The Daily Ittefaq
ঢাকা, সোমবার ০৫ আগস্ট ২০১৩, ২১ শ্রাবণ ১৪২০ এবং ২৬ রামাযান ১৪৩৪
সর্বশেষ সংবাদ হাইকোর্টের রায় বহাল; নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না জামায়াত | আপিল করেছেন গোলাম আযম | অষ্টম মজুরি বোর্ডের সুপারিশে মন্ত্রিসভার একমত

কিশোর উপন্যাস

সাকি মামা আর আমি

দেবব্রত মুখোপাধ্যায়

জমিদার বাড়ির সাপুড়ে

আমি তখন মাত্র ক্লাস ফাইভে উঠেছি। মানে এ বছরের গোড়ার দিকের ঘটনা। তখন কী ভয়ানক শীত পড়ল। সকালে-বিকালে কুয়াশার জ্বালায় কিচ্ছু দেখার উপায় নেই। তখনো আমাদের ক্লাস ভালো করে শুরু হয়নি। মাত্র নতুন বই দিয়েছে তো। একদিন দুই ক্লাস হয়, একদিন এক ক্লাস।

আমার আর রাজীবের তখন খুব মজা। প্রতিদিন একটা-দুটো ক্লাস শেষ হলেই ছুটি হয়ে যায়; আমরা চলে যাই জমিদার বাড়ি। জমিদার বাড়িতেই একটা জায়গা বানিয়ে ফেলেছি আমাদের গুপ্তধন খোঁড়ার জিনিসপত্র রাখার জন্য। জায়গা মানে সামনের যে দালানটা আছে, ওটার দোতলায় একটা রুম পরিষ্কার করে নিয়েছি আমরা। নিচতলায়ও করা যেত। কিন্তু ঝামেলা হলো, নীরারা আবার মাঝে মাঝে এদিকে আসে লুকোচুরি খেলতে। নিচতলায় আমরা জায়গাটা করলে ওরা দেখে ফেলতে পারে। দোতলায় ওঠার সাহস ওদের নেই।

দোতলার এই ঘরটায় আমরা একটা কোদাল, একটা শাবল, একটা ঝুড়ি, একগাছা দড়ি, একটা ব্লেড আর কয়েকটা বই রেখেছি। দড়ি আর ব্লেড রেখেছি; সাপে কাটলে কাজে লাগবে বলে। ডিসকভারি চ্যানেলে দেখেছি, সাপে কাটলে কী করতে হয়। আর বইগুলো রেখেছি; যখন খোঁড়াখুঁড়ি করতে ভালো লাগবে না, তখন পড়ব বলে। এর মধ্যে বাংলা বই যেগুলো ছিল, সব পড়া হয়ে গেছে। বাবা ঢাকা থেকে কয়েকটা ইংরেজি গোয়েন্দা বই এনেছিল; ওগুলো আর পড়াই হচ্ছে না।

এখন আমরা শুধুই খোঁড়াখুঁড়ি করছি। এগারোটা গর্ত খুঁড়ে ফেলেছি আমরা। বেশিদূর গর্ত করি না। হাত দুয়েক গর্ত করলেই বোঝা যায়, গুপ্তধন ওখানে আছে নাকি। সবুর পাগলা বলেছে, গুপ্তধন বেশি মাটির নিচে কেউ রাখে না। আমরা সবগুলো ঘরের মেঝে একবার করে পরীক্ষা করা হয়ে গেলে খুঁজব দেয়ালে কোথাও লুকানো দরজা-টরজা আছে কি না। সেটা খুঁজতে আমাদের একটা স্টেথিস্কোপ লাগবে। কানে স্টেথিস্কোপ লাগিয়ে দেয়ালে টোকা দিয়ে শব্দ শুনে শুনে ফাঁপা জায়গা খুঁজে বের করতে হয়; টিভিতে দেখেছি।

সেদিন অবশ্য আমরা গর্তও খুঁড়ছিলাম না, বইও পড়ছিলাম না, দেয়ালও দেখছিলাম না। চুপচাপ ঘাসের ওপর বসে ভাবছিলাম। গুপ্তধন পেলে কী করব তা-ই ভাবছিলাম। রাজীব বলল, 'আমি একটা জাহাজ কিনব। তারপর জাহাজ নিয়ে তিমি শিকার করতে অ্যান্টার্টিকায় চলে যাব।'

রাজীবটা আসলে একটু গাধা আছে। আমি বললাম, 'তুই জানিস না, তিমি শিকার করা নিষেধ? আর ওই ঠান্ডার মধ্যে তুই জাহাজ চালাবি কী করে?'

'নিষেধ বলেই তো করব। পুলিশ আসবে আমাকে ধরতে, গুলি চালাবে; আমিও গুলি চালাব। দারুণ অ্যাডভেঞ্চার হবে না!'

আমি আরেকটু হলে ওকে থাপ্পড়ই মারতে যাচ্ছিলাম। আমি গুপ্তধন পেলে একটা আইসক্রিম ফ্যাকটরি করব আর অ্যামাজনে বেড়াতে যাব বলে ঠিক করে রেখেছি। আর ও কি না, জাহাজ কিনে অ্যান্টার্কটিকা যাবে! পেটানো দরকার না? কিন্তু পেটানো হলো না। তার আগেই রাজীব চিত্কার করে উঠল, 'ওই যে তোর মামা আসছে।'

আমিও রাস্তার দিকে চেয়ে দেখি সাকি মামা আসছে। সঙ্গে সঙ্গে ওখান থেকেই চিত্কার করে উঠলাম,

'সা আ আ কি... মা আ আ আ মা...'

সেদিনই বুঝতে পারলাম, আমি আসলে বড় হয়ে গেছি। জমিদার বাড়ি থেকে দেওয়া আমার ওই চিত্কারে তিন রাস্তার মোড়ে সাকি মামা ঠিক থেমে গেল।

সাকি মামা আমাদের ঠিক আপন মামা না। আম্মার কেমন যেন ফুফাত ভাই। থাকে ঢাকায়। ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে কি যেন পাস করেছে। এখন মাঝে মাঝে চাকরি খোঁজে। আর মাসে একবার-দু বার করে আমাদের এখানে চলে আসে। মুড-টুড ভালো থাকলে সপ্তাহ, পনেরো দিন থেকে যায়।

এখন আর বোঝাই যায় না যে, সাকি মামা আমাদের পরিবারের কেউ না; সাকি মামাও তা মনে করে না, আমরাও করি না। বাবা বা আম্মু তো বরং সাকি মামাকে দেখলে দারুণ খুশিই হয়। আম্মু এই সুযোগে এটা ওটা নতুন নতুন রান্না করে খাওয়ায় সাকি মামাকে। আর আব্বু মুখে খুব ঝাড়ি দেয়, কিন্তু সাকি মামাকে পেলে খুশিই হয়; এটা ওটা কাজে বলা যায়!

সাকি মামা অবশ্য এসব কাজ করতে চায় না। সে চায় আমাকে আর নীরাকে নিয়ে গল্প করতে। কী দারুণ দারুণ গল্প যে জানে মামা! একেবারে ডিসকভারি চ্যানেলের মতো সব গল্প। অ্যামাজন নদীর পাড়ের জঙ্গল, মানুষখেকো গাছ, বরফের ওপর শিল মাছ ধরা; কত মজার সব গল্প। সবচেয়ে বড় কথা হলো, সাকি মামা আমাকে আর সব বড়দের মতো মোটেও ছোট মানুষ বলে মনে করে না।

আমার আর রাজীবের প্রত্যেকটা কাজ সাকি মামা খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। আমাদের কথা মন দিয়ে শোনে। আমাদের কথা দিয়েছে, একটা চাকরি পেলেই আমাদের গুপ্তধন খোঁজার ভালো যন্ত্রপাতি কিনে দেবে। আর একটা কথাও মামা দিয়েছে। সেটা এখন বলা যাবে না। এখন বরং সেদিনের ঘটনা বলি।

মামা আমাদের চিত্কার শুনে একটু থমকে জমিদার বাড়ির দিকে এগোল। আমরা আর এগোলাম না। মামা এখানে এলে ভালো হবে। ঘাসের ওপর বসে খানিক্ষণ গল্প করা যাবে।

সাকি মামা দূর থেকেই হাঁক দিল, 'কি রে, তোরা বাসায় ফিরবি না?'

আমিও জোরে উত্তর দিলাম, 'আগে এদিকে আসো। পরে যাব।'

মামা সেই বাসস্ট্যান্ড থেকে হেঁটে এসেছে। হাঁফিয়ে গেছে। কাঁধের ঝোলাব্যাগটা পাশে ছুড়ে ফেলার মতো করে রেখে ধপ করে ঘাসের ওপর বসে পড়ল। মামাকে এখন দেখতে একেবারে ইংরেজি সিনেমার নায়কদের মতো লাগছে। মুখে হালকা হালকা দাড়ি, চোখে কালো ফ্রেমের পাতলা চশমা, পরনে একটা কালো জিন্সের প্যান্ট আর কলারওয়ালা একটা কালো গেঞ্জি!

সাকি মামার চেহারার মধ্যে এমনিতেই অবশ্য একটা গোয়েন্দা নায়ক-গোয়েন্দা নায়ক ব্যাপার আছে। আমরা একবার মেপে দেখেছিলাম, ঝাড়া ছয় ফুট এক ইঞ্চি লম্বা সাকি মামা। এর ওপর নাকটা আবার কেমন যেন বাজ পাখির ঠোঁটের মতো খাড়া হয়ে বেঁকে গেছে। সব মিলিয়ে বিদেশি গোয়েন্দাদের মতো দেখা যায়।

সাকি মামা নিজেও অবশ্য গোয়েন্দা হতে চায়। ও আচ্ছা, সেটা এখন বলা যাবে না।

সাকি মামা একটু জিরিয়ে নিয়ে জিজ্ঞেস করল, 'কি রে, গুপ্তধন পেলি কিছু?'

আমরা দুজনই মাথা নেড়ে 'না' বলে দিলাম।

মামাও একটু হতাশ হলো। তারপরও জোর গলাতেই বলল, 'হাল ছাড়িসনে। ঠিক গুপ্তধন পেয়ে যাবি।'

রাজীব ইদানিং একটু হতাশ হয়ে যাচ্ছে। মুখ কালো করে বলল, 'আসলেই পাব মামা? কতদিন ধরে শুধু মাটি খুঁড়ছি; কিছুই পাই না।' সাকি মামা এবার একটু ধমক দিয়ে বলল, 'পাবে না কেন! জানো, সমুদ্রতলে ডুবে যাওয়া জাহাজের গুপ্তধন উদ্ধার করতে কত মানুষ যুগের পর যুগ চেষ্টা করে! তারপর গিয়ে দেখা যায়, গুপ্তধনের সন্ধান মিলেছে। চেষ্টা চালাও পাবে...'

'হ্যাঁ, পাবে। পাবে, পাবে।' —গর্জনের মতো শোনা গেল কথাটা।

আমরা কেউ এই কথা বলিনি। পেছনের দালানের দোতলা থেকে চিত্কারের মতো কথাটা ভেসে এল। আমরা তিন জনই সেদিকে ফিরে চাইলাম। ও আচ্ছা, সাহেব ওঝা!

সাহেব ওঝা হলো একজন সাপুড়ে। মাসখানেক হলো এখানে যায়-আসে। আমাদের কোনো বিরক্ত করে না। লোকে বলে, পৃথিবীর যেকোনো সাপকে কথা শোনাতে পারে সে। তার পোষা সাপরা নাকি কামরূপ-কামাখ্যা থেকে কবজ এনে দেয়। সেই কবজ পরলে সব রোগ সেরে যায়, আরও কত কী। অবশ্য সাকি মামা বলে, সব বুজরুকি।

মুখে সাকি মামা যা-ই বলুক, আসলে একটু ভীতু মানুষ। এই ভরদুপুরে পোড়ো জমিদারবাড়িতে সাহেব ওঝার হুংকার শুনে তাই একটু থতমত খেয়ে গেল। আমরাও একটু ভয় পেয়ে গেলাম। সাকি মামা ভয় তাড়ানোর জন্য ধমক দিয়ে বলল, 'কী সাহেব ওঝা। এখানে কী করো?'

সাহেব ওঝা খ্যাঁক খ্যাঁক করে হেসে উঠল, 'আমি! আমি কপাল খুঁজি। আমি কিছু পাইনাই। তবে তোমরা গুপ্তধন পাবা।'

আমি একটু গলা চড়িয়ে জিজ্ঞেস করলাম, 'তুমি কী করে জানো?'

'জানি। আমি অনেক কিছুই জানি। তোমরা গুপ্তধন পাবা—এটা জানি। আর জানি, তোমাগো শকশোতে ধরবে।'

শকশো মানে কী!

ভয়ানক স্টেশন

বাবার রাগের তো মাথা-মুণ্ডু নেই। একটু মাথা খারাপ কিসিমের মানুষ তো। তাই ঘন ঘন খেপে যান। খেপে গিয়ে বাবা বলেন, 'সাকিকে তোরা অবশ্যই বিলাইমামা বলে ডাকবি।'

আচ্ছা বলো, তা কি হয়? হয় না বলেই আমি আর নীরা কখনোই সাকি মামাকে বিলাই-মামা বলে ডাকিনি। আজ মনে হচ্ছে ভুল করেছিলাম।

আজ এই গৌরিপুর রেলস্টেশনে নেমে মামার ভাব-সাব দেখে মনে হলো, বাবা ঠিকই বলেছিলেন। সাকি মামাকে আসলে বিলাই মামা বলে ডাকা উচিত। ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে পাস করা একটা মানুষ এত ভীতু হতে পারে!

এই ভর সন্ধেবেলা এমন নিঝুম স্টেশনে নামলে অবশ্য সামান্য ভয় যে-কারও লাগতে পারে। ট্রেন থেকে যাত্রী বলতে নামলাম শুধু আমরা দুজন। নেমে দেখি স্টেশনেও কোনো লোকজন নাই। ফাঁকা একটা লাল দালান পড়ে আছে। দূর থেকে একটা লোক হাতে লাল আর সবুজ দুটো পতাকা নিয়ে হেঁটে আসছে। কাছেই কোথায় যেন 'তকক্ষেত, তকক্ষেত' করে কি একটা ডেকে উঠল।

আমি একটু ভয় পেয়ে গেলাম। আমি ক্লাস সেভেনে পড়ি। আমি একটু ভয় পেলে তাতে কোনো সমস্যা তো না। সমস্যা হলো, মামাও ভয় পেয়ে গেছে। আমি ভয়ে আস্তে আস্তে বিলাই-মামার কাছে সরে দাঁড়ালাম। মামা দেখি চোখ-টোখ বড় করে বলছে, 'কি রে সাগর, ভয় পাইছিস? ভয় পাস না। এটা তক্ষকের ডাক।'

বলল বটে 'ভয় পাস না'; কিন্তু চোখ-মুখ দেখে বুঝলাম, সাকি মামা নিজেই দারুণ ভয় পেয়েছে। আমার ভয় কেটে গেল। মনে হলো—মামাটা আসলেই বিলাই মামা।

সমস্যা হলো এই ভীতু বিলাই মামাকে নিয়ে আমরা এখন কোথাকার কোন বাঞ্ছারামপুর যাবো কীকরে? দুজনের কেউই এখানকার পথঘাট কিচ্ছু চিনি না। আগে কোনোদিন এই গৌরীপুর-বাঞ্ছারামপুর আসা তো দূরে থাক; নামও শুনি নাই।

সাকি মামা মোটেও আসতে চায়নি এখানে। বাবা ঝাড়ি দিয়ে বাধ্য করেছেন। বাবার মামাবাড়ি এখানে। আমরা জানতাম না। হঠাত্ জানলাম।

গত সপ্তাহে শুক্কুরবার হঠাত্ আমাদের বাসায় এসে হাজির বাবার এক মামাতো ভাই—মঞ্জু কাকু। গায়ে যাচ্ছেতাই ধরনের একটা সবুজ সাফারি। দিন দুয়েক বাসায় থাকার পর আমরা জানলাম, সেই মঞ্জু কাকুর নাকি মেয়ের বিয়ে। আমাদের দাওয়াত করতে এসেছে।

আমরা এই মঞ্জু কাকুকে আগে কোনোদিন দেখিইনি। আমি আর নীরা কোনোদিন নামও শুনিনি। আম্মা বলল, সে নাকি দেখেছে। কিন্তু এতকাল কোনো যোগাযোগ ছিল না। বাবাকেও কোনোদিন দেখিনি, তাদের বাড়ি বেড়াতে যেতে। তাই মঞ্জু কাকুর মেয়ের বিয়ে হোক আর ছেলের বিয়ে; সেখানে আমাদের যাওয়ার কোনো দরকারই ছিল না। কিন্তু মঞ্জু কাকু চলে যাওয়ার পরই বাবা খেপে গেল, 'অবশ্যই যেতে হবে। অবশ্যই মঞ্জুর মেয়ের বিয়েতে যেতে হবে।'

বাবার তো মাথায় একটু সমস্যা আছে। বাবা তাই কোথাও যায়-টায় না। তাহলে কে যাবে? আমাদের বাসায় আমি, বাবা, মা, নীরা আর সাকি মামা ছাড়া আর কেউ নেই। বাবা বললেন, 'সাগর যা, বাঞ্ছারামপুর থেকে ঘুরে আয়।'

আমার খুবই ভালো লাগল। কোথাও ঘুরতে যাওয়া হয় না। একটা সুযোগ যদি পাওয়া যায়। কিন্তু মা চটে উঠলেন, 'ও একা একা যাবে কী? ও জীবনে কোনোদিন একা বাসা থেকে বের হইছে।'

বাবার মাথায় সমস্যা। তাই বলেছিলেন, 'বেরোয়নি বলে বেরোবে না, তা তো না। দুদিন পর এই সাগরই দেখবা একা একা বিলেত, আমেরিকা যাচ্ছে।'

মা আরও চটে উঠলেন, 'যাবে। যখন যাওয়ার যাবে। এখন ও একা কোত্থাও যাবে না।'

বাবা হাল ছেড়ে দিয়ে বললেন, 'তাহলে আর কি? তোমার বিলাই ভাইকে পাঠাও সঙ্গে। দুজনে ঘুরে আসুক।'

তাতে মার আপত্তি ছিল না। কিন্তু রাতে বাসায় ফিরে মামা খেপে গেলেন, 'কিসের বাঞ্ছারামপুর! আমার এখন কত কাজ। সেসব ফেলে আমি কোত্থাও যেতে পারব না।'

মামা কোনো কথা বললেই বাবা কেন যেন খেপে যায়। হাতের মোবাইলটা খাটের ওপর ছুড়ে মেরে বলল, 'তুমি যাবে, তোমার ঘাড় যাবে। কাজ! কী কাজ আমি জানি না? তুমি না গেলে কাল থেকে এই বাসায় তোমার ভাত বন্ধ...'

ভাত বন্ধ হলে মামার খুব ক্ষতি হতো, তা না। চাইলে সেদিনই ঢাকায় চলে যেতে পারত। ঢাকায় তো আর বাবা তার ভাত বন্ধ করতে পারত না। কিন্তু মামা মুখে যা-ই বলুক, বাবাকে ভয় খায়। কিছু বললে, খানিকক্ষণ তর্ক করে; তারপর বাবার কথাই মেনে নেয়। তাই ভাত বন্ধের হুমকিতে, নাকি এমনি ভয়ে; মামা আমাকে নিয়ে সেই ময়মনসিংহ হয়ে গৌরীপুর চলে এসেছে। বাবা বলে দিয়েছে, এখান থেকে নাকি রিকশায় মাইল পাঁচেক গেলেই মঞ্জু কাকুদের বাড়ি। ভালো রাস্তা আছে।

কিন্তু কিসের রাস্তা। রাস্তাও নেই, রিকশাও নেই। মঞ্জু কাকু অবশ্য বলেছিল, আগে থেকে জানালে রিকশার ব্যবস্থা রাখবে। কিন্তু বাবা বললেন, 'নাহ। এক বাড়িতে বেড়াতে যাবে। আগে থেকে এত জ্বালাতন করার দরকার নেই। ওখানে এমনিতেই রিকশা পাবে।'

বাবা বলার সময় এরকম বড় বড় কথা আন্দাজে বলে ফেলে। সে নিজে গৌরীপুর সম্পর্কে কিছু জানুক আর না জানুক, বলে দিল—রিকশা পাওয়া যাবে। কিন্তু স্টেশনের গার্ড লোকটা বলল, 'রিকশা তো পাইবেন না।'

অন্ধকার হয়ে আসছে। এই পোড়ো বাড়ির মতো স্টেশনের সামনে আমি আর মামা দাঁড়িয়ে, সামনে তক্ষকের মতো চেহারার গার্ড। তক্ষকের ডাক শোনার পর থেকে এই লোকটাকে আমার তক্ষক বলে মনে হচ্ছে; আমি অবশ্য কোনোদিন তক্ষক দেখিনি।

সেই তক্ষকের কথা শুনে মামা আরও ভয়ে ভয়ে বলল, 'কেন পাব না? রিকশা চলে না এ পথে?'

'চলে। তয় সন্ধার পর আর চলে না। রাস্তা ভালো না।'—লোকটা এমনভাবে বলল যেন কিচ্ছু হয়নি।

বিলাই মামা একই সঙ্গে চটে উঠল এবং মনে হলো ভয়ে কেঁপে উঠল। খানিকটা চেঁচিয়ে বলল, 'রাস্তা ভালো না বললে হবে! আমরা তা হলে বাঞ্ছারামপুর যাব কী করে? আমরা এই পথ কী করে চিনব? না যেতে পারলে রাতে থাকব কোথায়?'

পরপর এতগুলো প্রশ্ন শুনেও তক্ষকের মতো সেই লোকটা কোনো শব্দ করল না। চুপচাপ স্টেশন ঘরটার দিকে হেঁটে এগোতে লাগল। মামা আরও খেপে গেল। লোকটার দিকে তেড়ে যাওয়ার মতো একটা ভঙ্গি করে বলল, 'ও ভাই! ও ভাই, যান কই? আপনার স্টেশনের মাস্টার কই?'

এবার লোকটা একটু পেছন ফিরে বলল, 'মাস্টারের ছেলের শরীর খারাপ। স্টেশনে আসে নাই। হাসপাতালে গেছে ছেলেরে নিয়ে।'

'তাহলে আপনি একটা ব্যস্থা করেন না ভাই। আমাদের তো বাঞ্ছারামপুর যেতে হবে।'

লোকটা একেবারেই পাথরের মতো। যেন খুব বিরক্ত হয়েছে, এভাবে বলল, 'তার আমি কী জানি? বাঞ্ছারামপুর যাবেন, তাহলি সন্ধের পর আইছেন কেন? এহন কোনো রিকশাওয়ালা আর নেই স্টেশনে।'

কথা বলতে বলতে তক্ষক ব্যাটা স্টেশন ঘরটার একটা খুপচির মধ্যে ঢুকে পড়েছে। একটা হেরিকেনের মতো আলো খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে জ্বালানোর চেষ্টা করছে। সে আলোতে অন্ধকার তো কাটছেই না; উল্টো অন্ধকার ঘোলা হয়ে আরও কেমন ভয়ংকর লাগছে। মামা এবার কাতর হয়ে বলল, 'ভাই আমাদের এখন তাহলে কী হবে?'

লোকটা আরও শীতল গলায় জবাব দিল, 'আপনাগো কী হবে, আমি জানি না। তয় রিকশা পাবেন না।'

'কেন? কেন পাব না!'

'পথে ভয় আছে।'

মামা আর আমি; দুজনই কেঁপে উঠলাম। মামা কাঁপতে কাঁপতেই জিজ্ঞেস করল, 'কিসের ভয়?'

'শকশো। শকশোর ভয় আছে।'

সেই শকশো! সাহেব ওঝা যে শকশোর কথা বলেছিল, সেই শকশো!

ইন্দুরমুখো ফজলা ভাই

সেই জমিদার বাড়িতে বলল সাহেব ওঝা। আবার এই ভয়ানক স্টেশনে এসে বলল এই তক্ষকের মতো দেখতে গার্ড। শকশ যেন আমাদের পিছু নিয়েছে। শকশোটা কী, তা-ই বুঝতে পারছি না। প্রশ্ন করলে কেউ উত্তর দিতে পারে না। শুধু ভয়ে ভয়ে চেয়ে থাকে। আমরা বুঝতে পারছি, শকশো একটা ভয়ানক কিছু।

এই পোড়ো এক স্টেশন, যেখানে সন্ধ্যের পর তক্ষকের মতো একটা গার্ড ছাড়া আর কেউ থাকে না, থেকে থেকে তক্ষকের ডাক শোনা যায়; সেখানে বসে শকশোর ভয় কার না লাগে বলো? মামার আর দোষ কী? আমি কাঁদো কাঁদো গলায় বললাম, 'মামা ওনার কাছে শোনো, ময়মনসিংহ ফেরার গাড়ি কখন। আমরা ফিরে যাব। আমি আর বাঞ্ছারামপুর যাব না।'

মামাও মনে হয় এটাই ভাবছিল। কিন্তু সে তো বড় মানুষ। আমার মতো এত ভয় পেলে তার চলে না। তাই একটু সাহস গলায় এনে বলল, 'আরেহ ধুর। সবকিছুতে ভয় পাস কেন? ওসব কিছু না। এখন ঝামেলা একটাই, রাতটা এই স্টেশনেই থাকতে হতে পারে। রিকশা পাওয়া যাবে না; রিকশা তো নাই এখানে।'

'আমি আছি। আমি যাতি পারি'—মিন মিন করে কথাটা শোনা গেল আমাদের পেছন থেকে, স্টেশন ঘরের দরজার থেকে।

ও বাবা! এ কে! এ তো তক্ষকের চেয়েও ভয়ানক চেহারার এক লোক। লোকটাকে দেখতে এক্কেবারে ছুঁচো ইঁদুরের মতো। মুখটা ঠিক ইঁদুরের মতো সরু; ইয়া লম্বা একটা থুতনি। থুতনির নিচে সাত-আট গাছা দাড়ি। সারা মুখে আর দাড়ি-গোঁফ কিছু নেই। মাথায় চুল আছে কিনা বোঝার উপায় নেই; মাথায় মস্ত একটা লাল টুপি পরা।

লোকটার বোধহয় লাল রংয়ের নেশা আছে। গায়ে বিশাল লম্বা একটা লাল কোট; ওই যে ইংরেজি সিনেমায় বরফের মধ্যে নায়করা যেমন কোট পরে হাঁটে ওইরকম লম্বা কোট। কোটের নিচে আবার পাঞ্জাবি আর লুঙ্গি। সবচেয়ে বিচিত্র ব্যাপার—গলায় লাল ক্যাটকেটে একটা মাফলার প্যাঁচানো। সবমিলিয়ে লোকটাকে দেখলে একটা বিশাল লাল ইন্দুর মনে হয়।

দেখতে যেমনই হোক, কথাটা শুনে আমাদের ভালো লেগে গেল—সে বাঞ্ছারামপুর যাবে! মামা আনন্দে ডগোমগো হয়ে বলল, 'বলেন কী? আপনি যাবেন! আপনার রিকশা আছে?'

লোকটা মিন মিন করে কি যেন বলার আগেই খ্যাঁক করে উঠল ট্রেন স্টেশনের সেই তক্ষক। টিম টিম করতে থাকা হারিকেনটা নিজের চোখের কাছে উঁচু করে লোকটাকে দেখে খিটমিটে গলায় বলল, 'ও কী যাবে! ও তো পাগল। এই ফজলা, দূর হ এইখান থেকে।'

ফজলা বা ইন্দুর; মানে ইন্দুরমুখো ফজলা লোকটা একটুও দূর হলো না। ফিক করে হেসে মিন মিন করে বলল, 'আমি দূর হলে তোমার এই সাহেবরা বাঞ্ছারামপুর যাবে কী করে? আমারটা ছাড়া আর রিকশা পাবে এহন? আমার সঙ্গেই যাতি হবে...'

তক্ষক আরও বিরক্ত হলো। হারিকেনটা টেবিলের ওপর ধপ করে নামিয়ে রেখে একা একা বলল, 'গেলি যাক। আমার কী?'

মামার আর তক্ষকের কথা শোনার সময় নেই। তাড়াতাড়ি ফজলার দিকে এগিয়ে বলল, 'আপনার রিকশা কই? মঞ্জুর সাহেবদের বাড়ি চেনেন আপনি? কত টাকা নেবেন?'

মামার এই এক সমস্যা। একেকবারে তিন-চারটে করে প্রশ্ন করে। কিন্তু ইন্দুরমুখো ফজলা দেখা গেল মামার প্রশ্নে একটুও ঘাবড়াল না। মাথা নিচু করে মিন মিন করে বলল, 'সমস্যা নাই। রিকশায় ওঠেন। ভাড়া যা মন লয়, দিয়েন।'

মামা আর কথা বাড়াল না। আমি ক্লাস সেভেনে পড়ি, আমি আর কী বলব? মামার পেছন পেছন স্টেশন থেকে বেরিয়ে একটা বন্ধ দোকানের সামনে রাখা রিকশায় উঠে পড়লাম। তখন বেশ অন্ধকার হয়ে গেছে। পাঁচ হাত দূরের আর কিছু দেখা যায় না। মামা রিকশায় উঠতে উঠতে বলল, 'হারিকেন ধরাবেন না, ভাই?'

ইন্দুরমুখো ফজলা আমাদের দিকে না ফিরে মিন মিন করে বলল, 'আমার হারিকেন লাগে না। অন্ধকারে আমি ভালো দেখি।'

আমার শরীর কেমন শিউরে উঠল। মামার এক হাত চেপে ধরে দেখি, হাত কেমন ঠান্ডা হয়ে গেছে। তার মানে মামাও ভয় পেয়েছে। এই অবস্থায় মামাকে অবশ্য আর দোষ দেওয়া যাচ্ছে না। আমারও ভয় করছে; ভয়ানক ভয় করছে।

ভয়ে টেরই পেলাম না, পাকা রাস্তা ধরে মিনিট পাঁচেক চলেই কখন আমরা কাঁচা রাস্তায় চলে এসেছি। কাঁচা রাস্তায় পড়েই রিকশাটা একটা ঝাঁকুনি খেল, সঙ্গে সঙ্গে ভয় পালিয়ে গেল। ওই যে বলে না যে, 'পিটুনির নাম বাবাজি; ভূত পলায় ব্যথায়।' বুঝলাম, ব্যথা পেলে ভয়ও পালিয়ে যায়। তার চেয়েও বড় কথা বুঝলাম, খালি খালি ভয় পাচ্ছিলাম আমরা। সাকি মামাও দেখলাম, ভয় কাটিয়ে ফেলেছে। অন্ধকারে অবশ্য মামার মুখ দেখতে পাচ্ছিলাম না; তারপরও বুঝলাম, ভয়টা একটু কমেছে।

একটু পর আর বুঝতে হলো না। বেশ গলায় সাহস-টাহস এনে মামা আমাদের ইন্দুরমুখো ফজলা সাহেবকে জিজ্ঞেস করল, 'তা ফজলা ভাই, আপনার বাড়ি কই?'

ফজলা লোকটার গলার ব্যাটারিতে মনে হয় সমস্যা আছে। জোরে কিছু বলতে পারে না। রেডিওর ব্যাটারি ফুরিয়ে যাওয়ার মতো আওয়াজে কিন কিন করে বলল, 'আমার তো বাড়ি নাই।'

'বাড়ি নাই মানে কী!'—মামা খেপে গেল।

বাসায় সারাক্ষণ বাবার ধমক খেতে খেতে সাকি মামা কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে। বাইরে বেরিয়ে যাকে পায়, ধমক দেয়। ধমক খেয়ে ফজলা আরও মিন মিন করে বলে, 'আমার কেউ নাই। এই রেল স্টেশন, নাইলে ওই বাঞ্ছারামপুরের মসজিদে পইড়া থাকি।'

ইন্দুর চেহারার ফজলার জন্য খারাপ লাগল—আহা লোকটার কেউ নেই। সাকি মামারও মনে হয় খারাপ লাগল। বড় করে একটা নিঃশ্বাস ফেলল। বিলাই স্বভাবের মানুষ তো; অল্পেই মানুষের জন্য খারাপ লাগে।

একটু সময় চুপ থেকে আবার কথা শুরু করল মামা। আমরা তখন মনে হয় একটা বিলের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি। কাঁচা রাস্তায় রিকশাটা খুব লাফাচ্ছে। আকাশে সুন্দর চাঁদ উঠেছে। চারদিকে অন্ধকারের মধ্যেও ধানক্ষেত, মূলাক্ষেত দেখা যাচ্ছে। দূরে একটা-দুটো ছোট ছোট আলো দেখা যাচ্ছে। মামা বলল, ওগুলো নাকি বাড়ির আলো। গ্রামের বাড়িগুলো এমন ফাঁকা ফাঁকা হয়!

সাকি মামা হঠাত্ জিজ্ঞেস করল, 'আচ্ছা, ফজলা ভাই, এই যে শকশো না কি যেন; যার ভয়ে কেউ সন্ধ্যার পরে রিকশা চালায় না। তুমি শকশো ভয় পাও না?'

মামার এটা জিজ্ঞেস করার কী দরকার ছিল? আসলেই সাকি মামাটা গাধা-মামা হয়ে যাচ্ছে। আমি তখন ভাবছিলাম, ফজলা যেন এই কথার কোনো উত্তর না দেয়। তা-ই হলো। ফজলা চুপ করে রইল। কিন্তু মামার মাথায় কিছু একটা চেপেছে। আবার জিজ্ঞেস করল, 'বলো তোমার ভয় লাগে না?'

ফজলা এবার কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, 'পাই তো। দারুণ ভয় পাই।'

মামা আবার ঘাবড়ে গেছে। আস্তে আস্তে কথা বলছে। যেন জোরে বললে শকশো শুনতে পাবে, 'তাহলে তুমি যে আসলা?'

'আমার তো কেউ নাই।'

ভয়টা চেপে বসেছে। বিলাই মামা ভয় একটু বেশিই পায়। আমি ক্লাস ফাইভে পড়ি, আমি তো ভয় পেতেই পারি। আমি আস্তে আস্তে মামার হাত চেপে ধরলাম। মামা ভয় তাড়ানোর জন্য শুধু জিজ্ঞেস করল, 'শকশো কী করে? মানুষ ধরে মেরে ফেলে?'

ফজলা বিড় বিড় করল, 'তা তো জানি না। শুনছি, শকশো যারে ধরে সেও নাকি শকশো হয়ে যায়। এই পথে কাউরে একা পাইলে তারে শকশো ধরে। পরে সে শকশো হয়ে যায়। তার চোখ দিয়া আগুন বাইর হয়। আর কেউ তারে খুঁজে পায় না।'

বলে কী ফজলা!

আমরা ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে রিকশায় বসে আছি। বিলের পথ ধরে ঝাঁকি খেতে খেতে চলছে ফজলার রিকশা। হঠাত্ রিকশা থেমে গেল। ফজলা চাপা গলায় বলল, 'নামেন।'

এই বিলের মাঝে কেন নামব! ফজলা কী করতে চায়?

মামা খেপে ওঠার আগেই ফজলা বলল, 'সামনে উঁচা ব্রিজ। টাইনা তোলা যাবে না।'

নামতে হলো। নেমে আমরা আলাদা হলাম না। ফজলা রিকশা টেনে এগোতে লাগল। আমরা তাড়াতাড়ি রিকশার পেছন পেছন হাঁটতে লাগলাম। রাস্তার মাঝখান ধরে হাঁটছি। রাস্তার পাশে গেলে যেন বিপদ। মনে হলো, এই কোথায় যেন শকশো আছে, অপেক্ষা করছে; যদিও আমরা জানি না, শকশো দেখতে কেমন।

ফজলা হন হন করে ব্রিজে উঠে গেল। আমরা একটু পেছনে পড়ে গেলাম। আমি কাঁপা কাঁপা গলায় মামাকে বললাম, 'মামা, আমার ভয় করছে।'

মামাও কাঁপা কাঁপা গলায় সাহস দিল, 'ভয়ের কী আছে?'

'মামা, ফজলা শকশো না তো?'

মামা কোনো কথা বলল না। সে ভয় পেয়েছে। আমি বুঝলাম, মামাও ভাবছে, ফজলা শকশো না তো?

ফজলা আমাদের জন্য দাঁড়িয়ে আছে। আমি চেষ্টা করলাম, ফজলার চোখ দেখতে; চোখে আগুন আছে কি না। ফজলা পেছন ফিরে দাঁড়ানো। চোখ দেখা গেল না। এই রিকশায় কি আর ওঠা ঠিক হবে?

মামা আমাকে টেনে তুলল, নাকি আমি মামাকে টেনে তুললাম; আর বলতে পারি না। শুধু মনে আছে, আমরা রিকশায় উঠলাম। ভয়ে মনে হলো, অজ্ঞান হয়ে যাব। আগে কোনোদিন অজ্ঞান হইনি বলে ঠিক বুঝতে পারছিলাম না, অজ্ঞান কীভাবে হয়।

কেমন ভয়ংকর একটা অবস্থা! এই বিলের মধ্যে রাস্তা, রাস্তার তিন কূলে মানুষ বলে কিছু নেই; একটা গরু-ছাগলও নেই। সেই সুনসান রাস্তায় আমরা বসে আছি একজন ফজলার রিকশায়। যে ফজলা অন্ধকারে ভালো চোখে দেখে, যে ফজলার দুনিয়ায় কেউ নেই এবং যে ফজলা একজন শকশো হলেও হতে পারে!

আমি মনে হয় জ্ঞানই হারিয়ে ফেলেছিলাম। মামাও মনে হয় অজ্ঞান।

হঠাত্ শুনলাম একটা চিত্কার, 'এই যে কাদের, সাগর! আসছো তোমরা!'

মঞ্জু কাকুর গলা! হাতে একটা হারিকেন নিয়ে একটা ভাঙা দোতলা বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে মঞ্জু কাকু। সাথে আরও অনেক লোকজন। মঞ্জু কাকু আরও কিসব যেন বলছে। সে সব বুঝতে পারলাম না।

বুঝলাম, আমরা পৌঁছে গেছি বাঞ্ছারামপুর; আমাদের শকশো ধরেনি; ফজলা শকশো নয়।

কুকুরের নাম ফেসবুক

আমরা রিকশা থেকে নামতেই শকশোর ভয় চলে গেল। কিন্তু তার চেয়েও ভয়ানক একটা কুকুর ছুটে এল। ইয়া বড় একটা কুকুর, আমার বুক সমান উঁচু হবে। মিশমিশে কালো রং, গলার কাছে লোমগুলো একটু বড়, আর জিভটা হ্যা হ্যা করে বাইরে ঝুলছে। দেখে আমি ভয়ে সাকি মামাকে জড়িয়ে ধরলাম। মামা ফিস ফিস করে বলল, 'জার্মান শেফার্ড।'

জার্মান হোক আর ইতালিয়ান; শেফার্ড আমাদের এবার ছিঁড়েই খাবে বলে মনে হলো। তার আগেই মঞ্জু কাকুর পেছন থেকে একটা বাচ্চা মেয়ের কণ্ঠ শোনা গেল, 'এই ফেসবুক, স্টপ।'

কথাটা বলা মাত্র কুকুরটা চুপ করে বসে পড়ল। আস্তে আস্তে আমাদের শুঁকতে থাকল। আমি তখন কুকুর ছেড়ে ওই বাচ্চা মেয়েটার দিকে চেয়ে আছি। ছোট্ট পুতুলের মতো দেখতে মেয়েটা। নীরার চেয়ে একটু বড় হবে, আমার চেয়ে ছোট। আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, 'ফেসবুক বললে কেন?'

মেয়েটা হেসে বলল, 'ওর নাম ফেসবুক, তাই।'

সাকি মামাও অবাক হয়ে গেল। তার নিজের নাম সাকি; তার চেয়েও বড় অবাক কথা, একটা কুকুরের নাম ফেসবুক। এবার মঞ্জু কাকু হেসে বলল, 'ওরা কোথা থেকে যেন এই ফেসবুক ব্যাপারটা শিখেছে। তাই এখন কুকুরটাকে এই নাম দিয়েছে।'

ফেসবুক কী, আমিও জানি। আমাদের স্কুলের পাশে সাইবার ক্যাফেতে অনেকেই নাকি ফেসবুকে ঢোকে। আমি একদিন শরিফ ভাইয়ের ফেসবুক দেখেছি। সেটা মোটেও কুকুরের মতো কিছু না। এই মেয়েটা তাহলে কুকুরের নাম কেন ফেসবুক রাখল। এটা আমাকে জানতেই হবে; জানতেই হবে। কিন্তু সে-সময় আর ব্যাপারটা জানা হলো না। তার আগেই মঞ্জু কাকু বলল, 'চলো তোমরা। ভেতরে চলো। ফ্রেশ হয়ে নাও।'

বাড়িতে বিয়ের লোকজন এখনো আসতে শুরু করেনি। মঞ্জু কাকুর বাড়িতে কারেন্ট নেই। একটা জেনারেটর আনা হয়েছে। আজ চালু হবে না। কাল থেকে চলবে জেনারেটর, পরশু বিয়ে তো। জেনারেটর না থাকলেও আলো তো আছে। আছে হ্যাজাকের আলো। এই আরেকটা নতুন জিনিস দেখলাম এখানে এসে—হ্যাজাক। কেরোসিনেই চলে, কিন্তু নিচে চেপে ধরে পাম্প করতে হয়। আর তাতেই একেবারে কারেন্টের চেয়েও ভয়ানক আলো হয়।

হ্যাজাকের তীব্র আলোয় আমাদের ভয়-টয় কেটে গেছে। আর রাতে ইয়া বড় কই মাছ, পাবদা মাছ, আর খাসির মাংস দিয়ে ভরপেট খেয়ে মামারও ভয় কেটে গেছে। খেতে খেতেই ফজলার প্রসঙ্গ উঠল। শকশোর প্রসঙ্গ উঠল।

মঞ্জু কাকু হেসে বলল, 'ও ফজলা বলছে এসব? ও তো পাগল। এই মসজিদে পড়ে থাকে রাতে।'

শুধু মঞ্জু কাকুর ছোট ভাই রাজু কাকু গম্ভীর হয়ে বলল, 'ফজলা পাগল ঠিকই, কিন্তু মিথ্যে বলে না। শকশো আসলেই আছে।'

এবার আর শকশোর কথা শুনে আমরা ভয় পেলাম না। বারবার ভয় পাওয়া, এই হ্যাজাকের তীব্র আলোয় ভয় পাওয়া; এগুলো ছোটমানুষের কাজ। আমি তো আর ছোট মানুষ না। তাই আর ভয় পাচ্ছি না। ভয় অবশ্য পরে পেয়েছিলাম। সে গল্প পরে বলব। আগে ওই ফেসবুকের গল্পটা শেষ করে নিই; না হলে পরে আবার ভুলে যাব।

রাতে আমরা সুন্দর একটা ঘরে ঘুমালাম। পুরোনো বাড়ির সেকেলে বিশাল খাট। খাটে দুই ধাপ সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হয়। সেই খাটে মোলায়েম গদির ওপর শুয়ে পড়তেই ঘুম চলে আসলো। কখন যে ভোর হলো টের পাইনি। সেই ফেসবুকের ঘেউ ঘেউ আওয়াজে টের পেলাম, দিন হয়ে গেছে।

চোখ ডলতে ডলতে বাইরে এসে দেখি, ঠিক আমাদের রুমের সামনে বসে হ্যা, হ্যা করছে ফেসবুক। মামা কোথায় যেন চলে গেছে। এবার একটু ভয় লাগল। কুকুরটা কীভাবে সামলাব? কি যেন ভেবে বললাম, 'ফেসবুক, সরে দাঁড়াও।'

সরে ঠিক দাঁড়াল না। ফেসবুক সামনের দু পা লাম্বা করে বসে পড়ল। বুঝলাম, সে আমার কথা বুঝতে পারছে। আবার তাই আলতো করে ডাক দিলাম, 'ফেসবুক।'

ফেসবুক উঠে দাঁড়ানোর আগেই পেছন থেকে একটা বাচ্চা মেয়ের কণ্ঠ শুনতে পেলাম, 'তুমি তো ফেসবুকের বন্ধু হয়ে গেছ।'

লজ্জা পেয়ে চমকে পেছন ফিরে দেখি সেই মেয়েটা। মেয়েটা একটু হেসে বলল, 'আমার নাম উর্মি। ফেসবুক আমার কুকুর।'

কী বলব, ভেবে না পেয়ে জিজ্ঞেস করলাম, 'তুমি কি মঞ্জু কাকুর মেয়ে?'

উর্মি হাসতে হাসতে অস্থির, 'মঞ্জু চাচুর মেয়ের তো বিয়ে। আমাকে দেখে কি বিয়ে হবে বলে মনে হচ্ছে?

আমি খুব লজ্জা পেয়ে গেলাম। উর্মিই আবার বলল, 'মঞ্জু চাচু আমার বড় চাচু। আমার বাবা হলেন শাহেদ আকবর; তোমরা যাকে রাজু চাচু বলছ।'

আমি কথা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। তাই ফট করে বললাম, 'তুমি কোন ক্লাসে পড়?'

উর্মি শুধু হাসে। হাসতে হাসতেই বলল, 'ক্লাস সিক্সে।'

যাক, মেয়েটা আমার চেয়ে ছোট আছে। এবার আমি বেশ সাহস পেলাম। আরেকটু গম্ভীর হয়ে প্রশ্ন করলাম, 'রোল কত?'

মেয়েটা হেসে বলল, 'তুমি কি স্যার নাকি? রোল, ক্লাস কেন জানতে চাচ্ছ? এখন কি পড়া ধরবে?'

বলে খিল খিল করে হেসে ফেলল মেয়েটা। আমি লজ্জা পেয়ে গেলাম। কিছু কথা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। তো তো করে বললাম, 'না, মানে এমনিই।'

মেয়েটা মুচকি হেসে বলল, 'আমার রোল এক। যাক, তুমি এখন নিচে চলো। সবাই নাশতা করে ফেলেছে। তোমাকে ডেকে নিয়ে যেতে বলেছে আমাকে।'

আবার একটু ঝামেলা হয়ে গেল। আমি তো ঘুম থেকে উঠে এখনো কিছু করিনি। যা যা করতে হবে, মেয়েটাকে বলাও যায় না। তাই একটু এদিক ওদিক তাকাচ্ছিলাম। মেয়েটা বিরাট ফাজিল। হেসে বলল, 'তুমি কী খুঁজছ, বুঝতে পারছি। এখানে বাথরুম-টয়লেট সব নিচে। নিচে চলো, পেয়ে যাবে।'

এই মেয়েটা বদ আছে। একে একটা শিক্ষা দেওয়া দরকার। রাজীবকে নিয়ে আশা দরকার ছিল। তাহলে উচিত শিক্ষা দেওয়া যেত। রাজীব একবার এশাকে যা শিক্ষা দিয়েছিল! কিন্তু আমি একা ওরকম কিছু করতে পারব না। তাই চুপচাপ উর্মির পেছন পেছন নিচতলায় নেমে এলাম। আমার কাজবাজ সেরে খাবার ঘরে ঢুকে দেখি, প্রায় সবার নাশতা শেষ। তাড়াতাড়ি নাশতা করে বাইরে এসে দেখি সাকি মামা সিনেমার নায়কদের মতো করে কোমরে হাত রেখে, চশমা একটু উঁচু করে, ঘাড় বাঁকিয়ে বাড়িটা দেখছে।

আমার পায়ের শব্দ পেয়ে মুখটা একটুও না ফিরিয়ে বলল, 'সাগর, বাড়িটা দেখেছিস! খুব ইন্টারেস্টিং। তোদের ওই জমিদার বাড়ির চেয়েও পুরোনো বাড়ি হবে।'

ধ্যাত। তা-ই হয় নাকি! এ বাড়িটা তো কত সুন্দর আছে। আমাদের ওই জমিদার বাড়ি তো ভেঙেচুরে গেছে। এটা কি করে বেশি পুরোনো হবে?

সাকি মামা মনে হয় আমার মনের কথাটা বুঝতে পারল। হেসে বলল, 'ওই জমিদার বাড়িটা ভেঙেছে অযত্নে। এরা তো যত্ন করে রাখে, তাই কিচ্ছু হয়নি। কিন্তু বাড়িটার ডিজাইন দেখ। এরকম জানালা তুই আগে দেখেছিস? কার্নিসে এরকম ডিজাইন দেখেছিস?'

তা ঠিক, জানালাগুলো কেমন বেশি ছোট। আর জানালাগুলো কাঠের সরু সরু ফালি বসানো; হারমোনিয়ামের রিডের মতো। মামা বলল, ওগুলো নাকি ভেতর থেকে টান দিলে ফাঁক হয়ে যায়। দেখতে দেখতেই অবাক হয়ে বললাম, 'আসলেই তো অন্যরকম, মামা।'

'বাড়িটার আরও মজা আছে। ছাদে গেলে দেখতে পাবে'—উর্মি চলে এসেছে।

আমি চাচ্ছিলাম না উর্মির সঙ্গে ছাদে যেতে। কিন্তু সাকি মামাটা আসলেই বোকা আছে। তাড়াতাড়ি বলে, 'বাহ, চলো, তোমাদের ছাদটা দেখে আসি।'

বিয়ে বাড়ির ভিড় তখন কেবল জমতে শুরু করেছে। এ জায়গা, ও জায়গা থেকে আত্মীয়রা আসছে। কাউকেই চিনি না। উর্মি বলল, সেও নাকি এদের কাউকে চেনে না। উর্মির যে আপুর বিয়ে; তার সঙ্গে এখনো দেখা হয়নি। সাকি মামা একবার বলল, ছাদ থেকে নেমে তার সঙ্গে দেখা করবে।

এদের ছাদে ওঠাটা একটা ভয়ানক ব্যাপার। সিঁড়িটা একেবারে সরু। সরু মানে একটু মোটা মানুষ হলে আর সোজা হয়ে উঠতে পারবে না। আর কী ভয়ানক খাড়া! এক তলায় উঠতে উঠতে দম ফুরিয়ে যায়। তাও ভাগ্য ভালো যে খুব উঁচু দালান না; তিন তলা।

ছাদে উঠতেই অবশ্য মনটা ভালো হয়ে গেল। বিশাল ছাদ বললেও, ঠিক বলা হয় না। মনে হয়, এই ছাদে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল ফুটবল ম্যাচ খেলা যাবে; এত্তো বড়। কিন্তু ছাদটার মজা আসলে শুধু বড়, সে-জন্য না। ছাদের এক পাশে দেখি আরেকটা সামান্য উঁচু ছাদ। ওটা দেখেই ভারি মজা পেলাম। আমি ছুটে গিয়ে ওটার ওপর উঠলাম।

উর্মি হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করল, 'বলো তো, এখানে আরেকটা উঁচু ছাদ কেন?'

আমি বোকার মতো চেয়ে রইলাম। আমি তো জানি না, কেন এমন ছাদ। তবে আমি কিছু বলার আগেই সাকি মামা উত্তর দিল, 'এটাকে বলে জল-ছাদ। এই অংশটার নিচে নিশ্চয়ই কারও শোবার ঘর। সেই ঘরটা যাতে গরমের দিনে রোদে বেশি গরম না হয়, তাই এরকম এক্সট্রা একটা ছাদ বানিয়ে নেওয়া হতো।'

উর্মি একটু হতাশ হয়ে বলল, 'ঠিক। বাবাও তা-ই বলে।'

তারপরই উর্মি আবার প্রশ্ন করল, 'ঠিক আছে। তাহলে বলো তো, ওগুলো কী?'

দেখি আঙুল দিয়ে একটা রডের মতো কি যেন দেখাচ্ছে। ছাদের এক কোনায় খানিকটা জায়গা পিলারের মতো উঁচু। সেই পিলার থেকে বেশ লম্বা একটা রড ওপরের দিকে উঠে গেছে। রডটার মাথায় আবার কেমন যেন একটা ডিজাইন করা। এটাও আমি চিনি না। আবার আমি মামার দিকে চাইলাম। মামা এবার উর্মিকেই জিজ্ঞেস করল, 'আমি তো জানি, ওটা কী? তুমি কি জানো?'

এতক্ষণে উর্মি বলার মতো কিছু খুঁজে পেল। একগাল হেসে বলল, 'ওটা হলো বজ্রনিরোধক দণ্ড।'

আমি হতভম্ব, 'মানে কী!'

'মানে হলো, এই দালানের ওপর যাতে বজ্রপাত না হয়, সে-জন্য ওটা লাগানো হয়েছে।'

'ওটা দিয়ে বজ্রপাত কীভাবে ঠেকাবে?'

এবার সাকি মামাই উত্তর দিল, 'হয় কী, যেকোনো জায়গায় সবচেয়ে উঁচু বিন্দুতেই বজ্রপাত হয়। আর সেটা ধাতব কিছু হলে; অবশ্যই সেখানে বজ্রপাত হবে। এখন এই রডটা লাগানোয় বাড়ির আর কোথাও বজ্রপাত না হয়ে, ওই রডে হবে। আর রডের অংশটা সরাসরি মাটিতে নেমে গেছে। তাই ওই রডে বজ্রপাত হলে বাড়ির কোনো ক্ষতি হবে না; তীব্র ভোল্টেজের বিদ্যুত্ সরাসরি মাটিতে চলে যাবে।'

আসলেই সাকি মামা কিন্তু পণ্ডিত মানুষ। বাবা যা-ই বলুক, সে মোটেও গাধা-মামা না।

আমরা আরও অনেকক্ষণ গল্প করতাম। কিন্তু এর মধ্যে নিচ থেকে মঞ্জু কাকুর গলা শোনা গেল, 'কাদের, সাগর। তোমরা কোথায়? নিচে আসো। দেখো কারা এসেছে।'

ইস। এখন ভেবেছিলাম, কুকুরটার নাম ফেসবুক কেন, তা নিয়ে কথা বলব। হলো না। নিচে নামতে নামতে উর্মি শুধু বলল, 'সাকি মামা, আপনি আব্বুর সাথে একটু কথা বলবেন। আসলেই কিন্তু আমাদের গ্রামে শকশো নিয়ে খুব ঝামেলা হচ্ছে।'

আবার শকশো!

শকশোর খোঁজ

সাকি মামা অস্থির হয়ে বললেন, 'আসলে শকশো জিনিসটা কী? সেটা একটু বুঝিয়ে বলুন।'

আমরা রাজু কাকু, মানে উর্মির বাবার রুমে এসেছি। সেই ছাদ থেকে নামার পর দুপুর পর্যন্ত আর আমরা একটু কথা বলার সুযোগ পাইনি। সকালে সেই এক গাদা আত্মীয় আসলো ঢাকা থেকে। এর মধ্যে আবার দেখা গেল, একজন সাকি মামার পরিচিত বের হয়ে গেছে। তাদের নিয়ে মঞ্জু কাকু, রাজু কাকু, সাকি মামারা বিরাট গল্পগুজব শুরু করে দিল। উর্মিও ভেতরে কোথায় যেন চলে গেল। বিয়ে বাড়ি তো; কেউ কারও খবর রাখছে না।

আমি বোকার মতো দালানের এপাশ ওপাশ ঘুরে বেড়ালাম। একটা লাভ হলো। আমি ঠিক করলাম, আরেকটু বড় হলে এখানেও গুপ্তধন খুঁজতে আসতে হবে। পেলে না হয় উর্মিদের কিছু ভাগ দিয়ে দেব। ভেবেছিলাম, উর্মিকে সামনে পেলে গুপ্তধনের ব্যাপারটা বলব।

তা আর হলো না। তার আগেই উর্মি এসে ডাক দিল, 'এই এখানে একা একা কী করো?'

আমি থতমত খেয়ে গেলাম। বললাম, 'কিছু না।'

'আচ্ছা। তুমি পরে এসে আবার কিছু-না কোরো। এখন আব্বুর রুমে চলো। তোমার সাকি মামা আর আব্বু কথা বলছে।'

নিশ্চয়ই শকশো নিয়ে কথা। আমি আর উর্মি ছুটে চলে এলাম। এসে দেখি শকশো নিয়ে কথাই শুরু হয়নি। সাকি মামা এই রাজু কাকুর সঙ্গে কিসব পারিবারিক ব্যাপার নিয়ে আলাপ করছে; দুজন মুখোমুখি দুটো চেয়ারে বসেছে। মাঝে টেবিলে চা আর চানাচুর রাখা। আমরা পাশের খাটটায় উঠে বসলাম। আমাকে দেখে রাজু কাকু বলল, 'এই যে সাগর। আসো। তোমার মামা বলল, তুমি নাকি একজন খুদে গোয়েন্দা?'

এহ। মামা নিশ্চয়ই আমার আর রাজীবের গোয়েন্দাগিরির ব্যাপারটা বলে দিয়েছে। সেটা একেবারে ফালতু একটা ব্যাপার ছিল। তখনও আমরা গুপ্তধন খোঁজা শুরু করিনি। আমাদের দুজনের একটা গোয়েন্দা দল ছিল তখন। আমরা টুকটাক গোয়েন্দাগিরি করতাম। একবার বড় একটা কাজ পেয়ে গিয়েছিলাম। আমাদের পাড়ার রনি সেবার হারিয়ে গেল। রনি ক্লাস থ্রিতে পড়ত।

সকাল বেলা থেকে ওকে খুঁজে না পেয়ে সবাই অস্থির। আমরা অস্থির না হয়ে নানারকম সূত্র খুঁজে, কিছু লোকের কথা আড়ি পেতে শুনে অপরাধী ধরে ফেললাম—বাজারের রসুল দোকানদার। সাকি মামাকে গিয়ে বুঝিয়ে বলতে, সাকি মামা আমাদের নিয়ে গেলেন থানায়। পুলিশ এসে রসুলকে ধরে ফেলল। সে এক মহা কাণ্ড। আমরা দুপুরের মধ্যেই কিডন্যাপার রসুলকে ধরে নিয়ে পুলিশের সঙ্গে রনিদের বাড়ি গেলাম।

তারপরই হলো কেলেঙ্কারি। ওদের বাড়ি গিয়ে দেখি, রনি ওর বাবার মার খেয়ে বেদম কাঁদছে। কেন? ওকে কেউ কিডন্যাপ করেনি। ও আসলে নিজেই বাড়ি থেকে পালাতে চেয়েছিল। ওর বাবা নদীর ওপার থেকে ধরে এনেছেন। আমাদের কথায় পুলিশ রসুলকে ধরেছে কিডন্যাপার বলে। স্রেফ ছোটমানুষ বলে আমাদের তখন কেউ মার দেয়নি।

সেই থেকে আমরা গোয়েন্দাগিরিই ছেড়ে দিলাম।

মামা এখন আবার সেই গোয়েন্দাগিরির গল্প করছে! কেলেঙ্কারি হয়ে গেল। তবু ভালো যে গল্পটা বললেও উর্মি শুনতে পায়নি। তাই আমি আর কথা না বাড়িয়ে চুপ করে রইলাম। সাকি মামাই কথা ঘোরালো। রাজু কাকুকে জিজ্ঞেস করল, 'আপনারা সবাই কি এই বাড়িতেই থাকেন?'

রাজু কাকু হেসে বললেন, 'নাহ। তা আর সবাই একসঙ্গে থাকতে পারি না। আমি তো উর্মি আর ওর মাকে নিয়ে ময়মনসিংহ শহরেই থাকি। ওখানে একটা চাকরি করি।'

'তাহলে এ বাড়িতে থাকে কে?'

'এতদিন তো মঞ্জু ভাইয়া, ভাবি আর তার মেয়েটা ছিল। দুজন কাজের মানুষ আছে। কিন্তু এখন মেয়েটাও চলে যাবে ওর শ্বশুরবাড়ি; কিশোরগঞ্জে। ভাইয়া আর ভাবি খুব একা হয়ে যাবে। আর সেটা নিয়েই আছি দুশ্চিন্তায়।'

'দুশ্চিন্তা কেন?'

রাজু কাকু একটু চুপ করে রইল। তারপর মাটির দিকে চেয়ে বললেন, 'আরে, ওই যে শকশোর কথা শুনছেন না? গত মাসকয়েক ধরে এই এক উত্পাত শুরু হয়েছে পুরো বাঞ্ছারামপুর জুড়ে।'

এবার আসলেই আমরা খুব অবাক হলাম। রাতের বেলা, নির্জন স্টেশনে বা রিকশায় ভয় পাওয়া এক কথা। আর দিনের বেলা এরকম বয়স্ক একজন মানুষ শকশো নিয়ে দুশ্চিন্তা করলে আরেক কথা। এখন তো মনে হচ্ছে, আসলেই শকশো বলে কিছু একটা আছে। আর এখানে সবাই সেটার ভয় পায়।

এইবার মামা একটু উত্তেজিত হয়ে বলল, 'আসলে শকশো জিনিসটা কী? সেটা একটু বুঝিয়ে বলুন।'

রাজু কাকু বলল, 'এটা হচ্ছে একটা ছেলে ভোলানো ভূতের মতো ব্যাপার। সব এলাকায় ভূতের কিছু নিজস্ব নাম আর বর্ণনা থাকে না; এটাও সেরকম। আমরা ছোটবেলা থেকেই শুনছি যে, বাইরে যাস না, শকশো আসবে। শকশো ধরে নিয়ে যাবে। তখন শুনতাম শকশো পানিতে থাকে। একা একা পুকুরপাড়ে গেলে হুট করে টেনে নিয়ে যায়। এটা তো আর সিরিয়াস কিছু না। বাচ্চাদের জন্য এই গল্প বলা হয়। কিন্তু এখন শোনা যাচ্ছে, আমাদের গ্রামে সত্যিই নাকি একটা শকশো আছে।'

আমি ভয় পেয়ে গেলাম। উর্মিও মনে হয় দারুণ ভয় পেয়েছে। আমার দিকে একটু এগিয়ে এসে বসল।

সাকি মামাও তো ভীতু মানুষ। সেও একটু ভয় পেয়ে গেল। তারপরও জিজ্ঞেস করল, 'কী শোনা যাচ্ছে? শকশো আছে, এটা কারা বলছে? কী করে এই শকশো?'

এতোগুলো প্রশ্ন শুনেও রাজু কাকু চুপ করে রইলেন। তারপর মাথা তুলে বললেন, 'কী করে; সেটা শুনলেই অবাক হবেন। শকশো মানুষকে হাওয়া করে দিচ্ছে। শকশোর সামনে যে পড়ে; সেও নাকি শকশো হয়ে যায়। কদিন পর তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না।'

আমি প্রায় চিত্কার করে উঠলাম, 'বলেন কী!'

রাজু কাকু একইভাবে বলে চললেন, 'হ্যাঁ। এ পর্যন্ত আমাদের এইটুকু গ্রামে সাত জন লোক নিরুদ্দেশ হয়েছে। বলা হচ্ছে, সাত জনই শকশোর শিকার।'

সাকি মামাও শিউরে উঠল, 'এ তো ভয়ানক ব্যাপার! পুলিশ কিছু করছে না?'

'পুলিশ প্রত্যেকবারই এসেছে খবর পেয়ে। কিছু করতে পারেনি। ওপরে জিজ্ঞেস করলে বলে, তারা দেখছে কী করা যায়। এখন গ্রামের মানুষই কিছু সিস্টেম ঠিক করে নিয়েছে।'

'কেমন সিস্টেম?'

'রাতে একা একা কেউ বাড়ি থেকে বের হয় না। একা একা পেছনে টিলার ওদিকে যায় না কেউ।'

এবার সাগর একটু কথা বলার সুযোগ পেল, 'টিলার ওদিকে কী সমস্যা?'

রাজু কাকু সাগরের দিকে চেয়ে হাসলেন, 'টিলার ওদিকেই তো সমস্যা। আমাদের এই বাড়ির পেছনে বাগানের পর থেকেই শুরু হয়েছে টিলাগুলো। আর টিলার ওদিক থেকেই নিরুদ্দেশ হয়েছে সবগুলো লোক।'

সাকি মামা প্রশ্ন করল, 'সবগুলো ঘটনাই কী রাতে ঘটেছে?'

'প্রথম দিকে তা-ই ঘটত। কিন্তু শেষ তিনটে ঘটনা একেবারে দিনে দুপুরে ঘটেছে। বাড়ি থেকে টিলার ওদিকে গেছে কাজে। আর কখনো ফেরেনি।'

সাকি মামা হঠাত্ করে কেমন যেন ফর্ম ফিরে পেল। একটু ভেবে নিয়ে বলল, 'একটাও লাশ পাওয়া যায়নি নিশ্চয়ই?'

'নাহ। দল বেঁধে গ্রামের লোক টিলার ওপাশ তন্ন তন্ন করে ফেলেছে। কিচ্ছু পায়নি।'

সাগরও সাকি মামার দেখাদেখি গোয়েন্দাগিরি করতে চাচ্ছে, 'সব জায়গা খোঁজা হয়েছে?'

রাজু কাকু একটু ইতস্তত করছে। তারপর বলল, 'আমি তো এখানে থাকি না। আমিও এসে এসব প্রশ্নই করেছি। এটাও জানতে চেয়েছিলাম। সবাই বলেছে, সব জায়গাই খোঁজা হয়েছে। একটা জায়গা ছাড়া।'

'কোন জায়গা?'

'নাদের আলীর সুড়ঙ্গ ছাড়া।'

এবার ওরা আরও অবাক হলো, 'নাদের আলীর সুড়ঙ্গ!'

'হ্যাঁ, এই সুড়ঙ্গে কী আছে, কেউ জানে না। আমরা ছোটবেলায় শুনতাম এই সুড়ঙ্গ দিয়ে নাকি ভারতে চলে যাওয়া যায়। আসলে কী, কে জানে। তবে একটা বড় টিলার নিচে বিশাল গুহার মুখ আছে। এই সুড়ঙ্গে নাকি একসময় নাদের আলী বলে এক লোক থাকত। সেই থেকে নাম নাদের আলীর সুড়ঙ্গ। আমার ধারণা, সব রহস্য এই সুড়ঙ্গেই আছে।'

আমরা আর কোনো কথা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। এত্তো ভয়ানক ব্যাপার আমরা কল্পনাও করিনি। শকশো একটা ভয়ের ব্যাপার বুঝতে পারছিলাম। তাই বলে এরকম সাত জন মানুষ হাওয়া করে দেবে, গ্রামের লোক ভয়ে ঘর থেকে বের হবে না; এটা আমরা কল্পনাও করিনি। একটা জিনিস বুঝতে পারলাম, এটার কোনো সমাধান করা আমাদের কম্ম না।

এর সমাধান করতে শার্লক হোমস, ফেলুদা বা সাহেব ওঝাকে লাগবে।

আমি আর উর্মি চুপ করে বসেছিলাম। সাকি মামা উঠে পড়ল। সেও মনে হয় আর মাথা ঘামাতে চায় না। শুধু ঘর থেকে বের হয়ে যাওয়ার সময় জিজ্ঞেস করল, 'আচ্ছা, মঞ্জু ভাইকে নিয়ে আপনি ভয় পাচ্ছেন কেন? উনি তো আর একা একা কোথাও যাবেন না।'

রাজু কাকু মাথাটা দুদিকে নেড়ে হতাশ গলায় বলল, 'সেটাই তো সমস্যা। ভাইয়ার একা না গিয়ে উপায়ও নেই। টিলার ওদিকেই আমাদের একটা জমি আছে। সেখানেই আমাদের ফসল হয়। আমাদের পরিবারের সারা বছরের মূল আয় আসে ওখান থেকে। ভাইয়াকে মাঝে মাঝে তো জমি দেখতে যেতে হয়। সেটাই হলো সমস্যা...'

আবার ফজলার সঙ্গে

বিছানায় আধশোয়া হয়ে থাকা সাকি মামাকে এখন দেখে সাকিদা বলে ডাকতে ইচ্ছে করছে!

ফেলুদা যেমন করে চারমিনার টানত; ঠিক সেই বইয়ের মতো করে ভারি আয়েশ করে সিগারেট টানছে এখন সাকি মামা। এমনিতে সাকি মামা খুব একটা সিগারেট খায় না। কিন্তু কোথাও বেড়াতে গিয়ে ভাব এসে গেলে দু-এক টান দেয়।

আজও তা-ই করছে। সেকেলে এই মঞ্জু কাকুদের বাড়িতে এসে শকশো রহস্যের সামনে পড়ে সাকি মামার ভারি ভাব এসে গেছে। আমি নিশ্চিত, মামা এখন নিজেকে হোমস-টোমস কিছু একটা মনে করছে। তাই এভাবে সিগারেট টানছে। আমি এই সিগারেটের ধোঁয়া একটুও সহ্য করতে পারি না।

তাই বিরক্ত হয়ে বললাম, 'মামা সিগারেট খেলে বাইরে গিয়ে খাও। তোমার জ্বালায় এখন রুমের ভেতর গন্ধ হচ্ছে।'

মামা উদাস হয়ে ছাদের দিকে তাকিয়েই জবাব দিল, 'আরে, সিগারেট না খেলে কি বুদ্ধি খোলে নাকি? এখন বুদ্ধির খুব দরকার।'

'হুঁহ। তোমার আবার বুদ্ধি! এই শকশো নিয়েই তো ভাবছ। কিছু বের করতে পারলে সিগারেটের বুদ্ধি দিয়ে?'

'নাহ রে। কিছু বের করতে পারিনি। তবে একটা প্রশ্ন আসছে মাথায়।'

'কী প্রশ্ন?'

'শকশো কেন একা লোক পেলে তবেই মারবে। শকশোর কি গায়ের জোর কম? আর মানুষ মারার জন্য টিলার দিকটাই কেন বেছে নেবে? শকশো যদি ক্ষমতাশালী একটা ভূত হয়, সে তো গ্রামের যেকোনো জায়গায় আসতে পারে।'

সাকি মামার কথাবার্তা শুনলে আসলেই বিরক্ত লাগে। আমি একটু খেপে গিয়ে বললাম, 'এসব প্রশ্নের আবার জবাব হয় নাকি? শকশো আছে, এটাই বড় কথা। সে আছে, আর মানুষ মারছে। এখন কেমন করে মারছে, এভাবে কেন মারছে—এসব কেউ জানে না।'

'জানে!'—মামার এই কথাটা শুনে আসলেই চমকে গেলাম।

'মানে কী! কে জানে?'

'সব না জানুক, কিছুটা অন্তত একজন লোক জানে।'

'কে সে?'

'ফজলা। রিকশাওয়ালা ফজলা নিশ্চয়ই কিছু জানে। ওর কালকে রাতের আচরণে আমার মনে হয়েছে, ও অনেক কিছু জানে।'

ফজলা মানে, সেই ইন্দুরমুখো ফজলা; যে কিনা শকশোও হতে পারে!

ফজলার কথা শুনে ভয়ও যেমন লাগল; ভালোও লাগল। তার মানে, সাকি মামা এই কেসটা নিয়ে কাজ করবে! আমি আনন্দ নিয়েই প্রশ্ন করলাম, 'মামা তুমি কি তাহলে ফজলার সঙ্গে আবার কথা বলতে চাও?'

'অবশ্যই চাই। ফজলার সঙ্গে কথা বললে তবেই বের হবে, আসলে আমাদের কী করতে হবে। তবে আগে হোক, পরে হোক; একটা কাজ করতেই হবে।'

'কী কাজ?'

'নাদের আলীর সুড়ঙ্গে যেতে হবে আমাদের।'

আমি আর কোনো কথা খুঁজে পেলাম না। ভয়ানক নাদের আলীর সুড়ঙ্গে কী করে যাব! ভাবতেই ভয়ে গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। আমার অবস্থা দেখে ভয়টা অনুমান করতে পারল সাকি মামা, 'কি রে ভয় পাচ্ছিস?'

তো তো করে বললাম, 'একটু'।

'ভয় পেলে ক্ষতি নেই। কিন্তু ভয় নিয়েই কাজটা করতে হবে। কাজ না করলে গোয়েন্দা হবি কী করে?'

'মামা! আমরা কি তাহলে গোয়েন্দা হয়ে যাচ্ছি!'

'দেখা যাক। কিছু না হওয়ার চেয়ে গোয়েন্দা হওয়া ভালো না?'

আমি মামার কথা বুঝলাম না। কিন্তু সত্যি সত্যি গোয়েন্দা হওয়া যাবে, ভেবেই আনন্দে অস্থির লাগছিল। ইস রাজীবটা থাকলে যা মজা হতো! ও গোয়েন্দাগিরি খুব পছন্দ করে। বেচারা মিস করছে।

রাজীবকে নিয়ে বেশিক্ষণ আফসোস করার সুযোগ পেলাম না। তার আগেই সিগারেট নিভিয়ে উঠে পড়ল সাকি মামা। বলল, 'তৈরি হয়ে নে। ফজলাকে খুঁজে বের করতে হবে।'

আমি কেবল উঠতে যাচ্ছি, এই সময় আরেকটা কণ্ঠ শুনতে পেলাম, 'তোমরা গোয়েন্দাগিরি করতে যাচ্ছ! আমিও যাব।'

উর্মির গলা।

সাকি মামা একটু থমকে গেল। বলল, 'নাহ রে উর্মি। তুমি ছোট মানুষ। তোমার যাওয়ার দরকার নেই।'

উর্মি একেবারে বেড়ালের মতো ফোঁস করে উঠল, 'ছোট মানুষ মানে কী! সাগর আমার চেয়ে এক ক্লাসের বড়। ও যখন যেতে পারে, আমিও পারব।'

এবার মামা কেবল বলতে যাচ্ছিল, 'তুমি মেয়ে...'

এটুকু বলতেই উর্মি ভয়ানক খেপে গেল, 'তুমি ছেলে আর মেয়ে আলাদা করছ! তোমার নামে আমি মামলা করে দেব সাকি মামা। অবশ্যই আমাকে নিয়ে যেতে হবে।'

মামলার ভয়ে হোক আর উর্মির খেপে যাওয়ার ভয়ে হোক; সাকি মামা শেষ পর্যন্ত উর্মিকে নিয়ে বেরোতে রাজি হলো। আমি অবশ্য আরেকবার আপত্তি করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু মুখ খোলার আগেই ওর যে চোখ দেখলাম, তাতে আর সাহস হয়নি।

বেরিয়ে পড়লাম। বিশেষ কিছু নিলাম না। আমি শুধু আমার কাঁধের ব্যাগটা নিয়ে নিলাম। এটার মধ্যে টর্চ, চাকু, দড়ি, ব্লেড; অনেক কিছু আছে। কাজে লাগতে পারে। আর কাজে না লাগলেও উর্মিকে সঙ্গে নিতে হলো। অবশ্য উর্মিকে নিয়ে বের হওয়ায় আমাদের একটা উপকারই হয়েছিল। আসলে উপকার হয়েছিল উর্মির সঙ্গে ফেসবুকও আমাদের সাথে বের হওয়ায়। আচ্ছা, সে গল্প পরে বলব। আগে ফজলাকে খুঁজে বের করার গল্প বলি।

ফজলাকে পেলাম আমরা বাজারের পেছনে মসজিদের কাছে। আমরা মঞ্জু কাকুর বাড়ির কাউকে বলিনি যে আমরা কেন বের হচ্ছি। মামা রাজু কাকুকে বলল, 'যাই, ওদের দুজনকে নিয়ে একটু এলাকাটা ঘুরে দেখি।'

রাজু কাকু সাবধান করে দিল, 'টিলার ওদিকে যাবেন না। আর একা একা কোথাও ঘোরার দরকার নেই। এই বাজারের দিকটাই ঘোরেন।'

আমরা বাজারেই গেলাম। উর্মিও এলাকাটা ভালো চেনে না। তারপরও ফজলাকে চেনে। ও বলল, ফজলা স্টেশনে থাকতে পারে। আমরা ঠিক করেছিলাম বাজার থেকে একটা রিকশা নিয়ে স্টেশনে যাব। তার আর দরকার হলো না। বাজারে পৌঁছে মামাই বের করে ফেলল ফজলার খোঁজ।

সে রিকশাস্ট্যান্ডে গিয়ে একজন বয়স্ক রিকশাওয়ালাকে জিজ্ঞেস করল, 'আচ্ছা, ফজলা ভাইকে কোথায় পাওয়া যাবে বলতে পারেন?'

বুড়ো লোকটা অবাক হয়ে মামার দিকে তাকাল, 'পাগলা ফজলা!'

'জি। পাগলা ফজলা। তাকে খুঁজছি।'

'ওরে কী দরকার? ও তো পাগল। কোথায় যাবেন বলেন, আমি নিয়ে যাব।'

মামা একটু অস্থির হয়ে বলল, 'কোথাও যাব না। ওনার সঙ্গে কথা আছে।'

আশপাশে ততোক্ষণে আরও কয়েকজন লোক দাঁড়িয়ে গেছে। সবাই হেসে উঠল। ভিড়ের ভেতর থেকে একজন বলল, 'পাগলের লগে আবার কথা!'

সাকি মামা আমার দিকে ফিরে বলল, 'এভাবে পাওয়া যাবে না। চল।'

কথাটা শেষ হওয়ার আগেই অল্প বয়সী এক রিকশা ড্রাইভার বলল, 'পাওয়া যাবে। এখন ফজলা ঘুমায়। আমি তারে মসজিদের পেছনে দেখে আসছি।'

আর কথা না বাড়িয়ে আমরা সরে আসলাম। ঝামেলা হলো, আমাদের পেছনে কয়েকজন লোকও চলা শুরু করল। এভাবে একজন বড় মানুষ দুটো বাচ্চা আর বিশাল একটা জার্মান শেফার্ড কুকুর নিয়ে পাগলা ফজলার কাছে যাচ্ছে—এটা বাজারের লোকের কাছে মজার ব্যাপার মনে হয়েছে। সাকি মামা তাই দারুণ বুদ্ধির একটা কাজ করল। আমাদের নিয়ে একটা মিষ্টির দোকানে ঢুকে পড়ল।

দুটো করে সন্দেশ খেলাম আমরা। উর্মি একটার বেশি খেতে পারল না। আমি ওর বাকিটা খেয়ে নিলাম। মিষ্টির দোকান থেকে বের হয়ে দেখি, আসলেই আমাদের জন্য আর কেউ অপেক্ষায় নেই। এবার নির্বিঘ্নে ফজলার কাছে যাওয়া যায়।

আমি ভেবেছিলাম, উর্মি বাজারের মসজিদটাও চেনে না। না, দেখা গেল উর্মি ময়মনসিংহে থাকলেও গ্রামের বাড়ির কিছু চেনে-জানে। তরতর করে হেঁটে মসজিদের কাছে চলে গেল। একটু ঘুরতেই আমরা দেখি, ফজলা।

মসজিদের পাশের দিকটায় একটা বাঁধানো সিঁড়ি আছে। ওই সিঁড়ির ওপর একটা গামছা না কি যেন টোপলা করে মাথার নিচে দিয়ে ঘুমাচ্ছে আমাদের ফজলা। সাকি মামা কাছে গিয়ে ডাক দিল, 'ফজলা ভাই। ও ফজলা ভাই।'

গুলি খাওয়া মানুষের মতো ছিটকে উঠল ফজলা ভাই। গুলি খেলে মানুষ কেমন করে, আমি জানি না। কিন্তু ফজলার কাণ্ড দেখে তা-ই মনে হলো। ঘুম থেকে উঠেই চিত্কার করে উঠল, 'ওরে বাবারে! আমারে খেয়ে ফেলল, মেরে ফেলল।'

ভাগ্যিস আশপাশে তখন কেউ ছিল না। নইলে লোকেরা ছুটে এসে আমাদের পেটাত। আর চিত্কার চেঁচামেচি করার আগেই সাকি মামা ওকে শান্ত করে ফেলল, 'ফজলা ভাই, ভয় পেও না। আমরা সেই মঞ্জু ভাইয়ের বাড়ির মেহমান। ওই যে সেদিন রাতে আসলাম।'

ফজলা ভাই ভয়ে ভয়ে একবার আমাকে, একবার উর্মিকে, একবার ফেসবুককে দেখে একটু শান্ত হয়ে বলল, 'কুকুর কেন সঙ্গে?'

'ও এমনি আসছে। ওর কথা বাদ দেন। আপনার সঙ্গে একটু কথা আছে।'

ফজলা ভাই অবাক, 'আমার সঙ্গে আবার কী কথা!'

'আছে কথা আছে। একটু মাথা ঠান্ডা করে বসেন।'

মাথার চুলগুলো হাত দিয়ে দারুণ করে চুলকে এলোমেলো করে চোখ সরু করে সাকি মামার দিকে চেয়ে বলল, 'ঠান্ডা হইছে। মাথা এখন বরফের মতো ঠান্ডা। বলেন।'

'আচ্ছা ফজলা ভাই, এক্কেবারে ভেবেচিন্তে বলেন তো, শকশো সম্পর্কে কী জানেন আপনি?'

ফজলা ভাই খেপে উঠে বলল, 'শকশো সম্পর্কে আমি কী জানি! সবাই যা জানে, আমি তাও জানি না। আমি পাগল মানুষ। আমি কিচ্ছু জানি না। শুধু জানি, শকশোতে ধরলে চোখ দিয়ে আগুন বাইর হয়। পরে মানুষটা নাই হয়ে যায়।'

সাকি মামার এমন রূপ আগে কখনো দেখিনি। পায়ের ওপর ভর করে বসে পড়েছে। ফজলার দিকে একটু ঝুঁকে বলল, 'তা বললে তো হবে না ফজলা ভাই। সবাই আপনাকে পাগল ভাবে। আমি টের পেয়েছি, আপনি মোটেও পাগল না। আপনি পরিষ্কার করে বলেন, শকশোটা আসলে কী?'

ফজলা সেই এক ক্যাসেটই বাজিয়ে যাচ্ছে, 'আমি কিচ্ছু জানি না।'

সাকি মামা উঠে দাঁড়াল। পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে ফস করে ধরিয়ে ফেলল। একগাল ধোঁয়া ছেড়ে অন্য দিকে তাকিয়ে বলল, 'তাহলে আপনি নাদের আলীর সুড়ঙ্গ সম্পর্কেও কিছু জানেন না?'

ফজলা হা করে সাকি মামার দিকে চেয়ে রইল। মুখে একটা শব্দও নেই। কয়েক সেকেন্ডে একেবারে চুপ থাকার পর বলল, 'আপনেরা নাদের আলীর সুড়ঙ্গ চেনেন কেমনে?'

সাকি মামার ভাব তখন দেখার মতো, 'চিনি না। তবে চিনব। আর আপনি আমাদের নিয়ে যাবেন নাদের আলীর সুড়ঙ্গে।'

নাদের আলীর সুড়ঙ্গ

ফজলা ভাই মাঝে মাঝেই গজ গজ করছে, 'এটা ঠিক হচ্ছে না, ভাইজানেরা। আপনেরা বিপদে পড়বেন।'

গজ গজ করলেও আমাদের পথ দেখিয়ে ঠিক এগিয়ে যাচ্ছে ফজলা ভাই। আমরা চলছি সেই টিলাগুলোর পাশ থেকে। আমরা চার জন। না, আসলে আমরা পাঁচ জন—আমি, উর্মি, সাকি মামা আর ফেসবুক নামের জার্মান শেফার্ড কুকুর।

ফজলা ভাই অনেক আপত্তি করেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সাকি মামার সঙ্গে পেরে ওঠেনি। সাকি মামা রাজনৈতিক মানুষ তো। রাজনৈতিক কথাবার্তা বলে পটিয়ে ফেলেছে ফজলাকে। একটা কথা বলেই কাবু করেছে, 'দেখেন, যদি আসল শকশো হয়, তাহলে তো আমরা এতজন আছি; কিছু করবে না। আর যদি নকল কিছু হয়, তাকে ধরতেই হবে। এত মানুষ মারছে, আরও মরতে পারে। এটা ঠেকাতে হবে না?'

ফজলা ভাই এই রাজনৈতিক কথা শুনে একটু মুখ কালো করে বলেছে, 'তা ঠিক। কিন্তু আমি পাগল মানুষ। আমি কি কিছু করতে পারব?'

সাকি মামা উল্টো বলেছে, 'দেখেন, আমার মনে হয়, পারলে আপনিই পারবেন। আপনি বলেন, আপনি রাতে-বিরাতে একা একা ঘোরেন; আপনাকে শকশো কিছু বলেনি। তার মানে, আপনাকে কোনো কারণে শকশো এড়িয়ে চলে।'

ফজলা ভাই একটু ভেবে বলেছে, 'তা অবশ্য ঠিক। আমি এর পরেও কতবার টিলার ওপাশে গেছি। কিছু হয়নাই। আমি যেয়ে যেয়ে দেখি। পাগল মানুষ তো। আর আমার কিডনির রোগ আছে। তাই মরার ভয় নাই। আমি নাদের আলীর সুড়ঙ্গে ঢুকতেও ভয় পাই না।'

আমি এবার আর চুপ থাকতে পারিনি। প্রশ্ন করলাম, 'আপনি সুড়ঙ্গে ঢুকেছেন?'

'আরে নাহ। মুখে ভয় নাই বললেই হলো! আসলে সুড়ঙ্গের সামনে গেলে বিরাট ভয় লাগে।'

আমরা এসব কথা বলতে বলতে এগোচ্ছিলাম। উর্মি ফজলা ভাইকে জিজ্ঞেস করল, 'ফজলা ভাই, আপনি রাতে রিকশা চালান কেন?'

'পাগল বলে। আমি পাগল বলে দিনে প্যাসেঞ্জার পাই না। আর রাতে কেউ থাকে না বলে আমি প্যাসেঞ্জার পাই। তাই রাতে রিকশা চালাই।'

সাকি মামা আবার শকশোর আলোচনায় আসতে চাইল। ফট করে জিজ্ঞেস করল, 'আপনি আসলেই শকশো দেখেছেন কখনো? নাদের আলীর গুহায় কাউকে ঢুকতে বেরোতে দেখেছেন?'

একটু ভাবল ফজলা ভাই। মাথাটা আবার জোরে জোরে চুলকাল। বলল, 'শকশো কিনা জানি না। একদিন একটা জিনিস দেখেছি।'

'কী!'—আমরা সবাই হাঁটা বন্ধ করে ফজলার দিকে ফিরে তাকালাম।

'একদিন ওই টিলার পাশে ঘুরতে ঘুরতে ঘুমায়ে পড়ছিলাম। নাদের আলীর সুড়ঙ্গ যে টিলায়, তার উল্টো দিকের একটা টিলার ছোট সুড়ঙ্গে ঢুকে ঘুমাইছি। হঠাত্ ঘুম ভেঙে দেখি, নাদের আলীর সুড়ঙ্গে বিশাল একটা কি যেন ঢুকছে। ট্রাকের মতো বিশাল, কালো; ভয়ে আমি প্রায় মরে যাই। চুপ করে ছিলাম। তারপর দেখলাম, একটা বিরাট লম্বা মানুষ, প্রায় সাত-আট হাত লম্বা মানুষ বাইর হলো সুড়ঙ্গ থেকে। সেটা শকশো হলেও হতে পারে। সেই শকশোটা চারদিক ভালো করে দেখে আবার ঢুকে গেল ভিতরে।'

এই বর্ণনা শোনার পর আমার মনে হলো এখনই ফিরে যাই। ভয়ে আমার হাত-পা একটু একটু কাঁপছে। কিন্তু সঙ্গে উর্মি থাকায় লজ্জায় আর ভয়ের কথা বলতে পারলাম না। তবে আমি না বললেও উর্মি মনে হয় বলেই ফেলত। তার আগেই ফজলার গলা শোনা গেল, 'ওই যে। ওই সামনের টিলাটার নিচে একটা গর্ত দেখেন? ওটাই নাদের আলীর সুড়ঙ্গের মুখ।'

সাকি মামাও একটু থমকে গেল। আমি নিশ্চিত, ভয় পেয়েছে। তারপরও ভাব ধরে রাখল। একটু কেশে বলল, 'চলেন। থেমে গেলে তো চলবে না। সুড়ঙ্গে ঢুকতে হবে।'

তারপর আমাদের দিকে ফিরে বলল, 'সাগর-উর্মি, ফেসবুককে নিয়ে তোমরা এখানে বসে থাকবা। আমি আর ফজলা ভাই ভেতরে ঢুকব।'

আমার কিছু বলতে হলো না। তার আগেই উর্মি খেপে গেল, 'মানে কী! আমরা কেন বাইরে বসে থাকব? আমরাও ভেতরে ঢুকব।'

আমিও ঘোড়ার মতো করে পা মাটিতে ঠুকে বললাম, 'অবশ্যই। আমরাও ভেতরে যাব।'

সাকি মামা অসহায় হয়ে ফজলা ভাইয়ের দিকে তাকাল। ফজলা ভাই কাতর কণ্ঠে বলল, 'চলেন। আপনারাও চলেন। বিপদ আইছে যখন; সবার উপরই আসুক।'

ব্যাস, আমরাও হন হন করে হাঁটতে থাকলাম।

কিন্তু সুড়ঙ্গের মুখে এসেই থমকে গেলাম। কেমন গা ছমছম করা একটা গুহার মুখ। দেখলে মনে হয়, ভেতরে নিশ্চিত ড্রাকুলা বাস করে। এর ভেতরে কোনোভাবেই ঢোকা ঠিক হবে না। কিন্তু আমি 'ঠিক হবে না' ভাবতে ভাবতেই সাকি মামা ঢুকে পড়ল। পেছন পেছন আমরাও। আর সবার আগে ফস করে ফজলা ভাই ঢুকে পড়েছে।

ভেতরে একেবারে ঘুরকুট্টি অন্ধকার। কিচ্ছু দেখা যায় না। নিজের হাত-পাও দেখা যায় না। সাকি মামা ফিস ফিস করে বলল, 'সাগর, টর্চ বের কর।'

আমার টর্চটাও আবার সেরকম। মুখে একটা কালো কাপড় বাঁধা আছে। ফলে আলো বেশিদূর যায় না। টর্চ বের করে জ্বাললাম। আশপাশের খানিকটা জায়গা পরিষ্কার দেখা গেল। তেমন কিছু নেই। কয়েকটা বাদুড় ঝুলে আছে সুড়ঙ্গের ওপর দিকে। পায়ের নিচে কাঠ-পাতা পচে জমে আছে। আর বোটকা একটা গন্ধ।

বেশ খানিক দূর পর্যন্ত গুটি গুটি পায়ে এগোলাম আমরা। কিচ্ছু চোখে পড়ে না। আমি বললাম, 'মামা। চলো ফিরে যাই। কিছুই তো দেখি না।'

সাকি মামা বিরাট ভাব নিয়ে ফেলল, 'কিছু দেখিস না!'

'না তো?'

'ভালো করে দেখ। পায়ের দিকে দেখ। কিছু দেখতে পাস?'

ও মা! আমরা সবাই পায়ের দিকে দেখলাম। দু-পাশে কি যেন সারি সারি দাগ দেখা যাচ্ছে পচা মাটির ওপরে। আমি অবাক হয়ে বললাম, 'কিসের দাগ?'

মামা আস্তে করে বলল, 'কোনো গাড়ির চাকার দাগ বলে মনে হচ্ছে। আর মাঝে দেখ, জুতোর দাগ গেছে সামনের দিকে।'

আচ্ছা, তাহলে এই গুহায় মানুষের যাতায়াত আছে বলতে হবে। সাকি মামা ফজলা ভাইকে প্রশ্ন করল, 'ফজলা ভাই, এদিকে গাড়িটাড়ি আসে কখনো?'

'আসে তো! ওই পুলিশের একটা মাইক্রো আসে প্রায়ই। কী হয়েছে, খুঁজতে আসে। আবার চলে যায়।'

'ভালো। চলো, আরেকটু সামনে যাই। সবাই সাবধান কিন্তু।'

আমরা সাবধানেই হাঁটছিলাম। আস্তে আস্তে এগোচ্ছি আর ঠান্ডা যেন বাড়ছে। এত ঠান্ডা কেন; প্রশ্ন করার আগেই হঠাত্ ফজলা ভাই সামনে থেকে ইশারা করল থেমে যাওয়ার জন্য। আমরা থেমে গেলাম। এবার আস্তে আস্তে কাছে আসতে বলল। আমরা এগিয়ে গেলাম। সুড়ঙ্গের এই পাশে একটা বিশাল লোহার গেট!

ওরে বাবা! এই সুড়ঙ্গের মধ্যে লোহার গেট বানিয়ে রেখেছে কারা? এই গেটের ওপাশে কী আছে?

অনেক প্রশ্ন ছিল। কিন্তু কোনো প্রশ্ন করা হলো না। তার আগেই গেটের ওপাশে শব্দ শোনা গেল। ফজলা ভাই ইশারায় পাশের একটা ফাটল দেখিয়ে দিল। টর্চ বন্ধ করে সবাই ফাটলের মধ্যে ঢুকে গেলাম। ফেসবুক শুধু ঢুকতে আপত্তি করছিল। জোর করে ওকে টেনে নিয়ে গেলাম। উর্মি ফেসবুকের মুখটা জোর করে চেপে ধরে রেখেছে।

গেটটা আস্তে আস্তে খুলে গেল। ভেতর থেকে দুটো লোক বেরিয়ে এল। অন্ধকারে ঠিক বুঝতে পারলাম না। মনে হলো, ডাক্তারের পোশাক পরা। একজন আরেকজনকে বলল, 'গাড়ির কী অবস্থা?'

'আসবে। একটু অপেক্ষা করতে বলেছে।'

'আজ কি শিকার হবে একটাও?'

'না মনে হয়। এখন যেটাকে ধরতে হবে, ওর বাড়িতে বিয়ের অনুষ্ঠান কাল। এটা শেষ হলে বাগে পাওয়া যাবে। সাহেব বলেছে, তার আগে একদিন রাতে বেরিয়ে আরেকটা মাল ধরতে।'

'এমনিতে পার্টস সাপ্লাই তো ভালোই হচ্ছে।'

'তা হচ্ছে।'

বোঝা গেল। এরাই তাহলে শকশো। এরাই তাহলে মানুষগুলোকে ধরছে। এবার মঞ্জু কাকুকেই ধরার প্লান করছে! কিন্তু কেন ধরছে? ভাবার সময়টাও পেলাম না। তার আগেই কেলেঙ্কারি হয়ে গেল। ফেসবুকের মুখ থেকে হাত সরে গেল উর্মির। বিকট শব্দ করে সে ফাটলের বাইরে ঝাঁপিয়ে পড়ল। আর লুকিয়ে থাকার অর্থ হয় না। এবার পড়ি কী মরি দৌড় দিতে হবে।

ফেসবুকের হঠাত্ আক্রমণে লোকদুটো একেবারে হতভম্ব হয়ে গেছে। আমরা সুযোগটা নিলাম। সাকি মামা ইশারা করল, আমরা দিলাম ছুট। ফেসবুকের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। লোক দুটোকে আটকে রাখার জন্য ও একাই যথেষ্ঠ। উর্মি শুধু চিত্কার করছে, 'আমার ফেসবুক।'

সাকি মামা ছুটতে ছুটতেই বলল, 'দৌড়াও। বেঁচে থাকলে ফেসবুক কেন, টুইটারও পাওয়া যাবে।'

তখন কে জানে, এই ফেসবুকই আসলে আমাদের মরণের হাত থেকে বাঁচিয়ে আনবে!

পুলিশ, পুলিশ

'এখন আমরা কী করব? পুলিশের কাছে যাব?'—আমাদের সবার হয়েই যেন উর্মি প্রশ্নটা করল।

কিন্তু যাকে প্রশ্ন করা হলো, সেই মামারই বেহাল অবস্থা। সেই নাদের আলীর গুহা থেকে মঞ্জু কাকুদের বাড়ির পেছনের বাগান; এই প্রায় আধা কিলোমিটার দৌড়ে আসতে গিয়ে সাকি মামার জিহ্বা বের হয়ে গেছে। আমার আর ফজলা ভাইয়ের তেমন কোনো সমস্যা হয়নি। ফজলা ভাই রিকশা চালায়, এটুকু পরিশ্রম করার অভ্যাস তার আছে। আমি স্কুলে ফুটবল খেলি, দৌড়াই; আমিও পারি।

উর্মিও বোঝা গেল দৌড়াতে পারে। কিন্তু বেচারির সমস্যা হয়েছে ফেসবুক। দৌড়ানোর সময় শুধু পেছন ফিরে তাকায়, আর কাঁদে—আমার ফেসবুক।

উর্মির কান্নাও এখন থেমে গেছে। এখন আমরা মঞ্জু কাকুর পেছনের বাগানে বসে প্ল্যান করার চেষ্টা করছি। সাকি মামা একটু দম ফিরে পেয়ে বলল, 'অবশ্যই পুলিশের কাছে যেতে হবে। পুলিশ ছাড়া এত বড় চক্র ভাঙা আমাদের পক্ষে সম্ভব না। এটা অনেক বড় একটা ব্যাপার।'

আমি বুঝতে পারলাম না, পুলিশের কাছে গিয়ে আমরা কী বলব? এই লোকগুলো কী করছে, নাদের আলীর সুড়ঙ্গে? মামাকে কথাটা বলতেই একটু চড়া গলায় বলল, 'কী করছে, সেটা বের করার কাজ পুলিশের। এখান থেকে সাতটা লোক নিরুদ্দেশ হয়েছে। ওখানে একটা কিছু গোপনে হচ্ছে। এটাই কী যথেষ্ট না, পুলিশের আসার জন্য?'

বাবারে বাবা! মামা একেবারে নেতাদের মতো কড়া ভাষায় কথা বলা শুরু করেছে। তারপরও আমি প্রশ্ন করলাম, 'তা পুলিশ তো আসবে বুঝলাম। কিন্তু মামা, তুমি বলো তো, ওখানে কী করে ওরা?'

সাকি মামা কিছু বলার আগেই ফেসবুকের দুঃখ ভুলে উর্মি বলে উঠল, 'মনে হয় বোমা বানায়।'

এতক্ষণ ধরে চুপ করে থাকা ফজলা ভাইও এবার মুখ খুলল, 'আমার মনে হয় না। আমার মনে হয়, এইখানে এরা ভূত-সাধনা টাইপের কিছু করে। মানে ভিতরে গিয়ে দেখো হয়তো, লাশের ওপর বসে ধ্যান করে!'

ফজলা ভাইয়ের কথা শুনে আমরা সবাই শিউরে উঠলাম। আমি নিশ্চিত, সাকি মামাও ভয় পেয়েছে। তারপরও মুখে খুব ভাব নিয়ে বলল, 'আরেহ নাহ, প্রেত-সাধনা করলে করবে শ্মশানে গিয়ে। তার জন্য এরকম গুহার মধ্যে ঘরবাড়ি বানানোর দরকার হয় না। এটা অন্য একটা ব্যাপার বলে মনে হচ্ছে।'

'কী ব্যাপার'—সবাই একসাথেই জানতে চাইলাম।

'আমার মনে হয়, এখানে মানুষের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ পাচারের একটা ব্যাপার চলছে।'—বিরাট ভাব নিয়ে উদাসী ভঙ্গিতে বলল মামা।

'বলো কী!'—আমরা প্রায় চিত্কার করে উঠলাম।

'হ্যাঁ। তোরা কতগুলো ব্যাপার খেয়াল করে দেখলে বুঝতিস। প্রথমত ওদের গেটের বাইরে আবর্জনার স্তূপে নানা ধরনের মেডিকেল জিনিসপত্র সুঁই, স্যালাইনের ব্যাগ, গ্লাভস; এসব ছড়ানো ছিল। দ্বিতীয়ত যে লোক দুটো বাইরে আসলো, তাদের পরনে যে অ্যাপ্রন ছিল, তা অপারেশনে ব্যবহার করে। তিন নম্বর হলো, ওই জায়গাটায় দারুণ ঠান্ডা ছিল।'

উর্মি ভ্রু নাচিয়ে প্রশ্ন করল, 'ঠান্ডা থাকলে কী হবে?'

'হতে পারে অনেক কিছুই। তবে একটা সম্ভাবনা থাকে। ভেতরে কোথাও ফ্রিজিং মেশিন দিয়ে অনেক বেশি ঠান্ডা ঘর বানিয়ে সেখানে মানুষের শরীরের বিভিন্ন অংশ সংরক্ষণ করা হচ্ছে।'

আমি এবার বলার মতো কিছু খুঁজে পেলাম, 'মামা, এটা হলে তো ভয়ানক ব্যাপার। কিন্তু মানুষের অঙ্গ এভাবে দীর্ঘদিন জমিয়ে রেখে লাভ কী?'

সাকি মামা অস্থির হয়ে বলল, 'আরে ছাগল! জমিয়ে কি আর রাখে নাকি। এখানে হয়তো ঘণ্টা কয়েক রেখে দেয় এরকম ঠান্ডায়। তারপরই পাচার করে দেয়।'

'পাচার করে কীভাবে? এত লোকের সামনে থেকে?'

'সেটা আমারও প্রশ্ন। এটা বুঝতে পারছি যে, গাড়িতেই পাচার করে। কিন্তু ফজলা ভাই বলল, এদিকে অন্য কোনো গাড়ি আসে না।'

ফজলা ভাই হাত উঁচু করে বলল, 'হ্যাঁ, ঠিক। আমি অনেকদিন চোখ রেখেছি। পুলিশের গাড়ি ছাড়া আর কিছু আসে না।'

মামা নিচের ঠোঁটটা কামড়ে ধরে বলল, 'তাহলে নিশ্চয়ই অন্য কোনো উপায় আছে। সেটা পুলিশই খুঁজে বের করতে পারবে।'

আমি আর উর্মি একসঙ্গে প্রশ্ন করলাম, 'তাহলে এখন আমরা কী করব?'

মামা ঝট করে উঠে দাঁড়াল, 'কাজ সোজা। এখন আমরা বাড়ি ফিরে রাজু ভাইকে সব খুলে বলব। উনি পুলিশ ডেকে আনবেন।'

এবার মামা ফজলা ভাইয়ের দিকে ফিরে বলল, 'ফজলা ভাই, আপনার একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে হবে। পারবেন?'

ফজলা ভাই ফর্ম ফিরে পেয়েছে। পাগল মানুষ তো। কাজ দিলে ভালো পারে। বলল, 'বলেই দেখেন।'

'আমরা ওদের বাড়ি যাচ্ছি। আপনি নাদের আলীর সুড়ঙ্গে চোখ রাখবেন। আপনাকে কিচ্ছু করতে হবে না। শুধু খেয়াল রাখবেন, ওরা কেউ বেরিয়ে যাচ্ছে কি না।'

'বেরোতে থাকলে আমি কী করব? ধরে ফেলব?'

'আরে নাহ। পাগল নাকি?'

'জি, আমি পাগল।'

'আচ্ছা, ভালো। আপনি পাগল। কিন্তু পাগলামির ভুলেও ওদের ধরতে যাবেন না। ওদের কাছে নিশ্চিত অনেক ভারী ভারী অস্ত্র আছে। আপনি শুধু আমাদের জানিয়ে দেবেন।'

'কীভাবে জানাব?'

মামা এবার সত্যিই ফেলুদার মতো হাসি দিল। পকেট থেকে নিজের মোবাইলটা বের করে ফজলা ভাইয়ের হাতে দিল। বলল, 'আপনি মোবাইল চালাতে পারেন?'

ফজলা ভাইয়ের হাসিও তখন দেখার মতো, 'পারি মানে! আমার তো মোবাইল ছিল। জলিল মিয়া কেড়ে নিয়ে পানিতে ফেলে দিল। তা না হইলে আমার মোবাইলও থাকত।'

'থাক। দুঃখ করে লাভ নেই। এখন আপনি আমার মোবাইলটা রাখেন। এখানে দেখেন রাজু ভাইয়ের নম্বর আছে। কোনো ঝামেলা দেখলে ওই নম্বরে ফোন দেবেন।'

'ঠিক হ্যায়, স্যার।'—ফজলা ভাই পুরো হিন্দির সিনেমার নায়ক হয়ে গেছে!

আমরা 'নায়ক' ফজলা ভাইকে রেখে এবার বাগান থেকে বের হলাম। মূল রাস্তা ধরে এবার দ্রুত মঞ্জু কাকুদের বাড়ি পৌঁছাতে হবে। সাকি মামা কেবল বলছিল, 'আমাদের কাছে পুলিশের নম্বর থাকলে ভালো হতো...'

মামার কথা শেষ হওয়ার আগেই দেখি, সামনের দিক থেকে একটা গাড়ি আসছে; পুলিশের গাড়ি। একেবারে ভাবতে না ভাবতেই হাজির!

এবার তাহলে সমস্যার সমাধান হয়ে গেল। আমরা হাত ইশারা করতেই গাড়িটা থেমে গেল। গাড়ি মানে এমনিতে সাধারণ মাইক্রোবাস। শুধু সামনে বড় বড় করে লেখা POLICE; দেখলেই বোঝা যায়, পুলিশের গাড়ি। মামা ফিস ফিস করে বলল, 'লোকাল থানা তো। তাই ভাড়ার গাড়ি ব্যবহার করে।'

মামার কথা শেষ হওয়ার আগেই গাড়ি থেকে একজন অফিসার টাইপের কেউ নেমে এলেন। অফিসারটার চেহারা একদমই ভালো না। দেখে মনে হয়, জোর করে কেউ ডিউটি করতে পাঠিয়েছে। পুলিশ না হয়ে গুণ্ডা হলে ভালো হতো। চেহারার মতোই খ্যাঁক খ্যাঁক করে কথা বলে। আমাদের জিজ্ঞেস করল, 'কী হয়েছে? গাড়ি থামালেন কেন?'

সাকি মামা দারুণ কেতা করে বলল, 'স্যরি অফিসার। আসলে আপনারা যা খোঁজ করছেন, আমরা সেটা বের করে ফেলেছি?'

'কী বের করে ফেলেছেন?'

'শকশো। শকশো রহস্যের সমাধান করে ফেলেছি।'

'বলেন কী!'—অফিসারের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল।

এ পর্যন্ত শুনে আরও দুজন পুলিশ গাড়ি থেকে নেমে এল। এর একজন জিজ্ঞেস করল, 'কীভাবে সমাধান করে ফেললেন?'

আমরা তিন জনই একসঙ্গে বলতে যাচ্ছিলাম। পুলিশ অফিসার আমাদের থামিয়ে দিলেন। মামাকে বললেন, 'আপনি বলেন।'

মামা দ্রুত, সংক্ষেপে আমাদের অভিযানের ব্যাপারটা বলে দিল। কীভাবে আমরা সুড়ঙ্গের ভেতরে ঢুকলাম, ঢুকে কী দেখলাম—সবই বলল। সেই সঙ্গে মামার অনুমানটাও বলে দিল—এখানে মানুষের অঙ্গ পাচার হয়!

পুলিশরা সব শুনে হতভম্ব হয়ে গেল। অফিসার বললেন, 'এবার তাহলে ওদের ধরতেই হয়। চলেন আমাদের সঙ্গে।'

আমি আর উর্মি খুবই মজা পেলাম। ভেবেছিলাম, ধরার অভিযানে আমাদের সঙ্গে নেবে না। তা না করে আমাদেরও গাড়িতে উঠতে বলল। অফিসার শুধু জিজ্ঞেস করলেন, 'আর কেউ নেই সঙ্গে?'

আমরা মুখ খোলার আগেই মামা বলল, 'না।'

আমরা গাড়ির ভেতর ঢুকে পড়লাম। একেবারেই সাধারণ মাইক্রো। ভেতরে পুলিশের পোশাক পরা আরও দুজন লোক। একজন লোক গাড়ি চালাচ্ছে। মানে পাঁচজন পুলিশ। আর একজন ড্রাইভার। একটু অবাক হলাম, গাড়ির পেছন দিকটায় বড় কয়েকটা বাক্স দেখে। ভাবলাম, অস্ত্র রাখা ওখানে। তারপরও প্রশ্ন করতে গিয়েছিলাম। তার আগেই গাড়ি ছেড়ে দিল।

গাড়ি সাই সাই করে উঁচু নিচু পথ ধরে নাদের আলীর সুড়ঙ্গের দিকে ছুটে চলল। ড্রাইভার জিজ্ঞেস করল, 'গাড়ি কি ভেতরে ঢুকাবো।'

অফিসার ঠ্যা ঠ্যা করে হেসে উঠল, 'অবশ্যই। তিন-তিনটা শিকার পাওয়া গেছে, ভেতরে না ঢুকায়ে উপায় আছে? এরা আবার সাধারণ শিকার না। গোয়েন্দা!'

আমি আর উর্মি চিত্কার করে উঠলাম, 'মানে!'

সাকি মামা একটুও নড়ল না। শুধু আস্তে আস্তে বলল, 'বিরাট ভুল হয়ে গেছে। আমার বোঝা উচিত ছিল।'

এতক্ষণে আমরাও বুঝে ফেলেছি, এরা আসল পুলিশ না। আসল পুলিশ কখনোই এরকম খারাপ হয় না। এরা আসলে পুলিশের পোশাক পরে এসব করে বেড়াচ্ছে। এরাই এখান থেকে সব পাচার করে পুলিশ লেখা গাড়িতে করে। কেউ সন্দেহই করে না। এখন আর আমাদের কিচ্ছু করার নেই। ফজলাও বাইরে থেকে কিছু করতে পারবে না। সে কাউকে বের হতে না দেখলে কোনো সন্দেহই করবে না। যতক্ষণে সে বুঝবে, আমরা উধাও; তার আগেই আমাদের মেরে ফেলবে।

আমরা এবার শেষ।

শেষ খেলা

আমাদের একটা দারুণ ঠান্ডা ঘরে রেখেছে। এই ঘর পর্যন্ত আসতে একটার পর একটা মহা বিস্ময়কর ঘটনা দেখেছি। প্রথমেই আমরা বুঝেছি, মামা যা অনুমান করেছে, ঠিক তা-ই হচ্ছে এখানে—মানুষের অঙ্গ পাচারের কারবার হচ্ছে। কিন্তু তার চেয়েও বড় বড় সব চমক দেখেছি আমরা। এত কিছু দেখেছি যে, গুছিয়ে বলতেও পারছি না।

সুড়ঙ্গে গাড়িটা ঢোকার আগেই প্রথম চমক টের পেলাম। আমাদের গাড়ির ওপর ঝুপ করে কী যেন একটা পড়ল। একটু পরই দেখলাম, গাড়ির কাচগুলো কালো কাপড়ে ঢেকে গেল। মামা আস্তে করে বলেছিল, 'ওপর থেকে কোনোভাবে কাপড় ফেলে গাড়ি ঢেকে দিচ্ছে। এতে দূর থেকে দেখলেও; কেউ বুঝবে না, গাড়িটা ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে।'

আবারও পুলিশগুলো, না, শয়তানগুলো খ্যাঁক খ্যাঁক করে হেসে উঠেছিল। একজন বলেছিল, 'এই গোয়েন্দার তো আসলেই বুদ্ধি আছে।'

অফিসার টাইপের গুণ্ডাটা মুখে চুক চুক শব্দ করে বলেছিল, 'কিন্তু এই বুদ্ধি কোনো কাজে লাগবে না! আফসোস!'

এরা খ্যাঁক খ্যাঁক করে হাসতে হাসতেই আমাদের নিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল। ঘট ঘট শব্দে বুঝেছিলাম, গেট খুলে গেল। তারপরই গাড়ির ওপর থেকে কাপড় সরিয়ে, গেট খুলে আমাদের টেনে নামাল। উর্মির মুখ দেখে মনে হলো, যেকোনো সময় ভ্যা করে কেঁদে ফেলবে। আমি ওর হাত ধরে রেখেছিলাম, যাতে বেশি ভয় না পায়।

সাকি মামা কি যেন একটা বলার চেষ্টা করছিল। তার আগেই অফিসার সাজা গুণ্ডাটা বলে, 'এখন সব চুপ। বড় সাহেব আসছেন।'

বলতে বলতেই আমাদের পেছনের দিকে আরেকটা দরজা খুলে গেল। দেখি, সেখান থেকে আলখেল্লা পরা, মুখে দাড়ি একজন লোক বেরিয়ে আসছে। কে জানো লোকটা?

সেই সাহেব ওঝা!

আমাদের দেখেই সাহেব ওঝা এক গাল হেসে বলল, 'আরে! এ কারা? এরা তো আমার পুরোনো বন্ধু। এদের কেন ধরে এনেছ?'

অফিসার গুণ্ডাটা বলে, 'স্যার, এরাই আজ একবার গুহায় ঢুকেছিল। পরে আমাদের গাড়ি থামিয়ে পুলিশ ভেবে সব বলে দিয়েছে।'

সাহেব ওঝা আফসোস করার মতো করে মাথা নাড়ল, 'আহা রে! এদের ওখানে একটা জমিদার বাড়ি আছে। সেখানে আরেকটা সেন্টার করব। ভেবেছিলাম, এদের যন্ত্রপাতি ওখানেই খুলব। তা না করে, এখানে করতে হচ্ছে। আফসোস, আফসোস।'

আমি শুধু বললাম, 'সাহেব ওঝা! তুমি এ জন্যই আমাদের শকশোর ভয় দেখিয়েছিলে?'

'আহা রে! এই সাগর ছেলেটার কী তেজ! ঠিক বলেছ ভাই। আমি চেয়েছিলাম, শকশোর ভয়টা তোমাদের গ্রামেও ছড়িয়ে দিতে। যাক তোমার আরেকটা বন্ধু আছে না। ওকে দিয়ে ছড়িয়ে দেব।'

এবার সে বাকি লোকদের দিকে ফিরে বলল, 'যাও। এদের খাতির করো। ওই ঘরে রেখে দাও। আরও দুটো লোক আছে না বেঁচে?'

একজন বলল, 'জি স্যার।'

'ভালো, ভালো। এদের পাঁচজনের অপারেশনই আজ রাতে করে ফেলতে হবে। এই আস্তানাটা ছাড়তে হবে। এখানে কাজ বেশি করা হয়ে যাচ্ছে। আজ বাদে কাল হয়তো পুলিশ-র্যাব চলে আসবে। আমরা ভোরেই একসঙ্গে চলে যাব।'

তারপর থেকে আমরা এই ঘরটায় বন্দি হয়ে আছি। ঘরটায় বন্দি হয়ে একটা উপকার হয়েছে। উর্মি একটু আনন্দ পেয়েছে। এই ঘরেই দেখা গেল অকাতরে ঘুমাচ্ছে ফেসবুক! 'আমার ফেসবুক' বলে কুকুরটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে উর্মি। ফেসবুকও উর্মির সাড়া পেয়ে উঠে কুঁই কুঁই করতে থাকল।

সাকি মামা বলল, 'কুকুরটাকে মেরে তো লাভ নেই। তাই মারেনি। আবার ছেড়ে দিলে বিপদ হতে পারে বলে ছাড়েওনি।'

সেই থেকে আমরা পুরো বন্দি। কেউ কোনো কথা বলছি না। উর্মি শুধু ফেসবুককে জড়িয়ে ধরে মাঝে মাঝে ফোঁপাচ্ছে। আমাদের ঘরটা অনেকটা সিনেমায় দেখা জেলখানার ঘরের মতো। পেছনে তিন দিকে পাহাড়ের দেয়াল। সামনে লোহার দরজা। দরজার ওপাশে কেউ এসে দাঁড়ালে তার মুখ দেখা যায়; ওপরে একটু ফাঁক আছে। সে ফাঁক থেকে অবশ্য হাত ঢোকানো যাবে না; লোহার গ্রিল বসানো। এখানে অপারেশনের আগে লোকদের এনে রেখে দেয়। পাশের ঘরে মনে হয় আরও লোক আছে।

উর্মি হঠাত্ মামাকে প্রশ্ন করল, 'আচ্ছা মামা, মানুষের কী অঙ্গ কেটে নেয় এরা?'

মামা একটু হতাশ হয়ে বলল, 'অনেক কিছুই। কিডনি, লিভার, চোখ তো চড়া দামে বিক্রি হয়ই। আজকাল আরও অনেক অঙ্গ চড়া দামে বিক্রি হয়।'

'অনেক দাম!'

'হ্যাঁ। তুমি কল্পনাও করতে পারবে না; এত দাম। একটা মানুষের অঙ্গ বেচেই কোটিপতি হয়ে যেতে পারে এরা।'

আমার মাথায় একটা প্রশ্ন এল, 'আচ্ছা মামা, এরা ফজলা ভাইকে কখনো ধরল না কেন?'

'শুনলি না, ফজলার কিডনিতে সমস্যা। ওরা শুধু শুধু ফজলাকে ধরে ঝামেলা করতে চায়নি। দেখা যাবে, ফজলার বাকি অঙ্গগুলোও খুব ভালো নেই।'

'ও!'

একটু পরই আমাদেরও এভাবে কেটে ফেলবে। আর কখনো মা-আব্বাকে দেখতে পাব না, রাজীবের সঙ্গে দেখা হবে না, আর কখনো গেমস খেলা হবে না; এসব ভাবতেই আমার কান্না আসছে। উর্মিও নিশ্চয়ই এরকম কিছু ভাবছে। কিন্তু চেয়ে দেখি, উর্মি খুব অবাক হয়ে দেয়ালের পাশে কি একটা দেখছে। অবাক হয়ে ডাক দিল, 'দেখে যাও।'

আমি আর মামা এগিয়ে গিয়ে দেখি, একটা ফুটো দেখছে উর্মি। সাকি মামা ভালো করে দেখে বলল, 'টিলার অন্য পাশের দেয়ালের ফুটো। এখান থেকে পানি গড়িয়ে বের হয়।'

কিন্তু ফুটো পেয়ে লাভ নেই। একটা হাতও গলাবে না এর থেকে। আমি আবার জায়গায় এসে বসে পড়লাম। সাকি মামার মুখে হঠাত্ হাসি দেখা গেল। বলল, 'সাগর, তোর ব্যাগটায় ছুরি আছে না?'

'আছে তো।'

'বের কর। এবার কাজে লাগবে।'

ওইটুকু ছুরি দিয়ে কী হবে? আমি জানি, ওই ছুরি দিয়ে গর্ত করা যায় না। তারপরও দিলাম মামার হাতে। মামা ছুরিটা নিয়ে গর্তের পাশে খোঁচানো শুরু করল। একটু জোরে জোরে কয়েকটা খোঁচা দিতেই একটা পাথর খসে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে বেশ আরেকটু বড় হয়ে গেল গর্তটা। মামার উত্সাহ বেড়ে গেছে। অনেকক্ষণ ধরে আশপাশে খোঁচালো। কিন্তু আর কোনো পাথর খসে পড়ে না।

মামা হতাশ হয়ে বলল, 'আর আলগা পাথর নেই।'

আমরাও খুব হতাশ। উর্মি মুখ কালো করে বলল, 'এখান থেকে তো আমরা বের হতে পারব না।'

মামা একটু সময় চুপ। তারপরই আস্তে আস্তে বলল, 'ফেসবুক পারবে।'

আরে বাবা! এটা তো মাথায় আসেনি। উর্মি ফেসবুককে ধরে গর্তের কাছে নিয়ে এল। আস্তে আস্তে করে বলল, 'ফেসবুক বাড়ি যাও। বাড়ি থেকে সবাইকে ডেকে আনো।'

ফেসবুক কী বুঝল কে জানে। সামনের দু-পা উঁচু করে গর্তটায় ঢুকতে চাইল। আমরা পেছন থেকে ধরে ওকে ঢুকিয়ে দিলাম। ফেসবুকের খুব কষ্ট হচ্ছে। এপাশ থেকে আমরা ঠেলছি, ওপাশ থেকে ও হাচড়ে পাচড়ে এগোচ্ছে। ওপাশে কী একটা শব্দ হলো। আমরা ভয় পেয়ে গেলাম। ফেসবুকও ঠিক সেই সময় বাইরে বেরিয়ে গেল গর্ত থেকে।

একটা লোক এসে দাঁড়াল আমাদের রুমের সামনে। মামা এদিকে গর্তটা আড়াল করে দাঁড়িয়ে পড়ল।

লোকটা মামার দিকে ফিরে বলল, 'কোনো চালাকির চেষ্টা কোরো না। আরেকটু পরই তোমাদের নিতে আসবে।'

বলে লোকটা চলে যাচ্ছিল। তার আগেই মামা ডাক দিল, 'ভাই, মেরে তো ফেলবেনই। তার আগে একটু পানি দিতে পারেন?'

'পানি!'

'হ্যাঁ, এই মেয়েটা খুব কষ্ট পাচ্ছে। ওর বুকে ব্যাথ্যা হচ্ছে।'

চেয়ে দেখি চোখের পলকে উর্মি বুক চেপে ধরে ব্যাথায় কাতরাচ্ছে। লোকটা চলে গেল। মামা ঝট করে সরে এসে গর্তটার মুখে আমার ব্যাগটা দাঁড় করিয়ে দিল। তারপর বলল, 'শোন, এখন আমাদের প্রধান কাজ টাইম পাস করা। সে-জন্য দরকার হলে কিছু ঝামেলা করতে হবে।'

'কীভাবে করবে?'—আমি সিনেমার মতো মজা পাচ্ছি।

'কিচ্ছু না। এই লোকটা পানি নিয়ে আসলে, ওকে কাবু করে আমরা বেরিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজব। তাতে আর কিছু না হোক, এরা প্ল্যান থেকে একটু সরে আসবে।'

'ওক্কে।'

বলতে না বলতেই পানি নিয়ে লোকটা চলে এল। এক হাতের পানির গ্লাসটা নিচে রেখে তালা খুলল। আবার পানির গ্লাস নিতে যেই নিচু হয়েছে; মামা দরজাটা একটানে খুলে ফেলে ওর মুখ চেপে ধরল। মামা নিয়মিত ব্যায়াম করে তো। শরীরে দারুণ জোর। মুখ চেপে ধরে কি যেন একটা করল। লোকটা পড়ে গেল। আমি ভয় পেয়ে বললাম, 'মেরে ফেললে!'

'আরে নাহ। ঘাড়ের পেছনে চাপ দিয়েছি। অজ্ঞান হয়ে গেছে। আর কথা বলিস না। এখন পালাতে হবে।'

পালানোর পথ বের করা সহজ না। আমরা গুহার উল্টো দিক ধরে দৌড়াতে শুরু করলাম। সবাই পায়ের জুতো খুলে নিয়েছি; শব্দ হবে না। কিন্তু জুতো না থাকায় পায়ের পাতায় খুব ব্যথ্যা করছে। অনেকক্ষণ ধরে হাঁটছি। এর যেন কোনো শেষই নেই। প্রায় পনেরো মিনিট হয়ে গেল। তারপর দেখি সামনে সেই গেট! আরেকটু হলেই আমরা বেরিয়ে যেতে পারব।

কিন্তু এখন এই গেট খুলব কী করে?

মামা কি যেন বলতে গেল। তার আগেই পেছন থেকে চড়া গলা শোনা গেল, 'গেটের দিকেই গেছে। কিছুতেই যেন পালাতে না পারে।'

এবার! এবার কী হবে? মামা হাতের ইশারায় পাশে ছোট একটা সুড়ঙ্গ দেখাল। এটা চোখেই পড়ে না। মূল সুড়ঙ্গ থেকে আরেকটা সুড়ঙ্গ একটু ওপরের দিকে উঠে গেছে। মামা ঝট করে ওটায় ঢুকে পড়ল। তারপর আমাকে আর উর্মিকে টেনে তুলল। উর্মিও কেবল ঢুকেছে; এর মধ্যে লোকগুলো পৌঁছে গেল।

চার জন লোক। সবাই একসঙ্গে কথা বলছে। একজন বলল, 'এখানে তো নাই। গেল কই?'

'তাহলে ভেতরের দিকেই আছে। চলো ভেতরে।'

বলে চারজনই ফিরে গেল। আমি আবার নেমে আসতে চাচ্ছিলাম। তার আগেই মামা ফিস ফিস করে বলল, 'সাহায্য না আসা পর্যন্ত এখানে লুকিয়ে থাকতে হবে।'

কত সময় কেটে গেছে জানি না। বুঝতে পারছি ভেতরে খুব গোলমাল চলছে। এবার দেখি সাহেব ওঝা নিজেই তিন চার জন লোক নিয়ে এদিকে আসছে। মেজাজ খারাপ করে চিত্কার করে বলছে, 'গেট খুলে দেখ, বাইরে চলে গেল কি না!'

একজন এসে গেটটা খোলা শুরু করল। গেট খোলার খটাং শব্দে উর্মি হঠাত্ কেঁপে উঠল। আর উর্মির পায়ে লেগে একটা পাথর গড়িয়ে পড়ল ঠিক সাহেব ওঝার সামনে। আর যায় কোথায়। সবাই চিত্কার করে উঠল, 'ওই যে।'

বলতে না বলতেই আমাদের টেনে নামালো সবাই। সাহেব ওঝা এবার আর হাসছে না। রাগে দাঁত কড়মড় করছে। মামার দিকে চেয়ে বলল, 'খুব গোয়েন্দাগিরির শখ তাই না? আমাদের এতগুলো পার্টস আজ সরানোর মতো গাড়ি নাই। তোর শখ তাহলে এখানেই মিটিয়ে দিই।'

বলেই ঝোলার ভেতর থেকে পিস্তল বের করে ফেলল। মামা এবার গেছে! আমাদের কত আদরের সাকি মামা। মামার কপালে পিস্তল চেপে ধরেছে। আমরা চোখ বুজে ফেলেছি। শুধু একটা শব্দ শুনলাম বোমা ফাটার মতো—দুম!

মামা মরে গেল!

ভয়ে ভয়ে চোখ খুললাম। মামা, না। সামনে পড়ে কাতরাচ্ছে সাহেব ওঝা। আর তার পাশে দাঁড়িয়ে পিস্তল তুলে নিচ্ছে সাকি মামা; আমাদের সাকি মামা। তাহলে সাহেব ওঝাকে গুলি করল কে?

'আমরা! আমরা চলে এসেছি। কেউ ভয় পেও না। তোমরা এদিকে চলে আসো'—রাজু কাকু। রাজু কাকুর পাশে পুলিশ। সত্যিকারের পুলিশ।

এই পাতার আরো খবর -
font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেছেন, 'রাজনৈতিক দল হিসাবে কর্মকাণ্ড করার কোনো অধিকার জামায়াত রাখে না।' আপনিও কি তাই মনে করেন?
2 + 9 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
অক্টোবর - ১৯
ফজর৪:৪২
যোহর১১:৪৪
আসর৩:৫২
মাগরিব৫:৩৩
এশা৬:৪৪
সূর্যোদয় - ৫:৫৭সূর্যাস্ত - ০৫:২৮
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :