The Daily Ittefaq
ঢাকা, সোমবার ০৫ আগস্ট ২০১৩, ২১ শ্রাবণ ১৪২০ এবং ২৬ রামাযান ১৪৩৪
সর্বশেষ সংবাদ হাইকোর্টের রায় বহাল; নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না জামায়াত | আপিল করেছেন গোলাম আযম | অষ্টম মজুরি বোর্ডের সুপারিশে মন্ত্রিসভার একমত

রবীন্দ্রনাথ আপনি ইতালি কেন এলেন?

পলাশ দত্ত

সাতাত্তর বছর আগে ইতালি সফরের পর শিরোনামে তোলা প্রশ্নটির মুখে পড়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ১৯২৬ সালে এই প্রশ্ন করছেন এক নারী। তাও ইতালিতে বসে নয়, ফ্রান্সে। বেনিতো মুসোলিনির সরকারের হাত থেকে বাঁচতে ইতালি ছেড়ে স্বামীসহ সুইজারল্যান্ডে থাকছিলেন তিনি—সিনোরা সালভাদোরি। তার এই প্রশ্নের জবাবে রবীন্দ্রনাথ কী বলেছিলেন তা জানার আগে কবির ওই ইতালি সফরের বিষয়টা একটু দেখে নেয়া যেতে পারে।

রবীন্দ্রনাথের ১৯২৬ সালের ওই ইতালি সফর শুরু হয় জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে। সেটি ছিল তাঁর দ্বিতীয় ইতালি-দর্শন। এর আগে ১৯২৫ সালের জানুয়ারি মাসে তিনি ইতালি যান কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা দিতে। বছর তিনেক আগে কলকাতায় তাঁর প্রতিষ্ঠিত বিশ্ব-ভারতীর জন্য অর্থ সংগ্রহে ওই সময়টায় ইউরোপ-আমেরিকা ঘুরে বক্তৃতা দিয়ে বেড়াচ্ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ১৯২৬ সালের ইতালি-সফরের সময় থেকে এখন পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে আগ্রহীদের জন্য—রবীন্দ্রনাথ ফ্যাসিস্ট মুসোলিনির আমন্ত্রণে ইতালি গেলেন কেন? অনেকে বলে থাকেন, তিনি জানতেন না যে ইতালিতে তিনি মুসোলিনির অতিথি হতে চলেছেন!

কিন্তু দ্বিতীয় দফার এই ইতালি সফর নিয়ে এত আলোচনা কেন? কারণ একটাই এবং তিনি একজন মানুষ—বেনিতো মুসোলিনি। রবীন্দ্রনাথের এই সফরে ইতালি এবং আরও নানা দেশের পত্রপত্রিকায় তাঁর নামে কিছু সাক্ষাত্কার বেরোল, যেগুলোতে মুসোলিনি তো বটেই; ফ্যাসিবাদও প্রশংসা পেয়ে গেল রবীন্দ্রনাথের মুখ দিয়ে! যেমন—ইংল্যান্ডের দ্য ডেইলি নিউজ। পত্রিকাটি ১১ জুন একটি খবর ছাপল 'ট্যাগোর ইন ইটালি : হোয়াট দ্য ইন্ডিয়ান পোয়েট থিংক্স অব মুসোলিনি' শিরোনামে। এতে বলা হলো : 'মহান ভারতীয় কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মুসোলিনির অতিথি হিসাবে ইতালিতে থাকছেন। ফ্যাসিবাদ এবং এর নেতা সম্পর্কে তার অভিমত পাল্টেছেন তিনি [রবীন্দ্রনাথ], যদিও ইতালিতে যে ব্যবস্থা খাপ খেয়েছে তা অন্য কোনো দেশের জন্য ভালো কিছু বয়ে আনবে না বলে একমত তিনি।'

অবশ্য এর আড়াই মাস পর ব্রিটেনেরই দ্য স্টার-এ ছাপা হচ্ছে, 'ফর ন্যাশনালিইজম : ট্যাগোর অ্যান্ড "ব্লাইন্ড প্যাশন" ফর ফ্যাসিজম' শিরোনামে এক খবর। এতে ডেইলি নিউজের খবর খণ্ডন করছেন রবীন্দ্রনাথ। তিনি বলছেন : 'জাতীয়তাবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের প্রতি ফ্যাসিবাদের অন্ধ আবেগ দেখার পর এর প্রতি আমার কোনো সমবেদনা থাকতে পারে না। যদিও মানুষগুলোর জন্য আমার গভীর ভালোবাসা আছে।' রবীন্দ্রনাথ বলেন, 'ইতালীয় সাক্ষাত্কার গ্রহণকারীরা আমার ভাবনা বিকৃত করেছে। এবং আমি জানতে পেরেছি যে, ফ্যাসিবাদের প্রতি আমার নিঃশর্ত সমর্থন আছে বলে প্রচারিত হয়েছে।'

দুই

রবীন্দ্রনাথের দুবারের ইতালি যাত্রারই আয়োজক ছিলেন কার্লো ফর্মিচি। কিন্তু তিনি রবীন্দ্রনাথকে জানলেন বা চিনলেন কীভাবে? এ বিষয়ে ২০০৯ সালে কল্যাণ কুণ্ডু এবং তার ৩১ বছর আগে (১৯৭৮ সালে) অবন্তীকুমার সান্যাল একই কথা বলেন। তাঁরা দুজনেই বলেন, ১৯২৫ সালে জেনোয়ায় রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা হয় ফর্মিচির। এর কোনো পূর্বসূত্র তাঁদের দুজনের কারও লেখায় পাওয়া যায় না। কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে তো ফর্মিচি জেনোয়া যাওয়ার পর কোনো আলোচনা সভায় দেখে চেনেননি। তাহলে কীভাবে রবীন্দ্রনাথকে চিনলেন তিনি?

চিনলেন রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের মেয়েজামাই কালিদাস নাগের মাধ্যমে। ইউনিভার্সিটি অব প্যারিসে পড়াশোনা করা কালিদাস ১৯২১ সালের আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে কার্লো ফর্মিচি ও গিউসেপ্পে তুচ্চির সঙ্গে পরিচিত হন। কালিদাসের পড়ার বিষয় ছিল ভারতবিদ্যা, অন্যদিকে ফর্মিচি ছিলেন ইউনিভার্সিটি অব রোমের সংস্কৃত বিষয়ের অধ্যাপক। এই দুজনই শান্তিনিকেতনে শিক্ষার্থীদের সংস্কৃত ও ভারতবিদ্যা শিক্ষা দিতে রবীন্দ্রনাথের আমন্ত্রণে ভারত আসবেন পরবর্তী সময়ে।

রবীন্দ্রনাথের কবিতা ও গানে মুগ্ধ ফর্মিচি ১৯২১ সালের মে মাসেই রবীন্দ্রনাথকে ইতালির ফ্লোরেন্সে সফরের আমন্ত্রণ জানিয়ে রেখেছিলেন। অন্যদিকে রোম থেকে ইতালি ফিরেও ফর্মিচি-তুচ্চির সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখেন কালিদাস : 'ইতালি থেকে আমার নতুন বন্ধু প্রফেসর ফর্মিচি ও ড. তুচ্চি আমাকে নিয়মিত লিখতে শুরু করলেন। আর ভারতের আদর্শ ও সংস্কৃতিকে ছড়িয়ে দিতে চাওয়া এই দুই ইউরোপীয় পণ্ডিতের কাজে নিজেকে কিছুটা লাগানো যায় কি না সে বিষয়ে আমি সচেষ্ট ছিলাম।' এই দুই বন্ধুর সঙ্গে ইতালিতে কালিদাসের আবার দেখা হয় প্রায় এক বছর পর। ১৯২৩ সালের ১৭ থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রোম সফর করা কালিদাস বুঝতে পেরেছিলেন যে ইতালি তখনই ফ্যাসিবাদের কবলে আছে। তবে ফর্মিচি ও তুচ্চিকে [অন্তত] তখনো ফ্যাসিবাদমুক্ত বলে মনে হয়েছিল তাঁর।

পরের বছরের এপ্রিল ও জুলাইয়ে চীন ও জাপান ভ্রমণ করেন রবীন্দ্রনাথ। সেই সফরে আরও কয়েকজনের সঙ্গে তাঁর সাথে ছিলেন কালিদাস। তো সেই দূর প্রাচ্য থেকেই ইতালির ফর্মিচির সঙ্গে তাঁর চিঠি যোগাযোগ ছিল রবীন্দ্রনাথের ভবিষ্যতের ইতালি সফর নিয়ে। এ বিষয়ে ফর্মিচি [পরবর্তী সময়ে] তার 'ভারত ও ভারতীয়' শিরোনামের বইতে লেখেন : 'নাগের সঙ্গে আমি উষ্ণ আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলাম। বক্তৃতা দেয়ার জন্য রবীন্দ্রনাথের ইতালি সফরের পরিকল্পনাটা তাঁর মাধ্যমেই প্রথম আসে। কবি ভারতে ফিরলেই তাঁর ইতালি-সফরের বিষযটি নিয়ে যথাউদ্যোগ নেবে বলে আমাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছল কবির ্লেহধন্য নাগ।' ওই সফর চলতে চলতেই ওই বছরের ডিসেম্বরে আর্জেন্টিনা সফরের আমন্ত্রণ পেলেন রবীন্দ্রনাথ, যা ফর্মিচিকে জানালেন কালিদাস নাগ।

সম্ভাব্য ইতালি সফর নিয়ে ফর্মিচির সঙ্গে কালিদাসের চিঠি চালাচালি বৃথা যায়নি। এক পর্যায়ে রবীন্দ্রনাথ ইতালি সফর করতে সম্মত হন। এবং সেই সফর হবে ১৯২৪ সালের ডিসেম্বরে আর্জেন্টিনা সফর থেকে ফেরার পথে। এই প্রক্রিয়ায় ১৯২৫ সালের ১৯ জানুয়ারি তিনি ইতালির জেনোয়ায় পৌঁছালেন। তাঁর এই জেনোয়া-পদাপর্ণও অবশ্য ইংরেজি ভাষার গণমাধ্যমের নজর এড়ায়নি। তিনি জেনোয়ায় পা রাখার একদিন পরই এ খবর প্রকাশ হচ্ছে ইংল্যান্ডের দ্য টাইমস পত্রিকায়। 'টেলিগ্রামস ইন ব্রিফ' নামের এক বিভাগে এ খবর প্রকাশ হলো : 'স্যার রবীন্দ্রনাথ ট্যাগোর দক্ষিণ আমেরিকা থেকে জেনোয়ায় পৌঁছেছেন এবং তিনি টানা কয়েকটি বক্তৃতা দেবেন যার প্রথমটি হবে মিলানে আগামীকাল রাতে।' রবীন্দ্রনাথ ইতালি পৌঁছানোর দু-সপ্তাহ আগে অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা নেন মুসোলিনি।

রবীন্দ্রনাথ আসার আগেই, ১৯২৪ সালের শেষদিকে তাঁর জন্য সরকারি আতিথেয়তা চেয়ে আবেদন করেন ফর্মিচি। কিন্তু শিক্ষা মন্ত্রণালয় এতে রাজি হয়নি। এরপর ফর্মিচি আতিথেয়তার জন্য আবেদন জানান এক বেসরকারি সংস্থার কাছে যার সভাপতি ছিলেন ডিউক তোমাসো গালারাতি স্কোত্তি। ফর্মিচির প্রস্তাব পেয়ে দ্বিধা না করে রাজি হয়ে যান ফ্যাসিবাদের কট্টর সমালোচক স্কোত্তি।

ফ্যাসিবাদি মুসোলিনির ক্ষমতা নেয়ার দু-সপ্তাহের মাথায় ইতালিতে হাজির হওয়া রবীন্দ্রনাথ মুসোলিনির কর্মকাণ্ড সম্পর্কে কতটুকু জানতেন। বলতে গেলে তেমন কিছুই না। আর তাঁর এই না-জানার বিষয়টি অনুভব করতে পেরেছিলেন কার্লো ফর্মিচি। তাই জেনোয়া থেকে মিলানের ট্রেনযাত্রায় এ নিয়ে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে কথা বলেছিলেন তিনি। ফর্মিচির বই থেকে সেই কথোপকথনের একটি অংশ : 'জেনোয়া থেকে মিলান যাওয়ার পথে আমাকে ইতালির রাজনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে বলতে বললেন রবীন্দ্রনাথ।' ওটাই ইতালির রাজনীতি নিয়ে রবীন্দ্রনাথের প্রথম জানা—এই কথা উল্লেখ করে ফর্মিচি তাঁর বইয়ে বলছেন : 'যুদ্ধের পরপর আমাদের দেশ যে অসহনীয় বিশৃঙ্খলার মধ্যে পড়েছিল তার বেদনাদায়ক কাহিনী বলেছিলাম।' এই দুরাবস্থা থেকে ইতালিকে বেনিতো মুসোলিনি উদ্ধার করেন বলে এসময় রবীন্দ্রনাথকে জানান ফর্মিচি। রবীন্দ্রনাথ ইতালি সফর শেষ করে ভারতে ফিরে যাওয়ার পর আগস্ট মাসে বিশ্ব ভারতীতে আমন্ত্রণ পেলেন ফর্মিচি।

এই আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে ১৯২৫ সালে শান্তিনিকেতন যাওয়ার সময় ফর্মিচির সঙ্গে যায় ইতালীয় সাহিত্য-সংস্কৃতির পাঁচশ বইয়ের এক ভাণ্ডার। বইগুলো দেওয়া হয়েছিল মুসোলিনির সরাসরি নির্দেশে। ভবিষ্যতে যতবার মুসোলিনি-দর্শন নিয়ে কথা উঠবে, ততবারই রবীন্দ্রনাথ সেই বইগুলোর প্রসঙ্গ আনবেন। বলবেন, বইয়ের ভাণ্ডার তাঁকে চরম বিস্মিত করেছিল এবং এমন ইঙ্গিতও পাওয়া যাবে যে, এর থেকেই তাঁর মুসোলিনি-শংসার শুরু। ১৯২৫ সালের শেষ নাগাদ শান্তিনিকেতন ছেড়ে ইতালি ফিরবেন ফর্মিচি। শান্তিনিকেতন ছাড়ার আগে তাঁর বিদায় সম্ভাষণে রবীন্দ্রনাথ যে বক্তব্য দেবেন তাতেও থাকবে এই বইগুলোর কথা। ওই বই কি রবীন্দ্রনাথকে মুগ্ধ করে ইতালি সফরে উত্সাহিত করার জন্য স্বপ্রণোদিত স্বপরিকল্পিতভাবে পাঠিয়েছিলেন মুসোলিনি?

এর জবাব রবীন্দ্রনাথের বহুলপাঠ্য ইংরেজি জীবনী কিংবা ইতালি সফর নিয়ে লেখা নানা নিবন্ধেও পাওয়া মুশকিল। যেমন কল্যাণ কুণ্ডুর ভাবনা : "He was both delighted and apprehensive as he was unable to source funding for an Italian scholar for the proposed exchange programme. Furthermore, he was unable to purchase the Italian books he promised Tagore. The situation was a little embarrassing for Formichi as he was aware that other European visiting professors who preceded him donated substantial amounts of resources to Tagore's University."

এ বিষয়ে অবন্তীকুমার সান্যালের দীর্ঘ প্রবন্ধের যে বর্ণনা তাও একরকম উত্তরহীনতাই : 'একই বছরের নভেম্বর মাস। ফর্মিচি শান্তিনিকেতনে এলেন মুসোলিনির 'দূত' হয়ে। সঙ্গে নিয়ে এলেন মুসোলিনির উপহার দেওয়া ইটালীয় সাহিত্যের বিরাট এক সম্ভার। তার সঙ্গে এলেন রোম বিশ্ববিদ্যালয়ের আর এক অধ্যাপক গিউসেপ্পে তুচ্চি। তুচ্চির ভারত-যাত্রার ব্যয় বহন করল মুসোলিনি-সরকার। রবীন্দ্রনাথ মুগ্ধ হলেন; যে-বিশ্বভারতীর জন্য দেশবিদেশে তাঁকে 'ভিক্ষার সফরে' বেরুতে হয়, তাঁর প্রতি কোনো বিদেশি সরকারের এমন বদান্যতা অভাবিত বলেই তিনি মুসোলিনির আন্তরিকতা ও সদিচ্ছায় বিশ্বাসী হয়ে উঠলেন।'

তবে প্রশ্নটির জবাব পেতে আমরা ফিরে যেতে পারি ফর্মিচির কাছে, বিশ্বভারতীতে পড়ানোর আমন্ত্রণপত্র যাওয়ার সময়টিতে। এই আমন্ত্রণের সঙ্গে সঙ্গেই দৃশ্যপটে ফিরে আসেন কালিদাস নাগও। রবীন্দ্রনাথের আমন্ত্রণের চিঠির পর ফর্মিচির কাছে গেল কালিদাসের একটি চিঠি। তিনি বললেন, ফর্মিচি যেন বিশ্বভারতীর লাইব্রেরিকে কিছু ইতালীয় শিল্প ও সাহিত্যের বইপত্র দেন। একইসঙ্গে ইতালীয় সাহিত্য ও সংস্কৃতির একজন শিক্ষকও নিয়ে যাওয়ার কথা বললেন কালিদাস। এই চিঠি পেয়ে ইতালির শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও সাড়া পাননি ফর্মিচি। এরপর তিনি সরাসরি চিঠি লিখলেন মুসোলিনিকে। মুসোলিনি ফর্মিচির সঙ্গে করে ইতালীয় সাহিত্য-সংস্কৃতির পাঁচশ বই পাঠানোর নির্দেশ দিলেন। এই বিপুল ইতালীয় সাহিত্য-সম্ভার নিয়ে ১৯২৫ সালের ৪ নভেম্বর শান্তিনিকেতনের উদ্দেশে রওয়ানা দিলেন ফর্মিচি। ইতালীয় সাহিত্য-সংস্কৃতির শিক্ষক হিসেবে এর কিছুদিন পরই যাবেন গিউসেপ্পে তুচ্চি, যিনি নির্বাচিত হবেন মুসোলিনির নির্দেশে।

তিন

ইতালি সফর নিয়ে রবীন্দ্রনাথের অনিচ্ছায়, ইতালীয়দের ইচ্ছায়, মুসোলিনির (এবং প্রকারান্তরে ফ্যাসিবাদের) প্রতি তাঁর ইতবাচক মনোভাব প্রকাশিত হয়েছিল ইতালীয় পত্রিকায়, যে বিষয়ে এই রচনার শুরুর দিকেই ইঙ্গিত রয়েছে। ইতালীয় পত্রিকার ওইসব ইচ্ছাকৃত কথাবার্তা যে পুরো ইংরেজিভাষী বিদ্ব্যত্ মহলে ছড়িয়ে পড়েছে তা রবীন্দ্রনাথও জানতে পারেন। তবে তিনি তা জানেন ইতালি ছাড়ার পর। ১৯২৬ সালে ওই ইতালি সফর শেষে তিনি যান ফ্রান্সে, যেখানে তাঁর জন্য অপেক্ষায় ছিলেন রমা রল্যা। সেখানে তাঁর ভাবমূর্তির ভরাডুবির খবর পেয়ে শেষ পর্যন্ত এ নিয়ে নিজেই কলম ধরেন রবীন্দ্রনাথ। তিনি একটি চিঠি লেখেন তাঁর সচিব সি এফ অ্যান্ড্রুযকে। পুরো সফরের ব্যাখ্যা দিয়ে লেখা ওই চিঠি ছাপা হয় ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টার গার্ডিয়ানেও। জবাবে ফর্মিচি চিঠি লেখেন ওই পত্রিকাতেই। রবীন্দ্রনাথ এ চিঠিরও জবাব দেন ম্যানচেস্টার গার্ডিয়ানের পাতায়।

তাদের ওই পত্রযুদ্ধ শান্তভাবেই শেষ হয়। কিন্তু ফ্যাসিবাদ নিয়ে রবীন্দ্রনাথের মুখে প্রশংসাবাণী বসিয়ে দেওয়া ইতালীয় গণমাধ্যম কি তা মেনে নিতে পারে? পারে না। তাই রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে প্রকাশিত হয় এমন লেখা :

তথাকথিত সাংস্কৃতিক বলয়ের বেকার অনুসারীরা নন্দিত ভারতীয় কবি রবীন্দ্রনাথকে এ দেশ ভ্রমণের আমন্ত্রণ জানানোর সিদ্ধান্ত নিলো—তখন আমরা এ নিয়ে খুব একটা উত্সাহী ছিলাম না। ইতলির নিজের এবং বিশ্বের জন্য সৌভাগ্যের বিষয় যে, এখানে প্রচুর সাহিত্য-শিল্প ঘরানা আছে; ভারতীয়দের কাছ থেকে এর শেখার কিছুই নেই। যা-ই হোক, রবীন্দ্রনাথ, যিনি কি না ফুল, নক্ষত্র আর পাউন্ড স্টার্লিংয়ের কবি, তিনি আলখাল্লা খুললেন আর ভাঙা ইংরেজিতে বাণী দিলেন আঞ্চলিক কিছু সমাবেশে যারা...। এই অভিজ্ঞতার পর রবীন্দ্রনাথ দ্বিতীয়বার ইতালি এলেন, প্রধানমন্ত্রীর আতিথ্য নিলেন, আর উড়ে বেড়ালেন ইতালির প্রধান প্রধান শহরে। আবারও আমাদের সহানুভূতি জাগাতে ব্যর্থ হলেন তিনি। যে-কবি নিজের মানুষদের বেদনা বোঝে না, আমাদের কাছে কবি নয়, শুধুই সে ছদ্ম-মিস্টিক। এই অসত্ সন্তু, অন্যদের বোকামি যাঁকে মহত্ত্বে পৌঁছে দিয়েছে, অতিথিদের প্রতি ইতালির প্রথাগত সদাচরণ থেকে লাভবান হয়েছেন। ইতালি তাঁর মধ্যে ভারতীয় জনতার মহত্ত্ব এবং এর বিপদজনক দ্বিধা দেখেছিল। এরপর রবীন্দ্রনাথ সীমান্ত পার হলেন আর বিষ ছড়াতে শুরু করলেন ইতালির বিরুদ্ধে। কে পাত্তা দেয়? রবীন্দ্রনাথকে মনে হয় হাস্যকর; আর তারাও যারা এই তেলবাজ এবং অসহ্য লোকটিকে এনেছিল আমাদের মাঝে।

১৯২৬ সালের সেপ্টেম্বরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পর্কে এইসব কথা ছাপা হয় ইতালির পোপোলো ডি ইতালিয়া পত্রিকায়। এই পত্রিকার সম্পাদক মুসোলিনির ভাই।

তবে কার্লো ফর্মিচির সঙ্গে লেনদেন তখনো ফুরায়নি রবীন্দ্রনাথের। ১৯৩০ সালে নিউ ইয়র্কে তাঁদের দেখা হয় আবার। ওই দেখার ফল হলো একটি চিঠি। যেটি রবীন্দ্রনাথ লেখেন মুসোলিনিকে!



মাননীয়,

আমার প্রিয় বন্ধু অধ্যাপক কার্লো ফর্মিচির হাত ধরে আসা আপনার অতুলনীয় উপহারের কথা আমার প্রায়ই মনে পড়ে।...

আমি যখন ইতালি ছিলাম তখন আপনি যে বিরল আতিথেয়তা দেখিয়েছিলেন সেজন্য আমি ব্যক্তিগতভাবে ঋণী। যে-ভুল বোঝাবুঝি দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমার, এবং আপনি যে মহান মানুষগুলোর প্রতিনিধিত্ব করেন তাঁদের মধ্যে, যে বাধা সৃষ্টি করেছে তা চিরস্থায়ী হবে না বলে আমি মনেপ্রাণে আশা করি। আপনার এবং আপনার জাতির প্রতি আমার এই কৃতজ্ঞতা গৃহীত হবে বলেও আমি আশা করি। একটা দেশের রাজনীতি এর নিজের, কিন্তু এর যে মানবিকতা তা পুরো মানবজাতির।

ফর্মিচির সঙ্গে শেষ দেখার পর রবীন্দ্রনাথের লেখা এই চিঠির কথা ৭৮ সালে অবন্তী সান্যালের গোচরে যায়নি। তবে ২০০৯ সালে ইতালি সফর নিয়ে মনন খাটানো কল্যাণ কুণ্ডু এর খবর রাখেন। যদিও তিনি নিশ্চিত হতে পারেন না, চিঠিটি আদৌ মুসোলিনিকে রবীন্দ্রনাথ পঠিয়েছিলেন কি না। তবে ইতালীয় এক লেখকের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি এ-ও বলেন যে চিঠিটি ইতালি পৌঁছেছিল, কিন্তু মুসোলিনির হাতে গিয়েছিল কি না—কে জানে। এরও আগে ইংরেজি ভাষায় সর্বশেষ বিশ্বস্ত রবিজীবনীর লেখক কৃষ্ণা দত্ত ও অ্যান্ড্রু রবিন্সনও এই চিঠির কথা বলতে ভোলেন না অবশ্য। তবে তাঁদেরও ধারণা ছিল চিঠিটি পাঠানো হয়নি : '১৯৩০ সালে নিউ ইয়র্কে রবীন্দ্রনাথের আবার দেখা হলো ফর্মিচির সঙ্গে। বাধা ভাঙতে তিনি মুসেলিনিকে চিঠি লেখানোর জন্য রবীন্দ্রনাথকে রাজি করাতেও সমর্থ হন বলেই দেখা যায়। রথীন্দ্রনাথের পরামর্শে চিঠিটি পাঠানো হয়নি, তবে এর খসড়া রবীন্দ্রভবনে অক্ষত আছে।'

ওই চিঠির ভাগ্যে আসলে কী হয়েছিল, তা ২০১০ সালে আমাদের নিশ্চিত করেন গিউসেপ্পে তুচ্চির মেয়ে গিউসেপ্পে ফ্লোরা। ইতালির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঐতিহাসিক আর্কাইভের বরাত দিয়েই এই নিশ্চয়তা দেন তিনি। ফ্লোরা জানান, রবীন্দ্রনাথের পাঠানো সেই চিঠিটি ওই আর্কাইভে সংরক্ষিত আছে। কিন্তু সম্পর্কের বরফ কি গলেছিল? ফ্লোরা জানাচ্ছেন, তাঁর জানামতে রবীন্দ্রনাথের ওই চিঠির জবাব দেননি মুসোলিনি।

এই পাতার আরো খবর -
font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেছেন, 'রাজনৈতিক দল হিসাবে কর্মকাণ্ড করার কোনো অধিকার জামায়াত রাখে না।' আপনিও কি তাই মনে করেন?
2 + 9 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
নভেম্বর - ২৯
ফজর৫:০২
যোহর১১:৪৭
আসর৩:৩৫
মাগরিব৫:১৪
এশা৬:৩১
সূর্যোদয় - ৬:২২সূর্যাস্ত - ০৫:০৯
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :