The Daily Ittefaq
ঢাকা, সোমবার ০৫ আগস্ট ২০১৩, ২১ শ্রাবণ ১৪২০ এবং ২৬ রামাযান ১৪৩৪
সর্বশেষ সংবাদ হাইকোর্টের রায় বহাল; নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না জামায়াত | আপিল করেছেন গোলাম আযম | অষ্টম মজুরি বোর্ডের সুপারিশে মন্ত্রিসভার একমত

গোয়েন্দা উপন্যাস

দুর্গ রহস্য

গোয়েন্দা কিশোর মুসা রবিন

রকিব হাসান

'রাস্তা তো খুব খারাপ!' আমি বললাম। গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছি। আমার নাম কিশোর পাশা। শখের গোয়েন্দা।

'সত্যি, এত খারাপ ভাবিনি,' আমার সঙ্গে সুর মেলাল আমার বন্ধু মুসা আমান।

'এত খারাপ জানলে আসতাম না!' কমিকের বই থেকে মুখ তুলে বিরক্ত কণ্ঠে বলল আমার আরেক বন্ধু রবিন মিলফোর্ড।

'তোমাকে তো নিষেধ করেছিলাম,' ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেললেন রবিনের বাবা রজার মিলফোর্ড। 'জোর করেই তো এলে।'

'এসেছি তো দাদা-দাদিকে দেখার লোভে,' মিনমিন করে বলল রবিন। 'এমন অবস্থা জানলে কোন পাগলে আসত।'

'সেই লোভটাই বহাল রাখো,' রবিনের মা বললেন। 'আমাদের দেখলে ভীষণ খুশি হবেন তাঁরা।'

'তবে এতটা খারাপ জানলে আসতাম না, এটা ঠিক।' বলে আবার কমিকে মন দিল রবিন।

জরুরি কাজে আটলান্টায় যাচ্ছেন রবিনের বাবা-মা। খবরটা রবিনকে জানানোর সঙ্গে সঙ্গে সে ধরে বসল, মাড টাউনে ওর নোয়া দাদা-দাদিকে দেখতে যাবে। দাদার ডাকনাম নোয়া, দাদির নাম লিলি। রবিনের বাবার ছোট চাচা-চাচি ওঁরা। রবিনের বাবাও রাজি হয়ে গেলেন। কারণ, মাড টাউনের পাশ দিয়েই আটলান্টায় যেতে হবে তাঁদের। সামান্য ঘুরে একটা সরু রাস্তায় নামলেই মাড টাউনে যাওয়া যাবে। রাতটা চাচার বাড়িতে কাটিয়ে, পরদিন ভোরে চলে যাবেন নিজেদের গন্তব্যে। আমি, রবিন আর মুসা মাড টাউনে থেকে যাব। আটলান্টা থেকে ফেরার পথে আবার আমাদের তুলে নেবেন আঙ্কেল।

বাবাকে রাজি করিয়েই আমাকে আর মুসাকে ফোন করেছিল রবিন। যাব কি না জিজ্ঞেস করেছিল। স্কুল ছুটি। তাই নতুন জায়গা দেখার লোভ সামলাতে পারিনি। আমার চাচা-চাচি, আর মুসার বাবা-মাকেও রাজি করাতে বেগ পেতে হয়নি। তাই আমরা এখন এখানে।

যা-ই হোক, যে গল্প বলছিলাম, মাড টাউন জর্জিয়ার দক্ষিণাঞ্চলে এক জলাভূমির মাঝখানে। সেখানে শুধু কাদা আর কাদা। তাই মাড টাউন বা 'কাদার শহর' নামটা উপযুক্তই হয়েছে।

সেই জলাভূমিতে বাস করেন রবিনের লিলি দাদি আর নোয়া দাদু।

জলাভূমির গভীরে।

সারাটা দিন হাইওয়ে ধরে ছুটেছি। এখন যাচ্ছি জলাভূমির মধ্যে একটা সরু রাস্তা দিয়ে।

পড়ন্ত বিকেল এখন। জলাভূমির লম্বা ঘাসের ওপর সাইপ্রেস গাছের দীর্ঘ ছায়া পড়েছে।

জানালা দিয়ে মাথা বের করে দিলাম। গরম ভেজা বাতাসের ঝাঁপটা লাগল মুখে। তাড়াতাড়ি মুখটা আবার ভেতরে নিয়ে এলাম। রবিনের দিকে তাকালাম। কমিকের বইতে নাক ডুবিয়ে রেখেছে ও।

গভীর মনোযোগে বই পড়ছে।

'রবিন...' বলতে গেলাম।

'এখন কথা বোলো না,' বই থেকে মুখ না তুলে হাত নাড়ল ও। 'একটা ভীষণ জায়গায় রয়েছি এখন।'

জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম আবার।

গাছপালার দিকে। ডালগুলো যেন ধূসর জালে ছাওয়া। প্রতিটি গাছ থেকেই ঝুলে রয়েছে মাকড়সার জালের মতো এই জাল। এতই ঘন, মনে হয় যেন ধূসর চাদরে ছাওয়া। অদ্ভুত দেখতে।

ওগুলো আসলে এক ধরনের উদ্ভিদ। পরজীবী। বড় গাছকে কেন্দ্র করে জন্মায়, বড় গাছের রস শোষণ করে বেঁচে থাকে। জলাভূমি জায়গাটা বড়ই অদ্ভুত। তবে এক ধরনের সৌন্দর্যও আছে। ভূতুড়ে সৌন্দর্য।

রবিনের বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম, 'আঙ্কেল, নোয়া দাদা আর লিলি দাদি কত বছর আপনাদের বাড়িতে আসে না?'

'আট বছর,' আঙ্কেল জবাব দিলেন।

তাঁর কথা শুনে বই থেকে মুখ তুলল রবিন। বলল, 'আমিও শেষ দেখেছি আট বছর আগে।'

'আসেন না কেন?' জিজ্ঞেস করলাম।

'কেন যে আসে না, সেটা তো আমিও বলতে পারছি না,' আঙ্কেল বললেন। 'আগে এমন ছিলেন না। তারপর, কয়েক বছর আগে থেকে কেমন অদ্ভুত স্বভাবের হয়ে গেছেন। তবে বিজ্ঞানীরা এমনই হয়। কখন যে মাথায় কী ঢোকে, কেউ জানে না।'

'বিজ্ঞানী?'

'হ্যাঁ।' রিয়ারভিউ মিররের ভেতর দিয়ে আমার দিকে তাকালেন আঙ্কেল। আবার চোখ ফেরালেন রাস্তার দিকে। ধীরে ধীরে বললেন, 'দুজনেই প্রাণিদেহের জিন নিয়ে গবেষণা করেন। জলাভূমির মাঝখানে দুর্গের মতো এক বিশাল বাড়িতে তাঁদের ল্যাবরেটরি। একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম, এত জায়গা থাকতে ওই নির্জন জলার মধ্যে কেন? জবাব দিয়েছিলেন, নির্জনতার মাঝেই তো মনোযোগ দিয়ে গবেষণা করা যায়—বিশেষ করে প্রকৃতির আদিমতার মাঝে।'

'হ্যাঁ, তা অবশ্য ঠিক,' মাথা ঝাঁকালাম। 'তাহলে দুজন সন্ন্যাসীর সঙ্গে থাকতে যাচ্ছি আমরা।'

'আজব সন্ন্যাসী,' কমিক থেকে মুখ তুলে বিড়বিড় করল রবিন।

সিটে গা এলিয়ে দিয়ে লম্বা হাই তুললাম।

মনে হচ্ছে যেন অনন্তকাল ধরে গাড়িতে রয়েছি। পেছনের সিটে গাদাগাদি করে বসেছি আমি, রবিন আর মুসা।

মুসাকে ঠেলে সরানোর চেষ্টা করলাম, যাতে আরেকটু আরাম করে বসতে পারি।

সরতে গিয়ে রবিনের হাতে মুসার কনুইয়ের ধাক্কা লাগল। বইটা পড়ে গেল নিচে। তোলার জন্য নিচু হলো রবিন। তবে ওর আগেই বইটা তুলে নিলাম আমি।

বইয়ের নাম 'মনস্টার ফ্রম দি মাড'। তার মানে কাদার দানব? 'এই পোলাপানের গল্প পড়ছ?' অকারণেই প্রশ্নটা করলাম। রবিন সবই পড়ে।

'এটা পোলাপানের গল্প না,' রবিন বলল। 'সত্যি সত্যি ভালো।'

'কী আছে এটাতে?' জবাবের অপেক্ষা না করে পাতা ওল্টাতে লাগলাম।

'ভয়ংকর দানবের গল্প। আধা-মানুষ, আধা-জন্তু। ওরা মানুষ ধরতে ফাঁদ পাতে। তারপর কাদার নিচে লুকিয়ে থাকে। দেখি, দাও, শেষ করে ফেলি। আর অল্প একটু বাকি আছে।' আমার হাত থেকে বইটা টেনে নিল রবিন।

'লুকিয়ে থেকে কী করে?' জিজ্ঞেস করল মুসা।

'ফাঁদে মানুষ পড়ার অপেক্ষা করে।' গলা কাঁপছে রবিনের। 'তারপর তাকে জলাভূমির গভীরে নিয়ে যায়। সেখানে ওদেরকে গোলাম বানিয়ে রাখে।'

গায়ে কাঁটা দিল মুসার। জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। ভূতুড়ে সাইপ্রেস গাছগুলোর দিকে। আমিও তাকালাম। ডালে জড়ানো ধূসর উদ্ভিদগুলো কোথাও জালের মতো জড়িয়ে আছে, কোথাও ঝুলে রয়েছে এমনভাবে, মনে হয় যেন গাছের দাড়ি।

অন্ধকার হয়ে আসছে। লম্বা ঘাসে দ্রুত জায়গা বদল করছে গাছের দীর্ঘ ছায়া।

সিটে হেলান দিল মুসা। ভূত-প্রেত, দৈত্য-দানব এ সবের অস্তিত্বে বিশ্বাস করে ও। 'ওই দানবগুলো আর কী কী করে?' জিজ্ঞেস করল ও।

'রাতের বেলা কাদার নিচ থেকে বেরিয়ে আসে,' জবাব দিল রবিন। 'মানুষের ঘরে ঢুকে বাচ্চা চুরি করে জলাভূমিতে কাদার নিচে নিয়ে যায়। সেইসব বাচ্চার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায় না।'

মুসার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলাম।

'তোমার নিশ্চয় বিশ্বাস হচ্ছে না তো?' ঝাঁঝিয়ে উঠল মুসা। 'ওরকম প্রাণী আসলেই আছে জলাভূমিতে। ভয়ংকর দানব। আধা-মানুষ, আধা-কুমির। ওদের গায়ে কুমিরের মতো আঁশ। এতই ধারালো, মানুষের গায়ে ঘষা লাগলে ছুলে গিয়ে মাংস সহ কেটে চলে আসে। হাড় বেরিয়ে যায়।'

'ওই দেখ!' সামনের দিকে তাকিয়ে বললাম আমি।

'কী! দানব!' আঁতকে উঠল মুসা।

'আরে না, ব্রিজ।' আঙুল তুলে সামনে একটা পুরোনো সরু ব্রিজ দেখালাম। কাঠ দিয়ে তৈরি সাঁকোর মতো ব্রিজটার তক্তাগুলো দেখে মনে হচ্ছে, যেকোনো সময় খসে পড়বে।

রবিন আর মুসাও ব্রিজটার দিকে তাকাল।

'আমি বাজি ধরে বলতে পারি, ওই ব্রিজের নিচে দানবেরা ঘাপটি মেরে রয়েছে,' কেঁপে উঠল মুসা।

ব্রিজের ওপর গাড়ির চাকা তুলে দিলেন আঙ্কেল। মড়মড়, ক্যাঁচকোঁচ করে প্রতিবাদ জানাল পুরোনো তক্তাগুলো। গাড়ির ভারে যেন গুঙিয়ে উঠল জ্যান্ত প্রাণীর মতো।

দম আটকে ফেললাম। ধীরে ধীরে গড়িয়ে চলেছে চাকাগুলো। এই ব্রিজ গাড়ির ভার সইতে পারবে বলে মনে হয় না।

খুব সাবধানে, ধীরে ধীরে চালাচ্ছেন আঙ্কেল।

দম বন্ধ করে জানালার বাইরে তাকিয়ে আছি। দৃষ্টি যেন আঠার মতো আটকে গেছে ব্রিজের ওপর।

অবশেষে ব্রিজের শেষ মাথায় যখন পৌঁছল গাড়িটা, হুস করে ছেড়ে দিলাম ফুসফুসে চেপে রাখা বাতাস। কিন্তু স্বস্তিটা এক মুহূর্তের বেশি টিকল না। চমকে উঠলাম বোমা বিস্ফোরণের মতো কানফাটা শব্দে। বেতো রোগীর মতো কেঁপে উঠল গাড়ি। দুলতে দুলতে এগোল।

একসঙ্গে চিত্কার করে উঠলাম আমি, মুসা আর রবিন। বিপজ্জনক ভঙ্গিতে গাড়ির সামনের দিকটা একপাশে ঘুরে গেল।

নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গুঁতো মারল পুরোনো ব্রিজটার রেলিংয়ে।

রেলিংয়ের পুরোনো কাঠগুলো ভাঙতে ভাঙতে এগোল।

ব্রিজের নিচে পড়তে শুরু করল গাড়িটা। চোখ বুজে ফেললাম।

কানে এল আঙ্কেলের চিত্কার, 'আমরা পড়ে যাচ্ছি!'

দুই

বিকট শব্দ হলো। ভয়ানক ঝাঁকুনি।

পেছনের সিটে এত জোরে লাফিয়ে উঠলাম আমরা তিনজনে, মনে হলো ডিগবাজি খেলাম। খানিকটা পিছলে গিয়ে গাড়িটা যখন স্থির হলো, তখন আমার গায়ের ওপর এসে চেপে আছে রবিন আর মুসা।

'এই, তোমরা ঠিক আছো তো?' আন্টির গলা কাঁপছে।

'আছি!' কোনোমতে জবাব দিলাম।

একটা মুহূর্ত চুপচাপ বসে রইলাম আমরা।

মৃদুস্বরে গুঙিয়ে উঠে নীরবতা ভাঙল রবিন।

'কী হয়েছে?' তুতলে জিজ্ঞেস করল মুসা।

'চাকা ফেটেছে,' ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেললেন আঙ্কেল। 'বাড়তি চাকাটা ঠিক থাকলেই হয় এখন। নাহলে এই জলার মাঝখানে রাতের বেলা কোনো সাহায্যই পাব না আমরা।'

কাত হয়ে জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে বসে যাওয়া চাকাটা দেখলাম। ফেটে পুরো চ্যাপ্টা হয়ে বসে গেছে।

ভাগ্য ভালো আমাদের, ব্রিজটা নিচু। নইলে মারা পড়তাম।

'গাড়ি থেকে নামো সবাই,' আন্টি বললেন। 'চাকাটা বদলাতে হবে।'

নামার আগে জানালা দিয়ে বাইরেটা ভালমতো দেখে নিল মুসা। কোনো দৈত্য-দানব আমাদের ধরার জন্য ওত পেতে আছে কি না দেখল বোধহয়। তারপর সাবধানে দরজার বাইরে বের করল একটা পা। বাইরে নামতেই ভুস করে জুতোসহ ডেবে গেল পুরু কাদায়।

'ইসিস, গেল আমার প্যান্টের তলাটা!' চেঁচিয়ে উঠল মুসা।

আমিও নামলাম। মুসার অবস্থা দেখে সাবধানই ছিলাম, তবে কোনো লাভ হয়নি। একই অবস্থা হলো আমারও।

রবিন লাফিয়ে নামতে গিয়ে খানিকটা কাদাপানি ছিটাল আমাদের গায়ে।

আঙ্কেল নেমে চাকা খোলার জ্যাক বের করার জন্য গাড়ির ট্রাংকের দিকে এগোলেন। আন্টি গেলেন পেছনে। ওঁদের দুজনের অবস্থাও আমাদের মতোই।

জোরে নিঃশ্বাস ফেললাম।

ন্যাশনাল জিওগ্রাফি আর ডিসকভারি চ্যানেলে জলাভূমির অনেক দৃশ্য দেখেছি। কিন্তু বাস্তব আর ছবিতে অনেক ফারাক, নামার পর বুঝলাম।

জলাভূমিতে বাস করে কীভাবে লোকে?

বাতাস ভারী। ভেজা। এত গরম, শ্বাস নিতে কষ্ট হয়।

চারপাশে তাকালাম।

কালো হয়ে গেছে আকাশ। রাত নামতে দেরি নেই। কমে এসেছে দিনের আলো।

'চাকা মেরামত করতে সময় লাগবে আঙ্কেলের,' রবিন আর মুসাকে বললাম। 'চলো, এই সুযোগে আশপাশটা একটু ঘুরে দেখে আসি আমরা।'

অমত করতে গিয়েও করল না রবিন। কী ভেবে রাজি হয়ে গেল মুসাও। 'কাজটা কি ঠিক হচ্ছে?' বিড়বিড় করল ও।

'হচ্ছে,' আমি বললাম। 'দাঁড়িয়ে থেকেই বা কী করব। তারচেয়ে সুযোগ যখন পেলামই, ঘুরেই দেখি। জলাভূমি দেখতেই তো এসেছি আমরা, তাই না?'

'আল্লাহই জানে কী দেখতে পাব!' আবারও বিড়বিড় করল মুসা।

জলাভূমির কাদায় দু-তিন পা এগিয়েই থেমে গেলাম। আমার মুখের চামড়া চুলকাচ্ছে। মশার কামড়ে!

হাজার হাজার মশা।

মাথা নেড়ে, থাবড়া দিয়ে মশা তাড়ানোর চেষ্টা করলাম। হাতের খোলা জায়গা থেকে ঝেড়ে ফেলতে চাইলাম।

'ধুর! জঘন্য জায়গা!' চেঁচিয়ে বলল রবিন। 'আমি এখানে থাকব না। বেড়াতে এসে ভুল করেছি। আমি আটলান্টায় চলে যাব!'

'দাদুর বাড়িতে মশা নেই,' পেছন থেকে ডেকে বললেন আন্টি।

'না, নেই, তোমাকে বলেছে,' চোখ ঘুরিয়ে বলল রবিন। 'আমি গাড়িতে যাচ্ছি।'

'আরে কী শুরু করলে? এসো আমার সঙ্গে,' রবিনের হাত ধরে টান দিলাম। 'ওই জায়গাটায় কী আছে দেখে আসি।'

সামনে লম্বা ঘাসে ঢাকা এক চিলতে জমি।

কাদার মধ্যে থপ থপ করে পা ফেলে সেদিকে এগোলাম।

আমার পাশে রয়েছে রবিন। মুসা পেছনে।

ঘাসে ঢাকা জায়গাটায় পৌঁছলাম। ঘন ঘাসের গভীরে খসখস শব্দ হলো। অস্পষ্ট অন্ধকারে গলা বাড়িয়ে তীক্ষ দৃষ্টিতে দেখে কীসের শব্দ বোঝার চেষ্টা করলাম।

'বেশি দূরে যেয়ো না। সাপ থাকতে পারে,' চেঁচিয়ে সাবধান করলেন আমাদেরকে আঙ্কেল। আন্টি ট্রাংকে মালপত্রের মধ্যে টর্চ খুঁজতে লাগলেন।

'সাপ?' খসখস শব্দটা যেখানে হচ্ছে সেদিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করল রবিন।

'বিষাক্ত সাপেরা দানবের চেয়ে কম ভয়ংকর নয়,' মুসা বলল।

'ওই গাছটার কাছে যাব,' আমি বললাম। 'ওই যে লম্বা গাছটা, সব গাছের মাথা ছাড়িয়ে যেটা উঠে গেছে, দেখতে পাচ্ছ?' আঙুল তুলে দেখালাম।

ধীরে হাঁটছি। আবছা অন্ধকারে সাইপ্রেসের জঙ্গলের ভেতর দিয়ে। সাবধানে। সাপের গায়ে পা দিতে চাই না।

গাছের ডালে ধূসর জালের পর্দা দোল খাচ্ছে। গাছপালা বেশ ঘন এখানে। আড়ালে বড় প্রাণী লুকিয়ে থাকার উপযুক্ত।

তারমানে এখানে হারিয়ে যাওয়াও খুব সোজা। বুঝতে পারলাম। হারালে কেউ খুঁজে পাবে না।

ধূসর জালের মতো পর্দা গায়ে লাগলে গা ছমছম করে। মনে হয়, মাকড়সার জাল। আটালো, দানবীয় মাকড়সা।

'জায়গাটা ভীষণ খারাপ,' বেশিক্ষণ চুপ থাকতে পারল না মুসা। 'দানব না থাকলেও ভূত তো নিশ্চয় আছে। চলো, ফিরে যাই।'

'আরেকটু এগোই। আর অল্প একটু।' আমি বললাম।

গাছের ভেতর দিয়ে সাবধানে এগিয়ে চললাম আমরা। নিচে কালির মতো কালো পানি। হাঁটার সময় আমাদের পায়ের ছলাত্ ছলাত্ শব্দ হচ্ছে।

কানের কাছে পিনপিন করছে অসংখ্য মশা। ঘাড়ে বসছে। থাপ্পড় মারছি। মারতে মারতে ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছি।

আরেকটু এগিয়ে আরেক টুকরো শুকনো, ঘাসে ঢাকা জমি পাওয়া গেল। 'ওই তো।'

'কী?' মুসার প্রশ্ন।

'এসে গেছি।' হাত তুলে দেখালাম। 'ওই যে, গাছটা।' কয়েক ফুট দূরের লম্বা গাছটা দেখালাম।

বাতাসে এক ধরনের ভেজা গন্ধ এখানে।

গোধূলির বেগুনি অন্ধকারে নানারকম শব্দ শোনা যাচ্ছে। চাপা গোঙানি। তীক্ষ চিত্কার। নিশ্চয় জলাভূমির প্রাণীদের, ভাবলাম। গাছের আড়ালে আর ঘাসের মধ্যে লুকিয়ে থাকা জলার প্রাণী।

মেরুদণ্ডে শিহরণ তুলল আমার।

খোলা জায়গাটার আরও ভেতরে ঢুকলাম। আমাদের সামনে মাথা তুলে রেখেছে বড় বড় গাছ, কাণ্ডের গোড়া থেকে অনেক ওপরে রয়েছে ডালপালাগুলো।

একটা মড়া কাণ্ডে হোঁচট খেল রবিন। উপুড় হয়ে পড়ল পাঁকে ভরা কালো পানিতে।

গুঙিয়ে উঠল ও। 'এবার আমি ফিরে যাব।'

বিষয়টা মোটেও হাসির নয়। তবু ফিক করে হেসে ফেলল মুসা।

রেগে গিয়ে কিছু বলতে যাচ্ছিল রবিন, এই সময় কানে এল পায়ের শব্দ।

শব্দটা রবিনও শুনেছে।

ভারী পায়ের শব্দ এগিয়ে আসছে। কালো পানি থেকে হালকা কুয়াশার মতো বাষ্প ওঠা জলাভূমি ধরে।

দ্রুত আসছে।

সোজা আমাদের দিকে।

'চলো!' চেঁচিয়ে উঠে আমার হাত ধরে টান দিল মুসা। 'পালাই!'

কিন্তু নড়তে পারলাম না। পায়ে যেন শিকড় গজিয়ে গেছে।

প্রাণীটার চলার শব্দ শুনতে পাচ্ছি এখন। ভারী, খসখসে শব্দ। কাছে আসছে। আরও কাছে।

'নিশ্চয় জলাভূমির দানব!' ফিসফিস করে বলল মুসা। 'নিশ্চয় আমাদের ধরতে আসছে।'

তাকিয়ে আছি। জলাভূমির কালো পাঁকের চেয়ে কালো রং ওটার। আবছা অন্ধকারে চোখ দুটো জ্বলছে।

তিন

শোনা গেল আন্টির চিত্কার, 'এখানে কী করছ তোমরা? আমি এদিকে খুঁজে মরছি। তোমাদের না গাড়ির কাছে থাকতে বলেছিলাম?'

'সরি, আন্টি...' বলেই মুসার দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললাম। নিচুকণ্ঠে বললাম, 'এই আমাদের কাদার দানো।'

'আসলে...' মিনমিন করে মুসা, 'জায়গাটাই এমন, মাথার মধ্যে সব গোলমাল করে দেয়। প্রচণ্ড এই পচা গরমই বোধহয় এর কারণ।'

এই সময় আঙ্কেলও এসে হাজির হলেন সেখানে। আন্টির মতোই বকা দিলেন আমাদের। 'এই, তোমরা এখানে এসেছ কেন? গাড়ির কাছ থেকে সরতে মানা করেছিলাম না?'

'সরি, আঙ্কেল,' লজ্জিত কণ্ঠে বললাম। 'কিন্তু চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে ভালো লাগছিল না। তা ছাড়া জলাভূমি দেখতে এসেছি, ভাবলাম, সুযোগ যখন পেয়েছি দেখেই নিই...'

'দেখার অনেক সময় পাবে। চলো, গাড়িতে চলো।'

গাড়ির কাছে এসে দেখলাম, চাকাটা মেরামত করে ফেলেছেন আঙ্কেল। এখন আসল কাজটা বাকি। গাড়িটাকে আবার রাস্তায় তোলা। মোটেও সহজ হলো না সেটা। তোলার চেষ্টা করলেই চাকাগুলো বনবন করে ঘোরে, পিছলে যায়, পুরু কাদার জন্য মাটিতে কামড় বসাতে পারে না।

শেষে আর কোনো উপায় না দেখে আমরা সবাই নেমে গাড়ির পেছনে ঠেলা দিতে লাগলাম। আঙ্কেল অ্যাক্সিলারেটর চেপে ধরলেন।

ঘোরার সময় পেছনের চাকা দুটো প্রবল বেগে কাদা ছিটাতে লাগল। কাদা লেগে গেল আমাদের গায়ে। তবে শেষ পর্যন্ত গাড়িটাকে আবার শক্ত মাটিতে তুলতে পারলাম।

গাড়ি চলল। তাকিয়ে রইলাম অন্ধকারের দিকে। ভূতুড়ে জলাভূমির দিকে।

কানে আসছে রাতের শব্দ।

তীক্ষ কিচির মিচির।

চাপা গোঙানি।

কর্কশ চিত্কার।

চার

দুর্গ। তা-ও আবার জলাভূমির মাঝখানে। ফ্লোরিডার জলাভূমি। জায়গাটার নাম মাড টাউন। বাংলা করলে দাঁড়ায় কাদার শহর। বেশিরভাগই আটাল কাদা, তার ওপর আগাছা আর কয়েক ফুট পানি। শুকনো জমি খুব অল্পই আছে।

মাথা তুলে রাখা উঁচু উঁচু গাছের জটলার অন্ধকারে যেন লুকিয়ে রয়েছে দুর্গটা।

সদর দরজার সামনে এসে গাড়ি থামালেন রজার আঙ্কেল। রজার মিলফোর্ড। আমার বন্ধু রবিন মিলফোর্ডের বাবা।

যা-ই হোক, সকালে রওনা দিয়ে মাড টাউনে আসতে আসতে রাত হয়ে গেল আমাদের। হেডলাইটের আলোয় দুর্গের মতো বাড়িটার দিকে তাকিয়ে রইলাম।

তিনতলা বাড়ি। কালচে-ধূসর পাথরে তৈরি। বাঁ পাশে কালো হয়ে যাওয়া চিমনি দিয়ে রুপালি ধোঁয়া বেরোচ্ছে।

'আমি ভেবেছিলাম জলাভূমির বাড়ি, নিশ্চয় ছোটখাটো কেবিনটেবিন হবে,' বিড়বিড় করে বললাম। 'গাছ কিংবা বাঁশের খুঁটির ওপরে বানানো। এতবড় বাড়ি কল্পনাই করিনি।'

'আমার কমিক বইতে কিন্তু ওভাবেই বানিয়েছে,' রবিন বলল। 'বাড়িটার জানালার অবস্থা দেখো না। বাবা, তোমার চাচা-চাচি কি ভ্যাম্পায়ার নাকি?'

জবাব দিলেন না আঙ্কেল।

জানালাগুলোর দিকে তাকিয়ে আছি। আমার কাছেও অবাক লাগছে। একেবারেই খুদে জানালা। তা-ও মাত্র তিনটে, এতবড় বাড়িটায়। প্রতি তলায় একটা করে ওই খুদে জানালা।

'এই, নামো তোমরা,' আন্টি বললেন। 'যার যার মালপত্র নামাও।'

গাড়ি থেকে নেমে মাল নামাতে ট্রাংকের দিকে গেলেন আঙ্কেল-আন্টি। রবিন আর মুসাও গেল ওঁদের সাহায্য করতে।

গাড়ির দরজার পাশে দাঁড়িয়ে রইলাম আমি।

রাতের বাতাস ঠান্ডা, ভেজা।

তাকিয়ে রইলাম মস্ত, কালো বাড়িটার দিকে। বেশিরভাগই গাছের আড়ালে ঢাকা পড়ে আছে। আশপাশে আর কোনো বাড়িঘরের চিহ্নও নেই।

হঠাত্ কানে এল অদ্ভুত চিত্কার। অনেকটা নেকড়ের ডাকের মতো। বিলাপ করছে যেন। জলাভূমির গভীর থেকে আসছে ওই শব্দ।

কেঁপে উঠলাম।

এভাবে চিত্কার করে ওটা কোন প্রাণী? অবাক হয়ে ভাবলাম।

'কিশোর, এসো।' বাড়ির সামনের দরজা থেকে হাত নেড়ে ডাকলেন আন্টি। আঙ্কেল আর রবিন ভেতরে চলে গেছে কখন। খেয়ালই করিনি।

'আরে, আরে, আমাদের সেই ছোট্ট রবিন না? কত বড় হয়েছে।' ভেতরে পা দিয়ে রবিনের দাদিকে বলতে শুনলাম। হাড্ডিসার দুই বাহু দিয়ে নাতিকে জড়িয়ে ধরে আদর করলেন। আমার আর মুসার সঙ্গে দাদির পরিচয় করিয়ে দিল রবিন। আমাদেরও একইভাব জড়িয়ে ধরলেন তিনি। হাসলেন। যেন আমরাও তাঁর আপন নাতি। তাঁর আন্তরিকতায় মুগ্ধ হলাম।

'সরো, লিলি,' নোয়া দাদা চেঁচিয়ে বললেন। 'আমাকে একবার দেখতে দাও।'

কঙ্কালসার বুড়ো হাড্ডিওয়ালা আঙুল দিয়ে আমার হাত চেপে ধরলেন দাদা। দাদা-দাদি দুজনেই খুব হালকা-পাতলা, ওজনহীন। যেন পলকা কাঠি। জোরে চাপ লাগলেই মট করে ভেঙে যাবে।

'তোমরা আসাতে কী যে খুশি লাগছে!' দাদি বললেন। নীল চোখ চকচক করছে। 'কেউ তো আর তেমন আসেটাসে না আমাদের এখানে।'

'দেরি দেখে তো ভাবছিলাম এলেই না বুঝি আর,' দাদা বললেন চেঁচিয়ে। 'আরও অনেক আগেই তো তোমাদের চলে আসার কথা।'

'গাড়ির চাকা ফেটে গিয়েছিল,' আঙ্কেল জানালেন।

'কী কেটে গিয়েছিল?'

'কাটেনি, কাটেনি, ফেটেছে।' জোরে চিত্কার করে জবাব দিলেন আঙ্কেল। 'চাকা ফেটেছে।'

দাদা কানে কম শোনেন। জোরে না বললে শোনেন না। হেসে ফেলল মুসা। কনুই দিয়ে ওর পাঁজরে গুঁতো মারলাম।

'ও, চাকা ফেটেছে। তা-ই বলো।' আঙ্কেলের হাত ধরে টান দিয়ে দাদা বললেন, 'এসো।'

আমাদের বসার ঘরে নিয়ে এলেন দাদা-দাদি।

ঘরটা এতই বড়, মনে হলো ফুটবল খেলা যাবে।

দেয়ালগুলো সবুজ রং করা। ম্যাড়মেড়ে সবুজ। ছাতের দিকে তাকালাম। লোহার তৈরি একটা ঝাড়বাতি, তাতে বারোটা মোম বসানো।

এক দিকের দেয়ালের বেশিরভাগটা জুড়ে রয়েছে মস্ত ফায়ারপ্লেস।

অন্য দেয়ালগুলোতে লাগানো রয়েছে অসংখ্য সাদা-কালো ছবি। পুরোনো হতে হতে হলদে হয়ে গেছে।

ছবিগুলো সম্ভবত দাদা-দাদির মৃত আত্মীয় ও বন্ধুদের, ভাবলাম।

একটা খোলা দরজা দিয়ে পাশের ঘরের দিকে তাকালাম। ডাইনিং রুম। বসার ঘরটার মতোই বড়। তেমনি অন্ধকার। তেমনি নিরানন্দ।

একটা কাউচে বসলাম আমি আর রবিন। গদির সবুজ কাপড়গুলো পুরোনো হতে হতে তেনা হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও গদির কাপড় ছিঁড়ে তুলো বেরিয়ে পড়েছে। পুরোনো স্প্রিংগুলো আমাদের ভারে বসে গেল। হঠাত্ কোনো কারণ ছাড়াই গুঙিয়ে উঠল মুসা। আমাদের পায়ের কাছে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ল।

ঘরের চারপাশে চোখ বোলালাম। ছবিগুলোর দিকে তাকালাম আবার। দেখলাম পুরোনো জীর্ণ গালিচাটা। মলিন চেয়ার-টেবিল। মাথার ওপরে মিট মিট করে জ্বলা আলোগুলো আমাদের ছায়া নাচাচ্ছে অন্ধকার দেয়ালে।

'জায়গাটা ভূতুড়ে,' ফিসফিস করে বলল মুসা। 'আর বিশ্রী গন্ধ।'

ভেবে অবাক হলাম, দুজন বুড়ো মানুষ এ রকম নোংরাভাবে কেন বাস করেন? অন্ধকার, ছাতাপড়া ঘরের মধ্যে? জলাভূমির গভীরে? বিজ্ঞানী হলেই কি নোংরা হতে হবে? কাজের লোক রাখতে না চান, ঠিক আছে, কিন্তু লোক দিয়ে সাফসুতরো করাতে অসুবিধে কী?

আমার চিন্তা বাধা পেলো দাদার কথায়। চেঁচিয়ে বললেন, 'যাক, শেষ পর্যন্ত এলে তোমরা! 'খুব ভালো লাগছে আমার। এখন বলো তো, কীভাবে এলে?'

আমাদের মুখোমুখি সোফায় বসেছেন দাদা-দাদি। আঙ্কেল আর আন্টি বসেছেন অন্য একটা সোফায়।

'নোয়া,' জোরে চেঁচিয়ে দাদি বললেন, 'এখন ওসব কথা বাদ দাও। এতখানি পথ পাড়ি দিয়ে এসে নিশ্চয় খিদে পেয়েছে ওদের। এই, এসো তোমরা, রান্নাঘরে চলো। তোমাদের জন্য আমি স্পেশাল খাবার রান্না করেছি—মুরগির মাংসের বড়া।'

দাদা-দাদি পেছন পেছন রান্নাঘরে এলাম আমরা। এই ঘরটাও বাকি সব ঘরগুলোর মতোই। অন্ধকার। নিরানন্দ।

তবে অন্য ঘরগুলোর মতো পুরোনো ছাতলাপড়া গন্ধ পেলাম না এখানে, হয়তো ভাজা মাংসের সুগন্ধের আড়ালে দুর্গন্ধ চাপা পড়েছে।

আভন থেকে আটটা মাংসের বড়া বের করলেন দাদি। আমাদের প্রত্যেকের জন্য একটা। দুটো বাড়তি। ওগুলো কার জন্য? একটা খেয়ে যদি আমাদের কারও আরও দরকার হয়, তাকে দেওয়া হবে? হতে পারে। মোটা রুটির সঙ্গে সেগুলো পরিবেশন করলেন দাদি।

আমার প্লেটে একটা বড়া দিলেন তিনি। সঙ্গে সঙ্গে কাঁটা চামচ বসিয়ে খানিকটা বড়া কেটে নিলাম। এতটা খিদে পেয়েছে, নানা উত্তেজনায় সেটা বুঝতেই পারিনি।

পাঁচ

ডিনারের পর গল্প করতে বসলেন আন্টি, আঙ্কেল, দাদা আর দাদি। এমন কোনো বিষয় নেই, যা ওঁরা আলোচনায় টেনে আনলেন না। ঘটনার তো অভাব নেই। আট বছর পর দেখা। বহু কথা জমে রয়েছে দুই পক্ষেরই।

তবে আমরা বড়দের এ সব আলোচনায় যোগ দিতে পারলাম না।

মুসা তো খানিক উসখুস করে বলেই ফেলল, 'আমরা টেলিভিশন দেখতে যাই?'

'টেলিভিশন? সরি, ভাই,' বিব্রত ভঙ্গিতে দাদি বললেন। 'আমাদের টেলিভিশন নেই।'

অবাক হয়ে আমার দিকে তাকাল মুসা। হাত উল্টে এমন একটা ভঙ্গি করলাম, বোঝাতে চাইলাম, জবাবটা আমারও জানা নেই।

তবে জবাবটা দাদিই দিলেন, 'এ বাড়িতে শুধু টেলিভিশন না, টেলিফোনও নেই। টেলিফোন আমাদের দরকার হয় না। ও জিনিসটা ভীষণ বিরক্তিকর। শুধু শুধু কারণে-অকারণে ফোন করবে লোকে। আমাদের গবেষণার খোঁজখবর নেয়ার চেষ্টা করবে। নিজেদের শান্তি নষ্ট করতে রাজি নই আমরা। কোথাও কোনো জরুরি খবর পাঠানোর দরকার হলে জেনারেল স্টোরের মিস্টার কারসনকে জানিয়ে আসি, সে-ই পোস্টম্যানের কাজটা সেরে দেয়।'

'গত সাত দিন ধরে মিস্টার কারসনের সঙ্গেও দেখা হয় না,' দাদা বললেন। 'আমাদের গাড়িটাও নষ্ট হয়ে আছে।'

টেলিভিশন নেই।

ফোন নেই।

গাড়ি নেই।

এবং রয়েছি আমরা বিশাল এক জলাভূমির মাঝখানে।

সভ্য জগত্ থেকে দূরে।

নিজেকে বোঝালাম—জলাভূমি দেখতে এসেছি, সেটাই দেখব, ওসব শহুরে আধুনিক জিনিস আমাদের দরকার নেই।

চুপচাপ বসে বসে বড়দের একঘেয়ে কথা শুনতে লাগলাম।

'শোবার সময় হয়েছে!' অবশেষে ঘড়ি দেখে দাদা বললেন। 'রজার, ঘুমোতে যাও তোমরা। তোমাদের তো আবার ভোরে উঠতে হবে। আড্ডাটা অবশ্য খারাপ লাগছিল না। কিন্তু কী আর করা।'

'তোমরা মন খারাপ কোরো না,' আমাদের তিন বন্ধুকে বললেন দাদি, 'কাল অনেক মজা করতে পারবে।'

'হ্যাঁ, ঠিক,' দাদা বললেন। 'মস্ত এই বাড়িটায় দেখার অনেক কিছু আছে। খুঁজবে, আর মজা পাবে। দুর্দান্ত অ্যাডভেঞ্চার হবে তোমাদের জন্য।'

'আর আমি আমার স্পেশাল কেক বানাব!' চেঁচিয়ে বললেন দাদি। 'খাবার বানাতে আমাকে সাহায্য করবে তোমরা। খুব মজা হবে, দেখো। কেকে এত মিষ্টি দেব, কামড় দিলে দাঁত খসে পড়ে যাবে!'

ঢোক গিলল রবিন। রসিকতায় হাসল না। এমনকি মুসার মুখেও খাবারের কথায়ও হাসি ফুটল না। জায়গাটা আসলে ওর মোটেও পছন্দ হচ্ছে না।

আঙ্কেল ও আন্টি আমাদের গুড-নাইট জানিয়ে ঘুমাতে চলে গেলেন। কাল সকালে আর তাঁদের সঙ্গে দেখা হবে না আমাদের। খুব ভোরে উঠে যখন চলে যাবেন, আমরা তখনো ঘুমিয়ে থাকব।

দাদির পেছন পেছন এগোলাম আমি আর রবিন। পুরোনো, অন্ধকার সিঁড়ি দিয়ে দোতলার বারান্দায় উঠে এলাম, যেখানে রয়েছে আমাদের শোবার ঘর।

পাশাপাশি তিনটে ঘরে থাকতে দেওয়া হলো আমাদের তিনজনকে। রবিন আর মুসা ওদের ঘরে ঢুকে যেতেই পেছন থেকে ঠেলা মেরে আমাকে আমার ঘরে ঢুকিয়ে দিলেন দাদি। হালকা-পাতলা দেহটায় এত শক্তি আছে, দেখে বোঝা যায় না।

শোবার ঘরটাও বাড়ির অন্যান্য ঘরের মতোই অন্ধকার। বিষণ্নতায় ভরা।

বিছানার পাশে আমার সুটকেসটা রেখে চারপাশে তাকালাম। এই ঘরটাও বিশাল। কোনো জানালা নেই।

ঘরের একমাত্র আলোর উত্স বিছানার পাশের ছোট একটা বেডল্যাম্প, সাধারণ বাল্ব লাগানো, সেটা থেকে মলিন হলুদ আলো বেরোচ্ছে। এতই মৃদু, প্রায় পুরো ঘরটাই অন্ধকারে ঢেকে রয়েছে।

মেঝেতে বিছানো একটা পুরোনো গালিচা। জায়গায় জায়গায় সুতো উঠে গিয়ে পাতলা হয়ে গেছে। পুরোনো। রংচটা।

বিছানার উল্টো দিকের দেয়াল ঘেঁষে রাখা একটা ড্রেসার। পুরোনো হতে হতে কাঠ বেঁকে গিয়ে কাত হয়ে রয়েছে একপাশে। ড্রয়ার বেরিয়ে রয়েছে।

একটা বিছানা। একটা ল্যাম্প। একটা ড্রেসার।

জানালাবিহীন মস্ত একটা ঘরে মাত্র এই তিনটা জিনিস।

দেয়ালগুলো শূন্য। নিরানন্দ ধূসর দেয়ালের বিষণ্নতা দূর করতে নেই কোনো ছবি। নেই উজ্জ্বল রং।

বিছানায় বসলাম। খাটের মাথায় লোহার শিক দিয়ে তৈরি হেলানে হেলান দিলাম।

হাত বোলালাম বিছানায় রাখা কম্বলে। খসখসে উল। তাতে পোকার ওষুধের গন্ধ।

'এই কম্বল আমি গায়ে দিতে পারব না,' চেঁচিয়ে বললাম, কিন্তু শোনার কেউ নেই। ঘরটা ভীষণ ঠান্ডা। স্যাঁতসেঁতে। শীতে কাঁপছি। বুঝলাম, এই কম্বলই গায়ে দিতে হবে আমাকে। না দিয়ে পারব না।

তাড়াতাড়ি কাপড় বদলে গন্ধে ভরা ওই কম্বলই গায়ের ওপর টেনে দিলাম।

বারবার এপাশ ওপাশ করছি। গদির তুলো শক্ত হয়ে জমে রয়েছে জায়গায় জায়গায়। পিঠে ব্যথা লাগে। কোন ভঙ্গিতে কোন জায়গাটায় থাকলে কিছুটা আরাম পাব, সেটা খুঁজতে লাগলাম। কোথাও আরাম পেলাম না।

ছাতের দিকে তাকিয়ে কান পেতে রইলাম। রাতের বেলা এই ভূতুড়ে বাড়িতে অদ্ভুত সব শব্দ হচ্ছে।

জলাভূমি থেকে ভেসে এল বিষণ্ন টানা চিত্কার।

তারপর শুনলাম ভয়াল হুংকার।

একবার মনে হলো পাশের ঘরে।

ঝট করে উঠে বসলাম।

রবিনের ঘর থেকে আসছে না তো?

ছয়

কান খাড়া করে শুনতে লাগলাম। নড়তে ভয় পাচ্ছি।

আবার দীর্ঘ একটা বিষণ্ন চিত্কার শোনা গেল। বাইরে থেকে। রবিনের ঘর থেকে আসেনি শব্দটা।

'অতি কল্পনা থামাও!' নিজেকে ধমক লাগালাম। 'এ সব তো মুসার স্বভাব। তোমার না।'

কিন্তু আমি বললেই তো আর জলাভূমির ভূতুড়ে চিত্কার বন্ধ হবে না।

কীসে চিত্কার করছে? কোন প্রাণী? জলাভূমির দানব?

কানের ওপর বালিশ চেপে ধরলাম। বহুক্ষণ লাগল ঘুম আসতে।

যখন ঘুম ভাঙল, বুঝতে পারলাম না সকাল হয়েছে, নাকি মধ্যরাত। জানালাবিহীন ঘরে বোঝা অসম্ভব।

আমার হাতঘড়ি দেখলাম। সাড়ে আটটা। তারমানে সকাল হয়েছে।

সুটকেসে আমার নতুন লাল শার্টটা খুঁজলাম। উজ্জ্বল রং আর নতুন কাপড় পরে মনটাকে হালকা করতে চাই। লাল শার্ট গায়ে দিয়ে জিনসের প্যান্ট পরব। কাদামাখা জুতোজোড়াই পায়ে দিতে হবে। বাড়তি জুতো আনিনি।

দ্রুত পোশাক পরে নিলাম। ঘরটা আমার কাছে জেলখানা মনে হচ্ছে। এটা থেকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বেরোনো দরকার।

দরজা খুলে বারান্দায় উঁকি দিলাম।

শূন্য।

কিন্তু আমার ঘরের মুখোমুখি বারান্দার উল্টো দিকে ছোট একটা জানালা আছে। গতরাতে এটা চোখে পড়েনি।

ময়লা কাচের ভেতর দিয়ে উজ্জ্বল রোদ আসছে। বাইরে উঁকি দিলাম, জলাভূমির দিকে।

লাল সাইপ্রেস গাছগুলোর মাথায় ভারী কুয়াশা ঝুলে রয়েছে। তাতে রোদ পড়ে ভেজা মাটিতে মোলায়েম গোলাপি আভা তৈরি করেছে। উজ্জ্বল আজব কুয়াশার কারণে জলাভূমিটাকে কেমন অবাস্তব আর রহস্যময় মনে হচ্ছে।

কাছেই একটা গাছের ডালে লাল রংয়ের কিছু একটা নড়ছে। ভালো করে দেখে বুঝলাম, পাখি। লাল পালক, কমলা ঠোঁট। এমন পাখি আগে দেখিনি।

তারপর আবার শুনলাম শব্দটা।

ভয়ানক গর্জন। তীক্ষ চিত্কার।

জলার গভীরে নিশ্চয় রহস্যময় সব প্রাণী লুকিয়ে রয়েছে, যা ন্যাশনাল জিওগ্রাফি কিংবা ডিসকভারি চ্যানেলেও দেখায়নি। আর দেখালেও আমি দেখিনি।

জলাভূমির জীব।

জলাভূমির দানব।

কেঁপে উঠলাম।

হলো কী আমার? মুসার রোগটা কি আমাকেও ধরেছে? ভূতপ্রেত আর দৈত্যদানবে বিশ্বাসের রোগ?

ঝাড়া দিয়ে মাথা থেকে উদ্ভট ভাবনাগুলো তাড়ানোর চেষ্টা করলাম।

জানালার দিক থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে, রবিনের ঘরের দিকে রওনা হলাম। রবিন আর মুসা উঠেছে কি না দেখি। না উঠলে ডেকে তুলতে হবে।

সাত

রবিন আর মুসাকে নিয়ে নাস্তা করতে নিচে নামার সময় বারান্দার জানালাটার দিকে চোখ পড়তে থেমে গেলাম। বাইরে তাকালাম। কুয়াশা কেটে গেছে। কুয়াশায় ভেজা গাছপালা রোদে চকচক করছে।

'খুব সুন্দর, তাই না?' বিড়বিড় করলাম।

'হ্যাঁ,' মুসা জবাব দিল। 'সুন্দর। তবে ভূতুড়ে।'

রান্নাঘরটাকেও ভূতুড়ে মনে হলো। অন্ধকার। সকাল বেলায়ও প্রায় রাতের মতোই অন্ধকার, গতরাতে যেমন দেখেছিলাম। তবে পেছনের দরজাটা খোলা, আর সেখান দিয়ে সামান্য রোদ এসে পড়েছে মেঝেতে আর দেয়ালে।

জলাভূমির নানারকম শব্দ ঢুকছে দরজা দিয়ে। সেগুলোকে অগ্রাহ্য করার চেষ্টা করলাম।

স্টোভের কাছে দাঁড়িয়ে আছেন দাদি। এক হাতে একটা হাতা, আরেক হাতে মস্ত প্লেটভরতি ব্লুবেরি দিয়ে তৈরি প্যানকেক। হাতা আর প্লেটটা লম্বা টেবিলে নামিয়ে রেখে অ্যাপ্রনে হাত মুছলেন। এ বাড়ির আরও অনেক কিছুর মতোই দাদির ঢোলা অ্যাপ্রনের কাপড়টাও পুরোনো আর ময়লা। আমাদের দেখে হাসিতে উজ্জ্বল হলো তাঁর মুখ। 'গুড মর্নিং' বলে তিনজনকেই জড়িয়ে ধরে স্বাগত জানালেন। তাঁর এই আন্তরিকতা ভালো লাগল আমার।

অস্পষ্ট অন্ধকারে দাদাকে দেখলাম খাবার টেবিলে বসে আছেন।

'রাতে ঘুম ভালো হয়েছিল?' হেসে জিজ্ঞেস করলেন তিনি। হাসিতে কুঁচকে গেল তাঁর নীল চোখের কোণা। চোখের ওপর এসে পড়া এক গোছা ধূসর চুল হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে ঠেলে সরিয়ে দিলেন। চুলেও জামের নীল রস লেগে নীলচে হয়ে গেল।

'হ্যাঁ, ঘুমিয়েছি,' দাদা জবাব দিলেন। তিনি ভেবেছেন তাঁকেই প্রশ্নটা করা হয়েছে। 'সব সময়ই ঘুমাই। এত নীরব আর শান্ত এখানে।' আর ঠিক ওই মুহূর্তে যেন তাঁর কথাকে ব্যঙ্গ করেই জোরালো একটা চিত্কার ভেসে এল জলাভূমি থেকে।

মনে মনে হাসলাম। দাদার ভাগ্য ভালো, তিনি কানে কম শোনেন, তাই এসব চিত্কার-চেঁচামেচি তাঁর কানে ঢোকে না। খাওয়া শেষ করে উঠে দরজার দিকে রওনা হলেন।

খাবার টেবিলে বসলাম আমরা।

টেবিলের মাঝখানে রাখা মস্ত আরেক প্লেট ব্লুবেরি প্যানকেক। দাদির হাতে যে প্লেটটা রয়েছে, এটা তারচেয়ে বড়। তাতে পাহাড়ের মতো উঁচু হয়ে আছে প্যানকেকের স্তূপ।

দাদি কি মুসার পেটুক স্বভাবের কথা জানেন? নাকি আমাদের রাক্ষস ভেবেছেন? রবিন আমার দিকে কাত হয়ে এসে ফিসফিস করে বলল, 'এখানে চল্লিশ-পঞ্চাশ জনের খাবার।'

'জানি,' গুঙিয়ে উঠলাম। 'আর আমাদেরকেই এগুলো খেয়ে শেষ করতে হবে। নইলে দাদি অপমানিত বোধ করবেন।'

'পারব না,' ঢোক গিলল মুসা।

মুসার মতো ভোজনরসিক বলছে পারবে না, তারমানে কী পরিমাণ প্যানকেক দেওয়া হয়েছে টেবিলে।

'নাও, নিজেরাই নিয়ে নিয়ে খাও,' দাদি বললেন। আরও দুই বাসন প্যানকেক এনে টেবিলে রাখলেন। 'খেতে লজ্জা কোরো না।'

এত প্যানকেক কেন বানিয়েছেন দাদি? ব্যাপারটা আমার কাছে অস্বাভাবিক লাগল। এত প্যানকেক খেয়ে শেষ করতে পারব না আমরা কিছুতেই।

একটা খালি বাসন টেনে নিয়ে কয়েকটা প্যানকেক নিলাম তাতে। মুসার বাসনে গোটা দশেক প্যানকেক তুলে দিলেন দাদি। তাতে অবশ্য আপত্তি করল না ও।

আমাদের সঙ্গে টেবিলে বসলেন দাদি। তবে তাঁর বাসনটা শূন্য রইল। একটা প্যানকেকও নিলেন না তিনি।

এত প্যানকেক বানিয়েছেন, আর তিনি একটাও নেননি। বিষয়টা কেমন রহস্যময় লাগছে আমার কাছে। কিছুই বুঝতে পারছি না।

'কী বই ওটা?' রবিনের প্যান্টের ব্যাকপকেট থেকে বেরিয়ে থাকা গোটানো কমিক বইটার দিকে আঙুল তুলে জিজ্ঞেস করলেন দাদি।

'কমিক। কাদার দানব,' প্যানকেক চিবাতে চিবাতে জবাব দিল রবিন।

'গল্পের বই আমারও খুব পছন্দ,' দাদি বললেন। 'তোমার দাদাও বই ভালোবাসে। আমরা এখানে সারাক্ষণই বই পড়ি। রহস্য গল্প ভালো লাগে আমাদের। তোমার দাদা বলে, ভালোভাবে লেখা হলে রহস্য কাহিনির কোনো তুলনা হয় না।'

'যাও, তোমরা বাইরে যাও, চারপাশটা ঘুরে দেখ, তবে বাড়ি থেকে বেশি দূরে যেয়ো না,' নাস্তার পর দাদি বললেন। 'আমি বাসন-পেয়ালাগুলো ধুয়ে ফেলি। তারপর কেক বানাতে বসব। তোমরা আমাকে সাহায্য করবে।'

পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে এলাম আমরা। জলাভূমিতে ঘুরে বেড়ানোটা খুব একটা আনন্দের কাজ মনে হলো না আমার কাছে। কিন্তু অন্ধকার ভূতুড়ে বাড়িতে হাত গুটিয়ে বসে থাকার চেয়ে তো ভালো।

অন্ধকার থেকে বেরিয়ে উজ্জ্বল রোদে চোখ ধাঁধিয়ে গেল আমাদের। গরম বাষ্পে ভরা বাতাস গায়ের চামড়ায় ছ্যাঁকা দিচ্ছে। দম আটকানো ভাবটা দূর করার জন্য জোরে জোরে শ্বাস টানতে লাগলাম।

'তো, কী করবে?' আমার মতোই জোরে জোরে দম নিচ্ছে রবিন।

একটা রাস্তা দেখতে পেলাম। বাড়ির পেছন থেকে বেরিয়ে গিয়ে জলাভূমির ভেতরে ঢুকেছে।

'চলো, দেখে আসি কোথায় গেল,' বললাম।

'নাহ, জলাভূমির ভেতরে আমি হাঁটতে যাব না,' সাফ মানা করে দিল মুসা।

'কীসের ভয়ে? দানবের?' খানিকটা রসিকতার সুরেই জিজ্ঞেস করলাম, 'কাদার দানো?'

'ইয়ার্কি মেরো না তো!' রেগে উঠল মুসা। কুঁচকে গেল ভুরু।

তবে আমাদের সঙ্গে এল। রোদের মধ্যে দিয়ে হাঁটতে লাগলাম আমরা। গাছের পাতা আর ডালপালার ভেতর দিয়ে চুইয়ে নামছে রোদ, তেরছা হয়ে বর্শার মতো মাটিতে গেঁথে যাচ্ছে যেন। পথের ওপর আলো-আঁধারির খেলা।

পেছন থেকে ডাক দিলেন দাদা, 'এই, বেশিদূরে যেয়ো না তোমরা।'

ঘুরে দাঁড়ালাম। কয়েক ফুট দূরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম দাদাকে।

হাতে একটা করাত। ধারালো দাঁতগুলো রোদে চকচক করছে।

রাস্তার পাশে কয়েক ফুট দূরে, বড় বড় দুটো সাইপ্রেস গাছের মাঝখানে ছোট একটা ছাউনির দিকে এগিয়ে গেলেন দাদা। ছাউনিটা এখনো বানানো শেষ হয়নি।

'না, যাব না,' দাদাকে নিশ্চিন্ত করার জন্য বললাম। 'বেশি দূরে যাব না।'

'ছাউনি বানাতে আমাকে সাহায্য করবে?' করাত নেড়ে জোরে চিত্কার করে বললেন দাদা। 'কাজের মধ্যে থাকলে আত্মবিশ্বাস বাড়ে।'

'আজ থাক, দাদা,' জবাব দিলাম। 'পরে।'

আমার কথা শুনতে পাননি বোধহয় তিনি। আবার চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 'কী, করবে সাহায্য?'

দুই হাত মুখের কাছে জড়ো করে জোরে চিত্কার করে রবিন বলল, 'প-রে-এ-এ।' তারপর আবার ঘুরে দাঁড়িয়ে রাস্তা ধরে হাঁটতে শুরু করল।

মুহূর্ত পরেই কীসে যেন হোঁচট খেল মুসা।

উপুড় হয়ে গেল পড়ে কাদার মধ্যে।

আট

'কুমির! কুমির!' বলে চেঁচিয়ে উঠল মুসা। 'কুমিরে খেয়ে ফেলল!'

মুসার পায়ের দিকে তাকিয়ে কাদায় ভরা ঘাসের মধ্যে কালো একটা জিনিস দেখতে পেলাম। অ্যালিগেটরের লেজের মতো।

হেসে উঠলাম।

'কুমির নয়, মুসা,' শান্তকণ্ঠে বললাম, 'ওটা সাইপ্রেসের শিকড়। কাদার মধ্যে বেরিয়ে আছে।'

আবার চিত্কার করতে মুখ খুলেছিল মুসা। আমার কথায় থেমে গেল। মুখটা ফাঁক হয়েই রইল। শিকড়টা দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। বিব্রত ভঙ্গিতে বলল, 'আমি ভেবেছিলাম ওটা কুমিরের লেজ।'

'জলাভূমির কুমিরের নাম অ্যালিগেটর, তা কি জানো?' রবিন জিজ্ঞেস করল।

'জানি,' জবাব দিল মুসা। 'ভয়ের চোটে আর অ্যালিগেটর বলব কখন, কুমিরই বলে ফেলেছি।'

প্রচণ্ড ভয় পেয়েছে বেচারা। কাদা থেকে পা টেনে তুলল ও।

'চলো, বাড়ি ফিরে যাই,' আমি বললাম। 'দাদি নিশ্চয় অপেক্ষা করছেন আমাদের জন্য। কেক বানাতে সাহায্য করতে বলেছিলেন।'

'তোমাদের দেখে তো মনে হচ্ছে বেশ আনন্দেই আছ,' রান্নাঘরের দরজা দিয়ে আমাদের ঢুকতে দেখে বললেন দাদি।

জবাবে কাঁধ ঝাঁকালাম।

'তো, আমার সঙ্গে কাজ করতে তৈরি?' হেসে জিজ্ঞেস করলেন দাদি। 'সব রেডি করেই রেখেছি।' লম্বা টেবিলটা দেখালেন তিনি। কেক বানানোর সমস্ত উপকরণ সাজিয়ে রেখেছেন।

'ময়দা গোলানোর কাজটা করতে আপত্তি নেই তো তোমার?' আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন তিনি।

'না,' বললাম।

মুসা আর রবিনের দিকে তাকালেন দাদি। 'তোমরা আপেলগুলো কুচি কুচি করে কাটো। পেস্তাবাদামগুলোও কাটো। তারপর কিসমিসগুলো ধোও। কেকে দিতে হবে। ফ্রুট কেক বানাব আমরা। আমি ডিম ভেঙে দুধে মিশিয়ে গোলাই। চিনিও মেশাতে হবে। চিনির একটা মাপ আছে। সেটা তোমরা করতে পারবে না।'

ময়দা গোলানো শুরু করলাম। অনেক ময়দা। এত ময়দা দিয়ে কতবড় কেক বানাবেন দাদি?

ময়দা গোলানো শেষ করতে অনেকটাই সময় লাগল আমার। মুসা আর রবিনের কাজও মোটামুটি শেষ। ঠিকভাবে হয়েছে কি না ভালমতো দেখে দাদি বললেন, 'হয়েছে। এবার চেয়ারে বসে জিরাও তোমরা। এক গ্লাস দুধ খাও। আমি এখন গোলানো ময়দায় ডিম আর দুধ মেশাব।'

কিন্তু দুধ খেতে ইচ্ছে করল না। তর্কও করতে চাইলাম না। তাই দাদির কথামতো গ্লাসে দুধ ঢেলে নিয়ে খেতে খেতে তাঁর কাজ দেখতে লাগলাম।

একটা নয়, তিনটে কেক বানাচ্ছেন দাদি। যে সাইজের বানাচ্ছেন, তাতে একটাতেই আমাদের হয়ে বেশি হয়ে যাবে।

না জিজ্ঞেস করে আর পারলাম না, 'দাদি, তিন কেক দিয়ে কী হবে?'

'আমি সব সময়ই বাড়তি বানিয়ে রাখতে পছন্দ করি,' অন্যদিকে তাকিয়ে দাদি জবাব দিলেন। 'বলা তো যায় না, কে কখন এসে পড়ে।'

কে কখন এসে পড়ে মানে? কে আসবে? এই জলার মাঝখানে?

দাদির দিকে তাকিয়ে রইলাম।

মাথায় গোলমাল হয়ে গেল নাকি?

কে আসবে? এত দুর্গম জায়গায় কার আসার কথা?

ঘটছেটা কী এখানে? অবাক হয়ে ভাবলাম।

সত্যিই কি কারও আসার কথা আছে?

তা না হলে এত খাবার বানিয়ে রাখছেন কেন?

দড়াম করে খুলে গেল রান্নাঘরের দরজা। দাদা ঢুকলেন। 'বেশি কাজ করলে বেশি পিপাসা লাগে!' রিফ্রিজারেটরের দিকে এগোলেন তিনি। 'ওই দেখ, ঠিক বলেছি না? তোমাদেরও পিপাসা লেগেছিল।' টেবিলে রাখা আমাদের শূন্য গ্লাস দুটো দেখালেন দাদা। 'তো, পিপাসা তো মিটেছে। এখন আমার ছাউনিটা বানাতে সাহায্য করবে?'

'জন,' দাদাকে বকা দিলেন দাদি, 'ওরা এখানে কাজ করতে আসেনি! বেড়াতে এসেছে!' আমাদের বললেন, 'বসে না থেকে বাড়িটা ঘুরে দেখ। এ বাড়িতে অনেকগুলো ঘর। সময় কাটবে, মজাও পাবে। গুপ্তধন যদি পেয়ে যাও, তাতেও অবাক হব না।' বলে হাসলেন তিনি।

'বাহ, ভালো কথা মনে করেছ তো! দারুণ হবে ওদের জন্য!' হাসিতে উজ্জ্বল হলো দাদার মুখ। পরক্ষণেই গম্ভীর হয়ে গেলেন। 'তবে একটা কথা মনে রেখো। তিনতলার বারান্দার শেষ মাথায় তালা দেওয়া ঘরটাতে ঢুকবে না। বুঝতে পেরেছ? আবারও বলছি, ঢুকবে না।'

'কেন?' জিজ্ঞেস করল রবিন। 'কী আছে ওটাতে?'

পরস্পরের দিকে তাকালেন দাদা-দাদি। উদ্বিগ্ন দৃষ্টি। লাল হয়ে গেছে দাদির গাল।

'ওটা স্টোর রুম,' দাদা জবাব দিলেন। 'সমস্ত জিনিসপত্র ওখানে রাখি। ফেলে দেওয়া বাতিল জিনিস। পুরোনো জিনিস। ভঙ্গুর। যেগুলো খুব সহজেই ভেঙে যায়। ওগুলোর কাছ থেকে দূরে থাকবে।'

দাদার কথা রহস্যময় মনে হলো আমার কাছে। বাতিল, ভঙ্গুর জিনিসের জন্য এত সাবধানতা কেন তাঁর? মনে হলো, কিছু লুকোতে চাইছেন তিনি। তর্ক করে ঝামেলা বাড়াতে চাইলাম না। দাদা-দাদি খুবই ভালো মানুষ। কিন্তু অদ্ভুত।

নয়

নিচতলার বেশিরভাগটা জুড়েই রয়েছে রান্নাঘর, বসার ঘর, আর ডাইনিং রুম। এগুলো আগেই দেখেছি আমরা।

একটা লাইব্রেরি আছে নিচতলায়। তাকগুলো পুরোনো বইতে ভরতি।

একটা ল্যাবরেটরিও দেখলাম। ধুলোয় ভরা। নাকে ধুলো ঢোকায় হাঁচি দিতে লাগলাম। এত ধুলো কেন? যন্ত্রপাতি আর তাকভরতি শিশি-বোতলের জারগুলো দেখে মনে হলো, বহুকাল ব্যবহার করা হয় না। এটাও অদ্ভুত লাগল আমার কাছে।

আকর্ষণীয় কিংবা আগ্রহ জাগানোর মতো কোনো কিছুই চোখে পড়ল না। নিচতলায় আর কিছু না পেয়ে ওপর তলায় চললাম।

সিঁড়ি বেয়ে উঠে এলাম দোতলায়।

বার বার মোড় নেওয়া অন্ধকার বারান্দা ধরে এগোলাম।

আমাদের বেডরুম দুটোর পাশ কাটালাম।

চলে এলাম আমাদের ঘরগুলোর পাশের ঘরটায়।

দাদা-দাদির শোবার ঘর এটা।

'এখানে ঢোকাটা বোধহয় উচিত হবে না,' রবিনকে বললাম। 'ওঁদের জিনিসপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করেছি জানলে বিরক্ত হবেন।'

'হলেও ঢুকব,' রবিন বলল। 'এত প্যানকেক কী করেছেন, দেখতে চাও না? সত্যিই ঘরে বসে খেয়েছেন কি না বোঝা দরকার।'

রবিনের কথায় যুক্তি আছে। তবু ঢুকতে ইচ্ছে করল না আমার। অন্য কারও বেডরুমে ঢুকতে অস্বস্তি লাগে।

চলে এলাম বেডরুমের পাশের ঘরটার দরজার সামনে। ভারী, শক্ত কাঠ দিয়ে তৈরি দরজা। ঠেলা দিতেই ক্যাঁচকোঁচ করে গুঙিয়ে উঠল যেন পুরোনো কব্জা।

বাতির সুইচের জন্য অন্ধকারে হাতড়াতে লাগলাম। সুইচটা পেয়ে টিপে দিলাম। অন্য সব ঘরের মতোই এটাতেও ম্লান আলো। অল্প পাওয়ারের বাল্ব লাগিয়ে ঘরগুলোকে প্রায় অন্ধকার করে রাখা হয়েছে। মনে হচ্ছে, যেন বেশি আলো পছন্দ করেন না দাদা-দাদি। ছাত থেকে লম্বা তারের মাথায় একটা মাত্র অল্প পাওয়ারের ময়লা বাল্ব ঝুলে রয়েছে। অসুস্থ হলুদ আলো ছড়াচ্ছে।

বিষণ্ন আলোয় অসংখ্য বাক্স দেখতে পেলাম। বাক্সে ভরতি ঘর। একটার ওপর আরেকটা সারি দিয়ে স্তূপ করে রাখা।

'এ সব বাক্সে কী আছে?' রবিনের প্রশ্ন।

একটা বাক্সের ডালা খোলার চেষ্টা করল ও। বলল, 'দেখ, কেমন পেট মোটা। ঠেলে বেরোনো।' আবার সেই একই প্রশ্ন করল, 'আছে কী এর ভেতর?'

রবিনের কাঁধের ওপর দিয়ে উঁকি দিলাম। ছত্রাক আর পুরোনো ভ্যাপসা গন্ধ ঘরের বদ্ধ বাতাসে। নাক কুঁচকে মৃদু আলোয় বাক্সটার দিকে তাকিয়ে ভেতরে কী আছে দেখার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম।

টেনেটুনে কার্ডবোর্ডের বাক্সের ডালাটা খুলে ফেলল রবিন।

অস্ফুট শব্দ করে উঠল।

'কী?' দেখার জন্য গলা বাড়িয়ে দিলাম। 'কী আছে?'

'খবরের কাগজ। পুরোনো খবরের কাগজে ভরতি,' জবাব দিল রবিন।

ওপরের কয়েকটা কাগজ তুলে নিলাম। নিচে অন্য কিছু থাকবে আশা করেছিলাম। নেই। নিচেও খবরের কাগজ। শুধুই কাগজ। পুরোনো। হলদে হয়ে গেছে।

একে একে আরও পাঁচটা বাক্স খুলে দেখলাম।

ভেতরে সেই একই জিনিস। খবরের কাগজ।

প্রতিটি বাক্স খবরের কাগজে ঠাসা। বিশাল এক ঘরভরতি বাক্স, আর সেগুলোতে ভরতি খবরের কাগজ।

আরেকটা বাক্স খুলল রবিন। ঘোঁত্-ঘোঁত্ করল, 'ম্যাগাজিন।'

পত্রিকা। ম্যাগাজিন। লাইব্রেরি ভরা বই। বাক্সভরতি পত্রিকা, ম্যাগাজিন। দাদি ঠিকই বলেছেন। পড়তে পছন্দ করেন তাঁরা। এত পত্রিকা জমিয়ে রাখার এটাই কারণ।

বাক্সে হাত ঢুকিয়ে একটানে অনেকগুলো ম্যাগাজিন তুলে আনলাম। হঠাত্ হাতের উল্টো পিঠে সুড়সুড় করে উঠল কী যেন। চমকে গিয়ে মাথা নুইয়ে তাকালাম ম্যাগাজিনের তলায়।

তেলাপোকা।

অসংখ্য তেলাপোকা ম্যাগাজিন থেকে এসে আমার হাতে হেঁটে বেড়াতে লাগল।

হাত থেকে পোকাগুলো ঝেড়ে ফেলে, ম্যাগাজিনগুলোকে মাটিতে আছাড় দিলাম।

বাক্সে তেলাপোকার রাজত্ব। ডালা খোলা পেয়ে দলে দলে বেরিয়ে এল। আমাদের গায়ে ঘুরে বেড়াতে লাগল কয়েকটা।

একটা ম্যাগাজিন দিয়ে বাড়ি মেরে পোকাগুলোকে গা থেকে ফেলতে লাগল মুসা।

আমার শার্টের কলার দিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল কয়েকটা। আমার ঘাড়ে, মুখে সুড়সুড়ি দিচ্ছে।

'উফ! শয়তানগুলো তো জ্বালাল।' চেঁচিয়ে উঠল রবিন।

চেঁচিয়ে লাভ নেই। তেলাপোকারা শুনবে না। শুনে ভয় পাবে না।

শার্টের বোতাম খুলে, ঝেড়েঝুড়ে গা থেকে ফেলতে লাগলাম পোকাগুলোকে।

একটা সরালে দশটা আসে। দশটা সরালে বিশটা।

কত সরাব?

তেলাপোকা আর তেলাপোকা। একসঙ্গে এত তেলাপোকা কমই দেখেছি।

থাবড়া মেরে, ম্যাগাজিন দিয়ে পিটিয়ে, ঝাড়া মেরে, নানাভাবে তেলাপোকা তাড়ানোর চেষ্টা করছে রবিন আর মুসা। চেঁচাচ্ছে। গাল দিচ্ছে পোকাগুলোকে।

'আহ, এত চেঁচাচ্ছ কেন? চিত্কার শুনে দাদা-দাদি দেখতে চলে আসবে।'

'এখানে গলা ফাটিয়ে চেঁচালেও কেউ শুনবে না! যা, মর, শয়তান তেলাপোকা! পাজি! বদমাশ!' থাবড়াতে লাগল মুসা।

সরে যেতে লাগল পোকাগুলো। গা চুলকাচ্ছে আমার। মুসা আর রবিনেরও চুলকাচ্ছে। মনে হলো, যেখান দিয়ে হেঁটেছে পোকাগুলো, সারাজীবন চুলকাবে ওসব জায়গা।

বিরক্ত হয়ে বারান্দায় বেরিয়ে মেঝেতে বসে পড়লাম। চুলকানি থামার অপেক্ষা করতে করতে বললাম, 'বহুত জ্বালান জ্বালাল।'

'হ্যাঁ,' ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলল রবিন। 'আমার কমিকটার অবস্থা দেখ?' বইটার এক কোণ ধরে ঝুলিয়ে রেখেছে ও। এটা দিয়ে তেলাপোকাকে বাড়ি মেরেছে। আবার এটাকে পকেটে ঢোকানো ঠিক হবে কি না বুঝতে চাইছে যেন।

এখানে চুলকাচ্ছি, ওখানে চুলকাচ্ছি, সারা গা চুলকাচ্ছি।

অবশেষে কমে এল চুলকানি। উঠে দাঁড়ালাম। প্রায় অন্ধকার বারান্দার দিকে তাকিয়ে বললাম, 'এর পরের ঘরটায় কী আছে?'

দশ

'আকর্ষণ করার মতো তো কোনো কিছুই দেখছি না,' হাত নেড়ে মুসা বলল। 'আর কোনো ঘরে আর ঢুকতে ইচ্ছে করছে না। কী করব?'

'ঘরে বসে বরং বই পড়া যাক,' রবিন বলল।

'ধুর!' হাত নেড়ে উড়িয়ে দিল মুসা। 'এখন বই পড়ে কে?' এক মুহূর্ত ভাবল ও। চোখ চকচক করে উঠল। 'তারচেয়ে এক কাজ করি চলো। লুকোচুরি খেলি।'

'লুকোচুরি?' রুক্ষকণ্ঠে বললাম। 'মাথা খারাপ হলো নাকি তোমার? এখন কি আমাদের দুই বছর বয়েস?'

'না, তা নয়, তবে এ বাড়িটা লুকোচুরি খেলার উপযুক্ত জায়গা। লোভ সামলাতে পারছি না।'

'মুসা, এসব ছেলেমানুষি...'

কিন্তু আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই রওনা হয়ে গেল ও। দৌড়ে চলে গেল বারান্দা ধরে, লুকানোর জন্য।

কী আর করব। গুনতে আরম্ভ করলাম, 'এক দুই' করে। বিশ পর্যন্ত গুনে একবার ডাক দিলাম ওর নাম ধরে। জবাব এল না। একশ পর্যন্ত গুনে আবার ডাকলাম। যখন সাড়া দিল না, বারান্দা ধরে রওনা হলাম আমি আর রবিন। বারান্দার শেষ মাথায় পৌঁছে পুরোনো একটা ঘোরানো সিঁড়িবারান্দা দেখতে পেলাম, যেখান থেকে তিনতলায় উঠে গেছে একটা কাঠের সিঁড়ি। নিচে দোতলার দিকেও সিঁড়ি নেমে গেছে। মুসা নিচে গেছে না ওপরে গেছে, বুঝতে পারলাম না। মনে হলো, ওপরেই গেছে।

ধুলোয় ভরা সিঁড়িটা বেয়ে উঠতে আরম্ভ করলাম। প্যাঁচিয়ে প্যাঁচিয়ে উঠে গেছে ধাপগুলো। আলো খুবই কম। ভালোমতো দেখতে পাচ্ছি না। তাই কোথায় গিয়ে শেষ হয়েছে সিঁড়িটা বুঝতে পারলাম না।

উঠতে শুরু করলাম। পায়ের চাপে ক্যাঁচকোঁচ করছে সিঁড়ি, গুঙিয়ে উঠছে। ধুলো-ময়লার পুরু আস্তর লেগে রয়েছে রেলিংয়ে।

জোরে শ্বাস টানছি। উঠে চলেছি ওপরে। আরও ওপরে। ধুলোয় ভরা বাতাস ঢুকছে গলায়। ভ্যাপসা, পুরোনো গন্ধ তাতে।

অবশেষে সিঁড়ির মাথায় উঠে এলাম। রবিন রয়েছে আমার পেছনে। তিনতলার বারান্দার দিকে তাকালাম। দোতলার বারান্দার মতোই এই বারান্দাটাও। একই রকম মোড়, বাঁক আর গলিঘুপচি।

একই রকম কালচে সবুজ দেয়াল। ছোট্ট একটিমাত্র জানালা দিয়ে ঢুকছে ম্লান আলো।

ধীরে ধীরে বারান্দা ধরে এগোলাম। সারি সারি দরজা। একটা দরজা দেখিয়ে রবিনকে ঢুকতে বলে আরেকটা দিয়ে আমি ঢুকলাম।

খালি। কিছুই নেই।

বেরিয়ে এলাম।

রবিনকে দেখলাম না। ও বোধহয় ঘরটা থেকে বেরোয়নি। তবে মুসাকে পায়নি, জানা কথা। দেখতে পেলে চিত্কার করে ডাকত।

অন্ধকার বারান্দা ধরে সাবধানে এগোলাম।

ভীষণ গরম এখানে। গাল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে। শার্টের হাতা দিয়ে মুছলাম।

এরপরের ঘরটা আগের দুটোর চেয়ে সামান্য ছোট। একদিকের দেয়াল ঘেঁষে রয়েছে একটা পিয়ানো।

পিয়ানোর পেছনে উঁকি দিয়ে দেখলাম মুসা লুকিয়ে রয়েছে কি না। নেই। বেরিয়ে এলাম ঘরটা থেকে।

এবারও রবিনকে দেখলাম না।

আরও খানিকদূর এগোলাম।

একটা বাঁক ঘুরলাম।

না দেখে পা ফেলতে গিয়ে পা পড়ল শূন্যে।

পায়ের নিচে মেঝে নেই।

নিজের অজান্তেই অন্ধকারে ছুঁড়ে দিয়েছি হাত দুটো। কোনো কিছু ধরে বাঁচার আশায়।

পুরোনো একটা রেলিংয়ে হাত ঠেকল।

আঁকড়ে ধরলাম। শক্ত করে।

দুই হাতে রেলিং ধরে ঝুলে পড়ে নিজেকে বাঁচালাম।

পা দুটো আবার তুলে আনলাম বারান্দার শক্ত মেঝেতে।

ধড়াস ধড়াস করছে হূিপণ্ড। শূন্য জায়গাটার দিকে তাকালাম। একটা কালো গর্ত। এক সময় ওখানে একটা সিঁড়ি ছিল। এখন নেই। পুরোনো হতে হতে ভেঙে পড়েছে।

জোরে নিঃশ্বাস ফেললাম। সমস্ত রাগ গিয়ে পড়ল মুসার ওপর। চেঁচিয়ে বললাম, 'মুসা, এই মুসা! কোথায় তুমি? এখুনি বেরোও। তোমার এই ছেলেমানুষি খেলা আমি আর খেলতে চাই না!'

ভাঙা সিঁড়িটার কাছ থেকে সরে এসে দ্রুত বারান্দা দিয়ে হাঁটতে লাগলাম। এখন আর রবিনকেও দেখছি না। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মুসাকে খুঁজে বের করে এই বিরক্তিকর খেলাটার ইতি টানতে চাই।

বারান্দার শেষ মাথায় এসে থেমে গেলাম।

তাকিয়ে আছি দরজাটার দিকে। তিনতলার বারান্দার শেষ মাথার দরজা।

পুরোনো আমলের একটা তালা লাগানো।

খুব আস্তে আস্তে এগিয়ে গেলাম দরজাটার দিকে। চাবির গর্তে লাগিয়ে রাখা হয়েছে একটা পুরোনো রুপালি চাবি। বয়েসের কারণে ওটার চকচকে ভাবটা নষ্ট হয়ে গেছে।

ওই ঘরটার ভেতরে কী আছে? কেন ওটাতে তালা দেওয়া? বিষয়টা বেশ রহস্যময় মনে হলো।

আরও কাছে গেলাম।

কেন আমাদের ওই ঘরে ঢুকতে নিষেধ করেছেন দাদা?

বলেছেন, ওটা স্টোর রুম। বাতিল মাল রাখার। মূল্যবান কিছু নয়। তাহলে ওটাতে ঢুকতে আপত্তি কেন?

ঘরটার দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগলাম।

কৌতূহল দমন করতে না পেরে হাত বাড়ালাম।

হাতের তালুতে চেপে ধরলাম মস্ত রুপালি চাবিটা।

এগারো

না! খোলা উচিত হবে না!

দাদার নিষেধ করার কথা মনে করে হাতটা সরিয়ে আনলাম।

কিন্তু মুসা কই? ওকে তো খুঁজে বের করতে হবে আমাকে। আমি লুকোচুরি খেলতে চাইনি, ও আমাকে বাধ্য করেছে। ওর এই খেলায় আমি মহা বিরক্ত। ক্লান্ত হয়ে গেছি।

হঠাত্ বুদ্ধিটা মাথায় এল।

আমিই বরং লুকিয়ে থাকি! মুসা যখন দেখবে, আমি ওকে খোঁজার চেষ্টা করছি না, সময় গেলে বিরক্ত হয়ে সে নিজেই বেরিয়ে এসে আমাকে খোঁজা শুরু করবে।

নিখুঁত প্ল্যান! ভাবলাম। তা-ই করব আমি। এখন ভাবতে হবে, কোথায় লুকাব?

পিয়ানোওয়ালা ঘরটায় ফিরে এলাম। ওটার পেছনে লুকানো যায় কি না ভাবতে লাগলাম।

পিয়ানোটা দেয়ালের কাছ থেকে ঠেলে সরিয়ে ফাঁক করার চেষ্টা করলাম। অল্প একটু ফাঁক করলেই চলবে, যাতে আমি পেছনে ঢুকে লুকাতে পারি। কিন্তু ভীষণ ভারী। এক ইঞ্চিও নড়াতে পারলাম না।

আবার ফিরে এলাম রুপার চাবিওয়ালা তালা দেওয়া ঘরটার কাছে।

অন্ধকার বারান্দায় ঘরটার আশপাশে খুঁজতে লাগলাম। তিনতলার আর কোনো দরজা, আর কোনো ঘর দেখা বাদ আছে কি না দেখছি।

আর ঠিক এই সময়ই চোখে পড়ল ওটা।

দেয়ালের গায়ে বসানো একটা ছোট্ট দরজা।

ডাম্বওয়েইটারের দরজা। এ জিনিস আমি আগেও দেখেছি পুরোনো কয়েকতলা উঁচু বাড়িতে। এগুলো এক ধরনের ছোট লিফট বা এলিভেটর, যেটা দিয়ে খাবার আর তৈজসপত্র ওঠানো-নামানো হয়।

ডাম্বওয়েইটার—লুকানোর অতি চমত্কার জায়গা! ওটার দিকে এগোলাম, এই সময় ঝনঝন করে শব্দ হলো। বাসন পড়ার মতো।

তালা দেওয়া দরজাটার অন্যপাশ থেকে।

এগিয়ে গিয়ে দরজার গায়ে কান পাতলাম। ভেতরে পায়ের শব্দ হচ্ছে। পায়চারি করছে কেউ।

তাহলে কি মুসাই ঢুকেছে ওর ভেতরে? হয়তো দাদা-দাদির কথা অমান্য করেছে। এমন একটা জায়গায় ঢুকে লুকিয়েছে, যেখানে আমি দেখতে যাব না—কারণ ও জানে, দাদা-দাদির কথা আমি অমান্য করব না। ওকে খুঁজে বের করতে না পারলে লুকোচুরি খেলায় হেরে যাব আমরা।

কিন্তু তাড়াহুড়া আর উত্তেজনায় একটা ভুল করেছে ও, সেটা হলো, তালার ফুটোয় চাবিটা ঢুকিয়ে রেখে গেছে। ভাবেনি, যদি আমি তাকে খুঁজে না পাই, কিছুতেই ভেতর থেকে তালা খুলে আর বেরোতে পারবে না। কিংবা হয়তো ভেবেচিন্তেই কাজটা করেছে। একটা সূত্র রেখে গেছে আমার জন্য, যাতে চাবিটা দেখে আমি বুঝি, ও ভেতরে আছে, আর আমি তখন নিজেই চাবি দিয়ে তালাটা খুলে ভেতরে ঢুকব। ওর আর বেরোতে অসুবিধে হবে না।

দরজাটার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলাম। মনে মনে বললাম, মুসা, তোমার চালাকি আমি ধরে ফেলেছি। আর বাঁচতে পারলে না, সরি!

চাবিটাকে আরেকবার চেপে ধরলাম। দাদা-দাদির নিষেধের কথা মনে পড়ল। কিন্তু এখন আর কিছু করার নেই আমার। মুসাকে বের করে আনতে হলেও এই দরজা আমাকে খুলতেই হবে। আর দ্বিধা না করে মোচড় দিলাম। কট করে পুরোনো স্প্রিং খোলার শব্দ হলো। নব চেপে ধরে টান দিয়ে খুলে ফেললাম দরজাটা।

আর তখনই দানবটার ওপর চোখ পড়ল আমার।

বারো

ঘরে ঢোকার জন্য সামনের দিকে ঝুঁকে রয়েছি। এক পা ভেতরে।

নড়তে পারলাম না। এই অবস্থায় পিছাতেও পারলাম না। চোখ সরাতে পারলাম না ভয়ংকর প্রাণীটার ওপর থেকে।

একটা দৈত্যাকার প্রাণী। দানব। কমপক্ষে দশ ফুট লম্বা।

ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে।

ওটার রোমশ, বিশাল দেহটার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছি। গরিলার মতো শরীর। গায়ের লোমে পাতা, শ্যাওলা আর মাটি লেগে রয়েছে। মাথাটা বিশাল। কুমিরের মুখের মতো। বড় বড় দাঁত বেরিয়ে রয়েছে লম্বা হাঁ করা দুই চোয়ালের ফাঁক দিয়ে। মস্ত মাথার দুই পাশে ফোলা চোখ।

সারা ঘরে ভয়ানক দুর্গন্ধ। মড়া পচা গন্ধের মতো। তার সঙ্গে জলাভূমির কাদা আর পচা উদ্ভিদের গন্ধ মেশানো।

দুর্গন্ধে পেটের ভেতর গুলিয়ে উঠল।

দানবটার হাতে মস্ত এক থালা ভরতি প্যানকেক। সেদিকেই নজর ওটার। তাই আমাকে দেখেনি এখনো।

এক হাতে থালাটা ধরে আরেক হাতে এক মুঠো প্যানকেক তুলে মুখে পুরল ওটা। ধারালো চোখা দাঁত নেড়ে অদ্ভুত ভঙ্গিতে চিবাতে লাগল।

তাকিয়েই আছি দানবটার দিকে। তখনো ডোরনব ধরে রেখেছি। আবার আরেক মুঠো প্যানকেক মুখে পুরল দানবটা। চিবিয়ে গিলে ফেলল। স্বাদে সন্তুষ্ট হয়ে ঘোঁত্ করে শব্দ করল।

খাওয়ার সময় ওর চোখ দুটো বড় বড় হয়ে যাচ্ছে। গলার কাছের মোটা শিরা দুটো দড়ির মতো ফুলে উঠে দপদপ করে লাফাচ্ছে।

সাহায্যের জন্য চিত্কার করতে চাইলাম। মুখও খুললাম। কিন্তু কোনো শব্দ বেরোল না।

এক হাতে মুখের ভেতর প্যানকেক পুরছে দানবটা। একেকবারে একের মুঠো করে। আরেক হাতে থালাটা ধরা।

খেতে খেতে হঠাত্ নিচু হয়ে রোমশ পা চুলকাল।

চুলকাতে চুলকাতে থেমে গেল আচমকা। সাগর কলার মতো মোটা মোটা আঙুল দিয়ে লোমের ভেতরে কী যেন খুঁজল। একটা কালো বড় গুবরে পোকা বের করে আনল।

দুই আঙুলে টিপে ধরে পোকাটাকে চোখের সামনে তুলে নিল দানবটা। চোখ দুটো আবার বড় হয়ে গেল।

পোকাটার পাগুলো নড়ছে, বাতাসে সাঁতার কাটছে যেন।

জ্বলন্ত চোখে পোকাটাকে দেখছে দানবটা। ওটার নড়তে থাকা পাগুলো দেখছে।

হঠাত্ পোকাটাকে হাঁ করা মুখের ভেতর ছুঁড়ে দিল দানবটা। কড়মড় করে চিবিয়ে গিলে ফেলল।

ঠোঁটের দুই কোণ বেয়ে নীল জামের রস গড়াচ্ছে দানবটার। তার সঙ্গে মিশে গেল পোকার রস।

পালাও! নিজেকে বললাম। জলদি পালাও এখান থেকে! কিন্তু এতটাই ভয় পেয়েছি, পা নড়ছে না আমার।

আরেক মুঠো প্যানকেকের জন্য হাত বাড়াল দানবটা।

জোর করে পা দুটোকে নড়ালাম। বারান্দার দিকে পিছিয়ে গেলাম এক পা।

নড়াচড়াটা বোধহয় লক্ষ করল দানবটা। ঝট করে মুখ তুলল।

জ্বলন্ত চোখে তাকিয়ে রইল আমার দিকে। তারপর ভারী কণ্ঠে ক্রুদ্ধ গর্জন করে উঠল।

হাত থেকে প্যানকেকগুলো ছেড়ে দিয়ে লাফানোর ভঙ্গিতে পা ফেলে আমার দিকে এগোল।

টান দিয়ে দরজার পাল্লাটা আবার লাগিয়ে দিয়ে দিলাম দৌড়। ছুটলাম বারান্দা ধরে।

'কিশোর! কী হয়েছে?' বারান্দার একটা মোড় থেকে বেরিয়ে এসে ডাকল আমাকে রবিন।

'একটা দানব! তালা দেওয়া ঘরটায়! জলদি ভাগো!' চিত্কার করে বললাম। 'দাদা-দাদিকে জানাতে হবে।'

ফিরে তাকালাম দানবটা অনুসরণ করছে কি না দেখার জন্য। রবিন যেখানে ছিল, সেখানেই আছে, নড়েনি।

'দাঁড়িয়ে আছ কেন?' চিত্কার করে বললাম। 'দানব! দানব রয়েছে ওই ঘরে! সরে যাও, রবিন, দৌড় দাও!'

ও দাঁত বের করে হাসল। 'তুমি ভাবছ আমি এতই বোকা—ভয় দেখাতে পারবে?'

হাসতে হাসতে দানবের ঘরটার দিকে এগোল ও।

'রবিন, পালাও!' মরিয়া হয়ে বললাম। 'আমি সত্যি বলছি!'

'আসলে তুমি আমাকে ভয় দেখাতে চাইছ,' রবিন বলল।

'সত্যি বলছি, রবিন! সত্যি! ভয় না!' গলা ফাটিয়ে চিত্কার করে উঠলাম। 'ওদিকে যেয়ো না! প্লিজ!'

কিন্তু কথা শুনল না রবিন। ততক্ষণে দরজার কাছে চলে গেছে। 'কই, কোথায় দানব?'

তেরো

এক সেকেন্ড পরেই রবিনের আতঙ্কিত চিত্কার শোনা গেল ঘরের ভেতর থেকে।

ওর চিত্কার ছাপিয়ে শোনা গেল দানবটার গর্জন।

এ সময় 'কী হয়েছে, কী হয়েছে?' বলে চিত্কার করতে করতে সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসতে লাগল মুসা। নিচতলায় লুকিয়েছিল ও, ওপরে নয়। বারান্দায় এসে দাঁড়াল।

'পালাও! পালাও!' ওদিকে ঘরের ভেতর থেকে ছিটকে বেরিয়ে এসে, হাত নেড়ে পাগলের মতো চিত্কার করতে লাগল রবিন। 'দানব! দানব! জলাভূমির দানব!' ভয়ে দরজাটা লাগাতে ভুলে গেছে।

কিছু বুঝতে না পেরে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল মুসা।

ভয়ংকর এক গর্জন ছড়িয়ে পড়ল বারান্দায়।

'কী-ক্কী হয়েছে?' তোতলাতে লাগল মুসা।

'একটা দানব আছে এ বাড়িতে!' জবাব দিলাম। 'জলদি পালাও!'

আর বলতে হলো না মুসাকে। ঘুরে দিল দৌড়। সিঁড়ির দিকে।

'রবিন, এসো!' বলে আমিও ছুটলাম।

আমাদের পায়ের চাপে মড়মড় করছে পুরোনো কাঠের সিঁড়িটা। মাথার ওপরে বারান্দায় দানবটার পায়ের ধুপধাপ শব্দ হচ্ছে। দরজা খোলা পেয়ে বেরিয়ে চলে এসেছে ওটা।

'আমাদের ধরতে আসছে,' ফিসফিস করে বলল রবিন।

জোরে গর্জন করে উঠল দানবটা। কাছে চলে আসছে।

দোতলায় নেমে রবিনকে বললাম, 'তোমরা ঘরে গিয়ে দরজা আটকে বসে থাকো। কোনো অবস্থাতেই দরজা খুলবে না। আমি দাদা-দাদিকে ডেকে আনি।'

মুসা আর রবিন ঘরে ঢুকে যেতেই আমি দৌড়ে চললাম রান্নাঘরে। চিত্কার করে বললাম, 'দাদি! দাদি! একটা দানব!'

কিন্তু রান্নাঘরে ঢুকে কাউকে দেখলাম না।

দৌড়ে বসার ঘরে ফিরে এলাম। 'কোথায় আপনারা? গেলেন কোথায়?'

বসার ঘরেও কেউ নেই।

লাইব্রেরিতে খুঁজলাম। সেখানেও নেই।

আবার দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগলাম দোতলায়। তাঁদের বেডরুমে খুঁজলাম। নেই।

দোতলার অন্যান্য ঘরেও দেখলাম। কোথাও খুঁজে পেলাম না তাঁদের।

গেলেন কোথায়? কোথায় যেতে পারেন? প্রশ্ন করলাম নিজেকে।

দরজা খুলে উঁকি দিল রবিন।

আমাদের মাথার ওপরে দানবটার হাঁটার ধুপধাপ শব্দ হচ্ছে।

'দাদা-দাদি কোথায়?' ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল রবিন। দানবটার শুনে ফেলার ভয়ে জোরে কথা বলতে ভয় পাচ্ছে।

'জানি না। কোথাও পেলাম না।'

'বাইরে দেখেছ?' ভয়ে চিঁ-চিঁ শব্দ বেরিয়ে এল রবিনের গলা দিয়ে।

আরে তাই তো! এটা তো ভাবিনি! নিজেকে বোঝালাম, আতঙ্কিত হয়ো না। মাথা গরম কোরো না। তাহলে সঠিকভাবে ভাবতে পারবে না। বাড়িতে যেহেতু নেই, ওঁরা নিশ্চয় বাইরে রয়েছেন। হয়তো বাড়ির পেছনে। ছাউনি বানাতে ব্যস্ত দাদা। দাদিও হয়তো তাঁকে সাহায্য করতে গেছেন।

ছুটে নেমে এলাম আবার সিঁড়ি দিয়ে। রান্নাঘরে ঢুকলাম। রবিন আর মুসাও এল এবার আমার সঙ্গে।

পেছনের দরজাটার কাছে এসে থেমে গেলাম। দরজায় লাগানো কাচের ভেতর দিয়ে তাকালাম। জলাভূমির দিকে। ছাউনির দিকে।

কেউ নেই ওখানে।

রবিন বলল। 'কোথায় গেলেন...?'

'শোনো!' ওকে থামিয়ে দিলাম। 'শুনতে পাচ্ছ?'

একটা গাড়ির শব্দ। ইঞ্জিনটা স্টার্ট নেয়ার চেষ্টা করছে।

'দাদার গাড়ি!' চেঁচিয়ে বললাম।

ইঞ্জিনের শব্দ লক্ষ করে ছুটলাম। বাড়ির সামনের দিকে হচ্ছে শব্দটা।

সামনের দরজায় লাগানো জানালা দিয়ে উঁকি দিলাম।

ওই যে তাঁরা!

'দাদা, দাদা!' বলে চিত্কার করে ডাকল রবিন।

পিছিয়ে এনে গাড়ি ঘোরাচ্ছেন দাদা। গাড়ির পেছনটা আমাদের দিকে।

চলে যাচ্ছেন তাঁরা।

প্রচণ্ড এক ধাক্কা খেলাম যেন।

'দাঁড়ান! দাঁড়ান!' চেঁচিয়ে বলল রবিন।

'তোমার কথা শুনতে পাবেন না!' আমি বললাম। 'দরজাটা খোলো!'

রবিনকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে আমি নিজেই দরজার হাতল ধরে জোরে টান দিলাম। দরজা খুলছে না। মুসাও এসে হাত লাগাল। আরও জোরে টানলাম। খুলল না।

'জলদি করো!' চিত্কার করে উঠল রবিন। 'আমাদের ফেলেই তো চলে যাচ্ছেন!'

হাতল ধরে টানতেই থাকলাম।

তারপর মাথায় ঢুকল ভয়ানক সত্যটা।

বাইরে থেকে দরজার হুড়কো লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। বললাম, 'খোলা যাবে না! বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে বন্ধ করে দিয়েছে!'

চৌদ্দ

'আশ্চর্য!' চেঁচিয়ে বলল মুসা। 'আমাদের ফেলে যাচ্ছেন কেন? তালা লাগিয়ে আমাদেরকে ভেতরে আটকে দিয়েছেন কেন?'

মাথার ওপর ধুড়ুম-ধাড়ুম শব্দ হচ্ছে। ছাত আর দেয়াল কাঁপছে। দেয়াল থেকে ছবিগুলো খুলে পড়তে শুরু করল।

'ঘটনাটা কী?' ছাতের দিকে তাকাল মুসা।

'দানবটা! আমাদের ধরতে আসছে!' বললাম। 'এখান থেকে বেরিয়ে যেতে হবে আমাদের।'

আবার রান্নাঘরে ফিরে এলাম। দৌড় দিলাম দরজার দিকে।

দরজার নব ধরে মোচড় দিতে লাগলাম। ঘুরল ওটা, তবে কোনো লাভ হলো না। বাইরে থেকে হুড়কো লাগিয়ে আটকে দিয়েছে আমাদের। জোরে টানাটানি করেও দরজা খুলতে পারলাম না।

নিচতলার সমস্ত ঘরে ছুটে বেড়াতে লাগলাম।

যেখানেই বাইরে বেরোনোর দরজা দেখলাম, খোলার চেষ্টা করলাম। সবগুলোর একই অবস্থা। বাইরে থেকে হুড়কো লাগানো।

মাথার ওপরে ভয়ংকরভাবে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে দানবটা।

দাদা-দাদি আমাদের এভাবে আটকে দিয়ে গেলেন কেন? প্রশ্নটা সারাক্ষণ খুঁচিয়ে যাচ্ছে আমার মগজে। কোনো জবাব পেলাম না। রহস্যটার কোনো মানে বের করতে পারলাম না।

হঠাত্ মনে পড়ল লাইব্রেরি ঘরটার কথা। দৌড়ে এসে ঢুকলাম। জানালার কাছে ছুটলাম।

নিচতলার একমাত্র জানালা।

আমাদের বেরোনোর একমাত্র পথ।

কাচ লাগানো পাল্লাটা খোলার চেষ্টা করতে লাগলাম।

পারলাম না।

আমার জায়গায় এসে দাঁড়াল মুসা। অনেক চেষ্টা করেও জানালাটা খুলতে না পেরে ক্ষিপ্ত হয়ে জোরে জোরে কিল মারতে লাগল কাঠের পাল্লার গায়ে।

'লাভ হবে না, মুসা!' আঙুল তুলে দেখালাম, দুটো মরচে পড়া বড় বড় পেরেকের চোখা অংশ বেরিয়ে রয়েছে জানালার শার্শির দুই পাশ দিয়ে। 'বাইরে থেকে পেরেক লাগিয়ে আটকে দিয়েছে!'

'পেরেক!' ককিয়ে উঠল ও। 'আমাদের আটকে রেখে গেলেন কেন তাঁরা? কেন গেলেন?'

'কাচ ভাঙতে হবে,' বললাম। 'এ ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।'

'এতক্ষণ বলনি কেন?' চেঁচিয়ে উঠল মুসা। সামনে ঝুঁকে কিল মারতে শুরু করল জানালার কাচে।

'পাগল হয়ে গেলে নাকি?' চিত্কার করে বললাম। 'হাত কাটবে তো। কোনো কিছু দিয়ে বাড়ি মেরে...'

কিন্তু কথা শেষ করতে পারলাম না, বিকট শব্দ হলো ওপরে। এর পরপরই ঝনঝন করে অনেকগুলো ছোট জিনিসও ছড়িয়ে পড়ার শব্দ হলো। আন্দাজ করলাম, পিয়ানোর চাবিগুলো খুলে পড়ছে।

'কী-ক্কী করছে ওটা?' আবার তুতলে বলল মুসা।

'ওপরে একটা ঘরে একটা পিয়ানো আছে। মনে হয় ওটাকেই আছাড় মেরে ভাঙছে।'

তিনতলার ঘরে যখন পিয়ানোটাকে বার বার আছাড় মারছে দানবটা, মনে হচ্ছে যেন ভূমিকম্প হচ্ছে। মেঝে, দেয়াল, লাইব্রেরির ছাত, সব কাঁপছে।

টেবিলে রাখা তামার ভারী একটা মোমদানির ওপর চোখ পড়ল আমার। মুসাকে দেখিয়ে বললাম, 'দাও তো ওটা আমার হাতে!' হাতে নিয়ে বললাম, 'আমার কাছ থেকে সরে থাকো।'

উঠে আবার জানালাটার কাছে এসে দাঁড়ালাম। তারপর হাত ঘুরিয়ে মোমদানিটা দিয়ে বাড়ি মারতে গেলাম জানালার কাচে। আর ঠিক এই সময় কানে এল আবার গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দ।

দুই সঙ্গীর দিকে তাকালাম। 'শুনলে?'

হাঁ হয়ে গেছে মুসা। নিচের চোয়াল ঝুলে পড়েছে।

ফিসফিস করে রবিন বলল, 'ইঞ্জিনের শব্দ!'

'হ্যাঁ!'

'দাদা-দাদি ফিরে এসেছে নিশ্চয়!' রবিন বলল। 'লোকজন নিয়ে এসেছে!'

মোমাদানিটা নামিয়ে রেখে ছুটলাম।

'আমি জানতাম, ওঁরা ফিরে আসবেন! জানতাম, এভাবে আমাদের ফেলে যেতে পারেন না!' চেঁচিয়ে বলতে লাগল রবিন।

ভারী গর্জন তুলে সরে যেতে শুরু করল ইঞ্জিনের শব্দ।

খোয়া বিছানো ড্রাইভওয়েতে চাকা ঘষা খাওয়ার খড়খড় শব্দ হচ্ছে।

'না! যাবেন না!' চেঁচিয়ে উঠে সামনের দরজার দিকে দৌড় দিল মুসা। 'যাবেন না! প্লিজ!'

দরজায় জোরে জোরে কিল মারতে লাগল মুসা। লাথি মারল।

আমিও এসে ওর পাশে দাঁড়ালাম। মেঝেতে চোখ পড়ল আমার। দুটো গোলাপি কাগজ দেখতে পেলাম। দরজার নিচ দিয়ে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।

মেসেজ! কাঁপা হাতে কাগজ দুটো তুলে নিলাম। পড়তে শুরু করলাম : আগামী সপ্তার আগে আমরা ফিরব না। সরি। আমরা যতটা ভেবেছিলাম, কাজটা সারতে তারচেয়ে দেরি হবে।

ফোনে মেসেজটা পাঠিয়েছেন রবিনের বাবা।

দাদা-দাদি ফেরেননি, বুঝতে পারলাম। জেনারেল স্টোরের মালিক মিস্টার কারসন গাড়ি নিয়ে এসেছিলেন, মেসেজটা পৌঁছে দেওয়ার জন্য।

দানবটার গর্জন আমার চিন্তায় বাধা সৃষ্টি করল।

পাক খেয়ে ঘুরে দাঁড়ালাম।

রবিন নেই।

'রবিন!' চিত্কার করে উঠলাম। 'কোথায় গেলে?'

জোরালো হলো দানবটার চিত্কার। ভয়ংকরতা বাড়ল।

'রবিন!' আবার ডাকলাম। 'এই রবিন!'

'কিশোর, জলদি এসো!' রান্নাঘর থেকে শোনা গেল রবিনের চিত্কার।

পনের

'কিশোর! মুসা! জলদি এসো!' উত্তেজিত কণ্ঠে বারবার ডাকতে লাগল রবিন।

বসার ঘরের ভেতর দিয়ে ছুটলাম আমি আর মুসা। চেঁচিয়ে জবাব দিলাম, 'আসছি, রবিন, আসছি!'

সোফা ঘুরে যাবার সময় একটা টুলে হোঁচট খেলাম। উপুড় হয়ে পড়ে গেলাম শক্ত মেঝেতে। কপাল ঠুকে গেল।

চিত্কার করে আমার নাম ধরে ডেকেই চলেছে রবিন। কিন্তু এখন ওর কণ্ঠস্বরটা দূর থেকে আসছে মনে হলো। সরে গেল আরও দূরে।

ব্যথায় দপদপ করছে আমার কপাল।

আমাকে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করল মুসা। মাথা ঘুরছে আমার।

'কিশোর! কিশোর!' মরিয়া শোনাল রবিনের কণ্ঠ।

'আমি আসছি!' ঘোরের মধ্যে জবাব দিলাম যেন।

কানে এল দানবটার হুংকার। সারা বাড়িতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।

রবিনের কাছে পৌঁছতে হবে আমাকে। মহা বিপদে রয়েছে নিশ্চয়। দানবটা ওকে ধরেছে কি না বুঝতে পারছি না।

বসার ঘরের ভেতর দিয়ে টলমল পায়ে ছুটলাম রান্নাঘরের দিকে।

দানবটার গর্জন দেয়াল কাঁপিয়ে দিল।

'রবিন, আমরা আসছি!' চিত্কার করতে চাইলাম, কিন্তু শুধু গোঙানি বেরোল। কপালে বাড়িটা বেশ জোরেই খেয়েছি।

হুড়মুড় করে ঢুকলাম রান্নাঘরে।

'কিশোর!' রিফ্রিজারেটরের পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে রবিন।

একা।

'ওটা কই?' ঘরের ভেতর ঘুরে বেড়াচ্ছে আমার চঞ্চল দৃষ্টি। দানবটাকে খুঁজছে।

'কোনটা কই?'

'দানবটা!' চেঁচিয়ে বললাম।

'ওপরতলায়!' অবাক ভঙ্গিতে জবাব দিল রবিন। 'এখানে আসতে এত দেরি লাগল কেন তোমাদের?' জবাবের অপেক্ষা করল না রবিন। 'এটা দেখে।' রিফ্রিজারেটরের দিকে দেখাল ও। চুম্বকের সাহায্যে ফ্রিজের গায়ে লাগিয়ে রাখা হয়েছে দুটো চিঠি।

'ওগুলো দেখানোর জন্য এভাবে পাগলের মতো চেঁচাচ্ছিলে?' মেজাজ খারাপ হয়ে গেল আমার। ওকে দানবে ধরেছে ভেবে মরিয়া হয়ে ছুটে আসতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে পড়েছি। 'আর তোমাকে দানবে ধরেছে ভেবে মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছিল আমার!'

কাঁপা হাতে ফ্রিজের গা থেকে চিঠি দুটো খুলে আনল রবিন। 'চিঠি দুটো আমাদের নামে। দাদা-দাদির লেখা।'

রবিনের হাতের চিঠি দুটোর দিকে তাকিয়ে রইলাম। দেখার জন্য ঝুঁকে এল মুসা।

আমাদের উদ্দেশ্য করে চিঠি দুটো লিখে রেখে গেছেন। এক ও দুই নম্বর দেওয়া আছে।

'আমাদের জন্য চিঠি রেখে গেছেন?' বিশ্বাস হতে চাইছে না আমার।

প্রথম চিঠিটার খাম ছিঁড়ল রবিন। ওর হাতের সঙ্গে চিঠিটাও কাঁপছে।

কাগজটার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে কিছু বলল। বুঝতে পারলাম না।

'দেখি!' হাত বাড়ালাম। কিন্তু সরিয়ে নিল রবিন। কাগজটা শক্ত করে ধরে রেখে পড়তে থাকল।

'রবিন, কী লিখেছে ওতে?' জিজ্ঞেস করলাম।

আমার কথা যেন শুনতেই পেল না ও। বিড়বিড় করেই চলেছে।

ওর দিকে তাকিয়ে রয়েছি।

পৃষ্ঠার ওপর থেকে নিচের দিকে নামছে ওর দৃষ্টি।

তারপর বড় বড় হয়ে গেল চোখ। আতঙ্ক ফুটল তাতে।

'রবিন!' অধৈর্য ভঙ্গিতে চেঁচিয়ে উঠলাম। 'কী লিখেছে?'

আবার পড়তে আরম্ভ করল রবিন। আমাকে শুনিয়ে। জোরে জোরে। 'প্রিয় কিশোর, মুসা ও রবিন,' বলেই থেমে গেল ও। কাগজটা ওর হাতের মধ্যে কাঁপতে শুরু করেছে।

'তোমাদের এভাবে ফেলে যেতে সত্যিই খুব খারাপ লাগছে আমাদের,' আবার পড়ল রবিন, 'কিন্তু আমাদের যেতেই হবে। কয়েক সপ্তাহ আগে জলাভূমি থেকে একটা দানব এসে জোর করে ঢুকে পড়েছে আমাদের বাড়িতে। ভুলিয়েভালিয়ে ওটাকে আমরা তিনতলার একটা ঘরে নিয়ে গিয়ে আটকে রেখেছি। আমরা বুঝতে পারছিলাম না ওটাকে নিয়ে কী করব। আমাদের গাড়ি নষ্ট হয়ে গিয়েছিল, তাই ফোন করতে যেতে পারিনি, সাহায্য আনতে যেতে পারিনি।

'গত কয়েকটা সপ্তাহ ভয়ানক আতঙ্কের মধ্যে কাটিয়েছি আমরা। দানবটাকে বাইরে ছেড়ে রাখতেও সাহস হচ্ছিল না, ওটা এতই বড়, আর সারাক্ষণ রেগে থাকে। আমরা জানতাম, ওটা আমাদের মেরে ফেলবে।'

রবিন পড়ছে। ভুরু কুঁচকে শুনছি আমি।

'রবিন, আমরা তোমার বাবা-মাকে দানবটার কথা বলতে চাইনি, জানতাম, তাহলে ওরা আর তোমাদের আনবে না। আমাদের এখানে কেউই আসে না। তা ছাড়া তোমাকে দেখার জন্য অস্থির হয়ে গিয়েছিলাম আমরা। বুঝতে পারছি, তোমার বাবা-মাকে দানবটার কথা না বলে কাজটা ঠিক করিনি। এখানে আসার পরেও ওদের বলা উচিত ছিল, তাহলে তোমাদের আটলান্টায় নিয়ে যেতে পারত। মায়া করে তোমাদের এখানে রেখে দিয়ে ভীষণ ভুল করেছি।'

'মায়া করে!' বিড়বিড় করল মুসা। 'সেটা তো বুঝলাম। কিন্তু আমাদের ফেলে গেলেন কেন?'

মুখ তুলে আমার দিকে তাকাল মুসা। কালো মুখটা আরও কালো হয়ে গেছে ওর। খাটো করে ছাঁটা তারের জালের মতো খুলি কামড়ে থাকা চুলওয়ালা মাথাটা নাড়ল ও। আমার আর রবিনের মতোই বিস্মিত হয়েছে।

আবার চিঠির দিকে চোখ নামাল রবিন। পড়তে আরম্ভ করল চিঠিটা। 'দানবটাকে খাবার দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে গেছি আমরা। না দিয়েও পারি না। ক্ষুধার্ত থাকলে দরজা ভেঙে বেরিয়ে চলে আসতে পারে এই ভয়ে। তাই একটানা খাইয়ে গেছি আমরা। দরজার নিচে ছোট একটা ফোকর কেটে নিয়েছে তোমাদের দাদা, সেটা দিয়ে ভেতরে খাবার ঢুকিয়ে দিত।

তোমাদের এভাবে ফেলে রেখে যাওয়াটা অনুচিত হচ্ছে। কিন্তু সাহায্য আনতে আমাদের যেতেই হচ্ছে। কাউকে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফিরে আসব, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। এমন কাউকে আনব, যে বুঝতে পারবে ভয়ংকর এই দানবটাকে নিয়ে কী করা যায়।

তোমাদের এভাবে ফেলে আসায় আমরা দুঃখিত, সত্যিই দুঃখিত। আরেকটা কথা, তোমাদেরকে বাইরে থেকে তালা আটকে দিয়ে আসতে হলো, সেটাও বাধ্য হয়ে, যাতে তোমরা বাইরে বেরিয়ে জলাভূমিতে ঘোরাঘুরি করতে না পার। এখানে বাইরের চেয়ে ঘরে নিরাপদ—এমনকি একটা দানবের সঙ্গে থাকাটাও—তাই যাতে বেরোতে না পার তাই দরজা আটকে দিলাম।'

দাদা-দাদির কথাগুলো কেমন অবাস্তব লাগছে আমার।

'বাইরেটা নিরাপদ নয়!' মুসা বলল। 'একটা খুনে দানবের সঙ্গে ঘরে আটকে রেখে গেছেন আমাদের, আর বলছেন, বাইরের চেয়ে ঘরে নিরাপদ! কিশোর, আমার মনে হয় দানবের ভয়ে দুজনেই ওঁরা পাগল হয়ে গেছেন! বদ্ধ উন্মাদ হয়ে গেছেন!'

পড়তে লাগল আবার রবিন, 'সত্যিই দুঃখিত আমরা, বিশ্বাস করো! একটা কথা মনে রেখো : তোমরা পুরোপুরি নিরাপদ, যতক্ষণ না...'

এ সময় ভয়ংকর গর্জন শোনা গেল ওপরতলায়। ভয়ে চমকে গিয়ে হাত থেকে চিঠিটা ছেড়ে দিল রবিন।

বোকা হয়ে তাকিয়ে দেখলাম, চিঠিটা বাতাসে উড়ছে। দানবের হুঙ্কারে আমিও কেমন বিমূঢ় হয়ে গেছি। মগজটাও যেন কাজ করছে না ঠিকমতো। মুসাও কান পেতে শুনছে।

বাতাসে উড়ে গিয়ে মেঝেতে পড়ল চিঠিটা।

চলে গেল ফ্রিজের তলায়।

'জলদি বের করো!' চেঁচিয়ে বললাম। 'আমার ধারণা, ওই চিঠিতেই রয়েছে দানবের হাত থেকে মুক্তির সমাধান! জলদি!'

মেঝেতে উপুড় হয়ে শুয়ে ফ্রিজের নিচ থেকে কাগজটা বের করতে চাইল মুসা। কাগজের বেরিয়ে থাকা একটা কোণা আঙুল দিয়ে টিপে ধরতে গিয়ে আঙুলের ঠেলা লেগে আরও ভেতরে ঢুকে গেল কাগজটা।

'আরে ধুর, কী করছ! সাবধানে ধরো না!' চেঁচিয়ে উঠলাম। 'না পারলে সরো, আমি দেখি!'

কিন্তু আমার কথা শুনল না মুসা।

নিজেই বের করার চেষ্টা করল।

ভেতরে হাত ঢুকিয়ে দিল। ফাঁক এত কম, উপুড় করে রাখতে হচ্ছে হাতের তালু। দুই আঙুলে টিপে ধরা কঠিন। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দানবের ভয় আর তাড়াহুড়া। তাই ধরতেও পারছে না, ঠেলা লেগে লেগে আরও বেশি গভীরে চলে যাচ্ছে কাগজটা।

একটা সময় আর দেখতেই পেল না।

'ওটাতে কী লেখা আছে?' রবিনের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম। 'মুখেই বলো। তুমি তো চিঠিটা পড়েছ...কী লেখা?'

'পুরোটা পড়িনি,' ঢোক গিলল রবিন।

পাক খেয়ে ঘুরে গেলাম। মরিয়া হয়ে লাঠিটাঠি জাতীয় কিছু একটা জিনিস খুঁজছে আমার চোখ, যেটার সাহায্যে ফ্রিজের নিচ থেকে কাগজটা বের করে আনা যায়।

কিন্তু কিছুই দেখতে পেলাম না। কিছুই নেই যেটা ফ্রিজের নিচে ঢোকাতে পারি।

আমার উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে রান্নাঘরের কেবিনেটের ড্রয়ারগুলো খুলে দেখতে শুরু করল মুসা।

আমাদের মাথার ওপরে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে দানবটা।

ছাতটা কাঁপছে, যেন ভূমিকম্প হচ্ছে।

কাঁপতে কাঁপতে টেবিল থেকে একটা কাচের বাসন ধূসর ঠান্ডা টাইলের মেঝেতে পড়ে ভাঙল। ঝনঝন করে শত টুকরো হয়ে গেল।

ছাতের দিকে তাকালাম। দানবটার দাপানিতে ছাতের রংয়ে চির ধরছে, আস্তর ভেঙে যাচ্ছে। 'দোতলায় নেমে এসেছে ওটা! কাছে চলে আসছে!'

'আমরা গেছি!' গুঙিয়ে উঠল মুসা। 'শেষ! আমাদের এসে ধরবে, তারপর...'

ষোল

'মুসা! ফ্রিজটা সরাতে হবে। ওই চিঠিটা আমাদের দরকার। নিশ্চয় প্রয়োজনীয় তথ্য লেখা আছে ওটাতে। সবটা পড়লে জানতে পারব।'

দুজনে মিলে ঠেলা দিয়ে রিফ্রিজারেটরটা সরানোর চেষ্টা করলাম। পুরোনো আমলের জিনিস। পাথরের মতো ভারী। নড়তে চায় না। গায়ের জোরে ঠেলতে লাগলাম। আমরা পারছি না দেখে রবিনও এসে হাত লাগাল।

ওপরতলায় দানবটার তর্জন-গর্জন বাড়ছে। প্রচণ্ড রাগে ক্রমাগত হুংকার ছাড়ছে।

আরও জোরে ঠেলা দিলাম আমরা।

অবশেষে নড়তে আরম্ভ করল রিফ্রিজারেটর।

খানিকটা সরানোর পর নিচু হয়ে ঝুঁকে তলায় উঁকি দিল রবিন। 'আরেকটু সরাতে হবে। কাগজটার কোণা দেখতে পাচ্ছি।'

দুজনে মিলে জোরে আরেকটা ঠেলা দিলাম।

কাগজটা ভালমতো দেখতে পেল এবার রবিন। দুই আঙুলে টিপে ধরল কাগজের কোণা। সাবধানে টেনে বের করে নিয়ে এল।

ঝাড়া দিয়ে ধুলো-ময়লা পরিষ্কার করে নিতে লাগল।

'পরে সাফ কোরো!' চেঁচিয়ে বললাম। 'পড়ো আগে! পড়ো!'

আবার পড়তে শুরু করল রবিন, 'তোমরা পুরোপুরি নিরাপদ, যতক্ষণ না...'

দম বন্ধ করে বাক্যটা শেষ হওয়ার অপেক্ষা করতে লাগলাম। পড়া শেষ হলেই জানতে পারব, কীভাবে নিজেদের নিরাপদে রাখতে পারব আমরা।

'...যতক্ষণ না,' রবিন পড়ছে, 'তিনতলার ওই ঘরের তালা খুলে দানবটাকে বের না করো।'

'সর্বনাশ!' নিচের চোয়াল ঝুলে পড়ল আমার। 'দেরি করে ফেলেছি! অনেক দেরি! আর কিছু লিখেছেন তাঁরা? নিশ্চয় লিখেছেন, দেখো তো!'

'হ্যাঁ, আছে,' রবিন পড়ল, 'সাবধান, ওই ঘরটা থেকে দূরে থাকবে! কিছুতেই ওই ঘরের দরজা খুলবে না!'

বাধা দিয়ে বললাম, 'তারমানে আমরা যে দানবটাকে ছেড়ে দিয়েছি, দাদা-দাদি জানেন না। সেজন্যই আমাদের রেখে যাওয়ার ঝুঁকি নিয়েছেন। আমার ধারণা, রাস্তায় বিপদ অনেক বেশি, আমাদের না নেয়ার সেটাও আরেকটা কারণ।'

'কিন্তু বিপদটা কী?' রবিনের প্রশ্ন।

'নিশ্চয় লিখে রেখে গেছেন—পড়ো, পড়লেই বোঝা যাবে।'

'দেরি করে ফেলেছি!' ককিয়ে উঠে বললাম আবার। 'অনেক দেরি! আর কিছু লেখেননি?'

'যদি কোনোভাবে দানবটা বেরিয়ে যায়, ওটাকে মেরে ফেলা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না তোমাদের। যেভাবেই হোক মারতে হবে।' চিঠি থেকে মুখ তুলে রবিন বলল, 'এই-ই, আর কিছু নেই। এখন আমরা ওটাকে বের করে এনেছি, ওটাকে মারার বুদ্ধিও আমাদেরই বের করতে হবে।'

'জলদি!' রবিনকে বললাম। 'দ্বিতীয় চিঠিটা খোলো! আরও কোনো তথ্য আছে ওটাতে। নিশ্চয়ই আছে!'

দ্বিতীয় খামটা ছিঁড়তে আরম্ভ করেছে রবিন, এ সময় ভারী পায়ের শব্দ শুনতে পেলাম।

নিচতলায় পদশব্দ।

পাশের ঘরে। বসার ঘর ওটা।

'জলদি, রবিন! চিঠিটা খোলো!'

তাড়াহুড়া করে ছিঁড়তে গিয়ে আরও দেরি করে ফেলছে রবিন। থেমে গেল, যখন কানে এল দানবটার নিঃশ্বাসের শব্দ।

ভারী, খসখসে নিঃশ্বাস।

এগিয়ে আসছে।

আমার বুকের ভেতর হূিপণ্ডটা ধড়াস ধড়াস করে লাফাচ্ছে।

'ও-ওটা...আ-আমাদের ধরতে আসছে!' চিঠির খামটা প্যান্টের পকেটে ভরে রাখতে রাখতে বলল রবিন।

'ডাইনিং রুমে চলো!' চিত্কার করে বললাম। 'সোজা ডাইনিং রুমে!'

'কী করব আমরা? ওটাকে মারব কীভাবে ?' চেঁচিয়ে উঠল মুসা।

ছুটে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলাম আমরা।

'আগে...আউ!' ডাইনিং রুমের টেবিলের কোণায় বাড়ি খেয়ে চিত্কার করে উঠলাম। তীক্ষ ব্যথা পা বেয়ে উঠে এল ওপরে।

হাঁটু চেপে ধরলাম। প্রচণ্ড ব্যথা।

'এসো কিশোর!' আমার হাত ধরে টানল মুসা। 'বেরিয়ে যেতে হবে এখান থেকে।'

আমিও জানি বেরিয়ে যেতে হবে। দানবটা নিচে নেমে এসেছে। ওপরতলায় যেতে হবে আমাদের।

ডাইনিং রুম থেকে বেরিয়ে সোজা সিঁড়ির দিকে ছুটলাম আমরা।

দানবটার ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ কানে আসতেই ঘুরে তাকালাম। দেখতে পেলাম ওটাকে।

আবার ওপরে উঠে এসেছে ওটা। সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়িয়ে ক্ষুধার্ত ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে। মুখ থেকে লালা গড়াচ্ছে।

সিঁড়ির মাথা থেকে ধীরে ধীরে সরে যেতে লাগলাম আমরা।

দানবটার চোখের দৃষ্টি অনুসরণ করছে আমাদের।

'ওটাকে মেরে ফেলতে হবে,' ফিসফিস করে রবিন বলল। 'চিঠিতে তা-ই লেখা আছে। ওটাকে মেরে ফেলতে হবে। কিন্তু কীভাবে?'

'আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এসেছে!' বলে উঠলাম। 'এসো আমার সঙ্গে!'

দানবটা দোতলার বারান্দায় উঠে পড়েছে।

রাগে জ্বলছে চোখ।

হঠাত্ বিকট গর্জন করে উঠল। ভয়ংকর গর্জন। সাদা ফেনা মেশানো গাঢ় লালা গড়িয়ে পরল ওটার কুমিরের মতো চোয়াল বেয়ে।

সাপের জিভের মতো জিভ দিয়ে সেই লালা চেটে সরাল।

হাতের কাছে একটা টুল পেয়ে দানবটাকে সই করে ছুঁড়ে মারল মুসা।

খপ করে সেটা ধরে ফেলল দানবটা। হাঁটু উঁচু করে তাতে বাড়ি মেরে টুলটা ভেঙে দুই টুকরো করল।

এক এক করে সেগুলো ছুঁড়ল আমাদের দিকে। আরও রেগে গেল।

টুলের ভাঙা টুকরোগুলো দেয়ালে বাড়ি খেতেই চেঁচিয়ে উঠল রবিন, 'জলদি ভাগো!'

সামনের সিঁড়ি বেয়ে দৌড়ে উঠতে শুরু করলাম। উঠে এলাম তেতলায়।

দুপদাপ করে আমাদের অনুসরণ করল দানবটা। ওটার ভারী পায়ের চাপে সিঁড়ি কাঁপছে। কাঁপছে পুরো বাড়িটাই।

'আসছে ওটা!' ককিয়ে উঠল মুসা। 'তুমি বললে তোমার মাথায় একটা বুদ্ধি এসেছে। কী বুদ্ধি?'

'ওপরে একটা ভাঙা সিঁড়ি আছে।' ঘোরানো-পেঁচানো অন্ধকার বারান্দা ধরে ছুটতে ছুটতে বললাম। 'ধাপগুলো সব খসে পড়েছে। কালো একটা কুয়ার মতো গর্ত হয়ে আছে ওখানে। সামনের বাঁকটা ঘুরলেই সিঁড়িটা দেখা যাবে। রেলিং ধরে ঝুলে থাকব আমি। বাঁক ঘুরে দৌড়ে আসবে দানবটা। সামলানোর সুযোগ পাবে না। পড়বে ওই গর্তের মধ্যে।'

'আমরা কী করব?'

'তোমরা যেকোনো একটা ঘরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দেবে।'

'যদি কাজ না হয়?' মুসার প্রশ্ন। প্রচণ্ড ভয় পেয়েছে ও। ভয় আমরা কেউই কম পাইনি। 'পড়ে গিয়ে যদি না মরে? শুধু জখম হয়? আরও বেশি রেগে যাবে তাহলে।'

'এত প্রশ্ন কোরো না!' অধৈর্য হয়ে হাত নাড়লাম। 'দেখাই যাক না কী হয়। না মরলে কিছু করার নেই। চেষ্টা করে দেখতে হবে।' একটা দরজা দেখিয়ে বললাম, যাও, এই ঘরটায় ঢুকে পড়ো।'

মুসা আর রবিন ঘরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিতেই ভয়ংকর হুংকার কানে তালা লাগিয়ে দিল যেন আমার। ফিরে দেখি, তিনতলায় উঠে এসেছে দানবটা। আমার দিকে জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। মুসা আর রবিনকে ঘরে ঢুকতে দেখেছে কি না বুঝতে পারলাম না।

ভাবনার সময় নেই। আবার দৌড়াতে শুরু করলাম।

গর্জন করে উঠল দানবটা। রাগে হুঙ্কারের পর হুংকার ছাড়তে লাগল।

রেলিংটার কাছাকাছি এসে গতি কমিয়ে দিলাম। দানবটা গতি কমাল না। আমার মাত্র কয়েক পা পেছনে রয়েছে।

জোরে জোরে বাড়ি মারছে আমার হূিপণ্ড। বুকে এত চাপ, মনে হচ্ছে ফেটে যাবে।

দুই হাত ওপরে তুললাম। তারপর ঝাঁপ দিলাম সামনে। হাত ফসকাল না। রেলিং ধরে ঝুলে পড়লাম।

প্রচণ্ড জোরে রেলিংয়ে পাশের দেয়ালে বাড়ি খেল আমার দেহ। ঝুলে রইলাম কালো, শূন্য গর্তটার ওপর।

দানবটা বাঁকের কাছে চলে এসেছে।

আমার বুদ্ধি কি কাজ করবে?

নিচে পড়ে মরবে ওটা?

সতের

প্রচণ্ড গতিতে ফাঁকা জায়গাটায় চলে এল দানবটা।

গর্তের কিনারে এল।

আমার দিকে নজর। দুই চোখ জ্বলছে। রাগে লাল।

চোয়াল ফাঁক করে ভয়ংকর এক হুংকার ছাড়ল। পা বাড়াল সামনে। শূন্য জায়গায় পা পড়ল। শেষ মুহূর্তে যখন ভুলটা বুঝল, তাল সামলাতে পারল না। পড়ে গেল গর্তের মধ্যে।

নিচের মেঝেতে আছড়ে পড়ার বিকট শব্দ শোনা গেল।

পুরোনো রেলিং ধরে ঝুলে রয়েছি। আমার ভারে মড়মড় করছে পুরোনো রেলিং।

হাত ব্যথা হয়ে গেছে আমার। আঙুলগুলো অবশ। বুঝতে পারছি বেশিক্ষণ এভাবে ঝুলে থাকতে পারব না।

কান পাতলাম।

নীরবতা।

দানবটা নড়ছে না।

নিচে তাকালাম। এতই অন্ধকার, কিছু দেখা গেল না।

আমার আঙুল ঘামে ভিজে পিছলে যাচ্ছে। দুই হাতে দোল দিয়ে বারান্দার কিনারাটা পায়ের সাহায্যে খুঁজে বের করলাম। জুতোর তলা বারান্দার কিনারে ঠেকতেই, হাতের সাহায্যে রেলিংয়ে ইঞ্চি ইঞ্চি করে সরে, নিরাপদে বারান্দায় উঠলাম।

কালো গর্তটার দিকে ঝুঁকে তাকালাম আরেকবার। কিন্তু অন্ধকারে কিছু চোখে পড়ল না। যেমন অন্ধকার, তেমনি নীরব। একেবারেই চুপচাপ।

'পেরেছি! পেরেছি!' আচমকা চেঁচিয়ে উঠলাম। 'আমরা এখন নিরাপদ। দানবটাকে মেরে ফেলেছি আমরা!'

মুসা আর রবিন যে ঘরটায় ঢুকেছে, তার দরজার সামনে এসে চিত্কার করে ডাকলাম, 'এই বেরিয়ে এসো তোমরা। দানবটাকে মেরে ফেলেছি।'

দানবটাকে মেরে এতই স্বস্তি বোধ করছি আমরা, বাচ্চাদের মতো করে চেঁচিয়ে, লাফাতে লাগলাম। সুর করে বলতে লাগলাম, 'মেরেছি! মেরেছি!'

আবেগের আতিশয্যে জড়িয়ে ধরলাম একে অন্যকে।

'এখান থেকে বেরোনো দরকার,' রবিন বলল। 'হেঁটে শহরে যাব। জেনারেল স্টোরের ফোন থেকে বাবাকে ফোন করব। আমাদের তুলে নিয়ে যেতে বলব। এখনই।'

এতই স্বস্তি আর আনন্দিত আমরা, প্রায় নাচতে নাচতে সিঁড়ি দিয়ে নামলাম। লাইব্রেরিতে ঢুকে জানালার কাছে গিয়ে মুসা আর রবিনকে বললাম, 'সরে থাকো। জানালাটা ভাঙব। এখান দিয়ে বেরিয়ে যাব আমরা।'

ভারী পিতলের মোমদানিটা তুলে নিলাম। বাড়ি মেরে কাচ ভাঙব। তারপর বেরিয়ে যাব।

এই ভূতুড়ে বাড়িটা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য তর সইছে না আমাদের। যত তাড়াতাড়ি পারা যায় ভয়ানক এই জলাভূমি থেকে পালাতে চাই।

মোমদানি দিয়ে বাড়ি মারতে গিয়েও থেমে গেলাম চাপা গোঙানি শুনে।

ভুল শুনলাম নাকি?

কান পেতে রইলাম।

আবার শুনলাম শব্দটা।

ভারী গরগর শব্দ।

তারপর শুনলাম ভারী পায়ের শব্দ। দানবটার, কোনো সন্দেহ নেই। ওপর থেকে নিচে পড়ে মরেনি ওটা।

এগিয়ে আসছে পায়ের শব্দ।

কাছে।

আরও কাছে।

এখানে থাকা যাবে না। ওপরে গিয়েও আর লাভ নেই। বরং ফাঁদে পড়ে যাব।

যাওয়ার একটাই জায়গা আছে। রান্নাঘরে।

'রান্নাঘরে চলো!' মুসা আর রবিনকে বলে দৌড় দিলাম।

লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে ডাইনিং রুমে ঢুকলাম। সিঁড়ির গোড়ার কাছ থেকে আসছে দানবটার পায়ের শব্দ।

দৌড়ে ঢুকলাম রান্নাঘরে।

আতঙ্কিত মুসা বলল, 'এখন নিশ্চয় অনেক বেশি রেগে গেছে। ভয়ংকর হয়ে উঠেছে আরও। কী করব এখন?'

রান্নাঘরে ঘুরে বেড়াতে লাগল আমার চোখ। 'আরেকটা বুদ্ধি এসেছে আমার মাথায়।'

'বুদ্ধিটা আগেরবারেরটার চেয়ে ভালো হওয়া চাই,' গুঙিয়ে উঠল মুসা।

'তুমি কোনো বুদ্ধি দিতে পার?' কিছুটা মেজাজ খারাপ করেই বললাম। 'পার?'

চুপ করে রইল ও।

টেবিলের ওপর রাখা দাদির বানানো একটা কেক দেখতে পেলাম। বললাম, 'দানবটা সকাল থেকে কিছু খায়নি। কেকটাকে নিয়ে এমন জায়গায় রাখব, যাতে ঢুকেই ওটার চোখে পড়ে।'

'কিন্তু সেটা তো এক সেকেন্ডের বেশি ঠেকাতে পারবে না ওটাকে,' রবিন বলল। 'এক কামড়েই খেয়ে ফেলে আবার আমাদের ধরতে আসবে।'

'না, পারবে না,' জবাব দিলাম। 'কেকে বিষ মিশিয়ে দেব। এমন সব বিষাক্ত জিনিসপত্র, যাতে ওটা মরে যায়।'

'কী জানি,' অনিশ্চিত ভঙ্গিতে বলল রবিন, 'এমন কোনো বিষ সত্যিই কি আছে, যা এই দানবকে মারতে পারে?'

'এ ছাড়া আর কোনো উপায়ও নেই,' তীক্ষ কণ্ঠে বললাম। 'কিছু একটা তো করে দেখতে হবে।'

একটা কাঁটাচামচ দিয়ে কেকটাকে গেঁথে সাবধানে তুলে নিলাম।

সিংকের নিচে ছোট আলমারিতে খুঁজে দেখলাম। নোংরা। সিংকের পাইপ নেমে গেছে ওটার পাশ দিয়ে। তাতে ভেজা ভেজা সবুজ রংয়ের গুঁড়ো লেগে রয়েছে। হতে পারে কোনো ধরনের বিষাক্ত ছত্রাক। সেগুলো মেশালাম কেক-এ।

একটা তাকে এক বোতল তার্পিন তেল রাখা। মুখটা শক্ত করে লাগানো। জোরে মোচড় দিয়ে খুললাম।

পুরো তেলটাই ধীরে ধীরে ঢেলে দিলাম কেকটার গায়ে।

'এহ!' মুখ বাঁকাল মুসা। 'ভয়ানক দুর্গন্ধ।'

কেকটা দেখলাম। তার্পিনে ভিজে গেছে। রস গড়াচ্ছে। 'তার্পিনটাকে শুষে নেয়ার মতো কিছু ঢালা দরকার এতে,' বিড়বিড় করে নিজেকেই বললাম। এক টিন ড্রেন ক্লিনার তুলে নিয়ে বললাম, 'এটাতে হবে।'

নীল রংয়ের ড্রেন ক্লিনারের গুঁড়ো ঢেলে দিলাম কেকের ওপর। তার্পিনের সঙ্গে বিক্রিয়া করে ফরফর আওয়াজ তুলল গুঁড়োগুলো।

লাফ দিয়ে পেছনে সরে গেল রবিন। বলল, 'যথেষ্ট হয়েছে। এতেই চলবে।'

ওর কথা কানে নিলাম না।

সিংকের নিচে মাথাটা ঠেলে দিলাম। দুটো বোতল দেখলাম। একটা বোতলের ময়লা হয়ে যাওয়া লেবেলটা পড়ে চেঁচিয়ে বললাম, 'ইঁদুর মারা বিষ! চমত্কার!' দ্বিতীয় জারটাতে রয়েছে অ্যামোনিয়া।

'জলদি করো!' তাগাদা দিল রবিন। 'দানবটার গোঙানি শুনতে পাচ্ছি। আসছে ওটা।'

কেকের ওপর প্রথমে ইঁদুরের বিষ ঢেলে দিলাম। তারপর অ্যামোনিয়া।

দানবটার গোঙানি এগিয়ে আসছে। বুকের ভেতর দুরুদুরু করছে আমার। একেকটা হুংকার ছাড়ছে ওটা, আর চমকে চমকে উঠছি। রবিন আর মুসারও আমার মতোই অবস্থা।

একটা রংয়ের টিন খুঁজে পেলাম। সেটা থেকে কমলা রং ঢেলে দিলাম কেকের ওপর।

'হয়েছে হয়েছে, আর কত?' আতঙ্কে গলা কাঁপছে রবিনের।

'যাতে কোনোভাবেই ব্যর্থ না হয়, সেই চেষ্টা করছি,' জবাব দিলাম।

এক মুঠো ন্যাপথালিনের বল তুলে নিয়ে গুঁড়ো করে কেকের ওপর ছড়িয়ে দিলাম।

'জলদি!' চেঁচিয়ে বলল মুসা। 'তাড়াতাড়ি করো! ওটা চলে এসেছে!'

বসার ঘরের মেঝেতে দানবটার পায়ের শব্দ হচ্ছে।

'জলদি করো!' আবার চেঁচাল মুসা।

খানিকটা পোকার ওষুধ স্প্রে করে দিলাম কেকের ওপর।

'কিশোর!' চেঁচিয়ে উঠল রবিন।

টেবিলে রেখে দিলাম বিষ মেশানো কেকটা।

কেকের স্বাদ কতটা অবশিষ্ট আছে জানি না, তবে গন্ধটা দানবের কাছে খারাপ না লাগলেই হলো। খারাপ লাগলে খাবে না। আমার উদ্দেশ্য ব্যর্থ হবে।

'ওই যে এসে গেছে!' চেঁচিয়ে বলল রবিন।

রান্নাঘরের টেবিলের নিচে লুকিয়ে পড়লাম তিনজনে। দেখার লোভ সামলাতে পারছি না। সাবধানে উঁকি দিয়ে দেখলাম। দানবটার মুখটা দেখতে পাচ্ছি না এখান থেকে, হাত দুটো পাগলের মতো দোলাচ্ছে। বাসন, পেয়ালা, গ্লাস যা পাচ্ছে সব ভাঙছে। চোখের সামনে যা পাচ্ছে, সব হাত দিয়ে ঠেলে ঠেলে ফেলছে।

হঠাত্ আমার হূিপণ্ডের গতি যেন থামিয়ে দিয়ে ঘুরে দাঁড়াল দানবটা।

দ্বিধা করছে। তারপর এক পা বাড়াল টেবিলটার দিকে। আরেক পা। আরও এক পা।

টেবিলের নিচে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে জড়সড় হয়ে বসে রয়েছি আমরা। থরথর করে কাঁপছি।

যদি আমাদের দেখে ফেলে দানবটা!

বুঝতে পারছি, প্রচণ্ড ঝুঁকি নিয়েছি।

ফাঁদে পড়ে গেছি আমরা।

কী করবে ওটা এখন?

আঠারো

টেবিলের কাছে এসে দাঁড়াল দানবটা। এত কাছে, ওটার গায়ের দুর্গন্ধ পাচ্ছি।

ভয়ের চোটে মৃদু গোঁ-গোঁ শব্দ বেরোচ্ছে মুসার মুখ দিয়ে।

হাতের তালু দিয়ে ওর মুখ চেপে ধরে চোখ বুজলাম।

'দোহাই তোর, চলে যা,' প্রার্থনা করতে লাগলাম। 'প্লিজ, দানব, আমাদের দেখিস না!'

ওটার নাক টেনে গন্ধ শোঁকার শব্দ শুনতে পাচ্ছি। কুকুর যেমন করে হাড়ের গন্ধ শোঁকে।

প্রচণ্ড কৌতূহলে বেশিক্ষণ বুজে রাখতে পারলাম না চোখ। কী করে দানবটা দেখার জন্য আবার যখন চোখ মেললাম, দেখি, টেবিলের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে ওটা।

নীরব স্বস্তিতে চেপে রাখা নিঃশ্বাসটা ছেড়ে দিলাম নাক দিয়ে।

দুম দুম পা ফেলে সারা ঘরে ঘুরে বেড়াতে লাগল দানবটা।

জোরে জোরে শব্দ করে গন্ধ শুঁকছে।

রিফ্রিজারেটরের কাছে গিয়ে ওটার গন্ধ শুঁকল।

স্টোভের কাছে গিয়ে ওটারও গন্ধ শুঁকল। আবার ঘুরতে লাগল সারা ঘরে। শুঁকছে। শুঁকছে। শুঁকছে।

ভাবলাম, আমাদের গন্ধ পেয়েছে ওটা। আমার আর রবিনের। প্লিজ, দানব। কেকের গন্ধ শোঁক। ওটার দিকে নজর দে। আমাদের কথা ভাবিস না। আমরা নেই।

দুম দুম করে পা ফেলে আবার স্টোভের দিকে এগোল ওটা।

শুঁকছে।

ঝুঁকে আভনটা দেখল। তারপর এক টান মেরে আভনের দরজাটা কব্জা থেকে ছিঁড়ে নিয়ে ছুড়ে ফেলল দূরে।

জোরে শব্দ করে দেয়ালে আছড়ে পড়ল দরজাটা। ভয়ে লাফিয়ে উঠে দাঁড়াতে যাচ্ছিল রবিন, টেবিলে মাথা ঠুকে যাওয়ায় বসে পড়ল আবার। চাপা গোঙানি বেরোল মুখ দিয়ে। মুসা ভয়ে থরথর করে কাঁপছে। আমার অবস্থাও ওদের চেয়ে ভালো না।

ফিসফিস করে বললাম, 'ওই দেখো!'

কেক খাচ্ছে দানবটা। তবে আমরা যেটা টেবিলে রেখেছি, সেটা নয়। আভনে আরও দুটো কেক ছিল।

ওই বড় বড় কেক দুটো খেয়ে ওর পেট ভরে যাবে। টেবিলের ওপরে রাখা কেকটার প্রতি আর লোভ করবে না। নাহ, আমাদের বাঁচার কোনো আশা নেই। নিজেদের মৃত ধরে নিতে পারি, ভাবলাম।

ক্ষুধার্ত ভঙ্গিতে কেক দুটো মুখে পুরে স্রেফ গিলে ফেলল দানবটা। তারপর আবার সারা ঘরে ঘুরতে লাগল। খাবার খুঁজে বেড়াচ্ছে বুঝতে পারছি।

বাতাস শুঁকছে।

এখনো ওটার খিদে মেটেনি। আমাদের কেকটা খা, দানব। আমাদের কেকটা খা। খা। খা। মনে মনে প্রায় কবিতার ছন্দে বলতে লাগলাম।

সাহস করে টেবিলের নিচ থেকে মাথা বের করে উঁকি দিলাম। দানবটার নজর টেবিলের দিকে। আমাকে দেখতে পাচ্ছে না। এগিয়ে আসছে।

টেবিলের কাছে এসে থেমে গেল ওটা।

বাতাস শুঁকল।

হ্যাঁ, কেকটা দেখেছে।

এতক্ষণে আমাদের কেকটা দেখতে পেয়েছে দানবটা।

এক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল ওটার দিকে। তারপর আলতো করে তুলে নিয়ে মুখে ঠেলে দিল।

নীরবে হাসলাম। কেকটা খাচ্ছে! দানবটা আমাদের কেকটা খাচ্ছে!

এই কেকটা সরাসরি কোঁত্ করে গিলে না ফেলে চিবিয়ে চিবিয়ে খাচ্ছে। মস্ত মুখের ভেতর রেখে চিবাচ্ছে, চিবাচ্ছে।

আরেকটা অস্থিরতার মধ্যে রেখে দিল আমাদের। গেলে না কেন? যেভাবে চিবাচ্ছে, বিস্বাদ লাগতে বাধ্য, এতসব আজেবাজে জিনিস মিশিয়েছি ওটাতে।

খাওয়ার সময় সাপের মতো লম্বা জিভ বের করে ঠোঁট চাটছে।

ভালুকের থাবার মতো হাত দুটো তুলে সেগুলো চাটল।

পেট ডলল।

এত কিছু করছে, গেলে না কেন? বিস্বাদ লাগছে? মুখ থেকে ফেলে দেবে?

তবে অবশেষে গিলল কেকটা।

সাপের মতো লম্বা জিভটা বের করে বারবার ঠোঁট চাটতে লাগল।

'মনে হয় বিষক্রিয়া করবে না,' ফিসফিস করে বললাম। 'ওর হাবভাব দেখে তো মনে হচ্ছে বিষাক্ত হওয়াতেই কেকটা বেশি মজা লেগেছে।'

'তাহলে এখন কী করব আমরা?' ফিসফিসিয়েই জিজ্ঞেস করল মুসা। দুই হাঁটু বুকের সঙ্গে চেপে দুই হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে কাঁপুনি থামানোর চেষ্টা করছে।

দীর্ঘ একটা গোঙানির মতো শব্দ করল দানবটা।

টেবিলের নিচ থেকে উঁকি দিয়ে তাকিয়ে আছি। দানবটার ঠেলে বেরোনো চোখ দুটো যেন ছিটকে বেরিয়ে আসবে।

ঘড়ঘড়ে, দম আটকানোর মতো একটা শব্দ বেরিয়ে এল ওটার গলা দিয়ে

রোমশ দুই থাবা দিয়ে নিজের গলা চেপে ধরল।

পেটের ভেতর থেকে গুড়গুড় করে ভারী শব্দ বেরোচ্ছে। আমচকা গলা থেকে দুই হাত সরিয়ে নিয়ে পেট চেপে ধরল। দেহটা বাঁকা হয়ে গেল সামনের দিকে।

ব্যথা আর বিস্ময়ে মৃদু চিত্কার করে উঠল।

তারপর পড়ে গেল রান্নাঘরের মেঝেতে।

'মরেছে! মরেছে!' চেঁচিয়ে উঠলাম। 'এবার নির্ঘাত্ মরেছে!'

টেবিলের নিচ থেকে বেরিয়ে এলাম আমরা।

দূরে দাঁড়িয়ে দানবটাকে দেখতে লাগলাম। মারা গেছে কি না কাছে গিয়ে নিশ্চিত হতে হবে।

চোখের পাতা দুটো বোজা ওটার।

বুকের দিকে তাকালাম, নড়ে কি না দেখার জন্য। শ্বাস নিচ্ছে কি না বোঝার চেষ্টা করলাম।

কিন্তু বুকটা নড়ছে না।

আরও কয়েকটা সেকেন্ড তাকিয়ে রইলাম।

নিথর হয়ে আছে দানবটা।

আমার কাঁধের ওপর দিয়ে উঁকি দিয়ে তাকাল মুসা। 'সত্যিই কি ওটা মরে গেছে?'

'মনে হয়!' তবে স্বস্তি পাচ্ছি না। আগেরবারের মতো যদি জেগে ওঠে?

প্যান্টের পেছনের পকেটে হাত দিল রবিন। টান দিয়ে ওর কমিক বুকটা বের করে ছুঁড়ে মারল দানবটাকে সই করে। দানবের মাথায় লেগে মেঝেতে পড়ে গেল বইটা। দানবটা নড়ল না।

'এইসব আলতু-ফালতু বই আর পড়ব না আমি,' চেঁচিয়ে বলল রবিন। 'জীবনেও না। চলো, এখান থেকে বেরিয়ে যাই।'

ঊনিশ

রান্নাঘর থেকে বাইরে যাওয়ার দরজাটা টেনে দেখলাম। খুলল না। বাইরে থেকে বন্ধ।

একটা দেয়াল আলমারি আছে রান্নাঘরে। কোনো কিছু না ভেবেই দরজাটা ধরে টানে দিলাম। খুলে গেল দরজাটা। অবাক হয়ে বললাম, 'এই দেখে যাও, এটা আলমারি না! ছোট আরেকটা ঘর!'

ছোট্ট অন্ধকার ঘরটায় ঢুকলাম আমরা। হোঁচট খেলাম মেঝেতে পড়ে থাকা একটা ঝাড়ুতে।

চোখ মিটমিট করলাম। চোখে সয়ে এল আবছা অন্ধকার।

আমার ডানে দেয়ালে ঠেস দিয়ে রাখা দুটো মরচে পড়া বেলচা। বাঁ পাশে পুরোনো এক বান্ডিল পাইপ।

উল্টো দিকে আরেকটা দরজা রয়েছে। দরজার গায়ে বড় একটা কাচের জানালা লাগানো।

কাছে এসে জানালাটা দিয়ে বাইরে উঁকি দিলাম। বাড়ির পেছন দিকটা চোখে পড়ল। একটা রাস্তা দেখতে পেলাম।

জলাভূমির ভেতর দিয়ে যাওয়া এই রাস্তা ধরে কি শহরে যাওয়া যাবে? চেষ্টা করে দেখব।

'রবিন, মুসা, বেরোনোর পথ পেয়ে গেছি!' চেঁচিয়ে বললাম।

দরজার নব ধরে মোচড় দিলাম। নবটা ঘুরলেও দরজা খুলল না। এই দরজাটাও বাইরে থেকে ডাণ্ডা কিংবা ছিটকানি দিয়ে আটকানো, এ বাড়ির বাকি দরজাগুলোর মতোই।

রবিন আর মুসাও টানাটানি করে দেখল।

মুসা বলল, 'জানালার কাচ ভেঙে বেরোব।'

দেয়ালে ঠেস দিয়ে রাখা বেলচাগুলোর দিকে তাকাল। একটা বেলচা এনে দুই হাতে মাথার ওপর তুলে ধরে ঘুরিয়ে বাড়ি মারতে গেল।

থেমে গেল পরক্ষণে। ভূমিকম্পে কেঁপে উঠল যেন মেঝে।

চরকির মতো পাক খেয়ে ঘুরে দাঁড়ালাম।

কানে এল ভয়ানক গর্জন।

হুংকার দিচ্ছে দানবটা।

মরেনি।

পায়ের চাপে দুম দুম শব্দ তুলে দরজায় এসে দাঁড়াল দানবটা।

ভয়ে চিত্কার করে উঠল রবিন। বিশাল একটা পা ভেতরে রাখল। ভেতরে ঢোকার সময় দরজার চৌকাঠে ঘষা লাগল ওটার বিশ্রী মাথাটা। কিন্তু কোনো কিছুই আর চোখে পড়ছে না যেন আমাদের।

দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছি আমরা।

ফাঁদে পড়ে গেছি।

বেরোনোর কোনো পথ নেই।

পালানোর জায়গা নেই।

দানবটার চোখ মুসার দিক থেকে আমার দিকে সরল, তারপর রবিনের দিকে। একটা মুহূর্ত স্থির হয়ে রইল ওর ওপর। আচমকা মুখটা ওপর দিকে তুলে প্রচণ্ড এক হুংকার দিল।

'আ-আ-আমাকে আগে খাবে!' তোতলাতে লাগল রবিন। 'ক-ক-ক্কমিকটা ওর মাথায় ছোঁড়া উচিত হয়নি। অপমানিত হয়েছে।'

'আমাদের কাউকেই ছাড়বে না!' চেঁচিয়ে বললাম। 'ওকে আমরা খুন করার চেষ্টা করেছি!'

আবার কিছু একটা করা দরকার—ঝড়ের গতিতে ভাবনা চলেছে আমার মগজে। কিন্তু কী? কী?

পা টেনে টেনে এগোচ্ছে দানবটা।

মুখটা ফাঁক করে ঝটাং করে বন্ধ করল। আবার খুলল। ওর হলুদ বড় বড় ধারালো দাঁতগুলো দেখতে পাচ্ছি।

দাঁত বেয়ে লালা গড়াচ্ছে।

চোখ দুটো লাল করে এগিয়ে আসছে আমাদের দিকে। কাছে। আরও কাছে।

নিজের হাতের দিকে তাকাল মুসা। বেলচাটা এখনো দুই হাতে ধরা। হঠাত্ সামনে পা বাড়িয়ে দিয়ে খোঁচা দেওয়ার ভঙ্গি করে বলল, 'সর! সর! শয়তান কোথাকার!'

ঘোঁত্-ঘোঁত্ করল দানবটা।

'সর! সর!' বেলচা দিয়ে খোঁচা মারার ভঙ্গি করতে করতে পাগলের মতো চিত্কার করতে লাগল মুসা। 'সর শয়তান, রাক্ষস!'

বেলচা ঘুরিয়ে বাড়ি মারল।

থ্যাক করে দানবটার পেটে লাগল বেলচাটা। বিশ্রী শব্দ।

হঠাত্ নীরব হয়ে গেল ঘরটা।

তারপর মাথাটা পেছন দিকে কাত করে প্রচণ্ড এক হুংকার ছাড়ল দানবটা। বদ্ধ ঘরে কানের পর্দা ফেটে যাওয়ার জোগাড় হলো আমাদের।

টলমল পায়ে সামনে এগোল ওটা। টান মেরে মুসার হাত থেকে বেলচাটা কেড়ে নিল। দরজার বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দিল এমনভাবে যেন একটা দাঁত খোঁচানোর কাঠি।

রান্নাঘরের মেঝেতে পড়ে ঝনঝন করে উঠল ওটা।

দেয়ালে ঠেস দিয়ে রাখা অন্য বেলচাটার দিকে তাকালাম। আমার দৃষ্টি অনুসরণ করে দানবটাও তাকাল।

টান দিয়ে তুলে নিয়ে দুই হাতে চেপে মট করে ভেঙে ফেলল দিয়াশলাইয়ের কাঠির মতো। ভাঙা টুকরো দুটোও ছুঁড়ে ফেলল রান্নাঘরে।

এখন কী করব? কিছু একটা তো করা দরকার!

হঠাত্ই মনে পড়ল।

চিঠি!

দাদা-দাদির লেখা দ্বিতীয় চিঠি, যেটা এখনো খোলা হয়নি!

'রবিন! জলদি দুই নম্বর চিঠিটা খোলো!' চেঁচিয়ে বললাম। 'কী করতে হবে নিশ্চয় লেখা আছে ওটাতে। খুলে পড়ো!'

ভয়ানক রেগে যাওয়া দানবটার দিকে তাকিয়ে আছে রবিন। বরফের মতো জমে গেছে যেন।

'রবিন!' মরিয়া হয়ে বললাম। 'চিঠিটা খোলো! এখুনি।'

জিনসের পকেটে একটা হাত ঢোকাল রবিন। বের করে আনল চিঠিটা। এতই হাত কাঁপছে, স্থির রাখতে পারছে না খামটা।

'জলদি করো, রবিন, প্লিজ!' ককিয়ে উঠলাম।

কাঁপা হাতে খামের কোণা ছিঁড়ল রবিন।

আর ঠিক তখনই গলা ফাটিয়ে চেঁচিয়ে উঠলাম আমি।

সামনে লাফ দিয়েছে দানবটা।

আমার হাত চেপে ধরেছে।

হ্যাঁচকা টান মারল দানবটা।

নিজের দিকে টেনে নিল আমাকে।

চোখ তুলে ওর ভয়ংকর মুখটার দিকে তাকিয়ে চিত্কার করে উঠলাম।

ছোট ছোট পানিভরা গর্তের মতো লাগল ওর গভীর চোখ দুটোকে। খুদে খুদে পোকা ঘুরে বেড়াচ্ছে তার ওপর। যেন সাঁতরে বেড়াচ্ছে।

ওই পোকায় ভরা ভয়ানক চোখের দৃষ্টি সহ্য করতে পারলাম না। মুখ ফেরালাম।

আরও শক্ত করে ধরল আমাকে দানবটা।

ওটার গরম দুর্গন্ধে ভরা নিঃশ্বাস এসে আমার গালে লাগছে।

চোয়াল দুটো ফাঁক করল।

মুখের ভেতরও অসংখ্য পোকা। জিভের ওপরে-নিচে সবখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

চিত্কার করে উঠলাম। দানবটার হাত থেকে ছাড়া পাওয়ার জন্য ছটফট শুরু করলাম। কিন্তু আমাকে ছাড়ল না ওটা।

'যেতে দে! আমাকে যেতে দে!' চেঁচাতে শুরু করলাম। 'প্লিজ...'

জবাবে ষাঁড়ের মতো গর্জন করে উঠল ওটা। মুখ থেকে বেরোনো গরম বাতাসের ঢেউ এসে লাগল আমার নাকেমুখে।

জলাভূমির পচা দুর্গন্ধ ওর নিঃশ্বাসে। আস্ত একটা জলাভূমি যেন। ওটার হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য ছটফট করতে করতে ভাবলাম।

আমার মুক্ত হাতটা দিয়ে ওটার হাতে কিল মারতে লাগলাম। সারা গায়ে শ্যাওলা ওটার, জলাভূমির শ্যাওলা মাখানো। দুর্গন্ধে দম আটকে যাচ্ছে আমার।

'ছাড় আমাকে, ছাড়!' অনুরোধ করলাম। 'প্লিজ, আমাকে যেতে দে!'

লাফ দিয়ে এগিয়ে এল রবিন। আমার হাত চেপে ধরে টেনে সরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করল। সে-ও আমার মতোই চিত্কার করে বলল, 'ছাড়! ছাড়!'

মুসাও ছুটে এল, আমাকে সাহায্য করতে। দানবটার রোমশ পায়ে ঘুসি মারতে লাগল।

পা ঝাড়া দিয়ে মুসাকে সরানোর চেষ্টা করল দানবটা।

লাথি মেরে ছুঁড়ে ফেলে দিল ঘরের অন্য প্রান্তে।

ভাবলাম, মরে যাবে।

'মুসা!' ভয়ে চেঁচিয়ে উঠলাম আমি। 'মুসা!'

ঘরের অন্যপ্রান্ত থেকে মুসার গোঙানি কানে এল।

'ছাড় শয়তান কোথাকার, ছাড়!' দানবটার হাত থেকে আমাকে ছাড়ানোর জন্য টানাটানি করতে করতে দম ফুরিয়ে গেছে রবিনের।

আরেকবার গর্জন করে উঠে রবিনকে জোরে একটা ঠেলা মারল দানবটা। ধ্রাম করে গিয়ে দেয়ালে বাড়ি খেল রবিন। দানবটা তখন আমার দিকে তাকিয়ে দুই হাতে আমাকে উঁচু করে ওটার মুখের কাছে নিয়ে গেল।

হাঁ করল।

ওর জঘন্য জিভটা বেরিয়ে এল।

আমাকে চাটল।

আমার খোলা বাহুর চামড়ায় গরম, আটালো স্পর্শ রেখে গেল সাপের মতো জিভটা।

তারপর দাঁতগুলো নামিয়ে আনতে শুরু করল। আমার হাতটা কামড়ে কেটে নেবে।

জ্যান্তই কামড়ে কামড়ে খাবে আমাকে পিশাচটা, বুঝতে পারলাম। পুরো হাঁ হয়ে খুলে গেছে দুই চোয়াল। হলুদ দাঁতগুলো পোকায় ছাওয়া। আমার হাতের ওপর মুখ নামিয়ে আনল ওটা।

তারপর হঠাত্ থেমে গেল।

ছেড়ে দিল আমাকে।

বিশ

আমার দিকে তাকিয়ে থেকে ধীরে ধীরে পিছিয়ে গেল দানবটা। আমার হাতের দিকে তাকিয়ে বড় বড় চোখগুলো আরও বড় হয়ে গেল।

আমিও আমার হাতের দিকে তাকিয়ে রয়েছি। দানবটার মুখের জঘন্য লালা লেগে রয়েছে।

ঝটকা দিয়ে দুই হাতে পেট চেপে ধরল দানবটা। তারপর গলার কাছে তুলে আনল। আবার পেট চেপে ধরল। দম আটকে যাচ্ছে। শ্বাস নিতে পারছে না।

'উফ! প্রচণ্ড ব্যথা! ভয়ানক যন্ত্রণা!' আমার দিকে তাকাল। 'তুমি... তুমি মানুষ?'

আমি আর রবিন দুজনেই অবাক। রবিন জিজ্ঞেস করল, 'তুমি কথা বলতে পার? আমাদের ভাষা জান?'

'তোমরা মানুষ, তাই না?' রবিনের প্রশ্নের জবাব না দিয়ে দানবটা জিজ্ঞেস করল আবার। 'মানুষ কি না জলদি বলো?'

'হ্যাঁ, হ্যাঁ, মানুষ,' আমি জবাব দিলাম।

ঝাঁকি দিয়ে মাথাটা পেছন দিকে কাত করে গুঙিয়ে উঠল দানবটা। 'সর্বনাশ! মানুষে আমাদের অ্যালার্জি আছে! ভয়ানক অ্যালার্জি! তাতেই আক্রান্ত হয়েছি আমি! তুমি মানুষ জানলে জীবনেও খাওয়ার চেষ্টা করতাম না তোমাকে। তোমার হাতের ঘাম আমার পেটে চলে গেছে। এখন আমি মারা যাব।'

বলেই চোখ উল্টে দিল দানবটা।

টলতে টলতে বাইরে বেরোনোর দরজাটার দিকে এগোল ওটা। বেশিদূর যেতে পারল না। টলে উঠে আছড়ে পড়ল দরজার গায়ে। প্রচণ্ড শব্দে বন্ধ পাল্লাটা ভেঙে গিয়ে দানবের শরীরের অর্ধেকটা পড়ল বাইরে। চাঁদের আলো ঘরে ঢুকল ভাঙা দরজা দিয়ে।

উপুড় হয়ে পড়ে রইল দানবটা। নড়ছে না।

আরেকবার আমার লালায় ভেজা হাতটার দিকে তাকালাম। হাতটা ডললাম। বিশ্বাস করতে পারছি না, মানুষের ঘামে মৃত্যু হয়েছে এতবড় একটা দানবের।

সত্যিই কি মানুষের ঘাম, নাকি আগে যে কেকের সঙ্গে বিষ খেয়েছে, সেগুলো ঠিকমতো ক্রিয়া করতে আরম্ভ করছে এখন? নিশ্চিত হতে পারলাম না।

নিশ্চিত হতে পারলাম না, এবারে সত্যি সত্যি মারা গেল নাকি ওটা।

'কিশোর! দাঁড়িয়ে আছ কেন? জলদি চলো!' আমার হাত ধরে দরজার দিকে টান দিল রবিন। 'চলো, বেরিয়ে যাই!'

মুসাও উঠে এসেছে।

দানবটাকে ডিঙিয়ে এলাম আমরা। শেষবারের মতো তাকালাম ওটার দিকে।

চোখ বোজা। শ্বাস নিচ্ছে না। নড়ছে না।

'কিশোর, চলো!' তাগাদা দিল রবিন।

সত্যিই কি মারা গেছে দানবটা? তাকিয়ে রইলাম ওটার দিকে। বুঝতে পারছি না।

ওটা মরল কি না নিশ্চিত হওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে থাকার কোনো মানে হয় না।

লাফ দিয়ে দরজা থেকে রাস্তায় নামলাম আমরা। দৌড়াতে থাকলাম। বাড়ি থেকে দূরে সরে এলাম। রাস্তায় আবার কার সঙ্গে দেখা হয়ে যায়, সেই ভয়ে ঢুকে পড়লাম জলাভূমিতে। মিস্টার কারসনের জেনারেল স্টোরে যাব। সেখান থেকে রবিনের বাবাকে ফোনে সব কথা জানিয়ে তাড়াতাড়ি আসতে বলব। তারপর জেনারেল স্টোরেই বসে থাকব আমরা। দাদা-দাদি ফিরে এলে এ পথেই আসবেন। তাঁদের সঙ্গেও দেখা হবে।

বাইরে অন্ধকার দেখে অবাক হলাম। রাত হয়ে গেছে। তারমানে কি সারাটা দিনই দানবটার সঙ্গে লড়াই করেছি?

সাইপ্রেস গাছের মাথার ওপরে ঝুলে রয়েছে যেন একটা ফ্যাকাশে চাঁদ। জলাভূমিতে ভূতুড়ে আলো ছড়াচ্ছে।

প্যাচপ্যাচে কাদা আর জলজ উদ্ভিদের মধ্য দিয়ে ছুটতে গিয়ে গোড়ালি পর্যন্ত কাদায় ডেবে যাচ্ছে আমাদের। লম্বা লম্বা আগাছাগুলোও বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বাধার সৃষ্টি করছে ভারী কুয়াশা।

মাঝে মাঝে পানি জমে আছে। সেগুলোও বাধা দিচ্ছে। দৌড়ানোর সময় ছপাত্ ছপাত্ শব্দ হচ্ছে।

শুধু কি এই, গাছের বেরিয়ে থাকা শিকড়েও হোঁচট খাচ্ছি।

গাছের ডাল থেকে ঝুলে রয়েছে ধূসর উদ্ভিদের দাড়ি। ছোটার সময় দুই হাতে সরাতে হচ্ছে সেসব। থাবা দিয়ে সরাতে হচ্ছে মুখের সামনে থেকে। ক্রমেই ঢুকে যাচ্ছি জলাভূমির গভীর থেকে গভীরে।

বাড়িটা যখন চোখের সামনে থেকে পুরোপুরি আড়ালে চলে গেল, তখন দম নেয়ার জন্য থামলাম।

অন্ধকারে কান পেতে আছি পায়ের শব্দ শোনার জন্য।

দানবটার পায়ের শব্দ।

কিছুই শুনছি না।

'দানবটাকে তাহলে সত্যিই মারতে পারলাম আমরা!' রাতের বাতাসে বেজে উঠল মুসার কণ্ঠ।

'বেরোতেও পারলাম!' যোগ করল রবিন। 'আমরা মুক্ত! আমাদের কোনো ক্ষতি হয়নি!'

'হ্যাঁ,' আমিও হাসলাম। 'সত্যিই আমরা পারলাম!'

আবার এগিয়ে চললাম। তবে প্রাণভয়ে ছুটতে হচ্ছে না এখন আর। ধীরে ধীরে, সাবধানে, এগিয়ে চলেছি জলাভূমি ধরে। বেরিয়ে থাকা শিকড়, ছোট ছোট গর্তে জমে থাকা পানি, ডিঙিয়ে আসছি লাফ দিয়ে দিয়ে।

রাতের বাতাসে অসংখ্য অদ্ভুত শব্দের প্রতিধ্বনি শুনতে পাচ্ছি। কুলকুচা করার মতো শব্দ। ছুটে চলা পায়ের হুটোপুটি। তীক্ষ চিত্কার।

কিন্তু ভয় পেলাম না।

সারাটা দিন দানবটার সঙ্গে থেকে যে ভয়ের মধ্যে কাটিয়ে এসেছি, যে দুঃস্বপ্নের মধ্যে, এসব শব্দ তার তুলনায় কিছুই না। সবচেয়ে বড় কথা, দানবটার সঙ্গে লড়াই করে জিতেছি।

'এই! রবিন!' হঠাত্ দ্বিতীয় চিঠিটার কথা মনে পড়ল আমার। দাদা-দাদির রেখে যাওয়া দুটো চিঠির একটা পড়েছি, আরেকটা পড়া হয়নি। রবিনকে বললাম, 'দুই নম্বর চিঠিটা তো পড়িনি।'

'তাতে কী?' জবাব দিল রবিন। 'ওটা পড়ার দরকারও নেই। দানবটা মারা গেছে। ওটাকে আমরা মেরে ফেলেছি, ব্যস। প্রথম চিঠিটাতে যা করতে বলা হয়েছে আমাদের।'

'চিঠিটা কোথায় রেখেছ? দুই নম্বরটা?' ওর কথায় কান না দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম। 'বের করো ওটা।' চলা থামিয়ে দিলাম। 'আমি জানতে চাই কী আছে ওটাতে।'

জিনসের পকেট থেকে দোমড়ানো খামটা বের করল রবিন। এক হাতের তালুতে রেখে অন্য হাত দিয়ে ডলে যতটা সম্ভব সমান করল। আর ঠিক এ সময় ভয়ংকর এক চিত্কার যেন জলাভূমির নীরবতাকে কেটে দুই টুকরো করে দিয়ে গেল।

'এখন থামাটা উচিত হচ্ছে না, কিশোর,' মুসা বলল। 'চিঠিটা পরেও পড়তে পারব। আগে শহরে যাওয়া দরকার। রজার আঙ্কেলকে ফোন করা দরকার।'

'এখুনি পড়ো! জলদি করো,' জোর দিয়ে বললাম রবিনকে।

অগত্যা খামের মুখ ছিঁড়ে ভেতর থেকে চিঠিটা বের করল রবিন।

হালকা বাতাস বইতে আরম্ভ করল। তীক্ষ সেই চিত্কারটা আবারও বয়ে নিয়ে এল আমাদের কাছে।

মাথার ওপর খসখস শব্দ করছে অন্ধকার গাছগুলোর পাতা।

ধীরে ধীরে পড়তে আরম্ভ করল রবিন। চাঁদের মৃদু আলোয় অক্ষরগুলো অস্পষ্ট, পড়তে কষ্ট হচ্ছে। তবে পড়তে পারল ও, দাদা-দাদি লিখেছেন, 'প্রিয় কিশোর ও রবিন। আশা করি তোমরা ভালোই আছ। প্রথম চিঠিটাতে একটা কথা লিখতে ভুলে গিয়েছিলাম। দানবটা যদি ওটার ঘর থেকে বেরিয়ে যায়, আর তোমরা ওটাকে মারতে পার, ঘর থেকে বেরোতে পার, তাহলে রাস্তা ধরে শহরে যেয়ো। সাবধান, কোনো অবস্থাতেই জলাভূমিতে নেমো না।'

চোখ উল্টে দিল রবিন।

জোরে গুঙিয়ে উঠল মুসা।

'পড়ো! পড়তে থাকো!' চেঁচিয়ে বললাম।

আবছা অন্ধকারে চোখ তেরছা করে কাগজটার দিকে তাকিয়ে পড়তে লাগল রবিন, 'একটা কথা বলে রাখি, দানবটা আমাদেরই সৃষ্টি। জলাভূমির কুমির, অর্থাত্ অ্যালিগেটরের বাচ্চার গায়ে মানুষের জিন ঢুকিয়ে দেখতে চেয়েছিলাম কী ঘটে। যা ঘটল, সেটা ভয়ংকর। প্রকৃতির সঙ্গে খেলা করতে গিয়েছিলাম আমরা। আর তার খেসারতও দিতে হয়েছে। দানব তৈরি করেছি। আরও ভয়ের কথা, বেশ কিছু অ্যালিগেটরের বাচ্চার গায়ে মানুষের জিন ঢুকিয়েছি আমরা। সবগুলোই দানব হয়ে গেছে। জলাভূমির গভীরে চলে গেছে। এই একটা দানব বাড়িতে ঢুকেছে। আমরা জানি, বাকিগুলোও ঢুকবে।'

বুকের মধ্যে দুরুদুরু শুরু হয়েছে আমার।

রবিন পড়ছে, 'রাতের বেলা চিত্কার করে একে অন্যকে ডাকাডাকি করে দানবগুলো, তীক্ষস্বরে শিস দিয়ে জানান দেয় কে কোথায় আছে। প্রতি রাতেই ওরা বেরোয়। ওদের বন্দি সঙ্গীর জন্য দুঃখ প্রকাশ করে। ওর ফেরার অপেক্ষা করে। তাই, যত কিছুই ঘটুক, জলাভূমিতে নামবে না। জায়গাটা মোটেও নিরপদ নয়। জলাভূমি থেকে দূরে থাকবে। গুড লাক! আমাদের ভালোবাসা নিয়ো।'

রবিনের হাত থেকে কাদায় পড়ে গেল চিঠিটা।

মুসার দুই হাত দুই পাশে ঝুলে পড়ল।

আস্তে করে ঘুরলাম আমি। চাঁদের আলোয় ছায়া পড়েছে জলাভূমির কাদা-পানিতে। বাতাসে গাছের ডাল নড়ার সঙ্গে সঙ্গে ফাঁক দিয়ে রুপালি আলোর রশ্মিগুলো বদল হচ্ছে।

'কিশোর! শুনলে? ওই শব্দটা? কী ওটা?' মুসার কণ্ঠস্বর শুনে মনে হলো ওর গলা টিপে ধরেছে কেউ।

'শিসের শব্দ!' ফিসফিস করে বলল রবিন। 'এখন কী করব আমরা? কিশোর, কোনো বুদ্ধি এসেছে তোমার মাথায়?'

'ভুল যা করার করে ফেলেছি,' চিন্তিত ভঙ্গিতে জবাব দিলাম। 'তবে ছোট্ট একটা আশা আছে এখনো। দানবগুলো মানুষ খেয়ে সহ্য করতে পারে না। ঘামেই অ্যালার্জি হয়ে মরে যায়। আমাদের খেতে চাইলে নিজেরাই মরবে।'

মলিন হাসি ফুটল রবিনের মুখে। পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হতে না পারলেও কিছুটা আশার সঞ্চার হলো ওর মনে।

মুসা তাগাদা দিল, 'তাহলে আর দাঁড়িয়ে আছি কেন? চলো, ফিরে যাই, যেদিক থেকে এসেছি, সেদিকে। রাস্তাটা খুঁজে বের করতে হবে। সেইসঙ্গে দানবগুলোর কাছ থেকেও দূরে সরে যেতে হবে আমাদের।'

'হ্যাঁ, চলো,' বলে আর দেরি না করে ঘুরে দাঁড়িয়ে ছুটতে আরম্ভ করলাম।

এই পাতার আরো খবর -
font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেছেন, 'রাজনৈতিক দল হিসাবে কর্মকাণ্ড করার কোনো অধিকার জামায়াত রাখে না।' আপনিও কি তাই মনে করেন?
5 + 3 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
নভেম্বর - ২৯
ফজর৫:০২
যোহর১১:৪৭
আসর৩:৩৫
মাগরিব৫:১৪
এশা৬:৩১
সূর্যোদয় - ৬:২২সূর্যাস্ত - ০৫:০৯
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :