The Daily Ittefaq
ঢাকা, সোমবার ০৫ আগস্ট ২০১৩, ২১ শ্রাবণ ১৪২০ এবং ২৬ রামাযান ১৪৩৪
সর্বশেষ সংবাদ হাইকোর্টের রায় বহাল; নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না জামায়াত | আপিল করেছেন গোলাম আযম | অষ্টম মজুরি বোর্ডের সুপারিশে মন্ত্রিসভার একমত

ঈদ স্মৃতি

বাংলাদেশে ঈদোত্সব একটি অসাম্প্রদায়িক স্মৃতি

শ্যাম সুন্দর সিকদার

দুদিন পরই ঈদ। মুনতাহানার আম্মা দু-সেট জামা নিয়ে এসেছেন আমার বাসায়। স্বর্ণার সাথে খেলছিল মুনতাহানা। স্বর্ণা আমার মেয়ে। মুনতাহানা রাঙ্গামাটি সদর ইউএনও-এর মেয়ে । চাকরির সুবাদে আমি তখন রাঙ্গামাটিতে ।

এটা ২০০৩ সালের কথা। বয়সের ফারাকটা লক্ষণীয় হলেও ওরা দুজন ভালো বন্ধু। স্বর্ণার বয়স এগারো আর মুনতাহানার হয়তো পাঁচ বছর। স্কুলের সময়টুকু বাদ দিয়ে ওরা দুজন একসাথেই থাকে। আমার বাসা থেকে মুনতাহানাদের বাসা প্রায় এক কিলোমিটার দূরে। তাতে কী? পথের দূরত্বটা ওদের মনের টানের কাছে প্রতিদিনই বেমালুম হার মানে। কখনো স্বর্ণা যায় ওদের বাসায়, আবার কখনো মুনতাহানা চলে আসে। শুধু ডাক পড়ে ঘুমানোর সময়। রাতে যার যার বাসায় ফিরে গিয়ে ঘুমায়।

ওরা দুজন একসাথে খেলে। পুতুল নিয়ে খেলা। গল্পে গল্পে সময় কাটে। পড়তে পড়তে সময় কাটে। দুজনে একই শিক্ষকের কাছে নাচ শেখে। নাচের শিক্ষক সপ্তাহে তিন দিন আমার বাসায় এসে নাচ শেখায়।

ওদের বয়সের ফারাকটা বেশি করে স্পষ্ট হয় শরীরের উচ্চতায়। স্বর্ণা বেশ লম্বা। মুনতাহানাকে ওর পাশে লিলিপুট মনে হয়। এমন অসামঞ্জস্য উচ্চতার দুজন নৃত্যশিল্পী একসাথে নাচলে অন্যরকম সৌন্দর্য চোখে পড়ে।

ঈদ সামনে রেখে মুনতাহানার মা এসেছেন শপিং সেন্টার হতে। দুজনের জন্য একই রংয়ের ও একই ডিজাইনের জামা এনেছেন। মুনতা স্বর্ণার সাথেই ছিল। নতুন জামা দেখে ওরা দুজনেই ভীষণ খুশি। ঈদের খুশির জোয়ার বইতে শুরু করেছে ওদের মনে। ঈদের দিনে ওরা কোথায় যাবে, কীভাবে সময় কাটাবে, সে ভাবনায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

স্বর্ণার মাও চমক দেখায়। সে আলমিরা খুলে নতুন জামা বের করে। গতকাল সেও ওদের জন্য জামা কিনে লুকিয়ে রেখেছিল। কাউকে বলেনি, সারপ্রাইজ দেবে বলে। এবার ওদের দ্বিগুণ আনন্দ। আনন্দে আনন্দে ঘরের বাইরে লেকের পাড়ে চলে যায় ওরা। ঈদ উদযাপনবের পরিকল্পনা করতে বসে। কোন কোন বন্ধুর বাড়ি যাবে, ঠিক করে নেয়। ঈদের জন্য কয়েক দিন স্কুল বন্ধ। তাই বন্ধটা খুব মজা করে কাটাবে ওরা।

স্বর্ণার মা বলছে, ভাবি আপনার মেয়ে আর আমার মেয়ে যেন হরিহর আত্মা। একজন আরেকজনকে ছাড়া তো এক মুহূর্তও থাকতে পারে না।

ঠিকই বলেছেন বৌদি, শুধু ঘুম ছাড়া। খাওয়া-দাওয়া, খেলাধুলা, গোসল করা—সবই একসাথে করে। মুনতাহানার মা বলেন।

শুধু তা-ই নয়, স্বর্ণা যখন ফুল তুলতে যায়, তখনও সাথে যায় আপনার মেয়ে। পূজা দিতে গেলে তখনও সাথে থাকে মুনতা। পূজার উপকরণ সাজাতে স্বর্ণাকে সাহায্য করে। আমি ওদের দেখি আর মনে মনে হাসি।

স্বর্ণার মায়ের কথার সাথে যোগ করে ভাবি বলেন, এ দুটোর কাছে ঈদ আর পূজায় কোনো ভেদাভেদ নেই। আসলে ওরা তফাতটা বোঝে না। সেজন্যই আমরাও চাই ওরা এ আনন্দটা এভাবেই করুক।

একই বছরে দুর্গাপূজা এলে স্বর্ণা আগাম দাবি জানিয়ে ওর মাকে বলল, মা, পূজা আসছে। নতুন জামা কিনতে হবে। মুনতার জন্যও কিনবে কিন্তু। এমন দাবি, না মিটিয়ে কি পারা যায়? সুতরাং পূজায় মুনতাও পেল নতুন জামা। ওদিকে মুনতার আম্মাও সারপ্রাইজ দিয়েছেন। এবার পূজা উপলক্ষে আগের মতোই দুজনের জন্য নতুন জামা। ওরা দুজন পূজায় প্রতিদিনই নতুন জামা পরে মণ্ডপে গেছে। উত্সবের আনন্দে হারিয়ে গেছে। ধর্ম-বিশ্বাস সেখানে মোটেই মুখ্য ছিল না। মুখ্য ছিল বন্ধুত্ব। মিল ছিল আনন্দ খোঁজার মাঝে।

আসলে দারুণ মিল আছে স্বর্ণা ও মুনতাহানার মাঝে। সে মিল হলো মানসিকতায় ও বিশ্বাসে। ধর্ম-বিশ্বাস ওদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে না। ধর্ম বোঝেও না।

ওদের এটা উদারতা নয়। ভণিতা নয়; বরং সাবলীল ও নিষ্কলুষ ভাবনা। ওদের ভাবনায় ও বিশ্বাসে—ঈদ যেমন আমাদের উত্সব, দুর্গাপূজাও আমাদের উত্সব। সবাই মিলে আনন্দ করার জন্য ফিরে ফিরে আসে উত্সবের দিনগুলো।

ঈদ এলে নতুন জামা পাওয়া যাবে। তা একটা নয়, অন্তত কয়েকটা তো হবেই। কতটি পাওয়া যাবে হিসাবটা শেষ করতে মন চায় না। নতুন জামার আনন্দই আলাদা। আবার দুর্গাপূজা এলেও ওদের একই রকম খুশিখুশি ভাব। এজন্য ঈদ আর পূজা ওদের মনের মধ্যে কোনো আলাদা প্রভাব ফেলে না। উত্সবের দিনগুলোতে ঘুরে বেড়ানো যায়। এ-বাড়ি ও-বাড়ি গিয়ে মজার খাবার খাওয়া যায়। গল্প করা যায়। যেমন খুশি ছোটাছুটি করা যায়। বন্ধুদের সাথে বসে টিভিতে বিশেষ অনুষ্ঠান দেখা যায়। না হয় বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ানো যায়। শিশুপার্কে বেড়ানোর আনন্দ অফুরন্ত। লেকের মাঝে নৌকা ভ্রমণ—সে তো আরও মজার। এমন কত কী!

কখনো কখনো শিশুরা মহত্ চিন্তা করে। মহত্ হতেও পারে। অহিংসা পরম ধর্ম—এটা হয়তো বোঝে না। তবে সে কাজটি অবলীলায় না বুঝেও করে ফেলতে পারে ওরা। ছোটরা বড়দের চাইতে মাঝেমধ্যে বেশি বুদ্ধিমত্তা ও উদারতার প্রমাণ রাখে। আমরা এমন একটা গল্প পড়েছিলাম : The children may be wiser than their elders. সেটি আকুলকা ও মালাসার গল্প।

স্বর্ণা ও মুনতাহানা তেমনই একটি গল্প তৈরি করেছে। ওদের কারণেই ঈদ আর দুর্গাপূজার আনন্দ পরস্পর ভাগাভাগি করে নিয়েছি। সবাই মিলে একসাথে বিভিন্ন পূজা মণ্ডপে প্রতিমা দেখতে গিয়েছি। আনন্দ করেছি। একসাথে উত্সবের নানাবিধ উপলক্ষ নিয়ে মজা করেছি। উত্কৃষ্ট ও সুস্বাদু খাবার খেয়েছি। এমন অসাম্প্রদায়িক অনুভূতিতে শিশুদের উদ্বুদ্ধ করার জন্য উপযুক্ত পারিবারিক পরিবেশটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

দুই

আর একটি ঘটনা বলা প্রাসঙ্গিক মনে করি। সেটা চুয়াডাঙ্গার ঘটনা। আমার ছেলের বয়স তখন ৪ বছর। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মহোদয়ের বাসায় মিলাদ চলছিল। আমার ছেলেটি তখন গিয়েছে ওই মিলাদে। সকলেই তখন মাথায় টুপি পরেছে। আমার ছেলে বলল, তার জন্যও একটি টুপি দিতে হবে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়াল যে, টুপির দাবিতে হৈ চৈ কান্নাকাটি। ফলে মাওলানা সাহেবের পক্ষে মিলাদের দোয়া পড়া কষ্টকর। অগত্যা জরুরি ভিত্তিতে একটা টুপি তার মাথায় দিয়ে তবেই রক্ষা।

মিলাদ শেষে এ নিয়ে যত হাসাহাসি। কিন্তু বড়দের এ হাসি-ঠাট্টার অর্থ যা-ই হোক, তার চাইতে বেশি গুরুত্ববহ ছিল মিলাদের সময় ওই শিশুর মাথায় টুপি পরানো। সেখানে ধর্ম-বিশ্বাসের চাইতে তার নিষ্পাপ মনে শান্তি স্থাপন ছিল মুখ্য। পাশাপাশি, সামাজিক নিয়মে সকল ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদিই সর্বজনীন—সেটা ওই শিশু মনের অজান্তে সকলকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। আমরা লক্ষ করেছি, বড়দের মধ্যে কেউ কেউ এ সকল বিষয় ভিন্নমাত্রায় বিচার-বিশ্লেষণ করে থাকে। সেটা শুধু অর্থহীনই নয়; অশান্তির উত্সও হতে পারে।

আমি যখন কলেজ-ছাত্র ছিলাম, তখন পুরো রমজান মাসে ইফতারের সময় সব বন্ধু মিলে ইফতার করতাম। কিন্তু দিনের বেলায় প্রকাশ্যে কখনো কিছু খেতাম না। সেটা রমজান মাসের পবিত্রতা বজায় রাখার জন্য। সংযমের জন্য। সিয়াম সাধনার প্রতি সম্মান দেখানোর জন্য। আমার এমন স্বভাবের কথা শুনে এক বন্ধু একটা গল্প বললেন। গল্পটি এমন—

কোনো এক রমজান মাসে এক বিশিষ্ট হিন্দু লোক তার শিশু ছেলেকে প্রকাশ্যে রাস্তায় দাঁড়িয়ে মোয়া খেতে দেখেন। তখন ছেলেকে সতর্ক করে বলেন, এখন রমজান মাস। এভাবে প্রকাশ্যে কোনো খাবার খেতে নেই। তাড়াতাড়ি ঘরে ফিরে যাও। ঘরে গিয়ে বসে খাও। ধর্মের বিশ্বাস কিংবা অনুশাসন যা-ই থাক না কেন, ছেলেকে ওইটুকু সতর্ক করে দেবার জন্য নাকি লোকটির বেশ খানিকটা পাপমোচন হতে পারে।

গল্পের শেষ ওখানেই। আমার অভিমত হলো : গল্পের শিক্ষা এই যে, অন্যের প্রতি, অন্য ধর্ম-বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকাটাই গুরুত্বপূর্ণ। এতে সম্প্রীতি বাড়ে। শান্তি আসে ।

বাংলাদেশে ধর্ম যার যার, কিন্তু উত্সব সবার। এমন বিশ্বাস রাখেন প্রায় সকলেই। দুর্গাপূজা, ঈদ, বড়দিন, বিজু, বৈষাবী ইত্যাদি উত্সবগুলোতে সম্প্রীতির অতুলনীয় প্রমাণ পাওয়া যায় । পহেলা বৈশাখে বাঙালি হয়ে যায় মহামিলনের ও ঐক্যের অদ্বিতীয় প্রতীক, যা সর্বজনীনতায় ভরপুর।

ঈদ আর রমজান। এ দুটো শব্দের সাথে আমার স্মৃতিতে আরও দু-একটা ঘটনা অম্লান। আমি ঝিনাইদহে কর্মরত থাকাকালে একসাথে প্রায় বারো-শ লোকের ইফতার ও ডিনার আয়োজন করার সুযোগ হয়েছিল। সকল কাজকর্ম অন্যসব লোকেরা করলেও তদারকির দায়িত্বটি পেয়ে আমার এক অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা সঞ্চিত হয়। এত শৃঙ্খলার সাথে কোনো অনুষ্ঠান আয়োজন করা যায়, সেটা আমি ওখান থেকেই শিখেছি।

এটা যেন ম্যাজিকের মতো কোনো বিষয়। তাছাড়া বাগানবাড়ির ফাঁকে ফাঁকে আলো ঝলমল পরিবেশে যেন স্বর্গীয় দীপ্তিময় এক আয়োজন। আমন্ত্রিত মেহমান সকলেই এ আয়োজনের তারিফ করেছিলেন ।

আমার এ অভিজ্ঞতা দিয়ে অনুরূপ ইফতার আয়োজন করেছিলাম রাঙ্গামাটিতে। ঈর্ষান্বিত কিছু লোকজনের ইন্ধনে পরদিন পত্রিকায় শিরোনাম হয়েছিল 'রাজকীয় ইফতার'। সে যা-ই হোক, আমার ভালো লাগার বিষয় হলো— অনুষ্ঠানটি খুবই ছিমছাম এবং অত্যন্ত শৃঙ্খলার সাথে সম্পন্ন হয়েছিল। আমার কাছে ওটার ভিন্নমাত্রা ছিল। তা হলো, আমন্ত্রিত অতিথিদের অংশগ্রহণে সর্বজনীনতা ছিল চোখে পড়ার মতো। সেজন্যই বলি—ঈদ, পূজা বা বৈষাবী বা বিজু কিংবা বড়দিন উত্সবে বাঙালিরা অসাম্প্রদায়িক।

এ সকল অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে প্রজম্ম থেকে প্রজন্মে আমরা অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মেলবন্ধন সৃষ্টি করতে পারি। বাংলাদেশে সেরকম আয়োজন বিদ্যমান রয়েছে। বাংলাদেশের মানুষ এমন দৃষ্টান্ত স্থাপনে বিশ্ব দরবারে এক ধাপ এগিয়ে রয়েছে।

এই পাতার আরো খবর -
font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেছেন, 'রাজনৈতিক দল হিসাবে কর্মকাণ্ড করার কোনো অধিকার জামায়াত রাখে না।' আপনিও কি তাই মনে করেন?
1 + 1 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
অক্টোবর - ১৯
ফজর৪:৪২
যোহর১১:৪৪
আসর৩:৫২
মাগরিব৫:৩৩
এশা৬:৪৪
সূর্যোদয় - ৫:৫৭সূর্যাস্ত - ০৫:২৮
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :