The Daily Ittefaq
ঢাকা, সোমবার ০৫ আগস্ট ২০১৩, ২১ শ্রাবণ ১৪২০ এবং ২৬ রামাযান ১৪৩৪
সর্বশেষ সংবাদ হাইকোর্টের রায় বহাল; নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না জামায়াত | আপিল করেছেন গোলাম আযম | অষ্টম মজুরি বোর্ডের সুপারিশে মন্ত্রিসভার একমত

সাক্ষাত্কার

একজন প্রকৃত নেতা কারো একটি ভুল দেখাবার সময় তার ভালো কাজগুলোও সামনে নিয়ে আসেন

নেলসন ম্যান্ডেলা

সাক্ষাত্কারটি ভূমিকা ও অনুবাদ করেছেন : এম এ মোমেন

বিংশ শতকের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রধানতম পুরুষ নেলসন ম্যান্ডেলা। তাঁর জন্ম ১৮ জুলাই ১৯১৮ দক্ষিণ আফ্রিকার গ্রামাঞ্চলে। পরিবারের দেওয়া নাম রোলিলালা ম্যান্ডেলা। ১৯২৫ সালে স্কুলশিক্ষক তাঁর নামের সাথে নেলসন যোগ করেন। কেবল কৃষ্ণাঙ্গ কলেজ ফোর্ট হেয়ার-এ ভর্তি হন কিন্তু প্রতিবাদী ভূমিকার জন্য দ্বিতীয় বছরই বহিষ্কৃত হন। ১৯৪১-এ পরিবারের ধার্য করা বিয়ে এড়াতে পালিয়ে যান। জোহানেসবার্গে এসে সোনার খনির নৈশপ্রহরী হিসেবে চাকরি শুরু করেন। ১৯৪৩-এ স্নাতক ডিগ্রি পান। পরের বছর আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের যুব লীগ প্রতিষ্ঠা করেন—তাঁর স্বাধীনতা আন্দোলন শুরু হয়ে যায়। ১৯৫৬-তে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে গ্রেফতার হন, সাড়ে চার বছর ধরে বিচার চলার পর ১৯৬১ সালে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পান।

১৯৬১-র জুনে আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস (এএনসি)-র সশস্ত্র উইং-এর প্রথম কমান্ডার-ইন-চিফ নিযুক্ত হন। ১৬ ডিসেম্বর সিরিজ বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে সশস্ত্র উইং শক্তি প্রদর্শন করে। ১৯৬২-তে তিনি ইথিওপিয়া ও মরক্কোতে সামরিক প্রশিক্ষণ নেন। বারোটি আফ্রিকান রাষ্ট্র সফর করেন। ৫ আগস্ট ১৯৬২-তে গ্রেফতার হন, আন্দোলনে উস্কানি দেওয়া এবং যথাযথ পাসপোর্ট ছাড়া বিদেশ সফর করায় তাঁর পাঁচ বছরের কারাদণ্ড হয়। জেলে থাকা অবস্থায় রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে নেলসন ম্যান্ডেলাসহ নয় জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। ১৯৬৮-তে ম্যান্ডেলার মা-র মৃত্যু হলে তাঁকে শেষকৃত্যে যোগ দিতে দেওয়া হয়নি। ১৯৬৯-এ বড় ছেলে থেম্বি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হলে তাঁকে পুত্রের শেষকৃত্যে যোগ দিতেও দেওয়া হয়নি।

১৯৭৫-এ আত্মজীবনী লিখতে শুরু করেন। জেল থেকে বের হবার বহু লোভনীয় প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। ১৯৮৯ সালে জেলে থেকে এলএলবি ডিগ্রি লাভ করেন।

১৯৯০-এর ২ ফেব্রুয়ারি এএনসি'র ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। ১১ ফেব্রুয়ারি ২৭ বছর কারাভোগের পর মুক্ত হন।

১৯৯৩ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার পান। ১৯৯৪ সালে স্বাধীন দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। এ বছর প্রকাশিত হয় তাঁর আত্মজীবনী 'অ্যা লং ওয়াক টু ফ্রিডম'। আকাশ-ছোঁয়া জনপ্রিয়তা থাকার পরও এক টার্ম দায়িত্ব পালনের পরই ১৯৯৯ সালে প্রেসিডেন্ট পদ থেকে সরে আসেন। ২০০৮ সালে ৯০ বছর উদযাপন করতে গিয়ে সামাজিক ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের ডাক দেন।

গত ৮ জুন ফুসফুসের মারাত্মক সংক্রমণ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন তিনি। মাসাধিকাল ধরে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। প্রিয় নেতার সুস্থ্যতা কামনায় তাঁর ভক্তকুল প্রতিদিন হাসপাতালের সামনে ভীড় করছেন—গণমাধ্যমে এ দৃশ্য এখনো ফলাও করে প্রকাশিত হচ্ছে।

নেলসন ম্যান্ডেলার সাক্ষাত্কার নিতে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ওপরাহ উইনফ্রে শিকাগো থেকে দক্ষিণ আফ্রিকায় আসেন। নেলসনের গ্রাম, নেলসনের কারাগার (রোবেন আইল্যান্ড প্রিজন) ঘুরে ম্যান্ডেলার সাক্ষাত্কার নেন। প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর মানুষটির বয়স তখন ৮২ বছর।

সাক্ষাত্কারটি ভূমিকা ও অনুবাদ করেছেন :

এম এ মোমেন

ওপরাহ উইনফ্রে : শেষবার যখন আপনার সাথে আমার কথা হয়, আপনি বলেছিলেন, যদি জেলে না থাকতেন তাহলে আপনার জীবনের সবচেয়ে বড় যে অর্জন নিজেকে বদলে ফেলা, তা কখনো সম্ভব হতো না। জেলখানায় ২৭ বছরের এই অনুধ্যান আপনাকে কেমন করে ভিন্ন মানুষে পরিণত করল?

নেলসন ম্যান্ডেলা : জেলে যাবার আগে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রধান রাজনৈতিক দলের সদস্য হিসেবে আমি সক্রিয় ছিলাম। সাধারণত আমি সকাল সাতটা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত ব্যস্ত থাকতাম। একটুখানি বসে চিন্তা করার ফুরসত্ আমার কখনো ছিল না। যতই কাজ করে গেছি, শারীরিক ও মানসিক অবসাদ আমাকে পেয়ে বসেছে, আমার বুদ্ধিবৃত্তিক যে সামর্থ্য তার সর্বোচ্চটুকু আমি কখনো প্রয়োগ করতে পারিনি। কিন্তু কারাগারের নিঃসঙ্গ সেলে আমি ভাবার সময় পেয়েছি। আমার অতীত ও বর্তমান সম্পর্কে একটি স্বচ্ছ ধারণা পেয়েছি, আমি আবিষ্কার করতে পেরেছি, আমার অতীতের কাছে আরও অনেক কিছু প্রত্যাশিত ছিল— মানুষের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের ব্যাপারে যেমন, নিজের যোগ্যতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও তেমনি।

ওপরাহ : কেমন করে আপনার অতীতের কাছে আরও বেশি প্রত্যাশা করেছেন?

নেলসন : ১৯৪০-এর দশকে আমি যখন জোহানেসবার্গ পৌঁছি, আমার পরিবার আমাকে উপেক্ষা করেছে, কারণ আমি তাদের হতাশ করেছি। পরিবারের আয়োজন করা একটি বাধ্যতামূলক বিয়ে এড়াতে আমি পালিয়ে গেছি—আর এটা ছিল আমার পরিবারের ওপর একটি বড় আঘাত। আমি যখন জোহানেসবার্গে ছিলাম, অনেক মানুষ আমার প্রতি সদয় ছিলেন। কিন্তু লেখাপড়া শেষ করে আমি যখন আইনজীবী হবার যোগ্যতা অর্জন করলাম, আমি রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। সেইসব মানুষের কথা কখনো স্মরণ করিনি। যখন আমি জেলে গেলাম তখনই কেবল মনে পড়ল, 'অমুক অমুকের কী হয়েছে? আমি কেন তাদের কাছে ফিরে যাইনি আর তাদের ধন্যবাদ বলিনি?' আমি খুব নিচু মানের মানুষে পরিণত হয়েছিলাম, যারা অতিথিপরায়ণতা এবং সহায়তাকে কৃতজ্ঞতাভরে স্মরণ করেছে, আমি তাদের মতো আচরণ করিনি। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম আমি যদি কখনো জেল থেকে ছাড়া পাই, আমি সেইসব মানুষ, তাদের ছেলেমেয়ে, নাতি-নাতনির কাছে গিয়ে তাদের সাহায্যের কথা বলব। এভাবে আমি আমার জীবনকে বদলালাম—আমি জানলাম, কেউ কারও জন্য যদি ভালো কিছু করে তাহলে তাকে সেভাবে সাড়া দিতে হবে।

ওপরাহ : সব সময়ই?

নেলসন : আমি এখন তা-ই করছি—সাড়া দিচ্ছি। যাদের কোনো সম্পদ নেই, দরিদ্র, অশিক্ষিত, দুরারোগ্য ব্যাধিতে শয্যাশায়ী, একটু সুখ এনে দিতে কোনো কর্মসূচি ছাড়া খালি হাতে তাদের কাছে যেতে আমি ভয় পাই। ভবিষ্যতে আমি যদি কখনো মারা পড়ি, তা ঘটবে তাদের সাহায্য করতে আমার অসামর্থ্যের কারণে। আমার জীবনের একটা ক্ষুদ্র অংশ ব্যয় করে যদি তাদের সুখী করতে পারি, আমিও খুশি হব।

ওপরাহ : সকালে কখন ঘুম থেকে ওঠেন? আপনার সারাটা দিন তো সেবাদানের জন্যেই?

নেলসন :সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে স্কুল, ক্লিনিক, কমিউনিটি হল ইত্যাদি তৈরি, শিশুদের জন্য বৃত্তি সংগ্রহ এসব কাজ। আমার সংসারের প্রতি দায়িত্ব তো রয়েছেই।

ওপরাহ : আপনি যে অনেক বছর অনুপস্থিত ছিলেন, তা পুষিয়ে দেবার জন্যই কি এভাবে কাজ করছেন?

নেলসন :ঠিক এটাই যে আমার মনে জায়গা দখল করে আছে তা নয়। দরিদ্ররা যাতে তাদের সমস্যা অতিক্রম করতে পারে আমি সেজন্যই বাকি জীবন কাজ করে যাব। মানবতার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জই হচ্ছে দারিদ্র্য। সেজন্যই আমি স্কুল তৈরি করছি। আমি মানুষকে দারিদ্র্য ও নিরক্ষরতা থেকে মুক্ত করতে চাই।

ওপরাহ : আমি সম্প্রতি রোবেন আইল্যান্ডে কিছু সময় কাটিয়ে এসেছি। এখানকার কারাগারে আপনি বন্দিজীবনের ১৮ বছর কাটিয়ে এসেছেন। শুনেছি আপনার মেয়েদের বয়স যখন যথাক্রমে ২ এবং ৩ বছর তখন তাদের দেখেছেন। এরপর যখন দেখা হয়, তাদের বয়স ১৬ বছর। ব্যাপারটা কেমন?

নেলসন : তাদের দেখতে না পারার কারণেই হয়তো শিশুদের প্রতি আমার অবসেশন গড়ে উঠেছে। কাউকে কাউকে আমি ২৭ বছর দেখিনি। কারাজীবন যে শাস্তি প্রদান করতে পারে তার মধ্যে এটাই সবচেয়ে ভয়াবহ। শিশুরাই জাতির সবচেয়ে বড় সম্পদ। আর সম্পদ হয়ে ওঠার জন্য তাদের পেতে হবে শিক্ষা ও বাবা-মায়ের ভালোবাসা। কারাগারে বন্দি থাকলে তো আর সন্তানদের তা দেওয়া সম্ভব হয় না।

ওপরাহ : এমন একটা পৃথিবীর কথা কল্পনা করা খুব কঠিন যেখানে আপনি আপনার সন্তানকে স্পর্শ করতে পারবেন না। আঁকড়ে ধরতে পারবেন না। সেটাই কী আপনার সবচেয়ে বড় ক্ষতি?

নেলসন : অবশ্যই।

ওপরাহ : আর কী মিস করতেন?

নেলসন :অবশ্যই আমার পরিবার। আমার জনগণ। অনেক বিষয় বিবেচনা করলে দেখা যাবে, আমরা যারা কারাগারের ভেতরে ছিলাম, বাইরের অনেকেই আমাদের চেয়েও বেশি ভোগান্তির শিকার হয়েছে। কারাগারে আমরা তিনবেলা খেয়েছি, কাপড় পেয়েছি। বিনে পয়সায় চিকিত্সা পেয়েছি। আমরা ১২ ঘণ্টা ঘুমাবার সুযোগ পেয়েছি। অন্যদের তো এই সুযোগ ছিল না।

ওপরাহ : আপনি কি নিজেকে পৃথিবী থেকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন মনে করতেন?

নেলসন :বাইরের সাথে যোগাযোগ স্থাপনে আমাদের নিজস্ব পদ্ধতি ছিল। একটি ঘটনা ঘটার দুদিন পর আমাদের কাছে খবরটা পৌঁছত। তবুও আমরা খবর তো পেতাম। কোনো কোনো জেল ওয়ার্ডের সাথে আমাদের বন্ধুত্বের সম্পর্ক হয়ে যেত। আমরা বলতাম, ভাই, আমাদের ময়লার স্তূপের কাছে নিয়ে চলো না। সেখানে পুরোনো খবরের কাগজও ফেলা হতো। সেগুলো পরিষ্কার করে লুকিয়ে লুকিয়ে আমাদের সেলে পড়ার জন্য নিয়ে আসতাম।

ওপরাহ :আপনি কারাগারের ভেতর আগের চেয়ে বেশি সুশৃঙ্খল জীবন কাটিয়েছেন। পড়াশোনা করেছেন, অন্যদের পড়তে উত্সাহ দিয়েছেন। কেন?

নেলসন :নাগরিকরা শিক্ষিত না হলে কেন জানি উন্নতি করতে পারে না। পড়াশোনার সুযোগ যাদের হয়েছে তারাই জাতিকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। আমি জানতাম, কারাগারে আমাদের জীবনের উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব। আমরা ভিন্ন মানুষ হিসেবে সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে পারি। সেখানে থেকে দুটো ডিগ্রি অর্জন করাও সম্ভব। নিজেদের শিক্ষিত করার মানে স্বাধীনতার সবচেয়ে ক্ষমতাশালী অস্ত্রগুলো নিজেদের হাতে তুলে নেওয়া।

ওপরাহ : আপনি কি আগের চেয়ে অধিকতর জ্ঞানী মানুষ হিসেবে কারাগার থেকে বেরিয়ে এসেছেন?

নেলসন :আমি বরং বলতে পারি কারাগারে ঢোকার সময় যতটা বোকা ছিলাম, বের হবার সময় তার চেয়ে কম বোকা। আমি সাহিত্য পাঠে নিজেকে সমৃদ্ধ করতে পারি। আমি সে সময় 'গ্রেইপস অব র্যাথ'-এর মতো উপন্যাস পড়ি।

ওপরাহ : ওটা তো আমারও একটি প্রিয় বই।

নেলসন : আমি যখন বইটির পাঠ শেষ করি, আমি একজন ভিন্ন মানুষ। এই বই আমার চিন্তা করার শক্তি বাড়িয়েছে, সুশৃঙ্খল করেছে। কারাগার থেকে বের হবার সময় কোনো বিষয় সম্পর্কে আমার জ্ঞানের ঘাটতি আগের চেয়ে কমেছে। আপনার জানাশোনা যত বেশি হবে আপনার উদ্ধত ও আক্রমণাত্মক প্রবৃত্তির তত হরাস ঘটবে।

ওপরাহ : আপনি কি ঔদ্ধত্যকে ঘৃণা করেন?

নেলসন :অবশ্যই। তরুণ বয়সে আমি উদ্ধত ছিলাম— কারাগার আমাকে তা থেকে মুক্ত করেছে। আমার ঔদ্ধত্যের কারণে আমি শত্রু ছাড়া কিছু তৈরি করতে পারিনি।

ওপরাহ : আর কোন কোন বিষয় আপনি ঘৃণা করেন?

নেলসন : অজ্ঞতা আর মানুষের অক্ষমতা—যার কারণে মানুষ একতাবদ্ধ না হয়ে নিজেদের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি করে। একজন ভালো নেতা খোলামেলাভাবে এবং বিস্তৃতভাবে এ নিয়ে বিতর্কে নেতৃত্ব দিতে পারেন। এটা তিনি জানবেন যে, শেষ পর্যন্ত তিনি এবং অপর পক্ষ অবশ্যই আরও নিকটে চলে আসবেন—এভাবেই তাদের ঘটবে আরও শক্তিমন্ত আবির্ভাব। যখন কেউ উদ্ধত, অনবহিত এবং অগভীর তখন তার মধ্যে এই ধারণার উদ্ভব ঘটে না।

ওপরাহ : আপনি চাচ্ছেন আপনার ধারণাটি প্রতিষ্ঠিত হোক। কিন্তু একজন ভালো নেতার তো সার্বক্ষণিক ইচ্ছে হবে শান্তি প্রতিষ্ঠা করার।

নেলসন : তা সত্যি। যখন বিপদ আসে, একজন ভালো নেতা তা মোকাবিলা করতে সামনের কাতারে চলে আসেন। কিন্তু যখন উত্সব হয়, ভালো নেতা রয়ে যান কক্ষের পশ্চােদশে।

ওপরাহ : সে ক্ষেত্রে আপনি মানুষের কোন গুণের প্রশংসা করেন?

নেলসন :নেতা যাদের সাথে কাজ করেন কখনো কখনো তাদের সমালোচনা করতে হয়—এটা এড়িয়ে যাবার কোনো উপায় নেই। আমি সেই নেতাকেই পছন্দ করি যিনি কারও কারও একটি ভুল দেখাবার সময় তার ভালো কাজগুলোও সামনে নিয়ে আসেন। আর তা হলে তিনি বুঝতে পারেন, নেতা তার সম্পর্কে পুরোপুরিই জানেন। অপদস্ত মানুষের চেয়ে ভয়াবহ বিপদজনক আর কেউ নেই। এমনকি যদি তাকে ন্যায্যভাবেও তা করা হয়ে থাকে।

ওপরাহ : আমি যখন আপনার সামনে বসে কথা বলছি, আমি কল্পনাও করতে পারছি না আপনি সাত ফুট বাই নয় ফুট একটি সেলে এতগুলো বছর কাটিয়ে এসেছেন। অনেক বছর পর আপনি যখন সেলটি দেখতে যান, আপনি কি বিশ্বাস করতে পেরেছেন—এটি কত ছোট?

নেলসন : তখন তো আমি এটাতেই অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিলাম। আমার যা কিছু করার সবই এমনকি সকাল- বিকালের ব্যায়ামও এখানে করেছি। কিন্তু এখন আমি বাইরে। এত কম জায়গায় কেমন করে প্রয়োজন মিটেছে বলতে পারব না।

ওপরাহ : দিনের বেলায় যখন বল প্রয়োগ করে আপনাকে দিয়ে চুনাপাথরের কাজ করানো হতো, আপনি বলেছেন, তখন সহকর্মীদের সাথে কথা বলার সুযোগ হতো। কিন্তু আমি যখন কারাগারটি দেখতে গেলাম, আমাকে জানানো হলো, প্রতিদিন বিকেল চারটায় সেলের দরজা বন্ধ করা হতো এবং আপনাকে কথা বলতে দেওয়া হতো না।

নেলসন : তা সত্যি। তবে আমরা এই বিধিটিকে চ্যালেঞ্জ করেছিলাম। ওয়ার্ডেনের চেয়ে বড় কর্তারা তাদের সাথে এমন আচরণ করত যেন তারা জীবজন্তু। কিন্তু আমরা তাদের সম্মান করতাম, তাই তারা আমাদের সাহায্য করত। সেলে তালা মারার পরপরই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা চলে যেত, সেলের দরজা খোলা ছাড়া আর সব কিছু করার সুযোগই তারা দিত। তাদের হাতে সেলের তালার চাবি থাকত না। আমাদের উল্টোদিকের সেলের কয়েদিদের সাথে আমাদের কথা বলতে দিত। আমরা যেহেতু ওয়ার্ডেনদের সম্মান করতাম, বিনিময়ে তারাও আমাদের সাথে ভালো মানুষের আচরণ করত।

ওপরাহ : আপনি কি বিশ্বাস করেন, মানুষ নিজ থেকেই ভালো?

নেলসন : তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই, তবে তা নির্ভর করে মানুষের অন্তর্গত ভালোত্বকে আপনি কতটা জাগিয়ে তুলতে পারেন তার ওপর। আমরা যারা বর্ণবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছি, আমরা অনেক মানুষকে বদলে দিতে পেরেছি, কারণ তারা আবিষ্কার করতে পেরেছিল যে, আমরা তাদের সম্মান করি।

ওপরাহ : যে মানুষ আপনাকে নিপীড়ন করে তাকে আবার সম্মান করেন কেমন করে?

নেলসন :আপনাকে একটা বিষয় অবশ্যই অনুধাবন করতে হবে, অনেক সময়ই ব্যক্তি রাষ্ট্রের নীতির কাছে বাঁধা পড়ে থাকে। যেমন কারাগারে একজন ওয়ার্ডেন কিংবা একজন অফিসার যতক্ষণ না সরকারি নীতিমালা অনুসরণ করেন, পদোন্নতি পান না, যদিও সেই নীতিতে তার কোনো বিশ্বাস নেই।

ওপরাহ : তার মানে ব্যক্তি নিজে যখন তার নীতি নয়, অন্যের নীতি বাস্তবায়ন করছে, আপনি তাকে বদলে দিতে পারেন?

নেলসন : অবশ্যই। আমাকে যখন কারাগারে পাঠানো হয়, আমি তখন প্রশিক্ষিত আইনজীবী। কারাগারের ওয়ার্ডেনরাই যখন সমন কিংবা কারণ দর্শানোর নোটিশ পেত, সাহায্যের জন্য এটর্নির কাছে যাবার মতো সুযোগ তাদের ছিল না। তাদের মোকদ্দমা নিষ্পত্তিতে আমি সাহায্য করতাম। ফলে তারা আমার সাথে ও অন্য কারাবন্দিদের সাথে ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে।

ওপরাহ : আপনার আত্মজীবনীতে লিখেছেন, আপনার বিরুদ্ধ পক্ষকে অসম্মানিত না করে তাকে পরাস্ত করতে পারতেন। এটা কেমন করে সম্ভব?

নেলসন : আমি ও আমার সহকর্মীগণ বর্ণবাদী শাসকদের সাথে মোটেও কথা বলতে চাইতাম না, কিন্তু আমাদের কারও কারও কাজে আমাদের এই শোষকদের সাথে যোগাযোগ ঘটে যায়। যেমন কালো মানুষদের যখন জোহানেসবার্গ থেকে বের করে দেওয়া হয় এবং যার যার গ্রামের বাড়িতে চলে যাবার নির্দেশ দেওয়া হয়, একজন এসে আমাকে বললেন, 'আমাকে সাহায্য করুন। আমি চাকরি হারিয়েছি। আমার বউ আছে, বাচ্চা স্কুলে পড়ে, এখন আমাকে বাড়ি ছাড়তে হচ্ছে।' আইনজীবী হিসেবে আমি তার সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের সাথে দেখা করে বলেছি, 'দেখুন আমি মানবিক আবেদন নিয়ে এসেছি, এই হচ্ছে আমার সমস্যা, আপনার ওপর ভরসা করা ছাড়া আর উপায় নেই। তখন অবশ্যই সেই লোক তাকে চাকরি খোঁজার সুযোগ দিত। কারাগারে যাবার আগেই আমি আবিষ্কার করি, একরোখা মেজাজের মানুষেরা বর্ণবাদ চালাচ্ছেন না; এমনকি তাদের কেউ কেউ বর্ণবাদে বিশ্বাসও করেন না। আপনি যদি বসে তাদের একজনের সাথে কথা বলেন তা হলে এটা বোঝানো সহজ যে, বর্ণবাদ দিয়ে একটি দেশ রক্ষা করা যাবে না। বরং এতে নিরপরাধ মানুষ জবাই হবে, এমনকি তার লোকজনও নিহত হতে পারে। কাজেই আমরা কঠোর বর্ণবাদী শাসকদের সাধারণ মানুষে পরিণত করেছি। যারা আমাদের সাথে কাজ করবে, কারণ আমরা তাদের ভেতরে ভালো গুণগুলো বের করে আনতে পেরেছি।

ওপরাহ : আপনি লিখেছেন যখন আপনি বালক ছিলেন শহরের লোকজন তাদের সমস্যা নিয়ে রাজ প্রতিনিধির কাছে আসতেন। উত্তর দেবার আগে তিনি সবগুলো প্রশ্ন মনোযোগ দিয়ে শুনতেন।

নেলসন : এই নীতিটি সারাজীবনই আমাকে প্রভাবিত করেছে। মানুষ যখন তার অভিমত জানাতে চায়, আমি ধৈর্য ধরি এবং মনোযোগ দিয়ে শুনি, এমনকি তাদের মতামত যদি ভুল মনে করি তবুও। দু-পক্ষকে ভালো করে না শুনলে, প্রয়োজনীয় প্রশ্ন জিজ্ঞাসা না করলে, সাক্ষ্য পরীক্ষা না করলে আপনার পক্ষে সঠিক সিদ্ধান্ত দেওয়া সম্ভব হবে না। আপনি যদি মানুষকে তাদের কথা বলতে না দেন, মতামত পেশ করার সুযোগ না দেন, তারা যে বিষয় নিয়ে এসেছে সে বিষয়ে সমালোচনার অধিকার না পায় তাহলে তারা আপনাকে কখনো পছন্দ করবে না। আর আপনি তখন সম্মিলিত নেতৃত্বের হাতিয়ারটি তৈরি করতে ব্যর্থ হবেন।

ওপরাহ : কারাজীবনের এক পর্যায়ে আপনাকে সহিংসতার বিরোধিতার বদলে আগাম মুক্তির প্রস্তাব দেওয়া হয়। আপনি কি সহিংসতাকে সমাধানের একটি পথ মনে করেন?

নেলসন :ব্যাপারটা তা নয়। যখন আমাকে প্রস্তাব দেওয়া হয়, 'সহিংসতা তোমরা শুরু করেছ, আমাদের সহিংসতা প্রতিরক্ষার জন্য। অত্যাচারিত মানুষ কোন রাজনৈতিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করবে তা অত্যাচারীরাই ঠিক করে দেয়। আর আমি কোনো শর্ত মেনে জেল থেকে ছাড়া পেতে চাই না। আমার সহকর্মীদের কাজ থেকে নিজেকে পৃথক করার বিষয়টি আমি কখনো অনুমোদন করব না।

ওপরাহ : আমি পড়েছি, আপনি নিজেকে কখনো আপনার সহবন্দিদের চেয়ে আলাদাভাবে বিবেচিত হতে ও বাড়তি সুযোগ নিতে দেননি, কারণ আপনি নিজেকে এবং যারা আপনাকে ঘিরে যূথবদ্ধ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছেন তাদের দেখেছেন?

নেলসন : আমার লোকেরা আমার নাম ব্যবহার করে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে আন্দোলন সংগঠিত করতে চেষ্টা করেছে—সেখানে তাদের অবদান আমার চেয়ে কম নয়; বরং বেশি। আমি যদি তাদের চেয়ে বেশি সুবিধা গ্রহণ করি তাহলে তো তাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে।

ওপরাহ : কারাগারে আপনারা সবাই ছিলেন ভাই, সহযোদ্ধারা সবাই একসাথে কারাবিন্দ হয়েছেন। তাদের নাম পৃথিবী জানে না, জানে আপনার নাম। ম্যান্ডেলা গ্রুপ নামে কিছু আছে আমরা তা-ও দেখিনি।

নেলসন : আমি বিনয় করে বলছি না, সেখানে অনেকেই ছিলেন লড়াইয়ে, যারা আমার চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান ও বেশি অঙ্গীকারাবদ্ধ।

ওপরাহ : ১৯৮৬ থেকে আপনি সমঝোতার পদক্ষেপ নিতে থাকেন, যা শেষ পর্যন্ত আপনাকে কারামুক্ত করে। জেল থেকে বের হতে পারবেন—এটা কি সত্যি কখনো ভেবেছেন?

নেলসন : আমরা সবাই জানতাম, একদিন আমরা মুক্ত হব—কিন্তু কখন তা আমাদের জানা ছিল না। জেলখানার ওয়ার্ডেনকে আমাদের কাছে পাঠানো হতো, ওয়ার্ডেন বলত, 'তোমাদের নাম, কোত্থেকে এসেছে এবং ছাড়া পেলে ঠিক কোথায় যাবে তা জানাও।' কখনো কখনো ওয়ার্ডেন বলত, 'তোমাদের মতো লোক এখানে ধরে রাখা যাবে না। সারা দুনিয়া তোমাদের মুক্তির জন্য চাপ দিচ্ছে।'

অনেক সময় এসেছে যখন মনে হয়েছে, সরকার বোধ হয় বর্ণবাদ-বিরোধী আন্দোলন একেবারে গুঁড়িয়ে দিল—আমাদের মনোবল অনেক নেমে গেছে কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে আমরা মনে করেছি—জেল থেকে আমরা বের হবই।

(১০ ফেব্রুয়ারি ১৯৯০) (প্রেসিডেন্ট) ডি ক্লার্ক আমার সাথে দেখা করে বললেন, 'কাল আপনাকে জেল থেকে ছেড়ে দেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।'

আমি বললাম, 'আপনি তো আমাকে অবাক করে দিলেন। আমাকে অন্তত সাত দিন সময় দিন যাতে আমাদের লোকদের বলতে পারি, তাদের তো তৈরি হতে হবে।'

ডি ক্লার্ককে আমি আরও বলেছিলাম, একবার আমি জেলগেটে পৌঁছে গেলে আমার ওপর তার আর কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। আমি ভিক্টর ভারস্টার কারাগার থেকেই মুক্তি পেতে চেয়েছি, ১৯৮৮ সাল থেকে আমি এই কারাগারে। আমি সেখানকার মানুষের সাথে কথা বলতে চেয়েছি। তারাই এতদিন আমার দেখাশোনা করেছে। কিন্তু ডি ক্লার্ক চেয়েছেন, এখান থেকে উড়োজাহাজে আমাকে প্রিটোরিয়া কারাগারে নিয়ে সেখান থেকে মুক্তি দেবেন। কিন্তু আমি তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করি। আমি নিজে যা ভেবেছি সে কারণেই তো তারা আমাকে জেলে পাঠিয়েছে, এখন আমার জন্য আমি তাদের ভাবতে দেব না। শেষ পর্যন্ত পরদিন তারা আমাকে ভিক্টর ভারস্টার কারাগার থেকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়—কারণ তারা যে আমাকে ছেড়ে দিচ্ছে তা আগেই সংবাদমাধ্যমে প্রচার করে এবং সারা পৃথিবী থেকে সাংবাদিকরা এসে জড়ো হতে থাকেন।

ওপরাহ : তার মানে, ২৭ বছর কারাবাসের পর আপনি বলেছেন, 'আমার শর্তে আমাকে মুক্তি দিতে হবে'?

নেলসন :হ্যাঁ, আমি এবং আমার সহবন্দিরা আমরা সবাই জানতাম আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আমাদের সমর্থন করছে।

ওপরাহ : এটা কি সত্য ৭১ বছর বয়সে আপনি কারগার থেকে যখন বের হলেন, ব্যাপারটা পুনর্জন্মের মতো?

নেলসন: হ্যাঁ। আমি তখন জেলের ভেতর। ওয়ার্ডেনদের বললাম, তারা যেন পরিবারের সদস্যদের নিয়ে জেলগেটে অপেক্ষা করে। বের হবার সময় তাদের কাছে কৃতজ্ঞতা জানাব। গেটে তারা ছাড়া আর কেউ থাকবেন আমি সত্যিই ভাবিনি। বের হয়ে দেখি সামনে জনতার ঢল।

ওপরাহ : আপনি একবার আমাকে বলেছেন, নেতার সবচেয়ে বড় গুণ হচ্ছে বিনয়। কারাগার থেকে আপনি কি আরও বিনয়ী হয়ে বের হলেন?

নেলসন : আপনি যদি বিনীত হোন, তাহলে আপনি কারও জন্যই হুমকির কারণ নন। কারও আচরণ এমন যেন অন্যের ওপর কর্তৃত্ব ফলাচ্ছেন। সেটা ভুল। আপনি যদি আপনার চারপাশের মানুষের সহযোগিতা চান, তারা যে আপনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ এটা তাদের অনুভব করার সুযোগ দিতে হবে—বিনয়ী ও অকপট হয়েই আপনাকে তার প্রমাণ দিতে হবে। আপনাকে জানতে হবে, অন্য মানুষের মধ্যে আপনার চেয়েও ভালো গুণাগুণ থাকতে পারে। তাদের তা প্রকাশ করতে দিন।

ওপরাহ : মায়া অ্যাঞ্জেলু বলেন, বিনয় হচ্ছে পৃথিবীতে আপনার অবস্থানটা জানা। এটা অনুধাবন করা যে, আপনিই পৃথিবীর প্রথম একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেননি।

নেলসন : সেটাই সত্যি।

ওপরাহ : কুনুতে থাকার অনুভূতি আপনার কাছে কেমন? আপনি কি প্রায়ই এখানে আসেন?

নেলসন : যত বেশিবার সম্ভব আসি। যদিও জোহানেসবার্গে আমাদের একটি বাড়ি আছে, আমি ও আমার স্ত্রী, আমাদের পরিবারিক দিনগুলোতে সেখানে অবস্থান করি না। আমি যখন জেলে, আমার বড় ছেলে একটা গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা যায়, আর...

ওপরাহ : আপনাকে ছেলের শেষকৃত্যে যোগ দিতে দেওয়া হয়নি?

নেলসন : না, তা নয়। আমরা তাকে জোহানেসবার্গে সমাহিত করি। কিন্তু পরে আমার স্ত্রী বলেছে, এই সন্তানটিকে অবশ্যই কুনুতে তোমার বাবার কবরের পাশে সমাহিত করা উচিত। শিশু অবস্থায় আমার একটি মেয়েও মারা যায়। তাকে এখানেই দাফন করি। গ্রাসা আমাকে বলেছে, তুমি যখন এখন আর দুনিয়া ঘুরে বেড়াচ্ছ না, পরিবারের সদস্যদের সাথে তোমার একটা দিন কাটানো উচিত। তোমার ছেলেমেয়ে, নাতিনাতনি এবং ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজনদের নিমন্ত্রণ করতে পার। তাতে বন্ধনটা আরও নিবিড় হবে।

ওপরাহ : এই বয়সে আবার প্রেমে পড়বেন, কখনো কি ভেবেছেন?

নেলসন : আমি যখন এই ভদ্রমহিলাকে প্রথম দেখি, তখন ভালোবাসার প্রশ্ন ছিল না। আমি তাকে একজন প্রেসিডেন্টের স্ত্রীই বিবেচনা করি, যার সাথে আমার আগে কখনো দেখা হয়নি। আমি তাকে খুব শ্রদ্ধা করেছি।

ওপরাহ : তিনি কেমন করে আপনাকে বদলে ফেললেন?

নেলসন : অবশ্য অনেক বদলেছেন। গ্রাসা আমার চেয়ে অনেক বেশি স্থিত, সহজে উত্তেজিত হয় না এবং আমাকে বারবার সতর্ক করে দেয়, আমার কাজের ব্যাপারে আমাকে অতি উত্সাহী হবার দরকার নেই। পারিবারিক এবং আন্তর্জাতিক বিষয়ে অনেক ভালো একজন উপদেষ্টা। আন্তর্জাতিক বিষয়ের কারণে পৃথিবীর অনেক দেশ তার সফর করা।

ওপরাহ : আপনার জীবন থেকে পাওয়া সবচেয়ে বড় শিক্ষাগুলোর একটি হচ্ছে, আমাদের শোষকদের ক্ষমা করে দেওয়ার মধ্যেই ক্ষমতা নিহিত। একবার আপনি আমাকে বলেছেন আপনি নিজেকে এমনভাবে তৈরি করেছেন যেন 'মস্তিষ্ক রক্তের ওপর খবরদারি' করে। কেমন করে আপনি এই আদর্শের চর্চা করেছেন?

নেলসন : এটা নিয়ে তো আমাদের সকলকে সংগ্রাম করতে হয়েছে, বিশেষ করে আমরা যখন শত্রুকে মোকাবিলা করি—শত্রুরা ছিল আমাদের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। কিন্তু আমরা যেহেতু পরস্পরকে হত্যা করার বিষয়টি এড়াতে চেয়েছি, আমাদের অনুভূতিকে দাবিয়ে রাখতে হতো। শান্তিপূর্ণভাবে বদলে যাবার এটাই একমাত্র উপায়।

ওপরাহ : অনেক মানুষ তো তা এমনকি নিজের পরিবারেও চর্চা করতে পারে না।

নেলসন : তা সত্যি। কিন্তু মানুষকে শেখাতে হবে যখন তারা অবিচারের শিকার, তাদের অবশ্য শত্রুর সাথে কথা বলতে হবে, উভয়ের শান্তির স্বার্থে ব্যবধান কমিয়ে আনতে হবে।

ওপরাহ : এখন বলা যায় আপনি আপনার জীবন সায়াহ্নে। আপনি এখন কী প্রত্যাশা করছেন?

নেলসন : আমি যে কাজ করছি, তা-ই চালিয়ে যেতে চাই। কোনো কোনো এলাকায় গরিব মানুষের ভালো রাস্তা, বিদ্যুত্, পানি এমনকি টয়লেটও নেই। তবে অনেক কিছু বদলে যাচ্ছে। পুরোটা ঘটতে অনেক বছর লেগে যাবে।

ওপরাহ : আমি আপনাকে ও আপনার কমরেডদের উচ্চাসনে রাখি, কারণ আপনারা প্রবল অত্যাচারের মুখে আজীবন আদর্শ ধরে রেখেছেন। এ জন্য আপনি নিশ্চয়ই গর্বিত।

নেলসন : ওপরাহ, আপনি অনেক সদয়। আমি আপানাকে এটুকু বলতে পারি, আপনি আমাকে যেমন মানুষ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, সব সময়ই তা ছিলাম না।

ওপরাহ : ম্যাগাজিনের শেষ পৃষ্ঠায় আমি একটি কলাম লিখি 'আমি নিশ্চিত যা জানি', আপনি নিশ্চিত কী জানেন?

নেলসন : আমি জানি আমার স্ত্রী সব সময় আমাকে সমর্থন করবে। আমি জানি পৃথিবীতে অনেক ভালো নারী ও পুরুষ রয়েছেন যারা সমাজের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ—দারিদ্র্য, নিরক্ষরতা ও রোগবালাই নিয়ে উদ্বিগ্ন।

ওপরাহ : আপনি কি মৃত্যুকে ভয় পান?

নেলসন : না। সেক্সপিয়র এটা চমত্কারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন : 'ভীরুরা মৃত্যুর আগে বহুবার মরে, বীর মৃত্যুর স্বাদ মাত্র একবারই নেয়।' আপনি যখন বিশ্বাস করেন গৌরবের মেঘের নিচে আপনি অদৃশ্য হয়ে যাবেন, কবরের বাইরেও আপনার নাম ছড়িয়ে যায়—আমিও তা-ই ভাবি।

এই পাতার আরো খবর -
font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেছেন, 'রাজনৈতিক দল হিসাবে কর্মকাণ্ড করার কোনো অধিকার জামায়াত রাখে না।' আপনিও কি তাই মনে করেন?
7 + 1 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
নভেম্বর - ২৯
ফজর৫:০২
যোহর১১:৪৭
আসর৩:৩৫
মাগরিব৫:১৪
এশা৬:৩১
সূর্যোদয় - ৬:২২সূর্যাস্ত - ০৫:০৯
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :