The Daily Ittefaq
ঢাকা, সোমবার ০৫ আগস্ট ২০১৩, ২১ শ্রাবণ ১৪২০ এবং ২৬ রামাযান ১৪৩৪
সর্বশেষ সংবাদ হাইকোর্টের রায় বহাল; নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না জামায়াত | আপিল করেছেন গোলাম আযম | অষ্টম মজুরি বোর্ডের সুপারিশে মন্ত্রিসভার একমত

ভ্রমণ

কর্দোবার গির্জা মসজিদে

ফারুক মঈনউদ্দীন

খুব ভোরে মাদ্রিদের আতোচা স্টেশন থেকে ইউরো রেলের ট্রেনে চড়ে কর্দোবা পৌঁছাতে সকাল নটা পেরিয়ে যায়। স্টেশনে নেমে প্রথমেই জোগাড় করতে হবে একটা ট্যুরিস্ট ম্যাপ ও গাইড বুক। এখানে রাত কাটানোর পরিকল্পনা নেই বলে সাথের মালপত্রের একটা গতিও করতে হবে লেফট লাগেজ রুমে। প্লাটফর্ম থেকে ওপর তলায় উঠে এলেই সামনে পড়ে ট্যুরিস্ট অফিসের কিওস্ক। সেখান থেকে ম্যাপ ইত্যাদি জোগাড় করে মূল স্টেশন বিল্ডিংয়ে ঢুকলে লেফট লাগেজ রুম খুঁজে নিতে দেরি হয় না। খুব বড় নয় স্টেশনটি। লেফট লাগেজ রুমের কাউন্টার জুড়ে আজদাহা সাইজের এক কৃষ্ণাঙ্গ সিকিউরিটি গার্ড দাঁড়ানো। সামনে যেতেই লোকটা যন্ত্রের মতো বলে, 'ফাইভ ইউরো'। পাসপোর্ট, বাড়তি ইউরোসহ প্রায় সর্বস্ব এখানে রেখে যাওয়ার আগে নিশ্চিন্ত হওয়ার জন্য আরও কিছু কথা জানা দরকার, কোনো ঝামেলা হলে ধনেপ্রাণে মারা যাওয়ার অবস্থা হবে। কিন্তু ওর চেহারা দেখে এবং ভাষাজ্ঞান আঁচ করতে পেরে কিছু জিজ্ঞেস না করে ইতস্তত করছিলাম। ঠিক এসময় হেলেদুলে এসে ঢোকেন মাথায় ঈষত্ টাকওয়ালা হাসিখুশি সজ্জন চেহারার এক প্রৌঢ়। সিকিউরিটির লোকটিকে হটিয়ে তিনি এবার কাউন্টারের পেছনে দাঁড়িয়ে বলেন, জি সেনর, মালপত্র রাখবেন? সারাদিনের জন্য ভাড়া পাঁচ ইউরো। বললাম, বিকেলের আগে বন্ধ করে চলে যাবেন না তো? আমরা সন্ধ্যায় এখান থেকে গ্রানাদার ট্রেনে উঠব। ভদ্রলোক বলেন, আরে না না, রাত নটা পর্যন্ত আছি আমরা।

লকারে স্যুটকেস, হাতব্যাগ ইত্যাদি জমা করে ভাড়ার আগাম টাকা মিটিয়ে দেওয়ার পর চাবিটা আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, এনজয় কর্দোবা। তারপর বললেন, এখানে বেশিরভাগ ট্যুরিস্টইতো ইহুদি পল্লি আর মেসকিতা দেখতে যায়। তারপর কর্দোবাতে ঘোরাঘুরির বিষয়ে কিছু উপদেশ দিয়ে ভদ্রলোক ট্যুরিস্ট ম্যাপে গোল্লা গোল্লা দাগ দিয়ে দেখিয়ে দিলেন, ট্যাক্সি নিয়ে কোন জায়গায় নামলে ভাড়া বেশি হবে না, কোন কোন জায়গা দেখার মতো, ফেরার সময় কোন পয়েন্ট থেকে ট্যাক্সি নিতে হবে ইত্যাদি।

মেসকিতা মানে মসজিদ, এটাকে আবার ক্যাথেড্রাল মস্কও বলা হয়। ইহুদি পল্লির পাশে ত্রিয়োনফো দে সান রাফায়েল-এর (সান রাফায়েলের বিজয় স্তম্ভ) গোড়া থেকে পশ্চিম দিকে গেলেই পৌঁছে যাওয়া যায় মেসকিতায়। সেই মোড়ের চওড়া চত্বরে ঘোড়াগাড়ির স্ট্যান্ড। ট্যুরিস্ট ম্যাপে দাবার ঘুঁটির মতো ঘোড়ার মাথাওয়ালা চিহ্ন দেখে বোঝা যায়, এগুলো বৈধ স্ট্যান্ড। বৈধ বা অবৈধ যা-ই হোক, ভাবনাহীন কোচোয়ানরা গুলতানি মারছে চড়নদার নেই বলে। একটু এগিয়ে গেলে হাতের বামে বর্তমান বিশপ ভবন, খ্রিষ্টান পুনর্বিজয়ের আগে এটা ছিল গভর্নরের বাড়ি, এখন আর্ট মিউজিয়াম। ওটার সামনে একপাল গরিব মহিলা কিছু ছোট ছোট গাছের কচি ডাল আমাদের গছানোর চেষ্টা করে, সম্ভবত জলপাই গাছের। গির্জায় প্রার্থনার কোনো কাজে লাগে হয়তো। আমরা ওদের হাত এড়িয়ে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াই জিরিয়ে নেওয়ার জন্য। তখন সেই মহিলাদের একজন এসে নিঃসংকোচে আমার কাছে সিগারেট চায়। আমি হাতের আধপোড়া সিগারেটটা এগিয়ে দিলে মহিলা 'ইহ্!' ভঙ্গিতে কটাক্ষ হেনে সরে যায়, তারপর আবার এসে আস্ত একটার জন্য আবদার করতে থাকে। ট্যুরিস্টদের অতদিকে তাকানোর সময় কোথায়?

ক্যাথেড্রাল মসজিদের সীমানার ভেতর ঢোকার বেশ কয়েকটা গেট আছে। সীমানা দেয়াল জেলখানার দেয়ালের মতো কোথাও ২০-২৫ ফুট, কোথাও ৫০-৬০ ফুট উঁচু। তবে সবটুকু সীমানা দেয়াল নয়, বেশিরভাগই মসজিদের মূল ভবনের বহির্দেয়াল। ভেতরে একটা বড়সড় কমলা বাগান, পোশাকি নাম 'প্যাটিও দে লা নরঞ্জোস' অর্থাত্ 'কমলা অঙ্গন'। এই কমলা বাগানের গাছগুলো নাকি লাগানো হয় ভেতরের স্তম্ভগুলোর সারির সাথে মিল রেখে, যাতে নামাজিরা ভেতরের স্তম্ভ এবং বাইরের গাছের সারির মধ্যে কোনো পার্থক্য না পান। সে-সময় মসজিদের বাগানের দিকটাতে কোনো দেয়াল ছিল না, তাই কমলা বাগানের পর স্তম্ভের অরণ্যে ঢুকে পড়ার একটা বাড়তি আকর্ষণ নিশ্চয়ই ছিল। এই মসজিদ যে তখন কেবল উপসনালয় ছিল তা নয়, এটি ছিল একাধারে শিক্ষালয় এবং মানুষের সামাজিক মিলনক্ষেত্র।

কমলা গাছের মাথা ছাড়িয়ে কিছুদূর পর পর দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটা খেজুর গাছ এবং ঊর্ধ্বমুখী বর্শার মতো ঝাউগাছ। এখানে একসময় মুসল্লিদের অজুর ব্যবস্থা ছিল, এখন অবশ্য তার কোনো চিহ্ন নেই। মূল মসজিদ ভবনের পশ্চিম দিকে কমলা অঙ্গন পেরিয়ে মাথা তুলে দাঁড়ানো শ-দুয়েক ফুট উঁচু টাওয়ার, তার মাঝামাঝি অংশে ঝুলছে বিশাল এক ঘণ্টা। এটি আদিতে ছিল মসজিদের মিনার, তৈরি করিয়েছিলেন দ্বিতীয় আবদুর রহমান। পরবর্তী সময়ে মসজিদকে গির্জায় রূপান্তরিত করার প্রক্রিয়ায় ১৬০০ শতাব্দীর দিকে ঘণ্টা মিনারটি বর্তমান রূপ লাভ করে। এই টাওয়ারের নিচের গেটটিই মূল ফটক, নাম 'লা পুয়ের্তা দেল পেরদন' অর্থাত্ 'ক্ষমার তোরণ'। এই ফটকের নিচে ভোজের দিন গির্জার যাজক এবং অন্যান্য সদস্যরা তাদের দেনাদারদের দেনার দায় থেকে মুক্তি দিত, সেজন্য এই নামকরণ। আরও যে কয়েকটা সাধারণ গেট আছে সেগুলোরও রয়েছে আলাদা আলাদা নাম।

কমলা বাগান ঘুরে উল্টো পাশে টিকিট কাউন্টারের সামনে গেলে জানা যায়, বেলা একটায় পরবর্তী দর্শনার্থীদলের টিকিট দেওয়া হবে। ধারণা করি, সে-সময় ভেতরে প্রার্থনা চলছিল বলে দর্শনার্থী প্রবেশ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে, কারণ একটা আধখোলা দরজা দিয়ে উঁকি দিলে ভেতরে জড়ো হওয়া মানুষজন দেখা যায় একঝলক, সেই সাথে ভেসে আসে সমবেত কণ্ঠের প্রর্থনা সংগীত। উঁকি দেওয়ার সময় দরজায় দাঁড়ানো প্রহরীদের দেহভঙ্গি খুব কড়া মনে হলো। অগত্যা সে-সময়টুকু বাইরে ঘুরে আসা যায়। 'লা পুয়ের্তা দেল পেরদন'-এর ঠিক বাইরে সিঁড়ির ধাপের ওপর এক বৃদ্ধা ভিক্ষা করছিল বসে। তার বাড়ানো হাত এড়িয়ে ইহুদি পল্লির রাস্তায় নেমে আসি। উপাসনালয়গুলোর বাইরে পুণ্যার্থী মানুষের হূদয়ের আর্দ্রতার সুযোগে ভিক্ষার বরকত ঘটে সব দেশেই। ঝকঝকে রাস্তার পাশে হরেক স্যুভেনিরের দোকান, সেখানে ঢুকে বিশালদেহী ট্যুরিস্টদের বেপরোয়া কেনাকাটার ফাঁকে খুব সন্তর্পণে কিছু খুচরা শপিং সারি। তারপর সময় কাটানোর জন্য মেসকিতার বাইরে উঁচু একটা বাঁধানো রোয়াকে বসে সদ্য কেনা সচিত্র ট্যুরিস্ট বইয়ের পাতা ওল্টাই।

উমাইয়া খেলাফতের আগে এই মেসকিতা ছিল একটা পেগান মন্দির, তারপর গির্জা। ৭১১ খ্রিষ্টাব্দে মুরীয় মুসলমানদের কর্দোবা দখলের পর এটিকে দুইভাগ করে এক ভাগকে মসজিদে রূপান্তরিত করা হয়। কোনো কোনো ইতিহাস বিশ্লেষকের মতে, খলিফা উমরের সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে পরবর্তীতে আবু জুবাইদা এবং খালিদ বিন ওয়ালিদের উদ্যোগে দামেস্ক এবং অন্যান্য শহরে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের শর্তে গির্জার দ্বিভাজন এবং খ্রিষ্টান ও মুসলমান উভয় ধর্মাবলম্বী কর্তৃক ব্যবহারের দৃষ্টান্ত থেকেই কর্দোবার সেন্ট ভিনসেন্ট গির্জার এই দ্বিভাজন। জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে একসময় গির্জাটিতে আর পুণ্যার্থী মানুষের স্থান সংকুলান হয় না। সে-সময় মুসলিম শাসক প্রথম আবদুর রহমান গির্জার অংশটি কিনে নিয়ে এখানে নতুন একটা মসজিদ তৈরি করেন ৭৮৬ খ্রিষ্টাব্দে। নবম এবং দশম শতাব্দীতে আরও বাড়ানোর পর বর্তমান আয়তনে পৌঁছে এটি। সবচেয়ে বেশি কাজ হয় দ্বিতীয় আল হাকামের সময়, ৯৬১ খ্রিষ্টাব্দে। পশ্চিমা দুনিয়ায় এটিই ছিল সবচাইতে বড় মসজিদ, আয়তন ২৪ হাজার বর্গ মিটার। ১২৩৬ সালে কর্দোবাতে খ্রিষ্টানদের পুনর্বিজয়ের পর এটিকে আবার গির্জাতে পরিণত করা হয়। তবে ভেতরের মূল ইসলামি স্থাপত্যের কোনো পরিবর্তন করা হয়নি, এমনকি মসজিদের মেহরাবটিও অক্ষত অবস্থায় রাখা হয়েছে। সেই থেকে এটির নাম ক্যাথেড্রাল মসজিদ, তবে এখনো কোথাও কোথাও গ্রেট মস্ক বলেও পরিচিত।

কথিত আছে দশম শতাব্দীতে মুসলমান শাসক আল মানসুর উত্তর স্পেনের সান্তিয়াগো দে কম্পোস্তেলা আক্রমণ করে সেখানকার গির্জার ঘণ্টাগুলো খ্রিষ্টান ক্রীতদাসদের দিয়ে ৫০০ মাইল দক্ষিণের কর্দোবাতে নিয়ে আসেন এবং সেগুলো গলিয়ে মেসকিতার জন্য তৈরি করান শত শত লণ্ঠন। উল্লেখ্য, এই সান্তিয়াগো দে কম্পোস্তেলা ছিল রোম এবং জেরুজালেমের পর খ্রিষ্টান বিশ্বের তৃতীয় উল্লেখযোগ্য তীর্থস্থান। এই ঘটনার আড়াইশ বছর পর খ্রিষ্টানদের কর্দোবা পুনর্বিজয়ের পর সম্রাট তৃতীয় ফার্ডিনেন্ড কর্দোবা থেকে সেই সব লণ্ঠন মুসলমান ক্রীতদাসদের দিয়ে আবার সান্তিয়াগো দে কম্পোস্তেলাতে বইয়ে নিয়ে যান এবং সেগুলোকে গলিয়ে ঢালাই করান গির্জার ঘণ্টা।

খ্রিষ্টান অধিকৃত হওয়ার পর দীর্ঘকাল কেটে যাওয়ার পর এটির নাম মেসকিতা রয়ে গেলেও এটিতে মুসলমানদের আর কোনো অধিকার থাকে না। তবে বর্তমান শতাব্দীর শুরু থেকে স্পেনীয় মুসলমানরা রোমান ক্যাথলিক কর্তৃপক্ষের কাছে বহুবার ধরনা দিয়েছে তাদেরকে যাতে মেসকিতায় নামাজ পড়তে দেওয়া হয়। কিন্তু স্পেনীয় কর্তৃপক্ষ এবং ভ্যাটিকান উভয় তরফ থেকে এই বিষয়ে নেতিবাচক সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়। মুসলমান নেতৃবর্গ এবং স্প্যানিশ ইসলামিক বোর্ডের বক্তব্য, তাঁরা মসজিদটির নিয়ন্ত্রণ বা আন্দালুসিয়ার কোনো পুরোনো স্মৃতি উদ্ধার করার জন্য এটিতে নামাজ পড়ার অধিকার চাইছেন না, পুরোপুরি মসজিদে পরিণত করার আগে একসময় এই মসজিদে খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীদেরও যেমন প্রার্থনা করার অনুমতি ছিল, তাঁরা সেটাই চাইছেন, যাতে স্থাপনাটি একটি সর্বজনীন রূপ লাভ করে।

কিন্তু এই সব দেনদরবারের পর ২০১০ সালে এখানে এমন এক ঘটনা ঘটে যেটি এই দাবিকে প্রত্যাখ্যান করার একটা যৌক্তিকতা এনে দেয় ক্যাথলিক নেতাদের কাছে। সে-বছর ৩১ মার্চ ইস্টার উইকের সময় কর্দোবার রাস্তায় যখন মিছিল চলছিল সে-সময় শখানেক ইউরোপীয় মুসলমানের একটা দল মসজিদ দর্শনে গিয়েছিল। তাদের মধ্যে কয়েকজন অস্ট্রিয় মুসলমান মেহরাবের সামনে নামাজে বসে পড়ে। তাদের উচ্চৈস্বরের তেলাওয়াত শুনে ভেতরের নিরাপত্তা রক্ষীরা তাদের বাধা দিতে চাইলে তারা উল্টো রক্ষীদেরকে আক্রমণ করে বসে, তাদের একজনের কাছে থাকা ছুরির আঘাতে এক রক্ষী আহত হলে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছিল। আক্রমণকারী দুজনকেও আটক করা হয়। ঘটনাটি কালের বিচারে ছোট হলেও তার ফলাফল ও পরিণতি তত ছোট ছিল না। সংবাদ মাধ্যমগুলো এটিকে রোমহর্ষক ঘটনা হিসেবে বর্ণিত করে অতি গুরুত্বের সাথে প্রচার করে। কোনো কোনো সংবাদ বিশ্লেষণে এমনও ব্যাখ্যা দেওয়া হয় যে, এ ঘটনাটা ঘটল এমন সময়, যার এক মাস আগে এক সৌদি শেখ কর্দোবায় একটা মুসলিম টিভি চ্যানেল খোলার জন্য অর্থ বিনিয়োগ করেছেন, আর ছয় মাস আগে আফগানিস্তানের পটভূমিতে নির্মিত 'উন বুরকা পর আমর' (ভালবাসার জন্য বুরকা) নামের ছবিটি স্থানীয় এক টিভি চ্যানেলে তিন কিস্তিতে দেখানো হয়। ছবিটি সেখানে ব্যাপক প্রচারণা পেয়েছিল। এই ঘটনাটি স্পেনে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। কিছু গোরা খ্রিষ্টান বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে ঘটনাটি ছিল পরিকল্পিত, এবং মুসলমানদের ভবিষ্যত্ পরিকল্পনা আছে স্পেন বিজয় করে আবার আন্দালুসিয়া দখল করা। আবার কেউ কেউ এমনও মনে করেন, ঘটনাটি ইস্টারের দিন ঘটানো হয়েছে ইচ্ছাকৃতভাবে খ্রিষ্টানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার জন্য। তাঁদের মতে, মুসলমানরা মেসকিতাতে যদি নামাজ পড়ার অনুমতি পায়, তাহলে স্পেনে যে আরও শখানেক মসজিদ আছে সেগুলোতে কি খ্রিষ্টানদের প্রার্থনা করার সুযোগ দেওয়া হবে? তবে মুসলমানরা মনে করেন, যদি মসজিদ না-ই হয় তাহলে এটি 'মসজিদ' (মেসকিতা) নামে পরিচিত হবে কেন? এই যুক্তি খণ্ডন করতেই বোধহয় স্পেনের কিছু কিছু কাগজে এটিকে আবার লা ক্যাথেড্রাল বলে উল্লেখ করা হতে থাকে।

২০১০ সালে অস্ট্রিয় মুসলমান ট্যুরিস্টদের সাথে যে ঘটনা ঘটেছিল, নিজের অভিজ্ঞতা থেকে সেরকমই একটা ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন ভারতে জন্মগ্রহণকারী, দেশভাগের পর পাকিস্তানে অভিবাসিত এবং ছাত্রজীবন থেকে এযাবত যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী অর্থনীতির অধ্যাপক ড. গজনফর তাঁর এক ভ্রমণলেখায়। তাঁর বর্ণনামতে, এই ঘটনার বহুবছর আগে কর্দোবার মসজিদটি দেখতে গিয়ে তিনিও আচমকা দলছুট হয়ে মসজিদের এক কোণে দুই রাকাত নফল নামাজ সেরে নিতে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন। প্রথম রাকাত নির্বিঘ্নে সেরে ফেললেও দ্বিতীয় রাকাতের সময় সেখানকার এক রক্ষী তাঁর হাত ধরে রূঢ়ভাবে টেনে নিয়ে তাঁকে মসজিদের বাইরে বের করে দেয়। এই মসজিদের সাথে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের একটা আবেগ জড়িয়ে আছে বলে এসব ঘটনার অবতারণা হয়।

তবে সব স্পেনীয় কিন্তু আরব কিংবা মুসলমানদের প্রতি বিরূপ মনোভাব পোষণ করেন না, বরং তাঁরা তাঁদের সেমিটিক উেসর জন্য গর্ব বোধ করেন। এমনকি ১৪৯২ সালে আরব এবং ইহুদি বিতাড়নের কারণে সৃষ্ট ক্ষতির জন্য তাঁদের মধ্যে আছে প্রচ্ছন্ন অনুশোচনা। স্পেনের স্থাপত্য, সংস্কৃতি তথা সংগীত-নৃত্য এমনকি রন্ধনশিল্পে পর্যন্ত মুরীয় প্রভাব বেশ গভীর। বহু স্পেনীয় শব্দ সরাসরি এসেছে আরবি থেকে, আবার কিছু এসেছে পরিবর্তিত রূপে। যেমন—স্পেনে বহুল ব্যবহূত 'ওখালা' (ojalá) শব্দটির অর্থ 'আশা করি' কিংবা 'খোদা চাহে ত', এই শব্দটি এসেছে আরবি 'ইনশাল্লাহ' থেকে। কিংবা মেসকিতার পূর্বপাশে বয়ে যাওয়া 'গুয়াদালকিভির' নদীর নামটিও এসেছে আরবি 'আল ওয়াদি আল কবির' থেকে, যার অর্থ 'বিরাট নদী'। এটি স্পেনের চতুর্থ দীর্ঘতম এবং আন্দালুসিয়ার বৃহত্তম নদী। স্পেনীয় 'আলকাজার' অর্থ দুর্গ বা নগরদুর্গ, শব্দটি এসেছে সরাসরি আরবি 'আল-কাসর' থেকে। এমনকি স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদ নামটিও এসেছে আরবি 'আল-মাগরিত্' থেকে, যার অর্থ জলের উত্স। উল্লেখ্য, মাদ্রিদের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে মানসানারিস নদী, এটিই ছিল জলের উত্স।

ভেতরে ঢোকার নির্দিষ্ট সময়ে বারো ইউরোর টিকিট কেটে একদল দর্শনার্থীর সাথে লাইন ধরে ভেতরে ঢুকলে বাইরের উজ্জ্বল আলো থেকে ভেতরের অনুজ্জ্বল স্নিগ্ধ আলোয় চোখ সয়ে আসতে কিছুটা সময় লাগে, তারপর প্রথমেই নজর কেড়ে নেয় অসংখ্য থাম, তার ওপর দুটো করে ধনুকাকৃতির খিলান, সাদা আর জাফরানি রংয়ের ডোরা কাটা। ছবিতে বঙ্কিমচন্দ্রের মাথায় যেরকম ডোরাকাটা শামলা দেখা যায়, অনেকটা সেরকম ডোরা। বিভিন্ন মূল্যবান পাথরে তৈরি এই স্তম্ভের সংখ্যা ৮৫৬টা, মতান্তরে ১২০০, গুনে দেখা হয়নি। দুই স্তরবিশিষ্ট একটার ওপর আরেকটা খিলান এবং উজ্জ্বল ডোরার কারণে একনজরে পুরো জায়গাটাকে থাম আর খিলানের অরণ্য বলে মনে হয়। মসজিদটির একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে তাকালে স্তম্ভের সারিগুলোকে মনে হয় যেন হাজার আয়নায় একটি স্তম্ভের পুনরাবৃত্ত প্রতিফলন। জ্যামিতির নিখুঁত বিন্যাসে সারিবদ্ধ স্তম্ভগুলো সবদিকেই তৈরি করেছে সটান গলিপথ। দ্বিস্তর খিলানের উজ্জল ডোরা এবং তার সাথে একসময়ের দেয়ালহীন পশ্চিম পাশ থেকে ঢুকে পড়া আলোর খেলা যে ভেতরে এক মনোরম পরিবেশ সৃষ্টি করত সেটা অতি সহজেই অনুমান করা যায়। সাধারণত এ জাতীয় বিশাল স্থাপনাগুলো হয় বেশ উঁচু, কিন্তু এটির উচ্চতা তত বেশি নয়, উচ্চতার অভাবটা আরও বেশি মনে হয় দুই স্তরের ধনুকাকৃতি লাল সাদা ডোরাকাটা খিলানের কারণে। এই দুই স্তরের ধনুকাকৃতি খিলান পুরো স্থাপত্যকে দিয়েছে এক অনন্য বৈশিষ্ট্য।

আমাদের মসজিদগুলোতে সাধারণত পূর্বদিকটা খোলা রাখা হয়, যাতে দিনের আলো ঢুকতে পারে, আর পশ্চিম পাশে, অর্থাত্ কেবলায় থাকে ইমামের দাঁড়ানোর মেহরাব। এখানে অবশ্য কেবলা পূর্বদিকে, কারণ স্পেন থেকে মক্কার কাবাশরিফ পূর্বদিকে, কিন্তু মেসকিতার মেহরাবটি সামান্য পূর্ব-দক্ষিণে মুখ করা। মেহরাবের অবস্থানগত এই ভুলটি দ্বিতীয় আল-হাকামের সময় সংশোধন করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও বিভিন্ন বিজ্ঞজনের পরামর্শে এটি যে অবস্থানে ছিল সে অবস্থায় রেখে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে ভেতরের সাজসজ্জা আরও বাড়ানোর জন্য তুরস্ক (তত্কালীন বাইজেন্টাইন) এবং অন্যান্য দেশ থেকে আনা হয়েছিল সেরা এবং দক্ষ কারিগরদের।

খ্রিষ্টানদের কর্দোবা পুনর্দখলের পর মেসকিতার পশ্চিমদিকের খোলা অংশটা দেয়াল দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়, ফলে ভেতরে একটা আলো-আঁধারির অদ্ভুত পরিবেশ তৈরি হয়েছে। তার ভেতর বিভিন্ন অংশে স্থাপন করা হয়েছে নানান নামের কয়েকটা খ্রিষ্টীয় প্রার্থনা মঞ্চ। এত বড় আয়তনের ভবনে ঠিক কেন্দ্রস্থল কোনটা, বোঝা মুশকিল, তবে এদিক ওদিক ছড়ানো ছোট ছোট কয়েকটা মঞ্চ থাকলেও বড়সড় একটা প্রার্থনা মঞ্চ দেখে মনে হয়, এটিই গির্জার মূল সভাস্থল, এটার জাঁকজমকও বেশি।

বর্ণিল স্তম্ভঅরণ্যের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে পূর্বদিকে গেলে পাওয়া যায় মসজিদের মূল জায়গাটা, মেহরাব, যেখানে একসময় দাঁড়াতেন ইমাম। জায়গাটা অক্ষত এবং অপরিবর্তিত, তবে প্রায় বিশ ফুট মতো জায়গা ছেড়ে দিয়ে লোহার গ্রিল দিয়ে ঘেরা। লোকজন সেই গ্রিলের বাইরে দাঁড়িয়ে দেখছে, ছবি তুলছে সময় নিয়ে। মেহরাবের দেয়ালে মাথার ওপর রঙিন পাথরের ইসলামি কারুকাজ, আরবিতে খোদিত কোরানের বাণী। আরবি হরফের বঙ্কিম বৈচিত্রের কারণে ক্যালিগ্রাফি শব্দটি অন্তত আমার কাছে কেন যেন এই বর্ণমালার সাথে একীভূত হয়ে গেছে। মসজিদের মেহরাবের দেয়ালে প্রধানত সোনালি এবং ময়ুরকণ্ঠী নীল রংয়ের পটভূমিতে কোরানের বাণীর ক্যালিগ্রাফি এবং লতাপাতার নকশা একনজরে চোখ বুলিয়ে যাওয়ার মতো নয়, বহু সময় ধরে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে উপভোগ করার মতো। মেহরাবের সামনে থেকে ঘুরতেই এক দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় রমণী তাঁর ক্যামেরাটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে মসজিদের বর্ণিল খিলানসহ থামগুলো নিয়ে তাঁর কয়েকটা ছবি তুলে দিতে অনুরোধ করেন। উজ্জ্বল ডোরাকাটা জোড়া খিলানের অরণ্যে মঙ্গোলীয় জাতিগোষ্ঠির সেই তরুণীর ক্ষীণতনু অস্তিত্ব এতই নগণ্য দেখায় যে, আমি একই ব্যাকগ্রাউন্ড রেখে ক্লোজআপে আরও কয়েকখানা ছবি তুলে দিই।

মসজিদের মেহরাব থাকে সবসময় কেবলামুখী দেয়ালের ঠিক মাঝামাঝি জায়গায়, কর্দোবার এই বিশাল ঐতিহাসিক মসজিদের মেহরাব পূর্ব দেয়ালের ঠিক মাঝখানে নয়। ম্যাপে দেখা যায়, এটির ডান পাশে অর্থাত্ দক্ষিণ দিকে যতখানি জায়গা, উত্তর পাশে জায়গা অনেক বেশি। তার একটা কারণও আছে। খলিফা আল মানজুরের সময় মসজিদের যখন আরেক দফা সমপ্রসারণ করা হয় তখন দক্ষিণ দিকে আর বাড়ানোর মতো সুযোগ ছিল না, কারণ সেদিকে খলিফার প্রাসাদ। এতে করে ইসলামি স্থাপত্যের সুষম বৈশিষ্ট্য রক্ষা করা সম্ভব হয়নি মসজিদটিতে।

কবি আল্লামা ইকবাল ৩০-এর দশকে স্পেন ভ্রমণে এসে কর্দোবা সফর করেন। তবে সেই ভ্রমণ নিষ্কণ্টক ছিল না। তাঁকে সে দেশে যেতে হয়েছিল বিশেষ অনুমতি নিয়ে, কারণ সে-সময় মুসলমান এবং ইহুদিদের স্পেন ভ্রমণ ছিল নিষিদ্ধ। সেবারের ভ্রমণে মেসকিতা দেখতে গিয়ে তিনি কিছুটা যে আবেগাপ্লুত ছিলেন, তার প্রমাণ তিনি দিয়েছেন তাঁর 'কুর্তোবার মসজিদ' কবিতায়। কারণ এটা তাঁর কাছে কেবলই একটা ঐতিহাসিক স্থাপনা পরিদর্শন ছিল না, ছিল একধরনের তীর্থ। কবিতাটিতে এই মসজিদকে উদ্দেশ করে তিনি লেখেন :

পবিত্র তুমি শিল্পের প্রেমিক মহলে,

বিশ্বাসের মহিমা তুমি

পূত পবিত্র করেছ আন্দালুসিয়ার ভূমি...।

প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, মসজিদটির দরজা মুসলমানদের জন্য বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ইকবালই ছিলেন প্রথম মুসলমান, যাঁকে এখানে নামাজ পড়তে বিশেষ অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। দেশে দেশে বিজেতা শাসকরা ধর্মীয় উপাসনালয়কে রূপান্তরিত করেছেন আপন খেয়ালে, বিজয়ের দম্ভে, ধ্বংস করেছেন অধিকাংশ ক্ষেত্রে। আমাদের ঘরের কাছের বাবরি মসজিদের উদাহরণ তো সেদিনের ঘটনা। বিজিতের উপাসনালয়কে অবিকৃত ও অক্ষুণ্ন রেখে বিজয়ী পক্ষের অনুকূলে রূপান্তরের দৃষ্টান্ত বোধকরি কর্দোবার মেসকিতাতেই পাওয়া যায়।

এই পাতার আরো খবর -
font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেছেন, 'রাজনৈতিক দল হিসাবে কর্মকাণ্ড করার কোনো অধিকার জামায়াত রাখে না।' আপনিও কি তাই মনে করেন?
1 + 1 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
অক্টোবর - ১৯
ফজর৪:৪২
যোহর১১:৪৪
আসর৩:৫২
মাগরিব৫:৩৩
এশা৬:৪৪
সূর্যোদয় - ৫:৫৭সূর্যাস্ত - ০৫:২৮
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :