The Daily Ittefaq
ঢাকা, সোমবার ০৫ আগস্ট ২০১৩, ২১ শ্রাবণ ১৪২০ এবং ২৬ রামাযান ১৪৩৪
সর্বশেষ সংবাদ হাইকোর্টের রায় বহাল; নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না জামায়াত | আপিল করেছেন গোলাম আযম | অষ্টম মজুরি বোর্ডের সুপারিশে মন্ত্রিসভার একমত

ওয়েস্টার্ন উপন্যাস

নীড়

রওশন জামিল

টেক্সাস ফ্ল্যাটের উজানে আগুনশিখার মত ছুঁচোল পাহাড়ি খাঁজ। একটা হাত নড়ে উঠল খাঁজের মাথায়। পরক্ষণে নিথর হয়ে গেল হাতটা। বিশাল বাদামি-ধূসর স্তব্ধতায় আর কোনো নড়াচড়া নেই। শব্দ নেই।

করাতের দাঁতের মত খাঁজের ওপরে, আকাশে, অলসভঙ্গিতে চক্কর কাটছে একটা শকুন। নড়ে-ওঠা হাতটা ওর চোখে পড়েছে। গোঁত্তা মেরে নিচে নেমে এল ওটা; দেখল, রিজের মাথায় ছড়ান-ছিটান পাথরের মাঝে একটা লোক পড়ে আছে। দীর্ঘদেহী, চওড়া কাঁধ, মেদহীন কঠিন মুখাবয়ব। পরনে জীর্ণ বুট, ছিন্ন জিন্স।

ওই মুখ শিকারীর, তবে এ মুহূর্তে ওটা একজন ধাওয়া-খাওয়া শিকারের মুখ। লোকটার পাশে রাইফেল পড়ে; কোমরে পিস্তলের বেল্ট। লোকটা এখনও বেঁচে আছে। শকুনটা অপেক্ষা করতে পারে।

দূর-নিচে, খাঁজের পাদদেশ থেকে দূরান্তে ছড়িয়ে পড়েছে মরু-অববাহিকার চোখ-ধাঁধানো শাদা বিস্তার। এর ওপাশে অগভীর নালা, একটা বিশুষ্ক লেকে গিয়ে মিশেছে। ওই নালা ধরে ক্রমাগত ওপরে উঠে আসছে কয়েকজন অশ্বারোহী। তিনটি দলে বিভক্ত ওরা, কিন্তু লক্ষ্য সবার এক।

ধাওয়া-খাওয়া লোকটার অবস্থান থেকে চিরুনির মত খাঁজ দুপাশে বিস্তৃত, অববাহিকার নিষ্প্রাণ শাদা আর ওপাশের ভাঙাচোরা পাহাড়ি প্রান্তরের মাঝে বিশাল দেয়াল তুলেছে। সীমান্তের দক্ষিণে ওই ভাঙাচোরা প্রান্তরে, হাজার হাজার ক্যানিয়নের কোনো একটায় একজন মানুষ গা ঢাকা দিতে পারে। অথবা পথ হারাতে পারে।

ওই জায়গায় পানি নেই বললেই চলে। শ্বেতাঙ্গরা খুব কমই যায় ওখানে। জায়গাটা মূলত ইনডিয়ানদের শেষ দুর্গ, এবং ওদের কাছে কোনো শ্বেতাঙ্গ করুণা আশা করতে পারে না।

বহুদূরে, ভাঙাচোরা প্রান্তরের ওপাশে, কয়েকটা সুবিশাল চূড়া মেঘ ছুঁয়েছে। দূর থেকে নীলাভ লাল দেখায় ওগুলো; নিরুত্তেজ, বিচ্ছিন্ন, উদাসীন। ওইসব পর্বতে পানি থাকবে। ঘাস থাকবে। একজন মানুষ ওখানে ছায়া পেতে পারে; বুনো শিকার পেতে পারে; আশ্রয় পেতে পারে। ধাওয়া-খাওয়া লোকটি এখনও সন্ধান করেনি ওটার, অবশ্য সে ওই পর্বতমালার কথা জানে। মাঝখানে কী আছে, তাও জানে।

তবে মাঝের ওই দুর্গম মরুভূমির এখানে-সেখানে, যদি কেউ জানে কোথায় খুঁজতে হবে, পানি মিলবে।

উত্তরে, ধাওয়া-খাওয়া লোকটার দৃষ্টিসীমায় নয় এখনও, অনুসন্ধানী অশ্বারোহীরা নাগাড়ে এগিয়ে চলেছে। ওদেরকেও দেখতে পেয়েছে শকুনটা। খাবারের খোঁজ-দেওয়া এই প্যাটার্ন ওর চেনা, যদিও এটা কীভাবে বোঝে তার কোনো যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা সে করতে পারে না। তার পুরো জীবন এ ধরনের খণ্ড খণ্ড অভিজ্ঞতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। সে জানে যখন এ ধরনের অশ্বারোহী দল দেখা যায় তখন মৃত্যুও তাদের সঙ্গেই থাকে।

ট্রেস জর্ডান অশ্বারোহী দলটাকে দেখতে পাচ্ছে না, কিন্তু সে জানে ওরা আছে ওখানে এবং ওকে খুঁজছে। একবার, সাত ঘণ্টা আগে, ওরা বিশ্বাস করেছিল ওকে হত্যা করা সম্ভব হয়েছে। ওর রক্ত-ভেজা শার্ট সাক্ষ্য দিচ্ছে ওদের অনুমান সত্যের কত কাছে ছিল।

মকিং বার্ড পাসের উজানে পাহাড়ি টিলার মাঝে ওকে কোণঠাসা করেছিল ওরা। তখন একদল শিকারি কুকুরের তাড়া খাওয়া কৃশ, ক্ষুধার্ত নেকড়ের অবস্থা ওর। ঘুরে দাঁড়িয়ে লড়াই করে ও, হার স্বীকার করেনি। জীবনে কখনও সে হারেনি।

একটা রাইফেলের গুলি পাথরে বাড়ি খেয়ে ফেরার সময়ে ওর নিতম্বের সামান্য ওপরে খানিকটা মাংস খুবলে নিয়ে গেছে। ফলে প্রচুর রক্ত হারিয়েছে ও।

ওকে লুটিয়ে পড়তে দেখেছিল ওরা। জানে না কী ধরনের মানুষের সঙ্গে লড়ছে, ফলে কাছাকাছি চলে এসেছিল খতম করার জন্য। সুযোগটা আবার এলে, অনেক সতর্ক থাকবে ওরা। পাহাড়ে ওরা শুধু রক্তই ঝরায়নি, এক সঙ্গীর লাশ ফেলে এসেছে এবং একজন মারাত্মক আহত হয়েছে। শেষমেশ যখন ফাঁদ গুটিয়ে আনে ওরা তখন কিছুই পায়নি—স্রেফ কিস্যু না।

এতক্ষণে প্রতিপক্ষের চরিত্র বুঝতে শুরু করেছে ওরা। পেছনে শত্রুর লাশ ফেলে নিঃশব্দে পালিয়েছে সে। লোকটা আহত হয়েছে, মাটিতে রক্ত দেখে বোঝা যায়, তবে যেভাবেই হোক না কেন, সে রক্তপাত বন্ধ করেছে। যেভাবেই হোক পেছনে কোনো ট্রেইল রাখেনি। এভাবে উবে গেছে, যেন মরুভূমি গিলে নিয়েছে ওকে, স্বগোত্রীয় ভেবে ক্যানিয়ন আর ঊষর অববাহিকার বুনো নিঃসঙ্গতার মাঝে আপন করে নিয়েছে।

বুনো, পাহাড়ি এলাকা আর সীমান্তের হিংস্রতার সঙ্গে জর্ডানের সম্পর্ক নাড়ির। তার অভিজ্ঞতার ঝুলি বিচিত্র। ওয়াইল্ড হর্স হান্টার, র্যাঞ্চ ফোরম্যান, র্যাঞ্চার, মার্শাল—জীবনে বহু ধরনের কাজ সে করেছে। আর এখন ভাবছে সামনের কাজটা নিয়ে। নড়াচড়া করলে ওর ক্যান্টিনটা আওয়াজ তুলছে পাথরে। তাই নিঃসাড় পড়ে আছে ও। পাথরের গায়ে ওর হূদিপণ্ড ধীরলয়ে ভারি হাতুড়ির বাড়ি মারছে। চলে যাওয়ার সময় হয়েছে। যেকোনও মুহূর্তে এসে পড়বে ওরা। সে ওদের দেখতে পাবে না, কিন্তু ওরা খুঁজে বের করবে। তাছাড়া ওর বিশ্রাম দরকার। পানি দরকার।

পাথরে পেট ঘষটে ঘোড়ার কাছে গেল ও, একটা সিগারেট বানাতে বানাতে পরিস্থিতি নিয়ে ভাবল। এই এলাকা ওরা চেনে। কিন্তু সে চেনে না। প্রতিটা ট্রেইল, হাইড আউট সব ওদের নখদর্পণে।

তাছাড়া ওই দলে ইয়াকব লানত্স আছে। দক্ষিণপশ্চিমের সেরা ট্র্যাকার লোকটা। জর্ডান তাকে নামে জানে, চেহারায় চেনে। এ ধরনের লোকের কথা পশ্চিমে মানুষের মুখে মুখে ফেরে। লানত্স ট্র্যাক করে বুদ্ধি দিয়ে, ইন্দ্রিয় দিয়ে। ওর চোখ যখন ট্রেইলের অর্থোদ্ধার করে, তখন মন ব্যস্ত থাকে যে-লোকটাকে তাড়া করছে তার পরবর্তী গন্তব্য অনুমানে।

পরিকল্পনায় ঝুঁকি আছে। কিন্তু একটা পরিকল্পনা ওর দরকার। এটা ওর চলার পথ এবং উদ্দেশ্য ঠিক করবে। এবং লানত্স পরিকল্পনাটা ধরে ফেলার আগেই আরেকটা নয়া পরিকল্পনা ঠিক করতে হবে ওকে। কখনই এক পরিকল্পনার সঙ্গে আরেক পরিকল্পনার মিল থাকলে চলবে না। তাহলে ওর হদিস বের করে ফেলবে ওরা।

স্যাডলে চাপল জর্ডান, ঘোড়া হাঁটিয়ে খাড়া ঢালের নিচে নামতে শুরু করল। পশ্চিমে একগুচ্ছ আকাশছোঁয়া মেসা। গভীর, বিসর্পিল ক্যানিয়ন ওগুলোকে বিচ্ছিন্ন করেছে। ওই ক্যানিয়নগুলো সহজগম্য, চলাচল উপযোগী। কিন্তু ওগুলোই একটা ফাঁদে পরিণত হতে পারে। মাইলের পর মাইল চলার পর সে আবিষ্কার করতে পারে ওটা আদতে কানা ক্যানিয়ন, বেরোবার রাস্তা নেই।

ওকে মেসার ছাতে ওঠার ট্রেইল খুঁজে বের করতে হবে। এমন পথে চলতে হবে যেখানে বাতাস বয় এবং ইনডিয়ানদের আনাগোনা আছে।

স্যাডলে নেতিয়ে পড়ল জর্ডান, শরীরে পচা ঘামের গন্ধ, জামাকাপড় ঘাম আর ধুলোয় চটচটে। ওর নিচে ক্লান্তপায়ে এগোচ্ছে ঘোড়াটা। জর্ডান জানে ওই অবলা জীব শক্তির শেষ সঞ্চয় খরচ করে দাঁড়িয়ে আছে এখনও। একটা রাত এবং দিনের প্রায় পুরোটা সময় ওরা দুজনেই পানি ছাড়া।

ক্ষীণ একটা ডিয়ার ট্রেইল বালিয়াড়ির বাইরে চলে গেছে। পাথুরে খাড়াইয়ে সহজে চলার জন্য বালু ছেড়ে ওই পথটা ধরল জর্ডান। টানা বেশ কিছুক্ষণ ওপরে ওঠার পর, একজায়গায় থেমে পেছন ফিরল। অনেকটা ওপরে উঠে এসেছে। চিরুনিসদৃশ খাঁজ বহু মাইল নিচে পড়ে রয়েছে। নিজের সৌভাগ্যে নিজেই বিস্মিত হল জর্ডান। দেয়ালের ওপাশ থেকে বেরিয়ে আসার সরু ওই পথটা সাধারণভাবে চোখে পড়ার কথা নয়।

নিজের অবস্থা বিচার করল ট্রেস জর্ডান। পছন্দ করার মত কিছু পেল না। ওর মাথা এখন আশ্চর্যরকমের পরিষ্কার কাজ করছে। এই স্বচ্ছতাকে ও বিশ্বাস করে না। এটা ঘোরের পূর্বলক্ষণ। নিজের দুর্বলতা টের পায় ও। বোঝে বিশ্রাম দরকার, পানি দরকার, জখম পরিচর্যার জন্য সময় দরকার।

অববাহিকার বিপরীতমুখী ওর ট্রেইল সবার চোখে ধরা পড়বে কিন্তু বালিয়াড়ি ধরে এগোনোর ব্যাপারটা কিছুক্ষণের জন্য হলেও ওদের ধন্দে ফেলবে। এখন প্রতিটা বিলম্ব গুরুত্বপূর্ণ।

অবশেষে ওর ঘোড়াটা যখন মেসার শীর্ষে উঠল, মুহূর্তের জন্য থামল জর্ডান। শরীরে বাতাসের পরশ অনুভব করে। ঘামে-ভেজা শার্টের নিচে শীত-শীত বোধ করে। স্যাডলে ঘাড় ফিরিয়ে পেছনে তাকাল ও।

অস্পষ্টভাবে, এবং বহুদূরে, পাহাড়ের নীল পটভূমে ধুলোর একটা রেখা ফুটে আছে বাতাসে। একটা ধুলোর রেখা, তারপর আরেকটা, এবং আরও একটা।

আবার রওনা হল সে। তেষ্টা লাঘবে জিভের নিচে নুড়ি রেখেছে একটা। দুবার নেমে হেঁটে এগোল, ঘোড়ার বোঝা হালকা করছে কিছুটা। বলা যায় না, কখন আবার ছুুটতে হয় প্রাণপণে। ঘোড়ার শক্তির ওপরেই তখন হয়ত নির্ভর করবে ওর বাঁচা অথবা মরা।

বেশ কয়েক মাইল হাঁটল সে, তারপর পড়ে গেল...

দিনকতক আগের কথা। পশ্চিমের এক পাহাড়ি এলাকায় বন্ধু জিমি হেনডার্সনকে নিয়ে বুনো ঘোড়া রাউন্ড আপ করছিল জর্ডান। প্রায় একমাসের মেহনতে দুই ডজন ঘোড়া একটা বক্স ক্যানিয়নে জড় করে ওরা। একটা একটা করে পোষ মানায় ওগুলোকে, নিতম্বে লোহার ছ্যাঁকা দিয়ে জেএইচ মোহর এঁকে দেয়। সবগুলোই ছিল ভাল জাতের ঘোড়া, এ ধরনের বুনো পালে যা সাধারণত থাকে না। হেনডার্সনকে ক্যাম্পে রেখে জর্ডান শহরে যায় নিজেদের জন্য কিছু খাবার আর রসদ কিনতে।

দুদিন পর ক্যাম্পে ফিরে ও দেখে ক্যাম্পও নেই, ঘোড়াও নেই। উধাও হয়েছে সব। ঘোড়া দাপিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে ক্যাম্প। জিমির লাশ পড়ে আছে ওটর হোলের অদূরে। চারটে বুলেট ঢুকেছে ওর শরীরে। পিস্তলটা নেই।

নিশ্চল, তপ্ত দুপুর। রোদ ঝলসান বেসিন। পোড়া জমিতে মুখ গুঁজে পড়ে আছে জিমি। দুটো বুলেট ছোড়া হয় ওর পিঠ লক্ষ্য করে। কাজটা যাদেরই হোক, নিশ্চিত হতে চেয়েছিল। তারা পেছনে কিছুই ফেলে যেতে চায়নি। তবে ট্রেস জর্ডানের ব্যাপারে তারা কিছুই জানত না।

পশ্চিমে যারা চেনে জর্ডানকে, জানে—সে শান্তিপ্রিয়, নিরীহ মানুষ। পিস্তলে বিজলির গতি, কেউ কেউ বলে, অ্যাপাচির মত ট্রেইল অনুসরণ করতে পারে। স্যালুন, ট্রেইল ক্যাম্পের মারামারিতে ওর জুড়ি মেলা কঠিন। ওকে মিথ্যুক বলায় টাসকোসাতে হত্যা করেছে একজনকে। এডৌবি ওয়ালসের উত্তরে বাফেলো ওয়ালোতে ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করায় চারজন ইনডিয়ানকে খুন করেছে। একদল দুর্বৃত্ত বন্দুকের মুখে সবকিছু কেড়ে নিয়ে মরুভূমিতে ধুঁকে মরার জন্য ফেলে এসেছিল ওকে। জর্ডান পায়ে হেঁটে মরুভূমি পেরিয়ে, শহরে ফিরে এর বদলা নিয়েছে। ছোট-বড় মিলিয়ে এরকম আরও কিছু ঘটনা আছে ওর। এসব সত্ত্বেও, ট্রেস জর্ডান শান্ত এবং শান্তিপ্রিয় মানুষ।

শোক সামলে, ধীরে ধীরে, হামলার ছবিটা মনের মধ্যে এঁকেছে সে।

ছজন লোক এসেছিল উত্তর থেকে। হর্স ক্যাম্পটা দেখতে পেয়ে, ক্রিকের ধারে ঝোপের আড়ালে আত্মগোপন করে ওরা, জায়গাটার ওপর নজর বোলায়। নিশ্চয় দুপুর তখন। উল্টান বালতিটা পড়ে আছে জিমির অদূরে। ছত্রভঙ্গ আগুনের পাশেই ফ্রাইয়িং প্যানটা পড়ে। সোজা এসেছে ওরা, ধীরগতিতে। জিমি তখন মাত্র বালতি ভরে ঝরনা থেকে ফিরে আসছিল (ওর গভীর ট্র্যাক ঝরনা থেকে দূরে সরে গেছে), ওদের দেখে সে থেমে ছিল।

পরের দিনগুলোয় ঝরনায় প্রচুর সময় ব্যয় করেছে জর্ডান। প্রতিবার খুঁজে পেয়েছে ট্রেইল, এবং একসময় আলাদা করে ছয়টা ঘোড়ার প্রত্যেকটার ট্র্যাক এবং সেগুলোর আরোহীদের স্বভাব তার মাথায় ছবির মত গেঁথে গেছে।

একজন লোক অর্ধেকটার বেশি সিগারেট খায় না। মাঝে মাঝে সশঙ্কিত দু-তিন টান দিয়েই ফেলে দেয়। আরেকজনের বুটে মেক্সিক্যান স্টাইল বিশাল স্পার লাগান। গোড়ালির ভরে বসলেই মাটিতে নিজেদের চিহ্ন রেখে যায় ওগুলো।

সপ্তাহ খানেক পর টোকেনওয়ার ধুলিধূসর রাস্তায় ঘোড়া হাঁটিয়ে উপস্থিত হল জর্ডান। একটাই রাস্তা, দুপাশে ক্ল্যাপবোর্ড লাগান ফলসফ্রন্টেড দালান আর কয়েকটা অ্যাডৌবি। রাস্তায় অলস দাঁড়িয়ে ছিল এক লোক। জর্ডানের ঘোড়ার ব্যান্ডটা চোখে পড়তেই চকিতে অদৃশ্য হল স্যালুনের ভেতরে।

ঘোড়া থেকে নামল ট্রেস জর্ডান, হিচরেইলে লাগামটা আলতো করে বাঁধল। যাকে খুঁজছিল, স্যালুনের ভেতরে তাকে দেখতে পেল না। একটা ড্রিংকের ফরমাস দিয়ে, তাস খেলায় মগ্ন তিনজন জুয়াড়ির ওপর নজর বোলাল। বারে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আরেকজন। জর্ডান ওর স্পারটা দেখল।

'একটা ড্রিংক করলে কেমন হয়?' বলতে বলতে কাছে সরে এল লোকটা। তরুণ, রুক্ষ চেহারা, পরিশ্রমী কাউহ্যান্ড। ওদের গ্লাসগুলো পূর্ণ হওয়ার পর নিজেরটা উঁচু করল সে, জর্ডানের দিকে তাকাল। 'তোমার এবং সামনের ট্রেইলের উদ্দেশে।'

পান করল ওরা। জর্ডান শান্ত গলায় বলল, 'আমি হয়ত থাকতে পারি কিছুদিন।'

'আমার পরামর্শ,' স্মিত হাসছে তরুণ, 'সবসময়ে চলার ওপরে থাক!'

হুমকিটা পরিষ্কার। রাস্তার লোকটার কাছে ওর ঘোড়ার গায়ে জেএইচ ব্র্যান্ড একটা কিছু বুঝিয়েছিল। এর অর্থ, জিমির হত্যাকারীদের সম্পর্কে লোকটা কিছু জানে। হয় সে জানে নয়ত খুনিদেরই একজন। নিঃসন্দেহে, স্যালুনের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় এই লোকটাকে সে কিছু বলেছে। জর্ডানকে মাত্র হুঁশিয়ার করা হয়েছে। যার মানে দাঁড়ায়, ওই ছজনের বন্ধু আছে।

'কিছু ঘোড়া চুরি গেছে,' বলল জর্ডান। আমার পার্টনারকে খুন করা হয়েছে। আমি ওদের ট্রেইল করে এখানে এসেছি।'

তরুণ এখন আর হাসছে না। গ্লাসের অবশিষ্ট তরলপদার্থ গলায় ঢালল সে, বার থেকে সরে দাঁড়াল। 'নির্ভর করছে একজন মানুষের কতটা জায়গা দরকার।'

ব্যাখ্যার অপেক্ষায় থাকে জর্ডান, কামরার কিছুই নজর এড়াচ্ছে না। টেবিলের লোকগুলো কানখাড়া করে শুনছে।

'ছয় হাজার মাইল সামনে,' বলল লোকটা, 'অথবা ছয় ফুট এখানে।'

ট্রেইলের রুক্ষতা ওকে একহারা করে গড়ে তুলেছে। বার থেকে সরে এল জর্ডান। দীর্ঘদেহী, কঠিন, নিঃসঙ্গ এক মানুষ সহসা যেন স্বরূপে আত্মপ্রকাশ করল। এক কদম পিছু হটল তরুণ, সন্ত্রস্ত বোধ করছে।

'আমার বাজি ধরা হয়ে গেছে,' বলল জর্ডান, 'এবং ওরাও তাস বেটে দিয়েছে।'

বাদুড়ডানা ঠেলে বাইরে এল সে আর ঠিক তক্ষুণি চোখে পড়ল বুড়ো লোকটাকে, একটা স্টিলডাস্টে চেপে রাস্তার উজান থেকে আসছে। জর্ডান নিজে পোষ মানিয়েছে ওই স্টিলডাস্টকে। ওই ঘোড়ার সঙ্গে প্রচুর সময় কাটিয়েছে। ওর নিজের বিশাল লাল ঘোড়াটা বাদ দিলে, ওই স্টিলডাস্ট ছিল পালের সেরা।

বুড়োর সামনের কিছু চুল শাদা। ওর চোখদুটো ভয়ঙ্কর এবং কর্তৃত্বপূর্ণ। স্যাডল থেকে যখন সে নামল, ভঙ্গিতে একটা রাজকীয় ভাব ফুটে উঠল।

সাইডওয়ক থেকে রাস্তায় নামল ট্রেস জর্ডান, রাস্তার ওপাশে বুড়োর উদ্দেশে রওনা হল। দীর্ঘ, সাবলীল ভঙ্গিতে পা ফেলছে, জানে সোজা বিপদের মুখে এগিয়ে যাচ্ছে। রাস্তার ভাটিতে থমকে দাঁড়াল এক লোক... আরেকজন আবির্ভূত হল দোকানের দরজায়।

স্টিলডাস্টের ব্র্যান্ড মুছে ফেলা হয়েছে। চমত্কার কাজ। জেএইচ বদলে এসবি করা হয়েছে।

স্যাডলের ওপাশ থেকে কড়া দৃষ্টিতে বুড়ো তাকাল ওর দিকে। 'কী ব্যাপার? খুঁজছ কিছু?'

জলাশয়ের ধারে শুকনো কাদায় পড়ে-থাকা জিমির লাশের কথা মনে পড়ল জর্ডানের, জবাব দিল: 'আমার ওই ঘোড়াটা যে চুরি করেছে আমি তাকে খুঁজছি। ওই ঘোড়া আমার। আমি ধরেছি। আমি পোষ মানিয়েছি। আমি জেএইচ মার্কার ছাপ দিয়েছি।'

প্রবীণ চোখজোড়া ক্রোধে জ্বলে উঠল চকিতে। 'আমাকে তুমি ঘোড়া-চোর বলছ?' ঘোড়াটাকে পাশ কাটাল বুড়ো, জর্ডানের মুখোমুখি হল। ওর কোমরে পিস্তল, নিচু করে বাঁধা।

'আমি শুধু এটাই বলছি, তুমি যে-ঘোড়ায় চড়েছ সেটা আমার। ওটা একটা চোরাই ঘোড়া।'

'তুমি একটা আস্ত মিথ্যুক!'

বুড়োর হাত যখন পিস্তলের বাঁট স্পর্শ করল, জর্ডান ওর পেটে গুলি করল।

ধোঁয়া-ওড়া পিস্তলের ওপর দিয়ে পথচারী দুজনের দিকে তাকাল জর্ডান। 'তোমরা দুজনেই যাও ঘোড়াটার কাছে, স্যাডল স্কার্টটা উঁচু করো।' ওরা যখন পা বাড়াল, সে যোগ করল, 'যদি স্যাডল স্কার্টের নিচে একটা চার ইঞ্চি পরিমাণ শাদা ক্ষতচিহ্ন না থাকে, আমি একটা মিথ্যুক।'

ওরা দেখতে পেল ক্ষতচিহ্নটা...

'কিছু যায় আসে না,' একজন লোক বলল। 'হয়ত ঘোড়াটা তোমার। কিন্তু ওই বুড়ো চোর ছিল না। তুমি পালাও, ওরা তোমাকে দড়িতে ঝোলানোর আগেই।'

দাঁতে দাঁত চপে উঠে বসল জর্ডান, স্যাডলে চেপে তাকাল চারপাশে। কোথাও কোনো প্রাণের চিহ্ন নেই। ব্যতিক্রম শুধু মাথার ওপরের ওই শকুনটা। তাপতরঙ্গে জুনিপার ঝোপের রেখা চোখে পড়ে কিন্তু নড়াচড়ার লক্ষণ নেই কোথাও। তারপর হঠাত্ কিছু ট্র্যাক দেখতে পেল ও।

একটা ধেড়ে ইঁদুর আর হরিণের ট্র্যাক।

ক্লিফের ধার অবধি গেছে ওগুলো, তারপর অদৃশ্য হয়েছে। ব্যাপারটা এত গুরুত্বপূর্ণ মনে হচ্ছে কেন? ধাঁধার কূল-কিনারা পায় না ও। অস্থির হয়ে উঠেছে ওর মাস্টাং, খুঁটায় বাধা লাগাম ছিঁড়ে ফেলতে চাইছে। ঘোড়াকে নিজের ইচ্ছায় চলতে দিল জর্ডান। পাহাড়ে বেড়ে-ওঠা ঘোড়া নিমেষে এগোল চূড়ার প্রান্ত বরাবর, কিনারে পৌঁছে থমকে দাঁড়াল।

ওর নিচে ভ্রুর মত একটা ট্রেইল পাহাড়চূড়ার গা আঁকড়ে আছে। ট্র্যাকগুলো ওই ট্রেইলেই গিয়ে মিশেছে। ট্রেইলের ওপর মনোযোগ নিবদ্ধ করল জর্ডান ইঁদুরের ট্র্যাক কোনো অর্থ বহন করে না। কিন্তু ওই একই ট্রেইলে হরিণের ট্র্যাক থাকার অর্থ সামনে কোথাও পানি থাকতে পারে। পানির গন্ধ পেয়ে থাকবে ঘোড়াটা, নিশ্চয় পিপাসায় আধমরা হয়ে আছে ওটা।

কাহিল অবস্থা ওর, কিন্তু জর্ডান বুঝল এমন একটা জায়গার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না। ট্রেইলটা খাড়া। একটা ভুল পদক্ষেপ, হাজার ফুটের বেশি পতন ডেকে আনবে। অথচ ওই ট্র্যাকই হয়ত পানির কাছে নিয়ে যাবে। হরিণ সামলেছে ওই কঠিন পথ। তাছাড়া, ওর এখন হারাবার মত আছেই-বা কী? ঘোড়ার কানে কানে কথা বলল জর্ডান।

মুহূর্তের জন্য কান খাড়া করল ঘোড়াটা, ইতস্তত করল একটু, তারপর আরোহীর তাড়ায় এবং নিজের তাগিদে এগোল সামনে। পায়ে পায়ে নিচে নামতে শুরু করল ওটা, রেকাব ঘষা খাচ্ছে পাহাড়ের গায়ে। প্রায় চল্লিশ গজ নামার পর এক জায়গায় দশ ফুট চওড়া হয়ে গেল ট্রেইলটা। এখানে ঘোড়া থেকে নামল জর্ডান, রাশ ছেড়ে দিয়ে, চার হাতে-পায়ে হেঁটে উঠে গেল যেখান থেকে নেমেছে সেখানে।

একমুঠো জংলা ঘাস দিয়ে ক্লিফের কিনার অবধি ট্র্যাকগুলো মুছে ফেলল ও, তারপর মুঠোভরে ধুলো নিয়ে আলগোছে ছড়িয়ে দিল মাটিতে যেন খুব স্বাভাবিক দেখায় জায়গাটা। তারপর যেভাবে এসেছিল সেভাবে নেমে গিয়ে স্যাডলে চাপল।

আধমাইলেরও বেশি যাওয়ার পর সহসা এক জায়গায় শেষ হয়ে গেল ট্রেইলটা। সামনে আধ-একর সমান একটা চাতাল, ওপর থেকে সম্পূর্ণ আড়ালে। বাইরের কিনার মানজানিতা আর জুনিপার ঝোপে ঘেরা। ক্যানিয়নের ওপাশ থেকে বোঝার জো নেই ঝোপের পেছনে এরকম একটা জায়গা থাকতে পারে। এখানে, শৈলশিরা আছে একটা, কোনোদিক থেকেই দেখা যায় না, এবং ওই শৈলশিরার একধারে একটা ধ্বংসাবশেষ রয়েছে।

নির্দেশ ছাড়াই দ্রুতপায়ে ঘোড়াটা এগোল ধ্বংসাবশেষের দিকে। পানি গড়িয়ে পড়ার শব্দ পেল জর্ডান।

তাড়াহুড়ো করে নামতে গিয়ে আরেকটু হলেই ঘোড়া থেকে পড়ে যাচ্ছিল ও। টলতে টলতে এগোল বেসিনের দিকে। পরিষ্কার টলটলে ঠান্ডা পানি প্রায় বারো ফুট দূরের একটা ফাটল থেকে রক বেসিনে গড়িয়ে পড়ছে। যখন তেষ্টা মিটল কিছুটা, চিত হয়ে শুয়ে পরিস্থিতি নিয়ে ভাবতে শুরু করল ও।

আপাতত সে নিরাপদ। এভাবে ট্র্যাক গোপন করেছে, ইয়াকব লানত্সর মত ঘাঘু ট্র্যাকারও সহজে ধরতে পারবে না। মেসার বেশিটাই নিরেট পাথর। ওপর থেকে এই চাতালও দেখা যায় না।

আবার পানি খেল সে, ব্যথায় কাতরাচ্ছে। যন্ত্রণা একটা ক্ষুধার্ত ইঁদুরের মত কুরে কুরে খাচ্ছে ওর জখমের জায়গা। কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল জানে না, জেগে উঠল ঠান্ডায়। রাত নেমেছে। তারা ফুটেছে আকাশে। গড়িয়ে স্যাডলের কাছে গেল সে, হাতড়ে দড়ির গিঁট খুলে বেড রোলটা খসিয়ে আনল। কম্বলে আপাদমস্তক মুড়িয়ে শুয়ে পড়ল আবার। মাথাটা অর্ধেক খালি পিপের মত মনে হচ্ছে, যার ভেতর ওর মগজ ঘুরপাক খাচ্ছে।

দূরে কোথাও চাঁদের কাছে কাতর ফরিয়াদ জানাল একটা কয়ৌটি। শব্দের বেসুরো ঝঙ্কার মুহূর্তের জন্য ঝুলে রইল শূন্যে, তারপর বাতাসে ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। জ্যোত্স্নায়-ভেজা রাত আগের মতই নিমজ্জিত হল নিঃসীম নিস্তব্ধতায়। শুধু পানি গড়িয়ে পড়ার ক্ষীণ শব্দ শোনা যায়। ঘুম আর ঘোরের ভেতর ব্যথায় গুঙিয়ে উঠল জর্ডান।

কতক্ষণ ঘুমিয়ে ছিল জানে না, হঠাত্ জেগে গেল কপালে কোমল হাতের স্পর্শে। জখমের জায়গায় ভোঁতা একটা যন্ত্রণা আছে এখনও, তবে আড়ষ্টভাব অনেকটাই কেটে গেছে। মাথা ভার হয়ে আছে। পানি গড়িয়ে পড়ার শব্দ আসছে। বাতাসে সেজ আর পোড়া লাকড়ির গন্ধ ভাসছে। চোখ বোজা অবস্থাতেই জর্ডান অনুমান করতে চেষ্টা করল ওর বন্দুক কোথায়। কাছেপিঠে কয়েক শ' মাইলের মধ্যে ওর কোনো বন্ধু নেই। এখানে মানুষ বা পশুর উপস্থিতি ওর জন্য বিপজ্জনক।

কপালের কোমল ভাবটা চলে গেছে। কিন্তু ও টের পায় কয়েকটা আঙুল ওর পিস্তলের বেল্ট বাকল খুলে, শার্ট সরাল একপাশে। কোমল অথচ দক্ষ আঙুল ক্ষতস্থান পরখ করল, তারপর আরামদায়ক এবং উষ্ণ কিছু একটা রাখল জখমের ওপর।

তাকাল জর্ডান। চোখে অন্ধকার সয়ে আসার পর দেখল একটি মেয়ে হাঁটু গেড়ে বসে ওর পাশে। চাঁদের আলোয় মেয়েটার লাল ব্লাউজ দেখতে পায় সে। ওর বাদামি কাঁধ আর কালো চুল নজরে আসে।

নিশ্চয় ঘোরের মধ্যে আছে সে। এই জনমানবহীন স্থানে কোনো মেয়ে থাকতে পারে না। এবার ঘাড় ফেরাল মেয়েটি, তাকাল ওর দিকে।

ওর চোখগুলো ডাগর এবং কালো, লম্বা পাপড়ি দিয়ে ঘেরা। পয়লা নজরেই ওই চোখে নারীর মমতা লক্ষ করল জর্ডান। পরক্ষণে বদলে গেল দৃষ্টি, সে অন্যদিকে তাকাল।

'কেমন বোধ করছ?' মেয়েটির কণ্ঠস্বর আবেগহীন, শত্রুতা কিংবা বন্ধুতা কিছুই প্রকাশ পায় না।

'ভাল,' কোনোমতে বলল জর্ডান। 'তোমার অশেষ দয়া।'

চকিতে তাকল মেয়েটি। 'একটা কুকুরের জন্যেও আমি করব এটা!'

ক্ষতস্থান থেকে পট্টিটা যখন সরাল ও, আঙুলের পেলবতা দূর হয়েছে। কাঁধের ওপর পড়ে-থাকা মেয়েটির কালো চুল, পাতলা ব্লাউজের তলায় স্ফীত স্তন পছন্দ হয় জর্ডানের। তবে ওর মুখখানা কঠিন। সেখানে কোনো উষ্ণতা নেই।

'ওরা যদি টের পায় তুমি আমাকে সাহায্য করেছ, তুমি বিপদে পড়বে।'

'বিপদ সবখানেই আছে।'

জর্ডানের শরীরে শক্তি নেই। নীরবে সে ওপরের ঝুলবারান্দার দিকে তাকিয়ে থাকে। নিশ্চয় ঘুমিয়ে পড়েছিল ও, যখন জাগল মেয়েটি চলে গেছে। আগুন নেভান। ওর জখমে পরিষ্কার ব্যানডেজ বাঁধা। মুখ আর হাত ধোয়ান হয়েছে।

মেয়েটির প্রতি কৃতজ্ঞতা বোধ করে ও। যখন ভেবেছিল সে অচেতন কোমল আচরণ করেছে মেয়েটি। কিন্তু ও সজাগ এটা টের পাওয়ামাত্র আচরণ মুহূর্তে বদলে যায়। এই হেঁয়ালির কারণ জর্ডান খুঁজে পায় না। অবশ্য এই দুর্গম প্রান্তরে মেয়েটির উপস্থিতিও এক হেঁয়ালি বৈকি।

কনুইয়ের ভরে উঁচু হয়ে ও দেখল ওর স্যাডল কাছে এনে রাখা হয়েছে। রাইফেলটা পাশে রাখা। পিস্তল দুটো খাপে ভরা। সবকিছু নাগালের মধ্যে।

পাহাড়ের নিচে নামার রাস্তাটা শুকনো ঝোপ আর ডালাপালা দিয়ে ঘিরে দেয়া হয়েছে। ওই পথে কেউ আসার চেষ্টা করলে সামান্যতম শব্দে ওর ঘুম ভেঙে যাবে। মেয়েটা যে-ই হোক, সবকিছু ভেবেছে এবং সে সাটন-বেইলেস আউটফিটের বন্ধু হতে পারে না।

উপত্যকায় ঘোড়সওয়ারদের আগমনের শব্দ পেয়েছিল মারিয়া ক্রিশ্চিনা। ওর বাবার মৃত্যুর পর এধরনের কোনো ঘোড়সওয়ার দল আর ক্যানিয়নে আসেনি। এর অর্থ একটাই—ঝামেলা। এদেশে যখন দশ-বারোজন ঘোড়সওয়ার দল বেঁধে চলে তখন তার মানে দাঁড়ায় খুনখারাপি।

ভেড়ার পাল থেকে সরে এল মারিয়া। কটনউডের ছায়ায় ঝিমোচ্ছিল ওর ঘোড়াটা। কাছে গিয়ে হোলস্টার থেকে একটা পুরোন ওয়াকার কোল্ট বের করল। হাত শরীরের দুপাশে ঝুলিয়ে রাখায়, পিস্তলটা স্কার্টের ভাঁজে ঢাকা পড়েছে।

আগুয়ান অশ্বারোহীরা বন্ধু, ওর এমন মনে করার কোনো কারণ নেই। ও মেক্সিকান, ভেড়া পালক। কিন্তু এরচেয়েও বড় পরিচয় ও হচ্ছে পাবলো চাভেরোর মেয়ে। চাভেরো এই ক্যানিয়নে বন্দুক যুদ্ধে নিহত হয়েছে। রক্তে ভেসে গেছে কঠিন পাথুরে জমি, কিন্তু সে লড়াই থামিয়ে পালায়নি। ঘোড়সওয়ারদের এগিয়ে আসার শব্দ শুনতে শুনতে, মারিয়া দিব্যচোখে দেখতে পায় ওদের চেহারা। একমাত্র সাটন-বেইলেস আউটপিটের পক্ষেই সম্ভব এত লোক জড় করা।

'হুয়ানিতো! ভেড়ার কাছে থাক!'

এগারো বছর বয়সেই হুয়ানিতোকে দেখতে ওর বাবার মত লাগে। বড় ভাই ভিচেন্তির চেহারার সঙ্গে ওর কোনো মিল নেই। সামনে এগোল মারিয়া, অপেক্ষায় থাকল অশ্বারোহী দলটাকে মোকাবেলার জন্য।

এই লোকগুলোই হত্যা করেছে ওদের বাবাকে। তারপর ওদেরকে তাড়িয়ে দিয়েছে এই পাহাড়ে। এখন ওরা যদি পাহাড়ে চাতালে লুকিয়ে-থাকা ওই লোকের হদিস পায়, তাহলে ওকেও হত্যা করবে।

টিলার চূড়া টপকে আঁটসাঁট দলবেঁধে এল ওরা, ঘোড়া হাঁটিয়ে নামল ঢালের নিচে, বারো গজ তফাতে এসে থামল। দশজনের দল। প্রতেকের মুখ পরিচিত।

জ্যাক সাটন ওদের মধ্যে সবচেয়ে বদ। বেপরোয়া রকমের সুন্দর চেহারা, নির্দ্ধিধায় খুন করতে পারে। লোভাতুর দৃষ্টিতে ওকে আপাদমস্তক মাপল সে। 'দিন-দিন তোমার খোলতাই হচ্ছে, মেহিকানো! খোদার কসম, একদিন আমি—'

'একদিন!' চাবুকের মত হিসহিসিয়ে উঠল মারিয়ার কণ্ঠ। 'একদিন তুমি খুন হবে!'

ওকে উপেক্ষা করে, বেন হাইনডমানের উদ্দেশে তাকাল মারিয়া। 'কী চাও তুমি?'

হাইনডমানের মধ্যে কোনোরকম চটুলতা নেই। খর্বাকৃতি, বলিষ্ঠ গড়ন, চওড়া চোয়াল সর্বদা দাড়ির জঙ্গলে অন্ধকার হয়ে থাকে। 'আহত কোনো লোককে দেখেছ তুমি, একটা কাহিল লাল ঘোড়া হাঁকাচ্ছে?'

'আমি দেখিনি কাউকে। কে লোকটা?'

সাটন তাকিয়ে ছিল ওর দিকে। মারিয়া জানে লোকটা ভোগ করতে চায় ওকে। ইচ্ছা করে দেহের প্রতিটি অঙ্গভঙ্গিতে ওকে বিদ্রূপ করতে লাগল সে। লোকটাকে সে তার ঔদ্ধত্য আর ভোগবাসনার জন্য ঘৃণা করে। মেয়েটা মেহিকান, তার ওপর ভেড়া পালে, আর ও কিনা তাকে তাচ্ছিল্য করার দুঃসাহস দেখায়। ভাবতে ভাবতে সাটনের মাথায় রক্ত চড়ে গেল।

'কাউকে দেখতে পেলে,' বলল সে, 'তোমার ছোট ভাইকে পাঠিয়ে আমাদের খবর দেবে। আরও ভাল হয়...আমিই বরং আসব...একা।' মারিয়াকে দৃষ্টিলেহন করল সাটন। 'আমার ধারণা তোমার একজন পুরুষ দরকার।'

মারিয়া নজর ফেরাল ওর দিকে। 'সেই পুরুষটা কোথায়?' মারিয়ার কণ্ঠে টিটকারি। 'তুমি?'

ক্রোধে লাল হয়ে গেল সাটনের চেহারা। 'তবে রে...কুত্তি!' মেয়েটার উদ্দেশে ঘোড়া দাবড়াল সে। মারিয়া অবিচল, ঘোড়াটা লাফিয়ে ওঠার মুহূর্তে ভারি কোল্ট উঁচু করে গুলি করল।

গুলির আওয়াজে এবং আগুনের ঝলকে চমকে উঠল ঘোড়াটা, মাথা কাত করল একদিকে, পড়তে পড়তে সামলে নিল। ততক্ষণে সাটনের কানে একটা উজ্জ্বল লাল বিন্দু ফুটে উঠেছে, এবং ফোঁটায় ফোঁটায় গড়াতে শুরু করেছে।

পিস্তল তাক করে রইল মারিয়া, ভাবলেশহীন চেহারা। 'তুমি যাও। পরের বার মিস করব না।'

কান স্পর্শ করল জ্যাক সাটন, চোখের সামনে হাত এনে দেখল রক্ত লেগে। ভয়ে শাদা হয়ে গেছে ওর মুখ, বিশ্বাস করতে পারছে না ঘটনাটা।

ঝিলিক মারছিল হাইনডমানের চোখ দুটো। বিশেষ মনোযোগে মারিয়া ক্রিশ্চিনাকে মাপল সে। 'তোমার ঘোড়াটা ভয় না পেলে,' সাটনকে বলল, প্রচ্ছন্ন সন্তোষের ধার মিশিয়ে, 'তুমি মারাই যেতে।'

'ঠিক, বেন।' সাটনের গলা নিচু। 'আমাকে খুন করত ও। ওই শিপহার্ডার কুত্তি আমাকে খুন করত।'

ঘোড়া ঘুরিয়ে নিল হাইনডমান। অন্যরা অনুগামী হল। স্যাডলে ঘুরে পেছনে তাকাল জ্যাক সাটন। 'বন্দুকটা হাতের কাছেই রেখ। আমি ফিরে আসব।'

অশ্বারোহী দলটা যখন টিলার মাথায় উঠল, একজন বিদায়ের ভঙ্গিতে হাত নাড়ল। ওই লোক ইয়াকব লানত্স।

স্কার্টের পকেট থেকে একটা কার্তুজ বের করল মারিয়া, পিস্তলটা রিলোড করল। লানত্স যখন ওই লোককে ট্র্যাক করে এতদূর এসেছে, তার মানে বিপদ আছে। কুঁজো, অদ্ভুত স্বভাবের বুড়ো এই লানত্স, যতটা না মানুষ তারচেয়ে ঢের বেশি শিকারি কুকুর। কখনও গোসল না, পাহাড়-পর্বতে ঘুরে বেড়ায় বেড়ালের মত।

একটা কঞ্চি ঘোরাতে ঘোরাতে হুয়ানিতো হাজির হল। 'কাকে খুঁজছিল ওরা?' জিজ্ঞেস করল ও।

ওর দিকে তাকাল মারিয়া, দৃষ্টিতে উষ্ণতা। সাটনকে মোকাবেলার পর যখন ঘুরে দাঁড়িয়েছিল ও, দেখেছে একটা পাথরখণ্ডের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসছে হুয়ানিতো।

'একটা লোককে,' মারিয়া বলল। 'একজন লোককে খুঁজছে ওরা।'

'আমি চাই না ওরা তাকে খুঁজে পাক।'

'হয়ত পাবে না,' বলল মারিয়া।

জীর্ণ বাকস্কিন ব্রিচেস আর তালিমারা ভেস্ট পরনে এক ঘোড়সওয়ার এগিয়ে এল ক্যানিয়ন ধরে। একটা হাড় জিরজিরে দোআঁশলা মাদি ঘোড়ায় চড়েছে সে। লোকটা ওর ভাই ভিচেন্তি। লিকলিকে গড়ন, দুর্বল মুখাবয়ব।

ওর দিকে তাকাল মারিয়া, কোনো আত্মীয়তা বোধ করে না, ভাবছে পিতার সঙ্গে কোনো পুত্রের এত অমিল হয় কীভাবে। আশ্চর্য ক্ষিপ্রতায় বন্দুক ড্র করতে পারে ভিচেন্তি, যে-কারও চেয়ে দ্রুতগতিতে, সম্ভবত জ্যাক সাটনের সঙ্গে পাল্লা দেয়ার ক্ষমতা রাখে। সাটন এ-পর্যন্ত এগারোটা খুন করেছে। কিন্তু ভিচেন্তি একটাও করেনি। করবেও না মনে হয়। ও দুর্বল, কাপুরুষ।

'ওরা এসেছিল কেন?' জানতে চাইল সে। 'কাকে খুঁজছিল?'

'ভয় পাচ্ছ?' বিদ্রূপের সুরে জিজ্ঞেস করল মারিয়া।

'আমি কোনো কিছুকে ভয় পাই না!' চেঁচিয়ে বলল ভিচেন্তি, রাগত চোখে দেখছে বোনকে। 'ভয় পাব কেন?'

'কেন? কেন পাবে তাতো জানি না। শুধু জানি তুমি ভয় পাও। সবকিছুতেই ভয় পাও।'

হুয়ানিতো ঘটনাটা লুকিয়ে রাখতে পারল না। 'মারিয়া ক্রিশ্চিনা সেনর সাটনকে গুলি করেছে।'

নিখাদ বিস্ময় ফুটল ভিচেন্তির চেহারায়। 'তুমি ওকে গুলি করেছ?'

কাঁধ ঝাঁকাল মারিয়া। 'কানে। ওর ঘোড়াটা লাফ দিয়েছিল।'

ভিচেন্তি তাকিয়ে থাকে বোনের দিকে। ওদের সবার মৃত্যুর কারণ হবে ও! সামান্যই সঞ্চয় ওদের। অন্তত এখানে কেউ কিছু বলছে না। ও একা থাকতে পারে না কেন? মাস্তানি মানায় মাস্তানদের।

বাবার লাশ আবিষ্কারের ঘটনাটা মনে পড়ল ভিচেন্তির। বাবাকে পূজা করত ও। অসমসাহসী মানুষ ছিলেন। কিন্তু সমস্ত সাহস এবং শক্তি সত্ত্বেও পঙ্গু নেকড়ের মত তাকে পাহাড়ে কোণঠাসা করেছিল ওরা, হত্যা করেছিল। ভিচেন্তির কী সুযোগ আছে সেক্ষেত্রে?

খাঁজের দিকে বিষণ্ন চোখে তাকাল সে, মনে মনে প্রার্থনা করল ওরা যেন লোকটাকে খুঁজে পায় এবং বিদায় হয়। হয়ত সে কাপুরুষ। কিন্তু সে বেঁচে আছে। সূর্যের তাপ উপভোগ করছে। বাতাসে সঙ্গীতের মূর্চ্ছনায় আনন্দলাভ করছে।

'খোদা করে ওরা যেন পায় ওকে,' ভিচেন্তি বলল। 'তাহলে ওরা চলে যাবে।'

মারিয়া ক্রিশ্চিনা তাকাল ভাইয়ের দিকে, তার চোখে অন্ধকার আর বিদ্রূপ খেলা করে। 'তুমি একটা নির্বোধ।'

রাগতভাবে জবাব দিতে গিয়েও সামলে নিল ভিচেন্তি, ঘোড়া হাঁকিয়ে সরে গেল, ক্রোধে শরীর আড়ষ্ট। সাহস কত ওর! জানে না সে এই পরিবারের কর্তা? এভাবে কথা বলে তার সঙ্গে! কিন্তু বেশি সময় রাগ পুষে রাখতে পারে না ভিচেন্তি। পরিবারের সমস্ত দায়-দায়িত্ব মারিয়াই সামলায়। ভিচেন্তি ওকে ভয় পায়।

ভিচেন্তির যাওয়া দেখে মারিয়া। কিন্তু ওকে আগেই ভাবনা থেকে খারিজ করে দিয়েছে সে। ও ভাবছে অন্য একটা সমস্যা নিয়ে। কোথায় লুকোতে পারে একজন মানুষ যেখানে ইয়াকব লানত্স তার হদিশ পাবে না?

আর নিরাপদ স্থান যদি থাকেও, এখন চলাফেরায় বিপদ আছে। ট্র্যাক না থাকলে একজন মানুষকে ট্রেইল করা সম্ভব হবে না। ওই পাহাড়ি চাতালে নীরবে পড়ে থাকাই এখন লোকটার জন্য মঙ্গলজনক। তবে আমাকে হঁশিয়ার হতে হবে, মারিয়া বলল নিজেকে। খুব হুঁশিয়ার।

দ্বিতীয়বার যখন রক শেলফে গেল মারিয়া তখন হঠাত্ করেই গেল। একটা ঝোপের পেছন থেকে সহসা বেরিয়ে এল সে। জর্ডানর জন্য খাওয়া এনেছে। গরম স্ট্যুর পট হাতে বাড়িয়ে ধরে বলল, 'খেয়ে নাও...কথা বলার সময় নাই।'

জর্ডান যখন আহারে ব্যস্ত, ওর ক্ষতস্থান পরিষ্কার করে ব্যান্ডেজ বদলে দিল মারিয়া। একটা কাপড়ে টর্টিয়া আর খানিকটা জার্কি মুড়ে ওর হাতে দিয়ে বলল, 'আগুন জ্বালবে না। ওরা তোমাকে খুঁজছে।'

চলে যাচ্ছিল ও, জর্ডান ওর স্কার্ট টেনে ধরল। ওর দিকে চোখ নামাল মারিয়; মুখ গম্ভীর, অভিব্যক্তিহীন।

'তুমি কে? কোত্থেকে আসছ?' জিজ্ঞেস করল জর্ডান।

'আমি কি তোমাকে এটা জিজ্ঞেস করেছি?'

'আমি জানতে চাইছি কার কাছে কৃতজ্ঞতা জানাব?'

'জানাতে হবে না।'

'অন্তত তোমার নামটা বল।'

কিছুই বলল না মেয়েটি, জর্ডান স্কার্ট ছেড়ে দেয়া অবধি সধৈর্যে অপেক্ষা করল। তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল ও, চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল। সহসা গলাটা সারস পাখির মত লম্বা করল জর্ডান, কোনোকিছু না ভেবেই অস্ফূটে বলল, 'তুমি...তুমি খুব সুন্দর।'

'তুমি বেশি কথা বলছ...ঘুমোও।'

ধ্বংসাবশেষের দেয়ালের ধারে পৌঁছে থামল মেয়েটি। ঘাড় ফেরাল না ও, তবে ভাঙাচোরা পাথুরে দেয়ালের ওপাশে পা বাড়ানর সময় বলল, 'মারিয়া ক্রিশ্চিনা,' এবং পরক্ষণে মিশে গেল অন্ধকারে।

'মারিয়া ক্রিশ্চিনা।' আপনমনে নামটা বার কয়েক আউড়াল জর্ডান। ধ্বনিগুলো মধু বর্ষণ করল যেন ওর কানে। স্পানিশ, সন্দেহ নেই। কিন্তু চলাফেরা ইনডিয়ানদের মত। সহজাত আভিজাত্যের ছাপ আছে আচরণে। পারিপার্শ্বিক অবস্থার সঙ্গে বেমানান আভিজাত্য আর আত্মমর্যাদাবোধ, মেয়েটির চরিত্রের এই দুই বৈশিষ্ট্যই জর্ডানকে মুগ্ধ করে।

নিজের বন্দুকগুলো আবার পরখ করল ও। এমুহূর্তে ওর জীবনের কোনো নিশ্চয়তা নেই। প্রতিটি মুহূর্তই বিপদের মুহূর্ত। প্রতিটি ঘণ্টাই ওর জীবনের শেষ ঘণ্টা হতে পারে। ও কোনো ট্র্যাক সৃষ্টি করছে না। কিন্তু মেয়েটির এই যাওয়া-আসা বেশি সময় গোপন থাকতে পারে না।

মাঝে মাঝে ক্যানিয়নে অথবা ওপরের মেসায় অশ্বারোহীদের আওয়াজ পায় সে। বোঝে তল্লাশি চলছে। আবার সন্ধ্যা ঘনাতে দেখে। ছায়াগুলোকে দীর্ঘ হতে দেখে। ক্যানিয়নের মাথায় নিঃসঙ্গ নক্ষত্রের জন্য ও অপেক্ষা করতে থাকে।

তবে আজ রাতে এরকম তারা ফুটল দুটো। একটা আকাশে। আর অন্যটা অনেক নিচে, মেসার উল্টোদিকে কোথাও। ওটা একটা আগুন; শিকারীদের ক্যাম্পফায়ার।

দুই

ইয়াকব লানত্স বসে আছে ওই আগুনের পাশে। হুয়ান জর্ডান যে-চাতালের নিচে শুয়ে আছে আহত হয়ে সেখান থেকে আগুনটা সাত মাইল দূরে। জ্যাক সাটন আছে ওখানে, এবং সেই সঙ্গে আরও আধ ডজন কঠিন চেহারার লোক। ওরা সবাই ক্লান্ত। অপেক্ষাকৃত বয়স্করা বিরক্ত। নবীনরা রেঞ্জের একঘেয়েমি কাজ থেকে আনন্দদায়ক পরিত্রাণ মনে করছে ব্যাপারটা। তবে একটা জায়গায় প্রত্যেকের মিল আছে। ওরা সবাই কৃতসঙ্কল্প। কেবল ইয়াকব লানত্স সামান্য ব্যতিক্রম। তার মুখটা ব্যর্থতায় তেতো হয়ে আছে।

বহুকালের মধ্যে এই প্রথম সে একটা ট্রেইল হারিয়ে ফেলে আর খুঁজে পায়নি। জর্ডান ফাঁকি দিয়েছে তাকে। হয় এই অঞ্চল থেকে সে পালিয়েছে, নয়ত সুরক্ষিত কোনো জায়গায় লুকিয়ে আছে।

ট্রেইলটা স্রেফ উবে গেছে। ঠিক কোথায় উবে গেছে পরিষ্কার করে সেটা বলা যাচ্ছে না। সাটন বিশ্বাস করেনি জর্ডান কখনও মেসায় উঠেছিল। হাইনডমান একমত পোষণ করেছে। লানত্স নিশ্চিত জর্ডান মেসায় পৌঁছেছিল, কিন্তু ব্যাখ্যা করতে পারছে না কেন তার এরকম বিশ্বাস। মেসায় শুধু দুটো তাজা ট্র্যাক দেখেছে সে। কোনোটাকেই ধাওয়া-খাওয়া লোকটার বলে চেনা যায়নি।

জর্ডান রক্ত হারিয়েছে, প্রচুর রক্ত। তবু সে চলা থামায়নি, এবং একবারও নিজের বুদ্ধি ব্যবহারে ব্যর্থ হয়নি। এ ধরনের মানুষ ভয়ঙ্কর।

জর্ডান সম্পর্কে লানত্স কিছু জানে না কিন্তু সে ট্রেইল পড়তে পারে। বুঝেছে, বুনো প্রান্তরের বৈশিষ্ট্য এবং ট্রেইল কীভাবে গোপন করতে হয় জর্ডান জানে। সহজেই বোধগম্য হয় এমন কৌশল সে কোথাও ব্যবহার করেনি। এবং কখনও দুবার কোনো কৌশলের আশ্রয় নেয়নি।

ওরা যে-এলাকার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে সেটা দুর্গম এবং ভাঙাচোরা। জায়গাটা উত্তরে নিউ মেহিকো এবং আরিযোনা এবং দক্ষিণে সনোরা ও চিহুয়াহুয়ার মধ্যে। ওয়টর হোলের সংখ্যা কম; সীমান্তের দক্ষিণে মেহিকোর ভেতরে পঞ্চাশ মাইলেরও বেশি এলাকা জনবসতিহীন।

অতীতে সীমান্ত এলাকায় তীব্র লড়াই হত। মারকুটে সাটন-বেইলেস আউটফিটের বিরুদ্ধে একমাত্র পাবলো চাভেরোই টিকে ছিল। কিন্তু শেষমেশ সেও মারা পড়েছে। তাসত্ত্বেও, ধাওয়া-খাওয়া লোকটা যদি কারও থেকে সামান্য সাহায্যও পায় তাহলে সেটা একমাত্র ওই পরিবারের কাছে।

'ভিচেন্তি একটা কাপুরুষ,' বলল মর্ট বেইলেস।

'মেয়েটা না,' বলল হাইনডমান।

'ও সাহায্য করে থাকলে আমরা দেখতে পেতাম,' যুক্তি দেখাল জো সাটন। 'এটা একদম খোলামেলা জায়গা।'

'তাহলে কেন আমরা দেখতে পাচ্ছি না ওকে?'

আলোচনাকে উপেক্ষা করল লানত্স, মেয়েটার কথা ভাবছে। কোনো গ্রিংগোকে ওই মেয়ে পছন্দ করে না, এটুকু সে জানে। কিন্তু তারচেয়েও বড় কথা, কোনো সাটন বা বেইলেসের প্রতি তার অনুরাগ নেই। প্রশ্নটা হচ্ছে: সাটনের কোপানলে পড়ে সে কি শেষ সম্বলটুকু খোয়াবার ঝুঁকি নেবে?

নিতে পারে...

লানত্স মনস্থির করল মেয়েটার ওপর নজর রাখবে। ভিচেন্তি উদ্বিগ্ন, অল্পক্ষণের মধ্যে বুঝল সে। মেহিকান ছোকরার অস্থিরতা এবং যেভাবে ওর চোখ পাহাড়-পর্বতের ওপর ঘুরছে সেটাই বলে দিচ্ছে এটা। একজন কমবুদ্ধির মানুষ মনে করতে পারে ও হয়ত জানে কিছু কিন্তু লানত্স সত্য অনুমান করে নিল। ভিচেন্তি কোনো ঝঞ্ঝাট চায় না, আর সাটনের ঘোড়সওয়াররা যতক্ষণ পাহাড়ে আছে, একটা ঝামেলা বাধতে পারে যেকোন সময়ে।

ক্যানিয়নের মাথায় একটা ঝোপের ভেতর অবস্থান নিল লানত্স। ওর সঙ্গে দুরবিন আছে, বাড়িটার আশেপাশে নড়াচড়া দেখতে পারবে। ওর ধৈর্য অসীম। যখন শিকারে বেরোয় তখন ঘণ্টা, দিন এগুলো তার কাছে কিছুই না। ওর চোখে কিছুই এড়াল না।

সন্ধ্যায় ও দেখল মারিয়া ক্রিশ্চিনা আর হুয়ানিতো ভেড়ার পাল ফিরিয়ে এনে বাড়ির অদূরে খোঁয়াড়ে আটকাল। বড় বড় কুকুরগুলোকে খাওয়ান হল। চিমনি থেকে অলস ধোঁয়া উঠল।

ভিচেন্তি বেরিয়ে এসে লাকড়ি কাটল। কুড়াল ওঠা-নামা দেখতে পায় লানত্স, খানিকবাদে কাঠ চেরার দূরাগত ভোঁতা শব্দ শুনতে পায়। অস্তরাগ ছায়গুলোকে ম্লান কমলারঙে রাঙিয়ে দিল। আড়মোড়া ভাঙল ইয়াকব লানত্স, পাইপ ধরিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল। কিছু ঘটলে এখনই হচ্ছে সেই সময়...

কিন্তু কিছুই ঘটল না। একবার দরজার বাইরে দেখা গেল মেয়েটাকে। চিতাবাঘের মত টানটান হয়ে গেল লানত্স যেন শিকারের গন্ধ পেয়েছে। কিন্তু মেয়েটা ডানে-বাঁয়ে তাকিয়ে, সবকিছু গোছান আছে নিশ্চিত হয়ে আবার ঢুকে গেল বাড়ির ভেতর। তারপর ঝুপ করে গাঢ় অন্ধকার ক্যানিয়নটাকে গ্রাস করল। শুধু দূরের দুটো জানালা জ্বলজ্বল করতে লাগল। রাত আরও শীতল হল।

হয়ত তার ভুল হয়ে থাকবে। হয়ত ওরা কিছুই জানে না। তবে রাতে সে আরও কাছে যেতে পারে।

সন্ধ্যায় কম্বলের শয্যা ত্যাগ করল ট্রেস জর্ডান, ধীরেসুস্থে হামাগুড়ি দিয়ে ক্লিফের কিনারে গেল। ঝোপঝাড়ের আড়াল থেকে ক্যানিয়নের ভেতরে তাকাল।

এই প্রথম সে পরিস্থিতি বিবেচনা করতে পারছে। ওর নিচে ক্যানিয়নটা একশ গজেরও কম চওড়া, কিন্তু সামান্য দূরে সমতল ভূমিতে ছড়িয়ে পড়েছে। ক্যানিয়নটা আসলে একটি ঝুলন্ত উপত্যকা, মাইল দুই তফাতে গিয়ে এক বিশাল সমভূমিতে মিশেছে, যা সীমান্তের দুপাশেই বিস্তৃত। সাটন-বেইলেসের গরু ওই প্রান্তরেই চরে।

অগ্রভূমিতে, ক্যানিয়নের সবচেয়ে চওড়া অংশের মাঝ বরাবর, চাভেরো হোমস্টিড। ক্যানিয়নের ওই অংশে প্রচুর ঘাস আছে, আর নিচের ঢালে যেখানে জায়গাটা গরুমোষ চরানর জন্য বেশি খাড়া নয়, ভেড়ার চর্বি, অ্যান্টিলোপ ছোপ এবং অন্যান্য লতাগুল্ম অস্পষ্ট চোখে পড়ল ওর। ওগুলো গবাদিপশুর জন্য চমত্কার খাবার।

একবার উল্টোদিকে, ক্যানিয়নের খাড়াইতে এক ঝলক নড়াচড়া ধরা পড়ল ওর চোখে। বেশ অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর ভাবল হয়ত ভুল দেখেছে।

অন্ধকার গাঢ় হওয়া অবধি ক্যানিয়নের ওপর নজর বোলাল ও, জানে না উল্টোদিকের ঢালে ঠিক একই কাজ করছে লানত্স। হালকা শীত বোধ হওয়ায়, আবার কম্বলের বিছানায় ফিরে গেল জর্ডান। অনেকটা সময় শুয়ে রইল ঠায়, খানিক আগের চলাফেরায় অসুস্থ, ক্লান্ত বোধ করছে। যখন ভাল বোধ করল একটু, উঠে একটা টর্টিয়া আর ছোট একখণ্ড জার্কি সহযোগে আহার সারল।

ইয়াকব লানত্সরে বিপরীতে মারিয়া ক্রিশ্চিনা। নাহ, মেয়েটা অহেতুক বিরাট ঝুঁকি নিচ্ছে। ওর উচিত নয় অনুমোদন দেয়া, কিন্তু কোনো উপায়ও নেই। সন্দেহ নেই সাটনরা বিশ্বাস করে সে এই তল্লাটেই আছে। নইলে বহু আগেই তল্লাশি থেমে যেত। এই গুপ্তস্থানই-বা কতক্ষণ গোপন থাকবে? চূড়ার উল্টোদিক থেকে কারও চোখে একটা জমাট অন্ধকার ধরা পড়তে পারে যেখানে লুকিয়ে আছে সে। ওর নড়াচড়া দেখে ফেলতে পারে কেউ।

ভোরে সূর্যোদয়ের সঙ্গে ঘুম ভাঙল জর্ডানের। নাস্তা করল প্রথমে, তারপর ঝরনা থেকে পানি পান করল। আড়মোড়া ভাঙল ও, পেশিগুলো শক্ত করল আবার ঢিলে করল, আঙুল মটকাল নমনীয়তা বজায় রাখার জন্য। যখন সূর্য উঠে পড়েছে অনেকটা, চাতাল থেকে রোদের ভেতর সরে গেল ও। পরে হামাগুড়ি ক্লিফের কিনার অবধি চেষ্টা করেই ক্ষান্ত হল। সে এখনও ভীষণ দুর্বল।

লাল ঘোড়াটা শৈলশিরার পেছনের অংশে ঘাস খাচ্ছে। রিমের ধারে আগাছা অবধি না গেলে ওটাকে সে দেখতে পাচ্ছে না।

স্যাডলব্যাগ থেকে দুরবিন বের করল ও, চোখে লাগিয়ে নজর বোলাল চারপাশে, ভূখণ্ডের বৈশিষ্ট্য বোঝার জন্য। হঠাত্ মুহূর্তের জন্য বিপরীত দিকের ক্লিফে একটা প্রতিফলন দৃষ্টি আকর্ষণ করল ওর।

জায়গাটা ওর অনেক নিচে, তবে ভেড়াগুলো থেকে উঁচুতে। বেশকিছু সময় নজর রাখার পর জর্ডান ভাবল ওর ভুল হয়েছে নয়ত ছুটন্ত খরগোশ বা ধেড়ে ইঁদুরের ধাক্কায় কোনো আলগা পাথর খসে পড়ার প্রতিফল ছিল ওটা। কিছুই নেই ওখানে...এবং তারপর আবার দেখল সে।

সামান্য একটা নড়াচড়া সাবধান করে দিল ওকে। মাত্র যে-জায়গায় নজর বুলিয়েছে আবার সেদিকে দুরবিন ফেরাল।

কোনো আড়াল নেই ওখানে তবে ঈষত্ অবতল একটা জায়গা আছে যেখানে একজন মানুষ শুয়ে থাকতে পারে। নড়াচড়া না করলে মানুষটাকে দেখা যাবে না। এরপর লোকটাকে দেখতে পেল ও। হাড্ডিসার দেহ, বুড়ো, ধারাল কুঠারের মত চেহারা। নিশ্চয় ওই লোক ইয়াকব লানত্স।

দুরবিন নামাল জর্ডান। জানে এধরনের লোকের দিকে সরাসরি তাকিয়ে থাকা বিপজ্জনক। ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় কাজ করে এদের, কেউ নজর রাখলে টের পেয়ে যায়।

মারিয়া ক্রিশ্চিনা ভেড়া চরাচ্ছে। ছেলেটা অদূরে গাছের ডাল কুড়োচ্ছে, রাতে স্যাডলের পেছনে বেঁধে বাড়ি নিয়ে যাবে।

মেয়েটা কি জানে ক্লিফের মাথা থেকে ওর ওপরে নজর রাখছে লানত্স? জর্ডান ভাবতে চেষ্টা করল নিজের অবস্থান ফাঁস না করে ওকে সতর্ক করা যায় কিনা। না, সম্ভব নয়, বুঝল সে। অপেক্ষা এবং মেয়েটার বুদ্ধির ওপর নির্ভর করা ছাড়া এ মুহূর্তে ওর আর কিছু করার নেই।

দুবার নিজের জায়গা পরিবর্তন করল মারিয়া। একটি স্থির লক্ষ্য নিয়ে কিছুদূর এগোল সে। এবং প্রতিবারই নিজের জায়গা বদলাতে বাধ্য হল লানত্স, যেন মেয়েটি তার দৃষ্টিসীমা থেকে হারিয়ে না যায়। একবার কাঠ কুড়োল মারিয়া, আরেকবার রাতের খাবারের জন্য বাঁধাকপি। ছায়ায় ফিরে এসে কিছু সময় সেখানে বসল ও, তারপর হঠাত্ উঠে ক্লিফের একটা জায়গা বরাবর এগোল যার ঠিক ওপরে ঘাপটি মেরে আছে লানত্স কিন্তু যেখানে থেকে মারিয়াকে সে দেখতে পাবে না।

জর্ডান হতবুদ্ধি, মারিয়ার উদ্দেশ্য অনুমান করতে চেষ্টা করে। সহসাই সবকিছু দিনের আলোর মত পরিষ্কার হয়ে যায় ওর কাছে। মারিয়া জানে লানত্স নজর রাখছে ওর ওপর এবং ইচ্ছেকৃতভাবে লোকটাকে সে উত্যক্ত করছে।

পাহাড়ের মাথায় ছটফট করছে লানত্স, জানার কোনো উপায় নেই নিচে কী করছে মেয়েটা। কিন্তু মারিয়ার মধ্যে কোনো অস্থিরতা নেই, ক্লিফের ছায়ায় আপনমনে সেলাই করছে। অল্প পরে একটা পনিতে চেপে সেখানে হাজির হল এক তরুণ। যদিও ওর পরিচয় জানে না জর্ডান, তবে ও হচ্ছে ভিচেন্তি।

মারিয়ার অদূরে রাশ টেনে ঘোড়া থামাল ভিচেন্তি। কিছু সময় অপেক্ষার পরেও যখন মারিয়া কিছুই বলল না, নিজেই মুখ খুলল। 'ওরা এখনও আছে এখানে।'

জবাব দিল না মারিয়া ক্রিশ্চিনা। ভাইকে সে ভালবাসে কিন্তু ওর দুর্বলতা ওকে ক্রুদ্ধ করে।

'তুমি জান লোকটা কোথায়?'

'কোনো লোক? কার কথা বলছ তুমি?'

'যে-লোকটাকে খুঁজছে ওরা। জর্ডান।'

'আমি কীভাবে জানব? তুমি বলার আগে পর্যন্ত নামটাও তো জানতাম না।'

অস্বস্তিভরে বোনের দিকে তাকিয়ে থাকে ভিচেন্তি। মারিয়া ওর নাভাহো স্ত্রী, রোসার মতই সহজ-সরল। রোসাকে সে বোঝে। ওদের মাকেও বোঝে। কিন্তু এ আলাদা ধাতুতে গড়া। হয়ত ওই গ্রিংগোকে বিয়ে করে শহরে কিছুদিন বাস করেছিল বলেই...না, ভুল হল, ও চিরকাল একটু অদ্ভুত ধরনের।

কোনো পুরষের সঙ্গে হাঁটবে না, অথচ শহরে যখন যাবে ওদের উদ্দেশে স্কার্ট দোলাবে। এটা ঠিক না। একদিন এই বোনের জন্য ওর কাউকে হত্যা করতে হবে। আর সব মেয়েদের মত ও একটা পুরুষ বেছে নেয় না কেন? পুরুষ ছাড়া একজন মেয়ের জীবনের কোনো মূল্য সেই।

ওরা যে-লোকটাকে খুঁজছে তার ব্যাপারে মারিয়া নিশ্চয় কিছু জানে। তথ্যটা ভীত করে ওকে। জ্যাক সাটন বা বেন হাইনডমান যদি জানতে পায় ওরা সাহায্য করছে আহত লোকটাকে, ওদের সবাইকে খুন করবে ওরা। প্রত্যেককে খুন করবে। নাকি শুধু মারিয়া ক্রিশ্চিনাকে খুন করবে?

ওরা সেরকম চেষ্টা করলে তাকে, ভিচেন্তিকে, অবশ্যই লড়তে হবে। কিন্তু সে লড়তে চায় না। সে একা একজন মানুষ এবং ওরা অনেক।

মারিয়া জানে তার ভাই কী ভাবছে। জানে ইয়াকব লানত্স পাহাড়ের ওপর থেকে নজর রাখছে। ওটা এখনও তেমন সমস্যা না। আহত ওই লোকটার কাছে এখন যথেষ্ট খাবার আর পানি আছে। অন্তত দুদিন অনায়াসে চলে যাবে। ওই আগন্তুক তার কেউ নয়। নর্থ আমেরিকান কারও প্রতি তার দরদ নেই। শুধু ওর স্বামী ব্যতিক্রম...মাতাল অবস্থায়ও সে কখনও দুর্ব্যবহার করেনি। নিপট ভদ্রলোক ছিল সে। এমনকি এখনও, তার সমস্ত দুর্বলতা মনে করার পরেও, প্রয়াত স্বামীর প্রতি একধরনের সমীহ বোধ করল ও।

আহত লোকটার কথা আবার ভাবল মারিয়া। ওর বন্দুকগুলোর কথা মনে করল। নিয়মিত যত্ন নেয়া হয় ওগুলো। লোকটা কঠিন। যখন শক্তি ফিরে পাবে, সে চলে যাবে। আপদ বিদায় হবে।

ছটফট করছিল ভিচেন্তি। স্যাডলে বসে সিগারেট বানাল ও। পিঠে মিঠেকড়া রোদ উপভোগ করছে ও। জানে না নজর রাখা হচ্ছে ওদের ওপর। তবে জানে নিশ্চয় রাখা হচ্ছে। বুকভরে সিগারেটের ধোঁয়া নিল সে। মারিয়া তাকাল ওর দিকে।

'ভিচেন্তি, আমার মনে হয় তুমি ভয়ে সিিঁটয়ে আছ। তুমি...পিস্তলে কী নিশানা তোমার। আমার বিশ্বাস জ্যাক সাটন তোমার সামনে কিচ্ছু না।'

এত বিস্মিত হয়েছিল ভিচেন্তি, সরে এল ওখান থেকে। এই প্রথম মারিয়া কোনো ব্যাপারে ওর প্রশংসা করেছে। কিন্তু তাই বলে জ্যাক সাটনের চেয়ে ক্ষিপ্র? না...না, এটা ঠিক না। তবে চিন্তাটা গেেঁথে রইল ওর মগজে। মারিয়া বিশ্বাস করে এটা।

সেই রাত এবং পরের দিনটা টানা বিশ্রাম নিল জর্ডান। সামান্য খাবার খেল, প্রচুর পানি পান করল আর ঘুমাল। মারিয়া ক্রিশ্চিনা ফিরে ফিরে হানা দিল ওর চিন্তায়। একধরনের প্রচণ্ড আভিজাত্য আছে মেয়েটার মধ্যে যা পুরুষের রক্ত চঞ্চল করে, সেটা ওকে দেখতে যতই গোমড়ামুখো মনে হোক না কেন।

সন্ধ্যায় নিচের ক্যানিয়ন থেকে তিনজন ঘোড়সওয়ার হাজির হল পাহাড়চূড়ায়। ইশারা পেয়ে গুপ্তস্থান থেকে বেরিয়ে এল লানত্স, ওদের সঙ্গে মিলিত হল গিয়ে। জর্ডান লক্ষ করছিল ওদের, তবে খালিচোখে, পড়ন্ত বিকেলের রোদ ঝিকিয়ে উঠতে পারে বাইনোক্যুলারে প্রতিফলিত হয়ে।

ভেড়াগুলো রওনা হচ্ছে বাড়ির পথে। আবার দেখল সে। মারিয়া নেই ওগুলোর সঙ্গে!

লোকগুলোর সঙ্গে কথা শেষ করে নিজের জায়গায় ফিরে আসছে লানত্স। অভ্যাসবশত, নিজের উইনচেস্টারের দিকে হাত বাড়াল জর্ডান। একটা পাথর গড়িয়ে পড়ার শব্দে চকিতে ঘুরল ও। ভগ্নাবশেষের দেয়াল ঘুরে পেছন থেকে এসেছে মারিয়া ক্রিশ্চিনা। হাঁপাচ্ছে, চোখ বস্ফািরিত। ওর হাতে খাবার। চলে যাওয়ার জন্য ঘুরে দাঁড়িয়েছিল মারিয়া, ওর হাত চেপে ধরল জর্ডান। 'সাবধান!' ইঙ্গিতে দেখাল অশ্বারোহীদের। 'জলদি কর! ওরা জেনে যাবে তুমি নেই!'

ওর চোখে চোখ রাখল মারিয়া, শীতল, দুর্বোধ্য। 'ভয় পাচ্ছ ওরা তোমাকে পেয়ে যাবে? নাকি আর খাবার পাবে না সেজন্য ভয়?'

'বোকার মত কথা বোলো না,' সংক্ষেপে বলল জর্ডান।

ঝটিতি ঘুরে দাঁড়াল মারিয়া।

'সাবাধানে থেকো। তুমি খুব সুন্দর, মারিয়া ক্রিশ্চিনা।'

ওর দিকে তাকাল মেয়েটা, সামান্য জ্বলে উঠল চোখের তারা, কিছু বলতে গিয়েও সামালে নিল নিজেকে, হনহন করে চলে চলে গেল।

জর্ডান যখন নজর বোলাল চারপাশে, লানত্স অদৃশ্য হয়েছে এবং অন্যরা চলে যাচ্ছে। রাইফেল হাতে, ক্লিফের কিনারে সরে এল জর্ডান। লানত্স মেয়েটাকে দেখতে পেয়ে পিছু নিলে ওকে এফোঁড় ওফোঁড় করতে দ্বিধা করবে না সে।

সেই রাতে, অন্ধকার ঘনাবার অনেক পরে, প্রথমবারের মত উঠে দাঁড়াল সে। রাইফেলটাকে ক্রাচ বানিয়ে, হাঁটল দুই কদম, বিশ্রাম নিতে বসল একটু সময়, তারপর আরও দুই কদম হাঁটল।

ভেড়া খোঁয়াড়ে তুলে হুয়ানিতো ভেতরে ঢুকেছে যখন মারিয়া এগোল বাড়ির দিকে। ঝরনার দিক থেকে ঘুরপথে এসেছে সে। ওখানে সে একটা বালতি ফেলে এসেছিল। বাড়ির ভেতরে ক্রুদ্ধ কণ্ঠস্বর শুনতে পেল ও। একটা ভিচেন্তির। মারিয়া ঢুকতেই ওর চোখে ক্রোধে জ্বলে উঠল।

অন্ধকার থেকে মারিয়ার দিকে চকিতে তাকালেন ওদের মা, দৃষ্টিতে উদ্বেগ। একটা ঝড় হঠাত্ থেমে যাওয়ার মুহূর্তে মারিয়া ঘরে প্রবেশ করেছে।

চোখ পাকিয়ে ওর দিকে তাকাল ভিচেন্তি। ঋজু ভঙ্গিতে কামরার অপরদিকে গেল ও, হাত ধুতে শুরু করল। টেবিলে খাবার সাজাতে লাগলেন ওদের মা। হুয়ানিতো বসে আছে টেবিলে, হাতে ছুরি; মোম আর আগুন ঘরটা আলোকিত করছে। বড় কামরা ওটা, বসার ঘর এবং রান্নাঘর, দুটোই এক সঙ্গে। এছাড়া তিনটা শোবার ঘর আর একটা পার্লার আছে। কখনও ব্যবহার হয় না।

ঘরময় পায়চারী করছিল ভিচেন্তি। হঠাত্ ঘুরে মারিয়ার মুখোমুখি হল। 'তুমি আমাদের সবাইকে বিপদে ফেলবে! ওই লোকটাকে লুকিয়ে রেখেছ!'

'মারিয়া তাকাল ভাইয়ের দিকে, চোখে অবজ্ঞা। 'তুমি একটা নির্বোধ,' বলল।

মারিয়ার উদ্দেশে আগুন ঝরল ভিচেন্তির চোখে। কিছু বলতে উদ্যত হল সে, পরক্ষণে দুম্দুম্ করে পা ফেলে বেরিয়ে গেল কামরা ছেড়ে, পেছনে আছড়ে পড়ল কবাট। মারিয়া তাকাল ওর গমনপথের দিকে, ঠোঁটদুটো আড়ষ্ট, চেপে বসেছে একটা আরেকটার ওপর। ভিচেন্তির যে-রকম মতিগতি, ঠিক নেই কী করবে। তবে সে ক্লিফের গোপন জায়গটার কথা জানে না। এমনকি হুয়ানিতোও জানে না।

ভিচেন্তির দুশ্চিন্তা অহেতুক নয়। আহত লোকটাকে সাহায্য করা ওদের সবার জন্যই বিপজ্জনক। কিন্তু মুমূর্ষু একটা লোককে আশ্রয় দেওয়া ছাড়া আর কী করতে পারত সে?

ঘরে ফিরে এল ভিচেন্তি, নিজের আসনে বসে খেতে শুরু করল রাগত ভঙ্গিতে। 'কোনো অধিকার নেই তোমার?' চিত্কার করল ও। 'কোথায় লোকটা?'

'আমি জানি না তুমি কী বলছ।'

তড়াক করে উঠে দাঁড়াল ভিচেন্তি। 'তুমি জান!' ফুলে উঠল ওর গলার সব শিরা-উপশিরা। 'তুমি লুকিয়ে রেখেছ ওকে! তুমি ওকে খাবার দিচ্ছ!'

'আর যদি দিয়েই থাকি তা?'

''ওরা আমাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে ছারখার করে দেবে! আমাদের সব ভেড়া মেরে ফেলবে!'

'আর তুমি কী করবে? লড়বে, নাকি পালাবে?'

রাগতভাবে তাকাল ভিচেন্তি। 'আমি লড়ব!'

'বেশ...তাহলে তা-ই কর এখন!'

অন্ধকারে উঠে দাঁড়াল ট্রেস জর্ডান, রাইফেলটাকে ক্রাচ বানিয়ে আবার হাঁটতে চেষ্টা করল। সাবধানে এগোল ও। আজ রাতে একটা গড়িয়ে-পড়া নুড়ির শব্দও বহুদূর থেকে শোনা যেতে পারে। কোনো অস্বাভাবিক শব্দ করার সাহস পেল না ও। গান বেল্ট কোমরে ঝোলাল সে, বার কয়েক ড্র প্র্যাকটিস করল, জানে ক্ষিপ্রতা ফিরে পেতে হবে। বন্দুক প্রয়োজন হবে ওর। যে-কোনো মুহূর্তে এসে পড়তে পারে ওরা।

কথাটা ভেবে, ধ্বংসাবশেষের কোণ ঘুরল ও, মারিয়া যে-পথে এসেছিল সেখানে গেল। পাহাড়ের পায়ের কাছে ফাটলের মধ্যে একটা খাড়াই ওটা। দেয়ালের গা থেকে সরু একটা বারান্দা বেরিয়েছে, ইঞ্চি কয়েক চওড়া হবে।

ঝরনায় ফিরে এল সে, প্রচুর সময় নিয়ে পানি পান করল। ওর তেষ্টা যেন কিছুতেই মিটতে চায় না। মৃদু বাতাসে লাকড়ি ধোঁয়ার গন্ধ পেল ও। এখনও ওরা আছে ওখানে, ক্যানিয়নের ঠিক ওপাশে, ওর একটা ভুলের জন্য অপেক্ষা করছে। ওরা কি টের পেয়েছে কিছু? নাকি এটা ইয়াকব লানেসর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়?

দুর্বলতা সত্ত্বেও অস্থির বোধ করে ও। ঘোড়াটাকেও অস্থির মনে হয়। ঘাস কমে আসছে। আর খুব বেশিদিন ঘোড়ার খাবার মিলবে না। খুব বেশি সময় বন্দি রয়েছে ওরা, কিন্তু এখন পথে নামার প্রশ্নই ওঠে না। রাইফেলটাকে ক্রাচ বানিয়ে শরীরের পেশিগুলো খেলাতে লাগল ও। জানে সুযোগ আসবে সহসাই...ইদানীং সারাক্ষণ খিদে পাচ্ছে। এটা কি সেরে ওঠার লক্ষণ?

এলাকাটার সুশৃঙ্খল পর্যবেক্ষণ শুরু করেছে সে। মরু এলাকা সম্পর্কে ধারণা থাকায়, ক্যানিয়ন, রিজ এগুলো চিনতে পেরেছে। এমনকি ক্যানিয়নেরও একটা প্যাটার্ন থাকে। রাতে ক্লিফের ওই খাড়াই বেয়ে পালাবার কথা চিন্তা করতেই ওর শরীর গুলিয়ে এল। কাজটা সম্ভব কিন্তু পরিষ্কার টার্গেটে পরিণত হবে।

বিছানায় ফিরে গিয়ে আবার ঘুমোল জর্ডান। কত সময় ঘুমিয়ে ছিল জানে না, হঠাত্ ধড়মড় করে উঠে বসল। পিস্তলের বাটে হাত চলে গেল ওর। কী জাগিয়ে দিয়েছে ওকে? রাতের কোনো সাধারণ শব্দে হত না এমন। ওর অবচেতন এসব শব্দের সঙ্গে অতিপরিচিত। এটা অবশ্যই অন্য কোনো শব্দ, যার সঙ্গে নৈশ সঙ্গীতের কোনো সম্পর্ক নেই।

মৃদু বাতাসে ঝোপঝাড় দুলছে। মাথার ওপর রাতের আকাশ সুবিস্তৃত, জ্যোছনাধবল, স্থির। চূড়াগুলো দীর্ঘ ছায়ার জন্ম দিয়েছে এখানে-সেখানে। নিশ্চয় ভুল হয়েছে ওর। এটা কোনো কল্পনা বা জ্বরের ঘোর হবে। তারপরও একমুহূর্ত অপেক্ষা করল সে। বুকভরে পাহাড়ি জলের মত তাজা এবং সুশীতল বাতাস টানল। আকাশে তারাগুলো লণ্ঠনের মত ঝুলে আছে। এই অনুভূতি, গন্ধ ওর চেনা। তাপ, ভাসমান মেঘের ছায়া, সহস্র ক্যানিয়নের না-বলা সহস্র কাহিনি, সব জানে ও।

ঘুরল ও, পরক্ষণে থমকে দাঁড়াল। ক্ষীণ একটা শব্দ শুনতে পেয়েছে, নিচে ক্যানিয়নে কিছু একটা নড়াচড়া করছে। কান পাতল ও...জ্যোত্স্না-আলোকিত স্তব্ধতা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র শব্দও বয়ে আনছে ওর কানে। শোনাই যায় না এত ক্ষীণ। কিছু একটা... কেউ নড়াচড়া করছে নিচে।

নিশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল ও, জানে কেউ বা কিছু শুনতে পারে। হয়ত এরই মধ্যে ওর আওয়াজ পেয়েছে।

ঘোরের মধ্যে সে কোনো আওয়াজ করেছিল কি? মনে হয় না, মানুষের অবচেতন সবসময় সতর্ক থাকে। অবশ্য পাহাড়ের দেয়ালগুলো বক্তৃতামঞ্চের শামিয়ানার মত, নিচের মানুষ ওর শব্দ যতটা পাবে তারচেয়ে অনেক সহজে সে ওদের শব্দ শুনবে।

অস্পষ্ট নড়াচড়াটা আবার শুনল সে...অনুসন্ধানকারী কোনো সূত্র পেয়েছে? এই সময় নিশ্চয় ট্র্যাক খুঁজছে না? আবার নিথর হয়ে গেল রাত। দূরে কোথাও নিঃসঙ্গ একটা কয়ৌটি আকাশের দিকে মুখ তুলে ফরিয়াদ জানাল।

'এটা কিছুতেই যুক্তিসঙ্গত হতে পারে না।' বিরক্তিভরে আগুনের দিকে তাকাল জো সাটন। 'কোনো মানুষ এভাবে চোখের সামনে থেকে হারিয়ে যেতে পারে না, যেরকম এই লোকটা গেছে।'

চোয়ালের ভেতর তামাক ঘোরাল বেন হাইনডমান, কথা বলছে না। স্বভাবসুলভ ধীরগতিতে হিশেব কষে বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করছে। ওদের সকলের মধ্যে একমাত্র হাইনডমানের সামনেই পেছনের সারিতে আসন নেয় জ্যাক সাটন। এ ব্যাপারে নিজস্ব ব্যাখ্যা আছে জোয়ের। গান স্লিংগার হিশেবে যত বড়াই করুক জ্যাক, কঠিন চোয়াল ভগ্নিপতিকে সে ভয় পায়।

'ওই মেসায় হারিয়ে ফেলেছি ওকে,' বলল মর্ট বেইলেস। 'খারাপ ছিল ওর অবস্থা বেশি দূর যেতে পারেনি।'

মকিং বার্ড পাসে এই মর্টের ভাইকেই হত্যা করেছে জর্ডান। আর জন হেনড্রিক্সকে যারা খুন করেছিল মর্ট তাদের একজন। জর্ডান ওর নাগাল পেতে পারে এমন ভাবছে না সে। জর্ডানকে সে হত্যা করতে চায় ভাইয়ের বদলা নেয়ার জন্য। তাছাড়া খুনখারাপি তার স্বভাব।

'যদি ও মেসায় আদৌ উঠে থাকে,' বলল জো।

গত দুদিনে তল্লাশি কমে এসেছে। জ্যাক সাটন এজন্য খুশি। দলের দুজন ফিরে গেছে খড় কাটার জন্য, আরেকজনের স্ত্রী সন্তানসম্ভবা। বেশি লোকের দরকার মিটে গেছে, আর এখন কানের লতির কাছে পাচড়াটা চুলকাতে চুলকাতে জ্যাক ভাবল অন্যরা বাড়ি ফিরে গেলেও সে খুশি হয়। নিজস্ব পরিকল্পনা আছে ওর। ট্রেস জর্ডানকে পাকড়াও করে হত্যা করা গৌণ হয়ে পড়েছে।

ও চাইছে বেন ফিরে যাক। বেন চায়নি মেহিকানোদের ঘাঁটান হোক। এটা যদি অন্য কেউ বলত জ্যাক মনে করত সে মেয়েটার প্রতি আসক্ত। কিন্তু বেন অমন না। ওর কারও প্রতি মায়া-দয়া নেই। ওর এই অনুভূতিহীনতায় জাক অস্বস্তি বোধ করে। বেন কঠিন মানুষ এবং চালাক।

সামনে ঝুঁকে নিজের কাপে কফি ঢালল ইয়াকব লানত্স। 'কাছেপিঠেই আছে,' বলল সোজাসাপ্টা।

বেন মাথা তুলল। 'তুমি দেখেছ?'

'না...কিন্তু ও এখানেই আছে।'

'যদি না-ই দেখে থাক, তাহলে তুমি জান কীভাবে?' বিরক্তির সুরে জানতে চাইল জ্যাক। মাঝে মাঝে লানেসর অতি নিশ্চিত ভঙ্গি ক্ষিপ্ত করে ওকে।

'ইয়াকব যদি বলে ও এখানে আছে,' বলল হাইনডমান, 'তাহলে ও এখানেই আছে।'

'আমি জানি না কেন,' বলল লানত্স, 'তবে মন বলছে।'

'ব্যাটা যদি এখানে থাকে,' আগুন খোঁচাল মর্ট বেইলেস, 'ওই মেহিকান কুত্তাগুলো নিশ্চয় জানে। আমি বলি কি সোজা ওখানে গিয়ে তুলে নিই মেয়েটোকে—'

'আমরা ওরকম কিছুই করছি না।' হাইনডমান কারও দিকে তাকাল না পর্যন্ত।

'ওই মেয়ে মুখ খুলবে না,' লানত্স বলল।

'আমি বাধ্য করব!' হিসহিস করে উঠল মর্ট। 'দেখ!'

'তুমি একটা গর্দভ,' বলল হাইনডমান। 'ওকে মেরে ফেলতে পারবে, কিন্তু কথা বলাতে পারবে না।'

কফি আর সিমের বিচির ডিশ নিয়ে একপাশে সরে গেল লানত্স। ওর অনুসন্ধিত্সু মন কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে একটা সমস্যা। একটা আহত লোক, একা...

'আশেপাশেই আছে কোথাও,' হাইনডমান বলল। যদি বেঁচে থাকে, সে খাচ্ছে। আর খাবার পাচ্ছে ওই মেহিকানদের থেকে। তবে ওদের মধ্যে ভিচেন্তিই কেবল বাইরে যায়।'

কম্বলের ওপর হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে ছিল জ্যাক সাটন। কনুইয়ের ভরে উঁচু হয়ে বলল, 'মর্ট, কাল তুমি আর জো ছায়ার মত লেগে থাকবে ভিচেন্তির পেছনে।'

'মনে হয় না কিছু পাব। আমার ধারণা মেয়েটাকে ধরা দরকার।'

'জ্যাক ঠিক বলছে, মর্ট। ওর পেছনে লেগে থাক। ফায়দা হবে। ও হয় ভুল চাল দেবে, নয়ত মুখ খুলবে।' কথা শেষ করে মাথা অন্যদিকে ফেরাল লানত্স। 'তবে বেশি কাছে যেও না।'

জর্ডানকে বুঝতে শুরু করেছে লানত্স। এই লোক বারো ঘাটের পানি খাওয়া, পশ্চিমের পাহাড়-পর্বত চেনে। ওকে যখন ধরবে ওরা, ব্যাপারটা খুব সুখের হবে না।

'আমি ঠিকই খুঁজে বের করব ওকে,' বলল লানত্স। 'তবে এরপর তোমরা সামলাবে।'

সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে লোকটার দিকে সবাই একযোগে তাকাল ওরা। বোঁটকা গন্ধ আসছে ধূর্ত ওই বুড়োর গা থেকে, চোখের তারায় রহস্যময় কৌতুক।

'কথাটার মানে কী?'

'তোমাদের কেউ কেউ বাড়ি ফিরবে না। এই লোকের মধ্যে নেকড়ের প্যাঁচ।'

বিতৃষ্ণভাবে নাক ঝাড়ল কেউ একজন। মর্ট বেইলেস অধৈর্যভরে পাশ ফিরল। লানেসর মনোভাবে ক্রুদ্ধ হয়েছে জ্যাক সাটন, কিন্তু এটাও বোঝে ওই বুড়োর সাহায্য ছাড়া ওরা এতদূর আসতে পারত না। বুড়ো বব সাটন সবসময় হাতের কাছে রাখতেন লানত্সকে। আর এখন বেন রাখছে।

কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ল ইয়াকব লানত্স। বিষণ্ন চোখে তাকিয়ে রইল আকাশের দিকে, ওর মন পাহাড়ি দুর্গম এলাকায় ফিরে গেছে। কোথাও একটা জায়গা থাকতেই হবে। এবং সেটা খুব কাছেই কোথাও।

ধূসর আলো ভোরের আগমন ঘোষণা করছে যখন জর্ডানের ঘুুম ভাঙল। প্রথমেই গত রাতের গা ছমছমে শব্দটার কথা মনে পড়ল ওর। খুব সতর্ক থাকতে হবে ওকে।

দিনের আলোয় পাহাড়ি ফাটলের খাড়াইটা পরখ করল ও। একটি মেয়ে বা শিশু হয়ত সরু ওই কার্নিশে হাঁটতে পারবে কিন্তু সামান্য এদিক-ওদিক হলেই...একটা ঘোড়াও হয়ত ফাটলের ঢালে হাঁটিয়ে নামান সম্ভব, কিন্তু তাতেও ঝুঁকি কম নয়। ক্যানিয়নের পাদদেশে ভাঙা পা নিয়ে পড়ে থাকতে হতে পারে।

জর্ডন দেখল যে-যুবককে সে মারিয়ার ভাই ভেবেছে সে পেইন্ট পনিতে চেপে ক্যানিয়নের উজানে রওনা হয়েছে। ও ক্যানিয়নের কোণা ঘুরতেই দুজন ঘোড়সওয়ার পিছু নিল। মেহিকান যুবক দুবার ঘাড় ফিরিয়ে দেখল ওদের।

আরও দুজন ঘোড়সওয়ার বাড়ি অবধি গিয়ে আস্তাবলের অদূরে পজিশন নিল। আচ্ছা, ব্যাপারটা তাহলে এতদূর গড়িয়েছে। চাভেরোদের প্রতিটি গতিবিধি নজরে রাখা হবে। আরেক লোক উইলো বনের ভেতর থেকে বেরিয়ে মারিয়া ক্রিশ্চিনার দিকে হাঁটতে শুরু করল। লোকটাকে আসতে দেখে অপেক্ষা করতে লাগল ও, কালো চুল বাতাসে উড়ছে, স্কার্ট ঢেউ তুলেছে। মারিয়া ঋজু দাঁড়িয়ে আছে।

বেশ কয়েক মিনিট কথা বলল ওরা। মারিয়ার আচরণ শান্ত অথচ মেজাজি। ওর চেহারায় এক ধরনের মোহনীয় আকর্ষণ আছে, দুরবিনের ভেতর দিয়ে লক্ষ করল জর্ডান। এক ধরনের অহঙ্কার আর তেজ আছে মেয়েটার মধ্যে যা ওর প্রতি জর্ডানের আগ্রহের জন্ম দিল। ওর নাড়ির গতি চঞ্চল করল।

যে-লোকটির সঙ্গে মারিয়া কথা বলছিল সে ইয়াকব লানত্স, আবেগহীন একজন মানুষ যে সবসময় নিজের বদ্ধমূল ধারণায় ডুবে থাকে। লোকটা যা-ই বলে থাক ওকে, মারিয়াকে এতটুকু বিচলিত দেখাল না। দুরবিন নামিয়ে মুখ মুছল জর্ডন। দিনটি উত্তপ্ত হতে যাচ্ছে।

কোনো সন্দেহ নেই এ ব্যাপারে। ওকে চলে যেতে হবে। আরও সমস্যা সৃষ্টির কোনো অধিকার নেই ওর। চেষ্টা নিতে হবে ওকে। শয্যায় ফিরে এল জর্ডান, অন্ধকারের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল।

যখন ঘুম ভাঙল ওর রাত নেমেছে। একটা মৃদু খসখস শব্দে টানটান হয়ে গেল ওর সব স্নায়ু। চকিতে উঠে দাঁড়াল ও, হাতে পিস্তল। তারপর পিস্তলটা হোলস্টার করে, দ্রুত এগোল ধ্বংসাবশেষের দিকে। দেয়ালের কিনারে অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল।

শুরুতে, পানি গড়িয়ে পড়ার শব্দ ছাড়া আর কিছু নেই; একটা নড়াচড়ার অস্পষ্ট ফিসফিস, অন্ধকারে একটা ইঙ্গিত, শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ...হাত বাড়াল জর্ডান, টুঁটি চেপে ধরতে চাইছে।

মাংসের আভাস পেল ওর হাত...ধস্তাধস্তি শুরু হয়েই থেমে গেল যখন জর্ডন নারীদেহের নরম চড়াই-উত্রাইয়ের সন্ধান পেল। 'মারিয়া ক্রিশ্চিনা?'

'ছেড়ে দাও আমাকে।'

শান্ত কণ্ঠস্বর, প্রায় নির্লিপ্ত। তারপরও যে-দেহটাকে সে ধরেছিল সেখানে চাপা উত্তেজনার একটা ভাব রয়েছে। অনিচ্ছাসত্ত্বেও হাত শিথিল করল জর্ডন, তবে আলগা করল না।

পিছু হটল মেয়েটা, নিজেকে ছাড়িয়ে নিল। ওর নিশ্বাসের শব্দ শুনতে পায় জর্ডন। চড়াই ভাঙার কারণে দ্রুতলয়ে ওঠানামা করছে? ধস্তাধস্তির কারণে? নাকি...?

'মনে করেছিলাম লানত্স।'

মারিয়া নিরুত্তর রইল। হালকা সুগন্ধির সুবাস আসছে, কোনো ফুলের গন্ধ, ক্ষীণ কিন্তু লেগে আছে। আকাশের পটভূমে ওর রেখায়িত মুখাবয়ব দেখতে পায় জর্ডান। 'আমি চলে যাচ্ছি,' বলল ও। 'আমি তোমাদের সবাইকে বিপদে ফেলছি।'

তবু মারিয়া কিছু বলল না বা নড়ল না। ক্যানিয়ন রিমের ওপরে নিঃসঙ্গ তারাটা কেবল জ্বলজ্বল করে। 'তুমি না এলে আমি মারা যেতাম।'

ওর দিকে মুখ ফেরাল মেয়েটা। কিন্তু অন্ধকারের কারণে জর্ডন সেখানে কোনো অভিব্যক্তি দেখতে পেল না।

'তুমি পুরুষের পাশাপাশি চলার যোগ্যতা রাখ, মারিয়া ক্রিশ্চিনা। পেছনে নয়।'

'তুমি বেশি কথা বল।'

'হয়ত...হয়ত খুব বেশি না।

কথা খুঁজল ট্রেস জর্ডান—পেল না। একটা সময় ছিল যখন সে সহজেই মেয়েদের সঙ্গে কথা বলতে পারত কিন্তু এই মেয়ের সঙ্গে এই সময়ে মনের অনুভূতি প্রকাশের উপযোগী কোনো ভাষাই সে খুঁজে পায় না।

একটা কোয়েল প্রশ্ন করল কোথাও। উত্তর পেল না। আবার পসি ক্যাম্পফায়ারের ধোঁয়ার গন্ধ পায় সে, হাওয়ায় মানজানিতার দুলুনি শোনে। তবে ওগুলো সামান্যতম প্রভাবিত করে না ওকে; ওর চেতনা আচ্ছন্ন মারিয়া ক্রিশ্চিনার সান্নিধ্যে।

'তোমার যাওয়া চলবে না।'

'যেতেই হবে...ওরা জানে আমি আশেপাশেই আছি।'

আবার নীরব রইল মারিয়া এবং জর্ডান ওর নীরবতার অর্থ বুঝল না। ঘোড়ার কাছে হেঁটে গেল ও। এত অকস্মাত্ তুলে নিল লাগামটা যে সভয়ে পিছিয়ে গেল ঘোড়া। জর্ডান অপেক্ষা করল ওর শান্ত হওয়া অবধি, তারপর স্যাডল চাপাল।

ঘোড়ার পিঠে সামান্য একটা স্যাডল চাপানর পরিশ্রমেই দম ফুরিয়ে গেল ওর, জখমের জায়গায় টান পড়ল। দম ফিরে পাওয়ার জন্য ঘোড়া গায়ে হেলান দিল ও। স্যাডলের ওপর দিয়ে ফাঁকা দৃষ্টিতে রাতের অভ্যন্তরে তাকাল। এই অবস্থা থেকে বেঁচে বেরোতে হলে দৈব সহায়তা লাগবে।

'তুমি ওপরে উঠতে পারবে না।'

'ঢাল ধরে?'

'ওটাই সেরা, কিন্তু আওয়াজ হবে অনেক।'

স্যাডলের বাঁধন শক্ত করল ও। মারিয়া তাহলে যাওয়া মেনে নিয়েছে। ওকে ঝেড়ে ফেলতে পেরে খুশিই হয়েছে, নিশ্চয়। যাওয়ার ব্যাপারে অদ্ভুত এক অনীহা বোধ করে ও। খানিক আগে মারিয়া যখন ওর আলিঙ্গনে বাঁধা পড়েছিল সে-সময়ের কথা মনে করে জর্ডান, মেয়েটার পেলব দেহ, তেজি লড়াই এগুলোর কথা ভাবে। ওই স্মৃতি উদ্দাম করে রক্ত চলাচল, মাথায় পৌঁছয়, সহসা ঘুরে মারিয়ার দিকে হাত বাড়ায় ও।

পিছিয়ে যেতে নেয় মারিয়া, কিন্তু জর্ডান আগেই ওকে বাহুবেষ্টনে জড়িয়ে নিয়েছিল। প্রবল লড়াই করে ও, অনেকটা বাঘিনীর তেজ নিয়ে। জর্ডান ধরে রাখে ওকে, কাছে টেনে নেয়। হঠাত্ এরপর, প্রতিরোধ বন্ধ করে মারিয়া, কিন্তু আত্মসমর্পণ করে না। জর্ডনের হাতে নিশ্চল দাঁড়িয়ে থাকে ও, সাড়া দেয় না। যখন জর্ডান মুক্তি দিল, মারিয়া সরে যাওয়ার চেষ্টা করল না।

'তুমি একটা পশু।'

ওর কণ্ঠস্বর নিচু, নিরাবেগ। আবার ওকে আলিঙ্গন করল জর্ডান, স্নিগ্ধ চুমু খেতে শুরু করল, ঠোঁটে, কপোলে, গলায়, কাঁধে। মারিয়া সাড়া দেয় না, কিন্তু সরেও যায় না। ওকে আবার ছেড়ে দিল জর্ডান, পিছিয়ে গেল, নিশ্বাস ধীরলয়ে বইছে। এরপর বেশকিছু সময় কোনো কথা বলে না ওরা। মারিয়া চলে যাওয়ার চেষ্টা করে না, কিন্তু নতুন আমন্ত্রণও জানায় না।

'তুমি বাড়ি যাও,' জর্ডান বলল। 'আমি আজ রাতেই চলে যাচ্ছি।'

উবু হয়ে মাটি থেকে একটা প্যাকেজ কুড়িয়ে নিল মারিয়া। 'খাবার।' মুহূর্তের জন্য দ্বিধা করল ও, তারপর ঘুরে দাঁড়াল।

'মারিয়া ক্রিশ্চিনা?'

থামল মেয়েটা কিন্তু ঘুরল না।

'আমি ফিরে আসছি।'

মারিয়া ওর কথা শুনতে পেয়েছে মনে হল না। 'ক্যানিয়নের উজানে যাবে। বামের প্রথম চওড়া ক্যানিয়টা নেবে। মেসা অতিক্রম করে পরের ক্যানিয়নে ঢুকবে, তারপর ওই ক্যানিয়ন আর দ্বিতীয় মেসাটাও পার হবে। লাল পাথর সদৃশ একটা চূড়া দেখবে যার গোড়ায় মরা কটনউড গাছ থাকবে একটা। ওই খাড়া চূড়ার পেছনে লুকোনর জায়গা আছে। সময় হলে ওখান থেকে মরুভূমিতে

পালানর রাস্তাও আছে।'

'আমার সঙ্গে মিলিত হও ওখানে।'

কাঁধ ঝাঁকাল মারিয়া। 'কেন যাব? তুমি কি ভেবেছ আমি গ্রিংগো? আমি মেহিকানো।'

'এসো মারিয়া ক্রিশ্চিনা। আমি তোমাকে চাই।'

'তুমি একটা নির্বোধ।'

জর্ডান ওর পেছন পেছন গেল। মারিয়া ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল। তারার ম্লান আলোয় ওর মুখ, দীঘির গভীর কালো জলের মত চোখ দুটো দেখতে পায়।

'আমি ফিরে আসছি। তোমার কাছে আমার ঋণ অশেষ।'

বেন হাইনডমানের কাঁধ ধরে ঝাঁকাল লানত্স। আগুন মরে এসেছে। কেউ উসকে দেয়নি। গভীর রাত এখন। কয়ৌটির ডাকও থেমে গেছে হঠাত্।

'বেন, ওঠো।'

চোখ মেলল হাইনডমান, মুহূর্তে জেগে উঠল। মাথা কাত করল একপাশে, শুনছে। কোনো শব্দ পেল না বেন, কিন্তু বুড়ো ট্র্যাকার ঝুঁকে আছে ওর ওপর। 'কী ব্যাপার, ইয়াকব?'

'আমরা ওকে মুঠোয় পেয়েছি, বেন। ঠিক যেখানে চাইছিলাম।'

উঠে বসল বেন, পায়ে বুট গলাতে শুরু করল। তেতো হয়ে আছে মুখটা, মাথা ভারি লাগছে। তারার অবস্থান দেখে ও অনুমান করে নিল রাত কয়টা বাজে। ক্লান্ত, অবসন্ন বোধ করছে, কিন্তু সমস্যাটাও শেষ করতে চাইছে এখুনি। ইতিমধ্যেই অনেক সময় নষ্ট হয়েছে।

'মেয়েটা যাচ্ছে ওর কাছে। পাহাড়ি দেয়ালের ওপর চাতাল, নিশ্চয় বেশ জায়গা আছে ওখানে। কারণ সঙ্গে ওর ঘোড়াটাও আছে। আজ রাতে ওই লোক নেমে আসতে যাচ্ছে, আমার ধারণা।'

'কীভাবে বুঝলে?'

'অনুমান।'

বসল লানত্স, ভাবছে বিষয়টা। 'তবে অনুমানটা অহেতুক না,' বলল। মেয়েটা খাবারের একটা বড় পোঁটলা দিয়েছে ওকে। অনেকক্ষণ হল আছে ওখানে। আমি জানি না কীভাবে গেল ওখানে, বা জায়গাটা ঠিক কোথায়, কিন্তু জানি কোথায় দিয়ে ব্যাটা নামবে।'

উঠে দাঁড়াল হাইনডমান। মাটিতে পা ঠুকে বুট জোড়া বসিয়ে নিল জায়গামত। তারপর ডেকে তুলল সবাইকে। ওর নির্দেশে দ্রুত তৈরি হতে শুরু করল ওরা। মৃদু আপত্তি করল কেউ কেউ, তবে কোনোটাই তেমন জোরাল নয়। ক্লান্ত মানুষকে ঘুম থেকে অসময়ে ডেকে তুললে যেরকম বিরক্তি প্রকাশ করে সেরকম।

'ক্যানিয়নের উজানের লোক দুটোকে,' লানত্স বলল, 'আমি জাগিয়ে দিয়েছি। হারামিটা ওই পথে এলে, ওরা ওকে নিকেশ করবে। ক্যানিয়নের ভাটিতে মেহিকানদের বাড়ির কাছে দুজন পাহারায় আছে। ও বোতলের মধ্যে আটকা পড়েছে। আমরা ছিপি লাগিয়ে দিয়েছি।'

পায়ে বুট গলিয়ে উঠে দাঁড়াল জ্যাক সাটন। কদিনের না-কামান দাড়ির জঙ্গলে গাল চুলকাচ্ছে। গোসল করা হয়নি অনেককাল। গা ঘিনঘিন করছে ওর। জ্যাক সাটন সবসময় ফিটফাট থাকত পছন্দ করে।

মেয়েটা তাহলে আগাগোড়াই জানত সবকিছু? কতবার ওই লোকটার সঙ্গে ওখানে মিলিত হয়েছে সে?

'ওই—!' কথাগুলো আপনাআপনি বেরিয়ে এল ওর মুখ থেকে, ভেতরের কিছু তিক্ততা খালি করে।

লানত্স তাকাল না ওদিকে, আর বেন হাইনডমান নীরবে স্যাডল তুলে নিয়ে এগোল পিকেট-করা ঘোড়াগুলোর দিকে। অন্যরা কোমরে গানবেল্ট বাঁধছে নয়ত রাইফেল তুলে নিয়ে অন্ধকারের ভেতর প্রবেশ করছে।

আঁটসাঁট হয়ে রওনা হল ওরা, তারপর ছড়িয়ে পড়ল। জ্যাক সাটন গেল বেন হাইনডমানের সঙ্গে। অন্যরা যখন চলে যাবে, মেয়েটার ব্যবস্থা নেবে সে। আর জর্ডানের জন্য...গলার কাছে একটা জমাট-বাঁধা পুঁটুরি অনুভব করল সাটন...কেমন বিশ্রি অনুভূতি।

ঢালের কিনারে এক মুহূর্ত বেশি অপেক্ষা করল ট্রেস জর্ডান। টের পায় সে, লাল ঘোড়াটা অনিশ্চিত ভঙ্গিতে এক পা বাড়িয়েই টেনে নিয়েছে আবার। 'চল, বেটা!' ঘোড়ার ঘাড়ে হাত বোলাল ও, রেকাবে দোল খেয়ে উঠে বসল স্যাডলে। সামনে এগোল ঘোড়া, পায়ের নিচে আলগা পাথর গড়িয়ে পড়ছে।

টলে উঠল ঘোড়াটা, পা হড়কাল, কসরত করে টাল সামলাল। দ্রুত নেমে যাচ্ছে ওরা, তবে এ পর্যন্ত লাল ঘোড়াটা ভালই সামলেছে ব্যাপারটা। জোরকদমে ছুটছিল ঘোড়া যখন জর্ডান গুলির শব্দ পেল।

ভারি পিস্তলের আওয়াজ...তারপর আরেকটা গুলি। দুটোই ছোড়া হয়েছে বাড়ির অদূরে। এরপর, গুলি এবং পাথর গড়িয়ে পড়ার প্রতিধ্বনি ছাপিয়ে তীক্ষ একটা চিত্কার শুনতে পেল ও। ওটা কোনো ভয় বা যন্ত্রণার চিত্কার নয়। বরং অভয় আর আশায় ভরপুর।

ওর দিক থেকে ওদের মনোযোগ সরিয়ে নেয়ার জন্য গুলি ছুড়েছে মেয়েটা। এর অর্থ, ওরা সতর্ক এবং তৈরি আছে।

ঢালের শেষ কয়েকটা ধাপ হুড়মুড় করে নেমে এল জর্ডান, ভারসাম্য বজায় রাখতে হিমশিম খেয়ে গেল ঘোড়াটা, তবে একবার পায়ের নিচে সমতলের জমাট বালির অস্তিত্ব টের পাওয়ার পর ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটল।

পাথর ধসের আওয়াজ পেল ইয়াকব লানত্স। অস্ফূটে খিস্তি করল সে, দৃশ্যটা অনুমান করে। কোন ধরনের মানুষ এমন নিশুতি রাতে ওভাবে নেমে আসবে!

'এসো, বেন,' বলল সে। 'ক্যানিয়নের উজানে বা ভাটিতে, এই দুদিকেই যেতে পারবে। আমরা ওকে বাগে পেয়েছি।'

তিন

ওর সামনে ক্যানিয়নের কাঁধ আকাশের দিকে বিরাট কালো মাথা তুলেছে। দিনের বেলায় এর অদূরেই দুই ঘোড়সওয়ারকে দেখতে পেয়েছিল জর্ডান। ঘোড়ার গতি মন্থর করল ও, বালুর বুকে নরম শব্দ হচ্ছে। একাধিক চাপা কণ্ঠস্বর শোনা গেল; একটা ছায়া নড়ে উঠল। স্পার দাবাল ও; হতচকতি ঘোড়া আগে বাড়ল লাফিয়ে, প্রাণপণে ছুটল সামনে।

সচমকিত খিস্তি শোনা গেল একটা। কেউ একজন ঘোড়ার সামনে পড়ে গিয়েছিল, সে-ই গাল বকে থাকবে সভয়ে সরে যাওয়ার সময়ে। জর্ডানের পাশ দিয়ে গুলি বেরিয়ে গেল একটা। ওর পিস্তল আগুন ঝরাল, ক্যানিয়নের দেয়ালে দেয়ালে প্রতিধ্বনি তুলে মিলিয়ে তার আওয়াজ।

অন্ধকারের মধ্যে চলন্ত একটা ছায়ামূর্তিকে খুব কাছ থেকে গুলি করেছে সে, তারপর ঘোড়া ছুটিয়ে সরে এসেছে। ওর পেছনে পরপর কয়েকটা গুলির শব্দ হল। চিত্কার শোনা গেল।

ইচ্ছেকৃতভাবে গতি মন্থর করল জর্ডান। পেছনে একদল ছুটন্ত খুরের আওয়াজ, বিস্মিত চিত্কার আর জবাব শুনতে পেল। একটা ক্যানিয়নের মুখ খুলে গেল বাঁয়ে। ঝোপঝাড়ে প্রায় বন্ধ, কিন্তু ঘোড়াটা ঠিকই ঢোকার রাস্তা পেল। সামনে এগোনর সময়ে ডালপালার ঘষা লাগল ওর মুখে।

উঁচু পাহাড়ি দেয়াল টপকে চাঁদের আলো ঠিকরে পড়ছে পাথুরে ট্রেইলে। গাছপালার ভেতর দিয়ে কোনোমতে একজন ঘোড়সওয়ার যেতে পারে। অস্পষ্ট ট্রেইলটা ধরে পাহাড়ের মাথায় উঠতে শুরু করল জর্ডান। দশ মিনিট পর মেসার মাথায় দেখা গেল ওকে, চন্দ্রালোকে ভিজছে। তবে ইতিমধ্যেই ওর পিছু নিয়েছে ওরা। নিচের ট্রেইলে ওদের খুরের আওয়াজ উঠছে।

দ্রুত চারপাশে তাকাল জর্ডান। রিমের মাথায় একটা পাথরচাঁই, দেখতে অনেকটা পিয়ানোর মত। ঘোড়া থেকে নামল ও, পাথরটার পেছনে গিয়ে দুহাতে নাড়াল।

নিচে নড়াচড়ার শব্দ হচ্ছে। সামনে ঝুঁকল ও, দাঁতে দাঁত চেপে শরীরের সমস্ত শক্তি একত্র করে ঠেলা মারল পাথরটাকে। নড়ে উঠল ওটা, সামান্য গড়িয়ে ঝুলে রইল। মাথার ওপরে চাঁদ, ওর গায়ে ঘাম আর ধুলোর গন্ধ, বুটের ডগা মেসার ছাদ আঁকড়ে ধরেছে...গড়াল পাথরচাঁইটা, আরেকটু কাত হল সামনে। মেসার মাথায় জর্ডান একা, কপালের দুপাশের রগ ফুলে উঠেছে, গলার ভেতরটা দবদব করছে। হঠাত্ পাঁজরে তীব্র ব্যথা অুনভব করল ও, এবং পরক্ষণে পাথরখণ্ডটা গড়িয়ে পড়ল।

হাঁটুর ভরে বসে পড়ল জর্ডান, হাঁপাচ্ছে, মুখ হাঁ, প্যান্টের ভেতরে রক্তের ধারা টের পাচ্ছে, ভ্রূ থেকে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে।

নিচের অতল অন্ধকারে ছিটকে পড়ল পাথরচাঁইটা, সঙ্গে নিয়ে গেল আরও অনেক পাথর। ঘোড়ার ভয়ার্ত চিত্কার এবং একজন মানুষের নিচে পড়ে যাওয়ার আওয়াজ ভেসে এল। এরপর কোনো কিছু ধসে পড়ার শব্দ, আরও কিছু ছোটবড় পাথর গড়ানর আওয়াজ...তারপর শুনশান কবরের নিস্তব্ধতা।

ক্লিফের কিনারে জর্ডান একা, পরিশ্রমে বুক ওঠানামা করছে হাপরের মত। হঠাত্ আদিম আক্রোশে অস্থির বোধ করল ও, নিচের অন্ধকারের উদ্দেশে প্রাণপণে চিত্কার করে বলল, 'আয় শালারা, আয়!'

ঘর্মাক্ত শরীরে ব্যথায় কাঁপতে কাঁপতে স্যাডলে মুহূর্তের জন্য হেলান দিল সে, শক্তি সঞ্চয়ের জন্য। আজ রাতে ওই পথে আবার ওঠার চেষ্টা করার আগে দুবার ভাববে ওরা। খানিক আগে মৃত্যুর হিমশীতল অতল গহ্বরে পড়ে যাওয়ার সময়ে ওই লোকটার আর্তচিত্কারের কথা মনে করল ও। সাধ করে মরণ ডেকে এনেছে ও, নিজেকে বলল জর্ডান। ওরা আমাদের ঘোড়া চুরি করেছে, আমার পার্টনারকে হত্যা করেছে, আমাকে হত্যা করতে চায়।

জর্ডান বেঁচে থাকতে চায়। রাতটা শীতল ও নিস্তব্ধ, মরু রাত যেমন হয়ে থাকে...বাঁচতে চায় সে...ওর অস্তিত্বে এক নারীর কোমল দেহের পরশ লেগে আছে। এখন মেয়েটির ঠোঁট দুটোর কথা মনে করল সে, ওর নীরব অপেক্ষার কথা মনে করল। প্রতিরোধ নয়, প্রত্যাখ্যান নয়, গ্রহণও নয়। শুধুই অপেক্ষা।

জ্যোত্স্নায়-ধোয়া মেসার ওপর দিয়ে নাগাড়ে ঘোড়া ছুটিয়ে এগিয়ে চলল ও। ক্ষতস্থান যন্ত্রণায় আগুন হয়ে আছে, কিন্তু সব উপেক্ষা করে ভোর অবধি ঘোড়ার পিঠে রইল সে, যেন জীবনে স্যাডল, যন্ত্রণা আর লড়াই ছাড়া কিছুই জানে না।

ধূসর আলোয় নিজেকে আবিষ্কার করল নিষ্প্রভ লাল এক পাথরখণ্ডের সামনে; ওটার গোড়ায় একটা প্রাচীন কটনউড, ন্যাড়া। উইলোর পর্দার ভেতর দিয়ে ঝরনায়-ঘেরা একফালি জমিতে বেরিয়ে এল সে। এখানে-সেখানে পাথর আর আগাছায় ভরা জায়গাটা। জর্ডান যখন শেষমেশ রাশ টানল, ভোরের আলোয় অ্যাসপেন বন ধূসর, শিশিরে ঘাস ভেজা ও ভারি। ক্লিফের গায়ে একটা পাথরের পুরোন বাড়ি ক্লান্ত কুকুরের মত গুটিসুটি মেরে দাঁড়িয়ে আছে। ওখানে স্যাডল থেকে নামল জর্ডান, পানি খেল।

অবসাদে কখন ঝিমুনি এসে গিয়েছিল জানে না, যখন চোখ মেলল সে রাত নেমেছে। পাথরের আড়ালে শুকন পাতা দিয়ে ধোঁয়াহীন আগুন জ্বেলে অনেকদিন পর প্রথম গরম খাবার খেল ও। ধাওয়াকারীদের কোনো শব্দ এখন অবধি পায়নি। কিন্তু অস্থির বোধ করছে। মারিয়া ক্রিশ্চিনার জন্য চিন্তা হচ্ছে। কোনো ঠিক নেই একা পেয়ে ওরা কী করবে মেয়েটাকে। ওর একটা ভাই আছে, কিন্তু অনেকের বিরুদ্ধে সে নিজেকে একা অসহায় বোধ করা স্বাভাবিক। সিগারেট বানিয়ে আগুন ধরাল ও।

নিচে পাথরের কোল ঘেষে কুলকুল করে ঝরনার পানি বইছে। একটা ময়ুর পেখম মেলে ধরল। হঠাত্, দূর ক্যানিয়নে একটা ঘোড়ার খুরের ধাক্কায় পাথর ছিটকে পড়ার আওয়াজ হল।

নিঃশব্দে উঠে দাঁড়াল ট্রেস জর্ডান, হাতে রাইফেল। কয়েকটা পাথর ডিঙিয়ে এমন জায়গায় অবস্থান নিল যেখান থেকে ট্রেইলের দিকে নজর রাখতে পারবে। তারপর অনেকক্ষণ আর কোনো সাড়াশব্দ নেই। নীরব-নিথর রাত গড়িয়ে চলে।

ভিচেন্তি খাবার টেবিলে বসে ছিল যখন মারিয়া ক্রিশ্চিনা তার কামরা থেকে এল। এত সকালে ওকে দেখে বিস্মিত হল মারিয়া। পাশ কাটিয়ে আগুনের ধারে গেল ও। কফির পানি ফুটছিল, তাতে কফি মেশাল।

ভিচেন্তি তাকাল চোখ তুলে। 'ভেড়া নিয়ে বেরিয়ো না।'

ঘুরে ওর মুখোমুখি হল মারিয়া। ভোরের আলোয় ভিচেন্তিকে বয়স্ক দেখাল। মারিয়া মনে করতে পারে না ওকে কখনও এত গম্ভীর দেখেছে কিনা।

'আমি নিয়ে যাব।'

'তুমি?' মারিয়া বিস্মিত।

'ওগুলোকে বাঁচাতে হবে।'

এবার ভাইকে ভাল করে লক্ষ করে মারিয়া। এখনও সূর্য ওঠেনি। ঘরে কেবল ওরা দুজনই। এই প্রথম ও দেখল ভিচেন্তির চেয়ারের পাশে রাইফেলটা ঠেস দিয়ে রাখা। একটা বাড়তি কার্ট্রিজ বেল্ট পরেছে...ওদের বাবার বেল্ট। 'তোমার ধারণা ওরা আসবে এখানে?'

'আসবে,' ভিচেন্তি বলল।

ঘুরে আগুনের কাছে গেল মারিয়া, একটা ডিম ভেঙে ফ্রাইয়িং প্যানে ছড়িয়ে দিল। গুছিয়ে ভাবতে চেষ্টা করে ও। ভিচেন্তিকে ভিন্ন এক মানুষ মনে হচ্ছে। ব্যাটাছেলের মত আচরণ করছে। ওর দিকে তাকাল মারিয়া। এই ভাইকে সে চেনে না মনে হচ্ছে, ওর পরিবর্তনে এতই বিস্মিত হয়েছে।

'আমি ভেড়াগুলোকে নচ-য়ে নিয়ে যাব,' বলল ভিচেন্তি। 'ওখানে কেউ খুঁজবে না।'

আচ্ছা, তাহলে এটাই এড়াতে চেয়েছিল ভিচেন্তি। এখন দায়িত্বটা ঘাড়ে চেপেইছে যখন, সে আর ভয় পাচ্ছে না। লজ্জায় অধোবদন হল মারিয়া। লজ্জা, ভাইকে কাপুরুষ ভেবেছিল বলে। লজ্জা, ওর ভুল হয়েছিল বলে।

ভিচেন্তির সরু চোয়াল স্থির সঙ্কল্পে শক্ত। অবশেষে মারিয়া উপলব্ধি করে ভিচেন্তি কখনই ভীত ছিল না, আসলে একটা বিবাদ এড়াতে চেয়েছিল সে, যে-বিবাদে চাভেরোদের পরাজয় ও ধ্বংস অনিবার্য।

'ভিচেন্তি...' জীবনে এই প্রথম অনুনয়ের সুর ঝরল মারিয়ার কণ্ঠে। 'লোকটা ভালমানুষ। আমি ওকে মরতে দিতে পারিনি।'

প্যান থেকে ডিম আর গরম টর্টিয়া প্লেটে তুলে নিল ভিচেন্তি। 'তুমি একজন পুরুষ সঙ্গী পেয়েছ এতেই আমি খুশি।'

আগুনের ধারে ফিরে গেল মারিয়া। ভিচেন্তির স্বল্পবাক আত্মসম্মানবোধে অভিভূত হয়েছে। ভেড়াগুলোকে ও নচ-য়ে নিয়ে যাবে। সন্দেহে নেই, ওটাই হচ্ছে ওগুলোর জন্য সেরা জায়গা। সাটন বাহিনী ভেড়া পছন্দ করে না, তবে চোখের আড়ালে রাখলে ওরা ওদের মনের আড়ালও হতে পারে। চাভেরোরা আরেকটা বাড়ি বানাতে পারবে। কিন্তু ওই ভেড়াগুলোই ওদের শেষ সম্বল।

'অন্যদেরকে তোমার সঙ্গে নিয়ে যাও।'

'তুমি?'

'ওদের লক্ষ্য আমি। আমাকে না পেলে তোমাদের পিছু নেবে।'

'তুমি আমার বোন। আমি থাকব।'

'যাও... আমি সামলাতে পারব।'

ইতস্তত করে ভিচেন্তি। বাকিদের প্রয়োজন হবে ওকে। হুয়ানিতো বেশি ছোট, আর মারিয়া ক্রিশ্চিনা বা ওকে ছাড়া ওদের মা অসহায় হয়ে পড়বেন। আরও আছে, ওর স্ত্রী, রোসা...চমত্কার নারী, কিন্তু বুদ্ধির বেজায় অভাব।

মারিয়া ক্রিশ্চিনা এর আগে পুরুষ সামলেছে। এবারে হয়ত সে সফল হতে পারে, কিন্তু ওর উপস্থিতিতে রক্তপাত হওয়ার আশঙ্কা আছে।

সূর্য তখনও ওঠেনি যখন মারিয়া ওদের চলে যেতে দেখল। ভেড়া নিয়ে সবার আগে হুয়ানিতো, তারপর খচ্চরের পিঠে ওদের মা আর রোসা, সঙ্গে কিছু দরকারি আর কিছু নেহাত অদরকারি জিনিস নিয়ে। ভিচেন্তি ওর রাইফেলটা কনুইয়ের ভাঁজে রেখেছে। আজ সকালে প্রথমবারের মত হোলস্টার নিচু করে বেঁধেছে ও। ঋজু ভঙ্গিতে দাঁড়িয়েছে, চোখে গর্ব। পেছন থেকে দলটাকে আগলাচ্ছে ও। 'যখন পারবে...চলে এসো।'

'আসব, ভিচেন্তি।'

শুকনো চোখে ওরা তাকিয়ে থাকে পরস্পরের দিকে, এই ভাই যাকে সে অবজ্ঞা করেছে, ভালবেসেছে, তাকে আর অবজ্ঞা করা যাবে না। ওদের মধ্যে কখনই আবেগ কাজ করেনি; এখনও তা করা চলবে না।

'ভিচেন্তি...খোদার নাম নিয়ে যাও।'

বাড়ির ভেতরটা কেমন যেন ফাঁকা আর নিঃসঙ্গ লাগে। ঝাড়ু নিয়ে ঘর পরিষ্কার শুরু করল মারিয়া। কোনো চিন্তা নয়... এটাই এখন একমাত্র কাজ। কোনো কিছু চিন্তা করার নেই। এখন শুধুই অপেক্ষার সময়।

কী করেছে সে? একটা গ্রিংগোর জন্য মা—ভাই সবার জীবন বিপন্ন করেছে? এমন এক পুরুষের জন্য যার সঙ্গে ওর কোনো সম্পর্ক নেই, এমনকি ভালভাবে দেখেওনি লোকটাকে? লোকটার বাহুর জোর, আকস্মিক বিনম্রতা মনে পড়ল ওর... সে আসলে নির্বোধ।

একটা ভবঘুরে, গানফাইটার। লোকটা কী বলেছে ওকে? ও যেন তার সঙ্গে মিলিত হয় হাইডআউটে গিয়ে, নয়ত সে-ই ফিরে আসবে ওর কাছে। কিন্তু ওর সঙ্গে মিলিত হওয়ার অর্থ হবে শত্রুকে হাইডআউট চিনিয়ে দেওয়া। আর ওই লোকই-বা ওর কাছে আসবে কীভাবে যখন এর অর্থ হচ্ছে ওর মৃত্যু? চুলোয় যাক। ও যা করেছে, করেছে। এটুকুই যথেষ্ট।

নাস্তার বাসন ধুচ্ছিল মারিয়া যখন ওদের আসার শব্দ পেল। বাইরে গেল সে ওদের সঙ্গে মিলিত হতে, অ্যাপ্রনে হাত মুছছে।

নয়জন অশ্বারোহী। কদিনের গোসল, কাপড়বদলের সুযোগহীনতায় নোংরা, দীর্ঘ সময় স্যাডলে থাকায় ক্লান্ত। মর্ট বেইলেস আছে দলে...লোকটা সম্পর্কে অনেক কাহিনি শুনেছে সে...জো সাটন, জ্যাক সাটন...লোকগুলোর মাঝে কোনো বন্ধুর মুখ নেই।

নিদ্রাহীনতায় জ্যাক সাটনের চোখমুখ বসা। হিংস্র দেখাচ্ছে। ওর পাশেই বেন হাইনডমান—বরাবরের মত—ভাবলেশহীন, দুর্জয়। লোহা দিয়ে তৈরি মানুষ, যার সামনে অন্যদের নমনীয় হতে অথবা ভাঙতে হয়।

'কোথায় গেছে ও?' প্রশ্ন করল হাইনডমান, সিগারেট বানানোর সরঞ্জাম বের করতে করতে।

'আমি জানি না।'

বিষয়টা গোপন করার চেষ্টা করল না মারিয়া। ওদেরকে পরাজিত করা সম্ভব না হলেও, অন্তত অহমের সঙ্গে মোকাবেলা করা যাবে।

'ফিরবে?'

কাঁধ উঁচুনিচু করল মারিয়া। 'ফিরবে?...কেন ফিরবে?'

জো সাটন মুখ খুলল। 'ভেড়াগুলো নেই, বেন। আমার মনে হয় ওরা কেটে পড়েছে।'

ফাটা ঠোঁটের ফাঁকে সিগারেট রাখল বেন হাইনডমান। খোদার কসম, একটা মেয়ে বটে! কীভাবে দাঁড়িয়ে আছে...ভয়-ডর বলতে কিছু নেই।

সময় নিয়ে বিষয়টা বিবেচনা করল ও। বেন হাইনডমান সাবধানী মানুষ। নিজের পরিবারের বাইরে, নির্মম, দয়া-মায়াহীন মানুষ, ব্র্যান্ডের জন্য বাঁচে। বুড়ো বব সাটনই ছিলেন বস, কিন্তু এখন তাঁর অবর্তমানে সব দায়িত্ব ওর কাঁধে বর্তেছে, যেমনটি বুড়ো বব প্রত্যাশা করতেন।

জ্যাক সাটন পছন্দ করেনি ব্যাপারটা, কিন্তু কিছু করারও ছিল না। এসবি র্যাঞ্চের ষাট জন কর্মচারীর মধ্যে বড়জোর আট-নজন ওর সঙ্গে থাকবে, এবং কেউই হাইনডমানকে মোকাবেলা করতে চাইবে না। সরাসরি, অক্লান্ত এবং শক্তিশালী, হাইনডমান কোনো প্রচেষ্টা অপচয় করে না। কোনো কিছু ওর পথরোধ করে দাঁড়ালে তাকে দ্বিধাহীনভাবে ধ্বংস করে কারণ ওটা তার পথ আটকেছিল। কিন্তু ওর সেই কাজে কোনো নীচতা বা ক্রূরতা থাকে না।

এখানে কিছু একটা আছে যা বিচলিত করছে বেনকে। এই মেহিকান মেয়েটার ভেতরে একধরনের বন্যতা আছে, যা বিপজ্জনক। মেয়েটা ওর স্ত্রীর মত নয়, যার মধ্যে বশ্যতাস্বীকার এবং সহ্য করার ক্ষমতা আছে, কিন্তু এই মেয়েটার শক্তি আক্রমণাত্মক; ওর বুদ্ধি আছে। জ্যাক এটা কোনোকালেই বুঝবে না।

মূলত এই গুণের কারণেই হাইনডমান, যে কখনও সময় অপচয় করে না, চাভেরোদের ঘাঁটায়নি। ওদেরকে ক্যানিয়নে শান্তিপূর্ণভাবে দিন গুজরান করতে দেওয়া অনেক বুদ্ধিমানের কাজ। নইলে পাহাড়ে আত্মগোপন করে ওরা এসবি-র গরুবাছুর চুরি করে জীবন চালাতে পারে।

জ্যাক যেটা উপলব্ধি করতে পারেনি তা হল এই মেয়ে লড়বে এবং মাত্র কয়েক মাইল দক্ষিণের মেহিকানদের সাহায্যও সে দরকারের সময়ে পাবে। সমস্যার শেষ এখানেই নয়। এসবির সেরা তৃণভূমিগুলো সীমান্তের দক্ষিণে। এই মেয়েকে আঘাত করা হলে বা তাকে ক্রুদ্ধ করা হলে, সে এসবি-র নিদারুণ ক্ষতিসাধন করতে পারবে। পাশাপাশি হাইনডমান এটাও জানে ট্রেস জর্ডান এসবির বিরুদ্ধে জয়ী হলে কী বিপদ হতে পারে। জর্ডানকে খুঁজে পেতেই হবে। এবং হত্যা করতে হবে।

'তুমি রয়ে গেলে কেন?' অবশেষে জিজ্ঞেস করল ও।

'আমি যাব কেন? এটা আমার বাড়ি।' হাইনডমানের চোখে চোখ রেখে জবাব দেয়ার সময়ে মারিয়ার কণ্ঠে সূক্ষ ঔদ্ধত্য প্রকাশ পেল। 'তোমরা আজকাল মেয়েদের সঙ্গেও মারপিট কর নাকি?'

নৈঃশব্দ্যের ওপার থেকে মর্ট বেইলেসের নিরস কণ্ঠস্বর ভেসে এল। 'আমাকে দশটা মিনিট আর একটা চাবুক আর স্পার দাও। সুড়সুড় করে ও কথা বলবে।'

সিগারেটের ডগার ওপর দিয়ে তাকাল বেন হাইনডমান, এধরনের উক্তিতে বিরক্ত। মর্ট সবসময় মেয়েদের প্রতি নিষ্ঠুর। বউ পেটাত। শেষমেশ অতিষ্ট হয়ে সে একদিন পালায়। আর ফিরে আসেনি। মর্ট চেষ্টা করেছিল ফেরাতে...পারেনি। হয়ত চেষ্টা করেছিল বলেই পারেনি। কিন্তু এই মেয়েকে দেখে একটা নির্বোধও বুঝবে ও ভাঙবে কিন্তু মচকাবে না।

'বেন?'

ইয়াকব লানত্স। বাড়ির একপাশে মাটিতে বসে আছে বুড়ো ট্র্যাকার। 'ও ফিরে আসবে, বেন।'

হাইনডমান দেখল মারিয়ার মুখে মুহূর্তের জন্য ভয় ফুটে উঠেই মিলিয়ে গেল। বেন হাইনডমান বুদ্ধিমান লোক। একটাই নারী এসেছে তার জীবনে, এবং সেটা হল তার স্ত্রী। কিন্তু সে নারীর মন বোঝে। 'ঠিক আছে,' হাইনডমান বলল, 'আমরা অপেক্ষা করব।'

ক্রোধে বিকৃত হল মর্টের চেহারা। 'অপেক্ষা?' সামনে ঘোড়া হাঁকাল সে, এভাবে যে আরেকটু হলেই উলটে ফেলছিল লানত্সকে।

'মর্ট।'

শীতল কণ্ঠস্বরটা টেনে ধরল ওর রাশ, ক্রোধের জায়গায় সুবুদ্ধি ফিরিয়ে আনল। হাইনডমানের শর্টগানটা স্যাডল বোয়ের ওপর আড়াআড়ি রাখা, জোড়া নল তাকিয়ে আছে বেইলেসের দিকে। 'আমি হকুম দিচ্ছি এখানে।'

দ্বিধা করল মর্ট, ভেতরে ভেতরে ক্রোধের আগুনে পুড়ছে। কিন্তু বেন হাইনডমানের সঙ্গে তর্কের সুযোগ নেই। শর্টগানটা নিছক হুমকি নয়। 'তুমি অপেক্ষা কর তাহলে,' অবশেষে বলল সে। 'আমি শহরে চললাম।'

বাড়ির ভেতরে ফিরে গিয়ে একটা চেয়ারে বসে পড়ল মারিয়া ক্রিশ্চিনা, পা দুটো দাঁড়িয়ে থাকার জন্য ভীষণ দুর্বল মনে হচ্ছে। ইতিমধ্যে কয়েকটা জিনিস দেখেছে সে। একটা লোকের মুখে ব্যানডেজ বাঁধা। মনে হয় হয় গণ্ডদেশে গুলি লেগেছে। ডেভ গডফ্রি নেই ওদের সঙ্গে। ট্রেস জর্ডান প্রতিশোধের পাল্লা ক্রমেই ভারি করছে।

বাড়ির ভেতর খাবার নিয়ে ঢুকল জো সাটন, টেবিলের ওপর স্তূপ করে রেখে মারিয়ার মুখোমুখি হল, হাতে টুপি। 'তুমি রান্না করে দেবে? আমরা কেউ রাঁধতে পারি না।'

ওর ভঙ্গি সলজ্জ, তবু মারিয়া একবার ভাবল না বলে দেয়। পরক্ষণে উপলব্ধি করল সে খাওয়া ভাল হলে মানুষের মধ্যে আলস্য আসে, ঘুম পায়। 'ঠিকাছে, আমি রাঁধব,' বলল।

এই কাজটায় নিজেকে ও ব্যস্ত এবং চিন্তা থেকে দূরে রাখতে পারবে। ওরা বিশ্বাস করেছে ট্রেস জর্ডান ফিরে আসবে। আসবে কি? ওর জন্যে?

ছজন থাকল। বাকিরা গেল তাজা ঘোড়া আনতে। হাইনডমান, জ্যাক এবং জো সাটন, লানত্স, বাক বেইলেস এবং গোমড়া-মুখো লোকটা যাকে সে চেনে ওয়েস পার্কার নামে রয়ে গেল। গডফ্রি, পরে শুনল ও, গড়ান পাথরের ধাক্কায় পাহাড় থেকে ছিটকে পড়ে মারা গেছে।

কোনো অচেনা পুরুষকে সে ভালবাসতে চায় না। ভালবাসার অর্থ নিজেকে সমর্পণ করা...নিজেকে উজাড় করে দেওয়া এমন একজনের কাছে যে তাকে চেনে না, তার ভাল লাগা মন্দ লাগার কথা জানে না। নাহ, সে ওই অচেনা অতিথির কথা আর ভাববে না।

জীবনে একটা ভুলই যথেষ্ট। কারও ভালবাসায় জড়ায়নি সে, কিন্তু মরুভূমি আর পাহাড়-পর্বতের ক্ষুদ্র কোণ থেকে বৃহত্তর জীবনের স্বাদ পাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে উঠেছিল। বাবা মারা যাওয়ায় সংসারের ওপর চাপও ছিল বেশি। সে না থাকলে একটা অনাহারী মুখ অন্তত কমে যায়। তাই বাড হেইসকে বিয়ে করেছিল। হেইসকে সে কখনও ভালবাসেনি। কিন্তু হেইস তাকে ভালবাসত। সজ্জন ছিল লোকটা, মদ ধরার আগে পর্যন্ত। তবে দুর্বল ছিল।

কিন্তু এই লোক অন্যরকম। ওর মধ্যে একটা কিছু আছে যা মনকে বিশ্বাস করায় যদিও সে জানে ওর কথায় কান দেওয়া বোকামি হবে। পুরুষরা মিথ্যা বলে। সবাই।

টেবিল থেকে পিছু হটল বাক বেইলেস, ঈর্ষামিশ্রিত সপ্রশংস দৃষ্টিতে তাকাল মারিয়া ক্রিশ্চিনার দিকে। 'তুমি রান্না জান। স্বীকার করতেই হবে।'

ওর উদ্দেশে ভ্রূকুটি করেই মুখ ফিরিয়ে নিল মারিয়া। ওর পেছনে উঠে দাঁড়াল জো সাটন। কিছুটা আত্মসচেতন ভঙ্গিতে বলল, 'ধন্যবাদ, ম্যাম।'

সবাই বিদায় নেয়ার পরও মারিয়ার পেছনে ঘুরঘুর করতে লাগল জ্যাক। নিজেকে সে কিছুতেই বিশ্বাস করাতে পারছে না একটা মেহিকান মেয়ের তাকে প্রত্যাখ্যান করার সাহস হতে পারে।

কয়েক মিনিট পর দরজায় উঁকি মারল হাইনডমান। গলায় শ্লেষ মিশিয়ে বলল, 'জ্যাক, তোমাকে যদি ওখানে থাকতেই হয়, তাহলে জানালা থেকে সরে এসো। তোমাকে দেখতে পেলে জর্ডান আসবে না।'

বিরক্তির সঙ্গে সরে এল সাটন।

মারিয়া ক্রিশ্চিনা ভাবছিল আজ রাতে জর্ডান ফিরে আসবে না। আজ রাতে ওর জন্য অপেক্ষা করবে সে। কাল? কালও অপেক্ষা করবে। এরপর তাকে পালাতেই হবে।

সবিস্ময়ে একটা সত্য উপলব্ধি করে মারিয়া। জর্ডানকে সে বিশ্বাস করেছে। একটা কাউপাঞ্চারের কথায় গলে যাওয়ার মত বোকা মেয়ে সে নয়। লোকটার সঙ্গে ওর ভালবাসাও নেই। কখনই কোনো গ্রিংগোকে সে সত্যিকার অর্থে ভালবাসতে পারবে না। কিন্তু এরপরও লোকটাকে সে ভুলতে পারছে না। নিজের শরীরে জর্ডানের স্পর্শ, তার তপ্ত নিশ্বাস অনুভব করে মারিয়া।

জ্যাক সাটন লক্ষ করছিল মারিয়াকে। হাঁটা-চলার সময়ে কেমন সুন্দর জামাটা আঁকড়ে আছে ঊরু। মারিয়ার পেছনটা দেখে ওর রক্ত চঞ্চল হয়। 'পাহাড়ে লোকটার সঙ্গে অনেক ফূর্তি করেছ না?' বলল সে।

কাবার্ড সাফ করছিল মারিয়া। নীরবে ঘুরে দাঁড়াল, দৃষ্টিতে ব্যঙ্গ। 'তোমার পছন্দ হয়নি ব্যাপারটা, না? নিজেকে অনেক বড় মনে কর! হাহ্! তুমি একটা ফালতু! একটা জানোয়ার! জান শুধু চুরি করতে আর খুন করতে!'

এক লাফে চেয়ার ছাড়ল জ্যাক সাটন, এগিয়ে এসে সজোরে চড় মারল মারিয়ার গালে। পিস্তলের গুলি মত শোনাল শব্দটা। এবার আরেকটা হাত চালাল জ্যাক। মারিয়া মাংস কাটার ছুরিটার দিকে হাত বাড়াল।

ছুরিটা ও ব্যবহার করতে পারার আগেই, দরজায় দেখা গেল বেন হাইনডমানকে। 'তুমি একটা নির্বোধ, জ্যাক! মেয়েটাকে ছেড়ে দাও!'

থমকে দাঁড়াল সাটন, মুখ ক্রোধে ফ্যাকাশে। হাইনডমানের উদ্দেশে ফিরল সে, আঙুলগুলো ছড়ান, চোখে খুনির লালসা। 'আমার সঙ্গে ওভাবে কথা বলবে না, বেন! একদিন তোমাকে আমি খুন করব!'

'কোরো।' তামাকের দলা গালের আরেকপাশে চালান করল বেন হাইনডমান। 'তোমার যখন সুবিধা বোলো, জ্যাক।' বুড়ো আঙুল নাচিয়ে দরজাটা দেখাল। 'কিন্তু এখন মেয়েটাকে একা থাকতে দাও। এটা ওর জামা টানাটানির সময় না। আমরা একটা লোককে খুঁজছি।'

ধীরে ধীরে কুড়ি পর্যন্ত গুনতে পারে এতটা সময় অপেক্ষা করল জ্যাক সাটন, তারপর হাইনডমানের সঙ্গে দরজার বাইরে বেরিয়ে গেল। বেন হাইনডমানের মধ্যে একধরনের নিস্পৃহতা আছে যেটা জ্যাক বুঝতে পারে না। ওর চোখের স্থির তাকিয়ে ছিল সে, অথচ মুহূর্তের জন্য তামাক চিবুনোয় বিরতি দেয়নি। যখন গরু ব্র্যান্ড করে বা দোকান থেকে ময়দা কেনে তখনও হাইনডমানের চেহারা এরকম থাকে।

হাইনডমান চলে গেল। সাটন দরজার উদ্দেশে ফিরল। 'জর্ডানের যা-ই হোক, তুই এখানেই থাকছিস। ওর ঠিকানা একবার লেগে গেলে তোকে নিয়ে কেউ মাথা ঘামাবে না। তখন আমি ছিবড়ে করব তোকে। কারও জন্য আর কিছু পড়ে থাকবে না।'

ছুরিটা নামিয়ে রাখল মারিয়া। 'আমি তোমাকে খুন করব,' বলল ভীষণ ঠান্ডা গলায়। 'আগে খুন করব।'

বেলা গড়িয়ে চলে। ওঁত পেতে-থাকা লোকগুলো তাপতরঙ্গের ভেতর দিয়ে নজর রাখে পাহাড়ে। দূর-আকাশে একটা শকুন উড়তে দেখে। কোথাও কোনো শব্দ নেই। নড়াচড়া নেই। তিক্ত সুরে খিস্তি করল জ্যাক সাটন, ঘাড় মুছল।

লিন-টু-বার্নের অদূরে ছায়ায় বসে আছে বাক বেইলেস, গরম আর ভারি বাতাসে হাঁপাতে-থাকা একটা গিরগিটিকে তাক করে নুড়ি ছুড়ছে।

'বৃষ্টি হবে,' বলল লানত্স। 'এই গুমোট ভাব বৃষ্টি ডেকে আনবে।'

দৃষ্টির আড়ালে ছায়ায় বসে রইল ওরা। জর্ডান কখন ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেবে কেউ বলতে পারে না। বাক বেইলেসের মনে পড়ল লানত্স কী বলেছে। জর্ডান যখন ফিরবে, তারা ওকে সামলাতে পারে। বেইলেসের মনে আছে জর্ডানকে যখন প্রথম বাগে পেয়েছিল ওরা তখন কী ঘটেছিল।

ছায়ার সবচেয়ে গভীর অংশে চুপ করে বসে আছে লানত্স। ও কীভাবে যেন সবসময় বুঝতে পারে কোথায় ছায়া সবচেয়ে গভীর এবং সবচেয়ে বেশিক্ষণ স্থায়ী হবে। মাঝে মাঝে জ্যাক সাটনকে লক্ষ করছে সে, আন্দাজ করে বন্দুকবাজের মনে কী আছে।

রাতের খাওয়াটাও জমল। হাইনডমান টেবিল থেকে সরে গেল কিন্তু উঠল না। জ্যাক অপেক্ষার খেলায় হারাতে চেষ্টা করল ওকে, কিন্তু শেষমেশ হার মানল। বেনকে অপেক্ষায় হারাতে পারবে না কেউ। পর্বতের মত অটল বসে রইল সে। হতাশ হয়ে উঠে গেল জ্যাক।

সিগারেট বানিয়ে ধরাল বেন। মেয়েদের সে কখনই বোঝে না। এমনকি নিজের স্ত্রীকেও নয়, যার সঙ্গে ঘর করছে অনেক বছর। অবশ্য কোনো কোনো মেয়ে পটে যায়। কাউকে ভয় দেখিয়ে বশ করা যায়। কাউকে তাদের পরিবারের মাধ্যমে বাগে আনতে হয়। কিন্তু এই মেয়েটিকে জয় করা সম্ভব কীভাবে?

ওর সংশয় আছে আদৌ সম্ভব হবে তা, কিন্তু সে চেষ্টা করতে চাইল। বেন হাইনডমান একটা লক্ষ্য নিয়ে চলে। এবং সেই লক্ষ্য হাসিল না হওয়া অবধি থামে না। ওর এই গুণের কারণেই জ্যাক সাটন এখন অবধি দল ভাঙার চেষ্টা করেনি। বেনকে ভয় দেখান যাবে না, খুন করাও কঠিন হবে।

'তুমি এই জর্ডান লোকটাকে ভালবাস?' অকস্মাত্ প্রশ্ন করল সে।

'কেন জিজ্ঞেস করছ?'

'ঠিক জানি না। হয়ত কৌতূহল। অনেক করেছ ওর জন্য।'

'কী করেছি? লোকটা মারা যাচ্ছিল...সারিয়ে তুলেছি। এটা তো তোমার জন্যও করব। যে-কারও জন্য করব।'

'হয়ত তা-ই। তুমি খুব ভাল মেয়ে।' কথাটা মনের ভেতর নাড়াচাড়া করল হাইনডমান, বুঝতে চেষ্টা করছে কীভাবে আলাপ জমান যায়। 'আমাদের তুমি পছন্দ কর না, না?'

'করা কি উচিত?' শ্রাগ করল মারিয়া, ভুরু কপালে। 'আমার বাবা খুন হয়েছেন তোমাদের হাতে। আমাদের তাড়াতে চেষ্টা করেছ। এটা আমাদের দেশ।'

'আমরা অবস্থাটা বদলাতে পারি,' ধীরে ধীরে শুরু করল বেন। 'তোমাকে আরও জমি দিতে পারি। বুড়ো মনিবের দুচোখের বিষ ছিল ভেড়া। কিন্তু আমি সেরকম না।' ওর দিকে চোখ তুলল সে। 'আমি তোমাকে ব্যবসার টাকা দিতে পারি। তোমার পার্টনার হতে পারি। তোমার দুই ভাই ওখানে কাজ করবে। লাভের টাকা আধাআধি।'

হাইনডমান আন্তরিক। মারিয়া জানে। হাইনডমান পেছনে থাকলে, কেউ ওকে কিছু বলতে সাহস পাবে না। প্রকাশ্যে নয়।

'তোমার স্ত্রী কী বলবে?' ওর কণ্ঠে কপট প্রশ্রয়।

সকরুণ দৃষ্টিতে তাকাল হাইনডমান। 'ঝামেলা করতে পারে,' বলল, 'মেয়েরা তোমাকে বিশেষ পছন্দ করে না।'

'অকারণে। আমি কাউকে বিরক্ত করি না। আমি ভাল মেয়ে।'

তাকাল বেন হাইনডমান। 'আমি তোমাকে বিশ্বাস করি,' বলেই বিস্মিত হল সে, কথাটা অবলীলায় মুখ থেকে বেরিয়ে আসায়। 'হ্যাঁ, আমি জানি তুমি ভাল। কিন্তু জানই তো মেয়েরা কেমন হয়ে থাকে। তুমি দেখতে,' ঈষত্ রাঙা হল ওর মুখ, 'তুমি দেখতে খুব সেক্সি।'

'তো? আমি নারী।'

'ম্, কী ভাবলে ভেড়ার প্রস্তাবটা? রাজি?'

'না।'

'আমার স্ত্রীর কারণে?' ইতস্তত করল বেন। 'আমি ওটা সামলাতে পারব।'

'কারণ এর বিনিময়ে তুমি আমার কাছে কিছু জানতে চাইছ।'

'বল আমাদের লোকটা কোথায়। আমি আমার লোকদের সরিয়ে নিচ্ছি। তুমি ভেড়াও পাবে।'

'আমি জানি না সে কোথায়।'

'ফিরে আসবে এরকম কিছু বলেছিল?'

সামান্য দ্বিধা করল মারিয়া এবং পরমুহূর্তে বুঝল ভুল হয়ে গেছে। হাইনডামানের চোখে আলো ফুটে উঠেছে। 'না,' বলল ও। 'কেন ফিরবে?'

কিন্তু উত্তরটা দিতে অনেক বেশি সময় নিয়েছে ও। উঠে পড়ল হাইনডমান, ভাল বোধ করছে। লোকটা আসবে, এই মেয়ের টানে সে ফিরে আসবে। 'কথা বলবে মনস্থির করলে আমাকে খবর পাঠিয়ো। আমরা ওকে এমনিতেও খুঁজে বের করব। তবে তুমি যদি হদিস দাও, তোমার দিকটা আমি দেখব। সবাই তোমার সঙ্গে ভাল ব্যবহার করবে।'

কথাটা সত্যি। হাইনডমানের ইচ্ছাই শেষকথা। ওরা পছন্দ নাও করতে পারে কিন্তু বিরুদ্ধে যাবে না। ট্রেস জর্ডান ফিরে আসতে গিয়ে মারা পড়তে পারে। তবু হাইনডম্যনের প্রস্তাবটা নিয়ে মারিয়া ভাবে না; ওর ভাবনা আচ্ছন্ন করে থাকে একটা দুশ্চিন্তা: জর্ডান ফিরতে গিয়ে ওদের ফাঁদে পা দিতে পারে।

কফি বানিয়ে আগুনের কিনারে রাখল মারিয়া, দরজায় গিয়ে জানাল ওদের। তারপর ঘরে গেল ও কিন্তু জামাকাপড় বদলাল না। ওরা ওই কফি খাবে। নিজেদের জাগিয়ে রাখার জন্য খাবে। কিন্তু যদি এমন হয় কফি পান করল ঠিকই অথচ জেগে থাকতে পারল না?

অনেক বিষাক্ত লতাগুল্ম আছে। শৈশব থেকে অনেকগুলো সে চেনে। রোসা কয়েকটা চিনিয়েছে। রোসার মা নাভাহোদের মধ্যে নামকরা ওঝা ছিলেন।

কিন্তু সে খুনি নয়। কিন্তু ওরা যদি ঘুমায়? সঙ্গে সঙ্গে ঘুমাল না মারিয়া, চুপ করে শুয়ে চিন্তা করতে লাগল। ওই নিশ্চল মরুভূমির কোনো একজায়গায় আকাশকে হাতছানি দিচ্ছে একটা পাহাড়চূড়া...স্তব্ধতার মাঝে একটা কোয়েল ডাকল...ওখানে ট্রেস জর্ডান অপেক্ষা করছে ওর জন্য।

রাগতভাবে বালিশে মাথা চেপে ধরল ও। একটু বাদে ঘুমিয়ে পড়ল।

ট্রেস জর্ডান যে-ধরনের সমস্যা হাজির করেছে সেই ধরনটাই ইয়াকব লানেসর সবচেয়ে বেশি পছন্দ। সেই কবে দলছুট অ্যাপাচিদের ট্রেইল করা ছেড়েছে, তারপর আর এত আনন্দ কোনো কাজে পায়নি। আনিমাস বা গুয়াদালুপে পর্বতমালায় লুকোনর জন্য অনেক ভাল জায়গা আছে। কিন্তু জর্ডান দক্ষিণে সান লুইসের দুর্গম এলাকার দিকে যাবে। জর্ডান ওই এলাকায় বেঁচে থাকতে পারবে কারণ সে অ্যাপাচিদের মত জীবনযাপন করতে পারে। কিন্তু মেয়েটাকে সঙ্গে না পাওয়া অবধি অতদূর যাবে না। হাইনডমানকে কথাটা বলল সে।

'যাই হোক,' বলল হাইনডমান, 'আমরা ভেড়াগুলোর খোঁজ করব। জোকে নিয়ে যাব আমাদের সঙ্গে।'

অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে লানত্স তাকালর বাড়িটার দিকে কিন্তু কিছু বলল না। জ্যাককে পেছনে ফেলে যাওয়ার অর্থ বিপদ ডেকে আনা। লানত্স চায় না মেয়েটার কোনো ক্ষতি হোক। জর্ডানকে ধরার জন্য ওই মেয়েই ওর সেরা টোপ। ভোর হওয়ার এক ঘণ্টা বাদে তিনজন ঘোড়ায় চেপে চলে গেল। সিগারেট বানাতে বানাতে ওদের যাওয়া দেখল জ্যাক সাটন।

ওয়েস পার্কার বসে রইল, চেহারায় শঙ্কা। বাক বেইলেস চোয়াল চুলকাল কাঁপা কাঁপা হাতে। মারিয়া ক্রিশ্চিনা দেখল ওদের। হাইনডমানকে সে যেতে দেখেছে। চট করে কসাইয়ের ছুরিটা তুলে নিল সে, সাইডবোর্ডে একটা কাপড়ের নিচে লুকিয়ে রাখল।

পাথরকুচিতে বুটের শব্দ তুলে ঘরের ভেতর পা রাখল জ্যাক সাটন। ওর ঠোঁটে চিকন হাসি, কিন্তু চোখ দুটো হাসছে না। 'বেন চলে গেছে,' বলল সে।

'সি।' মারিয়ার চোখ সতর্ক। 'আমি জানি।'

'আমি এরকম একটা সুযোগেরই অপেক্ষা করছিলাম।'

'তুমি একটা কাপুরুষ। বেনকে ভয় পাও।'

'ঘরের মাঝ বরাবর চলে এল সাটন। 'না, ভয় পাই না। স্রেফ বুদ্ধি করে চলি। বেন সব ঝামেলা সামলায়। আমাকে কাঁধ দিতে হয় না। তাই আমি ওর কথা শুনি।'

'তুমি যাও। এখানে তোমার কোনো কাজ নেই।'

জ্যাক সাটন হাসল। তবে হাসিটা সুন্দর নয়। 'আমার এখানে অনেক কাজ। তোকে শিক্ষা দেব।'

টেবিলের কোণ ঘুরল ও, মারিয়ার মুখোমুখি হল। মারিয়া পালানর চেষ্টা করল না। ওর চোখ সতর্ক, অপেক্ষা করছে, চেহারা ভাবলেশহীন।

হাত তুলল সাটন, তালু খোলা, আঘাত করল মারিয়াকে। বিষ্ফারিত হল মারিয়ার চোখ, কিন্তু অপলকে সাটনের দিকে তাকিয়ে থাকল ও, গালে চড়ের দাগ ফুটে উঠেছে। ওর এই নিস্পৃহতা খেপিয়ে তুলল সাটনকে। এবার মুঠি পাকাল ও, ঘুসি মারবে। আর ঠিক তখুনি কাপড়ের নিচে থেকে হ্যাঁচকা টানে ছুরিটা বের করল মারিয়া। মৃদু ঝিলিক চোখে পড়ল সাটনের, আবার হাত চালাল সে, ছুরির ফলা ওর শার্ট ভেদ করল।

টলে উঠল সে, পেছাতে গিয়ে একটা চেয়ারে হোঁচট খেয়ে উলটে পড়ল। মুহূর্তে মারিয়া পাশ কাটাল ওকে, বেরিয়ে গেল দরজা দিয়ে। লাফিয়ে উঠে ওকে জাপটে ধরতে চেষ্টা করল সাটন, কিন্তু আবার চেয়ারে বেধে পড়ে গেল। দরজা দিয়ে বেরিয়েই পাহাড়ি নালার দিকে ছুটল মারিয়া।

ওয়েস পার্কার ধরতে চেষ্টা করল কিন্তু মারিয়া ঘুরে দাঁড়িয়ে ছুরির ঘাই মারল। এক লাফে পিছিয়ে গেল পার্কার, গাল বকছে, রক্ত ঝরছে হাত থেকে।

এই বিলম্ব সাটনকে সময় দিল মারিয়ার কাছে পৌঁছে যাওয়ার। ছুরি এড়িয়ে, ওকে মাটিতে ফেলে দিল সে। মারিয়া উঠতে পারার আগেই, সাটন লাথি মেরে ছুরিটা ওর হাতছাড়া করল।

টলতে টলতে উঠে দাঁড়াল মারিয়া, পিছিয়ে গেল, চোখে নগ্ন ঘৃণা। সামনে এগোল সাটন, বাধা উপেক্ষা করে পাঁজাকোলা করে তুলে নিল মারিয়াকে, ঘরে এনে ছুড়ে ফেলল মাটিতে। মুহূর্তে উঠে দাঁড়াল মারিয়া, হাঁপাচ্ছে, কোণঠাসা জন্তুর মত জ্যাককে দেখছে।

বাইরে খিস্তি করছিল ওয়েস, বাহু থেকে অবিরল ধারায় রক্ত পড়ছে। বাক বেইলেস বাড়ির দিকে তাকাল, ওর সারা মুখে ঘাম। জিভ দিয়ে ঠোঁট চাটল সে।

'গাধার মত ওদিকে তাকিয়ে থেকো না!' খেঁকিয়ে উঠল পার্কার। 'আমার রক্তপাত বন্ধ করো!'

পার্কারের উদেশে এগোল বেইলেস কিন্তু ওর মনোযোগ বাড়ির ওপর। ভেতরে, সাইডবোর্ডে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মারিয়া ক্রিশ্চিনা, দেখছে জ্যাক সাটন এগিয়ে আসছে ওর দিকে।

'এই সুযোগেরই অপেক্ষা করছিলাম আমি,' বলল সাটন। 'এখন এস্তেমাল করব।' মারিয়াকে আঘাত করল সে, হিশেব করে জায়গামত মারতে লাগল। ঠোঁট কেটে রক্ত ছুটল। মারিয়া পালাতে চেষ্টা করল কিন্তু পারল না। প্রত্যেক বার আগের চেয়ে আরও জোরে আঘাত করে চলল সাটন।

'তোকে খুন করব আমি!' ফ্যাঁসফেসে গলায় বলল সে। 'তুই—'

'জ্যাক!' বাক বেইলেসের গলা ওটা। মাঝপথে ঘুসি থামাল সাটন। বাইরে ঘোড়ার খুরের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। রাগতভাবে আঘাত করল সাটন। কিন্তু সতর্ক ছিল মারিয়া ক্রিশ্চিনা, পিছিয়ে গেল একলাফে, মেঝেতে পড়ে গেল।

বাড়ি থেকে বেরিয়ে হাইনডমানের মুখোমুখি হল জ্যাক। দীর্ঘ একটা মুহূর্ত ওরা তাকিয়ে রইল একে অপরের দিকে, কেউই কথা বলল না। তারপর হাইনডমান সোজা বাড়ির ভেতরে গিয়ে ঢুকল।

মারিয়া ক্রিশ্চিনা উঠছিল মেঝে থেকে, শক্তির অভাবে পড়ে গেল আবার। মৃদু স্বরে খিস্তি করল হাইনডমান, মেয়েটার ক্ষতবিক্ষত, রক্তাক্ত মুখ দেখতে পেয়েছে। উঠতে সাহায্য করার জন্য ওর হাত ধরল হাইনডমান। একঝটকায় ছাড়িয়ে নিল মারিয়া, নিজের চেষ্টাতেই উঠে দাঁড়াল। 'তোমরা পশু! সবাই পশু! কাপুরুষ! তোমরা মেয়েলোকের গায়ে হাত দাও!'

লজ্জায় মাথা নিচু করল হাইনডমান, বাইরে বেরিয়ে এল। জ্যাক সাটন অপেক্ষা করছিল ওর জন্য। সাটনের চোখে লড়াইয়ের উদগ্র বাসনা লক্ষ করে বিরক্ত হল হাইনডমান। এসব সমস্যার সময় এটা নয়। 'তুমি কি উন্মাদ?' জানতে চাইল ও। 'ওই মেয়েটাকে আমাদের দরকার। ওকে মেরে ফেললে, তারপর?'

হাইনডমান চলে যাওয়ার পর লানেসর উদ্দেশে ফিরল সাটন। 'সব নষ্টের গোড়া তুমি। তুমিই ওকে ফিরিয়ে এনেছ! তোমাকে একদিন আমি—'

ঘাসের ডগা চিবোচ্ছিল লানত্স। কুতকুতে চোখজোড়া ভয়ঙ্কর শীতল। 'যখন সেই চেষ্টা করবে, কাজটা ভাল করে কোরো। আমি পিস্তলে দক্ষ না কিন্তু তোমাকে খুন করব, জ্যাক! ঠিক যেভাবে একটা কীটকে তাড়া করব, সেভাবে তোমাকে তাড়া করব এবং হত্যা করব!'

ওকে পাশ কাটিয়ে নিজের ঘোড়ার কাছে গেল জ্যাক সাটন। গর্দভের দল! জাহান্নামে যাক! স্যাডলে চাপল সে, ঝড়ের বেগে ক্যানিয়নের বাইরে চলে গেল।

হাইনডমান ফিরে এল। 'ও যদি তোমাকে ঘাঁটায়, ইয়াকব, তুমি আমার কাছে চলে এসো।'

বুড়োর কালো চোখ দুটো হাইনডমানের দিকে ফিরল। সোজা-সাপটা কথা বলল। 'তুমি বরং ওকে সামলাও, বেন। আমাকে নিয়ে তোমার না ভাবলেও চলবে।'

নিজের বিশাল দুই থাবার দিকে অপলকে তাকিয়ে থাকে হাইনডমান। এই মানুষ শিকার কী হাল করছে ওদের? পুরো দলটাকে ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে, এককথায়। জ্যাক এবং মর্ট এই বিপত্তির কারণ। ওরাই ঘোড়াগুলো চুরি করেছিল। ওদের মাঝে কিছু লোকের খুনের নেশা আছে যা মৃত্যু ছাড়া অন্যকিছুই থামাতে পারবে না।

গোড়ালির ভরে ঘুরে দাঁড়াল হাইনডমান, বাড়িতে ফিরে গেল। ঘুসিতে ফুলে উঠেছে মারিয়া ক্রিশ্চিনার মুখ। খুব সামান্যই চেনা যাচ্ছে ওকে। 'আমাদের জন্য কি এরপরও রাঁধবে তুমি?'

হাইনডম্যানের চৌকো গ্রানিট-কঠিন মুখের দিকে তাকাল মারিয়া। 'রাঁধব,' বলে মুখটা অন্যদিকে ফিরিয়ে নিল।

পরে হাইনডমান দেখল ঝুড়িহাতে বাড়ির বাইরে বেরোল মারিয়া, বাঁধাকপি বাগানে গেল। ওকে লক্ষ্য করল হাইনডমান, বাধা দিল না। পরিষ্কার দৃষ্টিসীমার মধ্যে আছে, পালাতে পারবে না।

শালগম নেওয়ার জন্য থামল ও, মাটি থেকে শেকড়সুদ্ধ উপড়াল। সামনে এগোল সে, শাদা ফুল-কালো পাতার একটা গুল্মের সামনে দাঁড়াল মুহূর্তের জন্য। তারপর বাড়িতে ফিরে এসে রান্নার জোগাড়ে বসল। বেশ কয়েকবার লোকগুলো দরজায় এসে কফির খোঁজ করল কিন্তু প্রতিবারই ওদের ফিরিয়ে দিল সে, এখনও তৈরি হয়নি একথা বলে।

ওয়েস পার্কারকে শহরে পাঠান হয়েছে। জ্যাক সাটন এখনও ফেরেনি। শুধু লানত্স, বাক বেইলেস আর হাইনডমান আছে ওখানে।

অবশেষে ডিশে খাবার সাজাল মারিয়া। তৃপ্তি করে আহার করল লোকগুলো। কিছুসময় লক্ষ করল সে, তারপর আরও কফি ঢেলে দিল প্রত্যেকের কাপে। পুরোন একটা ময়দার থলেতে কয়েকটা স্যানডুইচ এবং আরও কিছু খাবার দ্রুতহাতে ভরল ও। কেউ লক্ষ্য করল না ব্যাপারটা। সবসময়ে ব্যস্ত ভঙ্গিতে এদিক-ওদিক যাচ্ছে আর কাজ করছে।

এখন ভীত, মারিয়া কান পাতে সাটনের ফিরে আসার শব্দের জন্য। বেশ কয়েকবার বাইরে চকিতে নজর বোলায় ও, অন্ধকারে সিগারেটের আগুন দেখতে পায়। বিদঘুটে একটা হাসি শুনতে পায়, তারপর খিকখিক হাসি। হাইনডমানকে ডাকল বেইলেস কিন্তু কোনো সাড়া নেই। বার্নের কাছে সব সিগারেটের আগুন নিভে যাওয়া এবং মানুষের হাঁকডাক থেমে যাওয়া অবধি অপেক্ষা করল ও।

বার্নের কাছে গিয়ে মারিয়া দেখল হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে আছে লোকগুলো, ঘুমোচ্ছে। একজনের থেকে উইনচেস্টার সংগ্রহ করল ও, দুজনের থেকে কার্ট্রিজ বেল্ট এবং বার্ন ডোরের ভেতর থেকে পয়েন্ট ফোর ফোর গুলির বাক্স নিল। বার্নের কোণায় একটা ঘোড়ার বাঁধন খুলল, তারপর ঘোড়াটাকে হাঁটিয়ে বাড়ির দরজায় গিয়ে খাবার আর কম্বল চাপাল স্যাডলের পেছনে। এরপর ঘোড়ার পিঠে উঠে বসল ও, অনেকটা পথ হেঁটে এগোনর পর যখন বুঝল বাড়ি থেকে যথেষ্ট দূরে সরে এসেছে তখন জোরকদমে ছুটল।

চারদিক নীরব-নিথর। অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এল জ্যাক সাটন। নাক-ডাকা লোকগুলোর দিকে একপলক দেখল সে, তারপর মুচকি হেসে মারিয়া ক্রিশ্চিনার ট্রেইলের উদ্দেশে ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে ধীর গতিতে এগোল। ওর পেছনে কবরের নিস্তব্ধতা। বাড়ির আলো এসে পড়েছে লোকগুলোর ওপর। মাদকের প্রভাবে গাঢ় নিদ্রায় আচ্ছন্ন ওরা।

জ্যাক সাটনের শক্তির উত্স পরিবার। অনেকেই আছে যারা তার সঙ্গে মুখোমুখি লড়তে সাহস পায় না, কিন্তু দরকার হলে পেছন থেকে অ্যামাবুশ করতে দ্বিধা করবে না। কিন্তু তা করে না মূলত ওর পেছনে সাটন-বেইলেস আউটফিটের সমর্থনের কারণে। পরিবার তার সুরক্ষা কবচ হিশেবে কাজ করে।

অন্যদিকে, বুড়ো ববের প্রতি বেন হাইনডমানের আনুগত্য ছিল প্রশ্নাতীত। তার মেয়েকে সে বিয়ে করেছে। এবং সেই সঙ্গে নিজের জীবনকে জুড়েছে ওই ব্র্যান্ডের সঙ্গেও। ওর এটুকু বোঝার বুদ্ধি আছে সামান্য দুর্বলতা দেখালেই নেকড়েরা ঝাঁপিয়ে পড়বে।

তবে জ্যাক সাটন এমুহূর্তে এসব ভাবছিল না। সম্প্রতি ওর মধ্যে সেই চূড়ান্ত এবং সূক্ষ্ম পরিবর্তন ঘটে গেছে যা বহু বন্দুকবাজের জীবনেই আসে। শুরুতে, এধরনের লোক পয়লা খুনটা করে অনুশোচনায় ভোগে কিন্তু দ্বিতীয়টা বেশ সহজ হয়ে আসে। বন্দুকবাজ ক্রমশ তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে দেখতে শুরু করে প্রতিপক্ষকে, খুন করে আনন্দ পায়। পাশাপাশি তার নিজের বিপদও বাড়তে থাকে। মানুষ এখন তাকে হত্যা করতে চায়। ফলে ধ্বংস করার জন্য সর্বদা মুখিয়ে থাকে সে, পিস্তল বের করার জন্য হাত নিশপিশ করে।

মারিয়া ক্রিশ্চিনা সম্বন্ধে সে একটা জিনিস বুঝেছে। মেয়েটাকে ভয় দেখিয়ে কাবু করতে পারবে না। আবার সে এটাও বিশ্বাস করে না যে পাহাড়ি চাতালে জর্ডানের সঙ্গে ওর কিছু ঘটেনি। তাই এখন সে চাইছে জর্ডানকে খুঁজে বের করে ওর চোখের সামনে হত্যা করবে। সে মেয়েটার তেজ ভাঙতে চায়, এবং একইসঙ্গে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চায়। তাই মারিয়াকে ধরার তাড়া নেই ওর। কারণ ও-ই তাকে জর্ডানের কাছে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে।

মারিয়া যে-পথে যাচ্ছে বেলা ওঠার পর ভীষণ গরম পড়ল সেখানে। ক্রমশ শুষ্ক এলাকায় প্রবেশ করছে সে। ভোর হওয়ার ঘণ্টা খানেকের মধ্যে ও নিশ্চিত হয়ে গেল পেছনে ফেউ।

এটা ঊষর অঞ্চল। পেছনে ধুলোর কুণ্ডলী দেখেছে ও। একমাত্র একজন ঘোড়সওয়ারের পক্ষেই সম্ভব এধরনের ধুলোর মেঘ সৃষ্টি করা। এবং এর একটাই অর্থ হয়: জ্যাক সাটন ওর পিছু নিয়েছে।

দুবার দিক বদলাল সে। একবার প্রত্যাশিত পথে, আরেকবার অপ্রত্যাশিত। মাথায় আসে এমন প্রতিটা কৌশল অবলম্বন করল ও, ইচ্ছে করে ওটর হোলগুলো এড়িয়ে গেল। সারা সকাল একঢোক পানিও খেল না নিজে, যদিও দুবার ভেজা কাপড় দিয়ে ঘোড়ার মুখ মুছিয়ে দিল।

দুই কারণে ট্রেস জর্ডানের কাছে যাচ্ছে ও, নিজেকে বলল মারিয়া। এক, ওর বিশ্বাস দুদিন আগে বা পরে জ্যাক সাটন ওকে খুন করবে। এবং দুই, ওর ভয় ট্রেস জর্ডান ফিরে আসবে।

ওর নাসারন্ধ্রে ধুলো জমছে। মুখ আর জামাকাপড়ে ধুলোর আস্তর পড়ছে। ঘাম ধুলোর মাঝে বিচিত্র নকশা আঁকছে। ঘোড়া নাগাড়ে ছুটে চলেছে।

মারিয়া ক্রিশ্চিনা নিশ্চিত খুব বেশি সময় সে ইয়াকব লানত্সকে ফাঁকি দিতে পারবে না, তবে মনে করে জ্যাক সাটনকে হয়ত খসাতে পারবে। অতিমাত্রায় আত্মবিশ্বাসই সাটনের পরাজয়ের কারণ হতে পারে। তবে এরপরও লানত্সকে বোকা বানাবার সব রকম ফন্দি ব্যবহার করতে হবে ওকে। একটা পাহাড়ি থাকে পৌঁছে মারিয়া বুঝল সময় হয়েছে। ঘোড়া থামাল সে, মাটিতে নামল।

সবার আগে সজাগ হল ইয়াক লানত্স। আকাশে ধূসর আলো ফুটেছে যখন চোখ মেলল সে এবং, কী ঘটেছে বোঝামাত্র, উঠে দাঁড়াল তড়াক করে। অশ্রাব্য খিস্তি করে, ছুটল বাড়ির উদ্দেশে। এখনও আলো জ্বলছে, তবে দ্রুত নজর বুলিয়েই ও বুঝল কী ঘটেছে।

'ভেগেছে! চেঁচাল ও। 'পালিয়েছে মেয়েটা! একদম বুদ্ধু বানিয়েছে আমাদের!'

বেন হাইনডমানের মাথা ভয়ানক ব্যথা করছিল, কিন্তু তারপরও তড়িঘড়ি স্যাডল চাপল। বার্নে বাড়তি ঘোড়া ছিল। শেষমুহূর্তে জো সাটন এসে যোগ দিল সঙ্গে।

গত রাতের এঁটো কাপটা পরখ করল লানত্স, তলানিতে জিভ ঠেকিয়েই বিকৃত করল মুখ, বলল, 'ধুতরা!'

'এই দেখ এখানে,' রওনা হওয়ার মিনিট কয়েক পর বলল সে, 'জ্যাক ওকে অনুসরণ করছে।।'

শিকার এবং শিকারীর মনস্তত্ত্ব বোঝে লানত্স, সহজেই অনুমান করে নিল কেন জ্যাক পিছিয়ে আছে। ও বিশ্বাস করে মেয়েটা ওকে জর্ডানের কাছে নিয়ে যাবে। নেবে কি?

তপ্ত, স্থির সকালের পুরোটা সময় সে ব্যয় করল ওদের ট্রেইলের সন্ধানে। জ্যাক সাটনের ট্র্যাকে আগ্রহ নেই ওর, মেয়েটাকে খুঁজে পেতেই হবে।

ওর ট্রেইল যখন শেষমেশ পাথুরে থাকে শেষ হয়ে গেল, জ্যাক তার বহু আগেই খসে পড়েছে। পথের কোথাও মেয়েটা বোকা বানিয়েছে ওকে। সধৈর্যে চারপাশ পরখ করল লানত্স। একটা পাথরে খুরের চিহ্ন দেখতে পেল। কিন্তু ওটাই শেষ ট্র্যাক।

চক্কর দিল ও। তারপর আরও বড় চক্কর। তাপ বা তৃষ্ণা কিছুই ওকে দমাতে পারে না। সূর্যের প্রখর দীপ্তিতে চোখ কুঁচকে আসে, কিন্তু অনুসন্ধান অব্যাহত থাকে। হঠাত্ থামল ও। একটা ছোট্ট লাল সুতো। সুতোটা কুড়িয়ে নিতে নিতে শব্দ করে হাসল লানত্স।

'হাসির কী হল?' বিরক্তির সুরে জানতে চাইল বেইলেস।

'মেয়েটা বুদ্ধিমান। ঘোড়ার খুরে কাপড় জড়িয়েছে।'

কোনো অর্থ হয় না এখন আর অনুসরণ করার। খুব কম চিহ্ন থাকবে, আর তাও হয়ত একটা থেকে আরেকটা মাইল তফাতে। এধরনের ট্রেইলর হদিস বের করতে সপ্তাহ লেগে যাতে পারে। তবে তার দরকার হবে না।

কটনউড ক্রিক বছরের এ সময়টায় শুকনো। কাউবয় স্প্রিংও তা-ই। মিলসাইটের কাছে কেউ বাঁধ উড়িয়ে দিয়েছে। সেক্ষেত্রে কোথায় যেতে পারে ও?

জর্ডান চলে যাওয়ার আগে ওর সঙ্গে ছিল। মারিয়া জানে ওকে অনুসরণ করা হবে। তাই অনুসরণকারীদের ভুল রাস্তায় পরিচালিত করতে চেষ্টা করবে। এই কারণে সে ধরে নিতে পারে এই ট্রেইলটা ভুয়া। অন্য কোনো ঘুরপথে পানির কাছে যেতে এক-দুই দিন না, সপ্তাহ লেগে যাবে। সুতরাং, দক্ষিণের বিশাল বিস্তৃতির কোথাও ট্রেস জর্ডান অপেক্ষা করছে ওর জন্য।

এক-এক করে সম্ভাবনাগুলো নাকচ করতে লাগল ও। 'একটা বুদ্ধি এসেছে,' বলল লানত্স। ঘোড়ায় চেপে ওকে অনুসরণ করল ওরা। কিন্তু তিন ঘণ্টা পর ওরা যখন উলফ পেন ট্যাংকে পৌঁছুল, সেখানে পানির ধারে বা আশেপাশের ঘাসে কোনো ট্র্যাক দেখতে পেল না। এমনকী একটা দলছুট বাছুরের পায়ের ছাপও নেই।

রাগতভাবে দাঁতের ফাঁকে তামাক পিষল লানত্স। কোথায় যেতে পারে মেয়েটা!

তিক্তস্বরে গাল বকল ও, মনে পড়েছে বুড়ো চাভেরো একবার চূড়ার কাছে বিক্ষিপ্ত ঝরনার অদূরে বেশ কয়েকদিন লুকিয়ে ছিল। 'ওটাই!' বলল সে। 'ওটাই!'

গাল বকল বেইলেস। 'আর কতক্ষণ চলবে এরকম?'

'এসো,' তাগাদা দিল হাইনডমান। 'আমরা ওদের খুঁজে বের করব।'

দ্রুতপায়ে উলফ পেন ত্যাগ করল ওরা। বিকেল অনেকটা গড়িয়ে গেছে। কিছুক্ষণের মধ্যে শীতল হয়ে আসবে সবকিছু, তখন ওরা আরও জোরে ছুটতে পারবে।

সন্ধ্যায় খুঁটি তুলল ট্রেস জর্ডান, স্যাডলে চেপে এগোল ঘোড়া হাঁটিয়ে, পেছনের পথ দিয়ে বেরোনর রাস্তা ধরল। অস্থির এবং উদ্বিগ্ন বোধ করছে, বসে থাকতে কিংবা বিশ্রাম নিতে পারছে না। ক্ষতস্থানে চুলকাচ্ছে। নিশ্চয় সেরে আসছে চোট। বেশি করে পানি খেল ও, এমন জায়গায় সরে গেল যেখান থেকে ট্রেইল দেখা যায়। কিছুই নেই দৃষ্টিসীমার মধ্যে।

তন্দ্রা এসে গিয়েছিল ওর যখন একটা ঘোড়া হাঁটার শব্দ পেল।

চকিতে উঠে দাঁড়াল ও, হাতে উইনচেস্টার। দুবার ঘোড়াটার হোঁচট খাওয়ার শব্দ পেল। ভীষণ ক্লান্ত ওটা। রাইফেলটা বাম হাতে চালান করল জর্ডান, পিস্তলের বাটে হাত রাখল। তৃণপ্রান্তরে সরে গেল ও, নিঃশব্দে এগোল ঘাসের মধ্যে দিয়ে। সবে চাঁদ উঠেছে পাহাড়ের মাথায়, ঘেসোজমি ম্লান আলোয় স্নান করছে। অন্ধকার থেকে ভূতের মত আবির্ভূত হল ঘোড়া আর তার আরোহী।

ওর উদ্দেশে এগোতে নিয়েছিল জর্ডান, আলোয় দেখতে পেয়েছে মেয়েলি চুল। পরক্ষণে অদূরে অস্পষ্ট আরেকটা শব্দ পেল।

'আছ?' মৃদু গলায় বলল মারিয়া, তবে কথা ঠিকই শোনা গেল। জবাব দিল না জর্ডান। অন্ধকারে কেউ অথবা কিছু একটা অপেক্ষা করছে। আরও একজন শুনতে পেয়েছে কথাটা।

ঘোড়া হাঁটিয়ে ফাঁকা জায়গার আরও ভেতরে চলে এল মারিয়া। নীরব, নিঃসঙ্গ ছায়ামূর্তির মত দেখাচ্ছে ওকে, যেন ঘোড়ার পিঠে এক ইনডিয়ান রমণী। 'আছ এখানে?' ওর কণ্ঠস্বরে বিষাদমাখা হতাশা। জর্ডানের বুক টন্টন্ করে ওঠে।

অপেক্ষা করে ও। নিস্তব্ধতার মাঝে আর কোনো শব্দ নেই। এখনও ঘোড়ার পিঠে বসে আছে মেয়েটা। সাড়া পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে। জর্ডান অনুভব করে মারিয়া হতাশায় ভেঙে পড়তে যাচ্ছে। মেয়েটা কি ভাবছে সে-ও আরেকজন ভবঘুরে, যে নিশ্চয় চলে গেছে? ও কি ব্যবহূত হয়েছে? প্রয়োজন মেটার পর লোকটা কেটে পড়েছে ওকে বিপদের মুখে ফেলে? মরীয়া হয়ে সাড়া দিতে নিচ্ছিল জর্ডান—

'না,' বলে উঠল আরেকটা কণ্ঠস্বর, ' ও এখানে নেই। কিন্তু আমি আছি।'

ছুঁচোল টুপি মাথায়, দীর্ঘকায় এক লোক বেরিয়ে এল ছায়া থেকে। লোকটাকে হাত বাড়াতে দেখে ঘোড়া ছোটাতে চেষ্টা করল মারিয়া। কিন্তু ক্লান্ত থাকায় চট করে এগোতে পারল না ওটা। খপ করে ওর লাগামটা চেপে ধরল সাটন, হ্যাঁচটা টানে মুখ ফেরাল ঘোড়ার, তারপর মারিয়াকে ধরার জন্য হাত বাড়াল।

একটা ছোট্ট ডাল কুড়িয়ে নিল ট্রেস জর্ডান, বারো ফুট দূরে একটা ঝোপের ভেতর ছুড়ে মারল। ঝোপের ভেতর শব্দ করল ওটা। চকিতে ওদিকে ঘুরল ঘোড়সওয়ার, একটা গান ব্যারেলে চাঁদের আলো দেখল জর্ডান।

অপেক্ষা করল সাটন, পিস্তল তৈরি। তারপর ধীরে ধীরে পেশি ঢিলে করল ও। 'কোনো জন্তু হবে,' বলল জোরে। মারিয়া ক্রিশ্চিনার দিকে ঘুরল। 'যা শুরু করেছিলাম, এবার শেষ করব সেটা।'

এখনও ওর বেশি কাছে মারিয়া। গোলাগুলি শুরু হলে চোট পাওয়ার যথেষ্ট ঝুঁকি আছে। এবার একটা নুড়িপাথর তুলল জর্ডান, ঘেসোজমির ওপাশে নিক্ষেপ করল। জায়গায় জমে গেল সাটন, কান পেতে শুনছে। তারপর পিস্তল হোলস্টার করল সে। 'নাম,' আদেশ করল মারিয়াকে, 'নয়ত আমিই টেনে নামাব।'

নিশ্চল বসে ছিল মারিয়া ক্রিশ্চিনা, দৃশ্যত নড়াচড়ার শক্তি নেই এতই ক্লান্ত, অথবা চরম হতাশায় শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। এবার আচমকা একটা পা ঘোড়ার ওপর দিয়ে ঘুরিয়ে আনল সে, অন্যপাশে গড়িয়ে পড়ল মাটিতে। এবং একইসময়ে চড় কষাল ঘোড়াটাকে। লাফিয়ে উঠল ওটা। তড়াক করে পিছু হটল সাটন, আর সেই সুযোগে একটা ঝোপের অন্ধকারে ঝাঁপিয়ে পড়ল মারিয়া, নিশ্চল শুয়ে রইল।

ফাঁকায় একা হয়ে গেল জ্যাক সাটন, ছায়াগুলো লক্ষ্য করছে, মারিয়ার নিশ্বাসের শব্দের জন্য কান খাড়া করেছে। 'কোনো লাভ নেই,' আলাপচারিতার ঢঙে বলল। 'আমি এখন আমার তরিকায় করব সবকিছু। বেন এখানে নেই যে আমাকে থামাবে।'

নড়ে উঠল ট্রেস জর্ডান। ওর পায়ের আশেপাশের ঘাস ফিসফিস করে উঠল। ট্রেস জর্ডান এখন একটা খুন করতে যাচ্ছে। এই খুনটা ওকে করতেই হবে। নিজে খুন হলে চলবে না। মারিয়াকে কোনো অবস্থাতেই জ্যাক সাটনের হাতে তুলে দেওয়া চলবে না। থামল ও। জানে সাটন দেখতে পাচ্ছে ওকে।

'কে? জানতে চাইল সাটন। 'বাক? বেন?'

উত্তেজনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে সাটনের জন্য যতটা, জর্ডানের জন্য ততটা নয়। ও জানে কার মুখোমুখি হয়েছে; সাটন রাতের অন্ধকারে কেবল একটা ছায়া দেখতে পাচ্ছে।

'কথা বল!' অধৈর্য স্বরে খেঁকিয়ে উঠল সাটন। 'কে তুমি!'

'আমি সেই লোক যাকে তুমি খুঁজছ,' বলল জর্ডান। 'যদি না একটা মেয়েই তোমার লক্ষ্য হয়ে থাকে।'

চার

শীতল রাত। স্থির দাঁড়িয়ে থাকে জ্যাক সাটন, নিজের ধীর ভারি হূদস্পন্দন শুনছে। আফসোস করছে ট্রেস জর্ডানকে দেখতে না পাওয়ায়। এই ছায়ামূর্তি উদ্বিগ্ন করছে ওকে। কোনো ব্যক্তি নেই ওখানে, শুধুই অন্ধকার, অনির্দিষ্ট, অস্পষ্ট একটা কিছু।

শুরু থেকেই এই লোকটাকে দেখেনি সে। ওর সহযোগীকে খুন করেছে, ওকে তাড়া করতে সাহায্য করেছে এবং বর্তমান মুহূর্তের মুখোমুখি করেছে, কিন্তু একবারও সে ট্রেস জর্ডানকে কার্যত দেখেনি।

তুমি ওর চোখের দিকে তাকাতে পারছ না; ফলে ওর সাহসের পরিমাপও করতে পারছ না। ব্যাপারটা বিরক্ত করে সাটনকে তবে তার আত্মবিশ্বাসের কমতি হয় না।

'আমার ধারণা আমার পার্টনারকে যারা হত্যা করেছে তুমি তাদেরই একজন,' বলল জর্ডান।

সাটন ভেবে পায় না জর্ডান ওর বন্দুকবাজ হাতটা দেখতে পাচ্ছে কিনা। অলস ভঙ্গিতে একপাশে ঝুলছিল হাতটা, কিন্তু ওটাকে সে একটু একটু করে ওপরে তুলতে শুরু করেছে। 'ঠিক!' বিদ্রূপ ঝরল ওর কণ্ঠে। 'আমি ওদেরই একজন। আসলে আমারই বুদ্ধি ছিল ওটা।'

কথা বলার সময়ে হোলস্টারর ঠিক নিচের অংশে ছিল ওর হাত। বাট আঁকড়ে ধরার জন্য ওকে শুধু কনুই বাঁকাতে হবে। আচমকা কনুই বাঁকা করল ও, পিস্তলের বাট স্পর্শ করল হাত। খুনের নেশায় এখন টগবগ করে ফুটছে রক্ত। সাটন ড্র করল—

জোড়া ঘুসির মত দুটো বুলেট আছড়ে পড়ল ওর পেটে, এপাশে ঢুকে ওপাশে বেরিয়ে গেল। বুলেটের আওয়াজ শুনতে পেল সাটন, টলে উঠল। টাল সামলানর জন্য বাঁ পা পেছনে করল, পিস্তল উঁচু করতে লাগল। কিন্তু হাত যখন উঠল পুরোপুরি, সবিস্ময়ে সাটন আবিষ্কার করল, হাত খালি—পিস্তল নেই।

হতবুদ্ধি সে বোকার মত চেয়ে থাকে হাতের দিকে। তারপর হাঁটু ভাঁজ হয়ে গেল ওর। হুড়মুড় করে ধুলোয় লুটিয়ে পড়ল জ্যাক সাটন। কোমর থেকে নিম্নাঙ্গ অসাড়, কিন্তু মস্তিষ্ক পরিষ্কার কাজ করছে। কথা বলতে চেষ্টা করল ও, দেখতে চেষ্টা করল লোকটাকে, যে অদূরে দাঁড়িয়ে লক্ষ করছে ওকে। কথা সাজাতে চেষ্টা করল ও, কিন্তু ধারণা অস্পষ্ট হয়ে এল। তাহলে মৃত্যুর সময় এরকমই অনুভূতি হয়।

সামনে এগোল ট্রেস জর্ডান, সামান্য দূর দিয়ে ঘুরে, জানে ওর বুলেট লক্ষ্যভেদ করেছে, তবু কোনো ঝুঁকি নিতে চাইছে না।

'মারিয়া ক্রিশ্চিনা?' এবার ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল মারিয়া। 'আমাদের এখুনি রওনা হতে হবে। ওরা এসে পড়বে।' হাত ইশারা করল ও। 'ওর ঘোড়াটা নাও। তোমারটার মত কাহিল হয়নি।'

মরুভূমির বুক চিরে এগিয়ে চলল ওরা। চারিদিকে বালু আর বালু। পাথর, স্পানিশ ড্যাগার, ইউকা, অচোটিও আর ভাঙাচোরা লাভার স্রোত। চন্দ্রালোকিত রাতের আঁধারে অদ্ভুত সব ছায়া তৈরি করেছে ক্যাকটি। এখানে-সেখানে ঝোপঝাড়ের ভেতর নীরবে পথ চলেছে ওরা। জানে ফেরার পথ বন্ধ। আরেকজন সাটন মারা গেছে। ফলে ওদের দেনার বোঝা ভারি হয়েছে।

সীমান্তের দক্ষিণে ঊষর প্রান্তরে তর্জনী নির্দেশ করছে সিয়েরা ডি সান লুইস। ওটা অ্যাপাচি এলাকা। মরুভূমি। উভয়ই প্রাণবধের ক্ষমতা রাখে। এই এলাকায় অসংখ্যবার মার্কিন সেনা পরাস্ত হয়েছে। এটা বুনো শুয়োর আর কয়ৌটির দেশ, র্যাটল সাপ আর বৃশ্চিকের আবাস, প্রিকলি পিয়ার আর চোইয়ার ঠিকানা।

কথা বলছে না ওরা। ভোরের প্রথম আলো ফোটার পর জর্ডান দেখল মারিয়ার মুখ কতটা ক্ষতবিক্ষত হয়েছে, ফুলে গেছে। জীবনে এই প্রথম কাউকে হত্যা করে মনে শান্তি অনুভব করল ও। অথচ কোনো অভিযোগ করছে না মেয়েটা। ঘোড়ার পিঠে ঋজু বসে নাগাড়ে দক্ষিণের বন্ধুর প্রান্তর অভিমুখে এগিয়ে চলেছে। পেছনে তাকাল জর্ডান। দুটো ধুলোর মেঘ উড়তে দেখল।

দুবার, স্বল্প সময়ের জন্য, বিশ্রাম নিল ওরা। প্রতিবারেই ধুলোর মেঘগুলো আগের চেয়ে কাছে দেখাল।

'জায়গাটা চেন?' জিজ্ঞেস করল জর্ডান।

'না।'

'ক্যানিয়ন ডি লস এমবুদোস নামে একটা জায়গা আছে,' বলল জর্ডান। 'নাম শুনেছ?'

'অ্যাপাচিদের আস্তানা।'

'পানি আছে ওখানে,' বলল জর্ডন, 'এবং লুকোনর জায়গা।'

পথ ক্রমশ বন্ধুর হয়ে উঠছে। ঘোড়ায় চেপে আবার এগিয়ে চলল ওরা। কিন্তু মাইল কয়েক যাওয়ার পর, হোঁচট খেতে শুরু করল সাটনের ঘোড়াটা। জর্ডানের লাল ঘোড়া ভাল বিশ্রাম আর খাওয়া পেয়েছে। ফলে দূরত্বটা ওর কাছে কিছু মনে হচ্ছে না।আবার নামল ওরা, হেঁটে এগোল। কিন্তু মুখ থুবড়ে পড়ল সাটনের ঘোড়া, রোদের মধ্যে পড়ে থাকল।

'খাবার আর রাইফেল নিয়ে নাও,' বলল জর্ডান। 'আমরা ওকে রেখে যাব।'

'মারা যাবে তো?'

'না, বেলা পড়ে গেলে নিজেই উঠে দাঁড়াবে এবং পানি খুঁজে নেবে। ততক্ষণে অন্যরাও হয়ত এসে যাবে।'

হেঁটে এগিয়ে চলে ওরা কিন্তু জর্ডানের শক্তি ফিরে আসেনি এখনও, ফলে অল্পক্ষণের মধ্যেই দিগন্ত নাচতে শুরু করল ওর চোখের সামনে, পর্বতমালা তরল পদার্থে পরিণত হল। হাঁটু ভাঁজ করে বসে পড়ল ও। একটু জিরিয়ে রওনা হল আবার, শার্টের কলার ছিঁড়ে চওড়া করে দিল। গান বেল্ট আর পিস্তলের ভারে ব্যথা হয়ে গেছে ঊরুতে।

পেছনে তাকায় ওরা। কোনো ধুলোর মেঘ দেখা যাচ্ছে না। সামনে তাকাল জর্ডান। হাড় জিরজিরে পনির পিঠে তিনজন অ্যাপাচি গম্ভীর মুখে তাকিয়ে আছে ওদের দিকে। রাইফেল তাক করার সময় নেই আর। তাছাড়া, জর্ডান জানে না ওর হাত ভারি অস্ত্রচালনার মত যথেষ্ট শক্তি ফিরে পেয়েছে কিনা।

কালো হ্যাট ব্রিমের নিচে দিয়ে সে তাকাল লোকগুলোর দিকে। মরুভূমির পোড়খাওয়া তিনজন মানুষ। পেশিবহুল শরীরের গঠন এই ভূখণ্ডের মতই, পাথুরে এবং সবল। যেহেতু অ্যাপাচি, ধুলোর মেঘ ওদের নজরেও পড়বে এবং ওরা কৌতূহল বোধ করবে।

হাত ইশারায় পেছনের ট্রেইল দেখাল জর্ডান। 'শত্রু,' বলে, মারিয়া ক্রিশ্চিনার ক্ষতবিক্ষত চেহারার দিকে ইঙ্গিত করল, পিস্তলে হাত রাখল।

ভাবলেশহীন চেহারা ওদের, কালো চোখগুলো জরিপ করছে জর্ডানকে। রোদে পোড়া চেহারা ওর এবং ওই লোকগুলোর মতই শ্যামলা। শুধু চোখজোড়া ধূসর। মারিয়া ক্রিশ্চিনা তাকাল ওদের দিকে, কিন্তু বলল না কিছু। ওর পুরুষ কথা বলছে, আর এই কাজটাও পুরুষদেরই।

'ইনডিও?' মারিয়াকে দেখাল একজন অ্যাপাচি।

জর্ডান অর্ধেকের চিহ্ন দেখাল ইশারায়, তারপর নিজের দিকেও একই ইঙ্গিত করল। এই শেষের কথাটা সত্যি নয়, তবে ওর চেহারার বৈশিষ্ট্য ওই ধরনেরই, এবং এতে কাজ হতে পারে।

মাথায় লাল ফেট্টি অ্যাপাচিটা ঘুরে ইশারায় দূরের পাহাড় দেখাল। 'এমবুদোস,' বলল সে।

'সি,' জবাব দিল জর্ডান। তারপর অ্যাপাচিরা যখন সরে দাঁড়ার পথ থেকে, এগিয়ে চলল ওরা, ধীর গতিতে হেঁটে। একটা নালার আড়ালে যাওয়ার আগে অবধি ওদের কেউই মুখ খুলল না, শব্দও করল না। তারপর চকিতে স্যাডলে চাপল জর্ডান, পেছনে মারিয়াকে বসিয়ে ঝড়ের বেগে ঘোড়া ছোটাল।

ঘণ্টা কয়েক পর, পা ব্যথা করছে ওর, শরীর ভেঙে আসছে, তবু ছোটায় বিরতি দেয় না জর্ডান। ভূখণ্ডের বৈশিষ্ট্য বদলে গেছে এখন। ওরা স্পানিশ ড্যাগার, চোইয়া আর জশুয়ার অদ্ভুত এক জঙ্গলে প্রবেশ করেছে। প্রাচীন লাভা স্রোতের ভগ্নাবশেষ এখানে সেখানে বিভক্ত করেছে জঙ্গলটাকে। ক্যাকটি আর ছড়ান-ছিটান জমাট লাভার কালো চাঁইগুলোর মধ্যবর্তী ফাঁকা জায়গা ভরাট করেছে কাঁটা ঝোপ।

ওদের নিচে পানি আছে। ছোট ঝরনা না, লাভার তর্জনী ঘেরা বিরাট এক জলাশয়। আর ওটাকে ছায়া দিচ্ছে সাইকামোর, অ্যাশ, উইলো এবং বাকথর্ন। জলাশয়ের কিনারে ফাঁকা জায়গায় ছোট ছোট মরা আগুন দেখতে পেল ওরা।

ঘোড়া থেকে নেমে, খাড়া পথ বেয়ে পানির কিনারে নেমে গেল জর্ডান, পেছনে মারিয়া। পাড় ধরে লাভার একটা ঝুলবারান্দা অনুসরণ করে গাছপালার মাঝে ছোট্ট একফালি ফাঁকা জমি আবিষ্কার করল ওরা। উইলোর ঘন পর্দা জায়গাটাকে দৃষ্টি থেকে আড়াল করেছে। ওখানে থামল ওরা। শরীরের শেষ শক্তিটুকু ব্যয় করে স্যাডল খুলে নিল জর্ডান, ঘোড়াটাকে পিকেট করল।

তারপর আর একটিও শব্দ খরচ না করে, টানটান শুয়ে পড়ল এবং তক্ষুণি গভীর ঘুমের অতলে হারিয়ে গেল। ঘুমের ভেতর স্বপ্ন দেখল ও। ঘোড়ার ছুটোছুটি, বন্দুকের গর্জন, আর চোইয়া বনে লাভাখণ্ডের ওপর ওর অন্তহীন পতন।

যখন ঘুম ভাঙল জর্ডনের অন্ধকার ঘনিয়েছে, ঠান্ডা পড়েছে। তবে ওর গায়ে একটা কম্বল চাপান আছে। নাকে লাকড়ির ধোঁয়ার ক্ষীণ গন্ধ পেল সে। চিত হল জর্ডান, উঠে বসল।

'খাবার তৈরি,' ছায়ার ভেতর থেকে বলল মারিয়া ক্রিশ্চিনা। 'আগুনের ধারে।'

টলোমলো পায়ে পানির কিনারে গেল জর্ডান, হাত-মুখ-শরীর ধুয়ে মুছল শার্ট দিয়ে। কম্বলে নিজেকে আগুনের ধারে গেল।

গ্রোগ্রাসে স্যুপ আর টর্টিয়া খেল ও। তারপর রাতের নানা শব্দ শুনতে শুনতে কফিতে চুমুক দিতে লাগল। অদূরে কালো জল চিকচিক করছে জ্যোত্স্নার আলোয়।

'লানত্স কি জানে এই জায়গার হদিস?' জিজ্ঞেস করল ও।

'কী জানি?'

নীরবে একমুহূর্ত বসে রইল ও। 'লোকটা শয়তান...তবে অন্যদের মত অত বদ না।'

ওদের বিশ্রাম প্রয়োজন। ঘোড়ার বিশ্রাম প্রয়োজন। রাতে পথ চলার প্রশ্নই ওঠে না। ওদেরকে ঝুঁকি নিতেই হবে।

কাঁধ অবধি কম্বল টেনে, জর্ডান বসে রইল নীরবে। একবার মাথা তুলে নজর বোলাল চারপাশে। মারিয়া বসে অদূরে, নির্লিপ্ত ভঙ্গি, আকাশের কোলে রেখায়িত অবয়ব। কিছু বলতে নিয়েছিল জর্ডান, তারপর কী মনে করে মত বদলে শুয়ে পড়ল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে নিদ্রার কোলে ঢলে পড়ল ও।

কাঁধের ওপর কম্বল টেনে নিল মারিয়া ক্রিশ্চিনা, একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল পানির দিকে। কিছু বলছে না; কিছু ভাবছে না; এমুহূর্তে ও একজন ইনডিয়ান, নিজের জগতের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য।

পনের মাইল পেছনে এক বালুশিলার ঢালে হাইনডমান ও তার সাঙ্গপাঙ্গ ড্রাই ক্যাম্প করল। দিনটা ছিল ওদের জন্য পরাজয়, উত্তাপ, ধুলোবালু আর কাঁটাঝোপের।

ভোরে জ্যাক সাটনকে পেয়েছে ওরা। গুলি করে হত্যা করা হয়েছে ওকে। জবর গান ফাইট ছিল ওটা। সাটনের পিস্তল ওর হাতের কাছেই পড়ে আছে। একটা গুলিও ছোড়া হয়নি। লাশটার দিকে তাকিয়ে অসুস্থ বোধ করে বাক বেইলেস, আতঙ্কিত বোধ করে। কী ধরনের লোক এই জর্ডান?

মারাত্মক চোট নিয়ে পালিয়েছে। দিন কয়েক পর বেরিয়ে এসেছে গোপন ডেরা থেকে, কোনো ট্রেইল রাখেনি পেছনে, আর এখন হত্যা করেছে জ্যাক সাটনকে। বাক বেইলেস টের পায় তার সাহস উড়ে যাচ্ছে। নিজেকে তার বেত্রাহত কুকুর মনে হয়।

ঠোঁট ভেজাল ওয়েস পার্কার, আড়ে তাকাল হাইনডমানের দিকে। জানে হাইনডমান দমবার পাত্র না। হাইনডমানের এই গুণের সে বরাবর প্রশংসা করে এসেছে। কিন্তু এখন অভিসম্পাত দিল।

বেন হাইনডমান কোনো অনুশোচনা বোধ করে না। আগে বা পরে জ্যাক সাটনকে ওর খুন করতে হত, কিংবা নিজে খুন হত। এখন লোকটা মৃত, ঝামেলা দূর হয়েছে। 'মেয়ে পাগল,' উচ্চকণ্ঠে বলল সে। 'মেয়েটাকে একা থাকতে দিলে, এখন নিজেও বেঁচে থাকত।'

'ওই মেয়ে একটা অভিশাপ,' বাক বেইলেস বলল অভিযোগের সুরে। 'আমাদের সবার মৃত্যুর কারণ হবে। আমি বলি কী, ওকে যেতে দাও, আপদ যাবে।'

বিরক্তি প্রকাশ করল বেন হাইনডমান। 'আমরা মেয়েটাকে যেতে দিতে পারি,' বলল, 'কিন্তু ছেলেটাকে না। সাটন-বেইলেস আউটফিটকে যদি কেউ কলা দেখিয়ে পার পেয়ে যায়, আমরা এক বছরও টিকব না। হয় ওকে হত্যা করব আমরা নয়ত সবাই মরব।'

হাত ইশারায় চারপাশ দেখাল সে। 'আরিযোনা আর নিউ মেক্সিকোতে অন্তত পঞ্চাশটা আউটফিট আছে যারা আমাদের ঘাস চায়। দু-তিনটা দল আছে যারা কাজটা হাসিল করার ক্ষমতা রাখে। যেমন জন স্লটার। সেজন্যই জ্যাক আর মর্টকে ওই রাস্তায় হাঁটতে বারণ করেছিলাম।'

চারজন রাইডারসহ মর্ট বেইলেস যখন এল তখনও ওখানেই আছে ওরা। এরা সবাই কঠিন লোক, নিজেদের স্বার্থেই ট্রেস জর্ডানকে মৃত দেখতে চায়। অকাট্য যুক্তি দেখাল মর্ট। 'ওকে ছেড়ে দিলে, কদিন পর ঠিক ফিরে এসে বদলা নেবে। কেউ না কেউ বলে দেবে ওদের ঘোড়াগুলো আমরাই চুরি করেছিলাম। তখন আমাদের প্রত্যেককে নিকেশ করবে খুঁজে খুঁজে!'

ওদের ভয় সে বোঝে কারণে সে নিজের ভয়ের কথা জানে। এই বিপদ ওরা বুঝবে। জর্ডান কঠিন লোক। জ্যাক সাটনের কথা শোনাটা ওদের জন্য বোকামি হয়েছে। আগুনের পাশে গোল হয়ে বসল ওরা, পরিকল্পনা শুরু করল।

'কোথায় যেতে পারে?' লানত্সকে জিজ্ঞেস করল হাইনডমান।

আগুনে থুতু ফেলল বুড়ো। 'বলা মুশকিল। মেয়েটার ব্যাপারে আন্দাজ করা যায়। কিন্তু এখন জর্ডান নেতৃত্ব দিচ্ছে। ও জানে ও কোথায় যাচ্ছে। এই মরুভূমি আমার জানার বাইরে। হয়ত আশেপাশে গুপ্তস্থান আছে যদি কারও জানা থাকে সেটার কথা।'

কফিতে চুমুক দিল লানত্স। 'একটা কথা ভেবেছ, বেন? এটা অ্যাপাচি এলাকা। ওদের হাতে পড়লে আমাদের কপালে খারাবি আছে।'

'যখনকারটা তখন দেখা যাবে। জর্ডনকে আমরা খুঁজে বের করবই।'

'খড়ের গাদায় সূঁচ খোঁজার চেয়েও কঠিন কাজ,' অভিযোগ করল বাক বেইলেস। 'দশ বছর লাগবে ক্যানিয়নের গোলকধাঁধায় খুঁজে পেতে।'

'চুপ করো!' ধমক দিল বেন। 'ইয়াকব, তুমি বরং আন্দাজ করার চেষ্টা কর কোথায় যেতে পারে ওরা। আমি বরং এই বেলা একটু ঘুমিয়ে নিই।'

থু করে চিবান তামাকের দলা ফেলল লানত্স। 'পাহারা দাও বরং,' বলল সে। 'অ্যাপাচিরা ঘোড়া চুরির চেষ্টা করতে পারে।'

হূষ্টচিত্তে কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ল বাক বেইলেস। এখন আর ক্ষার চায় না সে। চায় বিয়র। জাহান্নামে যাক জর্ডান!

ভোরের আলো ফোটার আগে বিছানা ছাড়ল ট্রেস জর্ডান, ব্রাহ্ম মুহূর্তের ঠান্ডা গায়ে মাখল। কোমরে গানবেল্ট ঝোলাল ও, পায়ে বুট গলাল। আগুন মরে মিহি ছাইয়ে পরিণত হয়েছে। গাছতলা থেকে কিছু শুকনো পাতা আর কার্ল-লিফের মরা ডাল সংগ্রহ করল ও। এগুলোতে ধোঁয়া হয় না।

মারিয়া ক্রিশ্চিনা নিজের জায়গায় গুটিসুটি হয়ে শুয়ে আছে এখনও। নিঃশব্দে ডালগুলো ভাঙল জর্ডান, আগুনে ফেলল। তারপর জলাশয় থেকে পানি ভরে কফির পাত্রটা আগুনের ধারে একটা পাথরের ওপর রাখল গরম করার জন্য।

জায়গাটা বেশ আড়ালে। মূলত চোইয়া জঙ্গলে ঘেরা। কখনও কখনও জাম্পিং ক্যাকটাসও বলা হয় একে, মরুভুমির সবচেয়ে ভয়ঙ্কর উদ্ভিদগুলোর একটি। এছাড়া আছে ক্যাট-ক্ল, অর্গান পাইপ আর কিছু ব্যারেল ক্যাকটি।

নাস্তা তৈরি হওয়ার পর মারিয়ার কাছে গেল জর্ডান, ডাক দেয়ার জন্য সামনে ঝুঁকল। চকিতে চোখ মেলল মারিয়া। ডাগর, কালো, মায়াবি একজোড়া চোখ। এমুহূর্তে ওর অভিব্যক্তি দুর্বোধ্য। হাত বাড়াতে গিয়েও থেমে গেল জর্ডান। 'কফি তৈরি,' বলল।

ওদের চোখ দীর্ঘ এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে রইল একে অপরের ওপর, তারপর শান্ত গলায় মারিয়া বলল, 'ঠিকাছে। আসছি।'

পাখি কথা বলছে গাছের ডালে। ভোরের সুশীতল টাটকা হাওয়ায় জুড়িয়ে যাচ্ছে শরীর। আয়রনউড কলির ক্ষীণ গন্ধ পায় জর্ডান। তবে নিজের ঘ্রাণশক্তিতে ওর সন্দেহ জাগে। ওই ফুলের মরশুম এটা নয়। অবশ্য বহু মরু উদ্ভিদই প্রস্ফুটিত হয় বৃষ্টির সঙ্গে তাল মিলিয়ে, মরশুম অনুসারে নয়।

মারিয়া আগুনের ধারে এল, জর্ডানের বাড়ান কফি কাপটা নিল। ওর চেহারা মলিন। দাঁড়িয়ে আছে পা ঈষত্ ফাঁক করে, কফি কাপটা ধরেছে দুহাতে। 'খুব নির্জন,' হঠাত্ বলল ও।

'হ্যাঁ...জায়গাটা আমার পছন্দ।'

কফি পান করল মারিয়া, নাস্তা খেল। আরও জ্বালানি জড় করল জর্ডান, তারপর ট্রেইল ধরে ঢালের মাথায় উঠে গেল, দিনের আলোয় প্রবেশপথগুলো জরিপ করবে। দু-তিনটে রাস্তায় পৌঁছন যায় পানির কাছে, সবগুলোই পরিষ্কার নজরে পড়ে ওদের ক্যাম্পসাইট থেকে।

চূড়া থেকে চারপাশে এলাকা পর্যবেক্ষণ করল ও। অদূরের মেসা থেকে বিপদ আসতে পারে, তবে ক্যাকটাসের বাধা অতিক্রম করে তেমন কোনো রাস্তা আসেনি এদিকে। ঘোড়ার জন্য ঘাস আছে। দিন কয়েক চলার উপযোগী খাবার আছে ওদের সঙ্গে। ওরা অপেক্ষা করতে পারে।

সন্ধ্যায় উইনচেস্টার হাতে, মেসার ছাতে উঠে গেল জর্ডান, অনেকক্ষণ ধরে জরিপ করল চারদিক। ওখান থেকে কয়েক মাইল অবধি পরিষ্কার দেখতে পায় ও। যখন ফিরে আসার জন্য তৈরি হচ্ছে, দূরে একটা লাল বিন্দু চোখে পড়ল।

চোইয়া বনের বহু বাইরে, সন্দেহ নেই ওটা একটা ক্যাম্পফায়ার। দশ থেকে বারো মাইল দূরে হবে। অপসৃয়মাণ শেষ আলোয় পথ চিনে মেসা থেকে মরূদ্যানে ফিরে এল জর্ডান।

'ওরা ঘাঁটি গেড়েছে ও-দিকটায়,' বলল ও।

'আমরা থাকছি?'

'নড়াচড়া না করলে আমাদের ট্র্যাকও তৈরি হবে না।'

ওদের নিজেদের আগুন নিয়ে চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই। জর্ডান জানে রাতে অনেকদূর থেকে আগুনের আভা দেখা যায় কিন্তু এই ক্যাম্পটা ক্যানিয়নের এত গভীরে এবং গাছপালায় ঘেরা, এমনকি পঞ্চাশ গজ দূর থেকেও চোখে পড়বে না। ওদের জন্য সবচেয়ে ভাল বুদ্ধি, চুপ মেরে অপেক্ষা করা।

আগুনের অদূরে বসে আছে মারিয়া। ওর বিষণ্ন মুখে আগুনের আভা। ফোলা দূর হয়েছে কিছুটা, ক্ষতগুলো রঙ বদলাচ্ছে। তারপর এখন ওকে অচেনা, নিঃসঙ্গ দেখায়।

'কী করবে ভাবছ?' আচমকা প্রশ্ন করে জর্ডান। 'ফিরে যেতে পারবে না।'

কাঁধ ঝাঁকায় মারিয়া ক্রিশ্চিনা।

'আমার সঙ্গে থেকে যাও।'

তাকাল মেয়ে, ওর চোখে রাগ। 'তোমার সঙ্গে? কেন? কেন থাকব তোমার সঙ্গে?'

'তুমি আমার প্রেমিকা, মারিয়া ক্রিশ্চিনা।'

'আমি কারও প্রেমিকা নই।'

'তুমি আমার প্রেমিকা। এটা বিশ্বাস করতে শেখো।'

আগুন চোখে তাকাল মারিয়া, তারপর অবজ্ঞার সুরে বলল, 'আমি কেন তোমার প্রেমিক হতে যাব? তোমাকে সাহায্য করেছি বলে? সেটা তো একটা কুকুরকে ও করি। ঠিক আছে...আমি বিপদে আছি। ওরা আমাকে ঘৃণা করে। সেটা আমিও ওদের করি।'

'আমি তোমাকে যেতে দিচ্ছি না, মারিয়া।'

'আমি থাকব না যাব সে-ব্যাপারে তোমার কিছু বলার নেই।'

বহুদিন হল কোনো নারীসংশ্রব নেই ওর। জর্ডান উপযুক্ত ভাষা খুঁজে পায় না কিন্তু জানে, উপলব্ধি করে অন্তস্তল থেকে, এই নারীর মন জয় করতে হলে তাকে অবশ্যই ভাষা খুঁজে পেতে হবে। অবশ্যই বোঝাতে হবে সে সত্যিই ভালবাসে ওকে, সত্যিই ওকে চায়। ওর মনে নানা চিন্তা আসে, কিন্তু মুখ ফুটে বলতে পারে না। সবকিছুই মনে হয় অন্তঃসারশূন্য, অর্থহীন। জর্ডান শিখছে হূদয়াবেগ যখন গভীর ও শক্তিশালী, ভালবাসার কথা বলা তখন সহজ নয়।

সহসা চোখ তুলল মারিয়া, আগুনের ওপাশ থেকে সরাসরি তাকাল জর্ডানের দিকে। 'আমি এখানে এসেছি বলে তুমি মনে করছ আমি তোমার প্রেমিকা? শোনো...আমি তা নই। তুমি পারবে না আমার সঙ্গে প্রেম করতে।'

মেসার মাথায় চাঁদ উঠেছে। চোইয়া কাঁটাগুলোকে অপার্থিব আলোয় শাদা ফুলের মত দেখায়, বাগানের ফুলের মত অপরূপ শাদা... যেন মৃত্যুর বাগান। একটা বাদুর ডানা ঝাপটে উড়ে গেল কোথাও, পানিতে ছলাত্ করে পড়ল কিছু একটা।

আগুনের এপাশ থেকে মারিয়ার দিকে তাকাল জর্ডান কিন্তু মেয়েটা সাড়া দিল না। হঠাত্ উঠে পড়ল সে, মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে চলে গেল।

'যার যা কাজ তার সেটাই করা উচিত,' মারিয়ার যাওয়া দেখতে দেখতে বলল জর্ডান। 'আমি ঘোড়া চিনি...মেয়েমানুষ হয়ত ততটা না।'

মারিয়াকে আটকাতে চেষ্টা করে না জর্ডান। ও মনে হয় একা থাকতে চাইছে, হয়ত চিন্তা করার জন্য। যাই হোক, নিজের ব্যাপারে সত্যিকথাই বলেছে জর্ডান। রাইফেল হাতে উঠে দাঁড়াল ও, পথের দিকে হাঁটা দিল, জানে না মারিয়া দেখেছে কিনা।

জর্ডান যখন মেসায় উঠল, চোইয়া বন মোলায়েম শাদা মেঘের মত দেখাচ্ছে। তবে ওই মেঘে কাঁটা আছে, চাঁদের আলোয় অদৃশ্য, কিন্তু বেঁধার জন্য প্রস্তুত। জলাশয়ের ধারে উপবিষ্ট মৌন মেয়েটির কথা ভাবল ও। অনেক মেয়ে এসেছে ওর জীবনে; কেউই মারিয়া ক্রিশ্চিনার মত নয়। তারপরও ওর মনে হয় মেয়েটা যেন বুনো ঘোড়া, আদরের হাতকে ভয় পায় অথচ পিঠ চাপড়ানির জন্য উতলা থাকে, কিন্তু কারও বাহুবন্ধনে আবদ্ধ হতে চায় না, প্রতারিত হতে চায় না।

মরুভূমির ওপাশে তাকাল জর্ডান। আগুনটা যেখানেই ছিল, এখন আর নেই...না...আছে ওটা, দূরে চোখ টিপছে থেকে থেকে। ওই আগুনের পাশে শক্ত, কঠিন লোকজন আছে যারা ওকে ধরার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তার আর ওই লোকগুলোর মধ্যে শান্তির কোনো সম্ভাবনা নেই। এটা বাঁচামরার লড়াই। একসময়ে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাবে ওর, এবং তখন রুখে দাঁড়িয়ে অবশ্যই লড়তে হবে।

অনেক চিন্তাভাবনার পর উঠে দাঁড়াল জর্ডান, ট্রেইল ধরে পানির কাছে নেমে গেল। শুধু আগুন জ্বলছে...কোনো সাড়াশব্দ বা নড়াচড়া নেই। আগুনের ধারে যেখানে পেতেছিল সেখানেই পড়ে আছে ওর বেডরোল, কিন্তু মারিয়া ক্রিশ্চিনার-টা দেখা যাচ্ছে না কোথাও।

নিস্তব্ধতার মাঝে মেয়েটার নাম ধরে ডাকল সে...উত্তর নেই। আবার ডাকল ওর নাম, এবার আগের চাইতে জোরে, ভয়ে বুক কাঁপছে।

কোনো সাড়া নেই, কিছুই না...

দ্রুত ওর শয্যা-পাশে গেল জর্ডান। বিছানা আছে কিন্তু মারিয়া নেই। জোরে ওর নাম ধরে ডাকল জর্ডান, প্রতিধ্বনি উঠল কেবল। পানির কিনারে গেল ও। কী একটা চোখে পড়ল...আয়রনউডের ডালে ছেঁড়া কাপড়ের টুকরো।

প্রমাণ সাইজের টুকরো, যেন নিশানা হিশেবে ইচ্ছে করে জড়িয়ে দিয়েছিল মারিয়া।

দুটো পথ গেছে ওইদিকে। কাছেরটা ধরল জর্ডান, প্রার্থনা করছে যেন ওর অনুমান ঠিক হয়। পাহাড়ের শীর্ষে দৌড়ে গেল ও, থমকে দাঁড়াল। চাঁদের আলোয় সবকিছু অবারিত, ধবধবে। কোথাও কোনো প্রাণের চিহ্নমাত্র নেই।

তারপর, হঠাত্, দূরে একটা চাপা আর্তচিত্কার শুনতে পেল জর্ডান।

ক্ষীণ আওয়াজ...হারিয়ে গেল, সমস্ত ইন্দ্রিয় শক্তি একত্র করে কান পাতল সে। আবার শুনতে পেল শব্দটা, নারীকণ্ঠ, সাহায্যের জন্য চিত্কার করছে।

বাধা, অ্যামবুশ কোনোকিছুর তোয়াক্কা করল না জর্ডান, দৌড়ে নেমে গেল নিচে, প্রায় একশ গজ যাওয়ার পর গতি মন্থর করে কান পাতল আবার।

কোনো শব্দ নেই...থাকবেও না। কাজটা কোনো শ্বেতাঙ্গের নয়। কোনো শ্বেতাঙ্গের পক্ষে এরকম নিঃশব্দে একটি মেয়েকে তুলে নেয়া সম্ভব নয়। এটা কোনো অ্যাপাচির কাজ...কিংবা অ্যাপাচিদের। সম্ভবত যে-তিনজনের সঙ্গে ওদের দেখা হয়েছিল ট্রেইলে, তাদের কাজ, কারণ ওদের জানা আছে জর্ডানদের গন্তব্য।

আর অ্যাপাচিদের পক্ষেই একমাত্র সম্ভব এমন নিঃশব্দে কাজ সারা। ওরা শৈশব থেকেই মরু যুদ্ধের ট্রেনিং পায়।

হঠাত্, মরুভূমিতে অনেকগুলো ঘোড়ার ছুটন্ত খুরের শব্দ পেল জর্ডান, ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে। আর একমুহূর্ত দেরি করল না ও, দৌড়ে ফিরে এল নিজের ঘোড়াটার কাছে, মিনিট খানেকের মধ্যে সব গুছিয়ে নিয়ে পথে নামল।

একটু খুঁজতেই ইনডিয়ানদের ট্রেইল পেয়ে গেল জর্ডান। ট্র্যাক গোপনের কোনো চেষ্টাই করছে না ওরা। যে-কোনো সময়ে অ্যামবুশের চেষ্টা করতে পারে, তবে জর্ডান অনুমান করে সেরকম কিছু হবে না, কারণ ওর ধারণা দলটা বড়জোর তিন কি চারজনের। বেশ কিছুদূর যাওয়ার পর, দুবার নামল ও, ট্রেইল পরীক্ষা করল। ওই জায়গায় প্রান্তর অতটা ভাঙাচোরা না হওয়ায় সহজেই ঘোড়ার খুরের ছাপ খুঁজে পেল। চাঁদ ডুবে যাওয়া অবধি নাগাড়ে এগিয়ে চলল সে, যখন বুঝল অন্ধকারে আর ঠাহর করতে পারবে না ট্রেইল তখন থামল।

ঘোড়া থেকে নেমে কয়েকটা সিগারেট বানাল ও, একর পর এক টানতে লাগল। ভোর হওয়ার আগের একটা ঘন্টা অন্তহীন মনে হয় ওর কাছে, ভেতরে ভেতরে ছটফট করতে থাকে ওর প্রেমিকা, মারিয়া ক্রিশ্চিনার জন্য। অবশেষে যখন রাঙা হল আকাশ, ট্র্যাকগুলো পরিষ্কার দেখতে পেল জর্ডান। চারটা ঘোড়া, সবগুলোই খালি পা। একটায় দুজন আরোহী।

বিশ্রাম পেয়ে পথে নামার জন্য মুখিয়ে ছিল বিগ রেড। ইঙ্গিত পাওয়ামাত্র বিদ্যুত্গতিতে ছুটল, একেক কদমে অনেকটা জায়গা অতিক্রম করছে। বেলা বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলে গরম। ঘাম আর ধুলোয় বিচিত্র নকশা তৈরি হয়েছে ঘোড়া গা আর জর্ডানের শার্টে। দুবার স্বল্প সময়ের জন্য ঘোড়াটাকে বিশ্রাম দিল সে।

রাস্তা ফুরোতে চায় না কিন্তু কোনোদিকে ভ্রূক্ষেপ নেই জর্ডানের। ভুলে গেছে ওর অনুসরণকারীদের কথা। শুধু একটই চিন্তা এখন মাথায়: যেভাবেই হোক সামনের লোকগুলোর কবল থেকে উদ্ধার করতে হবে মারিয়াকে।

ক্রমশ তাজা ট্র্যাকের সন্ধান পাচ্ছে ও। এর অর্থ, ওদের মধ্যে ব্যবধান কমে আসছে, সেটা যত সামান্যই হোক না কেন।

খিদে পেয়েছে ওর কিন্তু থামল না, চলতির ওপর যা পারে মুখে পুরল থলে থেকে নিয়ে। ঘোড়াটা কাহিল বোধ করছে এখন, তবে মালিকের তাড়াও বুঝতে পারছে। এটা ঘাস খাওয়া ক্ষুদ্রকায় অ্যাপাচি পনিগুলোর চেয়ে সবল, ব্যবধান কমিয়ে আনছে।

একবার পেছনে তাকাল জর্ডান। মনে হল গলা শুকিয়ে আসছে শঙ্কায়। ওর পেছনে ধুলোর মেঘ।

ও চলতে শুরু করার পর ট্রেইল ধরতে ওরা একমুহূর্ত অপচয় করেনি। এখন চালাকির সময় নেই। এখন তাকে শুধু ছুটতে হবে।

দূর-সামনে ধুলো দেখতে পেল জর্ডান। ধুলোর একটা রেখা, দ্রুতই মিলিয়ে গেল। ঘোড়া দাবড়ে ফাঁকায় বেরিয়ে এল ও, সামনে দেখতে পেল ওদের। তিনটে পনি, জোরগতিতে ছুটছে। তিনটে...?

সময় থাকতে ঘোড়ার মুখ ঘোরাল জর্ডান। সামনে মাত্র তিন ঘোড়সওয়ার এই উপলব্ধি তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। ও যখন ঘোড়া ঘোরাচ্ছে ঠিক সেই মুহূর্তে একটা বুলেট শিস্ কেটে বেরিয়ে গেল ওর মাথার পাশ দিয়ে। তারপর ও দেখল অ্যাপাচিটা তার ঘোড়ার দিকে দৌড়ে যাচ্ছে। এক হাতে উইনচেস্টার ওঠাল জর্ডান, গুলি করল।

পলায়নপর লোকটার সামনে ধুলো ওড়ার বুলেট। বিগ রেডের পাঁজরে স্পার দাবিয়ে লোকটাকে তাড়া করল জর্ডান, একই সময়ে লেভার টেনে রিলোড করে নিয়েছে রাইফেলটা।

মরিয়া হয়ে নিজের ঘোড়ার কাছে পৌঁছাতে চেষ্টা করল অ্যাপাচিটা, চলতির ওপর ঘুরে গুলি করল। বেশি তাড়াহুড়ো করায় লক্ষ্যভ্রষ্ট হল সে, পরক্ষণে বিগ রেড চড়াও হল লোকটার ওপর, কাঁধের ধাক্কায় পেড়ে ফেলল মাটিতে।

গতি না কমিয়ে সামনে এগোল জর্ডান, তবে আগে নিশ্চিত করল অ্যাপাচির পনিটা ভয় পেয়ে পালিয়েছে।

ছড়িয়ে পড়ল সামনের অ্যাপাচিরা, একেকজন একেক দিকে দিকে ছুটল। নিশ্চয় ওর পেছনের লোকগুলোর অস্তিত্ব টের পেয়েছে ওরা, নইলে ঘুরে দাঁড়িয়ে লড়ত। একটা পনির পিঠে দুজন আরোহী। ওই ঘোড়ার পেছনে ছুটল জর্ডান। তাড়া করছে সে, কিন্তু পাশাপাশি এটাও চিন্তা করছে মেয়েটাকে ওরা হত্যা করবে নাতো?

হঠাত্ ধ্বস্তাধ্বস্তি শুরু করল মারিয়া, চকিতে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে চলন্ত ঘোড়া থেকে ঝাঁপ দিল মাটিতে। বালুতে আছড়ে পড়ল ও, তারপর ধোপার বস্তার মত গড়িয়ে কিছুদূর গিয়ে থামল।

ঘুরে অ্যাপাচিটা ধরতে এল ওকে। চকিতে ওদের দুজনের মাঝখানে হাজির হল জর্ডান। অ্যাপাচিটা রাইফেল ঘোরাল ওর উদ্দেশে, কিন্তু জর্ডান পাশ কাটিয়ে বাট দিয়ে আঘাত করল লোকটার মাথায়। মাটিতে পড়ে গেল লোকটা, একটা গড়ান দিয়ে উঠেই ছুরি বের করল। আর দেরি করল না জর্ডান। খুব কাছ থেকে একগুলিতে খতম করল ওকে। তপ্ত শাদা রোদে হাত-পা ছড়িয়ে পড়ে রইল বাদামি শরীরের লোকটা।

কপালের ঘাম মুছল ট্রেস জর্ডান। বাকি ইনডিয়ানগুলোর ছায়ামাত্র নেই। ঘোড়া থেকে নেমে মারিয়া ক্রিশ্চিনার দিকে এগোল ও।

ইতিমধ্যে উঠে দাঁড়িয়েছে মারিয়া, দেখছে জর্ডানকে। ওর সারা মুখে ধুলো, বাতাসে চুল উড়ছে। কিছু চুল কপোলে এসে পড়ল। ওর হাত বাঁধা, ব্লাউজ সামান্য ছেঁড়া, সেখানে স্তনের ঈষত্ আভাস, কিন্তু মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, অপেক্ষা করছে জর্ডানের জন্যে।

ওর বাঁধন কেটে দিল সে। মুহূর্তের জন্য ওরা দাঁড়িয়ে রইল মুখোমুখি, দুজোড়া চোখ স্থির একে অপরের ওপর। মারিয়াকে আলিঙ্গন করতে যাচ্ছিল জর্ডান কিন্তু চকিতে পিছিয়ে গেল মেয়েটা, চোখগুলো সন্ত্রস্ত পশুর মত বস্ফািরিত। 'না!...না!...'

নিজেকে গুটিয়ে নিল জর্ডান। তারপর ঘুরে নিজের ঘোড়া আর একটা অ্যাপাচি পনি নিয়ে এল। বিনাবাক্যব্যয়ে পনিটার পিঠে চাপল মারিয়া, ইনডিয়ানের ব্ল্যাংকেট স্যাডলে বসল। জর্ডান দেখল ইনডিয়ানটার উইনচেস্টার আর গোলাবারুদ সঙ্গে নিয়েছে মারিয়া। কার্তুজের বেল্ট কাঁধের ওপর ঝুলিয়েছে।

ওদের পেছনে ধুলোর মেঘ কাছে এসে পড়েছে। জর্ডানের মনে হয় ধুলোর ভেতর দিয়ে অবয়বগুলোকেও দেখা যাচ্ছে।

রওনা হল ওরা, তবে দ্রুতগতিতে নয়। পেছনের ঘোড়াগুলো অনেকটা পথ এসেছে, কোনো অবস্থাতেই জোরকদমে ছুটতে পারবে না। এই সুযোগে জর্ডানের ঘোড়াটা প্রয়োজনীয় বিশ্রাম পেয়ে যাবে।

ওরা এখন উত্তরে যাচ্ছে। সময়ের চেয়ে এগিয়ে ভাবছে জর্ডান। এখনও এটা মেহিকো তবে অ্যারিযোনা সীমান্ত ওদের উত্তরে এবং ওরা সাটন-বেইলেস র্যাঞ্চের ষাট-সত্তর মাইল পশ্চিমে সীমান্তে পৌঁছুবে। ওরা যদি একটা শহরে, যেকোনো শহরে পৌঁছুতে পারে যেখানে শেরিফ আছে...

কিন্তু কোনো শহর নেই। অন্তত সাহায্য মেলে এমন। টবাক আরও পশ্চিমে, আর টুসান এবং টুমস্টোন দূর-উত্তরে। ওদের সেরা সম্ভাবনা সান বারনার্দিনো স্প্রিংসে জন স্লটারের র্যাঞ্চ। হয়ত সময় থাকতে ওখানে পৌঁছুতে পারবে ওরা। জন স্লটারের কাছে আশ্রয় চাইতে পারবে। তাঁকে ঘাঁটাবার সাহস পাবে না কেউ, এমনকী সাটন আউটফিটও নয়।

ওদের পেছনে অশ্বারোহীরা আলাদা হয়ে গেছে। বেশি জায়গা নিজেদের নাগালের মধ্যে রাখার জন্য ছড়িয়ে পড়েছে। এবং ব্যবধান কমিয়ে আনছে।

সহসা একটা আইডিয়া এল জর্ডানের মাথায়। কোনোকম যুক্তি-তর্কের তোয়াক্কা না করেই এসেছে ওটা, ভীষণ ঝুঁকিপূর্ণ এবং কিছুটা নির্বোধও বটে। নিজের সুস্থতা নিয়ে মুহূর্তের জন্য সন্দেহ জাগল ওর, এতটাই বিপজ্জনক কাজটা। তবে বিপক্ষ ছড়িয়ে পড়ায়, কৌশলটায় কাজ দেয়ার সম্ভাবনা আছে।

ডাইনে-বাঁয়ে তাকাল ও, কিছু ঘন ঝোপ দেখতে পেয়েছে। ধাওয়াকারীরা চোখের আড়াল হতেই, দ্রুত মাটিতে পিছলে নেমে গেল ও, ঘোড়াটাকেও শুইয়ে ফেলল। মারিয়া ক্রিশ্চিনা আসতে আসতে বিগ রেডের চোখে জর্ডান পট্টি বেঁধে ফেলেছে। মারিয়া যখন দেখল কী করেছে জর্ডন, তখনও সেও অনুগামী হল। এরপর ঝটিতি কিছু আগাছা দিয়ে ঘোড়াগুলোকে আড়াল করল ওরা। তারপর নিজেরা শুয়ে রইল ঝোপের কিনারে। বিগ রেড কাঁপছিল কিন্তু জর্ডান আর মারিয়ার অভয়-জাগান কণ্ঠস্বরে দুটো ঘোড়াই শান্ত রইল, যদিও হঠাত্ করে অন্ধ হয়ে যাওয়ায় ভয় পাচ্ছে।

ভীষণ পরম পড়েছে। মাটি থেকে ভাপ উঠছে। যদি ভুল সময়ে একটা ঘোড়া নড়ে ওঠে তাহলেই চিত্তির। তবে আকস্মিক অন্ধকার ওদের নিশ্চল রাখল।

ওদের নিচে পুরু ধুলো। পিস্তল হাতে অপেক্ষা করছে জর্ডান। ওর কপাল বেয়ে ঘাম গড়াচ্ছে। জানে, যদি একজন ঘোড়সওয়ারও বেশি কাছে চলে আসে, ওদের এই আড়াল যথেষ্ট হবে না। ঘোড়ার গন্ধ লাগছে নাকে। সঙ্গে নিজের ঘাম আর আধোয়া জামাকাপড়ের গন্ধ। আর এগুলোর সঙ্গে জড়াজড়ি করে জংলী ফুলের সুবাস। এবার আগুয়ান ঘোড়ার শব্দ পেল ওরা।

একসঙ্গে দুটো ঘোড়া আসছে, বুঝল, এবং ওগুলো খুব কাছে এসে পড়েছে। স্নায়ু টানটান হয়ে গেল জর্ডানের, তৈরি যেকোনো মুহূর্তে গোলাগুলি শুরু হওয়ার জন্যে। একটা ঘোড়া হেঁটে আসার শব্দ পায় ও। বিগ রেডের গায়ে অভয়ের হাত রাখল জর্ডান।

অশ্রাব্য খিস্তি করল একটা লোক, ওর চ্যাপস ঘষা খাচ্ছে ঝোপঝাড়ের ডালে। সবচেয়ে কাছের জন চেঁচাল, 'কিছু দেখতে পেলে?'

'নাহ!' সামান্য দূরে, আরেক পাশ থেকে জবাব এল। 'সামনের ক্যানিয়নে চলো।'

ওদের আড়াল আদৌ যথেষ্ট নয়। কিন্তু ধাওয়াকারীরা এটা প্রত্যাশা করছে না, তাই সবসময়ে সামনে তাকাচ্ছে।

জর্ডানদের পেরিয়ে গেল রাইডাররা। ঘোড়া হেঁটে যাওয়ার শব্দ পেল ওরা। একটা ক্যানটিনের ছিপি খোলার এবং ঘোড়সওয়ারের কুলিকুচি করার শব্দ পেল।

নিঃসাড়ে পড়ে রইল ট্রেস জর্ডান। মনে মনে ধীরলয়ে পঞ্চাশ গুনছে। খানিকবাদে যখন সাহস করে গলা বাড়িয়ে উঁকি দিল ও, কেবল একজন অশ্বারোহীকে দূরে দেখতে পেল। অন্যরা নিশ্চয় ক্যানিয়নের ভেতরে খুঁজছে। দ্রুত উঠে দাঁড়াল ওরা, ঘোড়া দুটোর চোখের পট্টি খুলে দিয়ে ওগুলোকেও দাঁড় করাল।

সমকোণে ঘুরে পশ্চিমে ছুটল ওরা, তারপর আবার উত্তরে ঘুরল, নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে সম্ভাব্য সব ধরনের কৌশল অবলম্বন করছে। শিগগিরই ইউকা বনে ঢুকে পড়ল ওরা, এবং যখন বনের অনেকটা ভেতরে চলে এল তখন আর পেছন থেকে ওদের দেখা যাওয়ার উপায় রইল না।

বড়জোর সামান্য নিশ্বাস ফিরে পাওয়ার ফুরসত পেয়েছে ওরা। কোনো ট্র্যাক না পেয়ে লানত্স অচিরেই খুঁজতে শুরু করবে আবার। ব্যাক ট্রেইল করে ঝোপগুলো আবষ্কাির করবে, ওগুলোর নিচে ট্র্যাক দেখতে পাবে। জর্ডানের হাসি কান স্পর্শ করল, কল্পনায় বুড়ো ট্র্যাকারের বিরক্তি দেখতে পাচ্ছে। তবে বড়জোর এক ঘণ্টা এগিয়ে আছে ওরা, কিংবা আরও কম হতে পারে।

পাঁচ

প্রায় একমাইল পথ গোড়ালি-ভেজা পানির ভেতর দিয়ে এগোল ওরা, তারপর একটা পাথুরে জায়গায় পৌঁছুল যেখানে পানির গভীরতা খুব বেশি হলে দুই ইঞ্চি। নামল ওরা, হেঁটে এগোল, পায়ের পাতায় শীতল জলের পরশে আরাম বোধ করছে।

যেখানে ক্যানিয়নে প্রবেশ করেছিল সেখান থেকে প্রায় দশ মাইল দূরে একটা বেরোবার রাস্তা পেল ওরা, এবং সুযোগটা গ্রহণ করল। দেয়ালের ওপরে উঠল সাবধানে। রিমের মাথায় পৌঁছে, স্যাডল থেকে নামল জর্ডান, প্রচুর সময় নিয়ে এলাকাটা জরিপ করল।

চারদিকেই উন্মুক্ত, ঊষর প্রান্তর। ছড়ান-ছিটান পাথর আর ক্যাকটি, মেসকিট ঝোপ, মাটি ফুঁড়ে ভাঙা পা আকাশপানে তাকিয়ে আছে।

সতর্ক পায়ে এগোল ওরা। জর্ডানের চেহারায় অবসাদের ছাপ। মুখের ভাঁজে ভাঁজে ধুলোর আস্তর। চোখগুলোর কোটরের ভেতর কট্কট্ করছে। একধরনের ঘোরের ভেতর পথ চলছে ও। আধা কদম পেছনে স্যাডলে নেতিয়ে বসে আছে মারিয়া ক্রিশ্চিনা। ওর ঘোড়াটা যে-কোনো মুহূর্তে পড়ে যেতে পারে, এতই কাহিল। ওদের বিশ্রাম দরকার। খাবার দরকার। শক্তি ফিরে পাওয়ার জন্য সময় দরকার। ঘোড়াগুলোর জন্য দানা দরকার।

হাড়গিলে চেহারার ঝোপটা প্রথম দেখায় মোটেও প্রভাবিত হল না জর্ডান। এ ধরনের আরও পঞ্চাশটা ঝোপ পথে ফেলে এসেছে ওরা। প্রায় এক একর জায়গা জুড়ে ঝোপটা। তবে যেটা ওর নজর কাড়ল সেটা একটা অবতল জমি, ঝোপের এক কিনারে। কাছে গেল ও। আগাছায়-ছাওয়া গর্ত ওটা, মাঝখানে একফালি ফাঁকা জায়গা। তেমন আড়াল নেই, তবে হঠাত্ করে বোঝা যায় না ওখানে আশ্রয় থাকতে পারে। অবতল জমির তলদেশে ক্ষীণধারা ঝরনাও আছে একটা।

আগুন জ্বালবার প্রশ্নই ওঠে না। আপাতত ধাওয়াকারীদের চোখে ধুলো দিয়েছে ওরা। কিন্তু এই নির্জন জায়গায় সামান্য ধোঁয়াও বিপদ ডেকে আনতে পারে। ওদের কাছে খাবার-দাবার তেমন অবশিষ্ট নেই। সামান্য কফি আর জার্কি আছে কেবল।

ঝোপের কিনারে গিয়ে দাঁড়াল মারিয়া ক্রিশ্চিনা, মরুভূমির দিকে তাকাল, দুশ্চিন্তায় ভারি হয়ে আছে মন। জানে, এখনও পুরোপুরি স্বাধীনতা লাভ করেনি ওরা। শত্রুপক্ষকে সাময়িক দেরি করিয়ে দিতে পেরেছে মাত্র। বেন হাইনডমান যে-কোনো মুহূর্তে বুঝে যাবে কী করেছে ওরা এবং তখন ওদের পিছু নেবে আবার।

যত দেরি করিয়ে দিতে পারে ততই লাভ, যদিও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ওরা।

মারিয়া ক্রিশ্চিনা সঙ্গে আছে তাই, নইলে ট্রেস জর্ডান এভাবে পালাত না। সে এখন অনেকটাই সেরে উঠেছে। একা থাকলে এই অবস্থায় নিশ্চিতভাবেই রুখে দাঁড়াত, এবং শত্রু নিধনে মনোযোগী হত। পলায়নের পরিবর্তে লড়াইটা শত্রুর কাছে নিয়ে যেত। কিন্তু এখন তাকে মারিয়া ক্রিশ্চিনার নিরাপত্তার কথা ভাবতে হচ্ছে আগে।

'তুমি বরং ঘুমিয়ে নাও,' ঝোপের কিনার থেকে মারিয়া ফিরে আসার পর পরামর্শ দিল জর্ডান। 'আমি পাহারায় থাকছি।'

'তুমি ঘুমাও...আমি পাহারা দিচ্ছি।' মারিয়া তাকাল ওর চোখের দিকে, নিরাসক্ত দৃষ্টি। 'আমি তোমাকে তুলে দেব।'

অবসাদে ভেঙে আসছিল শরীর, তবু দ্বিধা করে জর্ডান। অবশ্য মারিয়াকে দেখে মনে হয় ও এখন ঘুমের মেজাজে নেই। স্যাডল থেকে বেড রোল নামাল জর্ডান, বিছানা পেতে শুয়ে পড়ল এবং প্রায় তক্ষুনি ঘুমিয়ে পড়ল।

কাঁধে একটা হাতের আলতো স্পর্শে জেগে গেল জর্ডান। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। কোনো তারা নেই আকাশে। দামাল হাওয়া বইছে। থেকে থেকে বিজলি চমকাচ্ছে।

'কিছু দেখতে পাচ্ছি না আমি। একটু আরাম করি।'

'ঠিক আছে।' পায়ে বুট গলাল জর্ডান, মাটিতে ঠুকে বসিয়ে নিল জায়গামত। 'ঝড় আসছে মনে হয়।'

'সি।'

জর্ডানের মুখে বালুর ঝাপটা লাগছে। টুপিটা টেনে ভালমত বসাল মাথায় যাতে বাতাসে উড়ে না যায়। কোমরে গানবেল্ট জড়াল।

পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল মারিয়া, চকিতে হাত বাড়িয়ে ওকে কাছে টেনে আনল জর্ডান। এক ঝটকায় হাতটা সরিয়ে দিয়ে নিজের পথে চলে যাচ্ছিল মারিয়া। কিন্তু আকস্মিক কামনার উত্তাপে অস্থির জর্ডান ধরে ফেলল ওকে এবং আলিঙ্গন করল।

লড়তে শুরু করল মারিয়া। হঠাত্ ওর শরীর একরাশ ইস্পাতের দড়ি হয়ে উঠেছে। পিছু হটল ও, ছাড়া পাওয়ার জন্য প্রাণপণে লড়ছে। জর্ডান ওর মুখখানা ধরে নিজের দিকে ফেরাল।

বিজলি চমকাল দূরে। সেই আলোয় জর্ডান দেখল মারিয়ার চোখ বস্ফািরিত, ঠোঁটজোড়া ঈষত্ ফাঁক। ধীরে ধীরে মুখ নামিয়ে আনতে শুরু করে জর্ডান, কপালের দুপাশের রগদুটো কাঁপছে তিরতির। আচমকা ওর পেছনের চুল খামচে ধরল মারিয়া, মুখ দিয়ে সজোরে আঘাত করল ওর মুখে। তারপর খামচি বসাল জর্ডানের হাতে, চড় মারল দুই গালে। কোণঠাসা বেড়ালের মত পিছিয়ে গেল ও, ঝোপের কিনারে গিয়ে দুপায়ের পাতায় ভর দিয়ে রুখে দাঁড়াল।

'ছোঁবে না আমাকে! আমার কাছে আসবে না! আমি তোমাকে খুন করব!'

মুহূর্তের জন্য জর্ডান একটা তাগিদ অনুভব করল ওকে আবার বুকে টেনে নেওয়ার, কিন্তু পরক্ষণে মত বদলাল। মেয়েটা ফালতু হুমকি দেয়নি। সম্ভব হলে সত্যি খুন করবে ওকে যদি সে জোর খাটাতে চায়।

'যেমন মর্জি তোমার।' রাইফেল তুলে নিল জর্ডান, ঝোপের উদ্দেশে পা বাড়াল। মাঝপথে গিয়ে ঘাড় ফেরাল ও, হাসছে। 'তবে একটা কথা বলতেই হবে আমাকে...কিছু সময়ের জন্য কিন্তু তুুমি সত্যিই উপভোগ করেছ ব্যাপারটা।'

'তুমি একটা পশু...আমি তোমাকে ঘৃণা করি।'

'তুমিও পশু,' বলল জর্ডান, হাসছে শব্দ করে, 'আর আমার এরকমই পছন্দ।'

'আমাকে সস্তা মেয়েমানুষ মনে করো।'

'সেরকম কিছুই মনে করি না। বরং মনে করি তুমি একটা চমত্কার মেয়ে, যদিও স্বভাবে বুনো মাস্ট্যাং।'

নিকষ কালো রাত। পাগলা হাওয়া বইছে। দূরের বিজলি চমকে মরুভূমি ভৌতিক দেখাচ্ছে। দূর-ক্যানিয়নে মেঘ গুড়গুড় করছে। বাতাসে ঝরা পাতা উড়ছে। দমকা হাওয়া ঝোপের গায়ে আছড়ে পড়ছে।

ঝোপের প্রান্ত থেকে সামান্য তফাতে বসল জর্ডান। বিজলির আলোয়ও ওকে দেখা যাবে না ওখানে।

বাতাস বাড়ছে...ধুলোর ঝাপটা লাগছে ওর মুখে। বৃষ্টি হচ্ছে পাহাড়ে। শিগগিরই পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে যাবে পথ। ক্যানিয়নে তলদেশে কুড়ি ফুট পানি দাঁড়িয়ে যাবে।

বৃষ্টি পড়ল একফোঁটা, তারপর আরেক ফোঁটা। ঘোড়ার কাছে গিয়ে স্লিকার বের করল জর্ডান, গায়ে চাপাল নিজেরটা, তারপর মারিয়ার কাছে গিয়ে একটা পনচৌ দিয়ে ঢেকে দিল ওকে। আর ঠিক তখুনি কিজলি চমকাল এবং বাজ পড়ল কোথাও।

ক্ষণিক আলোয় জর্ডান ওর মুখ দেখতে পেল। দৃশ্যত ঘুমোচ্ছে মেয়েটা। খানিক আগের ভয়ঙ্কর ক্রোধ, আকস্মিক নিস্পৃহতা, সব বিদায় নিয়েছে। অনিন্দ্যসুন্দর লাগছে ওকে। ঠিক ম্যাডোনার মত।

ঝুঁকে হাত বাড়াল জর্ডান, ওর চুল স্পর্শ করল। কী কালো...কী মসৃণ কালো। যেন মাকড়সার জালে আটকা-পড়া মধ্যরাত। একটা চুল আঙুলের ফাঁকে ধরে রাখল জর্ডান, তারপর আলগোছে ওটা জায়গামত রেখে, রাইফেল হাতে ফিরে এল ঝোপের ধারে। অন্ধকারে জর্ডান দেখতে পায়নি ও যে-চুলটা ধরেছিল, মারিয়া হাত উঠিয়ে ধরল সেটা। অন্ধকারে ও এটাও দেখতে পায়নি যে মারিয়া ওর দিকে তাকিয়ে ছিল ডাগর চোখে।

থেমে থেমে মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে, সাথে দমকা হাওয়া। ঘণ্টা দুয়েক ঝোপের কিনারে ঠায় বসে রইল জর্ডান। এখানে-সেখানে বিজলি চমকাচ্ছে। সেই আলোয় মরুভূমির ওপর নজর রাখছে ও। হঠাত্ ও টের পেল প্রকৃতি ঠান্ডা হয়ে এসেছে আগের চেয়ে। সামনে তাকাল ও, দেখল বৃষ্টির এক বিশাল দেয়াল মরুভূমির ওপর দিয়ে ধেয়ে আসছে ওদের দিকে। চকিতে উঠে দাঁড়াল জর্ডান, ঘুরে ক্যাম্পের পথ ধরল।

বিছানা গোটাচ্ছিল মারিয়া ক্রিশ্চিনা। জর্ডানের পাশ দিয়ে দূরে তাকাল ও, জিজ্ঞেস করল, 'আমরা রওনা হচ্ছি, না?'

'হ্যাঁ...দেরি করলে আটকা পড়ে যেতে পারি।'

সারা রাত ঝড় ফাঁকি দিয়ে ছুটে চলল ওরা। দুজায়গায় দুটো গভীর নালা পেরোল বানের জল ওগুলোকে ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়ার মুহূর্তেক আগে।

অকস্মাত্, সামনে, বিরাট গর্জন শুনতে পেল ওরা। দেখল, পানির প্রবল তোড়ে ভেসে যাচ্ছে একটা ক্যানিয়নের মেঝে। ওই ক্যানিয়ন অতিক্রম করা কোনোভাবেই সম্ভব না। পানি জায়গাবিশেষে দশ থেকে চল্লিশ ফুট উঁচু হবে। কোনো ঘোড়াই ওই তীব্র স্রোতে সাঁতরাতে পারবে না।

বিজলি চমকাল। মারিয়া ক্রিশ্চিনার কাঁধ আঁকড়ে ধরল ট্রেস জর্ডান, ইশরায় কতগুলো পাথরচাঁই দেখাল। ওগুলোর দিকে এগোল ওরা, ঝড়ের দিকে পিঠ-ফেরান একটা ঝুলবারান্দা পেল।

ঝুলবারান্দার নিচে আশ্রয় নিল ওরা, বৃষ্টি আর বাতাসের ঝাপটার বাইরে। জর্ডান দোল খেয়ে নামল ঘোড়া থেকে, মারিয়াকে নামতে সাহায্য করল। তারপর ঝুলবারান্দার পেছনের দিকে একটা মরা সিডার গাছের সঙ্গে ঘোড়া দুটোকে বেঁধে রাখল ও।

সামনে উন্মুক্ত প্রান্তরে আছড়ে পড়ছে বৃষ্টি, বাতাস কনকনে। আড়ে মারিয়া ক্রিশ্চিনার দিকে তাকাল জর্ডান। দেখল মেয়েটা শীতে ঠক্ঠক্ করে কাঁপছে। হাঁটু থেকে ওর পায়ের নিচের অংশ ভিজে জব্জব্ করছে।

এ অবস্থায় ঝুঁকির তোয়াক্কা করল না জর্ডান। কিছু শুকনো ডালপালা জড় করে আগুন জ্বালল। তারপর ওই আগুনের কোল ঘেষে দুজনেই বসল।

'তুমি আমাকে বলনি, কেন তুমি বব সাটনকে খুন করেছ,' যেন কথার পিঠে কথা বলছে এভাবে কৌতূহল ব্যক্ত করল মারিয়া।

সময় নিয়ে সব ঘটনা খুলে বলল জর্ডান। জিমি হেনডার্সন আর ওদের ঘোড়ার কথা ব্যাখ্যা করল। বলল কীভাবে ঝড়-তুফান-রোদ মাথায় করে ঘোড়াগুলোকে ওরা জড় করেছিল, পোষ মানিয়েছিল, ব্র্যান্ডিং করেছিল। নিজেদের ব্যবসা শুরু করতে চেয়েছিল ওরা। কিন্তু সাটন আউটফিট জনিকে হত্যা করে ঘোড়াগুলো লুট করেছে।

'নিশ্চয় জ্যাক সাটনের কাজ,' অভিমত জানাল মারিয়া। 'ওরকমই স্বভাব ওর। আর সম্ভবত মর্ট বেইলেস, আমার মনে হয়।'

জর্ডান বসে রইল নিরুত্তর। তাকিয়ে আছে ভোরের আলোর দিকে। টের পায়নি ওরা কখন ফরসা হতে শুরু করেছে আকাশ। ঝড়ের দাপটে ঝুলবারান্দার বাইরে ঝোপঝাড় আর গাছপালা তছনছ হয়ে গেছে। মরুভূমির জায়গায় জায়গায় বড়সড় পুকুর তৈরি হয়েছে। আকাশের পাণ্ডুর আলো প্রতিফলিত হচ্ছে ওই পানিতে, কালো মেঘের ছায়া পড়েছে।

এ সবকিছুই দেখতে পেল জর্ডান। এবং সঙ্গে আরও কিছু। ও দেখল বৃষ্টিভেজা পাঁচটা ঘোড়া আর তাদের আরোহীকে, সবাই সশস্ত্র, তাকিয়ে আছে ওর দিকে।

পাঁচজনের বিরুদ্ধে একজন। ওদের রাইফেলের মাযল্ নিচে নামান। গুপ্তস্থানটা দৈবাত্ আবিষ্কার করেছে। ওদেরকে রাইফেল তুলতে হবে। কিন্তু এই লোককে স্রেফ ড্র করতে হবে। বেন হাইনডমান জানে যে-লোক বুড়ো বব সাটনকে ড্রয়ে হারাতে এবং জ্যাক সাটনকে বুদ্ধু বানাতে পারে সে নিঃসন্দেহে ক্ষিপ্র এবং লক্ষ্যভেদী।

কোনো সন্দেহ নেই, গোলাগুলি শুরু হলে কাউকে মরতে হবে।

'তোমার হাতিয়ার ফেলে দাও,' বলল হাইনডমান, 'মেয়েটার তাহলে কোনো ক্ষতি হবে না।'

'না!'

চাবুকের মত আছড়ে পড়ল মারিয়া ক্রিশ্চিনার কণ্ঠস্বর। 'ভুলেও তা করতে যেয়ো না! ওরা তোমাকে খুন করবে! তুমি বন্দুক ফেললে, আমি গুলি করব!

বৃষ্টির মধ্যে ঘোড়ার পিঠে নিশ্চল বসে থাকে বেন হাইনডমান। জীবনে এই প্রথম এরকম অচলাবস্থায় পড়েছে।

মারিয়া ক্রিশ্চিনা গুলি করবে। ওর হাতে রাইফেল আছে। ওরা হয়ত হত্যা করবে ওকে কিন্তু বেন হাইনডমান নিজের কাঁধে নারী হত্যার দায় নিতে চায় না। এভাবে নয়।

মারিয়া ক্রিশ্চিনা থেকে ওর দৃষ্টি ট্রেস জর্ডানের ওপর স্থির হল। একহারা ভয়ঙ্কর অজেয় পুরুষ, ওর চেহারা বসে গেছে, মুখে দাড়ি-গোঁফের জঙ্গল, দেয়ালে পিঠ...কিন্তু লোকটা তৈরি।

আর ওই নারী, যে এখন দাঁড়িয়ে, সমস্ত স্নায়ু টানটান, অসাধারণ সুন্দরী, অত্যন্ত বিপজ্জনক।

অনেক লোক এবং একটা মেয়ে এখানে নিহত হতে যাচ্ছে ভেবে অসুস্থবোধ করল বেন হাইনডমান। এই মেয়েটা এভাবে নিহত হলে জীবনে কোনোদিন সে লোকসমাজে মুখ দেখাতে পারবে না। জর্ডানের দিকে তাকাল সে, মুহূর্তের জন্য পরস্পরের ওপর স্থির হল ওদের চোখ, এবং হাইনডমান বুঝল রক্তপাত এড়ানর কোনো উপায় নেই।

নিজের বীরত্ব সম্পর্কে কোনো ভুল ধারণা পোষণ করে না সে। সাহসের পরিচয় দিতে গিয়ে অযথা মৃত্যুবরণের কোনো অর্থ হয় না।

বিষয়টার এরকম পরিকল্পনা করেছিল না সে। একজন লোককে ধাওয়া করে, ফাঁদে ফেলে বন্দুকযুদ্ধে হত্যা করা এক জিনিস। আর এখানে মুখোমুখি লড়াই। বুলেট শত্রু-মিত্র বাছাই করে না। বেন হাইনডমান জানে কখন পিছু হটতে হয়।

'আমরা শুকনোয় এলে কিছু মনে করবে?' হাল্কা সুরে জিজ্ঞেস করল ও।

দীর্ঘ একটা মিনিট আর কোনো কথা হল না। এবং ওই এক মিনিটে ইয়াকব লানত্স ওর ঘোড়াটাকে হাঁটাতে শুরু করল। ধীরে রওনা হয়েছে সে তবে ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে। ও এমন কিছু দেখতে পেয়েছে যা অন্যরা পায়নি। সে গোলাগুলির আওতার বাইরে সরে যাচ্ছে। লানত্স প্রতিজ্ঞা করেছিল ঠিক এটাই করবে।

'না, খোদার কসম!'

ভোরের নিস্তব্ধতা খানখান হয়ে গেল মর্ট বেইলেসের তীক্ষ্ন কণ্ঠস্বরে। এবং কথা বলতে বলতে সে পিস্তলের বাট আঁকড়ে ধরল।

ওদের সবার মধ্যে একমাত্র ওর হাতেই রাইফেল নেই। আর সে-ই বল গড়ানর দায়িত্বটা নিল। বেন হাইনডমানের শান্ত কণ্ঠস্বরে সে আপসের সুর লক্ষ্য করেছে। ব্যাপারটা পছন্দ হয়নি, তাই পিস্তলের দিকে হাত বাড়িয়েছে।

ট্রেস জর্ডান এর পুরোটাই দেখল, পরিষ্কারভাবে। সকালের ছাই-ধূসর আকাশের কোলে, তুমুল বৃষ্টির ভেতর, ছায়ামূর্তির মত রেখায়িত হয়ে উঠেছে লোকগুলো, বৃষ্টিতে কালো দেখাচ্ছে ঘোড়াগুলো, স্টিল-গ্রের শরীর চকচক করছে। একলহমায় পরিস্থিতির তাত্পর্য বুঝে গেল ও। মর্ট বেইলেসের হত্যার নেশা ওদেরকে সেই ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দিয়েছে যা ওরা এড়াতে চাইছিল।

অন্ধের মত পিস্তলের দিকে হাত বাড়াল মর্ট, স্লিকারের কোণায় বাট আটকে গেল। অন্য কিছু হলেও, ঠিক সময়ে সে ওটা বের করতে পারত না। একটা বুলেট এফোঁড়-ওফোঁড় করল মর্টকে। তারপর যখন পড়ে যেতে শুরু করল সে স্যাডল থেকে, ভয় পেয়ে ওর নিচে লাফিয়ে উঠল ঘোড়াটা, তখন আরেকটা বুলেট ওর কপালে ত্রিনয়ন সৃষ্টি করল।

এরপর কিছু সময়ের জন্য ঝড়ের বিজলির স্থান দখল করল বুলেটের বিজলি, আর বজ্রপাত পরবর্তী নিস্তব্ধতাকে ভরাট করল বন্দুকের নির্ঘোষ।

মর্ট ভূপাতিত হওয়ার মুহূর্তে জর্ডানের মনে হল সে যেন বেন হাইনডমানের অস্ফূট আর্তনাদ শুনতে পেল। লোকটার জন্য সমবেদনা অনুভব করল জর্ডান। সীমান্তের কঠিন কিন্তু সত্মানুষ মানুষ হাইনডমান; অসত্ সংসর্গে তার আজ এই দুর্দশা।

এক মুহূর্ত—তারপর সব শেষ। গোলাগুলি থেমে গেল। মর্ট ঘোড়া থেকে মুখ থুবড়ে পড়েছে কাদাপানিতে। ওর পেছনের ঘোড়াটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে সামনের দুপায়ে দাঁড়িয়ে যাওয়ায় ওটার আরোহী মাটিতে আশ্রয় নিয়েছে।

মর্ট বেইলেসকে গুলি করেই চকিতে একপাশে সরে গেল ট্রেস জর্ডান, দ্রুত গুলি করল বেন হাইনডমানকে, জানে শত্রু দলে ওই লোকই সবচেয়ে কঠিন এবং সবচেয়ে বিপজ্জনক। বুলেটের ধাক্কায় স্যাডল থেকে পড়ে গেল হাইনডমান, ওর রাইফেল নিচের দিকে গুলি বর্ষণ করল।

মাটিতে কাছেই উইনচেস্টার সেভেনটি-থ্রির বিশ্রি গর্জন শুনতে পেল জর্ডান। টের পেল কোথা থেকে একটা বুলেট এসে কামড় বসিয়েছে ওর কাঁধে। হাইনডমানকে আবার গুলি করার জন্য নিজেকে স্থির করল ও। ঘোড়া লাফিয়ে ওঠায় যে-লোকটা মাটিতে পড়ে গিয়েছিল সে এখনও নিথর পড়ে আছে। আবার গুলি করল জর্ডান, চকিতে সরে গেল একধারে যাতে ওকে উদ্দেশে-ছোড়া এলপাতাড়ি গুলি মারিয়ার গায়ে না লাগে। মারিয়া উপুড় হয়ে শুয়ে মাটিতে, গুলি করল আরেক দফা। হাইনডমানের গুলি একপশলা পাথরকুচি বর্ষণ করল জর্ডানের মুখে। জর্ডান বিশালদেহীকে দ্বিতীয় দফা গুলি করল।

ঘোড়ার পিঠ থেকে রাইফেল তুলছিল এক লোক। জর্ডান আর মারিয়া দুজনেই গুলি করল ওকে। দুহাত আকাশে তুলল লোকটা, রাইফেল খসে পড়েছে মাটিতে।

ভয় পেয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটল ঘোড়াটা, কয়েক কদম স্যাডলেই বসে রইল সওয়ারি, তারপর হাত-পা ছড়িয়ে পড়ে গেল পানিতে, পড়েই থাকল, অনেক আগেই ওর ভবলীলা সাঙ্গ হয়েছে।

ঠিক যেরকম অকস্মাত্ শুরু হয়েছিল, সেরকম চকিতে শেষ হয়ে গেল। একটু আগের উন্মত্ত গোলাগুলি থেমে গেল সব। শুধু বৃষ্টির শব্দ টিকে থাকল।

ধীরে ধীরে সোজা হল জর্ডান। দুটো পিস্তলই হাতে, জানে না কখন বের করেছে দ্বিতীয়টা। একটা হোলস্টারে রেখে দিল ও, অন্যটায় গুলি ভরতে শুরু করল। একটা পিস্তল খালি হয়ে গেছে; অন্যটায় দুটো বুলেট অবশিষ্ট আছে। কখন এত গুলি ছুড়েছে তাও সে মনে করতে পারে না।

বোল্ডার আর ঝোপঝাড়ের আধো-আড়ালে হাঁটুর ভরে বসে ছিল মারিয়া ক্রিশ্চিনা, এখন উঠে দাঁড়াল।

'চোট পেয়েছ?' জর্ডানকে জিজ্ঞেস করল ও।

'সামান্য ছড়ে গেছে।'

একটুক্ষণ ওখানে দাঁড়িয়ে রইল জর্ডান, বৃষ্টির ভেতরে তাকিয়ে আছে। ইয়াকব লানত্স আশোপাশেই আছে কোথাও। যদিও সে লড়াই শুরু হওয়ার আগেই সরে গিয়েছিল, কিন্তু পরে সুবিধাজনক সময়ে ফিরে আসবে না এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। রাইফেলে লক্ষ্যভেদী হিশেবে ট্র্যাকারের সুনাম আছে।

বৃষ্টিতে বেরিয়ে এল ট্রেস জর্ডান। লানত্সকে দেখা যাচ্ছে না কোথাও।

জলভারে আনত মেঘের দিকে বস্ফািরিত চোখে তাকিয়ে আছে মর্ট বেইলেস, ভ্রূক্ষেপ নেই বৃষ্টিতে ভিজছে। ওর চারপাশে রক্তের ছোটখাট পুকুর তৈরি হয়েছে। পাতলা শরীরে পরনের শার্ট লেপটে আছে। লোকটার সমস্ত শয়তানি এখন অতীত, ওর জীবনের সঙ্গে সঙ্গে শয়তানিটাও ওকে ত্যাগ করেছে।

বেন হাইনডমানও পড়ে আছে, তবে মারা যায়নি। তিনটা গুলি লেগেছে ওর। ওগুলোর একটা রাইফেলের। পাশেই পড়ে-থাকা নিজের পিস্তলটা আঁকড়ে ধরার দুর্বল চেষ্টা করল সে, তারপর হাল ছেড়ে দিয়ে তাকাল জর্ডানের দিকে।

'খুব খারাপ?'

জর্ডান দেখল ক্ষতস্থানটা। একটা বুলেট বাম পাশ ভেদ করেছে, তবে অনেক নিচে দিয়ে। আরেকটা বেরিয়েছে বুকের ওপাশে, তবে বেশ উঁচুতে হওয়ায় ফুসফুসে লাগেনি। আর তৃতীয়টা ভেদ করেছে ঊরু।

'তুমি চোট পেয়েছ,' বলল জর্ডান। 'অবস্থা খারাপ হতে পারে।'

'আমার স্ত্রী আছে,' ম্লান হাসল হাইনডমান। 'ভাল মেয়ে। একজন পুরুষের এগুলো মনে রাখা উচিত।'

মুহূর্তের জন্য চোখ বুজে কী যেন ভাবল সে, তারপর তাকিয়ে বলল, 'ওদের উচিত হয়নি ঘোড়া চুরি করা। গর্দভের দল।'

আরেকটা লোক পড়ে আছে হাইনডমানের পেছনে, হাত-পা ছড়িয়ে, একটা হাঁটু ভেঙে গেছে। চতুর্থ লোকটা, বেইলেসের ঘোড়া যাকে ফেলে দিয়েছিল, এখনও নিশ্চল পড়ে আছে আগের জায়গাতেই। ওর জামাকাপড়ে রক্তের দাগ নেই।

জর্ডান হোলস্টার করল পিস্তল, হাইনডমানকে টেনে তোলার জন্য উবু হল। আর ঠিক তখুনি একটা হ্যামার টানার শব্দ হল। চকিতে ঘুরে দাঁড়াল জর্ডান।

ইয়াকব লানত্স দাঁড়িয়ে আছে অদূরে, হাত মাথার ওপরে। মারিয়া ওর দিকে উইনচেস্টার তাক করে আছে।

'সাহায্য লাগবে?' লানত্স জিজ্ঞেস করল। 'অনেক ওজন কিন্তু।'

ধরাধরি করে হাইনডমানকে ঝুলবারান্দার নিচে এনে শুইয়ে দিল ওরা দুজন। লানত্সকে এক নজর জরিপ করল মারিয়া, তারপর রাইফেল নামিয়ে রাখল। 'আগুন বানাও,' হুকুম করল ও।

তারপর জর্ডানের উদ্দেশে ফিরল। 'তুমি আগে,' বলল।

'ওর চোট বেশি,' বলল জর্ডান। 'আমি অপেক্ষা করতে পারি।'

কাঁধ ঝাঁকাল মারিয়া। 'ও মরলে ক্ষতি কী? সুযোগ পেলে তোমাকে ঠিকই হত্যা করত।'

'ও আগে,' সোজাসাপ্টা বলল জর্ডান। 'লেগে পড়।'

জর্ডানের দিকে তাকাল মারিয়া। ওদের চোখ পরস্পরের দিকে স্থির হয়ে রইল একমুহূর্ত, তারপর হাইনডমানের পাশে হাঁটুর ভরে বসল মারিয়া। 'নিজেকে খুব শক্তিশালী ভাবছ,' বলল ও, ওপরে তাকিয়ে। 'আসলে তুমি একটা বোকা।'

হাইনডমান হাসল শব্দ করে। পরক্ষণে মুখ বিকৃত করল ব্যথায়। জর্ডানের দিকে তাকিয়ে ও বলল, 'তুমি একখান মেয়ে পেয়েছ বটে, বন্ধু।'

ট্রেস জর্ডানের পাশ দিয়ে লানেসর উদ্দেশে তাকাল সে। 'তুমি অমন করলে কেন?' জিজ্ঞেস করল ফ্যাঁসফেঁসে গলায়।

ভাঙা দাঁত বের করে হাসল লানত্স। 'আমি বলেছিলাম তোমাকে...ওকে ট্রেইল করব কিন্তু ওর সঙ্গে লড়ব না। যখন দেখলাম মর্ট কী করতে যাচ্ছে, নিজেকে সরিয়ে নিয়েছি।'

আরেকটা লোক যেখানে পড়ে ছিল, জর্ডান তাকাল সেদিকে। নেই লোকটা। এতক্ষণ মড়ার মত পড়ে ছিল নিঃসাড়ে। সুযোগ পেয়েই চম্পট দিয়েছে।

মরু লতাগুল্মের নির্যাস দিয়ে ওদের ক্ষতস্থান ধুয়ে পট্টি বেেঁধ দিল মারিয়া। ইত্যবসরে লাশগুলো দাফন করল লানত্স। ওদের কাজ যখন শেষ হল তখন দুপুর। চাতালের নিচে এসে বসল বুড়ো ট্র্যাকার। 'বৃষ্টি থেমে আসছে,' বলল। 'ঝামেলার জন্য তৈরি হও।'

'ঝামেলা?'

'হ্যাঁ,' ধীরেসুস্থে বলল লানত্স। 'একজন পালিয়েছে। আরও আসছে। আমাদের সঙ্গের আর লোকেরা এবার তোমার পিছু নেবে।'

খড়ের বিছানা থেকে মুখ তুলল বেন হাইনডমান। 'লড়াই শেষ হয়ে গেছে, ইয়াকব। তুমি ওদের বলবে আমি বলেছি।'

'বাক শুনতে পারে। কিন্তু ওয়েস পার্কার শুনবে না। অন্যদের মধ্যেও কেউ কেউ নাও শুনতে পারে।'

'তাহলে তুমি গিয়ে থামাও,' হাইনডমান বলল কর্কশ গলায়। কনুইয়ের ভরে উঁচু হল সে। 'ওদের থামাও এবং আমার জন্য একটা বাকবোর্ড নিয়ে এসো এখানে। আর যদি না থামাতে পার, ছুটে যাবে জন স্লটার আউটফিটের কাছে।'

মেঘ ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। বৃষ্টি দূরে সরে গেল। সূর্য ফিরে এল। ডোবাগুলো অদৃশ্য হতে লাগল। ঝড়ের কথা মনে করিয়ে দেয়ার জন্য শুধু ছড়ান-ছিটান পাথরগুলোর আশেপাশের সবুজ ঝোপঝাড় আর ভিজে মাটি রয়ে গেল।

রাইফেলহাতে উঠে দাঁড়াল ট্রেস জর্ডান, ঘোড়াগুলোকে ঘেসো জমিতে নিয়ে এমন জায়াগায় পিকেট করল যেটা ঝুলবারান্দা থেকে পরিষ্কার দেখা যায়। সাটন-বেইলেস রাইডারদের ওর যতটা ভয় না পাচ্ছে, তারচেয়ে অনেক বেশি পাচ্ছে অ্যাপাচিদের। সনোরার এই এলাকাটা অ্যাপাচিদের। বেশ কয়েকদিন হল ধাওয়াকারী এবং ধাওয়া-খাওয়া উভয়ই প্রচুর ট্র্যাক তৈরি করছে এখানে।

আশেপাশের রাঞ্চেরিয়ার কোনো শিকারী, বা শাকসবজি নয়ত লাকড়ি সংগ্রহ করতে বেরোন স্কোয়াওর নজরে পড়তে পারে ওইসব ট্র্যাক। যে-তল্লাটে অ্যাপাচির অজান্তে খুব কমই কোনো শ্বেতাঙ্গ বিছানায় পাশ ফিরতে পারে, সেখানে ওরা এতকিছু টের পাবে না এমনটি মনে করা হাস্যকর।

উপরন্তু, যে-অ্যাপাচিগুলো মারিয়াকে অপহরণের চেষ্টা করেছিল, তারাও নিশ্চয় লোক জড় করছে এখন।

চাতালে ফিরে ও দেখল মারিয়া বসে আছে একটা পাথরচাঁইয়ের ধারে, রাইফেল তৈরি। একে অপরকে দেখল ওরা, কোনো কথার প্রয়োজন পড়ল না। দুজনেই ইনডিয়ান এলাকায় বড় হয়েছে; পরিস্থিতির গুরুত্ব বোঝে।

ধীর লয়ে গড়িয়ে চলল ঘণ্টা। কিছুই ঘটল না। প্রতিটি অতিক্রান্ত মিনিটের সঙ্গে বাড়ছে বিপদের ঝুঁকি। অস্থির বোধ করছে জর্ডান, বিরক্তও।

বিড়বিড় করে নালিশ জানাতে শুরু করেছে বেন হাইনডমান। ওর জ্বর বেড়েছে, প্রলাপ বকছে। মারিয়া ক্রিশ্চিনা জলপট্টি দিচ্ছে ওর কপালে। বেশ কয়েকবার ওকে লতাপাতার নির্যাস খাওয়াল মারিয়া। ইনডিয়ানরা জ্বর কমাতে ব্যবহার করে ওগুলো। কিছুটা কাজ হল এতে; কিন্তু ক্ষতস্থান থেকে প্রচুর রক্ত হারিয়েছে হাইনডমান, ফলে অবস্থা ক্রমশ খারাপের দিকে যাচ্ছে।

দ্বিতীয় দিনের দুপুর নাগাদ জর্ডান সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল কিছু একটা করতে হবে। একটা পাথরচাঁইয়ের গায়ে হেলান দিয়ে মরুভূমির তাপ তরঙ্গের দিকে তাকিয়ে ছিল সে যখন সিদ্ধান্তটা নিল। কয়েকটা খুঁটি আর দুটো পনচৌ দিয়ে দুটো ঘোড়ার মাঝখানে একটা ডুলি তৈরি করল সে। মারিয়ার সাহায্য নিয়ে হাইনডমানকে তোলা হল ওই ডুলিতে, তারপর ঘোড়া হাঁটিয়ে রওনা হল সবাই।

খুব মন্থর গতিতে এগোল ওরা। তবে এরপরও প্রায় পনের মাইল পথ অতিক্রম করল সন্ধ্যার মধ্যে, এবং একটা বিক্ষিপ্ত পাহাড়ি ঝরনার অদূরে একগুচ্ছ পাথরখণ্ডের আড়ালে ক্যাম্প করল।

বেন হাইনডমানের মুখ রক্তবর্ণ ধারণ করেছে। আরও মুমূর্ষু দেখাচ্ছে ওকে। আহত লোকটার দিকে তাকাল জর্ডান, নিয়তির তামাশা বিবেচনা করছে। মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে এই লোক হত্যা করার জন্য ওকে তাড়া করছিল, আর এখন সে, জর্ডান, তার বুলেটের আঘাতে মৃত্যুপথযাত্রী লোকটাকে বাঁচাতে চেষ্টা করছে। এজন্য নিজের জীবনের ঝুঁকিও সে নিচ্ছে।

রাইফেলহাতে ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে এল ট্রেস জর্ডান। চোটজনিত অসুস্থতায় সে নিজেও কৃশ হয়েছে অনেক। ওকে আরও একহারা আর শক্তপোক্ত লাগছে এর ফলে। পরনের জামাকাপড় কয়েকদিনের পথচলায় জীর্ণ।

তবে দুর্গম অঞ্চলে বহুকালের বসবাস কঠিন জীবনে অভ্যস্ত করে তুলেছে ওকে। ক্যাম্প থেকে কয়েক কদম যেতেই ট্র্যাক দেখতে পেল সে। একটা পায়ে হাঁটা লোকের ট্র্যাক।

একজন আহত লোক...শ্বেতাঙ্গ।

টলোমলো পায়ে এগিয়েছে লোকটা। একবার হাঁটু ভেঙে পড়ে গেছে। নিবিষ্ট মনে ট্রেইল অনুসরণ করে আধমাইল গেল জর্ডান। এই দূরত্বে দুবার মাটিতে পড়ে গেছে লোকটা। দ্বিতীয় জায়গায় মরুভূমির বুকে রক্তের ছোপ রয়েছে।

একটা টিলার মাথায় উঠল জর্ডান। অনেকদূর অবধি দেখা যায় ওখান থেকে। প্রায় মিনিট খানেক চারপাশ জরিপ করল ও। হঠাত্, উত্তরে, কিছুটা তফাতে, মরুভূমির বুকে একটা কালো বস্তু পড়ে থাকতে দেখল।

একটা পাথরখণ্ড হতে পারত ওটা। কিন্তু সূক্ষ্ম একটা পার্থক্য ওকে বলল ওটা আসলে তা নয়। উত্তর দিকে রওনা হল সে, দ্রুত হাঁটছে।

লাশটার কাছে পৌঁছুবার আগেই ও বুঝে গেল লোকটার পরিচয়। অ্যাপাচিদের বিরুদ্ধে জীবনে বহু যুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছে বুড়ো ইয়াকব লানত্স। এটা ছিল তার শেষ যুদ্ধ। হাত-পা ছড়িয়ে মরুভূমিতে পড়ে আছে। মারা গেছে। তবে ওর দেহ ঠান্ডা বা শক্ত কোনোটাই হয়নি।

তিনবার গুলি করা হয়েছে ওকে। একটা জখম কমপক্ষে একদিনের পুরোন। স্পষ্টতই ওদের ঝুলবারান্দার ক্যাম্প থেকে যাত্রার পরপরই আহত হয় সে এবং তার ঘোড়াটা মারা যায়। কোনো সুচতুর কৌশলে অ্যাপাচিদের ফাঁকি দিয়ে সে পথচলা অব্যাহত রাখে...হেঁটে।

আজ, হয়ত কয়েক ঘণ্টা আগে, আবার ওর ওপর চড়াও হয় ওরা। যদি এই সময়ের মধ্যেই হত্যা করা হয়ে থাকে লানত্সকে, তাহলে এর অর্থ দাঁড়ায় অ্যাপাচিরা কাছেপিঠেই কোথাও আছে। ওরা হয়ত উত্তরে আসা চারটে ঘোড়ার ট্র্যাকও আবিষ্কার করেছে।

ঝটিতি ফিরতি পথ ধরল জর্ডান, ক্যাম্পের উদ্দেশে এগোল। হাঁটতে হাঁটতে পরিকল্পনা করল ও। ওরা পরিশ্রান্ত, বেন হাইনডমানের সঙ্গীন, কিন্তু তা সত্ত্বেও আজ রাতেই রওনা হতে হবে। অ্যাপাচিরা কদাচিত্ রাতে আক্রমণ করে। রাতে ওরা পথ চলতেও পছন্দ করে না। সীমান্ত বড়জোর পনের থেকে কুড়ি মাইল হবে। আর ওখানেই, সান বারনার্দিনো স্প্রিংসে র্যাঞ্চটা অবস্থিত।

ওর চেহারা দেখেই চকিতে টানটান হয়ে গেল মারিয়া ক্রিশ্চিনা। সব খুলে বলল জর্ডান, কিছুই গোপন করল না।

সজাগ ছিল হাইনডমান। 'তোমরা দুজন রওনা হয়ে যাও,' বলল। 'আমার বাঁচার আশা এমনিতেই কম।'

'তুমি ঠিকই বাঁচবে,' জর্ডান বলল কাঠখোট্টা গলায়। 'এত সহজে তুমি মরার বান্দা নও।'

অন্ধকার ঘনাবার পরপরই যাত্রার প্রস্তুতি নিল ওরা। রওনা হওয়ার আগমুহূর্তে একটা ক্যাম্পফায়ার তৈরি করল জর্ডান, প্রচুর জ্বালানি গুঁজে দিল ওতে যাতে আগুনটা বড় হয়। এরপর নক্ষত্রের অবস্থান দেখে উত্তরে এগোল সবাই। ভাঙাচোরা বন্ধুর মরুভূমি, তবে কাফেলা যথেষ্ট দ্রুতই এগিয়ে চলল।

'চলতে থাক,' হাইনডমান বলল ওদের। 'আমাকে নিয়ে ভেবো না। অ্যাপাচিরা যদি আমাকে হত্যা করেও, কিছু আসে যায় না তাতে।'

তাই সারা রাত পথেই কাটাল ওরা এবং ভোরের প্রথম আলোয়, ঘোড়াগুলো যখন ক্লান্ত পা ফেলছে, বহুদূরে একগুচ্ছ বাড়িঘর দেখতে পেল।

আর ঠিক ওই মুহূর্তে মারিয়া ক্রিশ্চিনা চেঁচিয়ে উঠল, 'ট্রেস!'

স্যাডলে পেছন ফিরল জর্ডান। ওদের পেছনে এবং পুবে, বেশি হলে ছয়শ গজ তফাতে, এক ডজন ইনডিয়ান ঘোড়ার পিঠে বসে। একটা নালা থেকে বেরিয়ে এসেছে ওরা এবং জর্ডান নিজে যেরকম দৃশ্যত ঠিক সেরকমই বিস্মিত হয়েছে।

'চলতির ওপর থাক,' মারিয়াকে বলল সে। 'যাই ঘটুক, থামবে না।'

এগিয়ে চলল ওরা, নিজেদের গতি বজায় রেখে। অকস্মাত্ চলতে শুরু করল ইনডিয়ানরা। ওদের পনিগুলো ছুটতে শুরু করল।

গতি বাড়াল ট্রেস জর্ডান। দালানকোঠাগুলো এখন আর পাঁচ মাইল দূরেও নেই। ইনডিয়ানরা খুব কাছে এবং দ্রুত ব্যবধান কমিয়ে আনছে।

ঘুরে, উইনচেস্টার তুলল জর্ডান, সাবধানে নিশানা ঠিক করল। ট্রিগারে চাপ দিল ও, বুকভরে নিশ্বাস নিল একটা, ছেড়ে দিল খানিকটা বাতাস, তারপর আরও চাপ বাড়াল, তারপর আরেকটু—রাইফেলটা লাফিয়ে উঠল ওর হাতে, শূন্যে ঝাঁপাল একটা ঘোড়া, পেছনের পায়ে লুটিয়ে পড়ল, আরোহী আগেই ছিটকে পড়েছে।

আরও দুটো গুলি করল জর্ডান; তারপর ওর গুলির কার্যকরতা দেখার জন্য মারিয়া ক্রিশ্চিনা আর হাইনডমানের ডুলির পেছনে ছুটল।

তীক্ষ চিত্কারে আকাশ-বাতাস ভারি করে তুলল ইনডিয়ানরা, জর্ডানকে তাড়া করছে। হঠাত্ অদূরবর্তী র্যাঞ্চটার আস্তাবল থেকে বেরিয়ে এল একজন অশ্বারোহী, এগোল ওদের দিকে। তার পেছনে একে-একে আরও ছজন ঘোড়সওয়ার। ছড়িয়ে পড়ল ওরা, জোরকদমে এগিয়ে আসতে লাগল ওদের দিকে।

গুলির আওয়াজ পেল জর্ডান। ঘোড়া ঘুরিয়ে, দুশ গজ তফাতের একটা টার্গেট লক্ষ্য করে রাইফেলটা খালি করল। একটা ইনডিয়ান পড়ে গেল ওর পেইন্ট পনি থেকে, গড়ান খেল কয়েকটা, উঠে দাঁড়াল, তারপর আবার পড়ে গেল। এরপর আরেকটা ঘোড়া লাফিয়ে উঠল গুলির আঘাতে। ইনডিয়ানরা মন্থর করল ছোটার গতি, ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল।

ডুলির পেছনে ঘোড়া ছোটাল জর্ডান, রাইফেলে টোটা ভরতে ভরতে। যখন আবার পেছনে তাকাল ও, ইনডিয়ানরা রণে ভঙ্গ দিয়ে ফিরে যাচ্ছে।

র্যাঞ্চ থেকে আগত রাইডাররা পাশাপাশি হল ওদের। নেতা লোকটা খর্বাকৃতি, চৌকো গড়নের। চোখ দুটো শীতল ধূসর।

'হাইনডমান!' চিত্কার করে বলল সে। 'অ্যাপাচিরা তোমার এই হাল করেছে?'

'না।' ইশারায় জর্ডানকে দেখাল হাইনডমান। 'ও করেছে।'

রানচো সান বারনার্দিনোয় ওদের আাাগমনের দ্বিতীয় সকালে সকালের সূর্যালোকে বেরিয়ে এল ট্রেস জর্ডান, কপালের ওপর হ্যাটটা টেনে দিল। মাত্র দিনের শুরু। জন স্লটার এখনও নাস্তার টেবিলে। বেন হাইনডমান ঘুমুচ্ছে। বাহ্যত আগের চেয়ে সুস্থ।

সাটন-বেইলেস আউটফিটের অবশিষ্ট রাইডারদের চিহ্নমাত্র দেখা যায়নি এখনও।

পাহাড়ের সংঘর্ষে বাক বেইলেস এবং ওয়েস পার্কার ছিল না। ওদের সম্পর্কে কিছু বলছে না বেন হাইনডমান। কিন্তু ওর আচরণে এমন কিছু আছে যা ক্রমশ জর্ডানের অস্থিরতা বাড়িয়ে তুলেছে।

রান্নাঘরের কাজে সাহায্য করে যে-ইনডিয়ান মেয়েটা কিছু ফেলতে সে বাইরে এসেছিল। জর্ডানের উদ্দেশে একনজর তাকিয়েই বাড়ির উদ্দেশে সে বাড়াল।

'মারিয়া ক্রিশ্চিনাকে দেখেছ?' জর্ডান জিজ্ঞেস করল।

অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকাল মেয়েটা। প্যানের শেষ কয়েক বিন্দু পানি ঝরাল। 'চলে গেছে। অনন্ত দুঘণ্টা হবে ও চলে গেছে।'

'কী?'

'ঘোড়া নিয়ে গেছে। বিদায় জানিয়েছে সবাইকে। চলে গেছে এখান থেকে।'

'কোথায় গেছে?' জানতে চায় জর্ডান।

কাঁধ ঝাঁকাল মেয়েটা। 'আমি জানি না। বলেনি কিছু।'

খিস্তি করে কোরালের দিকে ছুটল জর্ডান। বিগ রেডের পিঠে ঝটিতি স্যাডল চাপিয়ে উঠে পড়ল নিজেও। কোনোদিকে না তাকিয়ে ঝড়ের বেগে ছুটল ট্রেইলের উদ্দেশে।

মারিয়া ক্রিশ্চিনা বাড়ি যাবে, সন্দেহ নেই। বাক বেইলেস এব ওয়েস পার্কারের কোনো খবর না জানায় স্বভাবতই দুশ্চিন্তায় পড়েছে ও। বেইলেসকে ও জানে। ওকে নিয়ে চিন্তা করে না। কিন্তু ওয়েস পার্কারের কথা আলাদা। ঘোড়াচোরদের দলটার সঙ্গেই তার দহরম-মহরম বেশি। কথাটা যত ভাবে ততই মারিয়ার উদ্বেগের কারণ জর্ডান বুঝতে পারে । তবে ওটাই একমাত্র কারণ নয়, জর্ডান এটাও জানে।

স্লটার র্যাঞ্চে পৌঁছার পর থেকেই মারিয়া ক্রিশ্চিনা সাবধান থেকেছে যেন কখনও একা ওর মুখোমুখি হতে না হয়। একান্তে কথা বলার কোনো সুযোগই সে রাখেনি। ওর মনে যে-চিন্তাই থাক, জর্ডান তা জানে না। স্পষ্টতই মারিয়া নিজের চিন্তা ওর সঙ্গে ভাগাভাগি করতে চায়নি।

বেশ কয়েকবার জর্ডান লক্ষ করেছে মারিয়া দেখছে ওকে, বস্ফািরিত নিবিষ্ট দৃষ্টি, কিন্তু চোখাচোখি হতেই অন্যদিকে তাকিয়েছে। তাছাড়া ওর আচরণেও একধরনের শীতলতা টের পেয়েছে জর্ডান।

গুয়াদালপ পাসের মধ্যে দিয়ে গেছে ট্রেইলটা। চেষ্টা করলে ওর নাগাল পেতে পারে সে। ও জানে খোদ গিরিপথের ভেতরে অথবা ওটার প্রবেশপথের কাছেই একটা ঝরনা আছে। এছাড়া গিরিপথের উত্তরে আরও কয়েকটা থাকা সম্ভব। গুয়াদালপের ওপাশের এলাকা তার অপিরিচিত, ব্যতিক্রম কেবল পালানর সময়ে যেসব জায়গায় গিয়েছিল সেগুলো।

সকালের রোদে বিরামহীন এগিয়ে চলল জর্ডান। মাঝে মাঝে মারিয়ার ট্র্যাক দেখতে পাচ্ছে। রানচো থেকে ছয়-সাত মাইল দূরে একজায়গায় ঘোড়াকে পানি খাওয়াতে থেমেছিল মেয়েটা। তারপর আবার এগিয়েছে। একটা টানা গতিবেগ বজায় রাখছে মারিয়া। ওর পনিটার ছাড়া আর কোনো ট্র্যাক দেখতে পেল না জর্ডান।

অ্যাপাচি হানাদারেরা ঘোরাফেরা করছে, এই খবরটুকুই যথেষ্ট অন্যদের ঘরে বসে থাকতে বাধ্য করার জন্য। একা ঘর থেকে বেরোনর উপযুক্ত সময় নয় এটা। বিশেষ করে কোনো রূপসী মেয়ের জন্য। তা সত্ত্বেও, গিরিপথের চূড়া দৃষ্টিসীমায় আসার আগেই, একজন নিঃসঙ্গ ঘোড়সওয়ারকে চোখে পড়ল জর্ডানের। একটা বে ঘোড়ায় চেপে ওর দিকেই আসছে।

হোলস্টারে পিস্তলটা ঢিলে করল জর্ডান, স্যাডলে নড়েচড়ে বসল, চলার গতি বজায় রাখছে। নবাগত ঘোড়সওয়ার কিছুটা ধীর গতিতে ছুটছে।

যখন দুজনের ব্যবধান দুশ গজে নেমে এসেছে, জর্ডান ওর চলার গতি কমাল। একই সময়ে ঘোড়সওয়ারকে চিনতে পারল ও। টোকেওয়ানায় ওই লোকই ওকে সাধান করে দিয়েছিল একত্রে ড্রিংক করার পর।

'হাউডি।' ওর মুখোমুখি হল জর্ডান।

পাণ্ডুর দেখাচ্ছে লোকটার তামাটে চেহারা। 'আমি জো সাটন,' বলল সে। 'আমি কোনো ঝামেলা খুঁজছি না।'

'তাহলে কোনো ঝামেলা হবে না।'

পকেট থেকে তামাক আর কাগজ বের করল জো সাটন, সিগারেট বানাতে শুরু করল। 'তুমি...বেনকে দেখেছ? বা অন্যদের?'

'দেখেছি...স্লটারের র্যাঞ্চে বিশ্রাম নিচ্ছে বেন। মনে হয় সেরে উঠবে।'

সাটনের আঙুলে ম্যাচ ভেঙে গেল। জর্ডান ঝুঁকে ওর সিগারেটের আগুন সাটনের সিগারেটে ধরল।

'মর্ট?'

'মারা গেছে...বুড়ো ইয়াকবও, তবে ওটা অ্যপাচিরা করেছে, আমি না।'

পাহাড়ে এবং পরে কী ঘটেছে, সময় নিয়ে ব্যাখ্যা করল জর্ডান। বেন হাইনডমানকে ডুলিতে চাপিয়ে সীমন্তে নিয়ে যাওয়ার কথা বলল।

'ট্রেইলে কাউকে দেখেছ?' জিজ্ঞেস করল ও।

'না।' সাটনকে চিন্তিত দেখাল। 'তবে কিছু ট্যাক দেখেছি। গিরিপথের ঠিক ভেতরে। যে-ই করে থাক ওগুলো মনে হয় ফিরে গেছে।'

'বাক বেইলেস আর পার্কারের কী খবর?'

কাঁধ উঁচু-নিচু করল জো সাটন। 'পার্কার অক্কা পেয়েছে...বেইলেস আহত তবে খারাপ চোট না। আমি যতটুকু শুনেছি ওরা উত্তরে চাভেরোর ছেলেটার কাছে গেছিল ওর বোনের হদিস জানতে। ভিচেন্তির সামনে পড়ে।'

'তারপর?'

'আমরা ভিচেন্তিকে ভুল আন্দাজ করেছিলাম। সে ভয়ে পালায়নি। বাক বলছে, ওয়েসকে কেটে পড়ার পরামর্শ দিয়েছিল ভিচেন্তি। কিন্তু ওয়েস শোনেনি। পরদিন সকালে ওয়েসকে আমরা কবর দিই।'

এখনও একটা ব্যাপার ফয়সালা হওয়া বাকি। জর্ডান যাত্রা অব্যাহত রাখতে চাইছিল। কিন্তু মীমাংসার জন্য এরচেয়ে ভাল সময় আর আসবে না। অনেক খুনোখুনি হয়েছে। জো সাটনকে যুক্তিবাদী মানুষই মনে হচ্ছে।

'বেন হাইনডমান বলেছে লড়াই শেষ। আমি আমার ঘোড়া ফেরত পাচ্ছি।'

'বেন হচ্ছে বস।' সাটনকে নির্ভার দেখায়। 'ওরা ছিল একেকটা গর্দভ।' আধ-খাওয়া সিগারেটটা ফেলে দিল ও। 'জ্যাক আর মর্ট...আর হ্যাঁ, ওয়েসও। আমাদের জন্য আমাদের সামর্থ্যের বাইরে ঝামেলা তৈরি করেছিল ওরা।'

ঘোড়া এগোল ট্রেস জর্ডান। 'দেখা হবে,' বলে বিগ রেডকে রওনা করল ট্রেইলে। সাবধানী মানুষ সে, পেছনে তাকাল একবার, দেখল জো সাটন আপনমনে নিজের পথে যাচ্ছে।

বেলা ডুবু ডুবু যখন মারিয়াকে আবিষ্কার করল সে। গিরিপথের অদূরে গাছগাছালির ভেতর একটা বালিয়াড়ির কিনারে ক্যাম্প করেছে ও। জর্ডানকে আসতে দেখে উঠে দাঁড়াল, চেহারা অভিব্যক্তিহীন। আগুনের চারপাশে চক্কর মারল জর্ডান।

'চলে এসেছ কেন?' জানতে চাইল বিরক্তির সুরে।

'আমি পালাইনি। আমি বাড়ি যাচ্ছি।'

আগুনের পাশে হাঁটু ভেঙে বসল মারিয়া, এত আচমকা যেন পায়ে জোর নেই, খাবার রান্নায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল। শেষ বিকেলের আলোয় ওর মুখ অস্বাভাবিক রকমের নিষ্প্রাণ দেখায়।

ঘোড়া থেকে নামল জর্ডান। 'তোমার এভাবে চলে আসার কোনো দরকার ছিল না! কিছু বলে আসতে পারতে!'

'কেন...কাকে বলে আসব...তোমাকে?'

'তোমার এভাবে চলে আসা আমি পছন্দ করিনি,' প্রতিবাদ করল জর্ডান। 'একটা মেয়ের একা পথ চলার জন্য সময়টা ভাল না।'

তাকাল না মারিয়া, আগুনে খড়ি ফেলছে। তারপর গোমড়ামুখে যোগ করল, 'আমি ঠিক আছি।'

রাস্তায় যেসব কথা ভেবেছিল জর্ডান, সেগুলো এখন আর খুঁজে পাচ্ছে না। পথে কোথাও হারিয়ে গেছে। ওকে ভিচেন্তি আর ওয়েস পার্কারের কাহিনি শোনাল ও। কিন্তু মেয়েটা ওর দিকে তাকাল না। পানিতে কফি ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। আগুনের কোণ ঘুরল জর্ডান, মেয়েটাকে কাছে টেনে নিল। 'মারিয়া ক্রিশ্চিনা, তুমি চলে যাও আমি চাই না। কোনো দিন না। আমি চাই তুমি আমার সঙ্গে থাক।'

ওর দিকে ফিরল মারিয়া, চোখে চোখ রাখল। সেখানে বিষাদ বা ক্রোধের লেশমাত্র নেই। 'তুমি জান না তুমি কী বলছ।'

'জানি, জেনেশুনেই বলছি।'

নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল মারিয়া, দৃষ্টি অকস্মাত্ বিদ্রোহী, ঈষত্ ভয়ার্ত। 'না...হাত সরাও।' জর্ডানের মুঠি থেকে নিজেকে মুক্ত করার ব্যর্থচেষ্টা করে ও।

'অমন কোরো না!' ধারাল স্বরে বলল জর্ডান। দুহাতে জড়িয়ে ধরল ওকে, শক্ত আলিঙ্গনে পিষে ফেলতে চাইছে বুকের সঙ্গে। মারিয়া তাকাল ওর দিকে। ওর চোখজোড়া ভীষণ কালো দেখাচ্ছে, জ্বলছে, ক্ষুধার্ত দেখাচ্ছে।

তারপর জর্ডানের সঙ্গে প্রাণপণ যুঝল ও। নিজেকে মুক্ত করার জন্য লড়ল। জর্ডান ধরে রইল ওকে, ধীরে ধীরে মুখখানা ফেরাল নিজের দিকে। ওদের ঠোঁট মিলিত হল পরস্পর, সেঁটে রইল।

মারিয়াকে ধরে থাকে জর্ডান, বলছে না কিছুই। 'পোষ মানাতে হবে,' খানিকবাদে বলল মৃদু স্বরে। 'আমি জানি তুমি ভাল করবে।'

নীরবে ওর বুকে মাথা রেখে দাঁড়িয়ে রইল মারিয়া। বিশাল লাল ঘোড়াটা সরে গেল সামান্য দূরে, ঘাস খেতে শুরু করল। ওর ধৈর্যের একটা সীমা আছে। মানুষের উদ্ভট আচরণের সঙ্গে পরিচিত হয়ে উঠছে আস্তে আস্তে।

পরে, যখন বেশির ভাগ কফি ফুটে নিঃশেষিত হয়ে গেছে, জর্ডান পান করল ওটা, কালো এবং চিনি ছাড়া।

মারিয়া তাকাল ওর দিকে, ঘনায়মান অন্ধকারে চোখ কোমল। 'মনে আছে একবার বলেছিলাম তুমি কখনও পারবে না?'

'আছে।'

'এখন মনে হচ্ছে তুমি পারবে।'

হেসে উঠল মারিয়া, দুষ্টু অথচ প্রশ্রয়ের সুরে; আর সেই হাসি ক্যাম্পফায়ারের ধোঁয়ায় মিশে ক্যানিয়নের দেয়াল-ঘেঁষা ঝোপের ভেতর মিলিয়ে গেল।

(লুই লা'মরের দি বার্নিং হিলস অবলম্বনে)

এই পাতার আরো খবর -
font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেছেন, 'রাজনৈতিক দল হিসাবে কর্মকাণ্ড করার কোনো অধিকার জামায়াত রাখে না।' আপনিও কি তাই মনে করেন?
8 + 7 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
নভেম্বর - ২৯
ফজর৫:০২
যোহর১১:৪৭
আসর৩:৩৫
মাগরিব৫:১৪
এশা৬:৩১
সূর্যোদয় - ৬:২২সূর্যাস্ত - ০৫:০৯
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :