িয়ে ধরতে গিয়ে নিতাই থরথর কাঁপতে শুরু করেছিল। তারপর রাতের অন্ধকারের বুক চীরে একটা শব্দ তীক্ষ্নভাবে তাকে বিদ্ধ করেছে—বিলাই! তুমি পুরুষমানুষ না, তুমি একটা বিলাইয়ের বাচ্চা।

বলেই মালতী দাঁতে দাঁত ঘষছিল, ঘন ঘন শ্বাস ফেলছিল, নিতাই তার পাশে বসে ছিল অসহায় এক পরাজিত যোদ্ধার মতো। পায়ের কাছে ঘুরঘুর করছির বিড়ালটা। যতক্ষণ নিতাই বাড়িতে থাকে, বিড়ালটা তার পিছু ছাড়ে না। লাথি-ঝাঁটা ছাড়া কিছু পায়নি, তবু তার টানের শেষ নেই। ভাগ! ভাগ! বলে উসটা মারতেই বিড়ালটা মিঁউ মিঁউ করে পালিয়ে গিয়েছিল। আর মালতী ক্যামন করে জানি হাসতে শুরু করেছিল। নিতাইয়ের অপমানের শেষ নেই।

পরের দিন, অর্থাত্ গতকাল সকালবেলা বিড়ালটা চুপ করে বসে ছিল গোয়ালঘরের কোণে। সে অভিমান করেছে। পশুপাখিরও মান-অভিমান হয়। নিতাই বুঝতে পারে। বয়স হয়ে যাওয়া গরুটাকে বাজারে বেচতে নিয়ে যাওয়ায় গরুটার চোখেও সে এমনই একটা দৃষ্টি দেখেছিল। কষ্টের বা দুঃখের নয়, অভিমানের। ওটা বলে বোঝানো যায় না।

রামলাল দা লোকটা ভালো কি মন্দ, বোঝা মুশকিল। বিপদে-আপদে তারই কাছে যায় নিতাই, ধার চাইলে দেয়, কিন্তু দেবার আগে এমন সব কথা শোনাবে, তাতে নিতাই কেন যে-কারোরই আর দুনিয়ায় বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করবে না। কাল বিড়ালের মনমরা মুখ দেখে বেরিয়ে গিয়েছিল তার কাছে। রামলাল দা ভিসিআরে কী একটা ছবি দেখছিল। নিতাই গিয়ে দাঁড়াল দরজার চৌকাঠে। রামলাল তাকে দেখতে পেয়েও ভান করল, দেখেনি। নিতাই দাঁড়িয়ে রইল। নিজে থেকে ডাকতে ভয় করে। যদি চটে যায়। রামলালের বউ এসে রামলালকে হয়তো বলল, নিতাই এসেছে। রামলাল হঠাত্ ঝট করে বিড়াল তাড়াতে শুরু করল। দূর দূর! বিড়াল কই? নাই। অদৃশ্য বিড়াল। নিতাই মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। রামলাল বলে, কী ব্যাপার? রামলাল দা... রামলাল দা, মাইনে... রামলাল ক্ষেপে গেল। এই নিতাই, তোকে না বলেছি সবসময় যা বলার ঝটপট বলে বিদায় হবি। বিড়ালের মতো মিনমিন করবি না।

তখনই নিতাইয়ের শরীরটা অসাড় হয়ে গিয়েছিল। পায়ে আর বল ছিল না। অদ্ভুত অনুভূতি। আগের রাতের কথা তার মনে আসছিল। বউয়ের সেই 'বিলাই' বলে দেওয়া গাল কানে এসে বাজে। কানের পর্দা যেন ফাটিয়ে দেবে। যে দরকারে এসেছিল, তা আর বলতে ইচ্ছা করল না। রামলাল দার বউ—সীতা বৌদি—শরবত নিয়ে আসছিল। পিপাসাও পেয়েছিল খুব। তাও সেই লোভ সংবরণ করে ছুটে এসেছিল সেখান থেকে।

ঘরে ফিরেই দাওয়ায় বিড়ালটাকে দেখে, তার প্রতি বিড়ালের করুণাভরা চাউনি লক্ষ করে নিতাইয়ের অপমানবোধ বেড়ে গিয়েছিল দু-গুণ, ইচ্ছে করছিল ওর চোখ দুটো উপড়ে ফেলে।

চার

নিতাই কোনোদিন বাবা হতে পারবে না, কিন্তু মালতীর মা হওয়ার ক্ষমতা আছে। জগতের এসব জটিল হিসাব-নিকাশ নিতাইয়ের মাথায় ঢোকে না। কিন্তু মালতী সব জানে। সে কঠিন কঠিন বিষয় বুঝতে পারে। পড়ালেখা করেছে হাই স্কুল পর্যন্ত। নিতাইকে কী সব পড়িয়ে শোনায় আর ব্যাখ্যা করে। যেদিন ডাক্তার সেই তথ্য জানাল, তখন মালতীর চোখে-মুখে কী এক উচ্ছ্বাস। ইতর, আহাম্মক, অচল স্বামীকে তার এখন ইচ্ছামতো ঠারানো যাবে। তুমি কীরকম মানুষ হে, ভগবানের দেয়া কমসে কম একটা মাত্র ক্ষ্যামতা, তাও নিয়া জন্মাও নাই। ছি !

কিন্তু নিতাই মালতীকে ঠিক বুঝতে পারে না। এই গালাগাল করল, অপমান করল, আবার চুপি চুপি গিয়ে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল। নিতাই ঠিক জানে না, কেন সে নিতাইকে সহ্য করতে পারে না। নিতাই গরিবের গরিব অধমের অধম, তাই বলে দয়ামায়া, টান, ভালোবাসা বলে কিছু থাকবে না? লোকে বলে, অভাবে স্বভাব নষ্ট। অভাব দেখলে ভালোবাসা পালিয়ে যায়। কিন্তু নিতাইয়ের হয়েছে উল্টো। বিশেষ করে পশুপাখিদের ওপর তার প্রবল মায়া। বুড়ো গরুটাকে বেচতে নেওয়ার সময় নিতাইয়ের কান্না দেখে গ্রামের মানুষ হাসাহাসি করেছে। বাজারে নিয়ে গরুটা যখন আরেকজনের হাতে সঁপে দিল, তখন নিতাই যেন বাপের কন্যাদানের চেয়ে বেশি কষ্ট অনুভব করেছিল। এই সেদিনও বিড়ালটাকে লাত্থি মারার পর সারারাত ঘুমাতে পারেনি। মেরেছে কি সাধে? চায়ের জন্য কিনে আনা এক বাটি দুধ বিড়ালটা খেয়ে ফেলেছিল। কিছু একটা করে মালতীকে একটু বুঝ দিতে না পারলে উপায় আছে! মালতীর সে কি চিত্কার, চেঁচামেচি। 'কত করে বলি এই কুত্তিটারে বস্তার মধ্যে পুরে নদীতে ফেলে দিয়া আসো, শুনেছ! কিসের এত পিরিত তোমার? বিলাইয়ের সঙ্গে! নাকি —'

না! ছি ছি! অমন নোংরা কথা সে মনে করতে চায় না। সেদিন বিড়ালটা সারা দিনই আর তার কাছে আসেনি। রাতেও ফেরেনি ঘরে। কার ঘরে গিয়ে ঠাঁই নিয়েছিল কে জানে। মালতী স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছিল। কিন্তু মালতীকে চরমভাবে হতাশ করে পরের দিন দুপুরবেলা বিড়ালটা ফিরে আসে। মালতীর চোখে আগুন। তবে কি মালতীই বিড়ালটাকে—

না না, নিতাই আর ভাবতে চায় না। অতটা নিষ্ঠুর নয় মালতী। কতবার সে দেখেছে, বিড়ালটা মালতীর ঘুমন্ত দেহের পাশে চুপ করে শুয়ে পড়েছে। আর মালতী তাকে ঘুমঘোরে নিজের সন্তানের মতো হাত বুলিয়ে দিয়েছে।

তাহলে...

হঠাত্ নিতাইয়ের চোখে পড়ে সামনে গোয়ালঘরের এক কোণে ফেলে রাখা একটা চটের বস্তার ওপর। সাধারণ, তুচ্ছ একটা জিনিস। চোখে পড়ার মতো নয়, কিন্তু আজ তা এত জ্বলজ্বল করে চোখে পড়ছে কেন? নিতাই যেন কোনো দুঃসহ গোপন ঘৃণার পাতালপুরীর ভেতর থেকে উঠে আসে। এইমাত্র যেন সে এক চরম সত্যের জমিনে এসে দাঁড়াল। পরশু রাতে বিছানায় তার উদ্দেশে মালতীর 'বিলাই' নামে ছোড়া তীক্ষ্ম তীর... কাল রামলাল দার কাছ থেকে ওই নামে অপমান... ঘরে ফিরে বিড়ালের চোখে করুণা... ভেতরটা পুড়ে যাচ্ছিল তার... ছটফট করছিল... হাত মোচড়াচ্ছিল... মাথা টনটন করছিল... বিড়ালটাকে আর সহ্য হচ্ছিল না... মালতী বিছানায় বাতের ব্যথায় গোঙাচ্ছিল... নিতাই পাকঘরে ঢুকে তন্নতন্ন করে কী যেন খুঁজতে শুরু করেছিল... টিনের কৌটা থেকে একটা ড্যাম যাওয়া বিস্কুট পায়... বিস্কুটটাকে করেছিল বিড়াল ধরার টোপ... বিড়ালটা আসে... সঙ্গে সঙ্গে ধরে বস্তায়... সারা রাস্তা বিড়ালের কী ছটফটানি, প্রতিরোধ, বের হওয়ার প্রাণান্ত চেষ্টা... এমন নাছোড় বিড়াল, সামলানো দায়... বস্তাটা প্রায় ছিঁড়েই ফেলল ভেতর থেকে... নিতাই যেন ক্রমে পশুতে পরিণত হয়ে যাচ্ছিল... রাস্তার ধারের বেড়া থেকে একটা বাঁশের কঞ্চি খুলে নেয়... বিড়ালটাকে বস্তা থেকে ফেলে দেয়... এক সেকেন্ড দেরি না করে প্রথম আঘাত তার চোখ বরাবর... বিড়াল থেকে বাঘ হয়ে উঠেছিল নিতাই!

পাঁচ

দাওয়ায় অসাড় নিতাই।

মালতী পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। মালতী নিজেই জানে না, মিনমিনে এক খেলুড়ে বিড়াল ওর মনের ভেতরও আনাগোনা করে, নয়তো কেন সে এখন হঠাত্ এই আচরণ করবে, যা তাকে একদমই মানায় না।

নিতাইয়ের মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে ভিজে আসা গলায় সে বলে, আমারে তুমি ক্ষমা কইরা দিয়ো। আমি মস্ত বড় পাপ করেছি, গো। ও তো ভগবানেরই সৃষ্টি। কতকাল ধইরা আছে আমাদের সঙ্গে, সে তো এই ঘরেরই একজন। মিছেমিছি তারে কত ঘেন্না করেছি! ভগবান আমারে হয়তো ক্ষমা করবে না, কিন্তু তুমি কইরো। তুমি কইরো!

নিতাই আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। অপরাধীর মতো দাঁড়ানো বউয়ের কোলে মাথা রেখে শিশুর মতো কাঁদতে শুরু করে।

আকাশ লাল। সূর্য ডুবে যাওয়ার আগে রাঙিয়ে যাচ্ছে পৃথিবীকে। নিতাই আর মালতীর ওপর সেই রং ছড়িয়ে পড়ছে।

এই পাতার আরো খবর -
font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেছেন, 'রাজনৈতিক দল হিসাবে কর্মকাণ্ড করার কোনো অধিকার জামায়াত রাখে না।' আপনিও কি তাই মনে করেন?
8 + 3 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
নভেম্বর - ২৯
ফজর৫:০২
যোহর১১:৪৭
আসর৩:৩৫
মাগরিব৫:১৪
এশা৬:৩১
সূর্যোদয় - ৬:২২সূর্যাস্ত - ০৫:০৯
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :