The Daily Ittefaq
ঢাকা, সোমবার ০৫ আগস্ট ২০১৩, ২১ শ্রাবণ ১৪২০ এবং ২৬ রামাযান ১৪৩৪
সর্বশেষ সংবাদ হাইকোর্টের রায় বহাল; নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না জামায়াত | আপিল করেছেন গোলাম আযম | অষ্টম মজুরি বোর্ডের সুপারিশে মন্ত্রিসভার একমত

উপন্যাস

লুপ্তপ্রায় মানুষদের নিয়ে সত্যি রূপকথা

জাকির তালুকদার

করতোয়াপারের বগুড়া থেকে শুরু করে তিস্তাপারের পাগলাপীর-রঙ্গপুর হয়ে পুনর্ভবা-ঘাঘটের জনপদগুলির দুই পাশে যেখানেই বড় বটগাছ দেখেছে, সেখানেই পরাজিত ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহীদের ফাঁসিতে লটকে রেখেছিল ইংরেজরা দিনের পর দিন। যাতে মানুষ দেখে, আর ভয় পায়, আর শিক্ষা নেয় যে ইংরেজদের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে গেলে ফলাফল এটাই হবে। এই এলাকায় তাই ফাঁসিতলা নামের গ্রাম অনেকগুলি। তবে অফিস থেকে বলা হয়েছে, তার পোস্টিং যে ফাঁসিতলাতে, সেটি গাইবান্ধার খুব প্রমিন্যান্ট একটা গ্রাম এবং গঞ্জ। অতএব চলো ফাঁসিতলা।

বাসের মধ্যে প্রায় পুরো সময় গজগজ করেছে সেজো ভাই। ঘুরেফিরে একই কথা বারবার বলেছে। তা হলো, শুধু শুধু জেদ করছে নাজ! চাকরি তো করবেই না; নেমেই হয়তো ফিরতি বাস ধরতে চাইবে। লাভের মধ্যে ভোগান্তিই সার।

নাজ কয়েকবার অবশ্য শান্ত গলায় বলতে চেয়েছে যে, সেজো ভাই না এলেও পারত। কিন্তু ঠিক যে কারণটা বাড়িতে উচ্চারিত হয়েছে, সেই একই কারণ এ ক্ষেত্রে উল্লেখ করেছে সেজো ভাই—ভাই হিসেবে, অভিভাবক হিসেবে তাদের দায়িত্ব তো আর তারা পালন না করে পারে না! যে বোন তাদের সবার ছোট, সবার আদরের, যে বোন কখনো ঢাকার বাইরে দূরের কথা—ঢাকার মধ্যেও একমাত্র ক্লাস করতে ছাড়া একা কোথাও যায়নি, সেই নাজকে তারা কীভাবে একা যেতে দেবে ঢাকা থেকে তিন-শ কিলোমিটার দূরে উত্তরবঙ্গের এক অখ্যাত গ্রামে। তা ছাড়া মনে মনে মায়ের একটা ক্ষীণ আশা ছিল। মেয়ে এনজিওর চাকরি নিয়ে গ্রামে যাচ্ছে বটে, কিন্তু কোনোদিন যেহেতু সে গ্রামে থাকেনি, তাই দু-একদিনের মধ্যেই তার গ্রামের মোহ কেটে যেতে পারে। ফলে ফিরে আসার জন্যও তার সাথে কাউকে চাই। সেই আশাতেই সেজো ভাইকে সঙ্গে জুড়ে দেওয়া।

সেই ভোর ছটায় উঠে গাবতলী ছোটা, তারপর গাদাগাদি ভিড়ের মধ্য ভারী ব্যাগ কাঁধে নিয়ে টার্মিনালের নোংরা পায়ে মাড়িয়ে বাস খুঁজে বের করতে করতেই এনার্জি অর্ধেক ফুরিয়ে যায়। বাসটা অবশ্য মোটামুটি আরামদায়ক। আর রাস্তাও বেশ ভালো। টাঙ্গাইলের পরের হাইওয়ে তো রীতিমতো মসৃণ, আন্তর্জাতিক মানের। কিন্তু বাস চলছে তো চলছেই। তিন, চার, পাঁচ ঘণ্টা পেরিয়ে যখন ছ-য়ে পড়ল সময়ের কাঁটা, সেজো ভাই ততক্ষণে সহিষ্ণুতার সীমা পেরিয়ে গেছে—এর চেয়ে কম সময়ে তো ঢাকা থেকে লন্ডনে পৌঁছানো যায় রে!

আরও একবার বোনকে বোঝানোর উদ্যোগ নিতে যাচ্ছিল সে। কিন্তু সেই চেষ্টা বাড়িতে সবাই মিলে কয়েকদিন ধরেই করা হয়েছে। কাজ হয়নি। তারা সবাই নাজের সামনে অনেক বিকল্প তুলে ধরেছিল। কেবল তো এমবিবিএস পাস করলি, ইন্টার্নিশিপ শেষ হলো তিন মাসও হয়নি, এর মধ্যেই তোকে চাকরির জন্য ব্যতিব্যস্ত হতে হবে কেন? তারচেয়ে পিজিতে গাইনি কিংবা মেডিসিনে বড় প্রফেসরের আন্ডারে অনারারি ট্রেনিং করো। এক বছরের ট্রেনিং নিলে এফসিপিএস পরীক্ষায় বসতে পারবি। এর ফাঁকে ফাঁকে বিসিএসটাও হয়ে যাবে। আর যদি চাকরি করতেই হয় তো ঢাকা শহরে কি তার অভাব আছে? বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ থেকে পাস করা বেকার ডাক্তাররা ঢাকায় ভিড় করছে, কিছু না কিছু করে খাচ্ছে আর তুই কি না ঢাকা মেডিকেল থেকে পাস করে, ঢাকায় নিজেদের বাড়ি থাকতেও এনজিওর চাকরি নিয়ে পাড়ি জমাচ্ছিস গণ্ডগ্রামে! আর কিছু না হলেও বড় ভাইয়ের বন্ধুদের ক্লিনিকে তো চাকরি করাই যেত। একটু চোখ-কান খোলা রাখলে মনবুশো বৃত্তি নিয়ে জাপান কিংবা কমনওয়েলথ স্কলারশিপ নিয়ে কানাডা-অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমানো যেত। আবার বেসরকারি ফার্ম কিংবা এনজিওতে চাকরি করতে চাইলে ঢাকায় কি পোস্টিং পাওয়া যেত না? তার ভাইদের বললেই হতো। কিন্তু নাজ কাউকে কোনোকিছু না জানিয়ে পত্রিকার পাতায় এএফপি বা অ্যাসিসট্যান্স ফর দি পুওর-এর সার্কুলার দেখে দরখাস্ত করেছে। ইন্টারভিউ দিয়ে জয়েনিং লেটার পাওয়ার পর বাড়িতে জানিয়েছে যে সে চাকরি করতে যেতে চায় গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার ফাঁসিতলা গ্রামে। হায়রে চাকরি! আর বেতনের অংক শুনে তো বাড়ির লোকের বমি হয়ে যায় আর কি! ওই টাকা তো বড় ভাইয়ের দুই ছেলের ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের মাসিক খরচের চেয়েও কম। তাহলে কেন নাজের এই অহেতুক জেদ? সে উত্তর কেউ পায়নি। নাজ কোনোকিছু ব্যাখ্যা করেনি। শুধু বলেছে—আমি যাব!

ঢাকা-রংপুরের কোচ ওদের গোবিন্দগঞ্জে নামিয়ে দিল। ওরা নামল, ব্যাগ নামানো হলো, তারপরেই বাস ঝাঁ ঝাঁ করে চলে গেল। ধাতস্ত হয়ে চারপাশে তাকিয়ে একটু দমে গেল নাজ। উত্তর-দক্ষিণে লম্বালম্বি চলে যাওয়া হাইওয়ে, রাস্তার দু-ধারে ছড়ানো-ছিটানো কয়েকটা দোকান, পূর্বদিকে একটা যাত্রীছাউনি গোছের চল্টাওঠা সিমেন্টের কাঠামো, কয়েকটা ভ্যানরিকশা নিয়ে কার্তিকের পড়ন্ত দুপুরে যেন ঝিমোচ্ছে লোকালয়টা। এত নিরুত্তাপ দুপুর আগে কখনো দেখেনি নাজ। সেজো ভাই মানুষ খুঁজছে। শেষমেশ এগিয়ে গেল পান-বিড়ির দোকানের দিকে। দোকানদারের বয়স বড়জোর তেরো-চোদ্দ। মনে হয় বাপকে দুপুরের খাবার এবং দিবানিদ্রার সুযোগ দিয়ে সে দোকানে প্রক্সি দিচ্ছে। সেজো ভাই বিড়ি-সিগারেট-পান কিছু না চেয়ে ফাঁসিতলা কোনদিকে জানতে চাওয়ায় সে একটু নিরুত্সাহিত হলেও পথ বাতলাতে দেরি করল না। বাঁ হাত দিয়ে দক্ষিণমুখো দেখাল—ওই দিকত যাওয়া লাগবি।

কদ্দুর?

বেশি না। তিন-চার মাইল।

তিন-চার মাইল! সত্যি?

হ্যাঁ রে, বাহে! ওই গাঁয়েত হামার খালার বাড়ি। হাটবারে হাটবারে সেটি হামার যাওয়াই লাগে।

তা যাব কীসে?

ওই ভ্যানত চল্যা যান।

ভ্যান-রিকশায় উঠতে হবে তাদের! সেজো ভাইয়ের যেন বিশ্বাসই হতে চায় না।

হাঁট্যাও যাতে পারেন। হামরা তো হাঁট্যাই বেশি যাই। ছেলেটা ফিক করে হাসে।

সেজো ভাই আর কথা বাড়াল না। একজন ভ্যানঅলা ফাঁসিতলা যেতে রাজি হওয়ায় কোনো দরদাম না করেই নাজকে নিয়ে উঠে পড়ল। পুরো রাস্তা কোনো কথা হলো না। নাজ ভেতরে ভেতরে অপরাধবোধে ভুগছে। না, এখানে চাকরি করতে আসার ব্যাপারে তার কোনো দ্বিধা বা অপরাধবোধ নেই। তার দুঃখ হচ্ছে সেজো ভাইয়ের জন্য। বেচারা জরুরি কাজ ফেলে শুধু তার জন্যই আজ ঢাকা ছেড়ে এসেছে। তার ওপর তাকে উঠতে হয়েছে ভ্যানে। তার মতো সাহেবি কেতার মানুষের জন্য ব্যাপারটা কতখানি কষ্টদায়ক, নাজ তা বোঝে। তার ভয় হচ্ছে, সামনের পরিস্থিতিগুলো সেজো ভাইয়ের মেজাজ হয়তো আরও খারাপ করে দেবে।

ফাঁসিতলা বাজারে পৌঁছিয়ে ভ্যানঅলা জিজ্ঞেস করল—কোনঠে নামবেন?

এএফপির হাসপাতাল।

ভ্যানচালক বাজার পেছনে ফেলে বাঁয়ের চল্টাওঠা রাস্তায় ঢুকল। সেজো ভাই, নাজ—দুজনেই অনভ্যস্ত ভঙ্গিতে বসে আছে ভ্যানে। বসার জায়গার পাশের কাঠ শক্ত হাতে চেপে ধরে কোনোক্রমে ভারসাম্য বজায় রেখেছে। কিন্তু এবড়োখেবড়ো রাস্তায় এসে কঠিন হয়ে পড়ল বসে থাকা। তবু ভাগ্য ভালো যে দূরত্ব বেশি না। সামনে চোখে পড়ল তীরচিহ্ন দেওয়া সাইনবোর্ড—'এএফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্র'। কিন্তু ভ্যানচালক যে বাড়িটার সামনে তাদের নামিয়ে দিল তার চেহারা দেখে সেজো ভাই তো বটেই, নাজের মনটাও দমে গেল। পূর্ব-পশ্চিমে লম্বা বাড়িটা। ইটের গাঁথুনি। তবে বাইরের দিকে কোনো প্লাস্টার নেই। নিচু টিনের চালা। জানালাগুলো ছোট ছোট ঘুলঘুলির মতো। গাঁয়ের হাইস্কুলের লম্বা বাড়ির মতো এই বাড়ির মাঝামাঝি জায়গায় পাশাপাশি দুজন ঢোকার মতো একটা স্টিলের গেট। তার গায়ে রাস্তার ধুলোর আস্তরণ। বাড়িটাতে কোনো সাড়াশব্দ নেই। নাজের মনে পড়ল আজ শুক্রবার। ছুটির দিন। হোক ছুটির দিন। তবু তো স্বাস্থ্যকেন্দ্র। আর হেড অফিসে তাকে বলা হয়েছে যে তাদের স্বাস্থ্যকেন্দ্রেই অফিস। এবং কর্মীদের বাসস্থানও সেখানে। তাহলে তো মানুষজন থাকার কথা।

নিঃশব্দ বাড়িটার পাশে কলার বাগান, পশ্চিমপ্রান্তে হাটের শেষাংশ, ফলে কয়েকটা দোকানের ছাউনি। কিন্তু আজ হাটবার নয় বলেই বোধহয় সেগুলো জনশূন্য।

কিছুক্ষণ কিংকর্তব্যবিমূঢ়ের মতো দাঁড়িয়ে থেকে নাজ স্বগতোক্তি করল—কেউ নাই না কি?

থাকবি না ক্যা! আছে। এই অফিসের মানুষজন ভিতরেই থাকে। বলে এগিয়ে গিয়ে ভ্যানচালক দমাদম বাড়ি মারল স্টিলের দরজায়।

বাড়ির ভেতরে বেশ দূর থেকে শব্দ ভেসে এল—কে?

প্রত্যুত্তরে দরজায় আবারও দমাদম বাড়ি মারল ভ্যানচালক।

একটা পায়ের শব্দ দরজার কাছে এল। ক্যাঁচক্যাঁচ করে ছিটকিনি খোলার শব্দ। সেই সঙ্গে আবারও ভেসে এল পুরুষকণ্ঠ—কে?

আপনের অফিসে লোক আসিছে। খুলেন!

দরজা খুলে উঁকি দিল মেটেরঙা এক মুখ। একটু পরখ করল তিনজনকে। তারপর মুখটা হাসি হাসি হয়ে উঠল। হাত তুলল কপালে—স্লামালেকুম। আপনেরা?

সেজো ভাইয়ের মুখ বিরস। নাজ তাড়াতাড়ি বলল—আমি ডাক্তার। ঢাকা থেকে আসছি। আগামীকাল থেকে আমার এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে জয়েন করার কথা।

এবার শশব্যস্ত হয়ে উঠল লোকটা। দরজা পুরোটা খুলে বেরিয়ে এল। ট্র্যাভেল ব্যাগ দুটো তুলে নিল ভ্যান থেকে—আসেন! আসেন!

সেজো ভাই ভাড়া মিটিয়ে ভ্যানচালককে বিদায় করতে ব্যস্ত থাকায় তার আগেই বাড়ির মধ্যে ঢুকতে পারল নাজ। দরজা পেরোনোর সঙ্গে সঙ্গে দুই দিকে দুই বারান্দা। ডানদিকের বারান্দাটা পাকা। বাঁ-দিকেরটা কাঁচা মাটির, শুধু বারান্দার পাড় ইটের গাঁথুনি দিয়ে তৈরি। নাজকে নিয়ে বাঁ-দিকের বারান্দায় উঠল লোকটা। ব্যাগ নামিয়ে রেখে প্রথম ঘরটার শিকল খুলল—আসেন ডাক্তার আপা। ভিতরে আসেন!

সে দ্রুতহাতে সুইচ টিপে আলো জ্বালাল, ফ্যান চালাল। ঘরের মধ্যে বেশ কয়েকটি টেবিল আর চেয়ার। দুটো হাফ সেক্রেটারিয়েট টেবিল। দুটো গদিমোড়া হাতলঅলা চেয়ার। অন্য চেয়ার-টেবিল আর র্যাকগুলো খটখটে কাঠের।

নাজকে একটা গদিমোড়া চেয়ারের দিকে ইঙ্গিত করল লোকটা—বসেন আপা! আপনার সঙ্গে...

উনি আমার বড় ভাই। আপনার পরিচয়?

আমি রইস। বাবুর্চি।

ও। অফিসের লোকজন নাই?

সব্বাই আছে। টেলিভিশন দেখতাছে। শুক্কুরবারে বাংলা সিনেমা হয়। আমি ডাকতাছি। আপনেরা বসেন।

ওদেরকে বসিয়ে বেরিয়ে যায় রইস।

ঘরের চারদিকে তাকায় নাজ। দেয়ালের একদিকে ঝুলছে হাতে আঁকা ম্যাপ। কর্ম এলাকার ম্যাপ। আরেকদিকের দেয়ালে একটা হার্ডবোর্ডে তৈরি বোর্ড। সেখানে আর্টপেপারে কয়েকটা গ্রাফ আঁকা। বোঝা গেল, ওগুলো মাসিক কর্মকাণ্ডের সূচক নির্দেশ করছে।

লোকজন এল। রইস ছাড়াও ছয়জন মহিলা, তিনজন পুরুষ। ওরা এসে সালাম দিয়ে দাঁড়াল ঘরের দরজার আশপাশে। এই সময় এল আরেকজন পুরুষ। ঘুমজড়ানো চেহারা। লুঙ্গির গিট বাঁধতে বাঁধতে আসছে। গায়ে হাওয়াই শার্ট। এসে তাকে সালাম দিয়েই কর্তৃত্বপূর্ণ গলায় হাঁকল সে—রইস!

জে স্যার!

আপার জিনিসপত্র উনার ঘরে পৌঁছে দাও! আর গেস্টরুম রেডি আছে তো? ভাইয়াকে সেখানে নিয়ে যাও!

এবার নাজের দিকে ফিরে বলল—আমি নূরুল আলম। ইউনিট ম্যানেজার। আপনার আসার খবর আমি জানি। তবে ভেবেছিলাম যে আপনি আগামীকাল আসবেন।

অসময়ে এসে আপনাদের বিশ্রামে ব্যাঘাত ঘটালাম।

না না ! লজ্জিত স্বরে বলল নূরুল আলম—আসলে ছুটির দিনে এই দুপুর বেলাটায় করার কিছু নাই তো, তাই নিজের ঘরে শুয়ে বই পড়তে পড়তে চোখ এঁটে এসেছিল।

অন্যদের দিকে ইশারা করে ম্যানেজার বলল—ইনারা সবাই আমাদের কর্মী। তবে সবার সঙ্গে আলাপ-পরিচয় পরে করলেও চলবে। আগে আপনারা বিশ্রাম নিন। হাত-মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে নিন। আপনাদের তো দুপুরের খাওয়া হয়নি।

নাজ মাথা নেড়ে জানায়—হাইওয়ে রেস্তোরাঁয় খেয়ে নিয়েছি।

তাহলে আপনারা হাত-মুখ ধুয়ে নেন। এর মধ্যই রইস চা বানিয়ে ফেলবে। রইস, তুমি আপার ব্যাগ উনার ঘরে নিয়ে যাও!

সেজো ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে ম্যানেজার বলল—ভাইয়া, আপনে আমার সঙ্গে আসেন। গেস্টরুমটা এই দিকে। আর আপনারা তো ডাক্তার আপাকে চিনলেন। আলাপ-পরিচয় পরে হবে। এখন যান, সিনেমা দ্যাখেন গিয়া।

সবাই সিনেমা দেখতে চলে গেলেও একটা মেয়ে রয়ে গেল। নিজে থেকেই বলল—ডাক্তার আপা, আমার নাম মুন্নী। আমি পিও।

পিও মানে?

প্রোগ্রাম অর্গানাইজার। মানে কর্মসূচি সংগঠক। চলেন, আপনার ঘর দেখাই।

যে ঘরে ওরা বসেছিল, সেটা অফিসরুম। দরজা দিয়ে বেরোলেই পর্দাঢাকা বারান্দায় লম্বা খাবার টেবিল। অফিসরুমের পাশের ঘরটা স্টোররুম। তার পরে একটা দড়মার বেড়া দিয়ে পৃথক বাসা। বেড়ার পরে বড় ঘরটা মেয়েদের। মুন্নী বলল—এই ঘরে আমরা থাকি।

পরের ঘরটা ডাক্তার আপার জন্য। ছোট ঘর। কিন্তু একার জন্য যথেষ্ট। ছোট একটা খাট, একটা টেবিল, একটা চেয়ার, একটা আলনা।

বারান্দার পর হাত তিনেক চওড়া উঠোন। তার পরে বাথরুম, কলতলা। মুন্নী বলল—আপা, আপনি কাপড় পাল্টান, বাথরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নেন। তারপরে আমাকে ডাক দিলেই আমি এসে আপনার জিনিসপত্র গুছিয়ে দেব।

এবার ভালো করে মেয়েটার দিকে তাকাল নাজ। মাঝারি উচ্চতার ফর্সা, বেশ সুন্দরী, সপ্রতিভ মেয়েটা। আচরণে কোনো জড়তা নেই। ভালো লাগল নাজের। জিজ্ঞেস করল—আপনার বাড়ি কোথায়, মুন্নী?

বাড়ি তো কাছেই। রংপুরে।

রংপুরে বাড়ি। তো বাহে বাহে বলছেন না যে!

হেসে ফেলল মুন্নী—সবসময়ই বাহে বলি। আপনে নতুন মানুষ। তাই আপনার সামনে শুদ্ধভাবে বলার চেষ্টা করছি।

বেরিয়ে গেল মুন্নী। প্রথমে ব্যাগ খুলে নিজের বেডশিট বের করল নাজ। বিছানার ওপর বিছিয়ে দিয়ে তারপর বসল বিছানাতেই। বিছানা তাকে টানছে। মনে হচ্ছে শুয়ে পড়ে। কিন্তু আগে হাত-মুখ ধোয়া দরকার। আর চায়ের তেষ্টা পেয়েছে খুব।

চায়ে একবার চুমুক দিয়েই মুখ তেতো করে ফেলল সেজো ভাই। বোঝা গেল কষ্ট করে তরল পদার্থটুকু গলার মধ্যে চালান করল বেচারা। তারপর নাজকে অবাক করে দিয়ে বলল—অমি এখনই চলে যাব।

মানে! মানে হলো, এখান থেকে গোবিন্দগঞ্জে যাব। নাইট কোচের টিকিট কেটে উঠে বসব গাড়িতে। ভোরে পৌঁছে যাব ঢাকায়।

ম্যানেজার বলল—এত তাড়াহুড়ার কী আছে, ভাইজান! এলেন, এলাকাটা ঘুরে-ফিরে দেখেন। দুই-একদিন থাকেন। তারপর যাবেন।

ম্যানেজারকে পুরোপুরি উপেক্ষা করল সেজো ভাই—এখানে কোনো ভদ্রলোক কীভাবে থাকে বুঝতে পারি না। বাথরুমের অবস্থা দেখেছিস? ঢুকলেই বমি বেরিয়ে আসতে চায়।

ম্যানেজারের মুখ কালো হয়ে গেল। বিব্রত হয়ে নাজ বলল—এই গ্রামে তুমি কোথায় পাবে টাইলস বসানো কমোড!

ওসব বুঝি না। তুই সাধ করে এই নরকে থাকতে এসেছিস। থাক! কিন্তু আমি আর এক মুহূর্তও এখানে থাকতে রাজি না।

যাও! নাজের গলায় কাঠিন্য নজর এড়াল না কারও—তুমি যেতে চাইছ, যাও। কিন্তু শুধু লিভিং-স্ট্যান্ডার্ড দিয়ে ভদ্রলোকত্ব বিচার করা যায় না, এটা মনে রেখো।

হাঁ হয়ে গেল সেজো ভাই—কি, তুই আমাকে জ্ঞান দিচ্ছিস!

পরিবেশটা অস্বস্তিকর হয়ে উঠল। রইস দাঁড়িয়ে আছে মুখে অর্থহীন হাসি নিয়ে। ম্যানেজার বেচারা প্রচণ্ড ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে। শীতের দিনের সন্ধ্যার মতো থমথমে হয়ে গেছে পরিবেশ। হঠাত্ হালকা চালে হেসে উঠল নাজ—ওহো, আমি ভুলেই গেছিলাম, নিজের বিছানায় না শুলে তোমার তো ঘুমই আসে না। কাজ নেই বাবা, তোমার রাতজেগে কষ্ট করার। তুমি বরং নাইট কোচেই চলে যাও। বাড়িতে বলো, আমাকে নিয়ে কেউ যেন দুশ্চিন্তা না করে।

সেজো ভাই রইসকে উদ্দেশ করে বলল—আমাকে গোবিন্দগঞ্জে যেতে হবে। দ্যাখো তো ভাই, একটা রিকশা বা ভ্যান কিছু পাও নাকি!

ম্যানেজার উঠে দাঁড়াল—তার দরকার নেই। আমি আপনাকে মোটরসাইকেলে নিয়ে যাচ্ছি। একেবারে ঢাকা কোচে উঠিয়ে দিয়ে ফিরব।

দুই

সকাল যে এত আলোময় হতে পারে, নাজের ধারণাই ছিল না। তারা ঢাকায় তো কখনো সকাল দেখে না। ভারী পর্দার ফাঁক দিয়ে আলো ঘরের মধ্যে ঢোকে না বললেই চলে। মেডিকেল কলেজে ক্লাস শুরু হতো সাড়ে সাতটায়। সেই কারণে নাজকে বাড়ি থেকে বেরোতে হতো সাতটার মধ্যে। তখনো কোনোদিন মনে হয়নি ঢাকায় সকাল বলে কোনো জিনিস আছে। বরং মনে হতো সারাদিন কারখানা, গাড়ি, টেম্পোর যে ধোঁয়াগুলো আকাশে জমা হয়, সেগুলো রাতে ভারী হয়ে নেমে এসেছে মাথার ওপর। আর সেই ধোঁয়ার কারণে সকালগুলোও ভারী, ফ্যাকাশে, ঝাপসা।

ঢাকায় সে সকালে ঘুম থেকে উঠেই শুনেছে কাকের কর্কশ গলা। আজ শুনতে পাচ্ছে টুনটুনির ডাক আর চড়ুই পাখির কিচিরমিচির। নাজ শুয়ে আছে উত্তর দিকে মাথা দিয়ে। ওর মাথার কাছে জানালাটা খুলে দিলে দেখা যায় ঠিক সোজাসুজি উঠোনের উল্টো ধারে একটা ডালিম গাছ। ডালিম রঙের ফুল আর গাঢ় প্রায় কালচে সবুজ পাতাগুলোর ফাঁকে ছোট ছোট পাখির নাচানাচি। মুগ্ধ হয়ে সেদিকে তাকিয়ে রইল নাজ।

রাতে ঘুম ভালো হয়নি। হবার কথাও নয়। ঘরে, বিছানায় একটা অচেনা অচেনা গন্ধ। আরেকটা কথা হচ্ছে, এত বড় হয়েছে, কিন্তু রাতে কখনোই একটা ঘরে সম্পূর্ণ একাকী থাকা হয়নি তার। অনেক বয়স পর্যন্ত মায়ের সাথে থেকেছে। এত দিন তার সাথে থাকত তার বড় ভাইয়ের মেয়ে টিয়া। গতরাতে সম্পূর্ণ অচেনা জায়গায়, অচেনা পরিবেশে সম্পূর্ণ একাকী একটা ঘরে রাত কাটিয়েছে সে। ভয় ঠিক নয়, একধরনের রোমাঞ্চকর অনুভূতি হচ্ছিল তার। ঘুম গাঢ় হয়নি। বারবার ঘুম ভেঙেছে। বাড়ির কথা মনে পড়েছে। মায়ের কথা, স্বজনদের কথা। চন্দনের কথা মনে পড়তেই বারবার নিজেকে সামলে নিয়েছে সে। কেউ জানে না যে চন্দনের জন্যই তো ঢাকা ছেড়েছে সে। ওই বিষাক্ত শহরের বিষাক্ত প্রতিনিধি চন্দন। দরজার কপাট বন্ধ করার মতো করে চন্দনের নাম মস্তিষ্কের যে কোষে আছে, তার কপাট বন্ধ করে রাখতে চেয়েছে সে। না, যে শহরের বাতাসে চন্দনের বিষাক্ত নিশ্বাস মেশে, সেই শহরের বাতাস নিজের ফুসফুসে নিতে চায় না সে।

ঘড়ির দিকে তাকাল নাজ। সকাল মাত্র ছটা। এরই মধ্যে প্রাণচাঞ্চল্য জেগেছে। মেয়েরা উঠে একে একে কলতলায় যাচ্ছে। রান্নাঘর থেকে ধোঁয়া বেরোচ্ছে। তার মানে রইস তার কাজ শুরু করে দিয়েছে। নাজ যতবার বাইরের দিকে তাকায় তার অনভ্যস্ত চোখ বারবার হোঁচট খায়; বৈভবহীন, বিলাসিতাহীন অথচ এত উজ্জ্বল।

বাথরুমে যাবার পথে নাজের জানালার দিকে তাকাল একটা মেয়ে। ওকে দেখে হাসল দাঁত ঝিকিয়ে—আপা, এত সকালেই উঠে পড়েছেন!

হ্যাঁ। আপনারাও তো খুব সকাল সকাল উঠেছেন।

আমরা তো রোজই উঠি।

মেয়েটা বাথরুমে ঢুকে পড়ল।

রাতে খাবার টেবিলে সবার সাথে পরিচয় হয়েছিল। কিন্তু নাজ এখন আলাদাভাবে মেয়েটার নাম মনে করতে পারছে না। এটা তার মনে আছে যে মেয়েদের মধ্যে চারজন পিও—মুন্নী, লিমা, মুক্তি ও শেফালি। ওরা ফিল্ডে কাজ করে। দুজন প্যারামেডিক—এলিনা আর রোজিনা। ছেলেদের মধ্যে পিও হচ্ছে লতিফ, শম্ভু, মোবারক। আনোয়ার হচ্ছে ল্যাবরেটরি টেকনিশিয়ান। অ্যাকাউন্টেন্ট রাজ্জাক সাহেব। অফিস অ্যাসিসট্যান্ট রহিম। বাবুর্চি রইস তো আছেই। সব মিলিয়ে বেশ বড়সড়ো একটা দল। একটা জিনিস নাজের জানা নেই। কে এদের সুপারভাইজার। সে, না কি ম্যানেজার নূরুল আলম। তবে আচরণ দেখে মনে হয়েছে, নূরুল আলম অন্তত তার ঊর্দ্ধতন কর্মকর্তা নয়। ব্যাপারটা নিয়ে রাতেও ভেবেছে নাজ। কিন্তু ঠিক কাকে জিজ্ঞেস করবে বুঝতে পারছে না। শেষে সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে সময়ই বলে দেবে কার অবস্থান কোথায়।

পরনের কাপড়টা গোছগাছ করে চুলে একটু চিরুনি বুলিয়ে দরজার খিল খুলল নাজ। শব্দ পেয়ে রান্নাঘর থেকে হাসিমুখ দেখাল রইস—আপা কি ঘুম থ্যাকা উঠ্যা চা খান?

ঘুম ভাঙার সঙ্গে সঙ্গে চা! তাহলে তো দারুণ হয়।

আমিও তাই ভাবিছি। ঢাকার টাউনের মানুষ আপনে। সকালে চা খাওয়ার অভ্যাস থাকবার পারে। এখনই দিচ্ছি।

রইস পাঁচমিশালি ভাষায় কথা বলে। বোঝা যায় না সে আসলে কোন এলাকার লোক। হতেই পারে। নাজ ভাবল। বিভিন্ন এলাকার মানুষের সংমিশ্রণ অফিসে। আঞ্চলিক ভাষাও জগাখিঁচুড়ি পাকিয়ে যায় সহজেই।

শীত আসছে। আবহাওয়ায় তার আমেজ মাখানো পূর্বাভাষ। আদা দিয়ে বানানো রং-চা খেতে দারুণ লাগল নাজের। তার জন্য আলাদা একটা বাথরুম আছে। সে বাথরুমের দিকে এগোচ্ছে দেখে রইস জিজ্ঞেস করল, গোসলের জন্য আপার গরম পানি লাগবে কি না।

এখানো তো শীত তেমন পড়েনি। অতএব আজ না হলেও চলবে। নাজ শুনেছে উত্তরবঙ্গের শীত বিখ্যাত। তখন যে কী অবস্থা হবে! অবশ্য তত দিন চাকরিতে টিকে থাকতে পারলে হয়। এ কথা মনে হতেই ফিক করে নিজেনিজেই হেসে ফেলল নাজ। নাহ্, চাকরি সে করবেই। অন্তত বেশি কিছুদিন। যদি একের পর এক প্রতিকূলতা আসতে থাকে তাহলে অবশ্য ভিন্ন কথা!

গায়ে পানি ঢালতে গিয়েই বুঝল পানিতে আয়রন প্রচুর। কাল রাতে পানি খাওয়ার সময় জিভে আয়রনের স্বাদ পাওয়া যাচ্ছিল। আজ দিনের আলোয় দেখল বালতির গায়ে পুরু আয়রনের প্রলেপ। পানির মধ্যেও শ্যাওলার মতো ভাসছে আয়রন। সর্বনাশ! কয়েকদিনেই তার চুলের দফা-রফা হয়ে যাবে। চামড়ার কথা কথা না হয় বাদই দেওয়া গেল। তার গায়ের রং এমনিতেই ময়লাটে। কিন্তু দাঁত। তার মনে পড়ল অফিসের বেশিরভাগ ছেলে-মেয়েরই দাঁতে হলদেটে ছোপ। সে ভেবেছিল এই এলাকার মানুষ বেশি পান খায় বলেই ওদের দাঁত ওরকম। কিন্তু এখন বোঝা যায়, কয়েকদিনের মধ্যে তার দাঁতও হয়তো ওদের মতোই হয়ে যাবে। অনেকক্ষণ পানির দিকে আতঙ্কমেশানো দৃষ্টিতে চেয়ে রইল সে। ঠিক করল, তার প্রথম কাজ হবে একটা ওয়াটার ফিল্টার তৈরি করা। পানি ঢেলে সাবান ঘষাও এক বিড়ম্বনা। ঘষতে ঘষতে শরীরের চামড়া ছিলে যাওয়ার জোগাড় কিন্তু ফেনা হচ্ছে না। এই পানি খেয়েছে সে। আরও দুই-চারবার খেলে নির্ঘাত কনস্টিপেশন। নাহ্, ফিল্টারের ব্যবস্থা তাকে করতেই হবে।

পরের বিড়ম্বনা নাস্তার টেবিলে। ধোঁয়া ওঠা ভাত, আলুর্ভতা, ডিম ভাজা আর ডাল। খাবার হিসেবে উপাদেয় এবং অর্থসাশ্রয়ী, এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নাই। কিন্ত নাজ জীবনে কোনোদিন সকালের নাস্তা হিসেবে ভাত খেয়েছে এমনটা মনে পড়ে না। বর্ষার সকালে দুই-এবার খিঁচুড়ির কথা বাদ দিলে তাদের চিরকালের সকালের নাস্তা হয় রুটি, নয়তো পরোটা। ভাত তার গলা দিয়ে নামছিল না মোটেই। রইস বুঝতে পারল ওর অবস্থা—আপা বোধায় সকালে রুটি খান। ভাতের অভ্যাস নাই।

হ্যাঁ। সকালে রুটি খাওয়াই অভ্যেস আমার।

আচ্ছা। কাল থাক্যা আপনের জন্যে রুটি বানাব।

না না, শুধু আমার একার জন্য আলাদা করে রুটি বানানোর দরকার নেই।

দরকার আছে। বলতে বলতে ম্যানেজার নূরুল আলম এসে বসল খাবার টেবিলে—দরকার আছে আপা। যার যা অভ্যেস। এক দিন-দুই দিনের জন্য ব্যতিক্রমে মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু আপনার সারা জীবনের অভ্যেস আপনি রাতারাতি পাল্টাতে পারবেন না। বোঝাই যাচ্ছে সকালে আপনি ভাত খান না। এখন রোজ আপনাকে ভাত দিলে আপনি খেতেও পারবেন না, টিকতেও পারবেন না। দেখা যাবে ব্যাগ গুছিয়ে নিয়ে বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন। তার চেয়ে রইস একটু কষ্ট করুক, সেটাই ভালো।

কিন্তু আমি একা রুটি খাব; ব্যাপারটা কেমন দেখায় না?

এতে খারাপ কিছু নেই। আমাদের ভাত ছাড়া চলে না, তাই আমরা ভাত খাই। আপনার রুটি ছাড়া চলে না, আপনি রুটি খাবেন। আর আজকে যেহেতু রুটি বানানো হয়নি, রইস বরং দোকান থেকে আপনার জন্য পাউরুটি এনে দিক।

শশব্যস্তে বলে উঠল নাজ—না না, আজকে অন্তত ঝামেলা করার দরকার নেই। আজ আমি ভাত দিয়েই চালিয়ে নেব।

ম্যানেজার তার একথা মেনে নিল। জিজ্ঞেস করল—তারপর কেমন কাটল আমাদের এখানে প্রথম রাত? ঘুম হয়েছিল?

হয়নি বলা যায় না। আবার খুব যে ভালো হয়েছে তা-ও বলা যাবে না।

তাহলে তো নিশ্চয়ই আপনার খারাপ লাগছে! আপনি না হয় ঘরে গিয়ে আর কিছুক্ষণ রেস্ট নেন।

না না, তার দরকার নেই। আমার তো রাত জাগার অভ্যেস আছে। হাসপাতালে নাইট ডিউটি করতে হতো না! তা ছাড়াও ঢাকার মানুষরা কেউই সকাল সকাল ঘুমায় না। আমার তো রাত জেগে বই পড়ার অভ্যেস ছোটবেলা থেকেই। আপনি বরং আমার কাজের কথা বলেন। আমাদের অফিস শুরু কটায়?

আমাদের অফিস শুরু সকাল আটটায়। তবে আপনার রোগী দেখার সময় নয়টা-পাঁচটা। মাঝখানে দুপুরে একটা থেকে তিনটার মধ্যে যেকোনো এক ঘণ্টার লাঞ্চ ব্রেক।

নাজ দেখল, ফিল্ডের মেয়েরা বেরিয়ে এল উঠোনে। ওদের পরনে সালোয়ার-কামিজের ওপরে সাদা অ্যাপ্রন, হাতে উলের হাতমোজা, পায়ে কেডস, মাথায় হেলমেট। ওরা দক্ষ হাতে নিজের নিজের হোন্ডা ঘুরিয়ে নিয়ে উঠে বসল। স্টার্টার কিক করল মাপা পায়ে। প্রায় প্রত্যেকেই এক কিকে স্টার্ট করল নিজ নিজ হোন্ডা। তারপর মসৃণ গতিতে বেরিয়ে গেল সরু গেট দিয়ে। মুগ্ধ চোখে ওদের যাওয়া দেখছিল নাজ। ম্যানেজারের কথায় সম্বিত ফিরল। ম্যানেজার বলছে—চলেন, অফিসে গিয়ে বসি। রইস ওখানেই আমাদের চা দেবে।

আমি ভাবছিলাম আগে আমার ক্লিনিকটা ঘুরে দেখব।

অবশ্যই দেখবেন। কিন্তু তার আগে কিছু কাগজপত্রে আপনার সই-সাবুদের ব্যাপার আছে। অ্যাকাউন্টেন্ট রাজ্জাক সাহেব এতক্ষণে সব রেডি করে ফেলেছে। আপনি শুধু দেখে নিয়ে সিগনেচার করে দেবেন।

অফিসে ঢুকে ম্যানেজার একটা হাফ সেক্রেটারিয়েট টেবিল দেখিয়ে বলল—ওটাই আপনার টেবিল। ড্রয়ারের তালাটা চেয়ে নেবেন রাজ্জাক সাহেবের কাছ থেকে।

অ্যাকাউন্টেন্ট রাজ্জাক সাহেব আর অফিস সহকারী রহিম ওদের ঢুকতে দেখে উঠে দাঁড়িয়েছিল। নিজের চেয়ারে বসতে গিয়ে ব্যাপারটা খেয়াল করল নাজ। একটু কুণ্ঠিতভাবেই বলল—আপনারাও বসুন না।

অফিস সহকারী রহিম হাজিরা খাতা হতে এসে দাঁড়াল নাজের টেবিলের সামনে। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাতেই সে হাসিমুখে বলল—অ্যাটেন্ডিং খাতায় সিগনেচার করবেন না, আপা?

জয়েন না করতেই সিগনেচার?

এসে পড়েছেন মানেই হলো জয়েন করেছেন।

তার সামনে খাতা মেলে ধরল রহিম। একেবারে সবার ওপরে লেখা ডা. মেহনাজ মতিন। তার মানে সে-ই এই আউটফিকের বস! নাজের কাঁধ ভারী ভারী ঠেকল। মনে হলো, বিশাল এক দায়িত্বের বোঝা সে নিজের কাঁধে তুলে নিল এইমাত্র। রাজ্জাক সাহেব অনেক কাগজ নিয়ে এল তার টেবিলে। সেগুলো রাখতে রাখতে বলল—আপা, আপনার ডিপ্লয়মেন্ট লেটারটা একটু দেবেন?

মানে?

জয়েনিং অর্ডারটা। হেড অফিস থেকে যেটা আপনাকে দিয়েছে।

ওহ্ হো। ওটা তো ঘরে রেখে এসেছি। এক্ষুনি আনছি।

থাক। ব্যস্ত হবার দরকার নাই। পরে হলেও চলবে। আপনি এইগুলোতে সই করেন।

জয়েনিং রিপোর্ট, চুক্তিপত্র, ইনসিওরেন্স পেপার, আরও অনেক ফর্মালিটি। এগুলোতে সই করতে করতে লেগে গেল প্রায় কুড়ি-পঁচিশ মিনিট।

নাজ জিজ্ঞেস করল ম্যানেজারকে—আমাদের এখানে রোগী কেমন হয়, আলম ভাই!

রোগী তো অনেকই হতো। কিন্তু কিছুদিন পরপরই ডাক্তার বদল হয়। একমাস ডাক্তার থাকে তো পরের মাসে থাকে না।

থাকে না মানে?

মানে ডাক্তাররা চাকরি ছেড়ে চলে যান। রোগীরা দূর থেকে এসে ডাক্তারকে না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে যায়।

ডাক্তার থাকে না কেন?

তা কী আর আমরা জানি! হয়তো গাঁও-গেরামে থাকতে তাঁদের বড় কষ্ট হয়। তাঁরা হয়তো ভাবেন এই রকম জায়গায় কীভাবে মানুষ বাস করতে পারে!

আপনারা যে আছেন!

আমরা আছি। আছি, কোনো যাবার জায়গা নাই বলে। ডাক্তারদের মতো তো আর আমরা মাসে মাসে চাকরি বদলাতে পারি না।

নূরুল আলমের গলার স্বরের তিক্ততা ঠিকই টের পায় নাজ। এ ব্যাপারে আর কথা বাড়াতে চায় না।

রইস আসে চা নিয়ে। চায়ের কাপ হাতে তুলে নিয়ে নূরুল আলম আগের কথার খেই ধরে নিজেই বলতে থাকে— আমরা ডাক্তারদের জামাই আদর করি। তোষামোদ করি থাকার জন্য। কত উঁচু পোস্ট দেওয়া হচ্ছে আপনাদের! ধরেন, আমি মাস্টার ডিগ্রি পাস। এই সংস্থায় আছি এগার বছর। কিন্তু আজ আপনি চাকরিতে জয়েন করেই হয়ে গেলেন আমার বস। শুধুমাত্র ডাক্তার হবাবর সুবাদে। আমরা আপনাদের প্রশ্নাতীত আনুগত্য দিচ্ছি। তবু ডাক্তাররা চাকরি ছেড়ে চলে যান। হেড অফিস থেকে দোষ দেওয়া হয় আমাদের। আমাদের দুর্ব্যবহারের জন্যই নাকি বেশিরভাগ ডাক্তার চাকরি ছেড়ে চলে যায়! আমরা নাকি তাদের অসহযোগিতা করি!

লোকটার প্রতি মমতা হয় নাজের। কিন্তু সান্ত্বনা দিয়ে ঠিক কী বলবে বুঝতে পারে না। নীরবে চায়ের কাপে চুমুক দেয়। অফিস রুমের পরিবেশটা একটু গুমোট হয়ে আসে। এই অস্বস্তি থেকে ওদের মুক্তি দেয় প্যারামেডিক। এলিনা বোধহয় নাম মেয়েটার। সে ঘরে ঢুকে বলে—আপা, একটা রোগী অনেকক্ষণ থেকে বসে আছে। আপনি দেখবেন কি?

হ্যাঁ হ্যাঁ, অব্যশই দেখব।

চায়ের কাপ টেবিলে রেখে উঠে দাঁড়ায় নাজ। অফিস রুম থেকে বেরিয়ে পূর্ব দিকে হাঁটে ওরা। নাজ খেয়াল করে, বাড়ির মূল গেটের ডানদিকের অংশটাই আসলে ক্লিনিক বা স্বাস্থ্যকেন্দ্র। প্রথমেই আছে অভ্যর্থনাকক্ষ বা রোগীর অপেক্ষার কক্ষ। তার পরে ডাক্তারের চেম্বার। এলিনা তাকে চিনিয়ে দেয়। নিজের চেম্বারে না ঢুকে নাজ আগে উঁকি দেয় অভ্যর্থনাকক্ষে। দুজন লোক একটা ছেলেকে নিয়ে বসে আছে। নাজকে ঢুকতে দেখে তারা উঠে দাঁড়ায়। হাসিমুখে ওদের দিকে তাকায় নাজ। পরক্ষণেই একজন লোককে দেখে ভেতরে ভেতরে চমকে ওঠে ভীষণ।

তিন

মারুফ আহমেদ না!

এই লোক এখানে কী করছে!

আরেকবার তাকে খুঁটিয়ে দেখল নাজ। ঋজু ভঙ্গিতে দাঁড়ানো লম্বায় প্রায় ছয়ফুট লোকটা। ঝড়-জলের ঝাপ্টা সয়ে সয়ে, রোদে পুড়ে তামাটে হয়ে গেছে মুখটা। মাথায় সেই ঝাঁকড়া চুল নেই, বাঁ-পাশে সামান্য টাকের আভাস। কিন্তু চেহারায় দৃঢ়তার ছাপ একটুও কমেনি।

নাজকে চিনতে পারেনি মারুফ আহমেদ। চেনার কথাও নয়। হাত কপালে তুলে সালাম দিল সে নাজকে। বলল—আমার এই ছাত্রটি প্রায় একমাস হলো জ্বরে ভুগছে। এখানে তো কোনো কোয়ালিফায়েড ডাক্তার নেই। তাই সুচিকিত্সা হচ্ছে না। আর টাকার অভাব তো আছেই। আপনি জয়েন করেছেন শুনেই ছুটে এলাম ওকে নিয়ে।

কথার ভঙ্গিতে নাজ আরও নিশ্চিত হলো। এ লোক মারুফ আহমেদই। ওদের নিয়ে চেম্বারে ঢুকল সে। বেশ আরামদায়ক তার চেম্বারটি। সাদা চুনকাম করা দেয়াল, দরজা-জানারায় পরিষ্কার ধবধবে সাদা পর্দা ঝুলছে, মাঝখানে লাল কালিতে রেডক্রিসেন্ট আঁকা। যন্ত্রপাতি যা আছে, আউটডোর রোগী দেখার জন্য পর্যাপ্ত।

খুব মনোযোগ দিয়ে ছেলেটাকে দেখল নাজ। বলল—মনে হচ্ছে ছেলেটার টাইফয়েড। রক্তটা পরীক্ষা করলে নিশ্চিত হওয়া যেত। কিন্তু তার কোনো উপায় নেই। এখানে সেই পরীক্ষাটা হয় না। আমি চিকিত্সা দিয়ে দিচ্ছি, ঠিকমতো ওষুধ খেলে আশা করি ভালো হয়ে যাবে।

প্রেসক্রিপশনটা হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়াল মারুফ আহমেদ—অনেক ধন্যবাদ! আর হ্যাঁ, আমাদের এই পিছিয়ে থাকা জনপদে আপনাকে স্বাগতম! আশা করি আগের ডাক্তারদের মতো আপনিও চটজলদি আমাদের ছেড়ে চলে যাবেন না। ডাক্তার আমাদের বড় প্রয়োজন।

আবার সালাম জানিয়ে ছেলেটাকে নিয়ে বেরিয়ে গেল মারুফ আহমেদ। নাজের ইচ্ছা হচ্ছিল তার সাথে আরেকটু কথা বলার। পরিচয় দিলে নিশ্চয়ই সে কথা বলত। কিন্তু পরিচয় দিতে নাজের দ্বিধা হচ্ছিল। তা ছাড়া সে এক-শ ভাগ নিশ্চিত না যে, এই লোক মারুফ আহমেদই। কিছুতেই মেলাতে পারছে না নাজ। নব্বইয়ের আন্দোলনের দেশ-কাঁপানো ছাত্রনেতা মারুফ আহমেদ এই অখ্যাত, নিভৃত জনপদে কেন? তার যা রাজনৈতিক অবস্থান ছিল, দেশের কোনো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে তার এত দিন থাকার কথা । এখানেই নাজের খটকা।

প্যারামেডিক এলিনাকে সে জিজ্ঞেস করল—এই যে বাচ্চাটাকে সাথে নিয়ে এসেছিল, ওই ভদ্রলোককে আপনি চেনেন?

মাথা ঝাঁকাল সে—আগেও দুই-একবার রোগী নিয়ে আসতে দেখেছি। নাম জানি না। আসলে আপা আমারও তো এখানে চাকরি বেশি দিন হয়নি।

কত দিন হলো?

চার মাস।

মোটে চার মাস!

আয়া জমিলা এখানকার স্থানীয় বাসিন্দা। ওকে জিজ্ঞেস করতেই সে বলল—হ্যাঁ আপা, চিনি। তাঁই সরকার বাড়ির ছোল। মারুফ আহমেদ। চিয়ারম্যান ভোটে খাড়াছিল দোয়াত-কলম মার্কা লিয়্যা। হেরে গ্যাছে।

নিশ্চিত হলো নাজ। হতাশও হলো। মারুফের সঙ্গীরা অনেকেই এমপি। কেউ কেউ মন্ত্রীও। কেউ কেউ বিচারপতিও হয়ে গেছে রাজনৈতিক পোস্টিং নিয়ে। অন্যেরা প্রায় প্রত্যেকেই বড় ব্যবসায়ী। সে-ও সেই রাজনৈতিক পরিচয় দিয়েই। আর মারুফ কিনা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করে! আবার হেরেও যায়!

ক্যাংকা কর্যা জিতপি আপা! ভোট করতে ট্যাকা লাগে। ছোলডার ট্যাকা-পয়সা নাই। ইস্কুলোত মাস্টারি কর্যা আর কত ট্যাকা পায়। তারউপরে এলাকার সব বড়লোকরা অর বিরুদ্ধে। তাই জিতলে নাকি সর্বহারা না কি য্যান পার্টিত ফাঁসিতলা ভর্যা যাবি। তারা নাকি খালি মানষের গলা কাটে। সেই ভয়েতই মানুষ মারুফকে ভোট দেয়নি।

হেসে ফেলল নাজ—ওই লোককে দেখলে কি মনে হয় সে মানুষের গলা কাটতে পারে?

না, তা মনে হয় না—একটু দ্বিধান্বিত জমিলার গলার স্বরও—ছোলডাক সক্কলেই ভালো জানে। আপদে-বিপদে গরিব মানুষের পাশত দাঁড়ায়।

থাক এসব কথা। চলো একটু আমাদের ক্লিনিকটা ঘুরে দেখি।

স্বাস্থ্যকেন্দ্রটা ইউ-প্যাটার্নের। যদিও ইটের গাঁথুনির ওপর টিনের চালা। তবে এই বাড়িটার দেয়াল-মেঝের প্লাস্টার বেশ ভালো। ঝকঝকে সাদা রং দেয়ালে। অভ্যর্থনা ঘরেই ওষুধ রাখা আছে। একজন প্যারামেডিক এখানে বসে। ঘরের দেয়ালজুড়ে বিভিন্ন স্বাস্থ্যবিষয়ক পোস্টার। চারটে বেঞ্চ দেওয়া আছে দু-দিকের দেয়ালঘেঁষে। রোগীদের বসার জায়গা। আর আছে একটা চোদ্দ ইঞ্চি টিভি এবং ভিসিপি। রোগীরা অপেক্ষা করার সময় চালিয়ে দেওয়া হয়। স্বাস্থ্যশিক্ষার কিছু ক্যাসেট আছে। বেশ ভালো লাগল নাজের। সবচেয়ে মজা লাগল অভ্যর্থনা ঘরের দরজায় ছয় জোড়া স্পঞ্জের স্যান্ডেল দেখে। এগুলো কেন? এলিনা জানাল, এগুলো রোগীদের জন্য। রোগীরা বেশিরভাগই আসে খালি পায়ে। ধুলো-কাদা মাখা পা। ওরা এসে এই স্যান্ডেল পায়ে দিয়ে কলতলায় পা ধোবে। তারপর উঠবে ক্লিনিকের বারান্দায়। ডাক্তার দেখানো শেষ হলে ওরা স্যান্ডেল খুলে রেখে চলে যাবে।

ওরা স্যান্ডেল নিয়ে চলে যায় না? সকৌতুকে জানতে চাইল নাজ।

কেউ কেউ স্যান্ডেল পায়ে দিয়েই বেরিয়ে যাবার উপক্রম করে। তবে আয়া খুব কড়া নজর রাখে।

ডাক্তারের চেম্বারের পরে ইউ বাঁক। এখানে প্রথম ঘরটা ল্যাবরেটরি। রক্ত-প্রস্রাব-পায়খানার রুটিন পরীক্ষা হয়। আর হয় যক্ষ্মার জন্য কফ পরীক্ষা। পরের ঘরটা লেবার কাম অপারেশন থিয়েটার। ছাটখাটো ফোঁড়া কাটা কিংবা কাটা-ছেঁড়া সেলাই করার ব্যবস্থা আছে। গর্ভবতীদের জন্য ডেলিভারি টেবিলটা বেশ ভালো। পুরুষ ডাক্তার কি ডেলিভারি করায়?

না আপা। ডেলিভারির কাজটা বেশিরভাগ করে রোজিনা। ও তো এফডব্লিউভি। সঙ্গে টিবিএ থাকে।

টিবিএ মানে?

ট্রাডিশনাল বার্থ অ্যাটেনডেন্ট। গ্রামের ধাত্রী। ওদের ট্রেনিং করানো হয়েছে নিরাপদ প্রসবের ব্যাপারে। ধাত্রী আর এফডব্লিউভি মিলে মূলত প্রসূতির কাজ করে। সমস্যা হলে ডাক্তার ভাইকে ডাকা হতো।

পরের রুমটা গর্ভবতী মায়েদের ওয়ার্ড। চারটে বেড। উঠোনের একদিকে একটা টিউবওয়েল আর বাথরুম-ল্যাট্রিন। সবমিলিয়ে ব্যবস্থাটা এ রকম গ্রামের জন্য যথেষ্ট ভালো, স্বীকার করতে হলো নাজের।

ডাক্তার না থাকলে তখন কী করেন?

তখন আমরাই রোগী দেখি। আমি আর রোজিনা। ওষুধও দেই।

ওষুধও দেন?

দেই। তবে আমাদের অ্যান্টিবায়োটিক লেখা নিষেধ। ডাক্তার ছাড়া অন্য কারও অ্যান্টিবায়োটিক লেখার হুকুম নাই।

এই ব্যবস্থাটাও পছন্দ হলো নাজের।

ফিরে এসে নিজের চেম্বারে বসল নাজ। এলিনা তার সঙ্গে আছে।

আমরা কীভাবে রোগী দেখি? ফ্রি?

না আপা! হাসল এলিনা—এনজিওতে ফ্রি কিছু হয় না। একজন রোগীর প্রতিবার ডাক্তার দেখানোর ফি দশ টাকা। ভিও হলে...

ভিও মানে?

ভিও মানে আমাদের সমিতির সদস্য ।

এই সমিতি কারা বানায়?

বানায় আমাদের এএফপির ক্রেডিট শাখা। ওই যারা লোন দেয় আরকি। ওদের অফিস গোলাপবাগে। তো ভিওদের ভিজিট দশ টাকা। যারা ভিও না, তাদের ভিজিট কুড়ি টাকা।

আমরা কীভাবে বুঝব, কে ভিও আর কে ভিও না?

ভিও সদস্যরা সঞ্চয়ের বই হাতে নিয়ে আসে।

ও আচ্ছা। ভিজিটের ব্যাপারটা বুঝলাম। ওষুধ কীভাবে পায় রোগীরা?

আমাদের একটা রেট দেওয়া আছে হেড অফিস থেকে। বাজারের দাম থেকে পনেরো পার্সেন্ট কমে।

ডেলিভারিতে কেমন খরচ পড়ে একজন রোগীর।

দেড়-শ থেকে দুই-শ টাকা।

মাত্র দেড়-শ টাকা!

তা-ই দিতে পারে না এখানকার মানুষরা। বেশিরভাগই বাড়িতে দাইয়ের মাধ্যমে ডেলিভারি করায়। যখন দাই আর পারে না, কেবল তখনই গর্ভবতীকে নিয়ে আসে এখানে।

একদিনের জন্য যথেষ্ট ছবক নেওয়া হয়েছে। এবার ক্ষান্ত দিল নাজ। এলিনা চলে গেল নিজের টেবিলে।

টুকটাক রোগী এল। খুব বেশি ভিড় হলো না। আয়া জমিলা আক্ষেপ করে বলল—আগে কত রুগি হচ্ছিল! কিন্তু রুগি আসে, দ্যাখে ডাক্তার নাই আর ফিরত যায়। এই কর্যা কর্যা রুগি এখন আর আসতে চায় না। হাতুড়ের কাছতই চিকিত্সা ল্যায়।

যে কজন রোগী এল, তাদের মধ্যে মহিলাই বেশি। নাজ খেয়াল করল, এদের প্রধান সমস্যা অ্যানিমিয়া আর অপুষ্টি। অন্য যেসব শারীরিক উপসর্গ নিয়ে এরা এসেছে, সেগুলোর মূলেও আছে অপুষ্টি। ওরা কথায় কথায় বলে—হামার শরিল খুব দুব্বল। অ্যাকনা ভিটামিন লেখ্যা দ্যান।

ভিটামিন ওষুধ খাওয়া কী দরকার! একটু ভালো-মন্দ খেলেই তো পারেন!

ভালো-মন্দ খাতে খরচ বেশি। হামি তো সোয়ামি-ছোল-বিটিক থুয়্যা একলা ভালো কিছু খাতে পারব না। অতজনার জন্যে ডিম-মাছ গোশতো কিনার পয়সা কুনঠে পাব! তারচায়ে হামাক ভিটামিন ওষুদই লেখ্যা দ্যান।

হায় খোদা! এভাবে তো কোনোদিন ভাবেনি নাজ। ঢাকা শহরে কোনো ডাক্তারের প্রেসক্রিপশনে ভিটামিন দেখলে নাক সিঁটকাত ওরা। আজ বিনা দ্বিধায় খসখস করে ভিটামিন আর আয়রন ট্যাবলেট কিংবা সিরাপ লিখে চলে নাজ।

দুপুরের পর আর কোনো রোগী আসে না। অভ্যর্থনাকক্ষে ভিসিডিতে বাংলা সিনেমার ক্যাসেট চালিয়ে দেখছে এলিনা আর রোজিনা। ওদের সাথে জুটে গেছে ল্যাব টেকনিশিয়ান আনোয়ার আর আয়া জমিলা। নাজ সাথে করে অনেক বই আর জার্নাল নিয়ে এসেছে। চেম্বারে বসে একটা বই পড়ার চেষ্টা করে। এই রকম উদাস, নিস্তরঙ্গ দুপুর নাজের জীবনে খুব বেশি একটা আসেনি। পাশের রাস্তা দিয়ে অনেকক্ষণ পরপর একটা ভ্যান বা গরুর গাড়ি যাওয়ার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। উঠে গিয়ে পর্দা সরিয়ে রাস্তার দিকে তাকাল নাজ। রাস্তার ওপাশে ধুলোঢাকা ছোট একটা আমগাছের নিচে সাইকেল সারাইয়ের জিনিসপত্র বিছিয়ে বসে আছে একজন লোক। খালি গা। মুখভর্তি চাপদাড়ি, এত দূর থেকেও দাড়িতে সাদার ঝিলিক চোখে পড়ে। এইখানে সাইকেল সারাইয়ের দোকান বিছানোর মানে কী? এখানে তো কোনো ভ্যান বা রিকশার স্ট্যান্ডও নেই। সারাদিনে কি লোকটার কোনো খদ্দের জোটে? লোকটা পদ্মাসনে বসে নিরুত্সুক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে রাস্তার দিকে। হঠাত্ লোকটা তাকাল এই জানালার সোজাসুজি। এত দূর থেকেও নাজ খেয়াল করল লোকটার চোখ দুটো অসম্ভব উজ্জ্বল! চাউনি খুব তীব্র। হয়তো লোকটা তাকে ভালো করে দেখতে পাচ্ছে না। তবু একটু অস্বস্তি বোধ করল সে। জানালা ছেড়ে এসে আবার চেয়ারে বসল। বইটা তুলে নিল চোখের সামনে।

একটু পরে ঘন ঘন হাই উঠতে শুরু করল। তাই রইস যখন পর্দা একটু সরিয়ে মাথাসহ অর্ধেক দেহ ভেতরে ঢুকিয়ে জিজ্ঞেস করল—আপা কি চা খাইবেন? তখন সে কৃতজ্ঞতার সাথে হ্যাঁ-বোধক মাথা নাড়ল।

কিন্তু চা খাওয়ার পরেও দুপুরের স্তব্ধতা তাকে চেপে ধরে রইল। জমিলা একবার এসে কুণ্ঠিতভাবে বলল—আপা, সিনামা দেখপেন? একলা একলা বস্যা আছেন!

না জমিলা, তোমরা দেখো।

তাহলে আপা আপনে ঘরোত যায়্যা আরাম করেন। রুগি আসলে হামি ডাক দিবোনি।

এ কথায় নাজ উঠে পড়ে।

ঘরে যাবার পথে অফিস রুমে একবার উঁকি মারে। অ্যাকাউন্টেন্ট হিসাব মেলাচ্ছে আর অফিস সহকারী টাইপ রাইটারে কিছু একটা টাইপ করছে। তাকে দেখে ওরা উঠে দাঁড়ায়—আসেন, আপা। বসেন!

নাজ মাথা নাড়ে—না। আমি ঘরে যাচ্ছি। রোগী এলে জমিলা খবর দেবে। এতে কি কোনো অসুবিধা আছে?

ওরা এই প্রশ্নে একটু অস্বস্তিতে পড়ে। রাজ্জাক সাহেব বলে—এমনিতে কোনো অসুবিধা নাই। কিন্তু হঠাত্ হঠাত্ রিজিওনাল অফিস কিংবা হেড অফিস থেকে মনিটরিংয়ের লোক চলে আসে তো। অফিসের সময় ঘরে থাকলে আবার রিপোর্ট করে দেয়। তবে আপনি ঘরে যান। আমরা ম্যানেজ করে নেব।

একথা শুনে নাজের একবার ইচ্ছা করে চেম্বারে ফিরে যেতে। কিন্তু সত্যিসত্যিই একটু গড়িয়ে নিতে তার খুব ইচ্ছা হচ্ছে। শেষের ইচ্ছাই জয়ী হয়। সে ঘরে এসে বিছানায় এলিয়ে পড়ে। তক্ষুনি আবার মনে পড়ে মারুফ আহমেদের কথা।

নব্বই সালে সে ছিল স্কুলের ওপরের ক্লাসের ছাত্রী। ওদের মোহাম্মদপুরের তাজমহল রোডের বাড়িতে সেদিন প্রায় সবাই ছিল। কারণ সারাদিন হরতাল। বাবা কলেজে যায়নি; নাজও যায়নি স্কুলে। তখন হরতাল হতো খুব। একটা দমবন্ধ করা বিশ্রী পরিবেশ। আর হরতালের দিন রাস্তায় বেরোনো খুব বিপজ্জনক ছিল। কারণ দিনভর চলত বোমাবাজি, টায়ার পোড়ানো, পিকেটারদের সাথে পুলিশ-বিডিআরের খণ্ডযুদ্ধ। প্রাণ হাতে নিয়ে কেউ বাইরে বেরোতে চাইত না। সারাদিন শুয়ে-বসে বাড়িতে কাটিয়েছে সবাই। সন্ধ্যার পরেও বাইরে বেরোনোর গরজও কারও তেমন ছিল না। ড্রইংরুমে বসে টিভি দেখছিল ওরা। রাত তখন আটটার মতো হবে। বড় রাস্তা দিয়ে একটা মিছিল যাচ্ছে। আজ হরতাল উপলক্ষে গুলি চলেছে দেশের কয়েক জায়গায়। রাজশাহী আর সিলেটে মারা গেছে দুজন। এই কারণে পরদিন আবার হরতাল ডাকা হয়েছে। সেই হরতালের সমর্থনে মিছিল। হঠাত্ ঘনঘন পুলিশের হুইসেল, ভারী বুটের শব্দ, হুটোপুটি, ককটেলের আওয়াজ। ওরা ভয়ার্ত চোখে জানালা দিয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়েছিল। হঠাত্ দেখা গেল কে একজন তীরবেগে ওদের দরজার দিকে ছুটে আসছে। এমনিতেই কলাপসিবল গেটে তালা মারা থাকে। কিন্তু সেই মুহূর্তে খোলা ছিল। কাজের ছেলেটা কিছু কিনতে গিয়েছিল বোধহয় পাড়ার দোকানে। ওরা আবছা অন্ধকারে মূর্তিটাকে ছুটে আসতে দেখল এদিকেই। এক ঝটকায় গেট খুলে লোকটা উঠে পড়ল বারান্দায়। তারপরেই হুড়মুড় করে ঢুকল ড্রইংরুমে। বাড়ির লোকজন হতচকিত হয়ে পড়েছিল। মেয়েরা তো হাউমাউ করে আর্তচিত্কার দিয়ে ফেলেছিল আতঙ্কে। লোকটা, তখন দেখা গেল তরুণ একটা ছেলে, ড্রইংরুমের কার্পেটের ওপর দাঁড়িয়ে হাঁফাচ্ছিল। বাবা একটু সাহস সঞ্চয় করে ধমকে উঠল—কে তুমি? বাড়িতে ঢুকেছ কেন?

ছেলেটা আরও কিছুক্ষণ জোরে জোরে শ্বাস নিল। তারপর বলল—ভয় পাবেন না। অমি চোর-ডাকাত নই। মিছিলে পুলিশের হামলা হয়েছে। তাই বাধ্য হয়েছি আপনাদের বাড়িতে ঢুকতে।

বড়ভাই বিরক্ত গলায় বলে—এই রকম টুকটাক মিছিল করে আর্মি শাসন হটানো যায়?

তরুণ ওই অবস্থাতেও বিদ্রূপের দৃষ্টিতে তাকাল বড় ভাইয়ের দিকে—মিছিল করে আর্মি হটানো যায় কি না, তা প্রশ্নসাপেক্ষ, তবে ড্রইংরুমে বসে টিভি দেখে যে হটানো যায় না, সে কথা গ্যারান্টি দিয়ে বলা যায়।

বড় ভাইয়ের মুখ মুহূর্তে লাল হয়ে গেল। তাকে বাঁচাতে এগিয়ে এল বাবা—তা এতই যখন বিপ্লবী তাহলে পুলিশ দেখলেই পালানো কেন? জেলে যেতে এত ভয় কেন?

ছেলেটা বলল—জেলে যেতে আমরা ভয় পাই না। বরং জেলে থাকলে আমরা একটু বিশ্রাম পাই, পড়াশোনা করার অবকাশ পাই। কিন্তু এখন আমাদের জেলে যাওয়া চলবে না। সংগঠকরা সবাই জেলে থাকলে বাইরে আন্দোলন সংগঠিত করবে কারা? আর স্যার, আরেকটা কথা জেনে রাখুন, সাময়িক পিছু হটা মানেই লড়াই ছেড়ে পালানো নয়।

কিশোরী নাজ হঠাত্ করে উঠে এল—এসব থাক তো ভাইয়া। আপনার বোধহয় হাত-মুখ ধোয়া দরকার। চলেন, বাথরুম দেখিয়ে দেই।

হাত-মুখ ধুলে তো ভালোই হয়। কিন্তু তার আগে একটু জিরানো দরকার। বলে কারও অনুমতির তোয়াক্কা না করে লোকটা একটা সোফায় ধপাস করে আধশোয়া হয়ে বসে পড়ল। চোখ বুঁজল ক্লান্তিতে। বাসার লোকজন বুঝতে পারছিল না এখন কী করা উচিত। কিন্তু বেশিক্ষণ তাদের বিড়ম্বনা সইতে হয়নি। ড্রইংরুমের দরজায় এসে দাঁড়াল তিনজন পুলিশ আর একজন সাদা পোশাকের লোক। লোকটা আঙুল তুলে দেখাল সোফায় এলিয়ে থাকা ব্যক্তিকে। পুলিশ তিনজন অপ্রত্যাশিত ক্ষিপ্রতায় ছুটে গিয়ে আঁকড়ে ধরল লোকটাকে। হাতকড়া পড়িয়ে, বাঁশিতে ফুঁ দিল দ্রুত কয়েকবার।

তরুণ কোনো বাধা দেবার চেষ্টা করল না। পুলিশের সঙ্গে বেরিয়ে যাবার সময় নাজের দিকে তাকিয়ে বলল—হাত-মুখ আর ধোয়া হলো না। আরেকদিন আসব, কেমন!

খুব ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে বেরিয়ে গেল লোকটা। বোঝা গেল পুলিশের হাতে ধরা পড়ায় এতটুকু ভয় পায়নি সে।

তখন জানত না। কিন্তু পরদিন পত্রিকায় হাতকড়া পরা ছবি দেখে নাজ জানল লোকটা হচ্ছে ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের নেতা মারুফ আহমেদ।

সেই ঘটনার পরে আজ সে প্রথম দেখল মারুফ আহমেদকে। মারুফের কি মনে আছে সেই রাতের সেই ঘটনার কথা?

চার

কয়েকদিন পর নাজ জানল, শুধু স্বাস্থ্যকেন্দ্রেই নয়, তাকে মাঝে মাঝে ফিল্ডে যেতে হবে।

কেন? ফিল্ডে যেতে হবে কেন?

ম্যানেজার নূরুল আলম একটু অস্বস্তির সাথে বলল—এসব তো আপনাকে হেড অফিস থেকে ব্রিফ করার কথা!

না, আমাকে এ সম্পর্কে কিছু বলা হয়নি। আপনি বলুন!

আমাদের যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি ফিল্ড বেইজড। কফ পরীক্ষায় পজিটিভ হলে রোগীকে বাড়িতে চিকিত্সা দেওয়া হয় আট মাস ধরে। আমাদের স্বাস্থ্যসেবিকাই ওষুধ খাওয়ায়। সপ্তাহে সপ্তাহে পিও সেখানে যায়। কিন্তু রোগীর কোনো জটিলতা হলে, যেমন ড্রাগ রিঅ্যাকশন বা অন্যকিছু হলে ডাক্তারকে যেতে হয় রোগীর বাড়িতে। এটা ছাড়াও আরও কিছু কাজ আছে।

যেমন?

নূরুল আলম হেসে বলল—আপনি হলেন এই ইউনিটের সর্বময় কর্তা। কর্মীরা ঠিকমতো কাজ করছে কি না, সেটা দেখাও আপনার দায়িত্ব। যেমন পিও ফিল্ড লোকেশন লিখে বেরিয়ে গেল। কিন্তু সে ঠিক জায়গাতে গেল কি না, অ্যাকশন প্ল্যান অনুযায়ী কাজ করছে কি না, সেটা দেখার জন্য আপনাকে মাঝে মাঝে সারপ্রাইজ ভিজিটে যেতে হবে।

একটু রুঢ় স্বরে বলল নাজ—আমাকে যদি কর্মীদের পেছনে ছুটতে হয়, তাহলে আপনি আছেন কী করতে?

ম্লান হাসল নূরুল আলম—আমি আছি আপনাকে কাজগুলো বুঝিয়ে দেবার জন্য। আপনি সবকিছুর সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারলেই আমি উইথড্র হয়ে যাব। আসলে এখনকার প্রজেক্ট ম্যানেজারের কোনো পদ নেই। ডাক্তারকেই ডাক্তার-কাম প্রশাসকের ভূমিকা পালন করতে হবে।

কিন্তু আমি ফিল্ডে যাব কীভাবে?

আপনি চাহিবামাত্র মোটরসাইকেল পেয়ে যাবেন। যদ্দিন নিজে চালাতে না পারেন, অন্য কারও সঙ্গে যাবেন। ইচ্ছা করলে রিকশা, ভ্যান, বা যেকোনো যানবাহনে যেতে পারেন। ভাড়া দেবে অফিস।

মনে মনে বিচার-বিশ্লেষণ করছিল নাজ। এনজিওর চাকরি সহজ হবে না, এটা সে জানত। কিন্তু দেখা যাচ্ছে এরা সুতোয় টান দিচ্ছে ধীরে ধীরে। একবার মনে হলো, দূর ছাই বাড়ি চলে যাই! পরক্ষণেই ভাই-ভাবিদের সম্ভাব্য বিদ্রূপ মাখানো দৃষ্টির কথা মনে পড়তেই সে মাথা ঝাঁকিয়ে দূর করে দিল চিন্তাটা। তা ছাড়া আছে চন্দন। না, হার সে স্বীকার করবে না। কালকেই সে ফিল্ডে যাবে। আবার মনে হলো, যেতে যখন হবে, তখন আজ থেকেই নয় কেন! টিবি পিও লতিফকে ডাকল সে—আমাদের জটিল রোগী কয়টা আছে?

লোকটা পান খায় খুব। গালের একপাশে পান নিয়ে রস গিলে বলল—অখন চিকিত্সাধীন আছে এক-শ নয়জন। তার মধ্যে ছয়জন এট্টু খারাপ লাগতাছে।

কত দূরে ওদের বাড়ি?

একটু ভাবল লতিফ—সবগুলানই কাছেই। এই ধরেন পাঁচ-ছয় কিলোমিটার। খালি দুইজন দূরে। তাগোর বাড়ি বাইশ-তেইশ কিলোমিটার হইব।

তাহলে আমি আপনার মোটরসাইকেলেই যাব। নিয়ে যেতে পারবেন না?

তা পারুম। অক্ষনই যাইবেন?

যাওয়া যায়।

লোকটা একটু পান চিবাল। বলল—আমি কই কি আপা, অক্ষন মানে সকালের দিকে ক্লিনিকে রোগী বেশি আসে। এইবেলা রোগীগুলান দ্যাখেন। সেকেন্ড হাফে যাওয়া যাইব।

তার কথায় রাজি হলো নাজ। আজ রোগীর ভিড়ও মোটামুটি বেশি। পিওরা গ্রামে গ্রামে খবর পৌঁছে দিয়েছে তার আসার। রোগীও আসছে অনেক।

আউটডোরে রোগী দেখার অভ্যেস নেই নাজের। তাই একটা রোগী দেখতে যথেষ্ট সময় লাগে। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে রোগী দেখতে হয়। ওদিকে অভ্যর্থনাকক্ষে রোগীর ভিড় বাড়তে থাকে। জায়গা না থাকায় বারান্দায় পেতে রাখা বেঞ্চিতে বসে কেউ কেউ। আজ সকাল নয়টায় রোগী দেখা শুরু করেছে, বেলা বারোটাতেও ভিড় প্রায় একই রকম আছে। বেশ গলদঘর্ম অবস্থা নাজের। এর মধ্যে রইস বার দুয়েক উঁকি দিয়েছে। চা দেবে কি না জানতে চেয়েছে। সময় নষ্ট হবে ভেবে তাকে নিষেধ করেছে নাজ।

বারোটার দিকে আয়া জমিলা ত্রস্তভাবে এসে বলল—খাঁ সাব আসিছে?

খাঁ সাহেব কে?

তাঁই এটিকার খুব মানী লোক।

বলতে বলতেই পর্দা ঠেলে ঢুকল লোকটা। লম্বা, শ্যামলা। সাদা দাড়ি। বয়স ষাটের কোঠায়। খুবই পরিচ্ছন্ন অভিজাত লুঙ্গি-পাঞ্জাবি পরনে। মাথায় টুপি, কাঁধে হাজিদের গামছা, হাতে বেতের মাথায় রুপোবাঁধানো লাঠি। এই ধরনের মানুষকে দেখলে ভক্তি আসার কথা। কিন্তু লোকটার আচরণে এমন একটা দাম্ভিকতা ফুটে উঠছে, যা নাজের ঠিক পছন্দ হলো না। তবু সে ভদ্রভাবেই বলল—বসুন।

লোকটা বোধহয় আশা করেছিল, তাকে সালাম দেওয়া হবে। কিন্ত সেটা না পেয়ে তার হাসিতে ঈষত্ টান পড়ল। ঘাটতি পুষিয়ে দিল জমিলা—সেলামালেকুম, খাঁ সাব!

আবার স্বাভাবিক হাসি ফিরে এল খাঁ সাহেবের মুখে—ওয়ালেকুম সালাম ওয়া রহমতুল্লাহ।

তাজিমের সঙ্গে তার জন্য দেখিয়ে দেওয়া চেয়ারটা একটু নড়িয়ে-চড়িয়ে দিল জমিলা। খাঁ সাহেব হাসিমুখেই বসল চেয়ারে—শুনলাম তুমি হামাগোর ইলাকার নতুন ডাক্তারনি। তাই ভাবলাম এট্টু পয়-পরিচয় কর্যা আসি।

খুব ভালো করিছেন—জমিলা বলল—মানী লোকের কাছত তো মানী লোকই আসপি।

তুই যা! ধমকের সুরে বলল খাঁ সাহেব—বাইরোত যায়্যা খাড়া। হামি ডাক্তারনির সাত কথা-বার্তা কই।

বয়স্ক মানুষটার কথার ভঙ্গি দেখে ভেতরে ভেতরে তেতে উঠছিল নাজ। কষ্ট করে উষ্মা চেপে স্বাভাবিক গলাতেই বলল—জমিলা, তুমি রইসকে বলো মেহমান এসেছেন, একটু চা দিতে।

হামি আবার মেহমান হবো কীভাবে! আরে ইডা তো হামার ইলাকা। এই জাগাত তুমিই হামাগের মেহমান। হা হা হা।

তবু আমি এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ইনচার্জ। আর আপনি এসেছেন আমার স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। কষ্ট করে হলেও একটু হাসি ম্যানেজ করে বলল নাজ।

তা যা বলিছ! কিন্তু চা তো হামি খাই না। খালি ফজরের নামাজের পর এক কাপই। হামার মেজো ছাওয়াল চা-পাতা পাঠায় সিলেট থাক্যা। তাঁই ওই জাগাত বড় চাকরি করে।

তাহলে তো মুশকিল! আমাদের যে সিলেট থেকে পাঠানো চা-পাতা নেই।

দরকার নাই। চায়ের দরকার নাই। এমনি তোমার সাথত কথা-বার্তা কই।

আবার তুমি! নাজের কান গরম হয়ে যাচ্ছে। সে পরিষ্কার বুঝতে পারছে এই তুমি বলা বয়সের ব্যবধান ও স্নেহের কারণে নয়। এ হচ্ছে আত্মম্ভরিতার কারণে।

ধরো যে, এই ইলাকা আবাদ করিছে হামার পরদাদা। তাই আছিল রানি ভিক্টোরিয়ার আমলের জমিদার। ইলাকার সব্বাই আছিল হামাগের পরজা। তা এখন জমিদারি নাই। না থাকলেও লোকজনের দেখভাল করা লাগে হামাগোরই।

তা করতেই হবে। আপনারাই তো মানুষের অভিভাবক।

এত করি, তা-ও মানষের শোকর নাই রে, মা! দান-খয়রাত করি, আকালে-মঙ্গাত ধার-করজ দি, বিয়া-বাদিত সাহায্য করি, আপদে-বিপদে ডাকলেও যাই, না ডাকলেও যাই। তবুও মানষের মন পাই না। আসলে কি জানো, ছোট মানষের মনডাও খুব ছোট হয়।

এ কথার উত্তরে কী বলা যায় ভেবে পেল না নাজ। চুপ করে রইল।

ছোটলোকের ইলাকার সব চাষা। এ্যাকনা কথা কবা এমন মানুষ পাবে না। দুঃখত হামার ছোল-মিয়্যা ইলাকাত আসবার চায় না। তানারা সব বড় বড় টাউনোত চাকরি-বাকরি করে। বাড়ি-ঘরও করিছে টাউনোত। সবচায়ে ছোট ছোলডা তো চল্যা গ্যাছে সেই কুন দ্যাশত। নিউজিল্যান্ড না কি য্যান নাম। খুব নাকি ঠান্ডার দ্যাশ।

একের পর এক চলল তাদের বংশের গুণকীর্তন, তাদের ক্ষমতার ও দাপটের গল্প। হুঁ হাঁ করে কথা চালিয়ে যাচ্ছিল নাজ। কিন্তু ওর মনের মধ্যে অস্থিরতা। অনেক রোগী বসে আছে। আলাপটা সংক্ষেপ করার জন্য কয়েকবার ইঙ্গিত করেছে সে। কিন্তু খাঁ সাহেবের সেদিকে পরোয়াই নাই—বুজলে, পাকিস্তান আমলেও ইউনিয়ন বোর্ডের পেরসিডেন্ট আছিলাম দুইবার। গণ্ডগোলের পর আর ওইসবে জড়াইনি। শ্যাখ মুজিবরের সময় থাক্যা দ্যাশে মানী লোকের আর মান নাই। তাও হামি কচ্ছি যে, মানষের ইজ্জত আল্লার হাতে। বংশের ইজ্জত আল্লার দান। এই যে এখন ইলাকার চিয়ারম্যান হামাগোরই বংশের ছোল। হামার ভাতিজা আফজাল খাঁ। অর বিরুদ্ধে কে খাড়াছিল জানো? এক ল্যাংটার ছোল। মারুফ!

তাচ্ছিল্যে মুখ বাঁকায় খাঁ সাহেব।

এবার স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়ে বলে নাজ—আপনি চাচা একটু অফিস রুমে বসে ম্যানেজার সাহেবের সাথে গল্প করেন। আমি ততক্ষণে রোগীগুলো দেখে নেই। তারপর আবার গল্প করা যাবে। জমিলা, চাচাকে অফিস রুমে নিয়ে যাও!

বুঝিছি বাহে, তুমি হামাক যাবার কচ্ছো।

একটু হেসে উঠে দাঁড়াল খাঁ সাহেব—হামি যাচ্ছি। তুমি একবার বেড়াবার আসো হামাগোর বাড়িত। খাঁ বাড়ি কলেই যে-কেউ দেখায় দিবি।

নিশ্চয়ই যাব, চাচা। সময় পেলেই যাব।

তখনো খাঁ সাহেব দরজার দিকে এগোয়নি। চেয়ার থেকে উঠে সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে। তার দাঁড়িয়ে থাকাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে নাজ জমিলাকে বলল—পরের রোগীটাকে ভেতরে পাঠিয়ে দাও!

পাঁচ

ফিল্ডে ওকে শেষ পর্যন্ত যেতে হলো মুন্নীর সাথে। লতিফ ইতস্তত করছিল। তার ইতস্তত ভাব দেখে বিরক্ত হয়ে উঠেছিল নাজ। তখন ম্যানেজার নূরুল আলম এসে পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে। গ্রামাঞ্চলে কাজ করতে হয়। এমনিতেই এনজিও-কর্মীদের নিয়ে অনেকে অনেক কথা বলে। তাই কর্তৃপক্ষের নির্দেশ আছে নেহাত বাধ্য না হলে ছেলেমেয়ে যেন এক মোটরসাইকেলে না ওঠে।

ওরা যে গ্রামে গেল তার নাম নাচাই-কোচাই। নাম শুনে হেসে ফেলল নাজ। মুন্নী বলল—আর একটা গ্রামের নাম হচ্ছে ফুটানির বাজার।

ফুটানি মানে দেমাগ, অহংকার।

শুনে নাজের হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ার জোগাড়।

মুন্নী খুব সাবধানে হোন্ডা চালাচ্ছিল। সে হয়তো ভাবছে নাজের মোটরসাইকেল চড়ার অভিজ্ঞতা নেই। মুন্নীর পেছনে বসে থাকতে থাকতে নাজের এক সময় চন্দনের কথা মনে পড়ল। চন্দনের মোটরসাইকেলে চেপে সে অনেক ঘুরে বেড়িয়েছে। ওই স্মৃতি মনে পড়তেই নাজের ঠোঁট দুটো পরস্পর শক্ত হয়ে চেপে বসল। মাথা ঝাঁকিয়ে মন থেকে বের করে দিতে চাইল প্রতারকটার মুখ।

প্রথমে ওরা গেল স্বাস্থ্যসেবিকার বাড়ি। কোহিনুর। গ্রামেরই মেয়ে। কিন্তু যথেষ্ট সপ্রতিভ, আচরণে কোনো জড়তা নেই। যক্ষ্মারোগীর খবর জানতে চাইলে কোহিনুর জানাল যে রোগীকে কিছুতেই ওষুধ খাওয়ানো যাচ্ছে না। এমনকি এএফপির লোক দেখলেই রোগিনী গালি-গালাজ শুরু করে।

কেন?

সে মনে করে তার স্বামী যে তাকে তালাক দিয়েছে, সে জন্য আমরাই দায়ী।

এ আবার কেমন কথা?

কৌতূহল বেড়ে গেল নাজের। মুন্নীকে বলল—চলেন রোগীর বাড়িতে যাই।

বেশি দূরে নয়। মুন্নী হোন্ডা নিয়ে এগোল। কোহিনুরের সাথে হেঁটে চলল নাজ। পথে সে চেষ্টা করল কোহিনুরের কাছ থেকে কথা বের করার। কিন্তু মেয়েটিও পরিষ্কার করে কিছু বলতে পারল না।

রোগিনীর বাড়িতে পৌঁছাতে না পৌঁছাতেই তার চিত্কার ভেসে এল কানে। কোহিনুর এবং মুন্নীকে শাপশাপান্ত করছে মহিলা। নতুন একজন মানুষ এসেছে, নাজ, তাকে দেখেও গা করল না মহিলা। সোজা বলে দিল—হামি ওষুদ খামু না। এই এনজিউ হামার সর্বনাশ করিছে বাহে। হামার কপাল পুড়াছে। কার কথাত যে হামি কাশি পরীক্ষা করাবার গেছিনু মা রে... বলতে বলতে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করল মহিলা।

একেবারে ভেঙে পড়া চেহারা। সেইসাথে মনের চাপের কারণেই বোধহয় একেবারেই নুইয়ে পড়েছে। নাজ তার কাছে গিয়ে হাত ধরল। এক ঝটকায় হাতটা সরিয়ে নেবার চেষ্টা করল মহিলা—আপনে আবার কেডা?

আমি ডাক্তার। নতুন এসেছি। তাই ভাবলাম আপনাদের সাথে একটু দেখা-সাক্ষাত্ করি, পরিচিত হই। তাই এলাম।

আসিছেন ভালো কথা। কিন্তু হামাক ওষুদ খাবার কথা কতে পারবেন না। ওষুদ হামি খাব না।

আচ্ছা ঠিক আছে। আপনি ওষুধ না খেলে না খাবেন। শুধু আমাকে বলেন যে কেন আপনি ওষুধ খাবেন না। ওষুধ খেলে কি আপনার কোনো সমস্যা হয়।

কুনো সমিস্যা নাই। কিন্তু ওষুদ হামি খাব না।

ওষুধ খেলে আপনি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে যাবেন। কাজ করতে পারবেন। সন্তানদের দেখা-শোনা করতে পারবেন। সংসার সাজিয়ে নিতে পারবেন।

এ কথা শুনেই ডুকরে কেঁদে উঠল মহিলা—সংসার! হামার সংসার আপনারা ভাঙি ফালাইলেন। ফির আবার সংসারের কথা কন?

মানে? আপনার কথা তো বুঝতে পারছি না।

হামার সংসারই তো শ্যাষ হয়া গেছে। আল্লারে কী জন্যে যে হামি কাশি পরীক্ষা করাতে গেছিনু!

এবার ঘর থেকে বেরিয়ে এল মহিলার মা। বৃদ্ধা মানুষ। তার কাছে গিয়ে দাঁড়াল নাজ। বলল—আমাকে একটু সব কথা খুলে বলেন তো, মা! আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।

কথা আর বেশি কী! তার মেয়ের যক্ষ্মা ধরা পড়েছে জানার সঙ্গে সঙ্গে জামাই বাড়ি থেকে খেদিয়ে দিয়েছে মেয়েকে। যক্ষ্মা রোগীকে নিয়ে ঘর করবে না সে। এখন শোনা যাচ্ছে, জামাই নতুন আরেকটা বিয়ে করবে।

থ হয়ে গেল নাজ।

রাগে মাথার মধ্যে আগুন ধরে গেছে।

মুন্নীকে বলল—রোগীর শ্বশুরবাড়ির ঠিকানাটা জেনে নেন। ওই গ্রামটাও কি আমাদের কর্ম এলাকার মধ্যে পড়ে?

জি, আপা।

চলেন, এক্ষুনি ওখানে যাব।

হকচকিয়ে গেল মুন্নী—আমরা যেয়ে কী করব, আপা?

কী করব মানে? জানতে চাইব ওরা এত বড় অন্যায় কেন করল?

আপা?

আচ্ছা মুন্নী, যদি মেয়েটার না হয়ে তার স্বামীর যদি যক্ষ্মা হতো, তাহলে কি মেয়েটা তাকে তালাক দিত?

কী জানি, আপা!

কী জানি, মানে? আপনি তো অনেক দিন থেকে কাজ করছেন। দেখেছেন কখনো, স্বামীর যক্ষ্মার কারণে বউ তাকে তালাক দিয়েছে?

না, আপা।

তাহলে স্বামী তাকে কোন যুক্তিতে তালাক দেবে?

কোহিনুর বলল—মরদ মানষের কুনো যুক্তি লাগে না, আপা।

মুন্নীও বলল—পুরুষ মানুষের সাতখুন মাফ।

ক্ষেপে গেল নাজ—বোকার মতো কথা বলবেন না। সর্দি-কাশি-জ্বরের মতো যক্ষ্মাও একটা অসুখ। চিকিত্সা করলেই সেরে যায়। অসুখ হলে তালাক দেয়া যাবে, এমন কোনো আইন নাই। আপনি ঠিকানা জেনে নেন। আমরা এক্ষুনি সেখানে যাব।

ঠিকানা নিচ্ছি আপা। কিন্তু আমাদের যাওয়া কি ঠিক হবে?

মানে?

আমি বলছিলাম, অফিসে ফিরে আমরা এই ব্যাপারটা ম্যানেজার ভাই আর অন্যদের জানাই। ওরা এলাকার গণ্যমান্য লোকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে একটা সুরাহা করতে পারবে।

কোহিনুরও সায় দিল—ওইভাবে কাম করাডাই ভালো হবি, আপা।



অফিসে ফেরার সময় ঝিম মেরে হোন্ডার পেছনে বসে রইল নাজ। ধীরে ধীরে চিনতে পারছে সে। একটু একটু করে পর্দা সরে যাচ্ছে চোখের সামনে থেকে। এই নাকি গ্রাম! ছায়াসুনিবিড় শান্তির নীড় গ্রাম! গ্রামের লোক নাকি গ্রামের প্রকৃতির মতোই সহজ-সরল। এই তার নমুনা! ছয় কিলোমিটার রাস্তা এইসব তিক্ত ভাবনায় ছেয়ে রইল নাজের মন।

ওদের অফিস থেকে একটু আগে হাটের মোড়ে একটা ঝুঁপড়ি চায়ের দোকান। কয়েকজন লোক সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। সাধারণত বয়ঃসন্ধিকাল থেকেই এই ধরনের পুরুষ-জটলা এড়িয়ে চলতে শেখানো হয় মেয়েদের। কিছুটা শেখানো হয়, কিছুটা মেয়েরা নিজেরা শিখে যায়। নাজও শিখেছে। কিন্তু এখন অন্যমনস্ক বলেই বোধহয় সে পূর্ণচোখে তাকাল লোকগুলোর দিকে। তারপরেই মুন্নীকে বলল—দাঁড়ান! হোন্ডা থামান!

মুন্নী হোন্ডা থামাল। কিন্তু হেলমেটের মধ্যেও বোঝা যাচ্ছে, তার চোখ দুটো অস্বস্তিতে পরিপূর্ণ। হোন্ডা থেকে নেমে জটলার দিকে এগোল নাজ। জটলারত লোকগুলোর মনোযোগও ততক্ষণে এদিকে পড়েছে। ওকে এগোতে দেখে জটলা থেকে বেরিয়ে এল মারুফ আহমেদ—স্লামালেকুম। কেমন আছেন?

আসলে মারুফকে দেখেই মোটরসাইকেল থামাতে বলেছে নাজ। তবে নিজের কথার আগে মারুফের প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়।

এই আছি—নাজ মাথা ঝাঁকাল—আপনার সেই রোগীর, মানে ওই যে বাচ্চাটার খবর কী?

ভালো। ছেলেটার জ্বর আসেনি আর। আমার অবশ্য উচিত ছিল আপনাকে ধন্যবাদ জানিয়ে আসা।

ডাক্তাররা ধন্যবাদ পায় না। আশাও করে না। যাহোক, আপনি কি ব্যস্ত?

খুব একটা না। কেন, বলুন তো?

আমি একটু কথা বলতে চাই আপনার সাথে। আসতে পারবেন আমাদের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে?

কিছুক্ষণ চিন্তা করল মারুফ আহমেদ। বলল—আপনি যান। আমি ঘণ্টাখানেকের মধ্যে চলে আসছি।

আর একটু তাড়াতাড়ি আসা যায় না?

হেসে ফেলল মারুফ আহমেদ—খুব জরুরি ব্যাপার মনে হচ্ছে। ঠিক আছে আপনি এগোন, আমি আসছি।

গেটের সামনে হোন্ডা থেকে নেমে দাঁড়িয়ে রইল নাজ। বেশ দ্রুত পায়ে হেঁটে আসছে মারুফ আহমেদ। নাজ খেয়াল করল, লোকটার হাঁটার মধ্যে ঋজু একটা ভঙ্গি আছে। এসে পৌঁছালে ওকে নিয়ে অফিস রুমে বসাল নাজ। রইসকে চা দিতে বলল। তারপর কোনো গৌরচন্দ্রিকা না করেই যক্ষ্মা রোগী মেয়েটার করুণ কাহিনি খুলে বলল। তারপর বলল—এর একটা বিহিত আপনাকে করতেই হবে।

মারুফ আহমেদ শুনছিল মনোযোগ দিয়ে। নাজের শেষের কথায় মৃদু হাসল—আমি কথা বলব ওদের সাথে। একটা ভালো সমাধানে পৌঁছার আপ্রাণ চেষ্টা করব। কিন্তু আপনি এত মানুষ থাকতে সমাধান করার জন্য আমাকে বেছে নিলেন কেন?

কারণ, আপনি মারুফ আহমেদ।

একটু ছলকে উঠল মারুফের হাতের চায়ের কাপ—আপনি আমাকে চেনেন!

নব্বইয়ের দেশকাঁপানো ছাত্রনেতা আপনি। আপনাকে চিনব না!

আপনাকে দেখে তো অনেক কম বয়স মনে হয়। আপনি তখন কোথায় পড়াশোনা করতেন!

স্কুলে।

বাব্বাহ! তখনই ছাত্ররাজনীতির এত খোঁজ-খবর রাখতেন!

না। আপনার কথা মনে আছে একটা বিশেষ ঘটনার প্রেক্ষিতে। নব্বই সালের সাতাশে ফেব্রুয়ারি পুলিশ আপনাকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল আমাদের বাড়ি থেকেই।

থমকে গেল মারুফ—তার মানে, ওই যে মোহাম্মদপুরে তাজমহল রোডের বাড়িটা। ওটা আপনাদের বাড়ি?

হ্যাঁ।

জানেন—লজ্জিত স্বরে বলল মারুফ—জেল থেকে বেরোবার পরে অনেকবার মনে হয়েছে আপনাদের বাড়ি যাই। আপনারা আমাকে রক্ষা করার চেষ্টা করেছিলেন, সে জন্য অন্তত একটা মৌখিক কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে আসি। কিন্তু জানেন, আমি কিছুতেই লোকেশনটা মনে করতে পারছিলাম না। আসলে সেদিন পুলিশের তাড়া খেয়ে কোথায় ঢুকেছিলাম, কিছুই খেয়াল ছিল না। ভালোই হলো, অনেক বছর পরে হলেও অন্তত কৃতজ্ঞতা জানানোর সুযোগ পেলাম।

নাজ হেসে বলল—শুধু মুখে কৃতজ্ঞতা জানালে হবে না। এই রোগীর সংসার ফিরিয়ে দিতে হবে।

মারুফও হাসল—কাজটা কঠিন। তবে অসম্ভব নয়। আমি আপ্রাণ চেষ্টা করব। আজ তা হলে উঠি।

মারুফের সঙ্গে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে এল নাজ—মাঝে মাঝে আসবেন।

আসব। তবে আমি বিপজ্জনক লোক। আমার সঙ্গে বেশি মেলামেশা করলে এলাকার প্রভাবশালী লোকেরা আপনাদের শত্রু হয়ে যাবে।

সে আমি বুঝব। আপনি আসবেন তো?

আসব।

ছয়

কিন্ত প্রায় দুই সপ্তাহ কেটে গেল। মারুফ আহমেদ একবারও এল না। তবে কাজটা সে ঠিকই করে দিয়েছে। যক্ষ্মা রোগী মেয়েটা ফিরে গেছে তার শ্বশুরবাড়িতে। লোকটার প্রতি শ্রদ্ধা একটু বাড়ল নাজের। আসলে রাজনীতির কাজ তো মানুষের মধ্যে আরও মানবিকতা সঞ্চার করা। যদিও এ দেশে প্রধান ধারার রাজনীতির অন্য নাম অমানবিকতা। এই স্রোতের বিপক্ষে লড়ছে অল্প কয়েকজন মানুষ। মারুফ আহমেদ তাদেরই একজন।

নাজের প্রতিটি দিন এতই ঘটনাবহুল থাকে যে, কাজের চাপে নিজের দিকে তাকানোর ফুরসতও খুব একটা মেলে না। সবচেয়ে বড় কথা, কাজগুলো করতে নাজের ভালো লাগছে। মানুষ যখন বুঝতে পারে, তাকে অন্যদের প্রয়োজন, অন্যদের কাছে তার কাজের মূল্য আছে, তখন সে নিজেকে আরও উপযোগী করার চেষ্টা করে। ঢাকা শহরে হাজার হাজার ডাক্তার। তাদের ডিগ্রির সীমা-পরিসীমা নেই। সেখানে নাজের মতো ডাক্তাররা কোনো কাজে লাগে না। অথচ এখানে, এই ফাঁসিতলার মতো জায়গাগুলোতে একজন ডাক্তারের কত প্রয়োজন! হয়তো যা যা শিখেছে, সব জ্ঞানের প্রয়োগ করার সুযোগ এখানে নেই, তবু যত রকম রোগীর সংস্পর্শে সে আসার সুযোগ পাচ্ছে, স্বাধীনভাবে চিকিত্সা দিতে পারছে, এমন সুযোগ শহরে কোথায়। তারচেয়ে বড় কথা, নাজ এখানে পুরো একটি টিমের নেতৃত্ব দিচ্ছে, যারা সবাই তার প্রতি প্রশ্নাতীত আনুগত্য দেখায়।

হঠাত্ তার মায়ের চিঠি এল। মা লিখেছে, 'আমরা তোমাকে চাকরি করতে পাঠিয়েছি, নির্বাসনে পাঠাইনি। অথচ মনে হচ্ছে, তুমি চাকরি করার নামে আমাদের চিরদিনের জন্য ত্যাগ করেছ। আজ পর্যন্ত তুমি বাড়িতে একটা ফোন করোনি, কিংবা কারও কাছে দু-কলম চিঠি লেখোনি। তোমার এই ধরনের আচরণ আমরা সবাই মর্মাহত।'

খুব খারাপ লাগল নাজের। লজ্জাও! কেমনভাবে পারল সে একাজ করতে। সে তো হেড অফিসে কয়েকবার ফোন করেছে, অথচ তাড়াহুড়োয় বাড়িতে ফোন না করেই চলে এসেছে। তা ছাড়া এখানে এনডব্লিউটি নেই। বুকিং দিয়ে অপেক্ষা করতে হয় অনেকক্ষণ। আর চিঠি লেখার কথা তার মনেই আসেনি। কারণ অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি যে সে আজ পর্যন্ত কাউকে চিঠি লেখেনি। কিন্তু এতে তার অপরাধের স্খালন হয় না। নাজের মনটা ছটফটিয়ে উঠল মায়ের সাথে কথা বলার জন্য।

লাঞ্চের পর ফিল্ড পিওরা বেরোনোর সময় সে জিজ্ঞেস করল—গোবিন্দগঞ্জের দিকে ফিল্ড কার?

শেফালি বলল—আমার আপা।

তাহলে আমাকে একটু নিয়ে চলেন।

আপনাকে একটু চঞ্চল মনে হচ্ছে।

বাড়ির চিঠি পেয়েছি। এতগুলো দিন হলো এসেছি, বাড়িতে কোনো খবর দিইনি।

যে দোকান থেকে ওরা ফোন করে, সেখানে নাজকে নামিয়ে দিয়ে শেফালি জানতে চাইল সে অপেক্ষা করবে কি না।

না আপনি কাজে চলে যান। আমি ভ্যানে বা রিকশায় চড়ে অফিসে ফিরে যাব।

ট্রাঙ্ককল বুক করে অপেক্ষা করতে লাগল নাজ। এই দোকানে কুরিয়ার সার্ভিসও চালু আছে। কতক্ষণে ঢাকার লাইন পাওয়া যাবে, ঠিক নেই। ফোনের লাইন পেতে পেতে সে ইতিমধ্যে একটা চিঠি লিখতে পারে। কথাটা মনে হতে কাগজ-কলম নিয়ে সে টেবিলের একধারে দাঁড়িয়ে চিঠি লিখতে শুরু করল। কুরিয়ার সার্ভিসে দিলে চিঠিটা আগামীকালই ঢাকায় পৌঁছে যাবে।

চিঠি লেখা তার কাছে এমনিতেই অনভ্যস্ত কর্ম। সবে মন বসেছে চিঠিতে, এমন সময় একটা ভরাট গলা কানে এল—ঢাকাত একখান নম্বর লাগা তো, বাবা। অ্যাকনা ফোন করা লাগবি।

চমকে মুখ তুলল নাজ। মারুফ দাঁড়িয়ে আছে। ওকে আগেই দেখেছে। মিটিমিটি হাসছেও। চিঠির দিকে ইঙ্গিত করে বলল—বাড়িতে লিখছেন?

মাথা নাড়ল নাজ—হ্যাঁ।

এতই ব্যস্ত থাকেন আপনি যে, বাড়ির চিঠি লিখতে হয় দোকানে বসে!

আসলে ঠিক তা নয়। চিঠি লেখার প্ল্যান ছিল না। টেলিফোনের বুকিং দিয়ে বসে আছি। কতক্ষণে লাইনে পাই ঠিক নাই। তাই এই ফাঁকে চিঠিটাও লিখে ফেলতে চাইলাম।

সত্যিই আমাদের এখান থেকে যেকোনো জায়গায় টেলিফোন করা খুব মুশকিল। খুব ব্যাকওয়ার্ড জায়গা।

ব্যাকওয়ার্ড জায়গা—নাজ প্রতিধ্বনি করল—তা এই ব্যাকওয়ার্ড জায়গায় আপনি কেন পড়ে আছেন?

পড়ে আছি মানে? ভুরু কুঁচকে উঠল মারুফের।

পড়ে আছেন মানে, পড়ে আছেন। আপনার লেভেলের একজন ছাত্রনেতা এখন ন্যাশনাল পলিটিক্সে বড় জায়গায় থাকার কথা। আপনার সঙ্গীরা কেউ এখন মন্ত্রী, কেউ এমপি, কেউ বিচারপতি, কেউ বড় বিজনেস ম্যাগনেট। আর আপনি পড়ে আছেন এই ধ্যারধ্যারে গোবিন্দপুরে।

গম্ভীর হয়ে গেল মারুফের চেহারা—এটা আমার নিজের জায়গা। আর একেই আমি কর্মক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিয়েছি।

কর্মক্ষেত্র! এমনই কর্ম করেন যে ইউপি চেয়ারম্যান ভোটে পর্যন্ত সবচেয়ে কম ভোট পান। অথচ ঢাকায় থাকলে... ঢাকায় থাকলে রোজ পেপারে আমার নাম ছাপা হতো। মস্তবড় নেতা হয়ে যেতাম, এই তো!

মারুফের থমথমে মুখ দেখে সম্বিত্ ফিরল নাজের। খুব লজ্জা পেল সে। মারুফের সাথে এমনভাবে কথা বলার অধিকার কে তাকে দিয়েছে! মুখ নিচু করে বলল—স্যরি, আমি একটু বেশি কথা বলে ফেলেছি! মাফ করবেন।

মাফ চাইবার বা করার কী আছে! এই প্রশ্নের মুখোমুখি আমি অসংখ্যবার হয়েছি। আমার বন্ধুমহল, সহকর্মী, সহযোদ্ধা, আত্মীয়, শুভানুধ্যায়ী যারা, তারা প্রায় সবাই আমাকে এই প্রশ্ন করেছে। বারবার করেছে। তাই এখন আর আমি এই প্রশ্ন শুনলে কোনো কিছু মনে করি না।

মজার ব্যাপার হলো, মারুফের বুক করা নম্বরটাই আগে পাওয়া গেল। টেলিফোনঅলা কিছুক্ষণ হ্যালো হ্যালো করে বলল—মারুফ ভাই, কথা কন!

মারুফ সম্ভবত কথা বলছে তার পার্টি অফিসের সঙ্গে। তেল-গ্যাস বিক্রির বিরুদ্ধে আন্দোলন, লং মার্চ—এসব নিয়ে কথা হলো কিছুক্ষণ। মারুফ জানাল, লং মার্চে সে যেতে পারবে না। তার কিছু কর্মী যাবে। সে যাবে না, প্রথমত স্কুলে এখন ছুটি পাওয়া যাবে না। দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে এলাকার জোতদারদের সাথে ক্ষেতমজুরের একটা কনফ্রন্টেশন দানা বেঁধে উঠছে। তাকে তাই এলাকাতে থাকতে হবে।

কথা শেষ করে বিল দিতে গেল মারুফ। দোকানদার হেসে বলল—লাগবি না, ভাই।

ক্যা? ট্যাকা লিবে না ক্যা? তাহালে তোমার ব্যবসা চলবি ক্যাংকা কর্যা?

ভাই। রোজ আওয়ামী লীগ-বিএনপি দলোক যে পরিমাণ চান্দা দিতে হয়, সেড্যা তো আর জানেন না। আপনের পাট্টি আর যা-ই করুক, জবরদস্তি কর্যা ট্যাকা ল্যায় না। ধর্যা ল্যান, এড্যা হামি স্বইচ্ছাত চান্দা দিলাম।

নিরুপায় ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকাল মারুফ। তারপর নাজের দিকে ফিরে বলল—তাহলে চলি!

দোকান থেকে বেরিয়ে পথে নামল মারুফ। নাজও এল তার পিছু পিছু। মারুফ হেসে জিজ্ঞেস করল—কিছু বলবেন?

হ্যাঁ। আপনি কি এখান থেকে ফাঁসিতলার দিকে যাবেন?

যেতে পারি। কিন্তু কেন?

তাহলে একসঙ্গে যেতাম। আমার ফোনটা করা হলে একসঙ্গে যাওয়া যেত।

তা যাওয়া যেত। কিন্তু আগেই বলেছি, আমার সঙ্গে বেশি ঘোরাফেরা করলে আপনার বা আপনাদের এনজিওর ক্ষতি হতে পারে।

মানে?

আমি এলাকার অধিকাংশ প্রভাবশালী লোকের শত্রু। ওরা তখন আপনাকে শত্রু ভাববে। আপনার চাকরি করা কঠিন হয়ে যাবে।

মরিয়া হয়ে নাজ বলল—ভাবলে ভাবুক। কিন্তু আপনাকে আমি তার জন্য দোষারোপ করব না। তা ছাড়া এই চাকরি আমার কাছে অনেক মূল্যবান কিছু না।

আপনি না করলেও আমি নিজেকে দোষারোপ করব। আমি এনজিও কনসেপ্টের বিরোধী। এনজিওদের অনেক কর্মকাণ্ডে আমার কোনো সায় নেই। কিন্তু এই এলাকার গরিব মানুষদের জন্য আপনার মতো ডাক্তারের দরকার আছে। আর গরিবের পক্ষের একজন মানুষ হিসেবে আমি চাই না যে প্রভাবশালীরা আপনার বিরুদ্ধে লাগুক এবং তার ফলে আপনাকে চলে যেতে হোক।

আশা করি, এ ধরনের সমস্যা হবে না।

মারুফ হাসল—তা-ই ভাবেন বুঝি? আপনি কি জানেন যে আপনি অলরেডি তোপের মুখে পড়ে গেছেন?

মানে? কীসের কথা বলছেন?

আপনি না কি খাঁ সাহেবকে সম্মান দেখাননি। উনি আপনার চেম্বারে গেলে আপনি তাকে বসতে বলেননি? প্রভাবশালীরা এখন আপনাকে খুব তীক্ষভাবে ওয়াচ করছে।

এটা ডাহা মিথ্যা কথা।

আমারও তা-ই ধারণা। কিন্তু লোকে খাঁ সাহেবের কথাই বিশ্বাস করবে। প্রথম কারণ তিনি বয়স্ক মানুষ, দ্বিতীয়ত হজ করে এসেছেন, তৃতীয়ত প্রভাবশালী। তবে ওই যে বললাম, এখনই ওরা কোনো অ্যাকশনে যাচ্ছে না। আপনার গতিবিধির ওপর নজর রাখছে। সেই কারণেই বললাম, নেহাত দরকার না হলে আমার সঙ্গে আপনার যোগাযোগ না করাই ভালো।

মনটা এত খরাপ হলো নাজের যে, বাড়িতে ফোন করার উত্তেজনাও মিইয়ে গেল।

সাত

সে রাতে ঘুম আসছিল না নাজের। মারুফকে তার এক অসম্ভব ধাঁধার মতো মনে হচ্ছে। একটা ব্যাপারে সে রীতিমতো অপমানিত বোধ করছে। বুঝতে পারছে, মারুফের অনুভূতিতে সে বিন্দুমাত্র আঁচড় পর্যন্ত কাটতে পরেনি। সেটাই স্বাভাবিক। যে লোক উজ্জ্বল ক্যারিয়ার, দেশজোড়া পরিচিতি, সম্মানের ব্যাকগ্রাউন্ড অনায়াসে পেছনে ফেলে দিয়ে এ রকম নিস্তব্ধ জনপদকে নিজের কর্মস্থল হিসেবে বেছে নিতে পারে, তার ওপর নাজ কেনো প্রভাব বিস্তার করতে পারবে, সেটা আশা করা যায় না। নেহাত তাদের বাসার একটা ঘটনায় জড়িয়ে পড়েছিল বলে কৃতজ্ঞতাবশে নাজের সঙ্গে সে কিছুটা নরম ব্যবহার করছে। অন্তত চাইছে না যে তার কারণে নাজের কোনো ক্ষতি হোক।

গ্রামের নির্ঘুম রাতগুলো এত দীর্ঘ হয়, জানা ছিল না নাজের। রাত দশটার পরে ওদের অফিসে কেউই জেগে থাকে না। অন্ধকার গ্রামে তো কারও জেগে থাকার প্রশ্নই ওঠে না। নিদ্রাহীনতা এবং নিস্তব্ধতা যেন নাজের বুকের ওপর চেপে বসতে চায়। নিজের ওপর তার নিজেরই রাগ হয়। কেন মারুফের কথা ভেবে সে নিজের ঘুম মাটি করছে!

হঠাত্ সে আবিষ্কার করে, মারুফ তার হিরো। নিতান্ত কিশোরী বয়সে মারুফের মতো একজন ব্যক্তিত্ব ওই রকম নাটকীয় পরিবেশে তার সামনে এসেছিল। এরচেয়ে রোমাঞ্চকর ঘটনা নাজের জীবনে আর একটাও ঘটেনি। পরক্ষণেই নাজ প্রশ্ন করে নিজেকে, ঘটেনি কি? চন্দনের সাথে ঘনিষ্টতা, প্রথম চুম্বন, ধাপে ধাপে আরও ঘনিষ্টতা—সেগুলো কি কম রোমাঞ্চকর ছিল? না, সেগুলোও রোমাঞ্চকর। কিন্তু অন্যরকম। চন্দন ছিল তার ধরাছোঁয়ার মধ্যেকার মানুষ। তাই পালিশ করা আচরণের আড়ালে তার কুিসত মানসিকতা নাজ ঠিকই উন্মোচন করতে পেরেছিল। কিন্তু মারুফ চিরকালই তার অচেনা। তার কিশোরী বুকের প্রথম কাঁপন। রবিনহুড কিংবা স্পাইডারম্যানের মানবীয় সংস্করণ একঝলক সে আরোপ করতে চেয়েছিল মারুফের ওপর।

নাজের মধ্যে জেদ তৈরি হতে থাকে। শক্তিশালী জেদ। সে রকম জেদ তৈরি হয়েছিল এখানে চাকরি নিয়ে আসার সময়। মারুফের দুর্ভেদ্য বর্ম সে ভেদ করবেই।

পরের শুক্রবার। অফিস, ক্লিনিক সব বন্ধ। আগের দিন জমিলাকে বলে রেখেছিল নাজ। নাস্তা করে উঠতে না উঠতে জমিলা এসে পৌঁছাল। ওকে নিয়ে নিজের ঘরে ঢুকল নাজ। জিজ্ঞেস করল—তুমি মারুফ আহমেদের বাড়ি চেনো?

কোন মারুফ? ওই দোয়াত-কলম মার্কা?

হ্যাঁ। চিনি।

কত দূর এখান থেকে।

কিছুক্ষণ ভাবল জমিলা—এই ধরেন, এই জাগাত থাক্যা গোবিন্দগঞ্জ যত দূরে, তার অর্ধেক। না, আর একটু য্যান বেশিই হবি। ক্যা? সেটি যাবেন আপা?

হ্যাঁ। তুমি আমাকে ওখানে রেখে তোমার বাড়িতে চলে যেয়ো। কে কে থাকে ওই বাড়িতে?

আর কি কেউ আছে যে থাকপি! মা নাই, বাপও নাই। থাকার মধ্যে আছে বুড়া ফুপু।

উনার বউ-ছেলে-মেয়ে নাই?

বিয়্যা হলে না বউ! তাঁই বিয়্যাই বসে না। মানুষডা ক্যাংকা যানি!

ঠিক এই রকম একটা উত্তর পাবে বলেই ধারণা ছিল নাজের। তবু জিজ্ঞেস করে—মানে!

একটু পাগল-পাগল ভাব। নিজের দিকত খিয়্যাল কম।

ভ্যান-রিকশায় চড়তে এখন আর নাজের কোনো অসুবিধা হয় না। আগে একটু লজ্জা করত, এখন সেটাও নাই। এখানে ভ্যানে চড়াকে কেউই খারাপ চোখে দেখে না। ধনি-গরিব, পুরুষ-মহিলা সবাই ভ্যানে ওঠে। নাজ ভেবে দেখেছে, এসব এলাকার জন্য ভ্যানই উপযুক্ত। রিকশার তুলনায় ভ্যান হালকা বাহন। এবড়োখেবড়ো রাস্তায় চলার জন্য বেশি উপযোগী। তা ছাড়া ভ্যানে যেমন যাত্রী নেওয়া যায়, তেমনি মালপত্রও বহন করা যায়।

জমিলার সঙ্গে টুকটাক কথা বলতে যাচ্ছিল নাজ। এলাকার কিছু কিছু লোক ইতোমধ্যেই চিনে ফেলেছে নাজকে। পাশ দিয়ে যাবার সময় কিছু আদাব-সালামও পাচ্ছিল সে।

মারুফদের বাড়িটা বেশ বড়। রাস্তার পাশেই বেশ খানিকটা জায়গাজুড়ে বাগান। আম, নিম আর কাঁঠাল গাছ চোখে পড়ল নাজের। বাগানের পরে একটা লম্বা টিনের আটচালা। জমিলা জানাল, ওটা বাহিরবাড়ি। কিছু ছাত্র এখন ওখানে থেকে পড়াশোনা করে। সেই ঘরের পরে একটা উঠোন। এল প্যাটার্নের তিনটা টিনের ঘর। উঠোনের পব পাশে ঘরের চালার নিচে খোলা উনুন। সব মিলিয়ে বোঝা যায়, মারুফদের অবস্থা মোটামুটি সচ্ছলই। একসময়ে নিশ্চয়ই সম্পন্ন গৃহস্থ ছিল ওরা। সে কথা বলতেই জমিলা বলল—বাপরে, অরা তো আছিল এই ইলাকাত খাঁ বাড়ির পরেই। অর বাপও আছিল এট্টু উড়নচণ্ডী আর ছোলডা তো রীতিমতোন পাগল।

ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন একজন প্রৌঢ়া। গ্রামের মহিলাদের মতোই মোটা কাপড় পরনে। বাড়িতে ব্লাউজ না পরার চল এখানে। প্রৌঢ়ার শরীরেও তা-ই। তবুও চলার ভঙ্গি আর শাড়ির পাড় দিয়ে গা ঢেকে রাখার মধ্যে একটা অন্যরকম শালীনতা। প্রৌঢ়া নেমে এলেন উঠোনে—কেডা বাহে?

আমরা, ফুপু! জমিলা সাড়া দিল।

জমিলা ধাত্রী হিসেবে এলাকায় পরিচিত। তাকে দেখে ফুপু বললেন—ও, আয়েনউদ্দির বউ! তোর সাথক কেডা?

হামাগের ডাক্তার আপা। মারুফ ভায়ের কাছত আসিছে।

ও ডাক্তার নি! আসেন মা। ঘরোত আসেন।

জমিলা জিজ্ঞেস করে—মারুফ ভাই বাড়িত নাই?

নাহ। তাঁই কি বাড়িত থাকার ছোল। সেই ফজরের অক্তে বার হয়্যা গেছে। হামি কনু, দুইডা মুড়ি খায়্যা যা। এক ঢোক পানি খা। না তার সুমায় নাই।

একটু হতাশ হলো নাজ—কোথায় গেছে জানেন?

বেশি দূর বোধায় না। ওই মসজিদ পাড়ার মানুষরা ডাকতে আসিছিল।

জমিলাই বুদ্ধি দিল—দহলিজ ঘরোত থাক্যা এ্যাকনা ছোলেক পাঠান যায় না?

তা যায়। হামি পাঠাচ্ছি। আপনেরা ঘরোত বসেন। ওই মারুফের ঘরোতই বসেন।

তিনি নিজেই এগিয়ে দরজা খুলে দিলেন—আসেন মা, এই ঘরোত বসেন!

ঘরে ঢুকেই বিস্ময়ের ধ্বনি বেরিয়ে এল নাজের মুখ থেকে। চারদিকের দেয়াল জুড়েই র্যাক উপচে পড়া বই। এত বই! ফুপু বলে—ওই একখানই নেশা ছোলের। খালি রাজ্যের বই কিনে। সারাদিন টোঁ টোঁ কর্যা ঘুরে। আর রাতের বেলা মুখ গুজ্যাঁ বই পড়ে। আপনে বসেন, মা! হামি এট্টু চা বানাই।

না না, চা লাগবে না।

তাই বললে কী হয়! এই পয়লাবার হামাগোর বাড়িত আসলেন। ডাক্তার মানষের একটা সর্মান আছে না!

হেসে ফেলল নাজ—ডাক্তার বলেই চা খেতে হবে?

প্রৌঢ়াও হাসলেন—হ্যাঁ, তাই খাওয়া লাগবি।

উনি বেরিয়ে গেলেন।

নাজ বলল—অনেক বই, তাই না?

ওই তো আপা! এইসব বই পড়্যা পড়্যাই মানুষটার মাথার গোলমাল হছে।

চেয়ারে বসল নাজ—কী এমন পাগলামি করেছে লোকটা? তাকে পাগল বলছ কেন?

এবার আর উত্তর খুঁজে পায় না জমিলা। আমতা আমতা করে বলে—এই যে ধরেন বিয়াসাদি করে না।

বিয়ে না করলেই একটা লোককে পাগল বলতে হবে?

তা না। মানে লোকটা কীরম যানি। অন্য মানষের মতন না।

এই কথাটি তুমি ঠিক বলেছ, জমিলা। সে অন্যদের মতো নয়। এক্সেপশনাল।

ওই তো আপনে বুঝবার পারিছেন।

উঠোনের প্রান্তে লম্বা ছাড়া পড়ে। পরক্ষণেই মারুফকে আসতে দেখা যায়। পরনে লুঙ্গি, একটা হাওয়াই শার্ট। আর যা-ই হোক মারুফকে লুঙ্গি পরা অবস্থায় দেখবে এমনটি ভাবেনি নাজ। তবে খুব খারাপ লাগছে না। আসলে পরিপ্রেক্ষিতের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলেই আর বেমানান মনে হয় না। গ্রামের প্রেক্ষিতে লুঙ্গি পরা খুবই স্বাভাবিক।

খুব স্বাভাবিকভাবে এগিয়ে আসে মারুফ। নাজের হঠাত্ আগমনে সে বিস্মিত হয়েছে, এমনটা মনে হয় না। হতে পারে বিস্ময়টা সে ইতোমধ্যেই হজম করে ফেলতে পেরেছে। সে ঘরে ঢুকে জিজ্ঞেস করে—কী ব্যাপার? একেবারে সশরীরে হাজির যে?

কোনো ব্যাপার ছাড়া আসতে নেই বুঝি!

না, তা নয়। তবে আপনার মতো ব্যস্ত মানুষ কোনো কারণ ছাড়া কোথাও যাবে বলে মনে হয় না।

ব্যস্ত মানুষেরা কি কাজ ছাড়া কোথাও যায় না? আপনি যান না?

এবার হাল ছেড়ে দেবার ভঙ্গি করল মারুফ—আচ্ছা বাবা, ঠিক আছে! আপনি কোনো কাজে আসেননি। এমনি বেড়াতে এসেছেন। আপনার বেড়াতে আসাকে সুস্বাগতম!

চা খাওয়ার পরে জমিলা বলল—আমি তাহালে যাই!

মারুফ একটু অবাক হয়ে বলল—সে কি! তোমার আপাকে ফেলে চলে যাচ্ছ?

জমিলা হাসল—আপার তো কুনো অসুবিদা নাই। অফিসত ফিরলে রান্দা ভাত পাবি। কিন্তু হামার তো তা না। আমার চারডা রান্দা-বাড়া আছে।

বেরিয়ে গেল সে।

মারুফ চেয়ার ঘুরিয়ে নাজের মুখোমুখি বসল—এবার বলেন, কী কাজ!

সত্যি, কোনো কাজ নেই। ছুটির দিন। হয় শুয়ে থাকতে হবে, নাহলে টিভি দেখতে হবে। তাই গল্পসল্প করার জন্য চলে এলাম।

মারুফ গম্ভীর হতে গিয়েও হেসে ফেলল—গল্প করার জন্য ভালো লোককেই বেছে নিয়েছেন! দেখা যাবে কিছুক্ষণ পরেই আমরা ঝগড়া করছি।

নাজ ভুরু তুলল—কেন! ঝগড়া হতে যাবে কেন?

ঝগড়া হবে না-ই বা কেন? আপনি এনজিওতে কাজ করেন, আর আমি এনজিও কনসেপ্টের বিরোধী।

এনজিওতে কাজ করি বলেই এনজিওকে দেশের মুক্তির একমাত্র পথ বলে আমি মনে করি না। তবু অন্তত প্রতিষ্ঠানের কাছে আমি কৃতজ্ঞ এই কারণে যে তৃণমূলে কাজ করার সুযোগ এরা আমাকে করে দিয়েছে। আর ঠিক যে জায়গায় বা যাদের জন্য আমার সার্ভিসটা দরকার, সেইখানে সার্ভিসটা দিতে পারছি। তা আপনি কেন এনজিওর বিরোধী?

আপনার অংশটা অর্থাত্ স্বাস্থ্যসেবাটা এনজিও কাজের একটা খুবই ক্ষুদ্র অংশ। ঋণ কার্যক্রমের নামে আপনারা যেসব অমানবিক শোষণ চালাচ্ছেন, স্বাস্থ্যসেবা সেই অমানবিকতাকে ঢেকে রাখার একটা ওপর-পালিশ মাত্র।

ঠিক বুঝলাম না।

এনজিওরা ঋণ দিয়ে কত পার্সেন্ট সুদ নেয়, জানেন?

না। ওসব সুদকষা অংক আমার কোনো দিনই ভালো লাগেনি। আর অর্থনীতি আমি বুঝি না।

অথচ অর্থনীতিই হলো সবকিছুর কেন্দ্রে। তবে বেশি না বুঝলেও চলবে। আমি আপনাকে শুধু একটা উদাহরণ দিচ্ছি। ধরেন আপনি এএফপি বা ব্র্যাক, গ্রামীণ ব্যাংক থেকে চার হাজার টাকা লোন নিতে গেলেন। আপনি লোন নিলেন চার হাজার টাকা। কিন্তু আপনার হাতে দেওয়া হবে ছয়-শ টাকা কম।

কেন?

তারা বলে যে সার্ভিস চার্জ, সিকিউরিটি, বিমা হেনতেন বাবদ ছয়-শ টাকা কেটে নেওয়া হলো। ও হ্যাঁ, এর মধ্যে প্রথম কিস্তির টাকাও আছে।

লোন দেওয়ার সময়েই প্রথম কিস্তির টাকা কেটে রাখে!

এই তো মজা। তার পরেও আপনাকে শোধ করতে হবে বায়ান্ন কিস্তি। প্রতি কিস্তিতে এক-শ বারো টাকা। হিসাব করে দেখেন, কত হলো।

হিসাব করতে গিয়ে মাথা ঝিমঝিম করে উঠল নাজের—এ যে রীতিমতো ডাকাতি!

হ্যাঁ। আর এ কারণেই প্রায় অর্ধেক ঋণগ্রহীতাই তাদের ঋণ সময়মতো শোধ করতে পারে না। কিস্তিখেলাপি হয়ে যায়।

এবার প্রতিবাদ কলল নাজ—না না, রিপোর্ট তো আছে যে এনজিওর ঋণ শতকরা আটানব্বই ভাগ ঠিকমতো আদায় হয়।

ওখানেও শুভংকরের ফাঁকি। ধরেন, কেউ চার হাজার টাকার লোনে এক-শ বারো টাকা কিস্তি দিচ্ছে। দেখা গেল, পর পর ছয় কিস্তি সে দিতে পারল না। তখন কী করা হয়?

ঘটি-বাটি, টিনের চাল, গোয়োলের গরু কেড়ে আনা হয়। পত্রিকায় দেখেছি।

হ্যাঁ, আনা হয়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে প্রতিরোধের মুখে এগুলো কেড়ে আনতে পারে না। তখন কী করে জানেন?

নাহ।

তখন ওই চার হাজার টাকার কিস্তি খেলাপির নামে আট হাজার টাকা ঋণ বরাদ্দ করা হয়। আট হাজার টাকা থেকে আগের সুদ-মূল কেটে নিয়ে তাকে ধরিয়ে দেওয়া হলো হয়তো সাড়ে তিন হাজার টাকা। এখন তাকে বায়ান্ন সপ্তাহ কিস্তি দিতে হবে ডবল করে। ওদিকে রিপোর্ট পাঠানো হলো যে, আগের ঋণের টাকা সুদসমেত ফেরত পাওয়া গেছে। বিদেশিরা রিপোর্ট পেয়ে খুশিতে বাগ-বাগ। দাও প্রফেসর ইউনূসকে নোবেল পুরস্কার! দাও আবেদ সাহেবকে নাইট উপাধি! এদিকে যার দারিদ্র্য কমানোর জন্য তাঁদের নোবেল পুরস্কার বা নাইটহুড দেওয়া হয়, সে গরিব থেকে হয়ে পড়ে আরও নিঃস্ব।

আবারও প্রতিবাদ করল নাজ—তবে যে বলা হয়, ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে অনেকেই দারিদ্র্যসীমা পেরিয়ে আসতে পেরেছে!

মারুফ দৃঢ়স্বরে বলল—সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা। এনজিওর ঋণ নিয়ে কোনো দরিদ্র পরিবারই দারিদ্র্যসীমা পার হতে পারেনি। উল্টো জড়িয়ে পড়েছে ঋণের জালে। এদের এখন কোনো স্বাধীনতা নেই। এরা ভোট পর্যন্ত দিতে বাধ্য হয় ঋণদাতা এনজিওর আদেশমতো প্রার্থীকে।

কিন্তু আমাদের যে বলা হয়েছে, এনজিওর কর্মীরা কোনোভাবেই রাজনীতিতে জড়াবে না।

সেটা বিএনপি বা আওয়ামী লীগের বেলায়। এই দুই দলের যে-ই ক্ষমতায় আসুক না কেন, এনজিওর কোনো অসুবিধা নাই। বিরোধিতা করা হয় আমাদের মতো বাম কর্মীদের। গত ইউপি নির্বাচনে আপনাদের তো বটেই, ব্র্যাক, গ্রামীণ ব্যাংক, অশা—সব এনজিওর কর্মীরা আমার বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে নেমেছিল ভোটযুদ্ধে।

তাই?

হ্যাঁ, তাই। যেকোনো মানুষকে জিজ্ঞেস করলেই জানতে পারবেন। সেই কারণেই তো বললাম, আমার সঙ্গে বেশি যোগাযোগ রাখবেন না। আপনার চাকরির অসুবিধা হবে।

আমি চাকরির ভয় পাই না।

তা না পেতে পারেন। কিন্তু গ্রামের পলিটিক্স অত্যন্ত ভয়ংকর। আপনার অন্য ক্ষতিও হতে পারে।

ভয় দেখাচ্ছেন?

না। সত্যিকারের পরিস্থিতিটা আপনাকে জানাচ্ছি।

একটা অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এল ঘরের মধ্যে। নাজ কোনো কথা খুঁজে পাচ্ছিল না। মারুফকেও একটু বিব্রত মনে হচ্ছিল এই ধরনের কথা বলে ফেলায়। ওরা দুজনেই চাইছিল অন্য কোনো প্রসঙ্গে কথা বলতে। কিন্তু জুতসই প্রসঙ্গও কেউ খুঁজে পাচ্ছিল না। শেষে মারুফ বলল—অনেক কথা হলো। এবার আরেক কাপ চা খাওয়া যেতে পারে, কী বলেন!

হ্যাঁ-সূচক মাথা ঝাঁকাল নাজ। তারপর উঠে গেল র্যাকের দিকে। বইগুলো দেখতে দেখতে বলল—আপনার অনেক বই!

হ্যাঁ। কিন্তু কাজে লাগছে না।

মানে? পড়েননি?

পড়েছি। কিন্তু আত্মস্থ করতে পারিনি।

নাজ এবারও বুঝতে না পেরে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাল। মারুফ ম্লান হেসে বলল—আত্মস্থ করতে পারলে লোকজনকে আরও প্রাঞ্জলভাবে তাদের সঠিক অবস্থার কথা বোঝাতে পারতাম। বোঝাতে পারতাম যে এই অবস্থার পরিবর্তন করা সম্ভব। মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে পারতাম। কিন্তু পারছি না।

এই জন্যেই ভোটে হেরে গেছেন, মনে করেন?

এটাও একটা কারণ তো বটেই।

আচ্ছা, আপনি যে মাপের মানুষ, ইউপি তো আপনার তুলনায় খুবই নগণ্য একটা ক্ষেত্র। আপনি ইউপি ইলেকশন করতে চান কেন?

এটা আমার একটা হাইপোথিসিস বলতে পারেন। জাতীয় নির্বাচন, যেমন সংসদ নির্বাচনে, কোটি কোটি টাকা না থাকলে, কালো টাকা, পেশিশক্তি, ভোট কেনার ক্ষমতা, অস্ত্র—এসব না থাকলে অন্তত এই রকম সময়ে নামা সম্ভব নয়। তো আমাদের বামপন্থীদের সেসব কোনোটিই নাই। তাহলে কি আমরা হাত গুটিয়ে বসে থাকব। আমার মতে স্থানীয় পরিষদ নির্বাচনগুলো আমাদের করা উচিত। এই ধরনের নির্বাচনের টাকা বা পেশিশক্তির ব্যবহার হয় কিন্তু সেগুলিকে এড়ানো সম্ভব। সর্বোপরি, এখানে সবার সঙ্গে প্রায় রোজই দেখা হয়। লোকজন টাকা খেয়ে হয়তো ভোট দিয়েছে অন্যকে, কিন্তু আমার সামনে পড়লেই তারা লজ্জা পায়। কারণ তাদের বিপদে-আপদে আমি সব সময়ই পাশে দাঁড়াই। ফলে আমার ধারণা, আমি একবার ঠিকই নির্বাচিত হবো। তাহলে বামপন্থী কর্মীরাও আমার দৃষ্টান্ত অনুসরণে উত্সাহী হবে।

ধরে নিলাম, স্থানীয় পরিষদে আপনারা নির্বাচিত হলেন। কিন্তু তাতে লাভ? স্থানীয় পরিষদের ক্ষমতা কতটুকু?

এটাও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। স্থানীয় পরিষদের ক্ষমতা আসলেই সীমিত। কিন্তু জনগণকে যদি সম্পৃক্ত করা যায়, যদি স্বচ্ছতা থাকে, যদি জনগণের মতামত চাওয়া হয় যে, এই-ই আমাদের মোট সম্পদ, আমরা কোন খাতে তা কাজে লাগাব—তাহলে আপনার প্রতি জনগণের আস্থা দিনে দিনে বৃদ্ধি পাবে। পাবেই। তখন আমরা ধীরে ধীরে বড় নির্বাচনের দিকে এগোতে পারব।

ওরে বাবা। এ তো অনেক দীর্ঘমেয়াদি ব্যাপার। তত দিনে চুল পেকে যাবে।

চুল তো পেকেই গেছে। প্রায় বুড়ো হয়েই গেছি।

কে বলল আপনাকে!

আমি যখন ইউনিভার্সিটি থেকে পাস করে বেরিয়ে গেছি, আপনি তখনো সম্ভবত স্কুলে পড়তেন। এখন আপনি পুরোদস্তুর ডাক্তার। তাহলেই বোঝেন, আমার বয়স কত?

ফুপু এসে দাঁড়ালেন দরজায়—বেলা কয়ডা বাজে? গুসল-খাওয়া লাগবি না, না কি?

নাজ একটু লজ্জিত হলো—আপনাদের দেরি করিয়ে দিলাম!

আরে না, রে মা! আপনে আসলেন, তাই ছোলডা আজকা ঘরোত আছে। অর কি গুসল-খাওয়ার কুনো ঠিক-ঠিকানা আছে। অর জন্যে না, হামি আপনের জন্যেই তাড়া করিচ্ছি।

মেঝেতে পাটির ওপর দস্তরখান পেতে বসা। মোটা চালের ভাত, দুই রকম শাক, বড়া, ডাল আর মাছের তরকারি। ফুপু একটু কুণ্ঠিত গলায় বলল—আপনের পাতে দেওয়ার মতোন কিছু নাই মা। গাঁয়ের মানুষ হামরা। হাটের দিন ছাড়া মাছ-গোস্তো পাওয়া যায় না।

মাংসের কী দরকার? এ-ই তো অনেক।

বড়াতে কামড় বসিয়ে উম্ম করে উঠল নাজ—কী মজা খেতে! কী দিয়ে বানানো?

ওইডা হলো বকফুলের বড়া।

খুব সুন্দর তো! আমি আরেকটা নেব!

নাজের আদুরে গলা শুনে হেসে ফেলল ফুপু—ল্যান না! ল্যান! আরও আছে তো। আপনের ভালো লাগলে যে কয়খান ইচ্ছা, খান।

ফুপু, আপনি কিন্তু আমাকে আপনি আপনি করছেন! আমার একটুও ভালো লাগছে না। আমাকে তুমি করে বলবেন।

ফুপু একটু বিব্রতভঙ্গিতে হাসল—নতুন মানুষ, চিন-পরিচয় নাই! তার উপরে আপনেরা মানী লোক।

কীসের চিন-পরিচয় নাই। এতক্ষণেও পরিচয় হয়নি!

আচ্ছা, আচ্ছা। ঠিক আছে।

খাওয়ার পর বেরিয়ে গেল মারুফ। মসজিদপাড়ার সালিশটা শেষ হয়নি। তবে আশ্বাস দিয়ে গেল, বেলা সাড়ে চারটার মধ্যেই ফিরবে সে।

ততক্ষণ পর্যন্ত ফুপুর সাথে চমত্কার সময় কাটাল নাজ। ফুপু গল্প করতে খুব পছন্দ করে বোঝা গেল। কাঁচা সুপারি দিয়ে পান খায় ঘনঘন। কাছে বসলে পান-সুপারি-জর্দার একটা মিষ্টি মাদকতাময় গন্ধ পাওয়া যায়। কথায় কথায় নাজ জানল, ফুপু যখন বিধবা হয়ে এ বাড়িতে ফিরে এল, তখন তার কোলে একটা মেয়ে। সেই মেয়ে হেসেখেলে বড় হয়েছে মারুফের সাথে। মারুফেরই বয়সী। তার বিয়ে হয়েছে গাইবান্ধা শহরে। ছেলে উকিল। খুব সুখে আছে মেয়ে। মেয়ে-জামাই অনেকবার তাকে নিতে এসেছে। তারা চায়, তিনি তাদের কাছে থাকেন। কিন্তু বাপ-মাহারা মারুফকে তিনি কেমন করে একা ফেলে যাবেন! ছেলেটা বিয়ে-থা করলেও কথা ছিল। কিন্তু ছেলে বিয়ের কথা কানেই তোলে না। হেসে উড়িয়ে দেয়।

নাজের মনে হয়, ভার্সিটি জীবনে হয়তো মারুফের কোনো প্রেম ছিল। থাকাই স্বাভাবিক। এই রকম ব্রিলিয়ান্ট, ক্যারিশমাটিক ছেলের প্রেম থাকারই কথা। হয়তো সেই মেয়ে মারুফের কথামতো গ্রামে থাকতে চায়নি, কিংবা হয়তো সেই মেয়েটা কোনো কারণে সম্পর্ক ভেঙে দিয়েছে বলেই মারুফ ঢাকা ছেড়ে চলে এসেছে নিজের গ্রামে।

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে নামে। তখনো মারুফের পাত্তা নেই। ফুপু একটু অস্থির হয়ে ওঠে—দ্যাখো তো ছোলের কাণ্ড! ইদিক যে আন্ধার হয়্যা আসল। তোমার এত রাস্তা যাওয়া লাগবি!

দহলিজ ঘর থেকে একটা ছেলে এসে জানাল যে জরুরি কাজে মারুফ ভাইকে আরেক গ্রামে যেতে হয়েছে। মারুফ ভাই একজন চেনা ভ্যানঅলাকে পাঠিয়েছে। সে ডাক্তার আপাকে তার অফিসে পৌঁছিয়ে দেবে।

নাজ র্যাক থেকে লিও টলস্টয়ের 'পুনর্জন্ম' বইটা বের করে রেখেছিল। ইচ্ছা ছিল মারুফের কাছে থেকে পড়ার জন্য চেয়ে নেবে। কিন্তু সে-ই তো নেই! ফুপু বলে—তাতে কী হইছে! বই লিতে চাও, লিয়্যা যাও, হামি মারুফেক কবোনি।

আট

এত দিনে নাজ জেনে গেছে, এটি দেশের দরিদ্রতম এলাকা না হলেও প্রচুর গরিব লোকের বাস এখানে। মধ্যবিত্ত প্রায় নেই বললেই চলে। একদিকে বড় বড় জোতদার, অর্থশালী মানুষ; অন্যদিকে ভূমিহীন এবং নামমাত্র জমির মালিক। বছরে একশ দিনের বেশি কাজ জোটে না শ্রমিকদের। বিশেষ বিশেষ ঋতুতে বাসের ছাদে বোঝাই হয়ে এলাকার পুরুষরা যায় অন্য এলাকায় ধান কাটার কাজে। এদেরকে বলা হয়—মফিজ। এই মফিজদের অনেকসময় বাসের ছাদে রশি দিয়ে বেঁধে নিয়ে যাওয়া হয়। যাতে বাস গর্তে পড়ে ঝাঁকি খেলে কিংবা তন্দ্রার ঘোরে এরা ছাদ থেকে পড়ে না যায়। সেই মঙ্গার দুই মাস এদের বউ-বাচ্চারা কলার থোড়, কচুসেদ্ধ, শালুক—যা পায় তা-ই খেয়ে দিনাতিপাত করে। দিনের পর দিন না খেতে পেয়ে এরা ভাতের স্বাদ ভুলে যায়। সেই সময় একদল ফেরিওয়ালা দেখা যায়। অবাক ব্যাপার হচ্ছে এই ফেরিওয়ালারা কিছু বিক্রি করতে আসে না, আসে কিনতে। গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি, ঘটি-বাটি থালা সবকিছু কিনতে থাকে তারা। কেননা এত সস্তায় অন্য সময় এগুলো কেনা যায় না। আর একদল আদম ব্যাপারি আসে। ওরা ফুসলিয়ে যুবতী মেয়ে-বউ-ঝিদের নিয়ে যায়। বিয়ে, তিনবেলা ভাত, সচ্ছল জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে ওরা নিয়ে যায় মেয়েদের। তারপর বিক্রি করে দেয় দেশে বা বর্ডার পেরিয়ে ভারতের পতিতালয়গুলোতে। চুরি করে, অনেক সময় অর্থের বিনিময়ে কিনে নিয়ে যায় কোলের শিশুদের। মধ্যপ্রাচ্যে চালান দেয় উটের জকি হবার জন্য।

আরও দেখেছে নাজ যে, এলাকার অবস্থাপন্ন লোকদের প্রায় সবারই একাধিক বউ। একটা গ্রামে সাত ভাই আছে। তাদের প্রত্যেকের দুজন করে বউ। মঙ্গার সময় শুধু তিন বেলা খেতে পাবার জন্য যুবতী মেয়েরা নির্দ্বিধায় মাঝবয়সী বা প্রৌঢ় লোকদের তৃতীয় বা চতুর্থ স্ত্রী হতে রাজি হয়ে যায়।

দেড়-দুই মাস পরে মফিজরা অন্য এলাকায় মজুরি খেটে যখন দ্যাশত ফেরে, তখন অনেকেই দেখে যে তাদের ঘর শূন্য। ঘর আছে কিন্তু ঘরণি নেই। চলে গেছে আদম ব্যাপারির হাত ধরে। নাজ জেনেছে, এই ফাঁসিতলা থেকেই মঙ্গা এলাকা শুরু। বিস্তৃত উত্তরের দিকে কুড়িগ্রাম, নীলফামারী জেলা হয়ে ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় পর্যন্ত। এই বেল্টেরই মেয়ে বাসন্তীর মাছধরা জাল পরে লজ্জা নিবারণ করার ছবি 'ইত্তেফাক'-এর পাতায় ছাপা হলে দেশজুড়ে ছিছি ধিক্কার উঠেছিল শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে। চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষের সময়ে। শেখ মুজিবের ওপর থেকে সমস্ত দেশবাসীর আস্থা উবে গিয়েছিল এই একটা ছবির মাধ্যমে।

এই অবর্ণনীয় দারিদ্র্য, শোক-বঞ্চনার পরেও মানুষগুলো ঘর বাঁধে, ফসল ফলায়, নকশিকাঁথায় ফুল তোলে, মরমিয়া গানের আসর বসায়, পালা-পার্বনে উত্সব করে। এদের এই প্রাণশক্তির উত্স কোথায়, ভেবে পায় না নাজ।

সম্পূর্ণ মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও এমনভাবে জীবনকে ভালোবাসার ক্ষমতা আছে এদের। এই কারণে এদের শ্রদ্ধা করে নাজ। আবার নিজেদের সম্মিলিত স্বার্থকে উপেক্ষা করে মাত্র দশটি টাকা বা এক বান্ডিল বিড়ির বিনিময়ে এরা নিজেদের ভোট বিক্রি করে দেয়। বিক্রি করে তাদেরই কাছে, পরীক্ষিতভাবে যারা এদের শত্রু। আবার বিপদে-আপদে নির্লজ্জের মতো ছুটে যায় তাদের কাছে, যাদেরকে তারা ভোটের সময় প্রত্যাখ্যান করেছিল। নাজের এই অনুযোগের উত্তরে মারুফ হাসে—এ তো এই উপমহাদেশের পরিচিত প্রবণতা। লড়কে লিয়ে লালঝান্ডা, ভোটকে লিয়ে কংগ্রেস।

আপনাদের রাগ হয় না?

হয় না আবার? আমাদেরই কত গ্রুপ তো অভিমান করে বলেছে—হারামজাদা জনগণ, তোরা কর নির্বাচন, আমরা গেলাম সুন্দরবন। বলে তারা চলে গেছে আন্ডারগ্রাউন্ডে। জনগণকে সংগঠিত করার বদলে বিশ্বাস স্থাপন করেছে অস্ত্রের শক্তিতে। ফলে কী হয়ছে? খুচখাচ কিছু জোতদারের গলাকাটা, জনগণ থকে আরও বিচ্ছিন্নতা। বিপ্লবীর পরিচিতি হয়েছে গলাকাটা ডাকাত হিসেবে।

মারুফের সাথে এসব গল্প একদিন হয়নি। হয়েছে টুকরো টুকরোভাবে। বিভিন্ন দিনে। বিভিন্ন সময়ে। নাজ একটা জিনিস খেয়াল করেছে, মারুফ নিজের ব্যক্তিগত বিষয়ে কথা বলতে চায় না। তেমনি অন্যের ব্যক্তিগত বিষয়ে কিছু জানতেও চায় না। রাজনীতি তার সার্বক্ষণিক আগ্রহের বিষয়। এর পাশাপাশি সাহিত্য, চিত্রকলা, সংগীতসহ বিভিন্ন মাধ্যমে বা বিষয়ে তার প্রচুর পড়াশোনা। কিন্তু ওগুলোর আলোচনা সে করে খুব সাধারণ ভাষায়। পাণ্ডিত্য প্রকাশ পাবে, এমন ধরনের শব্দ এড়িয়ে চলে। ভালো ফিল্মের কথা উঠলে হঠাত্ একদিন মারুফ বলে ফেলল—ঢাকায় না থাকলে এই একটা জিনিস মিস করা হয়। দেশ-বিদেশের খুব ভালো ভালো সিনেমা দেখা যায় ঢাকায়। ঢাকার বাইরে সে সুযোগ নেই বললেই চলে। আর এই রকম প্রত্যন্ত এলাকায় তো চিন্তাই করা যায় না।

মুখ টিপে হাসল নাজ—ঢাকাকে মিস করেন!

হাসল মারুফও—আপনি মিস করেন না? আপনার তো আরও বেশি মিস করার কথা

তেমন না।

কথাটা আমার খুব একটা বিশ্বাস হলো না। যাহোক, ওটা আপনার নিজস্ব ব্যাপার!

কেন বিশ্বাস হলো না, বলেন?

আচ্ছা, থাক না ব্যাপারটা।

না, থাকবে না। আমি ঢাকার মেয়ে হয়েও কেন এই প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে চাকরি নিয়ে এসেছি, এই প্রশ্ন কি আপনার মনে জাগেনি?

জেগেছে। কিন্তু জিজ্ঞেস করিনি। নিজের মতো করে উত্তর তৈরি করে নিয়েছি।

কী সেটা? শুনি।

বললাম তো ওসব নিয়ে আলোচনার দরকার নেই।

না, দরকার আছে। আপনি বলেন?

আমার ধারণা আপনি ঢাকা থেকে পালিয়ে থাকতে চান। ঢাকার কেউ একজন আপনার মনের খুব নরম জায়গাতে আঘাত করেছে। সেই ক্ষত থেকে অবিরল রক্ত ঝরে। সেই ক্ষত এবং ক্ষরণ থেকে আরোগ্য লাভের জন্যই আপনি ঢাকা ছেড়েছেন।

নাজের মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। মারুফ লক্ষ করল ব্যাপারটা। অপরাধী গলায় বলল—দিলাম বোধহয় আপনার ক্ষতটিকে খুঁচিয়ে রক্তাক্ত করে!

নাজ তবুও কথা বলল না। নিজেকে সামলাতে বেশ কষ্ট হচ্ছে। ওর অবস্থা দেখে সত্যিসত্যিই আফসোস হলো মারুফের। কোমল গলায় বলল—আমি সত্যিই দুঃখিত! এভাবে কথা বলাটা আমার উচিত হয়নি।

তবুও নাজ কথা বলছে না দেখে প্রায় হতভম্ব হয়ে পড়ল মারুফ। এই রকম পরিস্থিতিতে ঠিক কী করতে হয়, জানা নেই তার। একবার উঠে নাজের মাথায় হাত রাখতে চাইল, পরক্ষণেই গুটিয়ে নিল হাত। অকারণে গলা খাঁকারি দিল বার দুয়েক। তারপর বলল—আমি এখন যাই।

যাই বললেও যাবার জন্য উঠে দাঁড়াল না মারুফ। এটুকু বোঝে যে এখন তার চলে যাওয়া মানে মেয়েটিকে আরও বিড়ম্বনায় ফেলা।

বেশ কিছুক্ষণ পরে মাথা তুলল নাজ। থমথমে গলায় বলল—আপনি ঠিকই ধরেছেন। আমি ঢাকা থেকে পালিয়েই আছি।

পরিবেশ হালকা করার জন্য মারুফ বলল—তাতে কী হয়েছে! পালানো তো সব সময় দোষের নয়। ওই যে শ্লোক আছে না—য পলায়তি স জীবতি।

পরিহাসেও হাসল না নাজ। মারুফের চোখে চোখ রেখে হঠাত্ই প্রশ্ন করল—আপনি কি কখনো প্রেমে পড়েছেন?

মারুফ অস্বস্তি বোধ করল। বলল—পড়িনি, এমন কথা বলা যাবে না।

তারপর।

কী তারপর?

প্রেমে পড়ার পর কী হলো?

যে মেয়ের প্রেমে পড়েছিলাম, তাকে জানানোর সুযোগই পানি। হয়তো সাহসও পাইনি। একতরফা প্রেমে পড়া আর কি। প্রেম করা আর হয়নি।

আমি প্রেম করেছি।

ভালো কথা।

কিন্তু আমার সাথে প্রতারণা করা হয়েছে।

হেসে ফেলল মারুফ—এ তো কোনো নতুন কথা নয়। শতকরা আশিভাগ প্রেমের পরিণতি গড়ায় প্রতারণায়। তার জন্য কেউ ঢাকা ছেড়ে গণ্ডগ্রামে চল যায় বলে শুনিনি।

না, শুধু সেই জন্য নয়। বলতে পারেন আমি নিজের হারানো আত্মবিশ্বাস ফিরে পাবার জন্যই এই চ্যালেঞ্জিং চাকরি নিয়ে গ্রামে এসেছি। আমি চেষ্টা করছি আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধার করার।

তাহলে বলব, আপনি আপনার আত্মবিশ্বাস পুরোপুরি ফিরে পেয়েছেন। কারণ এই চ্যালেঞ্জে অলরেডি উতরে গেছেন আপনি।

এই প্রথম নির্ভার হাসি দেখা গেল নাজের মুখে—আপনি ঠিক বলছেন?

নিশ্চয়ই। একশ ভাগ ঠিক।

দৃঢ়স্বরে বলল মারুফ।

এখন নাজও স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারছে। টলস্টয়ের বইটার কথা তুলল সে। পুনর্জন্ম। আমার কাছে অদ্ভুত সুন্দর লেগেছে বইটা।

মারুফ সায় দেয়—আমারও খুব প্রিয় উপন্যাস ওটা। আর লেখক টলস্টয়ের ব্যক্তিজীবনও তো অসাধারণ। এই পুনর্জন্ম উপন্যাসটা লেখার আগে উনি অনেকদিন কোনো বই লেখেননি।

তাই নাকি? বলুন তো, শুনি!

কথা বলার মতো প্রিয় বিষয় পেয়েছে মনে হলো মারুফকে। নাজের অনুরোধ মাটিতে পড়ার আগেই কথা বলতে শুরু করল—টলস্টয়-গবেষকরা সবাই একমত যে বিভিন্ন সময়ে, বিশেষ করে, জীবনের একটি পর্যায়ে এসে টলস্টয়ের কাছে সাহিত্য সৃষ্টি করার কাজটি গৌণ হয়ে পড়েছিল। সেই সময় তাঁর কাছে জীবনের মুখ্য, কিংবা বলা যায়, একমাত্র বিবেচ্য বিষয় ছিল সত্য কথা বলা ও সত্যভাবে বাঁচা। তবে নিজের কাছে গৌণ হলেও অন্যদের কাছে টলস্টয়ের প্রধান কীর্তি সাহিত্যই। এখনো যেমন, কথাটি সেই সময়ের পাঠক তথা সকল রুশভাষাভাষীর জন্যই সত্য ছিল। তাদের কাছে একমাত্র বিবেচ্য টলস্টয়ের সাহিত্যকীর্তি। তবে একথাও তো সত্য যে জীবন-রাষ্ট্র-জনগণকে টলস্টয় যে দৃষ্টিতে দেখতেন, সেই দৃষ্টির সঙ্গে পরিচিত হতে না পারলে টলস্টয়ের মহাকাব্যিক উপন্যাসসমূহের সার্বিক তাত্পর্য অনুধাবন করা প্রায় অসম্ভব। টলস্টয়ের একমাত্র লক্ষ্য ছিল নৈতিক বিপ্লব। এটি এমন এক বিপ্লব যার ভিত্তি হবে বিবেক, যে বিপ্লবে বিত্তবানগণ স্বেচ্ছায় তাদের বিত্ত পরিহার করবে, অলসের দল সক্রিয় হবে এবং নতুন শ্রমবিভাগ হবে স্বাভাবিক ঈশ্বরপ্রদত্ত নিয়মানুসারে, যে নিয়মে একের শ্রমে অন্যের মাত্রাতিরিক্ত অংশীদারিত্ব থাকবে না। এই বিশ্ববীক্ষাই তাঁকে সাহিত্যের পাশাপাশি আরও অনেক সামাজিক-রাজনৈতিক ভূমিকা গ্রহণ করতে বাধ্য করেছিল। টলস্টয়ই সেই সময়ে রাশিয়ার অভিজাতসমাজের প্রথম ব্যক্তি, যিনি জারের বিভিন্ন স্বৈরাচারী জনবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন এবং ধর্মীয় বিতর্কে অংশ নিয়ে হোলি সিনকের নিষেধাজ্ঞার পরে বাকি জীবনের জন্য চার্চ ত্যাগ করেছিলেন। চার্চ ত্যাগ করলেও নিজেকে তিনি গভীর নিষ্ঠাবান একজন খ্রিষ্টান বলেই মনে করতেন। তবে যে খ্রিষ্টধর্মের তিনি অনুসরণ করতেন তা ছিল যীশু ও তাঁর সঙ্গীদের প্রবর্তিত সরল ও জৌলুসহীন ধর্মাচার। হোলি সিনক ত্যাগের সময় তিনি যে বিবৃতি দিয়েছিলেন, তাতে লেখা ছিল—'আমি ঈশ্বরে বিশ্বাস করি; তাঁকে আমি আত্মা, প্রেম ও যাবতীয় বস্তুর সারাত্সার হিসেবে উপলব্ধি করি। আমি বিশ্বাস করি তিনি আমার মধ্যে আছেন, যেমন আমিও তাঁর মধ্যে। আমি বিশ্বাস করি, প্রেমোপলব্ধিতে অগ্রসর হওয়ার একটিই পথ :প্রার্থনা। ধর্মমন্দিরে গণপ্রার্থনা নয়, যিশুখ্রিষ্ট স্পষ্টভাবে তার নিন্দা (মথি, ৬ :৫—১৩) করেছেন; সেই প্রার্থনা যা তিনি নিজে আমাদের শিখিয়ে গেছেন; একক প্রার্থনা, যার মধ্যে মনুষ্যজন্মের সার্থকতা সম্বন্ধে সচেতনতা এবং ঈশ্বরেচ্ছায় আমরা চালিত হতে বাধ্য—এই বিশ্বাস কোনো লোক নিজের মধ্যে পুনরুদ্ধার ও বলবতী করে তোলার ক্ষমতা প্রাপ্ত হয়।' একই সঙ্গে টলস্টয় চার্চ বা তত্কালীন খ্রিষ্টান ধর্মগুরুদের বিরোধিতা করতেন এই বলে যে তারা মানুষকে যিশুর সঠিক শিক্ষা ভুলিয়ে দিচ্ছে এবং মানুষকে শুদ্ধতার সাধনার পরিবর্তে নিয়ম-শৃঙ্খলার বন্ধন মেনে নিতে প্ররোচিত করছে। দিনপঞ্জিতে লিখলেন—'তৃতীয় শতাব্দী থেকেই গির্জা মানে আর কিছুই নয়, কেবল মিথ্যা, নিষ্ঠুরতা ও প্রতারণা।' আর গির্জাকে এসব অপকর্মে সর্বাত্মক সাহায্য করছে রাষ্ট্রের গণবিরোধী আইন, জার স্বয়ং এবং রাশিয়ার অলস ও পরজীবী অভিজাত শ্রেণী। 'রেজারেকশান' বা 'পুনর্জন্ম' বা 'পুনরুত্থান' উপন্যাসকে এইভাবে দেখলে সম্ভবত উপন্যাসটির টেক্সট তথা মর্মমূলে প্রবেশের ছায়াচ্ছন্ন ও স্বল্পালোকিত হলেও একটি পথ আবিষ্কার করার সম্ভাবনা দেখা দেয়।

যুবক টলস্টয় একদা তাঁর দিনপঞ্জিতে লিখেছিলেন—'আমার পেশা হচ্ছে সাহিত্য। লেখা! লেখা! আগামীকাল থেকে শুরু করে সারা জীবনভর আমি এই কাজটিই করে যাব। নইলে বাদ দেব সব কিছু—নিয়মকানুন, ধর্ম, সম্পত্তি, সব।'

অথচ সেই টলস্টয় পরবর্তী সময়ে একাধিকবার লেখা ছেড়ে দিতে চেয়েছেন। একবার তাঁর এই সর্বনেশে সিদ্ধান্তের কথা জেনে অগ্রজ লেখক তুর্গেনিয়েভ হন্তদন্ত হয়ে চিঠি লিখেছিলেন—'হাজার মাথা খুঁড়েও আমি বুঝতে পারি না লেখক ছাড়া তুমি আর কী। দার্শনিক? কোনো নতুন ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা? সরকারি চাকুরে? এদের মধ্যে কোনটা তোমাকে বেশি মানাবে? দয়া করে তা জানিয়ে আমাকে চিন্তামুক্ত করতে মর্জি হোক।'

তখনকার মতো টলস্টয় আবার ফিরে এসেছিলেন সাহিত্যে। কিন্তু এই রোগে আক্রান্ত হয়েছেন বারবার।

নিজের লেখা নিয়ে আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি তাঁর কোনোদিনই ছিল না। কারণ পাঠক হিসেবে যিনি অসাধারণ, তিনি নিজের লেখাকেও যখন পাঠ করেন একজন পাঠকের সত্তা নিয়ে, তখন সেই লেখার উত্কর্ষ বা অপকর্ষ বুঝতে তার সময় লাগে না। তা সত্ত্বেও নিজের বিভিন্ন রচনা সম্পর্কে মাঝে মাঝে অদ্ভুত ধারণা পোষণ করতেন টলস্টয়। 'যুদ্ধ ও শান্তি' এবং 'আনা কারেনিনা' উপন্যাস দুটিকে তিনি এই বলে প্রায় বাতিলের খাতায় ফেলে দিয়েছিলেন যে, এই উপন্যাস দুটি শুধু টাকার জন্য লেখা। তবে এটাও ঠিক যে 'আনা কারেনিনা' লেখার পরে তিনি মহাকাব্যিক রচনা সমাপ্ত করার একটি তৃপ্তিও লাভ করেছিলেন। ভেবেছিলেন এর পরে তাঁর আর উপন্যাস লেখার প্রয়োজন নেই। আবারও সেই লেখা ছেড়ে দেবার সিদ্ধান্ত। তাঁর এই সিদ্ধান্ত হাহাকার সৃষ্টি করেছিল পাঠকসমাজে। এমনকি একবার তাঁর পত্নী জারের সাথে সাক্ষাত্ করতে গেলে স্বয়ং জার তাকে এই বলে অনুযোগ করেছিলেন যে টলস্টয় কেন আর উপন্যাস লেখেন না?

টলস্টয় তখন শিল্পকে, এমনকি নিজের সাহিত্যকর্মকেও, একটি হালকা বিনোদনমূলক অভ্যাস বলে মনে করতে শুরু করেছেন এবং প্রকাশ্যেই বলছেন যে শিল্প জনগণের কোনো উপকার সাধনে সক্ষম নয়। বন্ধু ফিয়েেক চিঠিতে লিখলেন—'শিল্প মিথ্যা; এবং আমি আর এই মোহন মিথ্যাকে ভালোবাসতে পারছি না।' তাঁর দিনলিপি থেকে জানা যাচ্ছে, সে সময় তিনি, তুর্গেনিয়েভ চিঠিতে যেমনটি লিখেছিলেন কিছুটা ব্যঙ্গ কিছুটা ক্ষোভের সঙ্গে, একটি নতুন ধর্ম প্রবর্তনের ইচ্ছাও পোষণ করছিলেন। মানুষের ও মানবতার সার্বিক উন্নয়ন ও বিকাশসাধনই হবে তাঁর উদ্দিষ্ট নতুন ধর্মের মূল প্রেরণা। তার প্রস্তুতি হিসেবে টলস্টয়কে দেখা গেল নিজের জীবনযাপনকে প্রায় আমূল পাল্টে ফেলতে। আশপাশের গাঁয়ের ও পাড়ার ছেলেমেয়েদের নিজের বাড়িতে ডেকে এনে খুলে দিয়েছেন স্কুল। পড়াচ্ছেন নিজেই। সব খরচ নিজেরই। এমনকি ছাত্র-ছাত্রীদের দুপুরের খাবারের ব্যবস্থাও করেছেন নিজে। তাদের জন্য লিখছেন সহজপাঠ্য বই। লিখছেন ব্যাকরণ। কোনো কোনো সময় পুরুষবিহীন পরিবারের বিধবাদের জমি নিজে লাঙ্গল চালিয়ে চষে দিয়ে আসছেন। পোশাক নিয়ে পূর্বেই একবার বাড়িতে হইচই হয়েছিল যথেষ্ট। টলস্টয় পোশাকের ব্যাপারে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন। ধোপদুরস্ত বড়লোকি চালের জামাকাপড় পরতে তিনি আর রাজি নন। স্ত্রীর চেঁচামেচি, ছেলেমেয়েদের তীব্র আপত্তির কারণে শেষপর্যন্ত একটি আপোসরফা হয়েছিল এই মর্মে যে, টলস্টয় কোট-টাইয়ের বদলে ঢিলেঢালা গলাবন্ধ এক ধরনের জামা পরবেন। এই পর্যায়ে এসে দেখা গেল টলস্টয় সেই শর্তও আর মেনে চলতে রাজি নন। এখন তিনি পরছেন কৃষক-শ্রমিকদের মতো সাদাসিধে পোশাক। কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে ধর্মপ্রচারের চিন্তাটি মাথা থেকে সরে গিয়ে ফিরে এল আরেকটি উপলব্ধি। তা হচ্ছে—যে লিখতে জানে, লেখা চালিয়ে যাওয়া তার দায়িত্ব। তাই তিনি আবার লেখার জগতে ফিরতে মনস্থ করলেন। তবে ঠিক করলেন যে এখন থেকে যা তিনি লিখবেন সেই সব লেখা হবে সত্যের পক্ষে এবং জীবনের জন্য।

এই চিন্তা থেকেই বয়স পঞ্চাশ পেরিয়ে যাওয়ার পরে তিনি লিখতে শুরু করলেন 'রেজারেকশন'। কেউ এটিকে বাংলায় বলেছেন 'পুনরুত্থান', কেউ বলেছেন 'পুনর্জন্ম'। যদিও রেজারেকশন শব্দটির সাথে যে আধ্যাত্মিক অর্থদ্যোতনা জড়িয়ে আছে, পুনরুত্থান বা পুনর্জন্ম—কোনো শব্দ দিয়েই সে তাত্পর্য পুরোপুরি অনূদিত হয় না, তবুও বাঙালি লেখক-পাঠক এই শব্দ দুটিকেই রেজারেকশনের প্রতিশব্দ হিসেবে মেনে নিয়েছেন। উপন্যাস হিসেবে এটি সম্পূর্ণই ভিন্নধর্মী। এ যেন শুধু উপন্যাস নয়, তত্কালীন উত্তাল সময়ের গ্রন্থনা এবং গবেষণাও বটে। তাই উপন্যাস লেখার কাজে টলস্টয়ের বারংবার জেলগমন ও পরিদর্শন, বিচারকদের বিচারকার্যপদ্ধতি দর্শন, বারংবার লিখন, জেলের সেপাই-কয়েদিদের দৈনন্দিন জীবনের অনুসন্ধান।

'পুনর্জন্ম' বা 'রেজারেকশন' কার?

আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় পুনর্জন্ম হচ্ছে উপন্যাসের মূল পুরুষচরিত্র জমিদারতনয় নেখলিউদফের। পিসির জমিদারিতে বেড়াতে গিয়ে সেখানে আশ্রিত পিতৃমাতৃহীন তরুণী কাতিউশা মাসলভার দিকে নজর পড়ে যুবক নেখলিউদফের। জমিদারতনয়ের কামনা থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারা তত্কালীন যেকোনো কৃষক-কন্যার পক্ষেই প্রায় অসম্ভব ছিল। তদুপরি নিজের মনের মধ্যেও প্রয়োজনীয় প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি কাতিউশার পক্ষে। কারণ সে নেখলিউদফের মেয়েপটানো কথাগুলিকে সত্যিকারের প্রেমবাক্য বলে বিশ্বাস করেছিল। ফলে নিজের যৌবনকে সে সঁপে দিয়েছিল নেখলিউদফের কামনার কাছে। নিছক কামনাই। কারণ পরবর্তী দশ বছর নেখলিউদফের জীবনে তো দূরের কথা, স্মৃতিতেও কোনো স্থান ছিল না কাতিউশার। দশ বছর বাদে নেখলিদউফ যখন তাকে পুনরাবিষ্কার করে, তখন কাতিউশা বাধ্য হয়ে পরিণত হয়েছে বেশ্যাতে। শুধু তা-ই নয়, কাতিউশার বিরুদ্ধে উঠেছে অর্থ আত্মসাত্ ও নরহত্যার অভিযোগ। আদালতে জুরির বিচার চলছিল। অভিজাত সমাজের প্রতিনিধি, সেই সময়ে রাশিয়ার রাজধানীর সবচেয়ে এলিজিবল ব্যাচেলর, নেখলিউদফের ডাক পড়েছিল একজন জুরি হিসেবে।

সেই বিচারালয়ে বিচারকের আসনে বসে হঠাত্ করে নিজেকেই আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড় করায় নেখলিউদফ। মনে মনে ভাবে, কাতিউশার এই পরিণতির জন্য দায়ী কে? তার বিবেক জাগ্রত হয়। ফলে নেখলিউদফ দায়ী করে নিজেকেই। মামলার বিবরণ শুনে তার বিশ্বাস হয় না যে কাতিউশা টাকার জন্য মানুষ খুন করতে পারে। কিন্তু জুরিবোর্ডের অন্য সদস্যরা কাতিউশাকে শেষ পর্যন্ত অপরাধী বলেই সাব্যস্ত করে। এই রায়ে নেখলিউদফের ঐকমত্য ছিল না। কিন্তু অন্যমনস্কভাবে সে জুরিবোর্ডের অন্য সদস্যদের সাথে একমত হয়ে একই রায় দিয়ে বসে এবং পরে সচেতন হয়ে শিউরে উঠে উপলব্ধি করে যে কাতিউশা কোনো অপরাধ না করেও চার বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও সাইবেরিয়ায় নির্বাসনের রায় পেয়েছে। পরদিনই সে বিচারক ও জুরিবোর্ডের অন্য সদস্যদের দুয়ারে দুয়ারে গিয়ে কাতিউশার রায় পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানাতে থাকে। কিন্তু কেউই নিষ্পত্তি হয়ে যাওয়া এই বিচারকার্যটি নিয়ে নতুনভাবে ভাবতে বা তা নিয়ে মাথা ঘামাতে রাজি নয়। তখন এই রায়ের বিরুদ্ধে নেখলিউদফ কাতিউশার পক্ষে উচ্চতর আদালতে আপিল করে। আপিল যথারীতি নিষ্ফল হয়। তখন সে নিজের প্রভাবশালী আত্মীয় ও বন্ধুদের সাহায্য নিয়ে মহামান্য জারের কাছে ক্ষমার আবেদন করে। জার এই অনুরোধে সাড়া দিয়ে কাতিউশার কারাদণ্ড মওকুফ করেন। কিন্তু বহাল রাখেন সাইবেরিয়াতে নির্বাসনদণ্ড।

নেখলিউদফ প্রতিজ্ঞা করে, সে কাতিউশাকে এই অবৈধ দণ্ড থেকে মুক্ত করবে। সেইসঙ্গে কাতিউশা যাতে আবার বেশ্যাবৃত্তি গ্রহণে বাধ্য না হয় এবং সমাজে সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত হতে পারে, সে জন্য তাকে বিয়ে করে স্ত্রীর মর্যাদাও দেবে বলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। কিন্তু শুধু সেটুকুকেই তার পাপমোচনের জন্য যথেষ্ট বলে মনে করতে পারে না নেখলিউদফ। তাই একই সাথে সেই দিনটি থেকেই নিজেকে পরিশুদ্ধ করার যুদ্ধেও নেমে পড়ে সে। নিজেকে আত্মসমালোচনার মুখোমুখি দাঁড় করায় বারবার। সে-ও কি অন্য জমিদারদের মতোই কৃষকের শ্রম শোষণ করে না? সে-ও কি অভিজাত সমাজে বহুল প্রচলিত পরকীয়া প্রেমে মত্ত হয়ে থাকে না? আবার একই সঙ্গে একটি যথার্থ কুমারীকে একেবারে নিজের সম্পত্তির মতো স্ত্রী হিসেবে পেতে চায় না? সব প্রশ্নের উত্তরেই সে নিজেকে আসামির কাঠগড়ায় দেখতে পায় এবং নিজেকে তার মানুষ হিসেবে অত্যন্ত নীচুস্তরের বলে মনে হতে থাকে। সে এবার তাই সত্যিসত্যিই পরিশুদ্ধ হবার চেষ্টা শুরু করে। পরকীয়া প্রেম থেকে সরে আসে। বিয়ের সম্বন্ধ ভেঙে দেয়। মানসিকভাবে প্রস্তুত হয় সাইবেরিয়ায় গিয়ে কাতিউশার সহযোগী হতে।

কিন্তু একরাত্রির কামুকতায় একটি নিরীহ নিষ্পাপ মেয়েকে পাপের পথে ঠেলে দেওয়া যত সহজ, তাকে সেই পাপের পথ থেকে ফিরিয়ে আনা তত সহজ নয়। তদুপরি কাতিউশা এখন আর কিছুতেই তাকে ক্ষমা করতে রাজি নয়। সে যা বলে তার সারমর্ম হচ্ছে—এসব কথা নেখলিউদফ তোমার মনে হওয়া উচিত ছিল দশ বছর আগে। তা হলে দুজনের জীবনটাই অন্য রকম হতে পারত। সেদিন যাকে দৈহিক কামতৃপ্তির জন্য ব্যবহার করেছিলে আজ তাকে ব্যবহার করতে চাও নিজের আত্মার মুক্তির জন্য। তোমাকে বিয়ে করার আগে আমি বরং আত্মহত্যা করব। আমার জীবনকে নষ্ট করেছ তুমিই। তোমারই ঔরসজাত সন্তান এল আমার গর্ভে। তারও মৃত্য হলো অকালে। আবার তুমি এসেছ। কী করতে? আমাকে মুক্ত করতে। বেশ ভালো। পারো তো করো। কিন্তু বেশ্যাবৃত্তি থেকে উদ্ধার করবে কী করে? বেশ্যাবৃত্তি ছাড়া বেঁচে থাকার আর তো কোনো অবলম্বন নেই আমার। তোমার সঙ্গে বিয়ে? তা তো হতেই পারে না। আমাকে বিয়ে করে তুমি কোনোদিন সামাজিকভাবে সুখী হতে পারবে না। একটানা ত্যাগ স্বীকার করতে করতে তুমি হাঁফিয়ে উঠবে। এখন আবেগের বশে যে কাজটি তোমার কাছে যুক্তিযুক্ত মনে হচ্ছে, তখন তা তোমার কাছে জীবনের বোঝা বলে মনে হবে নিশ্চিত। তখন তুমি আমার সাথে হয়তো সদয় ব্যবহার করে চলবে, কিন্তু তা হবে কৃত্রিম। তুমি আমাকে আগেও ভালোবাসোনি, ভবিষ্যতেও ভালোবাসতে পারবে না। তুমি নিজেকে মহিমান্বিত করার জন্য অবিরল আত্মত্যাগ করে চলবে। আমি তোমার অমন আত্মত্যাগ গ্রহণ করতে নারাজ।

সাইবেরিয়ার দীর্ঘ পথ পেরোতে অনেক দিন সময় লাগে। কাতিউশার সঙ্গে অনেকবার কথা বলে তাকে রাজি করানোর চেষ্টা করে নেখলিউদফ। কিন্তু কাতিউশা ততদিনে আরেক জাতের মানুষ দেখে ফেলেছে। তারা হচ্ছে জার-বিরোধী বিপ্লবী। তারাও বন্দী। সাইবেরিয়ায় নির্বাসনে যাচ্ছে। এই প্রথম এমন ধরনের মানুষের সংস্পর্শে আসার সুযোগ পায় কাতিউশা। সে ভাবতে শুরু করে—কিসের জন্য এরা সর্বস্বত্যাগ করেছে, দুঃখকে ধারণ করেছে, বিপদের মুখে ঝাঁপিয়ে পড়েছে, এমনকি প্রাণ বিসর্জন দিতেও প্রস্তুত? এরা যা করছে, তা কি আত্মসুখের জন্য? ব্যক্তিস্বার্থের জন্য? না। তাদের সামনে রয়েছে এক মহান লক্ষ্য। সেটি হচ্ছে মাতৃভূমি রাশিয়ার মানুষের জন্য সার্বিক মুক্তি নিশ্চিত করা। তাদের সঙ্গে ঘনিষ্টতা হয় কাতিউশার। তারা কাতিউশার জীবনের সব কথা শোনে। তারাই প্রথম কাতিউশাকে বোঝায় যে তার অতীতের অন্য রকম ব্যাখ্যাও হতে পারে। এবং সেই ব্যাখ্যাটিই সঠিক ব্যাখ্যা। তারা বুঝিয়ে দেয় যে কাতিউশা কোনোরকম দোষেই বিন্দুমাত্রও দুষ্ট নয়, অপরাধী নয়। সে পরিস্থিতির শিকার। বিপ্লবীদের কাছে সে ঘৃণ্য নয়। বরং অন্য দশজন মানুষের মতোই সমান মাপের মানুষ। এমনকি এক পর্যায়ে আজীবন সাইবেরিয়ায় নির্বাসনদণ্ডে দণ্ডিত বিপ্লবী সাইমনসন তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। কাতিউশাও বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে সানন্দে রাজি হয় সাইমনসনের প্রস্তাবে। কারণ ইতোমধ্যেই সে উপলব্ধি করতে পেরেছে কমরেড সাইমনসনকে বিয়ে করে সে-ও আরেক কমরেডে পরিণত হবে। এই বিয়ে শুধু দুজন নর-নারীর জৈবিক মিলন নয়, বরং একসাথে বিপ্লবের জন্য কাজ করার সুযোগও। বিপ্লবের দিন তাকে কেউ বারাঙ্গনা বলবে না, বলবে বীরাঙ্গনা। প্রিন্স নেখলিউদফকে বিয়ে করলে কাতিউশার সম্মান আদৌ পুনরুদ্ধার হবে না। অভিজাত সমাজ তাকে মর্যাদা দেবে না। ঘৃণা করবে। নীচ চোখে দেখবে। হয়তো নেখলিউদফকেও একঘরে করবে। নেখলিউদফের ঔরসে তার গর্ভে কোনো সন্তান জন্ম নিলে অভিজাত সমাজ তার সন্তানকেও অপাঙেক্তয় করে রাখবে। ধনীর স্ত্রী হয়ে জীবনভর এসব অসম্মান সহ্য করার চেয়ে সাইমনসনের কমরেড হওয়া, বিপ্লবের সহযাত্রী হওয়া বহুগুণে শ্রেয়।

কাতিউশা সাইমনসনকে বরণ করায় নেখলিউদফও মুক্তি পায়। ততদিনে সেও হূদয়ঙ্গম করেছে যে তারও ঘর চাই, ঘরণি চাই, সন্তান চাই, নর-নারীর স্বাভাবিক সম্পর্ক চাই। কাতিউশা তাকে স্বাধীনতা দিয়েছে। সে কাতিউশার প্রতি কর্তব্যের দায় থেকে মুক্ত। কাতিউশার মুক্তির জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা সে করেছে, যখন ব্যর্থ হয়েছে তার দণ্ড মওকুফ করাতে, তখন নিজের জমিদারি প্রজাদের মধ্যে সহজ শর্তে বণ্টন করে দিয়ে সে কাতিউশার সাথে একই ভাগ্য বরণ করার জন্য স্বেচ্ছায় সাইবেরিয়ায় গেছে। কাতিউশা তার বিয়ের প্রস্তাব গ্রহণ না করলেও যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেটিকে নেখলিউদফের কাছেও সবচেয়ে যৌক্তিক মনে হয়েছে। নেখলিউদফের অন্তরাত্মা তাকে এই ইঙ্গিত দিয়েছে যে, তার অতীত পাপের প্রায়শ্চিত্ত সম্পন্ন হয়েছে। সে এখন নতুন মানুষ। মানুষ হিসেবে তার পুনর্জন্ম হয়েছে।

আবার কাতিউশা মাসলভারও পুনর্জন্ম ঘটে। সর্বনাশের চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে সে পাপের পথে যেতে বাধ্য হয়েছিল বটে, তবু তার মধ্যে কয়েকটি সদ্গুণ প্রবলভাবে টিকে ছিল। সে কিছুতেই মিথ্যা বলে না; এমনকি আত্মরক্ষার জন্যও নয়। সে পরদুঃখকাতর। পরের জন্য সাহায্য চায়, নিজের জন্য নয়। নিজের শত অসুবিধা সত্ত্বেও অন্যের সাহায্যে এগিয়ে যেতে দ্বিধান্বিত নয়। বিনা অপরাধে সাজা পেয়েও সে বিচলিত নয়। নেখলিউদফ বা সাইমনসনদের মতো পুরুষদের কাছে কাতিউশার মতো নারী যা প্রত্যাশা করে তা আনুষ্ঠানিক বিবাহ নয়, ভালোবাসা। এই ভালোবাসাই কাতিউশার মৃতসঞ্জীবনী। সেই ভালোবাসা দিয়েই তার পুনর্জন্ম।

এই উপন্যাস সারা পৃথিবীর পাঠকসমাজকে সবসময়ই আলোড়িত করেছে। আর রুশদের কাছে এটি শুধু উপন্যাসই নয়, যেন তাদের জাতির পুনর্জন্মের দলিল। রুশদের অন্তরাত্মার সঙ্গে কেমনভাবে মিশে গেছে এই উপন্যাস, তার উদাহরণ পাওয়া যায় রবীন্দ্রনাথের জবানিতে। 'রাশিয়ার চিঠি'তে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন—'আমি যেদিন অভিনয় দেখতে গিয়েছিলুম সেদিন হচ্ছিল টলস্টয়ের রিসারেকশন। জিনিসটা জনসাধারণের পক্ষে সহজে উপভোগ্য বলে মনে করা যায় না। কিন্তু শ্রোতারা গভীর মনোযোগের সাথে সম্পূর্ণ নিঃশব্দে শুনছিল। অ্যাংলো স্যাকসন চাষী-মজুর শ্রেণীর লোকে এ জিনিস রাত্রি একটা পর্যন্ত এমন স্তব্ধ শান্ত ভাবে উপভোগ করছে একথা মনে করা যায় না, আমাদের দেশের কথা ছেড়েই দাও।'

সোভিয়েত রাশিয়ার বিপ্লব একদা বিশ্বের সকল নিপীড়িত মানুষকে যে মুক্তির পথ দেখিয়েছিল, সেই বিপ্লবের নেতা লেনিন বলতেন যে, টলস্টয় হচ্ছেন রাশিয়ার বিপ্লবের দর্পণ। কাতিউশার যে বেশ্যাবৃত্তি নিয়ে টলস্টয় এত ভাবিত ছিলেন, যা থেকে মুক্তির কোনো উপায় তিনি খুঁজে বের করতে না পেরে সাইমনসনের চরিত্রটিকে উপন্যাসে সংযোজন করতে বাধ্য হয়েছিলেন, সেই সাইমনসনদের উত্তরসূরি বলশেভিকরাই বিপ্লবের পরে রাশিয়া থেকে পতিতাবৃত্তি সম্পূর্ণ উচ্ছেদ করেছিল। দর্পণে যে স্বপ্নের কথা লিখে রেখে গিয়েছিলেন টলস্টয়, সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপায়িত করেছিলেন লেনিন। তাই এই উপন্যাস যেমন, রুশ বিপ্লবও তেমনই, টলস্টয়েরও রেজারেকশন—পুনরুত্থান বা পুনর্জন্ম।

একটানা কথা শেষ করে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকে মারুফ।

নাজ মৃদুকণ্ঠে বলে—অপূর্ব!

মারুফ সায় দেয়—সত্যিই অপূর্ব উপন্যাস।

নাজ হেসে ওঠে। তার হাসি দেখে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে নাজের দিকে তাকায় মারুফ। কিন্তু কোনো উত্তর দেয় না নাজ। সে এবার 'অপূর্ব' শব্দটি উচ্চারণ করেছে মারুফের বিশ্লেষণের অসাধারণ ক্ষমতা দেখে।

নয়

রোগী দেখতে দেখতে ভাবছিল নাজ। আসলে চিকিত্সকের শেখার কোনো শেষ নেই। আর পরিস্থিতির সাথে খাপ খাওয়ানো শিখতে হয় সবচেয়ে বেশি। রোগনির্ণয় করে ওষুধ লিখে দিলেই যে ডাক্তারের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না, তা এখানে এসে শিখল নাজ। রোগীর ওষুধ কেনার সামর্থের কথা বিবেচনা করেও ওষুধ লিখতে হয়। যেমন টাইফয়েডের জন্য বিভিন্ন ওষুধ আছে। কোনোটার দাম বেশি। কমদামি ওষুধ দিলেও কাজ হয়, তবে সিম্পটম দূর হতে একটু সময় লাগে। ওষুধ লেখার সময় নাজ এখন রোগীকে খুব মোলায়েম স্বরে জিজ্ঞেস করে যে সে বেশি দামি ওষুধ কিনতে পারবে কি না। যদি না পারে, সে তখন রোগীকে আশ্বাস দিয়ে বোঝায় যে কমদামি ওষুধেও অসুখ সারবে। কিন্তু নিয়মিত, একটু বেশি দিন ধরে ওষুধটা খেতে হবে।

ডাক্তারদের লোকে গাল দেয় জল্লাদ বলে, অর্থ-পিশাচ বলে, অমানুষ বলে। আবার নাজ দেখেছে ডাক্তারের কাছ থেকে একটু ভালো ব্যবহার পেলে একেবারে গলে যায় মানুষ। মুহূর্তের মধ্যেই সে ডাক্তারকে বসিয়ে ফেলে দেবতার আসনে। তবে একটা ব্যাপারে নাজ খেয়াল করেছে যে শিক্ষিত-অশিক্ষিত নির্বিশেষে লোকে বিবেচনাহীনতার পরিচয় দেয়। তা হলো, ডাক্তারের যে বিশ্রাম দরকার, সে কথা তারা মনে রাখতে চায় না। ডাক্তার সারা দিন পরিশ্রম করলেও রাতে এসে রোগী ডাকামাত্র তাকে বিছানা ছেড়ে উঠতে হবে। দেরি হলেই ডাক্তারের মুন্ডুপাত। ঢাকায় দেখেছে নাজ, রোগীর ভিড় কমানোর ইচ্ছায় অনেক স্পেশালিস্ট ডাক্তার ফি বাড়িয়ে দেয়। ফল হয় উল্টো। ফি যত বাড়ে, লোকে মনে করে সে তত ভালো ডাক্তার, বড় ডাক্তার। তার চেম্বারে ভিড় অনেক বেড়ে যায়।

গ্রামাঞ্চলেও মাঝে মাঝে মজার সব উক্তি শোনা যায়। কেউ কেউ নাকি কর্মীদের জিজ্ঞেস করে—সত্যি করি কন তো বাহে, তোমাগের ডাক্তার কি এমবিবিএস পাস?

কর্মী উত্তর দেয়—অবশ্যই এমবিবিএস পাস। কেন, সন্দেহ হচ্ছে কেন?

এমবিবিএস ডাক্তার দশটাকা ভিজিট লিয়্যা রুগি দ্যাখে!

ওই ভিজিটের টাকা তো আর ডাক্তার নেয় না। ডাক্তারের বেতন দেয় আমাদের অফিস।

তা-ও হামাগোর সন্দো হয় বাহে। টাউনোত অ্যাকনা এমবিবিএস ডাক্তারের ভিজিট একশ খান ট্যাকা।

কর্মীরা এসব গল্প রসিয়ে রসিয়ে বলে অফিসে এসে। ওরা সবাই হাসে গল্প শুনে। তারপর রোগীদের সঙ্গে নাজের ভালো ব্যবহারের বিষয়েও কৌতূহল প্রকাশ করে মানুষ—সরকারি ডিসপেনসারিত কম্পাউন্ডার তো কথাত কথাত পোন্দে লাত্থি মারবার চায় আর তোমাগের আপা বড় ডাক্তার হয়্যাও কত মিষ্টি কর্যা কথা কয়। আবার ধরো যে কুদ্দুস ডাক্তার, হাতুড়ে, পয়সা না দিলে পারে তো গোয়ার কাপড় খুল্যা ল্যায় কিন্তু এএফপির হাসপাতালোত যে কায়খান ট্যাকা লিয়্যা যাবে, সেই ট্যাকারই ওষুধ দ্যায়। ফের ধরো টিবি রুগিক ওষুদ দ্যায় মাগনা। আটমাসের ওষুদ। চাট্টিখানি কথা বাহে! এত ট্যাকা অরা পায় কুনঠে?

অরে, ট্যাকা আসে বিদ্যাশ থাক্যা।

তা বাহে বিদেশিরা হামাগোর দ্যাশে ট্যাকা দ্যায় ক্যা?

এই প্রশ্নে অনেকেই বিপদে পড়ে। সঠিক উত্তর খুব কমজনেরই জানা। একজন বুদ্ধি খাটিয়ে বলে—হামাগোর দ্যাশে বড়লোকরা যাকাত দ্যায় দেখিস না! দ্যায় কারেক? গরিবোক। বিদেশের সব মানুষ তো বড়লোক। অরা যাকাত দ্যায় গরিব দ্যাশের মানুষোক।

এইসব গল্প শুনে হেসে গড়িয়ে পড়ে ওরা। ওদের সান্ধ্যআসর মূলত এইভাবে হাসি-গল্পেই কেটে যায়। হাসি-ঠাট্টা থেকে পরদিনের কাজের এনার্জি ফিরে পায় ওরা অনেকটা।

এক মহিলা তার বাচ্চাকে নিয়ে এসেছিল গত সপ্তাহে। জ্বর-কাশি নিয়ে এসেছিল বাচ্চা। সাত দিন পরে আবার যখন সে এল, প্রেসক্রিপশন হাতে নিয়ে জিজ্ঞেস করল নাজ—কেমন আছে আপনার বাচ্চা?

ভালো না।

এমন স্টেটকাট জবাবে একটু ভুরু কুঁচকে উঠল নাজের—একটুও উন্নতি হয়নি?

না।

আবার ভালো করে বাচ্চা এবং প্রেসক্রিপশনটা পরখ করল নাজ। অবশ্যই উন্নতি হবার কথা। সে জিজ্ঞেস করল—নিয়মমতো বাচ্চাকে ওষুধ খাইয়েছিলেন?

না।

একটু অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল নাজ—ওষুধ কেনেননি?

হ্যাঁ। কিনিছিনু।

তাহলে খাওয়াননি কেন?

ছোলের বাপ কলো যে তারও জ্বর-কাশি। ছোলের বদলে তাঁই ওষুধ খায়ে ফেলল। তাঁই এখন সুস্থ। হামি তাই আজ ছোলের জন্যে ওষুধ লিব্যার আসিছি।

এমন কথা জীবনেও শোনেনি নাজ। হাসবে না কাঁদবে বুঝতে পারে না। ওদিকে জমিলা মুখে আঁচল চাপা দিয়ে হাসতে হাসতে বেরিয়ে যায়। নাজও অনেক কষ্টে হাসি চাপে—আজ তাহলে ওষুধ নিয়ে যান বাচ্চার জন্য। দেখবেন, এবার যেন ওষুধ অন্য কেউ না খেয়ে নেয়!

মহিলা বাচ্চা কোলে বেরিয়ে যেতে না যেতে ঝড়ের মতো ঘরে ঢুকল আরেকজন মহিলা। ছুটে এসে প্রায় হুমড়ি খেয়ে পড়ল নাজের পায়ে—বাঁচান আপা, হামার ছোল-মিয়্যাক বাঁচান! হামার সোয়ামিক বাঁচান!

আরে, করেন কী!

বিব্রত ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়াল নাজ—কী অসুখ হয়েছে ওদের? ঘাবড়াবেন না। কোথায় আপনার রোগীরা?

মহিলা যেন তার কথা শুনতেই প্রায় না। হিস্টিরিয়া আক্রান্ত রোগীর মতো চিত্কার করে—সব লিয়্যা গেল! বাঁচান, আপা বাঁচান।

চিত্কার শুনে ছুটে আসে জমিলা, রোজিনা, আনোয়ার। ওদের দিকে অসহায়ের মতো তাকায় নাজ—কী হয়েছে শোনেন তো! আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।

ওরা মহিলাকে ঘিরে ধরে প্রশ্ন করতে থাকে। মহিলা হড়বড় করে কী কী বলে আর থেকে থেকে বুক চাপড়ায়। অনেকক্ষণ পরে জমিলা তার কথার সারমর্ম উদ্ধার করে। মহিলার স্বামী যক্ষ্মারোগী। এক মাস হলো চিকিত্সা চলছে। আরও একমাস আগে থেকে সে কোনো কাজ করতে পারে না। ফলে লোনের কিস্তি বাকি পড়েছে। আজ ক্রেডিট শাখার ম্যানেজার দলবল নিয়ে গেছে তার মালামাল ক্রোক করতে। মহিলা উপায়ান্তর না পেয়ে ছুটে এসেছে নাজের কাছে।

শুনে নাজের চোঁয়াল শক্ত হয়ে উঠল—এ কী কথা! একটা অসুস্থ মানুষ কিস্তি দেবে কী করে?

মহিলাকে জিজ্ঞেস করল—আপনার বাড়ি কোথায়?

ভবানীপুর

এখান থেকে দেড় কিলোমিটারের মতো দূরে।

চলেন, আমি যাচ্ছি। রোজিনা, আপনার হোন্ডা বের করেন!

অ্যাকাউন্টেন্ট রাজ্জাক সাহেব এসে নিরস্ত করার চেষ্টা করে—আপা, আপনার যাওয়াটা কি ঠিক হবে?

মানে?

এটা ক্রেডিট শাখার ব্যাপার। এসবে আমাদের নাক না গলানোই ভালো।

নাজ কঠিন গলায় বলল—এটা আমার চিকিত্সাধীন রোগীর ব্যাপার। রোজিনা, আপনি হোন্ডা স্টার্ট দেন!

হোন্ডা রওনা দেয় ভবানীগঞ্জের দিকে। পেছনে বিলাপ করতে করতে ছুটতে থাকে মহিলা।

ভবানীগঞ্জে এসে দেখা যায় রীতিমতো ক্রোক অভিযানে মেতেছে ক্রেডিট শাখার লোকজন। ম্যানেজার একটু দূরে হোন্ডায় হেলান দিয়ে সিগারেট টানছে। তার লোকজন কাঁচা মাটি আর ছনে ছাওয়া ঘরগুলো থেকে বের করে উঠোনে জমা করছে জিনিসপত্র। নাজ হোন্ডা থেকে নামতেই তাকে দেখে এগিয়ে এল ম্যানেজার—স্লামালেকুম, ডাক্তার আপা! এদিকে কোথায়? রোগী দেখতে বুঝি?

হ্যাঁ, রোগী দেখতে তো বটেই। কিন্তু আপনারা এসব কী করছেন?

আর বলবেন না। শালার লোকজন লোন নিয়ে ভাবে যে বাপের টাকা নিয়েছি। কিস্তি দেবার নাম নেই। তাই যা করা দরকার সেটাই করছি।

প্রতিবাদ করল নাজ—কিন্তু লোকটা তো যক্ষ্মারোগী। গত দুই মাস ধরে সে বিছানা ছেড়ে উঠতেই পারেনি। কাজ করতে পারেনি। কিস্তি দেবে কোত্থেকে?

কোত্থেকে দেবে, তা আমি কী জানি! আমাকে লোনের টাকা আদায় করতে হবে, ব্যাস।

নাজ খেয়াল করল চারপাশে অন্তত জনা পঞ্চাশেক মেয়ে-পুরুষ ভিড় করে দাঁড়িয়েছে। কী আশ্চর্য! ওরা কোনো প্রতিবাদই করছে না। প্রতিরোধ তো দূরের কথা। ওদের কাপুরুষতার জন্যেই হয়তো, নাজের মাথা আরও গরম হয়ে গেল। সে মাটিতে পা ঠুকে চিত্কার করে বলল—এ অন্যায়, অমানবিক এই কাজ আপনি করতে পারেন না!

ম্যানেজার হকচকিয়ে গেল। তারপরেই ঠোঁটে ফুটে উঠল ব্যঙ্গের হাসি—আপনি আপনার সীমা ক্রস করছেন, ডাক্তার আপা। আমার কাজে হস্তক্ষেপ করার কোনো এখতিয়ার আপনার নাই।

অবশ্যই আছে। আমার রোগী যদি বাড়ি থেকে উত্খাত হয়, তাহলে বাঁচবে কীভাবে!

হাঁড়ি-কুড়ি সব বের করে উঠোনে জড়ো করা হয়েছে। ম্যানেজারের মতো তার কর্মীরাও কেউ নাজের কথায় ভ্রুক্ষেপ করছে না। একজন পলিথিন ব্যাগ মোড়া কয়েকটা ট্যাবলেট-ক্যাপসুল ছুড়ে মারল উঠোনে। ওষুধগুলো ছড়িয়ে পড়ল উঠোনের ধুলোয়। হাহাকার করে উঠল নাজ—মেরে ফেলল! রোগীটার ওষুধও নষ্ট করে ফেলল!

ভিড় করে দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলোর ভেতর এ কথায় অপ্রত্যাশিত প্রতিক্রিয়া হলো। মৃত্যুর সাথে পাঞ্জারত একজন মানুষের ওষুধ কেড়ে নেওয়াটাকে ওরা কিছুতেই মানতে পারছে না। অসন্তোষের গুঞ্জন উঠল জনতার মধ্যে।

ম্যানেজার খেঁকিয়ে উঠল ওদের দিকে তাকিয়ে—তোমরা কী দ্যাখো খাড়ায়া খাড়ায়া? যাও, ভাগো সব!

ভিড় ঠেলে ঝাঁটা হাতে এগিয়ে আসে মাঝবয়সী একজন মহিলা—অনেক সহ্য করিছি হামরা। অসুস্থ মানুষের মুখের ওষুধ নষ্ট করতে যারা পারে, তারা মানুষ না। ভালো চান তো চল্যা যান এটি থাক্যা।

কী! এতবড় আস্পদ্দা! মাগি হুমকি দিতে আসিস!

একজন কর্মী ধাক্কা মারল মহিলাকে। মুহূর্তের মধ্যে আশপাশের ঘর থেকে ঝাঁটা হাতে বেরিয়ে আসতে দেখা গেল মহিলাদের। ওরা ঝাঁপিয়ে পড়ল ম্যানেজারসহ কর্মীদের ওপর। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই দেখা গেল ওরা দৌড়ে পালাচ্ছে আর ঝাঁটা হাতে গ্রামের সীমানা পর্যন্ত তাদের তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে মহিলারা।

দশ

প্রেরক :পরিচালক, স্বাস্থ্য কর্মসূচি, এএফপি, ঢাকা।

প্রাপক :ডা. মেহনাজ মতিন, মেডিকেল অফিসার, এএফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ফাঁসিতলা।

বিষয় :চাকরি থেকে বরখাস্ত করা প্রসঙ্গে।

সমস্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং তদন্ত থেকে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, আপনি ডা. মেহনাজ মতিন, ভবানীপুর গ্রামের কিস্তিখেলাপি ঋণ গ্রহীতাদের উসকানি দিয়ে আমাদের স্থানীয় ক্রেডিট শাখা ম্যানেজার ও কর্মীদের কাজে বাধাদান করেছেন। এমনকি আপনার প্ররোচনায় তারা ম্যানেজার ও কর্মীদের ওপর চড়াও হয়ে তাদের শারীরিকভাবে নিগৃহীত করেছে। আপনার এই সমস্ত কার্যকলাপ প্রতিষ্ঠানের আইন অনুযায়ী চরমভাবে শাস্তিযোগ্য।

আরও জানা গেছে যে, আপনি এনজিও-বিরোধী ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে মেলামেলা করেন। তাদের সাথে সংঘবদ্ধ হয়ে আপনি এই ধরনের অপরাধ সংঘটিত করতে প্ররোচনা দিয়েছেন।

এইসব কারণে আপনাকে সংস্থার চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হলো। আপনি আপনার সমস্ত প্রশাসনিক এবং অর্থনৈতিক দায়িত্ব অবিলম্বে শাখা ম্যানেজারের কাছে হস্তান্তর করবেন।

এই আদেশ অবিলম্বে কার্যকর করার জন্য বলা হচ্ছে।

এগারো

মারুফ জিজ্ঞেস করল—কবে যাচ্ছেন?

দেখি।

আপনার আসলে উচিত ছিল সেই সময় আমাকে খবর দেওয়া। আমি ঠিকই ব্যাপারটা হ্যান্ডেল করতে

পারতাম।

হয়তো।

নাজ চলে যাবে শুনে ফুপু নিজে তাকে দাওয়াত দিয়ে নিয়ে এসেছেন। একদিনেই মেয়েটাকে ভালো লেগে গেছে তার। একবেলা অন্তত মেয়েটাকে ভালো-মন্দ খাওয়াতে চান উনি। নাজ অবশ্য এসেই আব্দার করেছে, বকফুলের বড়া খাবে সে। তার আব্দার পূরণ করেছেন ফুপু। সেই সঙ্গে নান রকম মাছ-মাংস, দই, মিষ্টি। প্রায় শাহি খানা। মন ভালো না থাকলে মানুষের মুখে খাবার রোচে না। নাজেরও তা-ই হচ্ছিল। কিন্তু ফুপু তাকে রেহাই দেননি। একটু একটু সব আইটেম খাইয়ে ছেড়েছেন। ফলে গলা পর্যন্ত খাবার উঠে গেছে নাজের।

খাবার শেষে মারুফের ঘরে বসেছে ওরা। চেয়ার টেনে নিয়ে জানালার ধারে গিয়ে বসেছে নাজ।

মারুফ বলল—আপনাকে খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছে। একটু না হয় গড়িয়ে নিন বিছানায়। আমি ততক্ষণে একটু পাড়া ঘুরে আসি।

আমার শুতে ইচ্ছা করছে না।

ও। বাড়িতে খবর দিয়েছেন?

না।

সে কি!

মারুফের কণ্ঠে বিস্ময়—এমন একটা ব্যাপার ঘটল, অথচ বাড়িতে জানালেন না! এখন তো বাড়িতে গেলে আপনাকে শত শত প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।

নাজ হাসল—হ্যাঁ । সেই জন্যেই আমার বাড়ি যেতে ইচ্ছা হচ্ছে না।

মেয়েটা আজ খুব বেশি হেঁয়ালি করছে মনে হলো মারুফের—ইচ্ছা না করলেও অনেক কিছু করতে হয়। বাড়িতে না গেলে যাবেন কোথায়?

কেন, আপনার বাড়িতে থাকব!

যেন খুব মজার রসিকতা শুনেছে, এমনিভাবে হাসল মারুফ—তা অবশ্য থাকতে পারেন। ফুপু তাহলে একজন সঙ্গী পায়।

আপনি পান না!

প্রশ্নের তীব্রতায় হকচকিয়ে গেল মারুফ—তা পাই। তবে সঙ্গীতে অভ্যস্ত হয়ে গেলে মুশকিল। আপনি চলে গেলে তখন ফাঁকা ফাঁকা ঠেকবে।

কে বলেছে আমি চলে যাব?

নাজের সমস্ত চোখ-মুখ আরক্ত হয়ে গেছে। এর চেয়ে স্পষ্টভাবে, এর চেয়ে বেহায়ার মতো একটা মেয়ে আর কী বলতে পারে!

মারুফ বুঝতে পেরেছে ঠিকই। কিন্তু কোনো কথা বলল না সে।

নীরবতা ভাঙল নাজই—আমি তো এখানে থেকেই ডাক্তারি করতে পারি। আপনাদের পার্টির একটা স্বাস্থ্যকেন্দ্র বানিয়ে ফেলা যায়।

তা যায়। কিন্তু আমরা আপনাকে বেতন দেব কোত্থেকে? আমাদের তো বিদেশি পয়সা নাই।

বেতনের কথা উঠছে কেন? সার্ভিস চার্জ হিসেবে যে টাকা উঠবে, তার একটা অংশ আমরা নেব। বাকি অংশ পার্টি ফান্ডে জমা হবে।

মারুফের দুর্ভেদ্য বর্ম এখনও প্রায় অটল—এসব আপনার রোমান্টিক কল্পনা। বাস্তবের মাটিতে পা দিলে দু-দিনেই উবে যাবে।

যাবে না।

যাবে।

কেন একথা ভাবছেন?

আমাকে এক অনির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে হাঁটতে হচ্ছে। সে পথে হাঁটার ক্ষমতা সবার নেই।

আমি হাঁটতে পছন্দ করি।

হাঁটা খুব একটা আনন্দের ব্যাপার নয়। হোঁচট খেতে হয়, হুমড়ি খেয়ে পড়তে হয়, পায়ের তলা ফেটে রক্ত ঝরে।

নাজ তার সবচেয়ে মনোলোভা হাসিটি নিয়ে দাঁড়াল মারুফের মুখোমুখি—আমি কিন্তু গানও গাইতে পারি।

গান দিয়ে কী হবে?

গান গাইতে গাইতে আমরা হেঁটে যাব। তাহলে সুপ্তিমোড়া যে সমস্ত জনপদের পাশ দিয়ে আমরা হেঁটে যাব, তারা ঘুম ভেঙে জেগে উঠবে।

মারুফ হাসল। তার এই হাসিটা দেখে মনে হলো দুর্ভেদ্য বর্মটা আস্তে আস্তে শিথিল হয়ে আসছে।

এই পাতার আরো খবর -
font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেছেন, 'রাজনৈতিক দল হিসাবে কর্মকাণ্ড করার কোনো অধিকার জামায়াত রাখে না।' আপনিও কি তাই মনে করেন?
6 + 5 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
সেপ্টেম্বর - ১৮
ফজর৪:২৯
যোহর১১:৫৩
আসর৪:১৭
মাগরিব৬:০৩
এশা৭:১৬
সূর্যোদয় - ৫:৪৫সূর্যাস্ত - ০৫:৫৮
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :