The Daily Ittefaq
বৃহস্পতিবার, ১৪ আগস্ট ২০১৪, ৩০ শ্রাবণ ১৪২১, ১৭ শাওয়াল ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ পুলিশ সুপার পদমর্যাদার ২৮ কর্মকর্তাকে বদলি | পিনাক-৬ লঞ্চের জরিপকারক ওএসডি | ১ সেপ্টেম্বর থেকে ভোটার তালিকা হালনাগাদ শুরু | খিলগাঁওয়ে গুলি করে চার লাখ টাকা ছিনতাই

রাজনীতি

পথহারা রাজনীতির গণতন্ত্রে ফেরার প্রত্যাশা

ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ

মহাত্মন, রাজনীতিকগণ আমাদের মত অর্বাচীনদের কথাকে খেলো ভাবতে পারেন। তবুও আমরা যেহেতু জনগণের একটি অংশ তাই মাঝে-মধ্যে নিজেদের মূল্যবান মনে করি। আর এ কারণে এই পোড়া চোখে আমাদের ক্ষমতাবান রাজনীতিকদের আচরণ, বচন ও পদচারণাকে যখন সমালোচনাযোগ্য মনে করি—নিজের বিচারবুদ্ধিমত পরামর্শ দেয়া দায়িত্ব জ্ঞান করি তখন তা কাগজে লিখি বা তথ্য মাধ্যমে বলে ফেলি। যেহেতু আমাদের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো দ্বিধা-বিভক্ত, তাই যতই যৌক্তিক সমালোচনা হোক তা নেতিবাচকভাবে সহজেই গায়ে মাখেন। সমালোচিত পক্ষ সমালোচনা থেকে উপাদান নিয়ে আত্মশুদ্ধির পথ খোঁজেন না। নিন্দা ভেবে বিরক্ত হন। সমালোচকের প্রতি ক্ষুব্ধ হন। সমালোচনা ছাপলে সংশ্লিষ্ট কাগজের ওপর রুষ্ট হন। ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া হলে মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে গলা টিপে ধরতে চান। এ সবই বাস্তবে ঘটে। কারণ ক্ষমতাবান রাজনীতিকরা প্রকৃত অর্থে গণতন্ত্র চর্চা করেন না। গণতান্ত্রিক আচরণের প্রতি তাঁদের অনেকেরই আস্থা নেই। এর সাথে যুক্ত হয় সরকারে থাকা রাজনীতিকদের সুশাসন প্রতিষ্ঠার ব্যর্থতা। অন্যদিকে বিরোধী পক্ষের আদর্শিক দুর্বলতার কারণে আন্দোলন শাণাতে ব্যর্থ হওয়া। দুই পক্ষের আচরণেই গণতান্ত্রিক চেতনাহীনতা স্পষ্ট। সমালোচনা শুনতে কোনো পক্ষই রাজী নয়।

পনের-ষোল শতকে বহিরাগত সুলতানরা বাংলায় স্বাধীন সুলতানি শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তখন গণতন্ত্র বলতে প্রাতিষ্ঠানিক কোনোকিছুর অস্তিত্ব ছিল না এদেশে। সুলতানদের শাসন এক ধরনের রাজতন্ত্রের আদলেই প্রতিষ্ঠিত ছিল। তবুও সুলতানরা গণশক্তিকে শ্রদ্ধার সাথে মূল্যায়ন করতেন। এখন তো গণতন্ত্রের নামাবলি গায়ে জড়ানো রাজনীতিকরা নির্বাচনের সময় ছাড়া গণশক্তিকে পরোয়া করেন না। নিজেদের সমস্ত স্বেচ্ছাচার চাপিয়ে দেন জনগণের ঘাড়ে। দিল্লির সুলতানদের নিয়োজিত গভর্নররা চৌদ্দ শতকের মাঝপর্বে স্বাধীনতা ঘোষণা করে বাংলায় স্বাধীন সুলতানি রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এ সময় থেকে বাংলার শত্রুপক্ষ হয় দিল্লির মুসলমান সুলতানগণ। বাংলার সুলতানরা অনেকটা নিসঙ্গ হয়ে পড়েন। তাঁরা যথার্থই অনুভব করেন দিল্লির আক্রমণ প্রতিহত করে স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রাখতে হলে বাংলার সাধারণ মানুষকে আস্থায় রাখতে হবে। এই লক্ষ্যে তাঁরা বাংলার হিন্দু-মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে এক অপূর্ব সমন্বয় সাধন করেছিলেন। সুলতানদের মধ্যে গণতন্ত্রচর্চার ধারণা না থাকলেও আচরণের প্রকাশটি ছিল গণতান্ত্রিক।

এখনও আমাদের রাজনীতি প্রায়োগিক ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক হতে পারছে না কেন? এর বড় কারণ হতে পারে গণমুখী রাজনীতির আদর্শ থেকে বেরিয়ে আসা। আত্মবিশ্বাসহীন রাজনীতি আদর্শের শক্তির ওপর ভরসা করার মত সাহসী হতে পারে না। ক্ষমতান্ধতায় বন্দী হয়ে যায় বলে দলকেন্দ্রিকতায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। গণশক্তির চেয়ে অর্থ আর পেশি শক্তিকেই বড় করে দেখে। নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি অপসৃত হয়। তাই তৃণমূল থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত রাজনীতির ভেতর থেকে বেড়ে ওঠা পোড়খাওয়া রাজনীতিকদের মূল্যায়ন কমে যায় দলে। জাতীয় সংসদ ও দলীয় রাজনীতির অঙ্গন কালো টাকায় বলশালী আমলা আর ব্যবসায়ীরা রাজনীতির পোশাক পরে দাপটে চড়ে বেড়ান। প্রায় একক ক্ষমতাশালী নেত্রী-প্রধান আমাদের বড় দলগুলোর নেত্রীরা দূরদৃষ্টি দিয়ে ক্ষমতায় পৌঁছার পথ যতটা তৈরি করতে পারেন ততটাই ব্যর্থ হন দলীয় রাজনীতির ভিত্তিকে গণতান্ত্রিক উপায়ে পরিমার্জিত ও শক্তিশালী করতে। এভাবে দলগুলো জনসম্পৃক্ততা থেকে বিচ্ছিন্ন হতে থাকে। মন্ত্রী এমপি থেকে শুরু করে দলীয় রাজনীতিকরা জনআকাঙ্ক্ষা পূরণের বদলে নিজ নিজ দলের জননেত্রী বা দেশনেত্রীর ইচ্ছে পূরণেই ব্যস্ত থাকেন। এসব ইচ্ছেতে কোনো সংস্কারের জরুরি প্রয়োজন থাকলেও মুখ ফুটে বলার সাহস রাখেন না। আবার মন্ত্রী-এমপিরা গণবিরোধী বা বেফাঁস কথা বললে বা আচরণ করলেও নেত্রী তা শুধরে দেন না। শক্ত হাতে এর প্রতিবিধান করেন না। এতে লাঞ্ছিত হয় গণতন্ত্র—বিপন্ন হয় সাধারণ মানুষ। এর এন্তার উদাহরণও আছে।

গণতান্ত্রিক চর্চা না থাকায় আমাদের রাজনীতি অঞ্চলের ক্ষমতাবানরা সমালোচনা শুনতে পছন্দ করেন না। স্তাবক পরিবেষ্টিত থাকেন বলে গুণগান শোনাটাই অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। ক্ষমতাসীন দল সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হচ্ছে। গুম খুন আর বিচার বহির্ভূত হত্যা বাড়ছে। দলীয় সন্ত্রাসের বাড়বাড়ন্ত মানুষকে অসহায় করে তুলছে। অথচ সরকারের দৃশ্যমান উন্নয়ন কর্মকাণ্ড দিয়ে যে এসব কঠিন বাস্তবতাকে মুছে ফেলা যায় না তা মানতে রাজী নন সরকারি দলের বিধায়করা। তাই সরকারি নীতির সমালোচনা করলে বা সরকারকে সতর্ক করে দিয়ে পথ-নির্দেশনা দিতে চাইলে পত্রিকার লেখক, টকশো-এর কথক সরকার প্রধানের অস্বস্তির কারণ হন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ প্রধান এ ব্যাপারে নিজের ক্ষুব্ধতা এবং অস্বস্তি বহুবার প্রকাশ করেছেন। যা গণতান্ত্রিক ধারার সাথে খুব মেলে না। আর তাই প্রচলিত সংস্কৃতি অনুযায়ী তথ্য মন্ত্রণালয় সরকার প্রধানের ইচ্ছে পূরণের জন্য অসময়ে অপ্রয়োজনে সম্প্রচার নীতিমালা করে ফেললো। সমালোচনার মুখে এখন মাননীয় তথ্যমন্ত্রী মহোদয়কে নানাভাবে ব্যাখ্যা দিতে হচ্ছে।

গণতান্ত্রিক বোধের সংকটের কারণেই কিনা জানি না আমাদের রাজনীতির বিধায়করা সাধারণ মানুষের কষ্ট, ক্ষোভ, হতাশাকে মূল্য দিতে চান না। না হলে নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনাকে হালকাভাবে দেখার প্রবণতা কেন মন্ত্রী-এমপিদের। টিভি চ্যানেলগুলো এই খুনের কথা বেশি করে প্রচার করার বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রী-এমপিরা যখন প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তখন বিপন্ন গণতন্ত্রের বাস্তবতা স্পষ্ট হয়। একজন সমাজকল্যাণ মন্ত্রী তাঁর প্রকাশ্য আচরণের মাধ্যমে দেশের সংস্কৃতি, পেশাজীবীদের সম্ভ্রম থেকে শুরু করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে পর্যন্ত বিব্রত করছেন। দলে আর সরকারে যদি গণতন্ত্র বিরাজ করতো তবে সরকার পত্রপাঠ এর যৌক্তিক প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করতো। হাস্যচ্ছলে সতর্ক করে দেয়াটা যথেষ্ট ছিল না।

আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব গণতান্ত্রিক আচরণ থেকে দূরে সরে এসেছে বলেই ২০০৮ সালের নির্বাচনে মানুষের উজাড় করে দেয়া সমর্থনকে শেষ পর্যন্ত সম্মান দেখাতে পারলেন না। বিপুল জনসমর্থনে সিক্ত হয়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের মনোবল চাঙ্গা হবে এটি প্রত্যাশিতই ছিল। ইতিবাচক রাজনীতির পথে হেঁটে জনগণের সমর্থনকে ধারণ করে দেশের উন্নয়নে, দুর্নীতি কমিয়ে আনতে আর সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেবেন এমনটিই দেশবাসী আশা করেছিলেন। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে নেতিবাচক দলীয় রাজনীতির ছকের বৃত্তেই ঘুরতে লাগলো দলটি।

আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপির ভেতর গণতন্ত্রের দশা আরো বিপন্ন। এখানে একইভাবে দেশনেত্রী নির্ভরতা। তবে অতিসম্প্রতি দ্বৈত নেতৃত্ব দলটিকে নতুন সংকটে ফেলে দিচ্ছে। দেশে বসে খালেদা জিয়া আর প্রবাসে বসে তারেক জিয়ার আদেশ পালন করতে হচ্ছে পুতুল নাচের কুশীলবদের। এ কারণেই ৫ জানুয়ারির নির্বাচনী ট্রেন মিস করে এখন দলটির অসহায় দশা। জামায়াত নির্ভরতা দলের কর্মীদের মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার মনোবল যে দুর্বল করে দেবে একথা বিএনপি নেতৃত্ব সময় থাকতে বুঝতে চাননি। অরাজকতা তৈরি করে ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্নেই শুধু বিভোর থেকেছেন। এখন সরকার বিরোধী আন্দোলনের যে হাঁক-ডাক দিয়ে যাচ্ছেন তাতে যদি দলীয় নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করার ক্ষেত্রে কাজে লাগে তো ভালো—তবে মাঠের আন্দোলনে সক্রিয় হওয়া এত সহজ হবে বলে মনে হয় না। জামায়াতের পেশিশক্তি ব্যবহার করতে গিয়ে বিএনপি কর্মীদের যেভাবে হীনবল করে ফেলা হয়েছে একে পুনর্গঠন করা বেশ কঠিন বলেই অভিজ্ঞ মহলের ধারণা।

বিএনপি নেতৃত্ব বাস্তব বিচারে অগ্রসর হতে চাইলে ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন বিলাসের চেয়ে দলটির এখন গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরে আসার চেষ্টা আগে করা বিধেয়। দল সুসংগঠিত করার বিকল্প নেই। একবারে গাছের মগডালে নিয়মতান্ত্রিক পথে হেঁটে পৌঁছা যাবে না। কারণ এই পথ আগলে বসে আছেন আওয়ামী লীগের কুশলি খেলোয়াড়রা। সরকারের প্রতি জনগণের ক্ষুব্ধতার জায়গাটি শনাক্ত করে সেই মত একের পর এক জনসম্পৃক্ত ইস্যু নিয়ে মাঠের রাজনীতি চাঙ্গা করতে পারলে দলটি ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে বলে আমাদের ধারণা। ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য গণতান্ত্রিক পথে হাঁটার দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা থাকাই শ্রেয়।

এদেশের গণতন্ত্র প্রত্যাশী মানুষের প্রত্যাশা, আমাদের সকল পক্ষের ক্ষমতাবান রাজনীতিকরা নিশ্চয়ই গণতন্ত্রের দিশা পাবেন। কোনো অন্ধকার আর গণবিচ্ছিন্ন পথ নয়, গণতন্ত্রের পথে হেঁটে নিজ নিজ দলের শক্তিকে যেমন সংহত করবেন, দেশকল্যাণেও নিশ্চিত করবেন নিজেদের অবদান।

লেখক :অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, 'খালেদা জিয়া বাস্তবতা বুঝতে পেরেই নরম কর্মসূচি দিয়েছেন।' আপনিও কি তাই মনে করেন?
3 + 3 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
জুন - ১৬
ফজর৩:৪৩
যোহর১১:৫৯
আসর৪:৩৯
মাগরিব৬:৫০
এশা৮:১৫
সূর্যোদয় - ৫:১০সূর্যাস্ত - ০৬:৪৫
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :