The Daily Ittefaq
ঢাকা, সোমবার ০৫ আগস্ট ২০১৩, ২১ শ্রাবণ ১৪২০ এবং ২৬ রামাযান ১৪৩৪
সর্বশেষ সংবাদ হাইকোর্টের রায় বহাল; নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না জামায়াত | আপিল করেছেন গোলাম আযম | অষ্টম মজুরি বোর্ডের সুপারিশে মন্ত্রিসভার একমত

কবিতা

এই ভালো এই তবে ভালো

সৈয়দ শামসুল হক

তোমার সময় যদি সদাশয় হে ঈশ্বর হয়

আমাদের ঘরে এসো একবার দু'এক মিনিট।

লাবণ্যের চুল আজও সুবাসিত তেলে গন্ধময়—

যদিও দালান ভাঙা, কী নির্মল হাসে ন্যাংটো ইট।

তবুও যখন তুমি পূর্ণিমার চাঁদ তুলে ধরো,

যখন মাখিয়ে দাও পৃথিবীর আননে মাখন—

তখন যদিও শ্বাস বন্ধপ্রায়, প্রাণ মরো-মরো,

আমার মাটির থালা হয়ে ওঠে সোনার বাসন,

ভরে যায় ভোরের ফুলের মতো জুঁইশুভ্র ভাতে,

বন্ধ টিপকল থেকে বের হয় অমৃতের ধারা—

জীবনের গ্রাস ওঠে তখনই তো এই শীর্ণ হাতে!

এমন পরানকথা আমাদের করে আত্মহারা।

একবার দেখে যেও— যদি পারো— ভুবন ঈশ্বর!

অথবা ঈশ্বর নও— কবিদেরই তুমি কণ্ঠস্বর



শম নেই শান্তি নেই বৈঠা পড়ে— এখনো বৈঠায়—

একদা উদ্দেশ দেয় সোনা খড়ে ছাওয়া যে কুটির।

হূদয়ে তুমুল জল খেলা করে জোয়ার ও ভাটায়—

ঝলমল স্বপ্ন দেখি শুক্লপক্ষ জরির বুটির।

এখনো পাইনি তল, নদী জলে ঝুঁকে পড়া গাছ,

সাপের মাথার মণি, পড়ে আছে উধাও পরির

খসে পড়া স্বচ্ছ বাস, ঘাই দেয় রূপবতী মাছ—

ওতেই যে ঢেউ ওঠে— তোলপাড় নদীর গভীর।

জীবনের এইসব মেধাবীতে যাবার ইচ্ছায়

এখনো ভাঙছি জল, কত জল কতকাল থেকে—

মিঠে কি নুনের জল— অন্ধকারে ঢাকা দিকছায়—

খাতার পাতায় শুধু আজও হাতে কলমটি রেখে—

মধ্যরাত— লিখে যাচ্ছি— পৃথিবীর কোনো গল্প শেষ

এখনো হবার নয়— অথবা এ কবিতা বিশেষ

সোনার নূপুর বেজে যায়

রফিক আজাদ

এখন তো বৃষ্টিতে ভেজার বয়স আমার নেই

সাহসও তো নেই—

আষাঢ় মাসের এ-সময়ে অঝোর ধারায় শুনি

সোনার নূপুর বেজে যায়, বাজে অনাদি ঘুঙুর;

আনন্দে আপ্লুত গাছগাছালির পল্লব-পত্রালি

আন্দোলিত হতে দেখি, যেন পুন কালিদাস-কাল

সমাগত!—পত্রেপুষ্পে সুশোভিত প্রিয় বৃক্ষরাজি

অপার আহ্লাদে ভিজছে... শুনি ফুল্ল আনন্দভৈরবী!

বাঙ্গালার নরনারীগণ বুঝি সুখে নিদ্রা যায়

উন্মুখর আনন্দ-বর্ষণে!—বর্ষা আজ সর্বব্যাপী

মানুষে ও ধরাধামে; বৃষ্টি ঝরে ময়ূর-আনন্দে।

মেঘের গর্জনে, জানি, সুদৃশ্য পেখম খুলে নাচে

মহানন্দে ময়ূরেরা; এই ক্ষণে এক্ষেত্রে ব্যত্যয় :

ত্রিভুবন জুড়ে মেঘেরাই নেচে যায় ময়ূরের

বিকল্প কলাপে!—এই বুঝি বাঙ্গালার সুনিশ্চিত

নিজস্ব নিয়ম; ধরাধামে বৃষ্টির বিকল্প নেই—

বৃষ্টি দেবে সবকিছু ঢেলে তোমার দু'হাত ভ'রে

জীবনে ও শস্যক্ষেত্রে—কিন্তু, নিতে তুমি পারবে কি

সেই অযাচিত ধন—আছে কি সে ধারণ ক্ষমতা?

বর্ষা বড় ঋদ্ধ ঋতু,—দ্রবীভূত করে, এমনকি,

জল্লাদেরও মন; মাঙ্গলিক এই ঋতু বিশুষ্কতা

প্রত্যাখান ক'রে আর্দ্র করে হূদয়-মনন-মেধা!।

ভ্রমণকাহিনী

মহাদেব সাহা

আমি সব ভিসা অফিসের অনলাইন তোমার জন্য

খোলা রেখেছি

তুমি পৃথিবীর যে-কোনো শহরে ঘুরে বেড়াতে পার;

আমি বহুদিন ভিসার জন্য দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ক্লান্ত

তুমি যাও আমি চুপচাপ বসে থাকি।

কোথায় ঘুরবো আমি, শহরগুলো সব ডিশলাইনের বিজ্ঞাপন

পৃথিবীর বেশিরভাগ নদী এখন ঘুমের দেশের মতো

পাহাড়গুলো এতো নির্জন যে সেদিকে বেশিক্ষণ তাকানো যায় না;

হয়তো শিশুর মতো তোমার এখনো সবকিছু দেখতে ইচ্ছে করে

আমার ছোটাছুটির কথা শুনলেই দম আটকে আসে,

শিশুর মতো বেড়াতে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে

আমার কান্না থামাতে পারবে না।

তুমি যাও পাহাড় লেক সমুদ্র দেখতে থাকো

আমি ততোক্ষণ একলা একলা ঘুমাই;

তুমি যেখানে যেতে চাও যাও, উড়তে উড়তে

ব্রিটিশ কলম্বিয়া

এই শহর নদী আকাশ

তোমার চোখেই দেখবো আমি প্রিয়া।

গহনা

কাজী রোজী

এক পুকুর শান্ত জলে নারী তার মুখ খুঁজেছিল।

গহনায় ঢাকা ছিল তার সবটাই।

আকাশ গহনা খুলে দিল

ঝরে গেল মেঘ,

চাঁদ গহনা খুলে দিল

গলে গেল জ্যোত্স্না,

নারীও খুলে দিল সকল গহনা তার

হয়ে গেল শুধুই নারী।

নারী আকাশকে দিল তার গহনা...

চাঁদকে দিল রাতের গহনা।

পুরুষ নারীকে দিল যুদ্ধের গহনা...

জীবনকে দিল রক্তের গহনা।

এখন নারী মানে নিরাভরণ আকাশের সূর্য পুরুষ

পুরুষ মানে যুদ্ধের গহনা খোলা নারীর জীবন।

এখন পুরুষের গহনা আদিত্য পুরুষ।

নারীর গহনা শৈল্পিক নারী।

ঋতু অবুঝ ফাগুন

ফজল-এ-খোদা

মেয়েটিকে আমার খুব পছন্দ, ভালো লাগে বেশ!

চাই মেয়েটির সাথে ভাব করি, সময় কাটাই

স্ত্রীর এতে একটুও মত নেই

ভীষণ আপত্তি।

কিন্তু মেয়েটির কোনও অমত নেই

একটু আপত্তি গোপন গোপন এই খেলা;

কী করবো? আমার যে ইচ্ছে করে।

স্ত্রীকে আমি দারুণরকম ভালোবাসি

তারপরও এমন হয়

ইচ্ছেরা বেয়াড়া বড়ো!

ইচ্ছে, শুভ-অশুভের পার্থক্য বোঝে না

এখন বসন্ত; ফাগুনের এ কেমন ব্যবহার!

লোকযোদ্ধারা

মুহম্মদ নূরুল হুদা

কাল রাত ছিল লোকযোদ্ধার রাত

কাল রাত ছিল লোকযোদ্ধার স্মৃতি,

রাতে ও স্মৃতিতে তফাত কী আর বলো?

জনযুদ্ধের ইতিহাসে সুকৃতি।

রাত যদি আসে সূর্যের তিরোভাবে,

সূর্য কি চির তিরোহিত হতে জানে?

রাত যদি আসে রক্তে বীরের খাপে,

সূর্য-শোণিত জানে মুক্তির মানে।

লক্ষ বছর চিনেছে নিজেকে নিজে,

লোকযোদ্ধার মননে বিবর্তন;

জয়ে-পরাজয়ে রোদে-বৃষ্টিতে ভিজে

লোকযোদ্ধারা জনে জনে অগণন।

পঁচিশে মার্চে কালরাতও চেনে তাকে

শহীদ, গাজী ও মুক্তির সৈনিক,

স্বাধীনতা ডাকে সূর্যশোণিত বাঁকে

মুক্তমানব বার্তা যে দৈনিক।

পঁচিশে মার্চে তেমনি অবাক রাতে

বাঙালিরা জেতে লোকযুদ্ধের বাজি,

গণহত্যার রক্ত পেরিয়ে প্রাতে

ভণ্ডুল সব হন্তার কারসাজি।

দিন এসেছিলো দিন এসেছিলো দিন

দিন তো যায়নি দিন তো যায়নি দিন

দিন থাকবেই দিন থাকবেই দিন

রাত কেটে গেলে কেটে যায় দুর্দিন

লোকযোদ্ধারা আঁধারে হয় না লীন

লোকযোদ্ধারা চিরপরাজয়হীন

লোকযোদ্ধারা রাতকে বানায় দিন

লোকযোদ্ধারা আনে রাতহীন দিন

স্বাধীনতা মানে পরাধীনতা তো নয়

স্বাধীন আকাশে লোকযোদ্ধার বাতি

স্বাধীনতা মানে লোকযোদ্ধার জয়

বাঙালিরা সেই লোকযোদ্ধার জাতি

অপয়া

মাকিদ হায়দার

উনিশ কুড়িটি কানমলা

বাইশ তেইশটি নাকে খত

এমনকি সাতাশ আটাশটি জুতার বাড়ি

খাইবার পরেও আমার মনে হয় নাই

কেহ আমাকে অপমান করিল।

যিনি উহা করিয়াছিলেন

তিনি কিছুক্ষণ আগে আসিয়া আমার নিকট হইতে

ক্ষমা প্রার্থনা করিয়া গিয়াছেন।

ক্ষমা যে মহত্ত্বের লক্ষণ তাহা মানিতে

আমি মোটেই প্রস্তুত নহি,

কেননা, সেদিন আমাকে যেভাবে

প্রকাশ্য দিবালোকে

এমনকি, জনসমক্ষে জুতা দিয়া প্রহার করিয়াছিলেন

তাহার দূর সম্পর্কের এক ভগ্নিপতি,

সেই প্রহারে,

আমার সমস্ত শরীর ক্ষত বিক্ষত হইবার পর পরই, আমার

যে ব্যাথা শুরু হইয়াছিল তাহা

সত্যিকারেই কল্পনাতীত।

ইহার পরেও সেই ষণ্ডামার্কা, ভগ্নিপতিকে গতকল্য

আমাকেই ক্ষমা করিতে হইল।

কেননা ষণ্ডার স্ত্রী,

উম্মে কুলসুমের দূর সম্পর্কের ভগিনী।

একদিন দুপুর বেলায়

কুলসুম আমার দুই হাত দুই পা জড়াইয়া ধরিয়া বলিয়াছিল

আমি যেন তাহাকে ভুলিয়া না যাই।

আমাদের প্রেম, ভালোবাসা,

যেন তাজমহলের মতো চিরদিন অটুট থাকে।

তোমাকে বলিতে আজ আমার কোনো দ্বিধা নাই

পিতৃগৃহ, আমার জন্য চিরতরে রুদ্ধ হইয়া যাইবে,

যদি চিঠি আর সেই একত্রে তোলা স্টুডিওর ফটোগ্রাফখানি

ফেরত না দাও।

সরলমতী নারী, বুঝিতে পারে নাই ফটোগ্রাফ হইতে

অজস্র ফটোগ্রাফ করা যাইতে পারে।

তখনি, আমার মনে হইল ক্ষমা মহত্ত্বের লক্ষণ।

তাড়াতাড়ি চিঠি এবং সেই ফটোগ্রাফটি উম্মের হস্তে সমর্পণের পর পরই

নিজের উদারতাকে আকাশের সহিত তুলনা করিলাম নিজে, নিজে।

ক্ষমা করিবার পর হঠাত্ দেখিতে পাইলাম

উম্মে কুলসুমের দূর সম্পর্কের সেই ভগ্নিপতিটিকে।

তিনি আমাকে দেখিয়া মৃদু মৃদু হাসিতে লাগিলেন।

তাহার পর হইতে স্থির করিয়াছি আর কোনোদিনই কোনো

উম্মে কুলসুমকে বিশ্বাস করিব না।

দানবীয়

আবুবকর সিদ্দিক

কাল রাতে দ'লে পিষে গেছে এক বিকট দানব।

জমিজিরাত দলিল পর্চা পড়ে আছে তচনচ।

পশ্চিম আকাশে তার ধূসর পশম লেগে আছে।

উত্তরে খরার জ্বলন। যুবকেরা গাঁটরি বাঁধে,

চলে যাবে অগস্ত্যযাত্রায়। গর্ভিণী বধূরা চেপে রাখে

প্রসবের ব্যথা। শ্বাপদেরা বেরিয়ে এসেছে বন ছেড়ে।

বৃদ্ধেরা ত্রাণের কথা বলে।

দোয়া পড়ে ইমাম সাহেব।

অপরাধ, পাপ ও বিবেক

সহঅবস্থান করে যাবে চিরকাল।

সাদা পাতাগুলো

শিহাব সরকার

কী পড়ছি অতো মনোযোগে

লেখা নেই কাটাকুটি নেই দাগ নেই

ওটা ধুধু সাদা পাতা

নিঃস্ব মানুষের জীবন যেমন, শূন্য সাদা।

সাদা পাতা বলে কিছু নেই আসলে

পাগলের অপবাদ নিয়ে ঘুরি

সাদা পাতা বলে কিছু নেই,

ভেতরের চোখ দিয়ে বাস্তব দেখা যায়।

কোথায় সেই তীব্র চক্ষুজোড়া

পাতার ভেতরে আরো কত পাতা

জন্ম-মৃত্যুর ভবিষ্যদ্বাণী, কত ইতিহাস

আলতো হাত ছিন্ন পাণ্ডুলিপি-পৃষ্ঠায়।

সাদা পাতার ওপাশে সত্য-গূঢ় ছবি

বয়স বাড়ে, সাদা পাতাগুলো আরো সাদা

গ্রন্থাবলী থেকে অক্ষর মুছে আসে,

কথা হারায়, রং মুছে যায়।

আমার আছে পাতা, ধুধু সাদা।

দাহ্যখ্যাতি

ফারুক মাহমুদ

চেয়েছি, তোমাকে বলি—পোড়ামুখী, পথে পথে কেন

কাঁটা কুণ্ঠা অগ্নি আর্তি দগ্ধতার প্রখর প্রকোপ

ছড়িয়ে দিয়েছ সুখে। ভালোবাসাবশত বলেছি—

তোমার বাগানে যেন বারো মাস রঙিন বাতাস...

চেয়েছি, তোমাকে বলি—পুনশ্চটা গল্প হবে কেন

গল্প তো তোমার ঠোঁটে, অবজ্ঞার এত রাত্রিদিন

থামিয়ে দিয়েছ ঘড়ি! ভালোবাসাবশত বলেছি—

তোমার পায়ের শব্দ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম গান

চেয়েছি, তোমাকে বলি—যার হাতে গুঁজে দিলে হাত

সে তোমার বাড়া ভাতে ভরসা কী দেবে না যে ছাই

আস্থায় রেখেছ তাকে! ভালোবাসাবশত বলেছি—

বাগানে বিষের ফোঁটা, তুমি শুধু কুসুমউত্থিতা

আসলে তোমাকে বলি—দাহ্যগুণে আগুনখ্যাতি

তারও মনে ইচ্ছা জাগে—ভাগ্য হবে নিজে পুড়িবার!

প্রাইভেট কিউবিক্যাল

শামীম আজাদ

বায়ুবিদ্ধ দেয়ালে পিঠ ঠেকতেই

প্রশ্নমুক্ত আড়াল পেয়ে গেছি

বায়ু জগতে সকলই সম্ভব।

হাওয়া না হলেই

অনর্থক প্রশ্ন

যত্রতত্র দাঁড়ানো

যার পর নাই তারও ওপর—

পিল পিল পিঁপড়া জিজ্ঞাসা

ভাঁজ ভাঙা ভীতি, বালি পড়া অপরিমিতি,

মিঠাবিষ কলঙ্কমালা

বিবমিষা পাংশু পিত্তের ভেতর।

এখন এ নিরলে নিঃশ্বাস নেবো

প্রবাহে প্রহরা দেবো

পাকা পিচ লা লা গুলাব আঙ্গুরলতা।

এক জননী

খালেক বিন জয়েনউদদীন

তুমিও সেই বালিকা ছিলে, কপালে ছিলো নয়নকাড়া লাল টিপ

নাকের স্বর্ণ নোলকে ঝুলছিল স্বদেশচিত্র, ছেলেবেলার ছবি।

তুমিও সেই যুবতী ছিলে, বুকে ছিলো উদ্দাম হাওয়ার হাতছানি

প্রেমে-রূপে, মিলন-নিলয়ে ভরেছো আমার প্রীতির ঘর-গেরস্থি

নিত্যসত্তা মাঝে কখনো কখনো সন্তান শোকে হয়েছো পাথরসমা

সংকট-দুর্দিনে তোমার আঁচলের ছায়ায় নদীসিকস্তির জলাভূমি।

তুমি আজো স্তন্যদায়িনী, মানসমন্দিরে বাংলার শারদ-প্রতিমা

তোমার নাভিমূলে আমার সাকিন, পূর্বসূরিদের নাম ও ঠিকানা

তোমার বুকে আমার চিরকালের চিত্তধাম ও জাগ্রত ভালোবাসা

কোটি বছরের মৃত্তিকায় গড়া তুমি, অবাধ্য ছেলের এক জননী।

হলে শান্তির অশান্তিতেও

জাহিদুল হক

দিকগুলো তার ছায়া শুষে নেয় কালো হরদে ভ্রুকুটিতে;

বিদায় সামার! ফের আসে হিম কালিমার গাঢ় শীতে।

কালো রেখা গেলে কালো বিকেলেরা কালো গোধূলিতে মেশে

হলুদের বাড়ি স্মৃতিকেই শুধু রাঙালো নিরুদ্দেশে।

আমার 'আমি'-কে এসেছি কি ফেলে? কোন 'আমি' সাথে করে

এসেছি অটম! কবিতার ট্রেন—পাতা ঝরে, পাতা ঝরে।

ভের্লেন লেখে শনির কবিতা, আমার পকেটে মেঘ

ভর্তি করেছে সকাল-দুপুর উপমার উদ্বেগ।

ইউলিসিসের কিছু প্রস্তুতি ডায়রিতে লিখে রাখি—

পড়বো কি ফের? গ্রিক পুণ্যের উপত্যকাতে সে কি

শোনে দয়িতার ভাষাহীন ঘ্রাণ? স্বচ্ছ ঝরনা জুড়ে

তোমার প্রেমের কালো শালিকেরা সিথেরার নামে উড়ে

দূরের সুরের সিঁড়িগুলো ভাঙে—কালো দিন ভাঙা দিন

কার ছোঁয়াগুলো এবং ধসেরা খোঁড়ে শুধু সপ্লিন।

তাই মন জুড়ে মন কী রকম করে তুমি নেই বলে

ছিলে শান্তির অশান্তিতেও—সত্যি কি ভুলে গেলে!

তুমি জন্মেছো বলে

খালেদ হোসাইন

কান্নাটা ঠিকমতো করতে পারতাম না বলে,

ছেলেবেলায় বেশ মার খেয়েছি।

এখন আমি অবাক হয়ে যাই,

কখন যে তা আয়ত্ত হয়ে গেছে,

টের পাইনি। যেন পাথরের মর্ম চুঁইয়ে

বেরিয়ে আসে নোনাজল।

সবাই যখন বিত্ত-বৈভবের জন্যে

ছুটে গেছে রাজদরবারে, আমি তখন

তোমার জন্যেই উতলা হয়েছি।

মোক্ষলাভের জন্যে আমি যাইনি মন্দিরে-মসজিদে।

তোমাকে দেখার জন্য

আমার চোখে সঞ্চয় করেছি অনন্ত তৃষ্ণা।

কত অল্পে আমি সন্তুষ্ট হতে পারি, তুমি জানো।

শুধু তুমি জন্মেছো বলে বিশ্বচরাচরের কাছে

আমি ঋণী হয়ে থাকলাম চিরদিন। কিন্তু সে ঋণ

আমি কী দিয়ে শোধ করতে পারি বলো,

চোখের নিঃশব্দ জলবিন্দু ছাড়া?

ডুবলে পরে

হাসান হাফিজ

মনের কোণে লুকিয়ে ছিল ইচ্ছা এবং পাপ

বিস্মৃতি এক গোপন আঁধার দ্যায় সাহসে ঝাঁপ।

জখম হলো জখম হলো বিস্মরণের ডানা

ছটফটানি আর্তনাদে হয়েছি তালকানা।

পালিয়ে বাঁচার পথ খোলা নেই এখন কী যে করি

যখন তখন বিগড়ে যাবে সচল দেহঘড়ি।

হঠাত্ যদি হয় অকেজো ডুববো রে মাঝ গাঙে

এই নিয়তি দণ্ডায়মান, আছাড় পিছাড় ভাঙে।

শব্দ কথার এলান খোঁপা তথায় জড়ামড়ি

বিহঙ্গ আয় আমরা দু'জন অপেক্ষা গান ধরি।

সেই গানে সুর অন্তরা নেই বিচ্ছেদিয়া ঢেউ

ওই সংগীত ভালোবাসবে নাই জগতে কেউ।

ভালোবাসা না পায় না পাক, আমরা যদি বাঁচি

তিলেক দণ্ড নাইরে দ্বিধা তাধিন ধিনা নাচি।

কথাপুরাণ

জাহিদ হায়দার

বাঁশবাগানের মাথার উপর উঠছে কথার চাঁদ,

তারপরও কথাবিলাসীরা জ্যোত্স্নার ভেতর নেই চুপচাপ;

কথার আকাশে উড়ছে বোমারু বিমান;

যাদের কথা পছন্দ নয়, বোমা ফেলবে তাদের মাথায়।

আমাদের জিহ্বার বাড়িতে কথাবিষ আর কথামৃত

নিয়মিত করছে অনেক প্রস্রাব আর পায়েস খাচ্ছে;

মনে হচ্ছে, বেশ ভালো আছে শ্রোতাগণ;

মনে হচ্ছে, আমি আর তুমি কিছুদিন কথা বলবো না,

মুখোমুখি বসে থাকবো, দেখা যাবে নৈঃশব্দ্য অনুভব বোঝে কি-না?

মাঝে মাঝে কথারাও ঘুমাতে চায় নতুন স্বপ্নলোভে।

তামাক

সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল

প্রতিদিনের স্মৃতির এক-তৃতীয়াংশই মুছে যাচ্ছে। থাকছে নিকোটিন।

হুঁক্কার নিকোটিন ধোঁয়াটে নেশার বিষঘুম। বিষ পান ঠেলে দেয় দূরে

পা থেকে দ্রুত দূরে সরে যায় সিঁড়ি। কেউ কি এভাবে কাঁদতে পারে!

ঠোঁট থেকে দূরে সরে যাচ্ছে স্বপ্নস্বাদ। কী যে কষ্ট পাচ্ছে মানুষের মন।

বিড়ি ছিলো বলেই ক্লিনটন আর মনিকা'র কথা রাষ্ট্র হলো যুক্তরাষ্ট্রে।

বিশ্ব থেকে চিরতরে নিঃশেষ, নিষিদ্ধ, বন্ধ হোক বিষপাতা উত্পাদন।

বিভ্রান্তির অন্ধকারে

নাসির আহমেদ

অন্ধকার নেমে আসে হিমঠান্ডা বরফের মতো।

এখনতো প্রখর দুপুর! মেঘ নেই, জলীয় বাষ্পও।

তবু কেন মনে হচ্ছে বৃষ্টি হবে ওই কালো মেঘে

আলো তবে এইভাবে পরাভূত হবে অন্ধকারে!

মধ্যযুগীয় ভয় ছড়িয়ে দিয়েছে কারা দ্যুতিময় দিনের শরীরে!

বিষাদের মতো দ্বিধা গ্রাস করে নিতে চায় সূর্যের প্রত্যয়।

একী দেখি চারদিকে— অর্ধেক রোদ্দুর আর অর্ধেক রাত্তির!

দেশজুড়ে ভয়াবহ সময়ের বিপর্যয় : বিভ্রান্ত ঘড়িও।

এখানে জঙ্গল নেই, বাঘ নেই, লোকালয়ে তবু বুনো ভয়!

জঙ্গলের অন্ধকার গায়ে মেখে হন্তদন্ত আতঙ্কিত গ্রাম

পালাচ্ছে সর্বস্ব ফেলে-ফিরে এলো ফের একাত্তর?

এর নাম রাজনীতি? মধ্যযুগে ফিরে যাবে তোমার প্রগতি?

বাগানের ফলের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে বিষাক্ত কীটেরা

নীলকণ্ঠ ফুল তারও গাঢ় নীলে ঢুকে যাচ্ছে কালোর আভাস!

সত্য কী রকম দেখো দ্বিধান্বিত মিথ্যার বিভ্রমে!

আলোকে রাঙায় চোখ অন্ধকার প্রকাশ্য দুপুরে।

এরপরও আলোকিত শিশিরে ঝলকাবে সূর্যালোক

শুধু চাই সাহসী বিশ্বাস নিয়ে সত্যে অবিচল প্রতীক্ষাই।

ক্লান্তির হাঁদা ছাপ

সুজাউদ্দীন কায়সার

যাপনের বাস্তব ডানা মেলে

অপবাদ চিরে বয়ে যাওয়া

নিজের আকার নিয়ে তন্ময় এ দেহ প্রাণ

তুমি তো দুর্নাম :

চোখেমুখে তৃষ্ণার হারানো সবুজ

আর শব্দের অরণ্যে

ফ্যাকাশে মেদা :

মুখস্থ জীবনের আয়নায় একটি মোহলিপ্সা

না-কি শুদ্ধ নীরব!

জানি, মনটা তো শুকনো পাতা, অনেক দিনের সমতা

ওই সঞ্চালনে

ওই স্থিরতায়

আছে কবিতার মতো সুন্দর কষ্টগুলো

কেননা দুঃখ কিছু প্রকাশিত হোক না কতকালহারা

বাবার গান বাজে

মুহম্মদ সবুর

বাবার ওপর মাতামহ হেভি খাপ্পা হয়ে আছে হে—

বাবা কেন বিফইটার হয়নি, ড্রাংক্ড হয়ে নাচেনি পার্টিতে?

মাম্মীকে এই নিয়ে বেশ ঝেড়েছিলেন, লোকের আড়ালে...

বাবাও তো ভালো ড্রাংকার, কোক পেপসি গিলেন গোগ্রাসে

সফট ড্রিংকার বাবার হার্ড ড্রিংকেস আতঙ্ক মেনে নেয়নি

মাতামহ, সজোরে শুনিয়ে দিয়েছিলেন, 'আনকালচার্ড, রাবিশ'...

সেই থেকে বাবা জঞ্জাল, বাবার কোনো সংস্কৃতি নেই

রক গানে বাবা মজে না, বাউলেও নয়, মজে টপ্পায়

এই নিয়ে মাম্মীর সাথে গোলমালের হীরকজয়ন্তী চলছে...

জঞ্জালে বসে থেকে বাবা গিলেন তান ও বন্দিশ

সুরসাম্পানে ডুব দিয়ে গোপনে পান করেন আরক

আর গীত গজলের সাথে সখ্য পেলেও অসংস্কৃত

থেকে গেলেন বাবা যুগ যুগ ধরে...

এখন বাজারে সিডি, বাবার গান বাজে ককটেল পার্টিতেও!

আজকাল তোমাকে তেমন

মনে পড়ে না

মিনার মনসুর

আমি এখন কেবল তোমার প্রসাধনসামগ্রীর কথা ভেবে কষ্ট পাই। দেশবিদেশের শপিংমল ঘুরে কতো যত্নেই না তুমি তাদের সংগ্রহ করে এনেছিলে! তোমাকে নিয়ে আমার গোপন গর্বের কথা কী করে অস্বীকার করি, বলো? তবে তার চেয়ে বড়ো সত্য হলো, প্রেমে ও কামে ওরা তোমাকে যতোটা পেয়েছে তার সিকিভাগও জোটেনি অন্য কারো ভাগ্যে।

এখন কি উপেক্ষার ঝুলকালি জমে আছে ওদের চৌকস কামার্দ্র অবয়বে? তোমার দীর্ঘ অদর্শনে, অচুম্বনে আর স্পর্শহীনতায় বরেন্দ্রভূমির মতো চৌচির হয়ে গেছে সেই সব জাদুকরী জলের গৌরব? নাকি তোমার কন্যারাই কানায় কানায় পূর্ণ করে দিয়েছে পৃথিবীর নশ্বর নদীদের যতো অতল শূন্যতা!



আজকাল তোমাকে তেমন মনে পড়ে না। শুধু তোমার প্রিয় প্রসাধনসামগ্রীর কথা ভেবে কষ্ট পাই।

দিনলিপি, মে ২০১৩

মারুফ রায়হান

স্বর্গচ্যুত জোড়হীন পাখিটির কান্নায় কান পেতেছি।

সে বলে : নিয়তি মানি, আয়ু হোক আমার মৃত্যুস্থবির

শুধু অনুতাপ— অর্ধাঙ্গিনী পাখিনীর মনোমন্দির

নরক-আগুনে আমি, মহাপাপী, না বুঝেই ঝলসেছি!



শূন্য সন্ধ্যা মৃত্যুগন্ধা তুলে নিলো বিষ, অধরে পেয়ালা

বোশেখী হাওয়ার হাহাকার চেপে হঠাত্ বাজাল সুরের বেহালা



আবার বৃষ্টি এসেছে

আমাকে ভালোবেসেছে

রাতভর ছিল তার থেমে থেমে চলা

আমার ছিল নিজের সঙ্গেই কথা বলা

বৃষ্টি শুধিয়েছে, কেন দেখছ আমাকে কান্না

আগে যে আমার ভেতর ঢের পেতে পান্না

৪.

ভালোবাসলেই থাকে ভালোবাসা প্রকাশের ভার

প্রেম পেতে চাইলে বারবার শুধু শুধানো

হে প্রেমিক, অশ্রুসিক্ত, দগ্ধ দিঘি

অলক্ষে তোমার রক্তক্ষরণ

অন্তিম নিঃশ্বাস অবধি

আহত মিছিল

শাহাবুদ্দীন নাগরী

মধ্যরাতে জানালায় টোকা দেয় গোলগাল পূর্ণিমা চাঁদ, ফ্রস্টেড শার্সির

ভেতর দিয়ে ছড়িয়ে পড়ে শাদা জোছনা, দরোজায় ডুগডুগি বাজায়

দীঘল বৃক্ষছায়া, টেবিলের ফুলদানি থেকে পাখির মতো উড়ে যায়

গুচ্ছ গুচ্ছ স্বপ্ন (ফুল আর স্বপ্নের ভেতর আমি কখনো তফাত দেখি না),

দেয়ালে ফ্রেমবন্দি স্মৃতি নিয়ে মগ্ন বদ্ধ বাতাস, আমি নিঃশ্বাস নিতে গিয়ে

টের পাই বাসি পাউরুটির মতো দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে ইতিহাসের বই।



জানালাটা কি তাহলে খুলে দেবো? এমন দোটানায় পড়ে একবার আমি

হারাতে বসেছিলাম বাড়ির রাস্তা, জন্মসনদের চেয়ে আমার কাছে প্রিয়

হয়ে উঠেছিলো কাবিননামা, আমি শেষপর্যন্ত কোনোটাই রাখতে পারিনি

মানিব্যাগে, পলিটিক্যাল লিফলেটের মতো তুলে নিয়ে গেছে আবর্জনার

ট্রাক। বয়সের ওজন কি খুব বেশি? নইলে কেন তার ভারে পায়ের নিচে

চাপা পড়ে যাচ্ছে শৈশব! আমি পূর্ণিমার চাঁদ নিয়ে যখন মগ্ন হয়ে উঠি

তখন তাকিয়ে দেখি দেরাজে লুকিয়ে রাখা পারফিউমের সব সুগন্ধি

লোপাট হয়ে গেছে, একটি ফোঁটাও নেই যা দিয়ে আমি তাড়াতে পারি

এই কবরখানার আদি মদের উত্কট দুর্গন্ধ। অতঃপর দরোজার ওপারে

দিঘল বৃক্ষছায়ার নিচে বিড়ালের ইঁদুর নিধন উত্সব দেখে আমি আশান্বিত

হয়ে উঠি (আমি সবসময় অপটিমিসটিক), জানালার শার্সিতে উড়ে এসে

ডানা ঝাপটায় অন্ধ বাদুড়, মেঝের মার্বেল ফেটে বেরিয়ে আসে তরল

আগুন, সাপের জিহ্বার মতো চকচক করে ওঠে আহত মিছিল।

পাথর কাঁদে না

গাউসুর রহমান

পাথরও নাইতে যায়

পাথরও অনিদ্রা রোগে ভোগে

পাথরও ঘুমায়;

না হয় জেগে থাকে দিন-রাত।

পাথরের ভেতর পাথর হয়ে আছি

নিদ্রা-অনিদ্রার ভাবনা কী?

পাথর হাঁটে না বলে আমিও

হাঁটি না,

বান্ধবহীন পড়ে থাকি এক কোণায়।

নিজেও পাথর বলেই হূদয় ভাঙার

শব্দ শুনি না আমি,

পাথরের মতো আমারও পার্থিব কামনা নেই।

নদীর তীর ভেঙে পড়লে

পাথর কাঁদে না,

আমিও কাঁদি না।

মানুষের রোদন ও আক্ষেপ—

আমাকে স্পর্শ করে না,

শস্যের গন্ধ আমার কানে লাগে না;

মানুষের ভালো-মন্দে আমার কিছু

যায় আসে না।

গতর ভিজাও মাতম দেখে

সৌরভ জাহাঙ্গীর

'উঞ্চা উঞ্চা পাবত' ধরে খালি পায়ে হাঁটছ যখন হে কাহ্নপা

কাঞ্চি মুখে তোমার কি আর কীর্তন সাজে হরে কৃষ্ণের?

এক যুগ পর হঠাত্ করে লোকাল ট্রেনে এলে যখন রাধানগর

কি আর করা খানিক বসে এই অবেলায়

গতর ভিজাও মাতম দেখে রাধা-কৃষ্ণের।

অচিন পাড়ে লালন হাসে শূন্যে বসে।

একদশকের শ্রেষ্ঠ ভেবে নিজকে নিয়ে

বেশ তো আছো

তিন দশকে গর্তে পড়ে ভাঙবে যে পা

হেলিকপ্টার

এ যুগের পর আসবে না আর

এ যুগ থাকবে সব দশকে

বিদ্যাপতি কানে কানে কহে বাহে

হায়! কাহ্নকে বলে দে না

লোকাল ট্রেনের জায়গা নেই আর রাধানগর

জেট বোমারু ঘুরে ফেরে

উড়ে বেড়ায়।

স্বীকারোক্তি

আলমগীর রেজা চৌধুরী

অমন করে তুমি শেষবার বলনাকো...

এমন ঝড় শেষে আমি তো এসেছি

একদিন বলিনি, কী মুখর ভালোবাসা

চোখে হাত রেখে তোমাকে জেনেছি নিতা।

অমন করে তুমি শেষবার বলনাকো...

কতটা স্মৃতির কাছে মিথ্যে ফিরে যাওয়া

হূদয়ের সৌরভ দিয়ে গড়ানো আস্তরণ

ব্যগ্র প্রেমে প্রতিদিন তোমাকে জড়ায়

অমন করে তুমি শেষবার বলনাকো...

এতটা সময় কেবলি তোমার জন্য শোক

উন্মুলে বসন্ত দিন পুলকিত মধ্যরাত

কেঁপে ওঠে বিহ্বল একজন প্রিয়তমা

চোখে হাত রেখে বলো, বৃন্দাবন।

ভুলে যাব ক্যামেরা ঘোরালে

চৌধুরী ফেরদৌস

একটা সোঁদাঘ্রাণ কেবল শীতল শ্বাসে ঘিরছে তফাত। কোথাও গড়াচ্ছে মধু, ব্যথার আজান। সন্ধ্যাকোণে ফুটে আছে বৃষ্টিভেজা জুঁই।

ম্যাগজিন পড়ে আছে, ছোপ-ছোপ রক্ত...অন্ধকারে চলে যাচ্ছে লাশ। বিধ্বস্ত ভবন ঠেলে উঠে আসছে নূপুর-পরা পা। এক্ষণি হানবে আঘাত মন্ত্রকের মুখে ও কপালে। কিন্তু না, এ শুধু তন্দ্রার ঘোর—ভুলে যাব ক্যামেরা ঘোরালে।

বিফল বেলাতক—তবু তুমি বুনছ বাবুই? পৃথিবী কি ঘুমাবে নীরবে!

জীবন ঝামেলা

সরকার মাসুদ

শ্রাবণে আমার ঘরে ছাদ চুঁয়ে পানি পড়ে

আমার হূদয় চুঁয়ে মনোকষ্ট ফোঁটা ফোঁটা...

গ্রামের সৌন্দর্য দেখতে পেরিয়ে যাই কাঁঠালতলীর ব্রিজ

তৃপ্তি আছে অন্ধকারে মধ্যপাড়া বাজারের কাছে

আমি অনেকদিন একা একা সেদিকেই গেছি

সদাউজ্জল মেয়ের অগভীর চোখ ভেসে যায় খালে খালে

ধীর মফস্বল পিচ্ছিল সুষমায় পড়ে গিয়ে অপ্রস্তুত

আমি আবার ফিরে এসেছি খাঁচায়...

ঘর থেকে বেরিয়ে মানুষ আরো ভেতরে তাকালে

তার মনেই থাকেনা রাস্তার ফণিমনসা

মনে নেই অশেষ শ্রাবণে আমি দুরন্ত রিকশায় কাক ভেজা

নিয়ন আলোর নিচে আত্মা রেখে এসে নিরুপায়

ছড়িয়ে পড়েছি অন্ধকার শাখা-প্রশাখায়।

আমার জুতার ভেতর ঢুকে পড়া কাদা বেরোবে না

স্বপ্নের নদীর অপূর্ব দুই তীর শেষ হবে না

তীরবিদ্ধ মাথা নিয়ে ঘুরে ফিরছি খালে বিলে,

ভাবি তবু, মুগ্ধ চোখে মহুয়ার বসন্তে তাকাবো একদিন।

খেয়াঘাট

সোহরাব পাশা

রাতের পোশাক পরে হেঁটে যাচ্ছে দিন

কবন্ধ পা'গুচ্ছ খোঁজে স্বপ্নশব্দ গ্রাম

পুকুরে মাছের সংসার

নদী ছেড়ে ঘরে ফিরছে খেয়ার মাঝি

ঘাট যাবে না কোথাও

ঠিক এইখানেই চুল ভিজে ছিলো চর্যাবালিকার

দিব্যি দাগ আছে তার জলের শেকড়ে

সময়ের সব অঙ্ক মেলে না

দিনের দু'ঠোঁটে থাকে কিছুটা আঁধার

ময়লা জামার নিচে খুচরো পয়সা

পকেট সেলাই হচ্ছে নতুন ছায়ার;

বিখ্যাত বাতাসে ওড়ে প্রাচীন বিকেলে

ওপাশে জানালা দেখে উড়ে যাচ্ছে ভোরের বসন্ত

থৈ থৈ নদীর যৌবন

ছিঁড়ে যাচ্ছে বৃক্ষদের সবুজ ওড়না

তুমুল উড়ছে ধুলোদিন

শুধু ঘাট উড়ছেনা কোথাও

চেয়েছি আলাদা হতে

রেজাউদ্দিন স্টালিন

চেয়েছি আলাদা হতে মর্মমূল ছিঁড়ে,

ফিরতে চেয়েছি নীড়ে

ভিন্ন ডানার উদ্ভাস;

দীর্ঘবুক আগুনের শ্বাস

নিয়েছি মরণপণ প্রচেষ্টা অবধি;

শ্বাপদসংকুল অরণ্য জলধি

পেরিয়েছি একা ইউলিসিস

সার্সির জাদুমন্ত্র বিষ

আকণ্ঠ করেছি পান নীলকণ্ঠ আমি,

স্বপ্ন দেখেছি দূর অনন্ত আগামী

চাইনি অনুকরণের ঋণ প্রায়ান্ধ জীবন,

বরং রক্তযজ্ঞে করেছি অর্জন

একলব্যের হূত স্বাধীনতা,

অস্বীকৃতির অস্মিতা

বারবার হেনেছে হতাশ,

অদম্য অভয় বেদব্যাস;

ভিন্ন এক স্বরের সন্ধান

আমার আজন্ম ব্রত; অশত্থের তলে বিছিয়েছি ধ্যান

পথের পাগলি

জুয়েল মাজহার

পথে একটা পাগলি থাকে। অরক্ষিত যোনিপথে তার

রক্তমুখ ক্ষত নিয়ে জেগে থাকে অনন্ত শ্মশান

—রাত্রে বহু দৈত্য এসেছিল!

ধ্বংসস্তূপের পাশে রাত্রি একা মরে পড়ে আছে।

অযুত কীটের ভোজ। অনাহুত কৃমিরা এসেছে

—রক্তপায়ী মাছগুলি সাঁতরে চলে বাঁকা নদীজলে

আকাশে প্রকাণ্ড এক রক্তজবা চোখ লাল করে

দ্রুত আর ক্রমাগত ঢেলে চলে নিজের আগুন!

সহিংসতা

মাসুদ খান

তোমার হয়েই করি আমি তোমার সহিংসতা

তবেই তুমি শান্তিমতো, নিশ্চিন্ত,

ঘুমাও যথাতথা।

ধর্মে তুমি কামঠ-কুমির, স্বভাবে শৈবাল

আমি ধর্মে তোমার দিচ্ছি না তো ধরা।

তুমি গড়িয়ে-চলা শিলার গায়ে শ্যাওলাভাবে মেশো

তুমি মনেপ্রাণে আমিষ-আমিষ, হাবভাবে শর্করা।

সহিংসতা শেষে আমি আমিষ নিয়ে ফিরি

বেশ তো দুঃশীলা ছিলে, সুশীলা শিগগিরি!

বেলাহীন অদ্ভুত সকাল

দুখু বাঙাল

মাকড়ের বিত্তহীন জালে বুঝি ধরা ছিলে আধো আধো বোল

কোনো কিছু চাওয়া নয় কি জানি কি চেয়েছিলে তবু

ভেতরের বিস্তীর্ণ ভূ-ভাগ জুড়ে ভালোবাসা ভালোবাসা ঘ্রাণ

ঠিক তাও নয় চেয়েছিলে মাতৃহীন পিতৃহীন ভালোবাসাটাই।

সন্দ্বীপ চ্যানেলে ফের অবেলায় কি জানি কি স্টিমার নাম

অসতর্ক কালির দোয়াত হয়ে উল্টে পড়ে ভেজালে যেমন

বুঝিলাম— ভালোবাসা জিওলের খুন হওয়া সিথানের ডাল

বিয়োগে জীয়োনযোগ চিরদিন বেলাহীন অদ্ভুত সকাল।

আমি ধরতেও পারি না

ছাড়তেও পারি না

মজিদ মাহমুদ

আমি তোমাকে ধরতেও পারি না

ছাড়তেও পারি না

তোমাকে ধরার এবং ছাড়ার কারণ খুঁজতে থাকি

আমি খুঁজে পাই তোমাকে ভালোবাসার একটি সঠিক উপায়

অথচ তোমাকে পরিত্যাগ করার অসংখ্য কারণ

অথচ তুমি না পরিবর্তন হবে; না আমাকে পরিত্যাগ করবে

আমার হূদয়কে তাই তোমার কাছ থেকে রক্ষা করি

যার অর্ধেকটা সর্বদা তোমাকে দূরে রাখতে চাইবে

এবং বাকি অর্ধেকটা কাছে পাওয়ার জন্য ব্যাকুল হবে

অতএব আমাদের ভালোবাসায় যদি ভালোবাসা পেয়ে থাকে

তাহলে আমরা তাকে উত্পীড়িত করবো না

আমরা আর সন্দেহে কিংবা ঈর্ষার সঙ্গে কথা বলবো না

তার প্রস্তাবনা কোনো বিষয় নয়— যে পুরোটা গ্রহণ করবে

সুতরাং আমি জানি— যখন তোমার ইচ্ছে হবে

আমাকে ভালোবাসতে পারবে—

যে অর্ধেক তোমাকে ধরতে চায়।

ঈশ্বর, মেঘ এবং গলিপথ

শাহীন রেজা

যথারীতি মেঘ বয়ে যায় এবং আমি ঢুকে পড়ি সেই সুড়ং-এ। যার একদিক খোলা আর অন্যদিক ঢাকা পড়ে আছে ঈশ্বরের কালো চশমায়। এখানে নিউটনের সূত্র অচল। অসাড় মেটাফিজিক্স। আমি চোখ বন্ধ করে ইঁদুরের বাসি বিষ্ঠার গন্ধ নিই। চারপাশে বাতাস কেমন স্থির। অন্ধকারেরও এক প্রকার আলো আছে। সেই আলো আয়নায় আমি আমার বর্তমানকে খোঁজার চেষ্টা করি— ভবিষ্যতও। অথচ কী আশ্চর্য সকল প্রত্যাশায় যতি ঘটিয়ে অতীতে এসে হাজি হয় অন্ধ দৃষ্টি পর্দায়। অতীত মানেই তো ফেলে আসা কিছু— ভুলে আসা কিছু। ইঁদুরের বিষ্ঠার গন্ধ ঢেকে যায় তরল ন্যাপথলিনে। আমি খালি হাতে স্পর্শ করি আমার মায়ের মুখ। তার চোখ কেমন জলে ভেজা। মাগো, আমি কবি হতে চাইনি। কবি হওয়া মানেই দুঃখ; তুমি বলেছিলে। আমি দুঃখ পেতে পেতে ঈশ্বরের সন্তান হতে চেয়েছি।

সময় এগিয়ে চলে এবং একসময় মাকড়সাগুলো দৌড়ুতে থাকে আর কয়েকটি বাদুড় আমাকে পশ্চাতে রেখে দ্রুত বেরিয়ে যায় এবং ইঁদুরেরা খুঁজতে থাকে গর্ত; দেয়াল গাত্রে।

সুড়ং-এর গলিপথ থেকে হঠাত্ একটি গায়েবি আওয়াজ ধ্বনিত হয় এবং ঈশ্বরের কালো চশমা অপসৃত হতে হতে ভেসে আসে একটি সকাল। কবির আকাশ জুড়ে তখন প্রার্থনার ছড়াছড়ি। কবি মেঘ কুড়াতে থাকে, শব্দ কুড়াতে থাকে...

বুকের ভূমিকম্প

শিহাব শাহরিয়ার

ভাবছি— তোমার সবকিছু নিয়ে

আমি একটি উড়াল সেতু বানাবো

তোমার চেহারা, চুল, চিবুক, চামড়া

তোমার ঘুম, ঘাম, ঘুঙুর, গন্তব্য, গতিপথ

তোমার বেদনা, বিদ্রূপ, ব্যভিচার, ব্যবধান

তোমার অহংকার, অহমিকা, অনুতাপ, অনুরণন

সবই সেতুর বাহুতে ধীরে ধীরে দুলবে বাতাসে সারাক্ষণ

এই স্মরণ সেতুর পাঁজর ভাঙতে পারে

যদি তোমার বুকের ভেতর ভূমিকম্পের ভয় থাকে

যদি তুমি চাঁদকে আটচল্লিশ টুকরো করে ফেলে দিতে পারো শহরে

যদি ভুলে যাও '৯৭, তুরাগের তীর, সবজিক্ষেত আর বৃষ্টিভেজা নীল শাড়ি

হাতিরঝিলের খোলা বাতাসের সাথে আমি আজ গড়ে তুলেছি স্বপ্নের সখ্যতা

প্রাগৈতিহাসিক

ফজলুল হক

একটি স্মিত-স্মৃতির আদলে ভেসে এল তোমার নয়ন

ধর্মের কাজল থেকে ঝরে পড়া সেই মেঘের উদ্যমে

তারপর পথে পথে নেমে এল সংহারমিছিল

সবকিছু ছুঁয়ে, সব অভিমান ছুঁয়ে

আমার আঙিনায় ছড়িয়ে পড়ল তোমার বিষাদজন্মভূমি

পথের দু'পাশে তৃণের মৌন, কাগজে রোদের জ্যোতিতিতিক্ষা

অপভাষগুলি প্রতিফলনের কোরক, সাজাই আদিবীজের মায়ায়

পথে পড়ে থাকা এই পথের জীবন

ক্ষতভারময় ধর্মক্ষেত্র রিক্ত করে তবুও শূন্যের শীর্ষে ওড়ে

প্রাগৈতিহাসিক, ধুলোর কপোল থেকে তল-অবতলে!

মেঘ, প্লিজ...

টোকন ঠাকুর

বাইরে মেঘ ছিল, ফলে, তাকাচ্ছে ঘোলাটে আকাশ

ভরসন্ধেয় ভেতরে উপস্থিত আষাঢ়-শ্রাবণ মাস

কাঁটায় কাঁটায়, গম্ভীর অডিটোরিয়ামে

বৃষ্টিরা গান হয়ে, বিজলিরা নাচ হয়ে নামে

অনেক দর্শক-শ্রোতা, আমিও যে আছি এক কোণে

তা নাচ-গানের জন্য নয়, ভিজবার ইচ্ছামাখা মনে

কে ভেজাবে, কীভাবে? সেই মেঘ, প্লিজ, তুমি স্টেজে ওঠো না!

না হলে কেটে পড়ব, শুনব না অধ্যাপকের মেঘদূত-আলোচনা

হাসি আর নীরবতা

মজনু শাহ্

হাসি আর নীরবতার মাঝামাঝি এক ধুধু বালুকাবেলা খুঁজে পেতে চাই আমি। চাঁদচূর্ণ নিয়ে বসে থাকা মনোরোগী আমাকে বলো না, ডুমুরগাছের নিচে অপেক্ষারতা গ্রহবালিকার দিকে যাবার রাস্তা বলো না আমায়। বিস্তীর্ণ গমক্ষেত বলো না কখনো। বলো মৃগইঞ্জিন, দারুচিনি গাছে আটকে থাকা ঘুড়ি বলো, বলো ভাষাব্যাধ, রীতিলণ্ঠন, শঙ্খ, ঘুমবিন্দু বলো বলো

একটা করে সংক্ষিপ্ত অপেক্ষা

জাফর আহমদ রাশেদ

আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি — আমার শৈশবের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সঙ্গে যে আমার কোনো সংযোগ নেই, এ জন্য আমি দুঃখিত নই।

আমার জন্মের পর তিনটি শীতের সকাল কাটিয়েছি দাদুর কোলে। হাঁটু গেড়ে বসে দুই উরুর মাঝখানে লুঙ্গির ভেতরে আমাকে কায়দা করে বসিয়ে রোদ পোহাতেন তিনি। এসব মায়ের কাছে শোনা। মনে রাখবার মতো বড়ো হওয়ার আগেই তিনি মরে গেছেন। তার জন্য আমার কিন্তু খুব দুঃখ হয় না।

অবাক হয়ে ভাবি ২৫ বছর ধরে আমি মার কাছে থাকি না। ঠিক মতো ফোন পর্যন্ত দেওয়া হয় না। এটা কীভাবে হলো ভেবে আমি যে খুব অবাক হই তা কিন্তু না।

এ তালিকা আর একটু বড়ো। এর মধ্যে সেই বিকেল-বিকেল মেয়েটি আছে, প্রশ্রয়প্রবণ সুন্দরী গুরুজন আছেন, মফস্বলের একজন রাজনৈতিক কর্মীও আছেন যাকে খুব ভালো লাগত এবং যিনি আর আমাদের মাঝে নেই। এদের জন্য আমার মধ্যে প্রতিদিন দুঃখ বা হাহাকার গুঞ্জরিত হচ্ছে না।

তবে আমার ত্বকে একটা করে সংক্ষিপ্ত অপেক্ষা রয়ে গেছে বলে হয়।

পরাকাব্য

সরকার আমিন

!

দয়া করে একটু চুপ করোতো সমুদ্র। হে তর্জনগর্জন বীর

মুন্নীর সাথে আমার কিছু দরকারি কথা আছে।

খানিকটা ধীর

বিষণ্ন নির্জনতা খুব প্রয়োজন।

!!

আমার উঠানে ইচ্ছা করলেও রেলগাড়ি চালাতে পারব না

পাথর বাঁধতে পারব পেটে কিন্তু পাথরে চাষ করতে পারব না ইরিধান

ইচ্ছা করে চুরিটুরি করে ফেলি আলাদিনের চেরাগ,

ঘষে ঘষে তুলে ফেলি অভিমানী মানচিত্র থেকে রক্তের দাগ

তবু লোকালয়ে চলে আসে সুন্দরী-বনের বাঘ!

!!!

ক্লান্ত ভিক্ষুকের মতো আমার পক্ষে বহুগামী হওয়া সম্ভব নয়।

আমি তালগাছের মতো একহারা গড়নেরও নই যে গর্ব করে গোঁয়ার গোবিন্দ হবো।

আসলে আমি একজন গৃহকামী, যার ঘর হাওয়ামে উড়তা যায়ে

!!!!

ঘুম থেকে উঠে জানিলাম এ জীবন মন্দ নয়।

পেয়েছি পুরো গোলাপ ক্ষেত, কেবল গন্ধ নয়।

একটা শব্দ

আলফ্রেড খোকন

টেবিলজুড়ে শব্দরা সব জমে উঠছে

মেঘের মতো—;

মেঘের কথা লিখতে বসে

বৃষ্টি তোকে লিখতে হতো।

একটা শব্দ পাড়ার বিকেল

প্রতীক্ষা তার নাম;

থোকোর মতো একটা শব্দ

প্রসঙ্গত আসা—

তার একটা শব্দ সকালবেলা

আস্তে করে জানলা খুলে

সিঁড়ির ওপর উপুর হয়ে বসে থাকা

ফুরিয়ে যাবার রোদ;

একটা শব্দ মাত্র বলল,

'তোমার সঙ্গে আমার শোধবোধ'

দূরস্পর্শ

সৈকত হাবিব

দূরের চুম্বন তোমার জন্য

তোমার জন্য দূরস্পর্শ

নক্ষত্র কত দূরে

তবু সে থাকে খুব খুব কাছে

যখন ছুঁয়ে থাকে আমাদের হূদয়

সূর্য যে এত দূরে দূরে থাকে

দহন কি তার পাও না টের

মাংসরক্তমগজে

কাছে ও দূরে ভেতরে ও বাইরে

তোমার দূরস্পর্শ আমাকে

ছুঁয়ে ছুঁয়ে থাকে

ধানক্ষেতের পুবালি বাতাসে

ওবায়েদ আকাশ

কারো কাছে আমার সংসারের আয়-ব্যয়ের

হিসাব থাকবার কথা নয়

আমি যদি সীতার দুঃখের কথা ভাবতে ভাবতে

দু'চোখ দিয়ে কয়েক লক্ষ গ্যালন

অশ্রুপাত করে থাকি

তাতে আমার সংসারের আয়-ব্যায়ের ওঠানামা নিয়ে

কার এমন দায় পড়েছে যে ভাবতে বসে যাবে?

কিংবা প্রিন্সেস ডায়নার মৃতদেহ জুড়ে

কত লক্ষ টন পুষ্পার্ঘ্য বর্ষিত হলো

সে-সব ভাবনার ওঠানামা জুড়ে

কতবার আমার সংসারের আয়ব্যয়ের হিসাব

গেঁথে দেয়া হলো— তা-ও তো কখনো ভাবল না কেউ!

আমি এখন খোলা গায়ে খোলা মাঠে

গলায় গামছা পেঁচিয়ে পোয়াতি ধানক্ষেতের ভেতর দিয়ে হাঁটি

গোলাভরা ধানের সম্ভাবনার মতো

আমার অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ফুলেফেঁপে ওঠে

আমার হাতে আমার স্ত্রীর স্বপ্নের সাধ

সন্তানের জামা-জুতো-খেলনার দাবি

আজ দেখো ধানক্ষেতের পুবালি বাতাসে দুলছে...

নিরাপত্তা নেই

মাহবুব কবির

এখানে আমার কোনো নিরাপত্তা নেই।

পাহারায় ছিল গাছ, বন, পাহাড়—

এখন তারা নেই।

পাহারায় ছিল নদী-খাল-বিল—

তারাও নেই।

পাহারায় ছিল পশুপাখি সাপখোপ—

তারাও নেই।

পাহারায় ছিল গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরত্, হেমন্ত, শীত, বসন্ত—

তারাও তো নেই।

নিজ ঘরে ঢোকার সময় দেহতল্লাশি করছে রাষ্ট্র—

নিরাপত্তা নেই।

বিরহ

শেলী নাজ



বিরহনিষিক্ত জলে পড়ে থাকা আমার পাথর আজ

বৃষ্টিতে চঞ্চল, তার ভীরু সন্তরণ

জলগুচ্ছ ভেঙে ভেঙে দুপুরে বাজাল পাখোয়াজ

বৃষ্টি এল ঝেঁপে, মন কেঁপে কেঁপে নিল তার প্রথম ফোঁটাটি

সংশয় গিয়েছে ভিজে, শোষে নিচ্ছে তাকে সমস্ত চৈত্রপাথার

অপেক্ষার শেষে নবঘনরত্নে, অভ্র ও খনিজে ভরে গেল কাদামাটি

সোঁদাগন্ধি আমাকে গড়ল কুম্ভকার জাদুর আঙুলে

বসাল নতুন করে পটলচেরা দু'চোখ, নাক, মুখ, ঠোঁট

আর হায় প্রাণ দিতে গেল ভুলে !

ছিলাম ভালোই জ্বরে ও জরায়, প্রেমহীন এলোমেলো

আধখানা মিলনে ভরেছে অর্ধেক বিরহ

বাকি আধখানা ঝলসানো বুক নিয়ে কার কাছে যাই বলো?

আজও খুঁজে ফিরি

সানজিদা আখতার

আজও আমি খুঁজে ফিরি স্বপ্নের মানুষ। আমার

দুচোখ ওড়ে দিগন্তে প্রান্তরে। যেমন করে ইটের

পাঁজায় সবুজের ছায়া খোঁজে উদ্বাস্তু পাখি, আমার

অস্তিত্ব জুড়ে তেমনি হাহাকার আর বৃথা অন্বেষণ।

তৃষ্ণার্ত পথিক যেন মরীচিকা দেখে আর ধুঁকে ধুঁকে

জীবনমরুর বুকে মুখ থুবড়ে পড়ে। বহু ব্যবহূত

এই পুরোনো উপমাটিও এতটুকু করুণা করে না। তোমার

মধ্যে আজ তুমি নেই।

আমার চোখের পাতায় নামে হলুদ সন্ধ্যা। অথচ

এই চোখ একদিন তোমাকে দিয়েছে ভোরের আকাশ

আর রাতের নির্জনতার অনিঃশেষ নিকেতন। ফেলে আসা

কৈশোরের রোদেলা গন্ধমাখা অলসদুপুরগুলো কোথায় হারালো?

আলো-আঁধারিতে ঘেরা বকুলের ঝরে পড়া সেইসব ভোর?

কিশোরীর স্বপ্নগুলো ঝরা বকুলের মতো পিষ্ট হয়েছে

কারও পায়ের তলায়? মালা যদি মলিন বিবর্ণ হয়

তবু মন কেমন করা সুগন্ধ থাকে আর আমাকে

জড়িয়ে রাখে হারানো দিনের সুরভি আকুল সেইসব

দিনরাত্রির স্মৃতি। তারপর সোঁতের শেওলা হয়ে

ভেসে যায় কালিন্দীর জলে...

মানুষ সন্ধান করি— স্বপ্নের মানুষ...

সংক্রান্তি

বীরেন মুখার্জী

পুরোনো সুতোয় উড়ে যায় গোপন তাথৈ

গোধূলি বলয়ে

যে পল্লব কুরে খায় রোজ বুকপকেটের সংশয়

পরিক্রমাহীন পথ থেকে তা তুলে নিয়ে

ভাসিয়ে দিও ঘামঝরা রাতের অক্ষরে;

আগামীর ডানা থেকে ঝরে পড়া রোদ

হতে পারে আঙুলের মিহিন উপমা

কিংবা নকশিকাঁথা ভুল, অধিকারহীন;

তবু তো পথেই আছি, দ্বিধাহীন সমুদ্র তৃষ্ণায়!

বিভাজিত মাস্তুলে আজ লজ্জারাঙা ঘাসের পরিধি

মন্ত্রণার ফুল হয়ে হাসে; দেখ, ধুলোস্নিগ্ধ পাখি এক

ডানাময় সংগীত নিয়ে উড়ে যায় বুকের চৌকাঠে

যদিও সারথি, তোমার উঠোনে বাঁধা এক জীবন

ধ্রুপদী নোঙর!

ভালোবাসবার পর

সাখাওয়াত টিপু

যেন তুমি ছিনতাই হয়ে গেছ অভুক্ত মাছির কাছে

এই যে সরিষাক্ষেত হলুদ মধুর ভেতর তালমাতাল

ডানা হতে ঝরে দিন, রাত্রি তোমার শিয়রে নাচে

যেন নিমপ্যাঁচাদের কাছে রেখেছ কথার বর্তমান

বড় অবেলায় যাচ্ছ, চুল পাকছে শিমুলতুলার মতো

উচ্ছন্নে যাবার আগে, কবরের পাশে একবার বসো



যাইতে যখন চাও, জমিনের হূদয় মাড়িয়ে যাও

রোজ সকালে পা ফেলে যেভাবে গড়ায় রোদ

তোমার পায়ের ছাপ সেও এক চিহ্ন কবিতার

মহাকালে ধুলো মুছে দেবে রেখা ছাঁচ আর পদ

ততদিনে থাকবে না কেউ, তোমার কোমর, ঠোঁট

হাত হতে উরু ঠান্ডা হতে হতে সবই দূরের মাঠে

যৌবন ফোলানো ধানক্ষেতে দুলে থাকবে অতীত

এই ক্ষতচিহ্ন ভবিষ্যতের নাড়িয়ে দিয়েছে ভিত

শব্দবিস্তার

মুজিব ইরম

জানো তুমি

তৃতীয় বিশ্বের কন্যাদায়গ্রস্ত এক পিতা আমি

বড়োই বেকায়দায় আছি

এতো এতো সন্তানাদি নিয়ে

এতো এতো শ্রীহীনতা নিয়ে

সকলেই বলে

কেনো আমি দারস্থ করছি না ওদের

কেনো আমি বাড়িয়ে চলছি

পুত্রকন্যা

শব্দঋণ

বংশের কালিমা...

কী করে বলি

এখনও মধ্যরাতে

আমি বড়ো চাষি হয়ে উঠি

আমি বড়ো হালতী শ্রমিক হয়ে উঠি

শব্দপুত্র আমি

কী করে অনাবাদি রাখি দিলের হালট

আত্মার জমিন

রাত ঘন হলে

জ্বলে ওঠে বংশবাতি

বাক্যঋণ

বংশের আওলাদ

একদিন তারাও দারস্থ হবে কোনো এক বংশগরিমায়

এই ভেবে বিবাহযোগ্য শব্দগুলো তুলে রাখি গোপন সমাল্লে।

স্নানঘর

তুষার কবির

সবকিছু সাজানো রয়েছে এই জলঘরে; শ্বেতপায়রার

হালকা পালক, চারকোনা সুগন্ধি সাবান,

জলে ভেজা ঠান্ডা আমলকী, লাইলাক ফুলের রুমাল হাতে

ঠায় দাঁড়িয়ে রয়েছে সব কৃষ্ণ ক্রীতদাসীগণ—

পদ্মসরোবরের পাশ ঘেঁষে কাঠের দরজা, শ্বেতাভ ধোঁয়ার

মাঝে ধীরে ধীরে ঝরে পড়ে শুদ্ধ জলধারা;

দরজা খুলতেই ভেসে আসে শাদা কাকাতুয়ার প্রেমগীতি

আর চুলখোলা ডাকিনীর ডাক—

ভেজা অন্তর্বাস খুলে স্নানঘরে যাচ্ছে পৃথিবীর দেবীগণ;

ঘুমঘোর ঈষত্ গোলাপি পাপড়িগুলো ঝরে পড়ছে

সরোবরের নরোম নাভিতে—নীলাভ পেয়ালা জুড়ে হরিতকী—

জবজবে তোয়ালে জড়িয়ে সব বেরিয়ে আসছে এই স্নানঘর থেকে—

জলের রমণে আর সুরের মর্মরে দেবীগণ আজ সকলেই

শুদ্ধতমা জলের প্রতিমা—শতাব্দী পুরোনো এই জলমগ্ন স্নানঘরে!

নগ্ন পদচ্ছাপ

নওশাদ জামিল

এক বিদায়ের থেকে অন্যকোনো বিদায়ের দিন

যত দীর্ঘ হয় ততদিন ঘুরে আসি

ততদিন দেখি কিছু নগ্ন পদচ্ছাপ

মাঝখানে অধিকারহীন—উড়ে উড়ে চলে যায়

মুহূর্তের ধাক্কা

দেখি এক ভ্রূণ থেকে জেগে ওঠে আরেক পৃথিবী

এই রাত্রি এই সুড়ঙ্গের কানাগলি

আবার কী অবলীন হবে?

সিঁড়িমুখ ধরে হেঁটে যেতে যেতে শুনি

ঝিমধরা পাগলের হাসি

যেন আচ্ছন্নতা। আলো নেই, ছায়া নেই

নিশ্বাসের মতো পড়ে আছি এই গ্রহে, মায়াজালে

মাঝখানে কিছুদিন ঘুরে আসি—মাটিতে, পাথরে

ঘুরে আসি অশ্রুতে, হাসিতে।

শীত যায়, শীত আসে

শাহেদ কায়েস



স্বপ্নবিদ্ধ হয়ে কেউ কেউ বেঁচে থাকে আজীবন

শেষ হলে আলোকরশ্মির অধ্যাপনা,

গোধূলির রঙে খেলা করে স্বপ্নের সারসেরা

ভরে ওঠে আমাদের মায়াবী উঠান, সন্ধ্যা নামে

রেলগাড়ি থামে... সঙ্গে আসে দুর্গতিনাশিনী



ক্ষয়ে এলো বেলা—

অবলুপ্ত সৌন্দর্যের বিকিরণ কাশজঙ্গলের মেয়ে,

এবার ফেরাও চোখ...



২.

আজ আর হবে না যাওয়া

পার হয়ে এলে অন্যমনস্ক আকাশ, মেঘের সারাঙ

যাওয়া মানেই ফেরার প্রস্তুতি, শেকড়ের টান...

মৃত্তিকার শিশির ভেজা হাসি, চাঁদ ডাকা মাঠ

কুয়াশার গাণিতিক সংকেত, পৌষের আগমনী শিস



শীত যায়, শীত আসে-সুপর্ণারা ফেরে না কোনোদিন...

প্রতিদিন ভাবি

ইকবাল আজিজ

প্রতিদিন ভাবি আজ থেকে মহত্ কাব্যের দিন হবে শুরু—

জটিল ধ্রুপদী উপন্যাস লিখে যাবো অবিরত।

স্বর্গীয় সংগীত ডেকে যাবে খুব কাছ থেকে—

ছুটে যাবে অন্ধকারে আমার আশ্চর্য শিল্পরথ।

কিন্তু প্রতিদিন নিদারুণ ক্লান্তি নামে ও শরীর বেয়ে

প্রতিদিন নৈরাজ্যের দূত আসে সৃজনের পথে ধেয়ে।

সব ইচ্ছা নিমিষেই পলাতক, আশা দারুণ দুরাশা;

বেদনার বালুচরে প্রতিদিন বেঁধে যাই বাসা।

প্রতিদিন ভাবি আজ থেকে শুরু হবে সৃষ্টির উজ্জ্বল উত্সব

কেঁদে ওঠে নিমেষেই প্রেতছায়া—গৃহবন্দি প্রেরণার সব।

গলিপথে হেঁটে হেঁটে ভাবি, কী যে ভাগ্য গড়েছেন অরূপ বিধাতা;

অন্ধকারে মেঘে ঢাকা ভাগ্যহীন কবিতার খাতা।

মাধবকুণ্ডের মেয়ে

মুস্তাফিজ শফি

নামটি আমার স্পস্ট মনে আছে—কুলাউড়া রেলওয়ে জংশন। তারপর তোমাদের ব্যানার লাগানো গাড়িগুলো মিশে গিয়েছিলো মাধবকুণ্ডের পথে।

নদী সিকস্তি মানুষের কান্নার মতো মাধবকুণ্ডের পাহাড়ও যেনো অবিরত কাঁদে। আর কান্নার পাশে তুমি তখন ক্যামেরাবন্দি হতে থাকো ছড়ানো হাসিতে। তোমার হাসিতে ছলছল করে ওঠে ঝরনার জল। মন্দির, শিবমূর্তি, কুণ্ডের ভেতর হারিয়ে যাওয়া, এমনতরো পুরাকাহিনির গন্ধ ছড়ানো আশপাশের জনপদও কেঁপে কেঁপে ওঠে বারবার।

ও মেয়ে, হূদয় ভাঙা কারো কথা না হয় বাদই দিলাম, অশ্রুর মতো বিরহী এই কুণ্ডের জল থেকে নিজেকে সামলে রেখো।

মুক্তি

জুননু রাইন

আমার যেতে বাধা নেই, কষ্ট নেই, আমারতো ভালো না লাগা আছে;

এই ভালো না লাগার সঙ্গে কোনো অভিযোগ-অনুযোগ নেই

নেই হতাশা, প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ার কোনো বেদনা

আমার এই ভালো না লাগার সঙ্গে আমার আছে ভালোবাসাবাসি

ভালো না লাগাকে আপন করেছি, যেরকম ভালো না লাগাও করেছে আমাকে

আমার যেতে বাধা নেই, কষ্ট নেই, আমারতো ভালো না লাগা আছে

প্রেম তরঙ্গ

রাজু আলীম

প্রেম তরঙ্গের মধ্যে ডুবে যাচ্ছি, হাওয়ায় ভাসি

স্বপ্নের ইশারাগুলো উড়ে যায়, তবু পাশাপাশি।

হিসাব মেলানো ছন্দ দন্দে ভরা, দুঃখ পায় চাঁদে

পরস্পর যন্ত্রণারা একসাথে পড়ে গেছে ফাঁদে।

সৌন্দর্যের ফুল ঝরে পড়ে যায় কপালের লেখা

হেসে ওঠে ফের, কেঁদে ওঠে একা, কবিতার রেখা।

গন্তব্যের গতি থামে সাময়িক অদৃশ্য বাতাসে

নাগরিক দুঃখগুলো অপারগ, চুপি চুপি হাসে।

উড়ন্ত দিনের অপেক্ষায় থাকি দুরন্ত প্রেমিক

স্বর্ণের খনিতে বসে কাঁদি, ভালোবাসার শ্রমিক।

স্যুপের টেবিলে বসে রূপ দেখি, কাঁদে ভাঙা মন

কেঁপে ওঠে হূদয়ের তন্ত্রীগুলো, কাঁপে মুঠোফোন।

চোখের ওপরে চাঁদ ওঠে, ছুঁই হূদয়ের টুপি

অন্ধকারে বসে ছন্দ লেখে কবি, দোলে প্রেমঝুপি।

হরিণমাংসের স্বাদ

শতাব্দী কাদের

ও যিশু, আমি যে অন্ধ শিকারি

হাতে ধনুকসমেত তির

শুকনো পাতায় মচমচ শব্দ তুলে

পথ হাঁটি শিকারের খোঁজে

ইতিউতি, ঘুরিফিরি

ভুল তিরে বিদ্ধ হলে পাখি

রক্তের ঘ্রাণ পেয়ে আমার কঙ্কাল

হরিণমাংসের স্বাদ চেটেপুটে খায়...

প্রেমের কয়েনগুলো জমা রেখেছি মাটির ব্যাংকে

রনজু রাইম

প্রেমের কয়েনগুলো জমা করেছি শুধুই মাটির ব্যাংকে

পরানের গহিন প্রকোষ্ঠে— দুঃসময়ে কাছে পাব বলে...

জীবনের স্বপ্নময় ভ্রমণে কখন ফুরিয়ে যায় পথের কড়ি

সেই শঙ্কায় খুচরো প্রেম-ই জমিয়েছি বালক স্বভাবে—

প্রেমের বাজারে নিত্যই আছে মূল্যস্ফীতি, শেয়ারপতন

নিরাবেগ উদ্বেগে মধ্যরাতের ঘুমও যেন সোনার হরিণ

চোখে ও চৌদিকে সেই ফাঁকে ছবি আঁকে মহার্ঘ প্রেম

আমাকে অপূর্ব জোছনার শুশ্রূষা দেয় কোনও উদ্বৃত্ত চাঁদ

প্রবহমান মানুষ শুধুই একা স্মরণ-বিস্মরণের সিংহ-সময়

অপচয়ে ভরা মায়াবী অন্তহীন ভ্রমণে কাঙ্ক্ষিতার মতো

না চাইতেই কাছে আসে পূর্ণচাঁদ; নিষিদ্ধ কয়েন আমার—

অভাবে স্বভাবে তাকে বুকে টেনে নিই পরম ভালোবাসায়

লুপ্ত ইতিহাসের কিছু দুর্লভ কয়েন নিষিদ্ধ মিউজিয়ামে

রেখেছি অনেক যতনে— তাকে দেব না কখনও হারাতে...

আলোঘরে আঁধারের নৃত্য

মিলন সব্যসাচী

দু'হাতে দুর্ভেদ্য আঁধার সরাতে সরাতে

পৃথিবীর পথে খুঁজে ফিরে কাঙ্ক্ষিত আলোঘর

অসংখ্য নেড়ি কুকুরের ভিড় ঠেলে ঠেলে

আমার ঘরে ফিরতে কেবলই রাত হয়ে যায়!

রাতের শয্যায় ঘুমন্ত দিনের দ্রোহীশব্দরা জেগে ওঠো

আলোর আঙিনায় দাঁড়িয়ে যারা আঁধারকে ভয় পায়

তারা আরও অধিক আঁধার বুকে আঁকড়ে আছে

এখানে এখন আলোঘরেই জমে ওঠে আঁধারের নগ্ননৃত্য।

জরাসন্ধ

গোলাম মোর্শেদ চন্দন

এক টানে ছিঁড়ে ফেলা ওড়নাটা

আমার মতো দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেল

এখন আমি কোন পারে যাবো

দ্বিখণ্ডিত সত্তা নিয়ে হাঁটি আর হাঁটি

মনে হয় নদ হয়ে আছি ইদানিং

এপাড় ওপাড় ভুলে

জ্যামিতিক রেখা হয়ে গেছি দু'পাড়ের

সবকিছু ভাসিয়ে দেবার আগে

শারদুল সজল

মুনিয়ারা, এই থাকল রক্তের ফুল, তোমার খোঁপায় পরে নিয়ো

না না— রক্ত ঝরবে না, পুড়ে পুড়ে তা এখন কালো গোলাপ!

মৃত্যুর আগে পাখিটাও নাকি তার শেষ গান গেয়ে যায়

রেখে যায় শূন্যের অসীম সান্ত্বনা

নদীটির শেষ ঢেউয়ে মিশে থাকে রোদের হাওয়া

ঢেউ যতই উঁচুতে উঠুক, নদী জানে¬—

সে তার জলের অধিক নয়

জলের জলজ শরীর ছিঁড়ে ছিঁড়ে জলের মৃতদেহে যতটা শক্তি

যতটা মনস্তাত্ত্বিক আকাশের বিশালতা, নীলমেঘ

কোথাও অত বড় আকাশ নেই

তাই, প্রিয় মেঘে মেঘে আজ সবকিছু ভাসিয়ে দেবার আগে

কথার অব্যক্ততায় রেখে গেলাম ভালোবাসার মস্ত পৃথিবী!

সুতপা ও মেঘ

আহমেদ স্বপন মাহমুদ

সুতপা ও মেঘ একসাথে উড়ে যায়।

ভ্রমণখচিত স্বপ্ন ও স্মারকচিহ্ন

তোমাকে দিই। ভাবি হেমন্তে বৃষ্টির

লোভ কেন এত প্রবল ও কুয়াশাময়!

অভ্যাসবশত ট্রেন চলে যাচ্ছে দূরে

হাওয়ায় দীর্ঘশ্বাসের বিস্তৃতি নিয়ে

দাঁড়িয়ে আছে অনিদ্র তমসা—

বায়ুমণ্ডল ও অনধিকার রূপক!

আমাদের মাঝে মাঝে বিপুল রূপের প্রয়োজন হয়।

তোমাকে মার্বেল ও সরীসৃপের গল্প শুনিয়ে

রাত্রির গায়ে আগুন নিয়ে ভাবতে থাকি

রেলপথ এতটা দূরত্বের না হলে কেবলি কুহেলি—

মেঘ ও তোমার অনাশ্রিত বিরতির মতো, অন্ধ

বিরামহীনতার মতো।

পৌত্তলিকতা

সোহেল হাসান গালিব

হাওয়ার হার্পুনবেঁধা নারী যে টিলার চূড়া থেকে

টাল খেয়ে পড়ে যায়, তার নিচে বসে

তিনতাস খেলে চলে তিন জন, তিন বেলা।

রাত্রি হলে কই যায়, কী যে করে!—

ঘুমের ভেতর জামির ও জামরুল যে ভাষায়

কথা বলে পরস্পর, সেইসব দ্বৈতপ্রহেলিকা

সাক্ষী, এসবের আমি কিছুই জানি না।

নাভিকেই শরীরের মধ্যবিন্দু বলে মনে হয়।

যৌন-প্রান্তিকতা থেকে এই সত্যটুকু শুধু বুঝলাম

ধাতুমন্দিরের গায়ে কিছুটা হেলান দিয়ে।

যখন জোছনা মানে গন্ধকমদিরা, রাত্রি মানে স্নান-সরোবর,

'প্রেতপিপাসার কাছে রক্ত দেব, তবু না ছাড়ব হে মর্মর,

তোমার পৌত্তলিকতা'—

যতদূর ভেসে যায় ঢেউবার্তা, ও সংলাপ

কম্পমান তরণিতে দেখি তুমি অনায়াসে

পার হও পৃথিবীর পথ, সুপুরি বনের রাত্রি—

যে রাত্রি শৃগাল-মুখরিত,

যে রাত্রি ভোরের কাছে রাখে না প্রত্যাশা।

তোমার দিকে

তারিক টুকু

বুঝিনি তোমার দিকে এত মায়া, এই ঘুমহীনতা ছাপিয়ে

লক্ষ লক্ষ গ্যালাক্সির মধ্য দিয়ে অপ্রকাশের দিকে কেন চলে যায়!

সেখানে কি ধাতু ধূমকেতুর মতো ছিটকে আসে, পতনের শব্দ হয়?

ঘুরতে ঘুরতে কোনবা আকার পায় এই সব অবিমৃষ্যকারিতায়!

এরা ছিল বাঁকহীন—মৃদঙ্গের মধ্য দিয়ে ভেসে ওঠা সুর

জানি না সেও কেন একই দিকে জলের লহরীর মতো বয়।

অথবা ঘুমের কথা

শরাফত হোসেন

রাতের আলো বোল পাল্টালে নিজেকে ঝরা পাতার মতো

অচেনা মনে হতে থাকে, জলশূন্য নদী, রেখার পর রেখা

এইখানে আঁকা ছিলো পূর্বজন্মের ইতিহাস, সরল

মানুষের আনাগোনা, দর-দাম কষাকষি চলতেই থাকে

রাতভর রোমকূপ ঘেঁষে নামে কামের গন্ধ, চাতাল বাঁকে

পাহাড়িকা ছেড়ে গেলে প্লাটফর্মে ভিড় নামে নির্জনতার

ভোর-প্রত্যাশী মাছিরা ওম পাহারা দেয় কনকনে শীতে।

এ রাতে গান হলে কেমন, সুরে-বেসুরে

মানবতা লুট হলে কামের জয়, ঘুম-ঘোরে।

নিঃস্বন

পিয়াস মজিদ

মৃত তারাবৃন্দের সংহতি শুরু;

রাতের আয়ুর গভীরে

যে লীলামধুর কমলের সুর

তাতে নিকষিত সব

কুরুক্ষেত্র-কারবালা

বুদ্ধ-সুজাতা

কালো ময়ূর ও সুপারমুন।

আর এই ইতিহাসের বাইরে

তোমার রূপঘরের এককোণে।

ফুটে উঠি আমি;

অপরূপ-অভিরূপ-অনুমপ কুিসত।

একটি নিমেষ

আলতাফ শাহনেওয়াজ

বেদুইনের মতো কথাটি ঘর ভেঙে ছুটে গেল। অমারাত্রি পার হয়ে পৌঁছুবে তক্ষকগ্রামে। অশালীন কানাকানির অঙ্গুরি ছুঁয়ে ভাসতে থাকবে এরপর, যেন খড়কুটো—যতি বসিয়ে নিঃশ্বাস নিল মাত্র। সেই নিঃশ্বাস ধানক্ষেতে পোকায় খাওয়া একটি নিমেষ। হাওয়া এলে সারা দিনের ওপর, ওই বাতাসটুকুই আকাশনীল—ভেজা; পানি হয়ে তাপহীন কোনো গ্রহকে হেলায় আড়চোখে ফেলে চলে যাবে। সূর্যের চতুর্বলয় ঘুরে চক্ষু দুটো তার, অদিতিদের কলতলায় তখনো বসে থাকবে সত্যি!

কামরাঙা

অনন্ত সুজন

এভাবে এমন করে হেসোনা কখনো, যে কেউ

খুন হতে পারে। ওই যে দেখ, দূরের সবচেয়ে চিত্রিত তারাটি

মুহূর্তেই কেমন গলে গেছে। কফির মগে চুমুক দিয়ে কেন তবে

হবো না মাতাল? কৌশলে আমি নাকি অবজ্ঞায় পারঙ্গম।

এই দোষের টিকা আমারই পেশিতে বিদ্ধ করে অভিমানের

আবর্তে উঠে গিয়ে পাশের চেয়ারে বসলো। ইদানীং যাদের

আমি ঈর্ষা করতে শিখেছি—যে যুবক দু'জন প্রতিটি বিকেলের

বাঁকে বসে থাকে ব্যাপক কৌতূহলে।

কী সাহস আমার! এগিয়ে গিয়ে বলেই ফেলেছি—

সবুজ পাতার আড়ালে হলুদ কামরাঙা দেখেছো কখনো?

এবার রাগসম্রাজ্ঞী খোলাচুলের ঝাঁকুনি বিলিয়ে আসন্ন

সন্ধ্যাকে উল্টে দিয়ে স্থান ত্যাগ করে অবশেষে চলেই গেল

নিশ্চিত হলাম—মেয়ে মানুষের চুলের ভেতর লুকিয়ে থাকে

মহুয়ার বুনো ঘ্রাণ।

তার পেছনে বাউল ছুটে গেলো

তার পেছনে আরেক উন্মাদ।

ছায়াকুশলতা

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

ছায়াকে আঁধার হয়ে যেতে

দেখলাম

চোখ মুছলাম; জল

আর বুকের ভরাট ভেতরে

অনবরত, ঝরতে থাকলো

বৃষ্টিফোঁটা...

টু



টা

প...

এ মেট্রোজীবন ছেড়ে

বহুদিন বাড়ি যাই না বলে

ইথারে ইথারে

কাঁদছিলো মা আমার...

'সামনে ঈদ; বাড়ি যাবো'—

দুশ্চিন্তার পাড়ে দাঁড়িয়ে

ছায়াকে আঁধার হতে দেখলাম...

স্মৃতিসৌধ

ফেরদৌস মাহমুদ

স্মৃতিসৌধ দেখতে বেরিয়েছি।

পৃথিবী যেন মানুষের ছোঁয়ায় রূপসী স্মৃতিসৌধ, খুব সুশ্রী মায়াময় তবে ভীতিকর!

এখানে প্রতিদিনই শিশুবেশে নবীনেরা আসে। পৃথিবীটাকে ভালোবাসে, নতুন করে চায়

গ্রহটারে সাজাতে। অবুঝ অবস্থায় ফুর্তি করে কিন্তু বুদ্ধি বাড়লেই দুঃখ পায়। শেষে

ঘুমিয়ে হারিয়ে যায় নিরুদ্দেশে!

'জীবিকা' শব্দের আড়ালে এখানে লোকেরা অনেক কাজ করে, আমাদেরও করতে হয়।

আমার ভালো লাগে না একদম, এমনকি কথাসাহিত্যিক বড় ভাইয়েরও পছন্দ নয়

ওইসব। তবু আমি চাকরি ছাড়তে চাইলে আমার বড় ভাই বাধা দেয় আর বড় ভাই

ছাড়তে চাইলে চাঁদের পিঠে ঘণ্টা পিটাই আমি। আমাকে ডাকে রোজ ইতিহাসের

বিষাদ, ভাঙা রাজপ্রাসাদ, পোড়া মুণ্ড আর বিলাসী নারী!

আহা, ইতিহাস দেখতে বেরিয়েছি—

রক্ত দিয়ে জগত্জুড়ে মানুষ কেবল তৈরি করে রূপকথা আর স্মৃতিসৌধ!

হীরামন

মাসুদ পথিক

আর এইবার শখের হীরামন ধরতে এসে, জেনেছি কষ্টের গোপন নাম হলো হীরামন!

শূন্য খাঁচাটি সামনে নিয়ে ভাবি, এই পাখি ডানাহীন! ইতিহাসের কতপথ যায় উড়ে?

গ্রন্থে পড়ি কত না সন-তারিখ; র-রিয়ালিজম আর গ্লামার জর্জরিত সুররিয়ালিজমে

কার গেছে পা পিছলে পিছলে?

কেবল পথে পথে গ্রামসী রানির প্রহর, পেছনে অগ্নিবাহন, সামনে থাকে হিমযুগ, বিস্তর

তবুও জীবাণুবাহী হাওয়ায় চলেছি হীরামনের উদ্দেশে, গাছে গাছে তোতা, টিয়ার কলরব

আর সাঁওতাল রমণী সমাজে দেখি, প্রান্তরের ঢালে বাহাসী গন্ধর্বকুমার বসে, বুনোতর্কে

ভাবি হাওয়ার কত্থক হারানো বালক আমি কী? যে চায় হীরামন; হে পণ্ডিত, হে বীরবল

মথ ও মেধামিশ্রিত পূর্বপুরুষ, যুদ্ধাস্ত্রে

পাখিলোকে কে তুমি, একাধারে দেখাও মরুঝড়, বৃষ্টিমালা! অথবা আরব্যরজনীর দ্বীপ!

কয়ালের জঙ্গলে, জেনো, শিকারির ম্যাজিক হতে জন্ম হতে পারে সকল কসমিক জোন!

তবে সবার আগে চাই একটা হীরামন! এই ঘুঘুর ডিম ফোটা দুপুরের একটাই দাবি

বাউলিয়া ভাবনাগুচ্ছ

অতনু তিয়াস

১.

কবি

দুঃখবিলাসে মেতে আছ

মগ্ন রাতের লগ্ন ছিঁড়ে নিজের বুকেই

কাঁটা হয়ে গেঁথে আছ।

২.

মনে হয় আমি কোনো দূরবর্তী মানুষের ছায়া

আমাকে কোথাও দূরে নির্বাসনে পাঠিয়ে দিয়ে

নদীর কিনারে বসে আছি

আমারই ফিরে আসার প্রতীক্ষায়...

৩.

তুমি হাসতেই শব্দতরঙ্গের সাথে

আমার দামাল রক্তের তুমুল সংঘর্ষ বাঁধে

কখন যে আগুন জ্বলে ওঠে...!

৪.

ঘুম মানেই মৃত্যুর সাধ নয়

পুনরায় জেগে ওঠার আয়োজন

মৃত্যু মানেই ফুরিয়ে যাওয়া নয়

অন্য জীবনের প্রতিশ্রুতি।

অনন্ত ভোর

অথির শেরপা



অনন্ত ভোর, সুবর্ণিল মাছরাঙার চোখে চোখ রেখে এসো, এই নগরে

অনন্ত ভোর কোথায় তোমার আঙুল? আঙুল নাটাই হয়ে জড়িয়ে নেবে

আাামার যত মনখারাপের সুতো। আজকাল বসন্তও চলে গেছে ওই

উঁচু পাহাড়ের পেছনে। আমিই শুধু প্রজাপতি প্রজাপতি বলে দৌড়ানো এক

অসহিষ্ণু বালক। মৃত্যু থেকে খসে পড়া রাত প্যারেট করতে করতে; সামনে

এসে আর পারে না এগুতে। অনন্ত ভোর; ক্ষিপ্রগতি চিতাহরিণীর ঝলমলে ঘাম

থেকে কেন বেরিয়ে আসে সদ্যরচিত কবিতা... আগুন থেকে কেন কদমফুলের নকশা!

অসহ্য

মোস্তফা তারিকুল আহসান

সূর্য তো নয়ই চাঁদের দিকেও তাকাতে পারি না

ভালো করে

তাহলে কী আমি অন্ধ হতে চলেছি এতদিনে?

দুচোখ বস্ফািরিত করে একদিন চাঁদকে

দেখার জন্য বারান্দা থেকে নেমে গিয়েছিলাম ঘাসে

ঘাসের শিশির তখন চাঁদকে সঙ্গ দিচ্ছে

বাতাসের সাথে গান করছে জোছনা

আমি তাকাতে ওরা লজ্জা পেল না

বরং আমাকে পাত্তা না দিয়ে দিব্যি চালিয়ে গেল লীলা

সেই থেকে চাঁদ আমি সহ্য করতে পারি না

সেও অবশ্য আমাকে পারে না

অয়োমুখ

ত্রিশাখ জলদাস

এই শূন্যতা কি নুয়ে আসে

নিশীথের ডানার আড়ালে!

মাটি ও জলের গন্ধে

দ্বিখণ্ডিত জোনাকিরাও কি পড়ে আছে

পাশাপাশি নিরুত্তাপ!

যাকে তুমি পুষ্প ভেবে বসেছিলে পাশে,

তার জিভ থেকে ক্রমাগত

উঠে আসে বিষ—অগ্নিদাহ—

গলিত বিষাদ।

এই জন্ম আজ ভুলে ভরা—অচঞ্চল

এই জন্ম কুয়াশা ছড়ানো—দুর্বিনীত

শিলাস্তর চুয়ে নেমে যাচ্ছে কৃষ্ণ-দগ্ধ জল।

গুপ্তঘাতকেরা

মুহম্মদ মাহবুব আলী

ছোট ছোট স্বপ্নরা ভেঙে গেলে

বুনো হাঁসের মতো হাওয়ায় মেলে,

নৈঃশব্দ্যের কোলাহল দূরে সরে গেলে

একাকিত্বের মধ্যে বিভ্রমেরা খেলে।

দুঃখ-শোকে কাতর মানবাত্মার বিহনে

মিথ্যে অভিযোগের তর্জনীর হেলেনে,

একরাশ অশান্তির মধ্যে শান্তির সন্ধানে

গভীর থেকে গভীরতর স্তরের বন্ধনে;

ন্যায়-অন্যায় একাকার হয়ে যায়

মিথ্যে কেবলি সত্যকে গিলতে চায়।

নিজের স্বকীয়তায় চলার পথের যাত্রীরা

অন্যায়কে বিভ্রান্ত করে মিথ্যের ষড়যন্ত্রীরা।

এক আলাদিনের চেরাগের মতো ঘাতকেরা—গুপ্ত

ধীরে ধীরে সমাজ থেকে বিবেক বিসর্জনে লিপ্ত।

মাতাল পাপিয়ার প্রলাপ

অপু মেহেদী

পূর্বজনমে সম্ভবত বিবাগী পাপিয়া ছিলাম

সপ্নভ্রমে তাই 'চোখ গেল' বলে ডেকে উঠি।

মাঝে মাঝে আকাশ ছোঁয়ার সাধও হয়

কিন্তু আমার মখমল ডানায় কেউ ঝুলিয়ে দিয়েছে হাজার

কিউসেক অভিমান। পায়ে বাঁধা লক্ষ মেগাবাইট ট্রাফিকজ্যাম।

রাগ-শোক-কাম এসবের ঊর্ধ্বে আমি নই,

ব্যক্তিগত সংসারে আমি এক যৌনজমির বর্গাচাষি

উড়ন্ত রোদে অভ্যাস করি ডানাহীন শালিকের জীবন।

আমার গলায় ঝুলছে আত্মহত্যার জরুরি নোটিশ

পরজনমে চিল হতে চাই, নাহয় এক শিশুতোষ ঝিলের পানকৌড়ি।

অথচ হেমলকের পেয়ালায় স্বেচ্ছা চুমুক দিয়েই দেখি

শত শত চিল আর পানকৌড়ির মাঝে

আমি এক কৃষ্ণশকুন হয়ে উড়ছি!

তোমার নদীর জল

মানজুর মুহাম্মদ

আজ গোলাপ বনে বসন্ত দেখার পাকা কথা ছিল

ভোরের প্রথম প্রহরের অন্তর্বাসে ঘুঘুর ধুকপুক

সূর্যের সে কী গনগনে উত্তেজনা

তারপর-ই আকাশ ভাঙল। ভীষণ ভেসে গেল রোদের প্রেম

আমার হাতে সদ্য কেনা সুনীলের কবিতার বই

উড়ে গেল জলের বনে প্রজাপতি হয়ে

জল আমাদের ডুবালো ভার্চুয়াল ধাঁধায়

তোমার নদীর এত জল—বিশ্বাস হয় না।

অরণ্যের দিনরাত্রি

অজিত দাশ

অহেতুক কিছু দৃশ্য ছেড়ে পাগলের মতো

কেউ বা নেশার বুদবুদে রহস্য হয়ে ঘোরে

কেউ বা মিছে প্রজাপতি হরিণডাঙায়

আমারও ইচ্ছে কতদিন মদিরার জল মেখে রুপালি স্নানের

তোমার ডোরাকাটা চাঁদে পূর্ণ আস্থা ছিলো—শুনেছি জংঘার বিজয়ে

একদিন মাতৃত্ব আসে

ললিতকলা আসে পূর্ণ প্রেম হয়ে।

স্বপ্ন দেখাতে চাও

শামস আরেফিন

দুঃখগুলো বৃষ্টি হয়ে ঝরার পর জোছনার আনাগোনা—

রোদের হাঁটাহাঁটি স্নেহের ফুটপাতে—

স্বপ্নের মৃদুহাওয়া শুকতারা নিয়ে যায় মাছরাঙা চোখে।

বিছানা ছাড়া শোয়া ধান জয়নুলের বাস্তবতা নিয়ে দাঁড়িয়ে—

শিশিরে ভেজা স্মৃতি—গোবরে পদ্মফুল—

তারা দিয়ে চারগুটি খেলে যে-শিশুকে ক্লান্ত দেখো,

জানে না সে তারাগুলোও হাউমাউ করে কাঁদতে পারে

জামদানিতে প্রশ্ন হয়ে ঝুলতে পারে সমবেদনার আশায়।

যেখানে স্তব্ধ হূদয় নারকেলের ফোসকা হয়ে আছে—

ক্ষুধার্ত লালার মিছিল নিঃস্ব করে ভোরকে—

আত্মাহীন হাজারও সূর্যকে মেঘের কবরে দাফন করে হাত ঝাড়ছে প্রযুক্তি—

তালি দিচ্ছে দর্শক সময় আর ডলারের লালসায় পক্ষাগ্রস্ত বিবেক

কে তুমি সেখানে স্বপ্ন দেখাতে চাও উদ্ভ্রান্ত প্রকৃতি দিয়ে?

এই পাতার আরো খবর -
font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেছেন, 'রাজনৈতিক দল হিসাবে কর্মকাণ্ড করার কোনো অধিকার জামায়াত রাখে না।' আপনিও কি তাই মনে করেন?
1 + 8 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
অক্টোবর - ১৯
ফজর৪:৪২
যোহর১১:৪৪
আসর৩:৫২
মাগরিব৫:৩৩
এশা৬:৪৪
সূর্যোদয় - ৫:৫৭সূর্যাস্ত - ০৫:২৮
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :