The Daily Ittefaq
ঢাকা, সোমবার ০৫ আগস্ট ২০১৩, ২১ শ্রাবণ ১৪২০ এবং ২৬ রামাযান ১৪৩৪
সর্বশেষ সংবাদ হাইকোর্টের রায় বহাল; নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না জামায়াত | আপিল করেছেন গোলাম আযম | অষ্টম মজুরি বোর্ডের সুপারিশে মন্ত্রিসভার একমত

বিনোদন

অতি আত্মপ্রচারে এখন তারকা ইমেজের আত্মহত্যা চলছে!

তানভীর তারেক

হাতের কাছেই অস্থির রিমোট, বাটনে শতেক চ্যানেল। দর্শকদের অস্থির চোখ। এরপরও দেশীয় চ্যানেলগুলো, বিশেষত নাটক ও অন্যান্য অনুষ্ঠানাদি, কেন সেই অর্থে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে না সেটাই এখন বড় প্রশ্ন অনেকের কাছে। প্রিয় পাঠক, আপনি কি মনে করতে পারেন শেষ কবে দেশীয় একটি টিভি অনুষ্ঠান দেখা জন্য আকুল হয়ে সব কাজ ফেলে টিভি সেটের সামনে বসেছেন। জানি গড়পড়তায় সব উত্তর আসবে 'না'। আপনি নিজেই নিজেকে একটু প্রশ্ন করে দেখুন, 'কোথাও কেউ নেই' নাটকের পর নাটকের চরিত্র নিয়ে কোনো মিছিলের ঘটনা ঘটেছে?

বরং এর উল্টো দৃশ্যপট দেখা গেছে। এখন ঘর থেকে বেরুলেই দেয়ালে দেয়ালে নাটকের পোস্টার। অমুক নাটক দেখুন অমুক চ্যানেলে। সারাদেশে কিন্তু কোনো পোস্টার নেই। শুধু যেই চ্যানেলে নাটকটি প্রচার হবে বা হবার সমূহ সম্ভাবনা আছে, সেই চ্যানেলের দেয়ালে সাঁটানো পোস্টার। যাতে চ্যানেল মালিক ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে পড়ে! কী অদ্ভুত প্রক্রিয়া। এরপরও তেমন কোনো আগ্রহ যেন নেই বাংলা নাটকে।

এ ছাড়াও বিভিন্ন চ্যানেলে এখন সারাবছর ব্যাপী হরেক রকমের রিয়েলিটি শো অনুষ্ঠিত হচ্ছে মহাসমারোহে। বিশাল সাইজের বিলবোর্ডে নিজেই নিজেদের মহাতারকা খেতাব দিয়ে বসে আছেন। বর্তমানে গড় হিসাবে রিয়েলিটি শো প্রক্রিয়ায় ১০০ জন 'তারকা' নামের এই শোবিজ শ্রমিক আসেন মিডিয়াতে। এদের পোস্টারও ইদানীং দেখা যায় শহরজুড়ে। ভোট দিন অমুককে। আমাদের অমুক এলাকার ছেলেকে জয়জুক্ত করুন। যেন নির্বাচন লেগেই আছে সারাদেশে সারাক্ষণ!

ওপরের এই দুটি বিষয় নিয়েই নন্দিত নির্মাতা হানিফ সংকেতের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান 'ইত্যাদি' তে একাধিক স্কিড প্রচারিত হয়েছে। প্রশ্নটা যখন তার কাছে করি তখন হানিফ সংকেত বলেন, 'আমাদের রিয়েলিটি শোগুলো হওয়া উচিত তার নিজের ক্যারিয়ার-বান্ধব। এই জাতির সবাইকেই গায়ক হতে হবে—এমন কথা কে কাকে বলেছে? পোশাক-শ্রমিক, নির্মাণ-শ্রমিক সবাইকে কেন গানে প্রতিভা দেখাতে হবে? এর চাইতে বড় ট্রাজেডি তো হতে পারে না। একজন পোশাক-শ্রমিক তার পোশাকের সেরা ডিজাইন বা কাজে দক্ষতার বিচারে রিয়েলিটি শো হতে পারে। কিন্তু তা না করে এখন এদেশে সবাইকে গানের প্রতিযোগিতা করতে হবে।'

এমন নানারকম অস্থির প্রক্রিয়ার ভেতরেই এখন চলছে আমাদের শোবিজ ইন্ডাস্ট্রি।

এছাড়া নাটকের চাহিদা বা দর্শকদের আকর্ষণের জায়গায় নাটক থাকছে না, সেটিও এখন অনেক বড় প্রশ্ন। কিছুদিন আগে কলকাতায় জি বাংলা ও স্টার জলসা চ্যানেলে গিয়েছিলাম। কেন তাদের নাটকগুলো জনপ্রিয় বা অনুষ্ঠানগুলো কেনই বা এত আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে যা এপার-ওপার দুই বাংলায় আলোচনা তৈরি করে, সেই উত্তর খুঁজতে। স্টার জলসা-র অনুষ্ঠান প্রধান রেশমী রায় আমার দীর্ঘদিনের পরিচিত। এছাড়া এই চ্যানেলে সৌভিক, রানাসহ বেশ কজন সুহূদের সাথে বেশ কয়েকবছর ধরেই যোগাযোগ রয়েছে। তারা বললেন, 'আমরা যেহেতু পুরোটাই অনুষ্ঠাননির্ভর চ্যানেল, কোনো নিউজ বা রাজনৈতিক কোনো খবর নেই। তাই আমারা নিজেরাই আগে টার্গেট অডিয়েন্স তৈরি করি। একটা আলাদা গবেষণা টিম আছে যারা বিভিন্ন এলাকায় একটা জরিপ চালায়। বিভিন্ন শ্রেণীপেশার মানুষের বাড়িতে গিয়ে গিয়ে।'

এখানেই একটু থামি। প্রিয় পাঠক, আপনার কি এমন কোনো স্মৃতি আছে এই জীবনে যে কোনো চ্যানেলের গবেষণা টিম আপনার দরজায় এসেছে, কোনোদিন কলিংবেল চেপেছে? এখানেই জানি উত্তর সেই 'না' সূচক-ই আসবে।

প্রশ্নগুলো এখানেই তৈরি হয়। বিভিন্ন দেশে অনুষ্ঠানের ধারা বা পরিকল্পনার সিঁড়ি তৈরি হয় এভাবে। প্রথমে আইডিয়া জমা দেন প্রডিউসারবৃন্দ, অতঃপর তা নিয়ে দর্শক-চাহিদার কথা বিবেচনা করা হয়, এরপর স্পন্সর টার্গেট করে তাদেরকে প্রস্তাব দেওয়া হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, আমাদের দেশে পুরো প্রক্রিয়াটিই সম্পন্ন হয় একেবারে উল্টোভাবে। অর্থাত্ অধিকাংশ অনুষ্ঠান প্রধানের চিন্তা থাকে দর্শক নয়, আমার কোন অনুষ্ঠানটি কোন স্পন্সরকে বেশি খুশি করবে, সেই চেষ্টাতেই থাকেন। ফলে ক্রমাগত দর্শকেরা দুরে সরে যাচ্ছেন তাদের প্রিয় চ্যানেল থেকে।

এ প্রসঙ্গে অনুষ্ঠান নির্মাতা ও উপস্থাপক আব্দুন নূর তুষারের সাথে কথা হয়। তিনি বলেন, 'আমি নিজেও এই গবেষণা টিমের প্রয়োজনীয়তা দেখি। এছাড়া আমাদের অনুষ্ঠানের মান ও চাহিদা বাড়ানো সম্ভব নয়। কারণ আমরা এখানে রাজনৈতিক দলের মতো দর্শকদের কাছ থেকে অনেক দূরের অবস্থানে রয়েছি। আমি নিজেও একসময় উদ্যোগ নিয়েছিলাম ব্যক্তিগত উদ্যোগে একটি জরিপ চালানোর। কিন্তু পরে তা চ্যানেল কর্তৃপক্ষের অনাগ্রহের কারণে বন্ধ করতে হয়েছে।'

তারকাদের সম্বোধন প্রক্রিয়া ও ইমেজ ব্র্যান্ডিং বিভ্রাট

চ্যানেলগুলো এখন তাদের তরুণী উপস্থাপকদের দিয়ে—গতকাল মিডিয়ায় আসা তরুণ-তরুণীকে অবলীলায় বলে ফেলেন স্টার, সুপারস্টার বা মেগাস্টার। যথার্থ উচ্চারণে যেমন এই তরুণ উপস্থাপকেরাও সম্বোধন করছেন না, ঠিক তেমনি তারকাদের ইমেজ ব্র্যান্ডিং-এর কাজে বড় বড় মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানিগুলোও খুব একটা কাজ করছে না। সর্বশেষ আশার খবর হলো, আমাদের দেশে প্রায় এক যুগ পর লাক্স ফটোসুন্দরীর কোনো মডেল তাদের টিভিসি'র সুযোগ পেলেন। সেই ভাগ্যবতী মডেলের নাম মেহজাবিন।

দীর্ঘদিন পর বাংলাদেশি সুপার মডেলদের যেন আক্ষেপের দিন শেষ হলো। টানা প্রায় ১ যুগেরও বেশি সময় পর ছোট পর্দায় লাক্সের কোনো মডেল হলেন বাংলাদেশি তারকা। মূলত একটি পাক্ষিক ম্যাগাজিনের কাছ থেকে একটি স্যাটেলাইট চ্যানেলে দেশের সবচেয়ে বড় রিয়েলিটি শো আয়োজন স্থানান্তরিত হওয়ার পর থেকেই কোনো লাক্স তারকাকে লাক্সের মডেল হিসেবে দেখা যায়নি। বরং উল্টো বাংলাদেশি লাক্স তারকারা শুধুই নামে মাত্র সেরার মুকুটটি পরেছেন। বিনিময়ে প্রতিবছর মিডিয়া তাদের নিজ দায়িত্বে কাভারেজ দিয়েছে মাত্র। অথচ দেশে বিলবোর্ড, টিভিসি, পেপার অ্যাডসহ সবকিছুতেই দখল ছিল কখনো ঐশ্বরিয়া বা শাহরুখ, ক্যাটরিনা কিংবা প্রিয়াঙ্কা চোপড়ার। বাংলাদেশি লাক্স সুন্দরীরা ছিল যেন নামে মাত্র প্রতিনিধি। এ নিয়ে ইত্তেফাক বিনোদন প্রতিদিনে দীর্ঘদিন ধরেই লেখালেখি হয়েছে। বেশ কয়েকটি সেমিনারেও বিনোদন সাংবাদিকেরা সোচ্চার প্রতিবাদ জানিয়েছেন, লাক্স সুন্দরী নির্বাচিত হওয়ার পরও তার ইমেজ প্রমোশন নেই কেন। কেন সেই প্রোডাক্টের বিজ্ঞাপনে থাকবে না বাংলাদেশি তারকারা। মূলত এইসব কারণেই লাক্স তারকারা ছিলেন অনেকাংশেই দুর্ভাগা। আর নব্বইয়ের দশকের তারকারা ছিলেন অনেক সৌভাগ্যৗবান। কারণ, প্রথমত তখন কোনো স্যাটেলাইট চ্যানেলের ভিড় ছিল না, ছিল না এত এত কর্পোরেট ব্র্যান্ডিং নামক শব্দের যথেচ্ছাচার। ফলে একজন সুপারমডেল খুব দ্রুতই তার ইমেজকে দেশের শীর্ষ তারকার আসনে নিয়ে যেতে পারতেন লাক্স সুন্দরীর মুকুটের বিনিময়ে। কিন্তু এরপর দীর্ঘ কয়েকবছর ধরে এই রিয়েলিটি শো-র কোনো তারকা সুযোগ না পাওয়ায় গেল কয়েক বছরের লাক্স তারকারা ব্র্যান্ডিংয়ের চেয়ে নিজেদের গুণে টিকে ছিলেন কঠিন পরীক্ষায়—বিশাল স্যাটেলাইট সমুদ্রে। সেদিক দিয়ে আকাশ সমান ভাগ্যই যেন মেহজাবিনের। কারণ, দীর্ঘ কয়েকবছরের বলয় ভাঙছে তার মাধ্যমে। লাক্স মডেল হিসেবে এবারে বাংলাদেশি তারকার নাম আসছে তার মাধ্যমে। এক্ষেত্রে মম, শানু বা তার পূর্বসূরিরা কিছুটা আক্ষেপ করতেই পারেন। তবুও এটা অনেক বড় সুসংবাদ যে, বাংলাদেশি মডেল হিসেবে আবারও লাক্স তারকার ব্র্যান্ডিং হতে যাচ্ছে। ছোট পর্দার নান্দনিক বিজ্ঞাপনে শোভা পাচ্ছেন এখন মেহজাবিন।

টানা তিনমাস ধরেই নাকি এই পরিকল্পনা চলেছে। ভারতীয় নির্মাতা বিশাল মঙ্গেশকার নির্মাণ করেছেন মেহজাবিনকে নিয়ে এই নান্দনিক বিজ্ঞাপনটি। এ ছাড়াও বাংলাদেশি বিলবোর্ডেও ভিনদেশি মডেল সরিয়ে এবারে উঠবে বাংলাদেশি তারকা। মুম্বাই স্টুডিওতে তৈরি হওয়া এই লাক্সের বিজ্ঞাপন যেন শুধু মেহজাবিনের প্রাপ্তি নয়। গোটা বাংলাদেশি স্বপ্নভুক মডেলদের জন্য অনেক বড় একটি বিজয়। পেপার অ্যাড, বিলবোর্ড ও টিভিসি সবকিছুতেই থাকবে এবার মেহজাবিন। দীর্ঘ ২ বছরের এই কন্ট্রাক্টে আরও কিছু নিত্যনতুন পরিকল্পনাও রয়েছে বলে জানান মেহজাবিন। নতুন করে রেকর্ড গড়ার খুশিতে তাই আত্মহারা হতেই পারেন তিনি। দেশীয় তারকার ইমেজ ব্র্যান্ডিংয়ের জন্য এর চেয়ে আর বড় প্রাপ্তিযোগ কী হতে পারে। সত্যিকার অর্থেই আবারও লাক্স সুন্দরীর মুকুটটা যেন অভাবনীয় সুখস্বপ্নের প্রতীকে পরিণত হলো। ধন্যবাদ তাই ইউনিলিভারকে নতুন এই সিদ্ধান্তের জন্য। একাধিক ইন্টারভিউতে মেহজাবিন বলেছেন, 'অনেক অ্যাপ্রিশিয়েশন পাচ্ছি এই বিজ্ঞাপনটি করে। আমি তো ছেলেবেলা থেকেই দেশের বাইরে ছিলাম। দীর্ঘদিন পর দেশে এসে স্রেফ পাগলামি থেকেই লাক্সে ছবি দিয়েছিলাম। সেই থেকে সেরা হব ভাবিনি। এরপর মাস তিনেক আগে যখন তারা আমার সাথে এই বিজ্ঞাপনটি করবে বলে জানাল তখন সত্যিই খুব গর্বিত লাগছিল নিজেকে। তখনই জানলাম, সর্বশেষ অপি আপু নাকি কাজ করেছিলেন কোনো লাক্সের বিজ্ঞাপনে। তাই আমি বলব, এটা শুধু আমার একার বিজয় নয়, গোটা বাংলাদেশি শোবিজ ইন্ডাস্ট্রির জয় হয়েছে।

তাই এই ছোট ছোট জয়গুলোই পারে আমাদের মিডিয়াকে সমৃদ্ধ করতে। অতি আত্মপ্রচার করে নিজের ঢোল শুধু পেটালেই চলবে না, মৌলিক কিছু না থাকলে তা দর্শকেরা খুব দ্রুতই ফেলে দিতে পারে আস্তাকুঁড়ে। তখন হয়তো বারবার কলিংবেল চেপেও আপনাদের অনুষ্ঠান দেখাতে পারবেন না। তাই এই অতি আত্মপ্রচারে নিজেদের ইমেজের আত্মহত্যাটা বন্ধ করুন।

এই পাতার আরো খবর -
font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেছেন, 'রাজনৈতিক দল হিসাবে কর্মকাণ্ড করার কোনো অধিকার জামায়াত রাখে না।' আপনিও কি তাই মনে করেন?
6 + 2 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
সেপ্টেম্বর - ১৮
ফজর৪:২৯
যোহর১১:৫৩
আসর৪:১৭
মাগরিব৬:০৩
এশা৭:১৬
সূর্যোদয় - ৫:৪৫সূর্যাস্ত - ০৫:৫৮
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :