The Daily Ittefaq
ঢাকা, সোমবার ০৫ আগস্ট ২০১৩, ২১ শ্রাবণ ১৪২০ এবং ২৬ রামাযান ১৪৩৪
সর্বশেষ সংবাদ হাইকোর্টের রায় বহাল; নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না জামায়াত | আপিল করেছেন গোলাম আযম | অষ্টম মজুরি বোর্ডের সুপারিশে মন্ত্রিসভার একমত

ভ্রমণ

স্বর্ণালি বৌদ্ধ স্তূপে ঘূর্ণনচক্র

মঈনুস সুলতান

মোমের কেল্ল¬া

পিমপম মিনি মার্কেট থেকে সংক্ষিপ্ত সওদা সেরে ফিরছিলাম আমি ও হলেণ। আচমকা ব্রেক কষে গাড়িকে রাস্তার একপাশে দাঁড় করাতে হলো। আমাদের আশপাশে আরও অনেক গাড়ি, মোটর সাইকেল ও টুকটুক বা টেম্পো দাঁড়িয়ে পড়েছে। অনেকেই যানবাহন থেকে নেমে এসে উদগ্রীব হয়ে তাকাচ্ছে ওয়াট সিমুয়াং মন্দিরের দিকে। হুইসেল বাজিয়ে গোটা তিনেক পুলিশি মোটর-বাইক পার হতেই আমরা দুজন গাড়ি থেকে নেমে আসি—হুজুগটি কী তা সরেজমিনে তালাশ করতে। সিমুয়াং মন্দিরের দিক থেকে ভিড় ভারাক্রান্ত একটি জনস্রোত ধীর পদক্ষেপে এগিয়ে আসছে। শোভাযাত্রা কাছাকাছি আসতেই নজরে পড়ল যাত্রীদের ভূষণের বর্ণাঢ্যতা। এ মিছিলের অগ্রভাগে পুরুষরা আছে বটে তবে নিতান্ত সংখ্যালঘু হয়ে। নারীদের অনেকেই ভরভরন্ত তরুণী বা সদ্য কৈশোর উত্তীর্ণা যুবতী। কমবেশি সকলের পরনেই উজ্জ্বল রঙের সিল্ক 'পাসিন' বা লাও স্কার্ট। তাদের ঊর্ধ্বাঙ্গ ওড়নার মতো 'পবিয়াং' নামের বৃহত্ ব্রোকেডময় বস্ত্র খণ্ডে কোমর থেকে বাম কাঁধ ও পিঠের প্রায় তাবত্ ঢাকা। ডান বাহু সম্পূর্ণ নগ্ন ও নিরাভরণ। চুল তাদের চূড়া করে বাঁধা, শীর্ষ সোনালি অথবা রুপালি রশ্মি প্রতিফলনে সক্ষম জালে জড়ানো। রমণীরা সকলেই কিছু না কিছু বহন করছে। কারও হাতে পাতায় তৈরি মন্দিরের আকৃতি, তাতে গাঁদা ফুল গোঁজা। কারও হাতে রুপালি ভাণ্ড-পরিপূর্ণ পূজা উপাচারে। নারীদের প্রথম গুচ্ছটি ছন্দময় লঘু পদক্ষেপে খানিক পার হতে নজরে আসে জন কয়েক পুরুষ, তাদের পরনে প্রিন্সকোট আকৃতির শুভ্র জ্যাকেট, নিম্নাঙ্গের বস্ত্রটি অনেকটা ধুতির মতো তবে কালো কিংবা গাঢ় নীল বর্ণের। সকলেই বহন করছে একটি করে ছাতা যাকে রাজছত্র বললে অত্যুক্তি হয় না। পুরুষরা এ মিছিলে একাকী নয়, তাদের ছত্রছায়ায় হাঁটছে একজন করে নারী। নারীটি বহন করছে একটি 'ওয়াক্স ক্যাসোল' বা মোমের কেল্ল¬া। কেল্ল¬াটি কলাগাছের বাকল, বাঁশের কাঠি, মোম ও রঙিন কাগজে তৈরি, এবং তাতে সোনালি জগজগা কাগজে জড়ানো অজস্র গাঁদা ফুল। আকৃতিতে দেখতে অনেকটা মহররমের মিছিলে তাজিয়ার মতো।

দিন দুয়েক আগে 'ভিয়েনচান টাইমস'-এ পড়েছিলাম তাত-লুয়াং, বৌদ্ধ স্তূপে বাত্সরিক মেলা শুরু হয়েছে। পত্রিকায় উল্লেখ ছিল, আজ সিমুয়াং মন্দির থেকে মোমের কেল¬্লা নিয়ে মিছিল যাবে তাত-লুয়াং-এর চত্বরে। এবার মনে হলো, সংবাদ ঘোষণাটি আমাদের চোখের সামনে বাস্তবে রূপায়িত হচ্ছে। আমি ও হলেণ শোভাযাত্রার একাগ্রতা, ছন্দময় পদক্ষেপ, বাহিত রকমারি পূজা উপাচারের সামনে অনেকটা সম্মোহিত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। মনে হয় সাময়িকভাবে ট্রাফিকমুক্ত জনপদে সিল্কের লীলায়িত এক নিসর্গ-অর্চনা পুষ্পের সৌরভ ছড়িয়ে, অলংকারের মৃদু নিক্কন তোলে, সমস্ত কিছু রঙিন করে দিয়ে চলে যাচ্ছে। আমরা খানিক দূর থেকে ভেসে আসা ঘন্টাধ্বনি শুনি। আমাদের সামনে দিয়ে এখন মিছিলের শেষ প্রান্ত পার হচ্ছে। ঘন্টাধ্বনি ক্রমশ উচ্চকিত হতে থাকে। আশপাশের সবাই সিমুয়াং মন্দিরের দিকে প্রবল আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে। আমরা একটি বৃহত্ হাতিকে হেলেদুলে ঘন্টা বাজিয়ে আসতে দেখি। সড়কের দু-পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজনের মধ্যে এক ধরনের উত্তেজনা ও আগ্রহ যুগপত্ তীব্র হয়। হাতিটি আমাদের কাছাকাছি এলে অনেকে ক্যামেরায় বৃহত্ এ পয়মন্ত প্রাণীটির ছবি তোলে। আলোকচিত্রীদের অনেকেই মনে হয় পর্যটক বা লাওসে বাসরত বিদেশি। লাও জনগণের কেউ কেউ গজরাজের সামনে বা পাশে হাঁটু গেড়ে নত মস্তকে প্রণাম জানাচ্ছে। আমি এক প্রণতকে লাও ভাষায় জিজ্ঞেস করি, 'আনি মেনিয়াং? অর্থাত্ ব্যাপারটা কী?' ভদ্রলোক হাঁটুর ধুলা ঝাড়তে ঝাড়তে জবাব দেন, 'ছ্যাঙ পুয়া অর্থাত্ সাদা হাতি।' শ্বেতহস্তী শব্দ শুনে আমি এবার প্রাণীটির দিকে নিরিখ করে তাকাই। গজরাজ বর্ণে মোটেই শ্বেত নয়, বরং এর গাত্রবর্ণ ঈষত্ গোলাপি ও খয়েরিতে মেশানো। হলেণ আমাকে তড়িত জিজ্ঞেস করে—এ হাতি পবিত্র কি না? আমি তাকে জানাই, 'শুধু পবিত্রই না; অনেকটা দেবতুল্য মর্যাদার অধিকারী।' সে আবার জিজ্ঞেস করে, 'আমাদের এ প্রাণীটির জন্য কিছু করা উচিত কি?' আমি দ্রুত ছুটে গিয়ে গাড়ির দরোজা খুলে বাজারের থলি থেকে তিন হালি কলা নিয়ে ফিরে আসি। হলেণকে বলি, 'শ্বেতহস্তীর সামনে নতজানু হয়ে ভোজ্যটি অর্পণ করো।' সে ঠিক সাহস করে উঠতে পারে না। গজরাজ সম্ভবত অলৌকিক ক্ষমতাবলে তার ইতস্ততা বুঝতে পারেন। শুঁড় বাড়িয়ে দিয়ে হলেণের হাত থেকে তুলে নেন কদলীর ছড়াটি। সে ভয় পেয়ে পা তিনেক পিছিয়ে যায়। শোভাযাত্রার ডামাঢোল ছেড়ে গাড়ির দিকে যেতে যেতে ভাবি, আজ সন্ধেবেলা কাজবাজ গুছিয়ে যেভাবেই হোক তাত-লুয়াংয়ের বৌদ্ধ স্তূপে জমায়েত মেলাটিতে যেতে হয়।

তাত-লুয়াং

ভিয়েনচান শহরের এক প্রান্তে তাত-লুয়াং বৌদ্ধ স্তূপের অবস্থান। ষোড়শ শতকে এ পবিত্র সোনালি স্থাপত্য নির্মাণ করান লাও রাজা সাঈ সিথাথিরাত। দেউড়ির বেশ উঁচুতে বিগত এ রাজার সাদামাটা মূর্তি। মনে হয় পাথরের রাজকীয় শরীর নিষ্পলকভাবে তাকিয়ে আছে তার মেধা, মনন ও দাপটে সৃষ্ট স্বর্ণালি স্তূপের দিকে। স্তূপটি বৃহত্ এক প্ল্য¬াটফর্মের ওপর চার ধাপে প্রায় পঁয়তাল্লি¬শ মিটার উঁচু। ধাপগুলো চতুষ্কোণ। নিম্নধাপের দেয়ালে তিন শত তেইশটি পদ্ম পাপড়ির অনুকৃতি। উপরের ধাপে পাপড়িগুলোর সংখ্যা দু-শ আটাশ; তবে প্রতিটি পাপড়িতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বুদ্ধ মূর্তি খোদাই করা। তাত-লুয়াংয়ের উত্সব চান্দ্র পঞ্জিকানুযায়ী অনুষ্ঠিত হয় প্রতি বত্সর এক বার শীতকালের সুনির্দিষ্ট পূর্ণিমা রাতে। স্তূপের আঙিনার বাইরে বাঁধানো মস্ত চত্বরে বসে জাতীয় প্রদর্শনী ও মেলা। এ ঢামাডোলে শরিক হন লাও দেশের শুদ্রভদ্র অভিজাত-চণ্ডাল সকলে। পর্যটকরাও এখানে অনামন্ত্রিত নন। গাঁও-গেরাম থেকে আসেন প্রার্থনা পতাকা হাতে সহস্র বৌদ্ধ ভিক্ষু। সাথে সাথে আসেন নারী-পুরুষ অজস্র ভক্ত-মনস্কামনা পূরণের মানত নিয়ে। আর আসেন অসংখ্য তামেশগির প্রদর্শনীর কৌতুকে শরিক হতে।

বছর দুয়েক হলো আমি ও হলেণ ভিয়েনচান শহরে আছি। প্রতিবারই ভাবি, তাত-লুয়াংয়ের মেলায় যাব, কিন্তু নানারকম ঝামেলায় সে আর হয়ে ওঠে না। গেল বার আমরা মেলা চত্বরের কাছাকাছি পর্যন্ত পৌঁছেছিলাম, কিন্তু গোল বাঁধাল আমাদের আড়াই বছরের কন্যা কাজরি। মেলা চত্বরের কাছাকাছি একটি শিশুপার্ক। অমরা যেই মেলার দিকে ধাওয়া করেছি, কাজরি চিত্কার করে অঙ্গুলি নির্দেশে পার্কটির দিকে ইশারা করল। বুঝতে পারলাম, আমাদের কন্যাটির আরাধনার চেয়ে নাগরদোলায় ঘূর্ণনেই আগ্রহ অধিক। কী আর করা, আমাদের আর সে-বার সোনালি স্তূপে সহস্র সন্ন্যাসীর মন্ত্র ধ্বনিময় মিছিল দেখতে যাওয়া হলো না।

আজ সকালে 'পাসাত্ পিয়োং' বা মোমের কেল্ল¬া নিয়ে চলমান মিছিল দেখে আমাদেরও তাত-লুয়াং-এ যাওয়ার আগ্রহ তীব্র হয়। রাত দশটা নাগাদ কাজরি ঘুমিয়ে পড়তেই তাকে বেবিসিটারের হাওলা করে আমরা দুজন রওয়ানা হলাম। এত রাতেও তাত-লুয়াংয়ের প্রান্তর লোকে লোকারণ্য, অনেকটা আমাদের মহররমের মেলার মতো। আমাদের পাশ দিয়ে গাঁদা ফুলে গাঁথা সাজি ও রুপালি তৈজসের ওপর টাকার মালা নিয়ে আস্তে ধীরে হাঁটেন দুই পূজারিণীসহ এক প্রৌঢ় পুরুষ। আমরা ভিড় ঠেলে অতি ধীরে মূল স্তূপের দিকে এগিয়ে যেতে থাকি। আমাদের দু-পাশে মানুষ, ভক্ত, সন্ন্যাসী, বেলুন বিক্রেতা ও ভেঁপুওয়ালা। পূজা অর্চনার কাজে ব্যবহারের দ্রব্য সামগ্রীর স্টলের পাশেই তারস্বরে উচ্চকিত হচ্ছে রক মিউজিক। আমরা ভেতরের আঙিনার কাছাকাছি এসে পৌঁছাই। বাদ্যে মৃদু নিনাদে জনস্রোত দু-দিকে সরে পথ করে দেয়। নাচের ছন্দে হাতের লীলায়িত মুদ্রায় কোমরের বিছাহারে নিক্কন তুলে সামনে বাড়ে কিশোরীদের ছোট্ট একটি মিছিল।

স্তূপের দেয়াল ঘেঁষে অসংখ্য ফুলের দোকান। কোনো কোনো দোকানে বিক্রি হচ্ছে মোমবাতি ও ধূপকাঠি। হলেণ ফুল কিনতে যায়। এখানে না-ফোটা পদ্ম ফুলের প্রাধান্যই বেশি। আমরা পছন্দ করি একটি ফুটন্ত শাপলা। আরেক মহিলা দোকানি আমাদের মোম ও ধূপকাঠি কিনতে প্ররোচিত করে। আমরা তাত-লুয়াং স্তূপের ভেতরের অঙ্গনে প্রবেশ করি। স্তূপের চূড়ায় কলার থোড়ের আকৃতির শীর্ষের ঠিক পেছনেই বৃহত্ গোলাকার পূর্ণ চাঁদ। প্রতিটি ধাপের সোনালি আস্তর, পদ্ম পাপড়ি ও বুদ্ধ মুখাবয়ব ভেসে যাচ্ছে জ্যোত্স্নার কিরণে।

আমরা পুষ্পস্তবক, মোম ও ধূপকাঠি নিয়ে ভক্তদের সাথে হাঁটি। স্তূপের মূলধাপের চারদিকে চারটি প্রার্থনা-মঞ্চ। আমরা উত্তরের মঞ্চের সামনে একটু দাঁড়াই। সারি বেঁধে দীক্ষিতরা সিঁড়ি বেয়ে উঠে যাচ্ছে ওপরে। আমাদের পরিচিত এক তরুণীর সাথে দেখা হয়। তাকে আমি প্রায়ই দেখি বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন কাউন্টারে। আমার পাসপোর্টে মোহর দিতে গিয়ে সে সর্বদা মিঠে করে হাসে। আজ তার সাথে এক বয়স্কা মহিলা। আমরা তাদের 'সাবাইদি' বলে সম্ভাষণ করি। সে আমার দিকে কৌতূহল নিয়ে তাকায়। সম্ভাষণের জবাবও দেয়, তবে আমি সে হাসিটির আর সাক্ষাত্ পাই না! তার চোখেমুখে ফোটে ওঠে এক অন্যমনস্ক একাগ্রতা। সে পুষ্প ও ধূপকাঠি হাতে সিঁড়ি বেয়ে উঠে যায় প্রার্থনা-মঞ্চে। বয়স্কা মহিলা হলেণকে লাও ভাষায় খানিক উদরদেশ ইঙ্গিত করে জানান যে, তরুণীর মনস্কামনা হচ্ছে একটি সন্তান লাভ। আমি হলেণকে মানত প্রথা বুঝাতে চেষ্টা করি। আমাদের সাথে আবার আরেক পরিচিত জনের দেখা হয়। কিশোরটি হলেণের পরিচিত। প্রায়ই আমাদের বাংলোয় আসে তার সাথে ইংরেজিতে কথা বলার জন্য। সে অধুনা 'টোফেল' পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে। হলেণ তাকে দুম করে জিজ্ঞেস করে বসে, 'তুমি কি টোফেলের জন্য মানত দিতে এসেছ?' ছেলেটি লজ্জিত হাসে।

ভিয়েনচান শহরটি আসলেই ছোট। এখানে পরিচিতজনেরা যেন সর্বত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন। আমরা পূর্বের প্রার্থনা-মঞ্চের সামনে মি. সুবানকে দেখি। মি. সুবান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ভাইস মিনিস্টার, এখানেও স্যুট পরে এসেছেন। তার হাতে মোম, ধূপকাঠি ও ফুল। উনি আমাদের দেখতে পান না। হলেণ জিজ্ঞেস করে, 'আন্দাজ করতে পারো উনি কিসের মানত দিতে এসেছেন?' আমি খানিক ভেবে জবাব দিই, 'বোধ হয় পলিট ব্যুরোর মেম্বার হওয়ার জন্য স্পেশাল মানত দিতে।'

উত্তরের প্রার্থনা-মঞ্চের নিচে শামিয়ানা খাটানো। এক সারি অতি বৃদ্ধ গৈরিক পরা ভিক্ষু বসে আছেন সেখানে। তাঁদের সামনে শিন্নির ডেগের আকৃতির নয়টি বৃহত্ পিতলের পাত্র। ভক্তরা অতি শ্রদ্ধায় হাঁটু গেড়ে পাত্রগুলোর পাশে গিয়ে অর্পণ করছেন তোড়া তোড়া কাঞ্চন নয় কিপ বা লাও টাকা। দানসত্রের সামনে থেকে শুরু হয় প্রথাগত 'ভিয়েন-তিয়েন' বা ঘূর্ণনচক্র। একজন গৈরিক পরা অশিতীপর 'আচান' বা আচার্য মাইক্রোফোনে পালি ভাষায় মন্ত্র পড়ে 'ভিয়েন-তিয়েন'-এর ঘোষণা দেন। মন্ত্রে 'প্রদশকিন' শব্দটি উচ্চারিত হয় বারকয়েক। 'কুরু' বা গুরু বলে পরিচিত আরেক ভিক্ষু; বয়সে তিনি বৃদ্ধ হলেও তুলনামূলকভাবে আচানের চেয়ে কম বয়স্ক, ভিয়েন-তিয়েনের উদ্যোগ নেন। তিনি সাড়ম্বরে মোমবাতি ও ধূপকাঠিতে আগুন দিয়ে পদচারণা শুরু করেন। নানা বয়সের অজস্র সন্ন্যাসী 'কুরু' বা গুরুকে তত্ক্ষণাত্ অনুসরণ করে। সন্ন্যাসীদের পেছন পেছন যুক্ত হয় আমজনতার ঢল—নারী, পুরুষ, শিশু, কিশোর সকলে।

আমরা তাদের সাথে জ্বলন্ত মোমবাতি, ফুল ও ধূপকাঠি নিয়ে ভিয়েন-তিয়েনে যোগ দিই। সোনালি স্তূপের চারপাশে অতি ধীরে করতে থাকি 'প্রদশকিন'। ক্রমশ ঘূর্ণন চক্রের ভিড় বাড়ে। মোমগুলো জ্বলে জ্বলে সৃষ্টি করে আলোর নানাবিধ রেখা। ধূপের গন্ধে প্রাণ কেমন অধীর হয়ে ওঠে। আমাদের পাশ দিয়ে হেঁটে যায় এক কিশোরী, মেয়েটি নির্বাক, চোখে তার জল। প্রার্থনা করার ভঙ্গিতে দু-হাত উর্ধ্বে তুলে এক বৌদ্ধ ভিক্ষু হাঁটতে থাকেন, তাঁর চোখ দুটি আধবোজা, ধূপকাঠি থেকে ধোঁয়া ওঠে চক্রাকারে। 'ভিয়েন-তিয়েন' চলে অনেকক্ষণ ধরে। ক্রমশ মনে হতে থাকে, এর কোনো শুরু কিংবা শেষ নেই। মনে হয় আমি ও হলেণ হাঁটছি চন্দ্রালোকে জন্ম-জন্মান্তর ধরে। স্বর্ণালি স্তূপের চারপাশে অনেক পুরোনো মোম নিভে যায়। আলোর রেখাচিত্র তাতে ম্লান হয় না এক বিন্দু। হাওয়ায় ভেসে আসা জোনাকির মতো জ্বলে ওঠে নতুন নতুন মোমের শিখা। তারপর একসময় রাত্রি আরও গভীর হয়। চত্বরে মন্ত্রপাঠ স্তব্ধ হয়ে আসে। কেবল শোনা যেতে থাকে ভক্ত ভিক্ষুকুলের লঘু পদধ্বনি।

অনেক রাতে আমরা বাসায় ফিরি। ভোরবেলা অ্যালার্মের আওয়াজে ভারি বিরক্তি বোধ হয়। শয্যা ছেড়ে উঠতে ইচ্ছা হয় না। কাজরি মশারির পাশে এসে উত্তেজক কিছু ঘটতে যাচ্ছে—এরূপ স্বরে ডেকে বলে, 'বাপি, গেট আপ, উই আর গোয়িং টু তাত-লুয়াং।' উঠতেই হয়। ঘড়িতে দেখি রাত তিনটা, একটু বিরক্তি নিয়ে বেডরুমের বাইরে আসি। লিভিংরুম আলো করে দাঁড়িয়ে আছে আমার কন্যা ও তার জননী। দুজনের পরনেই অতি মিহি সিল্কের লাও পাসিন, চুল চূড়া করে বাঁধা। তাদের হাতে দুটি রুপালি গোলাকার পাত্র পরিপূর্ণ ভিক্ষুদের জন্য দান সামগ্রীতে। আমাকে জানানো হয় যে, আমরা সকলে তাত-লুয়াং এ 'তাকবাত' বা ভিক্ষুদের অন্নদান করতে যাচ্ছি। অতি অনিচ্ছায় প্রস্তুত হই। ঘরের বাইরে এসে দেখি কাজরির বেবিসিটার নংছাও, আমাদের কেয়ারটেকার নাঙ ভওয়ান ও তার ছোট্ট পুত্র কন্য পুই ও নুই সকলে একটি টুকটুক বা টেম্পো নিয়ে তাত-লুয়াংয়ে যাত্রার জন্য তৈরি। আমরা সকলের সাথে টুকটুকে আরোহণ করি। তাত-লুয়াংয়ের আশে পাশে সারা রাতে ভিড় এতোটা বেড়েছে যে, টুকটুককে ট্রাফিক পুলিশ বেশ আগেভাগেই থামিয়ে দেয়। আমরা ধীরে ধীরে পায়ে হেঁটে স্তূপের চত্বরে আবার প্রবেশ করি।

রাত তখন কেবল ভোর হচ্ছে। বাইরের আঙিনায় মনে হয় আরও শ-পাঁচেক গৈরিক পরা সন্ন্যাসীর সমাগম হয়েছে। সকলে বসে আছেন পঙিক্ত রচনা করে। সন্ন্যাসীদের বিপরীতে সারি বেঁধে আসন নিয়েছেন অসংখ্য 'মেকাও' বা সাদা শুভ্র ধুতি পরা কর্তিত চুলের নারী ভিক্ষু। ভেতরের আঙিনায় প্রবেশের মুখে কাজরি ফুল কেনার জন্য অস্থির হয়ে পড়ে। আমি সবাইকে স্তূপের দ্বারে দাঁড় করিয়ে রেখে তাকে ফুল বিক্রেতাদের কাছে নিয়ে যাই। সে একটি নীল পদ্ম পছন্দ করে।

অবশেষে আমরা সকলে স্তূপের ভেতরের চত্বরে আসি। এখানে জনসংখ্যা বেড়েছে রাতের চেয়ে অনেকগুণ বেশি। অনেকে রুপালি দানভাণ্ড সামনে রেখে চাতালে মাদুর পেতে বসে আছেন। আমরা নাঙ ভওয়ানদের সাথে তাদের পাতানো মাদুরে বসি। আমাদের সামনে সোনালি স্তূপকে ভোরবেলার মায়াবী আলোয় অনৈসর্গিক বোধ হয়। স্তূপ চূড়ার প্রেক্ষাপটে মেঘমালা যেন আবিরে ছেয়ে যায়। আমরা বসে বসে শেষবারের মতো শুকতারা জ্বলে উঠতে দেখি।

পেছনে স্তূপের দেয়াল সংলগ্ন টালির ছানি দেওয়া প্রাচীন চালায় বসে আছেন সারা দেশ থেকে আগত অসংখ্য সন্ন্যাসী। তাঁদের সকলের সামনে একটি করে ভিক্ষাপাত্র। ক্রমশ তাদের গেরুয়া বসন উজ্জ্বল হতে থাকে। আকাশে মেঘের বর্ণ হয়ে আসে শুভ্র নীল। আমাদের সামনে তাত-লুয়াংয়ের আকৃতি ফুটে ওঠে স্পষ্ট রূপে। সূর্যরশ্মিতে ধাপে ধাপে সৃষ্টি হয় আলোছায়া নকশা।

আমাদের পাশ দিয়ে হেঁটে যান বৃদ্ধ এক শ্বেতাঙ্গ পর্যটক দম্পতি। সামনের ঘাসে অবস্থান নিয়ে দুজনে মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে বারবার প্রণাম করেন। হলেণ ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করে, 'ওরা ধর্মান্তরিত হয়ে গেল নাকি?' আমি জবাব দিই, 'শ্বেতহস্তী দেখার পর আমারই ধর্মান্তরিত হওয়ার বাসনা হচ্ছে। শুকতারার আলোয় তাত-লুয়াংকে দেখে যে কারোরই মনে হতে পারে, ধর্ম এটাই সঠিক!' আমরা আরও খানিক ফিসফিস করে কথা বলি ও কোনো কারণ ছাড়াই হাসি। হঠাত্ করে খেয়াল হয় কাজরি মাদুর ছেড়ে উধাও হয়েছে। আমি উঠে দাঁড়িয়ে তাকে খুঁজি। অনেকেই হাতের ইশারায় আমাকে দেখান—ছোট্ট মেয়েটি ভক্তকুলের মধ্য দিয়ে এঁকেবেঁকে অনেকদূর চলে যাচ্ছে। আমাকে অতি সাবধানে দ্রুত ছুটতে হয়। ভক্তদের সাথে ধাক্কা না লাগানোর জন্য প্রাণপনে চেষ্টা করি। কাজরি তার ছোট্ট শরীর নিয়ে অতি দ্রুততার সঙ্গে অগ্রসর হচ্ছে, তার হাতে উঁচু করে ধরা নীল পদ্মটি। সে এবার সন্ন্যাসীদের জন্য নির্দিষ্ট চালাঘরের পাশ দিয়ে যাচ্ছে। তার পথ রোধ করে দাঁড়ায় ছোট্ট বছর ছয়েকের গেরুয়া পরা এক শিশু ভিক্ষু। মনে হয় দুজনে কথা বলছে। আমি ততক্ষণে খান চারেক মাদুর পাড়ি দিতে সমর্থ হয়েছি। অবশেষে আমি যখন তাদের কাছাকাছি এসে পৌঁছাই, কাজরি তখন শিশু ভিক্ষুটিকে নীল পদ্ম দিচ্ছে।

আমি তাকে দ্রুত কোলে তুলে নেই। সে আমাকে বলে, 'বাপি আই লাভ হিম, আই ওয়ান্ট টু প্লে¬ উইথ হিম।' আমি তাকে বলি, 'পরে যদি কখনো তার সাথে দেখা হয় তবে অবশ্যই তুমি তার সাথে খেলবে,' বলে উল্টোদিকে আমাদের মাদুরের পানে হাঁটি। হঠাত্ করে মনে হয় দু-পাশের ভক্তকুল অতি সম্ভ্রমে কাকে যেন পথ ছেড়ে দিচ্ছেন। আমি একপাশে সরে গিয়ে সামনে তাকাই। ভিড়ের ফাঁক গলে গলে হেঁটে আসছেন সাবেক রাষ্ট্রপতি, বর্তমানে প্যলিট ব্যুরোর উপদেষ্টা তান নুহাক, তাঁর পেছনে প্রধানমন্ত্রী তান শিশুভাত ও সংসদের সভাপতি তান সমান ভিয়াকত। তাঁদের পেছন পেছন ধীর পায়ে হাঁটেন গতরাতে দেখা বৃদ্ধ 'আচান' বা আচার্য ও 'কুরু' বা গুরু।

আমি ও কাজরি মাদুরে ফিরে আসার অল্পক্ষণের মধ্যেই শুরু হয় প্রভাতি প্রার্থনা। অতি সংক্ষিপ্ত 'রিচ্যুয়াল', মাইক্রফোনে তিন বার উচ্চারিত হয়—'নামোতাসসা ভগবতো আরাহাত্যে সামু সামবুদ্বাসা'; ভক্তকুল বুকের কাছে করজোড় করে শূন্যতার দিকে তাকিয়ে থাকে খানিক। তারপর সকলে নতজানু হয়ে মাটিতে মাথা ঠেকায়। চত্বর ঈদের জামাতের সিজদার দৃশ্য যেন ফুটে ওঠে। আমি এ সুযোগে খান কতক আলোকচিত্র তুলি। প্রভাতি প্রার্থনার পর শুরু হয় সন্ন্যাসীদের ভিক্ষা ভাণ্ডে দান সামগ্রী অর্পণ। আমার কন্যা ও তার জননী নাঙ ভওয়ানদের সাথে দানপাত্র হাতে সারিতে দাঁড়ায়। আমার ক্লান্ত লাগে তাই মাদুরে বসে থাকি একাকী। দু-পাশ দিয়ে সারির পর সারি ভক্তকুল হেঁটে যায় ভিক্ষুদের চালার দিকে। আমি স্বর্ণালি বৌদ্ধ স্তূপের দিকে তাকিয়ে থাকি। মনে হয় তাত-লুয়াং মেঘে মেঘে ভেসে যাচ্ছে শুকতারার দিকে। তার পেছন পেছন ছুটছে অজস্র ভিক্ষু ও ভক্তকুল। দিগন্তের কাছে ছোট ছোট দুটি বিন্দু দেখা যায়। বিন্দু দুটি স্পস্ট হতে থাকে। আমি পরিষ্কার দেখি, আমার মেয়ে ও শিশু ভিক্ষুটি খিলখিল করে হেসে ছুটছে আকাশ থেকে আকাশে। শিশু ভিক্ষুর হাতে ধরা নীলপদ্ম। হলেণের মৃদু ধাক্কায় ঘোর কাটে। সে জিজ্ঞেস করে, 'হোয়াট হ্যাপেনড্?' আমি জবাব দিই, 'এই একটু ভাবসমাধি হয়ে গেল!' সে রূপকটির মর্মার্থ বুঝতে না পেরে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে।

এই পাতার আরো খবর -
font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেছেন, 'রাজনৈতিক দল হিসাবে কর্মকাণ্ড করার কোনো অধিকার জামায়াত রাখে না।' আপনিও কি তাই মনে করেন?
3 + 1 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
সেপ্টেম্বর - ১৮
ফজর৪:২৯
যোহর১১:৫৩
আসর৪:১৭
মাগরিব৬:০৩
এশা৭:১৬
সূর্যোদয় - ৫:৪৫সূর্যাস্ত - ০৫:৫৮
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :