The Daily Ittefaq
ঢাকা, সোমবার ০৫ আগস্ট ২০১৩, ২১ শ্রাবণ ১৪২০ এবং ২৬ রামাযান ১৪৩৪
সর্বশেষ সংবাদ হাইকোর্টের রায় বহাল; নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না জামায়াত | আপিল করেছেন গোলাম আযম | অষ্টম মজুরি বোর্ডের সুপারিশে মন্ত্রিসভার একমত

রূপকথা

মালগাছির রাজকথা

অদ্বয় দত্ত

মালগাছি দেখলে নাকি পৃথিবীর বেশিরভাগটাই দেখা হয়ে যায়! এখানে আসার আগে তাকে এমনটাই বলা হয়েছে। তাই দেরি না করে সে এই অপরূপ সুন্দর দ্বীপ দেশটিতে নেমে পড়ে। কাছেই মহাসমুদ্র। সূর্য তখন পৃথিবীর অপর প্রান্তে। প্রচণ্ড ঝড়ো বাতাস আর মুষলধারার বৃষ্টির ভেতরে সে দেখতে পায় একটি কাঠের জাহাজ সমুদ্রের ঢেউয়ের তালে দুলছে। উপকূল খুব বেশি দূরে নয়। আহা। তীরে এসেই তরিটা ডুবছে তা হলে? সমুদ্রগর্জন ছাপিয়ে জাহাজের ভেতরকার মানুষের চিত্কার তার কানে আসছিল। সে চাইলে সবাইকেই বাঁচাতে পারে, কিন্তু পৃথিবীতে পা দিয়েই তাকে একটু সাবধানে থাকতে বলা হয়েছে। কোনো কিছুতে নিজেকে না জড়িয়ে শুধু পর্যবেক্ষণ করতে হবে। সুতরাং সে অপেক্ষায় থাকে কী ঘটে তা দেখার। কেউ যদি ঝড়ে মারা যায়, তবে তো আরও ভালো। তখন সে অপেক্ষায় থাকবে মৃতদেহটি উপকূলে ভেসে আসার। তারপর সেই সদ্যমৃতর শরীর দখল করে সে মিশে যাবে মানুষের সমাজে। এটাই তার কাজ।



দুই

সেই অপরূপ দেশের রাজা পরাক্রমাদিত্য ভেবেচিন্তে আর কূল কিনারা পাচ্ছেন না। তাঁর একমাত্র সন্তান রাজকুমারী পরমাকান্তকে বিয়ে দিতে হবে। রাজকুমারীর স্বামীই হবে মালগাছির ভবিষ্যত্ রাজা। এমন কন্যার উপযুক্ত পাত্র পেতে তিনি কী না করছেন! তিন বছর ধরে সারা রাজ্যে ঢেঁড়া পিটিয়েছেন। ফল হয়েছে লেমুরের ডিম। দলে দলে মাকালফল ছেলেরা এসেছে। তাদের প্রথমে যাচাই করেছেন মন্ত্রীরা। পছন্দ হলে প্রধানমন্ত্রী টিপে দেখেছেন পাত্রের যোগ্যতা। সেই স্তর পার হলে তারপর রাজা দেখেন পাত্র।

মুশকিল হলো এখন পর্যন্ত একজনও এই ধাপগুলো পার করে রাজা পর্যন্ত পৌঁছুতে পারেনি। বাধ্য হয়ে তাই কয়েক মাস আগে রাজা শিথিল করেন উপযুক্ত পাত্র হওয়ার শর্ত। তারপরও কেউ প্রমাণ করতে পারল না যে, সে রাজকুমারীর উপযুক্ত। ফলে তিন বছর ধরে রাজা প্রতিদিন একটু একটু করে হতাশ হতে হতে এখন পড়েছেন গভীর দুশ্চিন্তায়।

পরাক্রমাদিত্য আজ তাই বিষণ্ন মনে অপেক্ষা করছেন। আজ তাঁর কাছে রাজজ্যোতিষী সৌভাগ্যাচার্য আসবেন। দূত মারফত আগেই রাজজ্যোতিষী জানিয়েছেন—সমস্যার সমাধান হবে নিশ্চিত। ছয় মাস ধরে গ্রহ-নক্ষত্র বিচার করেছেন সৌভাগ্যাচার্য। নিশ্চয়ই কোনো ভুল থাকবে না তাঁর গণনায়। তবে প্রধান গুপ্তচর ভিন্ন কথা জানিয়েছেন। সে কারণে পরাক্রমাদিত্যর মন আরও বিষাদে ডুবে আছে।

রাজজ্যোতিষীর অপেক্ষায় রাজা অন্দরমহলে পায়চারি করছিলেন। এমন সময় বড় রানি এসে গজগজ করে বলেন, 'আপনার লজ্জা করে না, মেয়েকে আইবুড়ো করে রেখেছেন? বিয়ে দিতে পারছেন না।'

রাজা কোনো উত্তর দেন না। কী উত্তর দেবেন? ভালো পাত্র কোথায়?

বড় রানি আরও ঝাঁঝ নিয়ে বলেন, 'আপনার তো দুই পা-ই আছে, তারপরও সবাই বলে নুলো রাজা। কী জন্যে বলে, জানেন?'

রাজা তাও কোনো উত্তর দেন না।

বড় রানির দাসী পাশে পাশেই ছিল। মহারানিকে খুশি করতে সেও মুখ ভেঙচে বলে, 'উনি কানেও কালা হয়ে গেছেন।'

রাজা এবার হাসেন। শুধু মনে মনে ভাবেন—হাতি খাদে পড়েছে, ধৈর্য ধরে সবার লাথি এখন হজম করতে হবে। সবাই ভাবছে, হাতির দিন শেষ। ডুবে মরবে এবার। রাজা জানেন, তিনি যা দেখতে পান, অন্যরা তা কল্পনাও করতে পারে না। রাজা তাই হাসেন মুচকি মুচকি।

রাজজ্যোতিষী সৌভাগ্যাচার্য ছুটে আসেন এ সময়। সভাগৃহে রাজা একা সৌভাগ্যাচার্যকে নিয়ে বসেন। সৌভাগ্যাচার্য নতমুখে শ্রদ্ধা জানিয়ে বললেন, 'মহারাজ! ছয় মাস পর আপনার সঙ্গে দেখা। মনে হচ্ছে আপনার বয়স বেড়ে গেছে ছয় বছর! এ তো ভালো কথা নয় মহারাজ।'

রাজা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন।

সৌভাগ্যাচার্য বললেন, 'মন্ত্রীরা আগের মতো আর আপনাকে মান্য-গণ্য করেন না।'

রাজা মাথা নিচু করলেন।

সৌভাগ্যাচার্য বললেন, 'মহারাজ ভালো করেই জানেন, রাজ্যবাসী ভালো নেই। এককালে জনগণের ভালোমন্দ বুঝে আপনি রাজকর কম বেশি করতেন। রাজ্যের উন্নতি নিয়ে ভাবতেন। জনগণও আপনাকে দেবতা মনে করত। কিন্তু মহারাজ। অতীব দুঃখের কথা হলো, আপনাকে নিয়ে রাজ্যবাসী হাসাহাসি করে। সবাই মনে করে, রাজা...।'

রাজা চোখ তুলে বললেন, 'কী মনে করে বলো? রাজা একটা গাধা? অথর্ব? রাজার দিন শেষ?'

সৌভাগ্যাচার্য হাত কচলে বললেন, 'অপরাধ ক্ষমা করবেন মহারাজ। আপনি ঠিকই বলেছেন। আপনার প্রধানমন্ত্রী আর সভাসদ যেভাবে সবকিছু করেন, যা সিদ্ধান্ত নেন, সেভাবেই রাজ্য চলে, আপনার কথা শোনে না কেউ।'

রাজা বললেন, 'সমাধান বলো।'

সৌভাগ্যাচার্য বললেন, 'আপনার শনির চক্রে বৃহস্পতি ঢুকে পড়েছে। সেই চক্রে গিয়ে বৃহস্পতি সব শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। এদিকে শনির দশা তুঙ্গে। আপনার সিংহ রাশির সব গ্রহ-নক্ষত্রের দাপট এতদিন কোনো কিছুর পরোয়া করেনি। অথচ কী ভয়ংকর, এবার কিনা তা মেষ চক্রে ঢুকে একদম ভেড়া হয়ে গেল!'

রাজা বিরক্ত হয়ে বললেন, 'উপায় বাতলাও, অত প্যাঁচালের দরকার নেই।'

সৌভাগ্যাচার্য বললেন, 'বিশেষ রত্ন বানিয়ে নিয়ে এসেছি। রাজকুমারীর উপযুক্ত পাত্র মিলবেই। অন্যথায় বিপদ ভয়ানক।'

'কী রকম?'

সৌভাগ্যাচার্য বললেন, 'প্রধানমন্ত্রী চান তার বড় ছেলের সঙ্গে রাজকুমারীর বিয়ে দিতে। তিনি সব ষড়যন্ত্র গুছিয়ে ফেলেছেন। আবার সেনাপতির নিজের ছেলের বয়স মাত্র ছয় বছর বলে তিনি চান তার ছোট ভাইয়ের সঙ্গেই বিয়ে হোক রাজকুমারীর। তাই এই রত্ন ছাড়া সব অন্ধকার।'

রাজা ঝিমানো গলায় বললেন, 'রত্নটা কাকে ধারণ করতে হবে? আমাকে, না রাজকুমারীকে?'

সৌভাগ্যাচার্য বললেন, 'দুজনকেই।'

'কত মূল্য?' রাজা শুধালেন।

'মহারাজ! এই মাত্র দশ সহস্র স্বর্ণমুদ্রা। ভিন দেশ থেকে কিনে আনা কিনা!'

রাজা অর্থমন্ত্রীকে ডাকলেন। দশ সহস্র স্বর্ণমুদ্রা আনতে বললেন রাজকোষ থেকে। অর্থমন্ত্রী ফিরে এসে জানালেন, রাজকোষে মাত্র পনের হাজার স্বর্ণমুদ্রা আছে। দশ হাজার খরচ করলে আগামী সপ্তাহে রাজকর্মচারীদের মাইনে দেওয়াই সম্ভব হবে না।

রাজা হাত উঁচিয়ে বললেন, তিনি তা জানেন। আদেশ দিলেন, সৌভাগ্যাচার্যকে দশ হাজার স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে দিতে।

দুইটি 'অমূল্য' রত্ন রাজাকে বুঝিয়ে দিয়ে এবং তা পরিধানের নিয়ম জানিয়ে গদগদ চিত্তে দশ হাজার স্বর্ণমুদ্রার থলি বগলদাবা করে যেই না চলে যেতে পা বাড়ালেন সৌভাগ্যাচার্য, অমনি রাজা তার হাত টেনে ধরে বললেন, 'আরেকটু কথা আছে হে দুর্ভাগ্যাচার্য, বসো বসো।'

সৌভাগ্যাচার্য চমকে গেলেন রাজার শ্লেষভরা কথা শুনে। ইতস্তত বসতে না বসতেই রাজা তালি দিয়ে আদেশ দিলেন সেনাপতিকে আসতে।

রাজা বললেন, 'আমার আরেকটি প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যাও। কে বড় জ্যোতিষী, তুমি, নাকি আমার প্রধান গুপ্তচর?'

সৌভাগ্যাচার্য ভূত দেখার মতো চমকে উঠলেন যখন, এর পরপরই প্রধান গুপ্তচর এসে রাজার পায়ের সামনে এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা জমা করল।

রাজা বললেন, 'এই স্বর্ণমুদ্রা তুমি আমার গুপ্তচরকে ঘুষ দিয়ে রাজপ্রাসাদের গোপন কথা জেনে নিয়েছ। বেশ বেশ। তা হলে তোমার এখন সাকুল্যে কত লাভ হলো?'

সৌভাগ্যাচার্যর মুখ থেকে যেন রক্ত সরে গেল।

সেনাপতি এলেন এ সময়। রাজা চোখ লাল করে বললেন, 'মিথ্যা বলার জন্য এর জিভ কেটে নাও।' অর্থমন্ত্রীকে ডেকে বললেন স্বর্ণমুদ্রাগুলো রাজকোষে জমা রাখতে।

ঠিক তখন প্রধান গুপ্তচর জানালেন, 'মহারাজ, পূর্ব সমুদ্রের উপকূলে এক আজব মানুষের সন্ধান মিলেছে। যেন আকাশ থেকে কোনো দেবতা নেমে এসেছে! আমরা তাকে ধরে এনেছি। প্রধানমন্ত্রী এ কথা আপনাকে জানাতে নিষেধ করেছেন, কিন্তু আপনার একটিবার কথা বলা দরকার মানুষটার সঙ্গে।'

তিন

সে বড় বড় চোখ করে রাজপ্রাসাদের চারদিকটা দেখছে।

দেশটির মানুষ যে ভাষায় কথা বলে তা বুঝতে প্রথম দিন তার একটু সময় লেগেছিল। কারণ শব্দ-বাক্যগুলোর ব্যবহার একেক সময় একেক রকম। মানুষে মানুষে তার বিপুল তফাত। সে যেই দেহটি ধারণ করেছে, তার শরীর এখানকার মানুষের চেয়ে লম্বা, শুভ্রকান্ত। সে প্রথমে ঢুকেছিল স্থানীয় জেলেপাড়ায়। সবাই তাঁকে বিস্ময় চোখে দেখছিল। কেউ কেউ ভয় পেয়েছিল, কারও চোখে ছিল মুগ্ধ দৃষ্টি।

একজন জেলে বড় বড় চোখ করে বলে, 'তুমি কি রাজকুমারীকে বিয়ে করতে এসেছ? তোমার নৌকার সবাই ঝড়ে মারা গেছে। তুমিই শুধু বেঁচে গেছ, তার মানে ঈশ্বর তোমার সহায়। তা হলে তুমিই কি আমাদের ভবিষ্যত্ রাজা?'

আরেকজন বলে, 'তুমি কি দেবতা? এত সুন্দর মানুষ পৃথিবীতে আর দেখি নাই।'...

তাকে রাজার সভাগৃহে ডাকা হয়। সে যখন বীরদর্পে সভাগৃহে ঢোকে তখন রাজাও অবাক চোখে আপাদমস্তক দেখে নেন। কাছে বসিয়ে বলেন, 'দেশ কোথায় তোমার?'

সে বলে, 'অনেক দূর। রাতে আপনাকে দেখাতে পারব।'

রাজা অবাক হয়ে বললেন, 'রাতে দেখা গেলে এখন তো আরও ভালো দেখা যাবে। চারদিকে ঝলমলে দিনের আলো। আজ আবার অমাবস্যা। অন্ধকারে কীভাবে দেখাবে?'

সে বলে, 'অমাবস্যায় তো আরও সুবিধা। আর আকাশ মেঘমুক্ত থাকলে খুব সহজে সব দেখাতে পারব। নইলে আপনাকে নিয়ে একটু ওপরে উঠতে হতে পারে।'

রাজা বললেন, 'ওপরে? ওপরে তো মানুষ মৃত্যুর পর ওঠে। তুমি কি আমাকে মারতে চাও? ঠিক করে বলো, তোমার দেশ কোথায়? সমুদ্রের পশ্চিমে, নাকি পুবে? নৌকাডুবির কথা আমি শুনেছি।'

সে বলল, 'আমি এই সূর্যের দেশের মানুষ না। আমাকে আপনারা বিসূর্য নামে ডাকতে পারেন।'

রাজা ভ্রু কুঁচকে বললেন, 'তার মানে?'

বিসূর্য হেসে বলে, 'রাতে সব দেখাব। আর মাত্র এক প্রহর অপেক্ষা করুন মহারাজ।'

এক প্রহর পর রাজপ্রাসাদের ছাদে রাজা একা উঠলেন বিসূর্যকে নিয়ে। আকাশের ঈশান কোণের দিকে তাকাতে রাজাকে বলল বিসূর্য। সেখানে বহু দূরে একটি তারা মিটমিট করে জ্বলছে। একটা অদ্ভুত চোখ ঢাকনি (চশমা) পরিয়ে দেওয়া হলো রাজার দুই চোখে। হঠাত্ রাজার মাথা বিসূর্য শক্ত করে চেপে ধরে দুই হাতে। বলে, 'নড়বেন না মহারাজ। আপনাকে সব বুঝিয়ে দিচ্ছি। এখন দেখছেন আপনি বুধ গ্রহকে, এখন শুক্র—আপনার প্রতিবেশী। ওই যে মঙ্গল, তারপর ছোট ছোট পাথরটুকরো হলো গ্রহাণুপুঞ্জ। হ্যাঁ, এটা বৃহস্পতি। ওর চারপাশে অনেক চাঁদ, তারপর আমরা আরও বাইরে যাচ্ছি। সূর্যের জগত্ থেকে এই বের হলাম। এইবার দেখছেন সূর্যের সবচেয়ে কাছের নক্ষত্র। আমরা আরও আরও দূরে যাচ্ছি। পৃথিবী থেকে আকাশগঙ্গার মাঝ বরাবর পথের শুরুতে খুব কাছের একটি নক্ষত্রে ঢুকে যাচ্ছি। ওই যে একটা মিটমিটে লাল ছোট তারা, ওইটা আমাদের সূর্য। ওই সূর্য থেকে পৃথিবীতে আলো এসে পৌঁছায় পঁয়ত্রিশ বছর পর। ওর পেছনের দিকে আড়াল হয়ে আছে একটি ছোট্ট গ্রহ, আমি এসেছি ওইখান থেকে।'

শেষ কথাটা শুনে রাজা অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান। রাজার মাথায় বিসূর্য হাত বোলাতেই উঠে বসেন তিনি।

রাজা বললেন, 'তুমি কি স্বর্গ থেকে এসেছ?'

বিসূর্য অবাক হয়ে বলল, 'স্বর্গ কী জিনিস?'

রাজা বললেন, 'স্বর্গের কথা শোননি? তুমি মিথ্যুক। তুমি জাদুকর? বড় বিপজ্জনক তুমি।'

বিসূর্য বলল, 'আমি জানি, সবকিছু বোঝার মতো অবস্থা আপনাদের এখনো তৈরি হয়নি। আরও দুইশ বছর লাগবে। আমি আপনার মতোই এই মহাবিশ্বের একটি প্রাণী, তবে এই শরীর আমার না।'

রাজার মাথা আবার ঘোরাতে লাগল।

বিসূর্য বলল, 'যেই জাহাজ এসে এখানে ডুবেছে, তেমন জাহাজ এসে একসময় আপনাদের সবকিছু দখল করবে। তার আগে বলি, আমি দেড়-শ প্রহর পর চলে যাব। আপনার দেশটা খুব সুন্দর। আমি একটু ঘুরে ঘুরে দেখব।'

রাজা বললেন, 'আমার অনুমতি চাইছ?'

বিসূর্য হেসে বলল, 'যদি অনুমতি দেন।'

রাজা বললেন, 'যদি না দিই।'

বিসূর্য বলল, 'তাহলে আমাকে কয়েদ করুন। কিংবা মেরে ফেলুন। তারপর আমি আপনার ভেতরে ঢুকে পড়ি। তখন আমিই রাজা।'

রাজা কেঁপে উঠলেন, 'তুমি উন্মাদ। মিথ্যুক। নয়তো দুষ্ট জাদুকর।'

বিসূর্য বলল, 'আমি কেউ না। আর আমরা 'মিথ্যা' জিনিসটা বুঝি না। শুধু জানি ওটা বড় অপরাধ। অত বড় অপরাধ করার মতো বুদ্ধি আমাদের মাথা থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে।'

রাজা বললেন, 'কিন্তু তুমি যা বলছ, তার কোনো আগামাথা নেই। এটা সত্যি হলে আমাদের বেশিরভাগ জ্ঞানবুদ্ধিই মিথ্যা।'

বিসূর্য বলল, 'মিথ্যা নয়, ভুল। সত্যিই আপনারা ভুলেভরা মনের জগতে বাস করেন। তবে সেটা থেকে আপনারাও বের হবেন। আমাদের লেগেছিল পৃথিবীর হিসেবে প্রায় এক লাখ বছর। আর আপনারা প্রথম সত্য আবিষ্কারের মাত্র দশ হাজার বছরেই সব ভুল থেকে বের হয়ে যাবেন। আমরা তা সময়ভ্রমণে চাক্ষুষ দেখেছি। যদিও আপনাদের ভবিষ্যত্ অন্ধকার।'

রাজা বললেন, 'তোমার কথা কিছুই বুঝতে পারছি না।'

বিসূর্য বলল, 'এভাবে বলা আমারই ভুল। শুধু বোঝার মতো করে বলতে পারি, আপনি চাইলে আমি আপনার উপকার করতে পারি।'

রাজা বললেন, 'বেশ। আমার মেয়ে পরমাকান্তর বিয়ে দিয়ে দাও।'

বিসূর্য বলল, 'কেন? নতুন রাজা চাই?'

রাজা বললেন, 'আমার বয়স হয়েছে। বুক ধড়ফড় করে। নতুন রাজা ঠিক করে না গেলে আমি নরকে যাব।'

বিসূর্য বলতে গেল—নরক কী জিনিস? সঙ্গে সঙ্গে ভাবল, এ কথার অর্থও রাজা বুঝবে না। বিসূর্য বলল, 'ঠিক আছে। আমি রাজা সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান করে দিচ্ছি। আপনার মেয়েই হবে ভবিষ্যত্ রাজা।'

রাজা বললেন, 'তোমার সঙ্গে বৃথা বাক্যালাপ। পরমাকান্ত পুরুষ নয়, নারী। সে কী করে রাজা হবে?'

বিসূর্য বলল, 'আপনি চাইলেই হবে। নারীরা কি বুদ্ধিহীন?'

রাজা বললেন, 'পরমাকান্ত রাজনীতির কিছুই বোঝে না। খুব কোমল তাঁর মন।'

বিসূর্য বলল, 'আপনি যদি রাজ্যবাসীর জন্য সম্যক বোধসম্পন্ন একজন রাজা চান, তবে আপনার মেয়েকেই আমি সেভাবে গড়ে তুলতে পারি।'

রাজা বললেন, 'পরমাকান্ত রাজ্য চালাবে, আমি মানলেও রাজ্যবাসী যদি না মানে? তাছাড়া পরমাকান্ত যদি চিরকুমারী থাকে, তা হলে এর পরে কে রাজা হবে? পরমাকান্তর সন্তান চাই।'

বিসূর্য বলল, 'কী দরকার আপনারই বংশের কাউকে রাজা বানানোর। পরমাকান্তর পর রাজ্যবাসীই ঠিক করবে, কে হবেন যোগ্য রাজা।'

রাজা অবাক হয়ে বললেন, 'তুমি তো বিচিত্র সব কথা বলছ! যত্তসব বিশৃঙ্খল অনাসৃষ্টি কথা! রাজা আর প্রজার ভেতরে তাহলে তফাত কোথায় থাকবে?'

বিসূর্য বলল, 'রাজাই প্রজা, আবার প্রজাই রাজা। প্রজা না থাকলে রাজা কী করে রাজকর পাবে, রাজ্য কী করে চলবে? প্রজা ছাড়া রাজার অস্তিত্ব নেই। কিন্তু রাজা না থাকলেও প্রজারা বেঁচে থাকে।'

রাজা বললেন, 'তুমি আমার রাজবংশ ডোবাতে চাও দেখছি!'

বিসূর্য বলল, 'রাজবংশ আবার কী? সব রাজবংশই একসময় অতি সাধারণ বংশ ছিল। এই যেমন আপনার নবম পূর্বপুরুষ ছিলেন জেলেপাড়ার চৌকিদার। এক দুর্বল রাজাকে মেরে আপনার সপ্তম পূর্বপুরুষ রাজকর্মচারী থেকে রাজা হয়েছিলেন। এটা অন্যরা না জানলেও আমি তো জানি।'

রাজার চোয়াল ঝুলে গেল।

বিসূর্য তখন আরও একটি ভয়ংকর কথা বলল, 'মাত্র ত্রিশ-চল্লিশ বছর পর ঠিক আমার মতো দেখতে কিছু মানুষ উত্তর পশ্চিমের দেশ থেকে এখানে আসবে। তারাই আপনাদের শাসন করবে। তাদের বিদ্যাবুদ্ধির কাছে আপনারা অসহায়। সুতরাং এ রাজত্ব এমনিতেই থাকবে না।'

রাজা বললেন, 'আপনি তো দেখছি সবচেয়ে বড় জ্যোতিষী! সৌভাগ্যাচার্যর জিভ কেটে দিয়েছি মিথ্যার আশ্রয় নেওয়ায়। আপনি চাইলে আমার অমাত্য হতে পারেন। সঙ্গে গণকগিরিও করলেন।'

বিসূর্য বলল, 'আমি শুধু আপনাদের সময় অনুযায়ী দেড়-শ প্রহর এ পৃথিবীতে আছি। তারপর, তখন আকাশের যে জায়গাটা দেখালাম, সেখানে ফিরে যাব। তার আগে রাজকুমারী পরমাকান্তকে একটিবার নিয়ে আসুন, আমি তাকে সম্যক জ্ঞান দেব। তিনি তখন এ রাজ্যের সবচেয়ে বুদ্ধিমতি ও যোগ্য শাসক হবেন।'

পরমাকান্তকে ডেকে আনা হলো। বিসূর্য দেখে চমকে উঠল। যেই মানুষটার শরীর সে ধারণ করেছে, তার মস্তিষ্কের সব তথ্যই বিসূর্য ব্যবহার করতে পারছে। মানুষের ভাবনায়, রাজকুমারী মানেই পরম সুন্দরী নারী। কিন্তু পরমাকান্ত তো পরম কুিসত!'

রাজা নিজের মেয়ের সৌন্দর্যের তারিফ করে বললেন, 'আমার এমন সুন্দরী কন্যা কি চিরকাল কুমারী থাকবে?'

বিসূর্য বলল, 'উপযুক্ত পাত্র পেলে ভবিষ্যতে বিয়ে দেবেন। আপনার হবু রাজার সমস্যা তো মিটল।'

রাজার মাথায় হঠাত্ নতুন বুদ্ধি এল। তিনি জানেন, তাঁর মেয়ে দেশের রাজা হলে তাঁকে বিয়ে করার হিম্মত কারও হবে না। এদিকে অনূঢ়া অবস্থায় রাজাও হওয়া যায় না। রাজা তাই বিসূর্যর হাত ধরে বললেন, 'তুমি আমার মেয়েকে বিয়ে করবে?'

'কিন্তু আমি যে মাত্র দেড়-শ প্রহর আছি এ পৃথিবীতে।'

রাজা বললেন, 'এতেই হবে।' রাজা একইসঙ্গে খুশিতে গদগদ হয়ে ভাবলেন, এর ভেতরে পরমাকান্ত যদি মা হতে পারে, তাহলে তো সব সমস্যার সমাধান একসঙ্গে হয়ে গেল।

চার

মালগাছির সবকিছু ঘুরে ঘুরে দেখছে বিসূর্য আর পরমাকান্ত। তাদের সঙ্গে রয়েছে আকাশপথে ঘুরে বেড়ানোর রথ। সেই উড়ন্ত রথে চড়ে তারা বৃষ্টিভেজা অরণ্যে ঘুরে বেড়ায়। কত বিচিত্র গাছ। বিচিত্র সব পশুপাখি। কত রকমের লেমুর যে রয়েছে। একটি অতি ছোট লেমুর পরমাকান্তর দুই পায়ের ফাঁক দিয়ে পালিয়ে গেল। একটি ব্যাঙ ধূসর পাতার সঙ্গে মিশে ছিল, হঠাত্ তার সামনে সবুজ পাতা ঝরে পড়তেই ব্যাঙটিও সবুজ হয়ে যায়। না দেখলে চেনাই যায় না। পরমাকান্ত যত দেখে তত অবাক হয়। একটা সাপ কেমনে হেঁচড়ে পিছড়ে তার দিকেই আসছিল। এ প্রাণীটাকে বড্ড ভয় পায় পরমাকান্ত। চিত্কার করে জড়িয়ে ধরে বিসূর্যকে।

বিসূর্য হেসে বলে, 'এ বড় নিরীহ, নির্বিষ। তোমাকে দেখে সাপটাই বরং ভয় পেয়েছে। চিত্কার করার কথা ওই সাপের।'

তারা চলে আসে সমুদ্রের তলায়। পরমাকান্তর মুখে কি একটা পরিয়ে দিয়েছে বিসূর্য। তারপর থেকে সে ডাঙার মতো সাবলীলভাবে জলেও ঘোরাফেরা করছে। পরমাকান্ত যতই সমুদ্রের তলে সাঁতরে বেড়ায়, ততই হতবাক হতে থাকে।

বিসূর্য বলল, 'এ পৃথিবীর বেশিরভাগ প্রাণীই সমুদ্রে বসবাস করে। কিন্তু তোমরা মনে করো, এখানে মাছ ছাড়া আর কিই বা আছে!'

একটা ড্রাগন মাছ তার চেয়ে অনেক বড় আরেকটি মাছকে গিলে ফেলল। তার চুপসানো পেট কেমন বেঢপ ফুলে উঠল। পরমাকান্ত অতি ছোট ছোট প্রাণীদেরও দেখতে পাচ্ছে। ভবঘুরে অতি ছোট কিছু প্রাণী ভেসে ভেসে আপন মনে জটলা করে ঘুরছে, আর তাদের রসিয়ে রসিয়ে খাচ্ছে কোটি কোটি মাছ। সেইসব ছোট মাছকে খাচ্ছে একটু বড় মাছ। সেই একটু বড় মাছকে খাচ্ছে আরেকটু বড় মাছ। এভাবে চলছে খাওয়াখাওয়ি।

তারপর তারা চলে যায় সাগরের অতি গভীর তলে, যেখানে ঘুটঘুটে অন্ধকার। কী আশ্চর্য! এখানেও কিছু প্রাণী রয়েছে। আলো নেই বলে তাদের শরীর থেকে কীরকম জ্যোতি বের হচ্ছে। এরপর তারা প্রবালপ্রাচীর ঘিরে থাকা বিচিত্র রংয়ের মাছের রাজ্যে ঢুকে পড়ল। এভাবে সারা পৃথিবীর সমুদ্র ও স্থল জগতের জীবজন্তু দেখে বেরিয়ে পড়ল পৃথিবীর বাইরে।

প্রথমে গেল চাঁদে। পরমাকান্ত চমকে গেল চাঁদ থেকে পৃথিবীকে দেখে। তারপর গেল মঙ্গল গ্রহে। সেখান থেকে পৃথিবীকে দেখায় ছোট্ট একটি বিন্দুর মতো। আর না। তারা ফিরে এল। বিসূর্যর সময় নেই বেশি। দেড়-শ প্রহর পার হতে আর খুব সামান্যই বাকি আছে।

বিসূর্য ফিরে গেল তার নিজের দেশে। পরমাকান্ত রাজপ্রাসাদে ফিরে এসে প্রবল জ্বরে পড়ল। জ্বরের ঘোরে কীসব আবোল তাবোল বকতে থাকল সে। রাজবদ্যি এল। এক সপ্তাহ দুই সপ্তাহ পার হয়, জ্বর সারে না রাজকন্যার। রাজার মনে ভয় ঢুকে যায়। বিসূর্যকে বিশ্বাস করে পস্তাতে লাগলেন।

এক মাস পর পরমাকান্ত সুস্থ হয়ে ওঠে। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, বিসূর্যর কথা কিছুই স্পষ্ট মনে নেই তার। সব কীরকম কুয়াশার মতো লাগে। সমুদ্র তল, চাঁদ, মঙ্গল—এগুলোকেও কীরকম স্বপ্নের মতো মনে হয়।

পরমাকান্তকে মালগাছির রাজা হিসেবে অভিষিক্ত করা হয়। এমন রাজা মালগাছি আর কখনো দেখেনি। নতুন রাজা নিজেই যেন কিষানের কিষান, শ্রমিকের শ্রমিক, আর সাধারণ মানুষই যেন রাজা।

বিসূর্য ফিরে যাবার তিন মাস পর পরমাকান্ত আবার অসুস্থ হয়ে পড়ে। রাজবদ্যি এসে জানায়, নতুন রাজা মা হতে চলেছেন।

মালগাছিতে আবার আনন্দের বন্যা বয়ে যায়।

এই পাতার আরো খবর -
font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেছেন, 'রাজনৈতিক দল হিসাবে কর্মকাণ্ড করার কোনো অধিকার জামায়াত রাখে না।' আপনিও কি তাই মনে করেন?
9 + 2 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
নভেম্বর - ২৯
ফজর৫:০২
যোহর১১:৪৭
আসর৩:৩৫
মাগরিব৫:১৪
এশা৬:৩১
সূর্যোদয় - ৬:২২সূর্যাস্ত - ০৫:০৯
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :