The Daily Ittefaq
ঢাকা, সোমবার ০৫ আগস্ট ২০১৩, ২১ শ্রাবণ ১৪২০ এবং ২৬ রামাযান ১৪৩৪
সর্বশেষ সংবাদ হাইকোর্টের রায় বহাল; নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না জামায়াত | আপিল করেছেন গোলাম আযম | অষ্টম মজুরি বোর্ডের সুপারিশে মন্ত্রিসভার একমত

গল্প

১৯৭১

শান্তনু কায়সার

সেদিন ছিল ২৭ মার্চ। আমরা ব্রাহ্মণবাড়িয়া তিতাস গ্যাস রেস্ট হাউসে অপেক্ষা করছি। আজ খালেদ মোশাররফ আসবেন আমাদের উদ্দেশে বক্তৃতা দিতে। আমরা সবাই উত্তেজিত। কনফারেন্স রুমটাকে মনে হচ্ছে লেকচার থিয়েটারের মতো। আমরা সবাই টেবিলের পাশে চারদিকে চেয়ারে বসেছি। বক্তার জন্য রয়েছে আলাদা টেবিল ও চেয়ার। আমরা এতটাই উত্তেজিত যে, জুনিয়র কমিশন্ড অফিসাররা বসে থাকতে পারছে না। একবার উঠছে, একবার বসছে। একজন জেসিও উত্তেজনার মধ্যে ফিটই হয়ে গেল।

খালেদ মোশাররফ এলেন। দুপুর অথবা বিকেল তিনটায় তিনি তাঁর আসনে বসলেন। প্রথমেই তিনি আমাদের বিদ্রোহ সফল হওয়ার জন্য অভিনন্দন জানান। এর মধ্যে তারা নিশ্চয়ই কৌশলগত লক্ষ্যগুলো স্থির করে নিয়েছে এবং যথেষ্ট সতর্ক হয়েছে। ফলে তাদের আক্রমণ করার আমাদের সময় উত্তীর্ণ হয়েছে। আমাদের প্রশিক্ষিত সৈন্যের সংখ্যা এখন খুবই কম। অস্ত্র, গোলাবারুদ যা আছে, আছে; নতুনভাবে সহসা পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। চট্টগ্রাম, ঢাকা ও কুমিল্লায় কী ঘটছে পরিষ্কারভাবে আমরা তা জানি না। এর মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া বিদ্রোহের খবর নিশ্চয়ই পাকিস্তানিদের কাছে পৌঁছে গেছে। তারা হয়তো সহসাই এ জায়গায় আক্রমণ করবে। অতএব আমাদের যে স্বল্পসংখ্যক প্রশিক্ষিত সেনাবল রয়েছে, তা মূল্যবান বিবেচনা করে রক্ষা করতে হবে, যাতে একদিন আমরা আমাদের মাতৃভূমিকে রক্ষা করতে পারি। তাই আমাদের এ মুহূর্তের একমাত্র বিকল্প হচ্ছে—পশ্চাদপসরণ। সেজন্য বিদ্যমান শক্তিকে বাড়াতে হবে, বাড়াতে হবে প্রশিক্ষণ ও জনবল, নিয়োগ করতে হবে তরুণদের। তারপরই শুধু আমরা—

ক্যাপ্টেন আখতার আহমদ অবাক হয়ে ভাবছিল, এসব কী বলছেন মেজর। আমাদের এখন যুদ্ধ করার সময়। ক্যাপ্টেন দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসু চোখে মেজরের দিকে তাকান।

কোনো প্রশ্ন?

ইয়েস স্যার।

ইশারায় অনুমতি দিলেন মেজর।

স্যার, পাকিস্তানিরা আমাদের লোকেদের হত্যা করছে। কোথাও কোথাও আমাদের নারীদের...। আমরা সবাই যুদ্ধ করতে চাই।

সুবেদার সাব, কিন্তু দেশের জন্য আমাদের জীবন যে বড় মূল্যবান। আপনি চাইলে এখনই জীবন দিতে পারেন। কিন্তু ভেবে দেখুন, আগামীকাল কিংবা আরও কিছুদিন যদি বেঁচে থাকেন, আপনি তো বেশ কয়েকজনকে প্রশিক্ষণ দিতে পারবেন, যারা দেশের জন্য লড়বে। আনাড়ি লোকের চেয়ে প্রশিক্ষিত কর্মী যেমন ভালো তেমনি প্রশিক্ষণ নিয়ে যুদ্ধ করা কি বেশি ভালো নয়? এখন সময় হচ্ছে প্রশিক্ষণের যেন দীর্ঘস্থায়ী গেরিলা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে ও শক্তি সঞ্চয় করতে পারি।

ক্যাপ্টেন আখতারের সহ্য হচ্ছিল না। সে একজন শল্য চিকিত্সক। ম্যান অব অ্যাকশন। বসে থাকতে পারে না। তার মনে হয়, শত্রুহননের চেয়ে বড় কোনো কাজ অথবা উদ্দেশ্য নেই।

সে আবারও প্রশ্ন করে, প্রস্তুতির জন্য আমাদের কত সময় লাগতে পারে?

সেকথা কে বলতে পারে? তিন মাস, ছয় মাস, হয়তো এক বছর।

এক বছর!

হতাশ হয়ে বসে পড়ে ক্যাপ্টেন আখতার আহমদ।

কিন্তু মাথা ঠান্ডা হলে সে বুঝতে পারে, যুদ্ধবিদ্যা ও কৌশলকে আবেগ দিয়ে নয়, বুদ্ধি দিয়ে বুঝতে হবে।

এবং সে বুদ্ধির কারণে ব্যক্তিগতভাবে যা সে চায় না তা-ও তাকে করতে হয়। দেশের মুক্তির জন্য সৈনিকের পক্ষে নিরাবেগ ও নির্মোহ না হয়ে উপায় নেই।

তখন এপ্রিলের শেষ। মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল একদিন এক পাঠানকে ধরে নিয়ে আসে। তার নাম নূর আহমদ খান। তার অঞ্চল সে ছেড়েছে বহু বছর আগে। কুমিল্লার স্থানীয় এক মেয়েকে বিয়ে করে, প্রায় আধা বাঙালি হয়ে গেছে। কমপক্ষে পনের বছর সে কুমিল্লায় আছে। তাদের একটিমাত্র পুত্র—জামিল আহমদ খান। বছর নয়-দশ, বাংলাও বলে, উর্দুও বলে।

লেখাপড়া তেমন করেনি। করে কী হবে? বড় হলে কোনো কাজে ঢুকে যাবে—পড়ালেখার কী দরকার? মা নাম দস্তখত ছাড়া আর কিছুই পারে না। আর বাবা লেখাপড়া করেনি বলে পুত্রেরও মনে হয়, কী দরকার লেখাপড়া ও সময় খরচ করে? বাবার যদি হাতের কাজ জেনে জীবন চলে যায় তার কেন যাবে না? লেখাপড়া করলে কতটুকুইবা করতে পারবে তার মতো গরিবের ছেলে, আর তা কী কাজেই বা আসবে? মাঝখান থেকে কাজ করার ইচ্ছাটাই যাবে নষ্ট হয়ে। কাজ নাই বাবা অমন লেখাপড়া করে। সেজন্য বাবা-মা দুজনেই বলে, কাজ নাই বাবা লেখাপড়া করে। আমাদের মতো গরিবদের কী দরকার আলগা ফুটানি করে। শেষে পায়ের বেড়ি হয়ে দেখা দিবে। নিজেও সে মেনে নিয়েছে এই কথা।

পনের বছর ধরে ভালোই আছে নূর আহমদ খান। বাঙাল মুলুকে কী করে এসে পড়েছে, তা সে নিজেও জানে না। তবে পাঠান মুলুকের ভাষা বদলে না-বাঙাল না-পাঠান হয়ে গেছে। সে উর্দুর মতো একটা ভাষা বলে— সেটা কী ভাষা সে জানে না। তার তো জানার দরকার নাই, কাজ চললেই হলো। এভাবেই সে চলেছে। এতদিন কোনো সমস্যা হয়নি।

কিন্তু দক্ষিণ দিকে গর্কি হলো, কত মানুষ মারা গেল। তারপরে হলো ইলেকশন। বাঙালিরা নাকি অনেক ভোট পেয়েছে। এখন আবার শুনি, পাকিস্তান নাকি থাকবে না। যদি পাকিস্তান না থাকে, আমাদের কী হবে? আমাদের কি এই মুলুকে থাকতে দিবে? এতদিন যা-ই হোক, বহুদূরে হলেও দুইটা অংশ মিলে পাকিস্তান বলে একটা রাষ্ট্র ছিল। যেতে পারি, না পারি, ভাবতাম, ওই পারে আমার একটা মুলুক আছে, মাকান আছে। এখন যদি পাকিস্তান ভেঙে যায়, কোথায় খুঁজব আমার সেই মুলুক আর মাকান?

আরে ব্যাটা নূর আহমদ, আর কোনোদিন কি সেখানে যেতে পারবি, পাকিস্তান থাকুক আর ভাঙুক? যেখানে এসে পড়েছ, যেখানে পনেরটা বছর আছ, যেখানে লড়কা পয়দা হলো, যেখানে দেখতে দেখতে তারও বয়স হয়ে গেল নয়-দশ, সেটাকেই কেন আপনা মুলুক ভাবো না? পাকিস্তান যদি ভেঙে যায়, যাক। কী আছে? এখানকার বাঙালের মেয়েকে যদি শাদি করতে পারি তাহলে তো এই জায়গাকেও পেয়ার করতে পরি। কী, পরি না? বিয়ে করার সুবাদে এই মুলুকও আমার হইল। কী, হইল না? কিন্তু ভোটের পর বাঙালরা যেভাবে লেগে গিয়েছে তাতে কি বাঙাল ভাষা ছাড়া আর কোনো লোকদের তারা জায়গা দিবে? পাঠান, বেলুচি, পশতু—সবই তো ওদের কাছে এক। ছেলের নাম ধরে নিজের স্ত্রীকে ডাকে নূর আহমদ, ও জামিলের মা, বাঙালের লোকেরা কি আমাদের আপন ভাববে নাকি এখানে থাকতে দিবে?

জামিলের মায়েরও এর জবাব জানা নেই। সেও বলে, জানি না তো জমিলের বাপ। তুমি পুরুষ মানুষ, দুনিয়াদারি দেখ, বোঝ, তুমিই যদি না জান, আমি কী জানব, বুঝব? সে ভাবে, তার বাবা, মা কবে মারা গেছে। ভাই-বোন থেকেও নেই। একবার সে তার ভাই-বোনদের জিজ্ঞেস করেছিল। তারা তাকে বলেছে, তুমি পাঠান বিয়ে করেছ, তুমি জান। হায়রে বাবা, আল্লাহর দুনিয়ায় কেন এত বিরোধ? পাছে সে ভেবেছে, যা হবার হবে। এত বড় আল্লাহর দুনিয়ার তার কি, তাদের কি ঠাঁই হবে না? অবশ্য সে অন্য কথাও ভাবে, জামিল এখন দশ বছরের লেড়কা। দেখতে দেখতে বড় হয়ে যাবে। সে তো বাঙাল মুলুকের ছেলে। এইখানে তার জন্ম। তার বাবার কাছ থেকে যে ভিটাটুকু সে পেয়েছে, সেখানে আমিনা বিবি তার স্বামী নূর আহমদকে দিয়ে একটা ঘর তুলিয়েছে। সেই পরিচয়ে জামিল নিশ্চয়ই বেঁচে থাকবে আর পিতা-মাতা হিসেবে, সেখানে নিশ্চয়ই তাদেরও ঠাঁই হবে। এভাবে তারা এই মুলুকেই ঠাঁই পেয়ে যাবে। এই ভরসায় এক সময় আমিনা বিবির আর দুশ্চিন্তা হয় না।

কিন্তু নূর আহমদের একটু দুশ্চিন্তা হয়। বাঙালিরা যদি শেষে বলে, এটা তোমার মুলুক না, তুমি তোমার মুলুকে চলে যাও, তখন কী হবে? সে তো এখন তার মুলুকও চেনে না। তাহলে কী হবে? ভেবে ভেবে কোনো কূল-কিনারা পায় না নূর আহমদ খান। পরে সে এদের হাতে পড়ে। এদের বন্দুক, কোঁচামারা লুঙ্গি, কাপড়-বাঁধা মাথা দেখে সে ঘাবড়ে যায়। না বলতে পারি বাংলা, না উর্দু, না নিজের ভাষা। জগাখিচুড়ি ভাষা বলতে গিয়ে সে আরও তালগোল পাকিয়ে ফেলে, যেন বোকা বনে যায়। মুক্তিদেরও সন্দেহ বাড়ে।

চল ক্যাম্পে চল।

চল একে নিয়ে ক্যাম্পে যাই।

কে ও?

ক্যাপ্টেন আখতার জানতে চান।

মোটামুটি বুঝিয়ে বলে দলের নেতা,

ক্যাপ্টেনের ভ্রূ কুঞ্চিত হয়।

আচ্ছা, চোখ না বেঁধেই তোমরা সোজা ওকে এখানে নিয়ে এসেছ?

ইয়েস স্যার।

ইয়েস স্যার? অল ফুলস। এটুকু তোমাদের কারোরই মনে হলো না যে, ওকে যে খোলা চোখে নিয়ে এসেছ তাতে এ ও রুটটা চিনে যাচ্ছে। পাকিস্তান আর্মি বা তার কোনো ইন্টিলিজেন্সকে সে তো রুটটা দেখিয়েও দিতে পারে। কী, পারে না?

রাইট স্যার। আপনি ঠিক বলেছেন। ব্লান্ডার হয়ে গেছে। এখন কী করব?

ওকে আপাতত ক্যাম্পের মধ্যে পাহারায় রাখ।

ক্যাপ্টেন আখতার ভাবেন, ওকে আর বাঁচিয়ে রাখা যাবে না। রিস্ক নেওয়া অসম্ভব। চারিদিকে ছোটখাটো যে একশান হয়েছে ও হচ্ছে এবং যুদ্ধ চলছে তাতে ওকে ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবাই যায় না। ব্যক্তিমন যে কথা বলে, যুদ্ধের স্ট্রাটেজিতে তাতে সায় দেওয়া মোটেই সম্ভব নয়। কিন্তু লোকটা ইনোসেন্ট। হোক ইনোসেন্ট, সে এর মধ্যে এসে পড়েছে কিংবা মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে ধরা পড়েছে। সে রুট চিনে নিয়েছে সে। ও নো এই রিস্ক নেওয়া যাবে না।

হঠাত্ একটা বালকের কান্না শোনা যায়। বিশেষ সতর্ক আখতার চিত্কার করে ওঠেন, হু ক্রাইজ দেয়ার? একটা বাচ্চা-টাচ্চা মনে হচ্ছে—দেখ তো কে?

হ্যাঁ, স্যার, একটা ছেলে।

কে এই ছেলে?

স্যার, ওই পাঠানের ছেলে। নূর আহমদ খান পাঠানের ছেলে জামিল।

ও কী করে এখানে এল?

বাবাকে খুঁজতে খুঁজতে এখানে চলে এসেছে।

ঠিক আছে, আসতে দাও।

ছেলেটাকে দেখে বড় মায়া হয় ক্যাপ্টেন আখতারের। একেবারেই বাচ্চা। ভেরি ইয়ং অ্যান্ড ইনোসেন্ট।

এখানে কেন এসেছ?

মেরা বাবা, মেরা বাবা নূর আহমদ খান।

পরে খোঁজ নাও, এখন তুমি চলে যাও। এটা বড় ডেঞ্জারাস জায়গা, বুঝতে পার?

জি স্যার। কিন্তু আমি আমার বাবার সঙ্গে একটু দেখা করতে ও কথা বলতে চাই।

না—প্রশাসকের কণ্ঠে উচ্চারিত হয়। কিন্তু তারপর মনে হয়, তার স্ত্রী খুকুর গর্ভে যদি এরকম কোনো সন্তান হয় অর্থাত্ যদি সে—।

নাহি হোগা, চলা যাও।

তবু প্রশাসক স্থির থাকতে চান।

একটু যদি বাবাকে দেখতে পেতাম। মাকে গিয়ে বলতে পারতাম—।

একজনকে ডেকে তার সঙ্গে জামিলকে পাঠিয়ে দেন আখতার।

পিতা-পুত্রের মিলনে দুজনে খুব কাঁদে। মধ্যবয়সী নূর আহমদ খান তার বুদ্ধি দিয়ে বুঝতে পারে, তাকে আর এরা ছাড়বে না। এছাড়া তাদের কোনো পথ নেই।

এক সময় নিজের চোখের জল মুছে পুত্রের চোখের জল মুছিয়ে দিলেন নূর আহমদ। শেষে বললেন, যা ব্যাটা, চলা যা। মাকে দেখিস আর বলিস, একটা ভুল হইল। কার ভুল হইল, জানি না। কিন্তু ভুল একটা হইল। সেই ভুলের মাশুল গুনল তোর বাবা। তবু যদি সব ভালো হয় আমার কোনো আফসোস নাই, বাবা জামিল।

ছেলেটা চলে যাবার পর অনেকক্ষণ কেটে গেছে। ক্যাপ্টেন আদেশ দিয়ে দিয়েছেন—শুট হিম।

এখনো এসে খবর দিয়ে যায়নি।

দেবে তো অবশ্যই। তবে অপেক্ষার প্রহর বড় দীর্ঘ হয়। ততক্ষণ পিসফুল থাকাটাই সবচেয়ে বড় কথা।

দুই

নূরু এখন সামনে দাঁড়িয়ে আছে।

তুমি নিশ্চয়ই যুদ্ধ করতে এসেছ?

জি স্যার।

যুদ্ধের মূল কাজ কী—জানো নিশ্চয়ই। শত্রুনিধন-শত্রুকে হত্যা করা। তাই না নূরু?

জি স্যার।

তুমি কোন পর্যন্ত পড়াশোনা করেছ?

ক্লাস থ্রি।

তোমার বয়স?

নয়, স্যার।

এত কম বয়সে কেন মুক্তিযুদ্ধে এসেছ, সে তো তুমি আমাদের অনেকবার বলেছ। বলনি?

জি স্যার, বলেছি।

তাহলে আজ এই বিপরীত কাজের কারণ কী?

নূরু কোনো কথা বলে না।

ক্যাপ্টেন আখতারের মনে পড়ে, স্থানীয় বালক ও লোকেদের নিয়ে গড়া একটা প্লাটুনের অপারেশনের সাকসেস-স্টোরি শুনে তিনি মুগ্ধ হয়েছিলেন। এই বালকের সাক্ষাত্ তিনি পেয়েছিলেন ওই প্লাটুনে, যখন তিনি তাঁর রুটিন ভিজিটে গিয়েছিলেন। প্লাটুনকে উত্সাহ দেবার জন্য তিনি তাদের রেগুলার ইউনিটের পোশাক ও অস্ত্রশস্ত্র দিয়েছিলেন। কিন্তু একটি ছেলেকে দেখে তিনি খুবই অবাক হয়েছিলেন। তার ছিল খুবই কম বয়স। পোশাকগুলো তার গায়ে ঢলঢল করছিল। বয়স জেনে তিনি আরও অবাক হয়েছিলেন। মাত্র নয়। কিন্তু কেন সে ওই প্লাটুনে যোগ দিয়েছিল? কেউ তাকে নিয়ে আপত্তি করছে না দেখে তিনি আরও বেশি বিস্মিত হয়েছিলেন।

পরে জানলেন, পাকিস্তানি আর্মি তাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়েছিল এবং তার পিতা-মাতাকে হত্যা করেছিল। এর প্রতিশোধ নেবে বলেই সে এই প্লাটুনে এসে যোগ দিয়েছে। এবং এমন কিছু অপারেশন সে করেছে যে, কারোরই তাকে খাটো করে দেখার উপায় নেই। সেজন্য তাকে নিয়ে কেউ ঠাট্টা পর্যন্ত করে না। আড়ালে-আবডালে বলে, ধাইন্যা মরিচ। প্লাটুনে যোগ দিয়ে সে ট্রেনিং নেয়। শত্রুদের ফাঁদে ফেলে নিজেদের ব্যুহের মধ্যে এনে তাদের হত্যা করাই তার কাজ। এতদিন পর্যন্ত সে তার বিরুদ্ধে নালিশ করবার কোনো সুযোগ দেয়নি। তাহলে আজ তার হলো কী?

ক্যাপ্টেনকে কিছু না বললেও নূরুর চোখে ভাসতে থাকে সেই চিত্র। দুজন পাকিস্তানি সৈন্যকে সে বাগে পেয়েছিল। একজনকে গুলি করে সে ধরাশায়ী করে। কতক্ষণের মধ্যেই বোঝা যায়, সে মারা গেছে। দ্বিতীয়জনকেও সে গুলি করে। রক্ত পড়াকেও তোয়াক্কা না করে সে দৌড়াতে থাকে। হঠাত্ নূরু দেখে, দ্বিতীয় সৈনিকটি দাঁড়িয়ে প্রথম সৈনিকটির লাশ দেখছে।

গুলি করতে গিয়েও নূরু চুপচাপ দাঁড়িয়ে আড়াল থেকে দেখে, সে কী করে। তখন চাইলেই নূরু তাকে গুলি করে হত্যা করতে পারে। কিন্তু তা না করে তার কৌতূহল হয়, মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও ওই সৈনিকটি কী করবার জন্য এভাবে দাঁড়িয়েছে। তারপর নূরু দেখে, সে প্রথম সৈনিকটির কাছে যায়। তার মৃত দেহটি কাঁধের ওপর তোলে এবং তাকে নিয়ে এগুতে থাকে। সহযোদ্ধাকে সে কিছুতেই ফেলে যাবে না।

নূরুর মনে হয়, একে তো গুলি করা যায় না। ক্যাপ্টেন জিজ্ঞেস করেন, সুযোগ পেয়েও কেন তুমি শত্রুকে হত্যা করলে না?

নূরু বলে, জানি না স্যার।

তুমি যুদ্ধের নিয়ম লঙ্ঘন করেছ। কিন্তু তোমার বয়স যেহেতু কম, তোমাকে এবার ক্ষমা করা হলো। ভবিষ্যতে আর ক্ষমা করা হবে না।

ইয়েস স্যার, আপনি যা বলেন। কিন্তু—

বলো—

একটা কথা বলব স্যার?

হ্যাঁ, বলো।

আমি হয়তো যুদ্ধের নিয়ম লঙ্ঘন করেছি, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের নিয়ম লঙ্ঘন করিনি।

মানে?

জানি না স্যার।

তিন

একাত্তরে মুক্তিযোদ্ধারা যখন প্রশিক্ষণে এসেছিল তখন সাধারণভাবে তাদের পরনে ছিল লুঙ্গি, গায়ের জামাও ছিল সাধারণ। তখন তাদের বেশিরভাগেরই পা ছিল খালি। অথবা তারা পরেছিল জঙ্গলবুট। বেশিরভাগেরই না-কামানো মুখ। প্রশিক্ষণ অথবা যুদ্ধের সময় তারা যখন শহরে আসত, তখন আসত ওষুধ, খাদ্য অথবা অস্ত্র নিতে। এরকমই ছিল মুক্তিযোদ্ধারা।

খালেদ মোশাররফ বলতেন, দেশ জীবিত গেরিলা চায় না, চায় ত্যাগী বীর। মুক্তিযোদ্ধারা হয় মারা গেছে নয় অশনাক্ত কবরে শুয়ে আছে। যারা মুক্তিযুদ্ধকে বিক্রি করেছে অথবা অন্যভাবে তার সুবিধা নিয়েছে তারা মুক্তিযোদ্ধা নয়। মেরুদণ্ড বাঁকা না হওয়া ও উন্নত মস্তকের নাম ১৯৭১।

নূরু মিয়ার কবরের সামনে দাঁড়িয়ে তার কন্যা নূরুননাহারের দুই চোখ পানিতে ভেসে যায়। বড় অকালে মারা গেছে তার বাবা। নইলে মুক্তিযোদ্ধা-ব্যবসায়ীদের খপ্পরে পড়ে তার যে কী হতো।

এই পাতার আরো খবর -
font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেছেন, 'রাজনৈতিক দল হিসাবে কর্মকাণ্ড করার কোনো অধিকার জামায়াত রাখে না।' আপনিও কি তাই মনে করেন?
2 + 1 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
নভেম্বর - ২৯
ফজর৫:০২
যোহর১১:৪৭
আসর৩:৩৫
মাগরিব৫:১৪
এশা৬:৩১
সূর্যোদয় - ৬:২২সূর্যাস্ত - ০৫:০৯
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :