The Daily Ittefaq
বুধবার, ১৩ আগস্ট ২০১৪, ২৯ শ্রাবণ ১৪২১, ১৬ শাওয়াল ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ, পাসের হার ৭৮.৩৩ শতাংশ | প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রভাব ফলাফলে পড়েনি: শিক্ষামন্ত্রী | পাসের হারে মেয়েরা, জিপিএ-৫-এ ছেলেরা এগিয়ে

অবরুদ্ধ জীবনে মনিরুজ্জামান মিঞা!

স্বজনদের দাবি, তিনি অসুস্থ

সাইদুর রহমান

দেশের খ্যাতিমান শিক্ষাবিদ তিনি। ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। দায়িত্ব পালন করেছেন রাষ্ট্রদূতের। অথচ আজ তিনি লোকচক্ষুর আড়ালে। পরিবারের সদস্যদের ছাড়া যোগাযোগ নেই শুভাকাঙ্ক্ষী ও পরিচিত কারোর সঙ্গে। ব্যবহারের জন্য ব্যক্তিগত মোবাইলও নেই। এমনকি ব্যক্তিগত গাড়িটিও ব্যবহার করছেন অন্যরা। গত চার মাস যাবত্ বনানীর নিজগৃহে একপ্রকার বন্দী জীবন-যাপন করছেন অধ্যাপক মনিরুজ্জামান মিঞা। তবে স্বজনরা দাবি করেছেন, চিকিত্সকের পরামর্শে তাকে পূর্ণ বিশ্রামে রাখা হয়েছে। তিনি আলঝেইমার (স্মৃতিবিভ্রম) রোগে আক্রান্ত বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

ভারতের মুর্শিদাবাদে ১৯৩৫ সালে জন্ম নেয়া অধ্যাপক মনিরুজ্জামান মিঞা বর্তমানে বনানীর চেয়ারম্যান বাড়ীর (রোড নং ২/এ, বাড়ি নং ১৩) জামান ভিলার তৃতীয় তলায় নিভৃতে বসবাস করছেন। পাঁচ ভাই-এক বোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়। বাবা মোদ্দাছের হোসেন ছিলেন স্কুল শিক্ষক, মা আনোয়ারা খাতুন ছিলেন গৃহিণী। পরে তার পরিবার চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় স্থায়ী হয়। অধ্যাপক মনিরুজ্জামান কৃঞ্চ গোবিন্দ হাই স্কুল থেকে এসএসসি, রাজশাহী কলেজ থেকে বিএসসি পাস করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএসসি করেন। জগন্নাথ কলেজে শিক্ষকতা শুরু করেন। ১৯৬১ সালে উচ্চতর ডিগ্রীর জন্য প্যারিসে যান। ১৯৬৬ সালে প্যারিস থেকে ফিরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগে যোগদান করেন। ১৯৯০ সালের ২৪ মার্চ থেকে ১৯৯২ সালের ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করেন। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০০১ প্রণয়ন কমিটিতে তিনি চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এটিকে মনিরুজ্জামান মিঞা শিক্ষানীতি বলা হয়। পরবর্তীতে তিনি ইবাইস বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশনার ও সেনেগালের রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি চিরকুমার। যৌবনে পরিবারের সদস্যরা চেষ্টা করলেও তিনি বিয়েতে রাজি হননি। পরে ১৯৯০ সালে বিয়েতে আগ্রহী হলেও শেষ পর্যন্ত তা আর হয়ে ওঠেনি।

নিঃসঙ্গতা অধ্যাপক মনিরুজ্জামানকে শারীরিকভাবে দুর্বল করে ফেলেছে। আগের চেয়ে শরীরটা কৃশকায় হয়ে গেছে। তিনি বনানীর যে ফ্ল্যাটে থাকেন তার উপরের তলায় থাকেন তার আরেক ভাই ও পরিবারের সদস্যরা। তবে তাকে দেখভাল করছেন ছোটভাই বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্ট্যাডিজের প্রফেসরিয়াল ফেলো ড. এম আসাদুজ্জামান। পরিবারের সদস্যরা ছাড়া পরিচিতরা ওই বাড়িতে মনিরুজ্জামানের সঙ্গে দেখা করতে গেলেও দেখা পান না। তার ব্যবহূত দুইটি মোবাইল নম্বরই বন্ধ রয়েছে। এই অবস্থায় মঙ্গলবার অধ্যাপক মনিরুজ্জামানের সঙ্গে দেখা করার জন্য তার জামান ভিলায় গেলে অনুমতি ছাড়া দেখা করা যাবে না বলে জানান নিরাপত্তাকর্মীরা। পরে অধ্যাপক মনিরুজ্জামানের ছোট ভাই ড. এম আসাদুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি অপেক্ষা করতে বলেন। দুপুর ১টার দিকে তিনি এবং তার স্ত্রী অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা মেহেরুন নেসা অধ্যাপক মনিরুজ্জামানের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ দেন। এসময়ে স্বভাব-সুলভ ভঙ্গিতে অধ্যাপক মনিরুজ্জামান বলেন, কেমন আছো? জি স্যার ভালো। এরপর শারীরিক পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বলেন তিনি।

পরিবারের সদস্যদের অনুমতিতে অধ্যাপক মনিরুজ্জামান একান্তভাবে ইত্তেফাককে বলেন, 'সোমবার ব্যাংকে যেতে চাইলে রুমে তালাবদ্ধ থাকার কারণে যেতে পারিনি। ব্যাংক থেকে আমাকে বলা হয়েছে, কে বা কারা দুই দফায় ৩ লাখ ও ৯ লাখ করে মোট ১২ লাখ টাকা আমার একাউন্ট থেকে উত্তোলন করেছে। কিন্তু আমি কোন টাকা তুলিনি। এ বিষয়ে আলোচনার জন্য ব্যাংকে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু যেতে পারলাম না।

তিনি বলেন, মানসিক অসুস্থ না হলেও আমাকে মানসিক অসুস্থ বলা হচ্ছে। ইচ্ছা করলেই বাইরে যেতে পারি না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পেনশনও ঠিকভাবে পাচ্ছি না। আর্থিকভাবে কষ্টে আছি। এজন্য মোবাইল ফোন ক্রয় করতে পারছি না। আমি নিজের ফ্ল্যাটে আছি। ব্যাংকেও অর্থ জমা আছে। পরে তিনি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পুনরায় শিক্ষকতা করার জন্য দুটি চিঠি ডাক করার জন্য ধরিয়ে দেন। এর একটি ইউজিসি চেয়ারম্যানের কাছে অন্যটি ইবাইস বিশ্ববিদ্যালয়ের এক পরিচালকের কাছে।

তবে কারা আপনাকে তালাবদ্ধ করে রেখেছে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি জানি না। আমি বাইরে বের হতেই পারি না। ড্রাইভারের সঙ্গে দেখা করতে চাইলেও দেয়া হয় না। কারোর আমার সম্পত্তির প্রতি নজর পড়েছে বলে এমনটা হবে। একটা ছেলে আমাকে দেখা-শুনা করে। মাঝে মাঝে রাতে আমার একভাই আমার সঙ্গে থাকে। বাজার ওই করে দেয়।

খাবারের কোন সমস্যা হচ্ছে কিনা-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এখন আর তেমন খেতে পারি না। কাজের ছেলেটাই রান্না করে দেয়। তবে আমি আগের মতো স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে চাই। কারোর অধীনে থাকতে চাই না।

অধ্যাপক মনিরুজ্জামানের অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে ছোট ভাই ড. এম আসাদুজ্জামান ইত্তেফাককে বলেন, আসল ঘটনা হলো, গত বছর থেকেই অল্প সময়ের জন্য ছোট ছোট বিষয় ভুলে যেতেন তিনি। এ বছরের জানুয়ারি মাসে বিষয়টি আরো গুরুতর আকার ধারণ করে। তাকে একজন নিউরোলজিস্ট দেখানো হয়। নিউরোলজিস্ট পরীক্ষা করে জানান, শরীরে ভিটামিন বি ১২ এর মারাত্মক ঘাটতির কারণে মনিরুজ্জামান মিঞার মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বৈকল্যের সৃষ্টি হয়েছে; যা আলঝেইমার রোগ নামে পরিচিত। ফলে তার ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রষ্টতা দেখা দিয়েছে। পরে এই রোগ মারাত্মক আকার ধারণ করলে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তবে হাসপাতালে থাকতে না চাওয়ায় তাকে বাড়ি ফিরিয়ে আনা হয়। এরপর থেকেই তিনি একজন মানসিক চিকিত্সকের তত্ত্বাবধানে রয়েছেন এবং তার নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং চিকিত্সা চলছে।

তিনি জানান, গত মার্চ মাস থেকে তাকে পরিবারের অনুমতি ছাড়া বাইরে যেতে দেয়া হয় না। কারণ এর আগে হঠাত্ করে কাউকে না জানিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে যেতো। বর্তমানে তার পরিস্থিতি এতোই মারাত্মক যে তিনি তার ভাই এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের চিনতে পারেন না। অনেক সময় ছোট ভাইকে বড় ভাই ভেবে ভুল করেন। মাঝে মাঝে ভুলে যান যে তার পিতামাতা ৩০-৪০ বছর আগে মারা গেছেন। যে স্থানে তিনি শতবার গেছেন এমন জায়গাও তিনি চিনতে পারেন না। এ পরিস্থিতিতে তাকে কোথাও একা যেতে দেয়া হলে তিনি নিজে থেকে বাড়ি ফিরতে সক্ষম হবেন না। এসবই সম্পূর্ণভাবে আলঝেইমার রোগের লক্ষণ। দিন দিন তার পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে এবং অসুস্থতা চিকিত্সার অসাধ্য হয়ে পড়ছে। তবে চিকিত্সকের পরামর্শ তাকে রক্ষার যথাসাধ্য চেষ্টা করে যাচ্ছে তার পরিবার। যে কোনো অঘটন এড়াতে আমরা কোনো সময়ের জন্যই তাকে একা ছাড়ি না।

সম্পত্তির লোভে এমনটা করা হচ্ছে কিনা—এমন অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, এটা সম্পূর্ণ ?ভিত্তিহীন। বরং ব্যাংকিং লেনদেনে অসমর্থ হওয়ায় তার প্রতিদিনের খরচ, চিকিত্সার খরচ এবং অন্যান্য প্রয়োজন তার পরিবারের সদস্যরাই বহন করছেন। তিনি হয়তো মনে করতে পারেন তিনি ঠিক আছেন। শারীরিকভাবে তিনি হয়তো সুস্থ তবে তার মস্তিষ্ক ভালোভাবে কাজ করছে না।

বাসার কাজের ছেলে মনির বলেন, স্যারের ইচ্ছা অনুযায়ী সব করা হয়। শুধু একা তাকে বাইরে যেতে দেয়া হয় না। তবে জামান ভিলার আশপাশের সদস্যরা জানান, পরিবারের সদস্যদের অনুমতি ছাড়া তাকে কারোর সঙ্গে দেখা পর্যন্ত করতে দেয়া হয় না। একপ্রকার বন্দী করে রাখা হয়েছে তাকে।

অধ্যাপক মনিরুজ্জামান স্কয়ার হাসপাতালের চিকিত্সক ডা. ওয়াজিউল আলম চৌধুরীর তত্ত্বাবধানে রয়েছেন। অধ্যাপক মনিরুজ্জামানের চিকিত্সার বিষয়ে খোঁজ-খবর নেয়ার জন্য ডা. ওয়াজিউল আলম চৌধুরীর মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

এই পাতার আরো খবর -
font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেছেন, 'জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালায় কারো নৈতিক অধিকার খর্ব করা হয়নি।' আপনিও কি তাই মনে করেন?
6 + 9 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
ফেব্রুয়ারী - ২৯
ফজর৫:০৫
যোহর১২:১২
আসর৪:২৩
মাগরিব৬:০৪
এশা৭:১৭
সূর্যোদয় - ৬:২১সূর্যাস্ত - ০৫:৫৯
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :