The Daily Ittefaq
বুধবার, ১৩ আগস্ট ২০১৪, ২৯ শ্রাবণ ১৪২১, ১৬ শাওয়াল ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ, পাসের হার ৭৮.৩৩ শতাংশ | প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রভাব ফলাফলে পড়েনি: শিক্ষামন্ত্রী | পাসের হারে মেয়েরা, জিপিএ-৫-এ ছেলেরা এগিয়ে

আদালতে চ্যালেঞ্জ হবে সংসদের ক্ষমতা

সালেহউদ্দিন

আবারো সংবিধান সংশোধন হচ্ছে। এবার ইস্যু উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে ফিরিয়ে দেয়া। আইন মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে ১৬তম সংবিধান সংশোধন বিলের খসড়া প্রস্তুত করেছে। মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর সংসদের আগামী অধিবেশনে বিলটি উত্থাপনের সম্ভাবনা রয়েছে। এদিকে সংবিধান সংশোধনের এই বিল উচ্চ আদালতে চ্যালেঞ্জ হবে। দেশের সিনিয়র আইনজীবীরা মনে করেন, বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে ফিরিয়ে দিলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হবে। এতে বিচার বিভাগ সংসদের মুখাপেক্ষী হয়ে পড়বে এবং নির্বাহী বিভাগের কর্তৃত্ব বাড়বে।

১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদে বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে ন্যস্ত ছিলো। জিয়াউর রহমানের শাসনামলে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে এই ক্ষমতা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের হাতে দেয়া হয়। এ সংক্রান্ত সংবিধানের ৯৬(৩) অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে, একটি সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল থাকিবে যাহা এই অনুচ্ছেদে 'কাউন্সিল' বলিয়া উল্লিখিত হইবে এবং বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি এবং অন্যান্য বিচারকের মধ্যে পরবর্তী যে দুইজন কর্মে প্রবীণ তাহাদের লইয়া গঠিত হইবেঃ তবে শর্ত থাকে যে, কাউন্সিল যদি কোন সময়ে কাউন্সিলের সদস্য এইরূপ কোন বিচারকের সামর্থ্য বা আচরণ সম্পর্কে তদন্ত করেন, অথবা কাউন্সিলের কোন সদস্য যদি অনুপস্থিত থাকেন অথবা অসুস্থতা কিংবা অন্য কোন কারণে কার্য করিতে অসমর্থ্য হন তাহা হইলে কাউন্সিলের যাহারা সদস্য আছেন তাহাদের পরবর্তী যে বিচারিক কর্মে প্রবীণ তিনিই অনুরূপ সদস্য হিসাবে কার্য করিবেন।

(৪) কাউন্সিলের দায়িত্ব হইবে-

(ক) বিচারকগণের জন্য পালনীয় আচরণ বিধি নির্ধারণ করা; এবং (খ) কোন বিচারকের অথবা কোন বিচারক যেরূপ পদ্ধতিতে অপসারিত হইতে পারেন সেইরূপ পদ্ধতি ব্যতীত তাহার পদ হইতে অপসারণযোগ্য নহেন এইরূপ অন্য কোন পদে আসীন ব্যক্তির সামর্থ্য বা আচরণ সম্পর্কে তদন্ত করা।

(৫) যে ক্ষেত্রে কাউন্সিল অথবা অন্য কোন সূত্র হইতে প্রাপ্ত তথ্যে রাষ্ট্রপতির এইরূপ বুঝিবার কারণ থাকে যে কোন বিচারক- (ক) শারীরিক বা মানসিক অসামর্থ্যের কারণে তাহার পদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করিতে অযোগ্য হইয়া পড়িতে পারেন, অথবা (খ) গুরুতর অসদাচরণের জন্য দোষী হইতে পারেন, সেইক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি কাউন্সিলকে বিষয়টি সম্পর্কে তদন্ত করিতে ও উহার তদন্ত ফল জ্ঞাপন করিবার জন্য নির্দেশ দিতে পারেন। (৬) কাউন্সিল তদন্ত করিবার পর রাষ্ট্রপতির নিকট যদি এইরূপ রিপোর্ট করেন যে, উহার মতে উক্ত বিচারক তাহার পদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালনে অযোগ্য হইয়া পড়িয়াছেন অথবা গুরুতর অসদাচরণের জন্য দোষী হইয়াছেন তাহা হইলে রাষ্ট্রপতি আদেশের দ্বারা উক্ত বিচারককে তাহার পদ হইতে অপসারিত করিবেন।

সংবিধানের এই বিধান বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে রক্ষাকবচ হিসেবে মনে করেন আইনজীবীরা। ৫ম সংশোধনী বাতিলের মামলায়ও আপিল বিভাগ তার রায়ে উল্লেখ করেছেন। ১৯৭২ সালের সংবিধানের বিচারক অপসারণ পদ্ধতির যে প্রক্রিয়া তার চেয়ে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের বিধান বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে শ্রেয়তর। ৫ম সংশোধনী বাতিল ঘোষণা করলেও আপিল বিভাগ সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের বিধানটি অবৈধ ঘোষণা করেনি। পঞ্চদশ সংশোধন বিল পাসের জন্য গঠিত সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটিও সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের বিধানটি রেখে দিয়ে সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদের সংশোধন করে।

কিন্তু হঠাত্ করে বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের নেতৃত্বাধীন আইন কমিশন সরকারের কাছে বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে ফিরিয়ে নেয়ার সুপারিশ করে। এই সুপারিশ পাওয়ার পর সরকারের নীতিনির্ধারকরা আইন মন্ত্রণালয়কে এ সংক্রান্ত সংবিধান সংশোধন বিল প্রস্তুত করার জন্য গ্রিন সিগন্যাল দেন। প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রিসভার বৈঠকে আইনমন্ত্রীকে এ বিষয়ে তাগাদা দেন। সূত্র জানায়, বৈঠকে আইনমন্ত্রী জানিয়েছেন বিলের খসড়া তিনি প্রস্তুত করে রেখেছেন।

জানা গেছে, খসড়ায় ১৯৭২ সালের সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদ প্রতিস্থাপন করার কথা বলা হয়েছে। বর্তমান সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদে আটটি উপ-অনুচ্ছেদ রয়েছে। খসড়ায় ৯৬ অনুচ্ছেদে উপ-অনুচ্ছেদ থাকবে মাত্র চারটি। এর মধ্যে বিচারকদের অপসারণ-সংক্রান্ত ক্ষমতা সংসদের হাতে দেয়ার প্রস্তাব রয়েছে ৯৬ (২) অনুচ্ছেদে। আর বিচারকদের অসদাচরণ বা অসামর্থ্য প্রমাণের পদ্ধতি আইন দিয়ে নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে ৯৬ (৩) অনুচ্ছেদে। ৯৬ (২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, 'প্রমাণিত অসদাচরণ বা অসামর্থ্যর কারণে সংসদের মোট সদস্য-সংখ্যার অন্যূন দুই-তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতার দ্বারা সমর্থিত সংসদের প্রস্তাবক্রমে প্রদত্ত রাষ্ট্রপতির আদেশ ব্যতীত কোন বিচারককে অপসারিত করা যাইবে না।' ৯৬ (৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, 'এই অনুচ্ছেদের (২) দফার অধীন প্রস্তাব সম্পর্কিত পদ্ধতি এবং কোন বিচারকের অসদাচরণ বা অসামর্থ্য সম্পর্কে তদন্ত ও প্রমাণের পদ্ধতি সংসদ আইনের দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করিতে পারিবেন।'

সংসদের আগামী অধিবেশনে এ সংক্রান্ত ১৬ তম সংবিধান সংশোধন বিল উত্থাপনের প্রস্তুতি রয়েছে আইন মন্ত্রণালয়ের। কিন্তু সংবিধান সংশোধনের এই কার্যক্রম উচ্চ আদালতে চ্যালেঞ্জ হবে। সুপ্রিম কোর্ট বারের সম্পাদক ব্যারিস্টার মাহবুবউদ্দিন বলেন, 'সম্প্রচার নীতিমালা করে সরকার যেমনিভাবে গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে তেমনিভাবে সংসদের হাতে বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা দিয়ে বিচার বিভাগকে আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার গভীর ষড়যন্ত্র করছে। আমরা এই প্রক্রিয়াকে বিনা চ্যালেঞ্জে ছেড়ে দেব না। এর সঙ্গে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা জড়িত। আমরা এটি উচ্চ আদালতে চ্যালেঞ্জ করব।'

প্রবীণ আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক-উল হকও মনে করেন, এটি করা হলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হবে। তিনি বলেন, 'সরকার যখন বিচার বিভাগের উপর অসন্তুষ্ট হবে তখনই বিচারকদের অপসারণের সুযোগ পাবে।'

সুপ্রিম কোর্ট বারের সভাপতি এডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, 'এটি করা হলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বলে কিছু থাকবে না। বর্তমান সরকার রাজনৈতিক প্রভাব বিচার বিভাগের ওপর প্রতিষ্ঠিত করার জন্য এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে। এতে কোনভাবে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠিত হবে না। সংবিধান বিচারকদের স্বাধীনভাবে কাজ করার যে এখতিয়ার দিয়েছে, তাও বিনষ্ট হবে।'

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ল'র পরিচালক ড. শাহদীন মালিক বলেন, 'এই সংশোধনী পাস হলে জনমনে ধারণা জন্মাবে যে সরকার বিচার বিভাগকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য এই পদক্ষেপ নিয়েছে। যেটির ফল হবে দেশের শাসন ব্যবস্থার জন্য ভয়াবহ। দ্বিতীয়ত এই সংসদ জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে না। কারণ এটি নির্বাচিত বলে ধরে নেয়া সংসদ। এই সংসদ বিচার বিভাগকে নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে বিচার বিভাগের উপর থেকে জনগণের আস্থা চলে যাবে। যে সমাজে বিচার বিভাগের উপর জনগণের আস্থা থাকে না সেই সমাজে টিকে থাকা অসম্ভব।'

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এম আসাদুজ্জামান বলেন, পঞ্চম সংশোধনী মামলায় বিষয়টি বহু আগেই ফয়সালা হয়েছে। আপিল বিভাগ সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের বিধানকে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার রক্ষা কবচ হিসেবে মনে করেই এটিকে রেখে দিয়েছেন। পঞ্চদশ সংবিধান সংশোধনীর সময়েও আপিল বিভাগের এই রায়ের প্রতি সম্মান দেখিয়ে বর্তমান এই সরকারই এটি রেখে দিয়েছিলো। এখন এমন কি ঘটল যে এর পরিবর্তন করতে হবে। তিনি বলেন, সম্প্রতি হাইকোর্টের একজন অতিরিক্ত বিচারককে স্থায়ী বিচারক করা হয়নি। তিনি একটি মামলার রায়ে জাতীয় সংসদের একটি রুলিং অসাংবিধানিক ও বেআইনি বলে ঘোষণা করেছিলেন। আইনজীবীরা মনে করেন শুধুমাত্র এই কারণেই তাকে স্থায়ী নিয়োগ দেয়া হয়নি। ফলে সংসদের কর্তা ব্যক্তিরা রুষ্ট হলে কি হয় তার নজির তো আমাদের চোখের সামনে রয়েছে। এডভোকেট আসাদুজ্জামান বলেন, সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিচার কর্মবিভাগে নিযুক্ত বিচারকরা তার কর্মপালনে সম্পূর্ণ স্বাধীন। এখন ৯৬ অনুচ্ছেদকে সংশোধন করা হলে ১১৬ অনুচ্ছেদে বিচারকদের যে স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে তার সঙ্গে সংঘাত হবে।

সর্বশেষ আরো খবর -
font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেছেন, 'জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালায় কারো নৈতিক অধিকার খর্ব করা হয়নি।' আপনিও কি তাই মনে করেন?
1 + 1 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
জুন - ২০
ফজর৩:৪৩
যোহর১২:০০
আসর৪:৪০
মাগরিব৬:৫১
এশা৮:১৬
সূর্যোদয় - ৫:১১সূর্যাস্ত - ০৬:৪৬
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :