The Daily Ittefaq
বুধবার, ১৩ আগস্ট ২০১৪, ২৯ শ্রাবণ ১৪২১, ১৬ শাওয়াল ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ, পাসের হার ৭৮.৩৩ শতাংশ | প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রভাব ফলাফলে পড়েনি: শিক্ষামন্ত্রী | পাসের হারে মেয়েরা, জিপিএ-৫-এ ছেলেরা এগিয়ে

পদ্মায় লঞ্চডুবি

সাক্ষ্য দিতে এসে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন অনেকে

গণশুনানিতে সাড়া কম, আরো তিন লাশ উদ্ধার

মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি

পদ্মায় পিনাক-৬ লঞ্চডুবির ঘটনায় নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটি গতকাল মঙ্গলবার গণশুনানি করেছে। কিন্তু এতে খুব একটা সাড়া মিলেনি। বেঁচে যাওয়া যাত্রীদের মধ্যে মাত্র পাঁচ জন ও দুই প্রত্যক্ষদর্শী গতকাল সাক্ষ্য দেন। এদের অনেকে সাক্ষ্য দিতে এসে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। এদিকে দুর্ঘটনার নবম দিনে গতকাল বিভিন্ন স্থানে আরো তিনটি লাশ উদ্ধার হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

সকাল ১০টা থেকে সাক্ষ্য গ্রহণ করার কথা থাকলেও তদন্ত কমিটির সদস্যদের মাওয়ার পদ্মা রেস্ট হাউসে পৌঁছতে বিলম্ব হওয়ায় সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয় বেলা পৌনে ১২টায়। পৌনে ২টা পর্যন্ত তারা ওই সাতজনের সাক্ষ্য গ্রহণ করেন। পরে কাঁঠালবাড়ি ঘাটে একজন ও কাওড়াকান্দি ঘাটে চারজনের স্বাক্ষ্য গ্রহণ করেন তারা। এছাড়া নদী পার হওয়ার সময় তদন্ত দল বিআইডব্লিউটিএ জাহাজ 'তিস্তা'য় বসেই বিআইডব্লিউটিএ'র তত্কালীন পরিবহন পরিদর্শক ও লঞ্চ দুর্ঘটনা মামলার বাদি জাহাঙ্গীর হোসেন ভুঁইয়া (দায়িত্ব অবহেলার জন্য বর্তমানে বরখাস্ত) এবং মাওয়া বন্দরের পোর্ট অফিসার মো. মহিউদ্দিনের স্বাক্ষ্য গ্রহণ করেন। এ নিয়ে মোট ১৪ জনের স্বাক্ষ্য গ্রহণ করে সন্ধ্যার দিকে তারা ফিরে যান।

তদন্ত কমিটির কাছে সাক্ষ্য দিতে এসে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন লঞ্চ দুর্ঘটনায় বেঁচে যাওয়া যাত্রী গাজীপুর জেলার কাপাসিয়া থানার উত্তরখাম গ্রামের ইব্রাহিমের স্ত্রী বিউটি আক্তার (৪৫)। তিনি জানান, তার মেয়ে ইসরাত জাহান মিমের (১৪) লাশ ৪ দিন পর ভোলা থেকে উদ্ধার করা হয়। বিউটি বলেন, 'লঞ্চে অতিরিক্ত যাত্রী উঠানোর সময় আমরা বাধা দিয়েছিলাম। তখন লঞ্চের লোকজন আমাকে ধমকি দেয়।' তদন্ত কমিটির কাছে সাক্ষ্য শেষে ডুবে যাওয়া লঞ্চের জীবিত উদ্ধার হওয়া যাত্রী তিতুমীর কলেজের ছাত্র মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার দক্ষিণ ক্রোকচর গ্রামের মোশারফ মোল্লার পুত্র মো. সুজন মাহমুদ (২০) জানান, তার পরিবারের পাঁচ জন ওই লঞ্চে ছিল। খালা হাসি বেগমের (৩৫) লাশ পেলেও বাকি তিন জনের সন্ধান মিলেনি। খালাতো ভাই মিরাজ (৯), খালাতো বোন ইপা আক্তার (১৩) ও ইব্রাহিমের (১৭) ভাগ্যে কি হয়েছে তা এখনও জানেন না তারা। সুজন মাহমুদ কান্না জড়িত কণ্ঠে বলেন, 'অন্তত লাশটা পেলেও সান্ত্বনা দিতে পারতাম। সরকার এটা কি করলো। টাকা দিতে হইবো দেইখ্যা কি লঞ্চটি উঠাইলো না? আমরা টাকা চাই না, আমাদের স্বজনদের ফিরিয়ে দেন। তাদের মাটি দিতে পারলে অন্তত কবরটাতো দেখতে পারমু।'

সাত সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটির প্রধান যুগ্ম সচিব নূর-উর-রহমান সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে জানান, উপস্থিত সকলের সাক্ষ্য নেয়া হয়েছে। লঞ্চটি কিভাবে ডুবেছে এবং কি কারণে ডুবেছে আমরা এ সব জানার চেষ্টা করছি। তিনি আরও জানান, তদন্ত কমিটি নির্দিষ্ট ১০ দিনের মধ্যেই তদন্ত রিপোর্ট দেয়ার চেষ্টা করবে।

সাক্ষ্য গ্রহণের সময় কমিটির সদস্য সচিব সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের চিফ ইঞ্জিনিয়ার ক্যাপটেন জসিম উদ্দিন, বুয়েটের শিক্ষক প্রকৌশলী গৌতম কুমার সাহা, সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের ম্যাজিস্ট্রেট সাইফুল হাসান, বিআইডব্লিউটিএ'র ইঞ্জিনিয়ার ফিরোজ আহমেদ, বিআইডব্লিউটিসির প্রতিনিধি আব্দুল রহিম তালুকদার ও মুন্সীগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক নজরুল ইসলাম সরকার উপস্থিত ছিলেন।

আরও ৩ লাশ উদ্ধার: গত ৪ আগস্ট বেলা ১১টার দিকে কাওড়াকান্দি থেকে মাওয়া আসার পথে আড়াইশ' যাত্রী নিয়ে পিনাক-৬ লঞ্চটি ডুবে যায়। দুর্ঘটনার পর শতাধিক যাত্রীকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়। এছাড়া গত সোমবার পর্যন্ত মোট ৪৬টি লাশ উদ্ধার হয়। এদিকে গতকাল আরও তিনটি লাশ উদ্ধার হয়েছে। এর মধ্যে বরিশালের কাউনিয়া থেকে অজ্ঞাত নারী (২৫), শরিয়তপুরের সখীপুর থেকে অজ্ঞাত পুরুষ (৩০) এবং লক্ষ্মীপুরের রামগতি থেকে অজ্ঞাত আরেক নারীর (২৪) লাশ উদ্ধার করা হয়। লাশগুলো মাদারীপুরের শীবচরের পাঁচ্চর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আনা হচ্ছে। এ নিয়ে লঞ্চ দুর্ঘটনার পর মোট ৪৯টি লাশ উদ্ধার হলো।

অন্যদিকে নিখোঁজ অর্ধশতাধিক যাত্রীর ব্যাপারে কোন সদুত্তর না দিয়েই ডুবে যাওয়া লঞ্চটির উদ্ধার কার্যক্রম গত সোমবার স্থগিত ঘোষণা করে প্রশাসন। নিখোঁজদের সন্ধান না পাওয়ায় এবং লঞ্চ উদ্ধার না করেই উদ্ধার কার্যক্রম স্থগিত ঘোষণায় স্বজনহারাদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।

দাফনের টাকা না পাওয়ার অভিযোগ : গতকাল বিকাল তিনটায় মাওয়ায় পদ্মা রেস্ট হাউজে তদন্ত কমিটিকে খুঁজতে আসেন ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার ব্রাহ্মণকান্দা গ্রামের মৃত আব্দুল করিমের পুত্র কৃষক খলিল শেখ (৫৫); কিন্তু ততক্ষণে তদন্ত কমিটি রেস্ট হাউজ ছেড়ে ওপারে কাঁঠলবাড়ি ও কাওড়াকান্দি ঘাটে চলে যাওয়ায় তার কষ্টের কথা জানাতে পারেনি কমিটিকে। তবে খলিল শেখ অভিযোগ করেন, দুর্ঘটনার পাঁচ দিন পর শিবচরের পাচ্চর হাই স্কুল মাঠ থেকে তার মেজ মেয়ে মায়নার (২২) লাশ গ্রহণ করেন। তখন লাশ বহন ও দাফন বাবদ জেলা প্রশাসকের ঘোষণার ২০ হাজার টাকা তিনি পান নি। টাকা চাইলে শিবচর সাব-কন্ট্রোল রুমের কর্তব্যরত পুলিশ কর্মকর্তারা পরে যোগাযোগ করতে বলেন; কিন্তু গতকাল পর্যন্ত তিনি টাকা পাননি।

খলিল শেখ জানান, তার কন্যা ময়না আক্তার গার্মেন্টেসে চাকরি করতো। তার রোজগারেই সংসার চলতো। একমাত্র উপার্জনক্ষম মেয়েটি মারা যাওযায় এখন তিনি চোখেমুখে অন্ধকার দেখছেন। বিকাল ৪টা পর্যন্ত মাওয়ায় থাকার ঘোষণা দিয়েও তদন্ত কমিটি চলে যাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে খলিল বলেন, 'লাশ দাফনের টাহা পাইলাম না, ক্ষতিপূরণের ১ লাখ ৫ হাজার টাহা পামু কি না জানি না, আবার লঞ্চ মালিকের বিচার হবে কিনা এ নিয়াও সন্দেহ হামার।'

এ ব্যাপারে মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. সাইফুল হাসান বাদল জানান, যারা টাকা পাননি, তারা মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসক অথবা মাদারীপুরের জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে যোগাযোগ করলে টাকা পেয়ে যাবেন। ঘোষণার সব টাকাই স্বজনদের দেয়া হবে।

নিখোঁজ বহু যাত্রীর ব্যাগ মাওয়া ঘাটে: ডুবে যাওয়া লঞ্চ পিনাক-৬-এর অনেক যাত্রীর ব্যাগ এখনোও মাওয়া ঘাটে সংরক্ষিত আছে। স্থানীয় কান্দিরপাড় গ্রামের মনসুর আলী মাদবরের ছেলে নাহিদ (২২) ব্যাগগুলো সংরক্ষণ করছেন। মাওয়া ঘাটে তার স্পিডবোটের তেলের দোকানে গিয়ে দেখা গেছে বেশকিছু ব্যাগের স্তূপ।

নাহিদ জানান, আমি লঞ্চটি ডুবে যেতে দেখেছি। তখন ঘাটে আমাদেরই ৭টা বোট ছিল, সবগুলোকে পাঠাই উদ্ধার করতে। ৭টা বোটে ৩৫ থেকে ৪০ জনকে উদ্ধার করে নিয়ে আসি। নামিয়ে রেখে আবার আনতে গিয়ে আর কাউকে পাওয়া যায়নি, যে কজনকে ভাসতে দেখা গিয়েছিল সবাই তলিয়ে গেছে। তখন ব্যাগগুলো ভাসতে দেখে উঠিয়ে নিয়ে আসি। প্রায় ৬০টির মতো ব্যাগ ছিল। পরিচয় দিয়ে ব্যাগে কি আছে প্রমাণের পর প্রায় ৩০টি ব্যাগ এ পর্যন্ত মালিকরা নিয়ে গেছেন। আরো ৩০/৩৫টি ব্যাগ রয়ে গেছে।

নিখোঁজদের পরিবারে আহাজারি : ফরিদপুর প্রতিনিধি ও ভাঙ্গা সংবাদদাতা জানান, লঞ্চ ডুবির ঘটনায় এ পর্যন্ত ভাঙ্গার ২ জনের মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। এখনো একই পরিবারের ৫ জনসহ উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের ১৪ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের পরিবারে এখন চলছে শোকের মাতম। স্বজনের মরদেহ আসবে, একনজর দেখবে এই আশাতেই দিন কাটছে পরিবারের সদস্যদের। আর পরিবারের কিছু সদস্য এখনো পদ্মার পাড়ে খুঁজে ফিরছেন স্বজনের মরদেহ।

নিখোঁজরা হলেন- হামেরদী ইউনিয়নের ভীমের কান্দা গ্রামের ইসমাইল মিয়ার স্ত্রী চাদনী আক্তার (৪০), মেয়ে সাহিদা (১২), মেয়ে সুবর্না (৮), মেয়ে রুমানা (০১) ও তার বোন তাছলিমা বেগম (৫৫); তুজারপুর ইউনিয়নের ষরইবাড়ী গ্রামের সোহরাব হোসেনের ছেলে রবিউল হোসেন (২৮) ও মেয়ে রাবেয়া (১০); ঘারুয়া ইউনিয়নের খামিনারবাগ গ্রামের ছলেমান সেকের মেয়ে শাহিনুর (২৮), সফিউর সেকের ছেলে অলিউর সেক (৩০); কাউলিবেড়া ইউনিয়নের খাটরা গ্রামের লোকমান হোসেনের স্ত্রী আয়শা বেগম (৩০), মেয়ে সারা (১২) ও ভাতিজি রোজিনা (১৩); একই ইউনিয়নের পল্লীবেড়া গ্রামের মোস্তফা মাতুব্বরের ছেলে রেজাউল মাতুব্বর (২৮) ও নাসিরাবাদ ইউনিয়নের ভদ্রকান্দা গ্রামের সফর খানের ছেলে টিটন খান (৩২)।

এই পাতার আরো খবর -
font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেছেন, 'জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালায় কারো নৈতিক অধিকার খর্ব করা হয়নি।' আপনিও কি তাই মনে করেন?
1 + 9 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
সেপ্টেম্বর - ২৭
ফজর৪:৩৩
যোহর১১:৫০
আসর৪:১০
মাগরিব৫:৫৩
এশা৭:০৬
সূর্যোদয় - ৫:৪৮সূর্যাস্ত - ০৫:৪৮
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :