The Daily Ittefaq
ঢাকা, সোমবার ০৫ আগস্ট ২০১৩, ২১ শ্রাবণ ১৪২০ এবং ২৬ রামাযান ১৪৩৪
সর্বশেষ সংবাদ হাইকোর্টের রায় বহাল; নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না জামায়াত | আপিল করেছেন গোলাম আযম | অষ্টম মজুরি বোর্ডের সুপারিশে মন্ত্রিসভার একমত

উপন্যাস

লাইলিনামা

আন্দালিব রাশদী

প্রথম চুরির সাফল্য লাইলির সাহস বাড়িয়ে দেয়।

সাফল্যের চেয়ে বড় অনুপ্রেরণা আর কী হতে পারে। লাইলি হাসে। ঠিকই শুনেছে কচু কাটতে কাটতে ডাকাত হয়। ডাকাতদের অবশ্য মান-ইজ্জতই আলাদা, মন্ত্রীদের কারও কারও মত। খুব নামডাক ছিল তাদের এলাকার—ডাকাতের গ্রাম কাইতলা, কুমিল্লার কাইতলা। বাড়ি কোথায়? কাইতলা। শুনলেই মানুষ একটু বেশি সমীহ করত। সে গ্রামের মেয়ে লাইলি ছোট কাজে হাত নষ্ট করল। ছুরি, ড্যাগার, পিস্তল কিছুই লাগেনি, এমনকি জংধরা বলাকা ব্লেডও না। অপারেশন সাকসেসফুল হয়ে গেল।

লাইলি এই ফ্ল্যাটে দশ মাস পার করেছে। দশ মাসে একদিনও মনে হয়নি ছোটখাট একটা অপারেশন করা দরকার। হঠাত্ তার নতুন জ্ঞানের উন্মেষ হলো। চোখ খুলল। একটি সূঁচালো টুথপিক উপরের পাটির বামদিকে দুই দাঁতের মাঝখানে ঢুকিয়ে লাইলি হিসাব করল, বাচ্চা হতে দশ মাস আর চোখ খুলতে দশ মাস। বাচ্চার বেলায় আসলে সাড়ে নয় মাস। এর বেশি লাগলে পানি ভেঙে বাচ্চার মরণদশা শুরু হয়ে যায়। চোখ খুলতে দু-সপ্তাহ কম-বেশিতে সমস্যা হয় না।

কাকাতুয়ার বেডরুম আর বাথরুমের মাঝখানে যে সাজঘর, সেটাই তার স্টোরহাউস। সেখানে চোখে লাগার মতো জিনিসপত্রের এত বাহার আর এত বাড়াবাড়ি যে, চোখকান একটু খোলা রেখে টুপ করে এটা-ওটা সরিয়ে ফেললে কেউ টের পাবে না, আর একটা কিছু যে খোয়া গেছে সেটা টের পেতেও কমপক্ষে তিন সপ্তাহ—তিন সাতে একুশ দিন।

কাকাতুয়ার মন ভালো। সন্দেহ করা তো ছোট মনের মানুষের কাজ। সুতরাং লাইলিকে সন্দেহ করবে না। ভাববে, সে নিজেই বোধ হয় হারিয়ে ফেলেছে। কিংবা মা যদি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েও দেয় এটা নেই কেন, অনেকক্ষণ চুপচাপ থেকে এক সময় বলে উঠবে, কী যে বলো মা, এটা তো কখনো ছিলই না। আর তুমি যদি জোর দিয়ে বলো ছিলই, তা হলে সেটা শালিকের আমলে।

এই রুমটা শালিকেরই ছিল। শালিকের আসল নাম মাখদুমা মাহজাবিন। এখন বিদেশে, লন্ডনে পিএইচডি করতে গেছে। তাও প্রায় চার বছর। দুঃসংবাদটা আসে বছর দুয়েক আগে। শালিক ইমানুয়েল মুটালে নামের বিশালদেহী দাড়িওয়ালা এক কালো মানুষকে বিয়ে করে ফেলেছে। কী দুঃসাহস! তাদের জোড় ছবিও পাঠিয়েছে। গরিলার মতো একটি দানবের পাশে ফরসা রং, ক্ষীণ দেহ, টেনেটুনে পাঁচ ফুট এই মিষ্টি মেয়েটিকে দেখে কাকাতুয়ার মনে হয়েছে, বাঘের খাচায় একটি মেষ। আশ্চর্য! মেষটির হাসি। মানুষ যে কত উদ্ভট কাণ্ড করতে পারে!

ক্ষিপ্ত মা আরজুদা মান্নান, সেদিনই চেঁচিয়ে বললেন, শেষ। সব শেষ। এ বাড়িতে ওই হারামজাদির সব অধিকার শেষ। আমি তাকে ত্যাজ্য করে দিলাম। সে আমার মেয়ে হতে পারে না। এ মেয়ে আমি পেটে ধরিনি।

আর দেরি না করে কাকাতুয়াকে ঠেলে ঢুকিয়ে দিলেন এই রুমটিতে। বললেন, এখন থেকে এটা তোর রুম। এই রুমে যা যা আছে সব তোর। শালিক পাখি মরে গেছে। শি ইজ ডেড।

রুমটি এখন তারই। অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে।

লাইলি যখন শালিককে দেখেইনি কাকাতুয়ার কর্তৃত্ব মেনে নিয়েছে। কাকাতুয়াকে নিয়ে সমস্যা তার একটাই। কাকাতুয়া বোঝে না যে সে মেয়েমানুষ। মেয়েমানুষ হলে যে একটু স্নো-পাউডার দিতে হয়, এক পোচ হলেও যে লিপস্টিক লাগে—এই ধারণাটাই তার নেই। কাকাতুয়া বেশ একটু মনভোলাও। সালোয়ারের গিঁঠ বাঁধার পর ফিতেটা যে গুঁজতে হয় সে খেয়ালটা তো জরুরি। নতুবা ফিতেটা বড় হলে সামনে দিয়ে হাঁটুর নিচ পর্যন্ত গড়ায়। এ রকম ফিতে ঝুলানো অবস্থায় ক্লাস করে, শপিং সেন্টার ঘুরে, হাতে কোনো আইসক্রিম নিয়ে যখন ঘরে ঢুকল, লাইলি চেঁচিয়ে উঠল, হায় সর্বনাশ! আল্লাহ সোবহানাল্লাহু তায়ালা এটা কী করলেন—সারা দুনিয়ার পুরুষ মানুষ ফিতাটা দেখল!

কাকাতুয়া মাথা একটু নুইয়ে দেখল ফিতে ঝুলছে। বলল, ফিতা দেখলে সমস্যা কী?

লাইলি বলল, পুরুষ মানুষের চোখ! ছি ছি আস্তাগফিরুল্লাহ।

লাইলি ভাবল, কেমন বেআক্কেলে মেয়ে! কালো সালোয়ারের ফিতেটা কালো হলেও চোখে কম পড়ত। ফিতেটা সাদা, একেবারে ধবধবে সাদা। আর একদিন তো উল্টো সালোয়ার পরে নিজের পরীক্ষা শেষ করে ব্রিটিশ কাউন্সিল থেকে ঘুরে এসেছে।

যেখানে ইচ্ছে যাক, কাপড় উল্টো পরুক সোজা পরুক তার তাতে কী এসে যায়। যে মেয়ে নিজের ভালোমন্দ বোঝে না, পুরুষ মানুষের চোখ কতটা খারাপ টের পায় না, তার ঘরে এত জিনিস কেন? বডিমাপের নীলচে লোশন থেকে শুরু করে জনসন বেবি পাউডার, অয়েল অব ওলে থেকে শুরু করে ওজন মাপার ডিজিটাল মেশিন। পাটের দড়িতে তৈরি স্লিপার থেকে শুরু করে হলদে রঙের রেইনকোট (এত বৃষ্টি গেল, কোনোদিন রেইনকোট পরে বের হতে দেখেনি)—কী নেই কাকাতুয়ার স্টোর হাউসে! অনেক জিনিস আবার জোড়া জোড়া। লাইলি ধরেই নিল সমস্যা মা-টাকে নিয়ে। সামনে যা দেখেন, মেয়ের জন্য তা-ই কেনেন। সব বাজে খরচ।

লাইলি মাঝখানের ছোট রুমটাতে ঢুকে আলমারিতে সাঁটা মানুষ-সমান আয়নার সামনে দাঁড়ায়। ঠোঁটের বামদিকে নাকের ছিদ্র বরাবর, একটু নিচে পাকা টসটসে একটা ব্রণ। ছি! এটা নিয়ে সে ঘুরে বেড়াচ্ছে আর কাকাতুয়ার সমালোচনা করছে? মেয়েমানুষ এত বেখেয়াল হলে চলে?

ব্রণটা গালিয়ে খোলা আলমারির পাল্লাটা টান দিল। বারো ডজন সেনেটারি ন্যাপকিনের বড় প্যাকেটটা খোলাই। আগে বুকে ফুঁ দিয়ে সাহস সঞ্চয় করল। তারপর এক ডজন ন্যাপকিনের একটা প্যাকেট দ্রুত বের করে পুরোনা ইংরেজি খবরের কাগজে পেঁচিয়ে আর একবার ডাইনে-বায়ে তাকিয়ে মাথা একটুখানি নিচু করে সরাসরি নিজের রুমে ঢুকে ছিটকিনি লাগিয়ে দিল। তখনই টের পেল বুকটা ঢিপঢিপ করছে। নিজেকে বোঝালো, কেউ তো আর দেখেনি, ভয়ের কারণ নেই। লা ইলাহা ইল্লা আনতা সোবহানাকা ইন্নিকুনতু মিনাজ জোয়ালেমিন। ইনশাল্লাহ বিপদ-আপদ সব দূর হয়ে যাবে। তাছাড়া এটা তো আর ডাকাতি নয়।

রান্নাঘর থেকে লাইলির ডাক পড়ার আগেই প্যাকেটটা নিজের কালো ট্রাঙ্কে পুরোনো কাপড়ের নিচে রেখে ডালা ফেলে তালা মেরে বিড়বিড় করে বলল, কই কিছু হয়নি তো।

লাইলির অজান্তে কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে।

সাফল্য এসেছে ঠিকই, আতঙ্ক তখনো কাটেনি। ভয় স্বেদগ্রন্থিকে প্ররোচনা দিয়ে থাকতে পারে। সেজন্যই ঘামের বাড়াবাড়ি। লাইলি বেশ অনুভব করে জামার ভেতরের শরীরটা ঘামে স্যাঁতসেঁতে হয়ে পড়েছে।

দ্রুত রান্নাঘরে এসে ভালো করে পানি ছিটিয়ে মুখ ধোয়। তাতে আতঙ্কের চিহ্নগুলো ভেসে যায়। সূর্যবানু বলে, লাইলি কাবাবটা ভেজে দে।

কাজটা সূর্যবানুই করত, ভয় একটাই, কাবাবের বাইরের দিকটাতে সোনালি রং না-ও ধরতে পারে। যতবারই ভাজতে গেছে হয় পোড়া পোড়া কালচে হয়ে গেছে অথবা সোনালি রং কিছুটা ধরলেও ভেতরটা কাঁচা রয়ে গেছে। সে জন্যই লাইলিকে ডেকে আনা। কম বয়সী মেয়ে, চোখের জ্যোতি ঠিক আছে। ভাজা কাঠি হাতে নিলে, হাত কাঁপে না।

সূর্যবানু বাড়ির পুরোনো বুয়া। অন্তত কুড়ি বছর আগে একটি কন্যা সন্তানসহ বিধবা হয়ে গেলে আরজুদা মান্নান তাকে নিয়ে আসেন। দেড় বছর বয়সী মেয়েটিকে রেখে দেন সূর্যবানুর শাশুড়ি। বলেন, আমাদের বংশের মেয়ে বুয়ার মেয়ে হিসেবে পরিচিত হোক—এটা চাই না। বুয়া হোক, বেশ্যা হোক সূর্যবানুর যা ইচ্ছে হোক। মেয়ের জন্য যেন ফিরে না আসে। সূর্যবানুর স্বামী সেন্টু মিয়া বিদ্যুত্ বিভাগের ইলেকট্রিশিয়ান। স্থায়ী চাকরি নয়, ঠিকে মজুরের মতো। যখন ডাক পড়ত বড় মই নিয়ে ছুটত। কোথায় ট্রান্সফর্মার বিস্ফোরিত হয়েছে, কোথায় হাই টেনশন তার ঝুলে পড়েছে—এসবের মেরামতে তার হাত বেশ পাকা। অন্য সময় বাড়ি বাড়ি গিয়ে কাজ করত। কাট আউট জ্বলে গেছে, সুইচ কাজ করছে না, টু-পয়েন্ট প্লাগের বদলে থ্রি পয়েন্ট প্লাগের সকেট লাগানো, ফ্যানের রেগুলেটর ঠিক করা—এসব গার্হস্থ্য কাজই। রোজগার মন্দ নয়। এক মেয়ে আর বউ নিয়ে বেশ চলে যায়। এক রাতে ট্রান্সফর্মার মেরামত করতে গিয়ে মই বেয়ে উপরে ওঠার দু-মিনিটের মধ্যেই বিদ্যুত্ স্পৃষ্ট হয়ে অনেকক্ষণ তারের সাথে ঝুলে রইল। বিদ্যুত্ না থাকায় তার এই ঝুলন্ত দশা পাড়ার মানুষদের দেখার সুযোগ হয়নি। মই বেয়ে উপরে উঠে তাকে নামিয়েও আনতে হয়নি। সেন্টু মিয়া এত ওপর থেকেই ধপাস করে নিচে পড়ে যায়। সেন্টুর সহযোগী আলমাস আলী মইয়ের গোড়ায় দাঁড়িয়ে ছিল। বলল, তারে যখন ঝিলিক লাগল তখনই সেন্টু মিয়ার কাম সারা। এটা তো লাশ। লাশ পাঁচ-শ হাত ওপর থেকে পড়লেও যা দশ হাত ওপর থেকে পড়লেও তা-ই; একই কথা। লাশ তো আর ব্যথা পায় না।

কোনটা সত্যি কোনটা মিথ্যে সূর্যবানু তখন যেমন জানত না, এখনো জানে না—সেন্টু মিয়া ট্রান্সফর্মার মেরামত করতে গিয়ে না ট্রান্সফর্মার চুরি করতে গিয়ে জানটা খোয়ালো। লোকজন অবশ্য চুরির কথাটাই বেশি বলে। বলুক, মানুষের মুখে তো আর কুলুপ আঁটা যাবে না। আরজুদা যখন সূর্যবানুকে বলেকয়ে নিয়ে আসেন, তখন গার্হস্থ্য কাজে তাকে সাহায্য করার মতো আর কেউ নেই। দূর সম্পর্কের আত্মীয় বলে, এবং সূর্যবানুও সদ্য স্বামীহারা বলে অনেকটা জোর খাটিয়ে তাকে নিয়ে আসতে পেরেছেন। সূর্যাবানুর মাকে কথা দিয়েছেন, আজীবন তার ভরণ-পোষণ করবেন।

অসুখ-বিসুখ হলে বের করে দেবে কি-না জিজ্ঞেস করলে আরজুদা ওয়াদা করেন, তখন তার চিকিত্সার ব্যবস্থা করবেন। মৃত্যু হলে কাফন-দাফন ও কোরআন খতমের আয়োজনও করবেন। কখনো যদি সূর্যবানুর কন্যা চন্দ্রবানু ফিরে আসে তার মায়ের কাছে, আরজুদা হলফ করে বললেন, তিনি মায়ের সাথে মেয়েকেও আশ্রয় দেবেন, মেয়ের বিয়ের বন্দোবস্ত করবেন।

সূর্যবানু ও লাইলি একই পেশার হলেও বয়সের ব্যবধানের কারণে পেশাগত ঈর্ষা তেমন দানা বেঁধেছে কি-না আচরণে স্পষ্ট হয়ে উঠেনি। কিংবা উভয়েই দক্ষতার সাথে তা লুকিয়ে রেখেছে।

ঘামটা একটু কমে এসেছে। বুকের ধুকধুকও। হবেই তো। জীবনে প্রথম। তবে জিনিসটা লজ্জার।

টাকা চুরি, স্বর্ণ চুরি, মোবাইল ফোন চুরি—এগুলোর এক ধরনের গুরুত্ব। নগদ টাকাটা বেশি কাজে লাগে। স্বর্ণ কিংবা মোবাইল বেচতে হয় অর্ধেক দামে। যার জিনিস তিনি বলতেও গলায় জোর পান। কিন্তু এক প্যাকেট ওই জিনিস বেচতে গেলে কত দাম পাওয়া যাবে আল্লাহতায়ালা জানেন। ঢাকা শহরে আরও দু-চারজন মানুষের সাথে তো তার চেনাজানা হয়েছে, কিন্তু কেউ ওই জিনিস চুরি করেছে কিংবা কারও ওই জিনিস চুরি হয়েছে, লাইলি শোনেনি।

এটা তো পুরোপুরি নিজের জন্য। লাইলির ব্যাপারটা এখনো শুরু হয়নি, আরও দশদিন দেরি। পুরোনো কাপড় আর ত্যানা দিয়ে আর কতদিন চালাবে। টাকা-পয়সা কমবেশি একদিন হবে। কিন্তু ততদিনে তো বুড়ি হয়ে যাবে। বুড়ি হয়ে কি আর এসব স্বাদ আহলাদ মেটানো যাবে? বয়স হয়ে গেলে তো সবই বন্ধ হয়ে যায়। তখন স্যানেটারি টাওয়েল কোন কাজে লাগবে?

লাইলি আলুর চপ ভাজায় মন বসাতে পারছে না। ভয় হচ্ছে, পুড়ে যেতে পারে। আরও ভয় হচ্ছে এখনই যদি লাইজু ভাবি এসে বলেন, চল, তোর রুমে চল, তারপর যদি বলে বসেন, খোল তোর ট্রাঙ্ক খোল—তখন কী হবে?

প্যাকেটটা হাতে নিয়েই তিনি চেঁচাতে শুরু করবেন, ওহ মাই গড! টাকা-পয়সা সোনাদানা চুরির পর তুই এখন এগুলো চুরি শুরু করেছিস? আশ্চর্য! তোর চেহারা দেখে মনে হয় না, ভাজা মাছ উল্টে খেতে পারিস—আর তলে তলে তুই এমন গোপন জায়গায় হাত দিয়েছিস!

এ অবস্থায় লাইলিকে তো মাথা নিচু করেই থাকতে হবে। ততক্ষণে তিনি চেঁচাতে শুরু করবেন, এক্ষণ পুলিশের আইজিকে ফোন কর, পুলিশ কমিশনারকে ফোন কর, এসপিকে ফোন কর, ওসিকে ফোন কর, এই ডাকাতটাকে সাত দিনের রিমান্ডে নিক। বাপ বাপ করে সব বলে দেবে।

এ অবস্থা থেকে একমাত্র কাকাতুয়াই তাকে রক্ষা করতে পারে। হয়তো বলবে, এটাকে চুরি বলছ কেন? একটা প্যাকেট না বলেই নিয়েছে এই তো? এতে দোষের কী দেখলে? ফার্মেসিতে গেলে আমিই তো লজ্জায় বলতে পারি না। সেজন্যই তো মাকে দিয়ে আনাই। ও কীভাবে আমাকে বলবে, একই সমস্যা তো লাইলিরও। ওর সাথে মা থাকলে না-হয় মাকে দিয়ে চাওয়াতে পারত।

এজন্যই কাকাতুয়া এই বাড়িতে সবচেয়ে ভালো মানুষ।

কাকাতুয়া একেবারে দশে দশ। ভাবি দশে সোয়া তিন। টেনেটুনেও পাস করে না। কিন্তু বাবু ভাই দশে সাড়ে নয়।

আর এই বাড়ির আসল মালিক বেগম আরজুদা মান্নান। লাইলি আঙুলের কড় গুনে, পাঁচে থামে। তারপর বলে, দশে সাড়ে পাঁচ। তিনি অনেক টাকার মালিক। যাদের টাকা বেশি তাদের অন্তত দু-নম্বর বেশি দিতেই হয়, নতুবা তিনি পেতেন দশে সাড়ে তিন। পুরুষ হয়েও মিনমিনে স্বভাবের হওয়ায় লাইলি আবদুল মান্নানকে ফেল করিয়ে দেয়। দশে আড়াই। এই বাড়ির সবচেয়ে ছোট্ট রুমটিতে আরও একজন বসবাস করেন। নাম চপল। বয়সে কাকাতুয়ার বড়, পড়াশোনায় কাকাতুয়ার চেয়ে কম না বেশি জানা নেই। স্কুল-কলেজে যেতে দেখা যায় না। সকাল দশটা পর্যন্ত ঘুমায়, এগারটায় বাসা থেকে বেরোয়, রাত এগারটায় ফিরে আসে। সকালের নাস্তা আর রাতের খাবার তার রুমেই দেওয়া হয়, এই দায়িত্ব সূর্যবানুর। লাইলির মতো কম বয়সী মেয়ে এ ধরনের যুবকের ঘরে পাঠানো ঠিক নয়, তাই আর যাওয়া হয় না। চপল বেহালা বাজায়, নাটক করে। তাকে কত নম্বর দেওয়া যায় লাইলি বুঝে উঠতে পারে না। চপল কি আর লাবু ভাইয়া? তাকে কত দেবে, লাইলি গুনতেই থাকে, গুনতেই থাকে।

দুই

তোতা মিয়া এমনিতে ছেলে ভালো, কিন্তু কথাবার্তা খাটাশের মতো। খাটাশ যে এক ধরনের জন্তু—এটা লাইলি জানে, কখনো দেখেনি; হাতির সমান না ইঁদুরের সমান তার কোনো ধারণাই নেই। খাটাশ কেমন করে কথা বলে তাও সে জানে না। তবুও এই উপমাটি তার মনে হলো তোতার জন্য লাগসই।... তোতা মিয়া ঠোঁটের কোনায় সিগারেট এনে মাথার সামনে ফুলে থাকা চুলে আলতো করে ঝাঁকি মেরে বলল, খোদার কসম বলছি লাইলি, তোমার পেটে আমার বাচ্চা নড়ছে। আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি।

লাইলি বলল, আমি টের পেলাম না আর আপনি দেখতে পাচ্ছেন, ভালোই শোনালেন। তা আপনার বাচ্চা ঢুকল কোন দিক দিয়ে?

দিক একটাই। আর তিনটা মাস। নান্নু মিয়ার মেস ছেড়ে দুই রুমের একটা বাসা নেব। তখন টের পাবা বাচ্চা কোন দিক দিয়া।

তোতা মিয়া বাক্যটা অসমাপ্ত রেখে বাম হাতে তর্জনী আর বৃদ্ধাঙ্গুলে একটি বৃত্ত বানিয়ে ডান হাতের তর্জনী এর ভেতরে ঢোকায়, বের করে এবং মিটিমিটি হাসে। তখনই লাইলি বলে, আপনি এক নম্বরের খাটাশ।

খাটাশ গালটা তোতা মিয়ার ভালোই লাগে। সে জন্যই আবার জিজ্ঞেস করে কী বললে খাটাশ?

তারপর ফিক করে হেসে ওঠে। বলে, ঠিকই বলেছ।

খাটাশের সাথে তুলনীয় হওয়ায় তার সন্তুষ্টির কারণ এই নয় যে, উপমাটি তার খুব ভালো লেগেছে কিংবা এটা শুনে সম্মানিত বোধ করেছে। তার অঙ্গুলি সঞ্চালন যে সঠিক বার্তাটি পৌঁছে দিতে পেরেছে এবং বার্তাটি সঠিকভাবে গৃহীত হয়েছে খাটাশ গালটিই তা নিশ্চিত করেছে।

তোতা মিয়ার সাথে দেখা কাকাতুয়ার কলেজের কাছে।

আরজুদা মান্নান... এমএ এলএলবি যেদিন দু-নম্বর গাড়িটা নিয়ে বের হন সেদিন কাকাতুয়াকে রিকশায় কলেজে যেতে হয়। রিকশায় একা যাওয়া নিষেধ আছে। এগুলো কড়া আইন।

আরজুদা মান্নান, নিজেই কড়া কিছু আইনের মনিটরিং করেন। তার অন্যতম কয়েকটি হচ্ছে কাকাতুয়া সংক্রান্ত : গাড়ি না থাকলে রিকশায় কলেজে যাওয়া আসার সময় লাইলি তার সফরসঙ্গী হবে। এমনকি গাড়ি নিয়ে বাইরে গেলেও রাত আটটার মধ্যে কাকাতুয়াকে বাড়ি ফিরতে হবে। কাকাতুয়া প্রতিদিন (তার সুবিধানুযায়ী সময়ে) এক গ্লাস দুধ খেয়েছে কি-না লাইলির তা নিশ্চিত করতে হবে এবং এই দুগ্ধসেবন আইন অমান্য করলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব জানাতে হবে। ছেলেমেয়ে ছাড়া আর সবাই তাকে ম্যাডাম সম্বোধন করবে।

কাকাতুয়াকে কলেজে নামিয়ে দিয়ে কোনোদিন ফিরতি রিকশা নেয়। অধিকাংশ সময়ই পা চালিয়ে বাড়ি ফেরে। রিকশা ভাড়া যেটা বাঁচল তা দিয়ে নিজের স্বাদ-আহলাদ মেটায়। ম্যাডাম, লাইলির নামে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট করে দিয়েছেন, বেতনের টাকাটা সেখানেই জমা হয়। যেহেতু তার ওপর মা-বাবা-ভাই-বোন—সোজা কথা সংসার নির্ভরশীল নয়, তার টাকা পাঠানোরও প্রয়োজন হয় না। সুতরাং টাকা জমতে থাকুক। তিনি বলেছেন, ওষুধপত্রের প্রয়োজন হলে কাকাতুয়াকে বলবি, এনে দেবে। দু-চার টাকা হাতখরচ লাগলে বলিস, আমিই দেব। আর সব কাজের বুয়াদের মতো পান খাওয়া অভ্যাস করিস না, আমি পানটা একেবারেই সহ্য করতে পারি না।

কাকাতুয়া কলেজের গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকেছে—এটা নিশ্চিত হবার পর লাইলি রাস্তা পার হয়। ওপারে বড় ভবন বেশি হওয়ায় ফুটপাতে ছায়াও বেশি, মানুষও বেশি। লাইলি ধীরগতিতে এক ভবনের ছায়া ডিঙ্গিয়ে অন্যটার ছায়ায় পা রাখে। তারপর আরও একটার। এটার নিচতলায় শাড়ির দোকান। ধবধবে ফরসা ধারালো নাকের একটি ম্যানিকিনকে গাঢ় সবুজ কাতান পরিয়ে রাখা হয়েছে। লাইলি কাচের দেয়ালের বাইরে ম্যানিকিনের মুখোমুখি দাঁড়ায়। নিষ্প্রাণ মেয়েটা তার চেয়ে অন্তত এক হাত বেশি লম্বা। শাড়িটা বেশ মানিয়েছে।

বাড়ির পথে পা চালাবার আগে আর একবার সমস্ত কাচের দেয়ালের ভেতর দৃষ্টি ফেলে, পাশ থেকে আচমকা একটি পুরুষ কণ্ঠ বলে ওঠে, কী, পছন্দ হইছে?

লাইলি ভ্যাবাচ্যাকা খায়। শাড়ির দোকানদাররা আজকাল ফুটপাথেও দাঁড়িয়ে থেকে খদ্দের ধরতে শুরু করেছে নাকি। লাইলি দ্রুত পা চালায়। সরু ও বেশ ফরসা দেহ, ছোট চুল, জিন্স এতোটাই নিচে পরেছে যে, নিতম্বের আভাস দেখা যায়, তবে কালো চেহারাটা বেশ মিষ্টি—এমন একটা ছেলে ঘাড় ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করে, পছন্দ হয়নি?

লাইলি, বিড়বিড় করে বলল, বদমাইশের বাচ্চা।

ছেলেটি আরও দ্রুত হেঁটে অন্তত পঞ্চাশ হাত এগিয়ে গিয়ে ঘাড় ফিরিয়ে আর একবার লাইলির দিকে তাকাল।

লাইলি আরও একবার বিড়বিড় করে বলে, পছন্দ হলে কিনে দিবি?

যুবক তার কথা শোনেনি।

আরও একদিন দ্রুত হেঁটে বাড়ি ফেরার সময় সেই একই কণ্ঠ, এত তাড়া কিসের, ট্রেন ছেড়ে দিল নাকি?...

এবার কথা পেছন থেকে। সেই একই স্বর। প্যান্টও পুরোনাটাই, উপরেরটা ভিন্ন। সেদিন সম্ভবত কালো টি-শার্ট ছিল, এখন গোলাপি।

আশ্চর্য! ব্যাটা ছেলে আবার গোলাপি রংয়ের কাপড় নাকি?

যুবক দ্রুত তাকে ডিঙিয়ে যায়। যাবার সময় ফিস ফিস করে জিজ্ঞেস করে,

কোন ট্রেন—উপবন না ইসা খা এক্সপ্রেস।

লাইলি যথারীতি বালিকাসুলভ কাজটি করে বসল। মুখে থুতু জমিয়ে নিজের বামদিকটাতে দেয়ালের দিকে থুতু ফেলে বলল, অসভ্য।

যুবকও জানে, সে যদি ট্রেন ছাড়ার পরিবর্তে লঞ্চ ছাড়ার কথা বলত, একই জবাব পেত—অসভ্য। হাজারো কথার একটিই জবাব, অসভ্য।

যুবক প্রশংসা করেও দেখেছে। বলেছে, আপনি খুব সুন্দর।

'সুন্দর' শোনার পর চেহারাটা কোথায় লালচে হয়ে উঠবে তা না হয়ে আষাঢ়ের মেঘাচ্ছন্ন আকাশের মতো হয়ে গেল এবং সেই জবাবটিই বেরিয়ে এল—অসভ্য। অবশ্য এটাও ঠিক, সবার মুখে অসভ্য কথাটিই মানায় না।

এই মেয়েটির কথা অবশ্যই আলাদা। এমন ছটফটে একটি মেয়ের মুখে অসভ্যের চেয়ে মিষ্টি কোনো কথা সে প্রত্যাশাও করেনি।

মেয়েটি যে সায় দিয়েছে এটাই বড় কথা। যুবক দ্রুত রাস্তা পেরিয়ে নিজের কাজে চলে যায়। তারও তো ব্যস্ততা কম নয়।

তৃতীয় দেখা চার-পাঁচ দিন পর। কলেজে যাবার সময় কাকাতুয়ার পাশে উঠে বসতেই চোখে পড়ে গোলাপি টি-শার্ট এবং সম্ভবত নীল প্যান্ট পরা যুবক রাস্তার পাশের অস্থায়ী সিগারেটের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আয়েশ করে সিগারেট ফুঁকছে আর তার দিকে সরাসরি তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে। ব্যাপারটা কাকাতুয়ার চোখে পড়ে যেতে পারে—এই আশঙ্কায় হুড উঠিয়ে দেবার চেষ্টা করল।

কাকাতুয়া বলল, এখন তো তেমন রোদ নেই, হুড উঠাচ্ছিস কেন?

লাইলি বলল, রোদে আপনার মুখের রংটা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

এ জন্য তোর ভাবতে হবে না। ইউরোপের ফরসা মেয়েরা মুখের আর গায়ের রং তামাটে করার জন্য কড়া রোদে শুয়ে থাকে।

গায়ের রংও?

পেন্টি আর ব্রা পরে দেখিসনি বিচ-কটে শুয়ে পড়ে?

আস্তাগফিরুল্লাহ।

রিকশা কলেজগেটে থামে। কাকাতুয়া গেটের ভেতর ঢুকে যেতেই দেখে, গেট থেকে বেশ কিছুটা দূরে একটা নতুন রিকশায় এক পায়ের ওপর আরেক পা দোলাচ্ছে সেই যুবক। তার মানে তাকে ফলো করছে।

আমাকে ফলো করা এত সোজা না, আমিও ডজ দিতে জানি। কথাগুলো নিজেকে শুনিয়ে লাইলি টুপ করে কলেজের গেটের ভেতর ঢুকে পড়ে। পরনের পোশাকটা ভালো হওয়ায় আর ছাত্রীদের নির্দিষ্ট কোনো ড্রেস না থাকায় বাধা পায়নি। কলেজের ঠিক পেছন দিকটাতে একটা বড় ডোবা, কয়েকটা বড় বড় গাছ। লাইলি একটা গাছের গুড়িতে কিছুক্ষণ বসে থাকে। আরজুদা মান্নানের পুরোনো বুয়া খালাম্মা ডাকত। কিন্তু রাজনীতিতে যোগ দেবার পর তিনি বাড়ির সংস্কৃতিতে কিছু পরিবর্তন এনেছেন, তার একটি হচ্ছে ম্যাডাম শব্দটির পুনঃ পুনঃ ব্যবহার। ম্যাডাম সম্বোধন এক ধরনের ক্ষমতার সৃষ্টি করেছে। লাইলি ডাকছে খালাম্মার বদলে ম্যাডাম, সূর্যবানু আগে আপা ডাকত, এখন ডাকে ম্যাডাম, দূর সম্পর্কের আত্মীয়তার সূত্রে ড্রাইভার ডাকত নানি, এখন ডাকে ম্যাডাম।

তবে সাহেবকে পুরোনো সম্বোধনেই সবাই ডাকছে, খালু, ভাইজান, নানা। এ নিয়ে তার মাথাব্যথা নেই। যা ইচ্ছে ডাকুক, কিন্তু যার যা কাজ তা যেন পরিপাটিভাবে করে। বুয়াদের হাতের নখ বড় কি-না তিনি আগে মাঝেমধ্যে চেক করতেন। এখন তার দিন শেষ। লাইলি তার স্টাইলের অংশ হিসেবে বাম হাতের কানি আঙুলের নখটা বাড়ার সুযোগ দিয়েছিল। কিন্তু লাইজু ভাবি আলটিমেটাম দেন : চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে নখ কেটে যতটা সম্ভব নামিয়ে আনতে হবে। নতুবা...

নতুবা চাকরি চলে যাবে—এমন কিছু তিনি বলেননি। কারণ, চাকরিতে রাখা না রাখা পুরোটা ম্যাডামের ব্যাপার। সেজন্যই নতুবা পর্যন্ত বলে নিজের রুমে চলে গিয়েছেন।

ম্যাডামের আদি বাড়ি পাবনা হওয়ায় তাকে দলের বিভাগীয় সম্মেলনে রাজশাহী যেতে হয়েছে। গাড়ি নিয়ে গেছেন, ফিরতে আরও তিন-চার দিন। মানে পুরোটা সপ্তাহই কাকাতুয়ার সাথে কলেজে আসা-যাওয়া করতে হবে। লাইলি কোনো কাজ জমিয়ে রাখে না, সারাদিন কাকাতুয়ার কলেজে ডোবার পাশে বসে থাকলেও বাড়িতে তেমন অসুবিধে হবে না।

লাইলি যখন গেট থেকে বের হতে যাচ্ছে, দারোয়ান আটকায়। জিজ্ঞেস করে কোন ইয়ার? কোন সেকশন? ছুটি নিয়েছেন?

লাইলি জবাব দেয়, আমি স্টুডেন্টের সাথে। কাকাতুয়া আপাদের বাসায় থাকি। বুঝলেন, আমি কলেজে পড়ি না।

সাথে সাথে দারোয়ান আপনি থেকে তুইতে নেমে আসে। জিজ্ঞেস করে পড়াশোনা কয় ক্লাস?

নয় ক্লাস, নাইন পর্যন্ত, এইট থেকে নাইন-এ।

আমিও তো এইট।

বুঝলাম, খোলেন এখন যাই।

দারোয়ান বলল, আমার পারমিশন ছাড়া কলেজে ঢুকতে পারবি না। অবশ্য তুই বললে পারমিশন দেব। পারমিশন দেওয়া না দেওয়া আমার ব্যাপার। এটা আমার পাওয়ার। অবাঞ্ছিত কেউ ঢুকলে আমার সাজা হবে। কে অবাঞ্ছিত আর কে অবাঞ্ছিত নয়, আমি নিজেই ঠিক করি। ঠিক আছে তুই গেটে টোকা দিস, ডাকিস আইয়ুব ভাই। আমার নাম আইয়ুব খান, দিনের ডিউটি আমার, রাতের ডিউটি ফজল আলীর। ফজল রাতকানা, কী ডিউটি করে সেই জানে। ভাইস প্রিন্সিপাল ম্যাডামের আত্মীয়, কেউ কিছু বলে না। তোর নামটা কইলি না?

দরজা খোলেন, অপরিচিত মানুষকে আপনি করে বলতে শেখেন। তখন নাম বলব। দারোয়ান বড় গেটের ভেতরের ছোট দরজা খুলে বলল, কাজের বুয়ার তেজ কত! আর একদিন কলেজে ঢুকবি চুরির মামলায় ফাঁসাইয়া দিমু।

লাইলি গেটের বাইরে বহুদূর পর্যন্ত অপেক্ষমাণ সবগুলো রিকশার দিকে তাকাল, সিটের পর গোলাপি টি-শার্ট পরা একজনও বসে নেই। কেউ পা নাচাচ্ছে না।

তাকে না দেখতে পাওয়ায় লাইলির আতঙ্ক অন্তর্হিত হবার কথা। কিন্তু সে অস্বস্তিবোধ করতে শুরু করল। লোকটা গেল কোথায়? একটা জলজ্যান্ত মানুষ!

লাইলি রিকশা নেয়। রোদ যথেষ্ট কড়া হওয়ার পরও হুড ওঠানোর কথা বলেনি, রিকশাওয়ালা হুড উঠাতে চেয়েছে, দেয়নি। মনে হয়েছে, পেছনের রিকশায় সে তাকে ফলো করছে। বাড়ির গেটে রিকশা থামে, লাইলি নেমে আসে, সময় নিয়ে ভাড়া দেয়। কোনো রিকশা পেছন পেছন এসে থামেনি।

কিছুক্ষণ আগের অস্বস্তি মনখারাপে পরিণত হয়। মন খারাপ হলে ক্ষুধা মরে যায়, সুস্বাদু খাবারকেও মনে হয় কচি করলার রসে চুবানো কুখাদ্য। একসময় ঘুমিয়ে পড়ে। ঘুম আচমকা যখন ভাঙে তখন সোয়া চারটা। অথচ ঠিক চারটার মধ্যে কলেজের গেটে দাঁড়িয়ে থাকার কথা। চারটায় কলেজ ছুটি হয়ে গেছে। কাকাতুয়া সফরসঙ্গী ছাড়াই স্বাধীনভাবে বাড়ি ফেরে। লাইলি বলে, ম্যাডাম জানতে পারলে আমার চাকরি খতম।

আমি যে বলব না, নিশ্চিত থাকতে পারিস। তুই নিজেই আবার বলে ফেলিস না, তোর মাথায় ঘিলুর কিছু ঘাটতি আছে।

কিছুটা ঘাটতি থাকতেই পারে। আর কিছুটা বেশি থাকলে আমার প্রাইম মিনিস্টার হওয়া কে ঠেকায়! লাইলি ভাবে, তখন তো গেটের দারোয়ান আর গোলাপি টি-শার্ট পরা কাউকে মানুষই মনে করতাম না।

পরদিন চতুর্থ সাক্ষাত্। কাকাতুয়াকে কলেজগেটে ঢুকিয়ে দিয়ে পায়ে হেঁটে ফেরার পথে একটা সেলুনের ভেতর থেকে কলাপাতা রঙের শার্ট পরা সেই একই যুবক তার সামনে আবির্ভূত হয়ে সালাম দিয়ে বলল, এত ডাট কিসের?

লাইলি চোখ তুলে বলে, সামনে থেকে সরেন।

যুবক বলল, বাড়ির অবস্থা ভালো। বংশও ভালো।

লাইলি বলে, আহারে আমার নবাবজাদা! আপনার বংশের গুষ্টি কিলাই। সরেন রাস্তা ছাড়েন।

যুবক বলে, আমার নাম তোতা মিয়া সরকার।

তিন

তোতার ভালো লাগে। মেয়েটার তেজ আছে। ম্যাদামারা ঘোড়ায় সওয়ার হওয়ার কোনো কৃতিত্ব নেই। যে কেউ পারে। তেজি ঘোড়ায় সওয়ার হতে পারে কজন? তোতা মিয়ার স্বপ্নের আলো-আঁধারিতে কোত্থেকে এসে হাজির হয় দুরন্ত পঙ্খীরাজ। তোতা মিয়া লাগাম টানে, কিন্তু পঙ্খীরাজের গতি শ্লথ না হয়ে আরও বেড়ে যায়।

তোতা মিয়ার সময় কম। এর মধ্যেই সকালের দিকে এক-দু-ঘণ্টা বের করে নিতে হয়। মেয়েটি কখনো আসে, কখনো আসে না। তেজি মেয়ে তো এজন্য সময় বেশি লাগছে। পঞ্চম সাক্ষাতের দিন বের হলো ফুজি ফটো স্টুডিও থেকে। বাইরে বেশ গরম। ভেতরে এয়ার কন্ডিশন্ড শীতল হাওয়া। স্বচ্ছ কাচের দেয়ালের ভেতর দিয়ে বাইরে তাকিয়েছিল। দ্রুত সামনে এসে বলল, এত তেজ ক্যান?

লাইলি দ্রুত শুরু থেকে শোনা সবগুলো কথা মনে করে। কী আশ্চর্য! তাকে আপনিও বলেনি, তুমি কিংবা তুইও না। ভেবেছিল, তুই কি তুমি বললে দারোয়ানকে যেভাবে শুনিয়েছে এমন একটা কড়া কথা বলে দেবে।

কিন্তু তা বলতে না পেরে ফস করে অন্য একটা কড়া কথা বলে ফেলল, গোলাপি শার্ট পুরুষ মানুষ পরে? ছি ছি। ভালো বংশের মানুষের এই রুচি।

তোতা মাথা নিচু করে ফেলল। ভালো বংশের পুরুষ মানুষদের কোন রঙের শার্ট পরার কথা তোতা ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। তবে তোতা বেশ বুঝতে পারে 'অসভ্য' শোনার স্তরটি নিরাপদেই পার হয়ে এসেছে।

অবশ্য এটাও সত্য, শহুরে আবহাওয়ায় এই বয়সী মেয়েরা কখন কোন কথা বলে তার সবটার মানে উদ্ধার করা তার মতো মফঃস্বলে বেড়ে ওঠা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। নতুবা মালিবাগের সেকেন্ড ক্লাস চেহারার একটা টার্গেটের কারণে এত ভোগান্তি হবে তা কি কখনো ভেবেছে।

তোতা ভেবেছে, দোকান থেকে সদাইপাতি নিতে আসা স্পঞ্জের স্যান্ডেল পায়ের মেয়েটি কোনো বাসার কাজের বুয়াই হবে। প্রথম দিনই মেয়েটি এত সাড়া দিল যে, দ্বিতীয় দিনই সে প্রেম নিবেদন করলে এমন একটা হাসি উপহার দিল যে, তার মানে কবুল ছাড়া আর কোনো কিছুই ভাবার সুযোগ নেই। তৃতীয় দিন পাশাপাশি হেঁটে মেয়েটির হাতে একটি মোবাইল ফোন সেট দিয়ে বলল, আমার নাম, নম্বর সেইভ করা আছে, তোতা মিয়া সরকার। যখন কথা বলার সুযোগ পাবে একটা মিসকল গেলেই আমিও সুযোগ বুঝে কলব্যাক করব।

মেয়েটি থ্যাঙ্ক ইউ বলল না।

কিন্তু যখন বলল, 'সো নাইস অব ইউ' খটকা তখনই। ভুল দরজায় টোকা দেয়নি তো?

মালিবাগ চৌধুরীপাড়ায় পুরোনো দিনের বাড়ি খান ভিলার সামনে এসে একটু দূরে দাঁড়িয়ে সিগারেট ফুঁকতে থাকা চার-পাঁচজন যুবকের একজনকে ডাকল, এনাম ভাই, এই যে দেখেন আমার রোমিও।

অমনি যুবকরা এসে তাকে ঘিরে ধরল। নেতা গোছের যুবক বলল, ন্যান্সি, কতটুকু টাইট দেব?

খান ভিলার গেটের ভেতর ঢুকতে ঢুকতে ন্যান্সি বলল, সাবধান এক ফোঁটা রক্ত যেন বের না হয়।

যুবকদের একজন তার অণ্ডকোষ ও লিঙ্গ সজোরে চেপে ধরে জিজ্ঞেস করল, কেমন লাগছে বাজান? ন্যান্সি আপার পেছনে লাগতে গেলে কেন? আমরাই তো পাত্তা পাই না।

তোতার চোখ বেড়ে অশ্রু গড়াতে লাগল। মনে হলো অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাবে। তখনই নেতৃস্থানীয় যুবক কষে তার নিতম্বে লাথি মারলে অনেকটা দূরে গিয়ে উপুড় হয়ে পড়ে গেলো। তবুও ভালো অণ্ডকোষ ও লিঙ্গ দানবীয় মুষ্টি থেকে মুক্তি পেয়েছে। তোতা জ্ঞান হারায়নি। কিছুক্ষণ পর যখন উঠে দাঁড়ায়, শাস্তিদাতাদের একজনও আশেপাশে নেই। তোতা খান ভিলার দিকে তাকায়। তার মনে হচ্ছিল, এখন দেখবে দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে দাঁত কেলিয়ে হাসছে ন্যান্সি নামের এক নির্মম যুবতী। লম্বা বারান্দায় কেবল একজন বৃদ্ধ পুরুষ মানুষ, গাল ভর্তি সাদা দাড়ি, কিন্তু পাঞ্জাবিটা গোলাপি। এমন একজন বয়স্ক লোকের গোলাপি পাঞ্জাবি অণ্ডগোষের ব্যথা ছাপিয়ে তাকে একটু ভালো লাগার ছোঁয়া দিল। মাথা ঘোরানোটা কমতেই তোতা মিয়া দ্রুত মীরবাগ চৌধুরীপাড়া ছেড়ে রামপুরা হয়ে দৃষ্টির আড়ালে চলে গেল।

ছ-মাস আগে কালো চশমা পরে সেখানে গিয়েছিল। খান ভিলা গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে, এখানে তৈরি হচ্ছে বহুতল কম্পার্টমেন্টস বিল্ডিং, নাম কঙ্কাবতী অ্যাপার্টমেন্টস।

মারটা খুব বড় কিছু নয়, মোবাইল ফোনটা ফেরত পাবার আর কোনো সম্ভাবনা না থাকায় তোতা একটু কষ্টই পেল। সেদিনই চলে যাবার সময় ফিরে ফিরে খান ভিলার দিকে তাকিয়ে নাটকীয়ভাবে বলতে চেয়েছে, ন্যান্সি, এতটা নির্মম না হলেও পারতে।

ন্যান্সি তাকে যে শিক্ষা দিয়েছে, তার বেশ খানিকটা গ্রহণ করার কারণেই তাড়াহুড়ো করে এগোতে যায়নি। বুঝতে চেয়েছে— যদি সাড়া দেয় তা কি ভালোবাসার, না তাকে আরও শিক্ষা দেবার। এই মেয়েটি অবশ্য দেখতে অনেক ভালো। ন্যান্সি যদি সেকেন্ড ক্লাস হয়, সে ফাস্ট ক্লাসেরও এক কাঠি ওপরে।

আবারও ভুল হয় এই আশঙ্কা থেকেই তোতা জিজ্ঞেস করল, শার্টের কোন রং আপনার পছন্দ? সাদা?

গোলাপি আর কলাপাতা রং আমার পছন্দ হয় না।

তোতা ঢোক গিলে, তার মনে হয় অপারেশনটা সাফল্যের দিকে এগোচ্ছে। নতুবা তার কলাপাতা রং শার্টের কথা মনে রাখল কেমন করে?

আরজুদা মান্নান বিভাগীয় সম্মেলন থেকে নিজের গাড়িতে ফিরতে পারেননি। রাজশাহী থেকে ঢাকার পথে পঁচিশ কিলোমিটার আসার পরই ইঞ্জিনে আগুন ধরে যায়। ড্রাইভার পাকা বলে দ্রুত রাস্তার একপাশে গাড়িটা থামিয়ে দেয়। বনেট তুলতেই আগুন বাতাসের অক্সিজেন পেয়ে দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে। আরজুদা মান্নান দ্রুত নেমে আসেন। রাস্তার লোকজন সাহায্য করতে এগিয়ে আসে। আগুন নেভে। ড্রাইভারের হাতে কিছু টাকা দিয়ে নিজে প্রতিমন্ত্রীর গাড়িতে উঠে বসেন। গাড়ি বহরে তার পেছনে একটি গাড়িই ছিল, সেটিই প্রতিমন্ত্রী। প্রতিমন্ত্রী ফোনে দলের স্থানীয় মহাসচিবকে কোনো গাড়ির সাথে বেঁধে ইঞ্জিন পোড়া গাড়ি ঢাকায় আনার নির্দেশ দেন। মাওয়া ঘাটে এসে প্রতিমন্ত্রী একবারই তার বাম ঊরুর ওপর হাত রাখেন। কিন্তু তার তেমন সাড়া না পাওয়ায় তিনি আর এগোননি। প্রতিমন্ত্রী ইউরোপে ন-মাস পড়াশোনা করেছেন এবং শিখেছেন নারীর স্পষ্ট সম্মতি ছাড়া এগোনো বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।

হঠাত্ লাগা আগুন কাকাতুয়ার গাড়ি পাওয়ার সম্ভাবনা আবারও পিছিয়ে দিল। সুতরাং লাইলির সাথে যুবকের দেখা হবার সম্ভাবনা রয়েই গেল।

ষষ্ঠ দিন তোতা কলেজের গেটের কাছেই দাঁড়িয়ে ছিল। চোখাচোখি হবার পর লাইলি গাম্ভীর্য ধরে রাখতে পারেনি, ঠোঁটে একটু হাসি ফুটে উঠেছে। কাকাতুয়া গেটের ভেতর ঢুকে যাবার পর লাইলি চোখ ঘুরিয়ে তাকে একবার দেখে মাথা নুইয়ে ফিক করে হেসে ফেলে—এক ধমকে সরকার রং বদলে ফেলেছে। তোতার গায়ে সাদা ফুল শার্ট।

লাইলি রাস্তা পেরিয়ে বাড়ির পথে হাঁটতে থাকে। তোতা তখনো রাস্তা পার হয়নি দেখে গতি শ্লথ করে। অমনি একটি মজার কথা মনে পড়ে। কাকাতুয়া বেভুলা মনের হলে কী হবে মাঝে মাঝে মজার কথা বলে। —একবার লাইলির বয়সী এক বুয়াকে বেগম সাহেব পাউরুটি আনতে দোকানে পাঠিয়েছেন। কিন্তু বুয়ার ফিরতে অনেক দেরি হওয়ায় তিনি তার গালে একটা চড় কষিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, দেরি করলি ক্যান?

কী করমু খালাম্বা, একটা শয়তান বেটা আমারে ফলো করতেছিল।

তিনি বললেন, তুই তখন তাড়াতাড়ি চলে এলেই পারতি।

কেমনে আসমু খালাম্মা, শয়তান বেটা যে আস্তে আস্তে হাঁটতেছিল।

মজার কথাটা মনে হওয়ায় আবারও হাসি পেল। আজ কি সে নিজেই তোতা মিয়া সরকারের রাস্তা পারাপারে দেরি দেখে মজার কাহিনির পুনরাবৃত্তি করছে?

এটাও বোধ হয় সচেতন তোতার একটি পর্যবেক্ষণ—দেখি মেয়েটি কী করে। দ্রুত পা চালিয়ে তাকে ধরার সুযোগ না দিয়ে বাড়ির দিকে ছুটছে, না না এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখছে তোতা আসছে না কেন।

তার শ্লথ গতি তোতাকে আশ্বস্ত করে। তাহলে কথাটা বলা যায়। কোন কথা—আমি তোমাকে ভালোবাসি? পরক্ষণেই তোতা নিজেকে শোনাল, যত আস্তেই হাঁটুক এখনো সময় হয়নি। তাছাড়া ন্যান্সির চেহারাটাও মাঝে মাঝে চোখের সামনে ভেসে ওঠে। তখন একটু পিছুটান অনুভব করে—থাক না, এসবে জড়িয়ে বিপদ ডেকে আনার কী দরকার। তোতা বেশ দূর দিয়ে রাস্তা পার হয় যেন তখনই মেয়েটির চোখে না পড়ে। তারপর ধীরগতিতে পিছু নেয়। দূর থেকে দেখে হঠাত্ মেয়েটির পা দ্রুত চলতে শুরু করেছে। তার মানে সে আশা ছেড়ে দিয়েছে যে, তোতা মিয়া সরকার আর আসছে না। এটাই হয়, মানুষ যখন সরকারকে কাছে চায় পায় না।

কিন্তু তোতা প্রায় দৌড়ে তার কাছে পৌঁছায়। তার কাশির শব্দ শুনে তার পাশে তাকায়। ছোট্ট একটি ক্রোধ লুকিয়ে রাখতে পারে না। একটি ধমক দেবার সিদ্ধান্ত নিয়ে বলে ওঠে, এই গরমে ফুলহাতা শার্ট! সাদা হাফশার্ট নেই?

আলোচনার নিয়ন্ত্রণ চলে যায় মেয়ে মানুষের হাতে। তোতা বিড়বিড় করে। তারপর আরও খানিকটা পথ হেঁটে জিজ্ঞেস করে, বোন না কি? কলেজে কী পড়ে আইএ না বিএ?

আইএসসি পড়ে। খুব ভালো ছাত্রী। না, বোন হবে ক্যান। তার বোন হলে তো আর একজন বুয়া আমার মতোই আমার পেছনে আসা-যাওয়া করত।

একটা ভালো তথ্য পাওয়া গেল। ন্যান্সির মতো বাড়ির মালিকের মেয়ে নয়। অবশ্য ন্যান্সি আসলে কে সেটা বোঝার আগেই তো ঘটনাটা ঘটে যায়। মনে হতেই তোতার অণ্ডকোষে আতঙ্ক শিহরণ সৃষ্টি হয়।

তোতা বলল, যত ভালো ছাত্রীই হোক, দুজনে এক রিকশায় বসলে চোখ যায় আপনার দিকে।

খুশি লাগে, আপনি সম্বোধন করেছে। বলে, মানে?

মানে খুব সহজ। তিনি দেখতে সুন্দর। আপনি তার চেয়ে বেশি সুন্দর।

কী বললেন?

থাক, আজ যাই। কাজ আছে।

তোতা দ্রুত পায়ে উল্টোমুখি হাঁটতে থাকে। কথাটা বলতে পেরে বেশ স্বস্তি বোধ করছে।

লাইলি বিব্রত বোধ করলেও ঘরে ঢোকার আগে নিজকে শোনায়—কথা তো তার আর মিথ্যা নয়। সরকার ঠিকই বলেছে—রিকশায় কাকাতুয়ার সাথে বসলে পাশের রিকশার লোকটি তো তার দিকেই তাকায়, ভালো ছাত্রী তো গায়ে লেখা থাকে না। কিন্তু সৌন্দর্যের পুরোটাই গায়ে লেখা, দশজনে দেখতে পায়।

সপ্তম দিন তোতা তার হাতে তুলে দিল স্বচ্ছ হলদে কাগজে মোড়া এক প্যাকেট আমসত্ত্ব।

বলল, খান, খুব মজা। এটা ইন্ডিয়ার আমসত্ত্ব।

হাতে নিয়ে বলল, পাকিস্তানি আমসত্ত্ব নাই?

তোতা অন্য পকেট থেকে বের করে দিল এক প্যাকেট কিসমিস। বলল, এটা পাকিস্তানি।

বাংলাদেশি কিছু আনেন নাই?

তোতা মাথা নিচু করে বিনয়ের সাথে বলল, আপনার পছন্দ না-ও হইতে পারে। আমি বাংলাদেশি।

কথা তো দেখি ভালোই শিখছেন।

সেদিনই তার স্বর অনেক কোমল হয়ে এল। বলল, আমার নামটাও তো জিজ্ঞেস করলেন না?

আমার তো নামের দরকার নাই। মানুষটা দরকার। আমি অনেক মেয়ের নাম জানি—মৌসুমী, শাবনূর, পূর্ণিমা, মৌ, তিশা, জয়া, ইন্ডিয়ান মেয়েদের নামও জানি, তাতে আমার কী লাভ?

খালি তো নায়িকাদের নাম শোনালেন? হাসিনা-খালেদার নাম জানেন না?

আকস্মিকভাবে তার মুখ দিয়ে বেফাঁস কথা বেরিয়ে গেলো : পলিটিক্সের ড্যাশ মারি?

ড্যাশ মানে কী?

এটা এত খারাপ কথা যে, মুখে নেওয়া যায় না। ভদ্রমহিলাদের সামনে বলা যায় না। এই জন্য ড্যাশ বললাম।

ও আচ্ছা। তাই।

কিন্তু কথাটা এমনভাবে বলল যেন সে সবটাই বুঝেছে।

গায়ে পড়েই তাকে বলতে হয়, আমার নাম লাইলি। মিস লাইলি বেগম। ম্যাডামের বাসায় থাকি, কাজ করি।

আমার মূল কাজ লাবু ভাইয়ার দেখাশোনা করা। গাড়ি না থাকলে কাকাতুয়া আপুর সাথে কলেজে আসা, কলেজ থেকে বাসায় ফিরে যাওয়া। বিছানা ঠিকঠাক করা, রান্নায় এটা-ওটা সাহায্য করা। রান্নার জন্য অবশ্য সূর্যবানু আছে। ম্যাডামের দিককার দূর সম্পর্কের আত্মীয়। বদের হাড্ডি। সারাদিনই খায়। এক্ষুনি চুরি করে এক বাটি পায়েশ খেয়ে আধা প্লেট চটপটি আর তেঁতুল গোলা পানি, তারপর গরম পোলাও, সাথে চুলা থেকে তোলা তিনচার টুকরো মাংস। এত যে খায় শরীর কিন্তু একটুও ফুলে না। এখনো দেখতে বাঁশের কঞ্চির মতো। আর আমার একটু বাড়তি খেলেই শরীর লেগে যায়। শরীর ভার ভার লাগে। সূর্যবানু একটা বদের হাড্ডি। সিগারেটও খায়।

তোতা বলে, তা-ই নাকি? মেয়ে মানুষ সিগারেট খায়?

খায় মানে? বেদম খায়। খায় আর কাশে। নির্ঘাত্ যক্ষ্মা হবে। তখন কাশির সাথে রক্ত যাবে। আরও বদঅভ্যাস আছে, দাঁতে গুল ঘষে।

ম্যাডাম কেমন? মানে কেমন মানুষ?

লাইলি বলল, ফার্স্টক্লাস।

মানে?

ভালো খাবার দেন, থাকার জায়গা দেন, দামি কাপড় দেন। আমার কাপড় অধিকাংশই কাকাতুয়া আপুর। দু-একদিন পরার পর দিয়ে দেয়। এই জন্য আমার তেরো সেট জামাকাপড়। বেতনও দেয়। বিবাহের খরচ দেবারও কথা আছে।

বিবাহ কবে?

সেটা আল্লাহ জানে, তবে ভালো পাত্রের সন্ধান চলছে। আছে নাকি আপনার সন্ধানে? সরকারি চাকরি হলে ভালো হয়। বেতনটা রেগুলার। আমি আবার কষ্ট সহ্য করতে পারব না। আপনি কি চাকরি করেন?

তোতা বলল, আমি স্বাধীন মানুষ, কারও অধীনে চাকরি করি না। আমি যাকে বলে সেল্ফ এমপ্লয়েড।

মানে কী?

মানে খুব সহজ। নিজেই নিজেকে চাকরি দিই, নিজেই নিজের চাকরি খাই।

এখন চাকরি আছে না নাই?

আছে।

এ সময় এখানে ক্যান?

আমার ডিউটি দুটার পর। আগেও করি। ওভারটাইম পাই।

হাবভাব দেইখা তো মনে হয় না চাকরি করেন। বাপের জমিদারি আছে নাকি? থাকলে আমার পেছনে ক্যান? কারণ কী? প্রধানমন্ত্রীর মেয়ের জন্য প্রস্তাব পাঠান, দেখবেন রাজি হয়ে যাবে।

তোতা বলল, কারণটা তো তুমিই ভালো বলতে পারবে। সরি, তুমি বলে ফেলছি। শরীরে কি চুম্বক বসাইছেন খালি আমাকে টানে। আসতে চাই না, তবুও চলে আসি।

আপনি আসতে চান না?

তোতা ভাবে, মেয়েটা তো বলতে পারত ঠিক আছে তুমিই বলেন। তোতা এবার নিজেই জিজ্ঞেস করে আপনাকে কি আমার আপনি করেই বলতে হবে?

কেন? আপনি বলতে কষ্ট হয়? সবাইতো তুই আর তুমিই বলে। আমার জন্য অন্তত একজন থাকুক আপনি করে ডাকবে। সমস্যা কী? আমরা দাদা তো তার চল্লিশ বছরের ছোট দ্বিতীয় স্ত্রীকে আপনি বলতেন।

ঠিক আছে। আমি তো ভুলে আপনাকে প্রথম স্ত্রী বানাবার কথা ভাবছিলাম। এখন মনে হচ্ছে আপনি দ্বিতীয় স্ত্রী হবার উপযুক্ত।

বাসার কাছাকাছি এসে গেছে। লাইলির চোখে পড়ে, আরজুদা ম্যাডাম বের হচ্ছেন। তার পাশে একজন যুবক দেখলে তিনি চটে যাবেন। সুতরাং আদেশের সুরে বলল, আপনি তাড়াতাড়ি কেটে পড়েন, ম্যাডাম বের হচ্ছেন। আর শোনেন, তুমিই বলবেন।

চার

অষ্টম দিন লাইলি একটু সাজে। কাকাতুয়ার পরিত্যক্ত হলদে রংয়ের থ্রি-পিসটা পরে। এমনিতেই গায়ের রং ফরসা, তার ওপর হলদে রংয়ের ওপর আলো পড়ে প্রতিসরণের যে হলদে আভা সৃষ্টি করে তা-ও তাকে ঘিরে ধরে। লাইলি আয়নার লাইলির সাথে কথা বলে, ভেংচি কাটে, জিহ্বা দেখায়। আবার কিছুক্ষণ ঝিম মেরে ভাবে, কাকাতুয়া টের পেয়ে যাবে না তো?

গেট থেকে বের হবার সময় কাকাতুয়া বলল, তোকে হলদে পরি মনে হচ্ছে। আর এই সেটটা পরলে আমাকে গ্রামের বোকা মেয়েদের মতো লাগত।

না কাকাতুয়া আপু, আপনাকেও সুন্দর লাগত।

গায়ের রং ফরসা না হলে সুন্দর লাগে না রে। অবশ্য আফ্রিকায় হলে তুই পাত্তাই পাবি না, সুন্দর বলত আমাকে, আমেরিকাতেও।

আপনি তো আমেরিকাতেই চলে যাবেন, চিন্তা কী?

চিন্তা কী তুই বুঝবি না। নেহরিম আপু আমার কাজিন, বড় মামার মেয়ে, বাংলাদেশে কত ভালো ছিল। টিভিতে অনুষ্ঠান করত, গান লিখত, ছবি আঁকত, ইংলিশ স্কুলে পড়ত। কিন্তু আমেরিকা গিয়ে কোনোটাই আর শুরু করতে পারেনি। তার হাজব্যান্ড আমাদেরই আরেক খালার ছেলে ডাবলু ভাই তাকে নেগলেক্ট করতে করতে কোথায় ঠেলে দেয় জানিস?

কোথায়?

কিচেনে।

কিচেনে তো সব মেয়েমানুষই যায়।

সবাই যায় রান্না করতে। নেহরিন আপু ভেতরে গিয়ে সব দরজা-জানালা বন্ধ করে দেয়। টাওয়েল ঠেসে দিয়ে বন্ধ করে দরজার তলা। তারপর চারটি চুলার গ্যাস ছেড়ে দেয়। চুলার কাছে নাকমুখ লাগিয়ে প্রাণভরে গ্যাস টেনে নেয়। তারপর একসময় কিচেনের ফ্লোরে পড়ে যায়। সকালবেলা দরজা ভেঙে ডেডবডি টেনে বের করা হয়। ফুটফুটে আড়াই বছরের ছেলেটা ঘুম থেকে উঠে টিভির সুইচ অন করে কার্টুন চ্যানেলে টম অ্যান্ড জেরি দেখছে আর জেরির উদ্ভট সব কাজ দেখে খিলখিল করে হাসছে।

আরও কিছু বলার ছিল কিন্তু লাইলি না-ও বুঝতে পারে ভেবে নিজেই নিঃশব্দে নিজেকে শোনাতে থাকল। এভাবে যে মরা যায় নেহরিন আপু কার কাছে শিখেছে? কেন সিলভিয়া প্লাথ। ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্রী, সব জানে, কেমন করে ভার্জিনিয়া ওলফ বড় কোটের পকেটে ভারী পাথর ভরে সমুদ্রে নেমে গেছে, আর জীবিত উঠে আসেনি, কেমন করে হেমিংওয়ে নিজের মাথার খুলি উড়িয়ে দিয়েছে। হায়রে আমার নেহরিন আপুর আমেরিকান ড্রিম!

কাকাতুয়া কলেজে ঢুকে যায়। ফুরফুরে মেজাজ নিয়ে এদিক ওদিক দেখতে দেখতে রাস্তাটা পেরিয়ে ওপারে যায় লাইলি। আজ তাকে পেতেই হবে, নতুন এই হলুদ সাজ ব্যর্থ হয়ে যাবে। তাকে যে হলদে পরির মতো দেখাচ্ছে এটা তো আর নিজের কথা নয়, কাকাতুয়া বলেছে।

ফুটপাত ধরে প্রায় অর্ধেকটা পথ পেরিয়ে আসে। লাইলির রাগটা গিয়ে পড়ে হলুদ জামা-সালওয়ার-ওড়নার ওপর। এই রংটাই কুফা। নতুবা সেলাই-খোলা রং-ওঠা জামা যেদিন পরনে সেদিন সরকার সকাল থেকে দাঁড়িয়ে থাকে। আর পোশাকটা একটু ভালো হতেই তার কোনো খবর নেই।

কাপড়ের দোকানে ম্যানিকিনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। কই এসে তো বলছে না, পছন্দ হয়েছে? স্টুডিওর সামনে দাঁড়ায়, সেলুনের সামনে দাঁড়ায়, তোতা বের হয় না। এই সরকার পালিয়ে গেছে। সামান্য একটা মেয়ের দায়িত্ব নিতে পারে না, পালিয়ে বেড়ায়—এ কেমন সরকার? পালিয়ে যে বেড়ায় তার পৌরুষ কোথায়? ধ্যাত্। এমন পুরুষের দরকার নেই। সন্তানের জন্ম হয়ে যেতে পারে—নিশ্চয়ই এ আতঙ্ক তাকে পেয়ে বসেছে।

মূল রাস্তা থেকে ডানের গলি ধরে ডান পাশের সাত নম্বর বাড়িটাই কাকাতুয়াদের। লাইলি যখন গলিতে ঢুকতে যাচ্ছে হন্তদন্ত হয়ে উল্টোদিক থেকে আসছে তোতা মিয়া সরকার। লাইলি একবার ভাবল, শিক্ষাটা দেবার জন্য দ্রুত গলিতে ঢুকে পড়লেই তোতা আর খুঁজে পাবে না। কিন্তু তাতে তো মনের ঝালও মিটবে না, হলদে পোশাকটাও দেখানো হবে না। সুতরাং দাঁড়িয়েই রইল।

তোতা ঠিক সামনে এসে বলল, আজকে তোমার পরীক্ষা। দেখি তোমার মাফ করে দেবার ক্ষমতা আছে কি না?

লাইলি অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নেয়।

তোতা বলল, নেভার মাইন্ড। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি পকেট খালি। তোমার জন্য না হয় খরচ না-ই করলাম। নিজের তো রিকশা ভাড়া লাগবে, সিগারেটে টান দিতে হবে, বাবার বয়সী একটা ভিক্ষুক এসে দুটা টাকা চাইলে না বলব কেমন করে। সুতরাং টাকার খোঁজে বের হতে হলো। সেজন্যই পৌঁছতে এতটা দেরি।

লাইলি এবার উল্টে দাঁড়ায়।

বলে, আপনার মতো মানুষের চেহারা দেখাও পাপ।

সরি। আর হবে না। তুমি বললে, সবার সামনে তোমার পা চেপে ধরব। তখন ক্ষমা না করে পারবে না। কিন্তু বুঝতেই পারছ, তখন চারদিকে অনেক লোক জমে যাবে।

এবার ঘুরে দাঁড়িয়ে লাইলি বলল, আর ঢং করতে হবে না।

তোতা ব্যাক পকেটে হাত ঢুকিয়ে মানিব্যাগ বের করে একটা পাঁচশত টাকার নোট টেনে নিল। বলল, এটা তোমার, তোমার ভাগের।

এবার রীতিমতো ফোঁস করে উঠে লাইলি বলল, ঘটনা কী? বেশ্যাখানার দালাল নাকি? লাইলিকে সস্তা দামের মেয়ে পেয়েছেন? সাবধান। আর পেছন পেছন ঘুরবেন না। পুলিশ ডাকব। কাকাতুয়া আপুর ছোটমামাই ঢাকার পুলিশ কমিশনার।

পরপর তিনদিন কাকাতুয়াকে কলেজে পৌঁছে দিয়ে যতটা সম্ভব শ্লথগতিতে এক পা দু-পা করে হেঁটে হেঁটে বাসায় পৌঁছেছে। তৃতীয় দিন হাঁটতে গিয়ে তার মনে হয়েছে যেন এক স্মৃতির প্রান্তর পাড়ি দিচ্ছে। এইখানে এই ম্যানিকিনের সামনে জিজ্ঞেস করেছে, এত তাড়া কিসের? এইখানে এই সেলুন থেকে দম করে বেরিয়ে এসে তাকে অবাক করে দিয়েছে। এইখানে রাস্তার ওপারে কলেজের গেটের কাছে রিকশার ওপর পা নাচাচ্ছিল। আর এইখানে গলির শেষপ্রান্তে ছুটে এসে বলছিল, নেভার মাইন্ড।

লাইলি নিজেকেই বলে, আসলে আমার স্বভাবটাই খারাপ। সে তো আমাকে জোর করেনি, বুকের ওপর বন্দুক ধরে বলেনি, কাল ঠিক সাড়ে ন-টায় এখানে হাজির থাকবি, নতুবা কল্লাটা কেটে বাম হাতে ধরিয়ে দেব। আমি তো নিজেই এগিয়েছি। তাছাড়া পাঁচশত টাকা দিতে চেয়েছে তো কী হয়েছে? সেজন্য এত নোংরা কথা বলতে হবে। ছি ছি, আমি তোতার মতো একটা সরল মনের মানুষকে বলেছি বেশ্যার দালাল! আমার সম্পর্কে এখন সে কী ভাববে? যদি জিজ্ঞেস করে বসে, আগেও কোনো বেশ্যার দালাল তোমাকে টাকা সেধেছে না কি? তখন আমি কী জবাব দেব। আল্লাহ আমি একজন ভালোমানুষ সম্পর্কে গিবত করেছি। তুমি হাসরের ময়দানে আমার জিহ্বা কেটে ফেলো।

তখনই লাইলি জিহ্বাটা বের করে যতটা সম্ভব চোখ নামিয়ে দেখার চেষ্টা করে, জিহ্বার আগাটা এখনই কেটে ফেলেনি তো?

পরদিনও লাইলি আসা-যাওয়ার পথে তন্ন তন্ন করে খুঁজেছে। সামনে পেছনে তাকিয়েছে, ডানে বাঁয়ে দেখেছে। কোথাও তোতা মিয়া সরকারের কোনো চিহ্নই নেই। নির্বিকার রাস্তা, ফুটপাত, সুপার মার্কেট, থ্রিপিসপরা ম্যানিকিন, স্টুডিও, সেলুন কেউ বলছে না কোথায় তোতা? গোলাপি টি-শার্ট পরা একটা পুরুষ মানুষ যে এ রাস্তায় চলাফেরা করেছে—এটাও কেউ বলতে চাচ্ছে না। কারণ, এগুলো সবই ঘাতক। তোতার অন্তর্ধানের সাথে সবাই জড়িত।

লাইলি নিজের ভেতর চেঁচিয়ে ওঠে। যদি তোতার কিছু হয়—আমি তোদের কাউকে ছাড়ব না, সরকারের খুঁটি ধরে এমন ঝাঁকি দিব যে, বাংলাদেশ হুমড়ি খেয়ে পড়ে যাবে। আমি তখন ধ্বংসস্তূপ থেকে বের করে আনব আমার তোতা মিয়া সরকারকে।

খুব দ্রুত তার চিন্তার বলয় বদলে যাচ্ছে। বিকেল বেলা যখন দিনের ক্লান্তি থেকে হাই উঠছে লাইলি কলাপাতা সবুজ টি-শার্ট পরা তোতাকে মনে করে। ও একটা আস্ত ভীতু। ও পুরুষ নামের কলঙ্ক। কাকাতুয়ার ছোটমামা পুলিশ কমিশনার শুনেই ব্যাটা ইঁদুরের গর্তে ঢুকে পড়েছে।

রাতটা বড় কষ্টে কাটল।

টাকা সেধেছে তো কী হয়েছে? সেজন্য বেশ্যার দালাল বলে গাল দিতে হবে? সে জন্য পুলিশ কমিশনারের পাওয়ার খাটাতে হবে তার ওপর?

আরজুদা ম্যাডামের হাজব্যান্ড, কাকাতুয়ার বাবা যদি তাকে পাঁচশত টাকার একটি নোট দেন তাহলে কি লাইলি তাকে বেশ্যার দালাল বলতে পারবে? যদি পুলিশ কমিশনার মামাই তাকে কাজে ডেকে বলেন, লাচ্ছিটা খুব ভালো বানিয়েছিস। কী যেন তোর নাম—এই নে টাকাটা রাখ, তখন কি পাঁচশত টাকার নোট হাতে নিয়ে তাকে বলবে, ছোটমামা আপনি হচ্ছেন বেশ্যার দালাল?

পুলিশের ভয়েই হোক কি ভয়ংকর মনোকষ্ট নিয়ে হোক লাইলির মনে হলো তোতা যখন বেখেয়াল অবস্থায় রাস্তা পার হচ্ছিল তখন একটা দ্রুতগতির জিপ তাকে ধাক্কা মেরে চওড়া রাস্তার মাঝামাঝি একটা জায়গায় ফেলে লালবাতির মধ্য দিয়ে মিরপুরের দিকে ছুটে যায়। আর ষোল চাকার একটি লরির দুটি করে এক পাশের আটটি চাকা তাকে কালো পাথুরে রাস্তার সাথে একেবারে মিশিয়ে ফেলে। রাস্তায় তখন কেবল রক্ত আর মগজ।

লাইলির চোখ ভিজে আসে। বুকের ভেতর কাঁপন ধরে।

লাইলি এখন নিশ্চিত, তোতার মৃত্যুর জন্য একমাত্র সেই দায়ী। বিড়বিড় করে সে প্রার্থনা করে, আল্লাহ এমন পাপিষ্ঠার একমাত্র জায়গা জাহান্নাম। আমি আর কষ্ট সহ্য করতে পারছি না, আমাকে দ্রুত জাহান্নামে পাঠাও। আল্লাহ তুমি মেহেরবান। আল্লাহ তুমি তোতা মিয়া সরকারকে সরকারি মর্যাদায় বেহেশতে বসবাস করার অনুমতি দাও।

ঘুরেফিরে সারারাতই লাইলি কেবল ষোল চাকার লরির নিচে তোতার চ্যাপ্টা হয়ে যাবার দৃশ্যটি দেখতে লাগল।

এর মধ্যে যে কততম দিন অতিবাহিত হয়েছে লাইলি সে হিসাব গুলিয়ে ফেলেছে। একটা স্বপ্নও দেখল। কাকাতুয়ার বিয়ে হচ্ছে সুন্দর করে সাজানো একটি কমিউনিটি সেন্টারে। ম্যাডাম তাকে দায়িত্ব দিয়েছেন কনের কাছাকাছি কোথাও দাঁড়িয়ে থেকে তার কখন কী লাগবে এনে দেবে। আর একটা বিশেষ দায়িত্ব হচ্ছে, কনের জুতো জোড়া বরপক্ষের লোকজন চুরি করতে পারে—এই আশঙ্কায় তা লাইলির হাত ব্যাগে ভরে রাখতে হবে।

এটা কোনো সমস্যাই নয়।

হাতব্যাগটাও কাকাতুয়ার অনেকগুলো ব্যাগের একটি। জিজ্ঞেস করেছে, তুই কোনটা নিবি? যেটা ভালো লাগে নিয়ে যা।

লাইলি নিয়েছে হলুদটা। পোশাকও পরেছে সেই থ্রিপিস হলুদ সেট। ওদিকে বেশ বাজনা বাজছে। বর ঢুকে পড়েছে, সরাসরি মঞ্চে এসে কনের পাশে বসল। বর বসে হাত তুলে সবাইকে যখন সালাম জানায় লাইলি বিস্মিত হয়। তোতা মিয়া সরকার কাকাতুয়া মাহজাবিনকে বিয়ে করতে এসেছে।

কাকাতুয়া যখন তোতার আঙুলে আংটি পরিয়ে দিচ্ছে তার ভেতরে তখন প্রচণ্ড চিত্কার : হারামজাদি কাকাতুয়া আমি তোকে খুন করব।

লাইলি চিত্কারটা দমন করে। অবাক হয়ে দেখে, ষোল চাকার লরির নিচে পিষ্ট হওয়া তোতা এখনো বেঁচে আছে। তোতা দেখতে আগের চেয়ে অনেক সুন্দর হয়েছে। তোতার সাথে কাকাতুয়ার বেশ মানাবে।

হলদে পরির বেশে দাঁড়িয়ে থাকা লাইলির সাথে তোতার চোখাচোখি হয়। সামান্য ভাবান্তরও হয়নি তোতার। আরও একটু এগিয়ে যায়, কাকাতুয়ার বান্ধবী ও কাজিনদের ভিড় ঠেলে সামনে এগিয়ে যায়। চোখাচোখি হয় বরের সাথে।

লাইলি নিশ্চিত হয় তোতা তাকে চিনতে পারেনি।

এমন তো হতেই পারে। কত সিনেমাতে দেখেছে, নায়কের আগের স্মৃতি সব মুছে গেছে। উত্তম কুমারেরই একটা আছে, কী যেন নাম ছবিটার।

ঠিক তখনই কারেন্ট চলে যায়। বিয়ের অনুষ্ঠানে আসা লোকজন বলতে থাকে, জেনারেটর কই? এক মিনিটের মধ্যেই প্রচণ্ড ঘরঘর শব্দে জেনারেটর চলতে শুরু করে, তা আলোকিত করে কমিউনিটি সেন্টারকে। ততক্ষণ জেনারেটরের শব্দ লাইলির ঘুম ভাঙিয়ে দিয়েছে।

ভেতরে একটা প্রচণ্ড কষ্ট সৃষ্টি হয়েছিল তোতা আর কাকাতুয়ার বিয়েটা দেখে। কষ্টটা নেমে গেছে। কারণ, যাকে ইচ্ছে তাকে বিয়ে করুক, তোতা যে বেঁচে আছে এর চেয়ে ভালো কোনো সংবাদ এই পৃথিবীতে সৃষ্টি হতে পারে অন্তত লাইলি তা বিশ্বাস করে না।

লাইলি সম্ভবত আবার তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। কিছুক্ষণ আগে দেখতে থাকা স্বপ্নটি কিংবা সত্য ঘটনাটি অসমাপ্ত রয়ে গেছে। তবে বিদ্যুত্ চলে যাওয়া এবং জেনারেটরের আলো আসার মধ্যিখানের অংশটুকু পাতা উল্টে দেখার কোনো সুযোগ নেই। লাইলি যখন দেখতে শুরু করে তোতা আর কাকাতুয়া তখন বাসর ঘরের ছিটকিনি লাগিয়ে দিয়েছে।

লাইলির চোখ বড় হয়ে আসছে—হায় আল্লাহ একি দেখছি! তোতা কাকাতুয়াকে এভাবে জাপটে ধরেছে কেন? কাকাতুয়াটাও কেমন বেহায়া—খিলখিল করে হাসছে। এই দৃশ্য আমাকে দেখতে হচ্ছে—আমার তোতা অন্য মেয়েমানুষের সাথে... ছি ছি! ষোল চাকার লরির নিচে পড়েও এই পাষণ্ডটা মরেনি? ও মরলো না কেন? এই বদমাসকে কেন বাঁচালে আল্লাহ! আমি জানি, আমাকে কষ্ট দিতে।

পাঁচ

বিছানা ছাড়ার আগে লাইলি কতক্ষণ নিজের সাথে লড়াই করে সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারল না—এমন পরিস্থিতিতে সে তোতার মৃত্যু না বেঁচে থাকা চায়। লাইলি বিছানা ছেড়ে আয়নার দিকে তাকায়—হায় আল্লাহ! তুমি এ কোন বিপদে ফেললে? আমি কি চাই, তাও যে ঠিক করতে পারছি না। তুমি সাহায্য করো আল্লাহ!

দু-একদিনের মধ্যে গাড়ি ডেলিভারি দেবে। পরশু কি তার পরদিন থেকে কাকাতুয়া গাড়িতে আসা-যাওয়া করলে সম্পর্কের তো সেখানেই ইতি। ঠিকানা জানা নেই, ফোন নম্বরও জানে না। সাদামাটা একটা জামা গায়ে, সালোয়ারেরও নিচের দিকে অনেকটা সেলাই খোলা, পায়ে স্পঞ্জের স্যান্ডেল, কাকাতুয়াকে কলেজে দিয়ে লাইলি বাড়ি ফিরছে। পেছন থেকে ডাক শোনে, লাইলি।

দীর্ঘশ্বাসের সাথে অস্ফুট শব্দ বেরিয়ে আসে, তোতা! আমার তোতা!

লাইলি ফিরে তাকায়। গলা থেকে ব্যান্ডেজের কাপড়ের দড়িতে ঝোলানো হাত, মাথার ডানদিকে বেশ খানিকটা চুল কাটা, ব্লেডে চাছা, চোখমুখ ফোলা—এতো অন্য কারও হবার কথা নয়—এই তো তোতা! তোতা মিয়া। তোতা মিয়া সরকার। তোতাই আমার সব, তোতাই আমার বাংলাদেশ সরকার।

তোতাকে কিছু বলার আগে তার মনে হয়, আল্লাহ তার প্রার্থনা শুনে জবাব দিয়েছে, আমি তাকে জীবিতই চাই। শুকুর আলহামদুলিল্লাহ।

লাইলি চোখ তুলে জিজ্ঞেস করে, কী হয়েছে আপনার? এ অবস্থা কে করল?

তোতা বলল, নেভার মাইন্ড, ও কিছু না। এ অবস্থা করেছে মানুষ। মানুষের বাচ্চা মানুষ। মানুষের চেয়ে ইতর প্রাণী পৃথিবীতে আর নেই। অবশ্য আই ডোন্ট কেয়ার। আমি এসব কেয়ারই করি না। ৬ নম্বর বাসটা তখনো মগবাজার মোড়ে পৌঁছেনি। আমি দূর থেকে চারমুখি ফুট-ওভারব্রিজটা দেখতে পাচ্ছি। কাজটা সেরে এক মিনিটের মধ্যেই নেমে যাব। গাড়িটাও টার্ন নেবে মালিবাগের দিকে। এক প্যাসেঞ্জারের পকেট থেকে একটা মোবাইল ফোন টেনে তুলতেই শালার সে কী চিত্কার, যেন বাসে ডাকাত পড়েছে। আমার মতো এমন সাইজের একটা মানুষের ওপর বাসের এতগুলো তাগড়া মানুষ যদি ঝাঁপিয়ে পড়ে, আমার বাঁচার কোনো উপায় আছে, বলো। এক বানচোত শালা বলে, ওই হালার পাছা দিয়া আইক্কাঅলা বরাগ বাঁশ হামাইয়া দে। শালা কুট্টি আমার পেছন দিক দিয়ে বরাগ বাঁশ ঢুকায়ে দিতে চায়। চড়-থাপ্পড়, ঘুষি যে যা পারে দু-চারটা করে বকশিস দিল। এক বুড়ো শালা তার হাতের ছড়ি দিয়ে মারল মাথায়। এতজোরে যে, যতটা থেঁতলে গেল, কেটে গেল তার চেয়ে বেশি। ভাগ্য ভালো সে সময় পুলিশ এসে গেল, নতুবা মেরেই ফেলত। পুলিশ আসলেই ভালো মানুষ। পুলিশ না থাকলে চোর-ডাকাত-পকেটমার কেউই টিকতে পারত না। মানুষ বড় ইতর, পুলিশ অনেক ভালো।

লাইলি থ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। ঘাড় ঘুরিয়ে আঙুলের ওপর পা উঁচিয়ে তোতার মাথায় শেভ করা অংশটা দেখে। লম্বা সেলাইর দাগ। লাইলির শরীরটা কাঁপতে থাকে—মানুষ এমনই নির্মম হয়!

তোতা বলে, বুড়ো জায়গামতো হিট করতে পেরেছিল। ছ-টা স্টিচ লেগেছে। কাটাটা আর একটু ভেতরে গেলেই খুলি ফাটিয়ে ঘিলু বের করে আনত। শালা মানুষের বাচ্চা! মানুষ একটা খচ্চর প্রাণী।

লাইলি বলল, আপনি আবোল-তাবোল কী বলছেন? মোবাইল ফোনের জন্য আপনি মানুষের পকেটে হাত দেবেন কেন? ঢাকা শহরে মোবাইলের দোকান কম? এই রাস্তায়ও একটা দোকান আছে।

তোতা আমতা আমতা করে বলল, দোকানে মোবাইল পাওয়া যায়, কথা ঠিক। কিন্তু দোকানদার তো মাগনা দেবে না। টাকা দিয়ে তো যে কেউ কিনতে পারে। গতমাসে একটা মানিব্যাগ তুলে নগদ সাড়ে ছ-হাজার পাই। টাকা নিয়ে একটা ভালো মোবাইল ফোন কিনি, তখন চেষ্টা করেছি একটা ফাও পকেটে ঢুকিয়ে নিতে। কিন্তু দোকানের এক শালা শকুনের মতো আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। কী অবস্থা, মানুষ মানুষকে বিশ্বাস করে না। ওটা থাকলে ইজিলি তোমাকে দিয়ে দিতাম। তাহলে কথা বলে সব ঠিকঠাক করে নিতে পারতাম। তুমিও আমার ওপর চটতে না, আমিও ঠান্ডা মাথায় কাজটাজ সেরে আসতে পরতাম। এখন দেখ, ছোট লোকের বাচ্চারা কী একটা ঝামেলা পাকিয়ে ফেলল। এই অবস্থা, মানে হাত-পা বন্ধ অবস্থায় এক মাস থাকলে তো না খেয়ে মরতে হবে।

লাইলি খুব ঠান্ডা মাথায় বলল, আমার জন্য মোবাইল চুরি করতে গিয়ে আপনার এই দশা! আর একটু হলে তো দমটা টাশ করে বেরিয়ে যেত।

গা ছমছম করে ওঠে লাইলির। তার জন্য জীবন দিতে পারে এমন মানুষও তাহলে পৃথিবীতে আছে? চোখ ছলছল করে ওঠে। ডান চোখের প্রান্তে এক বিন্দু অশ্রু ধীরে ধীরে দুর্ভার হয়ে উঠতে থাকে। মানুষ মানুষকে এভাবে মারতে পারে! মানুষ এত পাষণ্ড! ৬ নম্বর বাসের যাত্রীরা আসলে মানুষের মুখোশে বন্যজন্তু। মাত্র একটা মোবাইল ফোনইতো, নাকি হীরের খণ্ড কোহিনূর?

শরীরের জখমের প্রভাব বিস্তার করার ক্ষমতা অস্বাভাবিক। খুব সহজে এক ধরনের যুক্তিকে নাকচ করে নতুন এক ধরনের যুক্তি প্রতিষ্ঠা করে। লাইলি বলতে চেয়েছিল, আপনার না অবস্থা ভালো, আপনি না ভালো বংশের ছেলে—আপনি পকেট মারেন কেন? এটা কি ভালো কাজ? আমি আপনার সাথে আর দেখা করব না, আপনি যদি দেখা করতে চেষ্টা করেন আমি কাকাতুয়া আপুকে বলব যেন পুলিশ কমিশনার আপনাকে হাতকড়া পরিয়ে উপযুক্ত শিক্ষা দেয়। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে তার মনে হচ্ছে, আহারে, আমাকে একটা মোবাইল দেবার জন্য এই মানুষটা মরণের ঝুঁকি নিয়েছে! আল্লাহ তুমি তাকে বালামুসিবত থেকে রক্ষা কর।

দুই করতল জোড় করে ক্ষমা প্রার্থনার ভঙ্গিতে লাইলি তোতার দিকে তাকিয়ে বলে, দোহাই আল্লার, আপনি আর চুরি করবেন না।

তোতা বলে, ধ্যাত্, চুরি কোথায়, এটা তো পিকপকেটিং। পকেট মারাতে থ্রিলই আলাদা। থ্রিলই তো জীবন। অবশ্য এটা মানি, এতে রিস্ক আছে। এই যেমন ধর মোবাইল তুলতে গিয়ে মার খেলাম, মাথায় স্টিচ মারতে হলো। আমার জানের দোস্ত শুকুর মোহাম্মদ এই মগবাজার চৌরাস্তাতেই ধরা পড়ে এমন মার খেলো, শেষ পর্যন্ত জীবন নিয়ে আর উঠে দাঁড়াতে পারল না। একেবারে শহীদ শুকুর মোহাম্মদ।

লাইলি একটু ধাতস্থ হয়ে তার কথায় বাধা দেয়। বলে, পকেটমারকে পিটিয়ে মারলে সে শহীদ হয়, এই প্রথম শুনলাম।

কী যে বল, পুরোনো ঢাকার খুনি কসাই বাবুকে যখন নবাবপুরের দোকানদাররা পিটিয়ে মারল, তার জন্য হরতাল হলো, শোকমিছিল হলো, তাকে শহীদ ঘোষণা করে একটা রাস্তার নাম কসাই বাবু রোড করা হলো, কেবল তারই সম্মানে। শুনলে তো। শুকুরের নামে তো হরতাল-মিছিল করিনি। রাস্তার নাম বদলাইনি, কেবল নামের আগে শহীদ বলেছি। এটা দোষের কিছু নয়। কসাই বাবু নাকি পার্টি করত। এটা ঠিক, শুকুর মোহাম্মদ কোনো পার্টি করত না।

লাইলি বলে, আপনি এত কথা বলেন কেন? মাথার সেলাই কবে কাটবে? শোনেন, চুল পুরোপুরি না গজানো পর্যন্ত আমার খোঁজে আসবেন না।

তোতা বলল, আগে কথা শোন, শুক্কুরের বউটা দেখতে অবিকল মাধুরী দীক্ষিকের মতো। গরীব মানুষের সুন্দরী বউ সহ্য হয় না। তোমাকে নিয়ে তো আমার ভয়টা ওখানেই।

মানে?

তুমিও তো খুব সুন্দর। সেদিন হলুদ কাপড়ে দেখে বুঝতে পারিনি এটা শাবনূর না তুমি।

আমি তার সবগুলো সিনেমা দেখেছি। ভবিষ্যতে যেগুলো মুক্তি পাবে, সেগুলোও দেখব। আমি যে তোমার পেছনে পেছনে ছুটলাম, সে তো শাবনূরের জন্যই।

মানে?

মানে সহজ। তোমাকে দেখে মনে হলো, এটাই আমার শাবনূর।

লাইলি প্রথমে পুলকিত হয় তার সৌন্দর্যের পরোক্ষ বন্দনায়। পরক্ষণেই মনে হয় তাহলে আমার কোনো দাম নেই। শাবনূরের মতো দেখতে বলেই আমি তোতা মিয়ার পছন্দ, আমি আমার মতো বলে নয়।

লাইলি বলে, যান আপনি শাবনূর নিয়েই থাকেন।

ছয়

পরের সপ্তাহে তোতা ক্রিকেট ক্যাপ পরে এসেছে। বেশ লাগছে তাকে।

লাইলি বলল, সেলাই কেটেছে?

সাতটার মধ্যে চারটা কেটেছে। নিচের দিকটাতে ইনফেসশান থাকায় কাটেনি। অ্যান্টিবায়োটিক দিয়েছে। তোমার সাথে পাঁচটা মিনিট বসতে চাই।

লাইলি বলে, এটা কি পার্ক নাকি?

তোতা লাইলিকে নিয়ে যেখানে বসবে, সেটাই পার্ক। চল, বিসমিল্লাহ হোটেলে বসি। লেডিস কেবিন আছে। সকালে নাস্তা করা হয়নি। আমি খাব আর তোমার সাথে টুকটাক কথা বলব।

তার মানে আপনি একাই খাবেন আর আমাকে আপনার সাথে বকবক করতে হবে?

একা খেলে তো দেড় ঘণ্টা আগেই সেরে নিতাম। তখন থেকে বলতে পার এ শরীরে এক পায়ে দাঁড়িয়ে আছি।

কেউ দেখবে না তো?

এক-শ বার দেখবে। ম্যানেজার, ওয়েটার, কাস্টমার—কেউই অন্ধ নয়। সবাই দেখবে, কিন্তু তাতে সমস্যাটা কী? মানুষ কি বউ নিয়ে বাইরে নাস্তা করতে পারে না। কেউ জিজ্ঞেস করলে বলব, আমার বউ।

তার মানে যারা আপনাকে চেনে সবাই আমাকে বলবে পকেটমারের বউ।

ঢাকা শহরে অন্তত তিন হাজার লোক আমাকে চেনে। কিন্তু আমার পেশা কী তা জানে মাত্র তিন জন। শুক্কুর মোহাম্মদের বউ মাধুরী দীক্ষিত। সরি, আসল নামটা ভুলে গেছি, আমার ওস্তাদ বক্কর আলী এবং আমার দোস্ত শাহরুখ খান। তাদের কারোই এখানে আসার সম্ভাবনা নেই।

কিন্তু পুলিশ তো চিনে?

পুলিশ চিনলে কোনো সমস্যা নেই। বড়জোর খাবারের বিলটা আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে দাঁত খিলাল করতে করতে বেরিয়ে যাবে। আর তোমার মামার কথা বলছ, তিনিও আমাকে চেনেন না।

আমার মামা কে বলেছে? কাকাতুয়া আপুর ছোটমামা।

একই কথা। ছাগল নাচে খুঁটির জোরে।

তার মানে তুমি আমাকে ছাগল বলতে চাচ্ছ?

আরে ধ্যাত্, কোন কথার যে কী মানে তুমি দাঁড় করাও। এখন খাবারে হাত দাও। পরোটা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।

পরোটা, হালুয়া, ভাজি নিয়েছে। পরোটা চারটা। সমান ভাগ করে দিলেও লাইলি নিজের প্লেট থেকে একটা পরোটা, খানিকটা ভাজি, খানিকটা হালুয়া তোতার প্লেটে তুলে দেয়। লাইলি বলে, আমি তো আর খালি পেটে আসিনি, আপনি খান।

লাইলির এই আদরটুকু তাকে স্পর্শ করে। বলে, তুমি শাবনূরের চেয়েও ভালো।

কেমন করে বুঝলেন?

শাবনূর তো আর আমাকে এভাবে কোনোদিন খাবার তুলে দেয়নি। তাছাড়া তোমার শরীরের ঘ্রাণটাও মিষ্টি।

কী বলেন পাগলের মতো—শরীরের আবার ঘ্রাণ আছে নাকি?

সবাই পায় না। নাক থাকতে হয়।

চা আসে, দুধ চা।

চায়ে চুমুক দিয়ে তোতা পকেট থেকে চ্যাপ্টা একটা ফোল্ডিং মোবাইল বের করে বলে, এই নাও। সিম লাগানো আছে। একটা নম্বরই ইংরেজি টি অক্ষরে পাশে সেভ করা, এটা আমার নম্বর। সেটের সাথেও একটা সিম ছিল, ভেঙে টুকরা করে ফেলেছি।

অন্য পকেট থেকে বের করল চার্জার। বলল, এটা কিন্তু নতুন। মানুষ তো আর চার্জার নিয়ে বাসে ওঠে না। উঠলে সেটাও আনতে পারতাম। আমার মতো এত পাকা হাত এই তল্লাটে আর একটাও নেই।

লাইলি বলল, সে তো মার খাওয়ার ধরন দেখেই বুঝতে পারছি। এই শরীরে আবার বাসে উঠেছেন?

ছয় নম্বরে উঠিনি। গুলিস্তান-গাজীপুর চৌরাস্তা বাসে অপারেশনটা করে টঙ্গির বোর্ড বাজারে নামি। হাতে ব্যান্ডেজ থাকায় কেউ সন্দেহ করেনি। যাকগে, তোমার দোয়া ছিল। সেজন্য সহিসালামতে ঢাকা পৌঁছাতে পেরেছি।

আমি পকেটমারের জন্য দোয়া করেছি? আস্তাগফিরুল্লাহ?

তোমার কথার ধরনও শাবনূরের চেয়ে বেশি ধারালো।

মানে?

ওই যে বললে, মারের ধরন দেখেই বুঝতে পেরেছ আমার হাত কতটা পাকা।

লাইলি সেটটা হাতে নিয়ে উল্টেপাল্টে বলে, সুন্দর তো। তবে কথা একটা, এই সেটের দাম একশত টাকা হোক কি এক লাখ টাকা, আমি কোনো পকেটমারের সাথে সম্পর্ক রাখতে চাই না।

কার সাথে সম্পর্ক করবে—ঠিকাদারের সাথে? অফিসারের সাথে? মন্ত্রীর সাথে? আমি তো ড্যাশ মারি একজন মানুষের, কি দুজনের, তিন জনের, কিন্তু শালারা তো মেরে দেয় গোটা বাংলাদেশের।

ড্যাশ আবার কী? লাইলি জিজ্ঞেস করে।

কথাটা একজন মহিলার সামনে মুখে আনার মতো না, সেজন্য ড্যাশ বললাম। যদি না বুঝে থাক বিয়ের পর বুঝিয়ে দেব। ড্যাশ আগেও একদিন বলেছিলাম।

আপনি একটা খাটাশ।

তোতা বলল, তার মানে তুমি বুঝতে পেরেছ।

টেবিলের ওপর তোতার হাত ক্রোলিং করে লাইলির হাতের দিকে এগিয়ে যায়। তার হাতের ওপর হাত রাখে। লাইলি বাধা দেয় না।

তোতার ইচ্ছে করে আরও এগোতে। কিন্তু নিজের বিশ্বাসযোগ্যতা সৃষ্টি করতে নিজেকে সংযত করে। লাইলি অন্তত একবার ভাবুক, খাবার হোটেলের পর্দাঘেরা কেবিনে চান্স পেয়ে তোতা তাকে জাপটে ধরেনি। তোতার বদলে কোনো বদমাস ছেলে হলে কী যে করত লাইলি তা ভাবুক। তোতা হুট করে আর পেতে চায় না। ন্যান্সি শিক্ষা দিয়েছে। এখন নিজেও পরীক্ষা করে নিতে চায়। তারও চাওয়া, লাইলি যে পরীক্ষা নিচ্ছে তাতেও সে পাস করুক।

বড় রাস্তা থেকে গলির মোড় পর্যন্ত আসে, তোতা উল্টো দিকে যাবে, এটা হচ্ছে লাইলিকে এগিয়ে দেওয়া। লাইলি বলল, আপনার আর আসতে হবে না, আমি একাই যথেষ্ট। তবে সাবধানে থাকবেন। এখনকার কাজটা ছেড়ে ভালো কিছু শুরু করেন।

তোতা বলল, দোয়া করো, চেষ্টায় আছি। একটা যন্ত্র কেনার চেষ্টা করে যাচ্ছি। সুবিধামতো দামে পাচ্ছি না। অবশ্য ভালো জিনিসের দাম তো বেশি হবেই। আমার আড়াই লাখ টাকার একটা ফিক্সড ডিপোজিট আছে, সুদসহ এখন পৌনে চার লাখে পৌঁছেছে। দেখা যাক কবে হাতে পাই। পেয়ে গেলে এসব ছেঁচড়া অপারেশন আর করব না। মাসে একটা কি দুটো। রাজা-বাদশাহের মতো হওয়া খেয়ে বেড়াব।

কিসের যন্ত্র?

তোতা বলে, ঠুশ।

মানে?

তোতা নিজের কণ্ঠনালীতে ডান হাতের তর্জনী ঠেকিয়ে বলে—ঠুশ। এক গুলিতে কাজ সারা। আমার বন্ধু, ঠিক বন্ধু নয়, বছর দুয়েকের ছোটই হবে, শাহরুক খান একটা কিনেছে। পলিটিক্যাল অপারেশন করে। রেট পাঁচ লাখ। আড়াই লাখ অ্যাডভান্স নেয়।

বিরোধী দলের লোক খুন করে?

আরে না, নিজ দলের বিরোধীদের। একবার এক নেতা দলের কেন্দ্রীয় নেতার কাছে নালিশ করে, জাহাঙ্গীর খানকে সামলান।

নেতা ধমক দিয়ে বলেন, তুই সামলাতে পারিস না আহাম্মক।

কেমন করে নেতা?

নেতা ডান হাতের তর্জনী দিয়ে ট্রিগার টেপার মতো করে ইশারা করলেন। স্থানীয় নেতা করণীয় ঠিক করে ফেললেন। কাজটা নিয়েছিল শাহরুখ খান। আড়াই লাখ অ্যাডভান্স পেয়েছে। অপারেশনের পর যখন বাকি টাকা চেয়েছে, তিনি বললেন, যা দিয়েছি এটাই বেশি। বেশি বাড়াবাড়ি করলে খুনের মামলায় ফাঁসিয়ে দেব।

শাহরুখ বলেছে, বস, তাহলে জোড়া খুনের মামলা দেন।

সে রাতেই খুন হন স্থানীয় নেতা তোজাম্মেল হোসেন।

তোতা বলল, এসব পরের চিন্তা। কাজের কথা শোন। ফোনটা ভাইব্রেশন মুডে আছে, শুতে যাও কটায়, দশটা না বারোটায়?

এগার-সাড়ে এগারটায়।

তাহলে তখন থেকে আধঘণ্টা। হাতের কাছে রাখবে। আমিই ফোন করব। তোমার করবার দরকার নেই।

লাইলি বলল, আমি কিন্তু ফিসফিস করে কথা বলব। কেউ শুনলে ঝামেলা হবে।

সাব্যস্ত হয় সামনে আর একদিন বিসমিল্লাহ হোটেলে পরোটা-হালুয়া খাবে। ফোনে দিন-তারিখ ঠিক করা হবে।

সে রাতেই ঠিক দশটা থেকে ফোনটা সাথে নিয়ে বসে থাকে। এগারটার দিকে যখন ফোনটা কাঁপতে থাকে লাইলি ফিসফিস করে বলল, এতক্ষণে! আমার খুব অস্থির অস্থির লাগছে।

তোতা বলল, আমি এখন কমলাপুর রেলস্টেশনে। এই মাত্র একটা ছোট অপারেশন করলাম। একটা গোলাপি রঙের লেডিস ব্যাগ। ভেতরে কী আছে এখনো দেখিনি। যা-ই থাক, সবসুদ্ধ এটা তোমার। আজ কথা থাক। কাল এই সময় আবার ফোন দেব। এখন ঘুমাও ডার্লিং।

ডার্লিং!

শব্দটা লাইলির মনে খুব মধুর এক ঝংকার তোলে।

লাইলি বলে, শোনেন, একটু সাবধানে থাকবেন। খাওয়া দাওয়া ঠিকমতো করবেন। আর একটা কথা, আমাকে আপনার একটা ফটো দেবেন। ম্যাডামের বাসায় আমার একটা আলাদা রুম আছে। আমার একটা কালো ট্রাঙ্ক আছে। ছবিটা ট্রাঙ্কে রাখব। প্রত্যেকদিন রাতে দেখব।

তোতা বলে, আচ্ছা। গুড নাইট।

চমত্কার! তোতা সাহেবদের মতো ডার্লিং বলে, গুড নাইট বলে। কথাটা সম্ভবত ঠিক—তোতা মিয়া ভালো বংশের ছেলে, বাড়ির অবস্থা ভালো। হয়তো বাড়িতে সত্মা, বের করে দিয়েছে। ঢাকায় এসে অসত্ সঙ্গে পকেটমার হয়েছে।

লাইলি বলে আচ্ছা, খোদা হাফেজ।

তোতার ফোনের কম্পন ভালো করে অনুভব করার জন্য লাইলি ফোনটা বুকের ওপর রেখে চিত্ হয়ে শুয়ে থাকে। গড়পড়তা মাসে একবার লাইলির ফোন আসে, কাকাতুয়ার ফোনে। ফোন করে বড়খালা, নাটোর থেকে। বড়খালু নাটোর চিনিকলের দারোয়ান ছিল, ম্যানেজার তার জায়গাতেই আলালকে চাকরি দিয়েছে। খালু মারা যায়নি, পক্ষাঘাতে শয্যা নিয়েছে। আলাল বড় ছেলে, এসএসসি থার্ড ডিভিশন, লাইলিকে দেখলে বোকার মতো হাসত। বড় খালাই খোঁজখবর নেন, কোনোদিন বলেন, তোর মাকে স্বপ্নে দেখেছি; কোনোদিন বলেন, আলালের জন্য বিয়ের ভালো সম্বন্ধ আসছে।

লাইলি বলতে চায়, তাতে আমার কী? কিন্তু বলা হয় না।

ফোনের ভাইব্রেশন পা থেকে মাথা পর্যন্ত তার সর্বাঙ্গ কাঁপিয়ে তুলল। লাইলি বলল, আপনি ভালো আছেন তো? সহি-সালামতে? গোলাপি লেডিস ব্যাগটাতে কী পেলেন?

৬২৫ টাকা, বাচ্চার ন্যাপি, একটা ব্লাউজ, একটা ছোট পাউরুটি, কয়েকটা চুলের কাটা, গোল আংটা ফিটকরা ছোট একটা বিউটি বক্স, আর একপাতা ট্যাবলেট।

তোতা বলল, বাচ্চার ন্যাপি দিয়ে কী করবে? রাজি থাকলে বল, বাচ্চার ফ্যাক্টরি চালু করে দিই।

লাইলি বলল, বিবাহের আগে প্রশ্নই আসে না।

সাত

এর মধ্যে গাড়ি ঠিক হয়ে যাওয়ায় লাইলির সাথে বাইরে যাওয়া হয়নি। ঠিক সাতদিন পর ম্যাডাম খুব সকালেই আগুনে পোড়া বস্তি পরিদর্শনে যাবার সময় লাইলিকে কাকাতুয়ার সাথে কলেজে যাওয়া-আসার দায়িত্ব দিলেন। এ কদিন কেবল মঙ্গলবার বাদে প্রতিরাতে তোতার সাথে কথা হয়েছে। এই প্রথম লাইলি ফোনে টি ফর তোতা টিপল। প্রথমবার ধরল না, দ্বিতীয়বার ধরেই আতঙ্কিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে লাইলি, কোনো সমস্যা?

লাইলি বলল, সমস্যা না সুখবর। ম্যাডাম গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেছে। আমি কাকাতুয়া আপুর সাথে কলেজে যাচ্ছি। শোনেন, গোলাপি ব্যাগটা এখনই আনবেন না। এগুলো আপনার বাসায়ই থাকুক।

তোতা বলল, আচ্ছা।

তোতা একটু দম নিয়ে আবারও বলল, হলুদ সেটটা পরে এসো। স্টুডিওতে তোমার ছবি তুলব।

তোতা বিছানার ওপর উঠে বসে। পাশের তিন বেডের একজনও নেই। সবাই অফিসের পথে বেরিয়ে গেছে। তোতার মতো সেল্ফ-এমপ্লয়েড কেউ নয়। যখন ইচ্ছে ঘুম থেকে ওঠার অপার স্বাধীনতা কারোই নেই।

তার তিন রুমমেটের দুজন গার্মেন্টস-এর শ্রমিক, একজন সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের পিয়ন, কামাই-রোজগার তারই সবচেয়ে বেশি; আর এই তিনজনই জানে তোতা ভালো বংশের ছেলে, বাড়ির অবস্থা ভালো, নিজে টুকটাক করে, না করলেও সমস্যা নেই। শাহ কামালের এই মেসবাড়িতে তোতা সবারই প্রিয়জন। কাউকে সিগারেট, কাউকে আতর আর তসবিহ, কাউকে সাবান কিংবা আফটার সেভ লোশন উপহার দিয়ে সবারই মন জয় করে রেখেছে। এমনকি যে বুয়া তাদের চারজনের রান্না করে, তারও পক্ষপাত তোতার প্রতি। আহত তোতার শুশ্রূষা করতে গিয়ে বার বার বলেছে, এত রাত করে কেন বাড়ি ফেরেন, ঢাকা শহরের যে অবস্থা, লাশও খুঁজে পাওয়া যায় না।

তোতা কলেজের গেটের কাছেই ছিল। কাকাতুয়া গেটে মাথা ঢোকাতেই তোতা কাছে এসে ফিসফিস করে বলল, হান্ড্রেড পার্সেন্ট শাবনূর। আমি তোমাকে এ রকম আরেকটা সেট বানিয়ে দেব।

লাইলি তার দিকে তাকিয়েই জিজ্ঞেস করল, চোখ লাল কেন?

আর বলো না, সদরঘাট টার্মিনালে রাত তিনটা পর্যন্ত ঘুরঘুর করেছি। কোনো লাভ হয়নি। উল্টো আদর্শ হিন্দু হোটেলে পাঁচফোড়ন দেওয়া সবজিভাত খেয়ে চল্লিশ টাকা খুইয়েছি। মেসে যখন ঢুকি তখন পাঁচটা, তুমি যখন ফোন কর, পৌনে আটটা। ঘুম লস হলে আমার চোখ লাল হয়ে থাকে।

আদর্শ হিন্দু হোটেল কেন? আদর্শ মুসলিম হোটেল নেই?

মুসলমানদের মাংস রান্না ভালো, হিন্দুদের সবজি, হোটেলটা আসলে একটা বড় নৌকা, সেজন্যই গিয়েছি। ভ্যারাইটির একটা মজা আছে না?

ফুজি কালার স্টুডিওতে লাইলির দুটো ফুল আর দুটো পাসপোর্ট সাইজ ছবির শট নিল। তোতা আগাম জমা দিল ১৫০ টাকা। ছবির ডেলিভারি বিকেলে।

বিসমিল্লাহ হোটেলে ঢুকে দেখল কেবিন চারটিতেই খানাপিনা চলছে। তোতা বলল, অসুবিধা নেই। ফ্যানের নিচে এই টেবিলটায় বসি। কেবিনে হলে তোমাকে ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করবে। ইচ্ছে এখানেও করবে, কিন্তু এত মানুষের সামনে তা করা ঠিক হবে না।

লাইলি বলল, আপনার হাত কেটে ফেলব।

তার কথা শেষ হতেই একটা কেবিন থেকে চারজন বেরিয়ে গেল। তোতা সেখানে ঢুকল প্রথমে, তারপর লাইলি। মিটিমিটি হাসিমুখ ওয়েটারকে যথরীতি পরোটা, ভাজি ও হালুয়া এবং চায়ের অর্ডার দিল। সেই দিনের মতোই লাইলি একটা পরোটা, অর্ধেক ভাজি, অর্ধেক হালুয়া তুলে দিল তোতার প্লেটে।

চামচ দিয়ে হালুয়া মুখে তুলে তোতা জিজ্ঞেস করল, বোন কজন, একটা শালি পাব তো?

লাইলি বলল, আমি কি আপনাকে জিজ্ঞেস করেছি, ভাই কজন? দেবর পাব তো? শোনেন, আমি একাই, আমার কেউ নেই, আবার সবাই আমার।

তোতা বলল, আই অ্যাম সরি। সারা রাত না ঘুমালে যা হয়, মুখ দিয়ে উল্টাপাল্টা কথা বের হয়। ছবিটা কখন দেখবে?

লাইলি বলল, আপনার কাছেই থাকুক। অবস্থা বুঝে একদিন দেখাবেন। বাসায় নেব না। মোবাইল ফোন নিয়েই টেনশনে থাকি, কখন কার চোখে পড়ে যায়। আমার যে কথা বলার মতো কেউ থাকতে পারে—এটা কারও বিশ্বাস হবে না। দুসপ্তাহ আগে তো আমারই বিশ্বাস হয়নি।

হালুয়াটা খুব ভালো তা-ই না?

আমার হাতের হালুয়া আরও ভালো।

তোতা হাসে, হবেই তো।

তোতা যখন চায়ে চুমুক দেয় লাইলি তার পেটের কাছে সালোয়ারের উপরিভাগে গুঁজে রাখা রুপালি চেইনের একটা চকচকে হাতঘড়ি বের করে এনে তোতার হাতে তুলে দেয়। বলে, এটা আপনার। কোনো প্যাসেঞ্জার তো আর নিজের হাত আপনার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলবে না, জনাব তোতা মিয়া সরকার, অনুগ্রহ করে এই ঘড়িটা নিয়ে নিন। আমি চোখ বন্ধ করে রাখলাম। কেউ আপনাকে দেবেও না, জীবনে আপনার এই সুন্দর হাতে ঘড়ি পরাও হবে না। দেন, আপনার হাতে পরিয়ে দিই।

তোতা বাঁ হাতটা এগিয়ে দেয়। লাইলি ঘড়ির চেইনের বৃত্তের ভেতর তার আঙুলগুলো ঢুকিয়ে গোটা করতল অতিক্রম করিয়ে কব্জিতে এসে ধাতব স্ট্র্যাপটা লাগিয়ে দিল।

তোতা বলল, আমার কালো হাতে সাদা ঘড়িটা দারুণ ফুটে উঠেছে। এত সুন্দর জিনিসটা কিনতে তোমার কয় মাসের বেতন গেল? তোমার টাকা কি গাছে ধরে?

লাইলি বলল, পুরুষমানুষের হাত তো কালোই ভালো। আপনারটা শ্যামলা। পুরুষের ফরসা হাত আমার ভালো লাগে না। আমার টাকা গাছে ধরে না। ঘড়ির জন্য আমার এক টাকাও লাগেনি। আপনার জন্য ছোট একটা অপারেশন করলাম। আর কী লাগবে বলেন। ছোটখাটো দু-একটা অপারেশন আমিও করতে জানি। লাবু ভাই মানুষ ভালো। ধরা পড়লেও তেমন সমস্যা হবে না।

তোতার চোখ কপালে উঠে যায়। লাবু ভাই! লাবু ভাই কে? তুমি কি ডাবল মক্কেল ফিট করে রেখেছ নাকি? লাবু পকেট মেরে এনে তোমাকে দেবে, তুমি দেবে আমাকে, আর আমি পকেট মেরে এনে দেব তোমাকে, তুমি আবার সেটা দেবে লাবুকে। ঘটনা কী ঠিকঠাক বল। বেঁচে থাকার জন্য দুই নম্বরি কাজ করি, কিন্তু মেয়েমানুষের বেলায় আমার এক নম্বরি মেয়ে চাই। লাবু ভাই ঘড়ি দিলে আমার সাথে বিসমিল্লাহ হোটেলে হালুয়া খাওয়ার দরকার নেই। লাবু ভাইর সাথে সোনারগাঁও-শেরাটন যেখানে ইচ্ছে যাও। মেয়েমানুষ হতে হবে এক নম্বর।

লাইলি হাসে। বলে, আগে মাথা ঠান্ডা করেন। লাবু ভাই পকেট কাটতে পারলে দুনিয়া উল্টে যাবে। লাবু ভাই পাগল। আস্ত পাগল। কাকাতুয়া আপুরা অবশ্য ভিন্ন কথা বলে। বলে, লাবুটা বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী। ভালোই বলে। হরেক কিসিমের পাগল আছে। এক কিসিমের নাম বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী।

তোতার চড়া মেজাজ অনেকটাই নেমে আসে। জিজ্ঞেস করে, আর কত কিসিমের পাগল তোমার চেনা?

লাইলি বলে, অনেক। এক পাগল নিজেকে মোটরসাইকেল মনে করে, এক পাগল সারাদিন ট্রাফিক পুলিশের মতো হাত ওঠায়, হাত নামায়, সবচেয়ে বদ কিসিমের হচ্ছে নেংটা পাগল।

তুমি দেখেছ?

অনেক। কলেজের সামনেও একটা নেংটা পাগল আসে।

তোমার লাবু ভাই কি নেংটা পাগল?

জি না, বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী। শোনেন, আমার মূল চাকরিটাই লাবু ভাইয়ের দেখাশোনা করা। লাবু ভাইর বুদ্ধিশুদ্ধি আসলেই কম। দোতলার জানালা দিয়ে ঘরের জিনিসপত্র বাইরে ফেলে দেয়—কোনোদিন আপেল, কোনোদিন কলম, নেইল কাটার, মোজা, চায়ের কাপ—যখন যা মনে চায় তা-ই। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে দেখে কোনটা কে নিল, তারপর মিটিমিটি হাসে। দু-একদিন জানালা দিয়ে বাইরে পেশাব করেছে। তখনো একই হাসি। সমস্যা হয় বাথরুমে, পেশাবের সময় জিনিসটা ঠিকমতো ধরে রাখতে পারে না, কমোডের বাইরে চলে যায়, নিজের পাজামাটাও ভিজিয়ে ফেলে। তারপরও মিটিমিটি হাসে। এমনটা প্রতিদিনই হয় এমন নয়, মাসে দু-মাসে একবার, যখন লাবু ভাই পুরোপুরি বেখেয়াল থাকে।

ঘড়িটা তাহলে তোমাদের লাবুর?

লাবু ভাইয়ের কয়েকটা ঘড়ি। সকাল আটটায় সময় জিজ্ঞেস করলে ঘড়ি দেখে বলে সাড়ে বারোটা, বিকেল পাঁচটায়ও বলে সাড়ে বারোটা। সাড়ে বারো ছাড়া ঘড়ির আর কোনো সময় সম্ভবত তার চোখে পড়েও না।

ঘড়ি না পেলে তোমাকে ধরবে না?

কেন ধরবে, আমার কোনো চুরির রেকর্ড নেই। জিজ্ঞেস করতে পারে।

তখন?

তখন বলব, কি জানি, লাবু ভাই জানালা দিয়ে ফেলে দিয়েছে মনে হয়। টোকাইরা নিশ্চয়ই নিয়ে গেছে। দু-একটা ঘড়ি কি কানের দুল না থাকলে তাদের কোনো সমস্যা নেই। লাখ লাখ টাকার মালিক। টাকা গুনেও না। এটা-ওটা না থাকলে টেরও পায় না। লাবু ভাই এমন মানুষ—ঘড়ি কোথায় জিজ্ঞেস করলে জানালা দিয়ে দেখিয়ে দেবে, বাইরে। ঘড়ির জন্য আপনার চিন্তা করার দরকার নেই। আর কিছু লাগলে বলেন।

তোতা আলোচনার ট্র্যাক থেকে সরে গিয়ে জিজ্ঞেস করে, লাবু না টাবু—ওই শালার বয়স কত?

লাইলি জিহ্বায় কামড় দেয়। লাবু ভাইর মতো মানুষকে কেউ শালা বলে? পাগল হোক প্রতিবন্ধী হোক আমি তো জানি এমন ভালো মানুষ আর একজন খুঁজে পাওয়া যাবে না। লাইলি বিড়বিড় করে এই কথাটা আবার উচ্চারণ করে—এমন ভালো মানুষ আর একজনও নেই।

বয়স কত জিজ্ঞেস করেছি, সেটার জবাব দিলে না?

কত আর—একুশ বাইশ কি তেইশ, আপনার বয়সীই হবে। আপনার বয়স কত?

বল কী! এ তো ডেঞ্জারাস বয়স। শালা পাগলের বাচ্চা তোমার গায়ে হাতটাত দেয় না তো? দিলে সত্যি করে বল, আমি লাবুর বারোটা বাজিয়ে দেব, কব্জি থেকে দুটো হাত কেটে আলাদা করে ফেলব। আর ওইটা—মাঝখানেরটা কেটে কুকুরকে দিয়ে খাওয়াব।

লাইলি ঠান্ডা মাথায় শুনে গেল। তারপর খোঁচা মেরে বলল, আপনি এত বড় বীর পালোয়ান বুঝতে পারলে তো কাছেই ঘেঁষতাম না।

তুমি কী বলতে চাও?

কিছুই বলতে চাই না। লাবু ভাইয়ের ছোটমামা পুলিশের কমিশনার। হেভি পাওয়ার। এই কথাটা শুধু মনে করিয়ে দিলাম।

আমি তার পাওয়ারের গুলি মারি। শুধু তোমার গায়ে হাত দিলে আমি পাগলের বাচ্চাকে আজিমপুর গোরস্থানে পাঠিয়ে দেব।

পরবর্তী কয়েকটি সাক্ষাতে লাইলি তোতাকে দিয়েছে ব্যাটারিচালিত একটি রেজর, বিদেশি আফটার সেভ লোশন, একটি নতুন টি-শার্ট। তোতা দিয়েছে হলদে কাপড় পরে স্টুডিওতে তোলা দুটি ছবি, একটি ছোট টর্চ লাইট, একটি চুড়ি-সম্ভবত সোনার, দু-বারে পাঁচশ পাঁচশ এক হাজার টাকা। তোতা আরও কিছু দিতে পারত। লাইলি নেয়নি। কারণ, ওই বাড়িতে সে তো অভাবে নেই। যা দরকার তার প্রায় সবই আছে, না থাকলেও সমস্যা নেই, চাইলেই কেউ না কেউ দিয়ে দেয়। কাজের মেয়ে এত আরামে কোথাও থাকে না।

অন্যকিছু নিয়ে নয়, কেবল মোবাইল ফোনটা নিয়ে লাইলি সমস্যায় পড়েছে। ধরা পড়ে গেলে একশত প্রশ্নের জবাব দিতে হবে। কোথায় পেলি, কে দিল নাকি চুরি করেছিস? তোর ফোনের কী দরকার? কথা বলার মতো তোর কে আছে? এটা কি ফোন দেখি—ওমা স্যামসাং, চার্জার কোথায়? কোথায় চার্জ করিস? এটার দাম কত হবে—চার-পাঁচ হাজার? আরও প্রশ্ন : তোর কি চরিত্র খারাপ হয়ে গেল নাকি? রাতে বাসায় থাকিস তো? পুরুষ মানুষ বড্ড বজ্জাত—ছুঁতে না দিলে পাঁচ টাকাও দেয় না, তুই কতটুকু দিয়েছিস যে পাঁচ হাজার টাকা দামের ফোন দিয়ে দিল?

অধিকাংশ প্রশ্নই করবেন লাইজু ভাবি। ভাবির আসল নাম আফসানা ফেরদৌসী, বাবু ভাইয়ের স্ত্রী। ভাবি আরও একজন আছে, নাম দীনা, বাবু ভাইয়ের ঠিক পরের জন, লোটন ভাইয়ের স্ত্রী। তারা এ বাড়িতে থাকেন না, কখনো কখনো বেড়াতে আসেন। কিন্তু রাতে থাকেন না। শ্বশুরবাড়িতে ফিরে যান। লোটন ভাই ঘরজামাই।

মোবাইলের কথা শুনলে দীনা ভাবি বলবে, তা-ই নাকি, আচ্ছা। ভালোই তো।

বড় ভাবি ধমক দিয়ে বলবেন, ভালোই তো মানে?

তিনি বলবেন, মানে ভালোই কথা-টথা বলতে সুবিধা তো তা-ই না?

এবার আরও ধমক খাবেন, তা-ই না মানে কী? লাইলির কাছে মোবাইল এল কেমন করে? তার মোবাইলেরই বা দরকার টা কী?

দীনা ভাবি বলবেন, আমিও তো তা-ই বলি। দরকার না থাকলে সুইচ অফ করে রাখলেই ব্যাটারির অপচয় হবে না।

লাইলি সিদ্ধান্ত নিল, তোতার সাথে তার গড়ে ওঠা সম্পর্ক এবং মোবাইল ফোন প্রাপ্তির ব্যাপারটা কাকাতুয়ার কাছে স্বীকার করবে। তবে তোতা মিয়া যে পকেটমার—এটা স্বীকার করবে না, বলবে, টুকটাক ব্যবসা করে, যখন সামনে যে ব্যবসা পায় তা-ই করে। চুক্তিতে সিটি কর্পোরেশনের ড্রেন পরিষ্কার করায়, আবার যশোর থেকে রজনীগন্ধা এনে কাটাবন মার্কেটে বিক্রি করে।

আট

কাকাতুয়া এর মধ্যে এলাকার উঠতি মস্তান ঘোড়া মন্টুর প্রেমে পড়ে। মন্টুর হাঁটার ঢংটা অনেকটা ঘোড়ার গ্যালোপিং-এর মতো বলেই ঘোড়া মন্টু নাম পেয়েছে। নামটা বেশ চালু হয়েছে। ফোনে যখন দূরের কেউ জিজ্ঞেস করে, কোন মন্টু, সে সবিনয়ে বলে, ঘোড়া মন্টু। আরও তিন জন মন্টুর বসবাস এই এলাকায়। টিক্কা মন্টু, মাইগ্যা মন্টু এবং শুটার মন্টু। শুটার মন্টু এ ক্যাটাগরির মাস্তান। ঘোড়া মন্টুর সাথে তার সুসম্পর্ক থাকলেও ঘোড়াটার বাড়াবাড়ি তার পছন্দ নয়। যেমন তোর হাতের গ্রিপ ছোট, দুই ছোট জিনিস ধর, তুই কেন আরজুদা মান্নানের মেয়ের সাথে প্রেম করবি? ম্যাডাম নেক্সট ইলেকশনে অন্তত সংরক্ষিত আসনের মহিলা এমপি হলেও হবেন। তুই কি এমপির মেয়ের গায়ে হাত দেবার উপযুক্ত হয়ে উঠেছিস?

ঘোড়া মন্টুরও আশঙ্কা, শুটার মন্টু তার মুখের গ্রাস কেড়ে নিতে পারে। কাজেই যা করার শিঘ্রই করতে হবে।

কলেজের নামে কাকাতুয়া লাইলিকে নিয়ে বের হয়েছে। রিকশায় কিছু দূর গিয়ে ওড়নায় মাথা ঢেকে ঘোড়া মন্টুর ১৮০ সিসি মোটর সাইকেলে সওয়ার হয়েছে। লাইলিও কিছুটা সময় পেয়েছে, আগে জানিয়ে রাখায় তোতাও হাজির। আবারও বিসমিল্লাহ হোটেলের কেবিনে নাস্তার সময়টা পেরিয়ে যাওয়ায় আলুর চপ আর দুধ চা খেয়ে বাসায় ফিরেছে।

সে-রাতেই—কাকাতুয়া যখন ইয়ারফোন লাগিয়ে এমপি থ্রি প্লেয়ারে কোলাভেরি ডি শুনছে আর হাত-পা এদিক ওদিক ছুড়ে নাচানাচির চেষ্টা করছে, লাইলি তখন সামনে এসে দাঁড়াল। এক কান থেকে ফোন সরিয়ে কাকাতুয়া জিজ্ঞেস করল, কী রে, কী চাস?

কীভাবে কথাটা বলবে, দু-তিন দিন ধরে লাইলি এর রিহার্সেলও দিয়েছে। সুতরাং সেই স্কিপ্ট অনুসরণ করেই বলল, একজন আমাকে একটা মোবাইল ফোন দিয়েছে। আপনি যদি বলেন এটা আপনি দিয়েছেন তখন আর সমস্যা থাকবে না।

কিসের সমস্যা?

সবাই হাজারটা প্রশ্ন করবে। লোকটা কে, জিজ্ঞেস করবে।

আমিও তো জিজ্ঞেস করব।

আপনি জিজ্ঞেস করলে সমস্যা নেই। আপনাকে সত্যি কথা বলব। আমি তাকে বলেছি কাকাতুয়া আপুর বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত আমি এ বাড়ি ছাড়তে পারব না। তিনি রাজি হয়েছেন।

তুই তাকে আমার কথা বলেছিস?

বলেছি, লাবু ভাইয়ার কথাও বলেছি। রাস্তায় ম্যাডামের পোস্টারের ছবিও দেখিয়েছি। ম্যাডামের ছবি দেখে বলেছে, খাইছে আমারে, তোমার ম্যাডাম তো মন্ত্রী হয়ে যাবে। চেহারায় আর ভাবে-সাবে তা-ই মনে হয়।

দেখি কোনটা তোর ফোন।

কোমরে গুঁজে রাখা ঝকঝকে ফোনটা বের করে কাকাতুয়ার হাতে দেয়। কাকাতুয়া বলে, এটা তো আমারটার চেয়েও দামি। আমি তোকে দিয়েছে বললে বাসায় কেউই বিশ্বাস করবে না।

তা হলে আপনার পুরোনো ফোনটা আমাকে দিয়ে এটা নিয়ে নেন।

কাকাতুয়া বলল, গুড আইডিয়া। তোরটাতে দেখছি ক্যামেরা, ইন্টারনেট, ব্লুটুথ সবই আছে। ঠিক আছে সকালে আমারটা নিস, নম্বরগুলো এটাতে তুলতে হবে তো।

লাইলি বলল, আমার নম্বরটা আপনারটাতে তুলে দিয়েন।

কাকাতুয়া লাইলির ফোনের ফোনবুকে যায়। কেবল একটা নম্বর সেভ করা। জিজ্ঞেস করে, কীরে এটা আবার কেমন নাম, টোটো।

জি ঠিকই আছে, এটা তোতা। তোতা মিয়া।

মানুষ ভালো তো? এটা জানিস তো, ঢাকায় একটা বড় গ্যাং কাজ করে। কাজের মেয়েদের সাথে প্রেমের অভিনয় করে বাসা থেকে বের করে বেনাপোল হয়ে ইন্ডিয়ায় নিয়ে বিক্রি করে। সুন্দরী মেয়ে হলে পঞ্চাশ হাজার রুপি পর্যন্ত পাওয়া যায়। সাবধানে থাকিস। গ্যাং-এর পাল্লায় পড়িস না।

ঘোড়া মন্টুর সাথে সম্পর্কটা গাঢ় হবার সাথে সাথে কাকাতুয়া গাড়িটা একেবারেই ছেড়ে দেয়। মা-কে বলে, গাড়িতে আসা-যাওয়া করলে ক্লাসমেটদের সাথে ডিসট্যান্স বেড়ে যায়। লাইলি তো আছেই, গাড়ির কী দরকার। মাঝে মাঝে দরকার হলে অবশ্যই পাব, তা-ই না মা?

বেগম আরজুদা মান্নানের ব্যস্ততা অনেক বেড়ে গেছে, তার দলেই নতুন আপদ যোগ হয়েছে। যে আসনের জন্য তিনি প্রার্থী, সরকারের অতিরিক্ত পা-চাটা অবসরপ্রাপ্ত একজন মহিলা সচিবও প্রার্থী হতে যাচ্ছেন। এই টেনশনের মধ্যে মেয়ের কথা শুনে বললেন খুব ভালো, আমি তো গাড়ি পেয়েছি বুড়ো বয়সে। ঠিক আছে। তবে সাবধান, চোখকান খোলা রাখবি। আমাদের দলের ছেলেগুলোই কিন্তু অপজিশনের গুলোর চেয়ে বড় বদমাশ।

কাকাতুয়া তার নাটকটা ভালোই সাজিয়েছে। রাতের খাবারের সময় সবার সামনে লাইলিকে ডেকে তার ফোনটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, এটা নে, মাঝে মাঝে আমাদের আগে ছুটি হয়ে যায়। আমাকে তোর জন্য অকারণে দেড় ঘণ্টা বসে থাকতে হয়। এই জন্যই তোকে ফোনটা দিচ্ছি।

লাইলি বলল, আপু, আপনার লাগবে না?

আমি নতুন একটা নিয়েছি বলেই তো তোকে এটা দিতে পারছি। চার্জারটা আমার পড়ার টেবিলে আছে নিয়ে আসিস। ফোনে যেন চার্জ থাকে। তোকে রিং করে যদি না পাই তাহলে কিন্তু তোর খবর হয়ে যাবে।

খুশিতে লাইলির ভেতরটা ফেটে পড়ছে। তারপরও এমনভাবে নিল যেন দেড়মনি একটা বস্তা তাকে দেওয়া হয়েছে, টেনে নিতে পারছে না।

সবার খাওয়া শেষ হলে লাবুর খাবার নিয়ে তার রুমে যায় লাইলি। ফেরার পথে কাকাতুয়ার রুমে নক করে। দরজা খোলার সাথে সাথে টুপ করে মাথা নুয়ে লাইলি তার পায়ে ধরে সালাম করে। কাকাতুয়া ধমক দেয়—ভাগ এখান থেকে।

লাইলির মনে হয়, তার প্রেমটা এতদিনে প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা পেতে যাচ্ছে।

প্রেম কাকাতুয়া ও লাইলিকে সহমর্মী করে তোলে।

লাইলি অবেলায় লেবুর শরবত নিয়ে হাজির হয়, খান আপু, শরীর ফ্রেশ লাগবে। শরবত মুখে দিয়ে কাকাতুয়া বলে, ধ্যাত্ এত চিনি খেলে আমি তো শি-এলিফ্যান্ট হয়ে যাব। বুঝলি কী বলেছি? বলেছি মাদী হাতী হয়ে যাব। বাত্সায়ন বলেছেন হস্তিনী। তুই কখনো আমাকে চিনির শরবত দিবি না। দিবি কেবল লেবুর রস, লবণও দিবি না, পানিও মেশাবি না। লেবু ফ্যাট কাটে।

লাইলি বলে, চিনি না হলে কি আর শরবত হয়?

তা হবার দরকার নেই। আমারটা ন্যাচারাল লেমন জুস।

কাকাতুয়া একদিনই তার দুই সেট থ্রি পিস তার পরনের অযোগ্য ঘোষণা করে লাইলিকে দিয়ে দেয়।

আপু, এগুলো তো বলতে গেলে নতুনই, দিয়ে দিচ্ছেন যে।

এগুলো পরে প্যারট মিয়ার সাথে দেখা করতে যাবি। জানিস তো তোতাপাখির ইংরেজি প্যারট। একটা ব্যাপারে সাবধান থাকিস, বাসায়-টাসায় কিন্তু যাবি না। একবার দরজা বন্ধ করতে পারলেই বিছানায় শুইয়ে দেবে। সহজে ধরা দিস না।

পুরুষ মানুষ সম্পর্কে এসব শুনতে শুনতেই তো বড় হয়েছে। কাজেই দরজা বন্ধ করতে দেবে না। কিন্তু গত পরশু বিসমিল্লাহ হোটেলের কেবিনে তার নিজেরই তো মনে হয়েছে পর্দার বদলে কেবিনের দরজা থাকলে ভালো হতো। ভেতর থেকে ছিটকিনি লাগিয়ে তোতাটাকে কয়েকটা কামড় দেওয়া যেত।

পুরুষ মানুষ সম্পর্কে যা-ই শুনুক তার অভিজ্ঞতা মিশ্র।

কেবল বাড়ি থেকে পালিয়ে বাঁচার জন্য টঙ্গি রেলস্টেশনে নেমে হাঁটতে শুরু করল। ঢাকা যে তখনো আসেনি বুঝতে পারেনি। অনেক লোক নেমে যাচ্ছে, সেও নামল। স্টেশন থেকে বেরিয়ে একজনকে জিজ্ঞেস করল, ঢাকা কোন দিকে?

সঠিক দিকই দেখাল। কিন্তু ঢাকায় কোথায় যাবে, কেমন করে যাবে সেও জিজ্ঞেস করেনি, কেউ বলেওনি ঢাকা কত বড়। হাঁটতে হাঁটতে যখন টঙ্গি ব্রিজের পাশে, লাইলি মন্দ মানুষের খপ্পরে পড়ে গেল। গাঁটের পয়সা খরচ করে সে মানুষ তাকে খাওয়াল। ঢাকার গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে চাকরি দেবে বলে আশুলিয়া ও সাভার-আরিচা রোডের সংযোগস্থল বাইপলে এনে নগদ পাঁচ হাজার টাকায় বেচে দিল। আরও বেশি পেত, পুলিশের উত্পাতের কারণে সুবিধা করতে পারেনি। সে রাতের খদ্দের চপল ও চপলের বন্ধুরা। মদ খেয়ে বুঁদ হয়ে থাকা ধনী লোকের ছেলেরা যখন তাকে আদেশ করছে, খোল জামা খোল, পাজামা খোল, চপল চিত্কার দিয়ে ওঠে, সাবধান খুলবি না। শুরু হয় হইচই। পুলিশ এসে হাজির হয়। বিব্রত চপল বলে ওঠে, আমার ছোটমামা পুলিশ কমিশনার। পুলিশকে বলে, মেয়েটাকে বাঁচান।

কাজটা খুব সহজ হয়নি, থানা পর্যন্ত আসতে হয়। মেয়েটির ক্রেতাকে দিতে হয় পাঁচ হাজার, ফুর্তি করার জন্য বন্ধুদের এক হাজার। মেয়েটিকে যে তার জিম্মায় নিচ্ছে তা কাগজে-কলমে লিখে দিয়ে এবং মেয়েটি যে স্বেচ্ছায় যাচ্ছে তা-ও লিখে থানা থেকে বেরিয়ে আসে। তার আগে ওসি বাসায় ফোন করেন। বেগম আরজুদা মান্নান, তাদের অপরিচিত নন। তিনিই বলেন, চপলের সাথে পাঠিয়ে দিন, আমি কোথাও না কোথাও প্রোভাইড করব।

লাজুক চপল এভাবে একটি মেয়েকে উদ্ধার করতে পারবে, এটা বেগম আরজুদাকে অবাকই করেছে। তিনি লাইলিকে কাজেই লাগিয়েছেন, চপলকে বলেছেন, এ ধরনের উদ্ধার কাজে আর যেয়ো না, বিপদে পড়বে। এমনকি অন-দ্য স্পট কোনো খারাপ মেয়েমানুষের সাথে বিয়েও পড়িয়ে দিতে পারে।

চপল কী কাজ করে সে-ই জানে। বাড়িতে খায়, ঘুমায় তবে টাকা-পয়সা চায় না। অন্য কারও রুমেও যায় না, এক সাথে খেতেও বসে না। দু-একদিন পরপর কাকাতুয়া উঁকি দেয়, চপল এটা-ওটা বলে। একদিন বলল, সজাগ থাকলে আর পড়াশোনার চাপ না থাকলে রাত সাড়ে এগারোটা টিভি অন করে দেখো—আমার একটা তিরিশ মিনিটের সলো পারফর্মেন্স আছে, বেহালা বাজাব।

কাকাতুয়া চপলের অনুষ্ঠানটিকে একটি উত্সবে পরিণত করে ফেলল। পুশ ট্রলি ঠেলে বাবাকে এনে বসাল, ড্রইংরুমের এক প্রান্তে, মা এল, বড় ভাই ও ভাবি এল, কার্পেটের ওপর বসে পড়ল লাইলি। বাবা বলল, চপলকে ডাকবি না?

কাকাতুয়া বলল, বলেছিলাম। বলেছে টিভিতে দেখলে নিজের ভুলগুলো কানে বাজবে, তখন মন খারাপ হয়ে যাবে।

মা, বলল, থাক, ডাকার দরকার নেই।

চপল রাগ বাজাচ্ছে। ঘুম পাচ্ছে বলে মা চলে গেল। ভাবি বলল, এসব প্যান প্যান শুনে কী হবে, দুজন উঠে চলে গেল। বেহালা বাদন যখন শেষের দিকে, কাকাতুয়া চোখ ঘুরিয়ে দেখে, বাবা চোখ মুছছে আর লাইলি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।

কাকাতুয়া অবাক হলো, লাইলিও বেহালার সুর বোঝে!

পরদিন বেগম আরজুদা আদেশ দিলেন, চপলের অনুষ্ঠান যখন হবার হবে—এ নিয়ে আমাদের ডাকাডাকি করার দরকার নেই। চপলকে যেটুকু দেবার আমি সবই দিচ্ছি। অন্য কোনো মহিলা হলে লাথি মেরে বের করে দিত।

ঠিক এক সপ্তাহ পরে চপল বলল, কাল সকাল সাতটা থেকে আটটা আমার এক ঘণ্টার একটা সাক্ষাত্কার হবে মাছরাঙা টিভির রাঙা সকালে। এটা লাইভ প্রোগ্রাম, আমি স্টুডিওতেই থাকব।

কাকাতুয়া বাবাকে এনে বসাল। মাকে বলল না, ভাই ও ভাবিকেও না। চা দিতে এসে পর্দায় চপলকে দেখে লাইলিও বসে পড়ল।

সাক্ষাত্কার গ্রহণকারীদের একজন বলল, আপনার ছোটবেলার কথা বলুন। আমাদের দর্শকরা বিশিষ্টজনদের শৈশবের কথা জানতে আগ্রহী।

একবার এদিক ওদিক তাকিয়ে চপল বলল, আমার কোনো শৈশব নেই। শৈশবের কোনো কথা নেই। আমার শৈশবের অকথিত গল্প শোনাতেই তো বেহালা ধরেছি। বসুন তো, একটু বাজিয়ে শোনাই।

চপল বেহালায় একটা করুণ সুর বাজাতে থাকল।

কাকাতুয়া বলল, বাবা, চপল ভাইয়া তো সেলেব্রিটি হয়ে গেছে।

তিনি বললেন, আরও হবে। আমার বাবা বাঁশি বাজাতেন। আমি ধরেছিলাম কিন্তু এগোতে পারিনি। চপল পারবে।

হঠাত্ বেগম আরজুদা ঢুকে পড়লেন, স্বামীকে ধমকে উঠলেন, টিভি তো তোমার রুমেও আছে, এখানে এসে দল বেঁধে দেখার কী দরকার?

কাকাতুয়া চেঁচিয়ে বলল, বাবাকে আমি নিয়ে এসেছি, আমার সাথে দেখার জন্য। তোমার সমস্যা কী?

তিনি চেঁচিয়ে উঠলেন, চুপ কর হারামজাদি। একটা কথা বললে বাড়ি থেকে বের করে দেব।

লাইলি দ্রুত ড্রইংরুম থেকে বেরিয়ে যায়। প্রশ্নটা তার মনেও জাগে। টিভির একটি ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানে কেবল দর্শক হিসেবে গিয়েছিলেন বাবু ভাই আর তার স্ত্রী। সেটা দেখার জন্য দুজন অন্তত একশ জনকে ফোন করেছেন, বাড়িতে উত্সব করে সবাই দেখেছে। চপলকে ডাকা হয়নি, চপলকে ডাকলেও না আসার একটা অজুহাত সৃষ্টি করত।

কাকাতুয়া জানে সমস্যাটা কোথায়, লাইলি জানে না।

বেগম আরজুদার ঘরের বাইরের ব্যস্ততা এবং স্বামীকে অমান্যতা-উপেক্ষার জবাব দিতেই হয়তো আবদুল মান্নান হুট করে শালিকের নাচের শিক্ষক সাবরিনা জাহানকে বিয়ে করে ফেলেন। বিষয়টি অনেকদিন গোপনই ছিল। চপলের জন্মের পর বিয়ের ব্যাপারটি জানাজানি হয়। বেগম আরজুদা অনুমতি ছাড়া বিয়েসহ আবদুল মান্নানের বিরুদ্ধে নারী নির্যাতন আইনে মামলার প্রস্তুতি নেন। আবদুল মান্নানও প্রথম স্ত্রীকে তালাকের হুমকি দেন। বেগম আরজুদা স্বামীর এই স্খলনের পরও তাকে ছাড়তে রাজি নন। শেষ পর্যন্ত কাবিনের মাত্র পাঁচ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ নিয়ে সাবরিনা আবদুল মান্নানকে ছেড়ে দিতে সম্মত হন। আবদুল মান্নানের পক্ষে তার প্রথম স্ত্রী বেগম আরজুদা চপলকে তার পরিবারে গ্রহণ ও তাকে লালন-পালনে অঙ্গীকার করেন।

সাবরিনা জাহান ১৮ বছর পর্যন্ত ছেলের ভরণপোষণের জন্য কিছুই চাননি, ছেলেকে বাবার কাছে পাঠানওনি। নাচের ক্লাসেই তিনি একদিন অজ্ঞান হয়ে পড়েন, হাসপাতালে নিতে নিতে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ শুরু হয়। মৃত্যুশয্যায় তিনি আরজুদা মান্নানকে দেখতে চাইলে তিনি রুঢ় হননি। তিনি যথারীতি দেখতে যান এবং সাবরিনার শেষ ইচ্ছাটি তার মৃত্যুর আগেই পূরণ করেন। তিনি চপলকে বাসায় নিয়ে আসেন। পরদিন সাবরিনা অজ্ঞান হয়ে পড়লে তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়, তৃতীয় দিন অপরাহ্নে তার মৃত্যু হয়।

চপল আবদুল মান্নানের পুত্র হলেও কাকাতুয়া ছাড়া আর কারও সাথে স্বাভাবিক সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করেনি। স্ত্রী সঙ্গত কারণেই বিরূপ থাকায় পরিবারের সদস্য হিসেবে চপলের পরিচিতি প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলী আবদুল মান্নানের চাকরি থেকে অবসর নিয়মমাফিক নেবার আগেই স্ট্রোকে লম্বালম্বিভাবে শরীরের অর্ধেক অংশ বলতে গেলে নিষ্প্রাণই হয়ে যায়, মস্তিষ্ক কিঞ্চিত্ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তার দিন কাটে এক ধরনের অপরাধবোধের মধ্য দিয়েই—চপলের কাছে অপরাধ, আরজুদার কাছে অপরাধ, সাবরিনার কাছে অপরাধ, একসময় তার মনে হয় বরং মাথাটা অচল হয়ে গেলে ভালো ছিল, ভালোমন্দ ও হাসিকান্নার বোধগুলো থাকত না, এগুলোর আর প্রয়োজনও নেই।

লাইলি অবাক হয়, কেমন পুরুষ স্ত্রীর ভয়ে নিজের রুম থেকে বের হয় না। আর চপল সাহেব তো আরও আজব। তাকে উদ্ধার করে আনার পর এতদিন গেল, একদিনও ডেকে জিজ্ঞেস করেনি কেমন লাগছে। কিন্তু মানুষটা যে আর দশজন পুরুষমানুষের মতো নয় এটা সে নিশ্চিত—পাগলও হতে পারেন। লাবু ভাইয়া এক ধরনের পাগল, তিনি আরেক ধরনের।

নয়

ছুটির পর কলেজের সামনে লাইলি কাকাতুয়াকে বলল, আপু এক মিনিট। প্যারট মিয়া।

কাকাতুয়া জিজ্ঞেস করে, কী হয়েছে প্যারট মিয়ার?

কিছু হয়নি, আপনি তাকে একটু দেখে দিন।

কোথায় দেখব?

এই তো।

বলতে বলতেই লাইলির ইশারা পেয়ে তোতা এসে একবার কাকাতুয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে দ্রুত মাথা নুইয়ে তার পা ছুঁয়ে কদমবুসি করল।

লাইলি অবাক হয়ে চিত্কার দিয়ে উঠল, কী করছেন, আপনি কী করছেন?

গেটের সামনে অপেক্ষমাণ একদল ছাত্রী চোখ ঘুরিয়ে দেখল ছফুটের কাছাকাছি লম্বা একটি সুদর্শন যুবক কাকাতুয়ার পা ছুঁয়ে উঠে দাঁড়াচ্ছে।

ছাত্রীদের একজন চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল, কীরে কাকাতুয়া, ঘটনা কী? রোমিও মাথা হেট করেছে কেন?

কাকাতুয়া ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বলল, আচ্ছা, আচ্ছা, ঠিক আছে। আমি এখন বাসায় যাচ্ছি, পরে কথা হবে।

লাইলির সাথে তার বয়স ও সম্পর্কের নৈকট্য এতটাই বেশি যে, লাইলি বলেই ফেলল, পায়ে ধরে সালাম করল, সালামি দেবেন না? দেন পঞ্চাশ টাকা সালামি দেন।

কাকাতুয়া ব্যাগে পঞ্চাশ টাকার কোনো নোট পেল না, বিশ টাকার তিনটি নোট বের করে লাইলির হাতে দিতে গেলে লাইলি বলল, যে সালাম করেছে তাকে দেন।

কাকাতুয়া নোটগুলো ব্যাগে ভরে একটা একশত টাকার নোট বের করে তোতা মিয়ার হাতে দিয়ে দ্রুত একটি খালি রিকশায় উঠে পড়ল, পাশে লাইলি। লাইলি ঘাড় বাঁকা করে তোতাকে একবার দেখে নিয়ে জিজ্ঞেস করল কেমন দেখলেন?

কাকাতুয়া বলল, প্যারট মিয়াকে কলেজের সামনে আসতে নিষেধ করিস। নতুবা কলেজের কোনো মেয়ে তার প্রেমে পড়ে যাবে। তখন কিন্তু তুই আউট হয়ে যাবি।

লাইলি বলল, না আপু, আমি তো ক্লাস এইট থেকে নাইনে উঠেছিলাম, তোতা ক্লাস এইটেই ছেড়ে দিয়েছে। একটা ভাত টিপে দেখার মতো—কলেজের মেয়েরা তোতার সাথে দুই মিনিট কথা বলার পরই বুঝে ফেলবে তার বিদ্যার দৌড়, তখন আর পাত্তা দেবে না।

কাকাতুয়া বলল, তোর মাথা! একবার প্রেমে পড়ে গেলে কোনো অযোগ্যতাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় না। তখন বলবে, রবীন্দ্রনাথ ক্লাস থ্রি পাস, সে তুলনায় প্যারট মিয়া তো ভালোই, ক্লাস সেভেন পাস।

লাইলি বলল, আপু কথা ঠিকই বলছেন।

সেদিন তোতামিয়া ঘিয়ে রংয়ের ইস্ত্রি করা পেন্ট এবং সাদা ফুল শার্ট পরে এসেছে। এটা তার স্বাভাবিক পোশাক নয়, লাইলি কাকাতুয়া আপুর সাথে পরিচয় করিয়ে দেবে। ব্যাপারটা চাকরির ইন্টারভিউর মতো, বোর্ড যেন তার পোশাকে কোনো খুঁত ধরতে না পারে, পোশাকটা যেন অফিসারদের পোশাক বলেই মনে হয়।

কাকাতুয়ার ছুটির আগে দুজন পাশাপাশি কিছুক্ষণ হেঁটেছে, ইগলু আইসক্রিম খেয়েছে। তোতা বলেছে, তোমার ফোন করার দরকার নেই। আমিই করব। মোবাইল সেটটা রাত দশটার পর কাছে রেখ। দু-চারদিন কথা না হলে মন খারাপ করবে না। কখন কোথায় কোন অপারেশনে ব্যস্ত থাকি—বোঝই তো।

লাইলি বলল, সবই বুঝি, কিন্তু আপনি একটু সাবধানে থাকবেন। পকেটমার ধরা পড়লে কিন্তু তার ওপর সবাই হাতের সুখ মেটায়।

তোতা বলল, মন্ত্রী ধরা পড়লেও একই অবস্থা, আরও বেশি কষ্ট দেয়। পেছন দিক দিয়ে গরম ডিম ঢোকায়।

কী যে বলেন, ঢোকে?

ডিম কেন, চাপ দিলে মুরগিও ঢুকে পড়ে।

লাইলি হেসে ওঠে। তখনই কলেজে ছুটির ঘণ্টা বাজে। দুজনই গেটের দিকে এগোয়। কাকাতুয়া বেরোবে।

সেদিন রাত এগারটার দিকে ফোনের কম্পন। লাইলি হ্যালো বলতেই তোতা জিজ্ঞেস করল, কী বলল?

বলেছে, প্যারট মিয়া হেভি স্মার্ট, কলেজের মেয়েদেরই মাথা ঘুরিয়ে দেবে। তখন তোর কোনো খবর থাকবে না।

আমি তো আজকেই একটা মেয়ের মাথা ঘুরিয়ে দিয়েছি। মেয়েটার নাম তাসকিন হাসিন চৌধুরী, দ্বিতীয় বর্ষ বিজ্ঞান, রোল নম্বর ১১২।

তার মানে? একদিনেই এত কিছু জানলেন?

শুধু এতকিছু! ছবিও আছে। দেখতে সুন্দর পাতলা ফ্রেমের চশমা পরে।

লাইলি একটু ঘাবড়ে যায়। জিজ্ঞেস করে, মানে?

বললামই তো, তার মাথা খারাপ করে দিয়েছি।

লাইলি লাইন কেটে দেয়।

তোতা আবার ফোন করে। লাইলি বলে, এমন মানুষের সাথে আমি কথা বলি না। আর ফোন করবেন না।

তোতা বলল, অর্ধেক কথা শুনে রাগ করলে চলবে? অনেক কথা তো শোননি। তোমাদের ম্যাডামকে সালাম করে উঠার সময় পাশের একটা মেয়ের ওপর ছোট্ট একটা অপারেশন করে মানিব্যাগ টাইপের একটা ছোট ব্যাগ তুলে নিয়েছি। টাকা ছিল মাত্র তিরিশ, কলেজের আইডি কার্ড, চারটা রাবার ব্যান্ড আর একটা তেঁতুলের আচার। যখন দেখবে ছোট ব্যাগটা নেই, তার মাথা তখন ঠান্ডা থাকবে? তবে আমি ভুল করেছি। স্টুডেন্টদের ওপর অপারেশন চালানো ঠিক না। তোমরা সবাই চলে যাবার পর স্কুলের গেটে ধাক্কা দিয়ে দারোয়ানকে বের করি। তার হাতে এটা দিয়ে বলি যে রাস্তায় পেয়েছি, তাসকিনের কাছে পৌঁছে দেবেন। তাসকিন এটা পেল কি না আমি পরশুদিন খবর নেব। তখন দারোয়ান বলল, জি স্যার অবশ্যই দেব।

লাইলি বলল, সেটা বলবেন তো। কম বয়সী মেয়েদের ব্যাগে আর হাত দেবেন না, কথা দিন।

তোতা বলল, তোমার ব্যাগ ছাড়া তোমার বয়সী আর কোনো মেয়ের ব্যাগে হাত দেব না।

কথা, ঠিক থাকে যেন।

আচ্ছা। খোদা হাফেজ।

তোতা মিয়ার সাথে আলাপ শেষ করে মনের আনন্দে একটি গ্লাসে চার চারটি লেবু চিপে কাকাতুয়ার দরজায় টোকা দেয়। দরজা খোলামাত্রই কাকাতুয়াকে কদমবুসি করে গ্লাসটা এগিয়ে দেয়।

কাকাতুয়া ধমক লাগায়, আমি কি এই রাতে ঘুমোবার আগে তোকে লেবুর রস দিতে বলেছি?

জি না আপু। মনের খুশিতে।

যা ভাগ। আমার কাজ আছে। মন্টুর ফোন আসবে।

আচ্ছা আপু, যাই।

তারপর বিড়বিড় করে বলল, আমি আমার প্যারট মিয়ার সাথে কথা কেবল শেষ করলাম, আপনার মন্টু মিয়া এতক্ষণে ফোন করবে!

মনের খুশিতে লাইলি চারটি লেবুর রস এক ঢোকে গিলে ফেলল। যতটা বিস্বাদ হবে ভেবেছিল, তার চেয়েও বেশি বিস্বাদ মনে হলো। কিন্তু মনের খুশিতে সব চাপা পড়ে গেল।

চার কি পাঁচ দিন পর তোতার ফোন করার কথা, বুকের ওপর ফোন রেখে লাইলি শুয়ে ছিল। কাঁপা শুরু হলেই সবুজ বোতাম টিপে কানের কাছে নিয়ে বলবে, এতদিনে কথা বলার সময় হলো। দশ দিন পেরিয়ে গেল। তারপর বিশ দিন। তখন ঠিক করল, ফোনটার কাঁপন শুরু হলেই প্রথম পাঁচ মিনিট শুধু গাল দেবে। যত ধরনের নোংরা গাল তার জানা, কিন্তু কোনোদিন চর্চা করার সুযোগ পায়নি, সেগুলো তাকে শোনাবে। ক্রমাগত ফোনের অপেক্ষায় থেকে রাত এগারোটা বাজলেই কাঁদতে শুরু করে, বালিশ ভিজে যায়। তার নির্ধারিত কাজ দায়সারাভাবে শেষ করে। অস্থিরতার মধ্যে দিন কাটে। দফায় দফায় উপবাস করতে থাকে। ক্ষুধা নেই, রুচি নেই—এই এক অদ্ভুত রোগ। সাড়ে চার মাসে অন্তত আট কেজি ওজন কমে যায়। এত ব্যস্ততার মধ্যে ম্যাডাম বেগম আরজুদা মান্নান লাইলিকে স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে গেলেন। তার মূত্র ও রক্ত পরীক্ষা করা হলো।

ডাক্তার বললেন, বোগাস, এ মেয়ের কিছুই হয়নি। না খাওয়াটা এই বয়সী মেয়েদের ফ্যাশন। খাবার সাধবেন না, না খেলে বা কম খেলেও কিছু বলবেন না। খাবার নিয়ে কোনো ধরনের আলোচনাই করবেন না। সব ঠিক হয়ে যাবে।

তিনি বললেন, নিজের মেয়ে হলে এক কথা। কাজের মেয়ে যদি এমন করে, বলুন। ডাক্তার বললেন, আপনি কাজের মেয়ে দেখাতে আমার কাছে নিয়ে এসেছেন, আর কাজ পেলেন না।

তারপর লাইলির সামনেই বললেন, খাবার একদম বন্ধ করে দিন। নো ফুড, নো ড্রিংক। দেখবেন চুরি করে খেতে শুরু করবে।

কাজের মেয়ে তো চুরি করেই খায়। গলদা চিংড়ি খায়, মুরগির ডানা খায় (রান চুরিতে ধরা পড়ার সম্ভাবনা বেশি), খাসির টুকরা খায়, ইলিশ মাছের ডিম খায়, এদিক ওদিক তাকিয়ে আরও কতকিছু গিলে ফেলে—সেই কাজের মেয়ে নাকি খাবে না। কিছু খাবে না, এটা কোনো কথা হলো।

না খেতে চায়, খাবার বাদ থাক, কিন্তু কাঁদবে কেন? তিনি জবাব দেন সব নষ্টের গোড়া ওই কাকাতুয়া। কাজের মেয়েকে আহলাদ দিয়ে মাথায় তুলেছে। বেশ, এখন ঠেলা সামলাও।

তিনি আর একদিন বললেন, সব নষ্টের গোড়া ওই চপলটা। কোত্থেকে টাকা দিয়ে রাস্তাঘাটের একটা মেয়ে কিনে এনেছে। যা এখন এটাকে বেচে আয়। আমার দরকার নেই। আমার লাবুর অবস্থা আগের চেয়ে ভালো। ও এখন একা একাই খেতে পারে। যত তাড়াতাড়ি পারিস তোরা এই আপদ বিদায় কর।

কাকাতুয়া বলল, না খাবি তো বেশ, কিন্তু কাঁদবি কেন?

দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে লাইলি বলল, আমার দুঃখ আপনি কেমন করে বুঝবেন?

কেন রে, প্যারট মিয়া পালিয়েছে নাকি? এত স্মার্ট ছেলে, কে জানে আমার কোনো বান্ধবী তার সাথে প্রেম শুরু করেছে কি-না। তোকে আমি আগেই বলেছিলাম এদের কোনো বিশ্বাস নেই।

লাইলি বলল, অবিশ্বাস করার মতো কোনো কাজ তো এ পর্যন্ত করেনি। একদিনও তো আমার হাত ধরে টানাটানি করেনি, অথচ মানুষ এ সময় কত কিছুই নাকি করে, পেটেও বাচ্চা এসে যায়।

এই ফাঁকে কাকাতুয়া ঘোড়া মন্টুর সথে কতটুকু এগিয়েছে, ছোঁয়াছুঁয়ি ও ধরাধরি তো হয়েছেই, তারপর কতদূর—এই হিসাবটা করে নিল। যে অবিশ্বাসের কথা লাইলিকে বলেছে, সেখানে তার মন্টু কতখানি বিশ্বাসযোগ্য সে প্রশ্নও তার মনে জাগে।

একটু দম নিয়ে আবারও দীর্ঘশ্বাস ফেলে লাইলি বলল, তোতা পালাবার মানুষ নয়। তাকে কেউ খুন করেছে কিংবা তিনি অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছেন।

কাকাতুয়া জিজ্ঞেস করে, তাকে কে খুন করবে?

খুনি, আপু খুনিরা তাকে খুন করবে। দেশটা খুনিতে ভরে গেছে।

প্যারট মিয়া কি এত গুরুত্বপূর্ণ মানুষ?

তাহলে আপু অ্যাকসিডেন্টে মারা গেছে। গাড়ির নিচে পড়েছিল। শরীর দুই টুকরা হয়ে গেছে, মাথাও ফেটে গেছে।

মরে গেলে আর কী করবি। ওয়েট ফর নাইটিঙ্গল মিয়া।

দশ

পরদিন চপল সারা শহর ঘুরে লাইলির একটি বন্দোবস্ত করল।

ড্রইংরুমে তার তেমন আসার নজির নেই। বেগম আরজুদা মান্নান তখন টিভির পর্দায় নিজেকে খুঁজছেন। তার দলের সভা ছিল। তিনি সামনের কাতারেই বসে ছিলেন। চপলকে ড্রইংরুমের দিকে এগোতে দেখে কাকাতুয়াও চলে আসে।

চপল খুব বিনয়ের সাথে বলে, আজ মঙ্গলবার। লাইলি কি আর দু-দিন একরাত এ বাড়িতে থাকতে পারে?

ঘাড় না ঘুরিয়ে এ বাসার ম্যাডাম বললেন, কেন, কী হয়েছে?

লাইলির জন্য একটি ভালো বন্দোবস্ত করেছি। ছেলেটি ভালো। আমি নিজে দেখেছি। তার থাকার জায়গাটিও ভালো, লাইট ও ফ্যান আছে।

কাকাতুয়া অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, কী বলছ চপল ভাইয়া।

চপল বলল, ঠিকই আছে, মা বলেছিলেন লাইলির বিদায়ের বন্দোবস্ত করতে। আমি ছবি নিয়ে এসেছি, দেখতে খুবই সুন্দর। চান্দখার পুল ছোট মসজিদের মুয়াজ্জিন, নাম খায়রুল আলম রব্বানী, আদি বাড়ি চাটখিল। পিতামাতা দুজনই মৃত। দুই বোন বিবাহিত। সংসার টানার কোনো ঝামেলা নেই। লাইলিকে বিয়ে করার জন্য তার অতিরিক্ত কোনো দাবি নেই। কিছু না দিলেও সমস্যা নেই।

তারপর একটি ফোল্ডারের ভেতর থেকে তার একটি ছবি বের করে দেখাল। কাকাতুয়া ছবি দেখল, ম্যাডামও দেখলেন।

কাকাতুয়া বলল, লাইলিকে না দেখেই রাজি হয়ে গেল?

জি, আমার কথা মুয়াজ্জিন সাহেব বিশ্বাস করেছেন। আমি বলেছি, লাইলি দেখতে সুন্দর, স্বভাবচরিত্রও ভালো, ঘরের কাজে আরও বেশি ভালো। তিনি শুধু জিজ্ঞেস করেছেন, নামাজ-রোজা করবে তো? আমি বলেছি ইনশাল্লাহ।

বেগম আরজুদা হঠাত্ চেঁচিয়ে উঠলেন, লাইলির বিয়ে ঠিক করতে তোকে কে বলেছে? আমি বলেছি?

জি না, আপনি বলেননি। আপনি শুধু তাকে বিদায় করতে বলেছেন। আমি ভাবলাম, লাইলির বয়সী একটা মেয়ের জন্য এ বাড়িটা যত নিরাপদ, অন্য কোনো বাড়ি তেমন না-ও হবে পারে। সেজন্যই তাকে একজন ভালো স্বামীর হেফাজতে দেবার সিদ্ধান্ত নিই। বৃহস্পতিবার মাগরেবের পর মুয়াজ্জিন সাহেব, ইমাম সাহেব তাদের পরচিত লোকজন কাজি সাহেবকে নিয়ে আসবেন। মুয়াজ্জিন সাহেব বেশি পদের খাবার-দাবার না করার জন্য বলেছেন। দেড়-দুঘণ্টার মধ্যেই সব শেষ হয়ে যাবে, মুয়াজ্জিন সাহেব লাইলিকে একবারে তুলে নিয়ে যাবেন। আমরা চাইলে পাঁচ-দশজন গেস্ট নিয়ে রোববার সন্ধ্যায় তাদের দাওয়াত কবুল করতে পারি।

ততক্ষণে লাইলিও এসে দাঁড়িয়েছে।

বেগম আরজুদার ফুঁসে ওঠা ক্রোধ কমাতে কাকাতুয়াই চপলকে জিজ্ঞেস করল, তুমি যার বিয়ে ঠিক করেছ, সে বিয়ে করবে কি-না জিজ্ঞেস করেছ?

চপল বলল, বিয়ে না করার কী আছে। পাত্র ভালো, দেখতে সুন্দর, সত্ মানুষ। এমন বরই তো খোঁজা উচিত।

কাকাতুয়া বলল, ঠিক আছে চপল ভাইয়া, তুমি যখন কষ্ট করে একজন ভালো পাত্র বের করেছ, এটা আমার জন্য রেখে দাও। আর কাকাতুয়া আপাতত বিয়ে করবে না, এই বাড়ি থেকেও যাবে না। তুমি শুধু চান্দখার পুলের পার্টিকে কিছুদিন অপেক্ষা করতে বল। আমি তো আছি।

ম্যাডাম রাগে দাঁত কটমট করতে করতে বেরিয়ে যাবার সময় বললেন, তুই চপলকে সামলা, নতুবা লাইলির সাথে চপলকে বাড়ি থেকে বের করে দেব।

লাইলি আলোচনার কিছুটা বুঝেছে, কিছুটা বোঝেনি। চপল ভাইয়ার সাথে বেরিয়ে গেলে মন্দ কী। তিনি ভালো মানুষ, তাকে বিপদের মুখে পড়তে দেবেন না।

কাকাতুয়া মুয়াজ্জিন খায়রুল আলম রব্বানীর ছবিটা লাইলিকে দেখায়—এই লোকটাকে বিয়ে করবি? খুব ভালো মানুষ।

লাইলির চোখের সামনে তখন ভাসমান তোতা মিয়ার গোলাপি শার্ট পরা চেহারা। মানুষটা মরেই গেল! তার চোখ ফেটে অশ্রু গড়াবার উপক্রম হচ্ছিল, তখন লাবুর রুমের কলিংবেল বেজে ওঠে। অশ্রু সামলে লাইলি ছোটে। এটাই আইন। যখন লাবু বেল টিপবে তখন এটাই হবে লাইলির সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। প্রতিবন্ধী লাবুকে অনেকটা বন্দি জীবন যাপন করতে হলেও লাইলিকে সেবাদানে সবার আগে ছুটতে হয় লাবুর কাছে।

লাবু তাকে টেনে বাথরুমে নিয়ে আসে, কমোড দেখায়, লাইলি তাকিয়ে দেখে, ভেতরে পড়ে আছে লাবুর চশমা। অঙ্গভঙ্গি করে লাবু তার কাছে ক্ষমা চাচ্ছে, আর কখনো চশমা কমোডে পড়বে না সেই প্রতিশ্রুতিও দিচ্ছে।

একটা পলিথিন ব্যাগে হাত ঢুকিয়ে লাইলি সে হাতে কমোড থেকে চশমা তুলে এনে পানিতে ভালো করে ধোয়, আবার সাবান মাখে আবার ধুয়ে তোয়ালেতে মুছে লাবুর চোখে পরিয়ে দেয়। তারপর নিজের বিছানায় গিয়ে শুয়ে থাকে।

ড্রইংরুমের আলোচনার সমাপ্তি টেনে কাকাতুয়া বলে, চপল ভাইয়া, তুমি চিন্তা করো না, আমাকে শুধু ঠিকানাটা দাও, আমি ম্যানেজ করব।

চপল ধমকে ওঠে, তোর যেতে হবে না! যা করার আমিই করব। মাকে এমন উল্টাপাল্টা হুকুম দিতে মানা করিস।

কাকাতুয়া অবাক হয়, সন্তুষ্টও হয়। এই প্রথম চপল তার অধিকার কিছুটা হলেও খাটিয়েছে। তাকে ধমক দিয়েছে, তুই করে বলেছে এবং মায়ের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছে।

সে রাতে আরও অনেকক্ষণ চপল-কাকাতুয়া কথা হয়েছে। চপল বলল, মা লাইলিকে বিদায় করার কথা বলেছে।

কাকাতুয়া বলল, মা মোটেও তা বলেনি, লাইলি খাচ্ছে না বলে খাওয়ার জন্য হুমকি দিতে মা এ কথা বলেছে। তাছাড়া মেয়েটার হাতে যাদু আছে, লাইলি আসার পর থেকে লাবুর অবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছে। স্বাস্থ্যটাও ভালো হয়েছে। সে রকম বড় ধরনের কোনো দুর্ঘটনা ঘটায়নি। মা কোনোভাবেই লাইলিকে ছাড়বে না। এমনকি তুমি মনে রেখো, মা লাইলিকে বিয়ে করতেও দেবে না। মা-র কাছে ফার্স্ট প্রায়োরিটি পলিটিক্স হতে পারে, ছেলেমেয়েদের মধ্যে লাবুই তার একমাত্র প্রায়োরিটি।

এগারো

লাইলি যখন খাওয়া-দাওয়া থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে চাইছে, ভেতরের কান্না শরীর পরাভূত করে তাকে কাঁপিয়ে তুলছে, তোতাকে ছাড়া জীবন যখন তার কাছে সম্পূর্ণ অর্থহীন হয়ে পড়েছে, এমন সময় চপলের বিয়ে ধার্য করা এবং ভেঙে দেওয়ার পরদিন লাবু দুপুরের খাবার ফিরিয়ে দিল। রাতের খাবারেও একই ইঙ্গিত, খাবে না। কাটল অনাহারে। সকালে কেবল পানি কয়েক ঢোক, দিনটাও গেল একইভাবে। স্থানীয় ডাক্তার এসে দেখে গেলেন, বললেন, চেম্বার বন্ধ করে ফেরার পথে ইন্ট্রাভেনাস গ্লুকোজ দিয়ে দেব।

ডাক্তার চলে যাবার পর লাইলি আবার খাবার নিয়ে যায় এবং তাকে বোঝাতে চেষ্টা করে, না খেলে সে মারা যাবে। লাবু তার নিজস্ব ভাষায় গো গো করে কিছু একটা বলে। কখন একটি-দুটো শব্দও করে—না, না বলে।

লাইলি লাবুর ভাষা বোঝে। তবে ভাষাটা তাকে শিখতে হয়েছে। তার জন্য দরকার হয়েছে নিবিড় পর্যবেক্ষণ। লাইলি যখন কাজে যোগ দেয় তার মূল দায়িত্ব ছিল লাবু দরজা খুলে কোথাও চলে যায় কি-না এটা লক্ষ রাখা। সে রকম কিছু লক্ষ করলে তার প্রথম কাজ দারোয়ান কাম কেয়ারটেকার নূরু মিয়াকে জানানো। তারপর ম্যাডামকে। আবদুল মান্নানকে জানানো না জানানো একই কথা, তিনি তার পুশ চেয়ার ঠেলে কোথাও যেতে পারবেন না। তিনি চেয়ারবন্দি মানুষ। তার চাকরির প্রথম মাসে তিনবার, দ্বিতীয় মাসে দু-বার এবং চতুর্থ মাসে একবার এমনটা ঘটেছে। প্রথম মাসের প্রথম চলে যাওয়াটাই সবচেয়ে দুশ্চিন্তার। লাইলি লাবুর পেছন পেছন ছুটেছে, গেটে নুরু মিয়া ছিল না। সুতরাং, গেট থেকে বেরিয়েই লাবু ভোঁ দৌড় দেয়। লাইলি শুধু এটুকু বলতে পেরেছে যে দক্ষিণ দিকে গেছে।

সে রাতে লাবুর আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। ম্যাডাম ঢাকা ছিলেন না বলে রক্ষা। লাইলি কিংবা নূরু মিয়া কেউ চাকরিচ্যুত হয়নি। পরদিন সকাল সাড়ে ন-টায় খবর আসে, একজন আত্মীয় ফোন করে জানান, লাবু নিউমার্কেট পাবলিক টয়লেটের বাইরে গালে হাত দিয়ে বসে আছে। বাবু বলল, আমার সময় নেই, নূরু মিয়া নিয়ে আসুক। দিনটা শুক্রবার হওয়ায় রক্ষা। কাকাতুয়া লাইলিকে নিয়ে বের হয়। সেখানে সেই অবস্থাতে তাকে পায়। লাবু রিকশা, অটোরিকশা কোনোটাতে উঠতে চায় না। এরই মধ্যে লাইলি কয়েকটি মুহূর্ত সরাসরি তার চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে হাত ধরে টান দেয়। বলে, চলেন আমার সাথে। এক ধরনের গো গো শব্দ করে সুবোধ কিশোরের মতো লাবু হাঁটতে থাকে।

কাকাতুয়া লাইলিকে বলে, শক্ত করে ধরে রাখিস, ছুট দিতে পারে।

লাইলি বলল, চিন্তা করবেন না, আপনি আগে আগে বাসার পথে হাঁটেন। আল্লাহর রহমত আমরা আপনার পেছন পেছন আসছি।

লাবু বেরিয়ে গেলে লাইলির চাকরি যাবে, তাকে না খেয়ে মরতে হবে, ইশারায় ইঙ্গিতে এটা তাকে বোঝাতে লাইলির তিন মাস লেগে যায়। চতুর্থ মাসে নিজের রুম থেকে বের হলেও গেটের বাইরে যাবার চেষ্টা করেনি। দিনে-রাতে বহুবার লাইলি একাই লাবুর ঘরে গিয়েছে, বিছানা ঠিকঠাক করেছে, কমলা ছিলে দিয়েছে, বোতল থেকে গ্লাসে পানি ঢেলেছে, রাথরুমে ঢুকে ফ্লাশ টেনেছে। প্রথম দিকে অসহযোগিতার ভাব থাকলেও পরে হয় সহযোগিতা করেছে, নয় কখনো নিষ্ক্রিয় থেকেছে। অধিকাংশ সময়ই বোকার মতো তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। বাবু ভাইয়ের স্ত্রী বহুবার বলেছে, পাগলের ঘরে মেয়েমানুষ কেন পাঠাচ্ছে, কখন রেপ করবে কে জানে। লাইলির অভিজ্ঞতা ভিন্ন, গায়ে হাত দেয়া তো দূরের কথা, লাইলির হাতের ছোঁয়া লাগতে পারে সে ভয়ে দু-হাত বুকের কাছে গুঁটিয়ে রেখেছে।

লাবুর মুখের শব্দ তো একটাই—গো গো।

কিন্তু লাইলি আবিষ্কার করেছে, ধ্বনির তারতম্যে গো গো-র মানেও পাল্টায়। কোনটা আনন্দের ঘো, কোনটা বেদনার—লাবু যেমন জানে, লাইলিও জানে।

যে মা-র সন্তানের অব্যক্ত কথাও বোঝার কথা সেই বেগম আরজুদা মান্নানকে ছেলের কথা বুঝতে সাথে দোভাষী রাখতে হয়। লাইলিই সে দোভাষী। লাবুর সাথে যোগাযোগের প্রশ্নে লাইলি নিজেকে এতটাই অপরিহার্য করে তুলেছে যে, মুখে যে যা-ই বলুক লাইলিকে লাবুর মা যেতে দেবেন না।

স্বেচ্ছা-অনশনে থাকা লাবু খাবার সামনে নিয়ে লাইলির দিকে তাকিয়ে গো গো করল, লাইলি অবলীলায় তার মানে বের করে ফেলল। লাবু বলতে চাচ্ছে, লাইলি তুমি খাচ্ছ না কেন? তুমিও মরে যাবে। তাহলে আমার আর বেঁচে থেকে লাভ কী? আমি ঠিক করেছি আমিও খাব না।

লাবুর মুখের ভাষা ও চাহনির এই যে অদ্ভুত প্রকাশ লাইলি আবিষ্কার করতে পেরেছে, তাতে সবচেয়ে বেশি আনন্দ লাবুরই।

লাইলি বিড়বিড় করে বলল, লাবু ভাই আপনি খান। আমি সামান্য একজন মানুষ, আমি বেঁচে থাকলেই কী, মরলেই কী।

লাবু আবার গো গো করে, লাইলির যুক্তি প্রত্যাখ্যান করে।

লাইলি বলে, আপনি না খেলে সিরিঞ্জ দিয়ে আপনার শরীরে খাবার ঢোকানো হবে, আপনি কষ্ট পাবেন।

লাবু গো গো করে। লাইলি এর মানে বের করে—আমি সিরিঞ্জ ভেঙে ফেলব, আমি কিছুতেই খাব না।

পাশে দাঁড়িয়ে দুজন অভুক্ত মানুষের ভাব বিনিময় দেখছে কাকাতুয়া। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে কিছু দেখছেন বেগম আরজুদা নিজেও।

এক সময় লাইলি বলে, ঠিক আছে, আমি খাচ্ছি।

লাবু গো গো করে। লাইলির মুখে হাসি। লাবু বলছে তাহলে আমিও খাব।

লাবুর প্লেট থেকে প্রথম লোকমা খাবার নিজে খায়, দ্বিতীয় লোকমা তৈরি করতেই লাবু হা করে, লাইলি তার মুখে খাবার তুলে দেয়। আমি একবার, তুমি একবার এই করতে করতে দুজনের অনশন ভাঙে। লাবু ভাঙে লাইলির অনশন, লাইলি ভাঙে লাবুরটা।

নূরু মিয়াকে দিয়ে ডাক্তারকে খবর পাঠানো হয়, গ্লুকোজ স্যালাইন নিয়ে আসার দরকার নেই, লাবু খেতে শুরু করেছে।

নির্বোধ পরিচিতি নিয়ে বেড়ে ওঠা লাবু তার নিজস্ব ভাষা ব্যবহার করে লাইলির বুকের ভেতরের একটা চাপা কষ্ট অনেকটাই কমিয়ে আনে।

লাইলি আস্তে আস্তে বলে, লাবু ভাইয়া, আপনি অনেক ভালো।

মেয়েটির ঠোঁট নড়া দেখে লাবু আনন্দিত হয়ে গো গো শব্দ করে।

লাইলির কাছে এর মানে তুমি আরও বেশি ভালো।

তার খুব রাগ হয় তোতা মিয়ার ওপর। এই পকেটমার লাবু ভাইয়ার কব্জি কেটে ফেলতে চেয়েছে। লাবু ভাইয়ার মিডল স্ট্যাম্প উড়িয়ে দিতে চেয়েছে। কী সব খারাপ কথাই না তার সম্পর্কে বলেছে।

লাইলি বিছানায় ফিরে ক্রুদ্ধ স্বরে বলে, তুই কে? তুই তো একটা পকেটমার। পকেটমারের বউ হতে আমার বয়েই গেছে। তোর সাথে আমার সব শেষ।

লাইলি দ্রুত তার রুমে গিয়ে তার মোবাইল ফোন থেকে চার্জার বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। মাসের পর মাস অকারণেই ফোনের ব্যাটারি চার্জ দিয়েছে। একটা ফোনও তো আসেনি। ফোনে আর চার্জ নয়। আস্তে আস্তে পুরো যন্ত্রটাই ডেড হয়ে যাবে। যাক। চোখ ফাটা কান্না নিয়ে নিয়ে লাইলি অভিশাপ দেয়, তুই মর।

লাইলি অনেকটাই আগের অবস্থায় ফিরে এসেছে। কিন্তু ফিরতে পারেনি কাকাতুয়া। তবে তার শোকের সংস্কৃতি ভিন্ন। কথা বলে না, দরজা বন্ধ করে আলো নিভিয়ে শুয়ে থাকে, বসে থাকে। কিন্তু লাইলি অনুভব করে, কাকাতুয়া আপু যা-ই করুক কষ্টটা একই, তার কষ্টের মতোই।

মুণ্ডুহীন একটা লাশ পাওয়া যায় আশুলিয়া সড়কের ঢালে। পরদিন খাবরের কাগজে ছবি এল। শিরোনাম : কোন হতভাগার এই মুণ্ডুহীন লাশ?

শুধু মুণ্ডু থাকলে চিনতে সমস্যা হয় না। গোটা দিন গেল, কার লাশ জানা গেল না।

তবে পরদিন সংবাদপত্রের একটি ছোট বক্স নিউজে জানাজানি হয় গেল শুটার মনটু আর নেই। একেবারে দু টুকরো। ধর থেকে মাাথা পুরো আলাদা করে ফেলেছে। একজন অজ্ঞাত ব্যক্তি রাত এগারোটার দিকে ফোন করে একটি বড় পত্রিকার নিউজ এডিটরকে জানায়, আমরা এই শুটার মন্টুর মুণ্ডু মেঘনা সেতুর ওপর থেকে নিচে ফেলেছি।

নিউজ এডিটর জিজ্ঞেস করলেন, শুধু মুণ্ডু কেন, বাকিটা কোথায়?

জবাব এল, বস, নেভার মাইন্ড আমাদের ভাগে মুণ্ডু ডিসপোজাল। এর বেশি বলতে পারব না।

এটা যে শুটার মন্টু তা নিশ্চিত তো?

মানুষ তো চেহারা দিয়ে চিনতে হয় নাকি পাছা দিয়ে? চেহারা দিয়ে হলে এটাই শুটার মন্টু।

নিউজ এডিটরের আরও প্রশ্ন ছিল। কিন্তু অপর প্রান্তের ফোন বন্ধ হয়ে যায়। কী কারণে তারা এ খবরটি সংবাদপত্রকে জানাল, তা-ও স্পষ্ট হলো না।

তার পরদিন সরকারি দলের যুবফ্রন্ট বিক্ষোভ করল, সামান্য ভাংচুরও হলো। তারা শহীদ মন্টুর রক্ত বৃথা যেতে দেবে না। এক মন্টু লোকান্তরে লক্ষ মন্টু ঘরে ঘরে। রক্তের জবাব তারা রক্তেই দেবে।

শুটার মন্টু বাঁচল কি মরল তাতে কাকাতুয়ার কিছু যায় আসে না। সমস্যা হচ্ছে ঘোড়া মন্টুকে নিয়ে।

মুণ্ডু না পেলেও দেহটি যে শুটার মন্টুর এটাই অনুমান করা হয়। খবরটি পত্রিকায় ছাপা হবার পর থেকে ঘোড়া মন্টুর সাথে কাকাতুয়া কষ্ট করেও আর যোগাযোগ করতে পারছে না।

বিভিন্ন ধরনের কথা তার কানে আসছে : ঘোড়া মন্টু নিজের হাতে শুটারকে খুন করেছে। ঘোড়া মন্টু বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে ভারতে চলে গেছে। শুটার মন্টুর অভিভাবকরাই ঘোড়া মন্টুকে সীমান্ত অতিক্রম করতে সাহায্য করেছে। ঘোড়া মন্টুকে ক্রসফায়ার দেখিয়ে হত্যা করা হয়েছে।

শুটার মন্টুর শরীরের অর্ধেকটা হলেও তো পাওয়া গেছে, ঘোড়া মন্টুর তো কিছুই পাওয়া গেল না।

পরদিন খবরের কাগজ ছেপেছে : মর্গে পড়ে আছে মুণ্ডুহীন লাশ। শুটার মন্টুর লাশ বলে সন্দেহ করা হলেও এখন পর্যন্ত কেউ লাশ সনাক্ত করতে কিংবা নিতে আসেনি। হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত সন্দেহে দুজন গ্রেফতার বলে জানানো হলেও সংখ্যা আরও বেশি বলে অনুমান করা হচ্ছে। মেঘনা ব্রিজ থেকে অজ্ঞাত যে ব্যক্তি ফোন করেছিল, তাকেও আটক করা হয়নি। এদিকে শামসুল হক মন্টু ওরফে ঘোড়া মন্টুর পিতা আবদুল হক জানিয়েছেন, সাদা পোশাকধারী চারজন মধ্যরাতে ঘুমন্ত মন্টুকে ধরে নিয়ে গেছে। এদিকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা জানিয়েছে তারা শামসুল হক মন্টু বা ঘোড়া মন্টু নামের কাউকে গ্রেফতার করেনি। আবদুল হক অজ্ঞাত চারজনের বিরুদ্ধে তার পুত্র-অপহরণের মামলা করেছেন। স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মীরা জানিয়েছেন শুটার এবং ঘোড়া-উভয় মন্টুই একই রাজনৈতিক দলভুক্ত, চাঁদাবাজ হিসেবে দুজনেরই কুখ্যাতি রয়েছে।

এ ধরনের সংবাদের আড়ালে কাকাতুয়ার দীর্ঘশ্বাস মিলিয়ে যেতে থাকে। লাইলির যন্ত্রণার যখন সাড়ে চার মাস, কাকাতুয়ার তখন ঘোড়া মন্টুকে হারানোর দেড়মাস চলছে। তবে দুজনের চোখেই একটা ভরসা যে তোতা কিংবা গোড়া মন্টু কারোই মৃত্যুর নিশ্চিত সংবাদ আসেনি। তাহলে তাদের ফেরার সম্ভাবনা রয়ে গেছে। ফিরলেই কি কাকাতুয়া কুখ্যাত চাঁদাবাজের বাইকের পেছনে আবার দু-দিকে দু-পা ছড়িয়ে বসবে? প্রশ্নটা তারই, কাকাতুয়া উত্তর খুুঁজে পাচ্ছে না।

লাইলি ছ-সাত দিন পর ফোনটাকে চার্জে দিল। সারারাতে ফুল চার্জ হলো। ভোরে তোতার নম্বরে কল দিল। বারবার একই কথা শুনল, মেয়াদ শেষ হয়েছে, রিচার্জ করুন। লাইলি মানে বুঝল না, কাকাতুয়ার কাছে নিয়ে গেল।

কাকাতুয়া ৫০ টাকা দিয়ে বলল, যা ফ্লেক্সিলোড করে নিস। কলেজে যাবার সময় দেখিয়ে দেব। লাইলির ফোন আবার জেগে উঠল, কিন্তু ও প্রান্তে বলল, এই নম্বরটি এখন বন্ধ আছে।

তাহলে মৃত্যু নিশ্চিত।

লাবুর রাতের খাওয়া শেষ হলো। তার খেতে ইচ্ছে করল না। শুয়ে পড়ল, সাথে সাথেই চোখ ভরে উঠল নিঃশব্দ কান্নায়। পকেটমার হোক, ডাকাত হোক, মন্ত্রী হোক, মানুষ তো! মানুষটা ভালোই তো ছিল। তিনি যদি না চাইতেন, বিসমিল্লাহ হোটেলের কেবিনে তার বসা হতো না কোনোদিনও। চোখ গড়িয়ে যখন অশ্রু ঝরছে তখনও তার নাকে আসছে হোটেলের সকালবেলার হালুয়ার ঘ্রাণ। নিজেকে ধিক্কার দেয়—একজন মানুষ হয়ে সে অন্য একজন মানুষকে মরার জন্য অভিশাপ দিয়েছে। এ কী নিষ্ঠুরতা! লাইলি তার অভিশাপ প্রত্যাহার করে নেয়। —আমার সাথে সম্পর্ক না থাকে না থাকুক কিন্তু মানুষটা যেন বেঁচে থাকে।

বারো

বহুদিন পর রাত এগারোটার দিকে ফোনটা কাঁপতে শুরু করল। তখনও লাইলির রুমের আলো নেভেনি। ঘাড় ঘুরিয়ে কতক্ষণ ফোনটার দিকে তাকিয়ে রইল। সত্যিই দেখছে তো। নাকি বিভ্রম! এর নামই কি আলেয়া?

কাঁপছে। লাইলি এদিক ওদিক তাকায়—আর কিছু কাঁপছে না তো? ভূমিকম্প কিংবা অন্য কিছু?

ধীরে ধীরে ফোনের কাঁপন থেমে যায়।

লাইলি এবার নিজেকে ধাক্কা দিল—আমি এ কোন ডাইনি? ফোনটা ধরলাম না কেন?

আসলে এটাতে যে ফোন আসতে পারে সেই বোধশক্তিই লোপ পেয়েছে তার। ফোন আবার কাঁপতে শুরু করল। রিসিভার আঁকা বাটনটিতে চাপ দিয়ে চাপা কণ্ঠে হ্যালো বলতেই ও প্রান্ত থেকে বলতে শুরু করল, লাইলি, আমাকে আটকে রাখে কোন শালা! চারটার দিকে জেলখানা থেকে ছাড়া পেয়েছি। একটা হাইজাকিং-এর মামলায় আমাকে আটক করেছিল। বুঝলে লাইলি, মানুষ জাতটাই খারাপ, আচ্ছা বেইমান। বেশ তো ধরে ফেলেছে, মানলাম, তারপর দিল গণধোলাই, এক শালার বাচ্চা এক ঘুষি মেরে কানকপাটি লাগিয়ে দিল। আমার দাঁত ভাঙলে কী হবে ওই বানচোতের হাতও কেটেছে। বেশ, ধোলাই দিলি মানলাম। পুলিশের হাতে দিয়ে দে, আমি ম্যানেজ করে বেরিয়ে আসব। শালার এক চুতিয়া পুলিশের কাছে দিয়ে আবার তোমার ছোট মামার বাচ্চা পুলিশ কমিশনারকে ফোন করে বলল, দারোগার বাচ্চা পকেটমারকে ছেড়ে দেবার তালে আছে। বেশ ফেঁসে গেলাম। মামলা-টামলা হয়ে এ ক-টা দিন খাটতে হলো। ফোনটা ভাগ্যিস সেদিন মনের ভুলে নিইনি, তাহলে আজ আর ফোন করা হতো না। আমি তোমার কথা মানি, পকেট কাটার কাজটা দেশের ড্যাশ মারার চেয়ে ভালো হলেও, আসলে কাজটা খারাপ। তুমি একদম চিন্তা করবে না। লাইন পেয়ে গেছি। ছোট জিনিস দেবে। সমস্যা একটাই লাভের ফিফটি ফিফটি।

ফোনের অপর প্রান্তে ফোঁপানোর শব্দ। তোতার সব কথা তার কানে যায়নি। কোন এক শালার বাচ্চার ঘুষিতে তোতার দাঁত ভাঙার পর্বে গিয়ে আটকে আছে লাইলির মন।

তোতা বলল, তোমার আপু কেমন আছে? নাইস লেডি। এই চার-পাঁচ মাসে তোমার চেহারা কি আগের চেয়ে সুন্দর হয়েছে? শোন, কালকের দিন বাদ থাক, পরশু অবশ্য দেখা করবে। অনেকদিন বিসমিল্লাহর কাবার খাইনি। আচ্ছা, খোদা হাফেজ।

তোতা ফোন রেখে দেয়, লাইলির একটি কথাও বলা হয় না।

ফোন রেখে দিয়ে লাইলি আর একবার কাঁদে, কত বড় শয়তান! আমি কেমন আছি একবারও জিজ্ঞেস করল না। কান্না থামার পর নিজেকে গুটিয়ে আনে, এবার আল্লাহর মেহেরবানির প্রশংসা করে। সে যে তার অভিশাপ প্রত্যাহার করে নিয়েছে, মেহেরবানি করে আল্লাহ তা কবুল করেছেন। বেঁচে আছে সেজন্যই।

কলেজে যাবার পথে লাইলি কাকাতুয়াকে বলল, ইনশাল্লাহ আপু তিনি ফিরে আসবেন।

তুই কার কথা বলছিস?

আপনার তিনি, মন্টু দুলাভাই।

তুই জানলি কেমন করে?

প্যারট মিয়া ফিরে এসেছে কিনা, তাই।

বদমাশটা এতদিন কোথায় ছিল?

আর বলবেন না আপু, খাঁচার ভেতরে ছিল।

মানে?

জেলখানায়?

কেন?

মারামারির মামলায় ফেঁসে গিয়েছিল। বদমেজাজি টাইপের মানুষ তো। একজনকে এমন ঘুষি মেরেছে, একেবারে কানকপাটি লেগে গেছে। তার দাঁত ভেঙেছে। অবশ্য তোতারও হাত কেটেছে। চরভাঙ্গা মানুষ তো, রাগ সামলাতে পারে না। মামলায় জেল খেটে বের হয়েছে। সেজন্যই বলছি, তিনি যেখানেই থাকুন সব বিপদ-আপদ কাটিয়ে ইনশাল্লাহ ফিরে আসবেন।

কাকাতুয়া বলল, এ রকম একটা বদমেজাজি মানুষের সাথে তুই সম্পর্ক রাখবি?

কী করব আপা, মেজাজ খারাপ হলে কী, মানুষটার দিল খুব পরিষ্কার, বোতলের মিনারেল ওয়াটারের মতো ঝকঝকে, বুকটা ভরা শুধু মায়া।

বেশ। তুই মায়া নিয়ে থাক। আমার প্যারট মিয়া ফিরে এলেও আমি আর তাকে অ্যাকসেপ্ট করব না। আমি সিরিয়াসলি পড়াশোনা করে ভালো একটা সাবজেক্টে ভর্তি হব। এটাই আমার একমাত্র প্রায়োরিটি।

লাইলি বলল, আপনার কথা অবশ্য আলাদা। তবে তিনি যদি ফিরে এসে সরি বলেন আপনি তাকে ফিরিয়ে দেবেন না। মানুষের মন ভাঙা পাপ।

থাক তোকে পাপ-পূণ্য নিয়ে পণ্ডিতগিরি করতে হবে না। মেজাজ খারাপ মানুষের মেজাজ খারাপ হলে বউকেও গলা টিপে মেরে ফেলে, জানিস তো?

না আপু, মেজাজ তত খারাপ না।

না হলেই ভালো, বলে কাকাতুয়া কলেজের গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকে যায়।

তোতা হাত ধরে লাইলিকে টান দেয়, চলো রাস্তা পার হই।

এতক্ষণ গেটের কাছাকাছিই দাঁড়িয়ে ছিল। দুই রাস্তার মধ্যকার আইল্যান্ডে দাঁড়িয়ে তোতা বলল, তুমি আগের চেয়েও ফরসা হয়েছ।

লাইলি বলল, আপনার চোখ নষ্ট হয়ে গেছে, ডাক্তার দেখান।

বিসমিল্লাহ হোটেলে পৌঁছা পর্যন্ত আর কোনো কথা হয়নি। ভেতরে ঢুকে দুজনই থ। কেবিন উঠিয়ে দিয়েছে। তাতে হোটেলটাকে আরও বড় মনে হচ্ছে। তোতা তবুও বেয়ারাকে বলে, কী ভাই, কেবিন গেল কই?

বেয়ারা লাইলিকে শুনিয়েই বলল, চুমাচুমির দিন শেষ। হোটেলের মালিক বদল হয়েছে। তিনি এসব বেশরিয়তি কাজ পছন্দ করেন না।

এক কোণে একটি টেবিল বেছে নিয়ে তোতা বলে, পরোটা হালুয়া আর ভাজি।

বেয়ারা বলে, হালুয়ার দিন শেষ। নাস্তায় দুই আইটেম : পরোটা আর চিকেন ঝালফ্রাই অথবা ভুনা খিচুড়ি আর চিকেন কারি।

তোতা বলে, বেশ ভুনা খিচুড়ি লাগাও।

লাইলি বলে, দাম জিজ্ঞেস করলেন না, টাকা আছে তো?

টাকা তোতার হাতের ময়লা, আজ আছে কাল নেই।

ভুনা খিচুড়ি আর চিকেন কারিতে তো হালুয়ার স্বাদ নেই। তবুও লাইলি মজা করেই খেল। তারপর দুজনের জন্য দু-কাপ চা।

তোতা বলল, ভালো করে দেখ, আমার চেহারা আর স্বাস্থ্য আগের চেয়ে অনেক ভালো হয়েছে। জেলখানার রুটি আর ডালের টেস্টই আলাদা। নিয়মিত খাওয়া-দাওয়া করলে আর ছায়ায় থাকলে চেহারা খুলবেই। তবে একটা সমস্যা হয়েছিল—শালার এক হোমোর বাচ্চার খপ্পরে পড়ে যাচ্ছিলাম। বেঁচে গেছি।

মানে?

হোমো মানে হোমো। এখন থাক, অন্যদিন বলব। শোন, দেড় রুমের একটা বাসা দেখেছি। ভাড়া একটু বেশি। যন্ত্রটা হাতে পেলে ইনকামও বাড়বে, অসুবিধা হবে না। তুমি রেডি হয়ে যাও।

আরও একদিন কলেজের গেটে ফুচকা খায়, তেঁতুল গোলা পানি লাইলি একটু বেশি করেই খায়। তোতাই বলে, বেশি ঝামেলা করার দরকার নেই, টুকটাক কিছু জিনিসপত্র আনতে পারলে ভালো, না আনলেও অসুবিধা নেই। সোজা চলে আসবে বিসমিল্লাহ হোটেলের সামনে। এখান থেকে রিকশায় আগারগাঁও, একটু ভেতরের দিকে। আমি বাসাটা একটু ঠিকঠাক করেই তোমাকে বলব। তুমি চাইলে সেদিনও কাজি অফিসে যেতে পারি, দু-একদিন পরে হলে তাতেও সমস্যা নেই। আজকাল তো অনেকেই বিয়ে ছাড়া একসাথে থাকে।

লাইলি বলে, আস্তাগফিরুল্লাহ, আমি পারব না।

তোতা বলে, আমারও তো সে কথা, না জায়েজ কাজের মধ্যে আমি নেই। কাজি সাহেবের কাজটা যত তাড়াতাড়ি করা যায় ততই মঙ্গল।

তোতা বলল, চলো একটু রিকশায় ঘুরি। তোমাকে বাসার কাছে নামিয়ে দিয়ে যাব। সব সময় তো হেঁটেই যাও।

লাইলি বলে, চলেন।

রিকশায় ওঠার আগেই তোতা বলে, আমি স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি তোমার পেটে একটা বাচ্চা আমাকে বাবা বলে ডাকছে।

লাইলি বলল, আমার পেটে আগে থেকেই বাচ্চা থাকলে ধরে নিতে পারেন এটা আপনার না। এই বাচ্চা আপনাকে বড়জোর মামা কিংবা চাচা ডাকতে পারে। আর বাচ্চা যদি বিয়ের পরে হয়, তাহলে ধরে নিতে পারেন আপনারই। বাচ্চাকে শেখাব যেন আপনাকেই বাবা বলে।

বাসা থেকে বেশ খানিকটা দূরে লাইলি নেমে পড়ে। গেটের কাছাকাছি আসতে পেটে একটা মোচড় অনুভব করে।

ফুচকা আর তেতুল গোলা পানির কারণে হোক কি তোতার স্পষ্ট শুনতে পাওয়া তার পেটের শিশুর বাবা ডাকের কারণে কিংবা অন্য যেকোনো কারণে লাইলি ভেতর থেকে উঠে আসা বমিটা বাথরুমে ঢোকা পর্যন্ত ধরে রাখতে পারল না, উগরে দিল ফুচকাসহ অভুক্ত আরও কিছু খাবার।

যে ক্রোধ এতদিন পুষে রেখেছে, বলি বলি করেও মুখ খোলেনি, মেয়ের বয়সী লাইলির এত বাড়াবাড়ি সহ্য করেছে—তুই কাজের বুয়া, মালিকের সাথে তোর বন্ধুত্ব কিসের? তুই টেলিফোনে কার সাথে কথা বলিস? ম্যাডাম না থাকলে তুই বাড়ির বিবি সহেব হয়ে যাস কেমন করে? লাবুর কথা মানলাম, পাগল-ছাগল মানুষ, বাবুর সাথে তোর কী? ঈদে আমাকে বকশিস দেয় একশ টাকা, তোকে দেয় দু-শ, ঘটনা কী?—

সূর্যবাণু আজ মুখ খুলবেই। এ কথা পক্ষীবিবিকে বলে কী লাভ—মানুষের নাম কাকাতুয়া—ছিঃ কাউয়া শকুন চিল এগুলো যদি মানুষের নাম হয় এসব মানুষ আখেরাতে নবিজির সাফায়েত পাবে না। এ কথা আরজুদা বিবিকে বলেই বা কী লাভ—শরিয়ত মেনে মান্নান সাহেবের মতো মানুষ চারটা বিয়ে করতে পারতেন। একটা করতেই আরজুদা বিবি যে অত্যাচার চালাল, তার ওপর, গুন্ডা দিয়ে মার খাইয়ে শিরদাঁড়া ভেঙে ফেলেছে, এখন হয় বিছানা নয় হুইল চেয়ার। আর বিবি সাহেব সারা দুুনিয়ার পুরুষ মানুষের সাথে লটরপটর করে বেড়াচ্ছে—এত অনাচার আল্লাহ সইবে? ক্ষুব্ধ সূর্যাবানু সোজা গিয়ে ধাক্কা দিল বাবু ভাইয়ের রুমে। ঘুম ভাঙা আলুথালু লাইজু ভাবিকে বলল, সর্বনাশ হইছে, সর্বনাশ হইছে ভাবি।

কী হয়েছে!

কী হয় নাই ভাবি, শয়তান ধরা পড়ছে। এ বড়িতে শয়তান বাস করে। লাইলি ধরা পড়ছে। এক্ষণ ঘরের সামনে এত্তগুলান বমি করছে।

বমি করেছে তো পরিষ্কার করতে বল।

খালি বমি পরিষ্কার করলেই হইব, পেট পরিষ্কার করতে হইব না?

কেন পেটে কী হয়েছে?

পেটে কী হইলে বমি করে বোঝেন না? মনে হয় পেটে বাচ্চা আছে। ক্যান, হ্যারল্ড মিয়া হইবার সময় আপনি বমি করেননি।

সম্বিত ফেরে লাইজুর। এটা তা হলে বাবুর কাজ। বাবুর বাবা আবদুল মান্নানও শালিকের নাচের মাস্টারের সাথে এ কাজ করেছে।

আলুথালু বেশেই নুজহাত রুম থেকে বেরিয়ে দেখল লাইলি ফ্লোর সাফ করছে। তার হাত থেকে মগ চেয়ে নিয়ে চুল ধরে টানতে টানতে লাইলিকে নিয়ে এল শাশুড়ির রুমে। বেগম আরজুদা মান্নান বাইরে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। লাইজু হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, মা, আপনাকে তো কিছু বলাই যায় না, কোনটার আবার কী মানে করে বসেন, তবে আপনি যে ঘরে একটা প্রস্টিটিউট পুষছেন, এটা কিন্তু মা না বলে পারছি না। কাজটা আপনার ছেলেদের কেউ করেছে কি না, নাকি বাইরের কেউ বুঝতে পারছি না।

তিনি বললেন, তোমার কী বলার সরাসরি বল, এত পেঁচিয়ে কথা বলছ কেন?

জি মা, সরাসরিই বলছি, আপনার লাইলি প্রেগন্যান্ট।

কে বলেছে?

প্রেগন্যান্ট হলে কারও বলতে হয়, নিজের শরীরই তা দশজনকে বলে দেয়।

তুমি লাইলির শরীরে কী দেখলে?

এখন শুরুর দিক, বমি শুরু হয়েছে। বমি করে ফ্লোর ভাসিয়ে দিয়েছে। এখনই সব খালাস-টালাস করে বের করে দিন, নতুবা কে জানে একসময় দাবি করে বসবে, বাচ্চাটা হ্যারল্ডের ভাই—হয়তো সেটাই সত্যি। আপনি ভালো মানুষ, এক চপল আপনি না হয় সামলে নিয়েছেন, আমরা আরেক চপল কেমন করে সামলাব, লাইলিকেই বা কী করব?

তিনি বললেন, বেশি হইচই করবে না। আমি দেখছি।

লাইজু বিড়বিড় করে বলল, সত্যি কথা আস্তে বললেও হইচই মনে হয়।

মিসেস মান্নান কিছুক্ষণ ভাবলেন, নাচের মাস্টারনিকে তিনি তো এতটুকুও সন্দেহ করেননি, তবুও ঘটেছে। কিন্তু লাইজু বাবুর কথা বলছে কেন? ড্রাইভার আছে, দারোয়ান আছে, চপল আছে, মান্নান সাহেব না হয় অচল, বাইরেও তো কম মানুষ নেই।

নিজেই লাইলিকে ডেকে নিয়ে এলেন। জিজ্ঞেস করলেন, ফ্লোরে বমি করলি কেন?

লাইলি বলল, আটকে রেখে বাথরুম পর্যন্ত যেতে পারিনি, তার আগেই বমিটা হয়ে গেছে। আমি সব ধুয়ে পরিষ্কার করেছি।

পরিষ্কার করাই তোর কাজ। কিন্তু বমিটা হলো কেন? রাতে কারও সাথে মানে কোনো পুরুষ মানুষের সাথে শুয়েছিস নাকি?

লাইলি জবাব দেবার আগেই দেখলেন তার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে লাইজু। লাইজু বলল, মা যে কীসব ফালতু প্রশ্ন করেন, ওই কাজের জন্য রাত লাগবে কেন, দিনেও করা যায় আর শুতেই বা হবে কেন, সিঁড়ির ফাঁকে দাঁড়িয়েও করা যায়।

তিনি লাইজুর ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে বলতে চাচ্ছিলেন, নিজের অভিজ্ঞতা থেকে এসব বলছ নাকি, কিন্তু ছেলের বউকে তো আর একথা বলা যায় না।

কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, জি না।

তাহলে হলো কেন?

লাইলি ভাবল, তোতার সাথে যেটুকু মনের সম্পর্ক হয়েছে, শরীরের সম্পর্ক তো তার সিকিটাও হয়নি, তবে এটা ঠিক তার পেটে তোতার সন্তান নড়াচড়া করছে—এ কথা তো কয়েকবার শুনেছে। তারও মনে হয়েছে, কথাটা দুদিন আগের হোক পরে হোক, সত্যি কথাই।

ম্যাডামের প্রশ্নের জবাবে লাইলি বলল, আমি কী জানি?

লাইজু বলল, শুনলেন মা, কী রকম বেয়াদব মেয়ে! তার বমি হবে আর কেন হচ্ছে সেটা জানতে হবে আপনাকে।

তিনি বললেন, আমি বেরোচ্ছি, জামালপুর যাব, ফিরব পরশু। এর মধ্যে লাইলির ইউরিন টেস্ট করিয়ে আন। দেখ প্রেগন্যান্সি রিপোর্ট পজেটিভ না নেগেটিভ। পজেটিভ হলে এমআর করিয়ে বিদায় করে দেব। আমি তাকে রাখব না।

লাইলি ফোঁস করে বলে উঠল, আমি এখানে থাকব কি থাকব না সে সিদ্ধান্ত দেবে চপল ভাই। তিনি আমাকে এখানে এনেছেন।

তিনি আর কথা বললেন না। ইউরিন টেস্টটা আগে করিয়ে নিয়ে এসো, বলে তিনি গাড়িতে উঠলেন। গাড়িতে থেকেই লাইলিকে ডেকে বললেন, আমার লাবুর যেন কোন অযত্ন না হয়, মনে রাখিস।

আধ ঘন্টার মধ্যেই তৈরি হয়ে লাইজু স্বচ্ছ একটি ছোট বোতল এনে লাইলির হাতে দিয়ে বলল, ঠিক অর্ধেকটাতে পেশাব ভরে নিয়ে আয়। এবার তুই ধরা পড়ে গেছিস।

লাইলি বোতলটা টেবিলের এক কোণে রেখে বলল, আমার পেশাব পরীক্ষা করব না। আপনি যা পারেন করেন। চপল ভাই যদি চলে যেতে বলে এক্ষণ চলে যাব, যেখানে যেতে বলে সেখানেই যাব। আমি আপনার কতা শুনব না।

তুই এত বড় বেয়াদব বলে লাইজু তার গালে কষে চড় বসাল। লাইলি বলল, আরও মারলেও দেব না।

কাজের বুয়াকে মাথায় তোলার ফল আমার শাশুড়ি একদিন না একদিন পাবেনই, বলে গজগজ করতে করতে নিজের ঘরে চলে গেল। সে ঠিক করে ফেলেছে আজ রাতে এই বদমহিলার ছেলেকে জনমের শিক্ষা দেবে।

সন্ধেবেলা তিনি জামালপুর সার্কিট হাউস থেকে ফোন করে লাইজুকে চাইলেন এবং তার কাছে প্রেগন্যান্সি টেস্টের ফল জিজ্ঞেস করলেন।

শাশুড়িকে কড়া কথা শোনানোর আর একটা সুযোগ হাতছাড়া করতে রাজি নয় লাইজু। বলল, আপনি তাকে মাথায় নিয়ে রেখেছেন, তাকে দিয়ে ছেলের বউ কী করে সেই গোয়েন্দাগিরি করিয়েছেন, সে আমার কথা শুনবে কেন? আগে আপনার মাথা থেকে মাটিতে নামান, তখন আমিও জানি খুন্তির ছ্যাঁকা দিয়ে কীভাবে কাজ করাতে হয়। লাইলি বোতলে ইউরিন দিতে রাজি হয়নি, উল্টো আমাকে বাজে কথা শুনিয়েছে। মা, আমি তো বুঝি সবই, ছাগল নাচে খুঁটির জোরে। আপনি তার শক্ত খুঁটি।

তিনি বললেন, চপল ফিরলে আমার মোবাইলে একটু কথা বলিয়ে দিয়ো, আমি লাইলিকে বিদায় করার ব্যবস্থা করছি।

সে তো করবেনই, এই কেলেঙ্কারি ফাঁস হলে আপনার ইলেকশনেরও বারোটা বাজবে। ঠিক আছে, চপল ফিরুক।

রাত এগারোটার দিকে লাইজু কেবল খেতে বসা তার স্বামীকে বলল, রেডি হয়ে যাও, তোমার ডিএনএ টেস্ট করাতে হবে।

কেন ডিএনএ টেস্ট কেন?

কেন এখনো বুঝতে পারনি, তোমাদের লাইলি প্রেগন্যান্ট।

মানে?

প্রেগন্যান্ট মানে বোঝ না? প্রেগন্যান্ট বানাতে পার, আর মানে বোঝ না। কাজটা কবে করলে, আমি তো গত তিনমাস লম্বা সময়ের জন্য শপিংয়েও যাইনি।

টেবিলের খাবার রেখে বাবু দাঁড়িয়ে যায়। জিজ্ঞেস করে তার মানে, কী বলতে চাও? এখনো বোঝনি কী বলতে চাই। যা বলতে চাই এক কথায় বলতে পারি, লাইলির পেটের বাচ্চাটি তোমার।

বাবু হঠাত্ সহিংস হয়ে লাইজুর গলা চেপে ধরল। বলল, আর একটা কথা বললে গলা টিপে মেরে ফেলব।

লাইজু ঘাবড়ে যায়, বাবু সাধারণত শোনে। আজ এ আচরণ কেন করল? সত্য কথা প্রকাশিত হয়ে যাচ্ছে তাই? নাকি তার অনুমান মিথ্যে বলে সে সহিংস?

লাইজু ছাড়া পায় না। এটা তো তার মায়ের শিক্ষা—সত্য হোক মিথ্যে হোক স্বামীকে চাপে রাখবি। চাপে না রাখলে পুরুষ মানুষ সোজা থাকে না। লাইজুর এটাও মনে হয়, বাবুর মতো সহজে সাড়া না দেওয়া মানুষ হঠাত্ সাড়া দিলে মিথ্যে চাপে নিজের জীবনটাও যেতে পারে। স্বামী ব্যবস্থাপনায় মায়ের ফর্মুলা না-ও খাটতে পারে।

পরস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে হ্যারল্ড। বাবাকে জিজ্ঞেস করে, তুমি কি মাকে একেবারে মেরে ফেলবে?

বাবু হাত ছেড়ে দেয়, লাইজু ছিটকে পড়ে যায়।

সে রাতে মিসেস মান্নান আবার ফোন করেন, কাকাতুয়াই লাইজুকে ডেকে দেয়। তার প্রশ্নের জবাবে লাইজু বলে, চপলের দরজা বন্ধ, ভেতরে আলো দেখা যাচ্ছে না। সম্ভবত আসেনি।

আসেনি না পালিয়ে গেছে? আমার সন্দেহ চপলই এ কাজটা করেছে। অপেক্ষা কর। আমি এসে একটা ব্যবস্থা করছি। তোমরা লাবুকে দেখে রাখার মতো একজন কাউকে খুঁজে বের কর। টাকা কিছু বেশি লাগলে লাগুক।

জি মা, আচ্ছা।

এবার লাইজুর মুখ দিয়ে একটা কড়া কথাও বের হলো না।

আরও একদিন এভাবেই কাটল।

পরদিন ঘরে ঢুকেই মিসেস আরজুদা মান্নান লাইলিকে ডাকলেন। তীব্র ঝাঁঝালো কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, পরীক্ষার জন্য লাইজুকে পেশাব দিসনি কেন?

আমি ভাবিকে বিশ্বাস করি না।

তুই কাকে বিশ্বাস করিস?

আপনাকে, কাকাতুয়া আপুকে, চপল ভাইয়া আর লাবু ভাইয়াকে, দারোয়ান নূরু চাচাকে।

বেশ আমিই নিয়ে যাব। ছোট বোতলে করে নিয়ে আয়।

লাইলি বলল, আচ্ছা।

কয়েক মিনিট পর কাগজে পেঁচিয়ে বোতলটা এনে দিল। তিনি বাঁ হাতে বোতলটা তুলে হালকা খড় রংয়ের প্রস্রাবের দিকে চোখ ছোট করে এমনভাবে তাকালেন যেন এর মধ্যেই দেখতে পাচ্ছেন মানুষের অতিক্ষুদ্র বাচ্চা সাঁতার কাটছে।

তেরো

মিডওয়েস্টার্ন ডায়াগনস্টিক ল্যাবরেটরিতে ঢুকে তার পরিচিত ল্যাবরেটরি টেকনিশিয়ান এমদাদ আলীকে ডেকে বলেন, রিপোর্ট লাগবে না, শুধু প্রেগন্যান্সিটা দেখে দাও।

তিনি অনেক রোগী এখানে পাঠান। সাথে ছোট চিঠি। এমদাদ, গরীব রোগী। কম টাকা নিয়ো।

এমদাদ একটা টেস্টটিউবে কিছুটা প্রস্রাব ঢেলে, ডাকল, খালাম্মা সামনে আসেন।

তিনি কাছে আসতেই এমদাদ একটা স্ট্রিপ এতে ঢুকিয়ে দিল। একটু পরে এটা বের করে এনে বলল, সরি খালাম্মা, এই দেখেন একটা দাগ। নেগেটিভ।

তিনি কিছু টাকার জন্য ব্যাগে হাত দিতে এমদাদ বলল, লাগবে না। সুসংবাদ হলে অন্যদিন দেবেন।

তিনি তার হাতে একশত টাকার নোট গুঁজে দিয়ে বললেন, এটাই সুসংবাদ। এই কেসটাতে আমরা নেগেটিভই চাচ্ছিলাম।

তিনি ফিরে আসতে লাইলিই প্রথম জিজ্ঞেস করল, কিছু পেয়েছেন? আমি আপনাকে বিশ্বাস করি।

না।

অমনি অবনত হয়ে লাইলি তার পা ছুঁয়ে বলল, আমি আপনার সাথে বেয়াদবি করেছি। আমাকে মাফ করে দেবেন।

রাতে তিনি বাবুদের ঘরে ঢুকলেন। বাবু উঠে বসল, মা কী খবর?

তিনি লাইজুকে সামনে রেখে বলেলেন, তোর বউ একটা কাজের মেয়ে সম্পর্কে গিবত করে বেড়াচ্ছে। বলছে, সে প্রেগন্যান্ট। আমি তার ইউরিন টেস্ট করিয়ে এনেছি, রেজাল্ট নেগেটিভ। এই নাও তার আরও আধ শিশি ইউরিন। তোমরা তোমাদের পছন্দমতো জায়গায় টেস্ট করাও। পজেটিভ হলে আমি ওকে বের করে দেব, না হলে বউসহ তোমাকে। মাঝামাঝি কোনো অপশন নেই। এ বাড়িতে এটাই তোমাদের শেষ মাস। হ্যারল্ডকে রেখে যেতে পার, আমি পালতে পারব। যে কদিন এখানে আছে আমি লাইজুর মুখ থেকে লাইলি সম্পর্কে ভালোমন্দ কোনো কথাই শুনতে চাই না।

চপল ফেরেনি। দু-তিন দিন ফেরেনি এমন ঘটনা আগেও ঘটেছে। কাজেই চপল কোনো দুশ্চিন্তার কারণ নয়।

চপলের অনুপস্থিতির সপ্তম দিন লাইলি কাঁদতে শুরু করল। সে জানে, তার কান্না চোখে পড়লে ম্যাডাম তার ওপর চটে যাবেন। গত দেড় দু-মাস ধরে ম্যাডাম তার হুইল চেয়ারে বসা স্বামীর ওপরও ক্ষেপে উঠেছেন। আবদুল মান্নানের নতুন রোগ হয়েছে। প্রায়ই সকালে চপলকে ডেকে পাঠান।

চপল এলে বলেন, মানে অস্পষ্ট আওয়াজে বলেন, বেহালাটা নিয়ে আয়।

চপল আবার নিজের ঘরে যায়, বেহালা নিয়ে আসে। তিনি বলেন, বাবা, রাগ ভৈরবীটা একটু বাজিয়ে শোনা।

এটিই তার একমাত্র চাওয়া। কখনো বলেন না খাম্বাজ, কাফি, আসারবী বেহাগ কী আহীর ভৈরব বাজা তো বাবা। হতে পারে তিনি একটি মাত্র রাগের নামই জানেন। গত সাতদিন প্রতিদিন সকালেই তিনি জিজ্ঞেস করেছেন, চপলটা ফেরেনি?

রাতের ফোনে তোতা সুখবর দিল। ছোট যন্ত্র হাতে পাবার পর প্রথম অপারেশনে যা পেয়েছে তাতে কমপক্ষে দুমাস চলে যাবে। যন্ত্রের মালিককে খুশি করার জন্য অপারেশনে যা পেয়েছে পুরোটা তাকে জানিয়েছে। কাঁটাবন সোনালী ব্যাংক থেকে অ্যাটাশে নিয়ে বের হওয়া হুজুরের কাছ থেকে হ্যাঁচকা টানে অ্যাটাশে নিয়ে নেয়। যন্ত্রের সামান্য ব্যবহারও করতে হয়নি। এক লাখ পাঁচ ছিল। ভাগে পড়েছে সাড়ে বায়ান্ন। তাকে আশি বললে তার থাকত পঁয়ষট্টি হাজার। সামনের অপারেশনে পুরোটা বলব না। এখন বাসা নিতে আর অসুবিধে হবে না। তবে সামনের সপ্তাহে একটা বাড়ি পেয়ে যাচ্ছি। আমার বন্ধু আনোয়ারের বাসা, বাচ্চা হবে বলে রোববার তার স্ত্রী ঈশ্বরদী, বাপের বাড়িতে চলে যাচ্ছে। তিন চার মাসের আগে ফিরছে না। আনোয়ার বলেছে ভাড়াটাড়া লাগবে না। হাড়ি-পাতিল বিছানা-বালিশ সবই আছে। তোর বউ রান্না করলে দুবেলা খেতে দিস। তাতে ভাড়া উসুল হয়ে যাবে। আমারও লাভ, রাঁধতে হলো না, খরচও না। আমি সব পাকা করে ফেলেছি। বৃহস্পতিবার খুব ভোরে, ধরো ফজরের আজানের পরপরই তুমি চলে আসবে। আমিতো ওখানে থাকবই। শুরু হবে তোমার নতুন জীবন, আমারও।

ঠিক আগের দিন, বুধবার রাতে এগারোটার দিকে তোতার ফোন আসে, এ বাড়িতে এটাই হবে তোতার শেষ ফোন। সে প্রস্তুতি জানতে চায়।

লাইলি জানায়, সব ঠিক আছে।

কথা শেষে হয়। লাইলি ভাবে, তোতার অন্তর্ধানের চার-পাঁচ মাস সময় এমন একটা নরম দিলের মানুষকে এত গালাগাল দিয়েছে, একবারও খোঁজ নেয়নি মানুষটা কোথায় আছে। মানুষ তো বন্দি প্রিয়জনকে দেখতে জেলখানায়ও যায়। বন্দি গরাদের শিকে হাত রাখে, তার স্ত্রী সে হাতের আঙুলে চুমো খায়। লাইলি তোতার আঙুলে চুমো খাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যায়। লাইলি জানে, এটাই তার বন্দিগিরির শেষ রাত। কাল থেকেই তোতা মিয়া সরকার নামের মানুষটির স্ত্রী হিসেবে তাকে বলা হবে মিসেস লাইলি বেগম, কিংবা মিসেস সরকার।

লাইলি হাসে, তোতার পেশা যা-ই হোক, ছেলে তো ভালো বংশের। বাড়ির অবস্থাও ভালো। তাছাড়া হাতে এখন একটা ছোট যন্ত্রও আছে। প্রমোশনই তো—প্রতিমন্ত্রী থেকে মন্ত্রী হওয়ার মতো।

লাইলি তার ব্যাগে দীর্ঘদিনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সঞ্চয় ছাড়াও তাড়াহুড়ো করে বাড়ির আর সবার চোখ এড়িয়ে হাতিয়ে নেওয়া ডাভ সাবান, এয়ার ফ্রেশনার, দুটো প্লেট, দুটো বাটি, একটি গ্লাস, ছোটবড় মিলিয়ে তিনটি চামচ, রুটি বানাবার বেলনা, দুটি চায়ের কাপ, একটি ফটোস্ট্যান্ড, দুটি কলম-এর মধ্যে একটি আবার মার্কার, তিন প্যাকেট স্যানেটারি ন্যাপকিন, এক কৌটা কাজুবাদাম, একটি বিছানার চাদর, লাবুর একটি পাসপোর্ট সাইজ ছবি, একটি হট ওয়াটার ব্যাগ, এক কৌটা কনডেসড মিল্ক, আয়না, চিরুনি, এক বোতল রুহ আফজা, কাকাতুয়ার স্টোর হাউস থেকে আনা দুটো প্যান্টি, দুটো ব্র্যাসিয়ার, প্যারাসিটামল, মাল্টি ভিটামিন, জন্মনিরোধক মার্ভেলন—এরকম আরও কিছু একটি পুরোনো সিনথেটিক ব্যাগে ভরলেও শেষ পর্যন্ত ধরা পড়ার ভয়ে সাথে নেয়নি। সাথে নিয়েছে সঞ্চিত ও হাতিয়ে নেওয়া কিছু টাকা, তোতার দেওয়া মোবাইল ফোন, দু-একটা অলংকার।

রাতের বেলা লাবুর সাথে শেষ সাক্ষাতের জন্য তার রুমে ঢুকে দেখে সবগুলো সুইচ অন করা, টিভি চলছে, ঘরের ভেতর যেন আলোর প্লাবন। সদ্য ইস্ত্রি ভাঙা পরিপাটি চাদরের ওপর অঘোরে ঘুমোচ্ছে পাগল কিংবা বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী একটি মানুষ। লুঙ্গির গিঁট ঠিকমতো সামলে রাখতে পারে না বলে তাকে পরানো হয় ইলাস্টিক লাগানো পাজামা। লাইলি একটা একটা করে সব সুইচ অফ করে। বের হবার সময় অন্ধকারেই অনুমান করে লাবুর কপালে হাত রাখে। নির্বিকার লাবু, টেরও পায় না। লাইলি নিজেকে শোনায় গায়ে হাত তো দিয়েছি আমি। পাজামাও পরিয়ে দিয়েছি অনেকদিন। বোকাটার তো নারী-পুরুষের বোধও নেই। নতুবা এই সাত বছরে কত কিছু ঘটতে পারত।

চোদ্দ

ফজরের আজানের পরপরই লাইলি একটা পুরোনো বোরকা পরে বেরিয়ে পড়ে। দ্রুত পা চালিয়ে গলি থেকে বেরিয়ে রাস্তায় নামে। এখানেই থাকার কথা তোতা মিয়ার। তখনো এসে পৌঁছেনি। এসে যাবে কয়েক মিনিটের মধ্যে। লাইলি একটি ল্যাম্পপোস্টের নিচে দাঁড়ায়। তখনো মাথার ওপরের সোডিয়াম বাতি জ্বলছে।

কয়েক মিনিটের জায়গায় আধঘণ্টা পেরিয়ে যায়, প্রতীক্ষা অসহ্য হয়ে ওঠে। ঘাড়ের কাছে গো গো শব্দ শুনে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে, তার ফেলে আসা ভারী সিনথেটিক ব্যাগটি হাতে নিয়ে একটুখানি দূরে দাঁড়িয়ে আছে লাবু ভাই। লাবুকে দেখে আঁতকে ওঠে লাইলি। লাবু গো গো করে। হতভম্ব লাইলি এবার আর তার কথা বুঝতে পারে না। লাবু ব্যাগটা এগিয়ে দেয়, পকেট থেকে একটা ঘড়ি বের করে তাকে সাধতে থাকে।

লাইলি হাত বাড়ায়। কিন্তু ঘড়িটা না ধরে লাবুকে জাপটে ধরে কাঁদতে থাকে, আমি যাব না লাবু ভাইজান, আমি যাব না।

লাবু যাতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে না যায় তা নিশ্চিত করাই ছিল লাইলির চাকরির প্রথম শর্ত। লাইলি যখন লাবুর হাত ধরে বাড়িতে ফিরে আসে এ বাড়ির ম্যাডাম দেখলেন লাইলি চাকরির শর্ত আবারও পূরণ করেছে। লাইলিকে ছাড়া যায় না, থাকুক না লাবুর সাথেই লাবুর ঘরে।

এই পাতার আরো খবর -
font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেছেন, 'রাজনৈতিক দল হিসাবে কর্মকাণ্ড করার কোনো অধিকার জামায়াত রাখে না।' আপনিও কি তাই মনে করেন?
8 + 1 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
অক্টোবর - ১৯
ফজর৪:৪২
যোহর১১:৪৪
আসর৩:৫২
মাগরিব৫:৩৩
এশা৬:৪৪
সূর্যোদয় - ৫:৫৭সূর্যাস্ত - ০৫:২৮
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :