The Daily Ittefaq
ঢাকা, সোমবার ০৫ আগস্ট ২০১৩, ২১ শ্রাবণ ১৪২০ এবং ২৬ রামাযান ১৪৩৪
সর্বশেষ সংবাদ হাইকোর্টের রায় বহাল; নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না জামায়াত | আপিল করেছেন গোলাম আযম | অষ্টম মজুরি বোর্ডের সুপারিশে মন্ত্রিসভার একমত

বড় গল্প

জলের আয়নায় মুখ

সারওয়ার-উল-ইসলাম

কাজল ব্যাগটা কাঁধে ঠিকমতো ঝুলিয়ে বাস থেকে নামল।

বাসটা কালো ধোঁয়া ছেড়ে চলে গেল দ্রুত গতিতে। একবার বাসটার দিকে তাকিয়ে কাজল হাঁটা শুরু করে সামনের দিকে।

ঢাকা থেকে চার ঘণ্টা লাগল এই সুবর্ণগ্রামে আসতে। থাকবে দু-দিন এ গ্রামে। এসেছিল আট বছর আগে। তখন এ গ্রামের অবস্থা এমন ছিল না। এসেছিল লঞ্চে। ঢাকার সদরঘাট থেকে লঞ্চে উঠেছিল। সে-বারই প্রথম লঞ্চে ওঠার অভিজ্ঞতা। লঞ্চের ডেক-এ দাঁড়িয়ে সামনের দিকে লঞ্চের এগিয়ে যাওয়া দেখতে খুবই ভালো লেগেছিল কাজলের। কেবিনে সিট নিলেও সারাটা পথ কখনো ডেক-এ দাঁড়িয়ে কখনো পাশের রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়েই কাটিয়েছিল চার ঘণ্টার পথ। উঠেছিল বেলা এগারটায়। সুবর্ণগ্রামে এসে পৌঁছেছিল তিনটার সময়। দুপুরে লঞ্চেই খেয়েছিল। আহ এখনো মনে হয় সেই ভাত আর তরকারির স্বাদটা যেন জিহবায় লেগে আছে। লাল চালের ভাত। ইলিশ মাছ ভাজা, সরপুঁটি মাছ বেগুন দিয়ে রান্না করা হয়েছিল। সঙ্গে ছিল পাতলা ডাল। ধোঁয়া ওঠা ভাত খেতে খেতে চার প্লেট খেয়ে ফেলেছিল।

লঞ্চের পেছনে তাকিয়ে দেখেছিল কতগুলো গাংচিল উড়ে উড়ে আসছিল। মামুনের কাছে শুনেছিল লঞ্চের পেছনে ঘূর্ণায়মান ব্লেডের আঘাতে মাছ মরে ভেসে ওঠে, সেই মাছ ছোঁ মেরে তুলে নেবার জন্য লঞ্চের পেছনে পেছনে উড়ে উড়ে আসে গাংচিলগুলো।

সুবর্ণগ্রাম তখন ছিল গাছপালায় ঘেরা। যেদিকে তাকাতো শুধু সবুজ চোখে পড়ত। এখন কমে গেছে সবুজ আর ছায়া ছায়া পরিবেশ। প্রায় বাড়িতে দালান দেখা যায়। সেবার মামুনের সঙ্গে গ্রামে ঘুরতে ভালো লাগেনি। মামুন প্রতিদিন বিকেলে কাজলকে গ্রাম দেখাতে বের হতো। খালের পাড় দিয়ে হেঁটে হেঁটে অনেক দূরে চলে যেত। ছোট ছোট মাছ ধরার নৌকা দেখত। ভেশাল দিয়ে মাছ ধরতে দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকত।

মামুন খুবই একরোখা স্বভাবের ছিল। কাজল যতই বলত, আমার ভালো লাগছে না গ্রাম ঘুরে দেখতে, মামুন ততই বলত চল আজ একটা নতুন জায়গা তোকে দেখাব। এভাবে সাতটা দিন দেখতে দেখতে কেটে গিয়েছিল।

সেই ঢাকা কলেজের বন্ধু মামুনের গ্রাম এটা। দুজন খুব ভালো বন্ধু ছিল। ঢাকা কলেজ থেকে পাশ করে দুজনেই ভর্তি হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, পালিটিক্যাল সায়েন্সে। ঢাকা কলেজে থাকতেই রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিল দুজন। প্রথমে ছাত্র ইউনিয়ন করত। পরে দল পাল্টে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের ছাত্রলীগের সক্রিয় কর্মী হয়। পরে বিশ্ববিদ্যালয় শাখার একজন তথ্য সম্পাদক অন্যজন প্রচার সম্পাদকের পদ পেয়ে যায়। শুরু হয় পুরোদমে রাজনীতি। নানা দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে মিটিং মিছিল থেকে শুরু করে আন্দোলেনে সামনের সারিতে থাকত দু-বন্ধু। একই হলে থাকত। প্রথমে ক্লাস একটু কম করলেও পরে ঠিকই ক্লাস করত দুজনেই।

বিশ্ববিদ্যালয়ে মামুন ছিল প্রচণ্ড গোঁয়ার প্রকৃতির। কাউকে ছেড়ে কথা বলত না। মিছিলের অগ্রভাগে থাকত সবসময়। অন্য নেতাকর্মীরা বিভিন্ন জায়গা থেকে চাঁদাবাজি করত। মামুন মাঝে মাঝে প্রতিবাদ করত। সেই প্রতিবাদই কাল হয়েছিল মামুনের জন্য। দলের ভেতরে কেউ কেউ ওকে দেখে নেবার হুমকি দিয়েছিল। কাজলের ধারণা, প্রতিপক্ষের সঙ্গে যেদিন গোলাগুলি হলো সেদিন নিজের দলের কেউ ওকে গুলিটা করেছিল। বিষয়টা অবশ্য কারও সঙ্গে শেয়ার করেনি আজ পর্যন্ত। যদিও কাজল তখন জেলে ছিল। তবে জেল থেকে বের হয়ে গোলাগুলি যেদিন হলো সেদিনকার এক প্রত্যক্ষদর্শীর কাছে যে বিবরণ শুনেছিল তা থেকেই কাজল আন্দাজ করেছিল মামুনের বুকে লাগা গুলিটা দলের ভেতর থেকে কেউ করেছিল। গুলিটা খুব কাছ থেকে কেউ ছুঁড়েছিল। বুকের বাঁ-পাশ দিয়ে ঢুকে পেছন দিক দিয়ে বের হয়ে গিয়েছিল।

মামুন মারা যাবার দু-মাস পরে জেল থেকে বের হয়েছিল কাজল। ষড়যন্ত্রমুলক চাঁদাবাজির মামলায় সেবার জেল খেটেছিল কাজল। ক্ষমতাসীন প্রতিপক্ষের লোকজন চাঁদাবাজদের সঙ্গে কাজলের নামটাও এক মামলায় ঢুকিয়ে দিয়েছিল। তাই অযথাই তিন মাস জেল খেটেছিল। জেল থেকে বের হয়ে একবার ইচ্ছে হয়েছিল মামুনদের গ্রামে আসবে। আবার পরক্ষণেই মামুনের বাবা-মায়ের চেহারাটা মনে হতেই কেন জানি আর আসতে ইচ্ছে করেনি। তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে কী জবাব দেবে? তাদেরকে কী বলে সান্ত্বনা দেবে? এসব ভেবে আর আসা হয়নি।

বেলা পড়ে গেছে। সূর্যের তেজ নেই বললেই চলে। শীত বিকেলের অবস্থা যা হয়। খানিকটা পথ হেঁটে একটা পান-সিগারেটের দোকানের কাছে এসে দাঁড়াল। পকেটে সিগারেট আছে তবুও মাঝবয়েসি দোকানিকে বলল, 'একটা বেনসন দেখি তো ভাই।'

দোকানি লোকটা সিগারেট হাতে দিয়ে বলল, 'ওই যে দড়ির মাথায় আগুন আছে।'

কাজল বলল, 'লাগবে না। লাইটার আছে।'

দোকানি কাজলের দিকে তাকিয়ে আছে জুলজুল করে, যেন এমন মানুষ এই প্রথম দেখছে। আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করে বলল, 'ভাই কি ঢাকা থেইকা আইছেন?'

সিগারেট ধরিয়ে আয়েশ করে একটান মেরে কাজল বলল, 'হ্যাঁ।'

'এখানে কই আইছেন? '

কাজল মনে মনে ভাবল, যাক বাবা বাঁচা গেল, নিজের থেকে আগ বাড়িয়ে আর রাশেদদের বাড়ির লোকেশনটা জিজ্ঞেস রতে হবে না। তার কথার রেশ ধরেই জিজ্ঞেস করা যাবে। বলল, 'শফিক তালুকদারের বাড়ি যাব।'

'আপনার কী হন তালুকদার সাব?'

আমার বন্ধুর বাবা। আচ্ছা ওনাদের বাড়িটা কোন দিকে যেন?'

'আপনে আগে আসেন নাই?'

'এসেছিলাম। আট বছর আগে। তখন তো এই পথ-টথ, গাড়ি-টাড়ি ছিল না। তখন লঞ্চে এসেছিলাম। এত ইটের দালানবাড়ি, দোকান-পাটও ছিল না।'

দোকানি লোকটা দোকান থেকে নেমে হাত দিয়ে দেখিয়ে যা বোঝাল তা হচ্ছে—দু-শ গজ হেঁটে উঁচু সড়ক থেকে নেমে তিনটা খেতের পর যে বাড়িটা দেখা যাচ্ছে তারপরে একটা পুকুর আছে। সেই পুকুরের পশ্চিম দিকের বাড়িটাই রাশেদদের।

কাজল লোকটার আন্তরিকতায় মুগ্ধ হয়ে গেল। বলল, 'আপনাকে অনেক ধন্যবাদ ভাই, এক কাজ করেন আমাকে এক প্যাকেট বেনসন দেন।'

দোকানি লোকটা আমতা আমতা করে বলল, 'আমার কাছে এক প্যাকেট হইব না। এখানে স্টার সিগারেট বেশি চলে। বেনসন কেউ খায় না। শহর থেইকা কেউ আইলে চায়। তারপরও এক প্যাকেট রাখি। পরশু এক প্যাকেট আনছিলাম। আইজ আপনের কাছে শেষ একটা বেচলাম।'

কাজল ভাবছে, মামুন মাঝে মাঝে বলত—আমাদের গ্রামের মানুষগুলো সরল। মনটাও নরম।

কথাটা মনে আসতেই আর অপেক্ষা করল না। হাঁটা শুরু করল।

দুই

আখি ওর ঘরে শুয়ে সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের কিশোরদের জন্য লেখা 'ইতি পলাশ' উপন্যাস পড়ছে। কলেজ থেকে ফিরে খেয়ে বইটা নিয়ে শুয়েছে। ঘরটা চমত্কার গোছানো। দখিনা জানালা দিয়ে সামনের খেত আর খেতের মাঝখান দিয়ে চলে যাওয়া পথটা দেখা যায়। চুলগুলো ছেড়ে দিয়ে উপুর হয়ে বইটা পড়ছে।

আখির পরনে হালকা সবুজের ওপর শাদা বুটিদার কামিজ আর শাদা সেলোয়ার। ওড়নাটা গলায় প্যাঁচানো। একমনে পড়ে যাচ্ছে। গ্রামের কলেজে বিএ পড়ে। এবারই ভর্তি হয়েছে বিএ-তে। আখির বড় ভাই মামুন দুই বছর আগে মারা গেছে। ছাত্র-রাজনীতি করত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ত। একদিন ক্যাম্পাসে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া শুরু হলে বিপক্ষ দলের গুলিতে মামুন মারা যায়। মামুনের পরে আরেক ভাই রাশেদ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইকোনোমিক্সে এম এ পড়ে। বাবা-মার খুব আদুরে মেয়ে আখি।

আখি একসময় বইয়ের পাতা থেকে চোখ সরিয়ে জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। দেখল, কে একজন ওদের বাড়ির দিকে আসছে। কাঁধে ব্যাগ ঝোলানো। হাঁটার ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে, এ গ্রামে এর আগে আসেনি কোনোদিন। ওদের বাড়ির দিকে বারবার তাকাচ্ছে। বইটা ভাঁজ করে রেখে শোয়া থেকে উঠে বসল।

কে লোকটা? প্রশ্নটা মনে মনে আওড়িয়ে ওপরের ঠোঁট দিয়ে নিচের ঠোঁট চেপে ধরল। খুব কাছে চলে এসেছে। আখি এবার খাট থেকে নেমে দরজায় কাছে এসে দাঁড়াল। উঠানে মা আর দুলি খালা কথা বলছে। আখিদের উঠানে ঢোকার পথে আড়াআড়ি করে রাখা যে বেড়াটা আছে, সেখানে এসে লোকটা দাঁড়িয়েছে। ওখানে দাঁড়ালে উঠান সরাসরি দেখা যায় না। লোকটা কাশি দিয়ে বলল, 'কেউ আছেন বাড়িতে?'

আখির মা মাথায় ঘোমটা টেনে এগিয়ে গেলেন। লোকটার মুখের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন।

আখি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, 'মা কাকে চাইছেন উনি?'

আখি কোনো সাড়া না পেয়ে দরজার কাছ থেকে নেমে হেঁটে মা-র পাশে এসে দাঁড়াল।

লোকটা বলল, 'খালাম্মা আমি কাজল। মামুনের বন্ধু।'

আখি একবারেই চিনতে পেরে বলল, 'মা উনি কাজল ভাই। আমাদের বাড়িতে বড় ভাইয়ার সঙ্গে এসেছিলেন। তুমি চিনতে পারছ না?'

মা-র চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে। খানিকটা সময় পর আঁচলে চোখ মুছে বললেন, 'তোমাকে প্রথমেই চিনতে পেরেছিলাম বাবা। তোমাকে দেখেই আমার মামুনের মুখখানি মনে পড়ে গিয়েছিল। আমার যে কী হলো তখন—তোমাকে বোঝাতে পারব না বাবা। আমার মনে হলোযেন মামুন বুঝি ফিরে এসেছে ঢাকা থেকে। যেমন করে ছুটিছাটাতে আসত। কিন্তু যখন মনে পড়ল মামুন তো বেঁচে নেই তখন চোখের পানি আটকে রাখতে পারলাম না। আসো বাবা ঘরে আসো।'

কাজল কিছুটা ইতঃস্তত এবং অপরাধবোধ নিয়ে যেন ঘরে ঢুকল। ঘরে ঢুকে একটা মোড়ায় বসে বলেই ফেলল, 'খালাম্মা আমি খুব লজ্জিত এবং বলতে পারেন অপরাধী।'

'কেন বাবা? '

'মামুনের লাশের সঙ্গে আসতে পারিনি।'

'আমরা তো শুনেছি তুমি তখন জেলে ছিলে।'

'তারপরও খালাম্মা দু-ছর পার হয়ে গেল, এর মধ্যে একবার আসা উচিত ছিল।'

আখি বলল, 'আসলে কাজল ভাই, আমরা ভেবেছি আপনি হয়তো দেশের বাইরে-টাইরে চলে গেছেন।'

'না বাইরে যাবার ইচ্ছে ছিল না কোনোদিন। যদিও অনেক সুযোগ এসেছিল। ছ-মাস আগে পাস করে বের হয়েছি। পার্টি করতাম সেই কারণেই বলতে পার চাকরি পেয়েছি দ্রুত। এখন পার্টিকে তেমন সময় দিই না।'

'আপনার চাকরি হয়েছে?' আখি বলল।

'হ্যাঁ গত মাসে জয়েন করেছি একটা বিদেশি কোম্পানিতে।'

'যাক বাবা শুনে খুব খুশি হলাম।' মামুনের মা বললেন।

কাজল ওর ব্যাগ থেকে একটা কাপড় আর পাঞ্জাবি বের করে মামুনের মা-র হাতে দিয়ে বলল, 'খালাম্মা, আপনার আর খালুর জন্য।'

'তুমি এগুলো আনতে...'

কাজল মামুনের মাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, 'খালাম্মা কোনো কথা বলবেন না। আমি প্রথম বেতন পেয়ে আমার মা আর বাবার জন্য একই রকম কাপড় আর পাঞ্জাবি কিনেছি। তাই আপনাদের জন্যও আনলাম।'

'তুমি কেন খামোখা....'

'খালাম্মা, মামুন বেঁচে থাকলে ওর চাকরি হলে নিশ্চয়ই এরকম প্রথম বেতন পেয়ে আপনাদের জন্য কাপড় কিনে আনত। তখন কি আপনি একথা বলতে পারতেন?'

মামুনের কথা উচ্চারণ করতেই মা চুপ করে গেলেন। আবার চোখ দিয়ে পানি পড়ছে মা-র।

আখি মা-র পাশে বসে কাঁধে হাত রেখে বলল, 'মা, কেঁদো না।'

কাজল ওর ব্যাগ থেকে স্ট্যাম্প রাখার বুক বের করে বলল, 'এটা রাশেদের জন্য। রাশেদ কই আখি?'

'রাশেদ ভাইয়া ঢাকায়।'

'ঢাকা কোথায়?'

'ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইকোনোমিক্সে মাস্টারস করছে।'

'প্রিলিমিনারিতে?'

'হ্যাঁ।'

'থাকে কোথায়?'

'হলে।'

'ও আমার সঙ্গে দেখা করে না কেন? ঠিকানা তো ছিলই।'

'ওই যে বললাম আমরা ভেবেছি আপনি হয়তো বাইরে চলে গেছেন।'

'আচ্ছা আমি না হয় বাইরে গেছি ভেবেছ। আমার বাসায় তো যেতে পারত, কোথায় আছি জানার জন্য।'

'আসলে রাশেদ ভাইয়া এমনিতেই খুব সহজ-সরল। এখনো ভীষণ লাজুক। তাই আর যায়নি। মা কয়েকবার বলেছেন আপনার বাসায় খোঁজ নেবার জন্য। যায়নি।'

মামুনের মা উঠে বললেন, 'বাবা তুমি বসো, আমি তোমার হাত-মুখ ধোয়ার পানি দিতে বলি।' বলেই চলে গেলেন চোখ মুছতে মুছতে।

কাজল ওর ব্যাগ থেকে চারটা বই বের করে আখিকে বলল, 'এগুলো তোমার জন্য। তুমি তো খুবই বই ভালোবাস। এখনো কি খাওয়া-দাওয়া ভুলে বই পড়?'

'বাহ মনে আছে সে কথাও।'

'মনে থাকবে না কেন? তুমি তখন কোন ক্লাসে যেন পড়তে?'

'ক্লাস সিক্সে।'

'সেদিনকার ছোট আখি আজ কত বড় হয়ে গেছ। এখন কিসে পড়ছ?'

'বিএ।'

'তোমার কি মনে আছে তুমি দুষ্টুমি করে বলেছিলে—একটু কাজল দেবেন কাজল ভাই, আমার আখিতে পরব।'

'হ্যাঁ মনে আছে।'

উঠানের একপ্রান্তে গোসলখানা। সেখান থেকে মামুনের মা ডাকলেন, 'কাজল আসো, হাত-মুখ ধুয়ে নাও, পানি দিয়েছি।'

'যান হাত-মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে নেন। পরে কথা বলা যাবে।' আখি বলল।

কাজল ঘর থেকে বের হলো হাত-মুখ ধোয়ার জন্য।

তিন

কাজল বসে আছে বারান্দায়। আখি ট্রে-তে করে চিড়া ভাজা আর চা নিয়ে এসে বলল, 'চিড়া ভাজা আর চা আপনার প্রিয় ছিল। তা-ই না কাজল ভাই?'

'বাহ, সে কথা তোমার মনে আছে?'

'মনে থাকবে না কেন? আমার সব মনে আছে।' বলেই আখি মিটমিট করে হাসল। কাজল কেমন ঘোর লাগা চোখে তাকিয়ে থাকল আখির দিকে।

আখি বলল, 'কী হলো শুরু করেন। দেখেন তো কেমন হয়েছে?'

কাজল ট্রে থেকে চিড়া নিয়ে খেতে খেতে বলল, 'ভালো হয়েছে।'

'আমি কিন্তু রান্না করতেও পারি।'

'তা হলে তো তোমাকে আর ঘরে রাখা যাবে না। বিয়ে দিতেই হয় এবার। খালাম্মাকে বলব তোমার জন্য বর খুঁজব কি-না।'

'আমি বিয়ে করলে তো!'

'মানে?'

'কেন বিয়ে করবে না?'

'কাউকে নির্বাচন করে রেখেছ?'

'না ওসব কিছু না।'

'তা হলে?'

'আমার বিয়ে জিনিসটা ভালো লাগে না।'

'এটা কোনো কথা হলো?'

'এটাই আসল কথা।'

'আমার মনে হয় সামথিং রং। তুমি কাউকে ভালোবাসতে?'

'না।'

'কেউ তোমাকে ভালোবাসত। এখন দূরে চলে গেছে? তেমন কিছু?'

' আসলে কাজল ভাই তেমন কিছু না। আমি আসলে এখনো বিয়ে নিয়ে কিছু ভাবি না। পড়াশোনা করতে চাই। চাকরি করব। বাবা-মাকে আমার ইনকামের টাকা থেকে কিছু প্রতিমাসে দিব। বাবার অনেক টাকা তো খরচ করেছি। কিছু রিটার্ন দেওয়া উচিত না। কী বলেন?'

'তুমি তো অন্যদিকে চলে গেলে আবার।'

'আপনি কি মাইন্ড করলেন আমার কথায়?'

'না, এতে মাইন্ড করার কী হলো?'

'আপনি কাউকে ভালোবাসেন?'

'না। আমার আসলে ও রকম সময় ছিল না। রাজনীতি করতাম। সারাক্ষণ দলের কথা ভাবতাম। তাই ওদিকে যাওয়া হয়নি।'

'কেউ আপনাকে ভালোবাসত?'

'একটা মেয়ে শুনেছিলাম আমার প্রতি দুর্বল ছিল। ওর নাম ছিল অনু। কিন্তু বিশ্বাস করো আমার সময় ছিল না ওসব নিয়ে ভাবার।'

'আপনার সঙ্গেই পড়ত?'

'হ্যাঁ, কথাটা আমাকে বলেছিল মামুন।'

'আপনি কখনো অনুর সঙ্গে কথা বলেছিলেন?'

'না।'

'কেন?'

'আখি, আমি এমন এক ছেলে যে যখন যেটা নিয়ে মেতে থাকি সেটার বাইরে গিয়ে কিছু ভাবতে পারি না। এটা আমার হয়তো অযোগ্যতা।'

'অনু নিশ্চয়ই আপনার জন্য কষ্ট পেয়েছে।'

'কষ্ট পেলে আমার কিছু করার ছিল বলো?'

'আপনাকে অনু নিশ্চয়ই খুব অহংকারী ভেবেছে?'

'ভাবতে পারে।'

'আপনি আসলেই খুব হূদয়হীন মানুষ।'

'এটা ঠিক না। আমি তো অনুকে কোনো কথা দিইনি। ও ভালোবেসেছে একতরফাভাবে। ভালোবাসা কি এক তরফা হয়, বলো আখি?'

'এক তরফা হয় না জানি, কিন্তু একটুও মায়া হয়নি অনুর জন্য?'

'একবারের জন্যও না।'

'এখন যদি কোনোদিন দেখা হয়ে যায় অনুর সঙ্গে কোথাও, আপনার খারাপ লাগবে না?

'খারাপ লাগবে কেন?'

'অনু এখন কোথায়? জানেন?'

'আমার এক ইয়ারমেটের বউ।'

'আপনার সেই ইয়ারমেট জানে আপনাকে অনু ভালোবাসত?'

'কী জানি এটা কী করে বলব। তবে তোমার ভাই মামুন বেঁচে থাকলে জানতে পারতাম। মামুনের সঙ্গে অনুর মাঝে মাঝে কথা হতো।'

'আচ্ছা ভাইয়ার সঙ্গে কারও অ্যাফেয়ার ছিল?'

'না। আসলে আমরা ওসব নিয়ে ভাবার সময় পেতাম না।'

'আপনি আসলেই আশ্চর্য মানুষ। মানুষকে কষ্ট দিয়ে আনন্দ পান।'

'আনন্দ পাই কথাটা বললে কোন যুক্তিতে?'

'এই যে একটা মানুষ আপনার জন্য কষ্ট পেল। আপনার কাছে এটা কোনো ব্যাপারই না। আপনি দিব্যি আছেন।'

'না তোমার সঙ্গে এ ব্যাপারে কিছু বলা ঠিক হবে না। তুমি আমাকে অপরাধী বানানোর চেষ্টা করে যাচ্ছ। কিন্তু এটা মোটেও ঠিক না।'

'আসলে কাজল ভাই, আপনার মুখে অনুর বিষয়টা শোনার পর ওনার প্রতি আমার একটা সফট কর্নার তৈরি হয়েছে। তাই ওনার জন্য কষ্ট লাগছে। আর কিছু না।'

'আমি যে বিষয়টা বুঝতে পারছি না তা কিন্তু না। আমি তোমার বিষয়টা বুঝতে পারছি। কিন্তু একটু ঠান্ডা মাথায় ভেবে বলো, আমার কী করা উচিত ছিল?'

'অনু কি দেখতে খুব খারাপ ছিল?'

'না।'

'তা হলে আপনার সঙ্গে তাকে কি খুব বেমানান মনে হতো?'

'ভাইরে, আমি তো তাকে নিয়ে কোনো স্বপ্ন দেখার সুযোগ পেতাম না। তাকে নিয়ে পার্কে বসে বাদাম খাবার সময় পেতাম না। কিংবা কোনো রেস্টুরেন্টের আলো-আঁধারিতে বসে স্যুপ খেতে খেতে তাকে দেখে দেখে মুগ্ধ হবার সময় পেতাম না। কী অধিকার আছে আমার এভাবে একটা মেয়েকে বঞ্চিত করার?'

'বুঝলাম, আপনার দর্শনটা কেমন?'

'খুব কি খারাপ মানুষ মনে হচ্ছে আমাকে আখি?'

'না, তবে একটা কথা ঠিক আপনি খুব শক্ত মনের মানুষ।'

'ঠিক আছে তোমার কথা মেনে নিচ্ছি। এখন তোমার জন্য কি পাত্র দেখব?'

'চিড়া খান। অনেক কষ্ট হয়েছে ভাজতে। মানুষের কষ্টের কোনো মূল্য নেই জানি। তবে আমার কষ্ট করে তৈরি করা চিড়া ভাজাটা শেষ করেন।'

'তা হলে তোমার জন্য পাত্র দেখব না। তা-ই তো?'

'একশ বার বলছি দেখবেন না দেখবেন না দেখবেন না... বুঝলেন।'

'হ্যাঁ বুঝলাম। তবে খালা-খালুকে বিষয়টা বলব।'

'আপনার সাহস তো কম না।'

'এতে সাহসের কী দেখলে?'

'এই যে আমি আপনাকে এত বলছি আমার জন্য পাত্র দেখবেন না, তারপরও এই বিষয়টা নিয়ে কথা বলছেন।'

'এটা আমার দায়িত্ব বলে মনে করছি।'

'এত দায়িত্ব ফলাবেন না।'

'তুমি খুব সিরিয়াসলি কথাটা বললে মনে হয় আখি?'

'সরি কাজল ভাই। এই বিষয়টা নিয়ে আলোচনা থাক।'

'তুমি খুব ভালো মেয়ে আখি। খুব ভালো মেয়ে।'

'হঠাত্ এ কথা বললেন কেন?'

'এমনি বললাম।' বলেই হাসল কাজল।

আখি কোনো কথা বলল না। কাজলের দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকল। তারপর একসময় ট্রে-তে করে চায়ের কাপ আর চিড়া ভাজার প্লেটটা নিয়ে চলে গেল।

চার

রাতের খাবার খেতে বসেছে আখি, কাজল আর আখির বাবা-মা। বাবা বললেন,

'কাজল, মামুন মারা যাবার পর মামলা করা হয়েছিল। সেই মামলার খবর কী, জানো বাবা?'

'খালু, আসলে ক্যাম্পাসে ছাত্রদের দুই পক্ষের গোলাগুলিতে কেউ মারা গেলে মামলার যে অবস্থা হয়, মামুনের মামলার অবস্থাও ওই রকম। কোনো অগ্রগতি নেই।'

'তুমি ছাত্র-রাজনীতি করে কী করেছ? আজকাল তো শুনি ছাত্র-রাজনীতি করে অনেক কিছু করে ফেলে। বাড়ি-গাড়ি থেকে শুরু করে প্রচুর সহায় সম্পত্তির মালিক বনে যায় ছাত্রনেতারা। অনেকে আবার ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সদস্যও হয়ে যায়।'

'আপনি খালু যা বলেছেন এক-শ ভাগ খাঁটি কথা বলেছেন। প্রচুর ধন-সম্পত্তির মালিক হয়েই ক্ষান্ত দেয় না—নিজের এলাকায় গিয়ে সংসদ নির্বাচন করার জন্য তোড়জোড় শুরু করে। আরও ক্ষমতাবান আর টাকা-পয়সার মালিক হবার জন্য। আমি একদম এর ঘোর বিরোধী ছিলাম। মামুনও আমার মতো ছিল। আমার কিছুই নাই। একটা চাকরি পেয়েছি এক বড় ভাইকে বলে। আমি মনে করি এটা পাবার যোগ্যতা ছিল। তারপরেও এক বড় ভাইকে বলে রেখেছিলাম।'

'দেশটা যে কোন পথে যাচ্ছে বুঝতে পারছি না। আজকাল গ্রামের কলেজগুলোতেও ছাত্র-রাজনীতি এমন এক পর্যায়ে চলে গেছে যে শিক্ষকরাও ছাত্রদের ভয়ে তটস্থ থাকে।'

'এর জন্য দায়ী আমাদের বর্তমান রাজনীতি। এখনকার রাজনীতি মানেই তো পয়সা কামানোর রাজনীতি। দেশের উন্নতি করবে। শিক্ষার উন্নতি করবে। কৃষকের উন্নতি করবে—এগুলো শুধু মুখে মুখে। দেশের বড় বড় রাজনীতিবিদরা যখন টু-পাইস কামানোর ধান্দায় থাকে সারাক্ষণ তখন ছাত্ররা আর কী শিখবে?'

'রাজনীতি বলতে কিছু নেই এখন দেশে।'

'খালু, সরকারে পক্ষ থেকে আপনাদের এক লাখ টাকা মনে হয় দেওয়া হয়েছিল। টাকাটা পেয়েছিলেন?'

'হ্যাঁ। আমার মামুনের প্রাণের দাম সেই এক লাখ টাকা আমি আমাদের গ্রামের মাদ্রাসায় দান করেছিলাম। গরীব ছাত্রদের যদি একটু উপকার হয় সে-জন্য।'

'ভালো করেছেন খালু।'

'তোমার বাবা-মা ভালো আছেন?'

' হ্যাঁ খালু। আখি বলল, ও নাকি রান্না শিখে ফেলেছে। এখন তো তাহলে ওকে বিয়ে দেওয়া দরকার। আমি কি পাত্র খুঁজব? বলেই আখির দিকে তাকিয়ে কাজল হাসল।

'দেখো, তুমি তো বড় ভাই। দায়িত্ব তো কিছুটা আছেই তোমার।' বাবাও হাসলেন কথাটা বলে।

'ঠিক আছে দেখব।'

আর কোনো কথা না বলে ভাত খেয়ে উঠে পড়ল কাজল।

পাঁচ

রাতে রাশেদের ঘরে কাজলের থাকার ব্যবস্থা হলো। শোবার আয়োজন করছে আখি। বিছানায় নতুন চাদর বিছিয়ে বলল, 'বাসায় কে আপনার বিছানা ঠিক করে দেয়?'

'ভাবি। আমি তো আসলে এলোমেলো গোছের মানুষ। ওসব ঠিকঠাক করে রাখতে পারি না।'

'বাসায় হাটবাজার কে করেন?'

'বড় ভাই। কখনো বাবা।'

'আপনি করেন না কেন?'

'আমাকে দিয়ে ওসব হবে না।'

'কেন? আপনার বয়স হয় নাই?'

'না। এখনো হয় নাই।'

'আপনি খুব অলস টাইপের, না?'

'এক-শ ভাগ অলস। আমার ইচ্ছে করে ঘরে সারাদিন ঘুমাই। শুধু খাবার সময় কেউ ডেকে তুলবে। খাব, আবার ঘুমিয়ে পড়ব।'

'বাসায় কখন ঘুমান?'

'বেশি রাত জাগা হয় না।'

'অফিসে যান ক-টায়?'

'সকাল আটটার মধ্যে গাড়ি চলে আসে। ন-টায় অফিসে পৌঁছে যাই।'

'আমাদের এখানে একা থাকতে আপনার ভয় করবে না তো?'

'তোমাদের এখানে ভূতটূত আছে নাকি?'

'হ্যাঁ, এ বাড়িতে একটা ভূত আছে।'

'তা-ই নাকি?'

'হ্যাঁ, আপনি কি ভূতকে ভয় করেন?'

'না।'

'মানুষ ভূতকে?'

'হ্যাঁ, ভীষণ ভয় করি।'

'আমাদের এ বাড়িতে মানুষ ভূত আছে।'

'কোথায় থাকে?'

'আমার ঘরে। ভূতটা খুব জেদি আর একরোখা।'

'তা-ই নাকি?'

'হ্যাঁ, যখন যার ঘাড় মটকাতে ইচ্ছে করে তখন তার ঘাড় মটকিয়ে ছাড়ে। খবরদার! ওর কথার অবাধ্য হবেন না।'

'না না কখনো না। ভুলেও না।'

'এখন শুয়ে পড়েন। অনেক রাত হয়েছে। অবিবাহিত পুরুষের ঘরে যুবতী মেয়েদের বেশিক্ষণ থাকা অনুচিত।'

'তা-ই নাকি?'

'হ্যাঁ।' বলেই হেসে চলে যাচ্ছিল। কয়েক পা এগিয়েই আবার পেছনে তাকিয়ে বলল, 'দরজাটা লাগাতে ভুলবেন না যেন।'

'আচ্ছা আচ্ছা।' বলেই কাজল দরজা লাগিয়ে শুয়ে পড়ল।

ছয়

শানবাঁধানো ঘাটের সিঁড়িতে বসে কাজল আখির সঙ্গে গল্প করছে। আধঘণ্টা আগে কাজল ঘুম থেকে উঠেছে। হাত-মুখ ধুয়ে নাশতা সেরে ঘাটে এসে বসেছে। আট বছর আগে যখন মামুনের সঙ্গে এসেছিল সে-বার সাতদিন থেকেছিল। এই ঘাটটাই প্রিয় জায়গা ছিল কাজলের। প্রায় প্রতিদিনই এই ঘাটে বসে গল্প করত মামুনের সঙ্গে। আখি থাকত মাঝে মাঝে। আখি ছোটবেলা বেশ টকাস টকাস কথা বলত। খুব চটপটে স্বভাবের ছিল তখন।

ন-টার মতো বাজে। ঘাটে রোদ এসে পড়েছে। শীতসকালের এই নরম রোদের মতো আরামদায়ক আর কী হতে পরে। দুজন দু-পাশে বসে কথা বলছে। আখি বলল, 'কাজল ভাই, এতদিন আমাদের কথা আপনার একবারও মনে পড়েনি?'

'মনে পড়েছে। অবশ্যই মনে পড়েছে।'

'তবে আসেননি কেন?'

'আসলে সময় করে উঠতে পারিনি।'

'মিথ্যে বললেন।'

'সত্যি বলছি সময় পাইনি।'

'চলেন পানির দিকে মুখ রেখে বলবেন।' বলেই আখি সিঁড়ি ভেঙে পানির কাছে এল। কাজল আসছে না দেখে বলল, 'কই আসেন।'

'কী পাগলামো করছ।'

'আসেন তো। নইলে কিন্তু হাত ধরে টেনে আনব।'

কাজল হাসতে হাসতে পানির কাছে এল।

আখি বলল, 'এবার পানির দিকে তাকান।'

'এই তাকালাম।' বলেই কাজল হাঁটু ভেঙে বসে পানির দিকে তাকাল।

'আপনার নিজের মুখ দেখছেন তো?'

'হ্যাঁ দেখছি।'

'এবার বলেন—সত্যি বলছি তোমাদের কথা মনে ছিল।'

'সত্যি বলছি তোমাদের কথা মনে ছিল। হয়েছে?'

'হ্যাঁ হয়েছে। মাথা তোলেন।'

কাজল মাথা তুলে হেসে বলল, 'এটা করলে কেন?'

'পানিতে নিজের মুখ দেখে মানুষ কখনো মিথ্যে বলতে পারে না।'

'তোমাকে এ কথা কে বলেছে?' বেশ অবাক হয়ে কাজল জানতে চাইল।

'আমি জানি।' দৃঢ়ভাবে কথাটা বলল আখি।'

'তুমি দেখছি ফিলোসোফারদের মতো কথা বলছ। বিএ-তে তোমার সাবজেক্ট কী কী বলো তো?'

'বাংলা, সমাজবিজ্ঞান, সাইকোলজি আর ফিলোসফি।'

'তা হলে নির্ঘাত বড় হয়ে মহিলা ফিলোসোফার হবে।'

'আপনার কেমন লাগছে আমাদের গ্রামটা?'

'কেন? '

'সে-বার যখন এসেছিলেন তখন তো বলেছিলেন আমাদের এই ঘাট ছাড়া আর কিছুই ভালো লাগেনি। তাই জিজ্ঞাসা করলাম।'

'না, এবার সবকিছুই ভালো লাগছে।'

'সত্যি বলছেন তো? না কি আবার পানির দিকে তাকাতে বলব।'

'না না সত্যি বলছি।'

'চলেন আগের জায়গায় গিয়ে বসি।'

'চলো।'

ওরা আবার আগের জায়গায় বসে আলাপ করতে থাকে।

'আসলে কাজল ভাই, আমাদের গ্রামটা সত্যিই সুন্দর। এখানকার মানুষ এখনো এত সহজ-সরল আর সাদামাটা জীবনযাপন করে যে আপনারা যারা ঢাকা শহরে থাকেন, তারা চিন্তাই করতে পারবেন না।'

'তুমি দেখছি একদম মামুনের মতো কথা বললে।'

'আপনার আরেকটা কথা মনে আছে কাজল ভাই?' আখি বেশ আগ্রহের স্বরে বলল কথাটা।

'কোন কথাটা?'

'ওই যে আমাদের গ্রামটা আপানার ভালো লাগেনি বলে ভাইয়া বলেছিল...' আখি এতটুকু বলেই থেমে গেল।

'কী বলেছিল?'

'আপনার মনে নেই?'

'ঠিক মনে করতে পারছি না যে।' কাজল মিথ্যে বলল।

'আপনার কি সত্যি মনে নেই?'

'না তো।'

'কিন্তু আপনার চেহারা দেখে মনে হচ্ছে আপনার সত্যি মনে আছে।'

'সত্যি বলছি আমার একদম মনে নেই।'

'চলেন পানির কাছে।'

'চলো।' চলো শব্দটা কাজল এমনভাবে বলল যেন আখি শুনে হয়তো বলবে ঠিক আছে লাগবে না, বিশ্বাস করছি আপনার কথা। কিন্তু নাছোড়বান্দা আখি কাজলকে পানির সামনে নিয়েই ছাড়ল। বলল, 'পানির দিকে তাকিয়ে বলেন একদম মনে নেই।'

আখির চোখের দিকে তাকিয়ে কাজলের যে কী হলো ক-মিনিট তাকিয়ে থাকল।

কী দেখছিল কাজল ওই চোখে? ওই চোখ দেখেই কি জীবনানন্দ দাশ কবিতা লিখেছিলেন? আখিও মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে আছে। মাঝপুকুরে কী একটা মাছ যেন টুপ করে মাথা জাগিয়ে আবার তলিয়ে গেল। পুকুরের শীতল পানিকে সূর্যটা পরম মমতায় ভালোবাসার তাপ দিচ্ছে।

কাজল একসময় সামান্য হেসে বলল, 'আমি মিথ্যে বলেছি। আমার মনে আছে। ভুলিনি সে কথা।'

কী এক ঘোর লাগা চোখে আখি বলল, 'দেখলেন তো বলেছিলাম না পানির দিকে তাকিয়ে নিজের মুখ দেখে কেউ মিথ্যে কথা বলতে পারবে না।'

'আমি তোমার কথা মেনে নিলাম। আরও যোগ করব—তোমার চোখের দিকে তাকিয়ে কেউ কখনো মিথ্যে বলতে পারবে না। চলো বাড়ি চলো খালাম্মা আবার খোঁজাখুজি শুরু করবে।' আখি সেই ঘোরলাগা চোখেই কাজলের সঙ্গে পা মেলাল।

সাত

সকালের খাবারের জন্য আখির মা পাটি বিছিয়ে বসে আছে। কাজল আর আখি এসে বসল। আখির মা বলল, 'বাবা, তোমরা শহরের মানুষ। সকালে রুটি খাও তা-ই না? তুমি সে-বার মামুনের সঙ্গে আসার পর এক সকালে বউয়া পাক করেছিলাম, মনে আছে?'

'খালাম্মা আমার মনে আছে। সঙ্গে কালিজিরা ভর্তা, বেগুন ভর্তা আর ডিম ভাজা ছিল।'

'ওরে বাবা! তোমার মনে আছে সে কথা? এবার আমের আচারও আছে।'

'কোনো চিন্তা নেই খালাম্মা। আমি সব খাই। খাওয়া-দাওয়ায় কোনো বাছবিচার নেই।'

বলেই কাজল খেতে শুরু করল। আখি ডিম ভাজা তুলে কাজলের প্লেটে দিল।

আট

আখিদের বাড়িতে চারটা বড় বড় ঘর। টিনের চৌচালা ঘরগুলো সুন্দর লাগে কাজলের কাছে। এর আগে যখন এসেছিল তখনো দেখত মুগ্ধ হয়ে। এখনো দেখছে। বাড়ির পশ্চিম দিকে একটা বড় নিমের গাছ। নিমের পাতাগুলো ঝিরি ঝিরি কাঁপছে। উত্তর দিকে একটা তেঁতুল গাছ।

আখি এসে বলল, 'কী দেখছেন কাজল ভাই?'

'তোমাদের বাড়িটা।'

'আমাদের বাড়িটা দেখার কী হলো?'

'তোমার কাছে হয়তো কিছু না বিষয়টা, কিন্তু আমার কাছে ভালো লাগে তোমাদের ঘরগুলো।'

'তা-ই।'

'চলো তো ওই নিম গাছটার নিচে যাই।' বলেই কাজল নিম গাছের নিচে গেল। পেছনে পেছনে আখিও নিম গাছের নিচে গিয়ে দাঁড়াল।

'নিম গাছ অনেক উপকারী, জানেন?'

'তা-ই নাকি? জানি না তো।'

'হ্যাঁ। নিমের পাতা শুকিয়ে গুঁড়ো করে পানি দিয়ে খেলে শরীরের রক্তচাপ কমে যায়। যাদের ডায়বেটিস আছে তারাও যদি ওই পানি খেতে পারে তাদেরও উপকার হয়।'

'ওরে বাবা তা হলে তো মহাঔষধ ওই নিমের পাতা।'

'আরও আছে। যদি কোনো বাড়িতে বসন্ত হয় কারও, তা হলে রোগীর মাথার কাছের জানালার সামনে নিমের পাতা ঝুলিয়ে রাখা হয়। নিমের পাতা ছুঁয়ে যে বাতাস ঘরে ঢোকে সেই বাতাস বসন্ত রোগীর শরীরের জন্য উপকারী।'

'তা হলে তো খুবই দামি গাছ এটা।' গাছের ওপরের দিকে তাকিয়ে কাজল কথাটা বলল।

'নিমগাছে ছোট ছোট সবুজ রংয়ের ফল হয়। দেখতে অনেকটা আঙুরের মতো। পাকলে হলদে হয়। দেখতে খুব সুন্দর লাগে তখন। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা ওই ফলগুলো নিয়ে খেলে।'

'আচ্ছা তোমাদের ওই তেঁতুল গাছে তো অনেক তেঁতুল ধরে। এত তেঁতুল কী করো?'

'লোক আসে প্রতি বছর। নিজেদের জন্য কিছু রেখে সব বিক্রি করে দেওয়া হয়।'

'তোমাদের ওই পুকুরে মাছ আছে?'

'হ্যাঁ। আছে তো।'

'আমি বলছিলাম কী চাষ করো তোমরা?'

'হ্যাঁ। রুই-কাতলা-মৃগেল ছাড়া আছে।'

'তোমরা ধর?'

'না। বাজারের মাছের ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয় প্রতি বছর।'

'নিজেরা ধর না?'

'না। কে ধরবে?'

'তোমাদের খাওয়ার জন্য ধরতে পার না?'

'না। বাবা ধরে না। রাশেদ বাড়ি এলে মা কত বলে—জাল ফেলে দুই একটা মাছ ধর। নিজের পুকুরের মাছ খেয়ে দেখি, কেমন লাগে। ভাইয়া ধরে না।'

'তার মানে তোমরা তোমাদের পুকুরের মাছ খেতে পার না?'

'পারি। ওই যখন জেলেরা পুকুরের এপার থেকে ওপার পর্যন্ত জাল ফেলে মাছ ধরে, তখন আমাদের অনেক মাছ দেয়। আমরা কেটে ফ্রিজে রেখে দিই।'

'এর আগে যখন এসেছিলাম তখন আমাকে নিয়ে মামুন তোমাদের গ্রামের এক দিঘি দেখাতে নিয়ে গিয়েছিল। জেলেরা সেদিন জাল ফেলে বিশাল বিশাল রুই-কাতলা ধরেছিল। সেই দিঘিটা এখনো আছে?'

'ও, মিয়াদের দিঘির কথা বলছেন?'

'তা বলতে পারব না কাদের দিঘি। দিঘির পাড়ে অনেকগুলো তালগাছ আছে।'

'বুঝতে পারছি। ওটা মিয়াদের দিঘি নামেই পরিচিত। অনেক বড়। প্রচুর মাছ ধরা পড়ে। গ্রামের লোকেরা ওই মাছ খেতে পারে না। ধরার পরেই ঢাকা চলে যায়। ঢাকা থেকে বড় বড় মহাজন আসে ওই পুকুরের মাছ কিনতে। খুব সুস্বাদু মাছ। আমরা দু-একটা মাছ পাই। বাবার পরিচিত ওই মিয়ারা। মামুন ভাইয়ের বন্ধু হচ্ছে মিয়াবাড়ির ছোট ছেলে। ওই সূত্র ধরেই প্রতি বছর মাছ ধরার সময় মিয়াবাড়ির লোকজন এসে মাছ দিয়ে যায় আমাদের।'

'আচ্ছা সে-বার এসে খালের পাড়ে অনেক কাশফুল দেখেছিলাম। এখনো কি কাশফুল হয় খালের পাড়ে?'

'হবে না কেন? হয় তো। রোদের ভেতর কাশফুল দেখতে কী যে ভালো লাগে কাজল ভাই!'

'আচ্ছা তোমাদের গ্রামে কি এখনো পালকির প্রচলন আছে? সে-বার এসে পালকি দেখেছিলাম। বর আর কনে যাচ্ছিল পালকি চড়ে। দু-পাশে চার বেহারা কাঁধে করে নিয়ে যাচ্ছিল।'

'হ্যাঁ আছে। তবে আগের মতো সচারচর দেখা যায় না। হঠাত্ কখনো কখনো।'

'মাইকের ব্যবহারও নিশ্চয়ই কমে গেছে বিয়ে বাড়িতে?'

'হ্যাঁ। এখন আর মাইক কেউ ব্যবহার করে না বিয়ে বাড়িতে।'

'আচ্ছা, কলাগাছ দিয়ে বিয়েবাড়ির গেট সাজায় এখনো?'

'আমার চোখে পড়ে না।'

'পয়লা বৈশাখের মেলা তো আগের মতোই হয়। তা-ই না?'

'হ্যাঁ। ওটা তো সবখানেই হয়। আপনাদের ঢাকাতে তো হয়। তবে আগে পয়লা বৈশাখের বিকেলবেলা বড় মাঠে ঘুড়ির কাটাকাটি বেশ জমত। এখন আর তেমন দেখি না।'

'এর কারণ কী?'

'আসলে এখন একটু বড় হলেই, মানে কলেজে ওঠার পরে ছেলেরা ঢাকায় চলে যায় পড়াশোনা করতে। তাই বোধ হয় ঘুড়ির কাটাকাটি খেলাটা কমে গেছে।'

'হতে পারে। তোমার যুক্তিটা ঠিক আছে।'

'কী যে ভালো লাগত ঘুড়ির কাটাকাটি! বিকেলবেলা আমাদের গ্রামের আকাশ লাল নীল বেগুনি সবুজ রংয়ের ঘুড়িতে ভরে যেত। কেটে যাওয়া ঘুড়ির পেছনে ছোট ছোট ছেলেরা লম্বা বাঁশের মাথায় ধঞ্চে গাছের ডাল আর বড়ই গাছের ডাল বেঁধে দৌড় লাগাত ঘুড়ি ধরার জন্য।'

'তোমাদের গ্রামে তো এখন অনেক দালান বাড়ি উঠে গেছে, দেখলাম।'

'হ্যাঁ, আমাদের গ্রামের অনেক মানুষ এখন বিদেশে থাকে। সেখান থেকে টাকা পাঠায়। সেই টাকায় দালানবাড়ি উঠছে।'

'তোমাদের এ বাড়িটা এভাবেই রেখ। এভাবেই সুন্দর লাগে। গ্রাম গ্রাম ভাবটা থাকুক।'

'এভাবেই থাকবে। কে যাবে দালানবাড়ি করতে? আর আমাদের অত টাকাও নাই।'

'টাকা-পয়সার জন্য না। রাশেদ চাকরি করলে দেখবে টাকা পয়সা চলে আসবে। তখন হয়তো ওর শখ জাগতে পারে দালানবাড়ির।'

'আপনার কি মনে হয় ভাইয়া পাশ করার পর চাকরি পেলে গ্রামে এসে থাকবে?'

'থাকবে না, কী বলো?'

'এখন যে ঢাকা থেকে মাসে একবার আসে তখনই কত দ্রুত গ্রাম থেকে পালাবে সেই চেষ্টায় থাকে। আর চাকরি পেলে এখানে থাকবে?'

এমন সময় আখির বাবা বাজারে যাবার জন্য ঘর থেকে বের হলেন। বের হয়ে কাজলকে ডাকলেন। কাজল নিমগাছ তলা থেকে এগিয়ে তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

কাজলকে আখির বাবা বললেন, 'তুমি কী মাছ খেতে পছন্দ করো?'

কাজল আমতা আমতা করে বলল, 'যেকোনো মাছ আনলেই হবে।'

'ওসব হবে না। আজ তোমার পছন্দের মাছ এ বাড়িতে আনা হবে।'

খুব অস্বস্থিতে পড়ে গেল কাজল।

'তোমার কি পছন্দের মাছ নেই?'

'জি মানে...'

'তুমি কী মাছ পছন্দ করে খাও? '

'আসলে সব মাছই খাই।'

'তোমরা তো ঢাকায় খাও সাতদিনের বরফ দেয়া নয়তো ফরমালিন দেওয়া মাছ। আমাদের এখানে এখনো টাটকা মাছ পাওয়া যায়। দিঘিতে এখনো বড় রুই আছে। শোল মাছও পাওয়া যায়।'

'খালু আপনার যে মাছ ভালো মনে হয় সেই মাছ নিয়ে আসেন।'

'বিশেষ পছন্দের কিছু নাই?'

'পাবদা মাছটা ভালো লাগে।' অনেক কষ্ট হলো প্রিয় মাছটার কথা বলতে।

বাজার থেকে আখির বাবা যখন ফিরলেন কাজল দেখল, বেশ বড় বড় পাবদা মাছ এনেছেন। সঙ্গে রুই আর চিংড়ি। মামুনের মাকে বললেন, 'পাবদা মাছ টমোটো দিয়ে ভুনা করে দিও। রুইয়ের মাথা মুগডাল দিয়ে মুড়িঘণ্ট আর আলু শিম দিয়ে রুই মাছের ঝোল কোরো। রাতে পোলাও মুরগি পাক করবে।'

নয়

দুপুরবেলা। কাজল গোসল করতে এসেছে ঘাটে। আখিও আছে। আখি বলল, 'কাজল ভাই, ওটা কী গাছ বলেন তো?' পুকুরের ওই পাড়ে একটা বড় গাছ দেখিয়ে বলল।

'আমি গাছ চিনি না।'

'চালতা গাছ।'

'বলেন তো ওইটা কী গাছ?' আখি আরেকটা গাছ দেখিয়ে বলল।

'চিনি না।'

'ওটা হচ্ছে বউন্না গাছ। ওটার বড় বড় গোটা হয়। কোনো কাজে লাগে না। পানিতে পড়ে থাকলে মনে হয় কদবেল।'

'তা-ই?'

'আচ্ছা এর আগে যখন এসেছিলেন তখনকার কিছু মনে আছে অপনার?'

'হ্যাঁ মনে আছে। দু-একটা ঘটনা তো এখনো স্পষ্ট মনে আছে। একটা ঘটনা বলি তোমাকে। মামুনের সঙ্গে তোমাদের গ্রামের বাজারে গেলাম। দেখলাম একটা বড় বটগাছের নিচে দাঁড়িয়ে এক অন্ধলোক মোমবাতি আর সোনালি রংয়ের চেন বিক্রি করছিল। তার পাশে একটা ছোট ছেলে ছিল, যে তাকে ধরে ধরে বাজারের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে নিয়ে যায়। অন্ধ লোকটা মোমবাতি বিক্রি করছিল এই বলে—'আপনার ছেলেমেয়ে বিদ্যুত্ চলে গেলে পড়তে পারে না। তখন আমার এই মোমবাতি আপনার ছেলেমেয়েদের পড়ার সুযোগ করে দিবে। আমি তো অন্ধ মানুষ। আল্লাহ আমাকে দুনিয়া দেখার সৌভাগ্য দেয় নাই। আপনাদের দিয়েছে। আমার একটা মোমবাতি কিনে নেন ভাই। আমাকে একটু আয় করার পথ দেখান। অন্ধ বলে যেন আপনাদের করুণা নিতে না হয়।—বিশ্বাস করো আখি, সেই অন্ধ লোকটার কথা শুনে আমার শরীরের রোমগুলো দাঁড়িয়ে গিয়েছিল।'

'আপনার মুখে কথাটা শোনার পর আমারও তো অমন লাগছে। কী সুন্দর কথা। তা-ই না? অন্ধ বলে করুণা নিতে চায়নি। ওহ দারুণ একটা কথা শোনালেন কাজল ভাই। আমার মনটা ভালো হয়ে গেল।'

'আরেকটা কথা লোকটা বলেছিল।'

'তা-ই নাকি, জলদি বলেন।'

'আগেইতো বলেছি অন্ধ লোকটা সোনালি রং দেয়া চেন বিক্রি করছিল। একটা দশ টাকা করে। কী বলে বিক্রি করছিল জানো?'

'কী বলে?'

'আপনার ঘরে যদি প্রিয় মানুষ থাকে, তবে তার জন্য এই চেনটা কিনে নেন ভাই। সামান্য দশ টাকার এই চেনটা পেয়ে আপনার প্রিয় মানুষের মনে যে আনন্দ কাজ করবে তা দেখার সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত হবেন না। আল্লাহ আমাকে সেই সৌভাগ্য দেয় নাই। সোনালি রংয়ের চেনটায় খুব সুন্দর লাগবে আপনার পছন্দের মানুষটাকে। আমাকে একটু স্বনির্ভর হওয়ার সুযোগ দেন একটা চেন কিনে।'

'ওহ কাজল ভাই, দুটা ঘটনাই অসাধারণ! খুব মায়া লাগছে সেই অন্ধলোকটার জন্য।'

'কে জানে এখনো বেঁচে আছে কিনা লোকটা।'

'বাবা বলতে পারবে।'

'এই অন্ধলোকটার কথা আমি কখনো ভুলতে পারব না।'

'আমারও মনে থাকবে অনেককাল।'

'প্রিয় মানুষকে সুন্দর লাগবে, অন্ধ হলেও তার ভেতরে প্রিয়মানুষের প্রতি ফিলিংসটা কাজ করেছে, এটা কি কম কথা?' আখি বলল।

'না আর দেরি করা ঠিক হবে না। গোসল করে ফেলি।'

'সাঁতার জানেন কাজল ভাই?'

'না।'

'তা হলে?'

'কয়েকটা সিঁড়ি এগিয়ে গলা পর্যন্ত নেমে মগ দিয়ে মাথা ভেজাব।'

'তা হলে তো মুশকিল। আমার পাহারা দিতে হবে আপনাকে, যদি ডুবে যান!'

'না, তুমি চলে যেতে পার, আমার সমস্যা হবে না।'

'কথা বাড়ানোর দরকার নেই, তাড়াতাড়ি নামেন।'

'কাজল এগিয়ে এল পানির কাছে। আখিও গেল। কাজল দুই সিঁড়ি নামতেই আখি দুষ্টুমি করে একটু ধাক্কা দিল। কাজল একটু দূরে গিয়ে পড়ল। তবে নিজেকে সামলে নিল। কাজল বলল,

'এমন করলে কেন?'

'প্রতিশোধ নিলাম।'

'মানে? আমার কী অপরাধ?'

'অপরাধটা হলো, কাল রাতে খাবার সময় কেন বাবাকে বললেন আমার জন্য পাত্র খুঁজবেন কি না?'

'আরে এটা শুনে তো তোমার আনন্দ পাবার কথা!'

'আমার যে কী সে আনন্দ হবে সে আপনি বুঝবেন না। বলেই মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে থাকল কাজলের মুখপানে। একসময় চলে গেল আখি। কাজল আর কথা বলল না। গোসল করে চলে এল বাড়িতে।

দশ

আখির মা আর দুলি খালা চালের গুঁড়ি করছে। কাজলের জন্য পিঠা বানাবে। দুলি খালা বলল,

'আপা একটা কথা কই?'

'বলো।'

'আমাগো আখির তো বয়স হইছে। বিয়া-শাদির কথা ভাবতে হইব।'

'বিএ টা পাশ করুক আগে।'

'সেইটা করুক। তয় কথাটা ঠিক কইরা রাখলে কেমন হয়?'

'তুমি কার কথা বলছ?'

'কাজল পোলাটা ভালোই। আমাগো আখির লগে মানাইব।'

এমন সময় দরজার সামনে এসে আখি থমকে যায়। ঘরে আর ঢোকে না। দাঁড়িয়ে থাকে। কথা শোনে দুলি খালার। মা দুলি খালার কথা শুনে বলল, 'তুমি যে কী বলো না।'

'কেন খারাপ কিছু কইছি কন?'

'না এটা হয় না। কাজল মামুনের বন্ধু। আমাদের ছেলের মতোই।'

'জামাই তো ছেলের মতোই থাকব।'

'না এটা হয় না।'

'হইলে ভালোই হইত।'

আখি কথাগুলো শুনে দৌড়ে চলে এল ওর ঘরে। ঘরে এসে বিছানায় শুয়ে জানালা দিয়ে দূরের মাঠের দিকে তাকিয়ে থাকল। খালা এটা কেন বললেন? ভাবতে থাকে আখি। দুলি খালা কি কিছু টের পেয়েছে? ঘাটে বসে কাজলের সঙ্গে কথা বলতে দেখেছে? আখি কাজলকে ধাক্কা মেরেছিল সেটা কি দেখেছে?

জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখে দূরের মাঠে রোদ বিছিয়ে আছে। একটা গরু মাঠে ঘাস খাচ্ছে। পাশে ছোট একটা ছেলে লাঠি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

জানালার পাশে ডালিম গাছের দিকে চোখ ফিরিয়ে আনে আখি। দুটা ডালিমের পাশে একটা ফুল ফুটে আছে। টুকটুকে লাল ফুলটার দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে। এত ভালো তো লাগেনি কোনোদিন ডালিম ফুলকে। আজ কেন লাগছে?

কাজলের সঙ্গে যেভাবে আচরণ করছে এটা কি একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে? বড় ভাইয়ের বন্ধুর সঙ্গে এভাবে কথা বলাতে অন্য কিছু প্রকাশ পাচ্ছে না তো ? কিন্তু আখি তো এমনই। ছোট থেকেই এমনভাবেই কথা বলে। তা হলে কি বড় হবার পর কথা একটু সংযত হয়ে বলতে হয়? কাজলকে ভালো লাগে আখির। এটাতো সত্য। এখানে লুকোছাপার কোনো কিছু নেই। আর সকালে যখন ঘাটে বসে কাজলকে মনে করিয়ে দিয়েছিল আট বছর আগের সেই মামুন ভাইয়ের দুষ্টুমি করে বলা কথাটা, তখন থেকেই কেমন যেন একটা শীতল পানির ধারা সারা শরীরে বয়ে গেছে আখির। মামুন ভাই বলেছিল, 'আমাদের গ্রামের মানুষগুলো খুবই সহজ-সরল। তোর ভালো লাগবে। আর যদি ভালো না লাগে তবে তোকে আমাদের আখির সঙ্গে বিয়ে দিয়ে জামাই করে রেখে দিব।'

মামুন ভাইয়া তো কথাটা এমনি এমনি বলেছিল সেদিন। কোনো কিছু না ভেবেই। তা হলে এমন লাগছে কেন আখির?

কথাটা সকালে মনে করিয়ে দেওয়াতে কি আখিকে একটু বেহায়া ভাবতে পারে কাজল ভাই? সে কি ভাবতে পারে আখির ভেতরে সেই আট বছর আগের কথাটা আজ অন্যরকম অনুভূতিকে জাগিয়ে তুলছে। তা হলে তো কাজল ভাইয়ের সামনে গেলেই লজ্জা লাগবে।

একটা প্রজাপতি এসে সেই ডালিম ফুলটার ওপর বসল। আখি মুগ্ধ হয়ে তাকাল। অনেকক্ষণ প্রজাপতিটা ওভাবে বসে থাকল।

এগারো

দুপুরে খাবারের পর কাজল শুয়ে আছে। আখি কাজলের ঘরে এল। আখিকে দেখে উঠে বসল। আখিকে বলল, 'আচ্ছা তুমি দুপুরে যেভাবে আমাকে ধাক্কা দিলে যদি আমি ডুবে যেতাম?'

'আমি আপনাকে বাঁচাতে নেমে পড়তাম। আর বাঁচাতে না পারলে কী হতো, মরে যেতেন।'

'তুমি কি আমার মরণ চাও?'

'আপনার মরণ হওয়াই দরকার।'

'কেন?'

'আপনি কারও মরণ চাচ্ছেন, তাই আপনার মরণ কেউ তো চাইতেই পারে।'

'তুমি এটা কী কথা বললে আখি। আমি তো তোমার কথার আগামাথা কিছুই বুঝতে পারলাম না।'

'তা-ই নাকি?'

'হ্যাঁ।'

'আপনি আমার বিয়ের কথা কেন বললেন বাবাকে কাল?'

'ওরে বাবা এটার জন্য এত রাগ?'

'আমার বিয়ের জন্য আপনাকে না ভাবলেও চলবে।'

'কেন, মামুন থাকলে কি ভাবত না?'

' ভাবত। আপনাকে ভাবতে হবে না।' কথাটার দৃঢ়ভাবে বলল আখি।

'তুমি কথাটা একটু সিরিয়াসলি বললে মনে হয়?'

'হ্যাঁ সিরিয়াসলি বললাম।'

'ঠিক আছে যাও আমি ভাবব না। শুনে খুশি হলে?'

'হ্যাঁ খুশি হলাম।'

'আচ্ছা তুমি কি সারাজীবন এ বাড়িতেই থাকবে?'

'না, কেন সারাজীবন এ বাড়িতে থাকব? '

'তা হলে বিয়ের কথায় রাগে কেউ?'

'আপনার সঙ্গে আমার বিয়ের ব্যাপারে কোনো আলাপ করতে চাই না।'

'আচ্ছা তা হলে এখন কী বলতে এসেছ বলো?'

'এমনি এসেছি। আপনার সঙ্গে গল্প করতে এসেছি।'

'ঠিক আছে তোমার কলেজের বন্ধুদের গল্প বলো, শুনি।'

'আমার ছেলে বন্ধু নেই।'

'মানে?'

'হ্যাঁ নেই। এতে অবাক হবার কী আছে?'

'আচ্ছা মেয়ে বন্ধুদের কথা বলো?'

'আমার মেয়ে বন্ধু একজন। ওর নাম লুনা।'

'লুনার বাড়ি কোথায়? তোমাদের আশেপাশেই?'

'হ্যাঁ আশেপাশেই ছিল। এখন একটু দূরে।'

'এখন দূরে কেন?'

'ওর বিয়ে হয়েছে। স্বামীর সঙ্গে থাকে।'

'বাহ, ওর বিয়ে কবে হয়েছে?'

'ছ-মাস আগে।'

'ওর স্বামী কী করে?'

'কলেজের শিক্ষক। পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়েছে, নাকি ভালোবেসে?'

'ভালোবেসে ওরা বিয়ে করেছে।'

'দেখলে তো তোমার বন্ধু লুনা বিয়ে করেছে। আর তুমি বিয়ের নাম শুনতেই তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলে।'

'আপনি কিন্তু আবার আমার বিয়ের ব্যাপারে কথা বলছেন।' আখি চোখ বড় করে কাজলের দিকে তাকাল।

'আচ্ছা সরি। তোমার বান্ধবী নিশ্চয়ই খুব সুখী জীবনযাপন করছে?'

'হ্যাঁ খুব সুখী লুনা, স্বামী নিয়ে।'

'ক্লাসে কি স্বামীর গল্প করে প্রতিদিন?'

'করে।'

'কী গল্প করে?'

'সে-সব কথা তো আপনাকে বলা যাবে না।'

'কেন বলা যাবে না?'

'সব কথা কি সবাইকে বলা যায়?'

'কেন বলা যায় না?'

'কারণ, আপনি বড় ভাইয়ের বন্ধু। আর লুনা এত পাজি—ও আমাকে যেসব কথা বলে আপনি বড় ভাইয়ের বন্ধু না হলেও বলা যেত না।' বলেই মিষ্টি করে একটা হাসি দিল আখি।

'ওর স্বামী খুব ভালোবাসে ওকে বুঝতে পারছি।'

'হ্যাঁ তা তো ভালোবাসবেই। ভালোবেসেই তো ওরা বিয়ে করেছে।'

'তোমার কাউকে ভালো লাগেনি কখনো?'

'না।'

'তোমাকে কেউ ভালোবেসেছিল?'

'সেটা কেমন করে বলব?'

'কেন, টের পাওনি?'

'না।'

'নিশ্চয়ই কেউ না কেউ ভালোবেসেছিল। হয়তো তুমি তার দিকে ভুল করেও তাকাওনি।'

'না, এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি।'

'তুমি হয়তো টের পাওনি। তুমি এত ভালো মেয়ে তোমাকে কারও ভালো লাগবে না তা হতে পারে না।'

আখি আর কোনো কথা বলল না অনেকক্ষণ। একসময় চলে গেল কাজলের ঘর থেকে।

বারো

কাজল আর আখি ভাপা পিঠা খাচ্ছে পাকঘরে বসে। আখির মা পাশে বসা। দুলি খালাও আছে।

আখি বলল, 'কাজল ভাই, আপনারা ঢাকায় ভাপা পিঠা কি বাসায় তৈরি করেন, নাকি দোকান থেকে কিনে আনেন?'

'কেন বাসায় মা তৈরি করেন।'

'ঢাকার মানুষ তো শুনি সবকিছুই দোকান থেকে কিনে এনে খায়, তাই কথাটা বললাম।'

'না, আমাদের বাসায় শীতের সময় সব ধরনের পিঠা তৈরি করেন মা। ভাবি তাকে সাহায্য করে।'

'চালের গুঁড়ি কোথায় পান?'

'কেন, বড় বড় শপিংমলে আটা যেমন বিক্রি হয়, চালের গুঁড়িও একইভাবে বিক্রি হয়।'

'নারকেল তো পাওয়াই যায়, তা-ই না?'

'আরে নারকেলের গুঁড়িও পাওয়া যায়।'

'বলেন কী?' আখি একটু অবাক হয়ে কথাটা বলল।

'তোমাদের গ্রামের মাঠে যে শাক-পাতা পাওয়া যায় সেগুলোও পাওয়া যায় ঢাকার শপিংমলগুলোতে।'

'তা হলে তো শহরে সবই পান আপনারা।'

'মাছ তোমরা যা খাও ঢাকায় সব পাওয়া যায়। শুটকি মাছও পাওয়া যায়। তোমরা বাজারে যে সিঙ্গারা খাও, সেটাও শপিংমলগুলোতে পাওয়া যায়। কিনে নিয়ে শুধু ভেজে খেলেই হয়।'

'মাছটাছ কেটেই রাখা হয় শপিংমলগুলোতে, তা-ই না?'

'হ্যাঁ। বাড়ি নিয়ে একটু ধুয়ে মশলা দিয়ে চুলায় বসিয়ে দিলেই হয়।'

'আমাদের এখানে আর ক-টা দিন থেকে যান না কাজল ভাই।'

'পরে আসব। কাল সকালেই চলে যাব।'

'মা তো আপনাকে কিছুই খাওয়াতে পারল না।'

'খালাম্মা অনেক আয়োজন করেছেন।'

'আরে এটা কোনো আয়োজন হলো। আমরা যা খাই তা-ই করেছে।'

'আমি আসলে বেশি খেতে পারি না। আছে না অনেক মানুষ খেয়ে শান্তি পায়। আমার ওরকম কিছু নেই।'

'আবার অনেক মানুষ আছে অন্যকে খাইয়ে আনন্দ পায়।' আখি বলল।

'যেমন খালাম্মা।' কাজল বলল।

'আরে না বাবা, তোমাকে এমন কী খাওয়াতে পারলাম। আর দু-একটা দিন থাকলে খাওয়াতে পারতাম।'

'খালাম্মা যথেষ্ট খেয়েছি। দুপুরে খালু যেভাবে আমার প্লেটে মাছের বড় বড় টুকরা তুলে দিলেন। আমার এখনো মাছের স্বাদ মুখে লেগে আছে। আর আপনার রান্না তো অসাধারণ।'

'তোমার খালু ওরকমই। রাশেদ ঢাকা থেকে এলে ওকেও মাছের টুকরা ওভাবে তুলে দেয়।'

'তা-ই?'

'হ্যাঁ। আখি পিঠা খেয়ে কাজলকে নিয়ে গ্রামটা ঘুরে আয়। সেই আট বছর আগের গ্রাম আর আজকের গ্রামের মধ্যে কোনো পার্থক্য খুঁজে পায় কি না দেখে আসুক কাজল।'

'হ্যাঁ চলো আখি। আচ্ছা ওই মন্দিরটা আছে? যেটার পেছনের ছোট ফুটো দিয়ে সাপ এসে দুধ খেয়ে যায়? মামুন সে-বার বলেছিল।'

'আছে, তবে যত্নের অভাবে গাছপালা উঠে জঙ্গলে ভরে গেছে জায়গাটা।'

'চলো পিঠা খাওয়া শেষ।' বলেই কাজল পাকঘর থেকে চলে যায়। সঙ্গে সঙ্গে আখিও উঠে এল।

তেরো

শীতের বিকেলে রোদ খুব তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যায়। কাজল আর আখি খেতের আইল ধরে হাঁটছে। আখি পরেছে দুধ শাদা রং সালোয়ার কামিজ। গায়ে একটা কালো চাদর। কাজল পরেছে জিন্স প্যান্ট, নেভি ব্লু শার্ট আর শাদা হাফ হাতা সোয়েটার। হালকা হাওয়ায় চুল উড়ছে কাজলের। দুজন হাঁটছে পাশাপাশি।

কাজল দেখল ফড়িংয়ের মতো একটা পোকা ধানের ডগায় বসে আছে। দাঁড়িয়ে গেল কাজল। আখি বলল, 'কী ব্যাপার কাজল ভাই, দাঁড়ালেন যে?'

'আচ্ছা ওটা কী?'

'ওটা ঘাসফড়িং।'

'আমি ধরি?'

'পারবেন না।'

'কেন?'

'ধরতে গেলেই উড়ে যাবে।'

'দেখি না চেষ্টা করে।' বলেই সামান্য এগিয়ে ধরতে গেল কাজল। কিন্তু তার আগেই ঘাসফড়িংটা উড়ে গেল খেতের মাঝখানের একটা ধানের ডগায়।

আখি বলল, 'কই ধরতে পারলেন?'

'তুমি কী করে বুঝলে ধরতে গেলে উড়ে যাবে?'

'আমি তো গ্রামের মেয়ে। ওগুলোর পেছনে কম সময় তো নষ্ট করিনি। খুব দুষ্টু ওরা। ধরতে গেলেই উড়ে যায়। আমি কখনো একটা ঘাসফড়িং ধরতে পারিনি।'

'তা-ই নাকি, তা হলে তো ওরা খুব পাজি। একটা ফড়িং ধরতে পারনি কখনো?'

'না, কখনো পারিনি।'

'তা হলে চলো সামনে আগাই।'

'চলেন।' বলেই সামনের দিকে এগিয়ে গেল আখি। কাজলও পা মেলাল আখির সঙ্গে।

খানিকটা পথ এগিয়ে আখি বলল, 'কাল এ সময় কোথায় থাকবেন?'

'অফিসে থাকব।'

'অফিস থেকে বাসায় ফিরবেন কখন?'

'সাড়ে পাঁচটা ছ-টায়।'

'বাসায় ফিরে কী করবেন?'

'ফ্রেশ হয়ে ভাবির হাতের এক কাপ চা খাব।'

'তারপর?'

'পিচ্চি ভাতিজাকে নিয়ে টিভি দেখব।'

'তারপর?'

'মা-র সঙ্গে নয়তো ভাইয়া-ভাবির সঙ্গে গল্প করব।'

'তারপর?'

'রাতের খাবার খেয়ে কিছুক্ষণ গান শুনব।'

'তারপর?'

'একসময় ঘুমুতে যাব।'

'শোয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘুম এসে যাবে?'

'হয়তো।'

আখি আর কিছু বলল না। মন্দিরটার কাছাকাছি ওরা চলে এসেছে। একটা এলোমেলো গোছের লোক গলা ছেড়ে গান গাইতে গাইতে ওদের দিকে আসছে। ওদের সামনে আসার পর গান থামিয়ে দুজনের মুখের দিকে তাকাল। সামান্য হাসল। আবার আগের মতোই একই গতিতে হাঁটা শুরু করল আর গাইতে থাকল সেই আগের গানটা।

লোকটার দিকে আখি তাকিয়ে থাকল কী এক গভীর দৃষ্টিতে। এখনো শোনা যাচ্ছে—'পাখি কখন জানি উড়ে যায়...'

কাজল মন্দিরটার দিকে তাকিয়ে আছে। অনেক উঁচু মন্দির। ওপরে একটা ত্রিশূল। ত্রিশূলের ছ-ফুট নিচে অনেকগুলো খোপ রয়েছে। অসংখ্য জালালি কবুতর আর টিয়ে পাখির বাস সেখানে। কাজল মন্দিরটাকে দেখে আখির দিকে তাকাল। আখি এখনো সেই এলোমেলো গোছের লোকটার দিকে তাকিয়ে আছে। কাজল আখির মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। দেখল আখির চোখে পানি টলমল করছে।

কাজল বলল, 'কী হয়েছে আখি?'

'কই কিছু না তো।' নিজেকে সামনে নিল দ্রুত উত্তর দিয়ে।

'তোমার চোখে পানি?'

'ওই লোকটার গান শুনে মনটা কেমন জানি হঠাত্ খারাপ হয়ে গিয়েছিল।'

'ঠিক আছে এস এবার বসি এখানে।'

'এখানে বসবেন?'

'কেন অসুবিধা আছে?'

'না কোনো অসুবিধা নেই।'

'চলো বসি তবে।'

'চলেন।'

দূরে একটা ছোট খাল বয়ে গেছে। পানি নেই তেমন। ঘাসের ওপর বসে কাজল সেই খালটার দিকে তাকিয়ে থাকল কতক্ষণ। সন্ধ্যার সময় ওরা মন্দিরটার কাছ থেকে যখন চলে আসছিল তখন একঝাঁক টিয়ে পাখি মন্দিরটার খোপগুলোতে ঢুকে পড়ল শব্দ করে। কাজল একবার মাত্র মন্দিরটার দিকে তাকিয়ে পা চালাল।

আখি কোনো কথা বলছে না দেখে কাজল বলল, 'আখি সত্যি করে বলো তো তোমার কী হয়েছে?'

'না কিছুই হয়নি।'

'তোমার খুব শীত লাগছে?'

আখি কোনো কথা বলল না।

'আখি তুমি কিছুই বলছ না যে?' কাজল বলল।

'কাজল ভাই, আমাদের গ্রামটা আপনার ভালো লাগে না?'

'হঠাত্ এ প্রশ্ন?'

'এমনি।'

'তোমার কি শরীর খারাপ লাগছে?' বলেই কাজল আখির কপালে ডান হাত ছোঁয়ালো।

কপালে কাজলের হাতের ছোঁয়া পাবার পর আখি চোখ বন্ধ করে বলল, 'কাজল ভাই আপনি আমাদের এখানে থেকে যেতে পারেন না?'

কাজল সঙ্গে সঙ্গে আখির কপাল থেকে হাত নামিয়ে নিল।

দুজন হাঁটছে পাশাপাশি। কোনো কথা নেই। কাজলের বুকের ভেতরে যেন সমুদ্রের গর্জন শুরু হয়েছে। এসেছিল কত আনন্দ নিয়ে। কিন্তু একি হতে যাচ্ছে! নিজেকে কোন জগতে ধীরে ধীরে ঠেলে দিচ্ছে। ক্রমশ কী এক বাঁধনে জড়িয়ে যাচ্ছে। মানুষের মন এত দুর্বল কেন? নিজেকে আর বশে রাখতে পারছে না। মন খারাপ হয়ে যাচ্ছে আখির জন্য। কষ্ট হচ্ছে। এই কষ্টের নামই তো নাটক-উপন্যাসে ভালোবাসা বলে। কাজল ভাবছে।

আজানের একটু আগে ওরা দুজন বাড়ি ফিরে আসে। আখি চুপচাপ ওর ঘরে ঢুকে যায়। কাজল উঠানে ঢুকে বুঝতে পারে, মামুনের মা-বাবা জায়নামাজে বসেছে নিশ্চয়ই মাগরিবের নামাজ পড়ার জন্য। কারণ, কাজের মহিলা একা পাকঘরে বসে কী যেন করছে।

কাজল ওর ঘরে ঢোকে। দেখে ঘরে বাতি জ্বালানো। বুকের ভেতরটা কেমন ঢিবঢিব করছে কাজলের।

চৌদ্দ

রাতেরবেলা আখির মা ভাত বেড়ে বসে আছে। বাবা এসে বসলেন। তারপর আখি এল। শেষমেষ কাজল এসে পাটিতে বসল। কাজলের হাতে একটা বিয়ের কার্ড। কাজল খুব লজ্জা পাচ্ছে। কিভাবে বলবে নিজের বিয়ের কথা, ভেবে পাচ্ছে না। আখি তাকাল একবার কার্ডটার দিকে। কাজল একসময় বলেই ফেলল, 'খালাম্মা, আগামী শুক্রবার আমার বিয়ে। আপনারা সবাই ঢাকা যাবেন।'

আখি অবাক হয়ে তাকাল কাজলের দিকে। কোনো কথা বলল না।

আখির মা বললেন, 'খুবই ভালো কথা। মেয়ে কী করে বাবা?'

'ইডেনে মাস্টারস-এ পড়ে।'

'বউমার কী নাম?'

'ডাক নাম পিউ। পুরো নাম নুজহাত শারমিন।'

'বাহ নামটা সুন্দর তো তা-ই নারে আখি?' মা বললেন আখির দিকে তাকিয়ে। আখি মুখে কোনো কথা বলে না। শুধু মাথাটা হ্যাঁ সূচক দোলায়।

'পিউদের বাসা কোথায়?'

'ঢাকাতেই ওরা বড় হয়েছে। থাকে লালমাটিয়ায়। দেশের বাড়ি বিক্রমপুরের শ্রীনগর।'

'বাবা কী করেন?'

'ডাক্তার।'

'কয় ভাই-বোন ওরা?'

'দুই ভাই তিন বোন।'

'পিউ কি ছোট?'

'না, মেজ।'

'তোমার পছন্দ নাকি পরিবারের?'

'ভাবি আর মার পছন্দ। আমি এখনো দেখিনি।'

'বলো কী বাবা, তোমরা শহরের ছেলে, এখনো দেখনি?' আখির বাবা খুব অবাক হয়ে কথাটা বললেন।

'আসলে খালু আমি শুধু ছবি দেখেছি। ভাবি বলেছিলেন ফোনে কথা বলতে আমি সেটাও করিনি। আমি তো এমনই।'

'যাক বাবা দোয়া করি ভালো থাক। সুখী হও। বউমাকে নিয়ে আমাদের গ্রামে বেড়াতে আসবা। তোমরা তো দুই ভাই তা-ই না?'

'জি।'

'ভাই যেন কী করে?'

'গার্মেন্টস ব্যবসা আছে আমাদের। ওটা দেখাশোনা করে।'

'তোমার মা-র শরীর কেমন আছে?'

'ভালো।'

কাজল আর কথা বাড়াল না। চুপ করে খেতে শুরু করল। পাশে বসা আখির দিকে আড়চোখে তাকাচ্ছে বারবার। আখি কোনো কথা বলছে না। কেন কিছু বলছে না? যে আখি এত টকাশ টকাশ করে কথা বলে, ওর মুখে কোনো কথা নেই। বিষয়টা একটু কেমন যেন ঠেকছে কাজলের কাছে।

সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে কাজল একা একা ঘরে বসেছিল। আখি আসেনি। কেন আসেনি? এমন কী হয়েছে যে কারণে আখি কাজলের ঘরে এল না! বিকেলটা কেমন যেন দ্রুত পার হয়ে গেল আজ। খেতের আলপথে হেঁটে যাওয়া, তারপর মন্দিরটার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা। দূরে একটা খাল চলে গেছে। সে খালের পাড়ে আখির পাশে বসে থাকা ভালোই তো লাগছিল। ফেরার সময় আখির কপালে হাত রাখার পরই আখি যেন কেমন হয়ে গেল। কী এক ঘোর লাগা চোখে তাকিয়েছিল আখি। একসময় বলেছিল, 'কাজল ভাই আপনি আমাদের এখানে থেকে যেতে পারেন না?'

আখি কথাটা কেন বলল তখন? কাজল ভাবছে কথাটা।

আখি অল্প করে ভাত প্লেটে নিয়ে ঝটপট খেয়ে চলে গেল। কাজল বিষয়টা খেয়াল করল। তারপর নিজে খেতে থাকল।

খাবার শেষে কথা বলার সময় কাজল ওর বিয়ের কার্ডটা মামুনের মায়ের হাতে দিয়ে বলল, 'খালাম্মা, আপনারা আসবেন অবশ্যই।'

'আমি না গেলেও তোমার খালু যাবেন।'

'আপনাদের সবাইকে যেতে হবে।'

'দেখা যাক বাবা, বলতে পারছি না।'

'আপনারা সবাই এলে আমার ভালো লাগবে।'

'আচ্ছা দেখা যাক বাবা।'

কাজল আর কথা বাড়াল না। খাবার শেষ করে হাত মুখ ধুয়ে নিজের ঘরে চলে এল।

পনেরো

কাজল বিছানা ঠিক করছে একা। আজ আখি আসেনি। এমন সময় আখির বাবা ঘরে ঢুকল। কাজল বলল, 'আসেন খালু।'

বাবা কাজলের বিছানায় বসে বলল, 'আখি তোমার বিছানা ঠিক করে দেয়নি আজ?'

'লাগবে না আমি নিজেই পারব।'

'এটা কেমন হলো বাবা।'

'এটা কোনো বিষয় না। খালু কিছু বলবেন?'

'তোমাকে একটা কথা বলতে এলাম বাবা।'

কাজলের কপালে একটু চিন্তার ভাঁজ পড়ল। মনে মনে ভাবল—খালু কি আখির বিষয়ে কিছু বলবেন? কাজল একসময় বলল, 'জি খালু বলেন।'

'কী করে যে বলি...'

'খালু কোনো দ্বিধা না রেখে বলেন। আমি তো আপনার ছেলের মতোই।'

'রাশেদ তো আগামী বছর মাস্টারস করে বের হবে।'

'জি খালু আমি শুনেছি।'

'তুমি যদি ওর জন্য কোথাও একটু চাকরির ব্যবস্থা করে দাও তা হলে ভালো হয়। আজকাল মামা-চাচা ছাড়া কোথাও কিছু তো হয় না।'

'আপনি এটা নিয়ে ভাববেন না। এটা আমার দায়িত্ব। ও মাস্টারস দিয়েই যেন আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে।'

'শুনে খুব খুশি হলাম বাবা। এটা বলার জন্য এসেছি। তুমি শুয়ে পড়ো।'

বলেই বাবা চলে গেলেন। কাজলও বাতি নিভিয়ে শুয়ে পড়ল।

ষোলো

কাজলের কিছুতেই ঘুম আসছে না। শুধু এপাশ ওপাশ করছে। আখির জন্য খুব মায়া হচ্ছে। কষ্টও হচ্ছে। কী সুন্দর প্রজাপতির মতো মেয়েটা। চেহারায় রাজ্যের মায়া। সেই মেয়েটার চোখে পানি দেখলে কার না কষ্ট লাগে! কার না বুক কাঁপে!

কাজলের জীবনটা দু-দিনেই কেমন যেন হয়ে গেল। ক-দিন পরেই যে জীবনের দিকে যাচ্ছে, সে জীবনে একটা কষ্টের স্মৃতি হয়ে বেঁচে থাকবে গ্রামের এই মায়াবতী মেয়েটা।

আখির জন্য এমন লাগছে কেন কাজলের? বুকটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে।

ভোরবেলা কাজলের ঘরের জানালার সামনে এসে আস্তে আস্তে ডাক দিল। ঘুম ভেঙে গেল কাজলের। কাজল জানালা খুলে দেখল আখির মুখখানি। দু-চোখ লাল আর ফোলা ফোলা।

'রাতে ভালো ঘুম হয়নি আপনার?'

'হয়েছে তো।'

'মিথ্যে বলছেন কেন?'

'তুমি ঘুমোওনি?'

'হ্যাঁ ঘুমিয়েছি।'

'মিথ্যে বললে কেন?'

'মিথ্যে বললাম কী করে বুঝলেন?'

'তোমার চোখ লাল।'

'আপনিও তো মিথ্যে বলেছেন।'

'কিভাবে বুঝলে?'

'আপনার চোখও লাল।'

তারপর অনেকক্ষণ দুজন কোনো কথা বলল না। আখি একসময় বলল, 'কাজল ভাই, বিয়ের কার্ডটা যেদিন এলেন সেদিন দিলেও পারতেন।'

'কেন?'

'তা হলে এই যে আজ চলে যাবেন আর আমি আপনার সঙ্গে লুকিয়ে লুকিয়ে কথা বলছি—এটা করার 'প্রয়োজন হতো না। আপনাকে স্বাভাবিকভাবে বিদায় দিতে পারতাম।' বলেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

'তোমার অনেক ক্ষতি করে দিলাম না আখি?'

'লাভ-ক্ষতির কিছু বুঝি না।'

'আখি তুমি বিশ্বাস করবে কি না জানি না, আমার একটা ভুলের জন্য কাল রাতে আমিও ঘুমুতে পারিনি।

'কী ভুল?'

'ওই যে তুমি যেটা বললে। কার্ডটা প্রথম দিনই কেন দিলাম না। সেদিন দিলে কাল রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমুতে পারতাম।'

আখি ঘোরলাগা চোখে কাজলের চোখে দিকে তাকাল। আখি জানালার কাছ থেকে চলে যাবার আগে বলল, 'আপনি আবার আমাদের গ্রামে আসবেন?'

কাজল কোনো কথা বলতে পারল না মিনিটখানেক।

'কী, কথা বলছেন না কেন? মিথ্যে বললে কিন্তু ঘাটের পানির কাছে নিয়ে যাব।' কথাটা বলেই হাসার চেষ্টা করল।কিন্তু পারল না।

'পানির প্রয়োজন নেই। তোমার চোখই যথেষ্ট। মিথ্যে বলতে পারছি না। হয়তো আসা হবে না।'

কথাটা শুনে আখি দাঁড়াতে পারল না। চলে গেল।

সতেরো

সকালবেলা কাঁধে ব্যাগটা ঝুলিয়ে কাজল ঘর থেকে বের হয়। মামুনের মা-বাবা উঠানে দাঁড়িয়ে আছেন। কাজল দুজনকে বলল, 'আপনারা আমাকে আশীর্বাদ করতে আসছেন কিন্তু শুক্রবার।

'যাব বাবা।'

'খালাম্মা রাশেদকে আমার সঙ্গে দেখা করতে বলবেন।'

'ঠিক আছে বলব।'

কাজল আর কথা বলল না। এক পা দু-পা করে উঠান পেরিয়ে বাড়ি থেকে বের হলো। তারপর দ্রুত পা চালাল। কিছুদূর আসার পর কী মনে করে একবার তাকাল মামুনদের বাড়ির দিকে। দেখল, আখি জানালার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। কাজল আবার আগের গতিতে হাঁটা শুরু করল।

কাজলের এমন লাগছে কেন? বুকের ভেতরটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে।

আখিকে আসার সময় কিছু বলতে পারল না। দু-দিনের জন্য মামুনদের গ্রামের বাড়িতে এসে জীবনটা কেমন যেন এলোমেলো হয়ে গেল কাজলের। কেন যে প্রথম দিনই বিয়ের কার্ডটা দিল না! নিজের ওপর খুব জেদ হচ্ছে। ভেবেছিল যাবার সময় দেবে। আর তাছাড়া লজ্জাও লাগছিল। আট বছর পর বেড়াতে এসেই যদি বিয়ের কার্ডটা দেয় তাহলে কেমন দেখায়, এসব সাত-পাঁচ ভেবে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বিদায়ের সময় কার্ডটা দেবে।

জীবনে কোনোদিন কোনো মেয়ের জন্য ভালোবাসা জন্মায়নি; কষ্ট পাওয়া তো দূরের কথা। আজ কেমন যেন একটা কষ্ট অনুভব হচ্ছে বুকের খুব গহিনে। বিশেষ করে আখিকে কিছু বলে না আসায় কষ্টটা যেন ক্রমশই বাড়ছে। এই কষ্টের নাম কী? নিজেকে নিজেই কথাটা বলল কাজল।

আর কখনো এই গ্রামে আসা হবে না, এটা তো সত্য। আর কখনো আখির মুখোমুখি হবে না কাজল। বিয়েতে নিশ্চয়ই আখি যাবে না। হয়তো ওর বাবা আর রাশেদ আসবে। আখির যখন বিয়ে হবে তখন কি কাজলকে নিমন্ত্রণ করা হবে? আর নিমন্ত্রণ করলেও তো কাজল আসতে পারবে না। আখির দিকে তাকালেই তো বুকটা মোচড় দিয়ে উঠবে কাজলের। মনে পড়ে যাবে একটা বিকেল কাটিয়েছিল আখির সঙ্গে। দূরে একটা খাল, পাশে মন্দির, মন্দিরের ওপরে একঝাঁক কবুতরের উড়ে যাওয়া। সেই বিকেলের কথা কি কখনো ভুলতে পারবে কাজল? সেই যে আলাভোলা মানুষটার গান—'পাখি কখন জানি উড়ে যায়'—এগুলো তো ভোলার মতো না। শানবাঁধানো ঘাটে বসে আখির সঙ্গে গল্প করা, পানির দিকে তাকিয়ে সত্য কথা বলার স্মৃতি ভুলতে চাইলেই কি ভোলা সম্ভব? কাজলকে ধাক্কা মেরে পুকুরে ফেলে দিয়েছিল আখি, এ কথা তো ভুলতে পারবে না কাজল। একটা ঘাসফড়িং ধরতে চেয়েছিল কাজল, পারেনি।

আগামী সপ্তায় নতুন জীবনে যাচ্ছে কাজল। সেই জীবনের শুরুতেই এ রকম একটা কষ্ট বুকের গহিনে লুকিয়ে থাকবে কাজলের। ভাবতেই কেমন যেন গলাটা শুকিয়ে আসছে। একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। পিউকে কি কখনো আখির কথা বলা যাবে? আর পিউ বিষয়টা কিভাবে নেবে, সেটাও তো একটা ব্যাপার। বাসর ঘরে প্রথম দেখা হবে পিউয়ের সঙ্গে কাজলের। তখন কি আর আখির কথা বলা ঠিক হবে? আর না বললেই বা কী হবে? এসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে কাজল বাসস্ট্যান্ডে চলে আসে।

আঠারো

গাড়ি চলছে ঢাকার উদ্দেশে। দু-পাশে ধানখেত। মাঝখানে উঁচু মহাসড়ক। দূরে আখিদের গ্রাম দেখা যাচ্ছে।

'আমাদের গ্রামের মানুষগুলো খুবই সহজ-সরল। তোর ভালো লাগবে। আর যদি ভালো না লাগে তবে তোকে আমাদের আখির সঙ্গে বিয়ে দিয়ে জামাই করে রেখে দিব।' আট বছর আগে মামুনের কণ্ঠে দুষ্টুমিমাখা সেই কথাটা যেন দূরাগত স্বরে কাজল শুনতে পেল।

কাজল জানালা দিয়ে পেছনের দিকে তাকাল একবার।

এই পাতার আরো খবর -
font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেছেন, 'রাজনৈতিক দল হিসাবে কর্মকাণ্ড করার কোনো অধিকার জামায়াত রাখে না।' আপনিও কি তাই মনে করেন?
5 + 9 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
নভেম্বর - ২৯
ফজর৫:০২
যোহর১১:৪৭
আসর৩:৩৫
মাগরিব৫:১৪
এশা৬:৩১
সূর্যোদয় - ৬:২২সূর্যাস্ত - ০৫:০৯
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :